আল-কুরআনের চরিত্র ধারণ করা প্রসঙ্গে

সমস্ত প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। আমরা তার প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করি। আমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রবৃত্তিজাত অনিষ্ট ও কর্মের কুপ্রভাব হতে আশ্রয় চাই। আল্লাহ তা’আলা যাকে হেদায়েত দান করেন, তার কোন ভ্রষ্টকারী নেই। আর যাকে তিনি ভ্রষ্ট করেন, তার কোন হেদায়েতকারী নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, ও একক, তার কোন শরীক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল।
হে আল্লাহ ! সালাত, সালাম ও বরকত অবতীর্ণ করুন তার উপর, তার বংশধর ও সাহাবাদের উপর, এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার পথে ধাবিত হবে ও তার আদর্শের অনুসরণ করবে তাদের উপর।
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন :- হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্ঝা করে থাক এবং আতœীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবল¤¦ন কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। (সূরা নিসা-১)
আল্লাহ রাব্বুল ইয্যত আরো ইরশাদ করেন :- অতঃপর আল্লাহ্ যাকে পথ-প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্যে উম্মুক্ত করে দেন এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে সংকীর্ণ অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন-যেন সে সবেগে আকাশে আরোহণ করছে। এমনি ভাবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না। আল্লাহ্ তাদের উপর আযাব বর্ষন করেন। (সূরা আন’আম-১২৫)
আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা আল-ইমরান-১০২) মুসলিম ভাইয়েরা !
পবিত্র কুরআন শাশ্বত, তার বাণী চিরন্তন এবং এটি সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ মূ‘জেযা। এ কুরআন দিয়েই সর্ব শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রেরণ করা হয়েছে, শক্তিশালী করা হয়েছে তার নবুয়তকে। এ কুরআনই হচ্ছে তার ধর্মের প্রথম প্রমাণ। বর্তমান বৈজ্ঞানিক যুগে মানুষ তার মধ্য থেকে নতুন নতুন অনেক তত্ত্ব ও উপাত্ত আবিষ্কার করছে, যা তার নবুয়তের সত্যতার অকাট্য প্রমাণ। কী সাহিত্যের উপাদান, কী সামাজিক নীতি ও আদর্শ, কী চমৎকার নীতি ও সুন্দর চরিত্র, কী রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা, এ কুরআনের মধ্যেই সব কিছু রয়েছে। হযরত আয়েশা (রাঃ)-কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যান্ত ব্যাপক অর্থবহ শব্দে উত্তর দিলেন : নিশ্চয় তোমাদের নবীর চরিত্র সম্পূর্ণ কুরআন। (সহীহ মুসলিম) কুরআনুল করীমের শিষ্টাচার ধারণ করা প্রত্যেক ঈমানদারদের একান্ত প্রয়োজন। মানুষের জীবনাচরণ ও চিন্তাধারায় যে ভাব পরিলক্ষিত হয়, তা-ই চরিত্র। চরিত্র মানুষের মহার্ঘতম বস্তু। শ্রেষ্ঠতম অলঙ্কার। চরিত্র মানুষকে ন্যায়, সত্য, সংযম ও শ্রদ্ধাবোধ শিক্ষা দেয় এবং সৎ পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করে। মূলতঃ চরিত্র বলতে মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছুকেই বোঝায়। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। এ শ্রেষ্ঠত¦ সে তার চরিত্র দিয়ে অর্জন করে নেয়। চরিত্রই হলো তার প্রকৃত বা আসল পরিচয়। তবে সৎ চরিত্রকে মানুষের অর্জন করতে হয়। আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনাচরণকে চরিত্র গঠনের সঠিক নমুনা হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :- চারিত্রিক সৌন্দর্য ও গুণাবলীর পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের জন্য আমি প্রেরিত হয়েছি। মানুষের চারিত্রিক পবিত্রতা অর্জন করার ব্যাপারই ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য। গোটা বিশ্বের কাছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা ও কাজ দ্বারা উন্নত ও উত্তম চরিত্রের এক নমুনা তুলে ধরেছেন। জীবনের সব ক্ষেত্রে তাঁর বাস্তব জীবনের গুণাবলীকে আঁকড়ে থাকার উপদেশ দান করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন :- যারা আল্লাহ্র কিতাব পাঠ করে, নামায কায়েম করে, এবং আমি যা দিয়েছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসা আশা কর, যাতে কখনও লোকসান হবে না। পরিণামে তাদেরকে আল্লাহ্ তাদের সওয়াব পুরোপুরি দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও বেশী দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী। (সূরা ফাতির-২৯/৩০) আল-কুরআনের চরিত্র হলো, সত্যন্যায়কে অবলম্বন করা, ভাল আচরণ, শ্রেষ্ট স্বভাব, চমৎকার নীতি, সুন্দর চরিত্র ধারণ করা, যার মধ্যে রয়েছে সহিষ্ণুতা, সহনশীলতা, ধীর-স্থিরতা, দানশীলতা, বদান্যতা, ক্ষমা, মার্জনা, দয়া, নম্রতা, ধৈর্য, স্থিতিশীলতা, অবিচলতা, ন্যায়-পরায়ণতা, ইনসাফ, সত্যবাদিতা, সুন্দর ব্যবহার,প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা, অঙ্গীকার পালন করা, আত্মত্যাগ, করুণা, মমতাবোধ, মনুষ্যত্ব বোধ, সাহসিকতা, আমানতদারী, ঐকান্তিকতা, এগুলো যা উল্লেখ করা হলো তা সুন্দর চরিত্র নামে আখ্যায়িত। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আল্লাহ্ উত্তম বাণী তথা কিতাব নাযিল করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ, পূনঃ পূনঃ পঠিত। এতে তাদের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে চামড়ার উপর, যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে, এরপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহ্র স¥রণে বিনম্র হয়। এটাই আল্লাহ্র পথ নির্দেশ, এর মাধ্যমে আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ্ যাকে গোমরাহ করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই। (সূরা যুমার-২৩)
ঈমানদার ভাইয়েরা !
মানব চরিত্রের স্বরূপ উন্মোচন ঃ পবিত্র কুরআনের অসংখ্য আয়াতে মানুষের ¯¦ভাব চরিত্র সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে। যেমন এক আয়াতে কুরআন বলছে : যখন মানুষ কোনো বিপদ-মসিবতে নিমজ্জিত হয় তখন সে দাঁড়িয়ে, শুয়ে, বসে এবং সর্বাবস্থায় আমাকে ডাকতে থাকে। (সূরা ইউনূস-১২)। অন্যত্র পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এক দল লোক সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে : আর যখন তাদের বলা হয়, তোমরা পৃথিবীতে ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করো না। তারা বলে আমরা তো সংস্কার কাজ করছি। জেনে রাখো, প্রকৃতপক্ষে তারাই বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। (সূরা বাকারা-১১)
জ্ঞান সাধনা ও সত্যানুসন্ধানে কুরআনের আহ্বান ঃ পৃথিবীতে উন্নতি সাধন এবং জীবনকে সার্থক ও ফলপ্রসূ করার নিমিত্তে পবিত্র কুরআন গোটা বিশ্ব মানবতাকে জ্ঞান সাধনা এবং সত্যানুসন্ধানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মানবজীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে। বস্তুত কুরআনের প্রথম নির্দেশনাই হলো জ্ঞান আহরণ সম্পর্কিত। কুরআন বলছে : পড়ো তোমার পালনকর্তার নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন জমাট রক্ত থেকে। (সূরা আলাক-১/৩) পবিত্র কুরআন এমন এক গ্রন্থ, যা মানবজাতির সব জিজ্ঞাসার অবসান ঘটিয়েছে। মানুষের জীবন সম্পর্কে কুরআনের বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি ও পথনির্দেশনা মানবজাতিকে একটি সুনির্ধারিত জীবন পদ্ধতি অবলম্বনে উৎসাহিত করেছে। যে জীবন পথের যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে মানবতা মুক্তি এবং শান্তির পথে পরিচালিত হতে পারে। মানবজীবনের সব সমস্যার সমাধান পবিত্র কুরআনে প্রদান করা হয়েছে। তাই মানবজীবনকে সার্থক ও সাফল্যমণ্ডিত করতে হলে কুরআনের দিকনির্দেশনা অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন :- যখন আমি একদল জ্বিনকে আপনার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম, তারা কুরআন পাঠ শুনছিল। তারা যখন কুরআন পাঠের জায়গায় উপস্থিত হল, তখন পর¯পর বলল, চুপ থাক। অতঃপর যখন পাঠ সমাপ্ত হল, তখন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সতর্ককারীরূপে ফিরে গেল। তারা বলল, হে আমাদের সম্প্রদায়, আমরা এমন এক কিতাব শুনেছি, যা মূসা (আঃ)-এর পর অবর্তীণ হয়েছে। এ কিতাব পূর্ববর্তী সব কিতাবের প্রত্যায়ন করে, সত্যধর্ম ও সরল পথের দিকে পরিচালিত করে। (সূরা আহকাফ-২৯/৩০) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম : আব্দুল কায়েস গোত্রের প্রতিনিধি প্রধানকে (যার উপাধি ছিল আশাজ্জ) সম্বোধন করে বলেছিলেন : নিঃসন্দেহে তোমার মধ্যে এমন দু’টি প্রশংসনীয় সৌন্দর্য বিদ্যমান, যা আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়। একটি হলো ব্যক্তিত্ব, আর দ্বিতীয়টি হলো শিষ্টাচার। আমরা যদি সুন্দর জীবনযাপন করতে চাই, তাহলে আমাদের উচিত চরিত্র ঠিক রাখার সাধনা করা। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। তাই মানুষের চরিত্র মানুষের মতোই হওয়া উচিত। চরিত্রহীন মানুষ পশুর সমান। চরিত্র গঠনের গুরুত্ব এতই ব্যাপক যে, জীবনের যাবতীয় সফলতার পূর্বশর্ত হিসেবেই একে বিবেচনা করা যায়। ব্যক্তিগত জীবনে সুখী-সফল, আত্মপ্রত্যয়ী এবং জয়ী হওয়ার জন্য চরিত্রের প্রয়োজন। হে মানবকুল, তোমাদের কাছে উপদেশবানী এসেছে তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে এবং অন্তরের রোগের নিরাময়, হেদায়েত ও রহমত মুসলমানদের জন্য। বল, আল্লাহ্র দয়া ও মেহেরবাণীতে। সুতরাং এরই প্রতি তাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিৎ। এটিই উত্তম সে সমুদয় থেকে যা সঞ্চয় করছ। (সূরা ইফনুস-৫৭/৫৮)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আমাদের সবাইকে আল-কুরআনের চরিত্র ধারণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন ….

سورة الماعون

১ ) আপনি কি দেখেছেন তাকে, যে বিচারদিবসকে মিথ্যা বলে?
২ ) সে সেই ব্যক্তি, যে এতীমকে গলা ধাক্কা দেয়
৩ ) এবং মিসকীনকে অন্ন দিতে উৎসাহিত করে না।
৪ ) অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাযীর,
৫ ) যারা তাদের নামায স¤¦ন্ধে বে-খবর;
৬ ) যারা তা লোক-দেখানোর জন্য করে