বিশ্ব ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ বিজয়ের ঘটনাঃ মক্কা বিজয়

আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ“ তোমাদের মধ্যে যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও জেহাদ করেছে তারা এবং পরবর্তীরা সমান নয়;তারা মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ অন্যদের অপেক্ষা যারা পরবর্তীকালে ব্যয় করেছে ও যুদ্ধ করেছে। তবে আল্লাহ্ উভয়ের জন্য কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন”। (হাদীদ – ১০)। তিনি আরো ইরশাদ করেছেনঃ “যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এবং তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দীনে প্রবেশ করতে দেখবে। তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করবে। তিনি তো তাওবা কবূল কারী। সূরা নাসর।
মহা বিজয়! কথাটি শুনলেই সকলের মনে আনন্দের জোয়ার আসে। কিন্তু এ বিজয় অর্জনের ইতিহাস বড়ই করুন! মহা বিজয়ের পূর্বের দিনগুলোর ইতিহাসের পাতা খুললেই গাঁ শিউরে ওঠে। চতুর্দিকে যুদ্ধ বিগ্রহ,রক্তপাত,মারা-মারি, হানা-হানি, জুলুম নির্যাতন,মেয়ে সন্তানকে জীবন্ত কবর, অসহায় মানুষকে দাস বানিয়ে সীমাহীন কষ্ট দেয়া, নারী পুরুষ উলঙ্গ হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফসহ এমন কোন অপরাধ বাকী ছিলনা যা তৎকালীন সমাজপতিরা করেনি। সীমাহীন জুলুমের ফলে মানুষের মনুষত্য হারিয়ে বিশ্বমানবতা ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে উপনীত। আসন্ন এ ধ্বংসের হাত থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা মুহাম্মাদ সা:কে প্রেরণ করলেন। যার জম্মে র সাথেই বিশ্ব অনুভব করলো যে পৃথিবীতে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। মুহাম্মাদ সা:কাল বিলম্ব না করে বিশ্ব মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করলেন।  বিপন্ন মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে লাগলেন। তাঁর এ আর্তমানবতার সেবার স্বীকৃতি স্বরুপ সেই জাহেলি সমাজের সর্বস্তরের মানুষগুলো তাকে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ খেতার ‘আল- আমীন’ উপাধি দান করলো। বিপন্ন মানুষের কল্যাণে তাঁর চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিলনা। কিন্তু তা সত্বেও মানুষের কাংখিত শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব হলো না। অবশেষে তিনি ভাবলেন, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই পারেন কাংখিত সফলতার পথ দেখাতে। তার বিধান ছাড়া কোন মানুষের ফরমুলাতেই মানুষের সব সমস্যার সমাধান দেয়া সম্ভব না। তাই তিনি ধরনা দিলেন আল্লাহর নিকটে। চলে গেলেন জাবালে নূরে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আল্লাহর পক্ষ থেকে সে শুভক্ষণ ঘনিয়ে আসলো। আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মাদ সা:কে বিশ্ববাসীর কল্যাণের জন্য দান করলেন নবুওয়াত ও কুরআন। নতুন উদ্যোমে শুরু হলো বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার মিশন।
নবুওয়াত প্রাপ্তির পরেই মক্কার কুরাইশ কাফেরগণ নানাবিধ অত্যাচারে অতিষ্ঠ করে তোলে তাঁকে ও তাঁর সাহাবিদেরকে। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, হাসি-ঠাট্টা, মিথ্যা অপবাদের তীক্ষè আঘাঁতে তাদের মানসিক অবস্থা জর্জরিত করা হয়। নবদীক্ষিত মুসলমানদেরকে তাদের মিশন থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। তাদের ঈমানী দৃঢ়তা দেখে কাফের সম্প্রদায় ইসলাম গ্রহণকারীদের ওপর এবার নির্যাতনের পথ বেছে নেয়। ক্রমেই তারা মানসিক আঘাঁতের সাথে শারিরীক নির্যাতন শুরু করে। তৎকালীন জাহেলি সমাজের পুরাতন সে বর্বরতা সত্বেও মুসলমানরা ধৈর্যচ্যুতি হননি। তারা রাসূল সা: এর নির্দেশে সবকিছু সহ্য করেই ইসলামী আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। অত্যাচারের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে। মুহাম্মাদ সা: ও তাঁর সাথীদের গোটা পরিবার সহ আবু তালিব গিরি গুহায় বন্দি জীবনযাপন করতে বাধ্য করা হয়। এরপরও স্বস্তি মেলেনি মুসলমানদের। আঁঘাতে আঁঘাতে জর্জরিত তেরটি বছরের চরম নির্যাতন সহ্য করে মহানবী ও তাঁর সাথীদেরকে শেষ পর্যন্ত মাতৃভূমি ত্যাগ করে মদীনায় যেতে বাধ্য করা হয়। সেখানেও তাদেরকে শান্তিতে থাকতে দেয়া হয়নি। হিজরতের পর হতে মুতার যুদ্ধ সময় পর্যন্ত একের পর এক যুদ্ধের মোকাবেলা করে তাদের টিকে থাকতে হয়। কখনো যুদ্ধ, কখনো সন্ধি করে এগুতে হলো। শত্রুর মোকাবেলা করেই মুসলমানগণ বিশ্ব দরবারে তাদের শক্তিমত্তার পরিচয় তুলে ধরতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে মুতার যুদ্ধে তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রোম স¤্রাজ্য মুসলমানদের ক্ষুদ্র একটি দলের নিকট নাস্তানাবুদ হওয়ায় সে শক্তি আরো বিকশিত হলো। এবার মুসলমানগণ শুধু প্রতিরোধ নয়, তারা আক্রমণেরও ক্ষমতা রাখে।  দশ বছর মেয়াদকাল নির্দিষ্ট করে ঐতিহাসিক হুদায়বিয়ার সন্ধি হয়েছিলো ষষ্ট হিজরীতে। যে চুক্তির অন্যতম একটি ধারাছিল এই যে,এখন থেকে আরব গোত্রগুলোকে অধিকার দেয়া হলো যে, তারা মুসলমান অথবা কুরাইশদের যে কোন দলের সাথে মিত্রতার বন্ধনে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে। এই শর্তের ফলে বনু খোজা গোত্র মুসলমানদের সাথে আর বনু বকর কুরইশদের সাথে মৈত্রী স্থাপন করলো। বনু খোজা গোত্র মক্কায় কুরাইশদের শক্তির তোয়াক্কা না করে বরং তাদের দুশমন মদীনার মুসলমানদের সাথে মৈত্রী স্থাপন করায় তারা ছিল ভীষণ ক্ষুব্দ। খোজা গোত্রকে ইসলামপন্থীদের সাথে ঐক্যমত পোষণ করায় এর প্রতিশোধ গ্রহণে তারা সদা তৎপর ছিল।  

বনু বকর ও কুরাইশ কর্তৃক সন্ধির শর্ত লঙ্ঘন
চুক্তির মেয়াদ দু‘বছর অতিক্রম না হতেই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বনু বকর গোত্র কুরাইশদের সহায়তায় বনু খোজাদের উপর রাতের অন্ধকারে অতর্কিত আক্রমণ করলো। ‘ওয়াতির’ নামক একটি নিভৃত পল্লীতে ছিল খোজা গোত্রের বসতি। রাতের বেলা পরিবার পরিজনসহ খোজা গোত্রের লোকেরা ঘুমে বিভোর। হটাৎ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। কুরাইশ ও বনু বকর গোত্রের লোকেরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদের ঘুমন্ত পল্লীতে আক্রমণ করলো।  আক্রমণের প্রথম আঘাতেই নিরীহ খোজাদের বহু নারী-পুরুষ ও শিশুদের প্রাণ হারালো। অনেকে বাঁচার আশায় কাবা ঘরে আশ্রয় নিলো। তখনও কাবার চারপাশে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ইসলাম ও মুসলমানের দুশমন পশু চরিত্রের মানুষগুলো হায়েনার মত সেখানেও আশ্রয় নেয়া খোজাদের হত্যা করলো। ( ইসলাম পন্থি ও তাদের সমর্থনকারীদের হত্যার ব্যাপারে সে সময় যেমন কোন আইন-কানুনের তোয়াক্কা করতো না। ঠিক বর্তমান সভ্যসমাজের দাবীদার বিশ্ব সা¤্রাজ্য শক্তিগুলোও মুসলমানদের হত্যার ব্যাপারে একই অবস্থা আমরা দেখতে পাই। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তার চেয়েও বর্বরতা লক্ষ্য করা যায়। সে সময় যাদেরকে হত্যা করা হতো তাদেরকেই আবার এ হত্যার জন্য দোষারোপ করা হতনা। কিন্তু এখন? হত্যার পর আবার তাদেরকেই হত্যার জন্য উষ্কে দেয়ার অপবাদে জেল জুলুম সহ্য করতে হয়। এ যেন নতুন রূপী জাহেলিয়াত, পুরাতন জাহেলিয়াতকেও হার মানায়। আর তাদের এ জঘন্য কাজে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে তাদেরই টাকায় গৃহপালিত এক শ্রেণীর মুসলমান নামের কুলাঙ্গারগণ। বিনা কারণে মুসলিম অধ্যুষিত জনগণের উপর ড্রোন হামলা হয়। ইসলামকে সমর্থন করার কারণে যেীথ বাহিনীর অভিযানের স্বীকার হতে হয়। কোন অমুসলিমদের গায়ে হাত পড়লে (যা কোন মুসলমানই সমর্থন করেনা) গোটা বিশ্ব শৃগালের মত চিল্লায়। আর বিনা অপরাধে মুসলমানদের জান-মাল,বাড়ী-ঘর ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছে, সেখানে উল্টো জঙ্গিবাদের বীষ বাাষ্প ছড়ায়। এখন আমাদের মাঝে রাসূল সা: নেই যে, আমরা তার মাধ্যমে এর প্রতিকার চাইব। রাসূল সা: নেই, তাতে কি হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এর প্রতিকারে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধে সোচ্চার হওয়ার আহবান করছেন। আর আল্লাহই আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল। মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী এ প্রেরণায়ই আমাদের বাঁচার উপায়। ইসলাম বর্হিভূত জীবনের চেয়ে শাহাদতী মৃতু অনেক ভাল। আল্লাহ তুমি আমাদেরকে শহীদি মৃতু দাও!)।  খোজা গোত্র কোন উপায় না দেখে এ করুণ কাহিনী রাসূল সা:কে অবহিত করলো এবং চুক্তি অনুযায়ী তারা রাসূলের নিকট সাহায্যোর আবেদন জানালো। রাসূল সা: এ মর্মান্তিক ঘটনা শুনে খুবই মর্মাহত হলেন। তিনি এ নিষ্ঠুর আচরণ থেকে বিরত থাকার এবং নি¤েœাক্ত তিনটি শর্তের যে কোন একটি গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়ে কুরাইশদের কাছে একজন দূূত প্রেরণ করলেন।
ক. খোজাদের যে সব লোককে হত্যা করা হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। অথবা,
খ. বনু বকরের সাথে কুরাইশদের সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে। অথবা,
গ. হুদায়বিয়ার সন্ধি-চুক্তি বাতিল ঘোষণা করতে হবে।
দূত মারফত এই সংবাদ শুনে ‘কোরতা বিন ওমর’ নামক জনৈক কুরাইশ বললোঃ “আামরা তৃতীয় শর্তটি সমর্থন করি”। অর্থাৎ, হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি বাতিল করা হলো। কিন্তু দূত চলে যাবার পর তারা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। কারণ, মুসলমানদের সাথে লড়াই করার মত শক্তি কুরাইশদের এখন আর আগের অবস্থানে নেই। কয়েকটা যুদ্ধে তাদের বড় মাপের অনেক বীর যোদ্ধারা মারা যাওয়ায় শক্তির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তাদের অর্থনীতিরও প্রায় বরোটা বেজে গেছে। তাদের সাহায্যকারী ইহুদীরা প্রায় সর্বনাশের দ্বার প্রান্তে উপনীত। অপরদিকে মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র দাওয়াতী কর্মকান্ডের মাধ্যমে নিজের প্রভাব এত ব্যাপক ও শক্তিশালী করেছে যে, মক্কার আশে পাশেও তাদের সমর্থক গোত্রসমূহের একটা মজবুত অবস্থান তৈরী হয়েছে। আর নৈরাজ্যবাদী ও বিদ্রোহী শক্তিগুলোকে কঠোরভাবে দমন করে শক্তিশালী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। এমতাবস্থায় কুরাইশদের আক্রমণ করাতো দূরের কথা, আত্মরক্ষা করাও কঠিন হবে। এ পরিস্থিতিতে হুদায়বিয়ার সন্ধিই ছিল তাদের একমাত্র রক্ষাকবচ। আর এখন সেটা নিজেরাই বাতিল করে মদীনাকে যেন আহবান জানালো, এস, আমাদেরকে আমাদের কুকর্মের শাস্তি দিয়ে যাও। এসব কারণেই হুদায়বিয়ার সন্ধি পুনর্বহাল করার জন্যে নিজেদের পক্ষ থেকে আবু সুফিয়ানকে প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করলো। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি, বিশেষত কুরাইশদের এতদিনকার আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল সা: তাদের এই নয়া প্রস্তাব সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না। কারণ, যাদের চরিত্রে পশুত্বের বীজ রয়েছে তাদের বিশ্বাস করার কোনই যুক্তি নেই। তিনি আবু সুফিয়ানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। বার বার এভাবে রক্তপাত,নিরীহ মানুষ হত্যার বিভীষিকা আর কতদিন চলবে। নির্মম ও নিষ্ঠুরতার কবল থেকে পুরোপুরি ও স্থায়ীভাবে মুক্তি লাভের একটি সমাধান বের করা দরকার। আর সেটা হতে পারে শত্রুর আসল আস্তানার মূলোৎপাটন এবং জাহেলিয়াতের নেতৃত্ব তার নিজ এলাকায়ই নিভিয়ে দেয়া। এ লক্ষ্যে আক্রনাত্বক অভিযান পরিচালনা অনিবার্য হয়ে দাড়ায়। আর এ জন্যে দায়ী বর্বর চরিত্রের কুরাইশরা, এটা তাদের কর্মফল যে, তারা নিজেরাই হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করে শান্তি ও নিরাপত্তার প্রাচীর গুড়িয়ে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *