তাবুক অভিযান, মুসলিম মিল্লাতের অগ্নিপরীক্ষা

নবম হিজরীর গ্রীষ্মকাল। সূর্যের প্রচন্ড তাপে আরবের মরুভূমি উত্তপ্ত। চারিদিকের মাঠ-ঘাট অগ্নিদগ্ধ। দুঃসহ গরমে মানুষ অস্থির। এই প্রচন্ড গরমের উপর মরণ-ঘাতকের ন্যায় দুর্ভিক্ষের হাহাকার। ঘরে অন্ন নেই,রোগের পথ্য নেই,নিদারুণ কষ্টের মাঝে মানুষের দিন কাটছে। মাঠে ফসল পাকার সময় আসন্ন। দুর্ভিক্ষ পীড়িত ভুখা মানুষের ক্লান্ত  চোখে সুখময় ভবিষ্যতের একটু আশা ঐ পাকা ফসলের মাঠকে ঘিরে। ফসল কাটার প্রস্তুতি চলছে ঘরে ঘরে। আর ঠিক এমনি সময় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো যুদ্ধের সংবাদ ভেসে আসলো। রোমানরা মুসলমানদের শেষ করে দেয়ার জন্য যুদ্ধ প্রস্তুতি নিচ্ছে। রোম স¤্রাজ্য তৎকালীন সময়ের পরাশক্তি। অর্ধেক দুনিয়া জুড়ে যাদের শাসন বিস্তৃত। কিছুদিন আগে এরা আরেক পরাশক্তি পারস্য (ইরান) কে আঘাত করেছিল।
রাসূল সা: এ সংবাদ জানতে পেরে সারা দেশের মানুষের প্রতি যুদ্ধের ঘোষণা জারী করলেন। মদীনার বাইরে বিভিন্ন গোত্রকের সংবাদ দেয়া হলো যে,প্রতিটি সামর্থবান ব্যক্তি যেন এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। সর্বস্তরের জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিলে তিলে গড়ে ওঠা ইসলামী রাষ্ট্র ধ্বংস করে পুণরায় আবার জালেম শাহী প্রতিষ্ঠিত হবে,তা কিছুতেই হতে দেয়া যায় না। তাই প্রতিটি সক্ষম ঈমানদারের ওপর এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা ফরয ঘোষণা করা হলো। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অর্থনৈতিক দৈন্যদশা, এ চরম সংকটময় মুহুর্তে একদিকে মানুষের ব্যক্তি জীবন বিপদাপন্ন, অন্যদিকে ইসলাম তেমনি সংকটাপন্ন। কিন্তু মুসলমানদের নিকট ব্যক্তিগত সমস্যার চাইতে দীনের পতাকা সমুন্নত রাখা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আর এ দুঃসময়ের অভিযানের মাধ্যমেই মুনাফিকদের আসল চেহারা প্রকাশিত হবে ।
কেন এই কঠিন যুদ্ধ
সারা পৃথিবী থেকে অন্যায়,অবিচার, যুদ্ধ ও রক্তপাত ইত্যাদি নির্মূলের মাধ্যমে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত মুসলমানদের সংগ্রাম চালু রাখতে হবে। আল্লাহ তা‘য়ালার বাণী, “ তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকো যতক্ষণ না ফিতনা নির্মূল হয়ে যায় এবং দীন একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায়। তারপর যদি তারা বিরত হয় তাহলে জেনে রাখো যালেমদের ছাড়া আর কারো ওপর হস্তক্ষেপ করা বৈধ নয়। বাকারা-১৯৩ আয়াত।  রাসূল সা:এর ঘোষণা, “আমাকে হুকুম দেয়া হয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের সাথে লড়াই করতে,যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা এ স্বাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ সা:আল্লাহর রাসূল। সেই সাথে নামাজ কায়েম করে ও যাকাত দেয়। যদি তারা এরূপ করে তাহলে তাদের জান ও মালের হেফাজতের দায়িত্ব আমার। (বুখারী ও মুসলিম।) সমস্ত মানবজাতিকে একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই দীনের অধিনে আনা এবং ফেতনা বন্ধ করা অসম্ভব এটা সকলেই বুঝে। এ সংগ্রাম চালু থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত । কিন্তু রাসূল সা:তো আর কিয়ামত পর্যন্ত থাকবেন না। তাহলে এ দীনের পতাকা বহনের দায়িত্ব পালন করবে কে? নিশ্চয় এ দায়িত্ব প্রতিটি মুসলমানের । প্রয়োজনে সশস্ত্র যুদ্ধ করতে হলেও এ কালেমার পতাকা সমুন্নত রাখতে এমন একটি জাতি গঠন করতে হবে-যে জাতির অন্যতম প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হবে নির্ভিক,মৃত্যুর কোন ভয় করবে না। তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হবে অটুট। ঐক্য হবে শীষা ঢালা প্রাচীরের ন্যায়। মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী, হারাবার কিছু নেই। উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যের কোনটার অভাব দেখা দিলে কাংখিত সাফল্য আশাকরা যায় না। নিজের সবকিছু বিলিয়ে দেয়ার মাধ্যমে মানবতার শান্তির জন্য সর্বাত্মক ত্যাগ করতে হবে বলেই আল্লাহ তা‘য়ালা এ জাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান ও সর্বশ্রেষ্ঠ পুরষ্কার ঘোষণা করেছেন। পরকালে তাদের কোন হিসেব নেয়া হবে না, কোন প্রশ্ন করা হবে না। এমন কি কবর আযাব তাদের জন্য মওকুফ করা হয়েছে। দেহ থেকে আত্মা বের হওয়ার সাথে সাথেই তাদের সর্বত্তোম জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। আল্লহ তাদেরকে এমন অধিকার দিলেন যে,তারা মরে গেলেও আমরা তদেরকে মৃতু বলতে পারবো না। আল্লাহ তা‘য়ালার এই ঘোষণা থেকেই এ কথা পরিস্কার হয়ে যায় যে,এই দীনের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনটি।
আল্লাহর রাসূলের জীবনীর দিকে নজর দিলেই এ সত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তাঁর এ উম্মাতকে জান-মাল উৎসর্গকারী মৃত্যুভয়হীন মুজাহিদ বাহিনী রূপে গঠন করা ছিলো অন্যতম প্রচেষ্টা। মাত্র তিনশ‘ তের জন মুজাহিদ নিয়ে ইসলামের প্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ বদরের প্রান্ত থেকে শুরু করে পরবর্তী যুদ্ধ গুলোতে মুজাহিদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে তাঁর জীবনের শেষ অভিযান তাবুকে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা দাঁড়ালো ত্রিশ হাজার। প্রথম ও শেষ যুদ্ধের মাঝখানে মুসলিম জাতির নেতা মুহাম্মাদ সা:সাতাশটি যুদ্ধে নিজে নেতৃত্ব দিলেন। কেন তাঁকে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে হলো, কেনইবা তিনি যখম হলেন? এতবড় ঝুকি নেয়ার দরকারইবা হলো কেন। তিনি জানতেন, পৃথিবীতে এ দ্বীন প্রতিষ্ঠার যে দায়িত্ব তাঁকে দেয়া হয়েছে তা তাঁর জীবনে পূর্ণাঙ্গ ভাবে অর্জন করা সম্ভব হবে না। তাঁর অনুপস্থিতিতে যাদের ওপর এ দায়িত্ব ন্যাস্ত থাকবে তাদেরকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরী করে যেতে হবে। তাইতো আমরা দেখতে পাই যে, প্রথম দিকের যুদ্ধ গুলোতে নিজে নেতৃত্ব দেবার পর মাঝে মধ্যে অন্য সাহাবীদেরকেও দায়িত্ব দিতেন। উদ্দেশ্য নেতৃত্বে নতুন নতুন সেনাপতি তৈরী করা। যারা তাঁর এ পৃথিবী থেকে চলে যাবার পর এই সংগ্রাম চালাবার উপযুক্ততার প্রমান দিতে পারে। সারা জীবনের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাধনা করে যে বীরের জাতি তিনি তৈরী করলেন, তাদেরকে তিনি জীবিত থাকতেই দেখে যেতে চান যে, যে কোন বিনিময় হোক এ দীনের পতাকা তারা সমুন্নত রাখতে বদ্ধ পরিকর। তিনি দেখতে চান,নীজ হাতে গড়া এই জাতি সত্যিই আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নতি স্বীকার করবে না। নেতার আনুগত্য করবে, সুন্নাহর অনুসরণ করবে। সেই সাথে ধন-সম্পদ.ব্যবসা-বাণিজ্য, স্ত্রী-পুত্রসহ সমস্ত কিছু বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত থাকবে। দুঃসহ যন্ত্রনা সহ্য করার মত ধৈর্য্য শক্তি এবং শাহাদাতের নজরানা পেশ করার মত প্রবল আকাংখা তাদের হয়েছে কি না। তাই তিনি তৎকালীন পরাশক্তি রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আহবান করলেন। আর এ অভিযান যে অন্যান্য অভিযানের মত ছিলনা তার বেশ কয়েকটা দিকে নজর দিলেই আমরা তা বুঝতে সক্ষম হব।
অন্যান্য অভিযান থেকে তাবুকের অভিযান ছিল ব্যতিক্রম
ক. পরা শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি: রাসূল সা: কোন অভিযানে প্রস্তুতির সময় গন্তব্য কোথায় এবং কাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হবে তা প্রকাশ করতেন না। এটা ছিলো শত্রুকে না জানিয়ে হঠাৎ আক্রমণের কৌশল, যাতে প্রাণ হানী ও রক্তপাত কম হয়। কিন্তু তাবুকের যুদ্ধে স্পষ্ট ঘোষণা করলেন তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি রোমানদের বিরুদ্ধে তাবুকের ময়দানে যুদ্ধ সংঘটিত হবে। স্বল্প সংখ্যক মুসলিম জাতি এতদিন আরবের ভিতরে আরবদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছে। কিন্তু এবার যাদের সাথে যুদ্ধ হবে তারা আরব নয়, রোমান। যাদেরকে আরবরা সবসময় ভয় করে এসেছে। যার প্রমাণ হলো যারা দুর্বলচেতা এবং মুনাফিক ছিলো তারা ভীতি ছড়াতে লাগলো এই বলে যে, এবার আরবরা রোমানদের নিকট পরাজয় বরণ করবে, এটা নিশ্চিত। বিশ্ব নাবী জানতেন যে ভবিষ্যতে তাঁর এই জাতিকে শুধু রোমান নয়,অন্য পরাশক্তি  পারস্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে। সেই সাথে তাঁর ওফাতের পর এ দায়িত্ব যখন মুসলিম উম্মাহর উপর অর্পিত হবে তখন পৃথিবীর অন্যান্য জাতির বিরুদ্ধেও লড়তে হবে।  জাতি মানসিকভাবে সেজন্য কতটুকু প্রস্তুত হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করা দরকার। তাই তিনি এ পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা প্রকাশ্যে বলে দিলেন।
খ. তীব্র গরম ও প্রচন্ড পানির পিপাসা:তাবুক অভিযানের সময় অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশী গরম পড়েছিলো। গরমের মাত্রা এতটাই তীব্র ছিলো যে,মানুষ অস্থির হয়ে একটু ছায়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে যেতো। ঐ অসহ্য গরম ও পানির পিপাসায় কাতর হয়েও জাতি তার কর্তব্য পালনে পিছপা হয় কি না, এটাও ছিলো তাদের জন্য পরীক্ষা।
গ. ফসল তোলার সময়: তাবুক অভিযানের সময়টা এমন ছিলো, যখন মদীনার একমাত্র অর্থকরী ফসল খেজুর পেকেছে। কয়েক দিন পরেই ফসল কাটা শুরু হবে। অনেক কষ্টে চাষ করে, পুঁজি বিনিয়োগ করে বুকভরা আশা নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণছে, ফসল ঘরে আসলে অর্থনৈতিক দৈন্যদশা কিছুটা লাঘব হবে। আর ঠিক এই সময়ই যুদ্ধে যাওয়ার আহবান। দীনের পতাকা সমুন্নত রাখতে এই জাতি পাকা ফসল রেখে আল্লাহর জন্য জান ও মাল উৎসর্গ করতে প্রস্তুত কিনা?
ঘ. যুদ্ধের গন্তব্য অনের দূরে:এতদিন এ জাতি আরবের ভিতরই যুদ্ধ করেছে, বাইরে যায়নি। এবার মক্কার গন্ডী পেরিয়ে বাহিরে গিয়ে যুদ্ধ করতে হবে। উদ্দেশ্য ভবিষ্যতে আল্লাহর দীন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে এ জাতি কতটুকু সক্ষম হবে তার পরীক্ষা নেয়া। আল্লাহ তা‘য়ালার অশেষ মেহের বাণী যে, প্রায় সম্পূর্ণ জাতিই যার যা ছিলো তা নিয়েই কোন কিছুর পরওয়া না করে বের হয়ে পড়লো। এখানেই শেষ নয়, সাহাবীদের বৃহৎ একটি জামায়াত পৃথিবীময় এ দীন কায়েমের লক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়েছেন যারা কোন দিন আর স্বদেশে ফিরে আসেননি।  ব্যতিক্রম যে নেই তা কিন্তু বলা যাবে না। মুষ্টিমেয় কিছু লোক যারা নানা অজুহাত পেশ করে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে যায়নি। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘য়ালার ঘোষণা  এসেছে এভাবে,“ ( হে নবী !) যদি তাড়াতাড়ি অর্থ সম্পদ বা আসবাবপত্র লাভের ব্যবস্থা থাকতো আর সফরও সহজ হতো, তবে তারা অবশ্যই তোমার সাথে যুদ্ধে যেতো। কিন্তু তাদের তো পথের দূরত্ব ও সফর কঠিন মনে হতে লাগলো। এখন তারা আল্লাহর কসম খেয়ে বলবে, যদি আমাদের সাধ্য থাকতো তাহলে অবশ্যই বের হতাম। তারা ( মিথ্যা বলে ) নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংস করছে। আল্লাহ ভালো করেই জানেন তারা মিথ্যাবাদী। ( তাওবা-৪২)। এমনকি যারা মিথ্যা ওযর পেশ করে রাসূল সা: থেকে যুদ্ধে যেতে অব্যহতি চেয়েছিলো, আর রাসূল সা: নিজের স্বভাগত কোমলতা ও উদারতার কারণে তাদেরকে অব্যহতি দিয়েছিলেন, তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সা:কে সতর্ক করলেন এই বলে যে, এ ধরনের উদার নীতি সর্বক্ষেত্রে সংগত নয়। যদি তাদেরকে অব্যহতি দেয়া না হতো এবং শেষ পর্যন্ত তারা যদি যুদ্ধে না যেত, তাহলে তখন তাদের মিথ্যা ঈমানের দাবী জনসম্মুখে প্রকাশ হয়ে যেত। আল্লাহ তা‘য়ালার বাণী, “ ( হে নাবী ! ) আল্লাহ তোমাকে মাফ করুন, তুমি তাদেরকে অব্যহতি দিলে কেন? এভাবে তুমি জানতে পারতে কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী। ( তাওবা-৪৩ ।)
ঙ. সর্বোচ্চ আর্থিক কুরবানী: রাসূল সা: সবাইকে সর্বোচ্চ আর্থিক কুরবানী করার জন্য যার যা সামর্থ আছে সেই মোতাবেক যুদ্ধ তহবিলে জমা দেয়ার আহবান করলেন। এর আগে কোন অভিযানে এমন করে যার যা সামর্থ আছে তা দিয়ে সাহায্য করার আহবান করেন নি। জান ও মালের কুরবানীর মাধ্যমে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে এ জাতি কতখানি সফল তাও আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা:দেখে নিলেন।
চ. যুদ্ধে সক্ষম প্রতিটি নাগরিককে তলব:প্রতিটি নাগরিককে এ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহবান জানালেন। তিনি জানতেন ভবিষ্যতে এ জাতিকে প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে দেশ ত্যাগ করতে হবে পৃথিবীময় মানবজাতির মধ্যে ন্যায়-বিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে। এ দায়িত্ব থেকে কেউ পিছু হটতে পারে না, তার প্রমাণ এই যে, যে তিনজন প্রকৃত মু‘মেন ঐ প্রচন্ড গরমের জন্য যাই যাই করে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নি। আল্লাহ তা‘য়ালা তাদেরকে মুসলিম সমাজ থেকে বহিস্কারের নির্দেশ দিয়ে কঠিন শাস্তির ঘোষণা দিলেন। সেই তিনজনের মধ্যে একজন হেলাল বিন উমাইয়া এতখানি বৃদ্ধ ছিলেন যে,খেদমতের জন্য কেউ না থাকলে তিনি ছিলেন অচল। এজন্য তার খেদমত করতে তার স্ত্রীকে রাসূল সা: এর নিকট থেকে অনুমতি নিতে হয়েছিলো। যদি হেলাল রা: এর মত অতিশয় বৃদ্ধ যুদ্ধে না যাওয়ার কারণে এমন কঠিন শাস্তি পেয়ে থাকেন, তাহলে কে আছে এ উম্মতের মুসলিম দাবীদার যে, জেহাদ না করেই অতি সহজে জান্নাতে প্রবেশ করবে? যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি তাদের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে কি ফয়সালা এসেছে তা জানতে আমরা সূরা তাওবার দিকে নজর দিলেই বুঝতে পারবো। আল্লাহর বাণী, “ তোমরা যখন ফিরে তাদের কাছে পৌঁছবে তখন তারা নানা ধরনের ওযর পেশ করতে থাকবে। কিন্তু তুমি পরিষ্কার বলে দেবে, বাহানাবাজী করো না। আমরা তোমদের কোন কথাই বিশ্বাস করবো না। তোমাদের অবস্থা আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। এখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমাদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করবেন। তারপর তোমাদেরকে তারই দিকে ফিরিয়ে দেয়া হবে, যিনি প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছুই জানেন। আর তোমরা কি কাজ করছিলে তা তিনি তোমাদের জানিয়ে দিবেন। তোমরা ফিরে এলে তারা তোমাদের সামনে কসম খাবে, যাতে তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা করো। ঠিক আছে, তোমরা অবশ্যি তাদেরকে উপেক্ষা করো। কারণ তারা অপবিত্র এবং তাদের আসল আবাস জাহান্নাম। তাদের কৃতকর্মের ফল স্বরূপ এটি তাদের ভাগ্যে জুটবে। তারা তোমাদের সামনে কসম খাবে যাতে তোমরা তদের প্রতি তুষ্ট হও। অথচ তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হলেও আল্লাহ কখনো এই ফাসেকদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন না।” ( তাওবা, ৯৪-৯৬ )। এ অভিযান থেকে ফিরে এসে রাসূল সা:তদন্ত করলেন কে কে যুদ্ধে যায়নি। যারা না গিয়ে বিভিন্ন অজুহাত পেশ করলো রাসূল সা: তাদেরকে ছেড়ে দিলেন। কারণ, আল্লাহ তো বলেই দিয়েছেন যে, তারা অবিত্র, তাদের স্থান জাহান্নামে। তবে যে তিন জন গড়িমসি করে যাননি কিন্তু রাসূল সা:এর নিকট দোষ স্বীকার করেছেন, আল্লাহর নির্দেশে রাসূল সা:তাদেরকে মুসলিম সমাজ থেকে বহিস্কার করলেন। বহুদিন এ কঠিন শাস্তির পর আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ঘোষণা করলেন। এরপর মুসলিম সমাজে তাদেরকে পূর্বের ন্যায় গ্রহণ করে নেয়া হলো। অবরোধ চলাকালীন সময় ইহুদীদের পক্ষ থেকে তাদেরকে অনেক লোভনীয় সুযোগ-সুবিধার প্রস্তাব করা হয়েছিলো। কিন্তু তারা তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে শাস্তি ভোগ করে গেছেন। তাইতো আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করে ক্ষমা ঘোষণা করেছেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *