কোরআন-হাদিসের আলোকে দাওয়াত-এর গুরুত্ব

নবী রাসূলগণের মূল দায়িত্ব,
সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ, প্রচার, নসিহত, ওয়াজ বা এককথায় আল্লাহর দীন পালনের পথে আহবান করাই ছিল সকল নবী ও রাসূলের (আলাইহিমুস সালাম) দায়িত্ব। সকল নবীই তাঁর উম্মতকে তাওহিদ ও ইবাদতের আদেশ করেছেন এবং শিরক, কুফর ও পাপকাজ থেকে নিষেধ করেছেন।
মহান আল্লাহ বলেন:
ﭽﭴ ﭵ ﭶ ﭷ ﭸ ﭹ ﭺ ﭻ ﭼ ﭽ ﭾ ﭿ ﮀ ﮁ ﮂ ﮃ ﮄ ﮡ ﭼ الأعراف: ١٥٧
যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মি নবীর, যাঁর উল্লেখ তারা তাদের নিকট রক্ষিত তাওরাত ও ইনজীলে লিপিবদ্ধ পায়, যিনি তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেন এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন। (সূরা আরাফ: ১৫৭)
এ আয়াতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কর্মকে আদেশ ও নিষেধ নামে অভিহিত করা হয়েছে। অন্যত্র এ কর্মকে দাওয়াত বা আহবান নামে অভিহিত করা হয়েছে।
আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা বলেন:
ﭽﮢ ﮣ ﮤ ﮥ ﮦﮧ ﮨ ﮩ ﮪ ﮫ ﯓ ﭼ الحديد: ٨
তোমাদের কি হল যে, তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আন না, অথচ রাসূল তোমাদেরকে আহবান করছেন যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আন। (সূরা হাদীদ: ৮)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ দায়িত্বকে দাওয়াত বা আহবান বলে অভিহিত করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
ﭽﮦ ﮧ ﮨ ﮩ ﮪ ﮫ ﮬﮭ ﮮ ﮯ ﮰ ﮱﯓ ﯠ ﭼ النحل: ١٢٥
আপনি আপনার প্রতিপালকের দিকে আহবান করুন হিকমত বা প্রজ্ঞা দ্বারা এবং সুন্দর ওয়াজ-উপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে উৎকৃষ্টতর পদ্ধতিতে আলোচনা-বিতর্ক করুন। (সূরা নাহল: ১২৫)
অন্যত্র এই দায়িত্বকেই তাবলিগ বা প্রচার বলে অভিহিত করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:
ﭽ ﭺ ﭻ ﭼ ﭽ ﭾ ﭿ ﮀ ﮁﮂ ﮃ ﮄ ﮅ ﮆ ﮇ ﮈﮉ ﮕ ﭼ المائدة: ٦٧
হে রাসূল! আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তা আপনি প্রচার করুন। যদি আপনি তা না করেন তাহলে আপনি আল্লাহর বার্তা প্রচার করলেন না। (সূরা মায়েদা : ৬৭)
কোরআনুল কারিমে বারবার বলা হয়েছে যে, প্রচার বা পোঁছানোই রাসূলগণের একমাত্র দায়িত্ব। নিচের আয়াতে বলা হয়েছে:
ﭭ ﭮ ﭯ ﭰ ﭱ ﭲ ﭳ ﭼ النحل: ٣٥
রাসূলগণের দায়িত্ব তো কেবল সুস্পষ্টভাবে প্রচার করা। (সূরা নাহল: ৩৫)
নূহ আ.- এর জবানিতে বলা হয়েছে:
ﭽﮏ ﮐ ﮑ ﮒ ﮓ ﮚ ﭼ الأعراف: ٦٢
আমি আমার প্রতিপলকের রিসালাতের দায়িত্ব তোমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি এবং আমি তোমাদের নসিহত করছি। (সূরা আরাফ: ৬২)
সূরা আরাফের ৬৮, ৭৯, ৯৩ নম্বর আয়াত, সূরা হুদ-এর ৩৪ নম্বর আয়াত ও অন্যান্য স্থানে দাওয়াতকে নসিহত বলে অভিহিত করা হয়েছে
সূরা শুরার ১৩ আয়াতে বলেছেন:
ﭽ ﭺ ﭻ ﭼ ﭽ ﭾ ﭿ ﮀ ﮁ ﮂ ﮃ ﮄ ﮅ ﮆ ﮇ ﮈ ﮉ ﮊﮋ ﮌ ﮍ ﮎ ﮏ ﮐ ﮑﮒ ﮓ ﮔ ﮕ ﮖ ﮗ ﮘﮙ ﮣ ﭼ الشورى: ١٣
তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি নূহকে- আর যা আমি ওহী করেছি আপনাকে- এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা এবং ঈসাকে, এ বলে যে, তোমরা দীন প্রতিষ্ঠা কর এবং তাতে দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা করো না। আপনি মুশরিকদের যার প্রতি আহবান করছেন তা তাদের নিকট দুর্বহ মনে হয়। (সূরা শুরা: ১৩)
তাবারি, ইবনু কাসির ও অন্যান্য মুফাসসির, সাহাবি-তাবিয়ি মুফাসসিরগণ থেকে উদ্ধৃত করেছেন যে, দীন প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো দীন পালন করা। আর দীন পরিপূর্ণ পালনের মধ্যেই রয়েছে আদেশ, নিষেধ ও দাওয়াত। এ অর্থে কোনো কোনো গবেষক দীন পালন বা নিজের জীবনে দীন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি অন্যদের জীবনে দীন প্রতিষ্ঠার দাওয়াতকেও ইকামতে দীন বলে গণ্য করেছেন।

حلاوة الطاعة ومرارة العصيان

{واعلموا أن فيكم رسول الله لو يطيعكم في كثير من الأَمر لعنتم ولكن الله حبب إليكم الإِيمان وزينه في قلوبكم وكره إليكم الكفر والفسوق والعصيان أولئك هم الراشدون فضلاً من الله ونعمة وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ } الحجرات ويقول الله – عز وجل -: { فإن تولوا فاعلم أنما يريد الله أن يصيبهم ببعض ذنوبهم } المائدة 49
حلاوة الإيمان ومرارة العصيان
حلاوة الإيمان عرفها النووي بقوله : استلذاذ الطاعات وتحمل المشاق في سبيل الله ، وقد جعل النبي صلى الله عليه وسلم لها علامات من تحققت فيه فقد ذاق حلاوة الإيمان ،
فعَنْ أَنَسٍ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ بِهِنَّ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ : أَنْ يَكُونَ اللَّهُ،عَزَّ وَجَلَّ ، وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا ، وَأَنْ يَكْرَهَ الْعَبْدُ أَنْ يَرْجِعَ عَنِ الإِسْلاَمِ ، كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ ، وَأَنْ يُحِبَّ الْعَبْدُ الْعَبْدَ لاَ يُحِبُّهُ إِلاَّ ِللهِ عَزَّ وَجَلَّ. أخرجه مسلم.

وعنْ الْعَبَّاسِ بْنِ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ:ذَاقَ طَعْمَ الإِيمَانِ مَنْ رَضِىَ بِاللَّهِ رَبًّا وَبِالإِسْلاَمِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولاً. أخرجه أحمد
وعَنْ الْمُغِيرَةَ بْنَ شُعْبَةَ:قَامَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم حَتَّى وَرِمَتْ قَدَمَاهُ ، قَالُوا : قَدْ غَفَرَ اللهُ لَكَ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ ، قَالَ : أَفَلاَ أَكُونُ عَبْدًا شَكُورًا. أخرجه البُخَارِي
وروي أن لصاً دخل بيت مالك بن دينار فما وجد شيئاً فجاء ليخرج فناداه مالك: سلام عليكم، فقال: وعليك السلام، قال: ما حصل لكم شيء من الدنيا فترغب في شيء من الآخرة – قال: نعم، قال: توضأ من هذا المركن وصل ركعتين، ففعل ثم قال: يا سيدي أجلس إلى الصبح، قال: فلما خرج مالك إلى المسجد قال أصحابه: من هذا معك – قال: جاء يسرقنا فسرقناه. تاريخ الإسلام للذهبي 2/144.
يقول ابن تيمية رحمه الله :(في رسالة العبودية 6 )” فإن المخلص لله ذاق من حلاوة عبوديته لله ما يمنعه من عبوديته لغيره، إذ ليس في القلب السليم أحلى ولا أطيب ولا ألذ ولا أسر ولا أنعم من حلاوة الإيمان المتضمن عبوديته لله ومحبته له وإخلاص الدين له، وذلك يقتضي انجذاب القلب إلى الله فيصير القلب منيباً إلى الله خائفاً منه راغباً راهباً ” .

{وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ } فمن تحلى بسكينة الإيمان ألقى الله في قلبه كراهية المعاصي والذنوب، فبعد أن كانت المعاصي تسيطر على العبد، وتعرقل سيره إلى الله تعالى، فإن الإيمان حينما يعمر القلب يطرد منه التعلق بالمعاصي والآثام.
فإن للطاعة نوراً كما قال ابن عباس ( إن للحسنة ضياءً في الوجه ونوراً في القلب وسعة في الرزق وقوة في البدن ومحبة في قلوب الخلق ، وإن للسيئة سواداً في الوجه ، وظلمة في القلب ، ووهناً في البدن ، ونقصاً في الرزق ، وبغضة في قلوب الخلق .
فأعظم عقوبات المعاصي حرمان لذة الطاعات وإن غفل عنها المرء لقلة بصيرته وضعف إيمانه أو لفساد قلبه .

মহানবী হজরত মোহাম্মদকে (সা.) অবমাননার প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলামের বিশাল মহাসমাবেশ


মহানবী হজরত মোহাম্মদকে (সা.) অবমাননার প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলামের ডাকা বিশাল মহাসমাবেশে বক্তারা বলেছেন, দেশে ও বিদেশে ইসলামের ওপর আঘাতকারীদের দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে। মুসলমানরা শান্তিপ্রিয় ও ধৈর্যশীল জাতি। কিন্তু ইসলামের ওপর যেভাবে একের পর এক উদ্দেশ্যমূলক ও উস্কানিমূলকভাবে আঘাত করা হচ্ছে, তাতে তারা বসে থাকতে পারে না। বিশ্বের ২০০ কোটি মুসলমান বুকের রক্ত দিয়ে ইহুদি খ্রিস্টানদের চক্রান্ত প্রতিরোধ করবে। মহানবীকে নিয়ে নির্মিত অপমানজনক চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ এবং এর নির্মাতা ইহুদি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক বাসিলির ফাঁসি না হওয়া পর্যন্ত আল্লামা আহমদ শফির নেতৃত্বে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে বক্তারা বলেন, বিশ্বে একজন মুসলমান বেঁচে থাকতে নবীর প্রতি অবমাননাকারীদের রেহাই দেয়া হবে না।
লাখো জনতার এ সমাবেশে বক্তারা বাসিলির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ায় মার্কিন প্রশাসন ও ওবামার সমালোচনা করে বলেন, ওবামাকে নমরুদের পরিণতি ভোগ করতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশেও কিছু ব্যক্তি কোরআন ও নবীকে অবমাননা করে বক্তব্য দিচ্ছে এমন অভিযোগ করে বক্তারা বলেন, এদের শাস্তি না দিয়ে সরকার প্রমাণ করেছে, তারা ইহুদি-খ্রিস্টানচক্রের দোসর। উদাহরণ হিসেবে বক্তারা বলেন, রামুতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে কোরআন অবমাননাকারী বৌদ্ধ যুবককে গ্রেফতার না করে ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা করছে সরকার। এতে প্রমাণিত হয় সরকারের ইন্ধনেই রামুতে বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থাপনায় ভাংচুর চালানো হয়েছে। এতে কোনো মুসলমান জড়িত ছিল না।
বক্তারা দেশে মুসলমানদের ওপর অন্যায় জুলুম-নির্যাতন বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, তা না হলে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের চরম ভরাডুবি ঘটবে। ৯০ শতাংশ মুসলমানের এই দেশে সরকার যে ইসলামবিদ্বেষী ভূমিকায় নেমেছে তাতে এই দলের নেতারা ভবিষ্যতে ইউপি নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মতো ভোটও পাবে না।
গতকাল নগরীর লালদীঘি মাঠে উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম হেফাজতে ইসলামের আমীর, কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের চেয়ারম্যান, দারুল উলুম হাটহাজারীর মুহ্তামিম শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ্ আহমদ শফীর (দা.বা) সভাপতিত্বে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রামের খ্যাতিমান আলেম ওলামারা এতে বক্তব্য রাখেন। দুপুর ২টা থেকে শুরু হয়ে বিকাল ৫টায় সমাবেশ শেষ হয়। এ সমাবেশকে কেন্দ্র করে দুপুর থেকেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার তাওহিদি জনতা লালদীঘি মাঠে সমবেত হতে থাকেন। তাদের গগনবিদারী মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে নগরীর রাজপথ। প্রচণ্ড বৃষ্টি উপেক্ষা করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা লালদীঘি মাঠে উপস্থিত হন। বৃষ্টির মধ্যেই অসীম ধৈর্য নিয়ে তারা বক্তাদের বক্তব্য শুনতে থাকেন। বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যাওয়ায় মহাসমাবেশে আগত লোকজন বিভিন্ন সড়কে আটকা পড়েন। তবে বৃষ্টি বেশিক্ষণ থামিয়ে রাখতে পারেনি গণজোয়ারকে। সব পথ মিশে গিয়েছিল লালদীঘি ময়দানে। বেলা ৪টার মধ্যে বিশাল এই ময়দান পরিণত হয় জনসমুদ্রে। লাখো জনতার ঢেউ লালদীঘি মাঠ ছাড়িয়ে আছড়ে পড়ে দুই পাশের সড়ক এবং সড়ক পেরিয়ে একদিকে কোতোয়ালি থানার মোড়, সিনেমা প্যালেস মোড়, অন্যদিকে আন্দরকিল্লা ও জেল রোড পর্যন্ত আধ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে। সভায় ইসলাম বিরোধীদের শাস্তি দেয়ার দাবিতে মুহুর্মুুুহু মিছিলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ওই এলাকা।
সভাপতির বক্তব্যে আল্লামা আহমদ শফি বলেন, যারা প্রিয়নবী সা.-এর শানে বেয়াদবী করে তারা অমানুষ, এরা মানবতার শত্রু। এদের প্রতিহত করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব। মুসলমানদের শরীরে রক্ত থাকতে কোনো বেইমানের স্থান এদেশে হবে না। তিনি বলেন, সব নবী-রাসুলকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করা ইসলামী আদর্শ ও বিশ্বাসের মৌলিক শর্ত। প্রমাণিত হয় মুসলমানরাই পৃথিবীর সর্বাধিক উদার, সহিষ্ণু জাতি। আমাদের মহানবীকে (সা.) অবমাননা করে কার্টুন ছাপানো, চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে উস্কানির পাশাপাশি তারা নিজের ধর্মের বড় দুর্বলতা বেহায়াপনাই পৃথিবীর সামনে তুলে ধরল।
আল্লামা আহমদ শফি বলেন, কোনো ধর্মকে কটাক্ষ, অপমান ও ব্যাঙ্গ করা ইসলাম অনুমোদন করে না। মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে ধর্ম অবমাননা করার অধিকার প্রদান করা হলে সমাজে নৈরাজ্য ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে। তিনি বলেন, যে ইহুদি মহানবীকে অবমাননা করে ছবি বানিয়েছে, তাকে ফাঁসি না দেয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরে যাব না। আন্দোলন চলতে থাকবে।
আল্লামা আহমদ শফী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর হামলার সঙ্গে আলেম ওলামা বা মাদরাসার ছাত্রদের কোনো সম্পর্ক নেই। আলেমরা সমাজের শান্তি সহাবস্থানের বাণী প্রচার করে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় যে, সরকারের কতিপয় বিকৃত মস্তিষ্কের দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও সাম্রাজ্যবাদী ইহুদিদের এ দেশীয় কিছু দালাল এ ন্যাক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে আলেম সমাজ ও দ্বীনদার লোকদের জড়ানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, মিথ্যা তথ্য দিয়ে আলেম সমাজকে হয়রানি এবং সমাজে হেয় করার যে কোনো চক্রান্তের দাঁতভাঙা জবাব দেয়া হবে।
সভাপতির ভাষণে আল্লামা শাহ্ আহমদ শফী বলেন, পশ্চিমারা বিবেকবিবর্জিত জাতি। ইহুদি-খ্রিস্টান ও সেক্যুলার গোষ্ঠী আল্লাহ-রাসুল (সা.) ও ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। মুসলমানদের ঈমানের উপর আঘাত এলে ঘরে বসে থাকতে পারি না। তিনি বলেন, একজন উম্মতে মোহাম্মদী সে যতই বে-আমল হোক, নবীর অবমাননা, কোরআনের অসম্মান বরদাশত করবে না। জীবন বাজি রেখে শাহাদাতের তামান্না নিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
মহাসমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা শাহ্ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী, মাওলানা আবদুল মালেক হালিম, সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরী, ড. আ.ফ.ম. খালিদ হোসেন, হাফেজ তাজুল ইসলাম, মাওলানা মুহাম্মদ ইদ্রিস নাজিরহাট, মাওলানা সৈয়দ আবু নোমান বায়তুশ শরফ, মাওলানা সালাহউদ্দিন নানুপুরী, মাওলানা লোকমান হাকিম, মুফতি মাহমুদ হাসান বাবুনগর, মাওলানা আজিজুল হক আল-মাদানী, মাওলানা সরওয়ার কামাল আজিজী, মুফতি ফয়জুল্লাহ লালবাগ, মুফতি হারুন ইজহার, মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহী, মাওলানা কাতেব ইলিয়াস ওসমানী, মাওলানা হাবিবুল্লাহ আজাদীবাজার, মুফতি হাসান মুরাদাবাদী, মাওলানা গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী। সমাবেশে ১৫ দফা ঘোষণা পাঠ করেন মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী।
হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, এটা রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, ঈমান রক্ষার আন্দোলন। এরপরও মহানবীর প্রতি অবমাননাকারী বাসিলিকে ফাঁসি না দিলে প্রয়োজনে মার্কিন দূতাবাস অভিমুখে লংমার্চ করা হবে। সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাসের কথাটি যতক্ষণ পুনঃস্থাপিত হবে না ততক্ষণ এই সরকার ইহুদি খ্রিস্টানদের দোসর হিসেবে পরিগণিত হবে।
মুফতি ফয়জুল্লাহ বলেন, নবীকে অবমাননা করে আমেরিকা ২০০ কোটি মুসলমানের উপর পারমাণবিক বোমার চেয়েও ভয়ঙ্কর বোমা হামলা চালিয়েছে। তাই এর বিরুদ্ধে উপযুক্ত জবাব দিতে হবে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশে ইসলাম, কোরআন ও নবীকে কটাক্ষ করে কিছু ব্যক্তি বক্তব্য দিচ্ছে। এদের শাস্তি না দিয়ে সরকার নিজেকে ইহুদি খ্রিস্টানদের দোসর হিসেবে প্রমাণ করেছে। এই সরকারকে আমরা আর ক্ষমতায় দেখতে চাই না।
তিনি বলেন, রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার ঘটনার নিন্দা জানাই। কিন্তু কোরআনকে ব্যঙ্গ করেছে যে বৌদ্ধ যুবক তাকে গ্রেফতার না করায় আমাদের আর বুঝতে বাকি নেই যে, সরকারই এই হামলার সঙ্গে জড়িত।
বায়তুশ শরফের অধ্যক্ষ আল্লামা সৈয়দ আবু নোমান বলেন, দেশে যারা ইসলামবিদ্বেষী ভূমিকা পালন করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন, নইলে আগামী নির্বাচনে জবাব পাবেন।
মুফতি হারুন ইজহার বলেন, বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনায় কোনো মুসলমান জড়িত নয়। এতে আলেম ওলামাদের জড়ানোর চক্রান্ত প্রতিহত করা হবে।
হজরত মাওলানা লোকমান হাকিম বলেন, ওবামা যদি মহানবীর প্রতি অবমাননার ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা না নেন তাহলে তার পরিণতি হবে নমরুদের মতো, যা দেখে বিশ্ববাসী শিউরে উঠবে।
সমাবেশ শেষে ১১ দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ধর্মের প্রতি কটাক্ষের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রেখে আইন পাস করা, মহানবীকে অবমাননাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, কোরআন অবমাননাকারী বৌদ্ধ যুবকের শাস্তি নিশ্চিত করা।

ইমাম আযম আবু হানীফা নোমান বিন সাবেত (রা) এর নাসল


প্রাচীনকালের একটি ঘটনা। এক ব্যক্তি কারো বাগানে প্রবেশ করল। সে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ছিল। ক্ষুধায় তার প্রাণ চলে যাবার উপক্রম। সে ক্ষুধা মিটানোর জন্যে গাছের দিকে তাকালো। বাগানে আপেলের গাছ দেখতে পেল।
সুতরাং সে হাত বাড়িয়ে একটি আপেল নিল এবং তার অর্ধেক খেয়ে নিল। এর পর বাগানের পার্শ্বেই এক নদী ছিল তা থেকে পানি পান করে তৃষ্ণা মিটাল; অল্পক্ষইের মধ্যে সে সচেতন হল। কেননা প্রচণ্ড ক্ষুধার তারনাই সে ফল আহারের আগে ভাবতে পারেনি। এখন যখন তার শরীরে শক্তি ফিরে পেল ভাবতে লাগল এবং নিজেকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলঃ তুমি নিপাত যাও! বিনা অনুমতিতে কারো গাছের ফল খাওয়া কি করে বৈধ হতে পারে?
অতঃপর সে শপথ করল যে, যতক্ষণ বাগানের মালিকের সাথে সাক্ষাত করে ক্ষমা না চাইবে ততক্ষণ সে আর বাড়ি ফিরে যাবেনা। সুতরাং সে বাগানের মালিকের খোঁজে বের হয়ে তার বাড়ি পৌঁছল এবং দরজায় আওয়াজ করল। মালিক ঘর থেকে বের হলে সে তার আগমনের উদ্দেশ্য বিস্তারিত ব্যক্ত করল ঃ মূলতঃ আমি খুব ক্ষুধার্ত ছিলাম। এজন্য নদীর তীরে অবস্থিত আপনার বাগান থেকে একটি আপেলের অর্ধেক আপনার অনুমতি ছাড়া খেয়েছি। এর পর আমার মনে পড়ল যে, এই আপেল আমি অনুমতি ছাড়া খেয়েছি যা আমার জন্যে বৈধ নয়।
এজন্যে আমি আপনার কাছে এসেছি যাতে আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিবেন না হয় এর বিনিময় নিয়ে নিন। বাগানের মালিক তার কথায় বিশ্বাস করছিল না যে, দুনিয়াতে এমন পরহেজগার ব্যক্তিও আছে। এর পর হঠাৎ তার একটি বিষয় খেয়াল হল এবং যুবককে বললঃ আমি তোমার ভুল ক্ষমা করতে পারি। আর ক্ষমা করার একটিই পন্থা তা হল তুমি আমার একটি শর্ত পূর্ণ করবে।
যুবক বললঃ কি সেই শর্ত? বলুন; বাগানের মালিক বললঃ আমার শর্ত হল যে, আমার কন্যাকে তোমার বিয়ে করতে হবে।
যুবক কিছুক্ষণ ভাবল এবং মাথা হেলিয়ে একমত প্রকাশ করল। মালিক বললঃ এত খুশী হওয়ার কারণ নেই। আমার কন্যা অন্ধ, বোবা এবং কানে শুনেনা। আমি অনেক কাল থেকে তার জন্য পাত্র খুঁজছিলাম; কিন্তু কোন উপযুক্ত পাত্র পাচ্ছিলাম না। যুবক তা শুনে চিন্তিত হল যে, এই বিপদ থেকে উদ্ধারের কি পথ আছে এবং এ অবস্থায় আমি কি করতে পারি। এর পর সে ভাবল এমন মেয়ের সাথে বিয়ে করে পরীক্ষায় নিপতিত হওয়া অবৈধ পন্থায় ফল খেয়ে জাহান্নামী হওয়ার চেয়ে উত্তম। আর এই দুনিয়ার জীবনতো স¦ল্পকালীন; কিন্তু আখিরাতের জীবন অনন্তকাল। তাই কেন দুনিয়ার কষ্ট বেছে নিবনা। সুতরাং অনিচ্ছা সত্ত্বেও আল্লাহর রেজামন্দি হাসিলের জন্য এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল।
যখন বিয়ে আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হল তখন বাসর রাতে তার চেহারায় অমানিশার অন্ধকার ছেয়ে গেল। সে বার বার ভাবছিল যে, এমন মেয়ে যে কথা বলতে পারেনা, শুনতে পারেনা, এমন বোবা অন্ধের কাছে কি করে যাবে? এই পরিস্থিতিতে তাকদীরের উপর নির্ভর করে রাযী হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে বললঃ “লা-হাওলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লা, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না-ইলাইহি রাজিউন।”

“বাসর রাতে যখন তার স্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের জন্যে নব বধূর কুঠরিতে প্রবশ করল তখন নব বধূ তার অভ্যর্থনার জন্যে দাঁড়িয়ে গেল এবং বললঃ আসসালামুআলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।”
যখন যুবক দেখল যে, তার সামনে এক অতীব সুন্দরী তার সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সঠিক আছে তখন যুবক কিছুক্ষণ থেমে বললঃ ওয়া আলাইকুমুস সালাম”
আমাকে তো বলা হয়েছিল যে, তুমি অন্ধ, বোবা, কানে শুননা।
মেয়েটি বললঃ আমার শ্রদ্ধেয় পিতা আপনাকে যা কিছু বলেছেন তা সবই সত্য ।

যুবক বলল আমাকে এ বিষয়ের মূল বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত কর যা তোমার পিতা আমাকে বলেছিলেন।
সে উত্তর দিলঃ আমার বাবা আমার ব্যাপারে বোবা বলেছেন এ জন্য যে, আমি কখনো শরীয়ত বিরোধী কথা বলিনি আর না আমি কোন পরপুরুষের সাথে কথা বলেছি।
আর আমার বাবা আমার ব্যাপারে বলেছেন যে আমি কানে শুনিনা তা এ জন্য যে, আমি কখনো এমন বৈঠকে বসিনি যেখানে গীবত, চোগলখোরী এবং অর্থহীন কথা-বার্তায় মজলিশের আলোচনার বিষয় হয়।
আমি অন্ধ এর অর্থ হল যে, আমি এমন ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি দেইনি যে আমার জন্য বৈধ নয়।
পাঠক! আপনারা কি জানেন এই যুবক কে ছিলেন? তিনি ছিলেন সাবেত বিন নোমান। আর এই পরহেজগার ব্যক্তির জীবনে যে স্ত্রী মিলেছিল তার বিষয়ে আপনারা জানতে পারলেন যে, সে কেমন পরহেজগার ও ধার্মিক নারী ছিলেন।
আর এই পবিত্র জোড়া থেকে সেই মহৎ ব্যক্তির জম্ম হয়, যিনি দুনিয়ার আকাশের উজ্জল নক্ষত্র যাকে বিশ্ব মুসলিম ইমাম আযম আবু হানীফা নোমান বিন সাবেত (রা বলে জানে।

যাকাতুল ফিতর বা ফেতরা


ইবনু উমরের (রা) বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী ছোট, বড়, নারী, পুরুষ, স্বাধীন, দাস সকল মুসলমানের জন্য যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। তিনি বলেন: “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বাধীন, দাস, পুরুষ, নারী, ছোট, বড় সকল মুসলমানের উপর এক ছা’ পরিমাণ খেজুর বা যব যাকাতুল ফিতর প্রদান করা ফরয করেছেন।” (বুখারী: হাদীস নং- ১৫০৪, মুসলিম: হাদীস নং- ৯৮৪)
আবু সাইদ খুদুরী (রা) বলেন: “আমরা যাকাতুল ফিতর হিসেবে এক ছা’ পরিমাণ খাবার, বা এক ছা’ পরিমাণ যব অথবা এক ছা’ পরিমাণ কিশমিশ প্রদান করতাম।” (বুখারী: হাদীস নং- ১৫০৬, মুসলিম: হাদীস নং- ৯৮৫)
ছা’ বলতে মদীনাবাসীর ছা’ বুঝতে হবে; ইবনু উমর (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “ওজন করার সময় মক্কার ওজন ব্যবহৃত হবে; পরিমাপ যন্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে মদীনাবাসীর পরিমাপ-যন্ত্র ব্যবহৃত হবে।” (আবু দাউদ: হাদীস নং- ৩৩৪০) বর্তমান সময়ে এর পরিমাণ দাড়ায় ৩ কেজির মত। এক ছা’ সমান চার মুদ।
এটি যাকাত প্রদানের ৮টি খাতের মধ্য থেকে শুধুমাত্র মিসকিনদের জন্য ব্যয় করতে হবে। এ সম্পর্কে ইবনু আব্বাসের (রা) হাদীস, তিনি বলেন: “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোযাদারের থেকে ঘটে যাওয়া অশ্লীল ও বেহুদা কথা-কাজের পরিচ্ছন্নতা ও মিসকিনদের আহার স্বরূপ যাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের আগে এটা আদায় করবে সেটি মাকবুল যাকাতে ফিতর হিসেবে গৃহীত হবে। আর যে ব্যক্তি এটি নামাযের পরে আদায় করবে সেটি সাদকাহ হিসেবে গণ্য হবে।” (আবু দাউদ: হাদীস নং- ১৬০৯)
কোন কোন আলিম বলেন: মিসকিনদের সাথে সাথে যাকাত ব্যয়ের বাকী খাতগুলোতেও এটি ব্যয় করা যাবে। যাকাত ব্যয়ের বাকী খাতগুলো হল: ফকির, যাদের মন জয় করা প্রয়োজন, ঋণগ্রস্ত, ক্রীতদাস মুক্তির জন্য, আল্লাহর পথে সংগ্রামের জন্য এবং মুসাফিরের জন্য।

কিয়ামুল লাইলের সমপরিমাণ সওয়াব 2

৫. রাতে সূরা বাকারার শেষ দু’আয়াত তিলাওয়াত করা।
আবু মাসউদ ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন:
(مَنْ قَرَأَ بِالآيَتَيْنِ مِنْ آخِرِ سُورَةِ الْبَقَرَةِ فِي لَيْلَةٍ كَفَتَاهُ).
“যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারার শেষ দু’আয়াত তিলাওয়াত করল, তার জন্য তা যথেষ্ট হবে”।
ইমাম নববী রহ. বলেছেন: “এর অর্থ কেউ বলেছেন: কিয়ামুল লাইলের পরিবর্তে যথেষ্ট হবে। কেউ বলেছেন: শয়তানের অনিষ্ট থেকে যথেষ্ট হবে। কেউ বলেছেন: বিপদ-মুসিবত থেকে নিরাপত্তা হাসিল হবে। তবে সব অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে”।
ইব্‌ন হাজার রহ. এ অভিমত সমর্থন করে বলেছেন: এ হিসেবে আমার বক্তব্য হচ্ছে: ওপরের সব অর্থ নেয়া সঠিক, আল্লাহ ভালো জানেন। প্রথম অর্থটি ইব্‌ন মাসউদ থেকে আলকামা, আলকামা থেকে আসেম সনদে একটি ‘মরফূ’ হাদিসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে:
“مَنْ قَرَأَ خَاتِمَة الْبَقَرَة أَجْزَأَتْ عَنْهُ قِيَام لَيْلَة”.
“যে ব্যক্তি বাকারার শেষ আয়াত পড়ল, কিয়ামুল লাইলের আমল হিসেবে তার পক্ষ থেকে তা যথেষ্ট হবে”।
সূরা বাকারার শেষ দু’টি আয়াত পাঠ করা খুব সহজ, অধিকাংশ মানুষের তা মুখস্থ রয়েছে। আল-হামদুলিল্লাহ! মুসলিমের কর্তব্য প্রতি রাতে তা পাঠ করা। সহজ তাই এতে যথেষ্ট করে অন্যান্য আমল ত্যাগ করা ঠিক নয়, যার সওয়াবও কিয়ামুল লাইলের সমপরিমাণ। কারণ মুমিনের লক্ষ্য হচ্ছে যথাসম্ভব নেকি হাসিল করা। অনুরূপেআমাদের জানা নেই যে, কোন্ আমল আল্লাহর গ্রহণযোগ্যতা লাভে ধন্য হয়।
আব্দুল্লাহ ইব্‌ন উমাইয়ের রহ. বলেছেন: “নিকৃষ্ট পেশার ন্যায় আল্লাহর ইবাদাতেও সামান্য আমল তোমার নিজের জন্য যথেষ্ট মনে কর না, বরং তুমি মন-প্রাণ দিয়ে অধিক অর্জনের চেষ্টা কর”।
৬. সচ্চরিত্র।
আয়েশা ‎রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন:
(إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَيُدْرِكُ بِحُسْنِ خُلُقِهِ دَرَجَاتِ قَائِمِ اللَّيْلِ صَائِمِ النَّهَارِ).
“নিশ্চয় মুমিন তার সচ্চরিত্রের দ্বারা রাতে কিয়ামকারী দিনে সিয়াম পালনকারীর মর্যাদা অর্জন করে”।
আবু তাইয়্যেব শামসুদ্দিন রহ. বলেছেন: “সচ্চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিকে এ সওয়াব দানের কারণ হচ্ছে, সিয়াম পালনকারী ও রাতে কিয়ামকারী উভয়ে নিজের নফসের সাথে মুজাহাদা করে। মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতি ভিন্ন হওয়া সত্বেও যে সবার সাথে সচ্চরিত্র প্রদর্শন করে, সে যেন অনেক নফসের সাথে মুজাহাদা করে, ফলে সে সিয়াম ও কিয়ামকারীর মর্তবা লাভ করে, বরং অনেক সময় তাদেরও ছাড়িয়ে যায়”।
একটি সচ্চরিত্র হচ্ছে মানুষের সাথে সুসম্পর্ক কায়েম রাখা ও তাদের থেকে কষ্ট দূর করা।
মুমিনকে ইমানের পর সচ্চরিত্রের চেয়ে উত্তম কোন জিনিস প্রদান করা হয়নি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ তার রবের নিকট ‘হুসনে খুলুক’ বা সচ্চরিত্র প্রার্থনা করতেন। যেমন জাবের ইব্‌ন আব্দুল্লাহ ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাত শুরু করতেন তখন তাকবির বলে বলতেন:
(إن صلاتي ونسكي ومحياي ومماتي لله رب العالمين ، لا شريك له ، وبذلك أمرت وأنا من المسلمين ، اللهم اهدني لأحسن الأعمال وأحسن الأخلاق ، لا يهدي لأحسنها إلا أنت ، وقني سيئ الأعمال وسيئ الأخلاق ، لا يقي سيئها إلا أنت).
“নিশ্চয় আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু দু’জাহানের রব আল্লাহর জন্য, তার কোন শরীক নেই, আমাকে তারই নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত। হে আল্লাহ আমাকে সুন্দর আমল ও সুন্দর আখলাকের পথ দেখান, আপনি ব্যতীত কেউ সুন্দর আখলাকের পথ দেখাতে পারে না। আপনি আমাকে খারাপ আমল ও খারাপ আখলাক-চরিত্র থেকে রক্ষা করুন, আপনি ব্যতীত কেউ তা থেকে রক্ষা করতে পারে না”।
অনুরূপ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যতবার আয়নায় চেহারা দেখতেন সচ্চরিত্রের জন্য দোয়া করতেন। ইব্‌ন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ যখন আয়নায় চেহারা দেখতেন বলতেন:
(اللهم كما حسنت خَلْقِي فحسن خُلُقِي). ‌
“হে আল্লাহ তুমি আমার সৃষ্টি সুন্দর করেছ, অতএব আমার চরিত্রও সুন্দর কর”।
সচ্চরিত্রশীল লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিক প্রিয় এবং কিয়ামতের দিন তার অতি নিকটে বসবে। জাবের ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন:
(إن من أحبكم إلي ، وأقربكم مني مجلسا يوم القيامة ؛ أحاسنكم أخلاقا).
“তোমাদের মধ্যে আমার অতি প্রিয় ও কিয়ামতের দিন আমার অতি নিকটে আসন গ্রহণকারী সে, যে তোমাদের মধ্যে অধিক সুন্দর চরিত্রের অধিকারী”।
উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তির জন্য আল্লাহ জান্নাতের উঁচু স্থানে প্রাসাদ নির্মাণ করবেন, যা তার সওয়াব ও সম্মানের বিনিময়। আবু বাহেলি ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন:
(أنا زَعِيمٌ ببيت في رَبَضِ الجنة لمن ترك الْمِرَاءَ وإن كان محقا، وببيت في وسط الجنة لمن ترك الكذب وإن كان مازحا، وببيت في أعلى الجنة لمن حَسَّنَ خُلُقَهُ).
“সত্য পথে থেকেও যে ঝগড়া ত্যাগ করল, আমি তার জন্য জান্নাতের উত্তম স্থানে ঘরের জিম্মাদার। হাসি-ঠাট্টায় যে মিথ্যা ত্যাগ করল আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে ঘরের জিম্মাদার। আর যে তার চরিত্র উত্তম করবে, আমি তার জন্য জান্নাতের উঁচু স্থানে ঘরের জিম্মাদার”।
সচ্চরিত্র শুধু দূরের লোক বা অপরদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে নিকট আত্মীয় বা আপনাদের ভুলা ঠিক নয়, বরং সচ্চরিত্রের হাত পিতা-মাতা ও পরিবারের প্রত্যেক সদস্যদের জন্য প্রসারিত করা উচিত। কতক ব্যক্তিকে দেখা যায় বাইরের লোকদের সাথে প্রশস্ত বক্ষ, হাসি-খুশি ও সচ্চরিত্রশীল, কিন্তু নিজ পরিবারের সদস্য ও সন্তানদের সাথে তার উল্টো, যা একেবারে পরিত্যাজ্য।

৭. বিধবা ও মিসকিনদের সেবা করার চেষ্টা করা।
আবু হুরায়রা ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন:
(السَّاعِي عَلَى الأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِينِ ؛ كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوْ الْقَائِمِ اللَّيْلَ الصَّائِمِ النَّهَارَ).
“বিধবা ও মিসকিনদের সেবায় আত্মনিয়োগকারী আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদ অথবা রাতে কিয়ামকারী ও দিনে সালাত আদায়কারী ব্যক্তির সমান”।
এ সওয়াব খুব সহজে অর্জন করা সম্ভব, যেমন কোন নিঃস্ব বা গরিব ব্যক্তির দরখাস্ত কোন এনজিও বা সেবা সংস্থায় পেশ করা, যেন তারা তার অবস্থা জানে ও তাকে প্রয়োজনীয় সাহায্য করে। অনুরূপ বিধবা-যার স্বামী নেই তার সেবা করেও এ সওয়াব অর্জন করা সম্ভব, যেমন তার প্রয়োজন পূর্ণ করা। এটা কঠিন কোন কর্ম নয়, আপনি আপনার নিকট আত্মীয়দের মধ্যে খোঁজ নিয়ে দেখতে পাবেন কোন ফুফু অথবা কোন খালা অথবা কোন দাদীর স্বামী নেই, তাদের খিদমত করে জিহাদ ও কিয়ামুল লাইলের সওয়াব অর্জন করতে পারেন।
৮. জুমার কতিপয় আদাব গুরুত্বসহ আদায় করা।
আউস ইব্‌ন আউস সাকাফি ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:
(مَنْ غَسَّلَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَاغْتَسَلَ ، ثُمَّ بَكَّرَ وَابْتَكَرَ ، وَمَشَى وَلَمْ يَرْكَبْ ، وَدَنَا مِنْ الإِمَامِ ، فَاسْتَمَعَ وَلَمْ يَلْغُ ، كَانَ لَهُ بِكُلِّ خُطْوَةٍ عَمَلُ سَنَةٍ ؛ أَجْرُ صِيَامِهَا وَقِيَامِهَا).
“জুমার দিন যে গোসল করল, ভালো করে; অতঃপর আগেভাগে মসজিদে গেল; হেঁটে চলল, বাহনে চড়ল না; ইমামের নিকটবর্তী হল; অনর্থক কর্মে লিপ্ত না হয়ে মনোযোগসহ শ্রবণ করল; তার প্রতি কদমে লেখা হবেএক বছরের আমল তথা এক বছরের সিয়াম ও কিয়ামের সওয়াব”।
অতএব যে ব্যক্তি এসব আদব রক্ষা করবে তার প্রতি কদম এক রাত অথবা এক সপ্তাহ অথবা এক মাস কিয়ামের সমান নয়, বরং পূর্ণ এক বছর কিয়াম করার সমান।
জুমার দিন গোসল করা, আগে আগে ও পায়ে হেঁটে মসজিদে যাওয়া, ইমামের নিকটবর্তী বসা, শেষের কাতারে পিছিয়ে না পড়া, মনোযোগসহ খুতবা শ্রবণ করা এবং বেহুদা ও অনর্থক কর্মকাণ্ড ত্যাগ করার মধ্যে এসব আদব সীমাবদ্ধ, যা খুব সহজ ও খুব সামান্য।
জ্ঞাতব্য যে, খুতবার সময় অহেতুক নড়াচড়া করা অনর্থক কর্মের অন্তর্ভুক্ত। যে অনর্থক কর্ম করল তার জুমা নেই। যে পাথর স্পর্শ করল সে অনর্থক কর্ম করল। যে বলল, ‘চুপ থাক’, সে অনর্থক কর্ম করল: অর্থাৎ যে তার পাশের সাথী অথবা নিজের সন্তানকে বলল ‘চুপ থাক’ সে বেহুদা কর্ম করল। খুতবার সময় যে তসবিহ অথবা মোবাইল অথবা কোন জিনিস দ্বারা খেলল, সেও অনর্থক কর্ম করল।
সুতরাং জুমার আদবসমূহে শিথিলতা করা ঠিক নয়, অন্যথায় আমরা এমন সব বিরাট সওয়াব থেকে বঞ্চিত হব, পরকালে যা আমাদের নেকির পাল্লা ভারী করবে ও অনেক বছরের সওয়াব প্রদান করবে।
৯. আল্লাহর রাস্তায় একদিন ও একরাত জাগ্রত থাকা।
সালমান ফারসি ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:
(رباط يوم وليلة خير من صيام شهر وقيامه ، وإن مات جرى عليه عمله الذي كان يعمله ، وأُجري عليه رزقه ، وأمِنَ الفتَّان) ، والفتَّان هو فتنة القبر.
“একদিন ও একরাত আল্লাহর রাস্তায় শত্রুর মোকাবেলায় যুদ্ধের প্রস্তুতিসহ দাঁড়িয়ে থাকা একমাস সিয়াম ও একমাস কিয়াম অপেক্ষা উত্তম। যদি সে মারা যায় তাহলে তার আমল চলমান থাকবে যা সে আঞ্জাম দিত, তার রিযিক তার জন্য অব্যাহত থাকবে এবং ফিতনা থেকে সে নিরাপদ থাকবে”। ফিতনা অর্থ কবরের আযাব।
১০. ঘুমের পূর্বে কিয়ামুল লাইলের নিয়ত করা।
আবু দারদা ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি ‘মরফূ’ হাদিস বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন:
(مَنْ أَتَى فِرَاشَهُ وَهُوَ يَنْوِي أَنْ يَقُومَ يُصَلِّي مِنْ اللَّيْلِ ، فَغَلَبَتْهُ عَيْنَاهُ حَتَّى أَصْبَحَ ، كُتِبَ لَهُ مَا نَوَى ، وَكَانَ نَوْمُهُ صَدَقَةً عَلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ).
“যে ব্যক্তি তার বিছানায় আগমন করল এ নিয়তে যে রাতে উঠে সালাত আদায় করবে, কিন্তু তার চোখে ঘুম চেপে থাকল ভোর পর্যন্ত, তার নিয়ত অনুসারে তার জন্য লিখা হবে, আর তার ঘুম হবে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য সদকা”।
লক্ষ্য করুন নিয়তের গুরুত্ব। নিয়ত আমলের জায়গায় প্রতিস্থাপিত হয়! এ থেকে আমরা ঐ ব্যক্তির বদ নসিব জানতে পারি, যে ঘুমানোর সময় ফজর সালাত আদায়ের পর্যন্ত নিয়ত করে না। এ হতভাগা শুধু কর্মস্থল অথবা বিদ্যালয়ের জন্য জাগ্রত হয়। সে কবিরা গুনায় অনবরত লিপ্ত, এ অবস্থায় তার মৃত্যু হলে পরিমাণ শুভ হনে না, আল্লাহর নিকট পানাহ চাই।
আর যে ফজরের সময় উঠার নিয়ত করে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিল, কিন্তু তবুও উঠতে পারল না, তার ওপর কোন তিরস্কার নেই। কারণ ঘুমন্ত অবস্থায় আল্লাহর বিধানের সীমালঙ্ঘন নেই, সীমালঙ্ঘন হচ্ছে জাগ্রত অবস্থায়।
১১. কিয়ামুল লাইলের সমান আমলগুলো প্রচার করা।
আপনার থেকে জেনে কেউ যদি এর ওপর আমল করে, তাহলে তাদের সমপরিমাণ আপনার সওয়াব হবে। কারণ কাউকে ভাল কাজের কথা বলা তা বাস্তবায়ন করার মত সওয়াব। অতএব আপনি কল্যাণের আহ্বানকারী হোন, ইলম প্রচার করুন, তাহলে যারা আপনার কারণে আমল করবে, তাদের ন্যায় আপনিও সওয়াবের অধিকারী হবেন। সকল প্রশংসার মালিক আল্লাহ তা‘আলা।

কিয়ামুল লাইলের সমপরিমাণ সওয়াব 1


সকল প্রশংসা দু’জাহানের পালনকর্তা আল্লাহ তা’আলার জন্য এবং দরূদ ও সালাম নাযিল হোক সর্বশেষ নবী ও রাসূল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবার ও সাথী এবং সকলের ওপর ।
অতঃপর,
কিয়ামুল লাইল বা রাতের সালাতের ফযিলত আল্লাহর নিকট বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ কোন সন্দেহ নেই। ফরয সালাতের পর এ সালাতের স্থান। এ সালাতের বৈশিষ্ট্য শুধু ব্যক্তির পাপ মোচন করা নয়, বরং পাপে লিপ্ত হওয়া থেকে হিফাযত করা। যেমন আবু উমামা বাহেলি রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন:
(عليكم بقيام الليل ، فإنه دأب الصالحين قبلكم ، وقربة إلى ربكم ، ومكفرة للسيئات ، ومنهاة للإثم) .
“তোমরা রাতের সালাত জরুরী করে নাও, কারণ তা নেককার লোকদের অভ্যাস, তোমাদের রবের নৈকট্য, গুনাহের কাফফারা ও পাপ থেকে সুরক্ষা”।
পূর্বসূরিগণ বরং কয়েক বছর পূর্বে আমাদের পূর্বপুরুষগণ কিয়ামুল লাইল বা রাতের সালাতের ব্যাপারে শিথিলতা করতেন না, কিন্তু বর্তমান যুগে অবস্থা পাল্টে অনেকের রাত পরিণত হয়েছে দিনে। তাদের থেকে বিদায় নিয়েছে রাতে আল্লাহর সাথে মোনাজাতের স্বাদ। অনেকের শিথিলতা ফজর সালাতের সীমা অতিক্রম করে গেছে।
তাউস ইব্‌ন কিসান রহ. সেহরির সময় জনৈক ব্যক্তির সাক্ষাতে আসেন, তাকে বলা হল: সে ঘুমে। তিনি বললেন: “আমি জানতাম না সেহরির সময় কেউ ঘুমাতে পারে”। তিনি যদি আমাদের দেখেন, আপনার ধারণা আমাদের সম্পর্কে তিনি কি বলবেন?
বান্দার ওপর আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী যে, তিনি কতক সহজ আমল দান করেছেন, যার সওয়াব কিয়ামুল লাইলের সমান। যার থেকে কিয়ামুল লাইল ছুটে যায় অথবা কিয়ামুল লাইল যার পক্ষে কষ্টকর, সে যেন কোন অবস্থায় এসব আমল ত্যাগ না করে। এর অর্থ কিয়ামুল লাইল ত্যাগ করা নয়, আমাদের পূর্বপুরুষগণ এমন অর্থ বোঝেননি, বরং তারা কল্যাণের প্রত্যেক ময়দানে অংশ গ্রহণ করতেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ তার কতক সাহাবিকে, যারা কিয়ামুল লাইলে অক্ষম ছিল, কিছু সহজ আমল বাতলে দিয়েছেন যা কিয়ামুল লাইলের সমান। এটা আমাদের নেকির পাল্লা ভারী করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বিশেষ আগ্রহের বহিঃপ্রকাশ। আবু উমামা বাহেলি ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন:
(من هاله الليل أن يكابده ، أو بخل بالمال أن ينفقه ، أو جبن عن العدو أن يقاتله ، فليكثر من سبحان الله وبحمده ، فإنها أحب إلى الله من جبل ذهب ينفقه في سبيل الله عز وجل).
“যে শঙ্কাবোধ করে রাত জাগতে পারবে না, অথবা খরচ না করে সম্পদ জমা করে রাখে, অথবা শত্রুর সাথে যুদ্ধ না করে ভীরুতা প্রদর্শন করে, সে যেন سبحان الله وبحمده অধিক পাঠ করে, কারণ তা আল্লাহর রাস্তায় পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ ব্যয় করার চেয়ে অধিক প্রিয়”।
আমি এখানে ফাযায়েলে আমল সম্পর্কে সেসব হাদিস উল্লেখ করব, যার সওয়াব কিয়ামুল লাইলের সমপরিমাণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ আমাদের তা বাতলে দিয়েছেন, যেন আমরা আমাদের আমলনামা ভারী ও সওয়াব বৃদ্ধির ব্রত গ্রহণ করি। যেমন:

১. ফজর ও এশার সালাত জামাতের সাথে আদায় করা।
উসমান ইব্‌ন আফ্‌ফান ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন:
(مَنْ صَلَّى الْعِشَاءَ فِي جَمَاعَةٍ كَانَ كَقِيَامِ نِصْفِ لَيْلَةٍ ، وَمَنْ صَلَّى الْعِشَاءَ وَالْفَجْرَ فِي جَمَاعَةٍ كَانَ كَقِيَامِ لَيْلَةٍ).
“যে এশার সালাত জামাতের সাথে আদায় করল, সে যেন অর্ধেক রাত কিয়াম করল, আর যে ফজর ও এশা জামাতের সাথে আদায় করল, সে যেন পূর্ণ রাত কিয়াম করল”।
এ জন্য উচিত ফরয সালাতগুলো মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করা। কখনো জামাত ত্যাগ না করা, বিশেষ করে ফজর ও এশার সালাত। এ দু’ সালাত মুনাফিকদের জন্য খুব কষ্টকর। যদি তারা এর সওয়াব জানত হাপুড় পেরে হলেও উপস্থিত হত, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রত্যেক সালাত অর্ধেক রাত কিয়াম করার সমপরিমাণ।

২. যোহর সালাতের পূর্বে চার রাকাত আদায় করা।
আবু সালেহ রহ. থেকে মুরসাল সনদে একটি ‘মরফূ’ হাদিস বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন:
(أَرْبَعُ رَكَعَاتٍ قَبْلَ الظُّهْرِ يَعْدِلْنَ بِصَلاَةِ السَّحَرِ).
“যোহরের পূর্বে চার রাকাত সেহরির সালাতের সমপরিমাণ”।
এ চার রাকাতের আরেক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আসমানের দ্বারসমূহ এ জন্য উন্মুক্ত হয়। আবু আইয়ুব আনসারি ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন:
(أربع قبل الظهر تفتح لهن أبواب السماء) .
“যোহরের পূর্বে চার রাকাতের জন্য আসমানের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত করা হয়”।
এ জন্য আমরা দেখি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ এর প্রতি খুব যত্নশীল ছিলেন, কোন কারণে ছুটে গেলে ফরযের পর কাযা করতেন, ত্যাগ করতেন না। যেমন আয়েশা ‎রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন: “যদি তিনি যোহরের পূর্বে চার রাকাত আদায় না করে থাকতেন, তাহলে পরে তা আদায় করতেন”। অপর বর্ণনায় তিনি বলেছেন: “যখন যোহরের পূর্বে তার চার রাকাত ছুটে যেত, যোহরের পরে তা আদায় করতেন”।
তাই যার চার রাকাত ছুটে যায়, অথবা কর্মস্থলের পরিবেশের কারণে তা আদায় করা সম্ভব না হয়, কাজ শেষে বাড়ি ফিরে তা আদায় করা দোষের নয়।
আবু ঈসা তিরমিযি রহ. বলেছেন: এ হাদিস প্রমাণ করে ফরযের পূর্বের সুন্নতগুলো নিয়মিত আদায় করা বিধি সম্মত। আর ফরযের শেষ সময় পর্যন্ত এর সময় দীর্ঘ হয়। যদি ফরয আদায়ের সাথে এর সময় শেষ হয়ে যেত, তবে ফরযের পর আদায় করা কাযা হিসেবে গণ্য হত। তখন ফরয পরবর্তী দু’রাকাত সুন্নতের পূর্বে এ চার রাকাত আদায় করার বিধান হত, অথচ এ অধ্যায়ের অপর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যোহর পরবর্তী দু’রাকাত আদায় শেষে এ চার রাকাত আদায় করা হত। [অতএব যোহরের পূর্বের চার রাকাত পরে আদায় করা কাযা নয় বরং আদায়, এ জন্য দু’রাকাত সুন্নতের পর তা আদায় করা বৈধ। কাযা হলে দু’রাকাত সুন্নতের পূর্বে তা কাযা করার বিধান থাকত।] ইরাকি রহ. এ অর্থ উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন: শাফেয়ি মতাবলম্বীদের নিকট এ অর্থই সঠিক।

৩. সম্পূর্ণ তারাবি ইমামের সাথে আদায় করা।
আবু যর গিফারি ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে রমযানে সিয়াম রাখলাম, সাত দিন বাকি থাকার আগে মাসের কোথাও তিনি আমাদের নিয়ে কিয়াম করেননি। তিনি আমাদের নিয়ে কিয়াম করলেন যে, রাতের এক তৃতীয়াংশ সমাপ্ত হল। ষষ্ঠ রাতে আমাদের নিয়ে কিয়াম করেননি, যখন পঞ্চম রাত বাকি তিনি আমাদের নিয়ে কিয়াম করলেন যে, রাতের অর্ধেক শেষ হল। আমি বললাম: হে আল্লাহর রাসূল যদি অবশিষ্ট রাতও আমাদের নিয়ে কিয়াম করতেন! আবু যর বলেন: অতঃপর তিনি বললেন: “নিশ্চয় ব্যক্তি যখন ইমামের সাথে সালাত আদায় করে তার চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত, তার জন্য পূর্ণ রাত কিয়াম করা গণ্য করা হয়”।
এটা এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যার জন্য অধিকাংশ মসজিদের ইমামগণ রমযানে মুসল্লিদের উদ্বুদ্ধ করেন। তবুও কতক লোক এ ফযিলতের ক্ষেত্রে শিথিলতা প্রদর্শন করে, অথচ এসব ফযিলতের কারণেই রমযান অন্যান্য মাস থেকে আলাদা মর্যাদার অধিকারী। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন:
(مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ)
“রমযানে যে সওয়াবের দৃঢ় বিশ্বাস ও আল্লাহর সন্তুষ্টির আশা নিয়ে কিয়াম করল, তার পূর্বের পাপ মোচন করে দেয়া হবে”। অনুরূপ ফযিলত লাইলাতুল কদরের জন্যও রয়েছে, তার কিয়াম এক হাজার মাস কিয়াম করার চেয়ে অধিক ফযিলতপূর্ণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
﴿ لَيۡلَةُ ٱلۡقَدۡرِ خَيۡرٞ مِّنۡ أَلۡفِ شَهۡرٖ ٣ ﴾ [القدر: 3]
“লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম”। [সূরা কাদর: (৩)]
বিস্ময় লাগে তাদের প্রতি যারা এ রাতেও শিথিলতা করে।

৪. রাতে এক শো আয়াত পাঠ করা।
তামিমে দারি ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন:
(مَنْ قَرَأَ بِمِئَةِ آيَةٍ فِي لَيْلَةٍ كُتِبَ لَهُ قُنُوتُ لَيْلَةٍ) .
“যে ব্যক্তি রাতে এক শো আয়াত পাঠ করল, তার জন্য পূর্ণ রাতের কিয়াম লিখা হবে”।
এক শো আয়াত পাঠ করা খুব সহজ, দশ মিনিটের বেশী সময় লাগে না। আপনার হাতে সময় কম থাকলে উদাহরণ স্বরূপ সূরা সাফ্‌ফাতের প্রথম চার পৃষ্ঠা পড়ে এ সওয়াব অর্জন করতে পারেন, অথবা সূরা কালাম ও আল-হাক্কাহ পাঠ করুন।
কোন কারণে যখন পড়তে না পারেন, ফজর থেকে যোহরের আগ পর্যন্ত সময়ে পড়ে নিন। এ নিয়ে গাফিলতি করবেন না, ইনশাআল্লাহ কিয়ামুল লাইলের সওয়াব অর্জন হবে। ওমর ইব্‌ন খাত্তাব ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন:
(مَنْ نَامَ عَنْ حِزْبِهِ أَوْ عَنْ شَيْءٍ مِنْهُ ، فَقَرَأَهُ فِيمَا بَيْنَ صَلاةِ الْفَجْرِ وَصَلاةِ الظُّهْرِ ، كُتِبَ لَهُ كَأَنَّمَا قَرَأَهُ مِنْ اللَّيْلِ).
“যে তার পূর্ণ ‘হিযব’ ও অথবা আংশিক ‘হিযব’ না পড়ে ঘুমিয়ে গেল, অতঃপর সে যদি তা ফজর ও যোহরের মধ্যবর্তী সময়ে পড়ে নেয়, তার জন্য গণ্য করা হবে যেন সে তা রাতেই পড়েছে”।
মুবারক পুরী রহ. এ হাদিস প্রসঙ্গে বলেছেন: “এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হয় রাতে কুরআন থেকে কিছু নির্ধারণ করে নেয়া জায়েয, যদি ঘুমের জন্য অথবা কোন কারণে তা ছুটে যায়, তাহলে তার কাযা করাও জায়েয। যে তা ফজর ও যোহর মধ্যবর্তী সময়ে কাযা করবে, সে রাতে আদায়কারী গণ্য হবে। আয়েশা ‎রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে ইমাম মুসলিম ও তিরমিযি প্রমুখগণ বর্ণনা করেছেন: ঘুম বা কোন ব্যথা যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কিয়ামুল লাইল থেকে বিরত রাখত, তিনি দিনে তার পরিবর্তে বারো রাকাত সালাত আদায় করতেন”।
এ হাদিস আমাদের সংবাদ দিচ্ছে যে, দিন-রাতে কুরআনের নির্দিষ্ট তিলাওয়াত থাকা বাঞ্ছনীয়, বিশেষ করে রাতে।
ভুললে চলবে না, আমাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে ঘুমানোর পূর্বে কমপক্ষে দশ আয়াত পাঠ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন, যেন আমরা গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত না হই?
আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আমর ইব্‌ন আস ‎রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম‎ বলেছেন:
(من قام بعشر آيات لم يُكتب من الغافلين ، ومن قام بمئة آية كُتب من القانتين ، ومن قام بألف آية كُتب من المقنطرين).
“দশ আয়াত দ্বারা যে কিয়াম করবে, তাকে গাফেলদের মধ্যে গণ্য করা হবে না, আর যে এক শো আয়াত দ্বারা কিয়াম করবে তাকে অনুগতদের মধ্যে গণ্য করা হবে, আর যে এক হাজার আয়াত দ্বারা কিয়াম করবে তাকে প্রাচূর্যের অধিকারীদের মধ্যে গণ্য করা হবে”।
আমরা আল্লাহর কুরআন রীতিমত তিলাওয়াত করি! আমাদের খতমে কুরআন শুধু রমযানে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, বরং পূর্ণ বছর ব্যাপী তা হওয়া জরুরী।
প্রতি রাতে কিয়ামুল লাইলের সওয়াব হাসিল করার জন্য এক শো আয়াত পাঠ করা, আল্লাহর কিতাবকে আঁকড়ে থাকার এক সুন্দর আমল।

যাকাত প্রসঙ্গ

যাকাত ইসলামের পাঁচটি ফরযের একটি। কালিমায়ে শাহাদাত ও সালাতের পর যাকাতের স্থান। কুরআন-হাদিস ও ইজমা দ্বারা এর ফরযিয়্যাত প্রমাণিত। যাকাতের ফরযিয়্যাত অস্বীকারকারী কাফের ও ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত মুরতাদ।
আর যাকাতের ব্যাপারে যে কৃপণতা করল অথবা কম আদায় করল সে আল্লাহর শাস্তির উপযুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿وَلا يَحۡسَبَنَّ ٱلَّذِينَ يَبۡخَلُونَ بِمَآ ءَاتَىٰ هُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦ هُوَ خَيۡرا لَّهُمۖ بَلۡ هُوَ شَرّ لَّهُمۡۖ سَيُطَوَّقُونَ مَا بَخِلُواْ بِهِۦ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِۗ وَلِلَّهِ مِيرَٰثُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۗ وَٱللَّهُ بِمَا تَعۡمَلُونَ خَبِير [سورة آل عمران:১৮০]
“আর আল্লাহ যাদেরকে তাঁর অনুগ্রহ থেকে যা দান করেছেন তা নিয়ে যারা কৃপণতা করে তারা যেন ধারণা না করে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর। বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর। যা নিয়ে তারা কৃপণতা করেছিল, কিয়ামত দিবসে তা দিয়ে তাদের বেড়ি পরানো হবে। আর আসমানসমূহ ও যমীনের উত্তরাধিকার আল্লাহরই জন্য। আর তোমরা যা আমল কর সে ব্যাপারে আল্লাহ সম্যক জ্ঞাত”। সূরা আলে-ইমরান: (১৮০)
সহিহ বুখারিতে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ যাকে সম্পদ দান করেছেন, অতঃপর সে তার যাকাত প্রদান করল না, কিয়ামতের দিন তার জন্য বিষধর সাপ সৃষ্টি করা হবে, যার দুটি চোঁয়াল থাকবে, যা দ্বারা সে তাকে কিয়ামতের দিন পেঁছিয়ে ধরবে, অতঃপর তার দু’চোয়াল পাকড়ে বলবে: আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার সঞ্চিত ধন”।

তিন ধরনের সম্পদের ওপর জাকাত ফরজ :
প্রথম প্রকার : স্বর্ণ- রৌপ্যের ওপর (নিসাব পরিমাণ হলে) সর্বাব¯’ায় জাকাত ফরজ। শর্ত হচ্ছে এর নিসাব পূর্ণ হতে হবে। স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ, আর রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপা বা তার সমপরিমাণ অর্থের মালিক হলে যাকাত ফরজ হবে
আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন :
وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ. يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لانْفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُونَ (التوبة:৩৪-৩৫
‘যারা সোনা-রূপা জমা করে রাখে অথচ তা আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় করে না। আপনি তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ প্রদান কর“ন। কিয়ামত দিবসে ঐ সোনা-রূপাকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠে ছেকা দেয়া হবে এবং বলা হবে এ হল তোমাদের সে সকল ধন-সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করে রাখতে। সুতরাং আজ জমা করে রাখা
সম্পদের স্বাদ গ্রহণ কর।

সঞ্চয় করে রাখার অর্থ হল, আল্লাহর নির্দেশিত পথে পরিমাণ মত ব্যয় না করা। আর সর্বোত্তম ব্যয় হল- জাকাত প্রদান করা।
এ বিষয়ে আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
ما من صاحب ذهب ولا فضة لا يؤدي منها حقها إلا إذا كان يوم القيامة صفحت له صفائح من نار فأحمى عليها في نار جهنم فيكوى بها جنبه وجبينه وظهره كلما بردت أعيدت له في يوم كان مقداره خمسين ألف سنة حتى يقضي بين العباد. رواه مسلم
যে সকল সোনা-রূপার মালিকগণ তাদের সম্পদ থেকে নির্ধারিত হক আদায় করে না, কিয়ামত দিবসে তার জন্য কতগুলো আগুনের পাত প্র¯‘ত করে তা জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তা দ্বারা ঐ লোকদের ললাট ও পিঠে চেপে ধরা হবে, তাপ কমে গেলে উত্তপ্ত করে পুনরায় চেপে ধরা হবে। পঞ্চাশ হাজার বছর দীর্ঘ সময় বান্দাদের হিসাব-নিকাশ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এভাবে শাস্তি চলতেই থাকবে। হক আদায় না করার অর্থ হল জাকাত আদায় না করা। যা অন্য রেওয়ায়েতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

দ্বিতীয় প্রকার : প্রাণীর ওপর। যে সকল প্রাণীর ওপর জাকাত ওয়াজিব হয় তা হল, উট, গর“, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ। যদি এ সকল প্রাণী সায়িমা হয় ও মাঠ চড়ে ঘাষ খায় এবং এগুলো বংশ বৃদ্ধির জন্য পালন করা হয় ও তা নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে এদের জাকাত দিতে হবে। উটের নিসাব ন্যুনতম ৫টি, গর“র ৩০টি, আর ছাগলের ৪০টি। সায়িমা ঐ সকল প্রাণীকে বলে, যেগুলো সারা বছর বা বছরের অধিকাংশ সময় চারণভূমিতে ঘাস খেয়ে বেড়ায়। যদি এ সকল প্রাণী সায়িমা না হয়, তবে এর ওপর জাকাত ওয়াজিব নয়। কিš‘ ব্যবসার উদ্দেশ্যে পালন করা হলে, সর্বাব¯’ায় এগুলোর জাকাত দিতে হবে, যদি তা নিসাব পরিমাণ হয়। আর নিসাবের কম হলে এগুলোর মূল্য অন্য সম্পদের সাথে যুক্ত করে নিসাব পরিমাণ হলে জাকাত দিতে হবে।

তৃতীয় প্রকার : ব্যবসায়ী সম্পদ। অর্থাত ব্যবসার জন্য রক্ষিত সম্পদ যেমন জমিন, গাড়ি, চতুষ্পদ জন্তু ও অন্যান্য সম্পদ । ¯’াবর-অ¯’াবর সকল প্রকার ব্যবসায়ী পণ্যের ওপর জাকাত ওয়াজিব।
عن سمرة بن جندب رضي الله عنه:” أمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم أن نخرج الصدقة مما نعده للبيع”.
ছুমরা বিন জুন্দাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত রসুলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে ব্যবসার জন্য রক্ষিত সম্পদ থেকে যাকাত দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন । বছরান্তে সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ করত, তার ৪০ ভাগের এক ভাগ জাকাত দিতে হবে। মেশিনারিজ বা খুচরা যন্ত্রাংশ ও এ জাতীয় ক্ষুদ্র পণ্যের ব্যবসায়ীদের কর্তব্য হল, ছোট-বড় সকল অংশের মূল্য নিধারণ করে নিবে, যাতে কোন কিছু বাদ না পড়ে। পরিমাণ নির্ণয়ে যদি জটিলতা দেখা দেয়, তাহলে সতর্কতামূলক বেশী দাম ধরে জাকাত আদায় করবে, যাতে সে সম্পূর্ণ দায়িত্ত্ব থেকে মুক্ত হতে পারে। মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তু

যথা খাবার, পানীয়, আসবাবপত্র, বাহন, পোষাক, ব্যবহার্য পণ্যের ওপর জাকাত আবশ্যক নয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,ليس على المسلم في فرسه و غلامه صدقة ‘মুসলিমদের গোলাম, বাদী, ঘোড়া এগুলোর ওপর জাকাত নেই।’ ভাড়া দেয়ার জন্য প্রস্তুতকৃত পণ্যের ওপর জাকাত আসবে না। তবে সেগুলো থেকে প্রাপ্ত অর্থের ওপর নিসাব পূর্ণ হবার পর জাকাত আসবে ।
এখান থেকে বুঝা গেল ব্যবসার জন্য রক্ষিত জমিনের উপর ও যাকাত ওয়াজিব তফসীল
যাচাই করলে দেখা যায় মুসলিমগন যত জমিনের মালিক হন তা পাঁচ ভাগে বিভক্ত
১) ভবিষ্যতে থাকার ঘর নির্মানের উদ্দেশ্যে অথবা সন্তানদের জন্য সম্পদ হিসাবে ক্রয় কৃত জমিন, এই প্রকার জমিনের কোন যাকাত আসবে না ।
২) ভবিষ্যতে ঘর বা মার্কেট দোকান ইত্যাদি নির্মান করে ভাড়া দেয়ার উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত জমিন ।
এই প্রকার জমিনের উপরও যাকাত আসবে না । তবে সেগুলো থেকে প্রাপ্ত অর্থের উপর
নিসাব পূর্ণ হয়ে এক বছর অতিবাহিত হলে যাকাত আসবে।
৩) ফসল উতপাদনের জমিন , সে জমির উপরও যাকাত আসবেনা । হাঁ উতপাদিত ফসলের শরয়ী নিয়ম অনুযায়ী যাকাত দিতে হবে ।
৪) ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত জমিন অর্থাত দাম বাড়ার পর বিক্রি করে দেয়ার নিয়তে
ক্রয়কৃত জমিন । এই প্রকারের জমিনের যাকাত দেয়া ওয়াজিব । যদি সে জমিনের দাম নেসাব
পরিমান হয় কেননা এই প্রকার জমিন ব্যবসার সম্পদের অন্তর্ভূক্ত ।
৫) এই উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত জমিন যে এই জমিনের উপর বিলডিং নির্মান করে নির্মানবস্তায় বা নির্মান
পূর্ণ হওয়ার পর ফ্লাট হিসাবে সে বিলডিং বিক্রি করে দিবে । বর্তমান যুগে বিভিন্ন কোম্পানি এ
প্রকার ব্যবসা করে আসতেছে এই প্রকারের জমিন ও বিলডিং এর দামের উপর প্রতি বছর
যাকাত আসবে।এতে অধিকাংশ ফকিহগনের এক মত রয়েছে ,কেননা ব্যবসার সম্পদে
যাকাত ওয়াজিব হওয়ার যা যা শর্ত রয়েছে সবগুলো এখানে পাওয়া যায়।
হাফেজ মুহাম্মদ আইয়ুব

‎রমযানের ফযিলত


আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‎
«إذا دَخَلَ شَهرُ رَمَضَانَ فُتِحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ، وَغُلِّقَتْ أَبوَابُ جَهَنَّمَ، وسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ» رَوَاهُ الشَّيخَان.
“যখন রমযান মাস আগমন করে, তখন আসমানের দরজাসমূহ খুলা হয়, জাহান্নামের ‎‎দরজাসমূহ বদ্ধ করা হয় এবং শয়তানগুলো শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়”। ‎ অপর বর্ণনায় আছে:‎
«إذا كَانَ أَوَّلُ ليْلَةٍ من شَهرِ رَمَضَانَ صُفِّدَتِ الشَّياطِينُ ومَرَدَةُ الجِنِّ، وغُلِّقَتْ أبوَابُ النَّارِ فَلَمْ يُفْتَحْ منْهَا بَابٌ، وفُتِحَتْ أَبوَابُ الجَنَّةِ فلمْ يُغْلَقْ منْها بَابٌ، ويُنَادِي مُنَادٍ: يا بَاغِيَ الخَيرِ: أَقْبِلْ، ويا بَاغِيَ الشَّر: أَقْصِرْ، ولله عُتَقَاءُ مِنَ النَّار وذَلكَ كُلَّ لَيْلَةٍ».
‎“যখন রমযানের প্রথম রাত হয়, শয়তান ও অবাধ্য জিনগুলো শৃঙ্খলিত করা ‎হয়, জাহান্নামের সকল দরজা বন্ধ করা হয়; খোলা হয় না তার কোন দ্বার, জান্নাতের ‎‎দুয়ারগুলো খুলে দেয়া হয়; বদ্ধ করা হয় না তার কোন তোরণ। এবং একজন ঘোষক ‎‎ঘোষণা করে: হে পুণ্যের অন্বেষণকারী, অগ্রসর হও। হে মন্দের অন্বেষণকারী, ক্ষান্ত হও। আর আল্লাহর জন্য রয়েছে জাহান্নাম থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত অনেক বান্দা, এটা প্রত্যেক রাতে হয়”।
হাদিসে বর্ণিত: “হে পুণ্যের অন্বেষণকারী অগ্রসর হও, হে মন্দের অন্বেষণকারী ক্ষান্ত হও”। অর্থ: ‎‎হে কল্যাণ অনুসন্ধানকারী, তুমি আরো কল্যাণ অনুসন্ধান কর। এটা তোমার মুখ্য সময়, এতে অল্প আমলে তোমাকে অধিক প্রদান করা হবে। আর হে মন্দের প্রত্যাশী, ‎তুমি ক্ষান্ত হও, তওবা কর, এটা তওবা করার মোক্ষম সময়।
অপর বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সাহাবিদের ‎সুসংবাদ প্রদান করে বলেছেন:
«أَتَاكُمْ رَمَضَانُ شَهرٌ مُبارَكٌ فَرَضَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ صِيَامَهُ، تُفَتَّحُ فيه أَبوَابُ السَّمَاءِ، وتُغْلَّقُ فِيهِ أَبْوَابُ الجَحِيمِ، وتُغَلُّ فيه مَرَدَةُ الشَّياطِينِ، لله فيهِ لَيلَةٌ خَيرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، مَنْ حُرِمَ خَيرَهَا فَقَدْ حُرِم».
“তোমাদের নিকট বরকতময় মাস রমযান এসেছে, আল্লাহ এর সওম ফরয করেছেন। এতে জান্নাতের দ্বারসমূহ খোলা হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ করা ‎হয়, শিকলে বেঁধে রাখা হয় শয়তানগুলো। এতে একটি রজনী ‎রয়েছে যা সহস্র মাস থেকে উত্তম। যে তার কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল, সে প্রকৃত অর্থে বঞ্চিত হল”।
আবু হুরায়রা অথবা আবুসাইদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহুমা‎ থেকে বর্ণিত, তারা বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‎
«إِنَّ لله عُتَقَاءَ في كُلِّ يَوْمٍٍ ولَيلَةٍ، لكُلِّ عَبدٍ مِنْهُم دَعوَةٌ مُستَجَابَةٌ» رواه أحمد.
“প্রত্যেক দিনে ও রাতে আল্লাহর মুক্তিপ্রাপ্ত বান্দা রয়েছে, তাদের প্রত্যেকের জন্য রয়েছে দো‘আ কবুলের প্রতিশ্রুতি”।
জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহু‎ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إنَّ لله عِنْدَ كُلِّ فِطْرٍ عُتَقَاءَ، وذَلكَ كُلَّ لَيلَة» رواه ابن ماجه.
“প্রত্যেক ইফতারের সময় আল্লাহর মুক্তি প্রাপ্ত বান্দা রয়েছে, আর তা প্রত্যেক ‎রাতে”। ‎
মাসায়েল:
‎এক. রমযান মাসের ফযিলত যে, এতে জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করা হয়, ‎জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ করা হয় ও শয়তানগুলো শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা হয়। রমযানের প্রত্যেক রাতে তা সংঘটিত হয়, শেষ রমযান পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
দুই. এসব হাদিস প্রমাণ করে যে, জান্নাত-জাহান্নাম আল্লাহর সৃষ্ট দু’টি বস্তু, এগুলোর দরজাসমূহ ‎প্রকৃত অর্থে খোলা ও বদ্ধ করা হয়।
তিন. ফযিলতপূর্ণ মৌসুম ও তাতে সম্পাদিত আমল আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ, যে কারণে জান্নাতের দরজাসমূহ খোলা ও জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ করা হয়।
চার. রমযানের সুসংবাদ প্রদান ও তার শুভেচ্ছা বিনিময় বৈধ। কারণ ‎সাহাবিদের সুসংবাদ প্রদান ও তাদেরকে আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের এসব বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা দিতেন। অনুরূপ প্রত্যেক কল্যাণের সুসংবাদ প্রদান ‎বৈধ।‎
পাঁচ. অবাধ্য শয়তানগুলো এ মাসে আবদ্ধ করা হয়, ফলে তাদের প্রভাব কমে যায় ও মানুষ অধিক আমল করার সুযোগ পায়।
ছয়. বান্দার ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ যে, তিনি তাদের সিয়াম হিফাজত করেন, তাদের থেকে অবাধ্য শয়তানের প্রভাব দূর করেন, যেন সে তাদের ইবাদত বিনষ্ট করার সুযোগ না পায়।
সাত. এসব হাদিস থেকে শয়তানের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলে। তাদের শরীর রয়েছে, যা শিকলে বাঁধা যায়। তাদের কতিপয় অবাধ্য, রমযানে যাদেরকে শৃঙ্খলবদ্ধ করা হয়।‎
‎আট. রমযানের বিশেষ মর্যাদা সেসব মুমিনগণ অর্জন করবে, যারা এর যথাযথ মর্যাদায় দেয় ও এতে আল্লাহর বিধান পালন করে। পক্ষান্তরে কাফের, যারা এতে পানাহার করে, এর কোন মর্যাদা দেয় না, তাদের জন্য জান্নাতের দরজাসমূহ খোলা ও জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ করা হয় না। তাদের শয়তানগুলো বন্দি করা হয় না, তারা জাহান্নাম থেকে মুক্তির যোগ্য নয়। অতএব এ মাসে তাদের মৃতরা আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি পাবে না।
নয়. যে মুসলিম কাফেরদের সঙ্গে মিল রাখল, যেমন রমযানের মূ‌ল্য দিল না, এতে পানাহার করল, সওম ভঙ্গকারী কাজ করল, অথবা সওমের সওয়াব হ্রাসকারী কর্মে লিপ্ত হল, যেমন গীবত, চোগলখুরী, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া ও এসব বৈঠকে উপস্থিত হওয়া, বলা যায় সে রমযানের ‎ফযিলত থেকে বঞ্চিত হবে, তার জন্য জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত ও ‎জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ করা হবে না, তার শয়তানগুলো শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকবে না।
দশ. সুরায়ে ‘সাদ’-এর ৫০নং আয়াতে জান্নাতের প্রশংসায় বলা হয়েছে:
﴿جَنَّٰتِ عَدۡنٖ مُّفَتَّحَةٗ لَّهُمُ ٱلۡأَبۡوَٰبُ ٥٠﴾ [ص: 50]
“চিরস্থায়ী জান্নাত, যার দরজাসমূহ থাকবে ‎তাদের জন্য উন্মুক্ত”। এ আয়াত রমযানের উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যের বিপরীত নয়, কারণ এ আয়াত জান্নাতের দরজাসমূহ সর্বদা উন্মুক্ত থাকার দাবি করে না। দ্বিতীয়ত এ আয়াত কিয়ামতের দিন সম্পর্কে। অনুরূপ জাহান্নাম সম্পর্কে সুরায়ে জুমারের ৭১নং আয়াত:
﴿حَتَّىٰٓ إِذَا جَآءُوهَا فُتِحَتۡ أَبۡوَٰبُهَا ٧١﴾ [الزمر: 71]
“অবশেষে তারা যখন জাহান্নামের কাছে এসে ‎‎পৌঁছবে তখন তার দরজাগুলো খুলে দেয়া ‎হবে”। হতে পারে এর পূর্বে জাহান্নামের দরজাসমূহ বদ্ধ থাকবে।
‎এগার. লাইলাতুল কদর ফযিলতপূর্ণ। এ রাত লাইলাতুল কদর বিহীন হাজার মাস থেকে উত্তম। এ রাতের বরকত থেকে যে মাহরুম হল, সে অনেক কল্যাণ থেকে মাহরুম হল।‎
‎বারো. রমযানের প্রত্যেক রাতে আল্লাহর মুক্ত করা কতিপয় বান্দা থাকে। যারা আল্লাহর মহব্বত, সওয়াবের আশা ও শাস্তির ভয়ে সওম রাখে, সওম হিফাজত করে, কিয়াম করে, ইহসানের প্রতি যত্নশীল থাকে ও অধিক নেক আমল করে, তারা মুক্তির বেশী হকদার।
‎তের. জাহান্নাম থেকে মুক্ত এসব বান্দার জন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ কবুলের ‎ওয়াদা রয়েছে। তারা দু’টি কল্যাণ লাভ করেছে: জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও দো‘আ কবুলের প্রতিশ্রুতি।‎
‎চৌদ্দ. মুসলিমদের উচিত সওয়াব বিনষ্ট বা হ্রাসকারী কর্ম থেকে সওম হিফাজত করা, যেমন চোখ, কান ও জবান সংরক্ষণ করা, তাহলে ইনশাআল্লাহ জাহান্নাম থেকে মুক্তির সনদ মিলবে।
‎পনের. সওম পালনকারীর উচিত অধিক দো‘আ করা, কারণ তার দো‘আ কবুলের সম্ভাবনা রয়েছে।

রজব মাসের বেদআত : শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি


রজব মাস পালন, তার ফজিলত, তাতে রোজা রাখা ইত্যাদি বিষয়ে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি যাচাই, এই সময়ের একটি বহুল উচ্চারিত প্রশ্ন। বিষয়টি খুবই তাৎক্ষণিক, তাই আমি এ মাসের সাথে সম্পর্কিত কিছু আহকাম বিষয়ে সংক্ষেপে আলোকপাত করার প্রয়াস পাব, আল্লাহ আমাকে সাহায্য করুন।
রজব : হারাম মাসের একটি
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরানে এরশাদ করেন :
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ و قاتلو المشركين كافة كما يقاتلونكم كافة واعلموا أن الله مع المتقين ﴿৩৬﴾ (التوبة:৩৬)
‘‘আসমান-জমিনের সৃষ্টি ও সূচনা লগ্ন হতেই আল্লাহর বিধান মতে মাসের নিশ্চিত সংখ্যা বারটি। তার মাঝে চারটি সম্মানিত। এ অমোঘ ও শাশ্বত বিধান ; সুতরাং এর মাঝে তোমরা (অত্যাচার-পাপাচারে লিপ্ত হয়ে) নিজেদের ক্ষতি সাধন করো না। তোমরা সম্মিলিতভাবে মুশরিকদের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হও, যেভাবে তারা সম্মিলিতভাবে তোমাদের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। আর জেনে রাখ, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।’’ (তওবা-৩৬)
চার হারাম মাস হচ্ছে মহররম, রজব জিলকদ ও জিলহজ। আবু বকর রা: হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন
(إن الزمان قد استدار كهيئته يوم خلق السما وات والأرض السنة اثنا عشر شهرا منها أربعة حرم ثلاث منواليات ذوالقعدة وذو الحجة والمحرم ورجب مضر الذي بين جمادى وشعبان) رواه البخاري و مسلم
‘‘রাসূল সা. বলেন, জমানা কাল-চক্রাকারে ঘুরে আসমান-জমিন সৃষ্টির প্রথম দিনের অবস্থায় ফিরে এসেছে। বারো মাসে বৎসর, তার ভেতর চারটি সম্মানিত। তিনটি একসাথে জিলকদ, জিলহজ, মুহররম। অপরটি মুদার সম্প্রদায়ের পঞ্জিকা মতে জুমাদা ও শাবানের মধ্যবর্তী রজব।’’ (বুখারী-মুসলিম)
রজবকে হারাম নামে নামকরণের কারণ
কারণ, তাতে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিষিদ্ধ। তবে, শত্র“ প্রথমে আক্রমণ করলে প্রতিরোধ করা বৈধ। এ কারণেই তাকে বলা হত বোধির রজব তাতে হাঁক দেয়া হত না যোদ্ধাদের সমবেত হওয়ার জন্য কিংবা তাতে শোনা যেত না অস্ত্রের ঝনৎকার।
কিংবা তাকে হারাম বলা হয় এ কারণে যে, অন্যান্য মাসের নিষিদ্ধ কর্মের তুলনায় এ মাসের নিষিদ্ধ কর্ম অধিক দূষণীয়। রজব মাসকে রজব বলা হয়, কারণ তা সম্মানিত। الترحيب মানে সম্মান জ্ঞাপন করা। শব্দটি এখান থেকেই উদ্ভূত। (লাতাইফুল মাআরেফ ২২৫)
রজবে প্রবেশের দোয়া
আনাস (রা:) হতে বর্ণিত, রাসূল যখন রজব মাসে উপনীত হতেন, তখন এই দোয়া পাঠ করতেন,
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم إذا دخل رجب قال: أللهم بارك لنا في رجب وشعبان وبلغنا رمضان. وإسناده ضعيف
যখন রজ মাস এসে যেত তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, ‘হে আল্লাহ আপনি আমাদের রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করেন এবং রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দেন।’ ইবনে হাজার ও ইবনে রজব উক্ত হাদিসের সনদ দুর্বল বলে আখ্যায়িত করেছেন।

রজবের দশ তারিখে উপাস্যের উদ্দেশ্যে পশু জবাই
কোন কোন আলেম রজব মাসে পশু জবাই মোস্তাহাব বর্ণনা করেছেন,—প্রমাণ হিসেবে তারা উপস্থাপন করেন মাখনাফ বিন সালিম রা:-এর হাদীস । মাখনাফ বিন সালিম রা: বলেন, আমরা রাসূলের সাথে আরাফার মাঠে অবস্থান করছিলাম, আমি শুনলাম তিনি বলছেন প্রতিটি বাড়ির অধিকারীদের উপর প্রতি বছর কোরবানি ও রজব মাসের আতীরা কর্তব্য। তোমরা কি অবগত আতীরা কি ? তা হল যাকে তোমরা রজবিয়া বল (অর্থাৎ রজবে জবেহ করার পশু)। আহমদ ৫/৭৬। ইমাম তিরমিজি বলেন হাদীস টি ‘হাসান’ ও ‘গরিব’। আমরা হাদিসে ইবনে আউনের সূত্র ব্যতীত ভিন্ন কোন সূত্রে হাদীস টি পাই না। মুহাদ্দিস ইবনে হাযম ও আব্দুল হক একে দুর্বল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ইবনে কাসীর বলেন হাদীস টির সনদের ব্যাপারে নানা সংশয় রয়েছে।
অধিকাংশ বিজ্ঞজনের মত এই যে, হাদীস টি মনসূখ (রহিত)। আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল বলেছেনلا فرع و عتيرة অর্থাৎ ইসলামে ফারা’ আতীরার অস্তিত্ব নেই।’ (বুখারী ৪৭৪৫)
হাদীস টির ব্যাখ্যায় আবু দাউদ বলেন, কেউ কেউ বলেন ফারা’ বলা হয় উটের প্রথম ভূমিষ্ঠ বাচ্চাকে, প্রাচীন আমলে লোকেরা তাদের উপাস্য তাগুতের জন্য একে বলি দিত। অত:পর তার মাংস খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করত, চামড়া ঝুলিয়ে রাখত গাছের ডালে। আতীরা বলা হয় রজবের দশ তারিখে উপাস্যের উদ্দেশ্যে যে পশু বলি দেওয়া হয়, তা। (আস সুনান ৩/১০৪)
ইবনে সীরীন, আবু উবাইদ ও ইসহাক বিন রাহওয়াই প্রমুখ আলেমের মত এই যে, হাদীস টিকে মানসূখ (রহিত) হিসেবে গ্রহণ করাই ওয়াজিব বা আবশ্যক।

রজবে উমরা পালন
মুসলমানদের কোন কোন উপদল রজব মাসকে বিশেষভাবে উমরা পালনের মাস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। তাদের বিশ্বাস এর রয়েছে প্রভূত ফজিলত এবং পরকালীন পুরস্কার। প্রকৃত সত্য ও শুদ্ধ মত হল রজব অন্যান্য মাসের অবিকল, তার বিশেষত্ব নেই অন্য মাসের তুলনায়। তাতে উমরা পালনের বিশেষ কোন ফজিলত বর্ণনা করা হয় নি। উমরা পালনের ক্ষেত্রে সময় সংশ্লিষ্ট আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী রমজান মাস এবং হজে তামাত্তুর জন্য হজের মাসগুলো। এ মাসগুলোয় উমরা পালনের বিশেষ ফায়দা হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত ও প্রমাণিত। হাদিসের কোথাও এ স্বীকৃতি পাওয়া যায় না যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মাসে উমরা পালন করেছেন। তাছাড়া, বিষয়টিকে আয়েশা রা: সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছেন।

রজব মাসের বেদআত
রজব মাসে মানুষের আবিষ্কৃত এবাদতগুলো নিম্নরূপ :
প্রথমত: সালাতুর রাগায়েব। তা হচ্ছে প্রথম জুমায় বাদ মাগরিব সাতটি সালামের মাধ্যমে বার রাকাত সালাত আদায় করা। প্রতি রাকাতে সূরা ফাতেহা পাঠের পর সূরা কদর তিনবার পাঠ করবে এবং সূরা ইখলাস পাঠ করবে বার বার। সালাত হতে ফারেগ হবার পর সত্তুর বার দরুদ পাঠ করবে, এরপর দোয়া করবে ইচ্ছামত। সন্দেহ নেই এবাদতের এ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে বেদআত, বর্জনীয়। এ সম্পর্কিত হাদীস টি সন্দেহাতীতভাবে মাওজু। ইবনে জাওজি তার এক রচনায় ইমাম নববির বরাতে উল্লেখ করেন যে, আলেমগন এর মাধ্যমে সালাতের কারাহাত প্রমাণ করেছেন আল্লাহ তাআলা এর উদ্ভাবক ও উদ্পাদককে ধ্বংস করুন। এ নিশ্চয় বেদআত, সুতরাং, সর্বার্থে বর্জনীয়। তা নিশ্চয় পথভ্রষ্টতা, মূর্খতা তাতে পালন করা এমন কিছু, যা বর্জনীয়। আলেমদের একটি বৃহৎ শ্রেণি একে ভ্রান্ত প্রমাণ করে নানা গ্রন্থ সংকলন করেছেন, এ সালাত আদায়কারীকে পথভ্রষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন
খাত্তাবী রহ: বলেন, সালাতুর রাগায়েব সংক্রান্ত হাদীস টি মিথ্যার অপলাপ বৈ নয়। হাফেজ ইবনে রজব রহ: বলেন রজব মাসের সাথে বিশিষ্ট কোন সালাত নেই। সালাতুর রাগায়েবের ফজিলত সংক্রান্ত যাবতীয় হাদীস মিথ্যা, ভ্রান্তিপ্রসূত যা কোন ভাবেই শুদ্ধ হতে পারে না। অধিকাংশ আলেমের সক্রিয় রায় অনুসারে এ সালাত বেদআত। হিজরি চার শতকের পরে এ সালাতের অস্তিত্ব ইতিহাসে পাওয়া যায়, তাই আমরা দেখতে পাই, প্রথম যুগের আলেমগণ এ ব্যাপারে কিছুই উল্লেখ করেননি।
দ্বিতীয়ত: মধ্য রজবের সালাত। এ সংক্রান্ত যাবতীয় হাদীস মওজু।
তৃতীয়ত: মেরাজের রাত্রির সালাত। তা রজবের সাতাশ তারিখে আদায় করা হয়। একে বলা হয় লাইলাতুল মেরাজের সালাত। এ এমন বেদআতী সালাত, যার কোন শরয়ি ভিত্তি নেই। রজব মাসেই মেরাজ সংগঠিত হয়েছে এ দাবিরও কোন জোড়ালো ভিত্তি পাওয়া যায় না। আবু শামাহ রহ: বলেন, কিছু কিছু গল্পকার বলেছেন যে, রজব মাসেই মেরাজ সংগঠিত হয়েছে। সঠিক পথের অনুসারীদের কাছে এ নিশ্চিত বিভ্রান্তি, মিথ্যা-প্রসূত।
পক্ষান্তরে আবু ইসহাক উল্লেখ করেন যে, রবিউল আউয়ালের সাতাশ তারিখে রাসূলের মেরাজ সংগঠিত হয়। যারা এ হাদিসের মাধ্যমে দলিল প্রদান করে সালাত আদায় করেন যে, রাসূল বলেছেন রজব মাসে এমন এক রাত্রি রয়েছে, যে রাতের আমলকারিকে একশো বছরের পুণ্য প্রদান করা হয়। তা হচ্ছে রজবের সাতাশ তারিখ। হাফেজ ইবনে হাজার, ইমাম বায়হাকী প্রমুখ আলেম একে দুর্বল হাদীস হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
উক্ত রাত্রির আরো বেদআত এই যে, সম্মিলিত ভাবে উদযাপন, মূমূর্ষ ব্যক্তিদের জেয়ারত, খাদ্যোৎসব ইত্যাদি। শায়েখ আলী ক্বারী বলেন সন্দেহ নেই, এ খুবই মন্দ বেদআত, গর্হিত কর্ম, কারণ, তাতে অকারণে সম্পদের অপচয় করা হয়, পৌত্তলিকদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ আচরণ করা হয়।

রজবের রোজা
রজব মাসে রোজা পালনের ব্যাপারে স্বতন্ত্র কোন ফজিলত বর্ণনা করা হয় নি। বরং অন্যান্য মাসের মতই তাতে এবাদত করা হবে, রোজা রাখা হবে যেভাবে রাখা হয় অন্যান্য মাসে। পেশাদার ওয়ায়েজ ও গল্পকার ভণ্ড ধার্মিকরা এর ফজিলত বর্ণনা প্রসঙ্গে যে হাদীস বর্ণনা করেন রাসূল বলেছেন :
إن في رجب نهرا، يقال له رجب، ماؤه أشد بياضاً من الثلج وأحلى من العسل، من صام يوما من رجب شرب منه.
রজবে রয়েছে একটি নহর, যার পানি বরফের তুলনায় সফেদ-শুভ্র, মধুর তুলনায় মিষ্ট, রজব মাসে যে একটি রোজা রাখবে, সে তা হতে পান করবে। উক্ত হাদীস টি সর্বৈবে বাতিল অগ্রহণযোগ্য
অন্য হাদীস , যা বর্ণিত হয়েছে এভাবে :
رجب شهر عظيم يضاعف الله فيه الحسنات، فمن صام يوما من رجب فكأنما صام سنة، ومن صام منه سبعة أيام غلقت عنه سبعة أبواب جهنم، ومن صام منه خمسة عشر يوما نادى مناد في السماء قد غفر لك ما مضى، فاستأنف العمل و من زاد زاده الله.
অর্থ : রজব এক মহৎ ও মহান মাস। আল্লাহ তাতে পুণ্য দ্বিগুণ করে দেন। যে রজবের এক দিন রোজা রাখবে সে যেন পুরো বছরই রোজা পালন করল। আর যে সাত দিন রোজা রাখবে তার জন্য জাহান্নামের সাতটি দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। আর ব্যক্তি পনেরো দিন রোজা পালন করবে, আকাশের একজন ঘোষক তাকে ডেকে বলবে : তোমার ইতিপূর্বের সমস্ত পাপ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে, সুতরাং নতুনরূপে আমলের সূচনা কর। আর যে এরও অধিক করবে, আল্লাহ তাকে আরো অধিক পুরস্কারে ভূষিত করবেন। একে ইবনে হাজার আসকালানী বাতিল বলে সাব্যস্ত করেছেন।
আমি নিবন্ধটির সমাপ্তি করছি হাফেজ ইবনে কায়্যিম ও ইবনে হাজার রহ: মন্তব্য দ্বারা, ইবনে কায়্যিম বলেন : রজবের রোজা ও সালাতের ব্যাপারে যে হাদীস গুলো উল্লেখ করা হয়, তার সবই মিথ্যা, অগ্রহণযোগ্য, সুতরাং বর্জনীয়। পক্ষান্তরে ইবনে হাজারের মন্তব্য ছিল রজব মাসের ফজিলত, তাতে রোজা পালন, কিংবা নির্দিষ্ট কোন অংশে ও রাতে রোজা ও সালাত আদায় ইত্যাদি বিষয়ে প্রামাণ্য কোন শুদ্ধ হাদীস পাওয়া যায় না, যার মাধ্যমে বিষয়টি প্রামাণ্যতার মানদণ্ডে উন্নীত হবে। আমরা আল্লাহর তওফীক কামনা করি।