দু’আ এক মহান ইবাদত

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, যিনি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল ও দাতা। এবং তাঁর জন্য কৃতজ্ঞতা এ জন্য যে, তিনি সব ধরনের নিয়মত দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।
    আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল এবং তাঁর বিশেষ বন্ধু , আর আল্লাহ তাঁর প্রতি শান্তি ও রহমত বর্ষণ করুন এবং তাঁর বরকতপূর্ণ সহচরবৃন্দগণের প্রতিও। কিয়ামতের দিন ও প্রতিদানের দিন পর্যন্ত।
মু’মিন ভাইয়েরা !
       সৃষ্টিকর্তা প্রতিপালক আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কিভাবে স্থাপিত হতে পারে ?  মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে কোনো রকম মুখাপেক্ষী নন । তিনি সকল সৃষ্টিজীব থেকে অমুখাপেক্ষী । সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান । তিনি মহা শক্তির অধিকারী, তাঁর ওপর কেউ বিজয়ী হতে পারে না । আকাশমণ্ডল ও তাবৎ জগতের প্রতিটি বিষয় তাঁর আয়ত্বাধীন । তাই মানুষ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে, তাঁর কাছে নিজের প্রয়োজন প্রার্থনা করতে, বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে সর্বদা তাঁর কাছেই মুখাপেক্ষী। তিনি কারীম-মহান । তাঁর কাছে প্রার্থনা করলে তিনি খুশি হন । তিনি ভালবাসেন মানুষ তাঁর কাছে তাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু চেয়ে নেবে । তিনি তাদের প্রার্থনা কবুল করেন ।
দু’আ অর্থ :- ডাকা, আহ্বান করা, প্রার্থনা করা, দু’আ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, দু’আ হচ্ছে ইবাদত। আর ইবাদত সবগুলিই আল্লাহরই জন্য পালন করতে হবে। দু’আ দুই প্রকার- (১) দু’আ আল-ইবাদাহ, উপাসনামূলক দু’আ। (২) দু’আ আল-মাস্আলাহ, প্রার্থনাকারী নিজের জন্য যা কল্যাণকর তা চাবে এবং যা ক্ষতিকর তা থেকে মুক্তি প্রার্থনা করবে।
       আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমার কাছে প্রার্থনা কর, আমি তোমাদের প্রার্থনা কবুল করব। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত হতে বিমুখ তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে। (আল-মুমিন : ৬০) এ আয়াতে প্রমানিত হল, যারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে না তারা অহংকারী। অতএব প্রার্থনা করলে অহংকার থেকে মুক্ত থাকা যাবে। আর এ আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দুআ অন্যতম ইবাদত। আর এটা পরিহার করা আল্লাহর সঙ্গে অহংকার করার নামান্তর। এ অহংকারের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো অহংকার হতে পারে না। কিভাবে মানুষ আল্লাহর সঙ্গে অহংকার করতে পারে যে আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে সব ধরনের জীবনোপকরণ দিয়েছেন, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান এবং ভাল-মন্দের প্রতিদান দিয়ে থাকেন।
      রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : দু’আ-ই হল ইবাদত। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত  হল দু’আ । রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেন : আল্লাহর কাছে দু’আর
চেয়ে উত্তম কোন ইবাদত নেই। (আবু দাউদ, তিরমিজী ও ইবনু মাজা)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : আর আমার বাšদারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তূত: আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নি:সংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে। (সূরা-বাকারাহ:১৮৬)
মুসলিম ভাইয়েরা !
      রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার চাচাতো ভাই ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে নসীহত করেছিলেন : হে খোকা ! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিক্ষা দেব, আল্লাহকে হেফাজত কর, আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। আল্লাহকে হেফাজত কর, তুমি তাকে সামনে পাবে। যখন প্রার্থনা করবে তখন আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করবে। যখন সাহায্য কামনা করবে তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাবে। জেনে রাখ ! পুরো জাতি যদি তোমাকে উপকার করতে একত্র হয় তবুও তোমার কোন উপকার করতে পারবে না , তবে আল্লাহ তোমার জন্য যা লিখে রেখেছেন। এমনিভাবে পুরো জাতি যদি তোমার ক্ষতি করার জন্য একত্র হয় তবুও তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না, তবে আল্লাহ যা তোমার বিপক্ষে লিখে রেখেছেন। কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে আর দফতর শুকিয়ে গেছে। (তিরমিযী)
দু’আ নিবেদন হতে হবে কেবলই আল্লাহর উদ্দেশ্যে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : যে মানুষকে শুনানোর জন্য কাজ করল আল্লাহ তা মানুষকে শুনিয়ে দিবেন। আর যে মানুষকে দেখানোর জন্য কাজ করল আল্লাহ তা মানুষকে দেখিয়ে দিবেন। ফলে সে আল্লাহর কাছে এর কোন বিনিময় পাবে না। (আবু দাউদ, তিরমিজী ও ইবনু মাজা)
দুআ করার আদবসমূহ : (১) দুআ করার সময় তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে এ দৃঢ় বিশ্বাস রাখা এবং দৃঢ়তার সঙ্গে দুআ করা : যদি আল্লাহ সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান থাকে তাঁর কুদরত, মহত্ত্ব, ওয়াদা পালনের প্রতি ঈমান থাকে তাহলে এ বিষয়টা আয়ত্ব করা সহজ হবে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : তোমাদের কেউ এ রকম বলবে না : হে আল্লাহ আপনি যদি চান তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিন। যদি আপনি চান তাহলে আমাকে অনুগ্রহ করুন। যদি আপনি চান তাহলে আমাকে জীবিকা দান করুন। বরং দৃঢ়তার সঙ্গে প্রার্থনা করবে এবং মনে রাখবে তিনি যা চান তা-ই করেন, তাকে কেউ বাধ্য করতে পারে না। (বুখারী)
(২) বিনয় ও একাগ্রতার সঙ্গে দুআ করা এবং আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ ও তার শাস্তি থেকে বাঁচার প্রবল আগ্রহ নিয়ে দুআ করা : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন : তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের প্রতিপালকের কাছে দুআ করবে। (আল-আরাফ : ৫৫)
(৩) আল্লাহর কাছে অত্যন্ত বিনীতভাবে ধর্না দেয়া এবং নিজের দুর্বলতা, অসহায়ত্ব ও বিপদের কথা আল্লাহর কাছে প্রকাশ করা : দেখুন আইউব আ. কিভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন। আল্লাহ সে সম্পর্কে  বলেন : এবং স্মরণ কর আইউবের কথা, যখন সে তার প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করে বলেছিল, আমি দুঃখ-কষ্টে পড়েছি, আর তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।  (আল-আম্বিয়া : ৮৩)
(৪) দু’আয় আল্লাহর হামদ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ পেশ করা : দুআর শুরুতে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ পড়া দুআ কবুলের সহায়ক।
(৫) আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ ও তাঁর মহৎ গুণাবলি দ্বারা দুআ করা : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন : আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাকে সে সকল নাম দিয়ে প্রার্থনা করবে।  (আল-আরাফ : ১৮০)
(৬) পাপ ও গুনাহ স্বীকার করে প্রার্থনা করা । (৭)  প্রার্থনাকারী নিজের কল্যাণের দুআ করবে নিজের বা কোনো মুসলিমের অনিষ্টের দুআ করবে না : নিজের কল্যাণের জন্য দুআ করলে তা কবুল হওয়ার ওয়াদা আছে আর অকল্যাণ বা পাপ নিয়ে আসতে পারে এমন দুআ করলে তা কবুল হবে না বলে হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
(৮) সৎকাজের অসীলা দিয়ে দুআ করা । (৯) বেশি বেশি করে ও বার বার দুআ প্রার্থনা করা : যেমন হাদীসে এসেছে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : তোমাদের কেউ যখন দুআ করে সে যেন বেশি করে দুআ করে কেননা সে তার প্রভুর কাছে প্রার্থনা করছে।
(১০) সুখে দুঃখে সর্বাবস্থায় দুআ করা । (১১) দুআর বাক্য তিনবার করে উচ্চারণ করা : দুআর বাক্য তিনবার করে উচ্চারণ করলে প্রার্থনাকারীর মনোযোগ ও একাগ্রতা বেশি হয় যা দুআ কবুলে সহায়ক হয়।
(১২) দুআয় উচ্চস্বর পরিহার করা । অনেক মানুষকে দেখা যায় তারা দুআ করার সময় স্বর উচু করেন বা চিৎকার করে দুআ করেন। এটা দুআর আদবের পরিপন্থী। (১৩) দুআ- প্রার্থনার পূর্বে অযু করা
(১৪) দুআয় দুহাত উত্তোলন করা : যেমন হাদীসে এসেছে ইবনু উমার রা. বলেন : নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুহাত তুললেন এবং বললেন, হে আল্লাহ! খালেদ যা করেছে আমি সে ব্যাপারে তোমার কাছে দায়িত্বমুক্ত।’ দুবার বললেন। (বুখারী) (১৫) কিবলামুখী হওয়া  দুআর সময় কিবলামুখী হওয়া মুস্তাহাব। যেমন হাদীসে এসেছে : আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার দিকে মুখ করলেন এবং কতিপয় কুরাইশ নেতাদের বিরুদ্ধে দ’ুআ করলেন। (বুখারী ও মুসলিম)
মু’মিন ভাইয়েরা !
       যখন স্পষ্ট হল যে, দ’ুআ-ই সর্বোত্তম ইবাদত ও সর্বশ্রেষ্ঠ আনুগত্য এবং যা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই নিবেদন করা মানুষের জন্য কর্তব্য। হোক তা প্রার্থনা অথবা আশ্রয় চাওয়া কিংবা বিপদ-মুক্তি, তা আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো কাছে পেশ করা বৈধ নয়। যে সকল বিষয় মানুষ সাহায্য করতে সামর্থ রাখে শুধু সে সকল বিষয় মানুষের কাছে চাওয়া বৈধ। আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করা যাবে না হোক নবী বা অলী বা পীর বা গাউস-কুতুব অথবা ফিরিশ্তা বা জিন এক কথায় কোনো সৃষ্টিজীবের কাছে দুআ করা যাবে না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকবে না, যা তোমার উপকার করে না, অপকারও করতে পারে না। কারণ এরূপ করলে তুমি অবশ্যই জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এবং আল্লাহ তোমাকে ক্লেশ দিলে তিনি ব্যতীত তা মোচনকারী আর কেউ নেই এবং আল্লাহ যদি মঙ্গল চান তবে তার অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি মঙ্গল দান করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (ইউনুস:১০৬-১০৭)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা কিয়ামত দিবস পর্যন্তও উহাকে সাড়া দেবে না ? এবং এগুলো তাদের প্রার্থনা সম্পর্কেও অবহিত নয়। যখন কিয়ামতের দিন মানুষকে একত্র করা হবে তখন এগুলো হবে তাদের শত্রু এবং এগুলো তাদের ইবাদত অস্বীকার করবে। (আল-আহকাফ : ৫-৬) 
               আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথের হিদায়াত দান করুন। আমীন

মহা গন্থ আল কোরআন একটি মুজেজা

 

(আল-কোরআন: একটি মহা মুজিযা ) (সর্ব যুগের সর্ব শ্রেষ্ট মুজিযা হলো আল- কোরআন)

সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার এবং  দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর এবং তার পরিবার বর্গ ও সাহাবীগণের উপর।

আমাদের সকলের জানা থাকা উচিৎ যে, মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে সত্যায়ন , সমর্থনকারী ও অসংখ্য মুজিযা দান করেছেন। সেগুলো তাঁর নবুওয়তকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে।

আরবি পরিভাষায় মুজিযা বলা হয়, প্রতিদদ্বিতা ও চ্যালেঞ্জের সময় প্রতিপক্ষ যার উত্তর দিতে অপারগ হয়ে যায়।(কামূসুল মুহিত)।

মুজিযা এমন এক আশ্চর্যজনক জিনিস, যা সকল মানুষ সম্মিলিতভাবে কিংবা আলাদা আলাদা ভাবে চেষ্টা করলেও তার মত আরেকটি জিনিস বানাতে সক্ষম হয় না, আল্লাহ তাআলা নবুওয়তের জন্য যাকে নির্বাচন করেন কেবল তাকেই তা দান করেন। যাতে সেটি তাঁর নবুওয়তের দলিল হয় এবং রিসালাতের সঠিকত্ব প্রমাণিত হয়।

মহা গ্রন্থ আল-কোরআন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উপর আল্লাহ তাআলার নাযিলকৃত কালাম। এটিই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ মুজিযা যা সদা সর্বত্র বিদ্যমান, পূর্বের এবং কিয়ামত পর্যন্ত আগত পরের সব সময়ের জন্য  এ মুজিযা বিদ্যমান থাকবে।(মানাহিলুল ইরফান ফি উলুমিল কোরআন ২২/১)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

প্রত্যেক নবীকেই তার মত করে কোন না কোন মুজিযা দেয়া হয়েছে, তার উপর লোকেরা ঈমান এনেছে। আর আমাকে যা দেয়া হয়েছে তা হল ওহী, আল্লাহ তাআলা আমার উপর প্রত্যাদেশ দিয়েছেন। আমি আশা করি কেয়ামতের দিন তাদের চেয়ে আমার অনুসারী বেশি হবে।(বুখারি)

এই হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য এই নয় যে কোরআনের মধ্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মুজিযা সীমাবদ্ধ।           এটাও উদ্দেশ্য নয় যে, তাকে এমন কোন মুজিযা দেয়া হয়নি যা র্স্পস করা যায়। বরং উদ্দেশ্য হল কোরআনুল কারিম এমন এক অভিনব মুজিযা যা কেবল তাকেই দেয়া হয়েছে আর কাউকে দেয়া হয়নি। কেননা প্রত্যেক নবীকে এমন মুজিযা দেয়া হয়েছিল যা শুধু তার সাথেই খাছ ছিল, তার মাধ্যমে যাদের নিকট তাকে পাঠানো হয়েছিল তাদেরকেই শুধু চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল।  প্রত্যেক নবীর মুজিযা তার জাতির অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। এ কারণে মূসা আ.-এর কওমের মধ্যে যখন যাদু বিদ্যা ছড়িয়ে পড়েছিল তখন তিনি তাদের নিকট লাঠি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন এবং লাঠির মাধ্যমে তাই বানাতে লাগলেন, তারা যাদু দিয়ে যা বানাত। কিন্তু মূসা আ.-এর যাদু তারা যা বানাল তা খেয়ে ফেলল। অর্থাৎ তার যাদু হুবহু তাদের যাদুর মত হল না।

যখন চিকিৎসা বিদ্যা খুবই উন্নতি লাভ করল, তখন ঈসা আ. আবির্ভূত হলেন এমন চিকিৎসা বিদ্যা নিয়ে যা দেখে সে সময়ের সকল চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা হতভম্ব হয়ে গেল। কারণ তিনি দেখালেন তার বিদ্য দিয়ে তিনি মৃতকে জীবিত করতে পরছেন, কুষ্ঠ ও বধির রুগীকে সুস্থ করেত পারছেন।

আর কাজগুলোর ধরন তাদের কাজের মতই ছিল কিন্তু তাদের ক্ষমতা ঈসার আ.-এর ক্ষমতার মত শক্তিশালী ও কার্যকর ছিল না।

আরবের লোকেরা যখন ভাষার অলংকারের উচ্চ শিখরে পৌঁছে গেল তখন আল্লাহ তাআলা আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মুজেযাস্বরূপ এমন কোরআন দিলেন, যার প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ বলছেন,  

বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না, না সামনে থেকে, না পেছন থেকে। এটি প্রজ্ঞাময়, সপ্রশংসিতের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। (সূরা হা-মীম আস্ সাজদাহ ৪২ আয়াত)

 

কিন্তু কোরআন বিষয়ক মুজিযা অন্য সমস্ত মুজিযা থেকে আলাদা। এটি চলমান দলিল যুগ যুগ ধরে আবহমান থাকবে। অন্যান্য নবীদের প্রমাণাদি তাদের যুগ শেষ হওয়ার সাথে সাথে শেষ হয়ে গেছে। সে সম্পর্কে শুধু সংবাদই জানা যায় বাস্তবে অবশিষ্ট তার কিছুই নেই। আর কোরআন এখনো প্রমাণ হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে শ্রোতা যেন এখনো নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা মের মুখ থেকে শুনছে। আর চলমান থাকার কারণে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আমি আশা করি কেয়ামতের দিন সকলের চেয়ে আমার অনুসারী বেশি হবে। (বিদায়া নিহায়া ২/৬৯)

কুরআনুল কারিম স্পষ্ট দলিল, এটি অনেক দিক দিয়ে মুজিযা: যেমন, শাব্দিক দিক দিয়ে। গাথুনির দিক দিয়ে। বালাগাতের দিক দিয়ে অর্থাৎ শব্দ তার ব্যাপক অর্থের উপর দালালাত করার দিক দিয়ে। ঐ সমস্ত অর্থের দিক দিয়েও মুজিযা যার নির্দেশ আল্লাহ তাআলা করেছেন। এবং সেসব অর্থের বিবেচনায়ও যা দ্বারা আল্লাহ তাআলা, তাঁর নাম ও গুণ সম্পর্কে সংবাদ দেয়া হয়েছে।

কোরআনের অলৌকিকত্বের আরও আছে তার ভাষার অলংকার, বর্ণনা ভঙ্গি ও বাক্য গঠন প্রণালী। সমস্ত মানুষ ও জিনকে এসব বিষয় দ্বারা চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে কিন্তু তারা এর মত রচনা করতে অপারগ হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

বল, যদি মানুষ ও জিন এ কোরআনের অনুরূপ আর একটি কোরআন তৈরি  করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ একটি কোরআন হাজির করতে পারেব না যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়। (  বানী ইসরাইল,৮৮)

أَ

তারা কি বলে, সে এটা বানিয়ে বলছে? বরং তারা ঈমান আনে না। অতএব, তারা যদি সত্যবাদী হয় তবে তার অনুরূপ বানিয়ে নিয়ে আসুক। (আত-তুর,৩৩-৩৪)

এই চ্যালেঞ্জের পর অনেক দিন অতিবাহিত হয়েছে তারা কেউ এগিয়ে আসেনি, তাদের রশি আরো ঢিল করে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা এর মত দশটি সূরা নিয়ে আসো,

নাকি তারা বলে, সে এটা রটনা করেছে? বল, তাহলে তোমরা এর অনুরূপ দশটি সূরা বানিয়ে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে আন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (সূরা হুদ ১৩)

 

তারা অপারগ হল আল্লাাহ তাআলা তাদের রশি আরও ঢিল করে দিয়ে বললেন:

নাকি তারা বলে, সে তা বানিয়েছে? বল, তবে তার মত একটি সূরা বানিয়ে নিয়ে আস এবং আল্লাাহ  ছাড়া যাকে পার ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। ( ইউনুস,৩৮)

 

মদিনায় হিজরতের পর আল্লাাহ তাআলা তাদেরকে আবার চ্যালেঞ্জ করলেন:  

আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাক, তবে তোমরা তার  মত একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাাহ  ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাক; যদি তোমরা সত্যবাদী হও। অতএব যদি তোমরা তা না কর-আর কখোনা তোমরা  তা করবে না-তাহলে আগুনকে ভয় কর যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফেরদের জন্য। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৩-২৪)

আল্লাাহ  তাআলার কথা : তোমরা অতীতে পারনি এবং ভবিষ্যতেও কখনো পারবে না, এর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ প্রমাণিত হয়ে গেছে। তারা পারবে না কুরআনের সূরার মত একটি সূরা বানিয়ে আনতে পরবর্তী যুগেও। যেমন ইতিপূর্বে এর সংবাদ দেয়া হয়েছে, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  তাদেরকে বলেছিলেন যখন তিনি মক্কায় ছিলেন,

বল, যদি মানুষ ও জিন এ কোরআনের অনুরূপ কোরআন হাজির করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ একটি কোরআন হাজির করতে পারবে না যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয় । ( বানী ইসরাইল, ৮৮)

আল্লাাহ  তাআলা রাসূলকে সাধারণভাবে নির্দেশ করার কারণে তাঁর মাধ্যমে সমস্ত সৃষ্টিজীবকে সুযোগ দেয়া হয়েছিল। সেখানে তাদের অপারগতার কথা বলা হয়েছে এই বলে যে, এ কাজে তারা সকলে যদি একত্রিতও হয় এবং পরস্পর সাহায্য সহযোগিতা করে তা সত্ত্বেও তারা পারবে না। এই চ্যালেঞ্জ সমস্ত সৃষ্টির জন্য। যারা কুরআন শুনেছে ও বুঝেছে চাই বিশেষ লোক হোক বা সাধারণ লোক, রাসূলের নবুওয়ত লাভের দিন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কেউ একটি মাত্র সূরাও তার মত বানিয়ে নিয়ে আসতে পারেনি।

পবিত্র কোরআনে হাজার হাজার মুজিযা রয়েছে। কেননা, তার সূরার সংখ্যা ১১৪টি। চ্যালেঞ্জতো দেয়া হয়েছে একটি সূরা দিয়ে। তার সবচেয়ে ছোট সূরা হল, সূরা আল কাউসার। যার আয়াত সংখ্যা মাত্র তিনটি, আয়াত তিনটিও অতি ছোট বটে। ছোট বড় মিলে কোরআনের আয়াত সংখ্যা মোট ছয় হাজার দুইশটি বা মতাত্তরে আরো কম বেশি হয়। এই হিসাবে চ্যালেঞ্জ গণনা করলে কত হবে একবার চিন্তা করে দেখুন। এ জন্য কোরআনুল কারিম অন্য সমস্ত মুজিযা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যে ব্যক্তি অন্তরচক্ষু দিয়ে দেখবে এবং ভাল করে শুনবে তার কাছে এ বিষয়টি দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যাবে।

আল-কোরআন মুজেযা হওয়ার এটিও একটি দিক যে, এর মধ্যে অনেক অদৃশ্য-গায়েবের কথা আছে যার জ্ঞান মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছিল না। আর তাঁর মত মানুষের এগুলো জানারও কোন রাস্তা ছিল না। এটাই প্রমাণ করে যে তা আল্লাাহ তাআলার বাণী, বিষয়টি কারো নিকটই অস্পষ্ট নয়। আল্লাাহ তাআলা বলেন:

আর তাঁর কাছে রয়েছে গায়েবের চাবিসমূহ, তিনি ছাড়া এ বিষয়ে কেউ জানে না এবং তিনি অবগত রয়েছেন স্থলে ও সমুদ্রে যা কিছু আছে। আর কোন পাতা ঝরে না, কিন্তু তিনি তা জানেন এবং যমিনের অন্ধকারে কোন দানা পড়ে না, না কোন ভিজা এবং না কোন শুস্ক; কিন্তু রয়েছে সুস্পষ্ট কিতাবে। ( আনআম, ৫৯)

গায়েব সম্পর্কে সংবাদের অনেকগুলো প্রকার রয়েছে:

অতীতের অদৃশ্য সংবাদ, যা সুন্দর সুন্দর ঘটনাবলীর মধ্যে ফুটে উঠেছে। আল্লাাহ  অতীত সম্পর্কে রাসূলকে সংবাদ দিয়েছেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্তমানকালীন অদৃশ্যের সংবাদ: যেমন, মুনাফিকদের ভেতরগত অবস্থা, এ সম্বন্ধে আল্লাাহ তাআলা স্বীয় রাসূলকে অবগত করতেন। সেসব ভুলচুক মুসলমানগণ মাঝে-মধ্যে যাতে জড়িয়ে যেতেন আর মহান আল্লাাহ সে বিষয়ে রাসূলকে জানিয়ে দিতেন। এছাড়া আরো অনেক বিষয় যা আল্লাাহ ছাড়া আর কেউ জানতেন না, তিনি সেসব বিষয়ে রাসূলকে অবগত করতেন।

গায়েবের আরেকটি দিক, ভবিষ্যতে সংঘটিতব্য অদৃশ্য বিষয়াবলীর সংবাদ। আল্লাাহ তাআলা সেসব বিষয়াদি সম্বন্ধেও তাঁর রাসূলকে জানিয়ে দিতেন। তিনি যেভাবে সংবাদ দিতেন পরে তা সেভাবে সঙ্ঘটিত হত। এই বিষয়গুলো এ কথারই প্রমাণ বহন করে যে, পবিত্র কুরআন আল্লাাহ তাআলার কালাম, আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল।

কুরআনুল কারিমের অলৌকিকত্বের মধ্যে শরিয়তের বিধান বিষয়ক অলৌকিকত্বও আছে: কোরআনুল কারিম পরিপূর্ণ হেদায়েত ও দিক-নির্দেশনা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। সর্ব যুগের সর্বস্থানে সকল শ্রেণীর মানুষের সকল প্রয়োজন পূরণ করার যাবতীয় দিক নির্দেশনা রয়েছে তাতে। কেননা, যিনি অবতীর্ণ করেছেন তিনি মানবকুলের যাবতীয় প্রয়োজন, সমস্যা ও তার সমাধান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। তিনি সকলের সৃষ্টিকর্তা, তাদের সুবিধা-অসুবিধা, কিসে তাদের কল্যাণ আর কিসে অকল্যাণ সে বিষয়ে পরিপূর্ণরুপে জানেন। সুতরাং যখন কোনো বিধান তাঁর পক্ষ থেকে এসেছে তা পূর্ণ প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এসেছে।

আল্লাাহ তাআলা বলেন:

যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি অতি সূক্ষ্মদর্শী, পূর্ণ অবহিত। (সূরা মুলক ১৪ আয়াত)

মানব প্রণীত আইন কানুনের দিকে দৃষ্টি দিলে এ বিষয়টি আরো বেশী স্পষ্ট হয়ে যায়। সে আইন কানুন মানুষের সমস্যার সমাধান করতে পারে না এবং সর্ব যুগে বা স্থানে চলে না। যার কারণে তার প্রণয়নকারীরা সব সময় তার মধ্যে পরিবর্তন পরিবর্ধন ও বাড়াতে কমাতে থাকে। গতকালের বানানো আইন আজ অচল, আজকের প্রণীতটি আগামীকাল অকেজো এ হচ্ছে মানব রচিত আইনের অবস্থা। তার কারণ মানুষের মধ্যে ভুল-ত্রুটি-অজ্ঞতা রয়েছে, তারা জানেনা কাল পৃথিবীর মধ্যে কি পরিবর্তন আসবে, কোথায় কোন কোন জিনিস তাদের উপযোগী হবে। আর কোন কোনটি অনুপযোগী হবে।

আর এটাই হল মানুষের অপারগ হওয়ার প্রকাশ্য দলিল, তারা এমন অইন বানাতে পারে না যা সকল মানুষের জন্য উপযোগী ও প্রযোজ্য হবে এবং তাদের স্বভাব-চরিত্রকে শুধরাবে। অপর দিকে পবিত্র কোরআন সর্ব প্রকার ত্রুটি থেকে মুক্ত, মানুষের স্বার্থ রক্ষার জিম্মাদার।  তাদেরকে ইহকাল ও পরকালের যুগপৎ কল্যাণের দিকেই পথ প্রদর্শন করে। মানুষ যদি সর্বতে¦াভাবে কোরআনকে আঁকড়ে ধরে এবং কোরআনের হেদায়েতের উপর চলে তাহলে তাদের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ সুনিশ্চিত।

আল্লাাহ তাআলা বলেন:

নিশ্চয় এ কুরআন এমন একটি পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল এবং যে মুমিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার। ( বনী ইসরাইল ৯ )

মোট কথা আল্লাাহ তাআলার কিতাব যেসব শরয়ি বিধি-বিধান দিয়েছে, তার ভিত্তি তিনটি উপকরণের উপর:

প্রথম উপকরণ, ছয়টি জিনিসের উপর থেকে অনিষ্ট দূর করা: সত্বা, জ্ঞান, ধর্ম, বংশ, সম্মান, সম্পদ হিফাযত করা।

দ্বিতীয় উপকরণ, উপকার খুঁজে বের করা। কোরআনুল কারিম সব কিছু থেকে উপকার বের করে আনার দরজা খোলা রেখেছে আর ঐ সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে যা ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়।

তৃতীয় উপকরণ, উত্তম চরিত্রের উপর চলা এবং ভাল অভ্যাস গড়ে তোলা।

কোরআনুল কারিম ঐ সমস্ত আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান করেছে যা সমস্ত মানুষ করতে অপারগ হয়েছে।

দুনিয়া ও আখেরাতে মানুষের প্রয়োজন হবে আর কোরআন তার জন্য নিয়ম-নীতি বলেনি এমনটি কোনো ক্ষেত্রেই হয়নি। বরং আল কোরআন মানুষের জন্য সেসব প্রয়োজনের সবচেয়ে উপযোগী ও সর্বাধিক সুন্দর পদ্ধতি বলে দিয়েছে।

কোরআনের অলৌকিকত্বের মধ্যে বর্তমান যুগের আধুনিক বিজ্ঞানের অলৌকিকত্বও রয়েছে। মহান আল্লাাহ বলেন,

বিশ্বজগতে ও তাদের নিজেদের মধ্যে আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাব যাতে তদের কাছে সুস্পষ্ট হয় যে এটি (কোরআন) সত্য; তোমার রবের জন্য এটাই যথেষ্ট নয় কি যে, তিনি সকল বিষয়ে সাক্ষী? (সূরা হা-মীম আস সাজদা আয়াত: ৫৩)।

অনেক পরে এসে আমাদের রবের পক্ষ থেকে এ অঙ্গীকারও পূর্ণ হয়েছে, মানুষ সৃষ্টি জীবের মধ্যে সূক্ষ্ম যন্ত্র দ্বারা আল্লাাহর নিদর্শন দেখতে পেরেছে। যেমন উড়োজাহাজ, সাবমেরিন ইত্যাদি সূক্ষ্ম যন্ত্র, যেগুলোর মালিক হয়েছে মানুষ মাত্র কিছুদিন আগে।

এ সমস্ত অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে ১৪৩০ বছর পূর্বে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কে সংবাদ দিয়েছিল? তা হলো  আল-কোরআন আল্লাাহ হর কালাম এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লহর সত্য রাসূল এটা তার প্রকৃষ্ট দলিল। আর এই বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব প্রমাণিত হয়েছে পৃথিবীতে, আকাশে, সমুদ্রে, মানুষের মধ্যে, জিব-জন্তুতে, বৃক্ষ তরুলতাতে পোকা মাকড় ইত্যাদিতে। সব উদাহরণ দিতে গেলে এখানে জায়গা সংকুলান হবে না।

সর্বশেষ কোরআনের সেই বিখ্যাত আয়াতকে স্মরণ করেই লেখার ইতি টানছি যাতে মহান আল্লাহ দাবি করে বলেছেন, জিন-ইনসান সকলে মিলে চেষ্টা করলেও এই কোরআনের মত অনুরূপ একটা কোরআন বানাতে পারবে না।

ইরশাদ হচ্ছে:- বল, যদি মানুষ ও জিন এ কোরআনের অনুরূপ একটি কোরআন হাজির করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপকোরআন হাজির করতে পারেব না যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়। ( বনী ইসরাইল, ৮৮)

আল-কুরআনের চরিত্র ধারণ করা প্রসঙ্গে

সমস্ত প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। আমরা তার প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করি। আমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রবৃত্তিজাত অনিষ্ট ও কর্মের কুপ্রভাব হতে আশ্রয় চাই। আল্লাহ তা’আলা যাকে হেদায়েত দান করেন, তার কোন ভ্রষ্টকারী নেই। আর যাকে তিনি ভ্রষ্ট করেন, তার কোন হেদায়েতকারী নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, ও একক, তার কোন শরীক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল।
হে আল্লাহ ! সালাত, সালাম ও বরকত অবতীর্ণ করুন তার উপর, তার বংশধর ও সাহাবাদের উপর, এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার পথে ধাবিত হবে ও তার আদর্শের অনুসরণ করবে তাদের উপর।
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন :- হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্ঝা করে থাক এবং আতœীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবল¤¦ন কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। (সূরা নিসা-১)
আল্লাহ রাব্বুল ইয্যত আরো ইরশাদ করেন :- অতঃপর আল্লাহ্ যাকে পথ-প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্যে উম্মুক্ত করে দেন এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে সংকীর্ণ অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন-যেন সে সবেগে আকাশে আরোহণ করছে। এমনি ভাবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না। আল্লাহ্ তাদের উপর আযাব বর্ষন করেন। (সূরা আন’আম-১২৫)
আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা আল-ইমরান-১০২) মুসলিম ভাইয়েরা !
পবিত্র কুরআন শাশ্বত, তার বাণী চিরন্তন এবং এটি সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ মূ‘জেযা। এ কুরআন দিয়েই সর্ব শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রেরণ করা হয়েছে, শক্তিশালী করা হয়েছে তার নবুয়তকে। এ কুরআনই হচ্ছে তার ধর্মের প্রথম প্রমাণ। বর্তমান বৈজ্ঞানিক যুগে মানুষ তার মধ্য থেকে নতুন নতুন অনেক তত্ত্ব ও উপাত্ত আবিষ্কার করছে, যা তার নবুয়তের সত্যতার অকাট্য প্রমাণ। কী সাহিত্যের উপাদান, কী সামাজিক নীতি ও আদর্শ, কী চমৎকার নীতি ও সুন্দর চরিত্র, কী রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা, এ কুরআনের মধ্যেই সব কিছু রয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যান্ত ব্যাপক অর্থবহ শব্দে উত্তর দিলেন : নিশ্চয় তোমাদের নবীর চরিত্র সম্পূর্ণ কুরআন। (সহীহ মুসলিম) কুরআনুল করীমের শিষ্টাচার ধারণ করা প্রত্যেক ঈমানদারদের একান্ত প্রয়োজন। মানুষের জীবনাচরণ ও চিন্তাধারায় যে ভাব পরিলক্ষিত হয়, তা-ই চরিত্র। চরিত্র মানুষের মহার্ঘতম বস্তু। শ্রেষ্ঠতম অলঙ্কার। চরিত্র মানুষকে ন্যায়, সত্য, সংযম ও শ্রদ্ধাবোধ শিক্ষা দেয় এবং সৎ পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে। মূলতঃ চরিত্র বলতে মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছুকেই বোঝায়। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। এ শ্রেষ্ঠত¦ সে তার চরিত্র দিয়ে অর্জন করে নেয়। চরিত্রই হলো তার প্রকৃত বা আসল পরিচয়। তবে সৎ চরিত্রকে মানুষের অর্জন করতে হয়। আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনাচরণকে চরিত্র গঠনের সঠিক নমুনা হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :- চারিত্রিক সৌন্দর্য ও গুণাবলীর পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের জন্য আমি প্রেরিত হয়েছি। মানুষের চারিত্রিক পবিত্রতা অর্জন করার ব্যাপারই ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য। গোটা বিশ্বের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা ও কাজ দ্বারা উন্নত ও উত্তম চরিত্রের এক নমুনা তুলে ধরেছেন। জীবনের সব ক্ষেত্রে তাঁর বাস্তব জীবনের গুণাবলীকে আঁকড়ে থাকার উপদেশ দান করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন :- যারা আল্লাহ্র কিতাব পাঠ করে, নামায কায়েম করে, এবং আমি যা দিয়েছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসা আশা কর, যাতে কখনও লোকসান হবে না। পরিণামে তাদেরকে আল্লাহ্ তাদের সওয়াব পুরোপুরি দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও বেশী দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী। (সূরা ফাতির-২৯/৩০) আল-কুরআনের চরিত্র হলো, সত্যন্যায়কে অবলম্বন করা, ভাল আচরণ, শ্রেষ্ট স্বভাব, চমৎকার নীতি, সুন্দর চরিত্র ধারণ করা, যার মধ্যে রয়েছে সহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, ধীর-স্থিরতা, দানশীলতা, বদান্যতা, ক্ষমা, মার্জনা, দয়া, নম্রতা, ধৈর্য, স্থিতিশীলতা, অবিচলতা, ন্যায়-পরায়ণতা, ইনসাফ, সত্যবাদিতা, সুন্দর ব্যবহার,প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা, অঙ্গীকার পালন করা, আত্মত্যাগ, করুণা, মমতাবোধ, মনুষ্যত্ব বোধ, সাহসিকতা, আমানতদারী, ঐকান্তিকতা, এগুলো যা উল্লেখ করা হলো তা সুন্দর চরিত্র নামে আখ্যায়িত। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আল্লাহ্ উত্তম বাণী তথা কিতাব নাযিল করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ, পূনঃ পূনঃ পঠিত। এতে তাদের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে চামড়ার উপর, যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে, এরপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহ্র স¥রণে বিনম্র হয়। এটাই আল্লাহ্র পথ নির্দেশ, এর মাধ্যমে আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ্ যাকে গোমরাহ করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই। (সূরা যুমার-২৩)
ঈমানদার ভাইয়েরা !
মানব চরিত্রের স্বরূপ উন্মোচন ঃ পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে মানুষের ¯¦ভাব চরিত্র সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে। যেমন এক আয়াতে কুরআন বলছে : যখন মানুষ কোনো বিপদ-মসিবতে নিমজ্জিত হয় তখন সে দাঁড়িয়ে, শুয়ে, বসে এবং সর্বাবস্থায় আমাকে ডাকতে থাকে। (সূরা ইউনূস-১২)। অন্যত্র পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এক দল লোক সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে : আর যখন তাদের বলা হয়, তোমরা পৃথিবীতে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করো না। তারা বলে আমরা তো সংস্কার কাজ করছি। জেনে রাখো, প্রকৃতপক্ষে তারাই বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। (সূরা বাকারা-১১)
জ্ঞান সাধনা ও সত্যানুসন্ধানে কুরআনের আহ্বান ঃ পৃথিবীতে উন্নতি সাধন এবং জীবনকে সার্থক ও ফলপ্রসূ করার নিমিত্তে পবিত্র কুরআন গোটা বিশ্ব মানবতাকে জ্ঞান সাধনা এবং সত্যানুসন্ধানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মানবজীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে। বস্তুত কুরআনের প্রথম নির্দেশনাই হলো জ্ঞান আহরণ সম্পর্কিত। কুরআন বলছে : পড়ো তোমার পালনকর্তার নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে। (সূরা আলাক-১/৩) পবিত্র কুরআন এমন এক গ্রন্থ, যা মানবজাতির সব জিজ্ঞাসার অবসান ঘটিয়েছে। মানুষের জীবন সম্পর্কে কুরআনের বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি ও পথনির্দেশনা মানবজাতিকে একটি সুনির্ধারিত জীবন পদ্ধতি অবলম্বনে উৎসাহিত করেছে। যে জীবন পথের যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে মানবতা মুক্তি এবং শান্তির পথে পরিচালিত হতে পারে। মানবজীবনের সব সমস্যার সমাধান পবিত্র কুরআনে প্রদান করা হয়েছে। তাই মানবজীবনকে সার্থক ও সাফল্যমণ্ডিত করতে হলে কুরআনের দিকনির্দেশনা অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন :- যখন আমি একদল জ্বিনকে আপনার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম, তারা কুরআন পাঠ শুনছিল। তারা যখন কুরআন পাঠের জায়গায় উপস্থিত হল, তখন পর¯পর বলল, চুপ থাক। অতঃপর যখন পাঠ সমাপ্ত হল, তখন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সতর্ককারীরূপে ফিরে গেল। তারা বলল, হে আমাদের সম্প্রদায়, আমরা এমন এক কিতাব শুনেছি, যা মূসা (আঃ)-এর পর অবর্তীণ হয়েছে। এ কিতাব পূর্ববর্তী সব কিতাবের প্রত্যায়ন করে, সত্যধর্ম ও সরল পথের দিকে পরিচালিত করে। (সূরা আহকাফ-২৯/৩০) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম : আব্দুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধি প্রধানকে (যার উপাধি ছিল আশাজ্জ) সম্বোধন করে বলেছিলেন : নিঃসন্দেহে তোমার মধ্যে এমন দু’টি প্রশংসনীয় সৌন্দর্য বিদ্যমান, যা আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়। একটি হলো ব্যক্তিত্ব, আর দ্বিতীয়টি হলো শিষ্টাচার। আমরা যদি সুন্দর জীবনযাপন করতে চাই, তাহলে আমাদের উচিত চরিত্র ঠিক রাখার সাধনা করা। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। তাই মানুষের চরিত্র মানুষের মতোই হওয়া উচিত। চরিত্রহীন মানুষ পশুর সমান। চরিত্র গঠনের গুরুত্ব এতই ব্যাপক যে, জীবনের যাবতীয় সফলতার পূর্বশর্ত হিসেবেই একে বিবেচনা করা যায়। ব্যক্তিগত জীবনে সুখী-সফল, আত্মপ্রত্যয়ী এবং জয়ী হওয়ার জন্য চরিত্রের প্রয়োজন। হে মানবকুল, তোমাদের কাছে উপদেশবানী এসেছে তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে এবং অন্তরের রোগের নিরাময়, হেদায়েত ও রহমত মুসলমানদের জন্য। বল, আল্লাহ্র দয়া ও মেহেরবাণীতে। সুতরাং এরই প্রতি তাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ। এটিই উত্তম সে সমুদয় থেকে যা সঞ্চয় করছ। (সূরা ইফনুস-৫৭/৫৮)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আমাদের সবাইকে আল-কুরআনের চরিত্র ধারণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন ….