মানব বিধ্বংসী নেতৃত্ব অবসানের প্রস্তুতি

 মানুষকে আল্লাহ তায়ালা সামাজিক জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। সমাজবদ্ধভাবেই তাকে চলতে হয়। এ জন্য প্রয়োজন নেতৃত্ব। নেতৃত্ব ছাড়া সমাজ চলতে পারে না। মানুষের সুখ-দুঃখ,উন্নয়ন অনেকটা নির্ভর করে নেতৃত্বের ওপর। নেতৃত্বের গুণাবলী যদি হয় নবীদের অনুকরনের তাহলে মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তির পথ খুজে পাবে। আর নেতৃত্ব যদি হয় ফেরআউন ও নমরুদের অনুকরনের তাহলে মানুষের দুনিয়া ও আখেরাত উভয়টিই বরবাদ হবে। ফেরআউনী নেতৃত্বের কু-ফল ভোগ করতে হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম  ধরে। কারণ,পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তারা একটি দৃষ্টান্ত কায়েম করে গেছে। জুলুম কিভাবে করতে হয়, সত্য অস্বীকার করে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার উপর কিভাবে অবিচল থাকা যায় এবং সত্যের মোকাবেলায় বাতিলের জন্য লোকেরা কেমন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে, এসব তারা করে দেখিয়ে দিয়ে গেছে। দুনিয়াবাসীকে এসব পথ দেখিয়ে দিয়ে তারা তাদের সহযোগী,সমর্থক, প্রশাসনের কর্মর্তা, আমলা ও মন্ত্রী পরিষদসহ জাহান্নামের দিকে এগিয়ে গেছে। এখন তাদের উত্তরসূরীরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে সেই মনযিলের দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। এধরনের নেতৃত্ব মানব সভ্যতার জন্য কতটা ক্ষতিকর সে বিষয় আল্লাহ তায়‘ালা মানব জাতিকে হুশিঁয়ার করেছেন এভাবে, “তাদেরকে আমি জাহান্নামের দিকে আহবানকারী নেতা করেছিলাম এবং কিয়ামতের দিন তারা কোথাও থেকে কোন সাহায্য লাভ করতে পারবে না।” (কাসাস্ – ৪১)। “ তারপর সেই দিনের কথা মনে করো যেদিন আমি মানুষের প্রত্যেকটি দলকে তার নেতা সহকারে ডাকবো।” ( বনী ঈসরাইল – ৭১)। নেতার গুণাবলীর ওপর নির্ভর করবে তাদের অনুসারীরা  কিয়ামতের দিন কোথায় স্থান পাবে। ইতিহাস স্বাক্ষী, মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত ফেরআঊনের উত্তরসূরী নেতৃত্ব কিভাবে মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন করেছে। বিপন্ন মানুষের একমাত্র নেতা মুহাম্মাদ সা: ঐ নেতৃত্বকে সৎপথে আনতে প্রাণপন চেষ্টা করেছেন। যাতে তারা আর কোন মানুষের ক্ষতি না করে এবং নিজেরাও সৌভাগ্যবান হতে পারে। কিন্তু তাদেরকে যতই সুযোগ দেয়া হয়েছে,ততই তারা হায়েনার মতো একের পর এক আঘাত করেই চলেছে। সর্বশেষ জাহেলী নেতৃত্ব যখন হুদায়বিয়ার সন্ধি লংঘন করে বনু বকরের ওপর পৈষাচিকভাবে হত্যা যজ্ঞ চালালো এবং সন্ধি প্রত্যাখ্যান করলো তখন রাসূল সা: কালবিলম্ব না করে এ নেতৃত্ব অবসানে যুদ্ধ অভিযানের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। তিনি নিজের ঘরেও অস্ত্র তৈরীর আদেশ দিলেন। তবে কোথায় কোন দিকে এবারের যুদ্ধ যাত্রা করা হবে, সেটা কাউকেই জানতে দিলেন না। এমনকি হযরত আয়েশা রা:ও  তা জানতে পারলেন না। অথচ তিনি নিজ হাতেই রাসূল সা:-এর জন্য অস্ত্র তৈরী করে দিয়েছেন। তবে অধিকাংশ লোক হয়তো ধারণা করেছিল যে এবার মক্কায় আক্রমণ করা হবে। কেননা এত বিপুল পরিমাণ সৈন্য আর কোথাও নিয়ে যাওয়ার কোন কারণ ছিল না। অতিমাত্রায় রক্তপাত যাতে না হয়,সে জন্যই রাসূল সা: এ কৌশল করেছিলেন। তিনি এ জন্য আল্লাহর সাহায্য চাইলেন। বললেন, “হে আল্লাহ ! কুরাইশদের থেকে আমাদের প্রস্তুতির যাবতীয় খবর গোপন রাখুন যাতে আমরা তাদের ওপর আকস্মিকভাবে চড়াও হতে পারি।”
বদর যোদ্ধা হাতেব ইবনে আবি বালতায়ার পরিবার পরিজন তখনো মক্কায় কাফেরদের দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল এবং কোন গোত্র তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। এ জন্য তিনি তাদের রক্ষণাবেক্ষণের উদ্দেশ্যে মদীনার প্রস্তুতির পূর্ণ বিবরণ সম্বলিত একটা গোপন চিঠি কুরাইশদের কাছে পাঠালেন, যাতে তারা তার এই অনুগ্রহের বদলা হিসেবে মক্কা বিজয়ের সময় তার পরিবারকে যে কোন রকম কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকে। সেই সাথে তিনি এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন যে, এই গোপন তথ্য সরবরাহ করা সত্ত্বেও মুসলিম বাহিনীর বিজয় সুনিশ্চিত  এবং তার চিঠি ইসলামের কোন বড় রকমের ক্ষতি করতে পারবেনা। এ ঘটনা থেকে বুঝা যায় বাহ্যিক পরিবেশ পরিস্থিতি ও মানসিক অবস্থার চাপে পড়ে কখনো অত্যন্ত সৎ লোকের পক্ষ থেকেও মারাত্মক পদস্খলন ঘটে যেতে পারে। রাসূল সা: ওহীর মাধ্যমে এ চিঠির খবর জানতে পারেন। তাঁর প্রেরিত গোয়েন্দারা মক্কা গমনরত এক মহিলাকে রওযায়ে খাখ নামক স্থানে গিয়ে পাকড়াও করে তার কাছ থেকে ঐ চিঠি উদ্ধার করেন। এত বড় ভ্রান্তি রাসূল সা: শুধু এজন্য ক্ষমা করেন যে, হাতেব নিষ্ঠাবান, ঈমানদার , সৎ ও বদরযোদ্ধা সাহাবী ছিলেন। আর এই পদস্খলনটা ছিল তার মানবীয় দুর্বলতা থেকে উদ্ভুত।  ওমর বিন খাত্তাব রা: বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, সে মুনাফেকী করেছে। আমাকে অনুমতি দিন তার ঘাড় কেটে ফেলি।” রাসূল সা: বললেন, “হে ওমর,তোমার কি জানা আছে যে, আল্লাহ তায়া‘লা বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদের ব্যাপারে বলেছেন যে, তোমরা যা খুশী কর, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিলাম।”
আল্লাহ তায়া‘লা হাতেব সম্পর্কে সূরা মুমতাহিনায় আয়াত নাযিল করলেনঃ “হে ঈমানদারগণ, যদি তোমরা আমার পথে জিহাদ করার জন্য এবং আমার সন্তুষ্টিলাভের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে থাক তাহলে আমার ও তোমাদের  শত্রুদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করবে না। তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা কর,অথচ যে সত্য তোমাদের কাছে এসেছে তারা তা মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাদের আচরণ হলো, তারা রাসূলকে এবং তোমাদেরকে শুধু এই অপরাধে জন্মভমি থেকে বহিষ্কার করে যে, তোমরা তোমাদের রব আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছো। তোমরা গোপনে তাদের কাছে বন্ধুত্বমূলক পত্র পাঠাও। অথচ তোমরা গোপনে যা কর এবং প্রকাশ্যে যা করো তা সবই আমি ভাল করে জানি। তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি এরূপ করে নিশ্চিন্তভাবেই সে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তাদের আচরণ হলো, তারা যদি তোমাদের কাবু করতে পারে তাহলে তোমাদের সাথে শত্রুতা করবে এবং হাত ও জিহবা দ্বারা তোমাদের কষ্ট দেবে। তারা চায় যে, কোনক্রমে তোমরা কাফের হয়ে যাও। কিয়ামতের দিন না তোমাদের আতœীয়তার বন্ধন কোন কাজে আসবে, না সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে। সেদিন আল্লাহ তোমাদের পরস্পর বিছিন্ন করে দিবেন। আর তিনিই তোমাদের আমল বা কর্মফল দেখবেন। তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তাঁর সাথীদের মধ্যে একটি উত্তম আদর্শ বর্তমান। তিনি তাঁর কওমকে স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছিলেন; আমরা তোমাদের প্রতি এবং আল্লাহকে ছেড়ে যেসব উপাস্যের উপাসনা তোমরা করে থাক তাদের প্রতি সম্পূর্ণরূপে অসন্তষ্ট। আমরা তোমদের অস্বীকার করেছি। আমাদের ও তোমাদের মধ্যে চিরদিনের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে- যতদিন তোমরা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনবে।” ( মুমতাহিনা , ১-৪)। উল্লেখিত আয়াত সমূহ দ্বারা আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আদর্শগত কারণে যারা শত্রুতায় লিপ্ত,তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। আল্লাহর প্রতি ঈমানের অপরিহার্য দাবীই হলো তাগুতের সাথে কুফরী করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *