মহা গন্থ আল কোরআন একটি মুজেজা

 

(আল-কোরআন: একটি মহা মুজিযা ) (সর্ব যুগের সর্ব শ্রেষ্ট মুজিযা হলো আল- কোরআন)

সকল প্রশংসা আল্লাহ তাআলার এবং  দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর এবং তার পরিবার বর্গ ও সাহাবীগণের উপর।

আমাদের সকলের জানা থাকা উচিৎ যে, মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে সত্যায়ন , সমর্থনকারী ও অসংখ্য মুজিযা দান করেছেন। সেগুলো তাঁর নবুওয়তকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করেছে।

আরবি পরিভাষায় মুজিযা বলা হয়, প্রতিদদ্বিতা ও চ্যালেঞ্জের সময় প্রতিপক্ষ যার উত্তর দিতে অপারগ হয়ে যায়।(কামূসুল মুহিত)।

মুজিযা এমন এক আশ্চর্যজনক জিনিস, যা সকল মানুষ সম্মিলিতভাবে কিংবা আলাদা আলাদা ভাবে চেষ্টা করলেও তার মত আরেকটি জিনিস বানাতে সক্ষম হয় না, আল্লাহ তাআলা নবুওয়তের জন্য যাকে নির্বাচন করেন কেবল তাকেই তা দান করেন। যাতে সেটি তাঁর নবুওয়তের দলিল হয় এবং রিসালাতের সঠিকত্ব প্রমাণিত হয়।

মহা গ্রন্থ আল-কোরআন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর উপর আল্লাহ তাআলার নাযিলকৃত কালাম। এটিই তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ মুজিযা যা সদা সর্বত্র বিদ্যমান, পূর্বের এবং কিয়ামত পর্যন্ত আগত পরের সব সময়ের জন্য  এ মুজিযা বিদ্যমান থাকবে।(মানাহিলুল ইরফান ফি উলুমিল কোরআন ২২/১)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

প্রত্যেক নবীকেই তার মত করে কোন না কোন মুজিযা দেয়া হয়েছে, তার উপর লোকেরা ঈমান এনেছে। আর আমাকে যা দেয়া হয়েছে তা হল ওহী, আল্লাহ তাআলা আমার উপর প্রত্যাদেশ দিয়েছেন। আমি আশা করি কেয়ামতের দিন তাদের চেয়ে আমার অনুসারী বেশি হবে।(বুখারি)

এই হাদীস দ্বারা উদ্দেশ্য এই নয় যে কোরআনের মধ্যেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মুজিযা সীমাবদ্ধ।           এটাও উদ্দেশ্য নয় যে, তাকে এমন কোন মুজিযা দেয়া হয়নি যা র্স্পস করা যায়। বরং উদ্দেশ্য হল কোরআনুল কারিম এমন এক অভিনব মুজিযা যা কেবল তাকেই দেয়া হয়েছে আর কাউকে দেয়া হয়নি। কেননা প্রত্যেক নবীকে এমন মুজিযা দেয়া হয়েছিল যা শুধু তার সাথেই খাছ ছিল, তার মাধ্যমে যাদের নিকট তাকে পাঠানো হয়েছিল তাদেরকেই শুধু চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছিল।  প্রত্যেক নবীর মুজিযা তার জাতির অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। এ কারণে মূসা আ.-এর কওমের মধ্যে যখন যাদু বিদ্যা ছড়িয়ে পড়েছিল তখন তিনি তাদের নিকট লাঠি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলেন এবং লাঠির মাধ্যমে তাই বানাতে লাগলেন, তারা যাদু দিয়ে যা বানাত। কিন্তু মূসা আ.-এর যাদু তারা যা বানাল তা খেয়ে ফেলল। অর্থাৎ তার যাদু হুবহু তাদের যাদুর মত হল না।

যখন চিকিৎসা বিদ্যা খুবই উন্নতি লাভ করল, তখন ঈসা আ. আবির্ভূত হলেন এমন চিকিৎসা বিদ্যা নিয়ে যা দেখে সে সময়ের সকল চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা হতভম্ব হয়ে গেল। কারণ তিনি দেখালেন তার বিদ্য দিয়ে তিনি মৃতকে জীবিত করতে পরছেন, কুষ্ঠ ও বধির রুগীকে সুস্থ করেত পারছেন।

আর কাজগুলোর ধরন তাদের কাজের মতই ছিল কিন্তু তাদের ক্ষমতা ঈসার আ.-এর ক্ষমতার মত শক্তিশালী ও কার্যকর ছিল না।

আরবের লোকেরা যখন ভাষার অলংকারের উচ্চ শিখরে পৌঁছে গেল তখন আল্লাহ তাআলা আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে মুজেযাস্বরূপ এমন কোরআন দিলেন, যার প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ বলছেন,  

বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না, না সামনে থেকে, না পেছন থেকে। এটি প্রজ্ঞাময়, সপ্রশংসিতের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। (সূরা হা-মীম আস্ সাজদাহ ৪২ আয়াত)

 

কিন্তু কোরআন বিষয়ক মুজিযা অন্য সমস্ত মুজিযা থেকে আলাদা। এটি চলমান দলিল যুগ যুগ ধরে আবহমান থাকবে। অন্যান্য নবীদের প্রমাণাদি তাদের যুগ শেষ হওয়ার সাথে সাথে শেষ হয়ে গেছে। সে সম্পর্কে শুধু সংবাদই জানা যায় বাস্তবে অবশিষ্ট তার কিছুই নেই। আর কোরআন এখনো প্রমাণ হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে শ্রোতা যেন এখনো নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লা মের মুখ থেকে শুনছে। আর চলমান থাকার কারণে নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আমি আশা করি কেয়ামতের দিন সকলের চেয়ে আমার অনুসারী বেশি হবে। (বিদায়া নিহায়া ২/৬৯)

কুরআনুল কারিম স্পষ্ট দলিল, এটি অনেক দিক দিয়ে মুজিযা: যেমন, শাব্দিক দিক দিয়ে। গাথুনির দিক দিয়ে। বালাগাতের দিক দিয়ে অর্থাৎ শব্দ তার ব্যাপক অর্থের উপর দালালাত করার দিক দিয়ে। ঐ সমস্ত অর্থের দিক দিয়েও মুজিযা যার নির্দেশ আল্লাহ তাআলা করেছেন। এবং সেসব অর্থের বিবেচনায়ও যা দ্বারা আল্লাহ তাআলা, তাঁর নাম ও গুণ সম্পর্কে সংবাদ দেয়া হয়েছে।

কোরআনের অলৌকিকত্বের আরও আছে তার ভাষার অলংকার, বর্ণনা ভঙ্গি ও বাক্য গঠন প্রণালী। সমস্ত মানুষ ও জিনকে এসব বিষয় দ্বারা চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে কিন্তু তারা এর মত রচনা করতে অপারগ হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

বল, যদি মানুষ ও জিন এ কোরআনের অনুরূপ আর একটি কোরআন তৈরি  করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ একটি কোরআন হাজির করতে পারেব না যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়। (  বানী ইসরাইল,৮৮)

أَ

তারা কি বলে, সে এটা বানিয়ে বলছে? বরং তারা ঈমান আনে না। অতএব, তারা যদি সত্যবাদী হয় তবে তার অনুরূপ বানিয়ে নিয়ে আসুক। (আত-তুর,৩৩-৩৪)

এই চ্যালেঞ্জের পর অনেক দিন অতিবাহিত হয়েছে তারা কেউ এগিয়ে আসেনি, তাদের রশি আরো ঢিল করে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা এর মত দশটি সূরা নিয়ে আসো,

নাকি তারা বলে, সে এটা রটনা করেছে? বল, তাহলে তোমরা এর অনুরূপ দশটি সূরা বানিয়ে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে আন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (সূরা হুদ ১৩)

 

তারা অপারগ হল আল্লাাহ তাআলা তাদের রশি আরও ঢিল করে দিয়ে বললেন:

নাকি তারা বলে, সে তা বানিয়েছে? বল, তবে তার মত একটি সূরা বানিয়ে নিয়ে আস এবং আল্লাাহ  ছাড়া যাকে পার ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। ( ইউনুস,৩৮)

 

মদিনায় হিজরতের পর আল্লাাহ তাআলা তাদেরকে আবার চ্যালেঞ্জ করলেন:  

আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাক, তবে তোমরা তার  মত একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাাহ  ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাক; যদি তোমরা সত্যবাদী হও। অতএব যদি তোমরা তা না কর-আর কখোনা তোমরা  তা করবে না-তাহলে আগুনকে ভয় কর যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করা হয়েছে কাফেরদের জন্য। (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৩-২৪)

আল্লাাহ  তাআলার কথা : তোমরা অতীতে পারনি এবং ভবিষ্যতেও কখনো পারবে না, এর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ প্রমাণিত হয়ে গেছে। তারা পারবে না কুরআনের সূরার মত একটি সূরা বানিয়ে আনতে পরবর্তী যুগেও। যেমন ইতিপূর্বে এর সংবাদ দেয়া হয়েছে, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  তাদেরকে বলেছিলেন যখন তিনি মক্কায় ছিলেন,

বল, যদি মানুষ ও জিন এ কোরআনের অনুরূপ কোরআন হাজির করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ একটি কোরআন হাজির করতে পারবে না যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয় । ( বানী ইসরাইল, ৮৮)

আল্লাাহ  তাআলা রাসূলকে সাধারণভাবে নির্দেশ করার কারণে তাঁর মাধ্যমে সমস্ত সৃষ্টিজীবকে সুযোগ দেয়া হয়েছিল। সেখানে তাদের অপারগতার কথা বলা হয়েছে এই বলে যে, এ কাজে তারা সকলে যদি একত্রিতও হয় এবং পরস্পর সাহায্য সহযোগিতা করে তা সত্ত্বেও তারা পারবে না। এই চ্যালেঞ্জ সমস্ত সৃষ্টির জন্য। যারা কুরআন শুনেছে ও বুঝেছে চাই বিশেষ লোক হোক বা সাধারণ লোক, রাসূলের নবুওয়ত লাভের দিন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কেউ একটি মাত্র সূরাও তার মত বানিয়ে নিয়ে আসতে পারেনি।

পবিত্র কোরআনে হাজার হাজার মুজিযা রয়েছে। কেননা, তার সূরার সংখ্যা ১১৪টি। চ্যালেঞ্জতো দেয়া হয়েছে একটি সূরা দিয়ে। তার সবচেয়ে ছোট সূরা হল, সূরা আল কাউসার। যার আয়াত সংখ্যা মাত্র তিনটি, আয়াত তিনটিও অতি ছোট বটে। ছোট বড় মিলে কোরআনের আয়াত সংখ্যা মোট ছয় হাজার দুইশটি বা মতাত্তরে আরো কম বেশি হয়। এই হিসাবে চ্যালেঞ্জ গণনা করলে কত হবে একবার চিন্তা করে দেখুন। এ জন্য কোরআনুল কারিম অন্য সমস্ত মুজিযা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। যে ব্যক্তি অন্তরচক্ষু দিয়ে দেখবে এবং ভাল করে শুনবে তার কাছে এ বিষয়টি দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যাবে।

আল-কোরআন মুজেযা হওয়ার এটিও একটি দিক যে, এর মধ্যে অনেক অদৃশ্য-গায়েবের কথা আছে যার জ্ঞান মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছিল না। আর তাঁর মত মানুষের এগুলো জানারও কোন রাস্তা ছিল না। এটাই প্রমাণ করে যে তা আল্লাাহ তাআলার বাণী, বিষয়টি কারো নিকটই অস্পষ্ট নয়। আল্লাাহ তাআলা বলেন:

আর তাঁর কাছে রয়েছে গায়েবের চাবিসমূহ, তিনি ছাড়া এ বিষয়ে কেউ জানে না এবং তিনি অবগত রয়েছেন স্থলে ও সমুদ্রে যা কিছু আছে। আর কোন পাতা ঝরে না, কিন্তু তিনি তা জানেন এবং যমিনের অন্ধকারে কোন দানা পড়ে না, না কোন ভিজা এবং না কোন শুস্ক; কিন্তু রয়েছে সুস্পষ্ট কিতাবে। ( আনআম, ৫৯)

গায়েব সম্পর্কে সংবাদের অনেকগুলো প্রকার রয়েছে:

অতীতের অদৃশ্য সংবাদ, যা সুন্দর সুন্দর ঘটনাবলীর মধ্যে ফুটে উঠেছে। আল্লাাহ  অতীত সম্পর্কে রাসূলকে সংবাদ দিয়েছেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্তমানকালীন অদৃশ্যের সংবাদ: যেমন, মুনাফিকদের ভেতরগত অবস্থা, এ সম্বন্ধে আল্লাাহ তাআলা স্বীয় রাসূলকে অবগত করতেন। সেসব ভুলচুক মুসলমানগণ মাঝে-মধ্যে যাতে জড়িয়ে যেতেন আর মহান আল্লাাহ সে বিষয়ে রাসূলকে জানিয়ে দিতেন। এছাড়া আরো অনেক বিষয় যা আল্লাাহ ছাড়া আর কেউ জানতেন না, তিনি সেসব বিষয়ে রাসূলকে অবগত করতেন।

গায়েবের আরেকটি দিক, ভবিষ্যতে সংঘটিতব্য অদৃশ্য বিষয়াবলীর সংবাদ। আল্লাাহ তাআলা সেসব বিষয়াদি সম্বন্ধেও তাঁর রাসূলকে জানিয়ে দিতেন। তিনি যেভাবে সংবাদ দিতেন পরে তা সেভাবে সঙ্ঘটিত হত। এই বিষয়গুলো এ কথারই প্রমাণ বহন করে যে, পবিত্র কুরআন আল্লাাহ তাআলার কালাম, আর মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল।

কুরআনুল কারিমের অলৌকিকত্বের মধ্যে শরিয়তের বিধান বিষয়ক অলৌকিকত্বও আছে: কোরআনুল কারিম পরিপূর্ণ হেদায়েত ও দিক-নির্দেশনা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। সর্ব যুগের সর্বস্থানে সকল শ্রেণীর মানুষের সকল প্রয়োজন পূরণ করার যাবতীয় দিক নির্দেশনা রয়েছে তাতে। কেননা, যিনি অবতীর্ণ করেছেন তিনি মানবকুলের যাবতীয় প্রয়োজন, সমস্যা ও তার সমাধান সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত। তিনি সকলের সৃষ্টিকর্তা, তাদের সুবিধা-অসুবিধা, কিসে তাদের কল্যাণ আর কিসে অকল্যাণ সে বিষয়ে পরিপূর্ণরুপে জানেন। সুতরাং যখন কোনো বিধান তাঁর পক্ষ থেকে এসেছে তা পূর্ণ প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এসেছে।

আল্লাাহ তাআলা বলেন:

যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি অতি সূক্ষ্মদর্শী, পূর্ণ অবহিত। (সূরা মুলক ১৪ আয়াত)

মানব প্রণীত আইন কানুনের দিকে দৃষ্টি দিলে এ বিষয়টি আরো বেশী স্পষ্ট হয়ে যায়। সে আইন কানুন মানুষের সমস্যার সমাধান করতে পারে না এবং সর্ব যুগে বা স্থানে চলে না। যার কারণে তার প্রণয়নকারীরা সব সময় তার মধ্যে পরিবর্তন পরিবর্ধন ও বাড়াতে কমাতে থাকে। গতকালের বানানো আইন আজ অচল, আজকের প্রণীতটি আগামীকাল অকেজো এ হচ্ছে মানব রচিত আইনের অবস্থা। তার কারণ মানুষের মধ্যে ভুল-ত্রুটি-অজ্ঞতা রয়েছে, তারা জানেনা কাল পৃথিবীর মধ্যে কি পরিবর্তন আসবে, কোথায় কোন কোন জিনিস তাদের উপযোগী হবে। আর কোন কোনটি অনুপযোগী হবে।

আর এটাই হল মানুষের অপারগ হওয়ার প্রকাশ্য দলিল, তারা এমন অইন বানাতে পারে না যা সকল মানুষের জন্য উপযোগী ও প্রযোজ্য হবে এবং তাদের স্বভাব-চরিত্রকে শুধরাবে। অপর দিকে পবিত্র কোরআন সর্ব প্রকার ত্রুটি থেকে মুক্ত, মানুষের স্বার্থ রক্ষার জিম্মাদার।  তাদেরকে ইহকাল ও পরকালের যুগপৎ কল্যাণের দিকেই পথ প্রদর্শন করে। মানুষ যদি সর্বতে¦াভাবে কোরআনকে আঁকড়ে ধরে এবং কোরআনের হেদায়েতের উপর চলে তাহলে তাদের সর্বাঙ্গীন কল্যাণ সুনিশ্চিত।

আল্লাাহ তাআলা বলেন:

নিশ্চয় এ কুরআন এমন একটি পথ দেখায় যা সবচেয়ে সরল এবং যে মুমিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার। ( বনী ইসরাইল ৯ )

মোট কথা আল্লাাহ তাআলার কিতাব যেসব শরয়ি বিধি-বিধান দিয়েছে, তার ভিত্তি তিনটি উপকরণের উপর:

প্রথম উপকরণ, ছয়টি জিনিসের উপর থেকে অনিষ্ট দূর করা: সত্বা, জ্ঞান, ধর্ম, বংশ, সম্মান, সম্পদ হিফাযত করা।

দ্বিতীয় উপকরণ, উপকার খুঁজে বের করা। কোরআনুল কারিম সব কিছু থেকে উপকার বের করে আনার দরজা খোলা রেখেছে আর ঐ সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে যা ক্ষতির দিকে নিয়ে যায়।

তৃতীয় উপকরণ, উত্তম চরিত্রের উপর চলা এবং ভাল অভ্যাস গড়ে তোলা।

কোরআনুল কারিম ঐ সমস্ত আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান করেছে যা সমস্ত মানুষ করতে অপারগ হয়েছে।

দুনিয়া ও আখেরাতে মানুষের প্রয়োজন হবে আর কোরআন তার জন্য নিয়ম-নীতি বলেনি এমনটি কোনো ক্ষেত্রেই হয়নি। বরং আল কোরআন মানুষের জন্য সেসব প্রয়োজনের সবচেয়ে উপযোগী ও সর্বাধিক সুন্দর পদ্ধতি বলে দিয়েছে।

কোরআনের অলৌকিকত্বের মধ্যে বর্তমান যুগের আধুনিক বিজ্ঞানের অলৌকিকত্বও রয়েছে। মহান আল্লাাহ বলেন,

বিশ্বজগতে ও তাদের নিজেদের মধ্যে আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাব যাতে তদের কাছে সুস্পষ্ট হয় যে এটি (কোরআন) সত্য; তোমার রবের জন্য এটাই যথেষ্ট নয় কি যে, তিনি সকল বিষয়ে সাক্ষী? (সূরা হা-মীম আস সাজদা আয়াত: ৫৩)।

অনেক পরে এসে আমাদের রবের পক্ষ থেকে এ অঙ্গীকারও পূর্ণ হয়েছে, মানুষ সৃষ্টি জীবের মধ্যে সূক্ষ্ম যন্ত্র দ্বারা আল্লাাহর নিদর্শন দেখতে পেরেছে। যেমন উড়োজাহাজ, সাবমেরিন ইত্যাদি সূক্ষ্ম যন্ত্র, যেগুলোর মালিক হয়েছে মানুষ মাত্র কিছুদিন আগে।

এ সমস্ত অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে ১৪৩০ বছর পূর্বে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কে সংবাদ দিয়েছিল? তা হলো  আল-কোরআন আল্লাাহ হর কালাম এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লহর সত্য রাসূল এটা তার প্রকৃষ্ট দলিল। আর এই বৈজ্ঞানিক অলৌকিকত্ব প্রমাণিত হয়েছে পৃথিবীতে, আকাশে, সমুদ্রে, মানুষের মধ্যে, জিব-জন্তুতে, বৃক্ষ তরুলতাতে পোকা মাকড় ইত্যাদিতে। সব উদাহরণ দিতে গেলে এখানে জায়গা সংকুলান হবে না।

সর্বশেষ কোরআনের সেই বিখ্যাত আয়াতকে স্মরণ করেই লেখার ইতি টানছি যাতে মহান আল্লাহ দাবি করে বলেছেন, জিন-ইনসান সকলে মিলে চেষ্টা করলেও এই কোরআনের মত অনুরূপ একটা কোরআন বানাতে পারবে না।

ইরশাদ হচ্ছে:- বল, যদি মানুষ ও জিন এ কোরআনের অনুরূপ একটি কোরআন হাজির করার জন্য একত্রিত হয়, তবুও তারা এর অনুরূপকোরআন হাজির করতে পারেব না যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়। ( বনী ইসরাইল, ৮৮)

الأسرة المسلمة মুসলিম পরিবার প্রসঙ্গে

     সমস্ত প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। আমরা তার প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করি। আমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রবৃত্তিজাত অনিষ্ট ও কর্মের কুপ্রভাব হতে আশ্রয় চাই। আল্লাহ তা’আলা যাকে হেদায়েত দান করেন, তার কোন ভ্রষ্টকারী নেই। আর যাকে তিনি ভ্রষ্ট করেন, তার কোন হেদায়েতকারী নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, ও একক, তার কোন শরীক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল।
হে আল্লাহ ! সালাত, সালাম ও বরকত অবতীর্ণ করুন তার উপর, তার বংশধর ও সাহাবাদের উপর, এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার পথে ধাবিত হবে ও তার আদর্শের অনুসরণ করবে তাদের উপর।
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন :- হে মু’মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে। (সূরা আহযাব-৭০/৭১)
আল্ল¬াহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন :- অতঃপর আল্লাহ্ যাকে পথ-প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্যে উম্মুক্ত করে দেন এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে সংকীর্ণ অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন-যেন সে সবেগে আকাশে আরোহণ করছে। এমনি ভাবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না। আল্লাহ্ তাদের উপর আযাব বর্ষন করেন। (সূরা আন’আম-১২৫)
আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :-হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা আল-ইমরান-১০২)
মুসলিম ভাইয়েরা !
মনের শান্তি ও আনন্দ অনুভব করা এবং অশান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর করা প্রত্যেক ব্যক্তির অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আর এর দ্বারাই পবিত্র জীবন অর্জিত হয় এবং আনন্দ ও প্রফুল্লতা পরিপূর্ণতা লাভ করে। তা অর্জনের জন্য রয়েছে ধর্মীয়, স্বভাবগত ও আমলী উপায়-উপকরণসমূহ। আর এসব উপায়-উপকরণের সামগ্রীক সমন্বয় সাধন মু’মিনগণ ব্যতীত অন্য কারও পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে না। এ সব আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নিয়ামত।
আল্ল¬াহ তা’আলা  ইরশাদ করেন :- আর এক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্যে তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সংগিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পার¯পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।(রুম-২১)
আল্ল¬াহ তা’আলা আরও ইরশাদ করেন :-
যদি আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হিদায়েত আসে, তখন যে আমার বর্ণিত পথ অনুসরণ করবে, সে পথভ্রন্ঠ হবে না এবং কষ্টে পতিত হবে না এবং যে আমার স¥রণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব। (সূরা ত্বো-হা-১২৩/১২৪)
সৌভাগ্যময় জীবন ইহজগতের প্রতিটি মানুষের সর্বোচ্চ লক্ষ্য। সৌভাগ্যের তাৎপর্য ও তা বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়। সুতরাং কেউ মনে করেন, সৌভাগ্য অর্জিত হবে সম্পদ সঞ্চয় ও প্রবৃদ্ধির দ্বারা। আবার কেউ মনে করেন, সৌভাগ্য মানে শারীরিক সুস্থতা ও বাসস্থানের নিরাপত্তা। আবার কারো মতে, সৌভাগ্য মানে হালাল জীবিকা ও উপকারী ইলম (বিদ্যা) অর্জন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, সৌভাগ্য মানে প্রকৃত ঈমান, সৎকাজ ও এগুলোর উপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকা। উপরিউক্ত অর্থসমূহ সৌভাগ্যের তাৎপয্যের অন্তর্ভূক্ত হতে কোন বাধা নেই, যতক্ষণ তা শার‘য়ী নিয়ম-নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে। তবে সৌভাগ্য দুই প্রকার : (এক) দুনিয়াবী (ইহকালীন) সৌভাগ্য; যা সাময়িক, সংক্ষিপ্ত জীবনের সাথে সীমাবদ্ধ ও পরিবর্তণশীল। (দুই) পরকালীন সৌভাগ্য; যা দীর্ঘস্থায়ী ও অসীম। আর এই উভয় প্রকার সৌভাগ্যই একটা অপরটার সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং আখেরাতের সৌভাগ্যের সাথে দুনিয়ার সৌভাগ্য জড়িত। আর দুনিয়া ও আখেরাতে পরিপূর্ণ পবিত্র সৌভাগ্যময় জীবন বলতে শুধু ঐ জীবনকেই বুঝায়, যা আল্লাহ মুত্তাকী মু’মিনদের জন্য মনোনীত করেছেন। সৌভাগ্যময় জীবন লাভের অন্যতম প্রধান ও আসল উপায় হল ঈমান ও সৎকর্ম। আর এই সৎকর্মের মধ্যমে নিজে ও নিজের আহালকে বাচানোর সর্বাত্বক চেষ্টা করতে হবে।
যেমন আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা কর, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও প্রস্তর, যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণ হƒদয়, কঠোর¯¦ভাব ফেরেশতাগণ। তারা আল্লাহ্ তা’আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে। (তাহরিম-৬ )
 আল্ল¬াহ তা’আলা আরও ইরশাদ করেন :-
মু’মিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, তাকে আমি নিশ্চয়ই পবিত্র জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করব। (সূরা নাহল-৯৭)
 সুতরাং যে ব্যক্তি ঈমান ও সৎ আমলের সমন্বয় সাধন করতে পারবে, তার জন্য আল্লাহ তা‘আলা ইহকালে পবিত্রময় জীবনের এবং ইহকালে ও পরকালে উত্তম প্রতিদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
আর এর কারণ সুস্পষ্ট। কেননা, মুমিনগণ আল্লাহর প্রতি বিশুদ্ধ ঈমানের ফলে সৎকাজ করে এবং দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য মন-মানসিকতা ও নৈতিক চরিত্রকে সংশোধন করে। তাদের সাথে মৌলিক নীতিমালা রয়েছে, যার দ্বারা তারা তাদের নিকট উপস্থাপিত সকল প্রকার হাসি-আনন্দ, অস্থিরতা ও দুঃখ-বেদনার কারণসমূহ উপলব্ধি করতে পারে।
আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- যারা ঈমান আনে এবং স্বীয় বিশ্বাসকে শিরকের সাথে মিশ্রিত করে না, তাদের জন্যেই শান্তি এবং তারাই সুপথগামী। (সূরা আন-আম-৮০)
আনাস ইব্নে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ঃ তিনটি জিনিস এমন যার মধ্যে সেগুলো পাওয়া যাবে, সে ঈমানের স্বাদ পাবে ।
১) আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুল তার কাছে অন্য সবকিছু থেকে প্রিয় হওয়া ।
২) কাউকে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য ভালবাসা ।
৩) জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে যেভাবে অপছন্দ করে, তেমনি আবারও কুফরীর দিকে প্রত্যাবর্তন করাকে অপছন্দ করে। (বুখারী ও মুসলিম)
আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- অতঃপর আল্লাহ্ যাকে পথ-প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্যে উম্মুক্ত করে দেন এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে সংকীর্ণ অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন-যেন সে সবেগে আকাশে আরোহণ করছে। এমনি ভাবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না। আল্লাহ্ তাদের উপর আযাব বর্ষন করেন। (সূরা আন-আম-১২৫)
ঈমানদার ভাইয়েরা !
মু’মিনের প্রাপ্তি ও কল্যাণ দিগুণ। হাসি-আনন্দ ও দুঃখ-কষ্ট সকল অবস্থায়ই সে তার কর্ম-কাণ্ডের সুফল ভোগ করবে। এ জন্যই মু’মিনেরা দু’টি জিনিস পাবেন, যেগুলো কল্যাণ বা অকল্যাণের প্রতিনিধিত্ব করে। এই গুণের অধিকারী ব্যক্তি এ দু’টি গুণ দ্বারা কল্যাণ ও অকল্যাণ লাভ করে, যেমন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, ধৈর্য ধারণ ইত্যাদি। এতে করে তার জন্য আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি হবে; দূর হয়ে যাবে দুশ্চিন্তা, অস্থিরতা, হৃদয়ের সংকীর্ণতা ও জীবনের দুঃখ-কষ্ট এবং ইহজগতে তার জীবন হয়ে উঠবে অর্থবহ ও সুখময়।
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন :- কসম যুগের, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাকীদ করে সত্যের এবং তাকীদ করে সবরের। (সূরা আসর)
মুমিনের ব্যপার ব্যতিক্রম তার ঈমানী শক্তি, ধৈর্য, আল্লাহর উপড় ভরসা ও নিভর্রশীলতা এবং তার সওয়াবের প্রত্যাশার কারণে। এসব বিষয়ে তার সাহস ও বীরত্ব আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং আল্লাহ তার রাসুলের ফয়সালার উপর সে অটুট থাকবে কেউ তাকে অন্য পথে নিতে পারবেনা।
যেমন আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল কোন কাজের আদেশ করলে কোন ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন ক্ষমতা নেই যে, আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্ট তায় পতিত হয়। (আহযাব ৩৬)
 আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহ্র যিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহ্র যিকির দ্বারাই অন্তর সমূহ শান্তি পায়। (সূরা রা’দ-২৮)
আল্ল¬াহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন :- যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন। (সূরা আন্কাবুত-৬৯)
পরিপূর্ণ সৌভাগ্য কি? আর কিভাবে তা আমরা অর্জন করব? আর পরিপূর্ণ দুর্ভাগ্য কী? কিভাবে তা থেকে আমরা সতর্কতা অবলম্বন করব? সৌভাগ্যের সবটুকুই রয়েছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ও তাঁর প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের মাঝে; যেমনিভাবে দুর্ভাগ্যের সবটুকুই রয়েছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা ও তাঁর প্রিয় রাসূলের অবাধ্যতার মাঝে।
আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, তারা অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে। (সূরা আহযাব-৭১)
অন্যত্র আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে, সে তো স্পষ্টই পথ ভ্রষ্ট হবে। (সূরা আহযাব-৩৬)
সৌভাগ্যময় জীবনের সঠিক পদ্ধতি প্রত্যক মুসলিম ব্যক্তিই কামনা করে এবং তার উপর ভিত্তি করেই মুসলিম সমাজ সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়। সুতরাং মু’মিনদের মধ্যে যে ব্যক্তি ঐসব উপায়-উপকরণের অধিকাংশ অর্জন করতে পারবে, সে সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে এবং উপভোগ করবে পবিত্রময় জীবন। আর তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তা অর্জনে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হবে, তার জীবন অতিবাহিত হবে দুঃখ-কষ্টে। আবার তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি মাঝামাঝি পর্যায়ের হবে, আল্লাহ প্রদত্ত তাওফীক অনুযায়ী জীবনযাপন করবে। আর আল্লাহই তাওফীকদাতা, তাঁর সাহায্যেই সকল কল্যাণ অর্জিত হয় এবং অকল্যাণ প্রতিরোধ হয়।
আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- সৎকর্মশীলগণ থাকবে জান্নাতে। এবং দুষ্কর্মীরা থাকবে জাহান্নামে। (সূরা ইনফিতার-১৩/১৪)
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আমাদের সবাইকে দুনিয়া ও আখেরাতে সৌভাগ্যময় জীবন-পবিত্রময় জীবন অর্জন করার তাওফীক দান করুন। আমীন …

الدعوة إلى الله تعالى আল্লাহর পথে দা‌ওয়াত

আল্লাহর পথে দা‌ওয়াত الدعوة إلى الله تعالى ভূমিকা বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আল-হামদু লিল্লাহ। ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ। ওয়াআলা আলিহী ওয়া আসহাবিহী আজমাঈন। আল্লাহর পথে আহবান করতেই নবী-রাসূলগণের পৃথিবীতে আগমন। মুমিনের জীবনের আন্যতম দায়িত্ব এই দাওয়াত। কোরআনুল কারিমে এ দায়িত্বকে কখনো দাওয়াত, কখনো সৎকার্যে আদেশ ও অসৎকার্যে নিষেধ, কখনো প্রচার, কখনো নসিহত ও কখনো দীন প্রতিষ্ঠা বলে অভিহিত করা হয়েছে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে এ কাজের গুরুত্ব, এর বিধান, পুরস্কার, এ দায়িত্ব পালনে অবহেলার শাস্তি, ও কর্মে অংশগ্রহণের শর্তাবলী ও এর জন্য আবশ্যকীয় গুণাবলী আলোচনা করেছি এই পুস্তিকাটিতে। এ বিষয়ক কিছু ভুলভ্রান্তি, যেমন বিভিন্ন অজুহাতে এ দায়িত্বে অবহেলা, ফলাফলের ব্যস্ততা বা জাগতিক ফলাফল ভিত্তিক সফলতা বিচার, এ দায়িত্ব পালনে কঠোরতা ও উগ্রতা, আদেশ, নিষেধ বা দাওয়াত এবং বিচার ও শাস্তির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়, আদেশ নিষেধ বা দাওয়াত এবং গীবত ও দোষ অনুসন্ধানের মধ্যে পার্থক্য ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করেছি। সবশেষে এ ইবাদত পালনের ক্ষেত্রে সুন্নাতে নববী এবং এ বিষয়ক কিছু ভুলভ্রান্তির কথা আলোচনা করেছি। হাদিসের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সহিহ বা নির্ভরযোগ্য হাদিসের উপর নির্ভর করার চেষ্টা করেছি। মুহাদ্দিসগণ অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষার মাধ্যমে হাদিসের বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা নির্ধারণ করেছেন, যে নিরীক্ষা-পদ্ধতি বিশ্বের যে কোনো বিচারালয়ের সাক্ষ্য-প্রমাণের নিরীক্ষার চেয়েও বেশি সূক্ষ্ম ও চুলচেরা। এর ভিত্তিতে যে সকল হাদিস সহিহ বা হাসান অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণিত হয়েছে আমি আমার আলোচনায় শুধুমাত্র সে হাদিসগুলিই উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি। অতি নগণ্য এ প্রচেষ্টাটুকু যদি কোনো আগ্রহী মুমিনকে উপকৃত করে তবে তা আমার বড় পাওয়া। কোনো সহৃদয় পাঠক দয়া করে পুস্তিকাটির বিষয়ে সমালোচনা, মতামত, সংশোধনী বা পরামর্শ প্রদান করলে তা লেখকের প্রতি তাঁর এহসান ও অনুগ্রহ বলে গণ্য হবে। মহান আল্লাহর দরবারে সকাতরে প্রার্থনা করি, তিনি দয়া করে এ নগণ্য কর্মটুকু কবুল করে নিন এবং একে আমার, আমার পিতামাতা, স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়স্বজন ও পাঠকদের নাজাতের ওসিলা বানিয়ে দিন। আমীন! আল্লাহর পথে দাওয়াত প্রথম পরিচ্ছেদ : পরিচিতি, গুরুত্ব ও বিষয়বস্তু ১. পরিচিতি: দাওয়াহ, আমর, নাহই, তাবলীগ, নসিহত, ওয়াজ নিজের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি নিজের আশেপাশে অবস্থানরত অন্যান্য মানুষদের মধ্যে আল্লাহর দীনকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা মুমিনের অন্যতম দায়িত্ব। এ জন্য মুমিনের জীবনের একটি বড় দায়িত্ব হলো ‌‌-আল আমরু বিল মারুফ অয়ান নাহ্‌ইউ আনিল মুনকার- অর্থাৎ ন্যায় কাজের আদেশ ও অন্যায় থেকে নিষেধ করা। আদেশ ও নিষেধকে একত্রে আদ-দাওয়াতু ইলাল্লাহ বা আল্লাহর দিকে আহবান বলা হয়। এ ইবাদত পালনকারীকে দায়ী ইলাল্লাহ বা আল্লাহর দিকে আহবানকারী ও সংক্ষেপে দায়ী অর্থাৎ দাওয়াতকারী বা দাওয়াত-কর্মী বলা হয়। দাওয়াত (الدعوة) শব্দের অর্থ, আহবান করা বা ডাকা। আরবিতে (الأمر) বলতে আদেশ, নির্দেশ, উপদেশ, অনুরোধ, অনুনয় সবই বুঝায়। অনুরূপভাবে নাহই (النهي) বলতে নিষেধ, বর্জনের অনুরোধ ইত্যাদি বুঝানো হয়। কোরআন-হাদিসে এই দায়িত্ব বুঝানোর জন্য আরো অনেক পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে: তন্মধ্যে রয়েছে আত-তাবলীগ (التبليغ) আন-নাসীহাহ (النصيحة) আল-ওয়াজ (الوعظ) ইত্যাদি। আত-তাবলীগ অর্থ পৌঁছানো, প্রচার করা, খবর দেওয়া, ঘোষণা দেওয়া বা জানিয়ে দেওয়া। আন-নাসীহাহ শব্দের অর্থ আন্তরিক ভালবাসা ও কল্যাণ কামনা। এ ভালবাসা ও কল্যাণ কামনা প্রসূত ওয়াজ, উপদেশ বা পরামর্শকেও নসিহত বলা হয়। ওয়াজ বাংলায় প্রচলিত অতি পরিচিত আরবি শব্দ। এর অর্থ উপদেশ, আবেদন, প্রচার, সতর্কীকরণ ইত্যাদি। দাওয়াতের এই দায়িত্ব পালনকে কোরআনুল কারিমে ইকামতে দীন বা দীন প্রতিষ্ঠা বলে অভিহিত করা হয়েছে। এগুলি সবই একই ইবাদতের বিভিন্ন নাম এবং একই ইবাদতের বিভিন্ন দিক। পরবর্তী আলোচনা থেকে আমরা তা বুঝতে পারব, ইনশাআল্লাহ। কোরআন-হাদিসের আলোকে দাওয়াত-এর গুরুত্ব নবী রাসূলগণের মূল দায়িত্ব, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ, প্রচার, নসিহত, ওয়াজ বা এককথায় আল্লাহর দীন পালনের পথে আহবান করাই ছিল সকল নবী ও রাসূলের (আলাইহিমুস সালাম) দায়িত্ব। সকল নবীই তাঁর উম্মতকে তাওহিদ ও ইবাদতের আদেশ করেছেন এবং শিরক, কুফর ও পাপকাজ থেকে নিষেধ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: ﭽﭴ ﭵ ﭶ ﭷ ﭸ ﭹ ﭺ ﭻ ﭼ ﭽ ﭾ ﭿ ﮀ ﮁ ﮂ ﮃ ﮄ ﮡ ﭼ الأعراف: ١٥٧ যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মি নবীর, যাঁর উল্লেখ তারা তাদের নিকট রক্ষিত তাওরাত ও ইনজীলে লিপিবদ্ধ পায়, যিনি তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেন এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন। (সূরা আরাফ: ১৫৭) এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মকে আদেশ ও নিষেধ নামে অভিহিত করা হয়েছে। অন্যত্র এ কর্মকে দাওয়াত বা আহবান নামে অভিহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা বলেন: ﭽﮢ ﮣ ﮤ ﮥ ﮦﮧ ﮨ ﮩ ﮪ ﮫ ﯓ ﭼ الحديد: ٨ তোমাদের কি হল যে, তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আন না, অথচ রাসূল তোমাদেরকে আহবান করছেন যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আন। (সূরা হাদীদ: ৮) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ দায়িত্বকে দাওয়াত বা আহবান বলে অভিহিত করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: ﭽﮦ ﮧ ﮨ ﮩ ﮪ ﮫ ﮬﮭ ﮮ ﮯ ﮰ ﮱﯓ ﯠ ﭼ النحل: ١٢٥ আপনি আপনার প্রতিপালকের দিকে আহবান করুন হিকমত বা প্রজ্ঞা দ্বারা এবং সুন্দর ওয়াজ-উপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে উৎকৃষ্টতর পদ্ধতিতে আলোচনা-বিতর্ক করুন। (সূরা নাহল: ১২৫) অন্যত্র এই দায়িত্বকেই তাবলিগ বা প্রচার বলে অভিহিত করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: ﭽ ﭺ ﭻ ﭼ ﭽ ﭾ ﭿ ﮀ ﮁﮂ ﮃ ﮄ ﮅ ﮆ ﮇ ﮈﮉ ﮕ ﭼ المائدة: ٦٧ হে রাসূল! আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তা আপনি প্রচার করুন। যদি আপনি তা না করেন তাহলে আপনি আল্লাহর বার্তা প্রচার করলেন না। (সূরা মায়েদা : ৬৭) কোরআনুল কারিমে বারবার বলা হয়েছে যে, প্রচার বা পোঁছানোই রাসূলগণের একমাত্র দায়িত্ব। নিচের আয়াতে বলা হয়েছে: ﭭ ﭮ ﭯ ﭰ ﭱ ﭲ ﭳ ﭼ النحل: ٣٥ রাসূলগণের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টভাবে প্রচার করা। (সূরা নাহল: ৩৫) নূহ আ.- এর জবানিতে বলা হয়েছে: ﭽﮏ ﮐ ﮑ ﮒ ﮓ ﮚ ﭼ الأعراف: ٦٢ আমি আমার প্রতিপলকের রিসালাতের দায়িত্ব তোমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি এবং আমি তোমাদের নসিহত করছি। (সূরা আরাফ: ৬২) সূরা আরাফের ৬৮, ৭৯, ৯৩ নম্বর আয়াত, সূরা হুদ-এর ৩৪ নম্বর আয়াত ও অন্যান্য স্থানে দাওয়াতকে নসিহত বলে অভিহিত করা হয়েছে সূরা শুরার ১৩ আয়াতে বলেছেন: ﭽ ﭺ ﭻ ﭼ ﭽ ﭾ ﭿ ﮀ ﮁ ﮂ ﮃ ﮄ ﮅ ﮆ ﮇ ﮈ ﮉ ﮊﮋ ﮌ ﮍ ﮎ ﮏ ﮐ ﮑﮒ ﮓ ﮔ ﮕ ﮖ ﮗ ﮘﮙ ﮣ ﭼ الشورى: ١٣ তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে- আর যা আমি ওহী করেছি আপনাকে- এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা এবং ঈসাকে, এ বলে যে, তোমরা দীন প্রতিষ্ঠা কর এবং তাতে দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা করো না। আপনি মুশরিকদের যার প্রতি আহবান করছেন তা তাদের নিকট দুর্বহ মনে হয়। (সূরা শুরা: ১৩) তাবারি, ইবনু কাসির ও অন্যান্য মুফাসসির, সাহাবি-তাবিয়ি মুফাসসিরগণ থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, দীন প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো দীন পালন করা। আর দীন পরিপূর্ণ পালনের মধ্যেই রয়েছে আদেশ, নিষেধ ও দাওয়াত। এ অর্থে কোনো কোনো গবেষক দীন পালন বা নিজের জীবনে দীন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অন্যদের জীবনে দীন প্রতিষ্ঠার দাওয়াতকেও ইকামতে দীন বলে গণ্য করেছেন। উম্মতে মুহাম্মদির অন্যতম দায়িত্ব ও বৈশিষ্ট্য দাওয়াত, আদেশ-নিষেধ, দীন প্রতিষ্ঠা বা নসিহতের এই দায়িত্বই উম্মতে মুহাম্মদির অন্যতম দায়িত্ব ও বৈশিষ্ট্য। ইরশাদ হয়েছে: ﭽﮖ ﮗ ﮘ ﮙ ﮚ ﮛ ﮜ ﮝ ﮞ ﮟ ﮠﮡ ﮢ ﮣ ﮤ ﮥ ﭼ آل عمران: ١٠٤ আর যেন তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহবান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম। (সূরা আলে ইমরান: ১০৪) অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন: ﭽﭞ ﭟ ﭠ ﭡ ﭢ ﭣ ﭤ ﭥ ﭦ ﭧ ﭨ ﭩﭪ ﭷ ﭼ آل عمران: ١١٠ তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানবজাতির (কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে। তোমরা ন্যায়কার্যে আদেশ এবং অন্যায় কার্যে নিষেধ কর এবং আল্লাহতে বিশ্বাস কর। (সূরা আলে ইমরান: ১১০) প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন: ﭽﯝ ﯞ ﯟ ﯠ ﯡ ﯢ ﯣ ﯤ ﯥ ﯦ ﯧ ﯨ ﯩ ﯪ ﯫ ﯬ ﭼ آل عمران: ١١٤ তারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে এবং তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করে। আর তারা কল্যাণকর কাজে দ্রুত ধাবিত হয় এবং তারা নেককারদের অন্তর্ভুক্ত। (সূরা আলে ইমরান: ১১৪) আল্লাহ তাবারকা ওয়া তাআলা আরও বলেন: ﭽ ﮑ ﮒ ﮓ ﮔ ﮕﮖ ﮗ ﮘ ﮙ ﮚ ﮛ ﮜ ﮝ ﮞ ﮟ ﮠ ﮡ ﮢﮣ ﮤ ﮥ ﮦﮧ ﮨ ﮩ ﮪ ﮫ ﮬ ﭼ التوبة: ٧١ আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীরা একে অপরের বন্ধু, তারা ভাল কাজের আদেশ দেয় আর অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করে, আর তারা সালাত কায়েম করে, জাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। এদেরকে আল্লাহ শীঘ্রই দয়া করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ পরক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা তাওবা: ৭১) সূরা তাওবার ১১২ আয়াতে, সূরা হজ্জের ৪১ আয়াতে, সূরা লুকমানের ১৭ আয়াতে ও অন্যান্য স্থানেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, আল্লাহর প্রকৃত মুমিন বান্দাদের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ। এভাবে আমরা দেখছি যে, ঈমান, নামাজ, রোজা ইত্যাদি ইবাদতের মত সৎকাজের নির্দেশ ও অসৎকাজের নিষেধ মুমিনের অন্যতম কর্ম। শুধু তাই নয়, মুমিনদের পারস্পারিক বন্ধুত্বের দাবি হলো যে, তারা একে অপরের আন্যায় সমর্থন করেন না, বরং একে অপরকে ন্যায়কর্মে নির্দেশ দেন এবং অন্যায় থেকে নিষেধ করেন। এখানে আরো লক্ষণীয়, এ সকল আয়াতে ঈমান, নামাজ, জাকাত ইত্যাদির আগে সৎকার্যে আদেশ ও অসৎকার্যে নিষেধ করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে আমরা মুমিনের জীবনে এর সবিশেষ গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি। এই দায়িত্বপালনকারী মুমিনকেই সর্বোত্তম বলে ঘোষণা করা হয়েছে পবিত্র কোরআনে। মহান আল্লাহ বলেন: ﭽﭼ ﭽ ﭾ ﭿ ﮀ ﮁ ﮂ ﮃ ﮄ ﮅ ﮆ ﮇ ﮈ ﮉ ﭼ فصلت: ٣٣ ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা কথায় কে উত্তম যে আল্লাহর প্রতি মানুষকে আহবান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি তো মুসলিমদের একজন। ( সূরা ফুসসিলাত: ৩৩) আমরা দেখেছি যে, আদেশ, নিষেধ বা দাওয়াত-এর আরেক নাম নসিহত। নসিহত বর্তমানে সাধারণভাবে উপদেশ অর্থে ব্যবহৃত হলেও মূল আরবিতে নসিহত অর্থ আন্তরিকতা ও কল্যাণ কামনা। কারো প্রতি আন্তিরকতা ও কল্যাণ কামনার বহি:প্রকাশ হলো তাকে ভাল কাজের পরামর্শ দেওয়া ও খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করা। এ কাজটি মুমিনদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি অন্যতম দায়িত্ব। বরং এই কাজটির নামই দীন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: الدِّيْنُ النَّصِيْحَةُ، قُلْنَا لِمَنْ قَالَ للهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأئمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَعَامَّتهِمْ. (رواه مسلم) দীন হলো নসিহত। সাহাবিগণ বললেন, কার জন্য ? বললেন, আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য, মুসলিমগণের নেতৃবর্গের জন্য এবং সাধারণ মুসলিমদের জন্য। (মুসলিম) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ নসিহতের জন্য সাহাবিগণের বাইআত তথা প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করতেন। বিভিন্ন হাদিসে জারির ইবনু আব্দুল্লাহ রা. মুগিরা ইবনু শুবা রা. প্রমুখ সাহাবি বলেন: بَايَعْتُ رَسُوْل اللهِ صلى الله عليه وسلَّمَ عَلى إقَامَةِ الصَّلاةِ وَإيْتَاءِ الزَّكَاةِ وَالنُّصْحِ لِكُلِّ مسْلِمٍ (رواه البخاري) আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বাইয়াত বা প্রতিজ্ঞা করেছি, সালাত কায়েম, জাকাত প্রদান ও প্রত্যেক মুসলিমের নসিহত (কল্যাণ কামনা) করার উপর। (বোখারি)। এ অর্থে তিনি সৎকার্যে আদেশ ও অসৎকার্যে নিষেধের বাইয়াত গ্রহণ করতেন। উবাদাহ ইবনু সামিত ও অন্যান্য সাহাবি রা. বলেন: إنَّا بَايَعْنَاهُ عَلى السَّمْعِ وَالطَّاعَةِ ..وَعَلى الأمْرِ بِالْمَعْرُوفِ وَالنَّهيِ عَنِ المُنْكَرِ وَ عَلى أنْ نَقُولَ في اللهِ تَبَارَكَ وَتَعَالى وَلا نَخَافُ لَومَةَ لائِمٍ فيهِ (أحمد صحيح) আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বাইয়াত করি আনুগত্যের… এবং সৎকর্মে আদেশ ও অসৎকর্মে নিষেধের এবং এ কথার উপর যে, আমরা মহিমাময় আল্লাহর জন্য কথা বলব এবং সে বিষয়ে কোন নিন্দুকের নিন্দা বা গালি গালাজের তোয়াক্কা করব না। (আহমাদ, বিভিন্ন গ্রহণযোগ্য সনদে)।