জান্নাতীদের পানীয়

জান্নাতীদের জন্য প্রধানত চার ধরনের পানীয়র ব্যবস্থা থাকবে। যেমন, পানি, দুধ, মধু ও শরাব। আরো থাকবে কর্পূর, শুকনো আদা মিশ্রিত ও তাসনীম পানীয়। এগুলো সবই দুনিয়ার সাথে পরিচিত। কিন্তু জান্নাতের পানীয়র স্বাদ, গন্ধ ও রং দুনিয়ার মত হবে না। সেখানকার প্রত্যেক বস্তুর স্বাদ, গন্ধ ও রং ভিন্ন ধরনের হবে। যার নযির পৃথিবীতে নেই। আল্লাহ তা‘য়ালা পবিত্র কালামে পাকে উল্লেখ করেন.
مَثَلُ الْجَنَّةِ الَّتِى وُعِدَ الْمُتَّقُونَ فِيهَا أَنْهَـرٌ مِنْ ماء غَيْرِ آسِن وَأَنْهـرٌ مِنْ لَبَن لَمْ يَتَغَيَّرْ طَعْمُهُ وَأَنْهـرٌ مِنْ خَمْر لَذَّة لِلشَّـرِبِينَ وَأَنْهَـرٌ مِنْ عَسَل مُصَفّىً وَلَهُمْ فِيهَا مِن كُلِّ الَّثمَرَاتِ وَمَغْفِرَةٌ مِن رَبِّهِمْ كَمَنْ هُوَ خَـلِدٌ فِي النَّارِ.
“মুত্তাকীনদের জন্য যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তার অবস্থা এই যে,তার মধ্যে স্বচ্ছ ও নির্মল পানির নহর বইতে থাকবে। এমন সব দুধের নহর বইতে থাকবে যার স্বাদে কোন সামান্যতম পরিবর্তন বা বিকৃত ও আসবে না। শরাবের এমন নহর বইতে থাকবে পানকারীদের জন্য যা হবে অতীব সুস্বাদু এবং বইতে থাকবে স্বচ্ছ মধুর নহর। এ ছাড়াও তাদের জন্য সেখানে থাকবে সব রকমের ফল এবং তাদের রবের পক্ষ থেকে থাকবে ক্ষমা। ( যে ব্যক্তি এই জান্নাত লাভ করবে সেকি) ঐ ব্যক্তির মত হতে পারে যে চিরদিন জাহান্নামে থাকবে।” ( মুহাম্মাদ ১৫)। দুনিয়ার পানীয় দুষিত হয় যা স্ব্যাস্থের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু জান্নাতের পানীয় যাবতীয় ক্ষতি থেকে মুক্ত।
لَا فِيهَا غَوْلٌ وَلَا هُمْ عَنْهَا يُنْزَفُونَ.
“ তা তাদের কোন শারিরীক ক্ষতি করবেনা এবং তারা তাতে মাতালও হবে না”। (সাফ্ফাত ৪৭)।  এ পানীয় তাদের ভাগ্যেই হবে, যারা পুরোপুরি তাদের রবের আনুগত্য করেছে, তাঁর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালন করেছে সেই সাথে তাঁর পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ কাজসমূহ থেকে বিরত রয়েছে। আল্লাহ তা‘য়াল বাণী,
إِنَّ الْأَبْرَارَ يَشْرَبُونَ مِنْ كَأْسٍ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُورًا * عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا.
“নিশ্চয়ই নেককার লোকেরা পানপাত্র থেকে এমন শরাব পান করবে যাতে কর্পূর মিশ্রিত থাকবে। এটি হবে একটি বহমান ঝর্ণা। আল্লাহর বান্দারা যার পানির সাথে মিশিয়ে পান করবে এবং যেখানেই ইচ্ছা সহজেই তার শাখা-প্রশাখা বের করে নিবে”। (সূরা দাহ্র,৫.৬)। অর্থাৎ জান্নাতীরা যেখানেই চাইবে, সেখানেই এ পানীয় উপস্থিত পাবে। তাদেরকে স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত পান পাত্রে তা পরিবেশন করা হবে।
وَيُطَافُ عَلَيْهِم بِآنِيَةٍ مِّن فِضَّةٍ وَأَكْوَابٍ كَانَتْ قَوَارِيرَا * قَوَارِيرَ مِن فِضَّةٍ قَدَّرُوهَا تَقْدِيرًا *وَيُسْقَوْنَ فِيهَا كَأْسًا كَانَ مِزَاجُهَا زَنجَبِيلا *عَيْنًا فِيهَا تُسَمَّى سَلْسَبِيلا.
“তাদের সামনে রৌপ্য পাত্র ও সচ্ছ কাঁচের পাত্রসমূহ পরিবেশিত হতে থাকবে। কাঁচ পাত্রও হবে রৌপ্য জাতীয় ধাতুর। যা            ( জান্নাতের ব্যবস্থাপকরা) যথাযথ পরিমাণে পূর্ণ করে রাখবে। সেখানে তাদের এমন সূরা পান করানো হবে যাতে শুকনো আদার সংমিশ্রণ থাকবে। এটি জান্নাতের একটি ঝর্ণা যা সালসাবিল নামে অভিহিত”। (দাহ্র ,১৫-১৮)।
আরবরা শরাবের সাথে শুকনো আদা মেশানো পানির সংমিশ্রণ খুব পছন্দ করতো। তাই বলা হয়েছে, সেখানেও তাদের এমন শরাব পরিবেশন করা হবে যাতে শুকনো আদার সংমিশ্রণ থাকবে। কিন্তু তা এমন সংমিশ্রণ হবে না যে, তার মধ্যে শুকনো আদা মিশিয়ে তারপর পানি দেয়া হবে। বরং তা হবে একটি প্রাকৃতিক ঝর্ণাধারা যার মধ্যে, আদার খোশবু থাকবে। কিন্তু তিক্ততা থাকবে না। সে জন্য তার নাম হবে “সালসাবিল”। এর অর্থ এমন পানি যা মিঠা, মৃদু ও সুস্বাদু হওয়ার কারণে সহজেই গলার নীচে নেমে যায়।
يسْقَوْنَ مِن رَّحِيقٍ مَّخْتُومٍ *خِتَامُهُ مِسْكٌ وَفِي ذَلِكَ فَلْيَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُونَ *وَمِزَاجُهُ مِن تَسْنِيمٍ *عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا الْمُقَرَّبُونَ.
“তাদেরকে মোহর করা বিশুদ্ধতম শরাব পান করানো হবে। তার ওপর মিশ্ক- এর মোহর থাকবে। যারা অন্যদের ওপর প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে চায় তারা যেন এই জিনিষটি অর্জন করার জন্য প্রতিযোগিতায় জয়ী হবার চেষ্টা করে। সে শরাবে তাসনীমের মোহর থাকবে। এটি একটি ঝর্ণা, নৈকট্যলাভকারীরা এর পানির সাথে পান করবে”। (মুতাফফিফীন.২৫-২৮)। ‘খিতামুহু মিসক’ এটা হবে উন্নত পর্যায়ের পরিচ্ছন্ন শরাব। ঝর্ণায় প্রবাহিত শরাবের থেকে এটি বেশী উন্নত গুণাবলী সম্পন্ন হবে। জান্নাতের খাদেমরা মিশকের মোহর লাগানো পাত্রে করে এনে এগুলো জান্নাতবাসীদের পান করাবে। এই শরাব যখন পানকারীদের গলা থেকে নামবে তখন শেষের দিকে তারা মিশকের খুশবু পাবে। আর ‘তাসনীম’ মানে উন্নত ও উঁচু। কোন ঝর্ণাকে তাসনীম বলার অর্থ হচ্ছে তা উঁচু থেকে প্রবাহিত হয়ে নীচের দিকে আসে। এ ছাড়াও থাকবে ‘হাউজে কাউসার’। এ স্পর্কে রাসূল সা:বলেছেন যে, তার পানি হবে দুধের চাইতে ( কোন কোন রেওয়ায়াত অনুযায়ী রূপার চাইতে আবার কোন কোন রেয়ায়াত অনুযায়ী বরফের চাইতে) বেশী সাদা এবং মধুর চাইতে বেশী মিষ্টি। তার তলদেশের মাটি হবে মিশকের চাইতে বেশী সুগন্ধিযুক্ত। আকাশে যত তারকা আছে সে পরিমানের স্বর্ণ ও রৌপ্যের পান পাত্র তার পাশে সাজানো থাকবে। তার পানি একবার পান করার পর দ্বিতীয়বার কারো পিপাসা লাগবে না। আর তার পানি যে একবার পান করেনি তার পিপাসা কোন দিন মিটবে না। পবিত্র কুরআনে এ নামে একটি সূরা রয়েছে । পঞ্চাশ জনের ও বেশী সাহাবী এ হাউজ কাউসার সংক্রান্ত হাদীসগুলো বর্ণনা করেছেন। তন্মধ্যে বুখীর থেকে একটি হাদীস নীচে উল্লেখ করা হলো।
عن عبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرٍو قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَوْضِي مَسِيرَةُ شَهْرٍ مَاؤُهُ أَبْيَضُ مِنْ اللَّبَنِ وَرِيحُهُ أَطْيَبُ مِنْ الْمِسْكِ وَكِيزَانُهُ كَنُجُومِ السَّمَاءِ مَنْ شَرِبَ مِنْهَا فَلَا يَظْمَأُ أَبَدًا.
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা: থেকে বর্ণিত। নাবী কারীম সা: বলেছেন, আমার হাউজের প্রশস্ততা এক মাসের পথের সমান। উহার পানি দুধের চেয়ে অধিক সাদা এবং তার ঘ্রাণ মৃগনাভী থেকেও খুশবুদার। আর উহার পান-পাত্রগুলো আকাশের নক্ষত্রের ন্যায় ( অধিক ও উজ্জল)। যে একবার উহা হতে পান করবে সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। (বুখারী)। রাসূল সা: তাঁর পর থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সময় কালের সমগ্র মুসলিম মিল্লাতকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন: তোমাদের মধ্য থেকে যারাই আমার পথ থেকে সরে গিয়ে অন্য পথে চলবে, তাদেরকে এ হাউজের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়া হবে। আমি বলবো: হে আমার রব ! এরা তো আমার উম্মাত। জবাবে বলা হবে: আপনি জানেন না, আপনার পরে এরা কি কি পরিবর্তন করেছিল এবং আপনার পথের উল্টোদিকে চলেছিল। তখন আমিও তাদেরকে দূর করে দেবো। আল্লাহ তা‘য়ালা আমাদেরকে তাঁর রাসূল সা:-এর আদর্শ অনুযায়ী সঠিক পথে চলার তাওফিক দিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *