অপরের প্রতি সহানুভূতি

untitledএকে অপরের প্রতি সহানুভূতি, সেবা-সহযোগিতার মতো এই মহত্ গুণটি যদি আমরা ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করি, তাহলে সমাজের উঁচু-নিচু ভেদাভেদ তথা শান্তি-শৃঙ্খলায় আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে। পরোপকারে রয়েছে আত্মিক তৃপ্তি, পরিবার, সমাজ এবং দেশের মঙ্গল। আমাদের মহানবী হজরত রাসুলুল্লাহ (সা) একটি কথা বিশেষভাবে হাদীসে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, মানুষ তাঁর প্রতিবেশীকে কষ্ট না দিয়ে, জ্বালাতন না করে এবং উপোস না রেখে বিপদে-আপদে, দুঃখে-কষ্টে, শোকে-দুঃখে একে অপরের প্রতি সমবেদনা-সহানুভূতিতে এগিয়ে আসা মানবিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। অতএব আমরা যেন পরিবার, সমাজ, দেশের শত কোটি মানুষের সঙ্গে আচার-আচরণে, সাহায্য-সহযোগিতা ও সহানুভূতিতে এবং পরোপকারী মন-মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসি।

মানবিক সহজাত গুণাবলীর মধ্যে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতা বা পরোপকার অন্যতম গুণ। এই মহত ও সুন্দর গুণটি যার মধ্যে বিদ্যমান, তিনি সমাজ তথা রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে উত্তম কাজের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। তাই ইসলামে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতাকে সর্বোত্তম কাজ বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং মানবতার মঙ্গল সাধনে এই গুণটির গুরুত্ব অত্যধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমরা বিভিন্নভাবে মানব ও মানব সমাজের উপকার সাধন করতে পারি। এই উপকার বা সেবাদান, পরিশ্রম বা আর্থিক সাহায্য কিংবা সত্ পরামর্শ দ্বারাও হতে পারে। একথা স্মরণীয়, মহত্ লোকেরা বরাবরই পরের কল্যাণ সাধনে নিজেদের উতসর্গ করেন। যাঁরা নিজেদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে পারেন-তাঁরাই শুধু এই মহত কাজটি পুরোপুরি সমাধা করতে পারেন। পক্ষান্তরে মহত্ত্বের এই গুণটি যাঁর মধ্যে নেই তিনি কস্মিনকালেও একে অপরের প্রতি সহানুভূতির কাজটি করতে পারেন না। ইসলামে পরোপকারের কথা বারবার গুরুত্বসহকারে বলা হয়েছে। দান-সাহায্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সুরা আল বাকারায় ইরশাদ হয়েছে : তোমাদের দান-সদকা, সাহায্যগুলো প্রকাশ্যে করো-তাও ভালো। তবে যদি গোপনে অভাবীদের দাও তাহলে তোমাদের জন্য এটিই বেশি ভালো। এ ছাড়া আল কোরআনে আরো বলা হয়েছে : কোনো গরীব-দুঃখীজন কিছু চাইলে তাকে ধমক দিয়ে ফিরিয়ে দিও না। পূর্ণাঙ্গ মানুষের মূর্ত প্রতীক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনে আমরা পরোপকারের দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। তাঁর অন্তঃকরণ ছিল সমবেদনা ও পরোপকারের আকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ। অকথ্য নির্যাতন ও অসহনীয় দুঃখকষ্টেও তাঁর ধৈর্য ছিল সীমাহীন। তাঁকে যারা কষ্ট দিত, তাদেরও তিনি ধর্যের মাধ্যমে শিক্ষা দিতেন। যারা তাঁকে বঞ্চিত করত তাদের তিনি অকাতরে দান-সাহায্য করতেন। তিনি রোগব্যাধি ও দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের সেবা-যত্ন করে শান্তি পেতেন। রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের তিনি সেবা, সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো পীড়িত ব্যক্তিকে দেখতে পথচলা শুরু করে, সে যেন আল্লাহর রহমতের দরিয়ায় সাঁতরাতে থাকে। যখন রোগীর কাছে উপস্থিত হয় তখন রহমতের দরিয়ায় ডুবে যায়। তিনি আরো একটি হাদীসে বলেছেন, বিধবা ও দারিদ্র্যের সেবক আল্লাহর পথে যোদ্ধার সমতুল্য। ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও, পীড়িতদের সেবা করো এবং বন্দিদের মুক্তি দাও, এটাই ছিল তাঁর আহ্বান।

মক্কার এক বুড়ি প্রতিদিন হজরত রাসুলে করীম (সা)-এর যাতায়াতের পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন। হঠাত একদিন রাসুলে করীম (সা) দেখলেন পথে কাঁটা নেই, খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন সেই বুড়ি রোগাক্রান্ত হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী। আল্লাহর রাসুল (সা) এই খবর শোনামাত্র ছুটে গেলেন বুড়ির বাড়িতে এবং মহানবী (সা) সেবা-শুশ্রূষা করে ওষুধপত্র খাইয়ে বুড়িকে সুস্থ করে তুললেন। আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা)-এর এই উদার ব্যবহার ও কর্মকাণ্ডে বুড়ি অনুশোচনায় নিজেকে ধিক্কার দিলেন। আল্লাহর রাসুল (সা)-এর এমন মহত ও উন্নত মনমানসিকতার বিরল দৃষ্টান্ত।

ইসলামে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি অর্থাত, পরোপকারের বহু উল্লেখযোগ্য নজির রয়েছে। আমরা হজরত ওমর (রা)-এর কথা অনেকেই জানি। তিনি ছিলেন বিশাল সাম্রাজ্যের খলিফা। তিনিও অতি সহজ-সরলভাবে জীবন নির্বাহ করতেন। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অতি মহানুভব-পরোপকারী হৃদয়। এক রাতে তিনি নগরীর শহরতলির আশপাশে ঘুরে যখন একটি ক্ষুধার্ত পরিবারের শূন্য হাঁড়িতে পানি জ্বাল দেওয়ার দৃশ্য অবলোকন করলেন তখনই হজরত ওমর (রা) ছুটে যান সরকারি গুদামে, সেখান থেকে তিনি বয়ে নিয়ে এলেন আটার বস্তা। গৃহকর্ত্রী খলিফার এমন দয়া ও সহানুভূতি দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন। পরোপকারের এই অপূর্ব ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। অতএব, পরোপকারের মতো একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতার গুণটি যদি আমরা অনুশীলন করি তবে আমাদের সমাজের উঁচু-নিচু ভেদাভেদ থাকবে না, সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধিতে আমূল শান্তিময় পরিবেশ ফিরে আসবে সন্দেহ নেই। শুধু তাই নয়, এতে রয়েছে আত্মিক তৃপ্তি। আবার লক্ষ করুন, আমাদের মহানবী (সা) বলেছেন, যে প্রতিবেশীকে উপোস রেখে পেটপুরে খায় সে মুমিন নয়। আসুন, আমরা যেন মানবিক কল্যাণে-মঙ্গলে একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল, সহমর্মিতা এবং সমবেদনায় একাত্ম হয়ে সমাজ সংসারে স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারি। দেশের সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধিকরণে যেন ধর্মীয় মূল্যবোধকে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে পার।

সূরা কুরাইশ – سورة قريش

سورة قريش

সূরা কুরাইশ : সূরা নং (১০৬) মাক্কী যুগে নাযিল, মোট আয়াত-৪।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

(১)  যেহেতু কুরাইশরা সুপরিচিত হয়েছে।

(২)  (অর্থাত) শীতকাল ও গরমকালে (বিদেশ) সফরে তাদের পরিচিতি হয়েছে। ১.

(৩)  সেহেতু এ (কাবা) ঘরের ২. মালিকের ইবাদাত করা তাদের উচিত।

(৪)  যিনি তাদেরকে খিদে থেকে বাঁচিয়ে খাবার দিয়েছেন এবং ভয় থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদে রেখেছেন। ৩.

১./ শীত ও গ্রীষ্মের সফর মানে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সফর। কুরাইশ বংশের লোকেরা গ্রীষ্মকালে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের দিকে এবং শীতকালে দক্ষিণ আরবের দিকে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করতো। এরই ফলে তারা ধনশালী হতে পেরেছিল।

২./ এর অর্থ হলো কাবাঘর যা মাক্কা শহরে অবস্থিত।

৩./ মাক্কাকে হারাম শরীফ (সবার সম্মানের জায়গা) হিসাবে সবাই মানতো বলে কুরাইশদের বিশ্বাস ছিল যে, কেউ মাক্কা আক্রমণ করবে না। আর কুরাইশরা কাবাঘরের খাদিম ছিল বলে তাদের বণিকদের কাফেলা নিরাপদে আরবের সব এলাকায় যাতায়াত করতে পারতো এবং কেউ তাদের সাথে কোন রকম খারাপ ব্যবহার করতো না। 

নাম করণ ঃ পয়লা আয়াতের কুরাইশ শব্দই এ সূরার নাম।

নাযিলের সময় ঃ কেউ কেউ এ সূরাকে মাদানী যুগের বলেছেন। কিন্ত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাসসিরগণ এ সূরাটিকে মাক্কী যুগের বলেই ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন। তৃতীয় আয়াতের “এই ঘরের রব” কথাটি দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এ সূরাটি মাক্কী যুগের। এই ঘর বলতে যে কাবাঘরই বুঝায় এ বিষয়ে সবাই একমত। তাই মাদানী যুগে মাক্কার ঘরকে এই ঘর বলা কিছুতেই মানানসই হতে পারে না।

ঐতিহাসিক পটভূমি ঃ কুরাইশ বংশের লোকেরা তাদের পূর্বপুরুষ কুসাই বিন কিলারের পূর্ব পর্যন্ত আরবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। কুসাই-এর চেষ্টায় এরা মাক্কায় কেন্দ্রীভূত হয় এবং আল্লাহর ঘরের খাদিমের দায়িত্ব পায়। তারই নেতৃত্বে মাক্কা শহরভিত্তিক একটা রাষ্ট্র গড়ে উঠে।

হজ্জের সময় সমস্ত আরব থেকে আগত হাজীদের সন্তোষজনক খিদমাতের মাধ্যমে কুরাইশদের মর্যাদা ও প্রভাব বেড়ে যায়।

কুসাই-এর ছেলে আবেদে মুনাফ পিতার জীবিতকালেই আরববাসীদের নিকট সুনাম অর্জন করে। আবদে মুনাফের চার ছেলের মধ্যে হাশিম বড় ছিল। রাসূল (সা)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব হাশিমেরই ছেলে। গোটা আরবে কুরাইশ বংশের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সুনাম-সুখ্যাতির ফলে হাশিমই সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দিকে মনোযোগ দেয়। সূরা ফীলের ঐতিহাসিক পটভূমিতে বলা হয়েছে যে, আরবের পূর্ব ও পশ্চিম দেশগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু ছিল। কিন্তু এ ব্যবসা তখন ইরানীদের হাতে ছিল। ইরানীরা একদিকে পারস্য উপসাগর দিয়ে দক্ষিণ আরবের মাধ্যমে পূর্বদিকের দেশগুলোর সাথে এবং অপরদিকে দক্ষিণ আরব থেকে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে মিসর ও সিরিয়ার সাথে এ ব্যবসা চালু করেছিল। যদিও আরবদের সহযোগিতা ছাড়া এ ব্যবসা চলতে পারতো না, তবু এ ব্যবসার আসল লাভ ইরানীরাই ভোগ করতো।

কুরাইশ নেতা হাশিম সারা আরবে তাদের সুনাম ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এ বাণিজ্যে আরবদের প্রাধান্য হাসিলের উদ্যোগ নেয়। হজ্জের সময় কুরাইশদের উদার ব্যবহার ও আশাতীত খিদমাতে আরবের সব গোত্রের লোকই তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকায় কুরাইশদের বাণিজ্যিক কাফিলাকে কেউ লুট করতো না। এমনকি তাদের কাছে কোন গোত্রই কোনরকম ট্যাক্স দাবী করতো না। এ ব্যবসার সুযোগে মাক্কা শহর আরবের আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হলো।

হাশিম ও তার ভাই আবদে শামস, মুত্তালিব ও নাওফেল মিলে সিরিয়া, ইরাক, ইরান, ইয়ামান ও হাবশার শাসকদের কাছ থেকে সরকারীভাবে এ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনুমতি  হাসিল করে নেয়। এ ব্যবসা এতটা উন্নতি লাভ করে যে, এরা চার ভাই আরবে “ব্যবসায়ী গোষ্ঠী” হিসাবে খ্যাতি লাভ করে। এ বাণিজ্য উপলক্ষে আরবের সমস্ত গোত্রের সাথে কুরাইশদের গভীর সম্পর্ক এবং চারপাশের রাষ্ট্রগুলোর সাথে আরবের ঘনিষ্ঠ পরিচয় হবার কারণে কুরাইশ নেতাগণ “আসহাবুল ঈলাফ” বা “বন্ধুত্ব ও পরিচয়ের ধারক ও বাহক” হিসাবে স্বীকৃত হয়। এই ‘ঈসাফ’ শব্দটি দিয়েই সূরা কুরাইশ শুরু হয়েছে।

কুরাইশদের এ মর্যাদার ফলে সারা আরবে তাদের নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেয়া হতো। ধন-দৌলতের দিক দিয়েও তারা আরবের সেরা গোত্রে পরিণত হয়। মাক্কা শহর আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্রের মর্যাদা পায়। আন্তর্জাতিক পরিচিতির দরুন কুরাইশরা ইরাক থেকে উন্নত মানের আরবী অক্ষর লেখার শিক্ষা পায় এবং সে অক্ষরেই কুরআন মজীদ লিখিত হয়। লেখা-পড়ার চর্চা কুরাইশদের মধ্যে যে পরিমাণে ছিল, এতটা আর কোন গোত্রে ছিল না। এসব কারণেই রাসূল (সা) বলেছিলেন : কুরাইশই জনগণের নেতা।

এ অবস্থায় যদি বাদশাহ আবরাহার হাবশী বাহিনী কাবাঘর ধ্বংস করতে পারতো, তাহলে কুরাইশদের সব কিছুই খতম হয়ে যেতো। আল্লাহর ঘর হিসাবে কাবার মর্যাদা শেষ হয়ে যেতো, কাবার খাদিম হিসাবে কুরাইশদের সম্মানও খতম হতো। মাক্কা আর ব্যবসা কেন্দ্র হিসাবে গণ্য হতো না এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরবদের হাত থেকে হাবশীদের হাতে চলে যেতো।

আল্লাহর কুদরতে হাবশী বাহিনী চরম গযবে পতিত হবার ফলে কাবাঘর “বাইতুল্লাহ” হিসাবে সারা আরবে আগের চেয়েও বেশী সম্মানিত বলে গণ্য হলো এবং সাথে সাথে কুরাইশদের নেতৃত্ব আরও মযবুত হলো। সবার মনেই এ বিশ্বাস দৃঢ় হলো যে, কুরাইশদের উপর আল্লাহর খাস মেহেরবানী আছে।

আলোচনার ধারা ঃ উপরিউক্ত পটভূমিকে সামনে রাখা হলে সূরা কুরাইশের মর্মকথা বুঝতে কোন রকম বেগ পেতে হয় না। শীত, গ্রীষ্ম নির্বিশেষে সারা বছর সর্বত্র ব্যাপক পরিচিতি ও বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে কুরাইশরা যে সৌভাগ্যের অধিকারী হয়েছে, তার বাহাদুরী যে তাদের নয়, একথাই এ সূরায় বুঝানো হয়েছে। তাদের পূর্বপুরুষ কুসাই-এর নেতৃত্বে কুরাইশরা মাক্কায় সমবেত হবার পূর্বে সারা আরবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তারা যে অভাব-অনটনে ছিল এবং নিরাপত্তার দিক দিয়ে অন্যান্য আরব গোত্রের মতোই তারা যে অনিশ্চিত অবস্থায় জীবন যাপন করতো, সে দুরবস্থা থেকে বর্তমান সুদিনের কারণ যে একমাত্র এই কাবাঘর, সে কথা এখানে তাদেরকে মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে, এ ঘরের যিনি মালিক, একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করা তাদের উচিত। আর মুহাম্মদ (সা) তাদেরকে এ কথারই দাওয়াত দিয়েছেন। এ দাওয়াত কবুল করলেই কুরাইশদের মর্যাদা বহাল থাকতে পারে। নেতৃত্বের অহংকারে যদি এ  দাওয়াত তারা কবুল না করে, তাহলে এ ঘরের মালিকই তাদের মর্যাদা কেড়ে নেবেন।

 

 

সবর বা ধৈর্য ধারন

সবর তেজদীপ্ত অশ্ব যা কখনো হোঁচট খায় না। এমন ক্ষুরধার তরবারী, যা কখনো  তেজ হারায় না; এমন বিজয়ী সৈনিক যা কখনো পরাজিত হয় না; এমন সুরক্ষিত দূর্গ যা কখনো ধ্বংস হয় না। সবর আর বিজয় দুই সহোদর ভাই। এমন কেউ  নেই, যে সবরের অস্ত্রে সজ্জিত হয়েছে অথচ তার নাসফ অথবা শয়তান তাকে পরাহত করেছে। যার সবর নেই সে শক্তিহীন, পঙ্গু।  যে ব্যক্তি তার জিহাদ-সংগ্রামে সবরকে সঙ্গী বানাবে না, সে পরাজিত হতে বাধ্য। তাইতো আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُون
হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধর ও ধৈর্যে অটল থাক এবং পাহারায় নিয়োজিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও। (সূরা আলে-ইমরান-২০০)
সবর মুমিনের জন্য গৃহাপালিত জন্তু, খুঁটির মধ্যে বেঁধে রাখার মতো। ইচ্ছামত এদিক সেদিক ঘোরে; কিন্তু পরিশেষে তাকে সেই খুঁটির কাছেই ফিরে আসতে হয়। সবর ঈমানের শেকড়রে মতো। বৃক্ষ যেভাবে শেকড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে  ঈমানও তদ্রুপ সবরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তাই যার সবর নেই  তার পূর্ণ ঈমান নেই। সবরবিহীন ঈমানদার দ্বিধাগ্রস্ত ঈমানদার। এ ধরনের ঈমানদার সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةٌ انْقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآَخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
মানুষের মধ্যে কতক এমন রয়েছে, যারা দ্বিধার সাথে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি তার কোন কল্যাণ হয় তবে সে তাতে প্রশান্ত হয়। আর যদি তার কোন বিপর্যয় ঘটে, তাহলে সে তার আসল চেহারায় ফিরে যায়। সে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি হল সুস্পষ্ট ক্ষতি। (সূরা হজ-১১)
যে সবর করে, বিপদে ধৈর্য ধারণ করে সেই ভাগ্যবান : পৃথিবীতে যারা সুন্দর জীবন গড়তে পেরেছে, তারা সবরের গুণেই তা গড়েছে। তারা সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করেছে এই সবরের বদৌলতেই। তারা দুঃসময় এলে ধৈর্য ধারণ করে আর সু-সময় এলে আল্লাহ তা’আলার শুকরিয়া আদায় করে। আর এভাবে তারা সবর ও শোকরের ডানায় চড়ে জান্নাতের অধিকারী হয়।
সবর কী? সবরের আভিধানিক অর্থ : ধৈর্য ধারণ করা, বাধা দেয়া বা বিরত রাখা, সহনশীলতা। শরীআ’তের পরিভাষায় সবর বলা হয় : অন্তরকে অস্থির হওয়া থেকে, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গাল চাপড়ানো ও বুকের কাপড় ছেঁড়া ইত্যাদি থেকে বিরত রাখা। কারো কারো মতে, এটি হলো মানুষের অন্তরগত একটি উত্তম স্বভাব, যার মাধ্যমে সে অসুন্দর ও অনুত্তম কাজ থেকে বিরত থাকে। এটি মানুষের একটি অন্তরগত শক্তি, যা দিয়ে সে নিজকে সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখতে পারে। সবর হলো সুন্দরভাবে বিপদ মোকাবিলা করা। বিপদকালে অভিযোগ-অনুযোগ না করে অমুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করাই সবর।
জুনায়েদ বাগদাদী (র) কে সবর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন : হাসি মুখে তিক্ততার ঢোক গেলা। যুন্নূন মিসরী (র) বলেন : আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ থেকে দূরে থাকা; বিপদের সময় শান্ত থাকা এবং জীবনের কুরুক্ষেত্রে দারিদ্রের কষাঘাত সত্ত্বেও অমুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করা।
এক বুযুর্গ এক ব্যক্তিকে অন্যের কাছে তার সমস্যা নিয়ে অনুযোগ করতে শুনে বললেন : যিনি দয়া করেন না তার কাছে দয়াকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছ। এ সম্পর্কে আরও বলা হয় : তুমি যখন মানুষের কাছে অভিযোগ কর, তখন মূলত দয়াময়ের বিরুদ্ধে নির্দয়ের কাছেই অভিযোগ কর।
অভিযোগ দু’টি পন্থায় করা হয়: একটি হলো, আল্লাহ তা’আলার কাছে অনুযোগ করা। এটি সবর পরিপন্থী নয়। যেমন ইয়াকূব (আ) প্রিয় পুত্র ইউসুফকে হারিয়ে বলেছেন : আমি আল্লাহর কাছেই আমার দুঃখ বেদনার অভিযোগ জানাচ্ছি। অপরটি হলো, নিজের মুখ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ভাষার মাধ্যমে মানুষের কাছে অভিযোগ করা। এটি সবর পরিপন্থী।
আমরা যে সবরের কথা আলোচনা করছি তা তিন প্রকারের। যথা : ১. আল্লাহ তা’আলার আদেশ-নির্দেশ পালন ও ইবাদত-বন্দেগী আদায় করতে গিয়ে ধৈর্যধারণ করা।  ২. আল্লাহ তা’আলার নিষেধ ও তাঁর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করা এবং ৩. তাকদীর ও ভাগ্যের ভালো-মন্দে অসন্তুষ্ট না হয়ে তার ওপর ধৈর্যধারণ করা। এই তিন প্রকার সম্পর্কেই শায়খ আবদুল কাদীর জিলানী (র) বলেন : একজন বান্দাকে অবশ্যই তিনটি বিষয়ে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে : কিছু আদেশ পালনে, কিছু নিষেধ থেকে বিরত থাকায় এবং ফয়সালাকৃত তাকদীরের ওপর।
আল-কুরআনে বর্ণিত লুকমান (আ)-এর বিখ্যাত উপদেশেও এ তিনটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে।
يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
হে আমার প্রিয় বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ কর এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধর। নিশ্চয় এগুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ। (সূরা লুকমান-১৭)
লুকমান (আ) যে ‘সৎকাজের আদেশ দাও’ বলেছেন, তার মধ্যে নিজে সৎ কাজ করা এবং অপরকে সৎ কাজের উপদেশ দেয়াÑ উভয়টি অন্তর্ভুক্ত। তেমনি অসৎকাজে নিষেধ করার মধ্যেও উভয়টি রয়েছে। এখানে ‘সৎকাজের আদেশ’ ও ‘অসৎকাজে নিষেধ’ শব্দ থেকেই এমনটি বুঝা যায়। তাছাড়া শরীয়তের  দৃষ্টিতেও ‘সৎকাজের আদেশ’ ও ‘অসৎকাজে নিষেধ’ বাস্তবায়িত হয় না, যতক্ষণ না আগে সে নিজে তা পালন করে।
وَالَّذِينَ صَبَرُوا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ أُولَئِكَ لَهُمْ عُقْبَى الدَّارِ
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সবর করে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিযক প্রদান করেছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং ভাল কাজের মাধ্যমে মন্দকে দূর করে, তাদের জন্যই রয়েছে আখিরাতের শুভ পরিণাম। (সূরা রা‘দ-১৯-২২)
সবর বা ধৈর্য আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ মুমিন বান্দাদের বৈশিষ্ট্য : নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তা’আলা এই বিরল গুণে ভূষিত করেছিলেন। তাই নবী-রাসূলগণই হলেন সবরের সকল আকার-প্রকৃতির উজ্জ্বলতম উদাহরণ। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র) বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা নব্বই জায়গায় সবরের কথা বলেছেন। অতএব ভেবে দেখুন সবর কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়!
আল্লাহ তা’আলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে সবরকারী তথা ধৈর্যশীলদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদেরকে হিসাব ছাড়া প্রতিদান দেবেন বলে উল্লেখ করেছেন।
قُلْ يَا عِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
বল, হে আমার বান্দারা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়ায় ভাল কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। আর আল্লাহর যমীন প্রশস্ত, কেবল ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেয়া হবে কোন হিসাব ছাড়াই। (সূরা যুমার-১০) আল্লাহ তা’আলা বলেন, তিনি ধৈর্যশীলদের জন্য হিদায়েত ও সুস্পষ্ট বিজয় নিয়ে তাদের সাথেই আছেন।
وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। (সূরা আনফাল-৪৬) আল্লাহ তা’আলা সবর ও ইয়াকীনের কারণে মানুষকে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করেন।
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ
আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা করেছিলাম, তারা আমার আদেশানুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত, যখন তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত। (সূরা সাজদাহ-২৪) আল্লাহ তা’আলা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, সবরই মানুষের জন্য কল্যাণকর।
وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ
আর যদি তোমরা সবর কর, তবে তাই সবরকারীদের জন্য উত্তম। (সূরা নাহল-১২৬) আল্লাহ তা’আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, কারও যদি সবর থাকে, তাহলে যত বড় শত্রুই হোক তাকে হারাতে পারবে না।
 وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ
আর যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের  কোন ক্ষতি করবে না। তারা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ তা পরিবেষ্টনকারী। (সূরা আলে-ইমরান-১২০) আল্লাহ তা’আলা বিজয় ও সফলতার জন্য সবর ও তাকওয়া অবলম্বনের শর্ত জুড়ে দিয়েছেন।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধর ও ধৈর্যে অটল থাক এবং পাহারায় নিয়োজিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও। (সূরা আলে-ইমরান-২০০) আল্লাহ তা’আলা ধৈর্যশীলকে ভালোবাসেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আর একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে?
وَكَأَيِّنْ مِنْ نَبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا وَاللهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ
আর কত নবী ছিল, যার সাথে থেকে অনেক আল্লাহ ওয়ালা লড়াই করেছে। তবে আল্লাহর পথে তাদের ওপর যা আপতিত হয়েছে তার জন্য তারা হতোদ্যম হয়নি। আর তারা দুর্বল হয়নি এবং তারা নত হয়নি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদেরকে ভালবাসেন। (সূরা আলে-ইমরান-১৪৬) আল্লাহ তা’আলা ধৈর্যশীলদের তিনটি বিষয়ে সুসংবাদ দিয়েছেন যার প্রতিটি বিষয় পাবার জন্য দুনিয়াবাসী একে অপরের সঙ্গে ইর্ষা করেন।
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ.  الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ. أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা, তাদেরকে যখন বিপদ আক্রামণ করে তখন বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। (সূরা বাকারাহ-১৫৫-১৫৭) ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহ তা’আলা রেখেছেন জান্নাত লাভের কামিয়াবী আর জাহান্নাম থেকে মুক্তির সাফল্য।
 إِنِّي جَزَيْتُهُمُ الْيَوْمَ بِمَا صَبَرُوا أَنَّهُمْ هُمُ الْفَائِزُونَ
নিশ্চয় আমি তাদের ধৈর্যের কারণে আজ তাদেরকে পুরস্কৃত করলাম; নিশ্চয় তারাই হল সফলকাম। (সূরা মুমিনূন-১১১) আল্লাহ তা’আলা আল-কুরআনের চারটি স্থানে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর নিদর্শনাবলী থেকে ধৈর্যশীল ও শোকরগুযার বান্দারাই উপকৃত হয় এবং তারাই সৌভাগ্যবান।
أَلَمْ تَرَ أَنَّ الْفُلْكَ تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِنِعْمَةِ اللهِ لِيُرِيَكُمْ مِنْ آيَاتِهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
তুমি কি দেখনি যে, নৌযানগুলো আল্লাহর অনুগ্রহে সমুদ্রে চলাচল করে, যাতে তিনি তাঁর কিছু নিদর্শন তোমাদের দেখাতে পারেন। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে। (সূরা লুকমান-৩১)
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا أَنْ أَخْرِجْ قَوْمَكَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَذَكِّرْهُمْ بِأَيَّامِ اللَّهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
আর আমি মূসাকে আমার আয়াতসমূহ দিয়ে পাঠিয়েছি যে, তুমি তোমার কওমকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে বের করে আন এবং আল্লাহর দিবসসমূহ তাদের স্মরণ করিয়ে দাও। নিশ্চয় এতে প্রতিটি ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য রয়েছে অসংখ্য নিদর্শন। (সূরা ইবরাহীম-৫)
فَقَالُوا رَبَّنَا بَاعِدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا وَظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ فَجَعَلْنَاهُمْ أَحَادِيثَ وَمَزَّقْنَاهُمْ  كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
কিন্তু তারা বলল, ‘হে আমাদের রব, আমাদের সফরের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিন। আর তারা নিজদের প্রতি যুলম করল। ফলে আমি তাদেরকে কাহিনী বানালাম এবং তাদেরকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দিলাম। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রয়েছে। (সূরা সাবা-১৯)
বিপদে ধৈর্য ধারণ করার ফযীলত অনেক : তাই বলে শরীয়তে বিপদ কামনা করার অনুমতি দেয়া হয়নি। কারণ মুমিন সচেতন ও বুদ্ধিমান। সে কখনো বিপদ প্রত্যাশা করতে পারে না। হ্যাঁ, বিপদ এসে পড়লে তাতে বিচলিতও হয় না; বরং তাতে ধৈর্য ধারণ করে। বিপদের সময় সে সহনশীলতার পরিচয় দেয়। যেমন সহীহ বুখারীতে আবদুল্লাহ বিন আবূ আওফা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, যুদ্ধের দিনগুলোতে একদা রাসূলুল্লাহ (সা) অপেক্ষায় থাকলেন। যখন সূর্য ডুবে গেল তখন তিনি তাঁদের মাঝে  দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে লোকসকল, তোমরা শত্রুদের সঙ্গে মুখোমুখী হবার প্রত্যাশা করো না। আল্লাহ তা’আলার কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করো। তবে যখন তোমরা তাদের মুখোমুখী হও, তখন ধৈর্য ধারণ করো এবং সবর করো। আর জেনে রেখো, জান্নাত তরবারির ছায়ার নিচে। (বুখারী) আপনারা কি সেই সাহাবীর কথা শুনেননি যিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়ে আহত অবস্থায় যন্ত্রণা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলেন? এ জন্যই কিন্তু আবু বকর সিদ্দীক (রা) বলতেন : আমার কাছে বিপদে পড়ে সবর করার চেয়ে সুখে থেকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাই অধিক পছন্দনীয়।
একজন প্রকৃত মুমিন কিন্তু সর্বাবস্থায় দৃঢ়ভাবে এ কথা বিশ্বাস করে যে, সে যে অবস্থায় আছে, তাতে কোনো কল্যাণ নিহিত রয়েছে। যেমন মুসলিম শরীফে সুহাইব ইবন সিনান (রা) থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে : মুমিনের অবস্থা কতইনা চমৎকার! তার সব অবস্থাতেই কল্যাণ থাকে। এটি শুধু মুমিনেরই বৈশিষ্ট্য যে, যখন সে আনন্দে থাকে, তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এবং যখন সে কষ্টে থাকে, তখন সবর করে। আর এ উভয় অবস্থাই তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মুমিনের পুরো জীবনই কিন্তু পরীক্ষা। যেমন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন : كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَنَبْلُوكُمْ بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ ‘আর ভাল ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। (সূরা আম্বিয়া-৩৫)
আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাকে প্রতি মুহূর্তে পরীক্ষা করেন। তিনি দেখতে চান কে ধৈর্যশীল, কে মুজাহিদ আর কে সত্যবাদী। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ ‘তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো জানেননি তাদেরকে, যারা তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদ করেছে এবং জানেননি ধৈর্যশীলদেরকে। (সূরা আলে-ইমরান-১৪২)
আল্লাহ তাআলা মুমিনকে সম্পদ-সন্তান সব কিছু দিয়েই পরীক্ষা করেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :  إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَاللهُ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ ‘তোমাদের ধনÑসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা বিশেষ। আর আল্লাহর নিকটই মহান প্রতিদান। (সূরা তাগাবুন-১৫)
রাসূলুল্লাহ (সা) স্বয়ং তাঁর সাহাবীদের সবর শিক্ষা দিয়েছেন। এ সবরের পরীক্ষা বেশি দেয়া হয়েছে মক্কী জীবনে। যেমন খুবাইব ইবন আরাত রা.-এর হাদীসে আমরা তার চিত্র দেখতে পাই। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন কা’বার ছায়ায় তাঁর একটি চাদরে মাথা রেখে শায়িত অবস্থায় ছিলেন। আমরা তাঁর কাছে অভিযোগ করলাম, কেন তিনি আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চান না, আমাদের জন্য তাঁর কাছে দু‘আ করেন না। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে (এমন বিপদও এসেছে যে) কাউকে পাকড়াও করা হতো। তারপর গর্ত খনন করে তাকে সেই গর্তে ফেলা হতো। এরপর করাত এনে তার মাথার ওপর রাখা হতো। অতপর তাকে দুই টুকরো করে লোহার চিরুনী দিয়ে তার শিরা-অস্থিসহ আচড়ানো হতো। তদুপরি তারা তাকে দ্বীন থেকে ফেরাতে পারতো না। আল্লাহর শপথ! এখন আমাদের পরীক্ষা চলছে। একদিন এমন আসবে যখন আরোহীরা সান‘আ থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত যাবে। বাঘ আর ছাগল একে অন্যের থেকে নিরাপদে থাকবে। এক আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করতে হবে না। কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়া করছো। অর্থাৎ মক্কার মুশরিকদের দেয়া আযাব অচিরেই দূর হয়ে যাবে। সুতরাং অতীতের উম্মতের মতো তোমরাও দ্বীনের বিপদে একটু ধৈর্য ধারণ করো।
সবরের ফযীলত : সবরের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহর বান্দা মাত্রই সবর করতে হবে। কেননা কখনো আল্লাহর আদেশ মানতে হবে, তাঁর নির্দেশিত কাজ করতে হবে। আবার কখনো তাঁর নিষেধ মেনে চলতে হবে, বিরত থাকতে হবে তা করা থেকে। আবার কখনো অকস্মাৎ তাকদীরের কোনো ফয়সালা এসে পড়বে। নিয়ামত দেয়া হবে, তখন শুকরিয়া আদায় করতে হবে। এভাবে নানা অবস্থার মধ্য দিয়ে মুমিনের জীবন অতিবাহিত হয়। সুতরাং মৃত্যু পর্যন্ত এই সবরকে সাথে নিয়েই চলতে হবে। এজন্যই সবরের অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে।
ক. উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি : যে ব্যক্তি কোনো বিপদে পড়ে আল্লাহ যা নির্দেশ দিয়েছেন অর্থাৎ  إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ   পড়বে এবং বলবে :  اَللَّهُمَّ آَجِرْنِيْ فِيْ مُصِيْبَتِيْ وَاخْلُفْ لِي خَيْراً مِنْهَا  হে আল্লাহ, আমাকে আমার বিপদের প্রতিদান দিন এবং আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন। আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন। উম্মে সালামা (রা) বলেন, আবূ সালামা মারা গেলেন। আবূ সালামার চেয়ে উত্তম মুসলমান আর কে হতে পারে? তাঁর ঘরেই রাসূলুল্লাহ (সা) সর্বপ্রথম হিজরত করেছেন। (তবে আমি দু’আটি পড়লাম আর আল্লাহ তা’আলা আমাকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা)-কেই স্বামী হিসেবে দান করলেন!)
খ. আয়েশা (রা) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : মুমিনকে যেকোনো বিপদই স্পর্শ করুক না কেন আল্লাহ তার বিনিময়ে তার গুনাহ মাফ করে দেন। এমনকি (চলতি পথে) পায়ে যে কাঁটা বিদ্ধ হয় (তার বিনিময়েও গুনাহ মাফ করা হয়। (বুখারী ও মুসলিম )
গ. আবূ মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : যখন কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয় অথবা সফর করে, তার জন্য সে সুস্থাবস্থায় এবং ঘরে থাকতে যেরূপ নেকী কামাই করতো অনুরূপ নেকী লেখা হয়। ( আশ্শারহুল মুমতি)।
ঘ. সুফিয়ান ইবন উয়াইনা (র) নিচের আয়াত : وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآَيَاتِنَا يُوقِنُونَ ”আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা করেছিলাম, তারা আমার আদেশানুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত, যখন তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত। (সূরা সাজদাহ-২৪)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, যেহেতু তারা সকল কৌশলের মূল তথা ধৈর্য অবলম্বন করেছে তাই আমি তাদেরকে নেতা বানিয়ে দিলাম।
ঙ. উমর ইবন আবদুল আযীয (রহ) বলেন, যাকে আল্লাহ তা’আলা কোনো নেয়ামত দিয়ে তা ছিনিয়ে নিয়েছেন এবং তার স্থলে তাকে সবর দান করেছেন, এমতাবস্থায় সে ব্যক্তি থেকে যা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তার চেয়ে সেটাই উত্তম যা তাকে দান করা হয়েছে।
জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে আমাদেরকে সবর ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে প্রতিবেশীর ওপর। তার দেয়া কষ্ট অম্লান বদনে সহ্য করতে হবে এবং তা সত্ত্বেও সচেষ্ট থাকতে হবে তার কল্যাণ সাধনে। ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে আত্মীয়দের ব্যাপারে। তাদের কাছ থেকে অনাকাংক্ষিত যেসব আচরণ হবে তার ওপর। তাতে ধৈর্য ধারণ করতে হবে আর নেকির প্রত্যাশায় থাকতে হবে। শুধু তাই নয় ধৈর্য ধরতে হবে আপনার অধীনস্তদের ব্যাপারেও। তারা ভুল করবে, ঝামেলা বাধাবে। তাতেও ধৈর্য ধরতে হবে। মনে রাখতে হবে দুনিয়ার সবাই তো আর নিয়মের মধ্যে চলে না। আরও ধৈর্য ধরতে হবে স্ত্রীর ভুলত্রুটির ব্যাপারে। তদ্রুপ স্ত্রীকেও স্বামীর আচরণে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে। তার আচরণে ধৈর্য ধরতে হবে। সব সময় অভিযোগ করলে চলবে না। তার উৎপাত বা অসদাচরণে ধৈর্য ধরেই সংসার জীবন চালিয়ে নিতে হবে। এভাবেই কিন্তু ভালোবাসা দীর্ঘস্থায়ী হবে। এভাবে আশপাশের অসহায়দের প্রতি ধৈর্য নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। কর্মস্থলে অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেক আচরণেও বিরক্তি আসবে। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যেতে চাইবে। কিন্তু এই ধৈর্য দিয়েই সেসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। কারণ পৃথিবীর সবাই একরকম মন-মানসিকতা সম্পন্ন হয় না। সবার স্বভাবও একরকম হয় না। ভালো-মন্দ মিলেই সমাজ। সুতরাং সবাইকে ধৈর্যের অনুশীলন করতে হবে। যার ধৈর্য নেই সে কিছুতেই সুখী হতে পারে না।

ঈদুল ফিতর, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন

সমস্ত প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। আমরা তার প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করি। আমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রবৃত্তিজাত অনিষ্ট ও কর্মের কুপ্রভাব হতে আশ্রয় চাই। আল্লাহ তা’আলা যাকে হেদায়েত দান করেন, তার কোন ভ্রষ্টকারী নেই। আর যাকে তিনি ভ্রষ্ট করেন, তার কোন হেদায়েতকারী নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, ও একক, তার কোন শরীক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ ! সালাত, সালাম ও বরকত অবতীর্ণ করুন তার উপর, তার বংশধর ও সাহাবাদের উপর, এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার পথে ধাবিত হবে ও তার আদর্শের অনুসরণ করবে তাদের উপর।

আল্লাহ তা’আলা  ইরশাদ করেন :- সদাচারের প্রতিদান সদাচার ছাড়া আর কি হতে পারে? (সূরা আর-রাহমান-৬০) অর্থাত যেসব মানুষ আল্লাহ তা’আলার জন্য সারা জীবন পৃথিবীতে নিজেদের প্রবৃত্তির ওপর বিধি-নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছিল, হারাম থেকে আত্মরক্ষা করে হালালের ওপর সন্তুষ্ট থেকেছে, ফরযকে ফরয মনে করে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালন করেছে, ন্যায় ও সত্যকে ন্যায় ও সত্য মনে করে হকদারদের হকসমূহ আদায় করেছে এবং সর্বপ্রকার দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করে অন্যায় ও অকল্যাণের বিরুদ্ধে ন্যায় ও কল্যাণকে সমর্থন করেছে। আল্লাহ তাদের এসব ত্যাগ ও কুরবানীকে ধ্বংস ও ব্যর্থ করে দেবেন এবং কখনো এর কোন প্রতিদান তাদের দেবেন না তা কি করে সম্ভব। আল্লাহ তা’আলার অবশ্যই তাদের প্রতিদান দেবেন। মাহে রমজান ছিল তাওবা ও ক্ষমার মওসুম, মাগফিরাত বা ক্ষমার মাস সেই মাস আমরা অতিবাহিত করেছি।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আল্লাহর দিকে বারবার প্রত্যাগমনকারী, তার ইবাদতকারী, তার প্রশংসা বানী উচ্চারণকারী, তার জন্য যমীনে বিচরণকারী, তার সামনে রুকু ও সিজদাকারী, সৎকাজের আদেশকারী, অসৎকাজ থেকে বিরতকারী, এবং আল্লাহর সীমারেখা সংরক্ষণকারী, (সেই সব মুমিন হয়ে থাকে যারা আল্লাহর সাথে কেনাবেচার সওদা করে) আর হে নবী! এ মুমিনদেরকে সুখবর দাও! (সূরা তাওবা-১১২)

আনন্দ ভরা, ভ্রাতৃত্ব-ভালবাসা ও সহমর্মিতায় অম্লান ঈদুল ফিতর, মুসলিমদের অন্যতম আনন্দ উতসব। হিজরী বছরের দশম-মাস শাওয়াল, শাওয়ালের প্রথম দিন মু’মিনদের অনাবিল খুশির দিন, ক্ষমার বার্তা নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর।

রহমাত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমযানুল মোবারক শেষ হলেই আমাদের মাজে মহাপুরস্কারের পয়গাম নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর। আজ ঈদুল ফিতর, মুবারক উপলক্ষ। আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে হাদিয়া হিসেবে-আসা মুবারক ও সম্মানিত উপলক্ষ।

সাহাবী আনাস (রা) বর্ণানা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনায় হিজরত করে এলেন, তিনি মদীনাবসীকে দু’টি দিবসে খেল-তামাশা করতে দেখলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন : এ দিবস দু’টি কী? তারা বললেন, আমরা জাহিলীযুগে এ দিবস দু’টিতে খেলতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে এ দু’টির পরিবর্তে উত্তম দিবস দিয়েছেন। ঈদুল আযহা  ও ঈদুল ফিতর। (আবূ দাউদ)

ঈদুল ফিতরের এ মহান দিবসে, আনন্দের শত আবহ বিজড়িত এ সকালে আমরা যেভাবে নামায আদায়ের মাধ্যমে উতসব পালন করছি, তা আল্লাহ তা‘আলার একটি বিশেষ করুণা ও দান। আমরা দীর্ঘ একটি মাস সিয়াম সাধনা করে, রাতের বেলায় তারাবীহ্-এর নামায পড়ে, কুরআন শুনে ও তিলাওয়াত করে, গরীব-মিসকীনকে দান-সাদকা করে, রোযাদারকে ইফতার করিয়ে, কল্যাণমূলক কাজে সহায়তা করে আমাদের আনন্দকে পরিপূর্ণ করার জন্য আজ উপস্থিত হয়েছি ঈদের নামাযে। এভাবে আনন্দ ও পবিত্রতার অকল্পনীয় সংমিশ্রণে কেবল মুসলিম উম্মাহই ঈদ উদযাপন করে। এটা  নিশ্চয় এক নিয়ামত যা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সম্মানিত করেছে।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- বল, আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে। সুতরাং এ নিয়েই যেন তারা খুশি হয়। এটি যা তারা জমা করে তা থেকে উত্তম। (সূরা ইউনুস-৫৮)

অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আর বলো, সেই আল্লাহর প্রশংসা, যিনি কোনো পুত্রও গ্রহণ করেননি। তাঁর বাদশাহীতে কেউ শরীকও হয়নি এবং তিনি এমন অক্ষমও নন যে, কেউ তাঁর সাহায্যকারী ও নির্ভর হবে। আর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করো, চূড়ান্ত পর্যায়ের ন্ত্রষ্ঠত্ব। (সূরা ইস্রা-১১১)

ঈদ আরবী শব্দ, অর্থ-আনন্দ, ফিতর-অর্থ, রোজা ভঙ্গ করা। এমন দিনকে ঈদ বলা হয় যে দিন মানুষ একত্র হয় ও দিনটি বার বার ফিরে আসে। যেহেতু এ দিনটি বার বার ফিরে আসে তাই এর নাম ঈদ। এ শব্দ দ্বারা এ দিবসের নাম রাখার তাতপর্য হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ দিবসে তার বান্দাদেরকে নেয়ামত ও অনুগ্রহ দ্বারা বার বার ধন্য করেন ও বার বার তার এহসানের দৃষ্টি দান করেন। যেমন রমজানে পানাহার নিষিদ্ধ করার পর আবার পানাহারের আদেশ প্রদান করেন। সাদকাতুল-ফিতর, হজ্জ-জিয়ারত, কুরবানীর গোশত ইত্যাদি নিয়ামত তিনি বার বার ফিরিয়ে দেন। আর এ সকল নিয়ামত ফিরে পেয়ে ভোগ করার জন্য অভ্যাসগত ভাবেই মানুষ আনন্দ-ফুর্তি করে থাকে।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- তোমার প্রভুর ক্ষমা লাভের উদ্দেশ্যে দ্রুত ধাবমান হও। এবং সেই জান্নাতের জন্য (প্রতিযোগিতা কর) যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের সমান, যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ভীরুদের জন্যে। (সূরা আলে-ইমরান-১৩৩)

আল্লাহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন :- হে বিশ্বাসীগণ ! আল্লাহ্কে ভয় কর এবং যারা (কথায় ও কাজে) সত্যবাদী তাদের অন্তর্ভুক্ত হও। (সূরা তাওবাহ-১১৯)

ঈদুল ফিতর সমস্ত রমযান মাস সিয়াম পালনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে তাওফীক দানের জন্য আল্লাহ তা’আলা প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। ঈদুল ফিতরের দিন সাদকাতুল-ফিতর আদায় করা তার পর সমবেত ভাবে দু’রাকাত সালাত আদায় করা। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদকাতুল-ফিতর ওয়াজিব করেছেন, অশ্লীল ও অনর্থক কথা-বার্তার কারণে সিয়ামে ঘটে যাওয়া ত্রুটি-বিচ্যুতি গুলো দূর করার জন্য ও মিসকিনদের খাদ্য প্রদানের জন্য। ঈদের নামাজের পূর্বে আদায় করলে তা সাদকাতুল-ফিতর হিসাবে গন্য হবে। আর ঈদের নামাজের পর আদায় করলে তা অন্যান্য সাধারণ সাদকার মত একটি দান হিসাবে গন্য হবে। (আবু দাউদ)

ঈদের দিনের করণীয় : ঈদের দিন গোসল করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা। ঈদের দিন গোসল করার মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা মোস্তাহাব।

ঈদের দিনে খাবার গ্রহণ প্রসঙ্গে : সুন্নত হল ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদের সালাত আদায়ের পূর্বে খাবার গ্রহণ করা। আর ঈদুল আযহার দিন ঈদের সালাতের পূর্বে কিছু না খেয়ে সালাত আদায়ের পর কুরবানির গোশত খাওয়া সুন্নত। ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদের সালাতের পূর্বে তিনটি, পাঁচটি অথবা সাতটি এভাবে বে-জোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়া সুন্নত।

সাহাবী আনাস (রাঃ) বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন কয়েকটি খেজুর না খেয়ে বের হতেন না, আর খেজুর খেতেন বে-জোড় সংখ্যায়। (বুখারী) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া : ঈদগাহে তাড়াতাড়ি যাওয়া উচিত। যাতে ইমাম সাহেবের নিকটবর্তী স্থানে বসা যায় ও ভাল কাজ অতি তাড়াতাড়ি করার সওয়াব অর্জন করা যায়, সাথে সাথে সালাতের অপেক্ষায় থাকার সওয়াব পাওয়া যাবে। ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া হল মোস্তাহাব।

ঈদের তাকবীর আদায় : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতেন। ঈদের সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : বল, আমি তোমাদের মত একজন মানুষ; (কিন্তু) আমার নিকট ওহী প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের আল্লাহ্ এক ও অদ্বিতীয়। সুতারাং যে তাহার প্রভুর সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎ কাজ করে এবং প্রভুর ইবাদতে কাউকে শরীক না করে। (সূরা কাহ্ফ-১১০) রমজান চলে গেছে, তার অর্থ এই নয় যে আমরা সারা বছর আর কোনো রোযা রাখব না। বরং রমযানের বাইরেও আমরা নফল রোযাসমূহ পালন করার চেষ্টা করব। কেননা, রোযার সাওয়াব অফুরন্ত, যা আল্লাহ তা’আলা নিজ হাতে দিবেন বলে হাদীসে ঘোষণা এসেছে। আর রমযানের পরপরই আমাদের সামনে যে নফল রোযাটি আসে তা হলো শাওয়াল মাসের ছয় রোজা। আবূ আইয়ূব আনসারী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি রমযানের রোযা রাখার পর শাওয়াল মাসে ৬টি রোযা রাখলো সে যেন সারা বছর রোযা রাখল। (মুসলিম) তাই আজ প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত¦ রমযান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে জীবনকে উদ্ভাসিত করা। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের তাওফীক দান করুন। আমীন .

লাইলাতুল কদরের মর্যাদা, বৈশিষ্ট্য ও ফযীলাত

(১) এ রাতে আল্লাহ তা‘আলা পুরা কুরআন কারীমকে লাউহে মাহফুয থেকে প্রথম আসমানে নাযিল করেন। তাছাড়া অন্য আরেকটি মত আছে যে, এ রাতেই কুরআন নাযিল শুরু হয়। পরবর্তী ২৩ বছরে বিভিন্ন সূরা বা সূরার অংশবিশেষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘটনা ও অবস্থার প্রেক্ষিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র উপর অবতীর্ণ হয়।
(২) এ এক রজনীর ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম।
(৩) এ রাতে পৃথিবীতে অসংখ্য ফেরেশতা নেমে আসে এবং তারা তখন দুনিয়ার কল্যাণ, বরকত ও রহমাত বর্ষণ করতে থাকে।
(৪) এটা শান্তি বর্ষণের রাত। এ রাতে ইবাদত গুজার বান্দাদেরকে ফেরেশতারা জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তির বাণী শুনায়।
(৫) এ রাতের ফাযীলত বর্ণনা করে এ রাতেই একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল হয়। যার নাম সূরা কদর।
(৬) এ রাতে নফল সালাত আদায় করলে মুমিনদের অতীতের সগীরা গুনাহগুলো মাফ করে দেয়া হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াব লাভের আশায় কদরের রাতে নফল সালাত আদায় ও রাত জেগে ইবাদত করবে আল্লাহ তার ইতোপূর্বের সকল সগীরা (ছোট) গুনাহ ক্ষমা করেদেন। (বুখারী)
কোন রাতটি লাইলাতুল কদর? [১] এ রাতটি রমযান মাসে। আর এ রাতের ফযীলত কিয়ামত পর্যন্ত জারী থাকবে।
[২] এ রাতটি রমাযানের শেষ দশকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “রমাযানের শেষ দশদিনে তোমরা কদরের রাত তালাশ কর।” (বুখারী)
[৩] আর এটি রমযানের বেজোড় রাতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “তোমরা রমাযানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত খোঁজ কর।” (বুখারী)
[৪] এ রাত রমযানের শেষ সাত দিনে হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর (কদরের রাত) অন্বেষণ করতে চায়, সে যেন রমাযানের শেষ সাত রাতের মধ্য তা অন্বেষণ করে।”
[৫] রমাযানের ২৭ শে রজনী লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী।
ক. হাদীসে আছে : উবাই ইবনে কাব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন যে, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি যতদূর জানি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যে রজনীকে কদরের রাত হিসেবে কিয়ামুল্লাইল করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা হল রমাযানের ২৭ তম রাত। (মুসলিম)
(খ) আব্দুল্লাহ বিন ‘উমার থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “যে ব্যক্তি কদরের রাত অর্জন করতে ইচ্ছুক, সে যেন তা রমাযানের ২৭শে রজনীতে অনুসন্ধান করে। (আহমাদ)
[৬] কদরের রাত হওয়ার ব্যাপারে সম্ভাবনার দিক থেকে পরবর্তী দ্বিতীয় সম্ভাবনা হল ২৫ তারিখ, তৃতীয় হল ২৯ তারিখে। চতুর্থ হল ২১ তারিখ। পঞ্চম হল ২৩ তারিখের রজনী।
[৭] সর্বশেষ আরেকটি মত হল- মহিমান্বিত এ রজনীটি স্থানান্তরশীল। অর্থাৎ প্রতি বতসর একই তারিখে বা একই রজনীতে তা হয় না এবং শুধুমাত্র ২৭ তারিখেই এ রাতটি আসবে তা নির্ধারিত নয়। আল্লাহর হিকমত ও তাঁর ইচ্ছায় কোন বছর তা ২৫ তারিখে, কোন বছর ২৩ তারিখে, কোন বছর ২১ তারিখে, আবার কোন বছর ২৯ তারিখেও হয়ে থাকে।
কেন এ রাতকে অস্পষ্ট করে গোপন রাখা হয়েছে। এটা স্পষ্ট করে নির্দিষ্ট করে বলা হয় নি কেন? এ রাতের পুরস্কার লাভের আশায় কে কত বেশী সক্রিয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এবং কত বেশী সচেষ্ট হয়, আর কে নাফরমান ও আলসে ঘুমিয়ে রাত কাটায় সম্ভবতঃ এটা পরখ করার জন্যই আল্লাহ তা‘আলা এ রাতকে গোপন ও অস্পষ্ট করে রেখেছেন।
যে রাতটি লাইলাতুল কদর হবে সেটি বুঝার কি কোন আলামত আছে? হাঁ, সে রাতের কিছু আলামত হাদীসে বর্ণিত আছে। সেগুলো হল : (১) রাতটি গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না।
(২) নাতিশীতোষ্ণ হবে। অর্থাত গরম বা শীতের তীব্রতা থাকবে না।
(৩) মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে।
(৪) সে রাতে ইবাদত করে মানুষ অপেক্ষাকৃত অধিক তৃপ্তিবোধ করবে।
(৫) কোন ঈমানদার ব্যক্তিকে আল্লাহ স্বপ্নে হয়তো তা জানিয়েও দিতে পারেন।
(৬) ঐ রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে।
(৭) সকালে হালকা আলোকরশ্মিসহ সূর্যোদয় হবে। যা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মত।
(সহীহ ইবনু খুযাইমাহ- ২১৯০, বুখারী০ ২০২১, মুসলিম- ৭৬২ নং হাদীস)
রমাযানের শেষ দশ রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী ধরণের ইবাদত করতেন? তাঁর ইবাদতের অবস্থা ছিল নিম্নরূপ :
১. প্রথম ২০ রাত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণ রাত জাগরণ করতেন না। কিছু সময় ইবাদত করতেন, আর কিছু অংশ ঘুমিয়ে কাটাতেন। কিন্তু রমাযানের শেষ দশ রাতে তিনি বিছানায় একেবারেই যেতেন না। রাতের পুরো অংশটাই ইবাদত করে কাটাতেন।
সে সময় তিনি কুরআন তিলাওয়াত, সলাত আদায় সদাকা প্রদান, যিকর, দু‘আ, আত্মসমালোচনা ও তাওবাহ করে কাটাতেন। আল্লাহর রহমাতের আশা ও তার গজবের ভয়ভীতি নিয়ে সম্পূর্ণ খুশুখুজু ও বিনম্রচিত্তে ইবাদতে মশগুল থাকতেন।
২. হাদীসে এসেছে সে সময় তিনি শক্ত করে তার লুঙ্গি দ্বারা কোমর বেধে নিতেন। এর অর্থ হল, রাতগুলোতে। তাঁর সমস্ত শ্রম শুধু ইবাদতের মধ্যেই নিমগ্ন ছিল। নিজে যেমন অনিদ্রায় কাটাতেন তাঁর স্ত্রীদেরকেও তখন জাগিয়ে দিতেন ইবাদত করার জন্য।
৩. কদরের রাতের ইবাদতের সুযোগ যাতে হাতছাড়া হয়ে না যায় সেজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশদিনের পুরো সময়টাতে ইতেকাফরত থাকতেন। (মুসলিম- ১১৬৭)
মহিমান্বিত লাইলাতুল কদরে আমরা কী কী ইবাদত করতে পারি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে এ রাত কাটাতেন এর পূর্ণ অনুসরণ করাই হবে আমাদের প্রধান টার্গেট। এ লক্ষ্যে আমাদের নিুবর্ণিত কাজগুলো করা আবশ্যক :
(ক) নিজে রাত জেগে ইবাদত করা এবং নিজের অধীনস্ত ও অন্যান্যদেরকেও জাগিয়ে ইবাদতে উদ্বুদ্ধ করা।
(খ) লম্বা সময় নিয়ে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ পড়া। এসব সালাতে কিরাআত ও রুকু-সিজদা লম্বা করা। রুকু থেকে উঠে এবং দুই সিজদায় মধ্যে আরো একটু বেশী সময় অতিবাহিত করা, এসময় কিছু দু‘আ আছে সেগুলে পড়া।
(গ) সিজদার মধ্যে তাসবীহ পাঠ শেষে দু‘আ করা। কেননা সিজদাবনত অবস্থায় মানুষ তার রবের সবচেয়ে নিকটে চলে যায়। ফলে তখন দু‘আ কবুল হয়।
(ঘ) বেশী বেশী তাওবা করবে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়বে। ছগীরা কবীরা গোনাহ থেকে মাফ চাইবে। বেশী করে শির্কী গোনাহ থেকে খালেছ ভাবে তাওবা করবে। কারণ ইতিপূর্বে কোন শির্ক করে থাকলে নেক আমল তো কবুল হবেই না, বরং অর্জিত অন্য ভাল আমলও বরবাদ হয়ে যাবে। ফলে হয়ে যাবে চিরস্থায়ী জাহান্নামী।
(ঙ) কুরআন তিলাওয়াত করবে। অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ কুরআন অধ্যয়নও করতে পারেন। তাসবীহ তাহলীল ও যিক্র-আযকার করবেন। তবে যিকর করবেন চুপিসারে, নিরবে ও একাকী এবং কোন প্রকার জোরে আওয়ায করা ছাড়া। এভাবে যিকর করার জন্যই আল্লাহ কুরআনে বলেছেন :“সকাল ও সন্ধ্যায় তোমার রবের যিকর কর মনে মনে বিনয়ের সঙ্গে ভয়ভীতি সহকারে এবং জোরে আওয়াজ না করে। এবং কখনো তোমরা আল্লাহর যিকর ও স্মরণ থেকে উদাসীন হয়োনা।” (আরাফ : ২০৫) অতএব, দলবেধে সমস্বরে জোরে জোরে উচ্চ স্বরে যিক্র করা বৈধ নয়। এভাবে সম্মিলিত কোন যিকর করা কুরআনেও নিষেধ আছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তা করেন নি। যিকরের শব্দগুলো হল: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ইত্যাদি।
(চ) একাগ্রচিত্তে দু‘আ করা। বেশী বেশী ও বার বার দু‘আ করা। আর এসব দু‘আ হবে একাকী ও বিনম্র চিত্তে কবুল হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে। দু‘আ করবেন নিজের ও আপনজনদের জন্য. জীবিত ও মৃতদের জন্য, পাপমোচন ও রহমত লাভের জন্য, দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তির জন্য। তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাতে নিম্নের এ দু‘আটি বেশী বেশী করার জন্য উতসাহিত করেছেন : “ হে আল্লাহ! তুমি তো ক্ষমার আধার, আর ক্ষমা করাকে তুমি ভালবাস। কাজেই তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। (তিরমিযী)

মুত্তাকীরা রাতের বেলা কমই ঘুমাতো – كَانُوا قَلِيلاً مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُون

সমস্ত প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। আমরা তার প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, ও একক, তার কোন শরীক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ! সালাত, সালাম ও বরকত অবতীর্ণ করুন তার উপর, তার বংশধর ও সাহাবাদের উপর, এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার পথে ধাবিত হবে ও তার আদর্শের অনুসরণ করবে তাদের উপর।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার শ্রেষ্ঠ নবীর শ্রেষ্ঠ উম্মাতদেরকে উপহার দিয়েছেন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মাস রমযানুল মোবারক। এ মাসেই আল্লাহ তা’আলার পক্ষথেকে রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। রমযান মাসে সিয়াম সাধনায় মহান আল্লাহর অনন্ত অসীম রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। তাই তো রমযানের আগমনে আল্লাহ প্রেমিক বান্দার অন্তরে এক অনাবিল আনন্দধারা প্রবাহিত হয়। সকল ঈমানদারেরা শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে এই পবিত্র মাসটি অতিবাহিত করে। মুসলিম উম্মাহর জন্য রমযান অত্যন্ত কাংক্ষিত ও প্রাপ্তির মাস। রমজান এমন একটি মাস যে মাসে ইবাদতের সওয়াব অনেক বেশি। সুতরাং আল্লাহর দরবারে বিনয়াবনত হয়ে কাতর কণ্ঠে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে যেন শারীরিক সুস্থতা ও মনের শুদ্ধতা নিয়ে দিনের বেলায় সিয়াম সাধনা ও রাতে সালাত, কুরআন তিলাওয়াত ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে এই মোবারক মাসের সদ্ব্যবহার করা যায়। রমজান মাস সতকর্ম ও আখিরাতের নেকি লাভের উত্তম মৌসুম। কিয়ামুল-লাইল বা রাতের সালাতের ফজীলত আল্লাহর নিকট বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ কোন সন্দেহ নেই। ফরয সালাতের পর এ সালাতের স্থান। এ সালাতের বৈশিষ্ট্য শুধু ব্যক্তির পাপ মোচন করা নয়, বরং পাপে লিপ্ত হওয়া থেকে হিফাযত করা। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : তোমরা রাতের সালাত জরুরী করে নাও, কারণ তা নেককার লোকদের অভ্যাস, তোমাদের রবের নৈকট্য, গুনাহের কাফফারা ও পাপ থেকে সুরক্ষা। (তিরমিযী) অর্থাত, আমাদের পূর্বপুরুষগণ কিয়ামুল লাইল বা রাতের সালাতের ব্যাপারে শিথিলতা করতেন না, কিন্তু বর্তমান যুগে অবস্থা পাল্টে অনেকের রাত পরিণত হয়েছে দিনে। তাদের থেকে বিদায় নিয়েছে রাতে আল্লাহর সাথে মোনাজাতের স্বাদ। অনেকের শিথিলতা ফজর সালাতের সীমা অতিক্রম করে গেছে।

قال الله تعالى : وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا (سورة الفرقان-৬৪)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : (রহমানের আসল বান্দা) তারাই যারা নিজেদের রবের সামনে সিজদায় অবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দেয়। (সূরা ফুরকান-৬৪)

قال الله تعالى : كَانُوا قَلِيلاً مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ (الذريات-১৭)

আল্লাহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন :- (মুত্তাকীরা) রাতের বেলা তারা কমই ঘুমাতো। (সূরা যারিয়াত-১৭) অর্থাত, তারা রাতের বেশীর ভাগ সময়ই মহান আল্লাহর ইবাদতে কাটাতেন এবং অল্প সময় ঘুমাতেন।

قال الله تعالى : تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ ، فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ. (سورة السجدة-১৬/১৭)

অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- তাদের পিঠ থাকে বিছানা থেকে আলাদা, নিজেদের রবকে ডাকে আশংকা ও আকাংকা সহকারে এবং যা কিছু রিযিক আমি তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। তারপর কেউ জানে না তাদের কাজের পুরস্কার হিসেবে তাদের চোখের শীতলতার কি সরঞ্জাম লুকিয়ে রাখা হয়েছে। (সূরা সিজদাহ-১৬/১৭) হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, হাদীসে কুদসীটি উদ্ধৃত হয়েছে যে, নবী করীম (সা) বলেছেন : আল্লাহ তা’আলা বলেন; আমার সতকর্মশীল বান্দাদের জন্য আমি এমনসব জিনিস সংগ্রহ করে রেখেছি যা কখনো কোন চোখ দেখেনি, কোন কান শোনেনি এবং কোন মানুষ কোনদিন তা কল্পনাও করতে পারে না। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদ)

জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম উপায় রাতের সালাত :

عن عبد الله بن سلام رضي الله عنه قال :  سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : يا أيها الناس أفشوا السلام ، و أطعموا الطعام ، و صلوا الأرحام ، و صلوا بالليل و الناس نيام ، تدخلوا الجنة بسلام (رواه الترمذي)

আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করেন, তখন লোকেরা তার দিকে ছুটে গেল। আর চারদিকে ধ্বনিত হল : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেছেন (তিনবার)।

আমি মানুষের সাথে তাকে দেখতে আসলাম। আমি যখন তার চেহারা ভালভাবে দেখলাম, পরিষ্কার বুঝলাম তার চেহারা কোন মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। আমি সর্বপ্রথম তাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন : হে লোকেরা, তোমরা সালামের প্রসার কর, খাদ্য দান কর, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখ ও রাতে সালাত আদায় কর যখন মানুষেরা ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিযী, ইবনে মাজা)

এ মোবারক মাসের শেষ দশকে রাব্বুল আলামীন লাইলাতুল কদর নামে এমন এক মহামূল্যবান ও মহিমান্বিত রজনী আমাদের দান করেছেন, যা ইতিপূর্বে কোন উম্মাতকে দেয়া হয়নি। লাইলাতুল কদর এমন একটি রজনী যা হাজার মাস (ইবাদাত) অপেক্ষা উত্তম।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাতে ইবাদত-বন্দেগীতে বেশি সময় ও শ্রম দিতেন, যা অন্য কোন রাতে দেখা যেত না। যেমন মুসলিম শরীফে আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে, তিনি এ রাতে কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে জাগ্রত থাকতেন এরপর সেহরী গ্রহণ করতেন। রমযানের শেষ দশক আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরনের লুঙ্গি শক্ত করে নিতেন। রাত্রি জাগরণ করতেন এবং পরিবারের সকলকে জাগিয়ে দিতেন। যেমন বোখারী ও মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে এসেছে। তিনি এ দশদিনের রাতে মোটেই নিদ্রা যেতেন না। পরিবারের সকলকে তিনি এ রাতে ইবাদত-বন্দেগী করার জন্য জাগিয়ে দিতেন। এ দশদিনের একটি বৈশিষ্ট্য হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ শেষ দশদিনে মসজিদে এ’তেকাফ করতেন। প্রয়োজন ব্যতীত তিনি মসজিদ থেকে বের হতেন না।

লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব : আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন এ রাতকে সকল রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি তার কালামে পাকে এ রাতকে প্রশংসার সাথে উল্লেখ করেছেন।

قال الله تعالى : حم ، وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ ، إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ ، فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ ، أَمْرًا مِّنْ عِندِنَا ۚ إِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ (سورة الدخان)

আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন : (১) হা-মীম, (২) শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, (৩) আমি তো এটা (কুরআনুল কারীমকে) অবতীর্ণ করেছি এক মুবারক রজনীতে; আমি তো সতর্ককারী। (৪) এ রজনীতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়; (৫) আমার আদেশক্রমে, আমি তো রাসূল প্রেরণ করে থাকি। (সূরা দুখান) ব্যাখ্যা : মুবারক রজনী দ্বারা মুফাস্সিরগণ লাইলাতুল কদরকে বুঝিয়েছেন। বরকতময় রজনী হল লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তা’আলা একে বরকতময় বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এ রাতে রয়েছে যেমন বরকত তেমনি কল্যাণ ও তাতপর্য। বরকতের প্রধান কারণ হল এ রাতে আল-কোরআন নাযিল হয়েছে। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-সিদ্ধান্ত লওহে মাহফুজ থেকে ফেরেশতাদের হাতে অর্পণ করা হয় বাস্তবায়নের জন্য। এ রাতের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হল আল্লাহ তা’আলা এ রাত সম্পর্কে একটি পূর্ণ সূরা অবতীর্ণ করেছেন।

قال الله تعالى : إنا أنزلناه في ليلة القدر ، وما أدراك ما ليلة القدر ، ليلة القدر خير من ألف شهر ، تنزل الملائكة والروح فيها بإذن ربهم من كل أمر ، سلام هي حتى مطلع الفجر  (سورة القدر)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : (১) নিশ্চয় আমি একে (কুরআনুল কারীমকে) নাযিল করেছি কদরের রাতে। (২) কদরের রাত সম্পর্কে আপনি কী জানেন ? (৩) কদরের রাত হচ্ছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (৪) এই রাতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতারা ও রূহ জিবরাঈল (আঃ) অবতীর্ণ হন তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। (৫) এ রাত সালাম তথা নিরাপত্তার রাত, যা ফজর হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সূরা,কদর)

লাইলাতুল কদরের ফযীলত ও মর্যাদা : মহান রাব্বুল আলামীন বিশ্ব মানবের হিদায়াত ও পথ নির্দেশিকা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এ রজনীতেই লাওহে মাহ্ফুজ থেকে প্রথম আসমানে সম্পূর্ণ রূপে অবতীর্ণ করেছেন। অতঃপর সুদীর্ঘ তেইশ বছর যাবত প্রয়োজন অনুসারে বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। (ইবনে কাসীর) দুনিয়ার বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ মূল্যবান ও মর্যাদাপূর্ণ রজনী হলো কদরের রজনী। এ রজনীর গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে উম্মতে মুহাম্মদীকে অবহিত করানোর জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ”সূরা কদর” নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা অবতীর্ণ করেছেন। এ সূরায় উম্মাতে মুহাম্মদীকে সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। এই একটি রাতের ইবাদাত হাজার মাস ইবাদাতের চেয়েও উত্তম বলে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি কদরের রাতে পূর্ণ বিশ্বাস ও সওয়াবের নিয়্যাতে ইবাদাত করবে তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (বুখারী)

হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রমযান মাসের আগমনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : দেখ এ মাসটি তোমাদের কাছে এসে উপস্থিত হয়েছে। এতে এমন একটি রাত আছে যা হাজার মাস থেকে অধিক উত্তম। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে যাবতীয় কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। আর চিরবঞ্চিত ব্যক্তিই কেবল এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। (ইবনে মাযাহ)

আল-কোরআনে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি লাইলাতুল কদর কোন রাত। তবে কুরআনের ভাষ্য হল লাইলাতুল কদর রমযান মাসে। কিয়ামত পর্যন্ত রমযান মাসে লাইলাতুল কদর অব্যাহত থাকবে। এবং এ রাত রমযানের শেষ দশকে হবে বলে সহী হাদীসে এসেছে। এবং তা রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে হাদীসে এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর। (বুখারী) 

নিঃসন্দেহে ঐ বরকতপূর্ণ রাতটি যে ব্যক্তি অবহেলায় বা অলসতায় অবমূল্যায়ন করল, এর যথার্থ গুরুত্বারোপ করল না সে সমূহ কল্যাণ থেকে নিজকে বিরত রাখল। প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির উচিত যে, ঐ রাতের যথাযথ ভাবে হক আদায় করে মহান আল্লাহর পক্ষথেকে কল্যাণ, ফযীলত, বরকত ও আশাতীত সওয়াব লাভে ধন্য হওয়া।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে বেশী-বেশী করে ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে শেষ দশকের ফযীলত অর্জন করে তার নৈকট্য লাভের তাওফীক দান করুন। আমীন .

রমজানের ঐতিহাসিক তিনটি প্রেক্ষাপট

তিনটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে রমজান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং তাতে আমাদের জন্য রয়েছে শিক্ষা।

১. রমজান কুরআন নাজিলের মাস। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এ মাসেই নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘রমজান এমন একটি মাস যে মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে।’ (সূরা বাকারা-১৮৫) এ কুরআনের কারণেই মূলত রমজান মাস তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কুরআন নাজিল মানবতার প্রতি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সবচেয়ে বড় করুণা। এ করুণার ফলে উম্মাতে মুহাম্মদি সবচেয়ে মর্যাদাবান জাতিতে অভিহিত। কুরআনের বদৌলতে মুসলমানরা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হয়েছিলেন। আজ মুসলমনরা কুরআন থেকে দূরে-বহুদূরে। তাই তো আমরা পৃথিবীতে অপমানিত-নিপীড়িত। আজ আমাদের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গেছে। অথচ মানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল কুরআনকে আমরা মুসলমানরা আমাদের জীবনের মূলমন্ত্রে পরিণত করলে আমাদের গৌরব আবারো ফিরে আসবে। তাই কুরআন নাজিলের এ পবিত্র রমজান মাসে আমরা বেশি করে কুরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি কুরআনের আলোকে আমরা আমাদের নিজেদের জীবন গড়ে তুলব। আর সেটাই হবে পবিত্র মাহে রমজানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
২. রমজান মাসেই সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ। সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়কারী এ যুদ্ধ এ মাসে সংঘটিত হওয়ার ফলে মাসটির গুরুত্ব আরো অনেক বেড়ে গেছে। তাই তো মাহে রমজানের আরেকটি শিক্ষা হচ্ছে : বদরের যুদ্ধে মুসলমানরা বাতিলের বিরুদ্ধে যেমনি ছিল আপসহীন, তেমনি আমাদেরও আজ অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে থাকতে হবে বজ্রকঠোর। রমজান ধৈর্যধারণের মাস একথা সত্য। তবে ধৈর্যের দোহাই দিয়ে বসে থাকব আর অন্যায় মাথাচাড়া উঠবে, সেটা ঠিক নয় তথা মাহে রমজানের শিক্ষাও নয়। অন্যায় আর অসত্যকে যাতে আমরা সমূলে ধ্বংস করে দিতে পারি, রমজান মাসে সংঘটিত বদরের যুদ্ধ আমাদের সে শিক্ষাই দিয়ে গেছে। বদরের যুদ্ধ ইসলামের প্রথম জেহাদ ও হক বাতিলের পার্থক্য নির্ণয়ের জেহাদ। বদরের যুদ্ধ প্রমাণ করেছে ইসলাম সত্য ধর্ম। বদরের যুদ্ধ থেকে মুসলমানদেরকে শিক্ষা নিতে হবে যে, তারা সত্যের পক্ষে। ন্যায়ের পক্ষে থেকে জেহাদ বা প্রতিরোধ গড়লে মুসলমানরা দুর্বল হলেও আল্লাহ তায়ালা এখনও তাদেরকে গায়েবী সাহায্যের জন্য প্রয়োজন আধ্যাত্মিকতা। মুসলমানদের এ আধ্যাত্মিক শক্তি ধ্বংস করতে সর্বদা চক্রান্ত করে যাচ্ছে। বদরের চেতনায় এদের প্রতিহত করা হক পথের মুসলমানদের ইমানী দায়িত্ব। পৃথিবীর ইতিহাসে বদরের যুদ্ধ ও মক্কা বিজয় মুসলিম উম্মার অগ্রগতির এবং জয়যাত্রার এক নবতর অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বদরের যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে কোন অস্ত্র এবং শক্তির বিরুদ্ধে ঈমানী শক্তি অপ্রতিরোধ্য।

৩. ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের মাস এ রমজান। রমজানের ঐতিহাসিক স্মৃতি জাগ্রত রাখতে মক্কা বিজয় অনেকখানি ভূমিকা পালন করেছে। সেদিন সিয়াম সাধনায় মশগুল মুসলমানরা ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে মক্কা অভিযানে বের হয়েছিলেন আল্লাহর রাসুলের সফরসঙ্গী হয়ে। মুসলমান ঘরে বসে থাকার জাতি নয়। আল্লাহর দ্বীনকে তাঁর দেয়া ভূখণ্ডে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে কায়েম করার দৃঢ়প্রত্যয় গ্রহণের অন্যতম শিক্ষা হচ্ছে মাহে রমজানের শিক্ষা। সুতরাং মুসলিম হিসেবে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার প্রত্যয় আমাদের গ্রহণ করতে হবে এ রমজান মাসে। মনে রাখতে হবে, বাতিলের ওপর আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে কায়েম করার জন্য আল্লাহর রাসুলের এ ধরাপৃষ্ঠে আগমন।

সূরা হুজুরাতের শিক্ষা

ইসলাম সার্বজনীন এক জীবনাদর্শ, যা মানুষকে এমন নীতি-নৈতিকতা ও শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়ে থাকে যার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি, ধন-সম্পদ ও মান-মর্যাদার হিফাজত হয়। ইসলাম মানবজাতির পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এতে জীবনের প্রতিটি বিষয় সুবিন্যস্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা আল-হুজুরাত রাসূল (সা.)-এর উপর নাযিলকৃত শেষ সূরা সমূহের মধ্যে একটি। সূরাটি মুসলমানদের করণীয় বিভিন্ন সদাচরণের উপর আলোকপাত করেছে যা তাঁদের সামাজিক ব্যবস্থাকে সমুন্নত, সুসংহত এবং সুরক্ষিত করে। যে কোনও সম্প্রদায় তাদের নেতার প্রতি যোগ্য সম্মান প্রদর্শন করবে। ঝগড়া-বিবাদ অনুচিত ও অশোভন তা শীঘ্র মিটিয়ে নেয়া প্রয়োজন। শোভনীয় ও ভদ্র আচরণ নৈতিক মূল্যবোধ থেকে উৎসারিত হয়। ইসলামী মূল্যবোধের সৌন্দর্য হচ্ছে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও বিশ্বাস প্রদর্শন যা প্রত্যেকের কর্তব্য বলে মনে করা হয়। একজন মুসলিম তার প্রতিপালকের প্রতি কেমন মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে। তার আচরণ কিভাবে নির্ধারণ হবে এবং কিভাবে প্রভাবিত করবে তার এবং রাসূল (সা.)-এর সম্পর্ককে। তার এবং সমাজে বসবাসকারী অন্যান্যদের মধ্যকার সম্পর্ক এবং আচরণই বা কি হওয়া উচিত। সার্বিকভাবে একজন মুসলিমের এই আচরণ, ব্যক্তি এবং সামষ্টিক পর্যায়ে কিভাবে একটি সমাজে তাওহীদের সমন্বয় ঘটাতে পারে। একটি মুসলিম সামাজিক কাঠামোর উপাদান এবং এর প্রধান লক্ষ্যগুলো কি সে সম্পর্কেও সূরা আল হুজুরাতে আলোকপাত করা হয়েছে ।

সূরা হুজুরাতের সার সংক্ষেপ : এ সূরার বিষয়বস্তু হচ্ছে মুসলমানদেরকে এমন আদব-কায়দা, শিষ্টাচার ও আচরণ শিক্ষা দেয়া যা তাদের ঈমানদারসূলভ স্বভাব চরিত্র ও ভাবমূর্তির উপযুক্ত ও মানানসই হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ব্যাপারে যেসব আদব-কায়দা, ও শিষ্টাচারের দিকে লক্ষ রাখতে হবে প্রথম পাঁচ আয়াতে তাদেরকে তা শিখিয়ে দেয়া হয়েছে।

قال الله تعالى : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ * يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ * إِنَّ الَّذِينَ يَغُضُّونَ أَصْوَاتَهُمْ عِندَ رَسُولِ اللَّهِ أُولَٰئِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ لِلتَّقْوَىٰ ۚ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ * إِنَّ الَّذِينَ يُنَادُونَكَ مِن وَرَاءِ الْحُجُرَاتِ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ * وَلَوْ أَنَّهُمْ صَبَرُوا حَتَّىٰ تَخْرُجَ إِلَيْهِمْ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ . (سورة الحجرات-১-৫)

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- হে মু’মিনগণ! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে অগ্রগামী হয়ো না। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন। হে মু’মিনগণ! নিজেদের আওয়াজ রাসূলের আওয়াজের চেয়ে উঁচু করো না এবং উচ্চস্বরে নবীর সাথে কথা বলো না, যেমন তোমরা নিজেরা পরস্পর বলে থাকো। এমন যেন না হয় যে, তোমাদের অজান্তেই তোমাদের সব কাজ-কর্ম ধ্বংস হয়ে যায়। যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে তাদের কণ্ঠ নিচু রাখে তারাই সেসব লোক, আল্লাহ যাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য বাছাই করে নিয়েছেন। তাদের রয়েছে ক্ষমা ও বড় পুরস্কার। হে নবী! যারা তোমাকে গৃহের বাইরে থেকে ডাকাডাকি করতে থাকে তাদের অধিকাংশই নির্বোধ। যদি তারা তোমার বেরিয়ে আসা পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করতো তাহলে তাদের জন্য ভাল হত। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। (সূরা হুজুরাত-১/৫)

এরপর নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, প্রতিটি খবরই বিশ্বাস করা এবং সে অনুসারে কোন কর্মকাণ্ড করে বসা ঠিক নয়, যদি কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা কওমের বিরুদ্ধে কোন খবর পাওয়া যায় তাহলে গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে খবর পাওয়ার মাধ্যম নির্ভরযোগ্য কি না। নির্ভরযোগ্য না হলে তার ভিত্তিতে কোন তৎপরতা চালানোর পূর্বে খবরটি সঠিক কি না তা যাঁচাই বাছাই করে নিতে হবে।

قال الله تعالى : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن جَاءَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَن تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ * وَاعْلَمُوا أَنَّ فِيكُمْ رَسُولَ اللَّهِ ۚ لَوْ يُطِيعُكُمْ فِي كَثِيرٍ مِّنَ الْأَمْرِ لَعَنِتُّمْ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ ۚ أُولَٰئِكَ هُمُ الرَّاشِدُونَ * فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَنِعْمَةً ۚ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ . (سورة الحجرات-৬-৮)

আল্লহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- হে ঈমান গ্রহণকারীগণ, যদি কোন ফাসেক তোমাদের কাছে কোন খবর নিয়ে আসে তাহলে তা অনুসন্ধান করে দেখ। এমন যেন না হয় যে, না জেনে শুনেই তোমরা কোন গোষ্ঠীর ক্ষতি করে বসবে এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে। ভাল করে জেনে নাও, আল্লাহর রাসূল তোমাদের মাঝে বর্তমান। তিনি যদি বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই তোমাদের কথা মেনে নেন তাহলে তোমরা নিজেরাই অনেক সমস্যার মধ্যে পড়ে যাবে। কিন্তু আল্লাহ তোমাদের মধ্যে ঈমানের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং তা তোমাদের কাছে পছন্দনীয় করে দিয়েছেন। আর কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে তোমাদের কাছে ঘৃণিত করে দিয়েছেন। আল্লাহর দয়া ও মেহেরবাণীতে এসব লোকই সৎপথের অনুগামী। আল্লাহ জ্ঞানী ও কুশলী। (সূরা হুজুরাত-৬/৮)

এরপর বলা হয়েছে মুসলমানদের দুটি দল যদি কোন সময় পরস্পর সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তবে সে ক্ষেত্রে অন্য মুসলমানদের কর্মনীতি কি হওয়া উচিত।

قال الله تعالى : وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا ۖ فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَىٰ فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّىٰ تَفِيءَ إِلَىٰ أَمْرِ اللَّهِ ۚ فَإِن فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا ۖ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ * إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ . (سورة الحجرات-৯-১০)

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- ঈমানদারদের মধ্যকার দু’টি দল যদি পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, তাহলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। তারপরও যদি দু’টি দলের কোন একটি অপরটির বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করে তবে যে দল বাড়াবাড়ি করে তার বিরুদ্ধে লড়াই করো। যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। এরপর যদি তারা ফিরে আসে তাহলে তাদের মাঝে ন্যায় বিচারের সাথে মীমাংসা করিয়ে দাও এবং ইনসাফ করো। আল্লাহ ইনসাফকারীদের পছন্দ করেন। মু’মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমাদের ভাইদের মধ্যকার সম্পর্ক ঠিক করে দাও। আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমাদের প্রতি মেহেরবানী করা হবে। (সূরা হুজুরাত-৯/১০)

তারপর মুসলমানদেরকে সেসব খারাপ জিনিস থেকে আত্মরক্ষার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যা সমাজ জীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং যার কারণে পারস্পরিক সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায়। একে অপরকে ঠাট্রা বিদ্রুপ করা, বদনাম ও উপহাস করা, খারাপ নামে আখ্যায়িত করা, খারাপ ধারণা পোষণ করা, অন্যের গোপনীয় বিষয় খোঁজাখুঁজি ও অনুসন্ধান করা, অসাক্ষাতে মানুষের বদনাম করা এগুলো এমনতিও গোনাহের কাজ এবং সমাজে বিপর্যয়ও সৃষ্টি করে।

আল্লাহ তা’আলা এগুলোকে নাম ধরে ধরে হারাম ঘোষণা করেছেন। অতপর গোত্রীয় ও বংশগত বৈষম্যের ওপর আঘাত হানা হয়েছে যা সারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে থাকে। বিভিন্ন জাতি, গোত্র ও বংশের নিজ নিজ মর্যাদা নিয়ে গর্ব ও অহংকার করা, অন্যদেরকে নিজেদের চেয়ে নিম্নস্তরের মনে করা এবং নিজেদের বড়ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যদের হেয় করা, এসব এমন জঘন্য খাসলত যার কারণে পৃথিবী জুলুমে ভরে উঠেছে। আল্লাহ তা’আলা অত্যন্ত ছোট্ট একটি আয়াতে একথা বলে এসব অনাচারের মূলোৎপাটন করেছেন যে, সমস্ত মানুষ এই মূল উৎস থেকে সৃষ্টি হয়েছে। তাদেকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভিক্ত করা হয়েছে পারস্পরিক পরিচয়ের জন্য, গর্ব ও অহংকার প্রকাশের জন্য নয় এবং একজন মানুষের ওপর আরেকজন মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব লাভের জন্য আর কোন বৈধ ভিত্তি নেই।

قال الله تعالى : يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰ أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِّسَاءٍ عَسَىٰ أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ ۖ وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ ۖ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ ۚ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ * يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ ۖ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَّحِيمٌ * يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ. (سورة الحجرات-১১-১৩)

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- মুমিনগণ, কেউ যেন অপর কাউকে উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোন নারী অপর নারীকেও যেন উপহাস না করে। কেননা, সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। কেউ বিশ্বাস স্থাপন করলে তাদের মন্দ নামে ডাকা গোনাহ। যারা এহেন কাজ থেকে তাওবা না করে তারাই যালেম। মুমিনগণ, তোমরা অনেক ধারণা থেকে বেঁচে থাক। নিশ্চয় কতক ধারণা গোনাহ এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। হে মানব জাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দিয়েছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। তোমাদের মধ্যে যে অধিক পরহেজগার সে-ই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদার অধিকারী। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও সবকিছু সম্পর্কে অবহিত। (সূরা হুজুরাত-১১/১২/১৩)

সবশেষে মানুষকে বলা হয়েছে যে, ঈমানের মৌখিক দাবী প্রকৃত জিনিস নয়, বরং সরল মনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মানা, কার্যত অনুগত হয়ে থাকা এবং আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর পথে জান ও মাল কুরবানী করা। সত্যকার মু’মিন সে যে এ নীতি ও আচরণ গ্রহণ করে। কিন্তু যারা আন্তরিকভাবে মেনে নেয়া ছাড়াই শুধু মৌখিকভাবে ইসলামকে স্বীকার করে এবং তারপর এমন নীতি ও আচরণ অবলম্বন করে যেন ইসলাম গ্রহণ করে তারা কোন মহা উপকার সাধন করেছে, পৃথিবীতে তারা মুসলমান, হিসেবে গণ্য হতে পারে, সমাজে তাদের সাথে মুসলমানের মত আচরণও করা যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহর কাছে তারা মুসলমান হিসেবে গণ্য হতে পারে না।

قال الله تعالى : قَالَتِ الْأَعرَابُ آمَنَّا ۖ قُل لَّم تُؤْمِنُوا وَلَٰكِن قُولُوا أَسْلَمنَا وَلَمَّا يَدْخُلِ الْإِيمَانُ فِي قُلُوبِكُمْ ۖ وَإِن تُطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ لَا يَلِتْكُم مِّنْ أَعْمَالِكُمْ شَيْئًا ۚ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ﴾

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- এ বেদুইনরা বলে, আমরা ঈমান এনেছি তাদের বলে দাও তোমরা ঈমান আন নাই। বরং বল, আমরা অনুগত হয়েছি। ঈমান এখনো তোমাদের মনে প্রবেশ করেনি। তোমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর আনুগত্যের পথ অনুসরণ করো তাহলে তিনি তোমাদের কার্যাবলীর পরস্পর দানে কোন কার্পণ্য করবেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। (সূরা হুজুরাত-১৪)

আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের আচরণ ও জীবনকে আল কুরআনের সূরা হুজুরাতের শিক্ষার আলোকে আলোকিত করার তাওফীক দান করুন। আমীন!

মুসলিম চরিত্রে রমযানের কাঙ্খিত প্রভাব

মুসলিম চরিত্রে রমযানের কাঙ্খিত প্রভাব

রমযানের গুরুত্ব : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “রমযানের আগমনে জান্নাতের দরজাগুলোকে খুলে দেয়া হয়”। রমযানে অধিক পরিমাণে ভাল কাজ করে জান্নাতের নিকটবর্তী হওয়া যায়। রমযানে সিয়াম পালনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করিয়ে নেয়ার চমৎকার সুযোগ আসে। আবু হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে উদ্ধৃত করেছেন : যে রমযানে বিশুদ্ধ বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান লাভের আশায় সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন।

তেমনি তিনি (সা:) বলেছেন: ঈমান সহকারে রমযানে রাতে যে কিয়াম করবে (রাতে সালাত আদায় করবে), তার অতীতের সমস্ত গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দেবেন। একবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মিম্বরে ওঠার সময় তিনবার আমিন বলেন। পরবর্তীতে তিনি ব্যাখ্যা করেন, জিবরীল (আঃ) এঁর তিনটি প্রার্থনার উত্তরে তিনি আমিন বলেন। তার মধ্যে একটি দুআ ছিল, যার ওপর রমযান আসে এবং চলে যায় অথচ তার গুনাহ মাফ হয় না, সে ক্ষতিগ্রস্ত/লাঞ্চিত হোক। বিশুদ্ধ নিয়তে সিয়াম পালন করলে মন্দের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার আত্মিক শক্তি অর্জিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: রোযা ঢাল স্বরুপ. একান্তভাবে আলল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য রোযা পালনকারীর জন্য বিশেষ পুরস্কার রয়েছে। একটি হাদীসে কুদসীতে এসেছে আল্লাহ বলেন : আদম সন্তানের সকল কাজই তার নিজের জন্য, সিয়াম ব্যতীত। এটা শুধুই আমার জন্য, এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।

রমযানের এইরূপ মর্যাদার প্রধান কারণ হচ্ছে এই মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে, যা স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ এবং পৃথিবীতে বিদ্যমান একমাত্র অপরিবর্তিত কিতাব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন : রমযান মাস সেই মাস, যে মাসে মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ স্বরুপ কুরআন নাযিল করা হয়েছে। এতে রয়েছে সত্য পথ প্রদর্শনের জন্য বিশুদ্ধ শিক্ষা এবং (সত্য থেকে মিথ্যাকে পার্থক্য করার) মানদন্ড।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২:১৮৫)

কুরআন নাযিল মানবজাতির প্রতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সর্ববৃহৎ অনুগ্রহ, যে মানবজাতি এর পূর্ববর্তী ওহী নাযিল হওয়ার পরবর্তী সময় থেকে নিয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল। তাঁর দয়া নিঃসৃত এই অনুপম অনুগ্রহ ছাড়া হেদায়েতের স্তিমিত-প্রায় আলোটুকুও হারিয়ে যেত এবং গোটা মানবসমাজে প্রতিষ্ঠা হত অন্যায়ের রাজত্ব।

সিয়ামের উদ্দেশ্য : রোযার মূল লক্ষ্য তাকওয়া (আল্লহ-ভীতি এবং তাঁর সম্পর্কে সচেতনতা) অর্জন। যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনুল কারীমে উল্লেখ করেছেন : “…যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২ : ১৮৩)

তাকওয়া সর্বোচ্চ নৈতিক গুণগুলোর একটি, তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর ক্রোধ এবং নিজের মাঝে একটি ঢাল তৈরী করতে পারে। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহর সমস্ত আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে সর্বদা সচেতন থাকা, অর্থাৎ হারাম পরিহার করা, মাকরূহ পরিহার করা এবং এমনকি সন্দেহের অবস্থায় হালালও পরিত্যাগ করা। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারেরা এটাও পরীক্ষা করে দেখেছেন যে রোযা বহুভাবে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। যেমন এ সময় শরীরে সঞ্চিত অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ব্যবহৃত হয়। এভাবে রোযা শরীরকে সবল রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

বর্তমান মুসলিম সংস্কৃতিতে রোযা : বর্তমান মুসলিম সংস্কৃতিতে রোযা ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনা এবং সংযমের পরিবর্তে পরিণত হয়েছে উৎসবের মাসে! রমযানের রাতগুলি পরিণত হয় পার্টি এবং ভোজের রাত্রিতে যা কিনা কোন কোন দেশে ভোর পর্যন্ত চলে। সেখানে রাত পরিবর্তিত হয় দিনে, দিন পরিবর্তিত হয় রাতে (বহু মানুষই রোযার সময়টুকু ঘুমিয়ে কাটায়)। সাধারণতঃ সেহেরীতে মানুষ হালকা খাবারের বদলে পেট ভরে খায়। ফলে রোযা অবস্থায় খুব কম মানুষই প্রকৃত ক্ষুধার তাড়না বোধ করে। আবার ইফতারীতে আরেক দফা ভরপেট খাওয়া চলে, সেই সাথে রয়েছে রকমারী খাবারের আয়োজন। ফলে অনেকেই রমযান শেষে ওজন বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করে!

মুসলিম চরিত্রে সাওমের কাঙ্খিত প্রভাব : রমযানের শিক্ষাসমূহ , রমযানের সময়কাল অনেকটা বিদ্যালয়ের মত, যে সময়টিতে শেখার মত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কোন কারণে নামায ছুটে গেলে আমরা তা পরবর্তীতে আদায় করে নিতে পারি, কিংবা রোযাও পরবর্তীতে রাখতে পারি, কিন্তু রমযানের সময়টি সেরকম নয়, এ সময় যদি পার হয়ে যায় এমন অবস্থায় যে আমরা রমযানের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গুলো নিতে পারলাম না, তবে তা বিরাট ক্ষতি।

প্রথম শিক্ষা : আল্লাহ সম্পর্কে সচেতনতা বা তাকওয়া সৃষ্টি, কুরআনের যে আয়াতে সিয়ামের আদেশ দেয়া হয়েছে, সে আয়াতেই এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে : হে বিশ্বাসীগণ। তোমাদের জন্য সিয়াম পালনকে নির্ধারণ করা হল যেমনটি তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২ : ১৮৩)

এই তাকওয়া আল্লাহ সম্পর্কে সচেতনতা, তাঁর উপস্থিতির উপলব্ধি, এবং এটা জানা যে তিনি আমাদের দেখছেন – যা আমাদেরকে ব্যক্তিগত জীবনে উন্নততর মানুষ হতে সাহায্য করবে। এই তাকওয়াকে আলী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন আল্লাহর প্রতি ভয়, অল্পে সন্তুষ্টি এবং (পরবর্তী জীবনের পানে) যাত্রার প্রস্তুতি হিসেবে। তাই ভয় তাকওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একদল লোক কেবল আল্লাহকে ভালবাসার কথা বলে থাকে এবং দাবী করে যে আল্লাহকে ভয় করে তাঁর ইবাদত করা ঠিক নয়, বরং তাঁকে শুধুমাত্র ভালবেসে ইবাদত করাটাই ঈমানের উন্নততর শর্ত । কিন্তু এ কথা ঠিক নয়। কুরআনের পাতায় পাতায় আল্লাহকে ভয় করার কথা বলা হয়েছে। এই ভয়ের অর্থ তাঁর অবাধ্যতার কারণে যে শাস্তি রয়েছে, সেই শাস্তিকে ভয় করা। মানুষ আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য সাধনা করার মাধ্যমে তাকে ভালবাসবে, একই সাথে তাঁর শাস্তির ভয়ও অন্তের পোষণ করতে হবে। এ দুটো অবিচ্ছেদ্য এবং প্রকৃত ঈমানের মৌলিক দুটি উপাদান। আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, যে রোযাদার লাইলাতুল ক্বদর লাভ করবে, তার পূর্ববর্তী পাপসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। এবং যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ঈমান সহকারে রমযানে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ সমূহকেও ক্ষমা করে দেয়া হবে“। এজন্য সিয়াম হতে হবে সঠিক পদ্ধতিতে এবং সঠিক প্রেরণার ভিত্তিতে। যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : যে রোযা অবস্থায় মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার ওপর আচরণ করা থেকে বিরত হল না, তার ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।

রোযা অবস্থায় আমাদের দিনগুলো রোযা না রাখা অবস্থায় আমাদের দিনগুলোর মত হওয়া উচিৎ নয় – এর মাঝে পার্থক্য থাকা উচিৎ। এই তাকওয়াই মানুষকে সর্বাবস্থায় অন্যায় থেকে বিরত রাখে, যদিও বা কেউ তাকে দেখতে না পায়। তাকওয়ার অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে। কুরআনের আলোকে তাকওয়ার কয়েকটি উপকারিতা হচ্ছে:

দ্বিতীয় শিক্ষা : আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করা

বিভিন্ন ধরনের ইবাদত প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সাথে আমাদের বন্ধন প্রতিষ্ঠার উপায়। রমযানে এই ইবাদতগুলো পরিমাণে বৃদ্ধি পায়, যেন আমরা এই মাস শেষে আল্লাহর সাথে সম্পর্কের উচ্চতর স্তরে অবস্থান করতে পারি। খাদ্য ও পানীয় দেহের পুষ্টির উৎস, মনের খাদ্য হচ্ছে জ্ঞান, আর অন্তেরর প্রয়োজন হচ্ছে ঈমান এবং আল্লাহ সম্পর্কে সচেতনতা। রমযানে অধিক ইবাদতের দ্বারা আমরা ইবাদতকে আমাদের জীবনের মৌলিক কাঠামো হিসেবে গ্রহণের শিক্ষা পাই। কুরআনে যেমনটি বলা হচ্ছে : “…নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার ত্যাগ, আমার জীবন-মরণ, জগসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।”(সূরা আল আনআম, ৬:১৬২)

এরকমই হচ্ছে একজন প্রকৃত মুসলিমের জীবন। রমযানে বেশী বেশী কুরআন তিলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য এক মাসে কুরআন খতম করা নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর বাণীর সাথে আমাদের সম্পর্ক গভীরতর করা, যদি কুরআনের বাণী আমাদের অন্তেরে স্থান করে নিতে পারে, তবে তা আমাদের জীবনকে আমূল পরিবর্তন করতে সাহায্য করবে। অধিক পরিমান কুরআন তিলাওয়াৎ শোনার আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে শয়তানের কুরআন থেকে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া। শয়তানের কুরআন [আরবী পরিভাষায় কুরান অর্থ হচ্ছে তিলাওয়াৎ, এখানে ভাষাগত অর্থটিকে ইংগিত করা হয়েছে] হচ্ছে গান-বাজনা, গল্প-উপন্যাস, সিনেমা-নাটক ইত্যাদি যেগুলো আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে না, এগুলো আমাদেরকে আনন্দ দান করলেও আল্লাহ থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে নেয়। তাই রমযানে আল্লাহর কুরআনের নিকটবর্তী হওয়া এবং শয়তানের কুরআন থেকে দূরবর্তী হওয়ার দ্বিমুখী সাধনা চালাতে হবে। রমযানে বেশী বেশী করে আমরা রাতের নফল সালাত আদায় করি, যেন রমযানের পরও তা আমাদের অভ্যাস হিসেবে থেকে যায়, কেননা সমস্ত সালাতের ভিতর রাতের সালাতই সবচেয়ে একনিষ্ঠভাবে আদায় করা সম্ভব, যখন কেউ আমাদের দেখতে পায় না, এই একনিষ্ঠতা অন্যান্য সালাতে অর্জন করা খুবই কষ্টসাধ্য। তেমনি এ মাসে ধার্মিক লোকদের সাহচর্য বৃদ্ধি পায়, আমরা রোযাদারদের সাথে বসে একত্রে ইফতার করি, এবং রোযাদারেরা একে অপরকে ইফতারের দাওয়াত দিয়ে থাকে। আমাদের উচিৎ এ মাসে বেশী বেশী করে আল্লাহভীরু, ধার্মিক লোকদের সাহচর্য লাভে সচেষ্ট হওয়া, বেশী বেশী করে সে সব স্থানে যাওয়া, যেখানে জ্ঞানের কথা আলোচিত হয়।

তৃতীয় শিক্ষা : সবর এবং ইচ্ছাশক্তি, যদিও মুসলিম সমাজে বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতির রোযায় সবর ও ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন নেই। কেননা ইফতার এবং সেহরীতে পেটভরে খেয়ে এবং সারাদিন ঘুমিয়ে কাটালে তাতে বিশেষ কষ্টের কিছু নেই। এতে কেবল দৈনন্দিন রুটিন পরিবর্তিত হয়ে রাত পরিণত হয় দিনে আর দিন রাতে। পারিভাষিক অর্থে একে রোযা বলে সংজ্ঞায়িত করা গেলেও এটা প্রকৃত সিয়াম নয়। এধরনের সিয়াম সবর করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে না। এতে সেই সবর অর্জিত হবে না, যেই সবর এই জীবনের পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেমনটি আল্লাহ সূরা আল আসরে বর্ণনা করেছেন : সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই সকল মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তারা ব্যতীত, যারা ঈমান এনেছে এবং সকর্ম করেছে, এবং পরস্পরকে সত্যের প্রতি আহবান জানায় এবং পরস্পরকে ধৈর্যধারণের উপদেশ দেয়।” (সূরা আল আসর, ১০৩:১-৩) এখানে বলা হচ্ছে সবর সাফল্যের চাবিকাঠি। এবং প্রকৃত সবরকারীর প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত।

চতুর্থ শিক্ষা : রিয়া থেকে বাঁচা, রিয়া অত্যন্ত ভয়ানক ব্যাপার। যদি আমরা অন্যদের দেখানোর জন্য আমল করি, তবে বাহ্যত একে উত্তম আমল বলে গণ্য করা হলেও আমাদের সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে যেতে পারে এই রিয়ার কারণে। রাসূল (সা) বলেছেন, তোমাদের জন্য আমি যা সবচেয়ে বেশী ভয় করি, তা হল ছোট শিরক বা শিরক আল আসগার। সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, ছোট শিরক কি?” তিনি উত্তর দিলেন, “রিয়া (লোক দেখানোর জন্য কাজ করা), নিশ্চয়ই আল্লাহ পুনরুত্থান দিবসে প্রতিদান দেওয়ার সময় লোকদের বলবেন, ‘পার্থিব জীবনে যাদেরকে দেখানোর জন্য তোমরা কাজ করেছিলে, তাদের কাছে যাও এবং দেখ তাদের কাছ থেকে কিছু আদায় করতে পার কিনা।’” (আহমাদ, বায়হাকী)। ইবন আব্বাস (রা) এ সম্পর্কে বলেন, “কোন চন্দ্রবিহীন মধ্যরাতের অন্ধকারে কালো পাথরের উপর কালো পিঁপড়ার চুপিসারে চলার চেয়েও গোপন হচ্ছে  রিয়া।” (ইবন আবী হাতিম)। রোযার মাধ্যমে প্রতিটি কাজ বিশুদ্ধভাবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করার শিক্ষা হয়, কেননা প্রকৃত সিয়াম অন্যকে দেখানোর জন্য হওয়া সম্ভব নয়। কারণ সিয়ামের বিষয়টি বাহ্যিকভাবে দেখা যায় না। একটি হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ বলেন: আদম সন্তানের সকল কাজই তার নিজের জন্য, সিয়াম ব্যতীত। এটা শুধুই আমার জন্য, এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।

পঞ্চম শিক্ষা : নৈতিক চরিত্র গঠন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যে রোযা অবস্থায় মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার ওপর আচরণ করা থেকে বিরত হল না, তার ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। এ মাসে আমরা অধিক ভাল কাজ করার এবং খারাপ কাজ থেকে অধিক পরিমাণে বিরত থাকার চেষ্টা করি। আমরা খারাপ কথা ও কাজ পরিহার করি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরও বলেছেন: তোমাদের কেউ রোযা অবস্থায় যেন অশ্লীল কাজ ও অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকে, এবং যদি কেউ কোন অশ্লীল কথা শুরু করে কিংবা তর্ক করতে আসে, তবে সে যেন তাকে বলে: আমি রোযাদার।’” তেমনি আমাদের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণে আনার শিক্ষা হয় এই রমযান মাসে। তাই সিয়াম আমাদের চোখ, কান, হাত ও জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার মাধ্যমে আমাদের নৈতিক চরিত্রে উন্নতি ঘটায়। আমরা যদি রোযা রেখেও হারাম কথা, কাজ কিংবা হারাম দৃশ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত বন্ধ না করি, তবে এই সিয়াম আমাদের নেক কাজের পাল্লায় যোগ না হয়ে যোগ হবে অন্যায়ের পাল্লায়, যার জন্য কিয়ামতের দিন আমাদের শাস্তি পেতে হবে।

ষষ্ঠ শিক্ষা : এটা উপলব্ধি করা যে পরিবর্তন সম্ভব, আমরা যখন বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকাই, আমরা সর্বত্র দেখতে পাই নৈতিক অবক্ষয়, ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিদাত, শিরক প্রভৃতির প্রাচুর্য, মুসলিমরা ইসলাম থেকে এতই দূরে, যে কারও পক্ষে ‘কোন আশা নেই’ এ কথা বলে বসা অসম্ভব নয়। এ অবস্থার যেন ক্রমাবনতি ঘটছে। এর সমাধান হচ্ছে মুসলিমদেরকে পরিবর্তন হতে হবে, কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব? রমযান আমাদের বলছে যে এটা সম্ভব। আমরা রমযানের ফজরে দেখতে পাই মসজিদ পরিপূর্ণ, অথচ অন্যান্য মাসে তা ফাঁকা থাকে। যদিও এদের মাঝে কিছু লোক কেবল রমযান মুসলিম, কিন্তু অনেকেই প্রকৃত ঈমানদার, যারা রমযানে সচেতন হয়ে ওঠে। তেমনি কুরআনের ওপর জমে থাকা ধূলো সরে যায়, এবং কুরআন বেশী বেশী করে তিলাওয়াৎ করা হয়। তেমনি মানুষের চরিত্রেও পরিবর্তন দেখা যায়। হয়ত ঝগড়াটে কোন ব্যক্তি এ মাসে নিজেকে সংযত করতে শেখে। তেমনি অনেক খারাপ কাজ যা অন্য মাসে ত্যাগ করা সম্ভব হয় না, তা এই মাসে সম্ভব হয়, যেমন অনেকে ধূমপান ত্যাগ করে থাকে। তাই রমযান আমাদের শেখায় যে মুসলিমরা নিজেদেরকে পরিবর্তন করতে সক্ষম। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এজন্য জিহাদকে রমযানের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আমাদের নফসের বিরুদ্ধে, পরিবারে, সমাজে ও বিশ্বে অবস্থিত সকল কু-শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে। একমাত্র এভাবেই পরিবর্তন আসা সম্ভব।

সপ্তম শিক্ষা : নিয়ন্ত্রণ, ক্ষুধা এবং যৌন বাসনা মানুষের চরিত্রে সবচেয়ে প্রবল দুটি বাসনা। এগুলোর ফলে মানুষ বহু বড় বড় পাপকাজে জড়িয়ে পড়ে। রোযা যেহেতু খাদ্য, পানীয় এবং যৌনাচার থেকে সংযম, তাই এর মাধ্যমে রোযাদারের আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন হয়। প্রকৃতপক্ষে রোযার শিক্ষা অর্জিত হয়েছে কিনা, তা বোঝার মুহূর্তটি হচ্ছে রোযা ভাঙ্গার মুহূর্ত। কেননা এসময় টেবিলে যাবতীয় মজাদার খাবার সাজানো থাকে, তাই রোযা ভেঙ্গেই মুখে প্রচুর পরিমাণে খাবার পোরার ইচ্ছে হয়, কিন্তু একজন মুমিনকে এসময় সংযত থাকতে হবে এবং নামাযের আগে হালকা কিছু মুখে দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) তিনটি খেজুর এবং পানি দিয়ে রোযা ভাঙতেন, এবং মাগরিবের নামাযের পর, মাঝারি খাবার খেতেন। আত্মিক সংযমও রোযার লক্ষ্য। কেবল খাদ্য, পানীয় ইত্যাদিই নয়, রোযাদারকে মিথ্যা বলা, গীবত করা, দুর্নাম করা ইত্যাদি থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “যে রোযা অবস্থায় মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার ওপর আচরণ করা থেকে বিরত হল না, তার ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” তিনি (সা) আরও বলেছেন: “তোমাদের কেউ রোযা অবস্থায় যেন অশ্লীল কাজ ও অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকে, এবং যদি কেউ কোন অশ্লীল কথা শুরু করে কিংবা তর্ক করতে আসে, তবে সে যেন তাকে বলে: ‘আমি রোযাদার।’” তাই উপরোক্ত দিক নির্দেশনা মেনে যে রোযা রাখবে, তার নৈতিক চরিত্রে উন্নতি ঘটবে, সে অধিকতর সত্যবাদী এবং কথা ও কাজে আরও সতর্ক হবে।

অষ্টম শিক্ষা : মধ্যপন্থা, যেহেতু রোযা ভাঙার সময় একজন রোযাদার নিজেকে সংযত রাখে, ফলে তার খাদ্যাভাসে মধ্যপন্থা গড়ে ওঠে, যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) খাদ্য গ্রহণ সম্পর্কে বলেছেন: “মুমিন এক পেটে, কাফির (যেন) সাত পেটে খায়।” জাবির (রা) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, “একজনের খাদ্য দুইজনের জন্য যথেষ্ট, দুইজনের খাদ্য চারজনের জন্য যথেষ্ট।” ইবন উমার (রা) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কাউকে সঙ্গীর অনুমতি ব্যতীত খাওয়ার সময় একেকবারে দুটো করে খেজুর নিতে নিষেধ করেছেন।

নবম শিক্ষা : সহমর্মিতা, রোযা একজন মানুষকে ক্ষুধা এবং তৃষ্ণার প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করায়, ফলে সে দরিদ্রের অবস্থা বুঝতে পারে। এর ফলে তার মাঝে দরিদ্রকে সহায়তা করার এবং তাদেরকে নিজ সম্পদের ভাগ দেয়ার প্রেরণা সৃষ্টি হয়। আর এই চেতনার নমুনা হিসেবেই ঈদুল ফিতরের দিনে অভাবীকে নির্দিষ্ট পরিমাণে দান করাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর যখন আমরা উপলব্ধি করব যে আমাদের এই কষ্ট ইচ্ছাকৃত, কিন্তু দরিদ্রদের কষ্ট অনিচ্ছাকৃত, তারা চাইলেও খেতে পায় না, তখন আমরা অধিকতর সহমর্মিতা অর্জন করতে পারব।

ইসলামকে অনুসরণ করলে দেশে কোন হানাহানি ও সন্ত্রাস থাকবে না

উপমহাদেশের অন্যতম বৃহত ও প্রাচীন দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-জামিয়াতুল আহ্‌লিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্‌রাসার বার্ষিক মাহ্‌ফিল ও দস্তারবন্দী সম্মেলন শুক্রবার মুনাজাতের মাধ্যমে শেষ হয়েছে। লক্ষাধিক মুসল্লী আখেরী মুনাজাতে অংশ গ্রহন করেন। সম্মেলনে সভাপতির বক্তব্যে জামিয়ার মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ ক্বওমী মাদ্‌রাসা শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান, পীরে কামেল আল্লামা শাহ্‌ আহ্‌মদ শফী (দা.বা.) বলেন, তাক্বওয়া তথা আল্লাহভীতি ছাড়া পরিপূর্ণ মুমিন হওয়া যায় না। অপরদিকে আল্লাহ্‌র ভয় মানুষের অন্তরে না থাকার ফলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অন্তরে আল্লাহভীতি থাকলে কারো পক্ষে শরীয়তের হুকুম লঙ্ঘন করা, হারাম পথে চলা কিছুতেই সম্ভব নয়। তিনি বলেন, আল্লাহভীতির অপর নাম তাক্বওয়া, আর এই তাক্বওয়া থেকে দূরে থাকার কারণেই বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মুসলমানগণ নানাভাবে অপদস্ত ও নির্যাতিত হচ্ছে। মুসলমানদেরকে এই দুর্দশা থেকে রেহাই পেতে পূর্ণাঙ্গ তাক্বওয়া অর্জনের পাশাপাশি ঈমানী শক্তি নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে। তিনি সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মুসলমানদেরকে এক কালিমার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আল্লামা শাহ্‌ আহ্‌মদ শফী অভিযোগ করে বলেন, আজ সর্বত্র ইসলামকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে। আমাদের অনৈক্য আর নিজ ধর্মের মধ্যে কতিপয় গোমরাহ ও ধর্মবিরোধীর কারণেই বিধর্মীরা সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে। বর্তমানে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন যেভাবে একের পর এক ইসলামের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার মূলক আঘাত হানার প্রয়াস এবং মসজিদে হামলা চালানোর মত দুঃসাহস দেখাচ্ছে, তাতে আমরা হতবাক ও বিস্মিত।
আল্লামা শাহ্‌ আহ্‌‌মদ শফী আরো বলেন, ইসলামে অসত্য, অন্যায়, সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্রের কোন স্থান নেই। ইসলাম ন্যায় ও শান্তির ধর্ম। ইসলামকে অনুসরণ করতে পারলে এদেশে কোন হানাহানি ও সন্ত্রাস থাকবে না। আর ইসলামী শিক্ষায়ও কোন প্রকার সন্ত্রাসের স্থান নেই। অথচ দেশে বিদেশে আজ ইসলাম ও মুসলমানদেরকে নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান নিজ নিজ ধর্ম পালন করলে, ধর্মীয় ততপরতা চালালে এবং তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কেউ অংশ নিলে কেউ মৌলবাদী ও প্রগতি বিরোধী হয় না। অথচ নামায আদায় ও দাড়ি-টুপী পরলে অথবা ইসলাম ধর্মীয় কোন আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নিলেই প্রগতি বিরোধী ও মৌলবাদীর রং লাগানো হয়।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত হাটহাজারী মাদ্‌রাসার দস্তারবন্দী ও বার্ষিক ইসলামী সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন, মাওলানা তফাজ্জুল হক হবিগঞ্জী, মাওলানা নূরুল ইসলাম ওলীপুরী, মাওলানা মোস্তফা আল হোসাইনী, মুফতী নূর আহমদ, মুফতী আব্দুচ্ছালাম চাটগামী, মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ্‌ বাবুনগরী, মাওলানা হাফেজ মুহাম্মদ জুনাইদ বাবুনগরী, মাওলানা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুরী, মাওলানা নূরুল ইসলাম, ড. আ.ফ.ম. খালেদ হোসেন, মাওলানা আব্দুল মালেক হালিম, মাওলানা মনজুরুল ইসলাম, মাওলানা নজিরুল ইসলাম, মুফতী জসীম উদ্দীন, মাওলানা সৈয়দ আলম আরমানী প্রমুখ।
আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলীপুরী ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত শুরু হয়েছে উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান সরকার ইসলাম বিরোধী সব জানালা খুলে দিয়েছে। কাদিয়ানী, এনজিও, নাস্তিক-মুরতাদদের দরজা খোলা, শুধু ইসলামের দরজা বন্ধ। আজ সর্বত্র ইসলামকে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে। আমাদের অনৈক্য আর নিজ ধর্মের মধ্যে কতিপয় গোমরাহ ও ধর্মবিরোধীর কারণেই বিধর্মীরা সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে। ইসলামে অসত্য, অন্যায়, সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্রের কোন স্থান নেই। ইসলাম ন্যায় ও শান্তির ধর্ম। ইসলামকে অনুসরণ করতে পারলে এদেশে কোন হানাহানি ও সন্ত্রাস থাকবে না।
উল্লেখ্য সম্মেলন শেষে বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জামিয়ার বিগত বতসরের প্রায় ২ সহস্রাধিক দাওরায়ে হাদীস (টাইটেল) উত্তীর্ণ তরুণ আলেমকে বিশেষ সম্মান সূচক পাগড়ী প্রদান করা হয়। বিশেষ সমাবর্তনে জামিয়া প্রধান হযরত আল্লামা শাহ্‌ আহমদ শফী তরুণ আলেমদের উদ্দেশ্যে উপদেশমূলক দীর্ঘ বক্তব্য রেখে বলেন, তোমরা ইসলামের আদর্শ ও শান্তির বাণী প্রচার করার জন্য দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়। সম্মেলনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার উলামায়ে কিরাম ছাড়াও লক্ষাধিক মুসল্লী অংশগ্রহণ করেন। আখেরী মুনাজাতে জামিয়া প্রধান দেশের ও বিশ্বের সকল মুসলমানের শান্তি, ঐক্য ও সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ মুনাজাত পরিচালনা করেন। এ সময় সমগ্র ক্যাম্পাস জুড়ে কান্নার রোল পড়ে যায়।