তাবুক অভিযান, মুসলিম মিল্লাতের অগ্নিপরীক্ষা

নবম হিজরীর গ্রীষ্মকাল। সূর্যের প্রচন্ড তাপে আরবের মরুভূমি উত্তপ্ত। চারিদিকের মাঠ-ঘাট অগ্নিদগ্ধ। দুঃসহ গরমে মানুষ অস্থির। এই প্রচন্ড গরমের উপর মরণ-ঘাতকের ন্যায় দুর্ভিক্ষের হাহাকার। ঘরে অন্ন নেই,রোগের পথ্য নেই,নিদারুণ কষ্টের মাঝে মানুষের দিন কাটছে। মাঠে ফসল পাকার সময় আসন্ন। দুর্ভিক্ষ পীড়িত ভুখা মানুষের ক্লান্ত  চোখে সুখময় ভবিষ্যতের একটু আশা ঐ পাকা ফসলের মাঠকে ঘিরে। ফসল কাটার প্রস্তুতি চলছে ঘরে ঘরে। আর ঠিক এমনি সময় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো যুদ্ধের সংবাদ ভেসে আসলো। রোমানরা মুসলমানদের শেষ করে দেয়ার জন্য যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছে। রোম স¤্রাজ্য তৎকালীন সময়ের পরাশক্তি। অর্ধেক দুনিয়া জুড়ে যাদের শাসন বিস্তৃত। কিছুদিন আগে এরা আরেক পরাশক্তি পারস্য (ইরান) কে আঘাত করেছিল।
রাসূল সা: এ সংবাদ জানতে পেরে সারা দেশের মানুষের প্রতি যুদ্ধের ঘোষণা জারী করলেন। মদীনার বাইরে বিভিন্ন গোত্রকের সংবাদ দেয়া হলো যে,প্রতিটি সামর্থবান ব্যক্তি যেন এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। সর্বস্তরের জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিলে তিলে গড়ে ওঠা ইসলামী রাষ্ট্র ধ্বংস করে পুণরায় আবার জালেম শাহী প্রতিষ্ঠিত হবে,তা কিছুতেই হতে দেয়া যায় না। তাই প্রতিটি সক্ষম ঈমানদারের ওপর এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ফরয ঘোষণা করা হলো। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক দৈন্যদশা, এ চরম সংকটময় মুহুর্তে একদিকে মানুষের ব্যক্তি জীবন বিপদাপন্ন, অন্যদিকে ইসলাম তেমনি সংকটাপন্ন। কিন্তু মুসলমানদের নিকট ব্যক্তিগত সমস্যার চাইতে দীনের পতাকা সমুন্নত রাখা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আর এ দুঃসময়ের অভিযানের মাধ্যমেই মুনাফিকদের আসল চেহারা প্রকাশিত হবে ।
কেন এই কঠিন যুদ্ধ
সারা পৃথিবী থেকে অন্যায়,অবিচার, যুদ্ধ ও রক্তপাত ইত্যাদি নির্মূলের মাধ্যমে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত মুসলমানদের সংগ্রাম চালু রাখতে হবে। আল্লাহ তা‘য়ালার বাণী, “ তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকো যতক্ষণ না ফিতনা নির্মূল হয়ে যায় এবং দীন একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়। তারপর যদি তারা বিরত হয় তাহলে জেনে রাখো যালেমদের ছাড়া আর কারো ওপর হস্তক্ষেপ করা বৈধ নয়। বাকারা-১৯৩ আয়াত।  রাসূল সা:এর ঘোষণা, “আমাকে হুকুম দেয়া হয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের সাথে লড়াই করতে,যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা এ স্বাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সা:আল্লাহর রাসূল। সেই সাথে নামাজ কায়েম করে ও যাকাত দেয়। যদি তারা এরূপ করে তাহলে তাদের জান ও মালের হেফাজতের দায়িত্ব আমার। (বুখারী ও মুসলিম।) সমস্ত মানবজাতিকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই দীনের অধিনে আনা এবং ফেতনা বন্ধ করা অসম্ভব এটা সকলেই বুঝে। এ সংগ্রাম চালু থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত । কিন্তু রাসূল সা:তো আর কিয়ামত পর্যন্ত থাকবেন না। তাহলে এ দীনের পতাকা বহনের দায়িত্ব পালন করবে কে? নিশ্চয় এ দায়িত্ব প্রতিটি মুসলমানের । প্রয়োজনে সশস্ত্র যুদ্ধ করতে হলেও এ কালেমার পতাকা সমুন্নত রাখতে এমন একটি জাতি গঠন করতে হবে-যে জাতির অন্যতম প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হবে নির্ভিক,মৃত্যুর কোন ভয় করবে না। তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে অটুট। ঐক্য হবে শীষা ঢালা প্রাচীরের ন্যায়। মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী, হারাবার কিছু নেই। উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যের কোনটার অভাব দেখা দিলে কাংখিত সাফল্য আশাকরা যায় না। নিজের সবকিছু বিলিয়ে দেয়ার মাধ্যমে মানবতার শান্তির জন্য সর্বাত্মক ত্যাগ করতে হবে বলেই আল্লাহ তা‘য়ালা এ জাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান ও সর্বশ্রেষ্ঠ পুরষ্কার ঘোষণা করেছেন। পরকালে তাদের কোন হিসেব নেয়া হবে না, কোন প্রশ্ন করা হবে না। এমন কি কবর আযাব তাদের জন্য মওকুফ করা হয়েছে। দেহ থেকে আত্মা বের হওয়ার সাথে সাথেই তাদের সর্বত্তোম জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। আল্লহ তাদেরকে এমন অধিকার দিলেন যে,তারা মরে গেলেও আমরা তদেরকে মৃতু বলতে পারবো না। আল্লাহ তা‘য়ালার এই ঘোষণা থেকেই এ কথা পরিস্কার হয়ে যায় যে,এই দীনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনটি।
আল্লাহর রাসূলের জীবনীর দিকে নজর দিলেই এ সত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তাঁর এ উম্মাতকে জান-মাল উৎসর্গকারী মৃত্যুভয়হীন মুজাহিদ বাহিনী রূপে গঠন করা ছিলো অন্যতম প্রচেষ্টা। মাত্র তিনশ‘ তের জন মুজাহিদ নিয়ে ইসলামের প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ বদরের প্রান্ত থেকে শুরু করে পরবর্তী যুদ্ধ গুলোতে মুজাহিদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে তাঁর জীবনের শেষ অভিযান তাবুকে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা দাঁড়ালো ত্রিশ হাজার। প্রথম ও শেষ যুদ্ধের মাঝখানে মুসলিম জাতির নেতা মুহাম্মাদ সা:সাতাশটি যুদ্ধে নিজে নেতৃত্ব দিলেন। কেন তাঁকে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে হলো, কেনইবা তিনি যখম হলেন? এতবড় ঝুকি নেয়ার দরকারইবা হলো কেন। তিনি জানতেন, পৃথিবীতে এ দ্বীন প্রতিষ্ঠার যে দায়িত্ব তাঁকে দেয়া হয়েছে তা তাঁর জীবনে পূর্ণাঙ্গ ভাবে অর্জন করা সম্ভব হবে না। তাঁর অনুপস্থিতিতে যাদের ওপর এ দায়িত্ব ন্যাস্ত থাকবে তাদেরকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরী করে যেতে হবে। তাইতো আমরা দেখতে পাই যে, প্রথম দিকের যুদ্ধ গুলোতে নিজে নেতৃত্ব দেবার পর মাঝে মধ্যে অন্য সাহাবীদেরকেও দায়িত্ব দিতেন। উদ্দেশ্য নেতৃত্বে নতুন নতুন সেনাপতি তৈরী করা। যারা তাঁর এ পৃথিবী থেকে চলে যাবার পর এই সংগ্রাম চালাবার উপযুক্ততার প্রমান দিতে পারে। সারা জীবনের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাধনা করে যে বীরের জাতি তিনি তৈরী করলেন, তাদেরকে তিনি জীবিত থাকতেই দেখে যেতে চান যে, যে কোন বিনিময় হোক এ দীনের পতাকা তারা সমুন্নত রাখতে বদ্ধ পরিকর। তিনি দেখতে চান,নীজ হাতে গড়া এই জাতি সত্যিই আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নতি স্বীকার করবে না। নেতার আনুগত্য করবে, সুন্নাহর অনুসরণ করবে। সেই সাথে ধন-সম্পদ.ব্যবসা-বাণিজ্য, স্ত্রী-পুত্রসহ সমস্ত কিছু বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত থাকবে। দুঃসহ যন্ত্রনা সহ্য করার মত ধৈর্য্য শক্তি এবং শাহাদাতের নজরানা পেশ করার মত প্রবল আকাংখা তাদের হয়েছে কি না। তাই তিনি তৎকালীন পরাশক্তি রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আহবান করলেন। আর এ অভিযান যে অন্যান্য অভিযানের মত ছিলনা তার বেশ কয়েকটা দিকে নজর দিলেই আমরা তা বুঝতে সক্ষম হব।
অন্যান্য অভিযান থেকে তাবুকের অভিযান ছিল ব্যতিক্রম
ক. পরা শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি: রাসূল সা: কোন অভিযানে প্রস্তুতির সময় গন্তব্য কোথায় এবং কাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হবে তা প্রকাশ করতেন না। এটা ছিলো শত্রুকে না জানিয়ে হঠাৎ আক্রমণের কৌশল, যাতে প্রাণ হানী ও রক্তপাত কম হয়। কিন্তু তাবুকের যুদ্ধে স্পষ্ট ঘোষণা করলেন তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রোমানদের বিরুদ্ধে তাবুকের ময়দানে যুদ্ধ সংঘটিত হবে। স্বল্প সংখ্যক মুসলিম জাতি এতদিন আরবের ভিতরে আরবদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছে। কিন্তু এবার যাদের সাথে যুদ্ধ হবে তারা আরব নয়, রোমান। যাদেরকে আরবরা সবসময় ভয় করে এসেছে। যার প্রমাণ হলো যারা দুর্বলচেতা এবং মুনাফিক ছিলো তারা ভীতি ছড়াতে লাগলো এই বলে যে, এবার আরবরা রোমানদের নিকট পরাজয় বরণ করবে, এটা নিশ্চিত। বিশ্ব নাবী জানতেন যে ভবিষ্যতে তাঁর এই জাতিকে শুধু রোমান নয়,অন্য পরাশক্তি  পারস্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। সেই সাথে তাঁর ওফাতের পর এ দায়িত্ব যখন মুসলিম উম্মাহর উপর অর্পিত হবে তখন পৃথিবীর অন্যান্য জাতির বিরুদ্ধেও লড়তে হবে।  জাতি মানসিকভাবে সেজন্য কতটুকু প্রস্তুত হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করা দরকার। তাই তিনি এ পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা প্রকাশ্যে বলে দিলেন।
খ. তীব্র গরম ও প্রচন্ড পানির পিপাসা:তাবুক অভিযানের সময় অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশী গরম পড়েছিলো। গরমের মাত্রা এতটাই তীব্র ছিলো যে,মানুষ অস্থির হয়ে একটু ছায়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে যেতো। ঐ অসহ্য গরম ও পানির পিপাসায় কাতর হয়েও জাতি তার কর্তব্য পালনে পিছপা হয় কি না, এটাও ছিলো তাদের জন্য পরীক্ষা।
গ. ফসল তোলার সময়: তাবুক অভিযানের সময়টা এমন ছিলো, যখন মদীনার একমাত্র অর্থকরী ফসল খেজুর পেকেছে। কয়েক দিন পরেই ফসল কাটা শুরু হবে। অনেক কষ্টে চাষ করে, পুঁজি বিনিয়োগ করে বুকভরা আশা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণছে, ফসল ঘরে আসলে অর্থনৈতিক দৈন্যদশা কিছুটা লাঘব হবে। আর ঠিক এই সময়ই যুদ্ধে যাওয়ার আহবান। দীনের পতাকা সমুন্নত রাখতে এই জাতি পাকা ফসল রেখে আল্লাহর জন্য জান ও মাল উৎসর্গ করতে প্রস্তুত কিনা?
ঘ. যুদ্ধের গন্তব্য অনের দূরে:এতদিন এ জাতি আরবের ভিতরই যুদ্ধ করেছে, বাইরে যায়নি। এবার মক্কার গন্ডী পেরিয়ে বাহিরে গিয়ে যুদ্ধ করতে হবে। উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে আল্লাহর দীন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে এ জাতি কতটুকু সক্ষম হবে তার পরীক্ষা নেয়া। আল্লাহ তা‘য়ালার অশেষ মেহের বাণী যে, প্রায় সম্পূর্ণ জাতিই যার যা ছিলো তা নিয়েই কোন কিছুর পরওয়া না করে বের হয়ে পড়লো। এখানেই শেষ নয়, সাহাবীদের বৃহৎ একটি জামায়াত পৃথিবীময় এ দীন কায়েমের লক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়েছেন যারা কোন দিন আর স্বদেশে ফিরে আসেননি।  ব্যতিক্রম যে নেই তা কিন্তু বলা যাবে না। মুষ্টিমেয় কিছু লোক যারা নানা অজুহাত পেশ করে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে যায়নি। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘য়ালার ঘোষণা  এসেছে এভাবে,“ ( হে নবী !) যদি তাড়াতাড়ি অর্থ সম্পদ বা আসবাবপত্র লাভের ব্যবস্থা থাকতো আর সফরও সহজ হতো, তবে তারা অবশ্যই তোমার সাথে যুদ্ধে যেতো। কিন্তু তাদের তো পথের দূরত্ব ও সফর কঠিন মনে হতে লাগলো। এখন তারা আল্লাহর কসম খেয়ে বলবে, যদি আমাদের সাধ্য থাকতো তাহলে অবশ্যই বের হতাম। তারা ( মিথ্যা বলে ) নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করছে। আল্লাহ ভালো করেই জানেন তারা মিথ্যাবাদী। ( তাওবা-৪২)। এমনকি যারা মিথ্যা ওযর পেশ করে রাসূল সা: থেকে যুদ্ধে যেতে অব্যহতি চেয়েছিলো, আর রাসূল সা: নিজের স্বভাগত কোমলতা ও উদারতার কারণে তাদেরকে অব্যহতি দিয়েছিলেন, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা:কে সতর্ক করলেন এই বলে যে, এ ধরনের উদার নীতি সর্বক্ষেত্রে সংগত নয়। যদি তাদেরকে অব্যহতি দেয়া না হতো এবং শেষ পর্যন্ত তারা যদি যুদ্ধে না যেত, তাহলে তখন তাদের মিথ্যা ঈমানের দাবী জনসম্মুখে প্রকাশ হয়ে যেত। আল্লাহ তা‘য়ালার বাণী, “ ( হে নাবী ! ) আল্লাহ তোমাকে মাফ করুন, তুমি তাদেরকে অব্যহতি দিলে কেন? এভাবে তুমি জানতে পারতে কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী। ( তাওবা-৪৩ ।)
ঙ. সর্বোচ্চ আর্থিক কুরবানী: রাসূল সা: সবাইকে সর্বোচ্চ আর্থিক কুরবানী করার জন্য যার যা সামর্থ আছে সেই মোতাবেক যুদ্ধ তহবিলে জমা দেয়ার আহবান করলেন। এর আগে কোন অভিযানে এমন করে যার যা সামর্থ আছে তা দিয়ে সাহায্য করার আহবান করেন নি। জান ও মালের কুরবানীর মাধ্যমে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে এ জাতি কতখানি সফল তাও আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা:দেখে নিলেন।
চ. যুদ্ধে সক্ষম প্রতিটি নাগরিককে তলব:প্রতিটি নাগরিককে এ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান জানালেন। তিনি জানতেন ভবিষ্যতে এ জাতিকে প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে দেশ ত্যাগ করতে হবে পৃথিবীময় মানবজাতির মধ্যে ন্যায়-বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে। এ দায়িত্ব থেকে কেউ পিছু হটতে পারে না, তার প্রমাণ এই যে, যে তিনজন প্রকৃত মু‘মেন ঐ প্রচন্ড গরমের জন্য যাই যাই করে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি। আল্লাহ তা‘য়ালা তাদেরকে মুসলিম সমাজ থেকে বহিস্কারের নির্দেশ দিয়ে কঠিন শাস্তির ঘোষণা দিলেন। সেই তিনজনের মধ্যে একজন হেলাল বিন উমাইয়া এতখানি বৃদ্ধ ছিলেন যে,খেদমতের জন্য কেউ না থাকলে তিনি ছিলেন অচল। এজন্য তার খেদমত করতে তার স্ত্রীকে রাসূল সা: এর নিকট থেকে অনুমতি নিতে হয়েছিলো। যদি হেলাল রা: এর মত অতিশয় বৃদ্ধ যুদ্ধে না যাওয়ার কারণে এমন কঠিন শাস্তি পেয়ে থাকেন, তাহলে কে আছে এ উম্মতের মুসলিম দাবীদার যে, জেহাদ না করেই অতি সহজে জান্নাতে প্রবেশ করবে? যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি তাদের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে কি ফয়সালা এসেছে তা জানতে আমরা সূরা তাওবার দিকে নজর দিলেই বুঝতে পারবো। আল্লাহর বাণী, “ তোমরা যখন ফিরে তাদের কাছে পৌঁছবে তখন তারা নানা ধরনের ওযর পেশ করতে থাকবে। কিন্তু তুমি পরিষ্কার বলে দেবে, বাহানাবাজী করো না। আমরা তোমদের কোন কথাই বিশ্বাস করবো না। তোমাদের অবস্থা আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। এখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করবেন। তারপর তোমাদেরকে তারই দিকে ফিরিয়ে দেয়া হবে, যিনি প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছুই জানেন। আর তোমরা কি কাজ করছিলে তা তিনি তোমাদের জানিয়ে দিবেন। তোমরা ফিরে এলে তারা তোমাদের সামনে কসম খাবে, যাতে তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা করো। ঠিক আছে, তোমরা অবশ্যি তাদেরকে উপেক্ষা করো। কারণ তারা অপবিত্র এবং তাদের আসল আবাস জাহান্নাম। তাদের কৃতকর্মের ফল স্বরূপ এটি তাদের ভাগ্যে জুটবে। তারা তোমাদের সামনে কসম খাবে যাতে তোমরা তদের প্রতি তুষ্ট হও। অথচ তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হলেও আল্লাহ কখনো এই ফাসেকদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন না।” ( তাওবা, ৯৪-৯৬ )। এ অভিযান থেকে ফিরে এসে রাসূল সা:তদন্ত করলেন কে কে যুদ্ধে যায়নি। যারা না গিয়ে বিভিন্ন অজুহাত পেশ করলো রাসূল সা: তাদেরকে ছেড়ে দিলেন। কারণ, আল্লাহ তো বলেই দিয়েছেন যে, তারা অবিত্র, তাদের স্থান জাহান্নামে। তবে যে তিন জন গড়িমসি করে যাননি কিন্তু রাসূল সা:এর নিকট দোষ স্বীকার করেছেন, আল্লাহর নির্দেশে রাসূল সা:তাদেরকে মুসলিম সমাজ থেকে বহিস্কার করলেন। বহুদিন এ কঠিন শাস্তির পর আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ঘোষণা করলেন। এরপর মুসলিম সমাজে তাদেরকে পূর্বের ন্যায় গ্রহণ করে নেয়া হলো। অবরোধ চলাকালীন সময় ইহুদীদের পক্ষ থেকে তাদেরকে অনেক লোভনীয় সুযোগ-সুবিধার প্রস্তাব করা হয়েছিলো। কিন্তু তারা তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে শাস্তি ভোগ করে গেছেন। তাইতো আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করে ক্ষমা ঘোষণা করেছেন।

 

মানব বিধ্বংসী নেতৃত্ব অবসানের প্রস্তুতি

 মানুষকে আল্লাহ তায়ালা সামাজিক জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। সমাজবদ্ধভাবেই তাকে চলতে হয়। এ জন্য প্রয়োজন নেতৃত্ব। নেতৃত্ব ছাড়া সমাজ চলতে পারে না। মানুষের সুখ-দুঃখ,উন্নয়ন অনেকটা নির্ভর করে নেতৃত্বের ওপর। নেতৃত্বের গুণাবলী যদি হয় নবীদের অনুকরনের তাহলে মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তির পথ খুজে পাবে। আর নেতৃত্ব যদি হয় ফেরআউন ও নমরুদের অনুকরনের তাহলে মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত উভয়টিই বরবাদ হবে। ফেরআউনী নেতৃত্বের কু-ফল ভোগ করতে হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম  ধরে। কারণ,পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তারা একটি দৃষ্টান্ত কায়েম করে গেছে। জুলুম কিভাবে করতে হয়, সত্য অস্বীকার করে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার উপর কিভাবে অবিচল থাকা যায় এবং সত্যের মোকাবেলায় বাতিলের জন্য লোকেরা কেমন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে, এসব তারা করে দেখিয়ে দিয়ে গেছে। দুনিয়াবাসীকে এসব পথ দেখিয়ে দিয়ে তারা তাদের সহযোগী,সমর্থক, প্রশাসনের কর্মর্তা, আমলা ও মন্ত্রী পরিষদসহ জাহান্নামের দিকে এগিয়ে গেছে। এখন তাদের উত্তরসূরীরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে সেই মনযিলের দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। এধরনের নেতৃত্ব মানব সভ্যতার জন্য কতটা ক্ষতিকর সে বিষয় আল্লাহ তায়‘ালা মানব জাতিকে হুশিঁয়ার করেছেন এভাবে, “তাদেরকে আমি জাহান্নামের দিকে আহবানকারী নেতা করেছিলাম এবং কিয়ামতের দিন তারা কোথাও থেকে কোন সাহায্য লাভ করতে পারবে না।” (কাসাস্ – ৪১)। “ তারপর সেই দিনের কথা মনে করো যেদিন আমি মানুষের প্রত্যেকটি দলকে তার নেতা সহকারে ডাকবো।” ( বনী ঈসরাইল – ৭১)। নেতার গুণাবলীর ওপর নির্ভর করবে তাদের অনুসারীরা  কিয়ামতের দিন কোথায় স্থান পাবে। ইতিহাস স্বাক্ষী, মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত ফেরআঊনের উত্তরসূরী নেতৃত্ব কিভাবে মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন করেছে। বিপন্ন মানুষের একমাত্র নেতা মুহাম্মাদ সা: ঐ নেতৃত্বকে সৎপথে আনতে প্রাণপন চেষ্টা করেছেন। যাতে তারা আর কোন মানুষের ক্ষতি না করে এবং নিজেরাও সৌভাগ্যবান হতে পারে। কিন্তু তাদেরকে যতই সুযোগ দেয়া হয়েছে,ততই তারা হায়েনার মতো একের পর এক আঘাত করেই চলেছে। সর্বশেষ জাহেলী নেতৃত্ব যখন হুদায়বিয়ার সন্ধি লংঘন করে বনু বকরের ওপর পৈষাচিকভাবে হত্যা যজ্ঞ চালালো এবং সন্ধি প্রত্যাখ্যান করলো তখন রাসূল সা: কালবিলম্ব না করে এ নেতৃত্ব অবসানে যুদ্ধ অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। তিনি নিজের ঘরেও অস্ত্র তৈরীর আদেশ দিলেন। তবে কোথায় কোন দিকে এবারের যুদ্ধ যাত্রা করা হবে, সেটা কাউকেই জানতে দিলেন না। এমনকি হযরত আয়েশা রা:ও  তা জানতে পারলেন না। অথচ তিনি নিজ হাতেই রাসূল সা:-এর জন্য অস্ত্র তৈরী করে দিয়েছেন। তবে অধিকাংশ লোক হয়তো ধারণা করেছিল যে এবার মক্কায় আক্রমণ করা হবে। কেননা এত বিপুল পরিমাণ সৈন্য আর কোথাও নিয়ে যাওয়ার কোন কারণ ছিল না। অতিমাত্রায় রক্তপাত যাতে না হয়,সে জন্যই রাসূল সা: এ কৌশল করেছিলেন। তিনি এ জন্য আল্লাহর সাহায্য চাইলেন। বললেন, “হে আল্লাহ ! কুরাইশদের থেকে আমাদের প্রস্তুতির যাবতীয় খবর গোপন রাখুন যাতে আমরা তাদের ওপর আকস্মিকভাবে চড়াও হতে পারি।”
বদর যোদ্ধা হাতেব ইবনে আবি বালতায়ার পরিবার পরিজন তখনো মক্কায় কাফেরদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল এবং কোন গোত্র তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। এ জন্য তিনি তাদের রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্যে মদীনার প্রস্তুতির পূর্ণ বিবরণ সম্বলিত একটা গোপন চিঠি কুরাইশদের কাছে পাঠালেন, যাতে তারা তার এই অনুগ্রহের বদলা হিসেবে মক্কা বিজয়ের সময় তার পরিবারকে যে কোন রকম কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকে। সেই সাথে তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন যে, এই গোপন তথ্য সরবরাহ করা সত্ত্বেও মুসলিম বাহিনীর বিজয় সুনিশ্চিত  এবং তার চিঠি ইসলামের কোন বড় রকমের ক্ষতি করতে পারবেনা। এ ঘটনা থেকে বুঝা যায় বাহ্যিক পরিবেশ পরিস্থিতি ও মানসিক অবস্থার চাপে পড়ে কখনো অত্যন্ত সৎ লোকের পক্ষ থেকেও মারাত্মক পদস্খলন ঘটে যেতে পারে। রাসূল সা: ওহীর মাধ্যমে এ চিঠির খবর জানতে পারেন। তাঁর প্রেরিত গোয়েন্দারা মক্কা গমনরত এক মহিলাকে রওযায়ে খাখ নামক স্থানে গিয়ে পাকড়াও করে তার কাছ থেকে ঐ চিঠি উদ্ধার করেন। এত বড় ভ্রান্তি রাসূল সা: শুধু এজন্য ক্ষমা করেন যে, হাতেব নিষ্ঠাবান, ঈমানদার , সৎ ও বদরযোদ্ধা সাহাবী ছিলেন। আর এই পদস্খলনটা ছিল তার মানবীয় দুর্বলতা থেকে উদ্ভুত।  ওমর বিন খাত্তাব রা: বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, সে মুনাফেকী করেছে। আমাকে অনুমতি দিন তার ঘাড় কেটে ফেলি।” রাসূল সা: বললেন, “হে ওমর,তোমার কি জানা আছে যে, আল্লাহ তায়া‘লা বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদের ব্যাপারে বলেছেন যে, তোমরা যা খুশী কর, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম।”
আল্লাহ তায়া‘লা হাতেব সম্পর্কে সূরা মুমতাহিনায় আয়াত নাযিল করলেনঃ “হে ঈমানদারগণ, যদি তোমরা আমার পথে জিহাদ করার জন্য এবং আমার সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে থাক তাহলে আমার ও তোমাদের  শত্রুদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে না। তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা কর,অথচ যে সত্য তোমাদের কাছে এসেছে তারা তা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের আচরণ হলো, তারা রাসূলকে এবং তোমাদেরকে শুধু এই অপরাধে জন্মভমি থেকে বহিষ্কার করে যে, তোমরা তোমাদের রব আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছো। তোমরা গোপনে তাদের কাছে বন্ধুত্বমূলক পত্র পাঠাও। অথচ তোমরা গোপনে যা কর এবং প্রকাশ্যে যা করো তা সবই আমি ভাল করে জানি। তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি এরূপ করে নিশ্চিন্তভাবেই সে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তাদের আচরণ হলো, তারা যদি তোমাদের কাবু করতে পারে তাহলে তোমাদের সাথে শত্রুতা করবে এবং হাত ও জিহবা দ্বারা তোমাদের কষ্ট দেবে। তারা চায় যে, কোনক্রমে তোমরা কাফের হয়ে যাও। কিয়ামতের দিন না তোমাদের আতœীয়তার বন্ধন কোন কাজে আসবে, না সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে। সেদিন আল্লাহ তোমাদের পরস্পর বিছিন্ন করে দিবেন। আর তিনিই তোমাদের আমল বা কর্মফল দেখবেন। তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাঁর সাথীদের মধ্যে একটি উত্তম আদর্শ বর্তমান। তিনি তাঁর কওমকে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছিলেন; আমরা তোমাদের প্রতি এবং আল্লাহকে ছেড়ে যেসব উপাস্যের উপাসনা তোমরা করে থাক তাদের প্রতি সম্পূর্ণরূপে অসন্তষ্ট। আমরা তোমদের অস্বীকার করেছি। আমাদের ও তোমাদের মধ্যে চিরদিনের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে- যতদিন তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনবে।” ( মুমতাহিনা , ১-৪)। উল্লেখিত আয়াত সমূহ দ্বারা আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আদর্শগত কারণে যারা শত্রুতায় লিপ্ত,তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। আল্লাহর প্রতি ঈমানের অপরিহার্য দাবীই হলো তাগুতের সাথে কুফরী করা।

বনু বকর ও কুরাইশ কর্তৃক সন্ধির শর্ত লঙ্ঘন

চুক্তির মেয়াদ দু‘বছর অতিক্রম না হতেই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সহায়তায় বনু খোজাদের উপর রাতের অন্ধকারে অতর্কিত আক্রমণ করলো। ‘ওয়াতির’ নামক একটি নিভৃত পল্লীতে ছিল খোজা গোত্রের বসতি। রাতের বেলা পরিবার পরিজনসহ খোজা গোত্রের লোকেরা ঘুমে বিভোর। হটাৎ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। কুরাইশ ও বনু বকর গোত্রের লোকেরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদের ঘুমন্ত পল্লীতে আক্রমণ করলো।  আক্রমণের প্রথম আঘাতেই নিরীহ খোজাদের বহু নারী-পুরুষ ও শিশুদের প্রাণ হারালো। অনেকে বাঁচার আশায় কাবা ঘরে আশ্রয় নিলো। তখনও কাবার চারপাশে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ইসলাম ও মুসলমানের দুশমন পশু চরিত্রের মানুষগুলো হায়েনার মত সেখানেও আশ্রয় নেয়া খোজাদের হত্যা করলো। ( ইসলাম পন্থি ও তাদের সমর্থনকারীদের হত্যার ব্যাপারে সে সময় যেমন কোন আইন-কানুনের তোয়াক্কা করতো না। ঠিক বর্তমান সভ্যসমাজের দাবীদার বিশ্ব সা¤্রাজ্য শক্তিগুলোও মুসলমানদের হত্যার ব্যাপারে একই অবস্থা আমরা দেখতে পাই। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তার চেয়েও বর্বরতা লক্ষ্য করা যায়। সে সময় যাদেরকে হত্যা করা হতো তাদেরকেই আবার এ হত্যার জন্য দোষারোপ করা হতনা। কিন্তু এখন? হত্যার পর আবার তাদেরকেই হত্যার জন্য উষ্কে দেয়ার অপবাদে জেল জুলুম সহ্য করতে হয়। এ যেন নতুন রূপী জাহেলিয়াত, পুরাতন জাহেলিয়াতকেও হার মানায়। আর তাদের এ জঘন্য কাজে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে তাদেরই টাকায় গৃহপালিত এক শ্রেণীর মুসলমান নামের কুলাঙ্গারগণ। বিনা কারণে মুসলিম অধ্যুষিত জনগণের উপর ড্রোন হামলা হয়। ইসলামকে সমর্থন করার কারণে যেীথ বাহিনীর অভিযানের স্বীকার হতে হয়। কোন অমুসলিমদের গায়ে হাত পড়লে (যা কোন মুসলমানই সমর্থন করেনা) গোটা বিশ্ব শৃগালের মত চিল্লায়। আর বিনা অপরাধে মুসলমানদের জান-মাল,বাড়ী-ঘর ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছে, সেখানে উল্টো জঙ্গিবাদের বীষ বাাষ্প ছড়ায়। এখন আমাদের মাঝে রাসূল সা: নেই যে, আমরা তার মাধ্যমে এর প্রতিকার চাইব। রাসূল সা: নেই, তাতে কি হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এর প্রতিকারে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধে সোচ্চার হওয়ার আহবান করছেন। আর আল্লাহই আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল। মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী এ প্রেরণায়ই আমাদের বাঁচার উপায়। ইসলাম বর্হিভূত জীবনের চেয়ে শাহাদতী মৃতু অনেক ভাল। আল্লাহ তুমি আমাদেরকে শহীদি মৃতু দাও!)।  খোজা গোত্র কোন উপায় না দেখে এ করুণ কাহিনী রাসূল সা:কে অবহিত করলো এবং চুক্তি অনুযায়ী তারা রাসূলের নিকট সাহায্যোর আবেদন জানালো। রাসূল সা: এ মর্মান্তিক ঘটনা শুনে খুবই মর্মাহত হলেন। তিনি এ নিষ্ঠুর আচরণ থেকে বিরত থাকার এবং নি¤েœাক্ত তিনটি শর্তের যে কোন একটি গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে কুরাইশদের কাছে একজন দূূত প্রেরণ করলেন।
ক. খোজাদের যে সব লোককে হত্যা করা হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। অথবা,
খ. বনু বকরের সাথে কুরাইশদের সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে। অথবা,
গ. হুদায়বিয়ার সন্ধি-চুক্তি বাতিল ঘোষণা করতে হবে।
দূত মারফত এই সংবাদ শুনে ‘কোরতা বিন ওমর’ নামক জনৈক কুরাইশ বললোঃ “আামরা তৃতীয় শর্তটি সমর্থন করি”। অর্থাৎ, হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি বাতিল করা হলো। কিন্তু দূত চলে যাবার পর তারা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। কারণ, মুসলমানদের সাথে লড়াই করার মত শক্তি কুরাইশদের এখন আর আগের অবস্থানে নেই। কয়েকটা যুদ্ধে তাদের বড় মাপের অনেক বীর যোদ্ধারা মারা যাওয়ায় শক্তির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তাদের অর্থনীতিরও প্রায় বরোটা বেজে গেছে। তাদের সাহায্যকারী ইহুদীরা প্রায় সর্বনাশের দ্বার প্রান্তে উপনীত। অপরদিকে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র দাওয়াতী কর্মকান্ডের মাধ্যমে নিজের প্রভাব এত ব্যাপক ও শক্তিশালী করেছে যে, মক্কার আশে পাশেও তাদের সমর্থক গোত্রসমূহের একটা মজবুত অবস্থান তৈরী হয়েছে। আর নৈরাজ্যবাদী ও বিদ্রোহী শক্তিগুলোকে কঠোরভাবে দমন করে শক্তিশালী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এমতাবস্থায় কুরাইশদের আক্রমণ করাতো দূরের কথা, আত্মরক্ষা করাও কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে হুদায়বিয়ার সন্ধিই ছিল তাদের একমাত্র রক্ষাকবচ। আর এখন সেটা নিজেরাই বাতিল করে মদীনাকে যেন আহবান জানালো, এস, আমাদেরকে আমাদের কুকর্মের শাস্তি দিয়ে যাও। এসব কারণেই হুদায়বিয়ার সন্ধি পুনর্বহাল করার জন্যে নিজেদের পক্ষ থেকে আবু সুফিয়ানকে প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করলো। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি, বিশেষত কুরাইশদের এতদিনকার আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল সা: তাদের এই নয়া প্রস্তাব সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। কারণ, যাদের চরিত্রে পশুত্বের বীজ রয়েছে তাদের বিশ্বাস করার কোনই যুক্তি নেই। তিনি আবু সুফিয়ানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। বার বার এভাবে রক্তপাত,নিরীহ মানুষ হত্যার বিভীষিকা আর কতদিন চলবে। নির্মম ও নিষ্ঠুরতার কবল থেকে পুরোপুরি ও স্থায়ীভাবে মুক্তি লাভের একটি সমাধান বের করা দরকার। আর সেটা হতে পারে শত্রুর আসল আস্তানার মূলোৎপাটন এবং জাহেলিয়াতের নেতৃত্ব তার নিজ এলাকায়ই নিভিয়ে দেয়া। এ লক্ষ্যে আক্রনাত্বক অভিযান পরিচালনা অনিবার্য হয়ে দাড়ায়। আর এ জন্যে দায়ী বর্বর চরিত্রের কুরাইশরা, এটা তাদের কর্মফল যে, তারা নিজেরাই হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রাচীর গুড়িয়ে দিয়েছে।

বিশ্ব ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ বিজয়ের ঘটনাঃ মক্কা বিজয়

আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ“ তোমাদের মধ্যে যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও জেহাদ করেছে তারা এবং পরবর্তীরা সমান নয়;তারা মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ অন্যদের অপেক্ষা যারা পরবর্তীকালে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ্ উভয়ের জন্য কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন”। (হাদীদ – ১০)। তিনি আরো ইরশাদ করেছেনঃ “যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এবং তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করতে দেখবে। তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করবে। তিনি তো তাওবা কবূল কারী। সূরা নাসর।
মহা বিজয়! কথাটি শুনলেই সকলের মনে আনন্দের জোয়ার আসে। কিন্তু এ বিজয় অর্জনের ইতিহাস বড়ই করুন! মহা বিজয়ের পূর্বের দিনগুলোর ইতিহাসের পাতা খুললেই গাঁ শিউরে ওঠে। চতুর্দিকে যুদ্ধ বিগ্রহ,রক্তপাত,মারা-মারি, হানা-হানি, জুলুম নির্যাতন,মেয়ে সন্তানকে জীবন্ত কবর, অসহায় মানুষকে দাস বানিয়ে সীমাহীন কষ্ট দেয়া, নারী পুরুষ উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফসহ এমন কোন অপরাধ বাকী ছিলনা যা তৎকালীন সমাজপতিরা করেনি। সীমাহীন জুলুমের ফলে মানুষের মনুষত্য হারিয়ে বিশ্বমানবতা ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে উপনীত। আসন্ন এ ধ্বংসের হাত থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা মুহাম্মাদ সা:কে প্রেরণ করলেন। যার জম্মে র সাথেই বিশ্ব অনুভব করলো যে পৃথিবীতে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। মুহাম্মাদ সা:কাল বিলম্ব না করে বিশ্ব মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করলেন।  বিপন্ন মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে লাগলেন। তাঁর এ আর্তমানবতার সেবার স্বীকৃতি স্বরুপ সেই জাহেলি সমাজের সর্বস্তরের মানুষগুলো তাকে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ খেতার ‘আল- আমীন’ উপাধি দান করলো। বিপন্ন মানুষের কল্যাণে তাঁর চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিলনা। কিন্তু তা সত্বেও মানুষের কাংখিত শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব হলো না। অবশেষে তিনি ভাবলেন, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই পারেন কাংখিত সফলতার পথ দেখাতে। তার বিধান ছাড়া কোন মানুষের ফরমুলাতেই মানুষের সব সমস্যার সমাধান দেয়া সম্ভব না। তাই তিনি ধরনা দিলেন আল্লাহর নিকটে। চলে গেলেন জাবালে নূরে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আল্লাহর পক্ষ থেকে সে শুভক্ষণ ঘনিয়ে আসলো। আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মাদ সা:কে বিশ্ববাসীর কল্যাণের জন্য দান করলেন নবুওয়াত ও কুরআন। নতুন উদ্যোমে শুরু হলো বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার মিশন।
নবুওয়াত প্রাপ্তির পরেই মক্কার কুরাইশ কাফেরগণ নানাবিধ অত্যাচারে অতিষ্ঠ করে তোলে তাঁকে ও তাঁর সাহাবিদেরকে। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, হাসি-ঠাট্টা, মিথ্যা অপবাদের তীক্ষè আঘাঁতে তাদের মানসিক অবস্থা জর্জরিত করা হয়। নবদীক্ষিত মুসলমানদেরকে তাদের মিশন থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। তাদের ঈমানী দৃঢ়তা দেখে কাফের সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণকারীদের ওপর এবার নির্যাতনের পথ বেছে নেয়। ক্রমেই তারা মানসিক আঘাঁতের সাথে শারিরীক নির্যাতন শুরু করে। তৎকালীন জাহেলি সমাজের পুরাতন সে বর্বরতা সত্বেও মুসলমানরা ধৈর্যচ্যুতি হননি। তারা রাসূল সা: এর নির্দেশে সবকিছু সহ্য করেই ইসলামী আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। অত্যাচারের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে। মুহাম্মাদ সা: ও তাঁর সাথীদের গোটা পরিবার সহ আবু তালিব গিরি গুহায় বন্দি জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হয়। এরপরও স্বস্তি মেলেনি মুসলমানদের। আঁঘাতে আঁঘাতে জর্জরিত তেরটি বছরের চরম নির্যাতন সহ্য করে মহানবী ও তাঁর সাথীদেরকে শেষ পর্যন্ত মাতৃভূমি ত্যাগ করে মদীনায় যেতে বাধ্য করা হয়। সেখানেও তাদেরকে শান্তিতে থাকতে দেয়া হয়নি। হিজরতের পর হতে মুতার যুদ্ধ সময় পর্যন্ত একের পর এক যুদ্ধের মোকাবেলা করে তাদের টিকে থাকতে হয়। কখনো যুদ্ধ, কখনো সন্ধি করে এগুতে হলো। শত্রুর মোকাবেলা করেই মুসলমানগণ বিশ্ব দরবারে তাদের শক্তিমত্তার পরিচয় তুলে ধরতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে মুতার যুদ্ধে তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রোম স¤্রাজ্য মুসলমানদের ক্ষুদ্র একটি দলের নিকট নাস্তানাবুদ হওয়ায় সে শক্তি আরো বিকশিত হলো। এবার মুসলমানগণ শুধু প্রতিরোধ নয়, তারা আক্রমণেরও ক্ষমতা রাখে।  দশ বছর মেয়াদকাল নির্দিষ্ট করে ঐতিহাসিক হুদায়বিয়ার সন্ধি হয়েছিলো ষষ্ট হিজরীতে। যে চুক্তির অন্যতম একটি ধারাছিল এই যে,এখন থেকে আরব গোত্রগুলোকে অধিকার দেয়া হলো যে, তারা মুসলমান অথবা কুরাইশদের যে কোন দলের সাথে মিত্রতার বন্ধনে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে। এই শর্তের ফলে বনু খোজা গোত্র মুসলমানদের সাথে আর বনু বকর কুরইশদের সাথে মৈত্রী স্থাপন করলো। বনু খোজা গোত্র মক্কায় কুরাইশদের শক্তির তোয়াক্কা না করে বরং তাদের দুশমন মদীনার মুসলমানদের সাথে মৈত্রী স্থাপন করায় তারা ছিল ভীষণ ক্ষুব্দ। খোজা গোত্রকে ইসলামপন্থীদের সাথে ঐক্যমত পোষণ করায় এর প্রতিশোধ গ্রহণে তারা সদা তৎপর ছিল।  

বনু বকর ও কুরাইশ কর্তৃক সন্ধির শর্ত লঙ্ঘন
চুক্তির মেয়াদ দু‘বছর অতিক্রম না হতেই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সহায়তায় বনু খোজাদের উপর রাতের অন্ধকারে অতর্কিত আক্রমণ করলো। ‘ওয়াতির’ নামক একটি নিভৃত পল্লীতে ছিল খোজা গোত্রের বসতি। রাতের বেলা পরিবার পরিজনসহ খোজা গোত্রের লোকেরা ঘুমে বিভোর। হটাৎ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। কুরাইশ ও বনু বকর গোত্রের লোকেরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদের ঘুমন্ত পল্লীতে আক্রমণ করলো।  আক্রমণের প্রথম আঘাতেই নিরীহ খোজাদের বহু নারী-পুরুষ ও শিশুদের প্রাণ হারালো। অনেকে বাঁচার আশায় কাবা ঘরে আশ্রয় নিলো। তখনও কাবার চারপাশে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ইসলাম ও মুসলমানের দুশমন পশু চরিত্রের মানুষগুলো হায়েনার মত সেখানেও আশ্রয় নেয়া খোজাদের হত্যা করলো। ( ইসলাম পন্থি ও তাদের সমর্থনকারীদের হত্যার ব্যাপারে সে সময় যেমন কোন আইন-কানুনের তোয়াক্কা করতো না। ঠিক বর্তমান সভ্যসমাজের দাবীদার বিশ্ব সা¤্রাজ্য শক্তিগুলোও মুসলমানদের হত্যার ব্যাপারে একই অবস্থা আমরা দেখতে পাই। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তার চেয়েও বর্বরতা লক্ষ্য করা যায়। সে সময় যাদেরকে হত্যা করা হতো তাদেরকেই আবার এ হত্যার জন্য দোষারোপ করা হতনা। কিন্তু এখন? হত্যার পর আবার তাদেরকেই হত্যার জন্য উষ্কে দেয়ার অপবাদে জেল জুলুম সহ্য করতে হয়। এ যেন নতুন রূপী জাহেলিয়াত, পুরাতন জাহেলিয়াতকেও হার মানায়। আর তাদের এ জঘন্য কাজে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে তাদেরই টাকায় গৃহপালিত এক শ্রেণীর মুসলমান নামের কুলাঙ্গারগণ। বিনা কারণে মুসলিম অধ্যুষিত জনগণের উপর ড্রোন হামলা হয়। ইসলামকে সমর্থন করার কারণে যেীথ বাহিনীর অভিযানের স্বীকার হতে হয়। কোন অমুসলিমদের গায়ে হাত পড়লে (যা কোন মুসলমানই সমর্থন করেনা) গোটা বিশ্ব শৃগালের মত চিল্লায়। আর বিনা অপরাধে মুসলমানদের জান-মাল,বাড়ী-ঘর ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছে, সেখানে উল্টো জঙ্গিবাদের বীষ বাাষ্প ছড়ায়। এখন আমাদের মাঝে রাসূল সা: নেই যে, আমরা তার মাধ্যমে এর প্রতিকার চাইব। রাসূল সা: নেই, তাতে কি হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এর প্রতিকারে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধে সোচ্চার হওয়ার আহবান করছেন। আর আল্লাহই আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল। মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী এ প্রেরণায়ই আমাদের বাঁচার উপায়। ইসলাম বর্হিভূত জীবনের চেয়ে শাহাদতী মৃতু অনেক ভাল। আল্লাহ তুমি আমাদেরকে শহীদি মৃতু দাও!)।  খোজা গোত্র কোন উপায় না দেখে এ করুণ কাহিনী রাসূল সা:কে অবহিত করলো এবং চুক্তি অনুযায়ী তারা রাসূলের নিকট সাহায্যোর আবেদন জানালো। রাসূল সা: এ মর্মান্তিক ঘটনা শুনে খুবই মর্মাহত হলেন। তিনি এ নিষ্ঠুর আচরণ থেকে বিরত থাকার এবং নি¤েœাক্ত তিনটি শর্তের যে কোন একটি গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে কুরাইশদের কাছে একজন দূূত প্রেরণ করলেন।
ক. খোজাদের যে সব লোককে হত্যা করা হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। অথবা,
খ. বনু বকরের সাথে কুরাইশদের সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে। অথবা,
গ. হুদায়বিয়ার সন্ধি-চুক্তি বাতিল ঘোষণা করতে হবে।
দূত মারফত এই সংবাদ শুনে ‘কোরতা বিন ওমর’ নামক জনৈক কুরাইশ বললোঃ “আামরা তৃতীয় শর্তটি সমর্থন করি”। অর্থাৎ, হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি বাতিল করা হলো। কিন্তু দূত চলে যাবার পর তারা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। কারণ, মুসলমানদের সাথে লড়াই করার মত শক্তি কুরাইশদের এখন আর আগের অবস্থানে নেই। কয়েকটা যুদ্ধে তাদের বড় মাপের অনেক বীর যোদ্ধারা মারা যাওয়ায় শক্তির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তাদের অর্থনীতিরও প্রায় বরোটা বেজে গেছে। তাদের সাহায্যকারী ইহুদীরা প্রায় সর্বনাশের দ্বার প্রান্তে উপনীত। অপরদিকে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র দাওয়াতী কর্মকান্ডের মাধ্যমে নিজের প্রভাব এত ব্যাপক ও শক্তিশালী করেছে যে, মক্কার আশে পাশেও তাদের সমর্থক গোত্রসমূহের একটা মজবুত অবস্থান তৈরী হয়েছে। আর নৈরাজ্যবাদী ও বিদ্রোহী শক্তিগুলোকে কঠোরভাবে দমন করে শক্তিশালী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এমতাবস্থায় কুরাইশদের আক্রমণ করাতো দূরের কথা, আত্মরক্ষা করাও কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে হুদায়বিয়ার সন্ধিই ছিল তাদের একমাত্র রক্ষাকবচ। আর এখন সেটা নিজেরাই বাতিল করে মদীনাকে যেন আহবান জানালো, এস, আমাদেরকে আমাদের কুকর্মের শাস্তি দিয়ে যাও। এসব কারণেই হুদায়বিয়ার সন্ধি পুনর্বহাল করার জন্যে নিজেদের পক্ষ থেকে আবু সুফিয়ানকে প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করলো। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি, বিশেষত কুরাইশদের এতদিনকার আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল সা: তাদের এই নয়া প্রস্তাব সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। কারণ, যাদের চরিত্রে পশুত্বের বীজ রয়েছে তাদের বিশ্বাস করার কোনই যুক্তি নেই। তিনি আবু সুফিয়ানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। বার বার এভাবে রক্তপাত,নিরীহ মানুষ হত্যার বিভীষিকা আর কতদিন চলবে। নির্মম ও নিষ্ঠুরতার কবল থেকে পুরোপুরি ও স্থায়ীভাবে মুক্তি লাভের একটি সমাধান বের করা দরকার। আর সেটা হতে পারে শত্রুর আসল আস্তানার মূলোৎপাটন এবং জাহেলিয়াতের নেতৃত্ব তার নিজ এলাকায়ই নিভিয়ে দেয়া। এ লক্ষ্যে আক্রনাত্বক অভিযান পরিচালনা অনিবার্য হয়ে দাড়ায়। আর এ জন্যে দায়ী বর্বর চরিত্রের কুরাইশরা, এটা তাদের কর্মফল যে, তারা নিজেরাই হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রাচীর গুড়িয়ে দিয়েছে।

জান্নাতীদের প্রাসাদসমূহ

জান্নাতীদের জন্য আল্লাহ সুবহানু তা‘য়ালা জান্নাতে সুউচ্চ মনোরম চমৎকার প্রাসাদ সমূহ তৈরী করে রেখেছেন। যে প্রাসাদের ভিতর থেকে বাহিরে এবং বাহির থেকে ভিতরে পরিস্কার দেখা যাবে। বসবাসের জন্যে কতইনা আনন্দদায়ক সে প্রাসাদ সমূহ। রাসূল সা: এর বাণী,  
عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ أَهْلَ الْجَنَّةِ لَيَتَرَاءَوْنَ أَهْلَ الْغُرَفِ فِي الْجَنَّةِ كَمَا تَرَوْنَ الْكَوْكَبَ الدُّرِّيَّ فِي السَّمَاءِ.
 সাহল ইবনে সা‘দ রা: থেকে বর্ণিত। রাসূল সা: বলেনঃ বেহেশতবাসীরা তাদের নিজ নিজ কক্ষ থেকে একে অপরকে এমনভাবে দেখতে পাবে যেভাবে তোমরা আকাশের তারকাগুলিকে দেখতে পাও। (বুখারী ও মুসলীম)। আর জান্নাতের প্রাসাদ সমূহের নীচ দিয়ে ঝর্ণা প্রবাহিত থাকবে। আল্লাহ তা‘য়ালার বাণী,
لَكِنِ الَّذِينَ اتَّقَوْا رَبَّهُمْ لَهُمْ غُرَفٌ مِنْ فَوْقِهَا غُرَفٌ مَبْنِيَّةٌ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَعْدَ اللَّهِ لَا يُخْلِفُ اللَّهُ الْمِيعَادَ.
“যারা তাদের রবকে ভয় করে চলেছে তাদের জন্যে রয়েছে বহুতল সু উচ্চ বৃহৎ প্রাসাদ যার নীচ দিয়ে ঝর্ণাধারাসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। এটা আল্লাহর প্রতিশ্রুতি। আল্লাহ কখনো তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না”। ( যুমার-২০)। যে প্রাসাদের একটি ইট হবে স্বর্ণের আর একটি ইট হবে রৌপ্যের। সিমেন্ট,বালু ও সূরকী ইত্যাদি হবে লুলু,ইয়াকুত ও জাফরান। রাসূল সা: এর বাণী,
 عَنِ ابْنِ عُمَرَ ، قَالَ : سُئِلَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ عَنِ الْجَنَّةِ ، كَيْفَ بِنَاؤُهَا ؟ قَالَ : ” لَبِنَةٌ مِنْ فِضَّةٍ , وَلَبِنَةٌ مِنْ ذَهَبٍ ، مِلاطُهَا الْمِسْكُ الأَذْفَرُ ، وَحَصْبَاؤُهَا اللُّؤْلُؤُ وَالْيَاقُوتُ ، وَتُرَابُهَا الزَّعْفَرَانُ .
ইবনে ওমর রা:থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন: জান্নাতের প্রাসাদ তৈরীর ব্যাপারে রাসূল সা:কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, জান্নাতের প্রাসাদের একটি ইট হবে স্বর্ণের আর একটি ইট হবে রৌপ্যের।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ بَيْنَا نَحْنُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ قَالَ بَيْنَا أَنَا نَائِمٌ رَأَيْتُنِي فِي الْجَنَّةِ فَإِذَا امْرَأَةٌ تَتَوَضَّأُ إِلَى جَانِبِ قَصْرٍ فَقُلْتُ لِمَنْ هَذَا الْقَصْرُ قَالُوا لِعُمَرَ فَذَكَرْتُ غَيْرَتَهُ فَوَلَّيْتُ مُدْبِرًا فَبَكَى عُمَرُ وَقَالَ أَعَلَيْكَ أَغَارُ يَا رَسُولَ اللَّهِ.
আবু হুরায়রা রা: বলেনঃ একদিন আমরা রাসূলুল্লাহ সা:-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি বললেন, আমি ঘুমের মাঝে (স্বপ্নে) দেখলাম, আমি যেন জান্নাতে প্রবেশ করেছি। হঠাৎ সেখানে আমার নজরে পড়ল একজন মেয়েলোক একটি প্রাসাদের পাশে বসে অযু করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ প্রাসাদটি কার? ফেরেশতারা বললেনঃ উমরের। তখন (প্রাসাদে প্রবেশের ইচ্ছা হলেও) উমরের আত্মসম্মান বোধের কথা আমার মনে পড়ে গেল। তাই আমি ফিরে চলে এলাম। এ কথা শুনে উমর রা: কেঁদে ফেললেন এবং বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমি কি আপনার কাছেও আত্মসম্মান বোধ দেখাতে পারি? (বুখারী)।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: أَتَى جِبْرِيلُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ هَذِهِ خَدِيجَةُ قَدْ أَتَتْ مَعَهَا إِنَاءٌ فِيهِ إِدَامٌ أَوْ طَعَامٌ أَوْ شَرَابٌ، فَإِذَا هِيَ أَتَتْكَ فَاقْرَأْ عَلَيْهَا السَّلَامَ مِنْ رَبِّهَا وَمِنِّي، وَبَشِّرْهَا بِبَيْتٍ فِي الْجَنَّةِ مِنْ قَصَبٍ لَا صَخَبَ فِيهِ وَلَا نَصَبَ.
আবু হুরায়রা রা:-থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ ( একদা) জিবরাইল নবী কারীম সা:-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল ! এই যে খাদীজা একটা পাত্র নিয়ে আসছেন যাতে তরকারী কিংবা খাবার অথবা কোন পানীয় দ্রব্য রয়েছে। যখন তিনি আপনার নিকট আসবেন তখন আপনি তাঁকে তাঁর রবের পক্ষ থেকে এবং আমার পক্ষ থেকে সালাম বলুন এবং তাঁকে জান্নাতের মধ্যে মণি-মুক্তাখচিত এমন একটা প্রাসাদের সুসংবাদ দিন যেখানে না কোন শোরগোল এবং না কোন কষ্ট-ক্লেশ থাকবে। (বুখারী)।
تَبَارَكَ الَّذِي إِنْ شَاءَ جَعَلَ لَكَ خَيْرًا مِنْ ذَٰلِكَ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَيَجْعَلْ لَكَ قُصُورًا.
বড়ই বরকত সম্পন্ন তিনি যিনি চাইলেই তাঁর নির্ধারিত জিনিস থেকে অনেক বেশী ও উৎকৃষ্টতর জিনিস তোমাকে দিতে পারেন, (একটি নয়) অনেকগুলো বাগান যেগুলোর নীচ দিয়ে নদী প্রবাহিত এবং বড় বড় প্রাসাদ। (ফুরকান-১০)। শুধুই কি প্রাসাদ আর নদী? না, সেখানে থাকবে সুউচ্চ তাবু যা তৈরী করা হয়েছে মুক্তা দিয়ে। সে তাবুর প্রতিটি কোণে স্বাগতম জানানোর জন্য অপেক্ষায় থাকবে হুরগণ।
عن أبي موسى الأشعري رضي الله عنه عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ  إِنَّ لِلْمُؤْمِنِ فِي الْجَنَّةِ لَخَيْمَةً مِنْ لُؤْلُؤَةٍ وَاحِدَةٍ مُجَوَّفَةٍ طُولُهَا سِتُّونَ مِيلًا لِلْمُؤْمِنِ فِيهَا أَهْلُونَ يَطُوفُ عَلَيْهِمْ الْمُؤْمِنُ فَلَا يَرَى بَعْضُهُمْ بَعْضًا.
আবু মুসা আশা‘রী রা: থেকে বর্ণিত। নবী সা: বলেনঃ বেহেশতের মধ্যে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য একক একটি ফাঁপা মুক্তার তৈরী তাঁবু থাকবে। তার উচ্চতা হবে আকাশের দিকে ষাট মাইল। তার প্রতিটি কোণে প্রত্যেক ঈমানদার ব্যক্তির জন্য একজন হুর থাকবে। মু‘মিন ব্যক্তি তাদের নিজ নিজ হুরের সাথে দেখা-সাক্ষাত করবে, কিন্তু একজনের হুর অপরজন দেখতে পাবে না। (বুখারী ও মুসলিম)। উল্লেখিত প্রাসাদ সমূহে বসবাসের জন্য প্রয়োজন খাঁটি ও নিষ্ঠাবান ঈমানদার হওয়া।  ঈমানের মৌখিক দাবীই যথেষ্ট নয়, বরং যে বিষয়ের প্রতি ঈমানের দাবী করা হয়েছে,তার জন্য সব রকম ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত হওয়া। যেমনিভাবে মানুষ ব্যবসায় মুনাফা অর্জন করার জন্য তার অর্থ, সময়, শ্রম এবং মেধা ও যোগ্যতা নিয়োজিত করে । ব্যবসায় অর্জিত বিপুল পরিমাণ মুনাফার মাধ্যমে দুনিয়ায় সে বিলাসবহুল প্রাসদ তৈরী করে। ঠিক পরকালের প্রাসাদ নির্মাণে তাকে ব্যবসা করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তা‘য়ালার বাণী,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى تِجَارَةٍ تُنجِيكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ + تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنفُسِكُمْ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ + يَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَيُدْخِلْكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَمَسَاكِنَ طَيِّبَةً فِي جَنَّاتِ عَدْنٍ ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ.
“হে ঈমানদারগণ ! আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি ব্যবসায়ের সন্ধান দেবো যা তোমাদেরকে কঠিন আযাব থেকে মুক্তি দেবে? তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ও জান-প্রাণ দিয়ে জেহাদ করো এটাই তোমাদের জন্য অতিব কল্যাণকর যদি তোমরা তা জান। আল্লাহ তোমাদের গোনাহ মাফ করে দেবেন এবং তোমাদেরকে এমনসব বাগানে প্রবেশ করাবেন যার নীচে দিয়ে ঝর্ণাধারা বয়ে চলবে। আর চিরস্থায়ী বসবাসের জায়গা জান্নাতের মধ্যে তোমাদেরকে সর্বোত্তম ঘর দান করবেন। এটাই মহা সফলতা। (সূরা সাফ্ফ ১০-১২) ।

জান্নাতীদের পানীয়

জান্নাতীদের জন্য প্রধানত চার ধরনের পানীয়র ব্যবস্থা থাকবে। যেমন, পানি, দুধ, মধু ও শরাব। আরো থাকবে কর্পূর, শুকনো আদা মিশ্রিত ও তাসনীম পানীয়। এগুলো সবই দুনিয়ার সাথে পরিচিত। কিন্তু জান্নাতের পানীয়র স্বাদ, গন্ধ ও রং দুনিয়ার মত হবে না। সেখানকার প্রত্যেক বস্তুর স্বাদ, গন্ধ ও রং ভিন্ন ধরনের হবে। যার নযির পৃথিবীতে নেই। আল্লাহ তা‘য়ালা পবিত্র কালামে পাকে উল্লেখ করেন.
مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِى وُعِدَ الْمُتَّقُونَ فِيهَا أَنْهَـرٌ مِنْ ماء غَيْرِ آسِن وَأَنْهـرٌ مِنْ لَبَن لَمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ وَأَنْهـرٌ مِنْ خَمْر لَذَّة لِلشَّـرِبِينَ وَأَنْهَـرٌ مِنْ عَسَل مُصَفّىً وَلَهُمْ فِيهَا مِن كُلِّ الَّثمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِن رَبِّهِمْ كَمَنْ هُوَ خَـلِدٌ فِي النَّارِ.
“মুত্তাকীনদের জন্য যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তার অবস্থা এই যে,তার মধ্যে স্বচ্ছ ও নির্মল পানির নহর বইতে থাকবে। এমন সব দুধের নহর বইতে থাকবে যার স্বাদে কোন সামান্যতম পরিবর্তন বা বিকৃত ও আসবে না। শরাবের এমন নহর বইতে থাকবে পানকারীদের জন্য যা হবে অতীব সুস্বাদু এবং বইতে থাকবে স্বচ্ছ মধুর নহর। এ ছাড়াও তাদের জন্য সেখানে থাকবে সব রকমের ফল এবং তাদের রবের পক্ষ থেকে থাকবে ক্ষমা। ( যে ব্যক্তি এই জান্নাত লাভ করবে সেকি) ঐ ব্যক্তির মত হতে পারে যে চিরদিন জাহান্নামে থাকবে।” ( মুহাম্মাদ ১৫)। দুনিয়ার পানীয় দুষিত হয় যা স্ব্যাস্থের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু জান্নাতের পানীয় যাবতীয় ক্ষতি থেকে মুক্ত।
لَا فِيهَا غَوْلٌ وَلَا هُمْ عَنْهَا يُنْزَفُونَ.
“ তা তাদের কোন শারিরীক ক্ষতি করবেনা এবং তারা তাতে মাতালও হবে না”। (সাফ্ফাত ৪৭)।  এ পানীয় তাদের ভাগ্যেই হবে, যারা পুরোপুরি তাদের রবের আনুগত্য করেছে, তাঁর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালন করেছে সেই সাথে তাঁর পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ কাজসমূহ থেকে বিরত রয়েছে। আল্লাহ তা‘য়াল বাণী,
إِنَّ الْأَبْرَارَ يَشْرَبُونَ مِنْ كَأْسٍ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُورًا * عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا.
“নিশ্চয়ই নেককার লোকেরা পানপাত্র থেকে এমন শরাব পান করবে যাতে কর্পূর মিশ্রিত থাকবে। এটি হবে একটি বহমান ঝর্ণা। আল্লাহর বান্দারা যার পানির সাথে মিশিয়ে পান করবে এবং যেখানেই ইচ্ছা সহজেই তার শাখা-প্রশাখা বের করে নিবে”। (সূরা দাহ্র,৫.৬)। অর্থাৎ জান্নাতীরা যেখানেই চাইবে, সেখানেই এ পানীয় উপস্থিত পাবে। তাদেরকে স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত পান পাত্রে তা পরিবেশন করা হবে।
وَيُطَافُ عَلَيْهِم بِآنِيَةٍ مِّن فِضَّةٍ وَأَكْوَابٍ كَانَتْ قَوَارِيرَا * قَوَارِيرَ مِن فِضَّةٍ قَدَّرُوهَا تَقْدِيرًا *وَيُسْقَوْنَ فِيهَا كَأْسًا كَانَ مِزَاجُهَا زَنجَبِيلا *عَيْنًا فِيهَا تُسَمَّى سَلْسَبِيلا.
“তাদের সামনে রৌপ্য পাত্র ও সচ্ছ কাঁচের পাত্রসমূহ পরিবেশিত হতে থাকবে। কাঁচ পাত্রও হবে রৌপ্য জাতীয় ধাতুর। যা            ( জান্নাতের ব্যবস্থাপকরা) যথাযথ পরিমাণে পূর্ণ করে রাখবে। সেখানে তাদের এমন সূরা পান করানো হবে যাতে শুকনো আদার সংমিশ্রণ থাকবে। এটি জান্নাতের একটি ঝর্ণা যা সালসাবিল নামে অভিহিত”। (দাহ্র ,১৫-১৮)।
আরবরা শরাবের সাথে শুকনো আদা মেশানো পানির সংমিশ্রণ খুব পছন্দ করতো। তাই বলা হয়েছে, সেখানেও তাদের এমন শরাব পরিবেশন করা হবে যাতে শুকনো আদার সংমিশ্রণ থাকবে। কিন্তু তা এমন সংমিশ্রণ হবে না যে, তার মধ্যে শুকনো আদা মিশিয়ে তারপর পানি দেয়া হবে। বরং তা হবে একটি প্রাকৃতিক ঝর্ণাধারা যার মধ্যে, আদার খোশবু থাকবে। কিন্তু তিক্ততা থাকবে না। সে জন্য তার নাম হবে “সালসাবিল”। এর অর্থ এমন পানি যা মিঠা, মৃদু ও সুস্বাদু হওয়ার কারণে সহজেই গলার নীচে নেমে যায়।
يسْقَوْنَ مِن رَّحِيقٍ مَّخْتُومٍ *خِتَامُهُ مِسْكٌ وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ *وَمِزَاجُهُ مِن تَسْنِيمٍ *عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا الْمُقَرَّبُونَ.
“তাদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধতম শরাব পান করানো হবে। তার ওপর মিশ্ক- এর মোহর থাকবে। যারা অন্যদের ওপর প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে চায় তারা যেন এই জিনিষটি অর্জন করার জন্য প্রতিযোগিতায় জয়ী হবার চেষ্টা করে। সে শরাবে তাসনীমের মোহর থাকবে। এটি একটি ঝর্ণা, নৈকট্যলাভকারীরা এর পানির সাথে পান করবে”। (মুতাফফিফীন.২৫-২৮)। ‘খিতামুহু মিসক’ এটা হবে উন্নত পর্যায়ের পরিচ্ছন্ন শরাব। ঝর্ণায় প্রবাহিত শরাবের থেকে এটি বেশী উন্নত গুণাবলী সম্পন্ন হবে। জান্নাতের খাদেমরা মিশকের মোহর লাগানো পাত্রে করে এনে এগুলো জান্নাতবাসীদের পান করাবে। এই শরাব যখন পানকারীদের গলা থেকে নামবে তখন শেষের দিকে তারা মিশকের খুশবু পাবে। আর ‘তাসনীম’ মানে উন্নত ও উঁচু। কোন ঝর্ণাকে তাসনীম বলার অর্থ হচ্ছে তা উঁচু থেকে প্রবাহিত হয়ে নীচের দিকে আসে। এ ছাড়াও থাকবে ‘হাউজে কাউসার’। এ স্পর্কে রাসূল সা:বলেছেন যে, তার পানি হবে দুধের চাইতে ( কোন কোন রেওয়ায়াত অনুযায়ী রূপার চাইতে আবার কোন কোন রেয়ায়াত অনুযায়ী বরফের চাইতে) বেশী সাদা এবং মধুর চাইতে বেশী মিষ্টি। তার তলদেশের মাটি হবে মিশকের চাইতে বেশী সুগন্ধিযুক্ত। আকাশে যত তারকা আছে সে পরিমানের স্বর্ণ ও রৌপ্যের পান পাত্র তার পাশে সাজানো থাকবে। তার পানি একবার পান করার পর দ্বিতীয়বার কারো পিপাসা লাগবে না। আর তার পানি যে একবার পান করেনি তার পিপাসা কোন দিন মিটবে না। পবিত্র কুরআনে এ নামে একটি সূরা রয়েছে । পঞ্চাশ জনের ও বেশী সাহাবী এ হাউজ কাউসার সংক্রান্ত হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে বুখীর থেকে একটি হাদীস নীচে উল্লেখ করা হলো।
عن عبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرٍو قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَوْضِي مَسِيرَةُ شَهْرٍ مَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنْ اللَّبَنِ وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنْ الْمِسْكِ وَكِيزَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ مَنْ شَرِبَ مِنْهَا فَلَا يَظْمَأُ أَبَدًا.
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা: থেকে বর্ণিত। নাবী কারীম সা: বলেছেন, আমার হাউজের প্রশস্ততা এক মাসের পথের সমান। উহার পানি দুধের চেয়ে অধিক সাদা এবং তার ঘ্রাণ মৃগনাভী থেকেও খুশবুদার। আর উহার পান-পাত্রগুলো আকাশের নক্ষত্রের ন্যায় ( অধিক ও উজ্জল)। যে একবার উহা হতে পান করবে সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। (বুখারী)। রাসূল সা: তাঁর পর থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সময় কালের সমগ্র মুসলিম মিল্লাতকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন: তোমাদের মধ্য থেকে যারাই আমার পথ থেকে সরে গিয়ে অন্য পথে চলবে, তাদেরকে এ হাউজের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়া হবে। আমি বলবো: হে আমার রব ! এরা তো আমার উম্মাত। জবাবে বলা হবে: আপনি জানেন না, আপনার পরে এরা কি কি পরিবর্তন করেছিল এবং আপনার পথের উল্টোদিকে চলেছিল। তখন আমিও তাদেরকে দূর করে দেবো। আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদেরকে তাঁর রাসূল সা:-এর আদর্শ অনুযায়ী সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন।

জান্নাতীদের খাদ্য

জান্নাতে প্রবেশাধিকার পাওয়াইতো সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য। আর এ সৌভাগ্যের অধিকারী তারাই হবে, যারা দুনিয়ার জীবনে আখেরাতকে  ভুলে যায়নি। বরং একদিন তাদেরকে আল্লাহর সামনে হাজির হয়ে সব কৃতকর্মের হিসেব দিতে হবে এ বিশ্বাস নিয়ে জীবন যাপন করেছে তারাই সেদিন জান্নাতে প্রবেশাধিকার পাবে। পরিবার-পরিজন সহকারে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া, সে সৌভাগ্যকে আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিবে। আল্লাহর তা‘য়ালার বাণী,
ادْخُلُوا الْجَنَّةَ أَنْتُمْ وَأَزْواجُكُمْ تُحْبَرُونَ * يُطافُ عَلَيْهِمْ بِصِحافٍ مِنْ ذَهَبٍ وَأَكْوابٍ وَفِيها ما تَشْتَهِيهِ الْأَنْفُسُ وَتَلَذُّ الْأَعْيُنُ وَأَنْتُمْ فِيها خالِدُونَ * وَتِلْكَ الْجَنَّةُ الَّتِي أُورِثْتُمُوها بِما كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ* لَكُمْ فِيها فاكِهَةٌ كَثِيرَةٌ مِنْها تَأْكُلُونَ.
তোমরা এবং তোমাদের স্ত্রীরা জান্নাতে প্রবেশ করো। তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করা হবে। তাদের সামনে স্বর্ণের প্লেটসমূহ আনা-নেয়া করানো হবে এবং মনের মতো ও দৃষ্টি পরিতৃপ্তকারী প্রতিটি জিনিস সেখানে থাকবে। তাদেরকে বলা হবে, “ এখন তোমরা এখানে চিরদিন থাকবে। দুনিয়াতে তোমরা যেসব কাজ করেছো। তার বিনিময়ে এ জান্নাতের অধিকারী হয়েছো। তোমাদের জন্য এখানে প্রচুর ফল-মূল মওজুদ রয়েছে যা তোমরা খাবে। ( যুখরুফ, ৭০-৭৩)। তদের সাথে সামিল হবে তাদের সৎকর্মশীল সন্তানেরা। আল্লাহর পাকের ঘোষণা,
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُمْ مِنْ عَمَلِهِمْ مِنْ شَيْءٍ كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ.
যারা ঈমান গ্রহণ করেছে এবং তাদের সন্তানরাও ঈমানসহ তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে আমি তাদের সেসব সন্তানকেও তাদের সাথে (জান্নাতে) একত্রিত করে দেব। আর তাদের আমলের কোন ঘাটতি আমি তাদেরকে দেব না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার উপার্জিত কর্মের জন্যে দায়ী। (তূর-২১)।                                                                                                                           সন্তানরা যদি যে কোন মাত্রার ঈমান ও সৎকর্মশীলদের আনুগত্য দ্বারা নিজেরা নিজেদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করতে পারে, তাহলে আল্লাহ তা‘য়ালা জান্নাতে তাদেরকে নি¤œ মর্যাদা থেকে উচ্চ মর্যাদা দিয়ে বাপ-দাদার সাথে একত্রিত করে দেবেন। এটা নিছক আল্লাহ তাআলার মেহেরবানী ও দয়া। সন্তানরা বাপ-দাদার সৎকাজের এ সুফলটুকু অন্তত লাভ করতে পারে। তবে তারা যদি নিজেদের কর্মদ্বারা নিজেরাই নিজেদেরকে জাহান্নামের উপযোগী বানায় তাহলে এটা কোনক্রমেই সম্ভব নয় যে, বাপ- দাদার কারণে তাদেরকে জান্নাতে পৌঁছে দেয়া হবে। তাদের মন খুশী করার জন্য সন্তানদেরকেও তাদের সাথে একত্রিত করা হবে। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা মর্যাদা হ্রাস করে তাদেরকে তাদের সন্তানদের কাছে নিয়ে যাবেন না। বরং সন্তানদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে তাদের কাছে নিয়ে যাবেন, যাতে নিজ সন্তানদের থেকে দূরে অবস্থানের কারণে মনকষ্ট না হয় এবং তাদের জন্য আল্লাহর নিয়ামতসমূহ পূর্ণ করে দেয়ার ক্ষেত্রে এ কমতিটুকু না থেকে যায়।
সবাই মিলে জান্নাতে আনন্দেরসাথে আহার করবে ভূনা গোশত। তাদেরকে সবরকমের গোশত সরবরাহ করা হবে। আল্লাহ তা‘য়ালার বাণী,
وَأَمْدَدْنَاهُم بِفَاكِهَةٍ وَلَحْمٍ مِّمَّا يَشْتَهُونَ.
আমি তাদেরকে সব রকমের ফল, গোশত এবং তাদের মন যা চাইবে তাই প্রচুর পরিমাণে দিতে থাকবো। ( সূরা তূর-২২)। সূরা ওয়াকিয়ায় ২১ আয়াতে বলা হয়েছে যে, তাদেরকে পাখির গোশত দিয়ে আপ্যায়ন করা হবে। আল্লাহ তা‘য়ালার ঘোষণা,
 وَفَاكِهَةٍ مِّمَّا يَتَخَيَّرُونَ* وَلَحْمِ طَيْرٍ مِّمَّا يَشْتَهُونَ.
“তারা তাদের সামনে নানা রকমের সুস্বাদু ফল-মূল পরিবেশন করবে যাতে তারা পছন্দমত বেছে নিতে পারে। পাখির গোশত পরিবেশন করবে যে পাখীর গোশত ইচ্ছামত ব্যবহার করতে পারবে”। তারা এগুলো তৃপ্তির সাথে খাবে এবং পান করবে তাদের মনের ইচ্ছামত।
كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا أَسْلَفْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَةِ.
“অতীত দিনগুলোতে তোমরা যা করে এসেছো তার বিনিময়ে তোমরা তৃপ্তির সাথে খাও এবং পান করো”। (হাককাহ-২৪)। এখন কারো মনে প্রশ্ন হতে পারে যে, শুধুই কি ফল-মূল আর গোশত দেয়া হবে? দুনিয়ায় তো কত ধরণের খাবার খেতাম যেমন, কুরমা,পোলাও, বিরিয়ানী, হালুয়া, রুটি ইত্যাদি। আল্লাহ ছোবহানাহু ওয়া তা‘য়ালার ভান্ডারে কি কম আছে? বান্দার মনে যে কোন ইচ্ছা- আকাংখা হওয়ার সাথেই সেখানে তা হাজির পাবে। এমন অনেক ধরণের খাবার আছে যা হয়ত অনেকেরই জানা নেই। তাও সেখানে পরিবেশন করা হবে।
وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَشْتَهِي أَنفُسُكُمْ وَلَكُمْ فِيهَا مَا تَدَّعُونَ*نُزُلًا مِّنْ غَفُورٍ رَّحِيمٍ.
“সেখানে তোমরা যা চাবে তাই পাবে। আর যে জিনিসেরই আকাংখা করবে তাই লাভ করবে। এটা সেই মহান সত্তার পক্ষ থেকে মেহমানদারীর আয়োজন যিনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান”। ( হা- মীম আস সাজদাহ-৩১,৩২)।

জান্নাতীদের খাট পালঙ্ক সমূহ

জান্নাত! সেতো এক অফুরন্ত নে‘য়ামতের পরিপূর্ণ শান্তিময় স্থান। কোন কিছুরই অভাব নেই সেখানে। ঘুমানোর জন্য রয়েছে খাঁট-পালঙ্ক। হেলান দিয়ে বসে আরাম করার জন্য রয়েছে বিছানা, বালিশ, উঁচু আসন। তৃঞ্চা মেটানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে শরাবে পরিপূর্ণ পানপাত্র সহ নানা আয়োজনে ভরপুর। কোন কিছু তাদের চাইতে হবে না। অন্তরে জাগ্রত হওয়ার সাথেই উপস্থিত হয়ে যাবে। আল্লাহ তা‘য়ালার বাণী,
مُتَّكِئِينَ عَلَىٰ فُرُشٍ بَطَائِنُهَا مِنْ إِسْتَبْرَقٍ ۚ وَجَنَى الْجَنَّتَيْنِ دَانٍ.
সেখানে তারা হেলান দিয়ে বসবে পুরু রেশমের আস্তর বিশিষ্ট বিছানায়, দুই বাগানের ফল হবে তাদের নিকটবর্তী। (রাহমান -৫৪)। وَفُرُشٍ مَرْفُوعَة সেখানে তারা সুউচ্চ আসনসমূহে অবস্থান করবে। (ওয়াকিয়া-৩৪)।                  
      এর বহুবচন। অর্থ বিছানা, ফরাশ। উচ্চস্থানে বিছানো থাকবে বিধায় জান্নাতের শয্যা সমুন্নত হবে। দ্বিতীয়ত: -فراش    শব্দটি فرش
এই বিছানা মাটিতে নয়, পালঙ্কের উপর থাকবে। তৃতীয়ত:বিছানাও খুব পুরু হবে। তারা কিভাবে বসবে তাও আল্লাহ তা‘য়ালা বলেছেন,
مُتَّكِئِينَ عَلَىٰ رَفْرَفٍ خُضْرٍ وَعَبْقَرِيٍّ حِسَانٍ.
 “ ঐ সব জান্নাতবাসী সবুজ গালিচা ও সূক্ষ্ম পরিমার্জিত অনুপম ফরাশের ওপর হেলান দিয়ে বসবে।” (রাহমান-৭৬)। আয়াতে আবকারী শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। জাহেলী যুগের আরবীয় কিচ্ছা-কাহিনীতে জিনদের রাজধানীর নাম ছিল আবকার। বাংলা ভাষায় আমরা যাকে পরীস্থান বলে থাকি। এ কারণে আরবের লোকেরা প্রতিটি উৎকৃষ্ট ও দুষ্প্রাপ্য বস্তুকে আবকারী বলতো। অর্থাৎ তা যেন পরীস্থানের বস্তু, দুনিয়ার সাধারণ কোন বস্তু তার সমকক্ষ নয়। এ কারণে আরববাসীদেরকে জান্নাতের সাজ-সরাঞ্জাম ও আসবাবপত্রের অস্বাভাবিক উৎকৃষ্ট ও সুন্দর হওয়ার ধারণা দেয়ার জন্য আবকারী শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘য়ালা সূরা গাশিয়ায় বলেন,
 فِيهَا سُرُرٌ مَرْفُوعَةٌ * وَأَكْوَابٌ مَوْضُوعَةٌ * وَنَمَارِقُ مَصْفُوفَةٌ * وَزَرَابِيُّ مَبْثُوثَةٌ.
“সেখানে উঁচু আসন থাকবে, পানপাত্রসমূহ থাকবে। সারি সারি বালিশ সাজানো থকবে এবং উৎকৃষ্ট বিছানা পাতা থাকবে”। (গাশিয়া-১২-১৬)। তাদের সামনে সবসময় পানপাত্র ভরা থাকবে। চেয়ে বা ডাক দিয়ে আনার প্রয়োজন হবে না। এরপর রয়েছে তাদের জন্য উন্নতমানের সুস্বাদু বিভিন্ন ধরণের মজাদার খাবারের ব্যবস্থা,যা তাদেরকে পরিবেশন করা হবে।

জান্নাতীদের পোশাক ও অলংকার সমূহ

জান্নাতীদের পোশাকের বিষয় আল্লাহ তায়া‘লা বাণী,
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحاتِ إِنَّا لا نُضِيعُ أَجْرَ مَنْ أَحْسَنَ عَمَلًا . أُولئِكَ لَهُمْ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهِمُ الْأَنْهارُ يُحَلَّوْنَ فِيها مِنْ أَساوِرَ مِنْ ذَهَبٍ وَيَلْبَسُونَ ثِيابًا خُضْرًا مِنْ سُنْدُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُتَّكِئِينَ فِيها عَلَى الْأَرائِكِ نِعْمَ الثَّوابُ وَحَسُنَتْ مُرْتَفَقًا .
যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কার নষ্ট করিনা। তাদেরই জন্যে  রয়েছে স্থায়ী জান্নাত যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত। সেথায় তাদেরকে স্বর্ণ কংকনে অলংকৃত করা হবে, তারা পরিধান করবে সূক্ষ্ম ও স্থ’ল রেশমের সবুজ বস্ত্র ও হেলান দিয়ে বসবে সুসজ্জিত আসনে; কত সুন্দর পুরস্কার ও উত্তম আশ্রয়স্থল। (কাহ্ফ ৩০,৩১)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يُدْخِلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِن ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ.
যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত, সেথায় তাদেরকে অলংকৃত করা হবে স্বর্ণ-কংকন ও মুক্তা দ্বারা এবং সেথায় তাদের পোশাক-পরিচ্ছেদ হবে রেশমের। ( সূরা হাজ্জ- ২৩)। সূরা ফাতিরের ৩৩ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলার ঘোষণা হচ্ছে,
جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُونَهَا يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِنْ ذَهَبٍ وَلُؤْلُؤًا ۖ وَلِبَاسُهُمْ فِيهَا حَرِيرٌ.
তারা প্রবেশ করবে স্থায়ী জান্নাতে, সেখানে তাদেরকে স্বর্ণ নির্মিত কংকর ও মুক্তা দ্বারা অলংকৃত করা হবে এবং সেখানে তাদের পোশাক-পরিচ্ছেদ হবে রেশমের।                                                                                                                     এখানে মনে হতে পারে যে, হাতে স্বর্ণের কংকন পরা নারীদের কাজ এবং এটা তাদেরই অলংকার। পুরুষদের জন্যে এটা ব্যবহার করা জায়েজ নয়। তেমনিভাবে রেশমের পোশাকও পুরুষদের জন্যে হারাম। তাহলে জান্নাতে তারা ব্যবহার করলে ব্যাপারটা কেমন হবে। এর ফয়সালা আমরা পেতে পারি রাসূল সা:এর নি¤œ বর্ণিত হাদিসে-
عن أبي هُرَيْرَةَ رضي الله عنه أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ :  مَنْ لَبِسَ الْحَرِيرَ فِي الدُّنْيَا لَمْ يَلْبَسْهُ فِي الْآخِرَةِ ، وَمَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ فِي الدُّنْيَا لَمْ يَشْرَبْهُ فِي الْآخِرَةِ , وَمَنْ شَرِبَ فِي آنِيَةِ الْفِضَّةِ وَالذَّهَبِ لَمْ يَشْرَبْ بِهِمَا فِي الْآخِرَةِ  ثُمَّ قَالَ  لِبَاسُ أَهْلِ الْجَنَّةِ , وَشَرَابُ أَهْلِ الْجَنَّةِ , وَآنِيَةُ أَهْلِ الْجَنَّةِ .
আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। রাসূল সা: বলেছেন: যে ব্যক্তি দুনিয়াতে রেশমী বস্ত্র পরিধান করবে, সে পরকালে তা পরিধান করতে পারবে  না। যে দুনিয়াতে মদ পান করবে, পরকালে তা থেকে সে বঞ্চিত হবে। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্রে পানাহার করবে, সে পরকালে এসব থেকে বঞ্চিত হবে। অত:পর রাসূল সা: বলেন: এই বস্তুসমূহ জান্নাতীদের জন্যে বিশেষভাবে নির্দিষ্ট। (নাসায়ী)।
 আল্লাহর হুকুম লংঘন করে যারা দুনিয়ায় ধন-সম্পদ, মান-সম্মান,প্রভাব-প্রতিপত্তি ইত্যাদি নেয়ামত অর্জন করে তা এ দুনিয়ায়ই সীমাবদ্ধ। পরকালে তারা শাস্তি ব্যতীত কোন ধরনের নেয়ামত পাবে না। আল্লাহর বাণী,
وَيَوْمَ يُعْرَضُ الَّذِينَ كَفَرُوا عَلَى النَّارِ أَذْهَبْتُمْ طَيِّبَاتِكُمْ فِي حَيَاتِكُمُ الدُّنْيَا وَاسْتَمْتَعْتُمْ بِهَا فَالْيَوْمَ تُجْزَوْنَ عَذَابَ الْهُونِ بِمَا كُنْتُمْ تَسْتَكْبِرُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَبِمَا كُنْتُمْ تَفْسُقُونَ.
যেদিন অবিশ্বাসীদেরকে জাহান্নামের কাছে উপস্থিত করা হবে (সেদিন তাদেরকে বলা হবে:) তোমরা তো পার্থিব জীবনে সুখ শান্তি পার্থিব জীবনেই নি:শেষ করেছ এবং সেগুলো ভোগ করেছ। সুতরাং আজ তোমাদেরকে অপমানকর আযাবের শাস্তি দেয়া হবে; কারণ, তোমরা পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে অহংকার করতে এবং তোমরা ছিলে পাপাচারে লিপ্ত। (আহক্বাফ-২০)।

তাছাড়া প্রাচীনকালে রাজা বাদশাহরা সোনার কাঁকন ও মূল্যবান রেশমী কাপড় ব্যবহার করতেন। অথচ উভয় জিনিস পুরুষের জন্যে দুনিয়াতে ব্যবহার করা ছিল নাজায়েজ। জান্নাতবাসীদের পোশাকের মধ্যে এ গুলোর কথা র্ননা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে একথা জানিয়ে দেয়া যে, সেখানে তাদেরকে রাজকীয় পোশাক পরানো হবে। একজন অবাধ্য বাদশাহ সেখানে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে। আর দুনিয়াতে একজন সাধারন খেটে খাওয়া মজদুর জান্নাতী হলে সেখানে সে থাকবে রাজকীয় জৌলুসের মধ্যে। কাজেই আমাদেরকে চলতে হবে আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী। আমাদের প্রবৃত্তির ইচ্ছানুযায়ী নয়। আল্লাহর বাণী,
وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا. يُدْخِلُ مَنْ يَشَاءُ فِي رَحْمَتِهِ وَالظَّالِمِينَ أَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا .
আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতিরেকে তোমরা অন্য কোন ইচ্ছা পোষণ করবে না। আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়। তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁর অনুগ্রহের অন্তর্ভূক্ত করেন; আর যালেমদের জন্যে তিনি প্রস্তুত রেখেছেন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। ( আদ দাহার ৩০)।

বিশ্বনেতাদের প্রতি হেদায়েতী পত্র

হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলে বাইরের সমস্যা কিছুটা শান্ত হওয়ায় এবং দাওয়াতী কাজে কোন বাঁধা নাথাকায় রাসূল সা: বহির্বিশ্বের তখনকার প্রতাপশালী রাজা-বাদশাদের নিকট পত্রের মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। তদুপরি হুদায়বিয়ার সন্ধিকে আল্লাহ তায়া‘লা ‘মহাবিজয়’ আখ্যা দেওয়ায় এ কাজে তাঁর আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। তখনকার দিনে জগতের ইতিহাসে যে কয়টি রাজশক্তি বিদ্যমান ছিল, তাদের মধ্যে এশিয়ায় চিন ও পারস্য, ইউরোপে রোম-সা¤্রাজ্য এবং আফ্রিকায় হাবসী সা¤্রাজ্যই ছিল প্রধান। ষষ্ঠ হিজরীর শেষ কিংবা সপ্তম হিজরীর শুরুতে তিনি বিশ্ব নেতাদের নামে ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়ে পত্র পাঠাতে থাকেন। এসব পত্র লোক মারফত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়। ইতিহাসে যে সব আমন্ত্রণ পত্রের কথা উল্লেখিত হয়েছে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:
প্রথম পত্রটি রোম স¤্রাট হিরাক্লিয়াসের নামে দেহিয়া কল্ব এর মাধ্যমে পাঠানো হয়। এ পত্রটি কখন কি অবস্থায় তার হাতে পৌঁছায় সে বিষয় কিছুটা উল্লেখ করা হলো। বহুদিন হতে রোম ও পারস্য-স¤্রাজ্যে ভীষণ যুদ্ধবিগ্রহ চলছিল। রোমকগণ পশ্চিম এশিয়ার এক বিস্তীর্ণ অংশ জয় করে রোম-স¤্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করে লয় এবং এর নাম দেয়া হয় ‘বাইজান্টাইন’ বা প্রাচ্য রোম-স¤্রাজ্য। এসময় এই বাইজান্টাইনের শাসন করতেন হিরাক্লিয়াস। ইনি কনষ্টান্টি নোপলে থেকে রাজ্যশাসন করতেন। ইহাকে ‘কাইসার’ও বলা হত। খ্রীষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথম দিকে পারস্য-স¤্রাট খসরু রোমকদের পরাজিত করে মিসর,সিরিয়া, ফিলিস্তিন উদ্ধার করেন। কিন্তু বেশী দিন সেগুলোকে অধিনে রাখতে পারেন নাই। কিছুদিনের মধ্যেই হিরাক্লিয়াস পারসিকদিগকে পরাজিত করে হৃতরাজ্যগুলো পুনরায় দখল করে নেন। ঠিক এই সময় মুহাম্মাদ সা: হুদায়বিয়ায় কুরাইশদের সাথে সন্ধি করতে ব্যস্ত ছিলেন। হিরাক্লিয়াস মনে মনে প্রতিজ্ঞা করছিলেন যে,যদি পারসিকদের পরাজিত করে প্যালেষ্টাইন পুনরায় দখল করতে পারেন তাহলে তিনি পায়ে হেটে জেরুজালেম পরিদর্শন করবেন। প্রতিজ্ঞানুযায়ী তিনি প্যালেষ্টাইন দখল করে মহা আনন্দে জাকজমক ভাবে জেরুজালেমে আসতেছিলেন। এমন সময় সীলমহরযুক্ত আরবী-ভাষায়-লিখিত একখানি পত্র তার হাতে এসে পৌঁছায়। দেহিয়া কল্ব নামে জনৈক আরবীয় দূত পত্রখানি প্রথমে বসরার শাসনকর্তা হারিসের নিকট প্রদান করেন। হারিস জনৈক কর্মচারীকে সাথে দিয়া দেহিয়া কলবকে জেরুজালেমে হিরাক্লিয়াসের নিকট পাঠায়ে দেন। পত্রখানিতে যে কথা লেখাছিল:
‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হতে রোমের প্রধান হিরাক্লিয়াসের নামে। যে ব্যক্তি সত্যপথ অনুসরণ করে, তার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। অত:পর আমি আপনাকে ইসলামের দিকে আহবান করতেছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, আপনার কল্যাণ হবে, শান্তিতে থাকবেন। আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিফল দিবেন। কিন্তু যদি আপনি এতে অস্বীকার করেন, তাহলে আপনার প্রজাসাধারণের পাপের জন্য আপনি দায়ী হবেন। ‘হে আহলে কিতাব! এস এমন একটি কথার দিকে, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান; তা এই যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করবো না, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবো না এবং আমাদের মধ্যেও কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে নিজের প্রভু বানাবো না। কিন্তু তোমরা যদি এ কথা মানতে অস্বীকৃত হও, তাহলে (আমরা স্পষ্ট বলে দিচ্ছি যে,) তোমরা সাক্ষী থাক, আমরা মুসলিম। ( সূরা আল-ইমরান-৬৪)। পত্রের নীচে ‘মুহাম্মাদুর রাসূলূল্লাহ’ মোহর (সীল) মারা ছিল। (পত্রের ভাষার দিকে লক্ষ্য করলে সহজেই যে বিষয়গুলো বুঝা যায় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, কোন দেশের রাষ্ট্রপতি যদি আল্লাহর নীতি মালা লংঘন করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তাহলে জাতি পথভ্রষ্ট হয় এবং জাতির বিপর্যয় দেখা দেয়। ফলে জনগণের পাপসহ এর যাবতীয় দায়ভার প্রথমত: রাষ্ট্র পরিচালকদের ই বহন করতে হবে। আসমান -যমিনে যাকিছু আছে সবকিছুরই একমাত্র মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। দেশ ও জাতি কোন্ নীতিমালার ভিত্তিতে পরিচালনা করলে সফলতা আসবে তাও জানেন আল্লাহ। তাই তিনি পৃথিবী পরিচালনার জন্য বান্দার হাতে তুলে দিয়েছেন বিজ্ঞান সম্মত এক নীখুঁত নীতিমালা সম্বলিত কিতাব। যাকে আল্লাহ তায়া‘লার ভাষায় বল হয়েছে ‘নেয়া‘মত’(কুরআন)। যে জাতির পরিচালকরা এ নেয়া‘মতকে উপেক্ষা করে অন্য নীতিমালা দিয়া দেশ ও জাতি পরিচালনা করবে সে দেশ ও জাতি ধ্বংসের সম্মুখীন হবে। আল্লাহর বাণী, “তুমি কি তাদেরকে দেখনা, যারা আল্লাহর তায়া‘লার নেয়ামতের পরিবর্তে কুফর অবলম্বন করেছে এবং তাদের অনুসারী জাতিকে ধ্বংস ও বিপর্যয়ের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে? তারা জাহান্নামে প্রজ্জ্বলিত হবে। আর জাহান্নাম কতইনা নিকৃষ্ট আবাস স্থল”। সূরা ইবরাহীম- ২৮,২৯। আজকের পৃতিবী জ্ঞান-বিজ্ঞানে,শিক্ষা-দিক্ষায়, আবিস্কারে অনেক উন্নতি হওয়ার সত্ত্বেও কেন এত অশান্তি? তার মূল কারণ উল্লেখিত আয়াতে বলা হয়েছে)। প্রবল ক্ষমতাধর রোম স¤্রাজ্যের অধিপতি হিরাক্লিয়াসের নিকট একজন নিরক্ষর মরুবাসীর পত্র। পত্রের সারমর্ম বুঝে হিরাক্লিয়াস বিস্ময় অভিভূত। রাজ্যের মন্ত্রীবর্গ, প্রশাসনের উচুঁ স্তরের লোকেরা পরামর্শ দিলেন তাঁকে সমুচিত শিক্ষা দেয়া হোক। কিন্তু হিরাক্লিয়াস তাদের কথায় সায় দিলেন না। তিনি বাইবেল থেকে জানতে পেরেছেন যে, একজন মহামানব আসবেন। তিনি মুহাম্মাদ সা: সম্পর্কে জানার আগ্রহ ব্যক্ত করলেন। মন্ত্রী, পুরোহিত ও অন্যান্য জ্ঞানী ব্যক্তিদিগকে নিয়ে একটি পরামর্শ সভার আয়োজন করলেন। সেখানে পত্রবাহক সহ অন্যান্য আরবদেরও ডাকলেন। ঘটনা চক্রে এ সময়ে ইসলাম বৈরী আবু সুফিয়ানও বাণিজ্য উপলক্ষে জেরুজালেমে অবস্থান করছিলেন। স¤্রাটের আদেশক্রমে তাকেও রাজ্যসভায় উপস্থিত করা হলো। দোভাষীর সাহায্যে কথাবর্তা আরম্ভ হবে। স¤্রাট আরবদের জিজ্ঞাসা করলেন:মুহাম্মাদের সর্বাপেক্ষা নিকট আত্মীয় কে আছে? আবু সফিয়ান উত্তর দিল:আমি আছি। মুহাম্মাদ আমার ভ্রাতুষপুত্র। তখন স¤্রাট আবু সুফিয়ানকে নিকটে ডেকে অন্যান্য আরবদের বললেন: এ ব্যক্তিকে আমি কতগুলো প্রশ্ন করবো। সে যদি মিথ্যা উত্তর দেয়, তাহলে তোমরা তার প্রতিবাদ করবে। আবু সুফিয়ান মহা সংকটে পড়লো। ভেবেছিল প্রাণ ভরে মুহাম্মাদের কুৎসা বলে যাবে। কিন্তু সে সুযোগ আর রইলো কোথায়। বরং মিথ্যা বললে তাকে এ রাজ দরবারে অপমানিত,লাঞ্ছিত হতে হবে। বাধ্য হয়েই তাকে আজ মহা শত্রুর বিরুদ্ধে সত্য কথা বলতে হবে। এ চিন্তায় আবু সুফিয়ান মহা সংকটে পড়ল।
আবু সুফিয়ানের সাথে আলোচনা
হিরাক্লিয়াস: নবুয়্যাতের দাবীদার ব্যক্তির বংশ কেমন?
আবু সুফিয়ান: সে সম্ভ্রান্ত বংশের লোক।
হিরাক্লিয়াস: এ বংশের আর কেউ নবুয়্যাতের দাবী করেছে?
আবু সুফিয়ান:কখনো কেউ নবুয়্যাতের দাবী করেনি।
হিরাক্লিয়াস:তাঁর পূর্ব পুরুষদের কেউ রাজা ছিলেন?
আবু সুফিয়ান: না।
হিরাক্লিয়াস: কোন শ্রেণীর লোক তাঁর ধর্ম গ্রহণ করছে?
আবু সুফিয়ান: বেশীর ভাগ দরিদ্র শ্রেণীর লোকই তাঁর ধর্ম গ্রহণ করতেছে।
হিরাক্লিয়াস: তাঁর অনুসারীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, না কমছে?
আবু সুফিয়ান:ক্রমান্বয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হিরাক্লিয়াস: এ ব্যক্তিকে কোন দিন মিথ্যা বলতে দেখেছ কি?
আবু সুফিয়ান:না, জীবনে কোন দিন মিথ্যা বলেননি।
হিরাক্লিয়াস: তিনি কি কখনো কোন চুক্তি বা ওয়াদা ভংগ করেছেন?
আবু সুফিয়ান:না, আজ পর্যন্ত তা দেখি নাই। তবে বর্তমানে হুদায়বিয়ার চুক্তি রয়েছে। দেখি সে চুক্তিতে অটল থাকে কি না?
হিরাক্লিয়াস:তাঁর সাথে তোমাদের কোন যুদ্ধ হয়েছে কি না?
আবু সুফিয়ান: হয়েছে।
হিরাক্লিয়াস: যুদ্ধের ফলাফল কি হয়েছে?
আবু সুফিয়ান: কখনো আমরা জিতেছি, আবার কখনো তাঁর জয় হয়েছে।
হিরাক্লিয়াস: তিনি মানুষদের কি শিক্ষা দেন?
আবু সুফিয়ান: তিনি বলেন: এক আল্লাহ ব্যতিত আর কোন উপাস্য নেই। তাঁর সাথে আর কাউকে শরীক করা যাবে না। নামাজ পড়। সত্য কথা বল, সুপথে চল, চরিত্রবান হও। পরস্পর মিলে-মিশে থাকো। মানুষকে উপকার কর,ক্ষতি করনা, ইত্যাদি।
এই আলোচনার পর হিরাক্লিয়াস বললো: “দেখ এ ব্যক্তি যে সত্যসত্যিই নবী,তাতে কোন সন্দেহ নেই। তোমাদের কথা হতে  স্পষ্ট বেরিয়ে এসেছে যে, তাঁর বংশ খুব সম্ভ্রান্ত, এ বংশে পূর্বে কেউ কোন দিন নবী,বা রাজা ছিলনা। নবীগণ সব সময় সম্ভ্রান্ত বংশেই জন্ম গ্রহণ করেন। পূর্বে কেউ নবী বা রাজা থাকলে তিনি তাঁর বংশের হারানো গৌরব ফিরে পাবার নেশায় তা করছেন বলে ধরে নেয় যেত। ব্যাপারটি কিন্তু তেমন নয়। দরিদ্র লোকেরাই তাঁর বেশী অনুসরন করছে। সত্য ধর্মের ব্যাপারে চিরকালই এমনটি হয়ে আসছে। জীবনে কোন দিন মিথ্যা বলেন নি, চুক্তি ও ওয়াদা ভংগ করেন নি। ইহাই সত্য নবী হওয়ার লক্ষণ। তোমরাই ভেবে দেখ, জীবনে যিনি এমনটি করেন নি, তাহলে তিনি যা কিছু বলছেন তা মিথ্যা হওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। তাঁর অনুসারী দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ,নবীদের অনুসারী বৃদ্ধি পায় কমে না। ইহা ছাড়াও তিনি তোমাদেরকে মহৎ ও উন্নত জীবন-যাপন পদ্ধতি শিক্ষা দেন। কাজেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস তিনিই হবেন বিশ্ব নবী, যার জন্যে সারা পৃথিবী অপেক্ষা করছে। তাঁর আধিপত্য একদিন আমার রাজত্ব পর্যন্ত পৌঁছবে। আমি যদি তাঁর নিকট যেতে সক্ষম হতাম, তাহলে নিজেই তাঁর পা মোবারক ধুয়ে দিতাম। 
হিরাক্লিয়াসের এসব মন্তব্যের ফলে তার সভাস্থলে তুমুল উত্তেজনা দেখা দিল। খ্রীষ্টান পাদ্রীগণ ও তার দরবারের আলেমরা কথা গুলোকে তাদের স্বার্থের বিপরিত মনে করায় তুমুল উত্তেজনা দেখা দিল। এমন কি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দেয়ার মতো পরিস্থিতি দেখা দিল। এর ফলে তার বিবেকে যে সত্যের আলো উদ্ভাসিত হয়েছিল,তা আবার নিভে গেলো। সা¤্রাজ্যের আসন্ন বিপদের আশঙ্কা দেখা দেয়ায় তিনি তার কথার কূট রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়ে সকলকে শান্ত করলেন। প্রকৃত পক্ষে সত্যকে গ্রহণ করার পথে ধন-সম্পদ ও ক্ষমতার মোহই সবচেয়ে বড়ো প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্ব নবীর পত্রের মাধ্যমে বাণী প্রেরণ খ্রীষ্টান- জগতে এক অভূত দোল খেতে লাগলো।