خطبة عيد الفطر ঈদুল ফিতরের খুৎবা

সমস্ত প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। আমরা তার প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করি। আমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রবৃত্তিজাত অনিষ্ট ও কর্মের কুপ্রভাব হতে আশ্রয় চাই। আল্লাহ তা’আলা যাকে হেদায়েত দান করেন, তার কোন ভ্রষ্টকারী নেই। আর যাকে তিনি ভ্রষ্ট করেন, তার কোন হেদায়েতকারী নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, ও একক, তার কোন শরীক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ ! সালাত, সালাম ও বরকত অবতীর্ণ করুন তার উপর, তার বংশধর ও সাহাবাদের উপর, এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার পথে ধাবিত হবে ও তার আদর্শের অনুসরণ করবে তাদের উপর। আল্লাহ রাব্বুল ইয্যত আরো ইরশাদ করেন :- হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে। (সূরা আহযাব-৭০/৭১) আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা আল-ইমরান-১০২) আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- হে ঈমানদারগণ তোমরা যদি আল্লাহ্কে ভয় করতে থাক, তবে তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করে দেবেন এবং তোমাদের থেকে তোমাদের পাপকে সরিয়ে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করবেন। বস্তূতঃ আল্লাহ্র অনুগ্রহ অত্যন্ত মহান। (সূরা আনফাল-২৯) ঈমানদার ভাইয়েরা ! আনন্দ ভরা, ভ্রাতৃত্ব- ভালবাসা ও সহমর্মিতায় অম্লান ঈদুল ফিতর, মুসলিমদের অন্যতম আনন্দ উৎসব। হিজরী বছরের দশম-মাস শাওয়াল, শাওয়ালের প্রথম দিন মুমিনদের অনাবিল খুশির দিন, ক্ষমার বার্তা নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর। রহমাত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমযানুল মোবারক শেষ হলেই আমাদের মাজে মহাপুরস্কারের পয়গাম নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর। ঈদ আরবী শব্দ, অর্থ-আনন্দ, ফিতর-অর্থ, রোজা ভঙ্গ করা। এমন দিনকে ঈদ বলা হয় যে দিন মানুষ একত্র হয় ও দিনটি বার বার ফিরে আসে। যেহেতু এ দিনটি বার বার ফিরে আসে তাই এর নাম ঈদ। এ শব্দ দ্বারা এ দিবসের নাম রাখার তাৎপর্য হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ দিবসে তার বান্দাদেরকে নেয়ামত ও অনুগ্রহ দ্বারা বার বার ধন্য করেন ও বার বার তার এহসানের দৃষ্টি দান করেন। যেমন রমজানে পানাহার নিষিদ্ধ করার পর আবার পানাহারের আদেশ প্রদান করেন। সাদকাতুল-ফিতর, হজ্জ-জিয়ারত, কুরবানীর গোশত ইত্যাদি নিয়ামত তিনি বার বার ফিরিয়ে দেন। আর এ সকল নিয়ামত ফিরে পেয়ে ভোগ করার জন্য অভ্যাসগত ভাবেই মানুষ আনন্দ-ফুর্তি করে থাকে। ইসলামে ঈদের প্রচলন : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুসলিম উম্মাহর প্রতি রহমত হিসেবে ঈদ দান করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনাতে আগমন করলেন তখন মদীনা বাসীদের দুটো দিবস ছিল, যে দিবসে তারা খেলাধুলা করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন এ দু দিনের কি তাৎপর্য আছে? মদীনা বাসীগণ উত্তর দিলেন : আমরা মূর্খতার যুগে এ দু দিনে খেলাধুলা করতাম। তখন রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ দু দিনের পরিবর্তে তোমাদের এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দুটো দিন দিয়েছেন। তা হল ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতর। (আবু দাউদ ও নাসায়ী) শুধু খেলাধুলা, আমোদ-ফুর্তির জন্য যে দুটো দিন ছিল আল্লাহ তা’আলা তা পরিবর্তন করে এমন দুটো দিন দান করলেন যে দিনে আল্লাহর শুকরিয়া, তার যিকির, তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সাথে সাথে শালীন আমোদ-ফুর্তি, সাজ-সজ্জা, খাওয়া-দাওয়া করা হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন উম্মতে মোহাম্মদীকে সম্মানিত করে তাদের এ দুটো ঈদ দান করেছেন। আর এ দুটো দিন বিশ্বে যত উৎসবের দিন ও শ্রেষ্ঠ দিন রয়েছে তার সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন ও সেরা ঈদ। আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- বল, আল্লাহ্র দয়া ও মেহেরবাণীতে। সুতরাং এরই প্রতি তাদের সন্তূষ্ট থাকা উচিৎ। এটিই উত্তম সে সমুদয় থেকে যা সঞ্চয় করছ। (সূরা, ইউনুস-৫৮) ঈমানদার ভাইয়েরা ! ঈদুল ফিতর সমস্ত রমযান মাস সিয়াম পালনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে তাওফীক দানের জন্য আল্ল¬াহ তা’আলা প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। ঈদুল ফিতরের দিন সাদকাতুল-ফিতর আদায় করা তার পর সমবেত ভাবে দু’রাকাত সালাত আদায় করা। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদকাতুল-ফিতর ওয়াজিব করেছেন, অশ্লীল ও অনর্থক কথা-বার্তার কারণে সিয়ামে ঘটে যাওয়া ত্রুটি-বিচ্যুতি গুলো দূর করার জন্য ও মিসকিনদের খাদ্য প্রদানের জন্য। ঈদের নামাজের পূর্বে আদায় করলে তা সাদকাতুল-ফিতর হিসাবে গন্য হবে। আর ঈদের নামাজের পর আদায় করলে তা অন্যান্য সাধারণ সাদকার মত একটি দান হিসাবে গন্য হবে। (আবু দাউদ) ঈদের দিনের করণীয় : ঈদের দিন গোসল করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা। ঈদের দিন গোসল করার মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা মোস্তাহাব। ঈদের দিনে খাবার গ্রহণ প্রসঙ্গে : সুন্নত হল ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদের সালাত আদায়ের পূর্বে খাবার গ্রহণ করা। আর ঈদুল আযহার দিন ঈদের সালাতের পূর্বে কিছু না খেয়ে সালাত আদায়ের পর কুরবানির গোশত খাওয়া সুন্নত। ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদের সালাতের পূর্বে তিনটি, পাঁচটি অথবা সাতটি এভাবে বে-জোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়া সুন্নত। সাহাবী আনাস (রাঃ) বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন কয়েকটি খেজুর না খেয়ে বের হতেন না, আর খেজুর খেতেন বে-জোড় সংখ্যায়। (বুখারী) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া : ঈদগাহে তাড়াতাড়ি যাওয়া উচিত। যাতে ইমাম সাহেবের নিকটবর্তী স্থানে বসা যায় ও ভাল কাজ অতি তাড়াতাড়ি করার সওয়াব অর্জন করা যায়, সাথে সাথে সালাতের অপেক্ষায় থাকার সওয়াব পাওয়া যাবে। ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া হল মোস্তাহাব। ঈদের তাকবীর আদায় : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতেন। ঈদের সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতেন। যখন সালাত শেষ হয়ে যেত তখন আর তাকবীর পাঠ করতেন না। ঈদের সালাতের হুকুম : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও কুরবানি কর। (সূরা কাউসার-২) আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন, যারা আল্লাহ্র সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পরাক্রমশালী শক্তিধর। তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শক্তি-সামর্থ্য দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহ্র এখতিয়ারভূক্ত। (সূরা, হাজ্জ-৪০/৪১) তাই আজ প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত¦ রমযান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে জীবনকে উদ্ভাসিত করা। আল্ল¬াহ তা’আলা আমাদের সবাইকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের তাওফীক দান করুন। আমীন .

الكلمة الطيبة পবিত্র বাক্য প্রসঙ্গে

সমস্ত প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। আমরা তার প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করি। আমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রবৃত্তিজাত অনিষ্ট ও কর্মের কুপ্রভাব হতে আশ্রয় চাই। আল্লাহ তা’আলা যাকে হেদায়েত দান করেন, তার কোন ভ্রষ্টকারী নেই। আর যাকে তিনি ভ্রষ্ট করেন, তার কোন হেদায়েতকারী নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, ও একক, তার কোন শরীক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল।
হে আল্লাহ ! সালাত, সালাম ও বরকত অবতীর্ণ করুন তার উপর, তার বংশধর ও সাহাবাদের উপর, এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার পথে ধাবিত হবে ও তার আদর্শের অনুসরণ করবে তাদের উপর।
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন :- হে মু’মিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে। (সূরা আহযাব-৭০/৭১)
আল্ল¬াহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন :- অতঃপর আল্লাহ্ যাকে পথ-প্রদর্শন করতে চান, তার বক্ষকে ইসলামের জন্যে উম্মুক্ত করে দেন এবং যাকে বিপথগামী করতে চান, তার বক্ষকে সংকীর্ণ অত্যধিক সংকীর্ণ করে দেন-যেন সে সবেগে আকাশে আরোহণ করছে। এমনি ভাবে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না। আল্লাহ্ তাদের উপর আযাব বর্ষন করেন। (সূরা আন’আম-১২৫)
আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :-হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিৎ ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। (সূরা আল-ইমরান-১০২)
মুসলিম ভাইয়েরা !
কালিমায়ে তায়্যিবা ইসলামের মূল ঘোষণা। এটা না পড়ে কেনো মানুষই ইসলামের সীমার মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। এ জন্যই কোন কাফির অথবা মুশরিক ব্যক্তি যখনই ইসলাম কবুল করতে চায় তখন সর্বপ্রথম তাকে এই কালিমা পড়তে হয়। মুসলমানদের ঘরে কোনো সন্তান জন্ম নিলে সর্বপ্রথম তার কানে এই কালিমার আওয়াজ পৌঁছানো হয়। মসজিদে মুয়াজ্জিন দৈনিক পাঁচবার উচ্চস্বরে এই কালিমার ঘোষণা দিয়ে মানুষকে নামাজের দিকে আহ্বান করেন। শুধু তাই নয় নামাজের মধ্যে এই কালিমা বার বার পড়তে হয়। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের অনেক জায়গায় এই কালিমার কথা বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্ল¬াহ তা’আলা  ইরশাদ করেন :- তুমি কি লক্ষ্য কর না, আল্লাহ্ তা’আলা কেমন উপমা বর্ণনা করেছেন: পবিত্র বাক্য হলো পবিত্র বৃক্ষের মত। তার শিকড় মজবুত এবং শাখা আকাশে উত্থিত। (সূরা ইবরাহীম-২৪) সুতরাং প্রতিটি মুসলমানদের জন্য এই কালিমার অর্থ ভাল করে জানা অত্যন্ত প্রয়োজন। আর তার অর্থ হলো-আল্ল¬াহ ছাড়া অন্য কোনো মা’বুদ নাই হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল।
এই পৃথিবীতে যত নবী-রাসূল এসেছেন তাঁরা সবাই কালিমার দাওয়াত দিয়েছেন। যেমন আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- হে মুহাম্মদ! আপনার পূর্বে যত নবীই আমি পাটিয়েছি তাঁদের সকলের প্রতি ওহীযোগে এই আদেশ দিয়েছি যে, আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ বা মা’বুদ নেই। অতএব তোমরা সকলে কেবল আমরাই দাসত্ব ও বন্দেগী কবুল কর। (সূরা আম্বিয়া-২৫) হযরত নূহ (আঃ) তার সমকালীন জনগণকে বলেছিলেন : হে জনগণ! এক আল্ল¬াহ তাআলার দাসত্ব ও বন্দেগী কবুল কর কারণ তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো প্রভূ বা ইলাহ নেই। (সূরা আরাফ-৫৯) হযরত ইউনুস (আঃ) তাঁর সমকালীন জনগণকে বহুদিন পর্যন্ত তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছিলেন। হযরত মূসা (আঃ) নিজের সমকালীন জনগণকে বলেছিলেন : আল্ল¬াহকে বাদ দিয়ে তোমাদের জন্য অন্য আর একজন মাবুদ তালাশ করে আনবে কি? অথচ একমাত্র আল্ল¬াহই তোমাদিগকে দুনিয়ার সমস্ত লোকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব ও সম্মান দান করেছেন। (সূরা আরাফ-১৪০) হযরত সালেহ (আঃ) তাঁর জনগণকে বলেছিলেন : হে আমার জনগণ! কেবল আল্ল¬াহ তা’আলার দাসত্ব ও ইবাদত কর; তিনি ব্যতীত তোমাদের আর কোনো মাবুদ নেই। (সূরা হুদ-৮৪) হযরত হুদ (আঃ) যখন দাওয়াত দিলেন; হে জনগণ! তোমরা কেবল এক আল্ল¬াহর দাসত্ব ও ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের ইবাদত পাওয়ার যোগ্য আর কেউ নেই, তখন জনগণ বলল, তুমি আমাদেরকে এই কথা বলতে এসেছো যে, আমরা একমাত্র আল্ল¬াহর দাসত্ব বন্দেগী করব এবং আমাদের পূর্বপুরুষ যাদের বন্দেগী করত তাদেরকে ত্যাগ করব? 
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই কালিমার দাওয়াত দিয়ে বলেছিলেন : বল তিনিই আমার রব, মালিক ও প্রভূ। তিনি ব্যতীত আর কোনো মা’বুদ নেই। তাঁর ওপরই আমার একান্ত ভরসা, আমি তাঁর দিকে ফিরে যাচ্ছি। লা-ইলাহা ইল্ল¬াল্ল-াহ কালিমাটির মধ্যে এমন কী কথা বা বস্তু নিহিত রয়েছে যে, উচ্চারণের সাথে সাথেই চারদিকে এত দুশমনের উদ্ভব হয়? অথচ এই দাওয়াত পেশ করার পূর্বে প্রত্যেক নবীই নৈতিক চরিত্রের দিক দিয়ে সেই সময়ের সমস্ত মানুষের নিকট খুবই শ্রদ্ধাভাজন ও প্রিয়পাত্র বলে বিবেচিত হয়েছেন।
হযরত মূসা (আঃ) তৎকালীন বাদশাহ ফেরাউনের ঘরেই লালিত পালিত হয়েছেন। কিন্তু যখনই এই কালিমা উচ্চারণ করলেন, তখন তাঁর ফেরাউন হয়ে গেলো তাঁর বড় দুশমন। হযরত ইবরাহীম (আঃ) একজন রাজ পুরোহিতের পুত্র। পিতার আদরের সন্তান এবং সেই কারণে অন্যদের প্রিয়পাত্র ছিল। কিন্তু যখনই এই তাওহীদের আওয়াজ বুলন্দ করলেন তখনই তার পিতা-মাতা হতে শুরু করে তৎকালীন বাদশাহ পর্যন্ত তার ঘোরতর শত্রু হয়ে গেল। এমনকি জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করেছিলো। হযরত ঈসা (আঃ) এর জন্মই ছিল সকল মানুষের নিকট বিশেষ এক মোজেযা দিয়ে যা মানুষ সাধারণ বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারে না এজন্য মানুষ তাকে অসাধারণ কিছু বলে মনে করত। কিন্তু তিনিও যখন একজন নবী হিসেবে আল্ল¬াহ তাআলার পবিত্রতা ও একত্বের কথা ঘোষণা করলেন, তখন তাঁর নিজ বংশের লোক ও আত্মীয়-স্বজনরাই তার শত্রুতায় উঠে-পড়ে লেগে গেল। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই তাওহীদের কথা ঘোষণা করার পূর্বে দীর্ঘ চল্লি¬শটি বছর পর্যন্ত তাঁর আপন বংশ তখনকার অন্য লোকদের মধ্যে জীবন-যাপন করেছেন এবং ছোট-বড় নারী-পুরুষ সকলেরই আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভক্তি তিনি পেয়েছেন। কিন্তু যখনই তিনি তাওহীদের বাণী লোকদের মধ্যে প্রচার করলেন সেদিন থেকেই তাঁর আপন বংশের লোকেরা প্রকাশ্যভাবে তাঁর দুশমনি করতে শুরু করল।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : সবচেয়ে উত্তম দু’আ আরাফাত দিবসের দু’আ এবং সবচেয়ে উত্তম কথা হলো যা আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগন বলেছেন, তা হলো :
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদ ওয়া হুয়া আ’লা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর। অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া আর কোন সত্য মাবুদ নেই, তিনি একক তাঁর কোন শরীক নেই. রাজত্ব একমাত্র তাঁরই জন্য এবং প্রশংসা একমাত্র তাঁরই জন্য তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান। এবং আল্লাহর যিকিরসমূহের মধ্যে- لا إله إلا الله এই মহামূল্যবান বানীর রয়েছে বিশেষ মর্যাদা এবং এর সাথে সম্পর্ক রয়েছে বিভিন্ন হুকুম আহকামের। আর এই কালিমার রয়েছে এক বিশেষ অর্থ ও উদ্দেশ্য এবং কয়েকটি শর্ত, ফলে এ কালিমাকে গতানুগতিক মুখে উচ্চারণ করাই ঈমানের জন্য যথেষ্ট নয়।
ঈমানদার ভাইয়েরা !
এই সেই কালিমা যার সাক্ষ্য আল্লাহ তা’য়ালা স্বয়ং নিজেই নিজের জন্য দিয়েছেন, আরো দিয়েছেন ফিরিশতাগণ ও জ্ঞানী ব্যক্তিগণ। আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আল্লাহ নিজেই সাক্ষ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাই নেই৷ আর ফেরেশতা ও সকল জ্ঞানবান লোকই সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে এ সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, সেই প্রবল পরাক্রান্ত ও জ্ঞানবান সত্তা ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। (সূরা আলে ইমরান-১৮) এ কালিমা ইখলাছের বা সত্যনিষ্ঠার বাণী, এটাই সত্যের সাক্ষ্য ও তার দাওয়াত এবং শিরকের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার বাণী। আল্লাহ ব্যতীত সকল উপাস্যদের অস্বীকার করা : বান্দার উচিত আল্লাহ তা’আলা ব্যতীত ধারণা প্রসূত সকল উপাস্য-মা’বূদ অস্বীকার করা। সাথে সাথে এ বিশ্বাস সুদৃঢ় করা যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন উপাস্য নেই। আল্লাহ ছাড়া যাদের এবাদত করা হচ্ছে সব অসাড়। যে কেউ এ সমস্ত কাজ করে সে আল্লাহর উপর অপবাদ আরোপ করে, হোক না সে উপাস্য (মা’বুদ) নৈকট্য প্রাপ্ত ফেরেস্তা, প্রেরিত রাসূল, নেককার ওলী, পাথর, গাছ, চন্দ্র, গোষ্টি-জ্ঞাতি, অথবা কোন সংবিধান…ইত্যাদি। আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- যে তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে সে ধারণ করে সুদৃঢ় হাতল যা ভাঙ্গার নয়। আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন। (সূরা বাকারাহ-২৫৬) অন্যত্র আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহর এবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর। (সূরা নাহল-৩৬) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যে لاإله إلا الله  বলেছে এবং আল্লাহ ছাড়া সকল উপাস্যকে অস্বীকার করেছে তার সম্পদ ও জীবন হারাম হয়ে গেছে এবং তার হিসাব আল্লাহর উপর ন্যস্ত। আল্ল¬াহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আর যারা মুত্তাকী ছিল তাদেরকে বলা হবে: তোমাদের পালনকর্তা কি নাযিল করেছিলেন? তারা বলবে: মহাকল্যাণ। যারা এ জগতে সৎকাজ করে, তাদের জন্যে কল্যাণ রয়েছে এবং পরকালের গৃহ আরও উত্তম। মুত্তাকীদের আবাসস্থল কত চমৎকার? সর্বদা বসবাসের উদ্যান, তারা যাতে প্রবেশ করবে। এর পাদদেশে দিয়ে নদীসমূহ প্রবাহিত হয়্ তাদের জন্যে তাতে তা-ই রয়েছে, যা তারা চায়্ এমনিভাবে প্রতিদান দিবেন আল্লাহ্ মুত্তকীদেরকে। ফেরেশতাগণ যাদের জান কবজ করেন তাদের পবিত্র থাকা অবস্থায়। ফেরেশতাগণ বলেন: তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। তোমরা যা করতে, তার প্রতিদানে জান্নাতে প্রবেশ কর। (সূরা নাহল-৩০/৩২)
হে মুসলিম ভাইয়েরা ! তুমি ভাল করে জেনে নাও: জান্নাতের সৌভাগ্য লাভ করা, জাহান্নাম হতে মুক্তি পাওয়া এ কালেমার উপর অটল, অবিরাম অবিচল থেকে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করা ব্যতিত সম্ভব নয়। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আমাদের সবাইকে কালেমার উপর অটল-অবিচল থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন …

حقوق الزوجين স্বামী স্ত্রীরির অধিকার

স্বামী-স্ত্রীর অধিকার
বিবাহ স্বামী-স্ত্রীর মাঝে একটি সুদৃঢ় বন্ধন। আল্লাহ তা’আলা এর চির স্থায়িত্ব পছন্দ করেন, বিচ্ছেদ অপছন্দ করেন। এরশাদ হচ্ছে : তোমরা কীভাবে তা (মোহরানা) ফেরত নিবে ? অথচ তোমরা পরস্পর শয়ন সঙ্গী হয়েছ। সাথে সাথে তারা তোমাদের থেকে চির বন্ধনের সুদৃঢ় অঙ্গিকারও নিয়েছে। (নিসা-২০)
এ চুক্তিপত্র ও মোহরানার কারণে ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মাঝে কতক দায়দায়িত্ব ও অধিকার নিশ্চিত করেছে। যা বাস্তবায়নের ফলে দাম্পত্য জীবন সুখী ও স্থায়ী হবে—সন্দেহ নেই। সে সব অধিকারের প্রায় সবগুলোই সংক্ষেপ আকারে বর্ণিত হয়েছে কোরআনের নিুোক্ত আয়াতে : যেমন নারীদের উপর অধিকার রয়েছে, তেমন তাদের জন্যও অধিকার রয়েছে ন্যায্য-যুক্তিসংগত ও নীতি অনুসারে। তবে নারীদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব পুরুষদের। আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। (বাকারাহ-২২৭)
আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেকের উপর প্রত্যেকের অধিকার রয়েছে। যদিও আনুগত্য এবং রক্ষনা-বেক্ষন ও অভিভাবকত্বের বিবেচনায় শ্রেষ্ঠত্ব পুরুষদের।
এখানে আমরা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মাঝে বিরাজমান কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধিকার
স্তর ও মানের ভিত্তিতে উল্লেখ করছি।
প্রথমত: যে সব অধিকারের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সমান। দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক সততা, বিশ্বস্ততা ও সদ্ভাব প্রদর্শন করা। যাদের মাঝে নিবিড় বন্ধুত্ব, অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক, অধিক মেলামেশা, সবচেয়ে বেশি আদান-প্রদান তারাই স্বামী এবং স্ত্রী। এ সম্পর্কের চিরস্থায়ী রূপ দিতে হলে ভাল চরিত্র, পরস্পর সম্মান, নম্র-ভাব, হাসি-কৌতুক এবং অহরহ ঘটে যাওয়া ভুলচুক ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখা অবশ্যম্ভাবী। এবং এমন সব কাজ, কথা ও ব্যবহার পরিত্যাগ করা, যা উভয়ের সম্পর্কে চির ধরে কিংবা মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। আল্লাহ বলেন : তাদের সাথে তোমরা সদ্ভাবে আচরণ কর। (নিসা-২০)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : তোমাদের মাঝে যে নিজের পরিবারের কাছে ভাল, সেই সর্বোত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে ভাল। (ইবনে মাজাহ) পরস্পর সদ্ভাবে জীবন যাপন একটি ব্যাপক শব্দ। এর মাঝে সমস্ত অধিকার বিদ্যমান।
দ্বিতীয়ত: পরস্পর একে অপরকে উপভোগ করা। এর জন্য আনুষঙ্গিক যাবতীয় প্রস্তুতি ও সকল উপকরণ গ্রহণ করা। যেমন সাজগোজ, সুগন্ধি ব্যবহার এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাসহ দুর্গন্ধ ও ময়লা কাপড় পরিহার ইত্যাদি। স্বামীÑস্ত্রী প্রত্যেকের এ বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা। অধিকন্তু এগুলো সদ্ভাবে জীবন যাপনেরও অংশ। ইবনে আব্বাস রা. বলেন : আমি যেমন আমার জন্য স্ত্রীর সাজগোজ কামনা করি, অনুরূপ তার জন্য আমার নিজের সাজগোজও পছন্দ করি। তবে পরস্পর এ অধিকার নিশ্চিত করার জন্য উভয়কেই হারাম সম্পর্ক ও নিষিদ্ধ বস্তু হতে বিরত থাকতে হবে।
তৃতীয়ত : বৈবাহিক সম্পর্কের গোপনীয়তা রক্ষা করা। সাংসারিক সমস্যা নিয়ে অন্যদের সাথে আলোচনা না করাই শ্রেয়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে উপভোগ্য বিষয়গুলো গোপন করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে সর্ব-নিকৃষ্ট ব্যক্তি সে, যে নিজের স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং যার সাথে তার স্ত্রী মিলিত হয়, অতঃপর সে এর গোপনীয়তা প্রকাশ করে বেড়ায়। (মুসলিম)
চতুর্থত : পরস্পর শুভ কামনা করা, সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দেয়া। আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে একে অপরকে সহযোগিতা করা। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে একে অপর থেকে উপদেশ পাওয়ার অধিক হকদার। দাম্পত্য জীবন রক্ষা করা উভয়েরই কর্তব্য।আর এর অন্তরভূক্ত হচ্ছে, পরস্পর নিজ আত্মীয়দের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করা ।
সন্তানদের লালন-পালন ও সুশিক্ষার ব্যাপারে উভয়েই সমান, একে অপরের সহযোগী। আল্লাহ তাআলা বলেন : তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ব্যপারে পরস্পরকে সহযোগিতা কর। (মায়িদা-২)
দ্বিতীয়ত : স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কর্তব্য। সুখকর দাম্পত্য জীবন, সুশৃঙ্খল পরিবার, পরার্থপরতায় ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন অটুট রাখার স্বার্থে ইসলাম জীবন সঙ্গিনী স্ত্রীর উপর কতিপয় অধিকার আরোপ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এখানে প্রদত্ত হল।
১. স্বামীর আনুগত্য : স্বামীর আনুগত্য করা স্ত্রীর কর্তব্য। তবে যে কোন আনুগত্যই নয়, বরং যেসব ক্ষেত্রে আনুগত্যের নিম্ন বর্ণিত তিন শর্ত বিদ্যমান থাকবে।
(ক) ভাল ও সৎ কাজ এবং আল্লাহর বিধান বিরোধী নয় এমন সকল বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করা। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর অবাধ্যতায় কোন সৃষ্টির আনুগত্য বৈধ নয়।
(খ) স্ত্রীর সাধ্য ও সামর্থ্যরে উপযোগী বিষয়ে স্বামীর আনুগত্য করা। কারণ আল্লাহ তাআলা মানুষকে তার সাধ্যের বাইরে অতিরিক্ত দায়িত্বারোপ করেন না।
(গ) যে নির্দেশ কিংবা চাহিদা পূরণে কোন ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা নেই, সে ব্যাপারে স্বামীর আনুগত্য করা। আনুগত্য আবশ্যক করে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন : নারীদের উপর পুরুষগণ শ্রেষ্ঠত্ব ও কর্তৃত্বের অধিকারী। (বাকারাহ-২২৭) আল্লাহ তাআলা আরো বলেন : পুরুষগণ নারীদের উপর কর্তৃত্বকারী। কারণ আল্লাহ তাআলা-ই তাদের মাঝে তারতম্য ও শ্রেষ্ঠত্বের বিধান রেখেছেন। দ্বিতীয়ত পুরুষরাই ব্যয়-ভার গ্রহণ করে। (নিসা-৩৪) উপরন্তু এ আনুগত্যের দ্বারা বৈবাহিক জীবন স্থায়িত্ব পায়, পরিবার চলে সঠিক পথে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বামীর আনুগত্যকে এবাদতের স্বীকৃতি প্রদান করে বলেন : যে নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, রমজান মাসের রোজা রাখে এবং নিজের লজ্জাস্থান হেফাজত করে ও স্বীয় স্বামীর আনুগত্য করে, সে, নিজের ইচ্ছানুযায়ী জান্নাতের যে কোন দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করবে। (মাসনাদে আহমদ)
স্বামীর কর্তব্য, এ সকল অধিকার প্রয়োগের ব্যাপারে আল্লাহর বিধানের অনুসরণ করা। স্ত্রীর মননশীলতা ও পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে সত্য-কল্যাণ ও উত্তম চরিত্রের উপদেশ প্রদান করা কিংবা হিতাহিত বিবেচনায় বারণ করা।উপদেশ প্রদান ও বারণ করার ক্ষেত্রে উত্তম আদর্শ ও উন্নত মননশীলতার পরিচয় দেয়া । এতে সানন্দ চিত্তে ও স্বাগ্রহে স্ত্রীর আনগত্য পেয়ে যাবে।
২. স্বামী-আলয়ে অবস্থান:
নেহায়েত প্রয়োজন ব্যতীত ও অনুমতি ছাড়া স্বামীর বাড়ি থেকে বের হওয়া অনুচিত।মহান আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নারীদের ঘরে অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রীদের সম্বোধন করে বলেন—সকল নারীই এর অন্তর্ভুক্ত আল্লাহ তাআলা আরো বলেন : তোমরা স্ব স্ব গৃহে অবস্থান কর, প্রাচীন যুগের সৌন্দর্য প্রদর্শনের মত  নিজেদের কে প্রদর্শন করে বেড়িও না। (আহযাব-৩৩)
স্ত্রীর উপকার নিহিত এবং যেখানে তারও কোন ক্ষতি নেই, এ ধরনের কাজে স্বামীর বাধা সৃষ্টি না করা। যেমন পর্দার সাথে, সুগন্ধি ও সৌন্দর্য প্রদর্শন পরিহার করে বাইরে কোথাও যেতে চাইলে বারণ না করা। ইবনে উমর রা. বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : আল্লাহর বান্দিদেরকে তোমরা আল্লাহর ঘরে যেতে বাধা দিয়ো না। (বুখারী)
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রা: এর স্ত্রী যয়নব সাকাফী রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে বলতেন : তোমাদের কেউ মসজিদে যাওয়ার ইচ্ছে করলে সুগন্ধি ব্যবহার করবে না। (মুসলিম)
২. নিজের ঘর এবং সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা। স্বামীর সম্পদ সংরক্ষণ করা। স্বামীর সাধ্যের অতীত এমন কোন আবদার কিংবা প্রয়োজন পেশ না করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : স্ত্রী স্বীয় স্বামীর ঘরের জিম্মাদার। এ জিম্মাদারির ব্যাপারে তাকে জবাবদেহিতার সম্মুখীন করা হবে। (বুখারী)
৩. নিজের সতীত্ব ও সম্মান রক্ষা করা। পূর্বের কোন এক আলোচনায় আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি হাদিস এ মর্মে উল্লেখ করেছি যে, নিজেকে কখনো পরীক্ষা কিংবা ফেতনার সম্মুখীন না করা।
৪. স্বামীর অপছন্দনীয় এমন কাউকে তার ঘরে প্রবেশের অনুমতি না দেয়া। হোক না সে নিকট আত্মীয় কিংবা আপনজন। যেমন ভাই-বেরাদার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : তোমাদের অপছন্দনীয় কাউকে বিছানায় জায়গা না দেয়া স্ত্রীদের কর্তব্য। (মুসলিম)
স্বামীর উপস্থিতিতে তার অনুমতি ব্যতীত নফল রোজা না রাখা। কারণ, রোজা নফল—আনুগত্য ফরজ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : নারীর জন্য স্বামীর উপস্থিতিতে অনুমতি ছাড়া রোজা রাখা বৈধ নয়। অনুরূপ ভাবে অনুমতি ব্যতীত তার ঘরে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়াও বৈধ নয়। (বুখারী)
তৃতীয়ত : স্বামীর উপর স্ত্রীর অধিকার
স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কর্তব্য, সুখকর দাম্পত্য জীবন, সুশৃঙ্খল পরিবার, পরার্থপরতায় ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন অটুট রাখার স্বার্থে ইসলাম জীবন সঙ্গী স্বামীর উপর কতিপয় অধিকার আরোপ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এখানে প্রদত্ত হল।
১.  দেন মোহর
নারীর দেন মোহর পরিশোধ করা ফরজ। এ হক তার নিজের, পিতা-মাতা কিংবা অন্য কারো নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন : তোমরা প্রফুল্ল চিত্তে স্ত্রীদের মোহরানা দিয়ে দাও। (নিসা-৪)
২. ভরন পোষণ:
সামর্থ্য ও প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী স্ত্রীর ভরন-পোষণ করা স্বামীর কর্তব্য। স্বামীর সাধ্য ও স্ত্রীর মর্তবার ভিত্তিতে এ ভরন-পোষণ কম বেশি হতে পারে।অনুরূপ ভাবে সময় ও স্থান ভেদে এর মাঝে তারতম্য হতে পারে।আল্লাহ তাআলা বলেন : বিত্তশালী স্বীয় বিত্তানুযায়ী ব্যয় করবে। আর যে সীমিত সম্পদের মালিক সে আল্লাহ প্রদত্ত সীমিত সম্পদ হতেই ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে পরিমাণ দিয়েছেন, তারচেয়ে’ বেশি ব্যয় করার আদেশ কাউকে প্রদান করেন না। (তালাক-৭)
৩. স্ত্রীর প্রতি øেহশীল ও দয়া-পরবশ থাকা। স্ত্রীর প্রতি রূঢ় আচরণ না করা। তার সহনীয় ভুলচুকে ধৈর্যধারণ করা। স্বামী হিসেবে সকলের জানা উচিত, নারীরা মর্যাদার সম্ভাব্য সবকটি আসনে অধিষ্ঠিত হলেও, পরিপূর্ণ রূপে সংশোধিত হওয়া সম্ভব নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : তোমরা নারীদের ব্যাপারে কল্যাণকামী। কারণ, তারা পাঁজরের হাড় দ্বারা সৃষ্ট। পাঁজরের উপরের হাড়টি সবচে’ বেশি বাঁকা। (যে হাড় দিয়ে নারীদের সৃষ্টি করা হয়েছে) তুমি একে সোজা করতে চাইলে, ভেঙে ফেলবে। আবার এ অবস্থায় রেখে দিলে, বাঁকা হয়েই থাকবে। তাই তোমরা তাদের কল্যাণকামী হও, এবং তাদের ব্যাপারে সৎ-উপদেশ গ্রহণ কর। (বুখারী)
৪. স্ত্রীর ব্যাপারে আত্মমর্যাদাশীল হওয়া। হাতে ধরে ধরে তাদেরকে হেফাজত ও সুপথে পরিচালিত করা। কারণ, তারা সৃষ্টিগতভাবে দুর্বল, স্বামীর যে কোন উদাসীনতায় নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অপরকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এ কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীর ফেতনা হতে খুব যতœ সহকারে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন : আমার অবর্তমানে পুরুষদের জন্য নারীদের চে’ বেশি ক্ষতিকর কোন ফেতনা রেখে আসিনি। (বুখারী) নারীদের ব্যাপারে আত্মম্ভরিতার প্রতি লক্ষ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : তোমরা সা’আদ এর আবেগ ও আত্মসম্মানবোধ দেখে আশ্চর্যান্বিত হচ্ছ। আমি তার চে’ বেশি আত্মসম্মানবোধ করি, আবার আল্লাহ আমারচে’ বেশি অহমিকা সম্পন্ন। (মুসলিম)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, যার মাঝে আত্মমর্যাদাবোধ নেই সে দাইয়ূছ (অসতী নারীর স্বামী, যে নিজ স্ত্রীর অপকর্ম সহ্য করে)। হাদিসে এসেছে : দাইয়ূছ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (দারিমী)
মানুষের সবচেয়ে বেশি আত্মমর্যাদার বিষয় নিজের পরিবার। এর ভেতর অগ্রাধিকার প্রাপ্ত স্বীয় স্ত্রী। অতঃপর অন্যান্য আত্মীয়Ñস্বজন এবং অধীনস্থগণ।
পরিশেষে নির্ঘাত বাস্তবতার কথা স্বীকার করে বলতে হয়, কোন পরিবার সমস্যাহীন কিংবা মতবিরোধ মুক্ত নয়। এটাই মানুষের প্রকৃতি ও মজ্জাগত স্বভাব। এর বিপরীতে কেউ স্বীয় পরিবারকে নিষ্কণ্টক অথবা ঝামেলা মুক্ত কিংবা ফ্রেশ মনে করলে, ভুল করবে। কারণ, এ ধরাতে সর্বোত্তম পরিবার কিংবা সুখী ফ্যামিলির একমাত্র উদাহরণ আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিবার ও ফ্যামিলি। সেখানেও আমরা মানবিক দোষ-ত্র“টির চিত্র দেখতে পাই, অন্য পরিবারের পবিত্রতা কোথায় ?
জ্ঞানী-গুণীজনের স্বভাব ভেবে-চিন্তে কাজ করা, ত্বরা প্রবণতা পরিহার করা, ক্রোধ ও প্রবৃত্তিকে সংযমশীলতার সাথে মোকাবিলা করা। কারণ, তারা জানে যে কোন মুহূর্তে ক্রোধ ও শয়তানের প্ররোচনায় আত্মমর্যাদার ছদ্মাবরণে মারাত্মক ও কঠিন গুনাহ হয়ে যেতে পারে। যার পরিণতি অনুসূচনা বৈকি? আবার এমনও নয় যে, আল্লাহ তাআলা সমস্ত কল্যাণ ও সুপথ বান্দার নখদর্পে করে দিয়েছেন। তবে অবশ্যই তাকে মেধা, কৌশল ও বুদ্ধি প্রয়োগ করতে হবে।