إذا سألت فاسأل الله যখন চাইবে আল্লাহর কাছেই চাইবে

 

সমুদ্র ভ্রমণে বন্ধুর আমন্ত্রণ, না করতে পারেনি সাজিদ। অল্প সময়ের প্রস্তুতি নিয়ে বের হয়ে পড়ল। প্রয়োজনীয় কাজ সেরে বাহনে চেপে বসল। সী-ট্রাকের ছাদে দাঁড়িয়ে চারিদিকের মোহনীয় সব দৃশ্য দেখে জ্ঞান হারাবার পালা। প্রকৃতি এত সুন্দর? এত অপরূপ মহান স্রষ্টার সৃষ্টি? এ যে কল্পনাকেও হার মানায়। উপরের নীল আকাশ সাগরের রূপালী জলরাশিতে নীল চাদর বিছিয়েছে যেন, কি অপরূপ নীলাভ করে তুলেছে তাকে। বহুদূর থেকে ছুটে আসা দক্ষিণা সমীরণ তরঙ্গ তুলে আরো মোহনীয় করে তুলেছে। সমুদ্র গভীর থেকে জেগে উঠা তরঙ্গরাজি মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের সাক্ষ্য দিচ্ছে যেন। সী-ট্রাকের প্রাচীরে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশির হিল্লোল দেখছে আর বিস্ময়াভিভূত হচ্ছে সাজিদ। কেবল মহান আল্লাহর দ্বারাই এই সৃষ্টি সম্ভব। যিনি সৃষ্টি করেছেন আকাশ, জমিন, পাহাড়, সমুদ্র… সবকিছু। সাজিদ ভাবছে আর আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা ও অনুরাগ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। পরিস্থিতির সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়ে চারিদিক দেখছে আর উদ্বেলিত হচ্ছে। দেখছে সমুদ্র বুক চিরে সী-ট্রাক অপূর্ব ভঙ্গিমায় এগিয়ে যাচ্ছে সম্মুখ পানে। সেই সৌন্দর্য্য আরোও উপভোগ করার জন্য নিচের দিকে তাকাল সাজিদ। বিশাল এক ঢেউ আছড়ে পড়ল সী-ট্রাকের গায়। প্রচন্ডভাবে কেঁপে উঠল সী-ট্রাক। সাজিদ শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে পারল না, আর অমনি বিপদ আপতীত হল। সিটকে গিয়ে পানিতে পড়ল সাজিদ। বিপদ আরো তীব্রতা লাভ করল। কারণ সে ভাল সাতার জানে না। বাঁচাও! বাঁচাও! করে সাজিদ স্বজোরে চিৎকার জুড়ে দিল। এ দিকে বিশাল বিশাল ঢেউও যেন তাকে পরাভূত করতে একের পর এক আঘাত হানতে লাগল। বজ্রধ্বনির ন্যায় গর্জন করে ডাকতে লাগল ইয়া জিলানি! ইয়া দাসুকি! ইয়া গাউসুল আজম! ইয়া খাজাবাবা… তার ধারণায় এরা তাকে উদ্ধার করতে পারবে। সে ঢেউয়ের সাথে যুদ্ধ করছে আর বিকট আওয়াজে চিৎকার করছে। এরই মাঝে নাফিসের দৃষ্টি তার উপর পড়ল। নাফিস, পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই বয়সের শক্ত-সমর্থ এক পৌঢ় বীর। চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। সফরের সহযাত্রী। সী-ট্রাকের ছাদে বসে ছিলেন। দেরি না করে লাইফ জ্যাকেট পরে সমুদ্রে ঝাঁপ দিলেন।

মুহূর্তের মাঝে পুরো সী-ট্রাকে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল। যাত্রীরা সকলেই সী-ট্রাকের ছাদে উঠে আসল। এবং যার যার সামর্থ‌ মত উদ্ধার কাজে সহযোগিতায় প্রবৃত্ত হল। ডিঙ্গি নৌকা পানিতে ফেলা হল। উদ্ধার কর্মীরা বীর নাফিসের সাথে যোগ দিল এবং সাজিদকে সী-ট্রাকে উঠাতে সাহায্য করল। আল্লাহর মেহেরবানীতে এক সময় উদ্ধার কর্ম সমাপ্ত হল। আল্লাহর ইচ্ছায় সাজিদ নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বেঁচে গেল। বন্ধু নাবিল তাকে জড়িয়ে ধরে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করল। এরপর উভয়ে মিলে সাজিদের মৃত্যু হতে মুক্তির উপকরণ বানিয়ে আল্লাহ তাআলা যাকে পাঠিয়েছেন সেই বীর-বিক্রম মহান ব্যক্তিত্বকে খুঁজতে লাগল। খুঁজতে খুঁজতে সী-ট্রাকের এক কোনায় তাকে তাকে তার আবিষ্কার করল। তোয়ালে দিয়ে শরীর মুচছেন। সাজিদ দৌড়ে গিয়ে তার সাথে মুআনাকা করে বলল, জানি না আমার দ্বারা আপনার ঋণ পরিশোধ সম্ভব হবে কিনা। আমার জীবন বাঁচিয়েছেন আপনি।

সাজিদের কথা শোনে সুন্দর করে হাসলেন। এবং উপরের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবলেন। অত:পর আড়চোখে তাকিয়ে বললেন, [বৎস! তোমার জীবন রক্ষার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। আর আমার প্রত্যাশা, তোমার জীবন রক্ষা পেয়েছে সে মূল্য তুমি পরিশোধ করবে।]

নাফিস সাহেবের কথাগুলো শুনে সাজিদ আশ্চর্য্যবোধ করল, ব্যাখ্যা পাওয়ার আশায় তাঁর দিকে তাকালো।

নাফিস সাহেব কথা চালিয়ে গেলেন, তুমি সমুদ্রে পড়ে ঢেউয়ের সাথে সংগ্রাম করছিলে আর জিলানি, দাসুকি, খাজাবাবা ও গাউসুল আজমকে উদ্ধার করার জন্য চিৎকার করে ডাকছিলে। তোমার আওয়াজ শুনতে পেয়ে আমি বুঝতে পেরেছিলাম তোমার সাহায্যের প্রয়োজন।

সাজিদ: তাদের কাছে ফরিয়াদ করায় দোষের কি হয়েছে? তারা কি আল্লাহ তাআলার ওলি নন? বিপদ, মুসিবত ও সংকটের মুহূর্তে ডাকলে সাহায্যে এগিয়ে আসেন? তারাইতো আমার ডাকে সাড়া দিয়ে উদ্ধারের জন্য আপনাকে পাঠিয়েছেন। এ কথা বলা সাজিদ হাসল।

এত বড় বিপদে পড়ে আহত হওয়া সত্তেও সাজিদের মনে আলোচনা চালিয়ে যাবার তীব্র আকাঙ্খা জাগলো।

নাফিস বললেন: এই আলোচনাতো তুমি পরেও করতে পারবে। তোমার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। আমরাতো অনেক সময় পাচ্ছি। আর যদি চাও আলোচনা চলতে পারে।

সাজিদ নাফিস সাহেবের কথায় সায় দিল। কারণ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা অনুভূত হচ্ছিল।

সেদিনই সন্ধ্যার দিকে সী-ট্রাকের ছাদে সাজিদের সাথে নাফিস সাহেবের দেখা হল। সাজিদ কিছুটা সুস্থতা অনুভব করছে।

নাফিস সাহেব কথা শুরু করলেন: সম্ভবত তুমি বিশ্রাম নিয়েছ। সাজিদ মাথা নাড়িয়ে জবাব দিয়ে বলল, আল-হামদু লিল্লাহ, আল-হামদু লিল্লাহ…।

সাজিদ বলল, আমরা যে বিষয়ে আলোচনা করছিলাম, সে সম্বন্ধে একটি হাদিস আপনার স্মরণে আছে নিশ্চয়ই।

নাফিস সাহেব: কি সেটি?

সাজিদ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী,

إذا تحيرتم في الأمور فاستعينوا بأصحاب القبور.

অর্থাৎ, কোনো বিষয়ে পেরেশান হলে, কবর বাসীদের সাহায্য প্রার্থনা কর।’ আপনি কি এই হাদিস অস্বীকার করতে পারবেন?

নাফিস: কোনো মুসলমানের পক্ষেই রাসূলুল্লাহর একটিমাত্র হাদিসকেও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে শর্ত হচ্ছে, হাদিসটি সহিহ হতে হবে।

আর তুমি যদি বর্ণিত হাদিসে গিভীরভাবে চিন্তা কর তাহলে দেখবে এটি প্রাজ্ঞ হাদিস বিষারদবর্গের সর্বসম্মতি মতে জাল ও বানোয়াট। অনুরূপভাবে কোরআনের মর্মেরও পরিপন্থী। কেননা ইস্তেআনার অর্থ হচ্ছে, সাহায্য প্রার্থনা করা। আর সূরা ফাতেহাতে আল্লাহ তাআলা আমাদের শেখাচ্ছেন। [وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ] আরবি সাহিত্যের ধারা অনুযায়ী বাক্যটি আমাদেরকে হসর তথা সীমিতকরণের ধারণা দিচ্ছে। অর্থাৎ, আমরা কেবল তোমারই [আল্লাহর] সাহায্য চাই। সুতরাং সাহায্য কেবল আল্লাহর কাছেই চাওয়া যাবে। অন্য কারে কাছে নয়। এখন তুমি বল, তোমার উদ্ধৃত হাদিস কি কোরআনের মর্মের বিপক্ষে যাচ্ছে না? কোরআন যা বলছে তার বিপরীত ধারণা দিচ্ছে না?

আমরা কি প্রতিদিনই প্রতিটি সালাতে সূরা ফাতেহা পড়ছি না এবং যে কোনো ভাবেই হোক এ ধারণা বার বার পাচ্ছি না?

হে বন্ধু! এই হাদিস একজন মাত্র সাহাবিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শোনেছেন বলে প্রমাণিত হয়নি। এ ধরনের বক্তব্য না কোনো সাহাবি দিয়েছেন কখনো, না কোনো তাবেয়ি। হাদিস সংকলকদের কেউ, নির্ভরযোগ্য কোনো কিতাবে এটি উদ্ধৃত করেছেন বলেও তথ্য পাওয়া যায়নি।

সাজিদ: এটি হাদিস শাস্ত্রের বিখ্যাত পন্ডিত আল্লামা আজলুনি কর্তৃক রচিত ‘কাশফুল খাফা’ গ্রন্থে আছে।

নাফিস: তোমার কথা ঠিক। তবে আল্লামা আজলুনি রহ. কাশফুল খাফা রচনা করেছেন, ‘জয়িফ’ ও মানুষের কাছে প্রশিদ্ধ হয়ে যাওয়া ‘মওজু’ হাদিস থেকে সহিহ হাদিসকে আলাদা করবার জন্য। তাই তাতে অনেক মওজু হাদিস উদ্ধৃত হয়েছে। জাল হাদিস রচনাকারীদের আল্লাহর কাছে তওবা করা ছাড়া কোনো রাস্তা নেই।

সাজিদ: তাহলে হাদিসটি মওজু! কথাটি সাজিদ এমনভাবে বলল যেন কিছুতে সে ডুবে যাচ্ছে। হঠাৎ নাফিস সাহেবকে প্রশ্ন করে বসল। তাহলে আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী সম্বন্ধে আপনি কি বলবেন? আল্লাহ বলছেন,

فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِنْ شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ

তখন তার নিজের দলের লোকটি তার শত্রুদলের লোকটির বিরুদ্ধে তার কাছে সাহায্য চাইল।[সূরা কাসাস:১৫]

এই আয়াত স্পষ্টরূপে প্রমাণ করে যে, মুসিবতে আক্রান্ত হলে মৃত ও অনুপস্থিতদের নিকট সাহায্য চাওয়া জায়েয।

নাফিস: বুঝতে পারছি। তুমি আসলে জায়েয সাহায্য প্রার্থনা ও নিষিদ্ধ সাহায্য প্রার্থনার মাঝে পার্থক্যটি ধরতে পারনি।

সাজিদ: উভয়ের মাঝে পার্থক্য আছে তাহলে?

নাফিস: পার্থক্য স্পষ্ট, আপাত দৃষ্টিতেই বুঝা যায়। প্রাজ্ঞ আলেমবৃন্দ সেটি উল্লেখ করেছেন। অনিষ্টি প্রতিরোধ ও লড়াই জাতীয় অনুধাবনযোগ্য বিষয়াদির ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান, জীবিত ও উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ থেকে সাহায্য কামনা করা জায়েয।

আর কঠিন বিপদাপদ যেমন অসুস্থতা, পানিতে ডুবে যাওয়া -যা ক্ষাণিক আগে তোমার বেলায় ঘটেছিল- ইত্যাদি ক্ষেত্রে অনুপস্থিত ব্যক্তিবর্গের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা নিষিদ্ধ। অনুরূপভাবে যেসব বিষয়ের উপর মানুষের ক্ষমতা নেই সেসব ক্ষমতা বহির্ভূত বিষয়ে মানুষের সাহায্য প্রার্থনা করাও নিষিদ্ধ।

নাফিস সাহেব ও সাজিদ সী-ট্রাকের একটি কোনায় গিয়ে মুখোমুখি দুটি আসনে বসল।

সাজিদ: তাহলে, আমরা কি জীবত মানুষের নিকট সাহায্য চাই না? মৃত ওলী-আউলিয়াদের রূহও এমনই। এগুলো (অক্কাপ্রাপ্ত অলীদের রূহ) কোষমুক্ত তরবারির মত। সাহায্য-সহযোগিতার ক্ষেত্রে এরা ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী। কতৃত্বের ক্ষেত্রে আল্লাহর ওলীরা বিশাল ক্ষমতাশালী।

নাফিস: আগে তুমি আমাকে বল, তোমাকে এসব তথ্য কে দিয়েছে? কে বলেছে ওলীদের আত্মা কোষমুক্ত তরবারির মত? আল-কোরআন ও হাদিসের ভিত্তিতে এসব কথার সনদ কি?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীতে নেই। যতবার আমরা তাঁর আলোচনা করি অথবা কবর যিয়ারত করি তাঁর প্রতি দরূদ পড়ি, তাঁকে সালাম দেই। তবে তাঁকে যদি ডাকাডাকি করি তাহবে শরয়ি বিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তখন আমাদের ও সাহায্যের জন্য ঈসা আলাইহিসসালামকে ডাকাডাকিকারী নাসারাদের মাঝে পার্থক্য থাকবে কোথায়? সুতরাং রাসূলুল্লাহকে ডাকার অর্থই হবে একাজে তাদের অনুসরণ করা। তাদের মত ও পথ অবলম্বন করা।

আর তুমি যে বললে, আল্লাহর ওলীরা মারা যাবার পর কর্তৃত্ব, পরিচালনা ও সাহায্যের ক্ষেত্রে অধিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যান। এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই। কোরআন সুন্নাহর কোথাও এ ব্যাপারে কিছুই বলা হয়নি। দৃশ্য-অদৃশ্য সম্বন্ধে পরিজ্ঞাত মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে এসব ধারণার বাতুলতা ও অসারতা সম্বন্ধে আমাদেরকে সুস্পষ্ট করে বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنْفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَى عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَى إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ ﴿42﴾  (الزمر:42)

আল্লাহ জীবসমূহের প্রাণ হরণ করেন তাদের মৃত্যুর সময় এবং যারা মরেনি তাদের নিদ্রার সময়। তারপর যার জন্য তিনি মৃত্যুর ফয়সালা করেন তার প্রাণ রেখে দেন এবং অন্যগুলো ফিরিয়ে দেন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল কওমের জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে। [সূরা যুমার:৪২]

এ আয়াত প্রমাণ করছে, রূহসমূহকে মহান আল্লাহ বরযখের কোনো এক জায়গায় সংরক্ষণ করে রাখেন।

আর মৃত সম্বন্ধে মহান আল্লাহ বলছেন,

وَمَا يَسْتَوِي الْأَحْيَاءُ وَلَا الْأَمْوَاتُ إِنَّ اللَّهَ يُسْمِعُ مَنْ يَشَاءُ وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَنْ فِي الْقُبُورِ ﴿22﴾ (فاطر:22)

 

আর জীবিতরা ও মৃতরা এক নয়; নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শুনাতে পারেন, কিন্তু যে ব্যক্তি কবরে আছে তাকে তুমি শুনাতে পারবে না। [সূরা ফাতির:২২]

ঈসা বিন মারয়াম আ. পরকালে বলবেন, (যেমন আল্লাহ বলছেন,)

وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ ﴿117﴾(المائدة:117)

আর যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি তাদের উপর সাক্ষী ছিলাম। অতঃপর যখন আপনি আমাকে উঠিয়ে নিলেন তখন আপনি ছিলেন তাদের পর্যবেক্ষণকারী। আর আপনি সব কিছুর উপর সাক্ষী। [সূরা মায়েদা:১১৭]

এখন তুমিই বল, মসিহ ঈসা এর মত আল্লাহর একজন জলিলুল কদর রাসূলই যখন তাঁর বিদায়ের পর উম্মতের মাধ্যমে সঙ্ঘটিতব্য কার্যাদি বিষয়ে ওয়াকিবহাল নন। তাহলে ‘ওলী আল্লাহদের রূহ কোষমুক্ত তরবারির মত’ বক্তব্য কিভাবে গ্রহণ করা যায়?

এসব ধারণার অসারতা সম্বন্ধে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্ট করে বর্ণনা দিয়েছেন, ইরশাদ হচ্ছে,

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لَا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ ﴿5﴾ (الأحقاف:5)

তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাউকে ডাকে, যে কিয়ামত পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না? আর তারা তাদের আহ্বান সম্পর্কে উদাসীন। [সূরা আহকাফ:৫]

আয়াতগুলো সাজিদ তন্ময় হয়ে শুনতে লাগল। একেবারে নিশ্চুপ হয়ে গেল সে। কতই না চমৎকার, তৃপ্তিদায়ক ও সন্তোষজনক বক্তব্য। তার নীরবতা দীর্ঘ হল। আয়াতের মর্ম উপলব্ধি করার চেষ্টা করছে আর গভীর মনোযোগ দিয়ে ভাবছে। সাজিদ বরাবরই কোরআন তেলাওয়াত শোনার প্রতি  দুর্বল।

নাফিস সাহেব নিজ আসন নিয়ে সামান্য পেছনে সরে গেলেন। নরম গলায় সাজিদকে লক্ষ্য করে বললেন, দেখি চা পাওয়া যায় কিনা। আলাপ চারিতায় চাঞ্চল্য ফিরে আসবে।

নাফিস সাহেব চলে গেলেন। সাজিদের চক্ষুদ্বয় তাঁকে পর্যবেক্ষণ করছে আর সে মনে মনে বলছে, তিনি যা বলছেন সেগুলো কি হক না বাতিল? বাতিলই বা হয় কি করে তিনিতো অনেকগুলো মুহকাম আয়াতের উদ্ধৃতি উপস্থাপন করেছেন… তবে।

তার মস্তিষ্কে নানা চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। মনে হল পৃথিবী তাকে নিয়ে ঘুরছে। চেতনায় ফিরে দেখতে পেল, নাফিস সাহেব দাড়ানো। মুখে মিষ্টি হাসি লেগে আছে আর দু’হাতে দু’টো চায়ের পেয়ালা।

সাজিদ চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে কিছু বলার জন্য নাফিস সাহেবের দিকে তাকালো। বলল, আমার ফুফুর বিয়ে হয়েছে অ-নে-ক দিন আগে। সন্তানাদি হচ্ছিল না। ডাক্তার কবিরাজসহ চেষ্টা-তদবিরের কোনো দিক তিনি বাকি রাখেননি। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। যখন যে যা বলেছে সে দিকে দৌড়িয়েছেন। ফলাফল শূন্য। উপায়ান্ত না পেয়ে সর্বশেষ জিলানির মাজারে গেলেন। আর একটি সুন্দর ছেলে জন্ম নিল। আচ্ছা এ ঘটনাটা কি প্রমাণ করে না যে, মৃতদের কতৃত্ব অবশিষ্ট থাকে?

নাফিস সাহেব তড়িৎ জবাব দিলেন, আগে তুমি বল আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুর পর মানুষের আমল সম্বন্ধে কি বলেছেন? তিনিতো আমাদের বলেছেন,

إذا مات الإنسان انقطع عنه عمله إلا من ثلاثة: إلا من صدقة جارية أو علم ينتفع به أو ولد صالح يدعو له .

মানুষ যখন মারা যায় তিনটি ব্যতীত তার সকল আমল বন্ধ হয়ে যায়, (সেই আমলত্রয়ী হচ্ছে) সদকায়ে জারিয়া, উপকারী ইলম এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। [সহিহ মুসলিম:৩০৮৪]

রাসূলুল্লাহর বক্তব্য অনুযায়ী জিলানির মৃত্যুর পর তাঁর আমল বন্ধ হয়ে গিয়েছে । আর তোমার ফুফুর সন্তান লাভ করা হচ্ছে, মহান আল্লাহর দান। তিনিই তাকে তা দান করেছেন। তোমার উচিত এ নিয়ামতের জন্য আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। তাঁর স্বীকৃতি প্রদান করা। দুনিয়া ছেড়ে যাওয়া জিলানির নয়। হাদিসে বর্ণিত আমলগুলোর সাওয়াব মৃত্যুর পরও চলমান থাকে। এগুলোছাড়া মৃত্যুর পর আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

একটু চিন্তা করে দেখোতো,

যেসব বিষয়ে জীবিতদের ক্ষমতা নেই সেসব বিষয়ে বুঝি মৃতরা ক্ষমতাবান? অথচ আল্লাহ তাআলা বলছেন,

وَمَا يَسْتَوِي الْأَحْيَاءُ وَلَا الْأَمْوَاتُ إِنَّ اللَّهَ يُسْمِعُ مَنْ يَشَاءُ وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَنْ فِي الْقُبُورِ ﴿22﴾ (فاطر:22)

আর জীবিতরা ও মৃতরা এক নয়; নিশ্চয় আল্লাহ যাকে ইচ্ছা শুনাতে পারেন, কিন্তু যে ব্যক্তি কবরে আছে তাকে তুমি শুনাতে পারবে না। [সূরা ফাতির:২২]

খুবই মন্দ ও পরিতাপের বিষয়, লোকেরা অনেক সময় এমনসব কাজের বর্ণনা মানুষকে শোনায়, বাস্তবতার নিরিখে যার কোনো ভিত্তিই নেই। সম্পাদনকারীরা এসব কাজকে নিজেদের চোখে সুন্দর দেখে তাই যারা এগুলোকে তাদের নিকট সুন্দর বলে উপস্থাপন করে তাদের মর্যাদা রক্ষার্থে বড় মনে করে।

কাউকে কবরে নেওয়া হল আর সে আরগ্য লাভ করল। হতে পারে বাস্তবিক পক্ষেই সে আরগ্য লাভ করেছে। কিন্তু সেই আরগ্য লাভে মৃত ব্যক্তি মাধ্যম হিসাবে কাজ করেছে এ কথা কোনোভাবেই মানা যায় না। আচ্ছা! আমরা হর হামেশা দেখি যে, কাদেরিয়া তরিকার অনুসারীরা নিজেদের শরীরে ধারালো ছুরি বিদ্ধ করে আর কিছু লোক এই কাজকে তাদের বৈশিষ্ট্য ও কারামত বলে বিশ্বাস করে। এদিকে শরীরে তরবারি বিদ্ধ করার ব্যাপারে হিন্দুদের খ্যাতি বিশ্বব্যাপি। তারা বাঁশের ধারালো কুঞ্ছি দ্বারা গন্ডদেশ ও শরীরের বিভিন্ন অংশ রক্তাক্ত করে এমনকি সেসব কুঞ্ছি শরীরের একদিক দিয়ে প্রবেশ করিয়ে অন্য দিক দিয়ে বের করে আনে। এখন কাদেরিয়াদের সেই কাজ যদি কারামত হয় তাহলে হিন্দুদের এইসব কাজকেতো মু’জেজা বলতে হবে।

সাজিদ! বাস্তবতা হচ্ছে দুই দলের কারো কাজের সাথে দ্বীনে ইসলামের দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এইসব কাজ হতে দ্বীনকে পবিত্র ও মুক্ত করা অতীব জরুরি।

সাজিদ: তবে শায়খ আব্দুল কাদের জিলানি তাঁর এক কবিতায় বলেছেন,

مريدي إذا ما كان شرقا و مغربا                           أغيثه إذا ما صار في أي بلدة

আমার মুরিদ, প্রাচ্যে অবস্থান করুক কিংবা পাশ্চাত্যে, যে দেশেই সে অবস্থান করুক না কেন আমি তাকে সাহায্য করে থাকি।

আমি নিজে উপস্থিত থেকে দেখেছি কতিপয় মুরিদ দুর্দশায় আক্রান্ত হয়ে নিজ শায়খের কাছে ফরিয়াদ করেছে, আর শায়খ ফরিয়াদ শুনে বিপদ দূর করে দিয়েছেন এবং তাকে উদ্ধার করেছেন।

নাফিস: কোরআনের অনেকগুলো আয়াত তোমার এই কথাটির বিরোধী । তোমার বক্তব্য গ্রহণ করলে সেই আয়াতগুলোকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আল্লাহ বলেন,

أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ أَئِلَهٌ مَعَ اللَّهِ قَلِيلًا مَا تَذَكَّرُونَ ﴿62﴾

বরং তিনি, যিনি নিরুপায়ের আহবানে সাড়া দেন এবং বিপদ দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে জমিনের প্রতিনিধি বানান। আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে?  তোমরা কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাক। [সূরা নামল:৬২]

প্রয়োজন দেখা দিলে তা পুরণের জন্য যদি সে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট ধর্না দেয় তাহলে আল্লাহর ধারস্থ হওয়ার অনিবার্যতার অনুভূতি তার কোত্থেকে হবে?

তাছাড়া এসব মাশায়েখ সম্বন্ধে যা বর্ণনা করা হয় তার অধিকাংশই মিথ্যা । খানিক আগে তুমি যে কবিতাটি শুনিয়েছ সেটিও সেই অশুদ্ধ ও মিথ্যা বিষয়গুলোরই একটি। যখন হাজার হাজার জাল হাদিস রচনা করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যা আরোপ করা হয়েছে তখন শায়খ আব্দুল কাদের জিলানি, জুনায়েদ বোগদাদি, রেফায়ি সম্বন্ধে মিথ্যা প্রচারনা চালালে আশ্চর্য্য হবার কি আছে? তোমার কথা অনুযায়ী আব্দুল কাদের জিলানি যদি আমাদের নিকট আসেনও এবং এই কবিতা আবৃত্তি করেন, আমরা তা মেনে নেব না এবং তাঁর জ্ঞানের পরিধি সম্বন্ধে আমাদের ধারণার স্বল্পতার কথা উল্লেখ করে ওজর পেশ করব। বরং নি:সংশয়ে তাঁর দাবী প্রত্যাখ্যান করে ফিরিয়ে দেব। কারণ কেয়ামতের দিন আমাদের হিসাব নেয়া হবে কোরআন সম্বন্ধে আব্দুল কাদের জিলানি সম্বন্ধে নয়।

সাজিদ: এক মানুষ কি অপর মানুষের নিকট সাহায্য চায় না? তাহলে গায়রুল্লাহর সাহায্য চাওয়া হয় না কোথায়?

নাফিস: পারস্পরিক সাহায্য সহযোগিতা করার উৎসাহ দিয়ে অসখ্য আয়াত ও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। প্রতিটি মানুষই জানে মৃতদের কাছে সাহায্য প্রার্থনার বিষয়টি আর হাদিস কোরআনে বর্ণিত সাহায্য চাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষ কোনো বিষয়ে নিজেকে যখন অক্ষম দেখতে পায় তখন তাদের কাছ থেকে সাহায্য চায়। অনিষ্ট দূর কিংবা কল্যাণ সাধনের জন্য চিরাচরিত অভ্যাস বহির্ভূত পন্থায় তাদেরকে ডাকে।

একটা উদাহরণ দিচ্ছি শোন,

একদল লোক গাড়ীতে চলমান অবস্থায় প্রবল ঝড়ে আক্রান্ত হল। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে তাদের একজন শায়খ রেফায়িকে ডাকাডাকি শরু করল: ইয়া সাইয়্যেদানা, ইয়া রেফায়ি। বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য তার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করতে লাগল। এই প্রার্থনাকারী যদি সর্বজ্ঞ, সর্বদ্রষ্টা, সম্যক জ্ঞাত আল্লাহকে ডাকত যার নিকট কোনো কিছুই গোপন নয় তাহলে ভাল কাজ করত। কিন্তু সে তা না করে সাইয়্যেদ রেফায়িকে ডাকল, যিনি নিজ কবরে শুয়ে ঘুমুচ্ছেন। তার এই কাজের অর্থই হচ্ছে, সে বিশ্বাস করে যে রেফয়ি তার ডাক শুনতে পাবেন এবং সাথে সাথে এখানে এসে তাকে উদ্ধার করতে সক্ষম। সুতরাং এই আহ্বানকারী রেফায়ির এমন যোগ্যতা ও গুণের বিশ্বাস মনে স্থান দিল যা মূলত মানুষের গুণাগুণের উর্ধ্বে। যেমন, জীবন, জ্ঞান, শ্রবন, দর্শন, ইচ্ছা, রহমত ও কুদরত। আর জীবন হচ্ছে মৃত্যুর বিপরীত। সে যদি রেফায়িকে জীবিত মনে না করত তাহলে তাকে ডাকত না এবং সাহায্যও প্রার্থনা করত না। তার এই কাজটি যদি সঠিক ও শরিয়ত সম্মত হত তাহলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিরাও সঙ্কট-মুসিবতের সময় এমনটি করতেন। কিন্তু ইসলামের ইতিহাস ঘাটলে এমন একজন সাহাবিকেও পাওয়া যাবে না যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তাঁর মৃত্যুর পর ফরিয়াদ করেছেন।

এসব কথা শুনে সাজিদ ভ্রূকুঞ্চিত করে নাফিস সাহেবের বিরোধিতা করে বলল, এই কথাতো সকলেরই জানা যে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ উম্মতকে সাহায্য করেন, তাদের নেককারদের সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়।

নাফিস: ভাইসাব! এই ধারণার প্রচলন ঘটালো কে? কে জানালো এই বিষয়ে? আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রেসালতের দায়িত্ব পালন করেছেন- উম্মতের নিকট সেটি পূর্নাঙ্গরূপে পৌঁছিয়েছেন। আমানত আদায় করেছেন। উম্মতের হিতাকাংক্ষীতা করেছেন-তাদেরকে হিতোপদেশ দিয়েছেন। আর সেই রাসূল বলছেন, (আল্লাহ নিজ ভাষায় বলছেন)

قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ ﴿188﴾

বল আমি আমার নিজের কোনো উপকার ও ক্ষতির ক্ষমতা রাখি না, তবে আল্লাহ যা চান। আর আমি যদি গায়েব জানতাম তাহলে অধিক কল্যাণ লাভ করতাম এবং আমাকে কোনো ক্ষতি স্পর্শ করত না। আমি তো একজন সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা এমন কওমের জন্য, যারা বিশ্বাস করে। [সূরা আ’রাফ:১৮৮]

তাঁর পবিত্র শরীর তাঁর কবরে বিদ্যমান। কিয়ামত পর্যন্ত সেটি সেখান থেকে বের হবে না।

সাজিদ: আপনার এই কথার প্রমাণ কি? বরং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের সাহায্যার্থে কবর থেকে বের হয়ে আসেন।

নাফিস: প্রমাণ, মহান পবিত্র আল্লাহর বাণী,

ثُمَّ إِنَّكُمْ بَعْدَ ذَلِكَ لَمَيِّتُونَ ﴿15﴾ ثُمَّ إِنَّكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ تُبْعَثُونَ ﴿16﴾

এরপর অবশ্যই তোমরা মরবে।তারপর কিয়ামতের দিন অবশ্যই তোমরা পুনরুত্থিত হবে। [সূরা মুমিনূন:১৫-১৬]

আয়াতে লক্ষ্য করেছ নিশ্চয়, আল্লাহ তাআলা এখানে ثُمَّ ব্যবহার করেছেনে। আর ثُمَّ পশ্চাদ্বর্তী করনের জন্য ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ আমরা মরে যাব এবং এর পর আমাদেরকে উত্থিত করা হবে এতদুভয়ের মাঝে আর কিছু নেই। সম্বোধনটি ব্যাপক, সব মানুষের মত নবী-রাসূলগণও এর ভেতর শামিল।

হাদিসে এসেছে,

عن جابر بن عبد الله رضي الله عنهما أنه كان يقول: لقيني رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال لي: ما لي أراك منكسرا؟ فقلت يا رسول الله! استشهد أبي وترك عيالا ودينا، قال: أفلا أبشرك بما لقي الله به أباك؟ قلت: بلى يا رسول الله!  قال: ما كلم الله أحدا قط إلا من وراء الحجاب، وأحيا أباك كفاحا، فقال: يا عبدي تمن عليّ أعطك، فقال: يا رب! تحييني فأقتل فيك ثانية، فقال الرب: إنه سبق مني: أنهم إليها لا يرجعون. أخرجه الترمذي وابن ماجة

সাহাবি জাবের বিন আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলতেন, আমার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাক্ষাত করলেন। আমাকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন, কি ব্যাপার, তোমাকে মনভাঙ্গা দেখাচ্ছে? আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার বাবা শহিদ হয়েছেন। তিনি পরিজন ও কিছু ঋণ রেখে গেছেন। বললেন, আল্লাহ তাআলা যা নিয়ে তোমার পিতার সাথে স্বাক্ষাত করেছেন আমি কি সেই বিষয়ে তোমাকে সুসংবাদ দেব? আমি বললাম, হ্যাঁ ইয়া রাসূলাল্লাহ। বললেন, আল্লাহ তাআলা কারো সাথে কেবল পর্দার পেছন থেকেই কথা বলেন। তিনি তোমার পিতাকে জীবিত করে বলেছেন, হে আমার বান্দা আমার কাছে আশা কর, (কিছু চাও) আমি তোমাকে দেব। তিনি বললেন, হে রব, আমাকে জীবিত করে দিন, যাতে আপনার নামে আবারো নিহত হতে পারি। আল্লাহ বললেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আগেই চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে যে, তারা তাতে প্রত্যাবর্তিত হবে না। [তিরমিজি, ইবন মাজাহ]

وعن ابن عمر رضي الله عنهما عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: إذا مات أحدكم عرض عليه مقعده بالغداة والعشي، إن كان من أهل الجنة فمن إهل الجنة، وإن كان من أهل النار فمن أهل النار، فيقال: هذا مقعدك حتى يبعثك الله يوم القيامة. أخرجه مسلم

আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমাদের কেউ মারা গেলে প্রত্যহ সকাল-বিকাল তার ঠিকানা তার সম্মুখে উপস্থাপন করা হয়। ব্যক্তি যদি জান্নাতবাসী হয় তাহলে জান্নাতবাসী থেকে আর জাহান্নাম বাসী হলে জাহান্নাম বাসী হতে। আর তাকে বলা হয়, এইটি তোমার ঠিকানা যেই পর্যন্ত না কিয়ামতের দিন আল্লাহ তোমাকে উত্থিত করবেন। [বোখারি ও মুসলিম]

 

وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : إن من أفضل أيامكم يوم الجمعة، فيه خلق آدم، وفيه قبض، وفيه النفخة، وفيه الصعقة، فأكثروا علي من الصلاة فيه فإن صلاتكم معروضة علي، قالوا : يا رسول الله وكيف تعرض صلاتنا عليك وقد أرمت؟ يقولون: بليت، قال: إن الله حرم على الأرض أجساد الأنبياء . أخرجه أبو داود وابن ماجة.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, তোমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হচ্ছে জুমুআর দিন। সেদিন আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে আর সেদিনই তাকে কবজ করা হয়েছে, সেদিন শিংগায় ফু দেওয়া হবে, সেদিন মূর্ছা যাওয়া হবে, সুতরাং সেদিন তোমরা আমার উপর বেশি বেশি দরূদ পাঠ করবে কারণ তোমাদের দরূদ আমার নিকট পেশ করা হবে। লোকেরা বলল, ইয়া রাসূল্লাল্লাহ, আমাদের দরূদ আপনার নিকট কিভাবে পেশ করা হবে অথচ আপনিতো ফুলে যাবেন। (অর্থাৎ, পঁচে গলে নি:শেষ হয়ে যাবেন) নবীজী বললেন, মহান আল্লাহ নবীদের শরীর মাটির জন্য হারাম করেছেন। [আবু দাউদ ৮৮৩, ইবন মাজাহ ১৬২৬]

এই হাদিস প্রমাণ করছে নবীদের শরীর কবর থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মত কে সাহায্য করার জন্য কবর থেকে বের হন মর্মে বক্তব্যটি সরাসরি আল্লাহ তাআলার বক্তব্য বিরোধী। আল্লাহ কি বলেননি?

قَالُوا رَبَّنَا أَمَتَّنَا اثْنَتَيْنِ وَأَحْيَيْتَنَا اثْنَتَيْنِ فَاعْتَرَفْنَا بِذُنُوبِنَا فَهَلْ إِلَى خُرُوجٍ مِنْ سَبِيلٍ ﴿11﴾

তারা বলবে, ‘হে আমাদের রব, আপনি আমাদেরকে দু’বার মৃত্যু দিয়েছেন এবং দু’বার জীবন দিয়েছেন। অতঃপর আমরা আমাদের অপরাধ স্বীকার করছি। অতএব (জাহান্নাম থেকে) বের হবার কোন পথ আছে কি’? [সূরা গাফির:১১]

দেখাই যাচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর থেকে বের হওয়ার ধারণা এই আয়াতের সরাসরি বিরোধিতা।

সাজিদ: সেটি কিভাবে?

নাফিস: জানা কথা আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে অস্তিত্বহীন থেকে সৃষ্টি করেছেন। এইটি হচ্ছে প্রথম মৃত্যু। অত:পর আমরা এই দুনিয়াতে একবার মৃত্যু বরণ করব। আর মৃত্যুর পর আরেকটি জীবন। এখন মৃত্যুর পর কবর থেকে নবীজী বা নেককার ব্যক্তিবর্গের ফিরে আসার ধারণা পোষণ করা মূলত এই আয়াতের বিরোধিতা করা। তখন মৃত্যু দুইটি হবে না, হবে তিনটি।

সাজিদ: চমৎকার যুক্তি আপনার। তবে হয়ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শারীরিকভাবে নন রূহের মাধ্যমে সাহায্য করেন। অনুরূপ আউলিয়া কেরামও তাদের রূহের মাধ্যমে সাহায্য করেন।

নাফিস: ভাই সাজিদ! জানিনা কোত্থেকে এসব উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসে। অথচ ব্যাপারটি অত্যন্ত সহজ। আল্লাহ তাআ আমাদের সৃষ্টি করেছেন তাই আমাদের দায়িত্ব হল ইবাদতের মাধ্যমে তার একত্ববাদের স্বীকৃতি দেয়া এবং এককভাবে তার ইবাদত করা। এখন তিনি বিদ্যমান থাকতে আমাদের তিনি ভিন্ন অন্য কারো কাছে সাহায্য চাওয়ার দরকারটি কি? তাছাড়া রাসূলুল্লাহর এই হাদিসটির প্রতি একটু লক্ষ্য কর।

عن عبد الله بن مسعود رضي الله عنه أن أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم سألوه عن هذه الآية: وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ ﴿169﴾ (آل عمران:169) فقال صلى الله عليه وسلم: أرواحهم في جوف طير خضر لها قناديل معلقة بالعرش تسرح من الجنة حيث شاءت، ثم تأوي إلى تلك القناديل، فاطلع إليهم ربهم اطلاعة، فقال: هل تشتهون شيئا؟ قالوا: أي شيئ نشتهي ونحن نسرح من الجنة حيث شئنا؟ ففعل ذلك بهم ثلاث مرات، فلما رأوا أنهم لن يتركوا من أن يسألوا، قالوا يا رب! نريد أن ترد أرواحنا في أجسادنا حتى نقتل في سبيلك مرة أخرى، فلما رأى أن ليس لهم حاجة تركوا. أخرجه مسلم

সাহাবি আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিরা নিম্নোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন,

وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ ﴿169﴾ (آل عمران:169)

অর্থাৎ, আর যারা আল্লাহর পথে জীবন দিয়েছে, তাদেরকে তুমি মৃত মনে করো না, বরং তারা তাদের রবের নিকট জীবিত। তাদেরকে রিজিক দেয়া হয়। [সূরা আলে ইমরান:১৬৯]

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাদের আত্মাসমূহ একটি সবুজ পাখির পেটে অবস্থান করবে, আরশের সাথে ঝুলন্ত তাদের অনেকগুলো প্রদীপ থাকবে। জান্নাতের যেথায় ইচ্ছা তারা বিচরণ করবে। অত:পর সেই প্রদীপের কাছে আশ্রয় নিবে। তাদের রব তাদের দিকে মনোনিবেশ করে জানতে চাইবেন। বলবেন, তোমরা কি কিছু চাও? তারা বলবে, কি চাইব আমরা? আমরাতো মনের ইচ্ছামত জান্নাতের ভেতর বিচরণ করে বেড়াই? আল্লাহ তাআলা পর পর তিনবার এরূপ প্রশ্ন করবেন। তারা যখন বুঝতে পারবে যে, কিছু না চাওয়া অবধি তাদের ছাড়া হবে না। তখন বলবে, হে রব! আমরা চাই আমাদের আত্মাসমূহ পুনরায় শরীরে ফিরিয়ে দেয়া হোক আর আমরা আবারো আপনার রাস্তায় নিহত হই। আল্লাহ যখন দেখবেন তাদের কোনো প্রয়োজন নেই, তখন তাদের ছেড়ে দেয়া হবে। [সহিহ মুসলিম]

এই হাদিস থেকে জানা যায়,

(১) তারা স্বীয় রবের কাছে আত্মা শরীরে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য প্রার্থনা করল। মৃত্যুর পর আত্মা শরীর থেকে যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এটি তার প্রকৃষ্ট দলিল।

(২) তারা শাহাদাতের বিশাল প্রতিদান প্রত্যক্ষ করার পর আবারো আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করার জন্য দুনিয়াতে ফিরে আশার কামনা ব্যক্ত করে তাঁর কাছে প্রার্থনা করেছে। কিন্তু তাদেরকে তা নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। কারণ দায়িত্ব ও কাজ সমাপ্ত হয়ে গিয়েছে, বাকি আছে কেবল প্রতিদান। এখন প্রশ্ন হল, তারা স্বীয় রবের নিকট এত সম্মনিত ও মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও যদি নিজের ব্যাপারে লাভ সাধন, ক্ষতি প্রতিরোধ ও কর্তৃত্বের মালিক না হন তাহলে অন্যের লাভ কিংবা ক্ষতি সাধনের ক্ষমতা রাখেন কি করে?!

সাজিদ: তবে শহীদগণ মৃত্যুবরণ করেন না।

নাফিস: শাহাদত বরণকারীগণ নিজ রবের নিকট জীবত, এইটি কোরআনে স্পষ্ট আয়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَا تَقُولُوا لِمَنْ يُقْتَلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتٌ بَلْ أَحْيَاءٌ وَلَكِنْ لَا تَشْعُرُونَ ﴿154﴾

যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদেরকে মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত; কিন্তু তোমরা অনুভব করতে পার না। [সূরা বাকারা:১৫৪] তবে তাদের এই জীবনটি বরজখি জীবন। পার্থিব জীবন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা সেটি অনুভব করতে পারি না। যদি তাই হতো তাহলে চাচা হামজা শহীদ হয়ে নিহত হবার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত ব্যথিত হতেন না। এত দূ:খ প্রকাশ করতেন না। আর হামজা যদি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দিতেন তাহলে কখনো না কখনো অবশ্যই তার কাছে আসতেন এবং প্রয়োজন সেরে দেয়ার জন্য প্রার্থনা করতেন।

এদিকে মহান আল্লাহ প্রিয় রাসূল সম্বন্ধে বলছেন,  

وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِنْ قَبْلِكَ الْخُلْدَ أَفَإِنْ مِتَّ فَهُمُ الْخَالِدُونَ ﴿34﴾

আর তোমার পূর্বে কোন মানুষকে আমি স্থায়ী  জীবন দান করিনি; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে তারা কি অনন্ত জীবনসম্পন্ন হয়ে থাকবে? [সূরা আম্বিয়া:৩৪]

إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ ﴿30﴾

নিশ্চয় তুমি মরণশীল এবং তারাও মরণশীল। [সূরা যুমার:৩০]

এখন তোমার কাছে আমার জিজ্ঞাসা, এখানে মৃত্যুর অর্থ কি? যদি তিনি সব সময় কবর হতে বের হয়ে আসেন এবং মানুষদের সাহায্য করেন, তাহলে আয়াতে বর্ণিত মৃত্যু দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে?

আল্লহ তাআলা আরো বলছেন,

وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تُسِرُّونَ وَمَا تُعْلِنُونَ ﴿19﴾ وَالَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَا يَخْلُقُونَ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ ﴿20﴾ أَمْوَاتٌ غَيْرُ أَحْيَاءٍ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ ﴿21﴾

আর আল্লাহ জানেন তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ্যে ঘোষণা কর। আর তারা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ডাকে, তারা কিছু সৃষ্টি করতে পারে না, বরং তাদেরকেই সৃষ্টি করা হয়। (তারা) মৃত, জীবিত নয় এবং তারা জানে না কখন তাদের পুনরুজ্জীবিত করা হবে। [ সূরা নাহল: ১৯-২১]

এমন অনেক লোক আছে যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীকে নিজেদের মন্দ স্বার্থসিদ্ধির ক্ষেত্রে ব্যবহার করে। এবং মানুষের উপর প্রভাব ও কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে। কোরআনের বহু আয়াতকে গোপন করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবিত এবং তাদের সাথে তাঁর সময়ে সময়ে দেখা-সাক্ষাত হয় মর্মে প্রচারণা চালিয়ে লোকদের বিভ্রান্ত করে। এমনকি তাদের কেউ কেউ এমনও বলে যে, তিনি হচ্ছেন তদন্তকারীদলের মুখপাত্র। শায়খের চারিপার্শ্বে কে আছে পর্যবেক্ষণ করেন।

সাজিদ: আল্লাহ ইচ্ছা করলে কি জিলানি, দাসূকি, মেহদার প্রমুখকে ফরিয়াদকারীর সাহায্য করার ক্ষমতা দিতে পারেন না?

নাফিস: আল্লাহ তাআলা সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। তাই বলে তাঁর ক্ষমতা ও সামর্থ দ্বারা এসব বক্তব্যের সমর্থনে দলিল উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। আমাদের সম্মুখে এতসব আয়াত বিদ্যমান থাকতে কার সাধ্য আছে সেসব মাশায়েখের বিশেষ ক্ষমতা আছে মর্মে দাবি করতে পারে? প্রেরিত নবী-রাসূলগণসহ আমরা সকলেই আল্লাহর বান্দা। আর তিনি আমাদের রব ও মালিক। মনিবের সম্মুখে গোলাম কোনো কিছুরই মালিক হতে পারে না। মহান আল্লাহর সম্মুখে সকল মানুষের অবস্থাও তাই। চাই তারা নবী-রাসূলই হোন না কেন।

নাফিস: ভাই সাজিদ!

সাজিদ: জ্বি ?

নাফিস: গাইরুল্লাহকে ডাকা ও তাদের কাছে যাহায্য প্রার্থনা সম্বন্ধে অনেকগুলো বিষয়ে তোমার একটু অবগত হওয়া প্রয়োজন। যারা গাইরুল্লাহকে ডাকে সেসব বিষয় তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।

সাজিদ: বিষয়টি উদাহরণসহ বুঝিয়ে বললে ভাল হত।

নাফিস: প্রথমত: যারা মৃত কিংবা অনুপস্থিত জীবিত-গাইরুল্লাহকে ডাকে, তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। তারা অবশ্যই এমন বিশ্বাস পোষণ করে যে এসব মাশায়েখ গায়েব সম্বন্ধে জানেন। এই মর্মে তাদের বিশ্বাস তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না। অথচ সন্দেহ নেই যে, গায়েব-হাজের, দৃশ্য-অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞাত একমাত্র আল্লাহ তাআলা।

দ্বিতীয়ত: যারা সাহায্যের জন্য মৃত কিংবা অনুপস্থিত জীবিত গাইরুল্লাহকে ডাকে, সেসব গাইরুল্লাহ সম্বন্ধে তাদের বিশ্বাস হল, বিশ্ব পরিচালনা ও কর্তৃত্বে তাদের দখল আছে। এই এতেকাদ তাদের থেকে আলাদা হয় না।

সাজিদ: আল্লাহর শপথ, এটিতো খুবই মারাত্মক বিষয়! আমি আল্লাহ ভিন্ন অন্যদের ডাকা হতে তাঁর আশ্রয় চাই।

সাজিদের এই কথায় নাফিসের চেহারায় আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠল। বললেন, ভাই সাজিদ! আল্লাহ তোমার জীবনকে বরকতময় করুন। এটিই আল্লাহর সঠিক রাস্তা অন্বেষণকারী হকপন্থীদের রীতি।

সী-ট্রাক হালকাভাবে কেঁপে উঠল। নাফিস সুন্দর করে হাসলেন। হাসল সাজিদও।

খানিক বিরতির পর নাফিসই শুরু করলেন কথা। আল্লাহ ভিন্ন অন্যের কাছে দোয়া করার ব্যাপারে তুমি যা বললে তার সাথে আমি বিপদ ও সঙ্কটাপূর্ণ পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ সকল নবীর আদর্শ কি ছিল তা যুক্ত করব।

১. আইউব আলাহিস সালাম। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَى رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنْتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ ﴿83﴾ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِنْ ضُرٍّ وَآَتَيْنَاهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُمْ مَعَهُمْ رَحْمَةً مِنْ عِنْدِنَا وَذِكْرَى لِلْعَابِدِينَ ﴿84﴾ (الأنبياء:83-84)

আর স্মরণ কর আইউবের কথা, যখন সে তার রবকে আহ্বান করে বলেছিল,আমি দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়েছি। আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু। তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম। আর তার যত দুঃখ-কষ্ট ছিল তা দূর করে দিলাম এবং তার পরিবার-পরিজন তাকে দিয়ে দিলাম। আর তাদের সাথে তাদের মত আরো দিলাম আমার পক্ষ থেকে রহমত এবং ইবাদতকারীদের জন্য  উপদেশস্বরূপ। [সূরা আম্বিয়া:৮৩-৮৪]

২. যুন্ নূন-ইউনুস ইবন মাতা, আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَذَا النُّونِ إِذْ ذَهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَنْ لَنْ نَقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَى فِي الظُّلُمَاتِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ ﴿87﴾ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ وَكَذَلِكَ نُنْجِي الْمُؤْمِنِينَ ﴿88﴾ (الأنبياء:87-88)

আর স্মরণ কর যুন-নূন এর কথা, যখন সে রাগান্বিত অবস্থায় চলে গিয়েছিল এবং মনে করেছিল যে, আমি তার উপর ক্ষমতা প্রয়োগ করব না। তারপর সে অন্ধকার থেকে ডেকে বলেছিল, আপনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি ছিলাম যালিম। অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম এবং দুশ্চিন্তা থেকে তাকে উদ্ধার করেছিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদেরকে উদ্ধার করে থাকি। [ সূরা আম্বিয়া:৮৭-৮৮]

৩. ইউসুফ ইবন ইয়াকুব আলাইহিমাস সালাম। ইরশাদ হচ্ছে,

قَالَ رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ وَإِلَّا تَصْرِفْ عَنِّي كَيْدَهُنَّ أَصْبُ إِلَيْهِنَّ وَأَكُنْ مِنَ الْجَاهِلِينَ ﴿33﴾ فَاسْتَجَابَ لَهُ رَبُّهُ فَصَرَفَ عَنْهُ كَيْدَهُنَّ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ ﴿34﴾ (يوسف:33-34)

সে (ইউসুফ) বলল, হে আমার রব, তারা আমাকে যে কাজের প্রতি আহ্বান করছে তা থেকে কারাগারই আমার নিকট অধিক প্রিয়। আর যদি আপনি আমার থেকে তাদের চক্রান্ত প্রতিহত না করেন তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং আমি মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হব। অতঃপর তার রব তার আহ্বানে সাড়া দিলেন এবং তার থেকে তাদের চক্রান্ত প্রতিহত করলেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। [সূরা ইউসুফ: ৩৩-৩৪]

৪. জাকারিয়া ইবন ইমরান আলাইহিস সালাম। ইরশদ হচ্ছে,

هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُ قَالَ رَبِّ هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ ذُرِّيَّةً طَيِّبَةً إِنَّكَ سَمِيعُ الدُّعَاءِ ﴿38﴾ فَنَادَتْهُ الْمَلَائِكَةُ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلِّي فِي الْمِحْرَابِ أَنَّ اللَّهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحْيَى مُصَدِّقًا بِكَلِمَةٍ مِنَ اللَّهِ وَسَيِّدًا وَحَصُورًا وَنَبِيًّا مِنَ الصَّالِحِينَ ﴿39﴾ (آل عمران:38-39)

সেখানে জাকারিয়া তার রবের কাছে প্রার্থনা করেছিল, সে বলল, হে আমর রব, আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী। অতঃপর ফেরেশতারা তাকে ডেকে বলল, সে যখন কক্ষে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিল, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে ইয়াহইয়া সম্পর্কে সুসংবাদ দিচ্ছেন, যে হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে বাণীর সত্যায়নকারী, নেতা ও নারী সম্ভোগমুক্ত এবং নেককারদের মধ্য থেকে একজন নবী। [সূরা আলে ইমরান : ৩৮-৩৯] মহান আল্লাহ আরও বলেন,

وَزَكَرِيَّا إِذْ نَادَى رَبَّهُ رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنْتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ ﴿89﴾ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَوَهَبْنَا لَهُ يَحْيَى وَأَصْلَحْنَا لَهُ زَوْجَهُ إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ ﴿90﴾ (الأنبياء:89-90)

আর স্মরণ কর জাকারিয়ার কথা, যখন সে তার রবকে আহ্বান করে বলেছিল, হে আমার রব! আমাকে একা রেখো না, তুমি তো শ্রেষ্ঠ মালিকানার অধিকারী। অতঃপর আমি তার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়া। আর তার জন্য  তার স্ত্রীকে উপযোগী করেছিলাম। তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত। আর আমাকে আশা ও ভীতি সহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী। [সূরা আম্বিয়া:৮৯-৯০]

৫. মূসা ইবন ইমরান আলাইহিস সালাম। মহান আল্লাহ ইরশাদ করছেন,

وَقَالَ مُوسَى رَبَّنَا إِنَّكَ آَتَيْتَ فِرْعَوْنَ وَمَلَأَهُ زِينَةً وَأَمْوَالًا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا رَبَّنَا لِيُضِلُّوا عَنْ سَبِيلِكَ رَبَّنَا اطْمِسْ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَاشْدُدْ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُوا حَتَّى يَرَوُا الْعَذَابَ الْأَلِيمَ ﴿88﴾ قَالَ قَدْ أُجِيبَتْ دَعْوَتُكُمَا فَاسْتَقِيمَا وَلَا تَتَّبِعَانِّ سَبِيلَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ ﴿89﴾ (يونس:88-89)

আর মূসা বলল, হে আমাদের রব, আপনি ফেরাউন ও তার পারিষদবর্গকে দুনিয়াবী জীবনে সৌন্দর্য ও ধন-সম্পদ দান করেছেন। হে আমাদের রব, যাতে তারা আপনার পথ থেকে গোমরাহ করতে পারে। হে আমাদের রব, তাদের ধন-সম্পদ নিশ্চি‎হ্ন করে দিন, তাদের অন্তরসমূহকে কঠোর করে দিন। ফলে তারা ঈমান আনবে না, যতক্ষণ না যন্ত্রণাদায়ক আযাব দেখে। তিনি বললেন, তোমাদের দোআ কবূল করা হয়েছে। সুতরাং তোমরা দৃঢ় থাক এবং যারা জানে না তাদের পথ অনুসরণ করো না।  [সূরা ইউনুস:৮৮-৮৯]

وَلَا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنْفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِنَ الظَّالِمِينَ ﴿106﴾(يونس:106)

‘আর আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুকে ডেকো না, যা তোমার উপকার করতে পারে না এবং তোমার ক্ষতিও করতে পারে না। অতএব তুমি যদি কর, তাহলে নিশ্চয় তুমি যালিমদের অন-র্ভুক্ত হবে। [সূরা ইউনুস:১০৬]

এই হচ্ছে আল্লাহ তাআলার মনোনীত ও নির্বাচিত, মানবতার শ্রেষ্ঠ সন্তান আম্বিয়া আলাইহিস সালামের দোয়ার স্বরূপ। তাদের প্রত্যেককেই দেখতে পাবে তুমি বিপদ ও মুসিবতের সময় উদ্ধার পাওয়ার জন্য আকাশ জমিনের পালনকর্তা মহান আল্লাহর দিকে দুই হাত উঠিয়ে তাঁকে ডাকছেন এবং তাঁর কাছেই প্রার্থনা করছেন। আমরা তাঁদের অনুসরণ করব না কেন? বল, সাজিদ বল?

সাজিদ: আমি কি বলব?

নাফিস: যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যদের ডাকে, প্রার্থনায় তারা কি বলে ? তারা কি বলে না?

হে হোসাইন! প্ররিত্রাণ দিন। সাহায্য করুন।

হে দাসূকি! আরগ্য দান করুন।

হে বদওয়ি! মদদ করুন।

হে গাউসুল আজম! আমাকে সম্পদ ও সন্তান দান করুন।

অথচ আল্লাহ তাআলা বলছেন,

فَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ فَتَكُونَ مِنَ الْمُعَذَّبِينَ ﴿213﴾ (الشعراء: 213)

অতএব, তুমি আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহকে ডেকো না, তাহলে তুমি আজাবপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত  হয়ে যাবে। [সূরা শুআরা:২১৩]

وَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ لَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ ﴿88﴾ (القصص:88)

আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহকে ডেকো না, তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তাঁর চেহারা (সত্ত্বা) ছাড়া সব কিছুই ধ্বংসশীল, সিদ্ধান্ত তাঁরই এবং তাঁর কাছেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে। [সূরা কাসাস:৮৮]

সাজিদ: সুবহানাল্লাহ! দয়া করে একটু বলুন, দোয়ার ক্ষেত্রে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ কি ছিল?

নাফিস: আজ থাক, এ ব্যাপারে আমরা অন্য সময় কথা বলব। বা-রাকাল্লাহু ফী-কা।

সাজিদকে বিদায় জানিয়ে নাফিস নিজের স্যুটে ফিরে গেলেন। মন-মস্তিষ্ক নানা চিন্তা ও দ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ। এই বন্ধুর জন্য বিস্ময়, সহানুভূতি ও আনন্দ সব একসাথে ভর করেছে চেতনায়।

উঠে গিয়ে আলমিরা থেকে প্যাড ও কলম নিয়ে বন্ধু সাজিদের উদ্দেশ্যে নিম্নোক্ত চিঠি লেখতে বসে পড়লেন।

                     প্রতি,

সাজিদ… যখন চাইবে আল্লাহর কাছে চাইবে।

প্রিয় বন্ধু,

উম্মতের জন্য আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিতাকাঙ্খিতা যাবতীয় সন্দেহ-সংশয়ের উর্ধ্বে। তাদের জন্য তার সীমাহীন স্নেহ-দয়া-সহানুভূতির ব্যাপারে ন্যূনতম সন্দেহের অবকাশ নেই। কেন নয়, তিনি তাঁর দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বোৎকৃষ্ট পন্থায়, নির্ভেজাল আন্তরিকতায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। চেষ্টা-শ্রমের সবটুকু নিংড়ে দিয়েছেন তিনি হেদায়েতের পথে আমাদেরকে আহ্বান করতে গিয়ে। সেই মহানুভব নবী যদি তোমাকে ও আমাকে কোনো নির্দেশ দান করেন, তাহলে তাঁর সেই নির্দেশকে সবকিছুর উপর অগ্রাধিকার দেওয়া যে কোনো বিচারেই ওয়াজিব হবে। আর তিনি পরিস্কার করে বলেছেন,

إذا سألت فاسأل الله.

অর্থাৎ, যখন চাইবে আল্লাহর কাছে চাইবে। [তিরমিজি ২৪৪০ ও আহমাদ ২৫৩৭]

নবীজীর অবদান ও ত্যাগের কথা স্মরণে থাকলে আমি নি:সন্দেহে বলতে পারি, তোমার অন্তর তীব্র ব্যাথা, যন্ত্রণা, পরিতাপ ও নিদরুণ দহণে দগ্ধ হবে যখন গাইরুল্লাহর নিকট কাউকে প্রার্থনা করতে শুনবে। কবরে শায়িত ব্যক্তিবর্গের নিকট দোয়া করতে দেখবে এবং তারই মত আরেকজন মানুষের দারস্থ হতে দেখবে।

প্রিয় ভ্রাতা! তুমি কি বদওয়ি, মিহদার, দাসুকি, জিলানি, খাজাবাবা ও জান্নাতি যুবাদের নেতা হোসাইনের মাজারে মানুষের সমাবেশ ও গাড়ি বহরগুলো দেখছ না? দেখছ না কি রহমতের সমীরে আশ্রয় নেওয়ার কি প্রানান্তকর চেষ্টায় রত তারা। রহমতের শীতলতা উপভোগ করার জন্য কি শ্রম। আচ্ছা তারা কি সফলতার মানদন্ডে উত্তীর্ণ? নাকি অকৃতকার্য? অথচ হোসাইনের নানাজান মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন,

إذا سألت فاسأل الله.

যখন চাইবে আল্লাহর কাছে চাইবে।

বলতো, তারা কি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছে না গাইরুল্লাহর কাছে?

প্রিয় বন্ধু! আমার সাথে আল্লাহর নিম্নোক্ত আয়াত মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করো তো, তিনি বলছেন,

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِي عَنِّي فَإِنِّي قَرِيبٌ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ فَلْيَسْتَجِيبُوا لِي وَلْيُؤْمِنُوا بِي لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ ﴿186﴾

আর যখন আমার বান্দাগণ তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে, আমি তো নিশ্চয় নিকটবর্তী। আমি আহ্বানকারীর ডাকে সাড়া দেই, যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে। আশা করা যায় তারা সঠিক পথে চলবে। [সূরা বাকারা:১৮৬]

তুমি কি চিন্তা করে দেখেছ, কেন তিনি নিকটে? আহ্বানকারীর আহ্বানে কেন তিনি সাড়া দান করেন? তিনি ব্যতীত অন্যকে ডাকার জন্যে? নাকি কেবল তাঁর দারস্থ হয়ে তাঁরই নিকট দোয়া করার জন্যে?

তোমার বিবেক কে প্রশ্ন কর। সিদ্ধান্ত তার কাছে জিজ্ঞেস কর।

আল্লাহ তাআলার বাণী মন দিয়ে শোন, আল্লাহ বলছেন,

لَهُ دَعْوَةُ الْحَقِّ وَالَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ لَا يَسْتَجِيبُونَ لَهُمْ بِشَيْءٍ إِلَّا كَبَاسِطِ كَفَّيْهِ إِلَى الْمَاءِ لِيَبْلُغَ فَاهُ وَمَا هُوَ بِبَالِغِهِ وَمَا دُعَاءُ الْكَافِرِينَ إِلَّا فِي ضَلَالٍ ﴿14﴾

সত্যের আহ্বান তাঁরই, আর যারা তাকে ছাড়া অন্যদেরকে ডাকে, তারা তাদের ডাকে সামান্যও সাড়া দিতে পারে না, বরং (তাদের দৃষ্টান্ত) ঐ ব্যক্তির মত, যে পানির দিকে তার দুহাত বাড়িয়ে দেয় যেন তা তার মুখে পৌঁছে অথচ তা তার কাছে পৌঁছবার নয়। আর কাফেরদের ডাক তো শুধু ভ্রষ্টতায় পর্যবসিত হয়। [ সূরা রা’দ:১৪]

তুমি কি ধারণা করছ, পানি তার মুখে পৌঁছবে?

না, কখনো না। আল্লাহর কসম।

আয়াতের শেষাংশে যা বলা হয়েছে তুমি কি চাও তোমার বিশেষণও তাই হোক? ভাই, আল্লাহর কসম, আমি তোমায় নিয়ে উদ্বিগ্ন।

প্রিয় বন্ধু! আল্লাহর আরেকটি আয়াতের প্রতি লক্ষ্য কর। তিনি বলছেন,

 

وَلِلَّهِ يَسْجُدُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ طَوْعًا وَكَرْهًا وَظِلَالُهُمْ بِالْغُدُوِّ وَالْآَصَالِ ۩﴿15﴾

আর আল্লাহর জন্যই আসমানসমূহ ও যমীনের সবকিছু অনুগত ও বাধ্য হয়ে সিজদা করে এবং সকাল ও সন্ধ্যায় তাদের ছায়াগুলোও। [সূরা রা’দ:১৫]

কি বল, এই আয়াতের পরও আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য সেজদা জায়েয?

তাহলে এর পরের আয়াতটির প্রতি লক্ষ্য কর,

قُلْ مَنْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلِ اللَّهُ قُلْ أَفَاتَّخَذْتُمْ مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ لَا يَمْلِكُونَ لِأَنْفُسِهِمْ نَفْعًا وَلَا ضَرًّا قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيرُ أَمْ هَلْ تَسْتَوِي الظُّلُمَاتُ وَالنُّورُ أَمْ جَعَلُوا لِلَّهِ شُرَكَاءَ خَلَقُوا كَخَلْقِهِ فَتَشَابَهَ الْخَلْقُ عَلَيْهِمْ قُلِ اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ ﴿16﴾

বল, আসমানসমূহ ও যমীনের রব কে ? বল, আল্লাহ। তুমি বল, তোমরা কি তাঁকে ছাড়া এমন কিছুকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেছ, যারা তাদের নিজদের কোন উপকার অথবা অপকারের মালিক না ? বল, অন্ধ ও দৃষ্টিমান ব্যক্তি কি সমান হতে পারে ? নাকি অন্ধকার ও আলো সমান হতে পারে ? নাকি তারা আল্লাহর জন্য এমন কতগুলো শরীক নির্ধারণ করেছে, যেগুলো তাঁর সৃষ্টির তুল্য কিছু সৃষ্টি করেছে, ফলে তাদের নিকট সৃষ্টির বিষয়টি একরকম  মনে হয়েছে ? বল, আল্লাহই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি  এক, পরাক্রমশালী। [সূরা রা’দ:১৬]

না, আল্লাহর শপথ, দৃষ্টিহীন ও দৃষ্টিমান কখনো এক হতে পারে না।

প্রিয় ভাই, এই আয়াতগুলো কি তুমি শুনেছ?

তুমি কি দেখতে পাচ্ছ না স্পষ্টতায় সেগুলো খুবই তীব্র ও ক্ষুরধার? এগুলোর পরও কি আরো দলিল-প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজন আছে?  এতদসত্তেও কিছু লোককে বলতে শুনবে,

ناد عليا مظهر العجائب            تجده عونا لك في النوائب

আলিকে ডাকো বিস্ময়কর বিষয়াদির প্রকাশকর্তা, সঙ্কট ও বিপদে পাবে তোমার সাহায্যকর্তা।

অপর একদল আছে, দেখবে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরে লোহার গ্রীল ঝাপটে ধরে অঝরে কাঁদে কিংবা সাইয়্যেদা জয়নব, খাজাবাবার কবরে গিয়ে গড়াগড়ি খায়, আশা ও ভয় করে, আর খন্ড খন্ড কবিতা আবৃত্তি করে বলে,

لمثل هذا يذوب القلب من كمد         إن كان في القلب إسلام وإيمان

এদের তরে বিবর্ণতা মুক্ত হয়ে অন্তরাত্মা বিগলিত হয়, থাকে যদি তাতে ঈমান ও ইসলাম দ্যূতিময়।

আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আল্লাহ ও রাসূলের মুহাব্বত কিংবা পরকালের চিন্তায় তুমি কাঁদতেই পার, দূরাবস্থার জন্য দুশ্চিন্তা করতেই পার। তাই বলে কি আল্লাহর জমিনে দাঁড়িয়ে গাইরুল্লাহকে ডাকবে? আওলাদে রাসূল, ইমামুল আয়িম্মা ইমাম জাফর সাদেকের বক্তব্যটি একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য কর। তিনি বলেছেন,

আল্লাহর শপথ, আমরাতো কেবলই গোলাম সেই সত্ত্বার যিনি আমাদের সৃষ্টি ও (হেদায়েতের জন্য) মনোনীত করেছেন। আমরা নিজেদের কল্যাণ কিংবা অকল্যাণ কিছুরই ক্ষমতা রাখি না। তিনি যদি আমাদের প্রতি রহম করেন তাহলে সেটি করেন তাঁর করুণায়। আর যদি শাস্তি প্রদান করেন তাহলে আমাদের পাপের কারণে। আল্লাহর শপথ, তাঁর উপর আমাদের কোনো কর্তৃত্ব ( বা দাবি) নেই। তিনি ব্যতীত আমাদের দায়মুক্তির কোনো ব্যবস্থা নেই। আমরা এক সময় মরে যাবো, আমাদেরকে কবরস্থ করা হবে, পুনরুত্থিত হব, একত্রিত করা হবে, (আল্লাহর সম্মুখে) দাঁড়াতে হবে, জিজ্ঞাসিত হব…।

ألم تر أن الحق تلقاه أبلجا        وأنك تلقى باطل القول لجلجا

তুমি কি দেখতে পাচ্ছো না, হক পরিদৃষ্ট হয় কতইনা প্রদীপ্ত, আর বাতিলকে দেখবে তুমি দুর্বোধ্য  ও অবিন্যস্ত।

তুমি গাইরুল্লাহকে ডাকো, কোথায় তোমার বিবেক?

কোথায় গেল তোমার দূরদৃষ্টি?

কোথায় তোমার চক্ষু?

তুমি কি সুস্পষ্ট-মুহকাম আয়াতগুলো দেখনি? আলোকোদ্ভাসিত বাক্যগুলোর প্রতি লক্ষ্য করনি? এতদসত্তেও অনুবর্তী হচ্ছো তাদের, যারা মুতাশাবেহ-অস্পষ্ট আয়াতকে দলিল হিসাবে ব্যবহার করে শিরকের রাস্তা গ্রহণ করেছে। যেমন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَابْتَغُوا إِلَيْهِ الْوَسِيلَةَ ﴿35﴾

হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং তার নৈকট্যের অনুসন্ধান কর। [সূরা মায়েদা:৩৫]

যুক্তি তুলে ধরে তারা বলে, ওসিলা হলো যার মাধ্যমে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছা যায়, তাঁর নৈকট্য হাসিল করা যায়। কথা ঠিক। তাই বলে বনী আদম ও তাদের কবর সমূহকে ওসিলা হিসাবে গ্রহণ করা হবে? নিশ্চয় ওসিলা তোমাদেরকে আল্লাহর নিকট পৌঁছে দেবে, তবে সেগুলো হচ্ছে নেক আমল ও ইবাদত-বন্দেগি।

সুতরাং আয়াতে যে ওসিলা অন্বেষণ করতে বলা হয়েছে তা নেককার বান্দা ও তাদের কবর নয় বরং নেক আমল-ঈমান, তাওহিদ, দোয়া ইত্যাদি।

সাজিদ, সূরা নমলের আয়াতগুলোর প্রতি একটু মনোযোগ দাওতো এর পর প্রতিটি আয়াতের শেষাংশে মহান আল্লাহর বিস্ময়কর সম্বোধনগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখ। ইরশাদ হচ্ছে,

أَمَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَأَنْزَلَ لَكُمْ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَنْبَتْنَا بِهِ حَدَائِقَ ذَاتَ بَهْجَةٍ مَا كَانَ لَكُمْ أَنْ تُنْبِتُوا شَجَرَهَا أَئِلَهٌ مَعَ اللَّهِ بَلْ هُمْ قَوْمٌ يَعْدِلُونَ ﴿60﴾ أَمَّنْ جَعَلَ الْأَرْضَ قَرَارًا وَجَعَلَ خِلَالَهَا أَنْهَارًا وَجَعَلَ لَهَا رَوَاسِيَ وَجَعَلَ بَيْنَ الْبَحْرَيْنِ حَاجِزًا أَئِلَهٌ مَعَ اللَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ ﴿61﴾ أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ أَئِلَهٌ مَعَ اللَّهِ قَلِيلًا مَا تَذَكَّرُونَ ﴿62﴾ أَمَّنْ يَهْدِيكُمْ فِي ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَنْ يُرْسِلُ الرِّيَاحَ بُشْرًا بَيْنَ يَدَيْ رَحْمَتِهِ أَئِلَهٌ مَعَ اللَّهِ تَعَالَى اللَّهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴿63﴾ أَمَّنْ يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَمَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَئِلَهٌ مَعَ اللَّهِ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ ﴿64﴾

বরং তিনি (শ্রেষ্ঠ), যিনি আসমানসমূহ ও যমীনকে সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের জন্য তিনি আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর তা দ্বারা আমি মনোরম উদ্যান সৃষ্টি করি। তার বৃক্ষাদি উৎপন্ন করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে? বরং তারা এমন এক কওম যারা শির্‌ক করে।

বরং তিনি, যিনি যমীনকে আবাসযোগ্য করেছেন এবং তার মধ্যে প্রবাহিত করেছেন নদী-নালা। আর তাতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা এবং দুই সমুদ্রের মধ্যখানে অন্তরায় সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।

বরং তিনি, যিনি নিরুপায়ের আহবানে সাড়া দেন এবং বিপদ দূরীভূত করেন এবং তোমাদেরকে যমীনের প্রতিনিধি বানান। আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে ? তোমরা কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাক।

বরং তিনি, যিনি তোমাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথ দেখান এবং যিনি স্বীয় রহমতের প্রাক্কালে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন। আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে? তারা যা কিছু শরীক করে আল্লাহ তা থেকে ঊর্ধ্বে।

বরং তিনি, যিনি সৃষ্টির সূচনা করেন, তারপর তার পুনরাবৃত্তি করবেন এবং যিনি তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে রিযিক দান করেন, আল্লাহর সাথে কি কোন ইলাহ আছে? বল, তোমাদের প্রমাণ নিয়ে এসো যদি তোমরা সত্যবাদী হও। [সূরা নমল:৬০-৬৪]

আয়াতগুলোর প্রতি লক্ষ্য করে দেখ। প্রতিটি আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ কত সন্দর করে নিজের শক্তিমত্তা, অসাধারণত্ব, তুলনাহীন সামর্থ্যের কথা ঘোষণার পাশিপাশি অন্য সব উপাস্যকে চ্যালেঞ্জ করে তাদের বাতুলতা প্রমাণ করেছেন। দেখ কেমন সুন্দর আল্লাহর বর্ণনা, 

أَئِلَهٌ مَعَ اللَّهِ بَلْ هُمْ قَوْمٌ يَعْدِلُونَ ﴿60﴾

আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে? বরং তারা এমন এক কওম যারা শির্‌ক করে।

أَئِلَهٌ مَعَ اللَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ ﴿61﴾

আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।

أَئِلَهٌ مَعَ اللَّهِ قَلِيلًا مَا تَذَكَّرُونَ ﴿62﴾

আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে ? তোমরা কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাক।

أَئِلَهٌ مَعَ اللَّهِ تَعَالَى اللَّهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴿63﴾

আল্লাহর সাথে কি অন্য কোন ইলাহ আছে? তারা যা কিছু শরীক করে আল্লাহ তা থেকে ঊর্ধ্বে।

أَئِلَهٌ مَعَ اللَّهِ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ ﴿64﴾

আল্লাহর সাথে কি কোন ইলাহ আছে? বল, তোমাদের প্রমাণ নিয়ে এসো যদি তোমরা সত্যবাদী হও।

সূরা শুআরাতে ইরশাদ হচ্ছে,

فَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ فَتَكُونَ مِنَ الْمُعَذَّبِينَ ﴿213﴾

অতএব, তুমি আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহকে ডেকো না, তাহলে তুমি আযাবপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত  হয়ে যাবে। [সূরা শুআরা:২১৩]

সূরা ক্বাফ-এও মহান আল্লাহ এ বিষয়ে সাবধান করেছেন।

الَّذِي جَعَلَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ فَأَلْقِيَاهُ فِي الْعَذَابِ الشَّدِيدِ ﴿26﴾

যে আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহ গ্রহণ করেছিল, তোমরা তাকে কঠিন আযাবে নিক্ষেপ কর। [সূরা ক্বাফ:২৬]

দেখেছ হকের প্রভাব ও দাপট কি? দলিলের স্পষ্টতা, ওজন ও ক্ষমতার প্রতি লক্ষ্য করে দেখ। এটিই হচ্ছে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বীন। এটিই তাঁর ওলি-আউলিয়াদের ধর্ম ও মতবাদ। এটিই তাদের আদর্শ। এটিই তাদের আকিদা। এবার চিন্তা করে দেখ, তাদের তুলনায় আমরা কোথায়? তাদের আদর্শ ও মতবাদের বাস্তবায়ন থেকে আমাদের অবস্থান কোথায়?

আকাশ বিদীর্ণ হবার উপক্রম হয়, পাহাড় চৌচির হয়ে যেতে চায়, যখন শুনতে পায় বনী আদম প্রয়োজন মিটানোর জন্য আল্লাহকে বাদ দিয়ে জিলানি, রেফায়ি, মিহদার, খাজাবাবা বলে চিৎকার করে।

আফসোস… হাজার আফসোস…! হে আল্লাহর ওলিবৃন্দ, আপনাদের নামে আল্লাহর দ্বীনে কত মিথ্যা রটানো হচ্ছে, আপনাদের মুহাব্বত প্রকাশ করতে যেয়ে শরিয়তের উপর কত উদ্ভট বানাওটি করা হয়েছে।

বন্ধু, আমার সাথে নিম্নোক্ত আয়াতটি একটু পর্যবেক্ষণ করে দেখ, রাহমানুর রাহিম বলছেন,

إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ عِبَادٌ أَمْثَالُكُمْ فَادْعُوهُمْ فَلْيَسْتَجِيبُوا لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ ﴿194﴾

আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে তোমরা ডাক তারা তোমাদের মত বান্দা। সুতরাং তোমরা তাদেরকে ডাক। অতঃপর তারা যেন তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।[সূরা আ’রাফ:১৯৪]

আয়াত থেকে তোমার কি বুঝে আসছে? কি তোমার অনুভূতি? বিপদাপদ, সঙ্কট-মুসিবতে দাসূকি, খাজাবাবাদের ডাকতে হবে? ।

দুশ্চিন্তার সময় হোসাইনকে আহ্বান করতে হবে?

দু:সময়ে মিহদার, গাওছুল আজমের নিকট আশ্রয় নিতে হবে?

কোথায় তোমার বিবেক?

কোথায় তোমার চক্ষু?

কোথায় তোমার অন্তর্দৃষ্টি-অনুভূতি ?

এটি আমাদের সৃষ্টিকর্তা-মালিক-নিয়ন্ত্রক, রিজিকদাতা-প্রতিপালক মহান আল্লাহর কালাম। আকাশ জমিনে যার রাজত্ব বিরাজমান। যিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

তুমি কি জান আল্লাহ কে? তাঁর কাছ থেকেই তাঁর পরিচয় শোন।

قُلْ مَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّنْ يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَنْ يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَنْ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ ﴿31﴾

বল, আসমান ও যমীন থেকে কে তোমাদের রিয্‌ক দেন? অথবা কে (তোমাদের) শ্রবণ ও দৃষ্টিসমূহের মালিক? আর কে মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন আর জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন? কে সব বিষয় পরিচালনা করেন? তখন তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ’। সুতরাং, তুমি বল, ‘তারপরও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না’? [সূরা ইউনুস:৩১]

قُلْ لِمَنِ الْأَرْضُ وَمَنْ فِيهَا إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿84﴾ سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ ﴿85﴾ قُلْ مَنْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ السَّبْعِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ ﴿86﴾ سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ ﴿87﴾ قُلْ مَنْ بِيَدِهِ مَلَكُوتُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ يُجِيرُ وَلَا يُجَارُ عَلَيْهِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ ﴿88﴾ سَيَقُولُونَ لِلَّهِ قُلْ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ ﴿89﴾

বল, ‘তোমরা যদি জান তবে বল, ‘এ যমীন ও এতে যারা আছে তারা কার?’অচিরেই তারা বলবে, ‘আল্লাহর’। বল, ‘তবুও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?’বল, ‘কে সাত আসমানের রব এবং মহা আরশের রব? তারা বলবে, ‘আল্লাহ’। বল, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?,বল, ‘তিনি কে যার হাতে সকল কিছুর কর্তৃত্ব, যিনি আশ্রয় দান করেন এবং যাঁর ওপর কোন আশ্রয়দাতা নেই? যদি তোমরা জান। তারা বলবে, ‘আল্লাহ’। বল, ‘তবুও কীভাবে তোমরা মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছ? [সূরা মুমিনূন : ৮৪-৮৯]

আয়াতের শেষাংশ فَأَنَّى تُسْحَرُونَ  [তবুও তোমরা কীভাবে মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছ?] একটু গভীরভাবে অনুধাবন করতো।

লোকেরা রাত্রি অতিবাহিত করেছে মোহাচ্ছন্ন অবস্থায়।

সাজিদ -কোরআন তেলায়াত, সালাত আদায়, সদকা, আল্লাহর ওলিদের তরে কান্নাকাটি, তাদের মুহাব্বত এবং তাদের সাথে সাক্ষাত করার সময়- তোমার অন্তরে প্রশ্ন জাগতে পারে, এই সব ইবাদত আল্লাহর নিকট নিষ্ফল হয়ে যাবে?

আমি বলি, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম, এগুলো সবই তোমাকে উত্তম ফল দিবে, আল্লাহর নিকট তোমার বড় পুঁজি এগুলো। তবে নিম্নোক্ত আয়াতটিতে সামান্য মনোনিবেস কর। আল্লাহ বলছেন,

وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ ﴿106﴾

তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তবে (ইবাদাতে) শির্‌ক করা অবস্থায়। [সূরা ইউসুফ: ১০৬]

জান, এই আয়াতের অর্থ কি? অর্থ হচ্ছে, অনেক লোক আছে যারা  আল্লাহর প্রতি  ঈমান এনেছে, তাঁকে সৃষ্টিকর্তা ও রিজিকদাতা বলে স্বীকৃতিও প্রদান করেছে, এতদসত্তেও তারা তাঁর সাথে শিরককারী যদিও তারা সালাত আদায় করে, সিয়াম পালন করে। কারণ তারা আল্লাহর ইবাদত ও প্রার্থনার ক্ষেত্রে তাঁর শরীক নির্ধারণ করেছে।

তোমার মনে আরো একটি ভাবনার উদয় হতে পারে, যেমন অনেকে বলে থাকে, আমরা কবরের ইবাদত করি, হোসাইনকে বিপদাপদে ডাকাডাকি করি, বদওয়ির শরণাপন্ন হই, রেফায়ির নিকট সাহায্য প্রার্থনা করি, এসব করি কেবল এই জন্য যে তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন নেককার ও আল্লাহর প্রিয় বান্দা। যথাযথভাবে আল্লাহর ইবাদত করেছেন। যথার্থ পন্থায় তাঁর তাওহিদকে ধারণ করেছেন। নিজেদের ঈমান ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তাঁরা ছিলেন আন্তরিক ও মুখলিস। এসব কারণে তাঁরা আপন প্রতিপালকের নৈকট্য সাধন করেছেন। তাই আমরা আল্লাহর নিকট তাদের নৈকট্য কামনা করি যাতে তারা আমাদেরকে তাঁর নৈকট্যপ্রাপ্ত করেদেন। সন্দেহ নেই, এই ধরনের ধারণা ও বক্তব্য শয়তানের প্রবঞ্চনা ও প্রতারণা।

নিম্নোক্ত আয়াতে লক্ষ্য করে দেখ আল্লাহ কি বলছেন,

أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِنْ دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَى إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ ﴿3﴾

জেনে রেখ, আল্লাহর জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদাত-আনুগত্য। আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, আমরা কেবল এজন্যই তাদের ‘ইবাদাত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে। যে বিষয়ে তারা মতভেদ করছে আল্লাহ নিশ্চয় সে ব্যাপারে তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না। [সূরা যুমার: ৩]

আয়াতে দৃষ্টি প্রক্ষেপণ করো। কি, উভয় অবস্থার মাঝে সামঞ্জস্য দেখতে পাচ্ছো না? আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। তুমি কি জান তারা কি চায়? তারা আল্লাহর নৈকট্য চায় কিন্তু রাস্তা গ্রহণ করেছে ভুল। এমন বহু কল্যাণ প্রত্যাশী আছে কিন্তু তারা তা অর্জন করতে পারেনি। আয়াতের শেষাংশ গভীরভাবে প্রত্যক্ষ কর।

প্রিয় ভাই, তুমি কি আল্লাহর কিতাব পড়েছ? তার থেকে কিছু হৃদয়ঙ্গম করেছ? গভীরভাবে চিন্তা করেছ? তার আয়াত সমূহে পর্যবেক্ষণ করেছ কি?

তুমি কি তা উপেক্ষা করবে? এই অমনোযোগিতা কতদিন চলতে থাকবে?

পরকালের জন্য কিছু সঞ্চয় করেছ কি? কি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ তার জন্য? আল্লাহর কাছে নিজ ব্যাপারে কি অজুহাত দাঁড় করাবে? নিজেকে বাঁচানোর জন্য কি যুক্তি উপস্থাপন করবে?

আল্লাহর তাওহিদ ও একত্ববাদের প্রতি নির্দেশকারী বহু অকাট্য আয়াত শুনলে, এখন তাঁর শাস্তি থেকে নিজেকে কিভাবে রক্ষা করবে?

হিসাব-নিকাশের দিন উম্মত সম্বন্ধে চিন্তা করেছ কি। যারা ভয়ে নতজানু হয়ে থাকবে, প্রতিটি উম্মতকে তার আমলনামার দিকে ডাকা হবে।

হাশর-নশর সম্পর্কে ভেবেছ কিছু?

হিসাব ও প্রতিদান সম্বন্ধে চিন্তা করেছ কি?

ভেবেছ কি, সেই দিন তুমি হবে একাকি। কোনো সাথি-সঙ্গী নেই। নেই কোনো বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, সহমর্মী। সাথী হবে কেবল সম্পাদিত নেক আমল।

يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ﴿34﴾ وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ﴿35﴾ وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ ﴿36﴾ لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ ﴿37﴾

সেদিন মানুষ পালিয়ে যাবে তার ভাই থেকে, তার মা ও তার বাবা থেকে, তার স্ত্রী ও তার সন্তান-সন্ততি থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই একটি গুরুতর অবস্থা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে।[সূরা আবাসা:৩৪-৩৭]

পরিশেষে বলি হে আমার প্রিয় ভাই, দীনি দায়িত্ববোধ থেকে আমি তোমার নিকট বিষয়গুলো সুস্পষ্ট করে চিঠিটি প্রেরণ করলাম। আশা করছি তুমি বিবেক ও বোধ দিয়ে সেগুলো অনুধাবনের সর্বাত্মক চেষ্টা করবে।

রাসূলের বংশধর হতে আগত ইমামগণ অনুরূপভাবে আল্লাহর নেকবান্দা ওলি-আউলিয়াগণ আমাদের ইমাম। তাঁরা দীনদারি, তাকওয়া-পরহেজগারি, ইসলামি সভ্যতা ও রাসূল প্রদর্শিত আদর্শে নিজেদের গড়েছেন। আল্লাহর চাহিদার কাছে নিজেদের বিলীন করে তাঁর হুকুম-আহকাম পালন করেছেন সর্বোচ্চ আন্তরিকতায়। উম্মতের শ্রেষ্ঠ সন্তান তারা। কিন্তু আল্লাহর প্রশ্নে তারা তাঁর বান্দা। তাঁর ইবাদত করাই তাদের দায়িত্ব। কুল মানবতার সাথে তারাও সেই নির্দেশে নির্দেশিত। তারাও আল্লাহর নিম্নোক্ত আয়াতের সম্বোধিত,

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ ﴿56﴾

আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদাত করবে। [সূরা জারিয়াত:৫৬]

সুতরাং তারা আল্লাহর প্রশ্নে অন্য সকল মানুষের ন্যায় তাঁর বান্দা। রব নয়। অতএব তাদের নিকট সাহায্য প্রার্থনা ও দোয়া করা বৈধ নয়।

আল্লাহ তোমাকে ও আমাকে সঠিক পথের হেদায়াত দান করুন। শত কোটি দরূদ ও সালাম আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর, তার পরিবার-পরিজন ও সাহাবাদের উপর।

 

(লেখাটি আল-বয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধের ছায়াবলম্বনে লেখা হয়েছে।)

সমাপ্ত

أهوال القيامة وما بعدها কেয়ামতের ভয়াবহতা ও তারপর

প্রথম অধ্যায়:
বরযখের শাস্তি ও সুখ
হে আল্লাহর বান্দা! মৃত্যুর পর থেকে নিয়ে কেয়ামত পর্যন্ত সময়টাকে বলা হয় বরযখ।
আর আপনি অবশ্যই জানেন যে, আখেরাতের প্রথম মনযিল হল কবর। মৃত্যু বরণ করার পরপরই মৃত ব্যক্তির উপর ছোট কিয়ামত কায়েম হয়ে যায়। মৃত ব্যক্তিকে কবরস্থ করার পর প্রতি সকালে ও প্রতি বিকালে তাকে তার ঠিকানা দেখানো হয়। যদি সে জাহান্নামী হয় তবে জাহান্নাম দেখানো হয়। যদি জান্নাতী হয়, তাহলে জান্নাত দেখানো হয়। ঈমানদারের কবরকে প্রশস্ত করে দেয়া হয়। উত্থান দিবস পর্যন্ত তাকে এভাবে তাকে সুখ-শান্তিতে রাখা হয়।
আর যে কাফের তার কবরকে সংকুচিত করে দেয়া হয়। হাতুরী দিয়ে পিটানো হয়।
কবর থেকে উত্থিত না হওয়া পর্যন্ত এ সময়টা হল বরযখী জীবন।

মৃত্যুকালীন অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা
আল্লাহ তাআলা বলেন :
حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ ﴿99﴾ لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ كَلَّا إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا وَمِنْ وَرَائِهِمْ بَرْزَخٌ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ ﴿100﴾
অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু আসে, সে বলে, হে আমার রব, আমাকে ফেরত পাঠান, যেন আমি সৎকাজ করতে পারি যা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম।’ কখনো নয়, এটি একটি বাক্য যা সে বলবে। যেদিন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে সেদিন পর্যন্ত তাদের সামনে থাকবে বরযখ।” সূরা আল মুমিনূন, আয়াত ৯৯-১০০

এ আয়াত থেকে আমরা যা শিখতে পেলাম :
১- যখন মৃত্যু উপস্থিত হবে তখন মানুষের চোখ খুলে যাবে। সে তখন ভাল কাজ সম্পাদন করার জন্য আরো সময় কামনা করবে। কিন্তু তাকে আর সময় দেয়া হবে না।
২- মৃত্যুর সময় এ ধরনের প্রার্থনা অনর্থক। এতে কোন ফল বয়ে আনে না।
৩- বরযখ এর প্রমাণ পাওয়া গেল।
৪- বরযখী জীবন শুরু হয় মৃত্যু থেকে আর শেষ হবে পুনরুত্থান দিবসে।
আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ
فَوَقَاهُ اللَّهُ سَيِّئَاتِ مَا مَكَرُوا وَحَاقَ بِآَلِ فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَذَابِ ﴿45﴾ النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آَلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ ﴿46﴾
অতঃপর তাদের ষড়যন্ত্রের অশুভ পরিণাম থেকে আল্লাহ তাকে রক্ষা করলেন আর ফিরআউনের অনুসারীদেরকে ঘিরে ফেলল কঠিন আযাব। আগুন, তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় তার সামনে উপস্থিত করা হয়, আর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে (সেদিন ঘোষণা করা হবে), ফিরআউনের অনুসারীদেরকে কঠোরতম আযাবে প্রবেশ করাও।”(সূরা আল গাফির, আয়াত ৪৫-৪৬)
এ আয়াত থেকে আমরা যা শিখতে পেলাম :
১- মুসা আলাইহিস সালাম ও তার অনুসারীদের আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ফেরাউনের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করলেন।
২- ফেরআউনের অনুসারীদের পতন হল।
৩- প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় তাদের দোযখ দেখানো হয়। এ কথা দিয়ে বরযখ ও তার শাস্তির বিষয়টি আবারও প্রমাণিত হল।
৪- কেয়ামেতর পর অপরাধীদের যে শাস্তি হবে সেটা বরযখের শাস্তির চেয়ে কঠোরতম হবে।
এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে :
عن البراء بن عازب قال خرجنا مع رسول الله صلى الله عليه وسلم في جنازة رجل من الأنصار فانتهينا إلى القبر ولما يلحد فجلس رسول الله صلى الله عليه وسلم وجلسنا حوله كأن على رؤوسنا الطير وفي يده عود ينكت بها في الأرض طويلا فرفع رأسه فقال أعوذ بالله من عذاب القبر قالها مرتين أو ثلاثا ثم قال إن العبد المؤمن إذا كان في انقطاع من الدنيا وإقبال من الآخرة بعث الله إليه ملائكة من السماء بيض الوجوه كأن وجوههم الشمس حتى يقعدوا منه مد البصر معهم كفن من أكفان الجنة وحنوط من حنوط الجنة ويجيء ملك الموت حتى يقعد عند رأسه فيقول أيتها النفس الطيبة اخرجي إلى مغفرة من الله ورضوان فتخرج تسيل كما تسيل القطرة[من] في السقاء فيأخذها فإذا أخذها لم يدعوها في يده طرفة عين حتى يأخذوها فيحولوها في ذلك الحنوط ثم يصعدون بها ويخرج منها كأطيب نفحة مسك وجدت على الأرض فيصعدون بها إلى السماء الدنيا فيستفتح فيفتح لها فلا يمرون بأهل سماء إلا قالوا ما هذا الروح الطيب فيقولون فلان بن فلان بأحسن أسمائه الذي كان يسمى بها في الدنيا حتى ينتهي بها إلى السماء الدنيا فيستفتحون له فيفتح له فيشيعه من كل سماء مقربوها إلى السماء التي تليها حتى ينتهي بها إلى السماء السابعة فيقول الله تعالى ذكره اكتبوا كتابه في عليين وأعيدوه إلى الأرض فإنى منها خلقتهم وفيها أعيدهم ومنها أخرجهم تارة أخرى فتعاد روحه في جسده ويأتيه ملكان فيجلسانه فيقولان من ربك فيقول ربي الله فيقولان ما دينك فيقول ديني الإسلام فيقولان ما هذا الرجل الذي بعث فيكم فيقول هو رسول الله صلى الله عليه وسلم فيقولان له وما يدريك فيقول قرأت في كتاب الله فآمنت به وصدقت فينادي مناد من السماء أن صدق عبدي قال فذلك قوله { يثبت الله الذين آمنوا بالقول الثابت في الحياة الدنيا وفي الآخرة } فينادي مناد من السماء أن صدق عبدي فأفرشوه من الجنة وألبسوه منها وافتحوا له بابا إلى الجنة فيأتيه من روحها ومن طيبها ويفسح له في قبره مد بصره ويأتيه رجل حسن الوجه حسن الثياب طيب الريح فيقول أبشر بالذي يسرك فهذا يومك الذي كنت توعد فيقول من أنت فوجهك الوجه يجيء بالخير فيقول أنا عملك الصالح فيقول رب أقم الساعة رب أقم الساعة حتى أرجع إلى أهلي ومالي وإن العبد الفاجر أو الآخر إذا كان في انقطاع من الدنيا وإقبال من الآخرة نزل عليه من السماء ملائكة سود الوجوه معهم أكفان المسوح حتى يجلسوا منه مد البصر ويجيء ملك الموت فيجلس عند رأسه فيقول أيتها النفس الخبيثة اخرجي إلى سخط من الله وغضب فتفرق في جسده تنقطع معها العروق والعصب كما ينزع السفود من الصوف المبلول فيأخذها فإذا وقعت في يده لم يدعوها في يده طرفة عين حتى يأخذوها فيضعوها في تلك المسوح ثم يصعدوا بها ويخرج منها كأنتن ريح جيفة وجدت على الأرض فيصعدون فلا يمرون على ملأ من الملائكة إلا قالوا ما هذا الروح الخبيث قال فيقولون فلان بأقبح أسمائه التي كان يسمى بها في الدنيا حتى ينتهوا بها إلى السماء الدنيا فيستفتحون له فلا يفتح له ثم قرأ رسول الله صلى الله عليه وسلم ( لا تفتح لهم أبواب السماء ولا يدخلون الجنة حتى يلج الجمل في سم الخياط) فيقول الله تعالى ذكره اكتبوا كتابه في أسفل أرض في سجين في الأرض السفلى وأعيدوه إلى الأرض قال فتطرح روحه ثم قرأ (ومن يشرك بالله فكأنما خر من السماء فتتخطفه الطير أو تهوي به الريح في مكان سحيق) فتعاد روحه في جسده ويأتيه ملكان فيجلسانه فيقولان له من ربك فيقول: هاه هاه لا أدري فيقولان ما دينك فيقول هاه هاه لا أدري فيقولان ما هذا الرجل الذي بعث فيكم فيقول هاه هاه لا أدري فينادي مناد من السماء أن كذب فأفرشوه من النار وألبسوه من النار وافتحوا له بابا من النار فيأتيه من حرها وسمومها ويضيق عليه قبره حتى تختلف فيه أضلاعه ويأتيه رجل قبيح الوجه قبيح الثياب منتن الريح فيقول أبشر بالذي يسوؤك هذا يومك الذي كنت توعد فيقول من أنت فوجهك الوجه يجيء بالشر فيقول أنا عملك الخبيث فيقول رب لا تقم الساعة رب لا تقم الساعة.
رواه أحمد وأبو داود والحاكم وصححه الألباني في أحكام الجنائز
বারা ইবনে আযেব রা. থেকে বর্ণিত, এক আনসারী ব্যক্তির দাফন-কাফনের জন্য আমরা একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে বের হলাম। আমরা কবরের কাছে পৌছে গেলাম তখনও কবর খোড়া শেষ হয়নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে বসলেন। আমরা তাঁর চার পাশে এমনভাবে বসে গেলাম যেন আমাদের মাথার উপর পাখি বসেছে। আর তাঁর হাতে ছিল চন্দন কাঠ যা দিয়ে তিনি মাটির উপর মৃদু পিটাচ্ছিলেন। তিনি তখন মাথা জাগালেন আর বললেন, তোমরা কবরের শাস্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। কথাটি তিনি দু বার কিংবা তিন বার বললেন। এরপর তিনি আরো বললেন, যখন কোন ঈমানদার বান্দা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে আখেরাতের দিকে যাত্রা করে তখন আকাশ থেকে তার কাছে ফেরেশতা আসে। তাদের চেহারা থাকবে সূর্যের মত উজ্জল। তাদের সাথে থাকবে জান্নাতের কাফন ও সুগন্ধি। তারা তার চোখ বন্ধ করা পর্যন্ত তার কাছে বসে থাকবে। মৃত্যুর ফেরেশতা এসে তার মাথার কাছে বসবে। সে বলবে, হে সুন্দর আত্মা! তুমি আল্লাহ তাআলার ক্ষমা ও তার সন্তুষ্টির দিকে বেরিয়ে এসো। আত্মা বেরিয়ে আসবে যেমন বেড়িয়ে আসে পান-পাত্র থেকে পানির ফোটা। সে আত্মাকে গ্রহণ করে এক মুহুর্তের জন্যেও ছাড়বে না। তাকে সেই জান্নাতের কাফন পরাবে ও সুগন্ধি লাগাবে। পৃথিবিতে যে মিশক আছে সে তার চেয়ে বেশী সুগন্ধি ছড়াবে। তাকে নিয়ে তারা আসমানের দিকে যেতে থাকবে। আর ফেরেশতাদের প্রতিটি দল বলবে, কে এই পবিত্র আত্মা? তাদের প্রশ্নের উত্তরে তারা তার সুন্দর নাম নিয়ে বলবে যে, অমুক অমুকের ছেলে। এমনিভাবে প্রথম আসমানে চলে যাবে। তার জন্য প্রথম আসমানের দরজাগুলো খুলে দেয়া হবে। এমনি করে প্রতিটি আসমান অতিক্রম করে যখন সপ্তম আসমানে যাবে তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলবেন, আমার বান্দা আমলনামাটা ইল্লিয়ীনে লিখে দাও। আর আত্মাটা দুনিয়াতে তার দেহের কাছে পাঠিয়ে দাও। এরপর কবরে প্রশ্নোত্তরের জন্য দুজন ফেরেশতা আসবে। তারা প্রশ্ন করবে, তোমার প্রভূ কে? সে বলবে আমার প্রভূ আল্লাহ। তারা প্রশ্ন করবে, তোমার ধর্ম কি? সে উত্তর দেবে, আমার ধর্ম ইসলাম। তারা প্রশ্ন করবে এই ব্যক্তিকে চেন, যাকে তোমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে? সে উত্তরে বলবে, সে আল্লাহর রাসূল। তারা বলবে, তুমি কিভাবে জানলে? সে উত্তরে বলবে, আমি আল্লাহর কিতাব পাঠ করেছি। তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি। তাকে সত্য বলে স্বীকার করেছি।
তখন আসমান থেকে একজন আহবানকারী বলবে, আমার বান্দা অবশ্যই সত্য বলেছে। তাকে জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও। তার কবর থেকে জান্নাতের একটি দরজা খুলে দাও। জান্নাতের সুঘ্রাণ ও বাতাস আসতে থাকবে। যতদূর চোখ যায় ততদূর কবর প্রশস্ত করে দেয়া হবে। তার কাছে সুন্দর চেহারার সুন্দর পোশাক পরিহিত সুগন্ধি ছড়িয়ে এক ব্যক্তি আসবে। সে তাকে বলবে, তুমি সুসংবাদ নাও। সূখে থাকো। দুনিয়াতে এ দিনের ওয়াদা দেয়া হচ্ছিল তোমাকে।
মৃত ব্যক্তি সুসংবাদ দাতা এ ব্যক্তিকে সে জিজ্ঞেস করবে, তুমি কে? সে উত্তরে বলবে, আমি তোমার নেক আমল (সৎকর্ম)। তখন সে বলবে, হে আমার রব! কেয়ামত সংঘটিত করুন! হে আমার রব! কেয়ামত সংঘটিত করুন!! যেন আমি আমার সম্পদ ও পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারি।
আর যখন কোন কাফের দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে আখেরাত পানে যাত্রা করে তখন তার কাছে কালো চেহারার ফেরেশতা আগমন করে। তার সাথে থাকে চুল দ্বারা তৈরী কষ্ট দায়ক কাপর। তারা চোখ বুজে যাওয়া পর্যন্ত তার কাছে বসে থাকে। এরপর আসে মৃত্যুর ফেরেশতা। তার মাথার কাছে বসে বলে, হে দুর্বিত্ত পাপিষ্ট আত্মা বের হয়ে আল্লাহর ক্রোধ ও গজবের দিকে চলো। তখন তার দেহে প্রচন্ড কম্পন শুরু হয়। তার আত্মা টেনে বের করা হয়, যেমন আদ্র রেশমের ভিতর থেকে লোহার ব্রাশ বের করা হয়। যখন আত্মা বের করা হয় তখন এক মুহুর্তের জন্যও ফেরেশতা তাকে ছেড়ে দেয় না। সেই কষ্টদায়ক কাপড় দিয়ে তাকে পেচিয়ে ধরে। তার লাশটি পৃথিবীতে পড়ে থাকে। আত্মাটি নিয়ে যখন উপরে উঠে তখন ফেরেশতারা বলতে থাকে কে এই পাপিষ্ট আত্মা? তাদের উত্তরে তার নাম উল্লেখ করে বলা হয় অমুক, অমুকের ছেলে। প্রথম আসমানে গেলে তার জন্য দরজা খোলার অনুরোধ করা হলে দরজা খোলা হয় না।
এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ আয়াতটি পাঠ করলেন:
لَا تُفَتَّحُ لَهُمْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَلَا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى يَلِجَ الْجَمَلُ فِي سَمِّ الْخِيَاطِ
অর্থাৎ : তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না উট সূঁচের ছিদ্রতে প্রবেশ করে। (সূরা আরাফ, আয়াত ৪০)
অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, তার আমলনামা সিজ্জীনে লিখে দাও যা সর্ব নিম্ন স্তর। এরপর তার আত্মাকে পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হবে।
এ কথা বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ আয়াতটি পাঠ করেন :
وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سَحِيقٍ
অর্থাৎ : আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল কিংবা বাতাস তাকে দূরের কোন জায়গায় নিক্ষেপ করল। (সূরা আল হজ, আয়াত : ৩১)
এরপর তার দেহে তার আত্মা চলে আসবে। দু ফেরেশতা আসবে। তাকে বসাবে। এরপর তাকে জিজ্ঞেস করবে, তোমার প্রভূ কে? সে বলবে, হায়! হায়!! আমি জানি না। তারা তাকে আবার জিজ্ঞেস করবে, তোমার ধর্ম কি? সে বলবে, হায়! হায়!! আমি জানি না। তারপর জিজ্ঞেস করবে, এ ব্যক্তি কে যাকে তোমাদের মধ্যে পাঠানো হয়েছিল? সে উত্তর দেবে, হায়! হায়!! আমি জানি না। তখন আসমান থেকে এক আহবানকারী বলবে, সে মিথ্যা বলেছে। তাকে জাহান্নামের বিছানা বিছিয়ে দাও। জাহান্নামের একটি দরজা তার জন্য খুলে দাও। জাহান্নামের তাপ ও বিষাক্ততা তার কাছে আসতে থাকবে। তার জন্য কবরকে এমন সঙ্কুচিত করে দেয়া হবে যাতে তার হাড্ডিগুলো আলাদা হয়ে যাবে। তার কাছে এক ব্যক্তি আসবে যার চেহার বিদঘুটে, পোশাক নিকৃষ্ট ও দুর্গন্ধময়। সে তাকে বলবে, যে দিনের খারাপ পরিণতি সম্পর্কে তোমাকে বলা হয়েছিলো তা আজ উপভোগ করো। সে এই বিদঘুটে চেহারার লোকটিকে জিজ্ঞেস করবে, তুমি কে? সে বলবে, আমি তোমার অসৎকর্ম। এরপর সে বলবে, হে প্রভূ! আপনি যেন কেয়ামত সংঘটিত না করেন।
বর্ণনায়: আহমদ, আবু দাউদ, হাকেম। আলবানী রহ. আহকামুল জানায়িয কিতাবে এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
এ হাদীস থেকে আমরা যা জানতে পারলাম :
১- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সঙ্গী সাথিদের নিয়ে অন্যের দাফন-কাফনে অংশ গ্রহণ করতেন।
২- কবরের শাস্তির বিষয়টি একটি সত্য বিষয়। এটি বিশ্বাস করা ঈমানের অংশ।
৩- কবরের শাস্তি থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় চাওয়া সুন্নত।
৪- ঈমানদার ও বেঈমানের মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য।
৫- কবরে যাওয়ার পর ঈমানদার তার পুরস্কার ও প্রতিদান পাওয়ার জন্য কেয়ামত তাড়াতাড়ি কামনা করবে। আর বেঈমান মনে করবে কেয়ামত কায়েম হলে তাদের জাহান্নামের আজাব শুরু হয়ে যাবে। তাই তারা কেয়ামত কামনা করবে না।
৬- ওয়াজ ও নসীহতের সময় কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করেছেন ও কুরআন থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছে রাসূলুল্লাহ সা.।
৭- কবরে ফেরেশতাদের প্রশ্ন ও তার উত্তর দেয়া একটি সত্য বিষয়। এর প্রতি বিশ্বাস রাখা ঈমানের অংশ।
৮- ইল্লিয়্যীন ও সিজ্জিনের পরিচয় জানা গেল। এ দুটি জান্নাত ও জাহান্নামের অংশ বিশেষ।
৯- বরযখী জীবনের সত্যতা এ হাদীস দিয়েও প্রমাণিত হল।
১০- হে আমার রব! কেয়ামত সংঘটিত করুন!! যেন আমি আমার সম্পদ ও পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারি। এ কথা দ্বারা ঈমানদার ব্যক্তি সম্পদ বলতে তার নেক আমলের সওয়াব ও পুরস্কার বুঝিয়েছেন। আর ঈমানদার ব্যক্তি জান্নাতে তার পরিবার পরিজনের সাথে মিলিত হবেন। যদি তার পরিবারবর্গ ঈমানদার ও সৎকর্মশীল হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالَّذِينَ آَمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُمْ مِنْ عَمَلِهِمْ مِنْ شَيْءٍ كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ
আর যারা ঈমান আনে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানের সাথে তাদের অনুসরণ করে, আমরা তাদের সাথে তাদের সন্তানদের মিলন ঘটাব এবং তাদের কর্মের কোন অংশই কমাব না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার কামাইয়ের ব্যাপারে দায়ী থাকবে। (সূরা আত তুর, আয়াত ২১)
১১- বরযখী জীবনের সুখ ও তার শাস্তির কিছু বর্ণনা এ হাদীসের মাধ্যমে জানা গেল।
১২- হাদীসে জান কবচকারী ফেরেশতাকে মালাকুল মউত বলা হয়েছে। এর অর্থ মৃত্যুর ফেরেশতা। তার নাম কি, তা কুরআনে বা কোন সহীহ হাদীসে বলা হয়নি। আমরা যে এ ফেরেশতার নাম দিয়েছি আজরাঈল এটা কুরআন বা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। সম্ভব এটা ইহুদীদের থেকে এসেছে। তাই এ নামটি ব্যবহার করা উচিত নয়।

আল-কোরআন: একটি মহা মুজিযা ﴿القرآن الكريم : المعجزات الكبرى

﴿القرآن الكريم : المعجزات الكبرى
 আল-কোরআন: একটি মহা মুজিযা
আল্লাহ তাআলার প্রশংসা এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ ও সালামের পর।
হে আল্লাহর বান্দাবৃন্দ, মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে সত্যায়ন ও সমর্থনকারী অসংখ্য মুজিযা দান করেছেন। সেগুলো তাঁর নবুওয়তকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে।
আরবি পরিভাষায় মুজিযা বলা হয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও চ্যালেঞ্জের সময় প্রতিপক্ষ যার উত্তর দিতে অপারগ হয়ে যায়।(কামূসুল মুহিত)।
মুজিযা এমন এক আশ্চর্যজনক জিনিস, যা সকল মানুষ সম্মিলিতভাবে কিংবা আলাদা আলাদাভাবে চেষ্টা করলেও তার মত আরেকটি জিনিস বানাতে সক্ষম নয়, আল্লাহ তাআলা নবুওয়তের জন্য যাকে নির্বাচন করেন কেবল তাকেই তা দান করেন। যাতে সেটি তাঁর নবুওয়তের দলিল হয় এবং রিসালাতের সঠিকত্ব প্রমাণিত হয়।
মহা গ্রন্থ আল-কোরআন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর আল্লাহ তাআলার নাযিলকৃত কালাম। এটিই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ মুজিযা যা সদা সর্বত্র বিদ্যমান, পূর্বের এবং কিয়ামত পর্যন্ত আগত পরের সব সময়ের জন্য মুজিযা।(মানাহিলুল ইরফান ফি উলুমিল কোরআন ২২/১)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«ما من الأنبياء نبيّ إلا أعطي من الآيات على ما مثله آمن البشر، وإنما كان الذي أوتيته وحياً أوحاه الله إليّ، فأرجو أن أكون أكثرهم تابعاً يوم القيامة»( ).
প্রত্যেক নবীকেই তার মত করে কোন না কোন মুজিযা দেয়া হয়েছে, তার উপর লোকেরা ঈমান এনেছে। আর আমাকে যা দেয়া হয়েছে তা হল ওহী, আল্লাহ তাআলা আমার উপর প্রত্যাদেশ দিয়েছেন। আমি আশা করি কেয়ামতের দিন তাদের চেয়ে আমার অনুসারী বেশি হবে।(বুখারি)
এই হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য এই নয় যে কোরআনের মধ্যেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুজিযা সীমাবদ্ধ।  
এটাও উদ্দেশ্য নয় যে, তাকে এমন কোন মুজিযা দেয়া হয়নি যা র্স্পস করা যায়।
বরং উদ্দেশ্য হল কোরআনুল কারিম এমন এক অভিনব মুজিযা যা কেবল তাকেই দেয়া হয়েছে আর কাউকে দেয়া হয়নি। কেননা প্রত্যেক নবীকে এমন মুজিযা দেয়া হয়েছিল যা শুধু তার সাথেই খাছ ছিল, তার মাধ্যমে যাদের নিকট তাকে পাঠানো হয়েছিল তাদেরকেই শুধু চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল।  প্রত্যেক নবীর মুজিযা তার জাতির অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। এ কারণে মূসা আ.-এর কওমের মধ্যে যখন যাদু বিদ্যা ছড়িয়ে পড়েছিল তখন তিনি তাদের নিকট লাঠি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন এবং লাঠির মাধ্যমে তাই বানাতে লাগলেন, তারা যাদু দিয়ে যা বানাত। কিন্তু মূসা আ.-এর যাদু তারা যা বানাল তা খেয়ে ফেলল। অর্থাৎ তার যাদু হুবহু তাদের যাদুর মত হল না।
যখন চিকিৎসা বিদ্যা খুবই উন্নতি লাভ করল, তখন ঈসা আ. আবির্ভূত হলেন এমন চিকিৎসা বিদ্যা নিয়ে যা দেখে সে সময়ের সকল চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা হতভম্ব হয়ে গেল। কারণ তিনি দেখালেন তার বিদ্য দিয়ে তিনি মৃতকে জীবিত করতে পরছেন, কুষ্ঠ ও বধির রুগীকে সুস্থ করেত পারছেন।
আর কাজগুলোর ধরন তাদের কাজের মতই ছিল কিন্তু তাদের ক্ষমতা ঈসার আ.-এর ক্ষমতার মত শক্তিশালী ও কার্যকর ছিল না।
আরবের লোকেরা যখন ভাষার অলংকারের উচ্চ শিখরে পৌঁছে গেল তখন আল্লাহ তাআলা আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুজেযাস্বরূপ এমন কোরআন দিলেন, যার প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ বলছেন,
لَا يَأْتِيهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِنْ حَكِيمٍ حَمِيدٍ
বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না, না সামনে থেকে, না পেছন থেকে। এটি প্রজ্ঞাময়, সপ্রশংসিতের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। (সূরা হা-মীম আস্ সাজদাহ ৪২ আয়াত)

কিন্তু কোরআন বিষয়ক মুজিযা অন্য সমস্ত মুজিযা থেকে আলাদা। এটি চলমান দলিল যুগ যুগ ধরে আবহমান থাকবে। অন্যান্য নবীদের প্রমাণাদি তাদের যুগ শেষ হওয়ার সাথে সাথে শেষ হয়ে গেছে। সে সম্পর্কে শুধু সংবাদই জানা যায় বাস্তবে অবশিষ্ট তার কিছুই নেই। আর কোরআন এখনো প্রমাণ হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে শ্রোতা যেন এখনো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে শুনছে। আর চলমান থাকার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
  «فأرجو أن أكون أكثرهم تابعاً يومَ القيامة»( ).
আমি আশা করি কেয়ামতের দিন সকলের চেয়ে আমার অনুসারী বেশি হবে। (বিদায়া নিহায়া ২/৬৯)
কুরআনুল কারিম স্পষ্ট দলিল, এটি অনেক দিক দিয়ে মুজিয: যেমন, শাব্দিক দিক দিয়ে। গাথুনির দিক দিয়ে। বালাগাতের দিক দিয়ে অর্থাৎ শব্দ তার ব্যাপক অর্থের উপর দালালাত করার দিক দিয়ে। ঐ সমস্ত অর্থের দিক দিয়েও মুজিয যার নির্দেশ আল্লাহ তাআলা করেছেন। এবং সেসব অর্থের বিবেচনায়ও যা দ্বারা আল্লাহ তাআলা, তাঁর নাম ও গুণ সম্পর্কে সংবাদ দেয়া হয়েছে।
কোরআনের অলৌকিকত্বের আরও আছে তার ভাষার অলংকার, বর্ণনা ভঙ্গি ও বাক্য গঠন প্রণালী। সমস্ত মানুষ ও জিনকে এসব বিষয় দ্বারা চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে কিন্তু তারা এর মত রচনা করতে অপারগ হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
 قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَ الْقُرْآَنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا ﴿88﴾
বল, যদি মানুষ ও জিন এ কোরআনের অনুরূপ হাজির করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ হাজির করতে পারেব না যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়। ( সূরা বানী ইসরাইল,  আয়াত: ৮৮)
أَمْ يَقُولُونَ تَقَوَّلَهُ بَلْ لَا يُؤْمِنُونَ ﴿33﴾ فَلْيَأْتُوا بِحَدِيثٍ مِثْلِهِ إِنْ كَانُوا صَادِقِينَ ﴿34﴾
তারা কি বলে, সে এটা বানিয়ে বলছে? বরং তারা ঈমান আনে না। অতএব, তারা যদি সত্যবাদী হয় তবে তার অনুরূপ বানিয়ে নিয়ে আসুক। (সূরা আত-তুর, আয়াত: ৩৩-৩৪)
এই চ্যালেঞ্জের পর অনেক দিন অতিবাহিত হয়েছে তারা কেউ এগিয়ে আসেনি, তাদের রশি আরো ঢিল করে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা এর মত দশটি সূরা নিয়ে আসো,
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ ﴿13﴾
নাকি তারা বলে, সে এটা রটনা করেছে? বল, তাহলে তোমরা এর অনুরূপ দশটি সূরা বানিয়ে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে আন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (সূরা হুদ ১৩ আয়াত)

তারা অপারগ হল আল্লাহ তাআলা তাদের রশি আরও ঢিল করে দিয়ে বললেন:
أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ قُلْ فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِثْلِهِ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ ﴿38﴾
নাকি তারা বলে, সে তা বানিয়েছে? বল, তবে তার মত একটি সূরা বানিয়ে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩৮)

মদিনায় হিজরতের পর আল্লাহ তাআলা তাদেরকে আবার চ্যালেঞ্জ করলেন: 
وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ ﴿23﴾ فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا وَلَنْ تَفْعَلُوا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ ﴿24﴾
আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাক, তবে তোমরা তার  মত একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাক; যদি তোমরা সত্যবাদী হও। অতএব যদি তোমরা তা না কর-আর কখোনা তোমরা  তা করবে না-তাহলে আগুনকে ভয় কর যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফেরদের জন্য। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৩-২৪)
আল্লাহ তাআলার কথা  فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا وَلَنْ تَفْعَلُواতোমরা অতীতে পারনি এবং ভবিষ্যতেও কখনো পারবে না, এর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ প্রমাণিত হয়ে গেছে। তারা পারবে না কুরআনের সূরার মত একটি সূরা বানিয়ে আনতে পরবর্তী যুগেও। যেমন ইতিপূর্বে এর সংবাদ দেয়া হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বলেছিলেন যখন তিনি মক্কায় ছিলেন, তিনি বলেছিলেন:
قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَ الْقُرْآَنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا ﴿88﴾ 
বল, যদি মানুষ ও জিন এ কোরআনের অনুরূপ হাজির করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ হাজির করতে পারবে না যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয় । ( সূরা বানী ইসরাইল, আয়াত: ৮৮)
আল্লাহ তাআলা রাসূলকে সাধারণভাবে নির্দেশ করার কারণে তাঁর মাধ্যমে সমস্ত সৃষ্টিজীবকে সুযোগ দেয়া হয়েছিল। সেখানে তাদের অপারগতার কথা বলা হয়েছে এই বলে যে, এ কাজে তারা সকলে যদি একত্রিতও হয় এবং পরস্পর সাহায্য সহযোগিতা করে তা সত্ত্বেও তারা পারবে না। এই চ্যালেঞ্জ সমস্ত সৃষ্টির জন্য। যারা কুরআন শুনেছে ও বুঝেছে চাই বিশেষ লোক হোক বা সাধারণ লোক, রাসূলের নবুওয়ত লাভের দিন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কেউ একটি মাত্র সূরাও তার মত বানিয়ে নিয়ে আসতে পারেনি।
পবিত্র কোরআনে হাজার হাজার মুজিযা রয়েছে। কেননা, তার সূরার সংখ্যা ১১৪টি। চ্যালেঞ্জতো দেয়া হয়েছে একটি সূরা দিয়ে। তার সবচেয়ে ছোট সূরা হল, সূরা আল কাউসার। যার আয়াত সংখ্যা মাত্র তিনটি, আয়াত তিনটিও অতি ছোট বটে। ছোট বড় মিলে কোরআনের আয়াত সংখ্যা মোট ছয় হাজার দুইশটি। এই হিসাবে চ্যালেঞ্জ গণনা করলে কত হবে একবার চিন্তা করে দেখুন। এ জন্য কোরআনুল কারিম অন্য সমস্ত মুজিযা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যে ব্যক্তি অন্তরচক্ষু দিয়ে দেখবে এবং ভাল করে শুনবে তার কাছে এ বিষয়টি দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যাবে।
আল-কোরআন মুজেয হওয়ার এটিও একটি দিক যে, এর মধ্যে অনেক অদৃশ্য-গায়েবের কথা আছে যার জ্ঞান মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছিল না। আর তাঁর মত মানুষের এগুলো জানারও কোন রাস্তা ছিল না। এটাই প্রমাণ করে যে তা আল্লাহ তাআলার বাণী, বিষয়টি কারো নিকটই অস্পষ্ট নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُبِينٍ ﴿59﴾
আর তাঁর কাছে রয়েছে গায়েবের চাবিসমূহ, তিনি ছাড়া এ বিষয়ে কেউ জানে না এবং তিনি অবগত রয়েছেন স্থলে ও সমুদ্রে যা কিছু আছে। আর কোন পাতা ঝরে না, কিন্তু তিনি তা জানেন এবং যমিনের অন্ধকারে কোন দানা পড়ে না, না কোন ভিজা এবং না কোন শুস্ক; কিন্তু রয়েছে সুস্পষ্ট কিতাবে। (সুরা আনআম, আয়াত: ৫৯)
গায়েব সম্পর্কে সংবাদের অনেকগুলো প্রকার রয়েছে:
অতীতের অদৃশ্য সংবাদ, যা সুন্দর সুন্দর ঘটনাবলীর মধ্যে ফুটে উঠেছে। আল্লাহ অতীত সম্পর্কে রাসূলকে সংবাদ দিয়েছেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্তমানকালীন অদৃশ্যের সংবাদ: যেমন, মুনাফিকদের ভেতরগত অবস্থা, এ সম্বন্ধে আল্লাহ তাআলা স্বীয় রাসূলকে অবগত করতেন। সেসব ভুলচুক মুসলমানগণ মাঝে-মধ্যে যাতে জড়িয়ে যেতেন আর মহান আল্লাহ সে বিষয়ে রাসূলকে জানিয়ে দিতেন। এছাড়া আরো অনেক বিষয় যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানতেন না, তিনি সেসব বিষয়ে রাসূলকে অবগত করতেন।
গায়েবের আরেকটি দিক, ভবিষ্যতে সংঘটিতব্য অদৃশ্য বিষয়াবলীর সংবাদ। আল্লাহ তাআলা সেসব বিষয়াদি সম্বন্ধেও তাঁর রাসূলকে জানিয়ে দিতেন। তিনি যেভাবে সংবাদ দিতেন পরে তা সেভাবে সঙ্ঘটিত হত। এই বিষয়গুলো এ কথারই প্রমাণ বহন করে যে, পবিত্র কুরআন আল্লাহ তাআলার কালাম, আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল।
কুরআনুল কারিমের অলৌকিকত্বের মধ্যে শরিয়তের বিধান বিষয়ক অলৌকিকত্বও আছে: কোরআনুল কারিম পরিপূর্ণ হেদায়েত ও দিক-নির্দেশনা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। সর্ব যুগের সর্বস্থানে সকল শ্রেণীর মানুষের সকল প্রয়োজন পূরণ করার যাবতীয় দিক নির্দেশনা রয়েছে তাতে। কেননা, যিনি অবতীর্ণ করেছেন তিনি মানবকুলের যাবতীয় প্রয়োজন, সমস্যা ও তার সমাধান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। তিনি সকলের সৃষ্টিকর্তা, তাদের সুবিধা-অসুবিধা, কিসে তাদের কল্যাণ আর কিসে অকল্যাণ সে বিষয়ে পরিপূর্ণরূপে জানেন। সুতরাং যখন কোনো বিধান তাঁর পক্ষ থেকে এসেছে তা পূর্ণ প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এসেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَلَا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ ﴿14﴾
যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি অতি সূক্ষ্মদর্শী, পূর্ণ অবহিত। (সূরা মুলক ১৪ আয়াত)
মানব প্রণীত আইন কানুনের দিকে দৃষ্টি দিলে এ বিষয়টি আরো বেশী স্পষ্ট হয়ে যায়। সে আইন কানুন মানুষের সমস্যার সমাধান করতে পারে না এবং সর্ব যুগে বা স্থানে চলে না। যার কারণে তার প্রণয়নকারীরা সব সময় তার মধ্যে পরিবর্তন পরিবর্ধন ও বাড়াতে কমাতে থাকে। গতকালের বানানো আইন আজ অচল, আজকের প্রণীতটি আগামীকাল অকেজো এ হচ্ছে মানব রচিত আইনের অবস্থা। তার কারণ মানুষের মধ্যে ভুল-ত্রুটি-অজ্ঞতা রয়েছে, তারা জানেনা কাল পৃথিবীর মধ্যে কি পরিবর্তন আসবে, কোথায় কোন কোন জিনিস তাদের উপযোগী হবে। আর কোন কোনটি অনুপযোগী হবে।
আর এটাই হল মানুষের অপারগ হওয়ার প্রকাশ্য দলিল, তারা এমন অইন বানাতে পারে না যা সকল মানুষের জন্য উপযোগী ও প্রযোজ্য হবে এবং তাদের স্বভাব-চরিত্রকে শুধরাবে। অপর দিকে পবিত্র কোরআন সর্ব প্রকার ত্রুটি থেকে মুক্ত, মানুষের স্বার্থ রক্ষার জিম্মাদার।  তাদেরকে ইহকাল ও পরকালের যুগপৎ কল্যাণের দিকেই পথ প্রদর্শন করে। মানুষ যদি সর্বতোভাবে কোরআনকে আঁকড়ে ধরে এবং কোরআনের হেদায়েতের উপর চলে তাহলে তাদের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ সুনিশ্চিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ هَذَا الْقُرْآَنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كَبِيرًا ﴿9﴾
নিশ্চয় এ কুরআন এমন একটি পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল এবং যে মুমিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরুস্কার। (সূরা বনী ইসরাইল ৯ আয়াত)
মোট কথা আল্লাহ তাআলার কিতাব যেসব শরয়ি বিধি-বিধান দিয়েছে, তার ভিত্তি তিনটি উপকরণের উপর:
প্রথম উপকরণ, ছয়টি জিনিসের উপর থেকে অনিষ্ট দূর করা: সত্বা, জ্ঞান, ধর্ম, বংশ, সম্মান, সম্পদ হিফাযত করা।
দ্বিতীয় উপকরণ, উপকার খুঁজে বের করা। কোরআনুল কারিম সব কিছু থেকে উপকার বের করে আনার দরজা খোলা রেখেছে আর ঐ সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে যা ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়।
তৃতীয় উপকরণ, উত্তম চরিত্রের উপর চলা এবং ভাল অভ্যাস গড়ে তোলা।
কোরআনুল কারিম ঐ সমস্ত আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান করেছে যা সমস্ত মানুষ করতে অপারগ হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে মানুষের প্রয়োজন হবে আর কোরআন তার জন্য নিয়ম-নীতি বলেনি এমনটি কোনো ক্ষেত্রেই হয়নি। বরং আল কোরআন মানুষের জন্য সেসব প্রয়োজনের সবচেয়ে উপযোগী ও সর্বাধিক সুন্দর পদ্ধতি বলে দিয়েছে।
কোরআনের অলৌকিকত্বের মধ্যে বর্তমান যুগের আধুনিক বিজ্ঞানের অলৌকিকত্বও রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
سَنُرِيهِمْ آَيَاتِنَا فِي الْآَفَاقِ وَفِي أَنْفُسِهِمْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ أَوَلَمْ يَكْفِ بِرَبِّكَ أَنَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ ﴿53﴾
বিশ্বজগতে ও তাদের নিজেদের মধ্যে আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাব যাতে তদের কাছে সুস্পষ্ট হয় যে এটি (কোরআন) সত্য; তোমার রবের জন্য এটাই যথেষ্ট নয় কি যে, তিনি সকল বিষয়ে সাক্ষী? (সূরা হা-মীম আস সাজদা আয়াত: ৫৩)।
অনেক পরে এসে আমাদের রবের পক্ষ থেকে এ অঙ্গীকারও পূর্ণ হয়েছে, মানুষ সৃষ্টি জীবের মধ্যে সূক্ষ্ম যন্ত্র দ্বারা আল্লাহর নিদর্শন দেখতে পেরেছে। যেমন উড়োজাহাজ, সাবমেরিন ইত্যাদি সূক্ষ্ম যন্ত্র, যেগুলোর মালিক হয়েছে মানুষ মাত্র কিছুদিন আগে।
এ সমস্ত অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে ১৪৩০ বছর পূর্বে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কে সংবাদ দিয়েছিল? আল-কোরআন আল্লাহর কালাম এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সত্য রাসূল এটা তার প্রকৃষ্ট দলিল। আর এই বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব প্রমাণিত হয়েছে পৃথিবীতে, আকাশে, সমুদ্রে, মানুষের মধ্যে, জিব-জন্তুতে, বৃক্ষ তরুলতাতে পোকা মাকড় ইত্যাদিতে। সব উদাহরণ দিতে গেলে এখানে জায়গা সংকুলান হবে না।
সর্বশেষ কোরআনের সেই বিখ্যাত আয়াতকে স্মরণ করেই লেখার ইতি টানছি যাতে মহান আল্লাহ দাবি করে বলেছেন, জিন-ইনসান সকলে মিলে চেষ্টা করলেও এই কোরআনের অনুরূপ বানাতে পারবে না। ইরশাদ হচ্ছে,   

قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنْسُ وَالْجِنُّ عَلَى أَنْ يَأْتُوا بِمِثْلِ هَذَ الْقُرْآَنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا ﴿88﴾ 
বল, যদি মানুষ ও জিন এ কোরআনের অনুরূপ হাজির করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ হাজির করতে পারেব না যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়। ( সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত: ৮৮)