কুরআন সুন্নাহর আলোকে রাস্থা-ঘাটে চলা চলের বিধান

হযরত রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেন  তোমরা পথে-ঘাটে আসন গ্রহণ করা পরিত্যাগ কর। সাহাবীগণ বললেন  ইয়া রাসূলাল্লাহ! পথে-ঘাটে বসা আমাদের জন্য অপরিহার্য  হয়ে পড়ে। আমরা সেখানে বসি পারস্পরিক কথা-বার্তা বলি। তখন নবী করীম (স) বলেন তোমরা এই বসা হতে বিরত থাকা  যখন অস্বীকার করছ,তখন বস,তবে সেই সঙ্গে পথের অধিকার পুরাপুরি আদায় কর। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন। পথের অধিকার কি হে আল্লাহর রাসূল!  তিনি  বলেন  দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখা,পীড়ন বন্ধ করা,সালামের উত্তর দেওয়া এবং ভাল-ভাল কাজের আদেশ করা ও মন্দ-নিষিদ্ধ কাজ হতে  বিরত রাখা। (বুখারী,মুসলিম,)

ব্যাখ্যাঃ মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ও সমাষ্টিকতা ছাড়া মানুষের জীবন অচল। এই সামাজিক জীবন মানুষকে অন্যান্য মানুষের সহিত নানাবাবে সম্পর্ক রাখতে হয়। ইহা ছাড়া মানুষের উপায় নাই। মানুষের এই সামাজিক-সামষ্টিক জীবনে রাস্তা-ঘাটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। কেননা এই রাস্তা-ঘাটে জনগণের পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাৎ হয় । এই সাক্ষাৎই তাহাদের মধ্যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠে। সামাজিক মানুষের পরস্পরের কথা-বার্তা হয় পথে-ঘাটে। জোট বাঁধি  দাঁড়াই থাকা  তাহারা কথা-বার্তা বলে ও নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করে  থাকে। কিন্তু রাস্তা-ঘাটে ভিড় করা বা দাঁড়াই  থাকা অনেক সময় সমাজের  অন্যান্য মানুষের পক্ষে বিশেষ ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায় ।

পথে দাঁড়াইবার এই সব দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সাহাবীগণকে সতর্ক করে  তোলার উদ্দেশ্যে প্রথমে তিনি বলিলেনঃ

রাস্তা-ঘাটের কি অধিকার,তাহা জানতে চাহিলে রাসূলে করীম (স) পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের উল্লেখ করেন। এই পাচঁটি কাজ যথাক্রমেঃ (১) দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখা,(২) কষ্টদান বা পীড়ন উৎপীড়ন বন্ধ করা,(৩) সালামের  জওয়াব দেওয়া,(৪) ভাল ও সৎ পূণ্যময় কাজের আদেশ করা এবং (৫) অন্যায়,মন্দ ও পাপ কাজ হইতে নিষেধ করা।

রাসূলে করীম (স) এই যে পাঁচটি কাজের উল্লেখ করছেন পথ-ঘাটের অধিকার হিসাবে,মূলত ইহা ইসলামী সমাজ জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই কাজ গুলি না করিলে পথে-ঘাটে বসার অধিকার থাকে না যেমন,তেমন ইসলামী সমাজে বসবাস করাও অধিকার থাকতে  পারে না। পথে-ঘাটে বসার- অন্য কথায় সামাজিক জীবন যাপন করার তোমার যে অধিকার, তাহা যদি তুমি ভোগ করিতে চাও,তাহা হইলে তোমাকে পথ-ঘাট তথা সমাজের অধিকার আদায় করিতেও প্রস্তুত থাকতে  হইবে। ইহা তোমার কর্তব্য। তুমি তোমার অধিকার আদায় করিয়া নিবে,কিন্তু তোমার কর্তব্য তুমি পালন করবে  না,এটা কি করে সন্ভব নয়। ইসলামী জীবন-আদর্শ মানুষ ও পৃথিবকে পারস্পরিক অধিকার কর্তব্য রজ্জুতে শক্ত করিয়া বাঁধিয়া দিয়াছে। এই বন্ধনে একটা হইবে আর অন্যটা হইবে না,তাহা হইতে পারে না। কর্তব্য কয়টির ব্যাখ্যা করিলেই স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায় যে,ইসলামী সমাজের জন্য ইহার সবকয়টি একান্তই অপরিহার্য।

সর্বপ্রথম কর্তব্য হইল চক্ষু নিম্নমুখী রাখা। নিজ চরিত্র নিষ্কুলষ রাকার জন্য চক্ষু নিম্নমুখী রাখা জরুরী। কেননা পথে কেবল পুরুষ লোকই চলাফিরা করে না,মেয়ে লোকও চলা-ফিরা করে।পুরুষরা যদি পথে বসিয়া বা দাঁড়াইয়া থাকিয়া চলাচলকারী স্ত্রীলোকদের প্রতি চক্ষু উন্মীলিত করিয়া রাখে এবং রূপ সৌন্দর্য ও যৌবন দেখে চক্ষুকে ভারাক্রান্ত করে  থাকে,তবে উহার কুফল তাহার চরিত্রে অনিবার্যভাবে প্রতিফলিত হবে।পক্ষান্তরে মেয়ে লোকপথে চলতে গিয়ে যদি অনুভব করে যে,পুরুষদের চক্ষু তাহাদিগকে গিলিয়া ফেলতে ব্যস্ত,তবে তাহাদের মনে কুণ্টা ও সংকোচ আসতে পারে। রাসূলে করীম (স) এই কারণেই সর্বপ্রথম এ কথাটির উল্লেখ করছেন  ।

রাসূলে করীম (স)-এর এই আদেশটি স্পষ্ট ও সরাসরিভাবে কুরআন মজীদ হইতে গৃহীত। আল্লাহ তাআলা নিজেই রাসূলে করীম (স)কে সম্বোধন করিয়া ইরশাদ করেন।

﴿قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ * سورة النور30)

হে নবী! মুমিন লোকদের বলে দিন,তাহারা যেন নিজেদের দৃষ্টিকে নিম্নমুখী রাখে এবং তাহাদের লজ্জাস্থানের পবিত্রতা সংরক্ষণ করে। ইহাই তাদের জন্য পবিত্রতর কর্মপন্হা। লোকেরা যাহা কিছু করে সে বিষয়ে আল্লাহ পুরাপুরি অবহিত।(আন নূর৩০)

আয়াতটির আলোকেও বুঝা যায়,চক্ষু অবনত রাখা না হইলে লজ্জা স্থানের পাপ পংকিলতায় পড়ে  যাওয়া সুনিশ্চিত। আর চক্ষু অবনত রাখা হলে উহার সংরক্ষণ অতীব সহজ ও সম্ভব। চরিত্রকে পবিত্র রাখার ইহাই সর্বোত্তম পন্হা। যাহারা নিজেদের দৃষ্টি পরস্ত্রীর উপর অকুণ্ঠভাবে নিবন্ধ করে,তাহারা প্রথমে নিজেদের মন-মগজকে কলুষিত করে এবং পরিণতিতে নিপতিত হয় কঠিন পাপের পংকিল আবর্তে। ইহাই স্বাভাবিক।

এই কারণে সর্বপ্রকার হারাম নিজিস হইতে দৃষ্টি নিচু ও অবনত রাখতে  হবে। এই আদেশ উপরোক্ত কেবলমাত্র পুরুষদের জন্যই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই আদেশ স্ত্রী লোকদের জন্যও। ইহারই পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে

﴿وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنّ .سورة النور31)

আর হে নবী! মুমিন মহিলাদের বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানগুলোর হেফাজত করে  (আন নূর৩০) অতএব পুরুষদের জন্য যেমন ভিন মেয়ে লোক দেখা হারাম,তেমনি স্ত্রীলোকদের জন্যও ভিন পুরষ দেখা হারাম। এই পর্যায়ে রাসূলে করীমের একটি কথা উদ্ধৃত করা আবশ্যক। তিনি বলেন- আত্মসম্মান চেতনা ঈমানের লক্ষণ এবং নারী পুরষের একত্রিত হওয়া মুনাফিকির কাজ।অর্থঃ নারী পুরুষের একত্রে সমাবেশ,নিবিড় নিভৃত একাকীত্বে ভিন নারী পুরুষের একত্রিত হওয়া। ইহা সর্বোতভাবে চরিত্র ধ্বংসকারী অবস্থা।

দ্বিতীয় হইল কষ্টদান বা পীড়ন উৎপীড়ন বন্ধ করা,ইহা হতে বিরত থাকা। ইহার অর্থ পথে চলমান মানুষের সর্বাত্মক নিরাপত্তা বিধান। তুমি পথে বসিয়া বা দাঁড়াই  লোকদিগকে কোনরূপ কষ্ট দিতে পারবে না। কাহাকেও কোন পীড়াদায়ক কথা বলতে পারবে না । এমন কাজও কিছু করতে  পারবে না,যাহাতে মানুষের কষ্ট হয়।

তৃতীয় সালামের জওয়াব দান। অর্থাৎ তুমি পথে বসিয়া বা দাঁড়াই  থাকিলে চলমান মুসলমান তোমাকে সালাম দিবে। তোমার কর্তব্য হইল সেই সালামের জওয়াব দান। এই সালাম দেওয়া ও উহার জওয়াব দেওয়া ইসলামী সমাজ ও সভ্যতা সংস্কৃতির একটা অত্যন্ত জরুরী অংশ। মুসলমান মুলমানকে দেখলে বলবে:  আস-সালামু আলাইকুম। আর ইহার জওয়াবে মুসলমান বলবে : অ-আলাইকুমুস সালাম। ইহা ইসলামের চিরন্তন রীতি। সালাম বিনিময় মুসলমানদের একটা সামাজিক কর্তব্য-ও।

চতুর্থ,আমরু বিল মারূফ-ন্যায়,ভাল ও সৎ কাজের আদেশ করা। মারূফ একটি ইসলামী পরিভাষা। কুরআন মজীদে ইহার ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। আল্লামা আইনী ইহার অর্থ   লিখেছেনঃ মারূফ বলিতে এটা ব্যাপকজিনিস বুঝায়। যাহাই আল্লাহর আনুগত্যের কাজ,যাহাতেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয় এবং জনগণের কল্যাণ সাধিত হয়। আর শরীয়াত যে সব নেক ও কল্যাণময় কাজের প্রচলন করেছে,তাহা সবই ইহার অন্তর্ভুক্ত।

পঞ্চম,মুনকার হতে বিরত রাখা। মারূফ-এর বিপরীত যাহা তাহাই মুনকার। সব রকমের খারাপ,কুৎসিত,জঘন্য, হারাম ও ঘৃণ্য অপছন্দনীয়,তাহা সবই মুনকার-এর মধ্যে শামিল। আবু দায়ূদের বর্ণনায় ইহার সহিত একটি অতিরিক্ত কথা উদ্ধৃত হয়েছে। তাহা হইলঃ পথ দেখাই দেওয়া বা পথের সন্ধান দেওয়া এবং হাচিঁদাতা যদি আল-হামদুলিল্লাহ, বলা।

এই দুইটিও পথের অধিকার ও পথের প্রতি কর্তব্য বলিয়া উল্লেখ করা  হয়েছে। অপর একটি বর্ণনায় এই সঙ্গে আরও একটি কথা উদ্ধৃত হয়েছে। তাহা হইলঃ উত্তম কথা বলা। অর্থাৎ পথে-ঘাটে লোকদের পারস্পরের দেখা সাক্ষাৎ হলে কথা-বার্তা অবশ্যই হইবে। এ কথা-বার্তা খুবই-ই উত্তম এবং ভাল হওয়া বাঞ্ছনীয়। কোনরূপ কটু বা অশ্লীল কথা বলা কিছুতেই উচিৎ হতে পারে না।

তিরমিযী শরীফে এই পর্যায়ে যে হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে তাহার ভাষা এইরূপঃ রাসূলে করীম (স) আনছার গোত্রের কতিপয় লোকের নিকট উপস্থিত হলেন। এই লোকেরা পথের উপরে বসা ছিল। তাহাদেরকে দেখিয়া তিনি বললেনঃ তোমরা যদি এই কাজ একান্ত কর-ই এবং এই কাজ না করিয়া তোমাদের কোন উপায় না-ই থাকে,তাহা হলে তোমরা মুসলমানদের সালামের জওয়াব অবশ্যই দিবে। নিপীড়িত অত্যাচারিত লোকদের সাহায্য সহযোগিতায় সক্রিয়ভাবে আগাইয়া-আসবে এবং পথহারা অন্ধ ও পথভ্রান্ত লোকদেরকে অবশ্যই পথ দেখাবে।

মূল কথা হইল,পথের উপর বসা যথার্থ কাজ নয়। কেননা পথ হইল লোকদের চলাচল ও যাতায়াতের স্থান। এই স্থান জুড়ে  লোকেরা বসে থাকলে পথের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহতহয়ে পড়ে। আর তাহাতে সামাজিক সামষ্টিক কাজ বিঘ্নিত হয়। এই কাজ সাধারণত করাই উচিৎ নয়। আর অবস্থা যদি এই হয় যে,এই কাজ তোমাদের না করিলে  নয়,তাহা হইলে এই কারণে তোমাদের উপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয়,তাহা পালন করতে তোমরা প্রস্তুত থাকতে হবে। এক কথায় হয় পথে আদৌ বসিবেই না। না হয়-অর্থাৎ পথে বসিলে এই দায়িত্ব পালন করতে  হবে।

উল্লেখিত তিরমিযীর হাদীসিটতে মাত্র তিনটি দায়িত্বের কথা উল্লেখ হয়েছে। এই পর্যায়ের হাদীস সমূহের আরও বহু কয়টি দায়িত্ব ও কর্তব্যের উল্লেখ হয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এই পর্যায়ে বর্ণিত হাদীস সমূহ হতে মাত্র সাতটি কর্তব্যের কথা প্রকাশ করিয়াছেন। ইবনে হাজার আল-আসকালানীর মতে এই দায়িত্ব ও কর্তব্য হইল মোট চৌদ্দটি। একত্রে সে চৌদ্দটি কর্তব্য এই=

সালাম বিস্তার করা,ভাল ভাল কথা বলা,সালামের জওয়াব দেওয়া,হাঁচিদাতা আলহামদুলিল্লাহ বল্লে ইয়ার হামুকাল্লাহ বলা,বোঝা বহনে লোকদের সাহায্য করা,মজলূমের উপর জুলুম বন্ধ করানো,আর্তনাদকারীর ফরিয়াদ শোনা,লোকদের সুপথ সঠিক পথ দেখানো,পথভ্রষ্টকে পথ চিনাই  দেওয়া,ভাল ভাল ও উত্তম কাজের আদেশ করা,খারাপ বা পাপ কাজ হইতে লোকদিগকে বিরত রাখা ,কষ্টদায়ক জিনিস পথ হ তে দূর করা,চক্ষু নিম্নমুখী রাখা এবং বেশী বেশী করিয়া আল্লাহর যিকির করা।

ইমাম নববী লিখিয়াছেনঃ পথে ঘাটে বসে  ও জট পাকাই  দাঁড়াই থাকতে  নবী করীম (স) নিষেধ করেছেন।সেই সঙ্গে তিনি এই নিষেধের কারণও বলে দিয়েছেন।সে কারণ হইলঃ ইহাতে নানা দুর্ঘটনা ঘটিতে পারে। স্ত্রীলোকদের চলাফিরায় অসুবিধা হইতে পারে। অনেক সময় এই পুরুষরা চলমান স্ত্রীলোকদের প্রতি তাকাইয়া থাকে,তাহাদের সম্পর্কে বদচিন্তা ও আলাপ-আলোচনায় মশগুল হয়,তাহাদের সম্পর্কে খারাপ ধারণা বা উক্তি করা। ইহাতে সাধারণ লোকদের অনেক অসুবিধাও হতে পারে। ইহা ছাড়া চলমান লোকদের প্রতি সালাম জানানো কিংবা ভাল কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ করার দায়িত্বও ইহারা পালন করে না। আর এই গুলিই হইল এই নিষেধের প্রকৃত কারণ।সমাপ্ত =

(২) তাহাজ্জুদ নামাজ মুমিনের অন্তরের প্রশান্তি

আরবি তাহাজ্জুদ ,শব্দের আভিধানিক অর্থ রাত জাগরণ বা নিদ্রা ত্যাগ করে রাতে নামাজ পড়া। শরিয়তের পরিভাষায় রাত দ্বিপ্রহরের পর ঘুম থেকে জেগে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে নামাজ আদায় করা হয় তা-ই তাহাজ্জুদ নামাজ।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার আগে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর তাহাজ্জুদ নামাজ বাধ্যতামূলক ছিল। তাই তিনি জীবনে কখনো তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া থেকে বিরত হননি। তবে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য এটা সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা অর্থাৎ এ নামাজ আদায় করলে অশেষ পুণ্য লাভ করা যায়,কিন্তু আদায় করতে না পারলে কোনো গুনাহ হবে না।

আর রাতের তাহাজ্জুদ নামাজ হলো আম্বিয়া আলাইহিস সালামদের সুন্নাত, তাহাজ্জুদ নামাজ  মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার গভীর সম্পর্ক স্থাপন তথা নৈকট্য ও সন্তোষ অর্জনের অন্যতম পন্থা। তাহাজ্জুদের ফজিলত প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,

﴿وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ عَسَىٰ أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا﴾

আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ নামাজ কায়েম করুন;এটা আপনার জন্য এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন মাকামে মাহমুদে । (সূরা বনি ইসরাইল : ৭৯)। তিনি আরও বলেন,

*تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ*

তারা শয্যা ত্যাগ করে আকাঙ্ক্ষা ও আশঙ্কার সঙ্গে তাদের প্রতিপালককে ডাকে এবং আমি তাদের যে রুজি প্রদান করেছি,তা থেকে তারা দান করে। (সূরা সিজদা : ১৬)। তাহাজ্জুদ নামাজ নফসের রিয়াজাত ও তারবিয়াতের এক বিশেষ মাধ্যম। কারণ প্রভুর প্রেমে গভীর রাতে সুখশয্যা ত্যাগ করেই আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হতে হয়। এ নামাজ মন ও চরিত্রকে নির্মল ও পবিত্র করা এবং সত্য পথে অবিচল রাখার জন্য অপরিহার্য ও অতীব কার্যকর পন্থা। পবিত্র কোরআনের -*إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا* সূরা মুজ্জাম্মিলে এর উল্লেখ করা হয়েছে

 

,নিশ্চয়ই রাতে ঘুম থেকে ওঠা মনকে দমিত করার জন্য খুব বেশি কার্যকর এবং সে সময়ের কোরআন পাঠ বা জিকির একেবারে যথার্থ। (সূরা মুজাম্মিল : ৬। ) অন্যত্র বলা হয়েছে,

*وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا*

আর আল্লাহর প্রিয় বান্দা তারা,যারা তাদের রবের দরবারে সিজদা করে এবং দাঁড়িয়ে থেকেই রাত কাটিয়ে দেয়। (সূরা ফুরকান : ৬৪)। ইসলামের প্রাথমিক যুগে কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ী হওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল যে তারা রাতের শেষ ভাগে আল্লাহ দরবারে চোখের পানি ফেলতেন আর ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। যেমন কোরআনে বলা হয়েছে,

* الصَّابِرِينَ وَالصَّادِقِينَ وَالْقَانِتِينَ وَالْمُنفِقِينَ وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالْأَسْحَارِ*

তারা ছিল কঠিন পরীক্ষায় পরম ধৈর্যশীল,অটল-অবিচল,সত্যের অনুসারী,পরম অনুগত। আল্লাহর পথে ধন-সম্পদ উৎসর্গকারী এবং রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। (সূরা আলে ইমরান : ১৭)। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসেও তাহাজ্জুদ নামাজের গুরুত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে।,আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি

أَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ- رواه مسلم

অর্থাৎ ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজ।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য এক হাদিসে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন

عن أبي هريرة رضي الله عنه ، أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: ” ينزل رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ : مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ”أخرجه البخاري في صحيحه (1145) ومسلم (1261 (

,আল্লাহতায়ালা প্রতি রাতেই নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হন যখন রাতের শেষ তৃতীয় ভাগ অবশিষ্ট থাকে। তিনি তখন বলতে থাকেন কে আছো যে আমায় ডাকবে,আর আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছো যে আমার কাছে কিছু চাইবে, আর আমি তাকে তা দান করব?কে আছো যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করব?(বুখারি ও মুসলিম)। শরহে সুন্নাহর বরাত দিয়ে মিশকাতুল মাসাবিহ গ্রন্থকার বর্ণনা করেন,হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত,রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,তিন ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ খুশি হন।

এক. যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদের জন্য ওঠে এবং নামাজ পড়ে। দুই. মুসল্লি যারা নামাজের জন্য সারিবদ্ধভাবে কাতারে দাঁড়ায়। তিন. মুজাহিদ যারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়। অনুরূপ আরেকটি হাদিস রয়েছে,হজরত জাবির (রা.) বলেন,আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি। রাতের মধ্যে এমন একটি মুহূর্ত আছে যদি কোনো মুসলমান তা লাভ করে এবং আল্লাহর কাছে ইহ ও পরকালের কোনো কল্যাণ চায় আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে তা দেন। (মুসলিম)। আসুন,আমরা তাহাজ্জুদ  নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার অধিক থেকে অধিকতর নৈকট্য লাভ  করি,

সমাপ্ত =

নিজ কু-প্রবৃত্তিকে দমনের সর্বোত্তম মাস হলো রমজান

ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভে ফরজ ইবাদত হলো সিয়াম পালন করা। মহান আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসে সিয়াম পালনকে আমাদের উপর ফরজ করে দিয়েছেন এই জন্য যে,এই মাসে অবতীর্ণ হয়েছে পবিত্র আল-কুরআন যা বিশ্ববাসীর জন্য হেদায়াত এবং নিদর্শন ও সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী বিধান হিসাবে।

প্রথমত সিয়াম সাধনায় আল্লাহর নির্দেশ পালন করা হয়। দ্বিতীয়,রোজা দ্বারা সংযমী হওয়া যায়। তৃতীয়,রোজা দ্বারা অতীতের গুনাহসমূহ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। মুলত  আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের সর্বোত্তম পন্থা হলো সিয়াম সাধনা। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

হে মুমিনগণ,তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে,যেভাবে ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।  সূরা বাকারা : ১৮৩

এই আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে,সিয়াম সাধনার দ্বারা তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জিত হয়।

এই পবিত্র মাসকে পূর্ণভাবে আল্লাহর রহমত,বরকত ও নাজাত প্রাপ্তির জন্য আমাদের কিছু করণীয় আছে এবং সেই সাথে কিছু বর্জনীয় কার্যাবলী রয়েছে যা পরিত্যাগ করার মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারবো। শুধুমাত্র পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে দিনের বেলায় বিরত থাকাই সিয়াম সাধনার মূল উদ্দেশ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে রমজান মাসে সার্বক্ষণিক নিজের কু-প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে প্রকৃত তাকওয়া অর্জন করা সম্ভব। আমাদের ভুলে গেলে হবে না যে,সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়টুকু রোজার অন্তুর্ভূক্ত নয়;বরং দিন ও রাত্রি উভয় সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে সিয়াম সাধনার প্রকৃত আত্মতৃপ্তি লাভ করা সম্ভব।

সিয়াম সাধানার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি হালাল খাদ্য ও পানীয়কে আল্লাহর নির্দেশের কারণে বর্জন করে নিজ কু প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন করে। সুতরাং নিজ কু-প্রবৃত্তিকে দমন ও আত্মশুদ্ধির জন্যে যে আমল গুলি করতে হবে তা ধারাবাহিক বর্ণনা করা হলো –

১ – আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রহমত লাভের উদ্দেশ্যে সিয়াম সাধনা করা:

عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال إذا جاء رمضان فتحت أبواب الجنة وغلقت أبواب الناروسلسلت الشياطين (بخارى ومسلم)

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন,আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন,যখন রমজান মাস আসে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। অপর বর্ণনায় রয়েছে বেহেশতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়,দোযখের দরজাসমূহ বন্ধ করা হয় এবং শয়তানকে শৃংখলিত করা হয়।অপর বর্ণনায় আছে,রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়।)বুখারীও মুসলিম(

রমজান মাসে যেহেতু বেহেশতের ও রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় সেহেতু রোজা রেখে আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাঁর রহমতের আশা করব।

২- মুখ ও জিহ্বাকে সংযত রাখা

পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি নিজের মুখ ও জিহ্বাকে সংযত রাখতে হবে। মিথ্যা,অশ্লীল কথাবাতা,গালিগালাজ,গীবত,পরনিন্দা,অভিশাপ দেয়া ও চোগলখোরীসহ অন্যান্য অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। হাদিসে এসেছে-আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত,নবী করীম সা. বলেছেন,যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যা কর্ম পরিত্যাগ করেনি,তার পানাহার ছেড়ে দেয়াতে আল্লাহর কোন কাজ নেয়।(মিশকাত : ১০৮৯,বুখারী

৩- নিয়মিত তারাবীহর নামাজ আদায় করা

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তারাবীহ পড়তে হবে। কেননা,যে ব্যক্তি রমজানে তারাবীহ নামাজ পড়বে তার অতীতের সগীরা গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। হাদিসে এসেছে-

কিন্তু তিনি এ বিষয়ে খুব তাকীদ করতেন না। বরং এরূপ বলতেন,যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের নিয়তে রমজান মাসে নামায কায়েম করবে তার পূর্ববর্তী (সগীরা) গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হবে। (মুসলিম)

৪- কুরআন তিলাওয়াত করা :

নফল ইবাদতের মধ্যে সর্বোত্তম ইবাদত হলো কুরআন তিলাওয়াত করা। যেমন হযরত নুমান বিন বাশির রা. হতে বর্ণিত নবী করীম সা. ইরশাদ করেনআমার উম্মতের সবচেয়ে উত্তম ইবাদত কুরআন তিলাওয়াত করা।  (বায়হাকী,শুআবুল ঈমান :হা. ১৮৬৯),অন্য হাদিসে এসেছে,যে ব্যক্তি রমজান মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে একটি নফল কাজ করবে সে ঐ ব্যক্তির সমান হলো যে,অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করল।  (মিশকাত :১৮৬৮) সুতরাং রমজান মাসে কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে আমরা অধিকতর সওয়াবের অধিকারী হবো।

৫- বেশি করে দান-সদকাহ করা– মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন-

مَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِّئَةُ حَبَّةٍ وَاللّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاء وَاللّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ (سورة البقرة 261)

যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে,তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো,যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। প্রত্যেকটি শীষে একশ করে দানা থাকে। আর আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন (সওয়াবে) কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ অতি প্রাচুর্যময় (এবং) সর্বজ্ঞ।  )সূরা বাকারাহ : ২৬১(

৬- নিজে ইফতার করার পাশাপাশি রোজাদারদের ইফতার করানো- হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

হযরত যায়েদ বিন খালেদ জুহানী রা. হতে বর্ণিত,রাসূল সা. বলেছেন,যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করালো তাকে রোজাদারের অনুরূপ সওয়াব দান করা হবে। কিন্তু রোজাদারের সওয়াবের কোন কমতি হবে না।  (তিরমিযী : ৮০৭)

৭-  মিসওয়াক করা : হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে,

আব্দুল্লাহ বিন রবিআ রা. তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন,তিনি বলেন,আমি নবী করীম সা. কে রোজা অবস্থায় অসংখ্যবার মিসওয়াক করতে দেখেছি। (তিরমিযী: হা.৭২৫)

৮- শীঘ্রই ইফতারী করা

হাদিস শরীফে এসেছে –হযরত সাহল ইবনে সা’দ রা. বলেন,আল্লাহ রাসূল সা. বলেছেন,মানুষ কল্যানের সাথে থাকবে যতকাল তারা শীঘ্রই ইফতার করবে। (বুখারী ও মুসলিম )

অন্য হাদিসে আছে,হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত রাসূল সা. বলেছেন,আল্লাহ তা’আলা বলেন,আমার বান্দাদের মধ্যে আমার কাছে তারাই বেশি প্রিয় যারা শীঘ্রই ইফতারী করে। (তিরমিযী, মিশকাত : ১৮৯৬)

৯- ইফতারের পূর্বে ও ইফতারের সময় দোয়া করা

হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা. যখন ইফতার করতেন নিম্নের দোয়াটি পড়তেন :

عَنْ أَنَسٍ ، قَالَ : كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ ” إِذَا أَفْطَرَ , يَقُولُ : اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ ، وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ ، فَتَقَبَّلْ مِنِّي إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমার রিজিক দিয়ে ইফতার করছি। তুমি আমার এই রোজাকে কবুল কর। নিশ্চয় তুমি সর্বজ্ঞ,সর্বশ্রোতা।  তাবারানী : ৮৪৫

১০- বেশি করে ইসতেগফার ও দোয়া করা

এই রমজান মাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত্রি হলো লাইলাতুল কদর। হাদিস মোতাবেক রমজানের শেষের দশদিন বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করার কথা বলা হয়েছে। এই জন্য যে মহান আল্লাহ দেখতে চান লাইলাতুল কদরের বরকত ও ফজিলত লাভের উদ্দেশ্যে তার কোন বান্দা বেশি ইবাদত করে।

রাসূল সা. এই শেষ দশকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন তা নিম্নোক্ত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন আমি রাসূল সা. কে লাইলাতুল কদরের কথা জিজ্ঞাসা করলাম, আজ কি দোয়া পাঠ করব? তিনি বললেন নিম্নের দোয়াটি পাঠ করবে       : اللهم انك عفو تحب عفو فا عف عنى

হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল। তুমি ক্ষমাশীলতাকে ভালবাস। অতএব আমাকে ক্ষমা করো। (তিরমিযী : হা. ৩৫১৩, মুসনাদে আহমদ : ১/১৭১

১১- খেজুর অথবা পানি দিয়ে ইফতার করা

হযরত সালমান আমের রা. বলেন,রাসূল সা. বলেছেন,যখন তোমাদের কেউ ইফতার করে সে যেন খেজুর দ্বারা ইফতার করে,কেননা এতে বরকত রয়েছে। যদি খেজুর না পায়,তবে যেন পানি দ্বারা ইফতার করে,এটি পবিত্রকারী।(আহমদ,তিরমিযী,আবু দাউদ,ইবনে মাজাহ,দারেমী)

১২- সেহরী খেয়ে রোজা রাখা

সেহেরী খাওয়া সুন্নত। সেহেরী খেয়ে রোজা রাখার মধ্যে বরকত নিহিত রয়েছে। হাদিস শরীফে এসেছে-

আনাস বিন মালেক রা. হতে বর্ণিত,রাসূল সা. বলেছেন- তোমরা সেহেরী খাবে। কেননা সেহরীতে বরকত রয়েছে।(বুখারী, মুসলিম)

১৩ – মসজিদে এতেকাফ করা

রমজানের শেষের দশদিনে এতেকাফ করা সুন্নত। পুরুষরা মসজিদে এবং স্ত্রীলোকেরা আপন ঘরে একটি স্থান ঘিরে নিয়ে তথায় এতেকাফ করবে। হাদিসে এসেছে-

হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত যে,নবী করীম সা. রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করতেন,যাবৎ না আল্লাহ তাকে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং তাঁর পর তাঁর স্ত্রীগণও এতেকাফ করেছেন। (বুখারী ও মুসলিম)

১৪- বেশি বেশি করে নফল নামাজ আদায় করা

হাদিস মোতাবেক রমজান মাসে একটি নফল ইবাদত করলে একটি ফরজ ইবাদতের সমান মর্যাদা পাওয়া যায়। হাদিসে এসেছে,হযরত আলী রা. বলেন,আমাকে হযরত আবু বকর রা. বলেছেন আর তিনি সত্য বলেছেন তিনি বলেছেন আমি রাসূল সা.কে বলতে শুনেছি যে,কোন ব্যক্তি গুনাহ করবে অতঃপর ওঠে আবশ্যকীয় পবিত্রতা লাভ করবে এবং নফল নামাজ পড়বে; তৎপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। (তিরমিযী,ইবনে মাজাহ)

১৫- বেশি করে আল্লাহর জিকির  ও তাসবীহ-তাহলীল করা

রমজান মাসে বেশি করে তাসবীহ পাঠ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্ঠা করতে হবে। মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন ,

وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُواْ فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُواْ أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُواْ اللّهَ فَاسْتَغْفَرُواْ لِذُنُوبِهِمْ وَمَن يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلاَّ اللّهُ وَلَمْ يُصِرُّواْ عَلَى مَا فَعَلُواْ وَهُمْ يَعْلَمُونَ.

আর যারা কোন অশ্লীল কাজ করে অথবা নিজেদের প্রতি যুলুম করে আল্লাহকে স্মরণ করে,অতঃপর তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ ক্ষমা করবে ?আর তারা যা করেছে,জেনে শুনে তা তারা বার বার করে না। (সূরা আল-ইমরান : ১৩৫)

১৬- রমজান মাসে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করা

রমজান মাসের শেষের দশদিনের বেজোড় রাত্রিতে লাইলাতুল কদরের জন্য বেশি করে আল্লাহর ইবাদত করতে হবে এবং সারা বিশ্ববাসীর শান্তি, ক্ষমা ও স্থিতিশীলতার জন্য দোয়া করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,

لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ  – লাইলাতুল কদর এক হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।  (সূরা কদর : ৩)

১৭-রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা :

রমজান মাসে এমন কিছু করা যাবে না যা শরীয়তপরিপন্থী। যেমন রোজাদারহীন ব্যক্তি রোজাদারদের সামনে পানাহার করা। সেই সাথে অশ্লীল ও অনৈতিক কার্যাবলী থেকে বিরত থাকতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন-

وَلاَ تَقْرَبُواْ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ

আর অশ্লীল কাজের নিকটবর্তী হবে নাতা থেকে যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে।( সূরা আন-আম : ১৫১)

পরিশেষে বলতে চাই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত ও সৎকর্মের মাধ্যমে এই রমজানের ফজিলত আমরা পূর্ণভাবে অর্জন করতে পারি। মহান আল্লাহ এই রমজান মাসে আমাদের উপর রহমত,রবকত ও মাগফেরাত প্রদান করুন এবং আমাদের জাহান্নাম থেকে নাজাত প্রদান করুন। আমিন।

 

মু্ত্তাকী পরিচয়

একজন মুসলিমের জীবনমানের অপরিহার্য ও অনিবার্য গুণ হল তাকওয়া। এর অর্থ বেঁচে থাকা,সাবধানতা অবলম্বন করা ও ভয় করা। সাধারণত নফস মানুষকে অন্যায়,অশ্লীল,খারাপ ও অনিষ্টিকর কথা,কাজ ও চিন্তা থেকে বিরত রাখে মুলত সেটাই হচ্ছে তাকওয়া। আর এ তাকওয়াই সমাজে মানবতাবোধ,নীতিবোধ ও মূল্যবোধ নামে পরিচিত। উঁচু-নিচু,ধনী-গরীব,সাদা-কালো যে কোন মুসলিম নারী পুরুষ তাকওয়া অবলম্বন করে তার  ব্যক্তিগত,পারিবারিক,সামাজিক, ,রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক,তথা সামগ্রিক জীবন পরিচালনা করেন,তিনি ইসলামের দৃষ্টিতে মু্ত্তাকী নামে পরিচিত। মানুষের জীবনে সাফল্য অর্জনে তাকওয়ার প্রভাব অপরিসীম। বিশেষ করে সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনয়নে তাকওয়া তথা আল্লাহ ভীতির কোন বিকল্প হয় না।

তাকওয়া পরিচিতি=

তাকওয়া শব্দটি ইসলামের একটি মৌলিক পরিভাষা। এর আভিধানিক অর্থ হল-ভালভাবে বেঁচে থাকা পরহেয করা,রক্ষা করা,দূরে থাকা, বিরত থাকা ও সাবধান থাকা। যিনি তাকওয়া অবলম্বন করেন,তাকে বলা হয় মুত্তাকী।

আভিধানিকভাবে তাকওয়া শব্দের আর এক অর্থ হল- ভয়,সতর্কতা ও জবাবদিহিতা। আল্লাহর যাবতীয় নির্দেশসমূহ প্রতিপালন ও সকল নিষেধাধ্জ্ঞা থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে আল্লাহকে ভয় করা(আল-মুজাম আল ওয়াসীত,দেওবন্দ, কুতুবখানা হুসাইনিয়াহ)

এই দ্বিতীয় অর্থে পবিত্র কুরআনের অনেক আয়াতে তাকওয়া শব্দের ব্যবহার রয়েছে।আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ -হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর।( সুরা হজ্জ ০১।

নূহ (আ) নিজ জাতিকে বলেছিলেন,إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ نُوحٌ أَلَا تَتَّقُونَ﴾ স্মরণ কর যখন তাদের ভাই নূহ তাদেরকে বলেছিল,”তোমরা কি ভয় কর না? আশ-শুআরা ১০৬

হূদ (আ),নিজ জাতিকে বলেছিলেন,﴿إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ هُودٌ أَلَا تَتَّقُونَ﴾স্মরণ করো যখন তাদের ভাই হুদ তাদেরকে বলেছিলো, তোমরা ভয় করছো না ?(আশ-শুআরা১২৪)

সালেহ (আ),নিজ জাতিকে বলেছিলেন, ﴿إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ صَالِحٌ أَلَا تَتَّقُونَ﴾স্মরণ করো যখন তাদের ভাই সালেহ তাদেরকে বললোঃ তোমরা কি ভয় করো না?(আশ-শুআরা১৪২)

লুত (আ) নিজ জাতিকে বলেছিলেন, ﴿إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ لُوطٌ أَلَا تَتَّقُونَ স্মরন করো যখন তাদের ভাই লূত তাদেরকে বলেছিল,তোমরা কি ভয় করো না?(আশ-শুআরা১৬১)

এবং শুআইব (আ) নিজ নিজ জাতিকে বলেছিলেন,  ﴿إِذْ قَالَ لَهُمْ شُعَيْبٌ أَلَا تَتَّقُونَ﴾যখন শোআইব তাদেরকে বলেছিল,তোমরা কি ভয় করো না? (আশ-শুআরা১৭৭

সুতরাং দেখা যাচ্ছে,তাকওয়া শব্দটি আভিধানিক ভাবে দুটি অর্থ ধারণ করে। এক,আত্মরক্ষা,বেঁচে থাকা,বিরত থাকা, মুক্ত থাকা,রক্ষা করা ও পরহেয করা।দুই,ভয়-ভীতি তথা কোন প্রকার অনিষ্ট ও ক্ষতিকর বিষয় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চিন্তা মিশ্রিত ভয়  ।

ইসলামী শরীআতের পরিভাষায় তাকওয়া অর্থ হল,আল্লাহ্‌ তাআলার ভয়ে নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ হতে দূরে থেকে ইসলাম নির্ধারিত পথে চলার আপ্রাণ চেষ্টা করা। অথবা,যে কাজ করার কারণে মানুষকে আল্লাহ্‌র শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে,তা থেকে নিজেকে রক্ষা করা হচ্ছে তাকওয়া। আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে প্রাপ্ত করুণা,ভালবাসা,দয়া ও অনুগ্রহ হারানোর ভয় অন্তরে সদা জাগ্রত থাকার নাম তাকওয়া (সম্পাদনা পরিষদ,ইসলমী বিশ্বকোষ,ঢাকা,ইফাবা,১৯৯২,১২শ খণ্ড,পৃ. ১০৭।) ।

মুত্তাকীর পারিভাষিক সংজ্ঞায় কাযী নাসিরুদ্দীন বায়যাবী (র) বলেন,

শরীয়তের পরিভাষায় মুত্তাকী বলা হয় ঐ ব্যক্তিকে যিনি নিজেকে এমন সব কিছু থেকে রক্ষা করেন,বাঁচিয়ে রাখেন,যা তাকে পরকালে ক্ষতির সম্মুখিন করবে”(কাযী নাসির উদ্দীন আবদুল্লাহ্ ইবন ওমর ইবন মুহাম্মদ আল-বায়যাবী) ।

আবু মুহাম্মদ আল হুসাইন ইব্‌ন মাসউদ আল বগবী (র) বলেন,

মুত্তাকী ঐ ব্যক্তি,যিনি শির্‌ক,কবীরা গুনাহ ও সকল প্রকার অশ্লীলতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখেন। মুত্তাকী শব্দটি আল ইত্তিকাউ থেকে নির্গত। এর প্রকৃত অর্থ হচ্ছে দুই বস্তুর মাঝখানের অন্তরাল-দেয়াল। যেমন এক হাদীসে আছে,সাহাবায়ে কিরামের উক্তি,যুদ্ধক্ষেত্রে যখন যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যেত তখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে আমাদের ও শুক্রদের মাঝখানে অন্তরায় করে রাখতাম। সুতরাং মুত্তাকী আল্লাহর আদেশ পালন এবং তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকাকে তার এবং আল্লাহর শাস্তির মাঝখানে অন্তরায় তৈরী করে বলেই তাকে মুত্তাকী বলা হয়।(মাআলিমুত তানযীল ফিত তাফসীর ওয়াত তাবীল,বৈরুত)

আল্লামা জারুল্লাহ যামাখশারী (রা) বলেন,ইসলামী শরীআতের পরিভাষায় মুত্তাকী হল ঐ ব্যক্তি,যে নিজ সত্তাকে রক্ষা করে এমন বিষয় থেকে,যার জন্য সে শাস্তির উপযোগী হয়ে যায়;সেটি করণীয় হোক বা বর্জনীয়।(আল-কাশশাফ)

তাকওয়া হচ্ছে -মূল্যবোধ,মানসিক শুদ্ধতা ও দৃঢ়তা। এটি যে কোন ধরনের পদঙ্খলন থেকে মানুষকে রক্ষা করে;সকল মন্দ ও অশ্লীল কথা,কাজ ও পরিবেশ থেকে ফিরিয়ে রাখ, এবং প্রবৃত্তির খেয়াল-খুশি বা অভিলাষ ও দুষ্টচক্রের ফাঁদে পড়ে নিজের ক্ষতি করা থেকে এবং পরিবার,সমাজ ও দেশের ক্ষতি করা থেকে রক্ষা করে। জনমানব শূন্য নির্জন স্থানে বা দুর্নীতি করার অসংখ্য সহজ পথ উন্মুক্ত থাকার পরও যে শক্তি মানুষকে তাতে লিপ্ত হওয়া থেকে মুক্ত রাখে তা-ই তাকওয়া।

إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

প্রকৃতপক্ষে যারা মুক্তাকী,তাদেরকে যদি কখনো শয়তানের প্রভাবে অসৎ চিন্তা স্পর্শও করে যায় তাহলে তারা তখনই সতর্ক হয়ে উঠে তারপর তারা নিজেদের সঠিক কর্মপদ্ধতি পরিষ্কার দেখতে পায়৷(সুরা আল আরাফ ২০১)।

তাকওয়া মানুষের মধ্যে ন্যায়-অন্যায় ও সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার শক্তি জাগ্রত করে। আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۗ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ

হে ঈমানদারগণ!,যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় কর,তাকওয়া অর্জন কর,তবে তিনি তোমাদের ভাল-মন্দ পার্থক্য করার শক্তি দান করবেন। এবং তোমাদের পাপগুলো তোমাদের থেকে দূর করে দেবেন এবং তোমাদের ত্রুটি -বিচ্যুতি ক্ষমা করবেন৷ আল্লাহ অতিশয় অনুগ্রহশীল ৷ (সুরা আল আনফাল২৯। )

অর্থাৎ তাকওয়ার ফলে মানুষের বিবেক বুদ্ধি প্রখর হয় এবং সুষ্ঠ বিচার-বিবেচনা শক্তি জাগ্রত হয়। তাই সে সত্য-মিথ্যা ন্যায়-অন্যায় ও ভাল-মন্দ চিনতে এবং তা অনুধাবন করতে ভূল করে না। তার হাতে তাকওয়ার আলোকবর্তিকা থাকার ফলে জীবন পথের মন্দ দিকসমূহ সে স্পষ্টত দেখতে পায়। বিবেচনার শক্তির প্রখরতা ও বুদ্ধিদীপ্ততা তার মধ্যে এমনভাবে কাজ করে যে,তার কাছে তখন ইহ-পারলৌকিক যে কোন বিষয়ের কোনটি সঠিক আর কোনটি ভূল তা স্পষ্টতই ধরা পরে। ফলে সে কোন সংশয়,দ্বিধা-দ্বন্দ্ব,ইতস্তত,দুর্বলতা ও হীনমন্যতা ছাড়াই দিবালোকের মত সুস্পষ্ট ও সঠিক পথে চলতে সক্ষম হয়। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন,

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَآمِنُوا بِرَسُولِهِ يُؤْتِكُمْ كِفْلَيْنِ مِن رَّحْمَتِهِ وَيَجْعَل لَّكُمْ نُورًا تَمْشُونَ بِهِ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ﴾

হে মুমিনগণ ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর-তাকওয়া অর্জন কর এবং তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। তিনি নিজ অনুগ্রহের দ্বিগুন প্রতিদান তোমাদেরকে দিবেন এবং তোমাদেরকে দিবেন জ্যোতি-আলো,যার সাহায্যে তোমরা পথ চলবে। এবং তোমাদের ত্রুটি -বিচ্যুতি মাফ করে দেবেন৷ আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু৷   (সুরা হাদীদ  ২৮।)

অর্থাৎ তাকওয়া জীবনকে এমন এক সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপন করে,যা সকল প্রকার ভয়-ভীতি,লোভ-লালসা,প্ররোচনা-প্রতারণা,প্রলভন-পদস্খলন থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখে।অন্ধকারাচ্ছন্ন গভীর সমুদ্রে কম্পাস যন্ত্র যেমন সমুদ্রভিযাত্রীকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকে,সমস্যা-সংকুল জীবন পথে তাকওয়াও তেমনি মানুষকে নির্ভূল পথের সন্ধান দেয়।

ভালকে গ্রহণ করার তীব্র আগ্রহ এবং মন্দকে পরিহার করে চলার দৃঢ় মনোবলই হচ্ছে তাকওয়া। মানুষের সকল সৎগুণের সঞ্জীবনী শক্তি হচ্ছে তাকওয়া। এ ক্ষেত্রে তাকওয়ার অধিকারী ব্যক্তিদের ইতবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মকাণ্ডের বর্ণনা সম্বলিত নিম্নোক্ত আয়াতগুলো প্রণিধানযোগ্য। যেমন,আল্লাহ তায়ালা সুরা বাকারার ২থেকে ৪ আয়াতে বলেন  এই আল কুরআন পথ প্রদর্শণকারী পরহেযগারদের জন্য। পরহেযগার হচ্ছে তারা,যারা অদৃশ্য বিষয়ের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে,নামায প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে জীবিকা দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে;এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করে,সেসব বিষয়ের ওপর যা কিছু আপনার ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে,এবং যা কিছু আপনার পূর্ববর্তীদের ওপর অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং তারা আখিরাতের প্রতিও দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করে। (সুরা বাকারার ২-৪।)  অন্যত্র বলা হয়েছে,

لَّيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا ۖ وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ ۗ أُولَٰئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

শুধমাত্র পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ ফিরানোর মধ্যে কোন কল্যাণ নেই;বরং কল্যাণ হচ্ছে,যে ঈমান আনবে আল্লাহ্‌র ওপর,কিয়ামত দিবস,ফেরেশতাগণ,আসমানী কিতাবসমূহ ও নবী-রাসূলগণের ওপর;আর তাঁরই ভালবাসার মানসে আত্মীয়-স্বজন,ইয়াতীম,মিসকীন,মুসাফির-পথিক,ভিক্ষুক ও সর্ব প্রকার দাসত্ব থেকে মানুষকে মুক্তির জন্য সম্পদ ব্যয় করবে;আর যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে,যাকাত প্রদান করে;আর যারা তাদের অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ করে যখন তারা অঙ্গীকার করে এবং অভাবে,রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণকারী। আর তারাই হল সত্যাশ্রয়ী,আর তারাই মুত্তাকী।(সুরা আল বাকারা ১৭৭।)তারাই হল সত্যাশ্রয়ী অংশের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে,আয়াতে বর্ণিত বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীন কর্মকান্ডসমূহ যখন তারা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করবে তখনই তারা মুত্তাকীরূপে পরিগণিত হবে।(ফাতহুল মাজীদ রিয়াদ)

মুত্তাকী ব্যক্তিকে কতগুলো বিষয় বর্জন করে চলতে হয়। মানুষের মধ্যে দুটি পরস্পর বিরোধী প্রবনতা বা শক্তি পাশাপাশি সাংঘর্ষিক অবস্থানে বিদ্যমান। তা হল,ভাল-মন্দ,সত্য-মিথ্যা,ন্যায়-অন্যায়,কল্যাণ-অকল্যাণ,আলো-অন্ধকার ইত্যাদি। এ পরস্পর বিরোধী দুই প্রবণতার মধ্য থেকে ভাল ও কল্যাণময় প্রবণতা বেছে নিয়ে সেটাকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা এবং এর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার ফলে যত কঠিন পরীক্ষা ও অবস্থারই মুকাবিলার সম্মুখীন হোক না কেন, তা ধৈর্য ও সাহসের সাথে উত্তীর্ণ হওয়া এটাই প্রকৃত তাকওয়া। অর্থাৎ মানবীয় সহাজাত সুকুমার বৃত্তি বা আকাঙ্খা যা মানুষকে কুপ্রবৃত্তি তথা মন্দ কথা,খারাপ কাজ ও দুষ্ট চিন্তা থেকে বিরত রাখে,তাকেও তাকওয়া বলা হয়। যারা তাকওয়া অবলম্বনে জীবন যাপন করেন এবং মুত্তাকীদের নেতা বা আদর্শ যারা হতে চান,তারা যেসব বিষয় বর্জন করে জীবন যাপন করেন, এমন কিছু বিষয়ের উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন,

وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا﴾

তারা যখন ব্যয় করে তখন অযথা ব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করেনা বরং উভয় প্রান্তিকের মাঝামাঝি তাদের ব্যয় ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে৷

وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ ۚ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ يَلْقَ أَثَامًا

তারা আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপাস্যকে ডাকে না,আল্লাহ যে প্রানকে হারাম করেছেন কোন সংগত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে নাএবং ব্যভিচার করে না ৷এসব যে-ই করে সে তার গোনাহের শাস্তি ভোগ করবে৷

আর যখন তারা (সম্পদ) ব্যয় করে তখন অনর্থক ব্যয় করে না,আবার কার্পণ্যও করে না;বরং এতদুভয়ের মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করে (ব্যয় করে)। সুরা  আল-ফুরকান ৬৭-৬৮

وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا

(আর রহমানের বান্দা হচ্ছে তারা) যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় নাএবং কোন বাজে জিনিসের কাছ দিয়ে পথ অতিক্রম করতে থাকলে ভদ্রলোকের মত অতিক্রম করে যায়৷

وَالَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ لَمْ يَخِرُّوا عَلَيْهَا صُمًّا وَعُمْيَانًا

তাদের যদি তাদের রবের আয়াত শুনিয়ে উপদেশ দেয় হয় তাহলে তারা তার প্রতি অন্ধ বধির হয়ে থাকে না৷

﴿وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا﴾

তারা প্রার্থনা করে থাকে,হে আমাদের রব ! আমাদের নিজেদের স্ত্রীদের ও নিজেদের সন্তানদেরকে নয়ন শীতলকারী বানাও এবং আমাদের করে দাও মুত্তাকীদের ইমাম ৷আল-ফুরকান ৭২-৭৪।== সমাপ্ত==

নফল ইবাদত আল্লাহ’র নৈকট্য লাভের সোপান

ইসলাম আমাদেরকে যেসব কাজ করার কথা বলেছে এর কয়েকটি ধরন আছে। সবগুলোর স্তর সমান নয়। যেমন ফরজ ও ওয়াজিব আমলের ক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আর তা করা অবশ্য কর্তব্য, না করলে কবিরা গুনাহ হবে। ফিকাহর কিতাবের পরিভাষায় সুন্নত ও মুস্তাহাব উভয় ধরনকে নফলের মধ্যে শামিল করা হয়। নফল অর্থ অতিরিক্ত। অর্থাৎ তা ফরজ ও ওয়াজিবের অতিরিক্ত। একে ফরজ ও ওয়াজিবের পরিপূরক হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। সুন্নত হলো এমন কাজ যার পেছনে অকাট্য নয় এমন দলিল বিদ্যমান। রাসুল সা. ও সাহাবায়ে কেরাম রা. থেকে এর প্রতি আমলের ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ পাওয়া যায়।
রাসুল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের রা. যুগে আমলের এমন শ্রেণিবিন্যাস ছিল না। তারা আমাদের সময়ের করণীয় এ চার শ্রেণির আমল তথা ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নত ও মুস্তাহাবকে সমান গুরুত্ব সহকারে আদায় করতেন। ইমামদের সর্বসম্মত মত হলো, কোনো নফল কাজ শুরু করলে তা পূর্ণ করা ওয়াজিব হয়ে যায়। কোনো কারণে ওই নফল কাজ ভঙ্গ হলে ফের কাজা করাও ওয়াজিব থেকে যায়। তাই নফল কাজটি করা বা না করা ইচ্ছাধীন হলেও একবার করতে শুরু করলে তার মধ্যে আর ফরজ ওয়াজিবের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। তদুপরি কোনো নফল কাজ পারতপক্ষে তরক না করা উচিত। কেননা যেমনি এটা ফরজের পরিপূরক, তেমনি এটা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য লাভের সোপান।
নফল ইবাদতের বেশি দরকার হবে কেয়ামতের দিন, হাশরের ময়দানে। যেদিন ফরজ ইবাদতের ত্রুটির কারণে বান্দা আটকে যাবে তখন তার নফল ইবাদতগুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। দৈনন্দিন এমন অনেক নফল আমল আছে যা অতি সহজেই করা যায় আবার এর সওয়াবও বেশি। যেমন সবসময় মনে মনে জিকির করতে থাকা, মাসনুন দোয়াগুলো রপ্ত করে নেয়া এবং প্রয়োজনীয় সময় পাঠ করা; সব কাজের আগে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা; যেকোনো কাজে নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা; এমনকি একজন মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলাও নফল ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। নফল ইবাদত কোনো সময় ধরে করতে হয় না। আল্লাহর কাছে কোন ইবাদতটি কবুল হয়ে যাবে বলা যায় না। যেকোনো ইবাদতের উসিলায় আল্লাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন।

আল্লাহর ‘আসমাউল হুসনার’

আল্লাহু। আল্লাহ শব্দের যিকিরে মনে আসে প্রশান্তি। দিল হয় পরিশুদ্ধ। আত্মার স্থীরতা মিলে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক। আর তাদেরকে বর্জন কর, যারা তাঁর নামের ব্যাপারে বাঁকা পথে চলে। তারা নিজেদের কৃতকর্মের ফল শীঘ্রই পাবে।’ (সুরা আল আরাফ : ১৮০)

উত্তম নাম বলতে সে সকল নামকে বোঝানো হয়েছে, যা গুণ-বৈশিষ্ট্যের পরিপূর্ণতায় সর্বোচ্চ স্তরকে চিহ্নিত করে। তার গুণবাচক নামকে বলা হয়, আসমাউল হুসনা। উপরুল্লেখিত আয়াতেও ‘আসমায়ুল হুসনা’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার দ্বারা বোঝা যায় যে, এসব আসমায়ে হুসনা বা উত্তম নামসমূহ একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের -ই বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্য লাভ করা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়। আর যখন জানা গেল, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য বিশেষ কিছু নাম রয়েছে, এবং সেসমস্ত নাম আল্লাহর সত্তার সাথেই নির্দিষ্ট, কাজেই আল্লাহকে যখন ডাকবে, এসব নামে ডাকাই কর্তব্য। আয়াতের অপরাংশে বলা হয়েছে, ‘তাদের কথা ছাড়ুন, যারা আল্লাহ তায়ালার আসমায়ে হুসনার ব্যাপারে বাঁকা চাল অবলম্বন করে। অচিরেই তারা তাদের কৃত বাঁকামীর প্রতিফল পেয়ে যাবে। অর্থাৎ যারা আল্লাহর নামের প্রকৃত অর্থ ছেড়ে এদিক-সেদিকের বানোয়াট ও ধারণাপ্রসূত অর্থ ও ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ জুড়ে দেয় এবং কুরআনের অর্থ গ্রহণে যুক্তি ও বাঁকা চালের আশ্রয় নেয়, তাদের ব্যাপারটা ছেড়ে দেওয়াই কর্তব্য। কারণ, তারা যে বাঁকামী এখন করছে, এর প্রতিফল তারা কড়ায়-গ-ায় পেয়ে যাবে।

আয়াতের মর্ম কথা হলো, হামদ, সানা, গুণ ও প্রশংসাকীর্তন, তাসবীহ-তাহলীলের যোগ্য যেহেতু শুধুমাত্র আল্লাহ-ই এবং বিপদাপদে মুক্তি দান আর প্রয়োজন মেটানোও শুধু তাঁর-ই ক্ষমতায়। কাজেই যদি প্রশংসা ও গুণকীর্তণ করতে হয়, তবে তাঁরই করবে আর নিজের প্রয়োজন বা উদ্দেশ্য সিদ্ধি কিংবা বিপদমুক্তির জন্য ডাকতে হলে শুধু তাঁকেই ডাকবে, তাঁরই কাছে সাহায্য চাইবে। আর ডাকার পদ্ধতিও বলে দেওয়া হয়েছে যে, তাঁর জন্য নির্ধারিত ‘আসমায়ে হুসনা’ বা উত্তম নামে -ই ডাকবে।

এ আয়াতের মাধ্যমে গোটা মুসলিম জাতিকে দুটি হিদায়াত বা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, প্রথমত : আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্তাই প্রকৃত হামদ-সানা বা বিপদমুক্তি বা উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য ডাকার যোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত : তাঁকে ডাকার জন্য মানুষ এমন মুক্ত নয় যে, যেকোনো শব্দে ইচ্ছা ডাকতে থাকবে, বরং আল্লাহ বিশেষ অনুগ্রহপরবশ হয়ে আমাদিগকে সেসব শব্দ সমষ্টিও শিখিয়ে দিয়েছেন যা তাঁর মহত্ব ও মর্যাদার উপযোগী। সেই সাথে এ সমস্ত শব্দেই তাঁকে ডাকার জন্য আমাদিগকে বাধ্য করে দিয়েছেন যাতে আমরা নিজের মত শব্দ পরিবর্তন না করি। কারণ, আল্লাহর গুণ বৈশিষ্ট্যের সব দিক লক্ষ্য রেখে তাঁর মহত্বের উপযোগী শব্দ চয়ন করতে পারা মানুষের সাধ্যের ঊর্ধ্বে। (মায়ারেফুল কুরআন )

ইমাম বোখারি ও মুসলিম, হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে রেওয়ায়েত করেছেন যে, রাসুলে করীম সা. এরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালার নিরানববইটি নাম রয়েছে। যে ব্যক্তি এগুলোকে আয়ত্ত করে নেবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (বোখারী ২৭৩৬, মুসলিম ২৬৭৭)

অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আল্লাহর এই নিরানববই নাম পাঠ করে যে উদ্দেশ্যের জন্যই প্রার্থনা করা হয়, তা কবুল হয়।

কুরআনের চর্চা হোক প্রতিদিন

 

প্রতিটি রমজান মাসে আমরা আনন্দের সাথে লক্ষ করি, বাড়িতে বাড়িতে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে প্রেরিত আসমানি কিতাব কুরআনুল কারিমের চর্চা হয়। কুরআনুল কারিমকে নিয়ে পর্যালোচনা হয়। মা আয়েশা সিদ্দিকা রা:-কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল নবী করিম সা:-এর জীবনযাপন কেমন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, নবী করিম সা: হচ্ছেন জীবন্ত কুরআন অর্থাৎ মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে প্রেরিত কুরআনুল কারিমের প্রতিটি অক্ষর মহানবী সা: পালন করতেন। নবী করিম সা: একদল সাহাবাকে কুরআনের হাফেজ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। এদের একটাই কাজ ছিল- পবিত্র কুরআনুল কারিমকে নিয়ে গবেষণা করা ও মুখস্থ করে রাখা- যেন পরবর্তীকালে এই কুরআনুল কারিমকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়া যায়। আসহাবে সুফ্ফার সম্মানিত সাহাবিগণ সারা দিন নবী করিম সা:-এর ভালোবাসার ছায়ায় থাকতেন। তারা কুরআনুল কারিমকে নিয়ে ভাবতেন এবং গবেষণা করতেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই কুরআনুল কারিমে জগতের সব কিছুকে তুলে ধরেছেন। যারা গবেষক তারা নিশ্চয়ই কুরআনুল কারিমের গবেষণা করে সব কিছু পেয়ে যাচ্ছেন। পৃথিবীর সব মহাপুরুষ কুরআনুল কারিমের চর্চা করে মহান রাব্বুল আলামিনের সর্বোচ্চ সান্নিধ্য পেয়েছেন। বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী রহ: তার বিখ্যাত বই গুনয়াতিত তালেবীন লেখার আগে ভালোমতো কুরআন অনুসরণ করেছেন। সুফি জগতের শাহেনশাহ মহিউদ্দিন ইবনুল আরাবি রহ: তার বিখ্যাত পুস্তক ফতুহাতে মক্কিতে মহান আল্লাহকে কিভাবে পাওয়া যাবে তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। এই পুস্তক লেখার আগে তিনি কুরআনুল কারিমকে ভালোভাবে বুঝেছেন, গবেষণা করেছেন। বিশ্বখ্যাত ফরাসি বিজ্ঞানী ড. মরিস বুকাইলি তার বিখ্যাত পুস্তক বাইবেল, বিজ্ঞান ও কুরআনে স্বীকার করেছেন  কুরআনুল কারিম একমাত্র পুস্তক, যা কখনোই বিকৃত হয়নি। মহান রাব্বুল আলামিন নিজেই কুরআনুল কারিমকে হেফাজতে রেখেছেন। একই সাথে তিনি এই পবিত্র কুরআনুল কারিমকে লওহে মাহফুজে সংরক্ষিত করেছেন। সারা পৃথিবীর সব মহাপুরুষ, লেখক, গবেষকের কাছে কুরআনুল কারিম প্রতিদিন নতুন করে সবাইকে হেদায়াতের আলোতে আলোকিত করছে। অন্ধকারে যখন পথিক পথ হারিয়ে ফেলে তাকে যেমন চন্দ্র তার কিরণ দ্বারা পথ দেখিয়ে দেয়, তদ্রুপ উম্মতি মোহাম্মদির অনুসারীরা যখন পথ হারিয়ে ফেলে, তখন কুরআনুল কারিম তাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়। বাংলাদেশের প্রতিটি বাড়িতে অত্যন্ত যত্নের সাথে কুরআনুল কারিম সংরক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু কেউ মারা না গেলে অথবা কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে কুরআনুল কারিম পাঠ করতে সহজে কাউকে দেখা যায় না। আমাদের উচিত প্রতিদিন অন্তত একটিবারের জন্য হলেও অর্থসহ কুরআনুল কারিম পাঠ করা। যারা প্রতিদিন কুরআনুল কারিম চর্চা করছেন, পাঠ করছেন তাদেরকে হেদায়াতের পথ স্বয়ং কুরআনুল কারিম দেখিয়ে দেয়। একটি দেশে যখন আপনি ভ্রমণ করতে যাবেন তখন আপনার প্রয়োজন হবে একটি গাইডবুকের। কিন্তু সারা জীবন পৃথিবীতে যত দিন থাকবেন এবং অনন্ত অসীম পারলৌকিক জীবনে যদি সুখময় জীবন চান তাহলে অবশ্যই আপনাকে-আমাকে, সবাইকে কুরআনুল কারিমকে সাথী করতে হবে। আমরা যদি কুরআনুল কারিমকে বরণ করে নিতে পারি তাহলে আমরা কখনো পথ হারাব না। সমগ্র পৃথিবীতে যে হানাহানি হচ্ছে তা বন্ধ হওয়ার একমাত্র পথ হচ্ছে কুরআনের আলোয় আলোকিত হওয়া। মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে আমাদের বিনীত ফরিয়াদ- হে দয়াময় আল্লাহ, দয়া করে আপনি আমাদের হেদায়েত দান করুন। কুরআনুল কারিমের আলোয় আলোকিত করুন। আমাদের দেশের কুরআন পাঠকেরা, গবেষকেরা যদি আন্তর্জাতিক মানের কুরআনের তাফসির পড়তে চান তাহলে তারা তাফসিরে জালালাইন, তাফসিরে ইবনে মাজাহারি ও তাফসিরে ইবনে কাসির- প্রভৃতি তাফসির গ্রন্থ সংগ্রহ করে পড়তে পারেন। –

অন্তর কঠিন হওয়ার কারণ ও প্রতিকার

 

মানুষ কেবল দেহসর্বস্ব জীব নয়। সুন্দর দৈহিক অবয়বের সাথে মহান আল্লাহ মানুষকে সুন্দর একটি ক্বলব বা অন্তর দিয়েছেন। যার মাধ্যমে মানুষ চিন্তা করে জীবনের ভাল-মন্দ বেছে নেয়। মানুষের অন্তরের চিন্তা-ভাবনার উপরই নির্ভর করে তার অন্যান্য অঙ্গের ভাল কাজ বা মন্দ কাজ সম্পাদন করা। এই ক্বলব বা অন্তরেই মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস বা আক্বীদার অবস্থান। আর আল্লাহ বান্দার অন্তরই দেখেন।[সলিম, মিশকাত তাহক্কীক আলবানী, রিক্কাক অধ্যায়, ‘লোক দেখানো ও নাম কুড়ানো অনুচ্ছেদ হা/৫৩১৪, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/৭।] এই ক্বলব বা অন্তর হ’ল পরিকল্পনাকারী এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি বাস্তবায়নকারী। অন্তর ভাল থাকলে, মানুষের কাজও ভাল হবে।[বুখারী হা/৫২, মুমলিম, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/৫৮৮।] অন্তর বা মন খারাপ থাকলে, কাজে মনোযোগ থাকে না। কাজ হয় অগোছালো, অসুন্দর। শরীরের অন্যান্য অঙ্গের ন্যায় এই অন্তরেরও রোগ-ব্যাধি হয়ে থাকে। শরীরের অন্যান্য রোগের কথা মানুষ জানলেও অন্তরের রোগ সম্পর্কে অনেকেই অজ্ঞ। ফলে অধিকাংশ মানুষের অন্তর সুস্থ না থাকার কারণে পাপ কাজ করেই যাচ্ছে। আল্লাহর আযাবের কথা শুনেও কর্ণপাত করছে না। অন্তর কঠিন হওয়া অন্তরের একটি অন্যতম রোগ। অন্তর কঠিন হ’লে মানুষ আল্লাহর আযাব ও জাহান্নামের শাস্তির কথা শুনে বিগলিত হয় না। আল্লাহ বনী ইসরাঈলদের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, ثُمَّ قَسَتْ قُلُوْبُكُم مِّن بَعْدِ ذَلِكَ فَهِيَ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةً ‘অতঃপর এ ঘটনার পরে তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেছে। তা পাথরের মত অথবা তদপেক্ষাও কঠিন’ (বাক্বারা ২/৭৪)। অন্য আয়াতে তিনি বলেন, وَلَـكِنْ قَسَتْ قُلُوْبُهُمْ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ مَا كَانُوْا يَعْمَلُوْنَ- ‘বস্ত্ততঃ তাদের অন্তর কঠোর হয়ে গেল এবং শয়তান তাদের কাছে সুশোভিত করে দেখাল, যে কাজ তারা করছিল’ (আনআম ৬/৪৩)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, فَوَيْلٌ لِّلْقَاسِيَةِ قُلُوْبُهُم مِّن ذِكْرِ اللهِ- ‘যাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণের ব্যাপারে কঠোর, তাদের জন্য দুর্ভোগ। তারা সুস্পষ্ট গোমরাহীতে রয়েছে’ (যুমার ৩৯/২২)। আল্লাহ আরো বলেন,  فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوْبُهُمْ ‘তাদের উপর সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হয়েছে। অতএব তাদের অন্তঃকরণ কঠিন হয়ে গেছে’ (হাদীদ ৫৭/১৬)

অন্তর কঠিন হওয়ার আলামত :

(১) আল্লাহর আনুগত্য ও ভালকাজে অলসতা :  মানুষের অন্তর কঠিন হ’লে ইবাদতে অলসতা চলে আসবে। ছালাত পড়বে কিন্তু অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকবে না। ছালাতে নফল ও সুন্নাত আদায়ের পরিমাণ কমে যাবে। মুনাফিকদের চরিত্র প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, وَلاَ يَأْتُوْنَ الصَّلاَةَ إِلاَّ وَهُمْ كُسَالَى وَلاَ يُنْفِقُوْنَ إِلاَّ وَهُمْ كَارِهُوْنَ ‘তারা ছালাতে আসে অলসতার সাথে আর ব্যয় করে সংকুচিত মনে’ (তওবা ৯/৫৪)। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, وَإِذَا قَامُوْا إِلَى الصَّلاَةِ قَامُوْا كُسَالَى- ‘যখন তারা ছালাতে দাঁড়ায় তখন তারা অলসভাবে দাঁড়ায়’ (নিসা ৪/১৪২)

(২) আল্লাহর আয়াত ও উপদেশ শুনে অন্তর প্রভাবিত না হওয়া : অন্তর কঠিন হ’লে মানুষ কুরআনের আয়াত শুনে বিশেষ করে আযাবের আয়াতগুলি শুনে ভীত হয় না; বরং কুরআন পড়া ও শোনাকে নিজের কাছে ভারী মনে হয়। আল্লাহ বলেন, فَذَكِّرْ بِالْقُرْآنِ مَن يَخَافُ وَعِيْدِ ‘অতএব যে আমার শাস্তিকে ভয় করে, তাকে কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দান করুন’ (ক্বাফ ৫০/৪৫)। অন্যত্র আল্লাহ মুমিনদের প্রশংসা করে বলেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُوْنَ الَّذِيْنَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوْبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيْمَاناً وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُوْنَ- ‘যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় আল্লাহর আয়াত, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় পরওয়ারদেগারের প্রতি ভরসা করে’ (আনফাল ৮/ ২)

(৩) দুনিয়াতে আল্লাহর আযাব-গযব ও মানুষের মৃত্যু দেখে অন্তর ভীত না হওয়া : মানুষ সাধারণত আযাব-গযব ও নিকটজনের মৃত্যু দেখলে ভীত হয়। কিন্তু কেউ যদি ভীত না হয়, ভাল আমল না করে, খারাপ আমল ছেড়ে না দেয়, তাহ’লে বুঝতে হবে তার অন্তর কঠিন হয়ে গেছে। আল্লাহ বলেন, أَوَلاَ يَرَوْنَ أَنَّهُمْ يُفْتَنُوْنَ فِيْ كُلِّ عَامٍ مَّرَّةً أَوْ مَرَّتَيْنِ ثُمَّ لاَ يَتُوْبُوْنَ وَلاَ هُمْ يَذَّكَّرُوْنَ ‘তারা কি লক্ষ্য করে না, প্রতিবছর তারা দু’একবার বিপর্যস্ত হচ্ছে, অথচ তারা এরপরও তওবা করে না কিংবা উপদেশ গ্রহণ করে না’ (তওবা  ৯/১২৬)

(৪) দুনিয়ার প্রতি ভালবাসা বৃদ্ধি পাওয়া ও আখেরাতকে ভুলে যাওয়া : মুমিনদের আসল বাসস্থান হ’ল জান্নাত। দুনিয়া হ’ল আখেরাতের শস্যক্ষেত্র। যদি কেউ আখেরাতের কথা ভুলে দুনিয়া অর্জনের পিছনে লেগে থাকে, তাহ’লে বুঝতে হবে তার অন্তর কঠিন হয়ে গেছে।

(৫) আল্লাহকে সম্মান করা কমে যাওয়া : আল্লাহকে সম্মান না করার অর্থ হ’ল আল্লাহর আদেশ-নিষেধকে মান্য না করা। সুতরাং কেউ আল্লাহর আদেশকে মান্য না করে নিষেধগুলিতে ডুবে থাকলে বুঝতে হবে লোকটির অন্তর কঠিন হয়ে গেছে।

অন্তর কঠিন হওয়ার কারণ :

অন্তর কঠিন হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। নিম্নে সেগুলি আলোচনা করা হ’ল।-

(১) অন্তরকে দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত রেখে আখেরাতকে ভুলিয়ে রাখা : এটা হচ্ছে অন্তর কঠিন হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ। যদি দুনিয়ার ভালবাসা আখেরাতের ভালবাসার চেয়ে প্রাধান্য পায়, তাহ’লে ধীরে ধীরে অন্তর কঠিন হ’তে আরম্ভ করে। ফলে ঈমান কমে যায়, সৎ কাজকে ভারী মনে হয়, দুনিয়াকে ভালবাসা আরম্ভ করে এবং আখেরাতকে ভুলে যেতে থাকে। জনৈক সৎ বান্দা বলেছেন,

ما من عبد إلا وله عينان في وجهه يبصر بهما أمر الدنيا، وعينان في قلبه يبصر بهما أمر الآخرة، فإذا أرد الله بعبد خيراً فتح عينيه اللتين في قلبه، فأبصر بهما ما وعد الله بالغيب، وإذا أراد به غير ذلك تركه على ما فيه، ثم قرأ-

‘প্রত্যেক বান্দারই দু’টি চোখ রয়েছে। এক চোখ দিয়ে সে দুনিয়ার বিষয় দেখে। আর অন্তরে যে চোখ আছে তা দিয়ে সে আখেরাতের বিষয় দেখে। আল্লাহ যদি কোন বান্দার কল্যাণ চান, তাহ’লে তার অন্তরে যে চোখ আছে তা খুলে দেন। ফলে আল্লাহ অদৃশ্যের যে ওয়াদা করেছেন সে সেগুলি দেখতে থাকে। আর আল্লাহ যদি অন্য কিছু ইচ্ছা করেন, তাহ’লে তার অবস্থায় তাকে ছেড়ে দেন। তারপর এ আয়াতটি পাঠ করেন, ‘তাদের অন্তর কি তালাবদ্ধ করা হয়েছে’ (মুহাম্মাদ ৪৭/২৪)

(২) অলসতা : এটা একটা সংক্রামক ব্যাধি। অন্তর এ রোগে আক্রান্ত হ’লে শরীরের সব অঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়ে। শরীরের সব অঙ্গ কর্মক্ষমতা হারায়। আল্লাহ বলেন, أُوْلَـئِكَ الَّذِيْنَ طَبَعَ اللهُ عَلَى قُلُوْبِهِمْ وَسَمْعِهِمْ وَأَبْصَارِهِمْ وَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْغَافِلُوْنَ- ‘তারা হ’ল সে সমস্ত লোক যাদের অন্তর, শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তির উপর আল্লাহ মোহর মেরে দিয়েছেন’ (নাহল ১৬/১০৮)। আল্লাহ মানুষকে যে সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়েছেন, মানুষের উচিত সেগুলি সঠিকভাবে কাজে লাগনো। অন্যথা সেই গাফেলদের জন্য আল্লাহ আযাবের ব্যবস্থা রেখেছেন। আল্লাহ বলেন,

وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيْراً مِّنَ الْجِنِّ وَالإِنْسِ لَهُمْ قُلُوْبٌ لاَّ يَفْقَهُوْنَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لاَّ يُبْصِرُوْنَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لاَّ يَسْمَعُوْنَ بِهَا أُوْلَـئِكَ كَالأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُوْلَـئِكَ هُمُ الْغَافِلُوْنَ-

‘আমি বহু জিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি। তাদের হৃদয় রয়েছে, কিন্তু তারা তদ্বারা উপলব্ধি করে না। তাদের চক্ষু রয়েছে কিন্তু তারা তদ্বারা দেখে না। তাদের কর্ণ রয়েছে, কিন্তু তদ্বারা তারা শোনে না। তারাই হ’ল পশুর ন্যায় বরং তা অপেক্ষা অধিক বিভ্রান্ত। তারাই হ’লো গাফিল বা অমনোযোগী’ (রাফ ৭/১৭৯)

(৩) খারাপ বন্ধুদেরকে ভালবাসা ও তাদের সাথে উঠা-বসা করা : কথায় আছে ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’। মানুষ যার সাথে চলাফেরা করে তার আচার-আচরণ অন্য জনের উপরও প্রভাব বিস্তার করে। রাসূল (ছঃ) বলেছেন,

مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالْجَلِيسِ السَّوْءِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْمِسْكِ، وَكِيرِ الْحَدَّادِ، لاَ يَعْدَمُكَ مِنْ صَاحِبِ الْمِسْكِ إِمَّا تَشْتَرِيهِ، أَوْ تَجِدُ رِيْحَهُ، وَكِيْرُ الْحَدَّادِ يُحْرِقُ بَدَنَكَ أَوْ ثَوْبَكَ أَوْ تَجِدُ مِنْهُ رِيحًا خَبِيثَةً.

‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ আতর বিক্রেতা ও কর্মকারের হাপরের ন্যায়। আতর বিক্রেতার থেকে শূন্য হাতে ফিরে আসবে না। হয় তুমি আতর খরিদ করবে, না হয় তার সুঘ্রাণ পাবে। আর কর্মকারের হাপর হয় তোমার ঘর অথবা তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে, না হয় তুমি তার দুর্গন্ধ পাবে’।[বুখারী হা/২১০১, মিশকাত হা/৫০১০ তাহক্বীক আলবানী আদব অধ্যায় আল্লাহর জন্য ভালবাসা অনুচ্ছেদ।]

ইবনে মাসঊদ (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, একজন লোক নবী (ছাঃ)-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আমরা সে ব্যক্তি সম্পর্কে কি বলব, যে কোন সম্প্রদায়কে ভালবাসে অথচ তাদের সাথে সাক্ষাত হয়নি? রাসূল (ছাঃ) বললেন, المرء مع من احب ‘মানুষ তার সাথেই থাকবে সে যাকে ভালবাসে’।[বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫০০৮ তাহক্বীক : আলবানী আদব অধ্যায় আল্লাহর জন্য ভালবাসা অনুচ্ছেদ; রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৯,৩৭০,৩৬৮।] অন্য হাদীছে রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,

لَمَّا وَقَعَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ فِى الْمَعَاصِى نَهَتْهُمْ عُلَمَاؤُهُمْ فَلَمْ يَنْتَهُوا فَجَالَسُوهُمْ فِى مَجَالِسِهِمْ وَوَاكَلُوهُمْ وَشَارَبُوهُمْ فَضَرَبَ اللَّهُ قُلُوبَ بَعْضِهِمْ بِبَعْضٍ وَلَعَنَهُمْ عَلَى لِسَانِ دَاوُدَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ

‘বনু ইসরাঈলরা যখন পাপাচারে লিপ্ত হ’ল, তখন তাদের আলেম দরবেশগণ প্রথমদিকে এইসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করত। কিন্তু লোকেরা বিরত না হওয়ায় পরে তারা দুষ্টমতি সমাজ নেতা ও বড়লোকদের সাথে উঠা-বসা ও খানাপিনা করত। ফলে আল্লাহ তাদের পরস্পরের অন্তরকে পাপাচারে কুলষিত করে দেন। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) তাদের উপর লা‘নত করেন’।[তিরমিযী, মিশকাত হা/৫১৪৮।]

(৪) অধিক হারে গুনাহ ও খারাপ কাজ করা : অধিক হারে পাপ বান্দার অন্তরকে কঠিন করে তোলে। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন,

إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا أَخْطَأَ خَطِيئَةً نُكِتَتْ فِى قَلْبِهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ فَإِذَا هُوَ نَزَعَ وَاسْتَغْفَرَ وَتَابَ سُقِلَ قَلْبُهُ وَإِنْ عَادَ زِيدَ فِيهَا حَتَّى تَعْلُوَ قَلْبَهُ وَهُوَ الرَّانُ الَّذِى ذَكَرَ اللهُ (كَلاَّ بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوبِهِمْ مَا كَانُوا يَكْسِبُونَ)

‘যখন বান্দা কোন পাপ করে, তখন তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে যায়। যখন সে তওবা করে, তখন সেটা তুলে নেওয়া হয়। আর ইস্তেগফারের মাধ্যমে অন্তরকে পরিষ্কার করা হয়। আর যদি পাপ বাড়তেই থাকে, তাহ’লে দাগও বাড়তে থাকে। আর এটাই হ’ল মরিচা। যেমন আল্লাহ বলেন, না এটা সত্য নয়; বরং তাদের কৃতকর্মই তাদের মনের উপর মরিচারূপে জমে গেছে’ (মুতাফফিফীন ৮৩/১৪)  আহমাদ, তিরমিযী

(৫) মৃত্যুর কষ্ট ও আখেরাতের আযাব ভুলে যাওয়া : মৃত্যু ও আখেরাতের চিন্তা মানুষের অন্তরকে নরম রাখে। কেউ মৃত্যুর কথা  ও  আখেরাতে জবাবদিহিতার কথা ভুলে গেলে তার অন্তর কঠিন হয়ে যায়।

অন্তর কঠিন হওয়ার প্রতিকার :

(১) আল্লাহ তাআলাকে চেনা : অন্তর কঠিন হওয়া থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার প্রথম ও প্রধান উপায় হ’ল আল্লাহর রহমত, ক্ষমা, শাস্তি ও মর্যাদা জানার মাধ্যমে অন্তর নরম করার চেষ্টা করা এবং আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের জন্য ছুটে আসা। আল্লাহ বলেন,غَافِرِ الذَّنبِ وَقَابِلِ التَّوْبِ شَدِيْدِ الْعِقَابِ ذِي  الطَّوْلِ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ إِلَيْهِ الْمَصِيْرُ- ‘পাপ ক্ষমাকারী, তওবা কবুলকারী, কঠোর শাস্তিদাতা ও সামর্থ্যবান। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তাঁরই দিকে হবে প্রত্যাবর্তন’ (গাফির ৪০/ ৩)

(২) কুরআন তিলাওয়াত করা : কুরআন তিলাওয়াত করা ও এর অর্থ বুঝে আমল করার মাধ্যমে অন্তর নরম হয়। আল্লাহ বলেন, الَّذِيْنَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوْبُهُمْ وَالصَّابِرِيْنَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ ‘(বিনয়ী হ’ল তারা) যাদের অন্তর আল্লাহর নাম স্মরণ করা হ’লে ভীত হয় এবং যারা তাদের বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করে’ (হজ্জ্ব ২২/৩৫)। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহঃ) কুরআন দ্বারা কঠিন অন্তরের কিভাবে চিকিৎসা করতে হবে তা অতি সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন এভাবে- ‘এটির দু’টি পথ রয়েছে- এক- আপনার অন্তরকে দুনিয়া থেকে স্থানান্তর করে আখেরাতের দেশে নিয়ে যাবেন। দুই- অতঃপর কুরআনের অর্থ বুঝবেন এবং কেন নাযিল হয়েছে সেটা বুঝার চেষ্টা করবেন এবং প্রত্যেক আয়াত হ’তে আপনার জন্য প্রয়োজনীয় অংশ গ্রহণ করে তা আপনার অন্তরের ব্যধির উপর প্রয়োগ করবেন। তা যদি আপনার অসুস্থ অন্তরের উপর প্রয়োগ করেন, তাহ’লে আল্লাহর ইচ্ছায় আরোগ্য লাভ করবেন’। 

(৩) অন্তরকে পরকালীন চেতনায় উজ্জীবিত করা : অন্তরকে বুঝাতে হবে যে, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের পরে রয়েছে স্থায়ী, অনাদি, অনন্ত আখিরাতের জীবন। সে জীবনের তুলনায় এ নশ্বর জীবন নিতান্তই তুচ্ছ ও নগণ্য। রাসূল (ছাঃ) বলেন,

والله مَا مَثَلُ الدُّنْيَا فِى الآخِرَةِ إِلاَّ مَثَلُ مَا يَجْعَلُ أَحَدُكُمْ إِصْبَعَهُ فِى الْيَمِّ فَلْيَنْظُرْ بِمَ يَرْجِعُ.

‘আল্লাহর কসম! আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ হ’ল যেমন তোমাদের কেউ মহাসাগরের মধ্যে নিজের একটি অঙ্গুলি ডুবিয়ে দেয়, এরপর সে লক্ষ্য করে দেখুক তা কি (পরিমাণ পানি) নিয়ে আসল’।[মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৫৬; তাহক্বীক : আলবানী, কিতাবুর রিক্বাক্ব; রিয়াযুছ ছালেহীন হা/৪৬৩।]

জাবের (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, একদা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) একটি কানকাটা মৃত বকরীর বাচ্চার নিকট দিয়ে অতিক্রমকালে বললেন, তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে একে এক দিরহামের বিনিময়ে ক্রয় করতে পসন্দ করবে’? ছাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমরা তো একে কোন কিছুর বিনিময়েই ক্রয় করতে পসন্দ করব না। তখন তিনি বললেন, فَوَاللهِ لَلدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللهِ مِنْ هَذَا عَلَيْكُمْ ‘আল্লাহর কসম! এটা তোমাদের কাছে যতটুকু নিকৃষ্ট, আল্লাহর কাছে দুনিয়া এর চেয়েও অধিক নিকৃষ্ট’।[মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৫৭ তাহক্বীক: আলবানী কিতাবুর রিক্বাক্ব’।]

(৪) মৃত্যু ও মৃত্যু পরবর্তী অবস্থার কথা চিন্তা করা : দুনিয়ার জীবনের পর সবাইকে মরতে হবে এবং দুনিয়ার জীবনের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে। এ চিন্তা ও বিশ্বাসই মানুষর অন্তর নরম করতে পারে। মরণের পর কবরে যেতে হবে, মুনকার-নাকীরের প্রশ্নের জবাব দিতে হবে, হাশরের ময়দানে আমলনামা নিয়ে উঠতে হবে, আমল ভাল হ’লে জান্নাত, না হয় জাহান্নাম। একথা চিন্তা ও বিশ্বাসের মাধ্যমেই অন্তর নরম হয়। পক্ষান্তরে সে যদি পরকালের জবাবদিহিতার কথা ভুলে যায়, তাহ’লে তার অন্তর দুনিয়ার মায়ায় আচ্ছাদিত হয়ে কঠিন হয়ে যায়।

(৫) কবর যিয়ারত করা ও তাদের অবস্থা চিন্তা করা : কোন মানুষ যদি কবরের কাছে গিয়ে এই চিন্তা করে যে, এই কবরে যে আছে সে একদিন দুনিয়াতে ছিল, আমার মত খাওয়া-দাওয়া করত, চলাফেরা করত। আজকে সে কবরে চলে গেছে, তার দেহ মাটি হয়ে গেছে, তার সম্পদ তার ছেলে-মেয়েরা ভাগ করে নিয়েছে। আমাকেও একদিন তার মত কবরে যেতে হবে। তাহ’লে অন্তর নরম হবে। রাসূল (ছঃ) বলেছেন, كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ أَلاَ فَزُوْرُوْهَا، فَإِنَّهَا تَرِقُ الْقَلْبَ . ‘আমি প্রথমে তেমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, এখন তোমরা কবর যিয়ারত কর। কেননা এটা অন্তরকে নরম করে’।[হাকেম, হা/১৩৯৩; আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন।]

আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, নবী করীম (ছাঃ) তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করেছিলেন। অতঃপর তিনি কেঁদেছেন এবং আশেপাশে যারা ছিল তাদের কাঁদিয়েছেন। অতঃপর বললেন, আমি আল্লাহর কাছে আমার মায়ের জন্য ক্ষমা চাওয়ার অনুমতি চেয়েছি, কিন্তু আমাকে অনুমতি দেয়া হয়নি। আমি আল্লাহর কাছে তাঁর কবর জিয়ারত করার অনুমতি চেয়েছি। অতঃপর আমাকে অনুমতি দিয়েছেন। অতএব তোমরা কবর যিয়ারত কর। কেননা এটা মৃত্যুকে স্মরণ করিয়ে দেয়’।[আলবানী, আহকামুল জানায়িয, মাসআলা নং ১১৯।]

(৬) আল্লাহর নির্দশনাবলী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা : আল্লাহ কুরআনে আযাব-গযবের অনেক আয়াত নাযিল করেছেন। বিভিন্ন জাতি অবাধ্য হওয়ার কারণে তাদেরকে ধ্বংস করে দেওয়ার কাহিনী বর্ণনা করেছেন। চিন্তাশীল মানুষ যদি এগুলি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেন তাহ’লে তার অন্তর নরম হবে। আল্লাহ বলেন,

كِتَاباً مُّتَشَابِهاً مَّثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُوْدُ الَّذِيْنَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِيْنُ جُلُوْدُهُمْ وَقُلُوْبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللهِ ذَلِكَ هُدَى اللهِ يَهْدِيْ بِهِ مَنْ يَشَاءُ وَمَن يُضْلِلْ اللهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ-

‘আল্লাহ উত্তমবাণী তথা কিতাব নাযিল করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ, পুনঃ পুনঃ পঠিত। এতে তাদের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে চামড়ার উপর, যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে, এরপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়। এটাই আল্লাহর পথনির্দেশের মাধ্যম। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথ প্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ যাকে গোমরাহ করেন তার কোন পথ প্রদর্শক নেই’ (যুমার ৩৯/২৩)

(৭) বেশী বেশী আল্লাহর যিকর করা ও গুনাহ মাফ চাওয়া : অন্তরের কঠিনতা যিকর ব্যতীত দূর হয় না। প্রত্যেকের উচিৎ অন্তরের কঠিনতা দূর করার জন্য আল্লাহর যিকর করা। একজন লোক হাসান (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, يا أبا سعيد، أشكو إليك قسوة قلبي، قال: أذبه بالذكر. ‘হে আবু সাঈদ! আপনার নিকট অন্তর কঠিন হওয়ার অভিযোগ করছি, তিনি বললেন, তুমি (অন্তরের কঠিনতা থেকে বাঁচতে) যিকর করবে। ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রহঃ) বলেছেন, صدأ القلب بأمرين: بالغفلة والذنب، وخلاؤه بشيئن: بالاستغفار والذكر. ‘দু’টি জিনিস অন্তরকে বন্ধ করে দেয়- অলসতা ও গুনাহ, এবং দুটি জিনিস এটাকে শূন্যতা করে- ক্ষমাপ্রার্থনা ও যিকির।

(৮) সৎ লোকদের সঙ্গী হওয়া ও তাদের থেকে উপদেশ গ্রহণ করা : সৎ লোকদের সাথে থাকা, তাদের সাথে চলাফেরা করা  ও  তাদের থেকে উপদেশ নেওয়ার মাধ্যমে মানুষের অন্তর নরম থাকে। আল্লাহ বলেন,

وَاصْبِرْ نَفْسَكَ مَعَ الَّذِيْنَ يَدْعُوْنَ رَبَّهُمْ بِالْغَدَاةِ وَالْعَشِيِّ يُرِيْدُوْنَ وَجْهَهُ وَلاَ تَعْدُ عَيْنَاكَ عَنْهُمْ تُرِيْدُ زِيْنَةَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَلاَ تُطِعْ مَنْ أَغْفَلْنَا قَلْبَهُ عَن ذِكْرِنَا وَاتَّبَعَ هَوَاهُ وَكَانَ أَمْرُهُ فُرُطاً.

‘আপনি নিজেকে তাদের সৎসঙ্গে আবদ্ধ রাখুন যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের পালনকর্তাকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে আহবান করে এবং আপনি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য কামনা করে তাদের থেকে নিজের দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবেন না। যার মনকে আমার স্মরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, সে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার আনুগত্য করবেন না’ (কাহফ ১৮/২৮)

জাফর বিন সুলায়মান বলতেন, كنت إذا وجدت من قلبي قسوة غدوت فنظرة إلي وجه محمد بن واسع ‘যখনই আমি আমার অন্তরের মধ্যে কঠিনতা লক্ষ্য করেছি, তখনই আমি মুহাম্মাদ বিন ওয়াছে‘-এর চেহারার দিকে লক্ষ্য করেছি’।

(৯) আত্মসমালোচনা করা : মানুষ যদি নিজে নিজের দিকে না তাকায়, তাহ’লে সে তার অন্তরের রোগের অবস্থা জানতে পারে না। তাই মানুষের উচিত তার প্রতিদিনের কার্যকলাপের দিকে নিজেই লক্ষ্য রাখা এবং ভাল কাজ অব্যাহত রাখা ও মন্দা কাজ ত্যাগ করা।

১০. দোআ করা : দো‘আ প্রত্যেক মুমিনের প্রধান হাতিয়ার এবং অন্তরের কঠিনতা থেকে পরিত্রাণকারী। অন্তরের চিকিৎসার জন্য নিম্নোক্ত দো‘আটি পড়া যায়, যা রাসূল (ছাঃ) করতেন, اللَّهُمَّ مُصَرِّفَ الْقُلُوْبِ صَرِّفْ قُلُوْبَنَا عَلَى طَاعَتِكَ.

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা মুছার্রিফাল কুলূব ছাররিফ কুলূবানা ‘আলা তা‘আতিক’। অর্থ: ‘হে হৃদয় সমূহকে পরিবর্তনকারী! আমাদের হৃদয়গুলিকে আপনার আনুগত্যের দিকে ঘুরিয়ে দিন’।[মুসলিম, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৪৭০, মিশকাত হা/৮৯।] অন্য হাদীছে এসেছে, يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوْبِ ثَبِّتْ قَلْبِىْ عَلَى دِيْنِكَ. ‘হে অন্তরের পরিবর্তনকারী! আপনি আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের উপর স্থির রাখুন’।[তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১০২।]

পরিশেষে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা,  তিনি  যেন আমাদেরকে অন্তরের কঠিনতা থেকে রক্ষা করে সুস্থ অন্তর নিয়ে তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়ার তাওফীক্ব দান করেন- আমীন।

আল্লাহর ভয়ের নামই তাকওয়া

 

পৃথিবীতে আল্লাহর হুকুম মেনে চলার মধ্যেই মানব পরিচয়ের সার্থকতা। কিন্তু মানুষের পক্ষে প্রায়শই সেটা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে তিনটি শক্ত প্রতিপক্ষ মানুষকে বাঁধা প্রদান করে। সেগুলো হলো ১. নিজের প্রবৃত্তি,২. পার্থিব মোহ ও ৩. শয়তানের প্রতারণা।

এই তিনটি কঠিন প্রতিকূলতার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে আল্লাহপ্রদত্ত দায়িত্বসমূহ সঠিকভাবে পালন করতে মানুষের প্রয়োজন ইস্পাতকঠিন মানসিক শক্তি। কারণ শয়তান সর্বদা মানুষকে আল্লাহর আদেশের বিরুদ্ধে চলতে প্ররোচিত করে। তার নিজের প্রবৃত্তি সব সময় আকর্ষণীয় বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়, কিন্তু হালাল হারামের কোনো বাছ-বিচার সে করে না। আর পৃথিবীর যাবতীয় চিত্তাকর্ষক বিষয় মানুষকে আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধাচারণে উদ্বুদ্ধ করে। চলমান জীবনের বাস্তবতায় বজ্রকঠিন মানসিক শক্তি ছাড়া কোনো মানুষের পক্ষে আল্লাহর বিধানের ওপর টিকে থাকা সম্ভব নয়। মানুষকে সেই মানসিক শক্তি যোগায় তাকওয়া নামক তার আত্মার এক সুকোমল বৃত্তি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর সামনে (হাশরের ময়দানে) দন্ডয়মান হওয়াকে ভয় করবে আর প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখবে জান্নাত হবে তার ঠিকানা।’

মানুষের মাঝে তাকওয়ার মহৎ গুণটি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহতায়ালা তার মুমিন বান্দার ওপর মাহে রমজানের রোজা ফরজ করেছেন। এ বিষয়ে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’(সুরা বাকারা : ১৮৩)

তাকওয়া আরবি শব্দটির আভিধানিক অর্থ ভয় করা। পরিভাষায় তাকওয়া বলতে মানব মনের এমন এক প্রবৃত্তিকে বোঝায় যা মুমিন ব্যাক্তিকে সর্বদা আল্লাহর ভয়ে ভীত রাখে। সে সদা সর্বদা এই ভয়ে ভীত থাকে যে জীবনের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র কোনো কাজেও যদি আল্লাহর হুকুম অমান্য করা হয়, তা হলেও কিয়ামতের দিন সেজন্য জবাবদিহি করতে হবে এবং জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। তাই মুমিন ব্যাক্তি সবসময় নিজের আত্মার বাধ্যবাধকতায় নিজ জীবনের যাবতীয় কর্মকান্ড খোদায়ি বিধাণের আলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। অতএব বলা যায়, তাকওয়ার অর্থ হলো  জীবনকে আত্মনিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। অন্যভাবে বললে, মুমিনের আচরণ নিয়ন্ত্রণে আইন, প্রশাসন বা সামাজিক দন্ডের কোনো প্রয়োজন হয় না। তার আত্মার শক্তি অর্থাৎ তাকওয়াই তার সমুদয় আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এই তাকওয়াই হলো রোজার প্রধান শিক্ষা। একজন রোজাদার যদি লোক চক্ষুর আড়ালে খায় বা পান করে অথবা যৌনাচারে লিপ্ত হয় তা হলে তাকে কেউই বাঁধা দিতে পারে না। কিন্তু সে শুধুমাত্র আল্লাহর ভয়ে এসব তা করা থেকে বিরত থাকে। এভাবে দীর্ঘ একমাস মহান আল্লাহর আদেশে দিনের বেলায় হালাল খাদ্য, পানীয় ও  বৈধ বিবাহিত স্ত্রীর একান্ত সান্নিধ্য বর্জন করার মাধ্যমে প্রত্যেক মুমিন তার জীবনে সমস্ত নিষিদ্ধ বিষয় থেকে আত্মরক্ষার স্থায়ী অভ্যাস গড়ে তুলবে অর্থাৎ তাকওয়া অর্জন করবে এটাই রোজার প্রধান শিক্ষা।

তাকওয়া সম্পর্কে কিছু জরুরি কথা সকল মুমিন-মুসলমানের স্মরণ রাখা দরকার। তাকওয়া না থাকলে ঈমান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মানুষের পক্ষে যে কোনো পাপ কাজ করা স্বাভাবিক হয়ে যায়। হাদিসে এসেছে, হজরত রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত মুত্তাকিদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না; যতক্ষণ না সে গুনাহে নিমজ্জিত হওয়ার আশঙ্কায় ওই সমস্ত কাজও বর্জন না করে যে সব কাজ সন্দেহপূর্ণ। যাতে কোনো গুনাহ নাই।  (তিরমিজি

তাকওয়া ঈমানকে পরিপূর্ণ করে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করে এবং তার শাস্তি থেকে আত্মরক্ষা করে তারাই হলো সফলকাম।’ [সূরা নূর : ২৪ 

তাকওয়া মুমিনের সম্মান বৃদ্ধি করে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মানব সকল! আমি তোমাদেরকে একজন মাত্র নারী ও পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিতি অর্জন করতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সব থেকে বেশি সম্মানিত ওই ব্যক্তি যে বেশি মুত্তাকি। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন এবং সব বিষয়ে অবহিত।  সূরা হুজরাত : ১৩

তাকওয়ার স্থান অন্তরে। হজরত আবু হুরায়রা রা. একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করবে না, তাকে অসহায় অবস্থায় পরিত্যাগ করবে না এবং তাকে তুচ্ছজ্ঞান করবে না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা. নিজের বুকের দিকে ইশারা করে বলেন, তাকওয়া এখানে।’  মুসলিম

তাকওয়া অর্জন করা মহান আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া সম্ভব নয়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বর্ণনা করেছেন, হজরত রাসূলুল্লাহ সা. দোয়া প্রসঙ্গে বলতেন, হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে হেদায়েত, তাকওয়া, পবিত্রতা ও অমুখাপেক্ষিতা প্রার্থনা করছি। সহিহ মুসলিম

রমজান মাস তাকওয়ার অনুশীলনের মাস। তাই বাহ্যিক অনুশীলনের সঙ্গে সঙ্গে মহান আল্লাহর দরবারে তাকওয়ার জন্য দোয়া করাও আবশ্যক।

 

 

তাওবা করার লাভ ও উপকারিতা

১. তাওবা দ্বারা গুনাহ মাফ হয়ে যায়ঃ

কেউ হয়ত বলতে পারেন, আমি তাওবা করতে চাই কিন্তু তাওবা করলে আমার লাভ কি? এবং কে আমাকে নিশ্চয়তা দেবে যে, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন? আমি সঠিক পথে চলতে চাই কিন্তু আমার মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে, যদি আমি নিশ্চিতভাবে জানতে পারতাম যে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন তাহলে আমি তাওবা করতাম?

আমি তাকে বলব, আপনার ভিতরে যে অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে সে অনুভূতি ইতঃপূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল। আপনি যদি মনোযোগ সহকারে নিম্নোক্ত দুটি রেওয়ায়েত পড়েন, তাহলে আপনার মনের প্রশ্ন আশা করি দূর হয়ে যাবে।

প্রথমত: ইমাম মুসলিম আমর ইবনে আ’স রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা বর্ণনা করেন। তাতে উলে¬খ করা হয়েছে, তিনি বলেন:

“মহান আল্লাহ যখন আমার অন্তরে ইসলামকে পছন্দনীয় করে দিলেন, তখন আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট গিয়ে বললাম, আপনি আপনার হাত বাড়ান আমি বাইয়াত করবো। তখন তিনি হাত বাড়ালে আমি হাত গুটিয়ে নেই। তিনি বলেন, হে আমর তোমার কি হল? আমি বললাম, আমি শর্ত করতে চাই। তিনি বলেন, কিসের শর্ত? বললাম, আমাকে যেন ক্ষমা করে দেয়া হয়। তিনি বললেন, হে আমর! তুমি কি জাননা যে, ইসলাম পূর্বের সবকিছু ধ্বংস করে দেয় এবং হিজরত পূর্বের সমস্ত গুনাহ ধ্বংস করে দেয়।

দ্বিতীয়ত: সহীহ মুসলিমে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:

কিছু মুশরিক লোক মানুষ হত্যা করে এবং তারা অনেক হত্যাকান্ড ঘটায়, জিনা করে এবং অনেক ব্যভিচার করে এরপর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলে, আপনি যা বলেন এবং যার দিকে আহ্বান করেন তা অতি উত্তম। এখন আপনি যদি আমাদেরকে জানাতেন যে, আমরা যা করেছি এর কি কাফ্ফারা রয়েছে? তখন আল্লাহর এ বাণী নাযিল হয়:

“আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন মা’বুদের উপাসনা করে না এবং আল্লাহ যাকে [হত্যা করা] হারাম করে দিয়েছেন, তাকে হত্যা করে না, শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতীত এবং তারা ব্যভিচার করে না, আর যে ব্যক্তি এরূপ কাজ করবে, তাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। কিয়ামাতের দিন তার শাস্তি বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং সে তাতে অনন্তকাল লাঞ্ছিত অবস্থায় থাকবে। কিন্তু যারা তাওবা করবে এবং ঈমান আনবে আর নেক কাজ করতে থাকবে আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দিবেন। আর আল্লাহ বড়ই করুণাময়।

এবং এ আয়াতটিও নাযিল হয়:

“আপনি বলে দিন, [আল্লাহ বলেন] হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর অত্যাচার করেছো, তোমরা আল্লাহ তা’আলার রহমত হতে নিরাশ হয়ো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ [অতীতের] সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করবেন। নিশ্চয় তিনি বড়ই ক্ষমাশীল, দয়ালু।”

হে মুসলিম ভাই! আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, তাওবা দ্বারা শুধু গুনাহ মাপ হয় না বরং তাওবা আরও অনেক ফায়েদা ও লাভ রয়েছে। যেমন-

২. তাওবা দ্বারা আল্লাহর ভালো বাসা ও মহব্বত লাভ হয়:

আল্লাহ তা’আলা তাওবাকারীকে মহব্বত করেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদেরকে ভালবাসেন এবং ভালবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে”।

৩. দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা অর্জন:

তাওবা দ্বারা একজন বান্দা দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“হে মুমিনগণ, তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার”।

৪. গুনাহগুলোকে নেকী দ্বারা পরিবর্তন করে দেয়া হয়:

বান্দা যখন তার অপরাধ বুঝতে পেরে সত্যিকার তাওবা করে, তখন আল্লাহ তা’আলা শুধু তার গুনাহকেই ক্ষমা করবেন না, বরং গুনাহগুলোকে নেকী দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আপনি মহান আল্লাহ তা’আলার এ বাণীকে একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন, তাতে আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের কী সু-সংবাদ দিচ্ছেন:

“তবে যে তাওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু”।

একটু ভালভাবে চিন্তা করে দেখুন এ বাণীটি, “তাদের পাপকে আল্লাহ নেকীতে পরিবর্তন করে দিবেন”। এতে আপনার নিকট মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের কথাই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে। আলেমগণ বলেন, পরিবর্তন দুভাবে হতে পারে:

এক: খারাপ গুণকে ভালগুণে পরিবর্তন করে দেয়া। যেমনÑ তাদের শিরককে ঈমানে পরিবর্তন করে দেয়া এবং ব্যভিচারকে পবিত্রতা ও চারিত্রিক সততায়, মিথ্যাকে সত্যবাদিতায় এবং খিয়ানতকে আমানদারীতা দ্বারা পরিবর্তন করে দেয়া।

দুই: তারা যে পাপ করেছে তা কিয়ামতের দিন নেকীতে রূপান্তরিত করে দেয়া। আপনি একটু ভাল করে পাঠ করুন, তাদের পাপকে নেকীতে পরিবর্তন করে দিবেন। তিনি একথা বলেননি প্রত্যেক পাপের স্থান নেকীতে পরিবর্তন করবেন। কেননা হতে পারে কম বা সমান অথবা বেশীতে পরিবর্তন করে দিবেন। এটা নির্ভর করছে তাওবাকারীর নিষ্ঠা ও পূর্ণতার উপর। আপনি কি এর চেয়ে উত্তম অনুগ্রহ আরো আছে বলে মনে করেন? আপনি মহান প্রভূর বাণীর উত্তম ব্যাখ্যা দেখুন নিম্নোক্ত হাদীসে:

“আবদুর রহমান বিন জুবাইর আবু তালীব শাতবুল মামদুদ হতে বর্ণনা করেন, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আসেন। অন্য বর্ণনায় এসেছে, একজন খুবই বৃদ্ধ ব্যক্তি লাঠিতে ভর দিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসেন যার চোখের পাতা তার চোখের সাথে লেগে গিয়েছিল। তিনি রাসূলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলেন, যদি কোন লোক সব ধরনের পাপ করে থাকে, এমন কোন পাপ নেই যা সে করেনি [ছোট বড় সব ধরনের পাপই করেছে]।

[অপর বর্ণনায় এসেছে যে, সে সব পাপই করেছে, তার পাপ যদি দুনিয়াবাসীর উপর বন্টন করে দেয়া হত তাহলে তাদেরকে ধ্বংস করে দিত] এর কি তাওবা করার সুযোগ রয়েছে? তিনি বললেন, আপনি কি ইসলাম গ্রহণ করছেন? সে বলল, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য মাবুদ নেই এবং নিশ্চয় আপনি আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন, ভাল কাজ করবেন এবং মন্দ [পাপ] কাজ পরিত্যাগ করবেন তাহলে আল্লাহ তা’আলা আপনার জন্য সব পাপকে ভাল কাজে পরিণত করে দিবেন। সে বলল, আমার গাদ্দারী ও কুকীর্তি সমূহ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। বর্ণনাকারী বলেন, সে বার বার আল্লাহু আকবার [আল্লাহ মহান] ধ্বনি উচ্চারণ করছিল যতক্ষণ না সে চোখের আড়াল হয়ে যায়”।

এখানে তাওবাকারী হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন, আমি ছিলাম পথভ্রষ্ট, নামায পড়তাম না, ইসলামের গন্ডির বাইরে ছিলাম, আমি কিছু ভাল কাজও করেছি, এখন তাওবা করার পর এগুলো কি ধরা হবে, নাকি সব হাওয়া হয়ে যাবে?

আপনার প্রশ্নের জবাব হল, উরওয়া ইবনে জুবাইর হতে বর্ণিত হাদীসটি। তিনি বলেন,

হাকীম ইবনে হিজাম তাকে জানিয়েছেন যে, তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি জাহেলিয়াতের যুগে দান-খয়রাত, গোলাম মুক্ত করা, আত্মীয়তা রক্ষা করা ইত্যাদি নেকীর কাজ করতাম। আমি কি এতে নেকী পাব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তুমি ইসলাম গ্রহণ করেছো, পূর্বেরগুলোকে উত্তম ভাবেই পাবে।” [বুখারী]

সুতরাং, এসব পাপ ক্ষমায় পরিবর্তন করে দেয়া হবে এবং এসব জাহেলিয়াতের যুগের নেকী তাওবার পরে ঠিক রাখা হবে। তাহলে আর কি-ইবা বাকী থাকলো?

৫. তাওবা দ্বারা জান্নাত লাভ হয়:

তাওবা জান্নাতে প্রবেশের কারণ হয়। আল্লাহ তা’আলা তাওবাকারীদের গুনাহ ক্ষমা করবেন এবং তাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর, খাঁটি তাওবা; আশা করা যায় তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত”।

আল্লাহ তা’আলা আরও বলেন,

“আর যারা কোন অশ্লীল কাজ করলে অথবা নিজদের প্রতি যুলম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা চায়। আর আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ ক্ষমা করবে ? আর তারা যা করেছে, জেনে শুনে তা তারা বার বার করে না। এরাই তারা, যাদের প্রতিদান তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতসমূহ যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর আমলকারীদের প্রতিদান কতই না উত্তম!

৬. দুনিয়াতে উত্তম জীবন উপকরণ ও আখেরাতে উত্তম প্রতিদান লাভ হয়:

আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে করীমে এরশাদ করেন-

“আর তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও। তারপর তার কাছে ফিরে যাও, (তাহলে) তিনি তোমাদেরকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত উত্তম ভোগ-উপকরণ দেবেন এবং প্রত্যেক আনুগত্যশীলকে তাঁর আনুগত্য মুতাবিক দান করবেন”।

অর্থাৎ, দুনিয়াতে তাকে উত্তম ভোগ উপকরণ দান করবেন আর তার ইবাোত ও আনুগত্য অনুযায়ী তাকে প্রতিদান দেবেন।

৭. আসমান থেকে সময়মত বৃষ্টি ও তোমাদের শক্তি দান করবেন:

আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে হুদ আ. এর ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, হুদ তার সম্প্রদায়ের লোকদের বলছিল,

“হে আমার কওম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও অতঃপর তার কাছে তাওবা কর, তাহলে তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি পাঠাবেন এবং তোমাদের শক্তির সাথে আরো শক্তি বৃদ্ধি করবেন। আর তোমরা অপরাধী হয়ে বিমুখ হয়ো না”।

৮. দু’আ কবুল হয়:

আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে সালেহ আ. এর ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সালেহ তার সম্প্রদায়ের লোকদের বলছিল

আর সামূদ জাতির প্রতি (পাঠিয়েছিলাম) তাদের ভাই সালিহকে। সে বলল, ‘হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে এবং সেখানে তোমাদের জন্য আবাদের ব্যবস্থা করেছেন । সুতরাং তোমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাও, অতঃপর তাঁরই কাছে তাওবা কর। নিশ্চয় আমার রব নিকটে, সাড়াদানকারী’।

৯. তাওবার দ্বারা যাবতীয় বলা-মুসিবত ও আল্লাহর আযাব দূর হয়:

আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেন-

আর আল্লাহ এমন নন যে, তাদেরকে আযাব দেবেন এ অবস্থায় যে, তুমি তাদের মাঝে বিদ্যমান এবং আল্লাহ তাদেরকে আযাব দানকারী নন এমতাবস্থায় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করছে। সূরা আনফাল, আয়াত:

তাওবার দ্বারা পেরেশানি দূর হয়, বিপদ থেকে মুক্ত পায় এবং রিযিক বৃদ্ধি পায়:

আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রা. হতে হাদিস বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা. এরশাদ করেন

“যে ব্যক্তি বেশি বেশি করে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থণা করে, আল্লাহ তা’আলা তার সমস্ত পেরেশানীকে দূর করে দেয়, সকল বিপদ থেকে উদ্ধার করে এবং তাকে তার ধারণাতীত রিযিক দান করে”।

তাওবার ক্ষেত্রে রাসূল সা. এর অনুসরণ

আল্লাহ তা’আলা রাসূল সা. এর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের যাবতীয় সব গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। তার তাওবা করা জরুরি নয়। তারপরও তিনি বলেন, হে মানুষ তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে যাও এবং তার কাছে ক্ষমা চাও। কারণ, আমি দৈনিক একশত বার আর দরবারে ক্ষমা চাই। তিনি আরও বলেন, আমি দৈনিক সত্তুরের অধিক আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাওবা করি। আর আমাদের জন্য রাসূলের অনুকরণ করা ও তার সূন্নাতের অনুসরণ করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ ও উত্তম আদর্শ। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

একটি মজলিসের মধ্যে রাসূল সা. ‘হে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা কর, আমার তাওবা কবুল কর, নিশ্চয় তুমি ক্ষমা কারী ও তাওবা কবুল কারী’ এ কথাটি একশ বারের অধিক বলতেন বলে সাহাবীরা গণনা করেন।

সূরা নাসর নাযিল হওয়ার পর যত সালাত আদায় করতেন, সব সালাতে তিনি এ দুআ পড়তেন।

তিনি আরও বলেন, তোমাদের কাউকে তার আমল নাজাত দেবে না। সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল আপনাকেও নাজাত দেবে না? তিনি বললেন, না আমাকেও না, তবে যদি আল্লাহ তা’আলা তার রহমত ও দয়া দ্বারা আমাকে ডেকে নেন।

সুতরাং আমাদের রাসূল এর অনুসরণ করতে হবে এবং তার সাহাবীরা কিভাবে তাওবা করেছে তা অনুকরণ করতে হবে। নিম্নে দুই সাহাবীর প্রসিদ্ধ দুটি ঘটনা উল্লেখ করছি।

সাহাবীদের তাওবা

মনে রাখবেন, সাহাবীরা ছিল উম্মতের আদর্শ। তারা যখন কোন ভুল করতেন, সাথে সাথে তারা তার থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে যেতেন এবং গুনাহ হতে পবিত্র হওয়ার জন্য তারা অস্থীর হয়ে যেতেন। তারা তাদের নিজেদের অপরাধ স্বীকার করতেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে তা প্রকাশ করতে কোন প্রকার কুন্ঠাবোধ করতেন না। আমরা এখানে এ উম্মতের প্রথম যুগের রাসূলের সাহাবীদের তাওবার কয়েকটি ঘটনা উদাহরণ স্বরূপ উলে¬খ করবো।

মায়েয ইবনে মালেক আল আসলামীর রা. এর তাওবা:

এক Ñ বুরায়দা রাদিয়াল্লাহু তা’আল আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মায়েয ইবনে মালেক আল আসলামী রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার আত্মার উপর জুলুম করেছি, আমি জিনা করেছি। আমি চাই আপনি আমাকে পবিত্র করুন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্প্রদায়ের নিকট লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করলেন যে, তার মানসিক কোন সমস্যা আছে বলে তোমাদের কাছে খবর আছে কি? তারা বলল, আমরা তো এ ধরনের কিছু জানিনা। তাকে আমরা পূর্ণ জ্ঞানবানই দেখছি। আমাদের দৃষ্টিতে সে একজন সুস্থ মানুষ। এরপর সে তৃতীয়বার আবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসে এবং রাসূল আবার তার গোত্রের নিকট লোক পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করেন। তারা জানায়, তার কোন মানসিক সমস্যা নেই। অতঃপর যখন সে চতুর্থবার আসে তখন তার জন্য গর্ত খুঁড়া হয়, পাথর ছুঁড়ে হত্যার মাধ্যমে তার শাস্তি কার্যকর করা হয়।

দুই- গামেদিয়া [গামেদিয়া গোত্রের জনৈকা মহিলা] এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি ব্যভিচার করেছি, আপনি আমাকে পবিত্র করুন! রাসূল তার কথার প্রতি কোন কর্ণপাত করলেন না এবং তিনি তাকে ফিরিয়ে দিলেন। পরের দিন সে আবার এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! কেন আপনি আমাকে ফেরত পাঠালেন? হয়তো আপনি আমাকে মায়েযের মত ফেরত পাঠাচ্ছেন! আল্লাহর শপথ! আমি অবৈধভাবে গর্ভবতী। তখন তিনি তাকে বললেন, যখন সন্তান প্রসব করবে, তখন এস। সন্তান জন্ম দেবার পর বাচ্চাটিকে একটি কাপড়ে জড়িয়ে নিয়ে মহিলা রাসূলের নিকট হাজির হলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, যাও যখন সে খাবার খেতে পারবে তখন আসবে। এরপর যখন বাচ্চা খাবার খেতে শুরু করে তখন মহিলা তার সন্তানকে নিয়ে এসে হাজির হন, তখন বাচ্চার হাতে এক টুকরা রুটি ধরা ছিল। সে বলে, হে আল্লাহর রাসূল! বাচ্চা এখন খাবার খাচ্ছে। অতঃপর তার বাচ্চাটাকে একজন মুসলমানের জিম্মায় দেয়া হল। এরপর তার বুক পর্যন্ত গর্ত খুঁড়তে নির্দেশ দেয়া হল। এরপর লোকদের নির্দেশ দেয়া হল যেন পাথর ছুঁড়ে হত্যার মাধ্যমে তার শাস্তি কার্যকর করা হয়। খালিদ ইবনে অলিদ একটা পাথর ছুঁড়ে তার মাথায় মারেন, যার ফলে রক্ত ছুটে খালিদের মুখে এসে পড়ে, এজন্য খালিদ তাকে গালি দেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার গালি শুনতে পেয়ে বলেন, ধীরে, হে খালিদ! আমার জীবন যে সত্ত্বার হাতে রয়েছে তার কসম করে বলছি। এ মহিলা এমন তাওবা করেছে, যদি এ তাওবা কোন অবৈধ ট্যাক্স আদায়কারী করত, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হত। এরপর নির্দেশ দেয়া হয় এবং তার জানাযা পড়ে তাকে দাফন করা হয়।

এক বর্ণনায় এসেছে, উমার রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তাকে রজম [পাথর ছুড়ে হত্যা] করলেন এরপর তার আবার জানাযা পড়বেন? তখন তিনি বললেন, সে এমন তাওবা করেছে তা যদি মদীনার সত্তর জন লোকের মাঝে বন্টন করে দেয়া হত, তাহলে তা তাদের গুনাহ মাপের জন্য যথেষ্ট হত। তুমি কি এর চেয়ে আর কাউকে উত্তম দেখেছ, যে আল্লাহর উদ্দেশ্যেই নিজের জীবন নিয়ে উপস্থিত হয়েছে”?।

আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না

আপনি হয়তো আমাকে বলতে পারেন, আমি তাওবা করতে চাই কিন্তু আমার গুনাহের পরিমাণ অনেক বেশী, আমি আমার জীবনে যত রকমের গুনাহ আছে, তা সবই আমি করেছি। আমি জীবনে অনেক বড় বড় পাপ কামাই করেছি। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিগত এত বছরের সব পাপ কি আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন?

হে সম্মানিত পাঠক ভাই! আপনাকে আমি বলছি, এটি বিশেষ কোন সমস্যা নয় বরং এটা অনেকেরই সমস্যা যারা তাওবা করতে চায়। গুনাহ যত বড় হোক না কেন, আল্লাহর রহমত ও দয়া তার চেয়ে অনেক বড়। আল্লাহ তা’আলা সব ধরনের পাপকেই ক্ষমা করবেন।

আল্লাহ তা’আলা কুরানে করীমে স্বীয় বান্দাদের সম্বোধন করে বলেন,

“বলে দাও যে, [আল্লাহ বলেন] হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের উপর অত্যাচার করেছো, তোমরা আল্লাহ তা’আলার রহমত হতে নিরাশ হয়ো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ [অতীতের] সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করবেন; নিশ্চয়ই তিনি বড়ই ক্ষমাশীল, দয়ালু। আর তোমরা তোমাদের রবের দিকে প্রত্যাবর্তন কর এবং তার নিকট আত্মসমর্পণ কর আযাব আসার পূর্বেই, অতঃপর আর তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না”।

আল্লাহ তা’আলা বান্দাদের আল্লাহর রহমত থেকে হতাশ হতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ মানুষকে ক্ষমা করবেনই। আনাস বিন মালেক রাদিয়াল্লাহ আনহু হতে হাদিসে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,

أআমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আল্লাহ তা’আলা বলেন, হে আদম সন্তান! যখনই তুমি আমাকে ডাকবে ও আশা করবে, আমি তোমার মধ্যে যে সব দোষ ত্রুটি আছে, সেগুলো নির্বিঘ্নে ক্ষমা করে দেব। হে আদম সন্তান! যদি তোমার গুনাহের স্তুপ আসমান পর্যন্ত পৌঁছে, তারপর তুমি আমার নিকট ক্ষমা চাইলে, আমি নির্বিঘ্নে তোমাকে ক্ষমা করে দেব। হে আদম সন্তান! যদি তুমি জমিন ভর্তি গুনাহ করে থাক, তারপর যে অবস্থায় তুমি আমার সাথে কাউকে শরিক করোনি সে অবস্থায় তুমি আমার নিকট আসলে, আমি তোমার কাছে জমিন ভর্তি ক্ষমা নিয়ে উপস্থিত হব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও এরশাদ করেন,

“একজন বান্দা রাতে যে সব অপরাধ করে, তা ক্ষমা করার জন্য আাল্লাহ তা’আলা সারা হাত পেতে রাখেন, আর দিনের বেলা যে সব অপরাধ করে, তা ক্ষমা করার জন্য আল্লাহ তা’আলা রাতে হাত পেতে দেন। এটি ততদিন পর্যন্ত চলতে থাকবে, যেদিন সূর্য্ পশ্চিম দিক থেকে উদয় হবে”।

মোট কথা পাপের পরিমাণ যত বেশী হোক না কেন আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই ক্ষমা করবেন। কিন্তু তারপরও আমাদের অন্তরে এ অনুভূতি জাগে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করবেন কিনা? এ অনুভূতি জাগ্রত হওয়া কারণ হচ্ছে:

প্রথমত: আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার ব্যাপকতা সম্পর্কে বান্দার অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস না থাকা। এর ব্যাখ্যা হিসেবে মহান আল্লাহর এ বাণীই যথেষ্ট হবে:

“নিঃসন্দেহে আল্লাহ [অতীতের] সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করবেন; নিশ্চয়ই তিনি বড়ই ক্ষমাশীল, দয়ালু”।

দ্বিতীয়ত: আল্লাহর রহমত যে কত ব্যাপক সে সম্পর্কে ঈমানে ঘাটতি থাকা। এক্ষেত্রে নিম্নের হাদীসে কুদসীই যথেষ্ট। মহান আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি জানলো যে, আমি গুনাহ মাফ করার ক্ষমতা রাখি তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেব এ ব্যাপারে কোন কিছুতেই পরওয়া করবো না, যদি সে আমার সাথে কোন কিছু শরীক [অংশীদার] না করে থাকে”। এটি হবে, যখন বান্দা আল্লাহর সাথে পরকালে সাক্ষাত করবে।

তৃতীয়ত: তাওবার কার্যকর ক্ষমতা সম্পর্কে এ ধারণা না থাকা যে, তা সব গুনাহকেই ক্ষমা করে দিতে পারে। এক্ষেত্রে রাসূলের এ হাদীসই যথেষ্ট, “যে ব্যক্তি তাওবা করবে তার যেন কোন গুনাহ থাকবে না।”

ক্ষমাকে যারা খুব কঠিন বলে মনে করে এবং চিন্তা করে, আল্লাহ কঠিন পাপ ক্ষমা করবেন কিনা? তাদের জন্য নিম্নোক্ত হাদীসটি পেশ করছি।

তাওবার প্রতিবন্ধকতা

১- শয়তান মানুষের সামনে গুনাহগুলো সু-শোভিত করে তুলে এবং প্রিয় বানিয়ে দেয়। ফলে বান্দার অন্তর গুনাহের কর্মের দিক অগ্রসর ও ধাবিত হয়। আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করা হতে পলায়ন করে এবং ইবাদাত বন্দেগী করা তার নিকট কষ্টকর হয়।

২- হারামকে হালাল হিসেবে তুলে ধরে এবং হালালকে হারাম হিসেবে তুলে ধরে শয়তান বান্দাকে ধোকায় ফেলে দেয়। এ ছাড়াও ভালো কাজকে খারাপ এবং খারাপ কাজকে ভালো হিসেবে প্রকাশ করে শয়তান মানুষকে ধোকা দেয়। ফলে তার আর তাওবা করার সুযোগ হয় না। সে যে অন্যায় করছে, তা সে বুঝতেই পারে না।

৩- শয়তান বান্দাকে তাওবা থেকে ফিরানোর জন্য তারা তাকে বিভিন্ন ধরনের আশা দিয়ে থাকে। শয়তান বান্দাকে বলতে থাকে, তুমি তাওবা করতে এত তাড়াহুড়া করছ কেন? তোমারতো তাওবা করার এখনো অনেক সময় আছে। তুমি এখনো যুবক, পড়া লেখা শেষ করোনি, চাকুরি পাওনি ইত্যাদি। এরপর যখন চাকুরি পায় তখন বলে এখনো বিবাহ করোনি ইত্যাদি বলে শয়তান মানুষকে তাওবা থেকে ফিরিয়ে রাখে। এ ধরনের সমস্য সামনে আসলে মৃত্যুর কথা স্মরণ করবে। কারণ, মৃত্যু ছোট বড় কাউকেই ছাড়ে না। যে কোন সময় যে কোন বয়সের লোকের মৃত্যু এসে যেতে পারে। তখন আর তাওবা করার সুযোগ থাকবে না।

৪- গুনাহকে ছোট মনে করে তাওবা করা হতে বিরত থাকে। যখন কোন একটি গুনাহ করে, তখন শয়তান এসে বলে, এতো বড় ধরনের কোন অপরাধ নয় যে, তা হতে তাওবা করতে হবে। মানুষ এর চেয়ে আরও বড় বড় গুনাহ করে থাকে।

৫- তাওবা করার পর গুনাহ ছেড়ে আল্লাহর আনুগত্যের উপর অবিচল থাকা কষ্টকর হওয়ার কারণে তাওবা করতে মনে চায় না। কারণ, যখন তাওবা করে তখন সাথীরা বলে তুমি এত কষ্ট করছ কেন? তোমার থেকে তোমার সাথীরা দূরে সরে যাচ্ছে, সবাই তোমার বিরুদ্ধে ক্ষেপে যাচ্ছে।

৬- হতাশাও মানুষকে তাওবা থেকে ফিরিয়ে রাখে। কারণ, যখন কোন বান্দাহ গুনাহ করার পর তাওবা করতে চায়, তখন শয়তান এসে বলে, তোমার গুনাহ অনেক বড় যা আল্লাহ কখনোই ক্ষমা করবে না। যদি ক্ষমা নাই করে, তাহলে তাওবা করে লাভ কি? ফলে সে তাওবা করা হতে বিরত থাকে।

উল্লেখিত বিষয়গুলো যখন আপনার সামনে আসবে তখন আমরা আপনাকে বলব, আপনি শয়তানদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করুন। নিশ্চয় শয়তানদের চক্রান্ত খুবই দুর্বল। আপনি শয়তানের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, এসব শয়তান ও তার দোসররা অবশ্যই থেমে যাবে অতঃপর খুব শীঘ্রই তার ষড়যন্ত্র দূর্বল হয়ে পড়বে এবং মুমিনের ধৈর্য ও দৃঢ়তার সামনে সে পরাজিত হবে।

আপনি নিশ্চিত থাকুন যে, আপনি যদি শয়তানের কথা মত চলেন, তার কাছে মাথা নত করেন, তাহলে সে আরো বেশী বেশী ধোকা আপনার বিরুদ্ধে দাঁড় করাবে। সুতরাং পূর্বে ও পরে সর্বাবস্থায় আপনিই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অতএব তার অনুসরণ না করে আল্লাহর সাহায্য চান এবং বলুন:

“আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই আমার উত্তম অভিভাবক”। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতির আশংকা করতেন তখন বলতেন:

“হে আল্লাহ! আমি আপনাকে তাদের গলার উপর ছেড়ে দিচ্ছি এবং আপনার নিকট পরিত্রাণ চাচ্ছি তাদের খারাপী থেকে”।

অনেক সময় দেখা যায় গুনাহের কর্ম ছাড়ার কারণে তার সাথে তার খারাপ বন্ধুরা যাদের সাথে ইতিপূর্বে বন্ধুত্ব ছিল, তারা যোগাযোগ করে তাকে হুমকি দিয়ে বলে, তুমি এতদিন আমাদের সাথে ছিলে এখন কেন আমাদের থেকে দূরে সরে গেলে? আমাদের কাছে তোমার সব গোপন তথ্য আছে যেগুলো আমরা রেকর্ড করে রেখেছি, তোমার ছবিও আমাদের নিকট রয়েছে, তুমি যদি আমাদের সাথে বের না হও তাহলে তোমার পরিবারের নিকট সব ফাঁস করে দিবো! একথা সঠিক যে, আপনার অবস্থান খুবই নাজুক।

এ ধরনের কোন পরিস্থিতির স্বীকার হলে, আপনাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, আল্লাহ মুত্তাকিদের সাথে রয়েছেন, তাওবাকারীদের সাথে রয়েছেন এবং তিনি মুমিনদের অভিভাবক। তিনি তাদেরকে লাঞ্ছিত করবেন না এবং তাদেরকে ছেড়ে দিবেন না। তাঁর নিকট কোন বান্দা আশ্রয় নেয়ার পর সে কখনো অপমানিত হয় না। আপনি জেনে রাখুন, নিশ্চয় কঠিন অবস্থার সাথেই সহজ অবস্থা আসে এবং সংকীর্ণতার পরেই প্রশস্ততা আসে।

হে তাওবাকারী ভাই!

আপনার জন্য একটি ঘটনা উল্লেখ করছি যা আমাদের কথার যথার্থতা প্রমাণ করবে। ঘটনাটি হল, প্রখ্যাত ফেদায়ী [গেরিলা] সাহাবী মারসাদ ইবন আবিল মারসাদ আল গানাবীর, যিনি দুর্বল মুসলমানদেরকে মক্কা থেকে গোপনে মদীনায় নিয়ে আসতেন। তিনি মক্কা থেকে দুর্বল বন্দী লোকদের গোপনে মদীনায় পৌছে দেয়ার ব্যবস্থা করতেন।

মক্কায় একজন নষ্টা মহিলা ছিল যার নাম আনাক এবং সে ছিল তার বান্ধবী। তিনি মক্কার একজন বন্দী লোককে ওয়াদা দিয়েছিলেন মদীনায় পৌছে দেয়ার। তিনি বলেন, এক চাঁদনী রাতে আমি মক্কার এক দেয়ালের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। আনাক আমার ছায়া দেখে এগিয়ে আসে এবং বলে, মারসাদ? আমি বললাম হাঁ, মারসাদ। সে বলল, মারহাবা, স্বাগতম, এস আমার কাছে রাত কাটাও। আমি বললাম, হে আনাক! আল্লাহ ব্যভিচারকে হারাম করেছেন। সে তখন চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো, হে তাবুবাসীরা! এই লোকটি তোমাদের বন্দীদেরকে নিয়ে ভাগতে চায়।

তিনি বলেন, আটজন লোক আমার পিছু নেয় এবং আমি তখন খান্দামা পাহাড়ে [মক্কার প্রবেশ পথের একটি পাহাড়] ঢুকে পড়ে এক গুহায় লুকিয়ে যাই। এরা আমার সন্ধানে আমার কাছে এসে পড়ে, কিন্তু আল্লাহ আমাকে এদের থেকে আড়াল করে রাখেন। তিনি বলেন, এরপর তারা ফিরে যায় এবং আমিও ঐ লোকটির নিকট গিয়ে তাকে বহন করে নিয়ে আসি। লোকটি ছিল বেশ ভারী, আমার অনেক কষ্ট হয়ে ছিল। তাকে কিছু দূরে বয়ে নিয়ে গিয়ে তার হাত পায়ের বাঁধন খুলে ফেলি। আমি অনেক কষ্টে তাকে মদীনায় নিয়ে আসি। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে বলি, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আনাককে বিয়ে করতে পারি? [কথাটি দুবার বললাম] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুপ করে থাকলেন কোন জবাব দিলেন না। তখন এ আয়াত নাযিল হয়:

“ব্যভিচারী পুরুষ ব্যভিচারিণী মহিলাকেই বিয়ে করে অথবা মুশরিকা মহিলাকে এবং ব্যভিচারিণী মহিলা ব্যভিচারী পুরুষ অথবা মুশরিক লোককেই বিয়ে করে থাকে”।

তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে মারসাদ! ব্যভিচারী পুরুষই কেবল ব্যভিচারিণীকে অথবা মুশরিকা মহিলাকে বিয়ে করে থাকে এবং ব্যভিচারিণী মহিলাও একমাত্র ব্যভিচারী পুরুষ অথবা মুশরিক লোককে বিয়ে করে থাকে, সুতরাং তুমি তাকে বিয়ে করো না”।

আপনি দেখলেন কিভাবে আল্লাহ তা’আলা ঈমানদারের পক্ষে প্রতিরোধ গড়লেন এবং তিনি মুহসিনদের [সৎকর্মশীল লোকদের] সাথে কি আচরণ করলেন? অবস্থা যদি খুবই খারাপ হয় যে, আপনি যা আশংকা করছেন তাই ঘটে, আর এর ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে তাহলে আপনি আপনার অবস্থান বর্ণনা করুন, স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিন এবং বলুন, হ্যাঁ, আমি পাপ করতাম। এখন আল্লাহর নিকট তাওবা [প্রত্যাবর্তন] করেছি? এখন তোমরা কি চাও?

আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে যে, প্রকৃত কেলেঙ্কারী তো হল আল্লাহর সামনে কিয়ামতের দিন প্রকাশিত কেলেঙ্কারী। সেই ভয়ানক দিনে যেদিন একশ, দু’শ, হাজার, দু’হাজার লোকের সামনে নয় বিশ্বের সকল মানুষের সামনে, সমস্ত সৃষ্টিকুলের সামনে, ফেরেশতা, জিন ও ইনসান সবার সামনে আদম থেকে শুরু করে দুনিয়ার সর্বশেষ মানুষের সামনে তা ঘটবে।

আসুন আমরা ইবরাহীম আলাইহি ওয়া সাল্লামের দু’আ পাঠ করি:

েআর যেদিন সকলকে উত্থাপিত করা হবে সেদিন আমাকে লাঞ্ছিত করবেন না। যেদিন কোন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি কাজে আসবে না। একমাত্র কাজে আসবে যদি সঠিক অন্তঃকরণ নিয়ে কেউ উপস্থিত হয়”। সংকট মুহূর্তে নবীর শেখানো দু’আ পড়ে নিজেকে হেফাযত করুন:

“হে আল্লাহ! আপনি আমাদের ইজ্জত রক্ষা করুন এবং আমাদের নিরাপদ রাখুন। হে আল্লাহ! আমাদের প্রতিশোধ তাদের উপর ফেলুন যারা আমাদের উপর জুলুম করেছে এবং আমাদেরকে সাহায্য করুন তাদের বিরুদ্ধে যারা আমাদের উপর চড়াও হয়েছে। হে আল্লাহ! আমাদের শত্রুদেরকে ও হিংসুকদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে খুশি হতে দেবেন না।”

আল্লাহর নিকট প্রার্থনা হল আল্লাহ যেন আমাদের ক্ষমা করেন এবং আমাদের তওবা কবুল করেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে এ থেকে রক্ষা করুন। নিশ্চয় তিনি শুনেন ও দোয়া কবুল করেন।

মানুষের কল্যাণে জাকাত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা

 

is (2)

জাকাত ইসলামের অন্যতম মৌলিক একটি ইবাদত। দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে জাকাত একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা। কিন্তু অনেকেই জাকাতের প্রধান নীতিমালা সম্পর্কে সম্যক অবহিত নন ।

পবিত্র কুরআনের বহুসংখ্যক আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা আমাদের ওপর এ দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। কুরআন শরিফের বহু আয়াতে সালাত বা নামাজের নির্দেশের পাশাপাশি জাকাত আদায়ের কথা বর্ণিত হয়েছে। সূরা বাকারায় বর্ণিত হয়েছে ‘মুসলিম নর ও নারী একে অপরের বন্ধু, তারা সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজে বাধা দেয়, সালাত কায়েম করে, জাকাত আদায় করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে। যারা জাকাত আদায় করে না আল্লাহ তাদেরকে কঠিন শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ।

জাকাত ফরজ কার ওপর : জাকাত ফরজ হয়েছে কয়েকটি শর্ত সামনে রেখে। এগুলো হলো সম্পদের মালিকানা সম্পর্কিত এবং অন্য কয়েকটি আবার মালিকানাধীন সম্পত্তি বিষয়ক। যেমন ১. মুক্ত বা স্বাধীন মানুষ, অর্থাৎ ক্রীতদাস নয়; ২. সম্পত্তির মালিককে অবশ্যই একজন মুসলমান হতে হবে; ৩. জাকাত এমন ব্যক্তির ওপর ফরজ হয়, যিনি সুস্থমস্তিষ্ক এবং নিজস্ব ধীশক্তির ওপর যার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। জাকাত কোনো অপ্রকৃতিস্থ মানুষের ওপর ফরজ হয় না; ৪. জাকাত সেসব সম্পদশালীর ওপর ফরজ হয়, যারা প্রাপ্তবয়স্ক; ৫. মালিককে তার সম্পদের পূর্ণ মালিকানা ও দখলের অধিকারী হতে হবে; ৬. সম্পদের প্রকৃত বা অনুমিত বৃদ্ধি হতে হবে। সম্পদের বৃদ্ধি বলতে মূল্যবৃদ্ধিকে বুঝায় যেমন  স্বর্ণ, রৌপ্য বা নগদ অর্থ ব্যবসায়ে বিনিয়োগ হলে মূল্যমান বৃদ্ধি হতে পারে। ৭. অত্যাবশ্যকীয় চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত সম্পদের অধিকারী হতে হবে। অর্থাৎ মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য যেসব সম্পদ যেমনÑ বসতবাড়ি, কাজের যন্ত্রপাতি, কারখানার মেশিনারি, যাতায়াতের বাহন, আসবাবপত্র, পরিধেয় ইত্যাদির ওপর জাকাত দিতে হবে না; ৮. জাকাত দাতাকে ঋণদায় থেকে মুক্ত হতে হবে ।

নিসাব : নিসাব হলো ন্যূনতম সেই পরিমাণ সম্পদ, যার মালিকানার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর জাকাত ফরজ হয়। কোনো ব্যক্তির আর্থিক সামর্থ্যরে ভিত্তিতেই ওই ব্যক্তির ওপর ট্যাক্স আরোপিত হয় এবং তদনুসারেই এর পরিমাণ নিরূপণ করা হয়। অনুরূপভাবে ইসলামী আইনে কোনো ব্যক্তির মালিকানাধীন সম্পদের পরিমাণের ভিত্তিতেই ওই ব্যক্তির জাকাত নিরূপিত হয়। কোনো ব্যক্তি যতক্ষণ পর্যন্ত একটি ন্যূনতম নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক না হন, ততক্ষণ পর্যন্ত ওই ব্যক্তির ওপর জাকাত আদায়যোগ্য নয়। শরিয়া আইনে ওই ন্যূনতম নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদকে নিসাব বলা হয়। ওই ন্যূনতম নির্ধারিত বা ততোধিক পরিমাণ সম্পদের মালিককে জাকাত আদায়ের মাধ্যমে তার সম্পদ গরিব ও দুঃখীদের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়ার উপযুক্ত সম্পদশালী ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিভিন্ন সম্পদের জাকাত : জাকাত প্রযোজ্য হয় এমন সম্পদ হলো সোনা, রুপা, গবাদিপশু, সব ধরনের বাণিজ্যিক পণ্য (ঃৎধফব মড়ড়ফং) ও খনি থেকে আহরিত বা গুপ্তধন। সোনা ও রুপা সম্পর্কিত বিধিবিধান হলোÑ ১. স্বর্ণ : এক বছরের জন্য কমপক্ষে ৮২.০৫ গ্রাম সোনা বা এর সমমূল্যের নগদ টাকার মালিকানার জন্য সংশ্লিষ্ট মালিকের ওপর ২.৫ শতাংশ হারে জাকাত আদায় করা ফরজ। ২. রুপা বা রৌপ্য : এক বছরের জন্য ন্যূনতম ৫৯৫.৩৫ গ্রাম রুপা বা এর সমমূল্যের নগদ টাকার মালিকানার জন্য সংশিষ্ট মালিকের ওপর ২.৫ শতাংশ হারে জাকাত আদায় করা ফরজ। অলঙ্কার, তৈজসপত্র বা অন্য যে আকার বা প্রকারেই থাকুক, তার ওজন ন্যূনতম নির্দিষ্ট পরিমাণ অতিক্রম করলে এবং এসবের মালিকানা একটি পূর্ণ চান্দ্র বছর ধরে বহাল থাকলে ওই সোনা ও রুপার জন্য মালিকের ওপর জাকাত ফরজ হয়ে যায়। ৩. কারেন্সি নোট : কোনো ব্যক্তির কাছে যদি কারেন্সি নোটরূপে নিসাব পরিমাণ সোনা বা রূপা ক্রয়ের মতো যথেষ্ট টাকা থাকে, তবে প্রতি ১২ মাস পরপর তার জাকাত আদায় করতে হবে। ৪. বাণিজ্য পণ্যের জাকাত : ব্যবসায়-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে রক্ষিত দ্রব্যসামগ্রীর পুঁজির জন্য জাকাত আদায় করতে হবে। ৫. শেয়ার সার্টিফিকেটের জাকাত : শেয়ার সার্টিফিকেটের জাকাত বার্ষিক ভিত্তিতে নির্ণয় করতে হবে এসব শেয়ারের নগদে রূপান্তরযোগ্য বাজারমূল্য অনুসারে। এরূপ বাজারমূল্য অবশ্যই পুঁজির অন্তর্ভুক্ত হবে এবং ইসলামের অনুশাসন অনুযায়ী এরূপ মোট মূল্যের জন্য জাকাত আদায় করতে হবে। ৬. কেবল মাঠে সঞ্চরণশীল পশুর মালিকানার জন্য ওই রূপ মালিকদের ওপর জাকাত আদায়যোগ্য। আস্তাবল, গোশালা, খাঁচা বা অনুরূপ বেষ্টনীতে আবদ্ধ যেসব পশু চরে বেড়ায় না, তাদের জন্য জাকাত আদায় করতে হবে না। অল্প বয়সের পশুর জন্য জাকাত একেবারেই আদায়যোগ্য নয়। এ ছাড়া শৌখিন অশ্বারোহণ, চাষবাস অথবা উপার্জন বা পেশাগত কাজে ব্যবহৃত পশুদের মালিকানার জন্যও যাকাত আদায় করতে হয় না। তা ছাড়া সম্পদ পরিবৃদ্ধির আরো যেসব খাত রয়েছে, তা জাকাতযোগ্য, যা এত স্বল্পপরিসরে আলোচনার সুযোগ কম ।

ঋণ দেয়া অর্থের জাকাত : কোনো ব্যক্তি অন্যকে টাকা ধার দিলেও ওই পরিমাণ টাকার ওপর তার মালিকানা বহাল থাকে। তবে ওই খাতক ওই টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত তিনি ওই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার সামর্থ্য উপভোগ করেন না। ইসলামী আইন অনুসারে ধার ও ঋণকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। সাধারণভাবে এগুলো হলো   ১. কাভি বা নিশ্চয়তাসম্পন্ন ঋণ; এরূপ ক্ষেত্রে এমনকি পূর্ণ মেয়াদের জন্য ওই টাকা মহাজনের কাছে পরিশোধিত না হয়ে থাকলেও বা তা খাতকের হাতে রয়ে গেলেও ওই অর্থের মালিকের ওপর জাকাত আদায় করা বিধেয়। ২. মুতাওয়াসসিথ বা দুর্বল নিশ্চয়তাসম্পন্ন; বাণিজ্যিক পণ্য কেনাবেচা বা নগদ টাকা ধার দেয়া ছাড়া অন্যান্য লেনদেন এ প্রকৃতির ধার বা ঋণের অন্তর্ভুক্ত। এ রকম অর্থের মধ্যে পূর্ণ নিসাব পরিমাণ টাকা উদ্ধার হলেই জাকাত আদায়যোগ্য। ৩. জায়িফ বা নিশ্চয়তাবিহীন। এ রকম ক্ষেত্রে ওই রূপ দানের গ্রহীতা ওই দান প্রকৃত হাতে পাওয়ার পর ১২ মাস ধরে তা তার অধিকারে থাকলেই এই সম্পত্তির জন্য তার (গ্রহীতার) ওপর জাকাত আদায়যোগ্য হবে। তার অধিকারের বাইরে ওই সম্পত্তি যত দিন ছিল তত দিনের জন্য এর ওপর জাকাত হবে না ।হীরা, মুক্তা, রতেœর জাকাত : মূল্যবান পাথর তথা হীরা, মুক্তা ও মূল্যবান রতœরাজি বা পাথর যদি ব্যবসায় বা বিনিয়োগের জন্য ব্যবহৃত না হয় তাহলে সেসবের জন্য জাকাত আদায় করতে হবে না। তবে ব্যবসায় বা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত মূল্যবান রতœরাজির জন্য এসবের মালিকের ওপর জাকাত আদায় করার বাধ্যবাধকতা আছে।

বাড়িভাড়ার জাকাত : কারো যদি নিজের বা বৈধ নির্ভরশীলদের বসবাসের জন্য ব্যতীত অন্য গৃহ থাকে এবং তিনি তা অন্যকে ভাড়ায় দেন তাহলে ওই ভাড়া বাবদ প্রাপ্ত নিট আয়ের জন্য তাকে জাকাত আদায় করতে হবে। তবে সে রকম আয়ের পরিমাণ অবশ্যই নিসাব পরিমাণ হতে হবে এবং তা তার কাছে এক বছর ধরে বজায় থাকতে হবে। উল্লেখ্য, সংশ্লিষ্ট ইমারতের মূল্যের জন্য নয়, বরং এরূপ ইমারত থেকে প্রাপ্ত নিট আয়ের জন্যই জাকাত আদায় করতে হয়।যানবাহনের জাকাত : মোটরগাড়ি, ভ্যান, ট্রাক, ঠেলাগাড়ি, ওয়াগন, নৌকা ইত্যাদি যেসব যানবাহন ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় না, সেসবের মূল্যের জন্য জাকাত আদায় করতে হয় না। তবে এসব বাহন থেকে অর্জিত নিট আয় যদি মালিকের কাছে এক বছর ধরে থাকে তাহলে ওই নিট আয়ের জন্য জাকাত আদায়যোগ্য।

যেসব সম্পদের জাকাত দিতে হবে না : প্রত্যেক মানুষের ওপর যেমন জাকাত আদায় করা বাধ্যতামূলক বা ফরজ নয়, তেমনি জাকাতের বিধিবিধানও মানুষের সব ধরনের সম্পদের জন্য প্রযোজ্য নয়। সোনা, রুপা, সঞ্চরণশীল গবাদিপশু, বাণিজ্যিক দ্রব্যস¤ভার ও বাণিজ্য পণ্যাদি জাকাতের বিধিবিধানের আওতায় আসে। এসব ছাড়া অন্যান্য দ্রব্যের জন্য জাকাত প্রযোজ্য নয়। যথা  দালান, সোনা বা রুপা ব্যতিরেকে অন্য উপাদানে নির্মিত তৈজসপত্র, থালাবাসন, আসবাবপত্র, কাপড়চোপড় ইত্যাদি। তবে ব্যবসায় বা বিনিয়োগের অংশ হিসেবে ক্রয়কৃত যেকোনো পণ্য। যথা  ইমারত, গবাদিপশু, থালাবাসন, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদির জন্য জাকাত আদায় করতে হবে।

জাকাত কাদের প্রাপ্য : জাকাতের অর্থ বিতরণের বিষয়ে কুরআন শরিফে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। যারা জাকাত পাবেন তারা হলেন ১. ফকির, অর্থাৎ এরূপ গরিব মানুষ যার সম্পত্তির পরিমাণ নিসাব অপেক্ষা কম; ২. মিসকিন, অর্থাৎ অভাবী, যার রোজগার তার নিজের ও নির্ভরশীলদের অপরিহার্য প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়; ৩. আমিলিন, অর্থাৎ বায়তুল মাল বা কোনো সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণকাজে নিয়োজিত কমচারী; ৪. মুয়াল্লেফাতুল কুলুব, অর্থাৎ শাশ্বত ধর্মে দীক্ষাপ্রাপ্ত সেসব ব্যক্তি, যাদের হৃদয় সত্যের দিকে ধাবমান এবং যাদের জন্য সাহায্য আবশ্যক; ৫. রিকাব, অর্থাৎ ক্রীতদাসের দাসত্ব মোচনের জন্য মুক্তিপণ প্রদান; ৬. গারিমিন, অর্থাৎ ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি; ৭. ইবনুস সাবিল, অর্থাৎ মুসাফিরের পাথেয়, যা অর্থাভাবে বিদেশ-বিভুঁইয়ে আটকে থাকা এমনকি সচ্ছল ব্যক্তির ভ্রমণব্যয় হিসেবেও ব্যবহার করা যায়; এবং ৮. ফি সাবিলিল্লাহ, অর্থাৎ যারা আল্লাহর রাস্তায় নিজেদের নিয়োজিত রাখে বা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কোনো উত্তম কাজে ব্যয় করা ।