দু’আ এক মহান ইবাদত

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, যিনি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল ও দাতা। এবং তাঁর জন্য কৃতজ্ঞতা এ জন্য যে, তিনি সব ধরনের নিয়মত দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।
    আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল এবং তাঁর বিশেষ বন্ধু , আর আল্লাহ তাঁর প্রতি শান্তি ও রহমত বর্ষণ করুন এবং তাঁর বরকতপূর্ণ সহচরবৃন্দগণের প্রতিও। কিয়ামতের দিন ও প্রতিদানের দিন পর্যন্ত।
মু’মিন ভাইয়েরা !
       সৃষ্টিকর্তা প্রতিপালক আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কিভাবে স্থাপিত হতে পারে ?  মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে কোনো রকম মুখাপেক্ষী নন । তিনি সকল সৃষ্টিজীব থেকে অমুখাপেক্ষী । সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান । তিনি মহা শক্তির অধিকারী, তাঁর ওপর কেউ বিজয়ী হতে পারে না । আকাশমণ্ডল ও তাবৎ জগতের প্রতিটি বিষয় তাঁর আয়ত্বাধীন । তাই মানুষ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে, তাঁর কাছে নিজের প্রয়োজন প্রার্থনা করতে, বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে সর্বদা তাঁর কাছেই মুখাপেক্ষী। তিনি কারীম-মহান । তাঁর কাছে প্রার্থনা করলে তিনি খুশি হন । তিনি ভালবাসেন মানুষ তাঁর কাছে তাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু চেয়ে নেবে । তিনি তাদের প্রার্থনা কবুল করেন ।
দু’আ অর্থ :- ডাকা, আহ্বান করা, প্রার্থনা করা, দু’আ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, দু’আ হচ্ছে ইবাদত। আর ইবাদত সবগুলিই আল্লাহরই জন্য পালন করতে হবে। দু’আ দুই প্রকার- (১) দু’আ আল-ইবাদাহ, উপাসনামূলক দু’আ। (২) দু’আ আল-মাস্আলাহ, প্রার্থনাকারী নিজের জন্য যা কল্যাণকর তা চাবে এবং যা ক্ষতিকর তা থেকে মুক্তি প্রার্থনা করবে।
       আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমার কাছে প্রার্থনা কর, আমি তোমাদের প্রার্থনা কবুল করব। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত হতে বিমুখ তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে। (আল-মুমিন : ৬০) এ আয়াতে প্রমানিত হল, যারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে না তারা অহংকারী। অতএব প্রার্থনা করলে অহংকার থেকে মুক্ত থাকা যাবে। আর এ আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দুআ অন্যতম ইবাদত। আর এটা পরিহার করা আল্লাহর সঙ্গে অহংকার করার নামান্তর। এ অহংকারের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো অহংকার হতে পারে না। কিভাবে মানুষ আল্লাহর সঙ্গে অহংকার করতে পারে যে আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে সব ধরনের জীবনোপকরণ দিয়েছেন, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান এবং ভাল-মন্দের প্রতিদান দিয়ে থাকেন।
      রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : দু’আ-ই হল ইবাদত। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত  হল দু’আ । রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেন : আল্লাহর কাছে দু’আর
চেয়ে উত্তম কোন ইবাদত নেই। (আবু দাউদ, তিরমিজী ও ইবনু মাজা)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : আর আমার বাšদারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তূত: আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নি:সংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে। (সূরা-বাকারাহ:১৮৬)
মুসলিম ভাইয়েরা !
      রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার চাচাতো ভাই ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে নসীহত করেছিলেন : হে খোকা ! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিক্ষা দেব, আল্লাহকে হেফাজত কর, আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। আল্লাহকে হেফাজত কর, তুমি তাকে সামনে পাবে। যখন প্রার্থনা করবে তখন আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করবে। যখন সাহায্য কামনা করবে তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাবে। জেনে রাখ ! পুরো জাতি যদি তোমাকে উপকার করতে একত্র হয় তবুও তোমার কোন উপকার করতে পারবে না , তবে আল্লাহ তোমার জন্য যা লিখে রেখেছেন। এমনিভাবে পুরো জাতি যদি তোমার ক্ষতি করার জন্য একত্র হয় তবুও তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না, তবে আল্লাহ যা তোমার বিপক্ষে লিখে রেখেছেন। কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে আর দফতর শুকিয়ে গেছে। (তিরমিযী)
দু’আ নিবেদন হতে হবে কেবলই আল্লাহর উদ্দেশ্যে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : যে মানুষকে শুনানোর জন্য কাজ করল আল্লাহ তা মানুষকে শুনিয়ে দিবেন। আর যে মানুষকে দেখানোর জন্য কাজ করল আল্লাহ তা মানুষকে দেখিয়ে দিবেন। ফলে সে আল্লাহর কাছে এর কোন বিনিময় পাবে না। (আবু দাউদ, তিরমিজী ও ইবনু মাজা)
দুআ করার আদবসমূহ : (১) দুআ করার সময় তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে এ দৃঢ় বিশ্বাস রাখা এবং দৃঢ়তার সঙ্গে দুআ করা : যদি আল্লাহ সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান থাকে তাঁর কুদরত, মহত্ত্ব, ওয়াদা পালনের প্রতি ঈমান থাকে তাহলে এ বিষয়টা আয়ত্ব করা সহজ হবে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : তোমাদের কেউ এ রকম বলবে না : হে আল্লাহ আপনি যদি চান তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিন। যদি আপনি চান তাহলে আমাকে অনুগ্রহ করুন। যদি আপনি চান তাহলে আমাকে জীবিকা দান করুন। বরং দৃঢ়তার সঙ্গে প্রার্থনা করবে এবং মনে রাখবে তিনি যা চান তা-ই করেন, তাকে কেউ বাধ্য করতে পারে না। (বুখারী)
(২) বিনয় ও একাগ্রতার সঙ্গে দুআ করা এবং আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ ও তার শাস্তি থেকে বাঁচার প্রবল আগ্রহ নিয়ে দুআ করা : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন : তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের প্রতিপালকের কাছে দুআ করবে। (আল-আরাফ : ৫৫)
(৩) আল্লাহর কাছে অত্যন্ত বিনীতভাবে ধর্না দেয়া এবং নিজের দুর্বলতা, অসহায়ত্ব ও বিপদের কথা আল্লাহর কাছে প্রকাশ করা : দেখুন আইউব আ. কিভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন। আল্লাহ সে সম্পর্কে  বলেন : এবং স্মরণ কর আইউবের কথা, যখন সে তার প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করে বলেছিল, আমি দুঃখ-কষ্টে পড়েছি, আর তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।  (আল-আম্বিয়া : ৮৩)
(৪) দু’আয় আল্লাহর হামদ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ পেশ করা : দুআর শুরুতে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ পড়া দুআ কবুলের সহায়ক।
(৫) আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ ও তাঁর মহৎ গুণাবলি দ্বারা দুআ করা : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন : আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাকে সে সকল নাম দিয়ে প্রার্থনা করবে।  (আল-আরাফ : ১৮০)
(৬) পাপ ও গুনাহ স্বীকার করে প্রার্থনা করা । (৭)  প্রার্থনাকারী নিজের কল্যাণের দুআ করবে নিজের বা কোনো মুসলিমের অনিষ্টের দুআ করবে না : নিজের কল্যাণের জন্য দুআ করলে তা কবুল হওয়ার ওয়াদা আছে আর অকল্যাণ বা পাপ নিয়ে আসতে পারে এমন দুআ করলে তা কবুল হবে না বলে হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
(৮) সৎকাজের অসীলা দিয়ে দুআ করা । (৯) বেশি বেশি করে ও বার বার দুআ প্রার্থনা করা : যেমন হাদীসে এসেছে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : তোমাদের কেউ যখন দুআ করে সে যেন বেশি করে দুআ করে কেননা সে তার প্রভুর কাছে প্রার্থনা করছে।
(১০) সুখে দুঃখে সর্বাবস্থায় দুআ করা । (১১) দুআর বাক্য তিনবার করে উচ্চারণ করা : দুআর বাক্য তিনবার করে উচ্চারণ করলে প্রার্থনাকারীর মনোযোগ ও একাগ্রতা বেশি হয় যা দুআ কবুলে সহায়ক হয়।
(১২) দুআয় উচ্চস্বর পরিহার করা । অনেক মানুষকে দেখা যায় তারা দুআ করার সময় স্বর উচু করেন বা চিৎকার করে দুআ করেন। এটা দুআর আদবের পরিপন্থী। (১৩) দুআ- প্রার্থনার পূর্বে অযু করা
(১৪) দুআয় দুহাত উত্তোলন করা : যেমন হাদীসে এসেছে ইবনু উমার রা. বলেন : নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুহাত তুললেন এবং বললেন, হে আল্লাহ! খালেদ যা করেছে আমি সে ব্যাপারে তোমার কাছে দায়িত্বমুক্ত।’ দুবার বললেন। (বুখারী) (১৫) কিবলামুখী হওয়া  দুআর সময় কিবলামুখী হওয়া মুস্তাহাব। যেমন হাদীসে এসেছে : আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার দিকে মুখ করলেন এবং কতিপয় কুরাইশ নেতাদের বিরুদ্ধে দ’ুআ করলেন। (বুখারী ও মুসলিম)
মু’মিন ভাইয়েরা !
       যখন স্পষ্ট হল যে, দ’ুআ-ই সর্বোত্তম ইবাদত ও সর্বশ্রেষ্ঠ আনুগত্য এবং যা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই নিবেদন করা মানুষের জন্য কর্তব্য। হোক তা প্রার্থনা অথবা আশ্রয় চাওয়া কিংবা বিপদ-মুক্তি, তা আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো কাছে পেশ করা বৈধ নয়। যে সকল বিষয় মানুষ সাহায্য করতে সামর্থ রাখে শুধু সে সকল বিষয় মানুষের কাছে চাওয়া বৈধ। আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করা যাবে না হোক নবী বা অলী বা পীর বা গাউস-কুতুব অথবা ফিরিশ্তা বা জিন এক কথায় কোনো সৃষ্টিজীবের কাছে দুআ করা যাবে না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকবে না, যা তোমার উপকার করে না, অপকারও করতে পারে না। কারণ এরূপ করলে তুমি অবশ্যই জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এবং আল্লাহ তোমাকে ক্লেশ দিলে তিনি ব্যতীত তা মোচনকারী আর কেউ নেই এবং আল্লাহ যদি মঙ্গল চান তবে তার অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি মঙ্গল দান করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (ইউনুস:১০৬-১০৭)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা কিয়ামত দিবস পর্যন্তও উহাকে সাড়া দেবে না ? এবং এগুলো তাদের প্রার্থনা সম্পর্কেও অবহিত নয়। যখন কিয়ামতের দিন মানুষকে একত্র করা হবে তখন এগুলো হবে তাদের শত্রু এবং এগুলো তাদের ইবাদত অস্বীকার করবে। (আল-আহকাফ : ৫-৬) 
               আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথের হিদায়াত দান করুন। আমীন

فضل شهر شعبان

       সমস্ত প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। আমরা তার প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করি। আমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রবৃত্তিজাত অনিষ্ট ও কর্মের কুপ্রভাব হতে আশ্রয় চাই। আল্লাহ তা’আলা যাকে হেদায়েত দান করেন, তার কোন ভ্রষ্টকারী নেই। আর যাকে তিনি ভ্রষ্ট করেন, তার কোন হেদায়েতকারী নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, ও একক, তার কোন শরীক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল।
হে আল্লাহ ! সালাত, সালাম ও বরকত অবতীর্ণ করুন তার উপর, তার বংশধর ও সাহাবাদের উপর, এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার পথে ধাবিত হবে ও তার আদর্শের অনুসরণ করবে তাদের উপর।
আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা আল-ইমরান-১০২)
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আরো ইরশাদ করেন :- হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তার থেকে তার সঙ্গীনীকে সৃষ্টি করেছেন; আর বিস্তার করেছেন তাদের দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞ্ঝা করে থাক এবং আতœীয় জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবল¤¦ন কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। (সূরা নিসা-১)
আল্লাহ রাব্বুল ইয্যত আরো ইরশাদ করেন :- হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে। (সূরা আহযাব-৭০/৭১)
মুসলিম ভাইয়েরা !
       আল্লাহ তা’আলা অনুগ্রহ করে তাঁর বান্দাদের জন্যে বছরের মধ্যে কোন কোন মাসকে সম্মানিত ও মর্যাদাবান করেছেন। আল্লাহ তা’আলার কাছে বারটি মাসের মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত ও মর্যাদাশীল। সেই মর্যাদাশীল মাস সমূহে বান্দা নেক আমল করলে তাঁর মর্যাদা ও সম্মান আল্লাহ তা’আলার নিকট আরো বৃদ্ধি পায়। আর শা’বান মাসও মর্যাদাপূর্ন একটি মাস। শা’বান হিজরী সালের অষ্টম মাসের নাম। এই নামকরণের কতিপয় কারণ পাওয়া যায়। যথা : (১) এ মাসে আরবরা দলবদ্ধ হয়ে পানির অনুসন্ধানে ছড়িয়ে পড়ত। (২) যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্য দলবদ্ধ হত।
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শা’বান মাসে এতো বেশি পরিমাণে রোযা পালন করতেন যে, আমাদের মনে হত, তিনি রোযা ত্যাগ করবেন না। আবার যখন রোযা ত্যাগ করতেন, আমাদের মনে হত, এবার আর রোযা পালন করবেন না। এবং আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান মাস ছাড়া অন্য কোন মাসে পরিপূর্ণ রোযা পালন করতে দেখিনি; এবং শা’বান মাসের মত এতো বেশি পরিমানে রোযা অন্য কোন মাসে পালন করতে দেখিনি। (বুখারী ও মুসলিম)
শা’বান মাসে রোযা পালন (আসহুরুল হুরুম) নিষিদ্ধ পবিত্র মাস চেয়েও শ্রেষ্ঠ এবং উত্তম নফল হল রমযান মাসের নিকটবর্তী দিবসের রোযা। আগে হোক কিংবা পরে। ফরয রোযার তুলনায় এ সকল রোযার স্থান ফরজ নামাযের আগে-পরে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহর অনুরূপ। এগুলো ফরয সমূহের অসম্পূর্ণতাকে পরিপূর্ণতা দান করে। রমযানের আগে-পরে নফল রোযার কাজও তাই। সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ যেমন অন্যান্য সাধারণ নফল হতে শ্রেষ্ঠ তেমনিভাবে রমযান মাসের আগে-পরের রোযা অন্য সময়ের নফল রোযা হতে শ্রেষ্ঠ। এ মাসের ফযীলতকে মানুষ উপেক্ষা করে, মাসটি রজব ও রমযানের মধ্যবর্তী মাস হওয়ার ফলে এর মাধ্যমে মূলত বুঝানো হচ্ছে, শাবান মাসকে যেহেতু দুটি সম্মানিত মাস বেষ্টন করেছে, সে জন্য মানুষ ঐ দুই মাসের আমলে ব্যস্ত হয়ে শাবান মাসকে অবহেলা করে। পক্ষান্তরে, অনেক মানুষ মনে করে, শাবান মাসের রোযার তুলনায় রজব মাসের রোযার মর্যাদা অধিক। কারণ, রজব হচ্ছে নিষিদ্ধমাস। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি এমন নয়।
হযরত উসামা বিন যায়েদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে)! শা’বান মাসে আপনি অধিকহারে রোযা পালন করেন; অন্য কোন মাসে তো এরূপ দেখিনি ! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন : শা’বান, রজব ও রমযানের মধ্যবর্তী মাস, এ মাসের ফযীলতকে মানুষ উপেক্ষা করে। এই মাসে বিশ্ব প্রতিপালকের কাছে আমল পেশ করা হয়। আর আমি পছন্দ করি যে, রোযা পালনাবস্থায় আমার আমল পেশ করা হোক। (নাসায়ী ও আহমদ) 
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : শা’বান মাসে রোযা রাখা এবং রমযানের সাথে মিলিয়ে নেয়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অত্যন্ত প্রিয় ছিল। (আবু দাউদ ও আহমদ)
আর শা’বানের পরই রমযান মাসের আগমন, রমযান হলো তাক্বওয়া অর্জনের মাস, কুরআন নাযিলের মাস, এই মাসেই মুসলমানদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন :- হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার। (সূরা বাকারাহ-১৮৩)  
ঈমানদার ভাইয়েরা !
       শা’বান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিক পরিমাণ রোযা পালনের কারণ সম্পর্কে বিদ্বানদের বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। (১) সফর ও অন্যান্য ব্যস্ততায় প্রতি মাসের তিনটি নফল রোযা পালনে বিঘœ সৃষ্টি হত। তাই ঐ সব রোযা শা’বান মাসে কাযা করতেন। নবী কারীম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন নফল শুরু করলে তা পূর্ণ করতেন। কোন কারণে ছুটে গেলে পরে কাযা করতেন। (২) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ রমযানের রোযা শা’বানে কাযা করতেন। এ জন্য তিনিও তাদের সাথে নফল রোযা পালন করতেন। এরূপ একটি বর্ণনা আয়েশা (রাঃ) থেকে পাওয়া যায়, তিনি বলেন : তিনি রমযানের রোযার কাযা শা’বান মাস পর্যন্ত বিলম্ব করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় অন্য সময় তা সম্ভব হয়ে উঠত না। (৩) সাধারণত মানুষ এ মাসের ফযীলত সম্পর্কে উদাসীন থাকে, তাই তাদের শিক্ষাদানের নিমিত্তে রোযা পালন করতেন। এ মতকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। কারণ, এ মতের পক্ষে উসামা বিন যায়েদের পূর্বে উল্লেখিত হাদীসের সমর্থন পাওয়া যায়, যাতে বলা হয়েছে : এটা ঐ মাস যা সম্পর্কে মানুষ উদাসীন থাকে, রজব ও রমযানের মধ্যবর্তী মাস। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন শাবান মাস আসত তখন থেকে যাওয়া নফল রোযাগুলো আদায় করতেন, যাতে রমযান মাস আসার পূর্বেই নফল রোযাগুলো পরিপূর্ণ হয়। যেমনটি তিনি নফল নামায ও কিয়ামুল লাইল কারণ বশতঃ ছুটে গেলে কাযা করতেন। আয়েশা (রাঃ)-এ সুযোগ ব্যবহার করে ঋতুস্রাবের কারণে রমযান মাসের যে সব রোযা বাদ যেত তা কাযা করতেন। অন্য সময় রাসূলের সাথে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতেন বলে সম্ভব হতো না। অতএব, যাদের উপর অতীত রমযান মাসের রোযা বাকী আছে তার কাযা আদায়ের ব্যাপারে সতর্ক করা, সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এমনিভাবে, শাবানে রোযা রাখা দ্বারা অন্য উপকারও আছে। তাহল, শা’বানে রোযা পালনের মাধ্যমে রমযান মাসের রোযা পালনের অনুশীলন হয়। এতে রমযান মাসে রোযা পালনে কষ্ট অনুভব হয় না।  বরং, এর মাধ্যমে রোযা রাখার অনুশীলন ও অভ্যাস সৃষ্টি হয়। ফলে রমযান মাসে রোযা পালনে উৎসাহ ও আনন্দ বৃদ্ধি পায়। শা’বান যেহেতু রমযানের ভূমিকা, তাই রমযানের কতিপয় কাজ এ মাসেও করা যায়; যেমন, রোযা পালন, কুরআন তিলাওয়াত, দান-ছদকা ইত্যাদি।
আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- তোমরা নামায কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। তোমরা নিজেদের জন্যে যা কিছু অগ্রে পাঠাবে, তা আল্লাহ্র কাছে উত্তম আকারে এবং পুরস্কার হিসেবে বর্ধিতরূপে পাবে। তোমরা আল্লাহ্র কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা ক্ষমাশীল, দয়ালূু। (সূরা মুয্যম্মিল-২০)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শানুযায়ী সম্পাদিত আ’মলই সর্বোত্তম আ’মল। নতুন উদ্ভাবিত আমলই সবচেয়ে নিন্দিত। আল্ল¬াহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা করি, তিনি আমাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শকে আঁকড়ে ধরে তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক দান করুন। তাওফীক দান করুন তাঁর আদর্শের বিপরীত সব কিছু হতে নিরাপদ থাকার।
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আমাদেরকে শা’বান মাসের ফযীলত অর্জন করার তাওফীক দান করুন।  আমীন ….

فضل الذكر জিকিরের ফজিলত সম্পর্কে

সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্যে, যিনি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল ও দাতা। এবং তাঁর জন্য কৃতজ্ঞতা এ জন্য যে, তিনি সব ধরনের নিয়ামত দিয়ে আমাদের পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।
       আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল এবং তাঁর বিশেষ বন্ধু , আর আল্লাহ তাঁর প্রতি শান্তি ও রহমত বর্ষণ করুন এবং তাঁর বরকতপূর্ণ সহচরবৃন্দগণের প্রতিও। কিয়ামতের দিন ও প্রতিদানের দিন পর্যন্ত।

মুসলিম ভাইয়েরা !
       আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন :- অতএব তোমরা আমাকেই স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো এবং তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ হও ও অবিশ্বাসী হয়ো না। (সূরা বাকারাহ-১৫২)
যিকিরের আভিধানিক অর্থ :- স্মরণ করা, মনে করা, উল্লেখ করা, বর্ণনা করা।
পারিভাষিক অর্থ :- শরীয়াতের আলোকে যিকির বলা হয়, মুখে বা অন্তরে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা এবং প্রশংসা করা, পবিত্র কোরআন পাঠ, আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, তার আদেশ-নিষেধ পালন, তার প্রদত্ত নেয়ামত ও সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা—ইত্যাদি।
       ইমাম নববী (রাহ) বলেন :- যিকির কেবল তাসবীহ, তাহলীল, তাহমীদ ও তাকবীর—ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আনুগত্যের সাথে প্রত্যেক আমলকারীই যিকিরকারী হিসেবে বিবেচিত। আল্লাহ তাআলার যিকির এমন এক মজবুত রজ্জু যা সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে সম্পৃক্ত করে। তাঁর সান্নিধ্য লাভের পথ সুগম করে। মানুষকে উত্তম আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত করে। সরল ও সঠিক পথের উপর অবিচল রাখে।
এ-কারণে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে যিকির করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহর জিকির সবচেয়ে বড় ও সর্বোত্তম এবাদত ; কেননা, আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করা হচ্ছে এবাদতের আসল লক্ষ্য।
       আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : আপনি আপনার প্রতি প্রত্যাদিষ্ট কিতাব পাঠ করুন এবং নামায কায়েম করুন। নিশ্চয় নামায অশ্লীল ও গর্হিত কার্য থেকে বিরত রাখে। আল্লাহ্র স¥রণ সর্বশ্রেন্ঠ। আল্লাহ্ জানেন তোমরা যা কর। (সূরা-আনকাবুত-৪৫)
       আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন : আর অতঃপর যখন হজ্জ্বের যাবতীয় অনুন্ঠানক্রিয়াদি সমাপ্ত করে সারবে, তখন স¥রণ করবে আল্লাহ্কে, যেমন করে তোমরা স¥রণ করতে নিজেদের বাপ-দাদাদেরকে ; বরং তার চেয়েও বেশী স¥রণ করবে। তারপর অনেকে তো বলে যে পরওয়াদেগার ! আমাদিগকে দুনিয়াতে দান কর। অথচ তার জন্যে পরকালে কোন অংশ নেই। (সূরা বাকারাহ-২০০)
আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন।  
       আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও অধিক স্মরণকারী নারী এদের জন্য আল্লাহ রেখেছেন ক্ষমা ও মহা প্রতিদান। (সূরা আহযাব-৩৫)
       হযরত আবুদ্দারদা (রাঃ) থেকে বর্ণিত : নবী  কারীম (সাঃ) ইরশাদ করেন : আমি কি তোমাদেরকে এমন এক আমল সম্পর্কে অবহিত করব না, যা তোমাদের অধিপতির নিকট সবচেয়ে উত্তম ও পবিত্র, এবং তোমাদের মর্যাদা অধিক বৃদ্ধিকারী, এবং তোমাদের জন্য স্বর্ণ-রূপা দান করা ও দুশমনের মুখোমুখি হয়ে তোমরা তাদের গর্দানে বা তারা তোমাদের গর্দানে আঘাত করার চেয়ে উত্তম ?  তারা বলল :- হাঁ ইয়া রাসূলুল্লাহ ! তিনি বললেন :- যিকরুল্লাহ (আল্লাহর জিকির বা স্মরণ)। আল্লাহর যিকিরকারী, তাঁর নিদর্শনাবলী থেকে শিক্ষা লাভকারী : তারাই বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন। (তিরমিযী)

ঈমানদার ভাইয়েরা !

       আল্লাহর যিকির সুরক্ষিত দুর্গ : বান্দা এ-দ্বারা শয়তান থেকে রক্ষা পায়। নবী কারীম (সাঃ) ইরশাদ করেন : ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়া (আঃ) ইসরাঈল-তনয়দেরকে বলেছেন :‘এবং আমি তোমাদেরকে আল্লাহর জিকিরের আদেশ দিচ্ছি, কারণ এর তুলনা এমন এক ব্যক্তির ন্যায় যার পিছনে দুশমন দৌড়ে তাড়া করে ফিরছে, সে সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করে নিজকে রক্ষা করেছে। অনুরূপ, বান্দা আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে শয়তান থেকে সুরক্ষা পায়। (আহমদ) যিকির মানুষের ইহকাল ও পরকালের মর্যাদা বৃদ্ধি করে : আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : মক্কার একটি রাস্তায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হাঁটছিলেন। জুমদান নামক পাহাড় অতিক্রম করার সময় বললেন, তোমরা চল, এটা জুমদান-মুফাররাদূন অর্থাৎ একক গুণে গুণান্বিতরা এগিয়ে গেছে তিনি জিজ্ঞেস করলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ (সাঃ) মুফাররদূন অর্থাৎ একক গুণে গুণান্বিত কারা ? জওয়াবে তিনি বললেন : আল্লাহকে বেশি করে স্মরণকারী নারী-পুরুষ। (মুসলিম) যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয় ; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়। 
       আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন : হে ঈমানদারগণ, তোমরা যখন কোন বাহিনীর সাথে সংঘাতে লিপ্ত হও, তখন সুদৃঢ় থাক এবং আল্লাহ্কে অধিক পরিমাণে স¥রণ কর যাতে তোমরা উদ্দেশ্যে কৃতকার্য হতে পার। (সূরা আনফাল-৪৫)
যিকিরের প্রকারভেদ :- যিকির অন্তর দ্বারা হতে পারে, জিহ্বা দ্বারা হতে পারে, বা এক সঙ্গে উভয়টা দ্বারাও হতে পারে। এর বিভিন্ন প্রকার রয়েছে, নীচে কিছু উল্লেখ করা হল : (১) কুরআনুল করীম পাঠ করা : এ হচ্ছে রাসূল (সাঃ)-এর উপর নাযিলকৃত আল্লাহ তাআলার কালাম। আল্লাহর কালাম বিধায় সাধারণ যিকির-আজকারের চেয়ে কুরআন শরীফ পাঠ করা উত্তম।
আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন : ‘যে ব্যক্তি কিতাবুল্লাহর একটি অক্ষর পড়ল তার জন্য এর বিনিময়ে একটি নেকি অবধারিত এবং তাকে একটি নেকির দশ গুণ সওয়াব প্রদান করা হবে। আমি বলছি না আলীফ-লাম-মীম একটি অক্ষর বরং আলীফ একটি অক্ষর, এবং লাম একটি অক্ষর, এবং মীম একটি অক্ষর। (তিরমিযী)
(২) মৌখিক যিকির : যেমন তাসবীহ, তাহলীল, তাহমীদ ও তাকবীর—ইত্যাদি পড়া, যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। (৩) প্রার্থনা : এটা বিশেষ যিকির, কেননা এ-দ্বারা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ হয়, ইহকাল ও পরকালের প্রয়োজন পূরণ হয়।
(৪) ইস্তিগফার করা : আল্লাহ তাআলা নূহ (আঃ)-এর কথা বিবৃত করে বলেন :- বলেছি, তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি তো মহা ক্ষমাশীল। (সূরা নূহ-১০)
(৫) অন্তর দিয়ে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করা। এটা অন্যতম বড় যিকির।
       আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে নিদর্শনাবলী রয়েছে বোধশক্তি সম্পন্ন লোকদের জন্য, যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহর স্মরণ করে এবং আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি সম্বন্ধে চিন্তা করে ও বলে—‘হে আমদের প্রতিপালক ! তুমি এগুলো নিরর্থক সৃষ্টি করনি, তুমি পবিত্র, তুমি আমাদেরকে অগ্নি-শাস্তি হতে রক্ষা কর। (সূরা আল-ইমরান-১৯০/১৯১)
(৬) রকমারি ইবাদতের অনুশীলন করা : যেমন সালাত কায়েম, যাকাত প্রদান, পিতা-মাতার সাথে অমায়িক আচরণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা, জ্ঞানার্জন ও অপরকে শিক্ষাদান—ইত্যাদি। কেননা, সৎকর্মের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহকে স্মরণ করা।
       আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেন : এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর। (সূরা ত্বা-হা-১৪)
যিকিরের কতিপয় নমুনা : (১) সাধারণ যিকির : সামুরা বিন জুনদব (রাঃ) থেকে বর্ণিত : তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন :- আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় কথা চারটি : সুবহানাল্লাহ, আল্লাহামদুলিল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবর, যে কোন একটি দ্বারাই আরম্ভ করা যেতে পারে। (মুসলিম) (২) সকাল-বিকালের যিকির : আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন :- যে সকাল এবং বিকালে ‘সুবহানাল্লাহ ওয়া বিহামদিহী’ একশত বার বলবে, যে এ-রকম বা এর অতিরিক্ত বলবে, কেয়ামত দিবসে এর চেয়ে উত্তম কেউ কিছু আনয়ন করতে পারবে না। (মুসলিম)
(৩) বিপদের মুহূর্তে যিকির : আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বিপদের সময় বলতেন :- আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই, যিনি সুমহান, সহিষ্ণুবান, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই যিনি মহান আরশের রব, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই যিনি আকাশসমূহের রব, এবং ভূমির রব এবং সম্মানিত আরশের রব। (মুসলিম)
মোট কথা হলো, বর্ণিত ফযীলত ও প্রতিশ্র“ত পুরস্কার হাসিল করার অভীষ্ট লক্ষ্যে উল্লেখিত ও অনুল্লেখিত প্রয়োজনীয় যিকিরসমূহ মুখস্থ করে নিয়মিত পড়া প্রত্যেক মুসলমানের উচিত।