খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের যৌন কেলেংকারী : পোপের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস

 বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্যাথলিক গীর্জাগুলোতে শিশুদের উপর যৌন নিপীড়নের ঘটনা একের পর এক প্রকাশ পাওয়ায় পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট তথা ভ্যাটিকান এখন কঠিন সমস্যার মধ্যে রয়েছে। খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের যৌনতা এখন গোটা ক্যাথলিক ব্যবস্থার জন্য দুষ্টক্ষতে পরিণত হয়েছে। আজ আমরা এ সম্পর্কেই বিস্তারিত আলোচনা করব।

কোমল শিশুদের উপর খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের যৌন নিপীড়নের অসংখ্য ঘটনায় গোটা বিশ্বই আজ হতবাক। ব্রাজিল,আয়ারল্যান্ড,অস্ট্রিয়া ও জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ক্যাথলিক গীর্জাগুলোতে চরম মানবতা বিরোধী এসব ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ খ্রিস্টানরা এসব ঘটনায় ধর্মযাজকদের উপর এখন ভীষণ ক্ষুব্ধ। ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের শীর্ষ ধর্মগুরু পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট গীর্জাগুলোর ঘৃন্য এ ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবেন বলে তারা আশা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের যৌন অনাচারের ঘটনাবলী ফাঁস হবার পর এই ধর্মের মৌলিক বিষয়ে কিছু পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। অষ্ট্রিয়ার একজন ধর্মযাজক, খ্রিস্টান ধর্মগুরুদের জন্য বিয়ে নিষিদ্ধের বিধান বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। পোপ তথা ভ্যাটিকান এখন এমন এক তিক্ত বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছেন, যা গোটা ধর্মের জন্য বড় আঘাত হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আয়ারল্যান্ডে শিশুদেরকে ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশের পর পোপ ক্যাথলিক গীর্জাগুলোর মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে নিজেও কাজ শুরু করেছেন।
তিনি আয়ারল্যান্ডের ধর্মযাজকদের সাথে দুই দিনব্যাপী আলোচনার পর শিশু ধর্ষনের ঘটনাকে অশ্লীল অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি আইরিশ খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আয়ারল্যান্ডের গীর্জাগুলোর মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে হবে এবং এ জন্য ধর্মযাজকদের চেষ্টা চালাতে হবে। পোপের সাথে সাক্ষাতকালে আইরিশ ধর্মযাজক জোফেফ দাফি বলেছেন, কলংকের যে ছাপ গীর্জায় লেগেছে, তা মুছে ফেলার কোন পথ নেই। ধর্মযাজকদের অপকর্মের খবরে ধার্মিক খ্রিস্টানরা আজ উদ্বেলিত, কারণ মানুষকে আধ্যাত্মিকতা ও নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা দেয়া যাদের দায়িত্ব,তারাই আজ চরম সীমা লংঘনকারী। জার্মানির ধর্ম যাজক কনফারেন্সের সচিব হ্যান্স লাংগদুরফার সাপ্তাহিক এশপিগ্যালকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, যেসব ঘটনা ফাঁস হয়েছে,তা গীর্জাগুলোর নোংরা চেহারাকে তুলে ধরেছে এবং এর ফলে আমরা খুবই ব্যথিত হয়েছি।
অপরাধী ধর্মযাজকদের নিন্দা ও সমালোচনার মাধ্যমে পোপ তথা ভ্যাটিকান জনমতের ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এই কৌশল কাজে আসেনি। পোপ সম্প্রতি মালটা সফরকালে ধর্মযাজকদের মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার হওয়া কয়েক জনের সাথে বৈঠক করেছেন। তিনি এ সময় অশ্রু সজল চোখে এসব অপকর্মের ব্যাপারে দুঃখ ও নিন্দা প্রকাশ করেছেন। তিনি মাল্টায় বলেছেন, পাপাচার গীর্জার ভাবমূর্তিকে আহত করেছে। এই সফরের একই সময় ভ্যাটিকান এক বিবৃতিতে জানায় যে, পোপ ধর্ষনের শিকার লোকজনের সাথে বৈঠককালে তাদের জন্য দোয়া করেছেন এবং এসব অভিযোগের ব্যাপারে তদন্ত করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ঐ বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, যারা অন্যায় ও অপকর্মের সাথে জড়িত, গীর্জা কর্তৃপক্ষ তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করবে। যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তৎপর বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান, অপরাধী ধর্মযাজকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থার পাশাপাশি শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। পোপের দুঃখ প্রকাশ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে এসব সংস্থা বলেছে, পোপকে কাজের মাধ্যমে তার আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে হবে।

ইউরোপ ও আমেরিকায় শিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা, গোটা বিশ্বেই ভ্যাটিকান ও পোপের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন করেছে। মার্কিন টিভি চ্যানেল সিবিএসের এক জনমত জরিপে অংশগ্রহণকারী ২৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক বলেছেন, পোপের ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী ইতিবাচক নয়। এই জরিপ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের মাঝে পোপের জনপ্রিয়তা ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এর আগে ২০০৬ সালে পরিচালিত একই ধরনের এক জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা গিয়েছিল, মার্কিন ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের মাঝে পোপের জনপ্রিয়তা প্রায় চল্লিশ শতাংশ। ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের মাধ্যমে যারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন,তাদের অধিকাংশই শিশু এবং এসব শিশু গীর্জাগুলোর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত স্কুলগুলোতে পড়াশোনা করতো। সরকারী ও বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি যাদের আস্থা নেই এমন ধার্মিক পরিবার, তাদের সন্তানরা নৈতিক ও চারিত্রিক শিক্ষা পাবে এই আশায় গীর্জার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি করে থাকে। সম্প্রতি প্রকাশিত এসব ঘটনা ক্যাথলিক ধার্মিক পরিবারগুলোর জন্য মারাত্মক আঘাত হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

ভ্যাটিকান ও পোপ ক্ষমাপ্রার্থনা ও ক্ষতিপুরণ দেয়ার মাধ্যমে এসব কলংক চাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, খ্রিস্টান পাদ্রীদের যৌন অনাচারের ঘটনাবলীকে এভাবে ঢাকা দেয়া সম্ভব হবে না। গীর্জাগুলোতে যৌনতা এত বেশি চরম আকার ধারন করেছে যে,এসব ঘটনা একটির পর একটি প্রকাশিত হতেই থাকবে। অন্যদিকে, গীর্জাগুলোতে এ পর্যন্ত যৌন নির্যাতনের বহু ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কোন ধর্মযাজকেরই এ জন্য শাস্তি হয়নি। গীর্জা কর্তৃপক্ষ কৌশলে এসব বিষয় এড়িয়ে যাচ্ছে। বর্তমান পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট এর আগে নিজেই এ ধরনের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। খ্রিস্টান পাদ্রী বা ধর্মযাজকদের যৌন নিপীড়নের কারণ হিসেবে পাদ্রীদের জন্য বিবাহ নিষিদ্ধ থাকাকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। অপরাধীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার উপর পোপের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি জড়িয়ে রয়েছে। অপরাধীদের শাস্তি না হলে খ্রিস্টান ধর্ম থেকে দূরে সরে যাবার প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে পর্যবেক্ষকরা আশংকা প্রকাশ করেছেন।
জার্মানিতে এরই মধ্যে খ্রিস্টান ধর্ম থেকে দূরে সরে যাবার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গীর্জার প্রতি মানুষের যেটুকু আস্থা ছিলো, সেটুকুও এখন ফিকে হয়ে আসছে। শত শত শিশুর উপর শতাধিক পাদ্রীর বলাৎকারের ঘটনা ফাঁস হবার পর জার্মানির জনগণও চরমভাবে হতাশ। জার্মানীর দৈনিকগুলো লিখেছে, বিশ্বে বিশেষকরে জার্মানিতে পোপ ষোড়শ বেনেডিক্টের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা হ্রাসের ফলে মনে করা হচ্ছে, গীর্জা বিমুখতা আরও বাড়বে। জার্মানিতে পরিচালিত জনমত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, জার্মানির মাত্র এক তৃতীয়াংশ মানুষ পোপের প্রতি আস্থাশীল এবং ৪৫ শতাংশ মানুষ পোপের কার্যকলাপকে নেতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশের চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়।

ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের শীর্ষ ধর্মগুরু পোপ শুধু যে সাধারণ মানুষেরই সমালোচনার শিকার হচ্ছেন তা নয়, পোপের ঘনিষ্টজনরাও তার কর্মকান্ডে সন্তুষ্ট নয়। পোপের সাবেক সহকর্মী হ্যান্স কুংগ বলেছেন, প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ সৃষ্টির সময়ের পর আর কখনোই ক্যাথলিক গীর্জা আজকের মতো এত বেশি সংকটের সম্মুখীন হয়নি। তিনি এক পত্রিকায় বিশেষ প্রবন্ধে লিখেছেন, ক্যাথলিক ধর্মযাজকদের উচিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের ব্যাপারে নয়া কমিশন গঠন করা। এ ক্ষেত্রে পোপ বাধা সৃষ্টি করলে ভ্যাটিকানের উপর সম্মিলিত চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *