কুরআন সুন্নাহর আলোকে রাস্থা-ঘাটে চলা চলের বিধান

হযরত রাসূলে করীম (স) ইরশাদ করেন  তোমরা পথে-ঘাটে আসন গ্রহণ করা পরিত্যাগ কর। সাহাবীগণ বললেন  ইয়া রাসূলাল্লাহ! পথে-ঘাটে বসা আমাদের জন্য অপরিহার্য  হয়ে পড়ে। আমরা সেখানে বসি পারস্পরিক কথা-বার্তা বলি। তখন নবী করীম (স) বলেন তোমরা এই বসা হতে বিরত থাকা  যখন অস্বীকার করছ,তখন বস,তবে সেই সঙ্গে পথের অধিকার পুরাপুরি আদায় কর। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন। পথের অধিকার কি হে আল্লাহর রাসূল!  তিনি  বলেন  দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখা,পীড়ন বন্ধ করা,সালামের উত্তর দেওয়া এবং ভাল-ভাল কাজের আদেশ করা ও মন্দ-নিষিদ্ধ কাজ হতে  বিরত রাখা। (বুখারী,মুসলিম,)

ব্যাখ্যাঃ মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ও সমাষ্টিকতা ছাড়া মানুষের জীবন অচল। এই সামাজিক জীবন মানুষকে অন্যান্য মানুষের সহিত নানাবাবে সম্পর্ক রাখতে হয়। ইহা ছাড়া মানুষের উপায় নাই। মানুষের এই সামাজিক-সামষ্টিক জীবনে রাস্তা-ঘাটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ। কেননা এই রাস্তা-ঘাটে জনগণের পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাৎ হয় । এই সাক্ষাৎই তাহাদের মধ্যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে উঠে। সামাজিক মানুষের পরস্পরের কথা-বার্তা হয় পথে-ঘাটে। জোট বাঁধি  দাঁড়াই থাকা  তাহারা কথা-বার্তা বলে ও নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করে  থাকে। কিন্তু রাস্তা-ঘাটে ভিড় করা বা দাঁড়াই  থাকা অনেক সময় সমাজের  অন্যান্য মানুষের পক্ষে বিশেষ ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায় ।

পথে দাঁড়াইবার এই সব দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সাহাবীগণকে সতর্ক করে  তোলার উদ্দেশ্যে প্রথমে তিনি বলিলেনঃ

রাস্তা-ঘাটের কি অধিকার,তাহা জানতে চাহিলে রাসূলে করীম (স) পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের উল্লেখ করেন। এই পাচঁটি কাজ যথাক্রমেঃ (১) দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখা,(২) কষ্টদান বা পীড়ন উৎপীড়ন বন্ধ করা,(৩) সালামের  জওয়াব দেওয়া,(৪) ভাল ও সৎ পূণ্যময় কাজের আদেশ করা এবং (৫) অন্যায়,মন্দ ও পাপ কাজ হইতে নিষেধ করা।

রাসূলে করীম (স) এই যে পাঁচটি কাজের উল্লেখ করছেন পথ-ঘাটের অধিকার হিসাবে,মূলত ইহা ইসলামী সমাজ জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এই কাজ গুলি না করিলে পথে-ঘাটে বসার অধিকার থাকে না যেমন,তেমন ইসলামী সমাজে বসবাস করাও অধিকার থাকতে  পারে না। পথে-ঘাটে বসার- অন্য কথায় সামাজিক জীবন যাপন করার তোমার যে অধিকার, তাহা যদি তুমি ভোগ করিতে চাও,তাহা হইলে তোমাকে পথ-ঘাট তথা সমাজের অধিকার আদায় করিতেও প্রস্তুত থাকতে  হইবে। ইহা তোমার কর্তব্য। তুমি তোমার অধিকার আদায় করিয়া নিবে,কিন্তু তোমার কর্তব্য তুমি পালন করবে  না,এটা কি করে সন্ভব নয়। ইসলামী জীবন-আদর্শ মানুষ ও পৃথিবকে পারস্পরিক অধিকার কর্তব্য রজ্জুতে শক্ত করিয়া বাঁধিয়া দিয়াছে। এই বন্ধনে একটা হইবে আর অন্যটা হইবে না,তাহা হইতে পারে না। কর্তব্য কয়টির ব্যাখ্যা করিলেই স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায় যে,ইসলামী সমাজের জন্য ইহার সবকয়টি একান্তই অপরিহার্য।

সর্বপ্রথম কর্তব্য হইল চক্ষু নিম্নমুখী রাখা। নিজ চরিত্র নিষ্কুলষ রাকার জন্য চক্ষু নিম্নমুখী রাখা জরুরী। কেননা পথে কেবল পুরুষ লোকই চলাফিরা করে না,মেয়ে লোকও চলা-ফিরা করে।পুরুষরা যদি পথে বসিয়া বা দাঁড়াইয়া থাকিয়া চলাচলকারী স্ত্রীলোকদের প্রতি চক্ষু উন্মীলিত করিয়া রাখে এবং রূপ সৌন্দর্য ও যৌবন দেখে চক্ষুকে ভারাক্রান্ত করে  থাকে,তবে উহার কুফল তাহার চরিত্রে অনিবার্যভাবে প্রতিফলিত হবে।পক্ষান্তরে মেয়ে লোকপথে চলতে গিয়ে যদি অনুভব করে যে,পুরুষদের চক্ষু তাহাদিগকে গিলিয়া ফেলতে ব্যস্ত,তবে তাহাদের মনে কুণ্টা ও সংকোচ আসতে পারে। রাসূলে করীম (স) এই কারণেই সর্বপ্রথম এ কথাটির উল্লেখ করছেন  ।

রাসূলে করীম (স)-এর এই আদেশটি স্পষ্ট ও সরাসরিভাবে কুরআন মজীদ হইতে গৃহীত। আল্লাহ তাআলা নিজেই রাসূলে করীম (স)কে সম্বোধন করিয়া ইরশাদ করেন।

﴿قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا يَصْنَعُونَ * سورة النور30)

হে নবী! মুমিন লোকদের বলে দিন,তাহারা যেন নিজেদের দৃষ্টিকে নিম্নমুখী রাখে এবং তাহাদের লজ্জাস্থানের পবিত্রতা সংরক্ষণ করে। ইহাই তাদের জন্য পবিত্রতর কর্মপন্হা। লোকেরা যাহা কিছু করে সে বিষয়ে আল্লাহ পুরাপুরি অবহিত।(আন নূর৩০)

আয়াতটির আলোকেও বুঝা যায়,চক্ষু অবনত রাখা না হইলে লজ্জা স্থানের পাপ পংকিলতায় পড়ে  যাওয়া সুনিশ্চিত। আর চক্ষু অবনত রাখা হলে উহার সংরক্ষণ অতীব সহজ ও সম্ভব। চরিত্রকে পবিত্র রাখার ইহাই সর্বোত্তম পন্হা। যাহারা নিজেদের দৃষ্টি পরস্ত্রীর উপর অকুণ্ঠভাবে নিবন্ধ করে,তাহারা প্রথমে নিজেদের মন-মগজকে কলুষিত করে এবং পরিণতিতে নিপতিত হয় কঠিন পাপের পংকিল আবর্তে। ইহাই স্বাভাবিক।

এই কারণে সর্বপ্রকার হারাম নিজিস হইতে দৃষ্টি নিচু ও অবনত রাখতে  হবে। এই আদেশ উপরোক্ত কেবলমাত্র পুরুষদের জন্যই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই আদেশ স্ত্রী লোকদের জন্যও। ইহারই পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে

﴿وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنّ .سورة النور31)

আর হে নবী! মুমিন মহিলাদের বলে দাও তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানগুলোর হেফাজত করে  (আন নূর৩০) অতএব পুরুষদের জন্য যেমন ভিন মেয়ে লোক দেখা হারাম,তেমনি স্ত্রীলোকদের জন্যও ভিন পুরষ দেখা হারাম। এই পর্যায়ে রাসূলে করীমের একটি কথা উদ্ধৃত করা আবশ্যক। তিনি বলেন- আত্মসম্মান চেতনা ঈমানের লক্ষণ এবং নারী পুরষের একত্রিত হওয়া মুনাফিকির কাজ।অর্থঃ নারী পুরুষের একত্রে সমাবেশ,নিবিড় নিভৃত একাকীত্বে ভিন নারী পুরুষের একত্রিত হওয়া। ইহা সর্বোতভাবে চরিত্র ধ্বংসকারী অবস্থা।

দ্বিতীয় হইল কষ্টদান বা পীড়ন উৎপীড়ন বন্ধ করা,ইহা হতে বিরত থাকা। ইহার অর্থ পথে চলমান মানুষের সর্বাত্মক নিরাপত্তা বিধান। তুমি পথে বসিয়া বা দাঁড়াই  লোকদিগকে কোনরূপ কষ্ট দিতে পারবে না। কাহাকেও কোন পীড়াদায়ক কথা বলতে পারবে না । এমন কাজও কিছু করতে  পারবে না,যাহাতে মানুষের কষ্ট হয়।

তৃতীয় সালামের জওয়াব দান। অর্থাৎ তুমি পথে বসিয়া বা দাঁড়াই  থাকিলে চলমান মুসলমান তোমাকে সালাম দিবে। তোমার কর্তব্য হইল সেই সালামের জওয়াব দান। এই সালাম দেওয়া ও উহার জওয়াব দেওয়া ইসলামী সমাজ ও সভ্যতা সংস্কৃতির একটা অত্যন্ত জরুরী অংশ। মুসলমান মুলমানকে দেখলে বলবে:  আস-সালামু আলাইকুম। আর ইহার জওয়াবে মুসলমান বলবে : অ-আলাইকুমুস সালাম। ইহা ইসলামের চিরন্তন রীতি। সালাম বিনিময় মুসলমানদের একটা সামাজিক কর্তব্য-ও।

চতুর্থ,আমরু বিল মারূফ-ন্যায়,ভাল ও সৎ কাজের আদেশ করা। মারূফ একটি ইসলামী পরিভাষা। কুরআন মজীদে ইহার ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। আল্লামা আইনী ইহার অর্থ   লিখেছেনঃ মারূফ বলিতে এটা ব্যাপকজিনিস বুঝায়। যাহাই আল্লাহর আনুগত্যের কাজ,যাহাতেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয় এবং জনগণের কল্যাণ সাধিত হয়। আর শরীয়াত যে সব নেক ও কল্যাণময় কাজের প্রচলন করেছে,তাহা সবই ইহার অন্তর্ভুক্ত।

পঞ্চম,মুনকার হতে বিরত রাখা। মারূফ-এর বিপরীত যাহা তাহাই মুনকার। সব রকমের খারাপ,কুৎসিত,জঘন্য, হারাম ও ঘৃণ্য অপছন্দনীয়,তাহা সবই মুনকার-এর মধ্যে শামিল। আবু দায়ূদের বর্ণনায় ইহার সহিত একটি অতিরিক্ত কথা উদ্ধৃত হয়েছে। তাহা হইলঃ পথ দেখাই দেওয়া বা পথের সন্ধান দেওয়া এবং হাচিঁদাতা যদি আল-হামদুলিল্লাহ, বলা।

এই দুইটিও পথের অধিকার ও পথের প্রতি কর্তব্য বলিয়া উল্লেখ করা  হয়েছে। অপর একটি বর্ণনায় এই সঙ্গে আরও একটি কথা উদ্ধৃত হয়েছে। তাহা হইলঃ উত্তম কথা বলা। অর্থাৎ পথে-ঘাটে লোকদের পারস্পরের দেখা সাক্ষাৎ হলে কথা-বার্তা অবশ্যই হইবে। এ কথা-বার্তা খুবই-ই উত্তম এবং ভাল হওয়া বাঞ্ছনীয়। কোনরূপ কটু বা অশ্লীল কথা বলা কিছুতেই উচিৎ হতে পারে না।

তিরমিযী শরীফে এই পর্যায়ে যে হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে তাহার ভাষা এইরূপঃ রাসূলে করীম (স) আনছার গোত্রের কতিপয় লোকের নিকট উপস্থিত হলেন। এই লোকেরা পথের উপরে বসা ছিল। তাহাদেরকে দেখিয়া তিনি বললেনঃ তোমরা যদি এই কাজ একান্ত কর-ই এবং এই কাজ না করিয়া তোমাদের কোন উপায় না-ই থাকে,তাহা হলে তোমরা মুসলমানদের সালামের জওয়াব অবশ্যই দিবে। নিপীড়িত অত্যাচারিত লোকদের সাহায্য সহযোগিতায় সক্রিয়ভাবে আগাইয়া-আসবে এবং পথহারা অন্ধ ও পথভ্রান্ত লোকদেরকে অবশ্যই পথ দেখাবে।

মূল কথা হইল,পথের উপর বসা যথার্থ কাজ নয়। কেননা পথ হইল লোকদের চলাচল ও যাতায়াতের স্থান। এই স্থান জুড়ে  লোকেরা বসে থাকলে পথের আসল উদ্দেশ্য ব্যাহতহয়ে পড়ে। আর তাহাতে সামাজিক সামষ্টিক কাজ বিঘ্নিত হয়। এই কাজ সাধারণত করাই উচিৎ নয়। আর অবস্থা যদি এই হয় যে,এই কাজ তোমাদের না করিলে  নয়,তাহা হইলে এই কারণে তোমাদের উপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয়,তাহা পালন করতে তোমরা প্রস্তুত থাকতে হবে। এক কথায় হয় পথে আদৌ বসিবেই না। না হয়-অর্থাৎ পথে বসিলে এই দায়িত্ব পালন করতে  হবে।

উল্লেখিত তিরমিযীর হাদীসিটতে মাত্র তিনটি দায়িত্বের কথা উল্লেখ হয়েছে। এই পর্যায়ের হাদীস সমূহের আরও বহু কয়টি দায়িত্ব ও কর্তব্যের উল্লেখ হয়েছে। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এই পর্যায়ে বর্ণিত হাদীস সমূহ হতে মাত্র সাতটি কর্তব্যের কথা প্রকাশ করিয়াছেন। ইবনে হাজার আল-আসকালানীর মতে এই দায়িত্ব ও কর্তব্য হইল মোট চৌদ্দটি। একত্রে সে চৌদ্দটি কর্তব্য এই=

সালাম বিস্তার করা,ভাল ভাল কথা বলা,সালামের জওয়াব দেওয়া,হাঁচিদাতা আলহামদুলিল্লাহ বল্লে ইয়ার হামুকাল্লাহ বলা,বোঝা বহনে লোকদের সাহায্য করা,মজলূমের উপর জুলুম বন্ধ করানো,আর্তনাদকারীর ফরিয়াদ শোনা,লোকদের সুপথ সঠিক পথ দেখানো,পথভ্রষ্টকে পথ চিনাই  দেওয়া,ভাল ভাল ও উত্তম কাজের আদেশ করা,খারাপ বা পাপ কাজ হইতে লোকদিগকে বিরত রাখা ,কষ্টদায়ক জিনিস পথ হ তে দূর করা,চক্ষু নিম্নমুখী রাখা এবং বেশী বেশী করিয়া আল্লাহর যিকির করা।

ইমাম নববী লিখিয়াছেনঃ পথে ঘাটে বসে  ও জট পাকাই  দাঁড়াই থাকতে  নবী করীম (স) নিষেধ করেছেন।সেই সঙ্গে তিনি এই নিষেধের কারণও বলে দিয়েছেন।সে কারণ হইলঃ ইহাতে নানা দুর্ঘটনা ঘটিতে পারে। স্ত্রীলোকদের চলাফিরায় অসুবিধা হইতে পারে। অনেক সময় এই পুরুষরা চলমান স্ত্রীলোকদের প্রতি তাকাইয়া থাকে,তাহাদের সম্পর্কে বদচিন্তা ও আলাপ-আলোচনায় মশগুল হয়,তাহাদের সম্পর্কে খারাপ ধারণা বা উক্তি করা। ইহাতে সাধারণ লোকদের অনেক অসুবিধাও হতে পারে। ইহা ছাড়া চলমান লোকদের প্রতি সালাম জানানো কিংবা ভাল কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজের নিষেধ করার দায়িত্বও ইহারা পালন করে না। আর এই গুলিই হইল এই নিষেধের প্রকৃত কারণ।সমাপ্ত =

(২) তাহাজ্জুদ নামাজ মুমিনের অন্তরের প্রশান্তি

আরবি তাহাজ্জুদ ,শব্দের আভিধানিক অর্থ রাত জাগরণ বা নিদ্রা ত্যাগ করে রাতে নামাজ পড়া। শরিয়তের পরিভাষায় রাত দ্বিপ্রহরের পর ঘুম থেকে জেগে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে নামাজ আদায় করা হয় তা-ই তাহাজ্জুদ নামাজ।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার আগে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর তাহাজ্জুদ নামাজ বাধ্যতামূলক ছিল। তাই তিনি জীবনে কখনো তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া থেকে বিরত হননি। তবে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য এটা সুন্নতে গায়রে মুয়াক্কাদা অর্থাৎ এ নামাজ আদায় করলে অশেষ পুণ্য লাভ করা যায়,কিন্তু আদায় করতে না পারলে কোনো গুনাহ হবে না।

আর রাতের তাহাজ্জুদ নামাজ হলো আম্বিয়া আলাইহিস সালামদের সুন্নাত, তাহাজ্জুদ নামাজ  মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে বান্দার গভীর সম্পর্ক স্থাপন তথা নৈকট্য ও সন্তোষ অর্জনের অন্যতম পন্থা। তাহাজ্জুদের ফজিলত প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,

﴿وَمِنَ اللَّيْلِ فَتَهَجَّدْ بِهِ نَافِلَةً لَّكَ عَسَىٰ أَن يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَّحْمُودًا﴾

আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ নামাজ কায়েম করুন;এটা আপনার জন্য এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন মাকামে মাহমুদে । (সূরা বনি ইসরাইল : ৭৯)। তিনি আরও বলেন,

*تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ*

তারা শয্যা ত্যাগ করে আকাঙ্ক্ষা ও আশঙ্কার সঙ্গে তাদের প্রতিপালককে ডাকে এবং আমি তাদের যে রুজি প্রদান করেছি,তা থেকে তারা দান করে। (সূরা সিজদা : ১৬)। তাহাজ্জুদ নামাজ নফসের রিয়াজাত ও তারবিয়াতের এক বিশেষ মাধ্যম। কারণ প্রভুর প্রেমে গভীর রাতে সুখশয্যা ত্যাগ করেই আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হতে হয়। এ নামাজ মন ও চরিত্রকে নির্মল ও পবিত্র করা এবং সত্য পথে অবিচল রাখার জন্য অপরিহার্য ও অতীব কার্যকর পন্থা। পবিত্র কোরআনের -*إِنَّ نَاشِئَةَ اللَّيْلِ هِيَ أَشَدُّ وَطْئًا وَأَقْوَمُ قِيلًا* সূরা মুজ্জাম্মিলে এর উল্লেখ করা হয়েছে

 

,নিশ্চয়ই রাতে ঘুম থেকে ওঠা মনকে দমিত করার জন্য খুব বেশি কার্যকর এবং সে সময়ের কোরআন পাঠ বা জিকির একেবারে যথার্থ। (সূরা মুজাম্মিল : ৬। ) অন্যত্র বলা হয়েছে,

*وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا*

আর আল্লাহর প্রিয় বান্দা তারা,যারা তাদের রবের দরবারে সিজদা করে এবং দাঁড়িয়ে থেকেই রাত কাটিয়ে দেয়। (সূরা ফুরকান : ৬৪)। ইসলামের প্রাথমিক যুগে কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ী হওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল যে তারা রাতের শেষ ভাগে আল্লাহ দরবারে চোখের পানি ফেলতেন আর ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। যেমন কোরআনে বলা হয়েছে,

* الصَّابِرِينَ وَالصَّادِقِينَ وَالْقَانِتِينَ وَالْمُنفِقِينَ وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالْأَسْحَارِ*

তারা ছিল কঠিন পরীক্ষায় পরম ধৈর্যশীল,অটল-অবিচল,সত্যের অনুসারী,পরম অনুগত। আল্লাহর পথে ধন-সম্পদ উৎসর্গকারী এবং রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। (সূরা আলে ইমরান : ১৭)। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিসেও তাহাজ্জুদ নামাজের গুরুত্বের কথা উল্লেখ রয়েছে।,আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি

أَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ- رواه مسلم

অর্থাৎ ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজ।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য এক হাদিসে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন

عن أبي هريرة رضي الله عنه ، أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: ” ينزل رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ يَقُولُ : مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ”أخرجه البخاري في صحيحه (1145) ومسلم (1261 (

,আল্লাহতায়ালা প্রতি রাতেই নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হন যখন রাতের শেষ তৃতীয় ভাগ অবশিষ্ট থাকে। তিনি তখন বলতে থাকেন কে আছো যে আমায় ডাকবে,আর আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আছো যে আমার কাছে কিছু চাইবে, আর আমি তাকে তা দান করব?কে আছো যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করব?(বুখারি ও মুসলিম)। শরহে সুন্নাহর বরাত দিয়ে মিশকাতুল মাসাবিহ গ্রন্থকার বর্ণনা করেন,হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত,রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,তিন ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ খুশি হন।

এক. যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদের জন্য ওঠে এবং নামাজ পড়ে। দুই. মুসল্লি যারা নামাজের জন্য সারিবদ্ধভাবে কাতারে দাঁড়ায়। তিন. মুজাহিদ যারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়। অনুরূপ আরেকটি হাদিস রয়েছে,হজরত জাবির (রা.) বলেন,আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি। রাতের মধ্যে এমন একটি মুহূর্ত আছে যদি কোনো মুসলমান তা লাভ করে এবং আল্লাহর কাছে ইহ ও পরকালের কোনো কল্যাণ চায় আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে তা দেন। (মুসলিম)। আসুন,আমরা তাহাজ্জুদ  নামাজের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার অধিক থেকে অধিকতর নৈকট্য লাভ  করি,

সমাপ্ত =

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *