দু’আ এক মহান ইবাদত

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, যিনি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল ও দাতা। এবং তাঁর জন্য কৃতজ্ঞতা এ জন্য যে, তিনি সব ধরনের নিয়মত দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।
    আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল এবং তাঁর বিশেষ বন্ধু , আর আল্লাহ তাঁর প্রতি শান্তি ও রহমত বর্ষণ করুন এবং তাঁর বরকতপূর্ণ সহচরবৃন্দগণের প্রতিও। কিয়ামতের দিন ও প্রতিদানের দিন পর্যন্ত।
মু’মিন ভাইয়েরা !
       সৃষ্টিকর্তা প্রতিপালক আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কিভাবে স্থাপিত হতে পারে ?  মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে কোনো রকম মুখাপেক্ষী নন । তিনি সকল সৃষ্টিজীব থেকে অমুখাপেক্ষী । সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান । তিনি মহা শক্তির অধিকারী, তাঁর ওপর কেউ বিজয়ী হতে পারে না । আকাশমণ্ডল ও তাবৎ জগতের প্রতিটি বিষয় তাঁর আয়ত্বাধীন । তাই মানুষ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে, তাঁর কাছে নিজের প্রয়োজন প্রার্থনা করতে, বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে সর্বদা তাঁর কাছেই মুখাপেক্ষী। তিনি কারীম-মহান । তাঁর কাছে প্রার্থনা করলে তিনি খুশি হন । তিনি ভালবাসেন মানুষ তাঁর কাছে তাদের প্রয়োজনীয় সবকিছু চেয়ে নেবে । তিনি তাদের প্রার্থনা কবুল করেন ।
দু’আ অর্থ :- ডাকা, আহ্বান করা, প্রার্থনা করা, দু’আ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, দু’আ হচ্ছে ইবাদত। আর ইবাদত সবগুলিই আল্লাহরই জন্য পালন করতে হবে। দু’আ দুই প্রকার- (১) দু’আ আল-ইবাদাহ, উপাসনামূলক দু’আ। (২) দু’আ আল-মাস্আলাহ, প্রার্থনাকারী নিজের জন্য যা কল্যাণকর তা চাবে এবং যা ক্ষতিকর তা থেকে মুক্তি প্রার্থনা করবে।
       আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমার কাছে প্রার্থনা কর, আমি তোমাদের প্রার্থনা কবুল করব। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত হতে বিমুখ তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে। (আল-মুমিন : ৬০) এ আয়াতে প্রমানিত হল, যারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে না তারা অহংকারী। অতএব প্রার্থনা করলে অহংকার থেকে মুক্ত থাকা যাবে। আর এ আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দুআ অন্যতম ইবাদত। আর এটা পরিহার করা আল্লাহর সঙ্গে অহংকার করার নামান্তর। এ অহংকারের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো অহংকার হতে পারে না। কিভাবে মানুষ আল্লাহর সঙ্গে অহংকার করতে পারে যে আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে সব ধরনের জীবনোপকরণ দিয়েছেন, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান এবং ভাল-মন্দের প্রতিদান দিয়ে থাকেন।
      রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : দু’আ-ই হল ইবাদত। অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন : সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত  হল দু’আ । রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেন : আল্লাহর কাছে দু’আর
চেয়ে উত্তম কোন ইবাদত নেই। (আবু দাউদ, তিরমিজী ও ইবনু মাজা)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : আর আমার বাšদারা যখন তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে আমার ব্যাপারে বস্তূত: আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নি:সংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে। (সূরা-বাকারাহ:১৮৬)
মুসলিম ভাইয়েরা !
      রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার চাচাতো ভাই ইবনে আব্বাস (রাঃ)-কে নসীহত করেছিলেন : হে খোকা ! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিক্ষা দেব, আল্লাহকে হেফাজত কর, আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। আল্লাহকে হেফাজত কর, তুমি তাকে সামনে পাবে। যখন প্রার্থনা করবে তখন আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করবে। যখন সাহায্য কামনা করবে তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাবে। জেনে রাখ ! পুরো জাতি যদি তোমাকে উপকার করতে একত্র হয় তবুও তোমার কোন উপকার করতে পারবে না , তবে আল্লাহ তোমার জন্য যা লিখে রেখেছেন। এমনিভাবে পুরো জাতি যদি তোমার ক্ষতি করার জন্য একত্র হয় তবুও তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না, তবে আল্লাহ যা তোমার বিপক্ষে লিখে রেখেছেন। কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে আর দফতর শুকিয়ে গেছে। (তিরমিযী)
দু’আ নিবেদন হতে হবে কেবলই আল্লাহর উদ্দেশ্যে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : যে মানুষকে শুনানোর জন্য কাজ করল আল্লাহ তা মানুষকে শুনিয়ে দিবেন। আর যে মানুষকে দেখানোর জন্য কাজ করল আল্লাহ তা মানুষকে দেখিয়ে দিবেন। ফলে সে আল্লাহর কাছে এর কোন বিনিময় পাবে না। (আবু দাউদ, তিরমিজী ও ইবনু মাজা)
দুআ করার আদবসমূহ : (১) দুআ করার সময় তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে এ দৃঢ় বিশ্বাস রাখা এবং দৃঢ়তার সঙ্গে দুআ করা : যদি আল্লাহ সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান থাকে তাঁর কুদরত, মহত্ত্ব, ওয়াদা পালনের প্রতি ঈমান থাকে তাহলে এ বিষয়টা আয়ত্ব করা সহজ হবে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : তোমাদের কেউ এ রকম বলবে না : হে আল্লাহ আপনি যদি চান তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দিন। যদি আপনি চান তাহলে আমাকে অনুগ্রহ করুন। যদি আপনি চান তাহলে আমাকে জীবিকা দান করুন। বরং দৃঢ়তার সঙ্গে প্রার্থনা করবে এবং মনে রাখবে তিনি যা চান তা-ই করেন, তাকে কেউ বাধ্য করতে পারে না। (বুখারী)
(২) বিনয় ও একাগ্রতার সঙ্গে দুআ করা এবং আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ ও তার শাস্তি থেকে বাঁচার প্রবল আগ্রহ নিয়ে দুআ করা : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন : তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের প্রতিপালকের কাছে দুআ করবে। (আল-আরাফ : ৫৫)
(৩) আল্লাহর কাছে অত্যন্ত বিনীতভাবে ধর্না দেয়া এবং নিজের দুর্বলতা, অসহায়ত্ব ও বিপদের কথা আল্লাহর কাছে প্রকাশ করা : দেখুন আইউব আ. কিভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন। আল্লাহ সে সম্পর্কে  বলেন : এবং স্মরণ কর আইউবের কথা, যখন সে তার প্রতিপালকের কাছে প্রার্থনা করে বলেছিল, আমি দুঃখ-কষ্টে পড়েছি, আর তুমি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।  (আল-আম্বিয়া : ৮৩)
(৪) দু’আয় আল্লাহর হামদ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ পেশ করা : দুআর শুরুতে আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করা ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ পড়া দুআ কবুলের সহায়ক।
(৫) আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ ও তাঁর মহৎ গুণাবলি দ্বারা দুআ করা : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন : আল্লাহর রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাকে সে সকল নাম দিয়ে প্রার্থনা করবে।  (আল-আরাফ : ১৮০)
(৬) পাপ ও গুনাহ স্বীকার করে প্রার্থনা করা । (৭)  প্রার্থনাকারী নিজের কল্যাণের দুআ করবে নিজের বা কোনো মুসলিমের অনিষ্টের দুআ করবে না : নিজের কল্যাণের জন্য দুআ করলে তা কবুল হওয়ার ওয়াদা আছে আর অকল্যাণ বা পাপ নিয়ে আসতে পারে এমন দুআ করলে তা কবুল হবে না বলে হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
(৮) সৎকাজের অসীলা দিয়ে দুআ করা । (৯) বেশি বেশি করে ও বার বার দুআ প্রার্থনা করা : যেমন হাদীসে এসেছে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : তোমাদের কেউ যখন দুআ করে সে যেন বেশি করে দুআ করে কেননা সে তার প্রভুর কাছে প্রার্থনা করছে।
(১০) সুখে দুঃখে সর্বাবস্থায় দুআ করা । (১১) দুআর বাক্য তিনবার করে উচ্চারণ করা : দুআর বাক্য তিনবার করে উচ্চারণ করলে প্রার্থনাকারীর মনোযোগ ও একাগ্রতা বেশি হয় যা দুআ কবুলে সহায়ক হয়।
(১২) দুআয় উচ্চস্বর পরিহার করা । অনেক মানুষকে দেখা যায় তারা দুআ করার সময় স্বর উচু করেন বা চিৎকার করে দুআ করেন। এটা দুআর আদবের পরিপন্থী। (১৩) দুআ- প্রার্থনার পূর্বে অযু করা
(১৪) দুআয় দুহাত উত্তোলন করা : যেমন হাদীসে এসেছে ইবনু উমার রা. বলেন : নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুহাত তুললেন এবং বললেন, হে আল্লাহ! খালেদ যা করেছে আমি সে ব্যাপারে তোমার কাছে দায়িত্বমুক্ত।’ দুবার বললেন। (বুখারী) (১৫) কিবলামুখী হওয়া  দুআর সময় কিবলামুখী হওয়া মুস্তাহাব। যেমন হাদীসে এসেছে : আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবার দিকে মুখ করলেন এবং কতিপয় কুরাইশ নেতাদের বিরুদ্ধে দ’ুআ করলেন। (বুখারী ও মুসলিম)
মু’মিন ভাইয়েরা !
       যখন স্পষ্ট হল যে, দ’ুআ-ই সর্বোত্তম ইবাদত ও সর্বশ্রেষ্ঠ আনুগত্য এবং যা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই নিবেদন করা মানুষের জন্য কর্তব্য। হোক তা প্রার্থনা অথবা আশ্রয় চাওয়া কিংবা বিপদ-মুক্তি, তা আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো কাছে পেশ করা বৈধ নয়। যে সকল বিষয় মানুষ সাহায্য করতে সামর্থ রাখে শুধু সে সকল বিষয় মানুষের কাছে চাওয়া বৈধ। আল্লাহ ব্যতিত অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করা যাবে না হোক নবী বা অলী বা পীর বা গাউস-কুতুব অথবা ফিরিশ্তা বা জিন এক কথায় কোনো সৃষ্টিজীবের কাছে দুআ করা যাবে না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকবে না, যা তোমার উপকার করে না, অপকারও করতে পারে না। কারণ এরূপ করলে তুমি অবশ্যই জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হবে। এবং আল্লাহ তোমাকে ক্লেশ দিলে তিনি ব্যতীত তা মোচনকারী আর কেউ নেই এবং আল্লাহ যদি মঙ্গল চান তবে তার অনুগ্রহ রদ করার কেউ নেই। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তিনি মঙ্গল দান করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (ইউনুস:১০৬-১০৭)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : সে ব্যক্তি অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুকে ডাকে যা কিয়ামত দিবস পর্যন্তও উহাকে সাড়া দেবে না ? এবং এগুলো তাদের প্রার্থনা সম্পর্কেও অবহিত নয়। যখন কিয়ামতের দিন মানুষকে একত্র করা হবে তখন এগুলো হবে তাদের শত্রু এবং এগুলো তাদের ইবাদত অস্বীকার করবে। (আল-আহকাফ : ৫-৬) 
               আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথের হিদায়াত দান করুন। আমীন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *