সূরা কুরাইশ – سورة قريش

سورة قريش

সূরা কুরাইশ : সূরা নং (১০৬) মাক্কী যুগে নাযিল, মোট আয়াত-৪।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

(১)  যেহেতু কুরাইশরা সুপরিচিত হয়েছে।

(২)  (অর্থাত) শীতকাল ও গরমকালে (বিদেশ) সফরে তাদের পরিচিতি হয়েছে। ১.

(৩)  সেহেতু এ (কাবা) ঘরের ২. মালিকের ইবাদাত করা তাদের উচিত।

(৪)  যিনি তাদেরকে খিদে থেকে বাঁচিয়ে খাবার দিয়েছেন এবং ভয় থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদে রেখেছেন। ৩.

১./ শীত ও গ্রীষ্মের সফর মানে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সফর। কুরাইশ বংশের লোকেরা গ্রীষ্মকালে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের দিকে এবং শীতকালে দক্ষিণ আরবের দিকে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করতো। এরই ফলে তারা ধনশালী হতে পেরেছিল।

২./ এর অর্থ হলো কাবাঘর যা মাক্কা শহরে অবস্থিত।

৩./ মাক্কাকে হারাম শরীফ (সবার সম্মানের জায়গা) হিসাবে সবাই মানতো বলে কুরাইশদের বিশ্বাস ছিল যে, কেউ মাক্কা আক্রমণ করবে না। আর কুরাইশরা কাবাঘরের খাদিম ছিল বলে তাদের বণিকদের কাফেলা নিরাপদে আরবের সব এলাকায় যাতায়াত করতে পারতো এবং কেউ তাদের সাথে কোন রকম খারাপ ব্যবহার করতো না। 

নাম করণ ঃ পয়লা আয়াতের কুরাইশ শব্দই এ সূরার নাম।

নাযিলের সময় ঃ কেউ কেউ এ সূরাকে মাদানী যুগের বলেছেন। কিন্ত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাসসিরগণ এ সূরাটিকে মাক্কী যুগের বলেই ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন। তৃতীয় আয়াতের “এই ঘরের রব” কথাটি দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এ সূরাটি মাক্কী যুগের। এই ঘর বলতে যে কাবাঘরই বুঝায় এ বিষয়ে সবাই একমত। তাই মাদানী যুগে মাক্কার ঘরকে এই ঘর বলা কিছুতেই মানানসই হতে পারে না।

ঐতিহাসিক পটভূমি ঃ কুরাইশ বংশের লোকেরা তাদের পূর্বপুরুষ কুসাই বিন কিলারের পূর্ব পর্যন্ত আরবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। কুসাই-এর চেষ্টায় এরা মাক্কায় কেন্দ্রীভূত হয় এবং আল্লাহর ঘরের খাদিমের দায়িত্ব পায়। তারই নেতৃত্বে মাক্কা শহরভিত্তিক একটা রাষ্ট্র গড়ে উঠে।

হজ্জের সময় সমস্ত আরব থেকে আগত হাজীদের সন্তোষজনক খিদমাতের মাধ্যমে কুরাইশদের মর্যাদা ও প্রভাব বেড়ে যায়।

কুসাই-এর ছেলে আবেদে মুনাফ পিতার জীবিতকালেই আরববাসীদের নিকট সুনাম অর্জন করে। আবদে মুনাফের চার ছেলের মধ্যে হাশিম বড় ছিল। রাসূল (সা)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব হাশিমেরই ছেলে। গোটা আরবে কুরাইশ বংশের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সুনাম-সুখ্যাতির ফলে হাশিমই সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দিকে মনোযোগ দেয়। সূরা ফীলের ঐতিহাসিক পটভূমিতে বলা হয়েছে যে, আরবের পূর্ব ও পশ্চিম দেশগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু ছিল। কিন্তু এ ব্যবসা তখন ইরানীদের হাতে ছিল। ইরানীরা একদিকে পারস্য উপসাগর দিয়ে দক্ষিণ আরবের মাধ্যমে পূর্বদিকের দেশগুলোর সাথে এবং অপরদিকে দক্ষিণ আরব থেকে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে মিসর ও সিরিয়ার সাথে এ ব্যবসা চালু করেছিল। যদিও আরবদের সহযোগিতা ছাড়া এ ব্যবসা চলতে পারতো না, তবু এ ব্যবসার আসল লাভ ইরানীরাই ভোগ করতো।

কুরাইশ নেতা হাশিম সারা আরবে তাদের সুনাম ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এ বাণিজ্যে আরবদের প্রাধান্য হাসিলের উদ্যোগ নেয়। হজ্জের সময় কুরাইশদের উদার ব্যবহার ও আশাতীত খিদমাতে আরবের সব গোত্রের লোকই তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকায় কুরাইশদের বাণিজ্যিক কাফিলাকে কেউ লুট করতো না। এমনকি তাদের কাছে কোন গোত্রই কোনরকম ট্যাক্স দাবী করতো না। এ ব্যবসার সুযোগে মাক্কা শহর আরবের আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হলো।

হাশিম ও তার ভাই আবদে শামস, মুত্তালিব ও নাওফেল মিলে সিরিয়া, ইরাক, ইরান, ইয়ামান ও হাবশার শাসকদের কাছ থেকে সরকারীভাবে এ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনুমতি  হাসিল করে নেয়। এ ব্যবসা এতটা উন্নতি লাভ করে যে, এরা চার ভাই আরবে “ব্যবসায়ী গোষ্ঠী” হিসাবে খ্যাতি লাভ করে। এ বাণিজ্য উপলক্ষে আরবের সমস্ত গোত্রের সাথে কুরাইশদের গভীর সম্পর্ক এবং চারপাশের রাষ্ট্রগুলোর সাথে আরবের ঘনিষ্ঠ পরিচয় হবার কারণে কুরাইশ নেতাগণ “আসহাবুল ঈলাফ” বা “বন্ধুত্ব ও পরিচয়ের ধারক ও বাহক” হিসাবে স্বীকৃত হয়। এই ‘ঈসাফ’ শব্দটি দিয়েই সূরা কুরাইশ শুরু হয়েছে।

কুরাইশদের এ মর্যাদার ফলে সারা আরবে তাদের নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেয়া হতো। ধন-দৌলতের দিক দিয়েও তারা আরবের সেরা গোত্রে পরিণত হয়। মাক্কা শহর আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্রের মর্যাদা পায়। আন্তর্জাতিক পরিচিতির দরুন কুরাইশরা ইরাক থেকে উন্নত মানের আরবী অক্ষর লেখার শিক্ষা পায় এবং সে অক্ষরেই কুরআন মজীদ লিখিত হয়। লেখা-পড়ার চর্চা কুরাইশদের মধ্যে যে পরিমাণে ছিল, এতটা আর কোন গোত্রে ছিল না। এসব কারণেই রাসূল (সা) বলেছিলেন : কুরাইশই জনগণের নেতা।

এ অবস্থায় যদি বাদশাহ আবরাহার হাবশী বাহিনী কাবাঘর ধ্বংস করতে পারতো, তাহলে কুরাইশদের সব কিছুই খতম হয়ে যেতো। আল্লাহর ঘর হিসাবে কাবার মর্যাদা শেষ হয়ে যেতো, কাবার খাদিম হিসাবে কুরাইশদের সম্মানও খতম হতো। মাক্কা আর ব্যবসা কেন্দ্র হিসাবে গণ্য হতো না এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরবদের হাত থেকে হাবশীদের হাতে চলে যেতো।

আল্লাহর কুদরতে হাবশী বাহিনী চরম গযবে পতিত হবার ফলে কাবাঘর “বাইতুল্লাহ” হিসাবে সারা আরবে আগের চেয়েও বেশী সম্মানিত বলে গণ্য হলো এবং সাথে সাথে কুরাইশদের নেতৃত্ব আরও মযবুত হলো। সবার মনেই এ বিশ্বাস দৃঢ় হলো যে, কুরাইশদের উপর আল্লাহর খাস মেহেরবানী আছে।

আলোচনার ধারা ঃ উপরিউক্ত পটভূমিকে সামনে রাখা হলে সূরা কুরাইশের মর্মকথা বুঝতে কোন রকম বেগ পেতে হয় না। শীত, গ্রীষ্ম নির্বিশেষে সারা বছর সর্বত্র ব্যাপক পরিচিতি ও বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে কুরাইশরা যে সৌভাগ্যের অধিকারী হয়েছে, তার বাহাদুরী যে তাদের নয়, একথাই এ সূরায় বুঝানো হয়েছে। তাদের পূর্বপুরুষ কুসাই-এর নেতৃত্বে কুরাইশরা মাক্কায় সমবেত হবার পূর্বে সারা আরবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তারা যে অভাব-অনটনে ছিল এবং নিরাপত্তার দিক দিয়ে অন্যান্য আরব গোত্রের মতোই তারা যে অনিশ্চিত অবস্থায় জীবন যাপন করতো, সে দুরবস্থা থেকে বর্তমান সুদিনের কারণ যে একমাত্র এই কাবাঘর, সে কথা এখানে তাদেরকে মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে, এ ঘরের যিনি মালিক, একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করা তাদের উচিত। আর মুহাম্মদ (সা) তাদেরকে এ কথারই দাওয়াত দিয়েছেন। এ দাওয়াত কবুল করলেই কুরাইশদের মর্যাদা বহাল থাকতে পারে। নেতৃত্বের অহংকারে যদি এ  দাওয়াত তারা কবুল না করে, তাহলে এ ঘরের মালিকই তাদের মর্যাদা কেড়ে নেবেন।

 

 

সবর বা ধৈর্য ধারন

সবর তেজদীপ্ত অশ্ব যা কখনো হোঁচট খায় না। এমন ক্ষুরধার তরবারী, যা কখনো  তেজ হারায় না; এমন বিজয়ী সৈনিক যা কখনো পরাজিত হয় না; এমন সুরক্ষিত দূর্গ যা কখনো ধ্বংস হয় না। সবর আর বিজয় দুই সহোদর ভাই। এমন কেউ  নেই, যে সবরের অস্ত্রে সজ্জিত হয়েছে অথচ তার নাসফ অথবা শয়তান তাকে পরাহত করেছে। যার সবর নেই সে শক্তিহীন, পঙ্গু।  যে ব্যক্তি তার জিহাদ-সংগ্রামে সবরকে সঙ্গী বানাবে না, সে পরাজিত হতে বাধ্য। তাইতো আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُون
হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধর ও ধৈর্যে অটল থাক এবং পাহারায় নিয়োজিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও। (সূরা আলে-ইমরান-২০০)
সবর মুমিনের জন্য গৃহাপালিত জন্তু, খুঁটির মধ্যে বেঁধে রাখার মতো। ইচ্ছামত এদিক সেদিক ঘোরে; কিন্তু পরিশেষে তাকে সেই খুঁটির কাছেই ফিরে আসতে হয়। সবর ঈমানের শেকড়রে মতো। বৃক্ষ যেভাবে শেকড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে  ঈমানও তদ্রুপ সবরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তাই যার সবর নেই  তার পূর্ণ ঈমান নেই। সবরবিহীন ঈমানদার দ্বিধাগ্রস্ত ঈমানদার। এ ধরনের ঈমানদার সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةٌ انْقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآَخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
মানুষের মধ্যে কতক এমন রয়েছে, যারা দ্বিধার সাথে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি তার কোন কল্যাণ হয় তবে সে তাতে প্রশান্ত হয়। আর যদি তার কোন বিপর্যয় ঘটে, তাহলে সে তার আসল চেহারায় ফিরে যায়। সে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি হল সুস্পষ্ট ক্ষতি। (সূরা হজ-১১)
যে সবর করে, বিপদে ধৈর্য ধারণ করে সেই ভাগ্যবান : পৃথিবীতে যারা সুন্দর জীবন গড়তে পেরেছে, তারা সবরের গুণেই তা গড়েছে। তারা সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করেছে এই সবরের বদৌলতেই। তারা দুঃসময় এলে ধৈর্য ধারণ করে আর সু-সময় এলে আল্লাহ তা’আলার শুকরিয়া আদায় করে। আর এভাবে তারা সবর ও শোকরের ডানায় চড়ে জান্নাতের অধিকারী হয়।
সবর কী? সবরের আভিধানিক অর্থ : ধৈর্য ধারণ করা, বাধা দেয়া বা বিরত রাখা, সহনশীলতা। শরীআ’তের পরিভাষায় সবর বলা হয় : অন্তরকে অস্থির হওয়া থেকে, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গাল চাপড়ানো ও বুকের কাপড় ছেঁড়া ইত্যাদি থেকে বিরত রাখা। কারো কারো মতে, এটি হলো মানুষের অন্তরগত একটি উত্তম স্বভাব, যার মাধ্যমে সে অসুন্দর ও অনুত্তম কাজ থেকে বিরত থাকে। এটি মানুষের একটি অন্তরগত শক্তি, যা দিয়ে সে নিজকে সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখতে পারে। সবর হলো সুন্দরভাবে বিপদ মোকাবিলা করা। বিপদকালে অভিযোগ-অনুযোগ না করে অমুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করাই সবর।
জুনায়েদ বাগদাদী (র) কে সবর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন : হাসি মুখে তিক্ততার ঢোক গেলা। যুন্নূন মিসরী (র) বলেন : আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ থেকে দূরে থাকা; বিপদের সময় শান্ত থাকা এবং জীবনের কুরুক্ষেত্রে দারিদ্রের কষাঘাত সত্ত্বেও অমুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করা।
এক বুযুর্গ এক ব্যক্তিকে অন্যের কাছে তার সমস্যা নিয়ে অনুযোগ করতে শুনে বললেন : যিনি দয়া করেন না তার কাছে দয়াকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছ। এ সম্পর্কে আরও বলা হয় : তুমি যখন মানুষের কাছে অভিযোগ কর, তখন মূলত দয়াময়ের বিরুদ্ধে নির্দয়ের কাছেই অভিযোগ কর।
অভিযোগ দু’টি পন্থায় করা হয়: একটি হলো, আল্লাহ তা’আলার কাছে অনুযোগ করা। এটি সবর পরিপন্থী নয়। যেমন ইয়াকূব (আ) প্রিয় পুত্র ইউসুফকে হারিয়ে বলেছেন : আমি আল্লাহর কাছেই আমার দুঃখ বেদনার অভিযোগ জানাচ্ছি। অপরটি হলো, নিজের মুখ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ভাষার মাধ্যমে মানুষের কাছে অভিযোগ করা। এটি সবর পরিপন্থী।
আমরা যে সবরের কথা আলোচনা করছি তা তিন প্রকারের। যথা : ১. আল্লাহ তা’আলার আদেশ-নির্দেশ পালন ও ইবাদত-বন্দেগী আদায় করতে গিয়ে ধৈর্যধারণ করা।  ২. আল্লাহ তা’আলার নিষেধ ও তাঁর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করা এবং ৩. তাকদীর ও ভাগ্যের ভালো-মন্দে অসন্তুষ্ট না হয়ে তার ওপর ধৈর্যধারণ করা। এই তিন প্রকার সম্পর্কেই শায়খ আবদুল কাদীর জিলানী (র) বলেন : একজন বান্দাকে অবশ্যই তিনটি বিষয়ে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে : কিছু আদেশ পালনে, কিছু নিষেধ থেকে বিরত থাকায় এবং ফয়সালাকৃত তাকদীরের ওপর।
আল-কুরআনে বর্ণিত লুকমান (আ)-এর বিখ্যাত উপদেশেও এ তিনটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে।
يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
হে আমার প্রিয় বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ কর এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধর। নিশ্চয় এগুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ। (সূরা লুকমান-১৭)
লুকমান (আ) যে ‘সৎকাজের আদেশ দাও’ বলেছেন, তার মধ্যে নিজে সৎ কাজ করা এবং অপরকে সৎ কাজের উপদেশ দেয়াÑ উভয়টি অন্তর্ভুক্ত। তেমনি অসৎকাজে নিষেধ করার মধ্যেও উভয়টি রয়েছে। এখানে ‘সৎকাজের আদেশ’ ও ‘অসৎকাজে নিষেধ’ শব্দ থেকেই এমনটি বুঝা যায়। তাছাড়া শরীয়তের  দৃষ্টিতেও ‘সৎকাজের আদেশ’ ও ‘অসৎকাজে নিষেধ’ বাস্তবায়িত হয় না, যতক্ষণ না আগে সে নিজে তা পালন করে।
وَالَّذِينَ صَبَرُوا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ أُولَئِكَ لَهُمْ عُقْبَى الدَّارِ
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সবর করে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিযক প্রদান করেছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং ভাল কাজের মাধ্যমে মন্দকে দূর করে, তাদের জন্যই রয়েছে আখিরাতের শুভ পরিণাম। (সূরা রা‘দ-১৯-২২)
সবর বা ধৈর্য আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ মুমিন বান্দাদের বৈশিষ্ট্য : নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তা’আলা এই বিরল গুণে ভূষিত করেছিলেন। তাই নবী-রাসূলগণই হলেন সবরের সকল আকার-প্রকৃতির উজ্জ্বলতম উদাহরণ। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র) বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা নব্বই জায়গায় সবরের কথা বলেছেন। অতএব ভেবে দেখুন সবর কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়!
আল্লাহ তা’আলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে সবরকারী তথা ধৈর্যশীলদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদেরকে হিসাব ছাড়া প্রতিদান দেবেন বলে উল্লেখ করেছেন।
قُلْ يَا عِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
বল, হে আমার বান্দারা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়ায় ভাল কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। আর আল্লাহর যমীন প্রশস্ত, কেবল ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেয়া হবে কোন হিসাব ছাড়াই। (সূরা যুমার-১০) আল্লাহ তা’আলা বলেন, তিনি ধৈর্যশীলদের জন্য হিদায়েত ও সুস্পষ্ট বিজয় নিয়ে তাদের সাথেই আছেন।
وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। (সূরা আনফাল-৪৬) আল্লাহ তা’আলা সবর ও ইয়াকীনের কারণে মানুষকে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করেন।
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ
আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা করেছিলাম, তারা আমার আদেশানুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত, যখন তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত। (সূরা সাজদাহ-২৪) আল্লাহ তা’আলা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, সবরই মানুষের জন্য কল্যাণকর।
وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ
আর যদি তোমরা সবর কর, তবে তাই সবরকারীদের জন্য উত্তম। (সূরা নাহল-১২৬) আল্লাহ তা’আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, কারও যদি সবর থাকে, তাহলে যত বড় শত্রুই হোক তাকে হারাতে পারবে না।
 وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ
আর যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের  কোন ক্ষতি করবে না। তারা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ তা পরিবেষ্টনকারী। (সূরা আলে-ইমরান-১২০) আল্লাহ তা’আলা বিজয় ও সফলতার জন্য সবর ও তাকওয়া অবলম্বনের শর্ত জুড়ে দিয়েছেন।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধর ও ধৈর্যে অটল থাক এবং পাহারায় নিয়োজিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও। (সূরা আলে-ইমরান-২০০) আল্লাহ তা’আলা ধৈর্যশীলকে ভালোবাসেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আর একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে?
وَكَأَيِّنْ مِنْ نَبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا وَاللهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ
আর কত নবী ছিল, যার সাথে থেকে অনেক আল্লাহ ওয়ালা লড়াই করেছে। তবে আল্লাহর পথে তাদের ওপর যা আপতিত হয়েছে তার জন্য তারা হতোদ্যম হয়নি। আর তারা দুর্বল হয়নি এবং তারা নত হয়নি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদেরকে ভালবাসেন। (সূরা আলে-ইমরান-১৪৬) আল্লাহ তা’আলা ধৈর্যশীলদের তিনটি বিষয়ে সুসংবাদ দিয়েছেন যার প্রতিটি বিষয় পাবার জন্য দুনিয়াবাসী একে অপরের সঙ্গে ইর্ষা করেন।
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ.  الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ. أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা, তাদেরকে যখন বিপদ আক্রামণ করে তখন বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। (সূরা বাকারাহ-১৫৫-১৫৭) ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহ তা’আলা রেখেছেন জান্নাত লাভের কামিয়াবী আর জাহান্নাম থেকে মুক্তির সাফল্য।
 إِنِّي جَزَيْتُهُمُ الْيَوْمَ بِمَا صَبَرُوا أَنَّهُمْ هُمُ الْفَائِزُونَ
নিশ্চয় আমি তাদের ধৈর্যের কারণে আজ তাদেরকে পুরস্কৃত করলাম; নিশ্চয় তারাই হল সফলকাম। (সূরা মুমিনূন-১১১) আল্লাহ তা’আলা আল-কুরআনের চারটি স্থানে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর নিদর্শনাবলী থেকে ধৈর্যশীল ও শোকরগুযার বান্দারাই উপকৃত হয় এবং তারাই সৌভাগ্যবান।
أَلَمْ تَرَ أَنَّ الْفُلْكَ تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِنِعْمَةِ اللهِ لِيُرِيَكُمْ مِنْ آيَاتِهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
তুমি কি দেখনি যে, নৌযানগুলো আল্লাহর অনুগ্রহে সমুদ্রে চলাচল করে, যাতে তিনি তাঁর কিছু নিদর্শন তোমাদের দেখাতে পারেন। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে। (সূরা লুকমান-৩১)
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا أَنْ أَخْرِجْ قَوْمَكَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَذَكِّرْهُمْ بِأَيَّامِ اللَّهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
আর আমি মূসাকে আমার আয়াতসমূহ দিয়ে পাঠিয়েছি যে, তুমি তোমার কওমকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে বের করে আন এবং আল্লাহর দিবসসমূহ তাদের স্মরণ করিয়ে দাও। নিশ্চয় এতে প্রতিটি ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য রয়েছে অসংখ্য নিদর্শন। (সূরা ইবরাহীম-৫)
فَقَالُوا رَبَّنَا بَاعِدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا وَظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ فَجَعَلْنَاهُمْ أَحَادِيثَ وَمَزَّقْنَاهُمْ  كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
কিন্তু তারা বলল, ‘হে আমাদের রব, আমাদের সফরের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিন। আর তারা নিজদের প্রতি যুলম করল। ফলে আমি তাদেরকে কাহিনী বানালাম এবং তাদেরকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দিলাম। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রয়েছে। (সূরা সাবা-১৯)
বিপদে ধৈর্য ধারণ করার ফযীলত অনেক : তাই বলে শরীয়তে বিপদ কামনা করার অনুমতি দেয়া হয়নি। কারণ মুমিন সচেতন ও বুদ্ধিমান। সে কখনো বিপদ প্রত্যাশা করতে পারে না। হ্যাঁ, বিপদ এসে পড়লে তাতে বিচলিতও হয় না; বরং তাতে ধৈর্য ধারণ করে। বিপদের সময় সে সহনশীলতার পরিচয় দেয়। যেমন সহীহ বুখারীতে আবদুল্লাহ বিন আবূ আওফা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, যুদ্ধের দিনগুলোতে একদা রাসূলুল্লাহ (সা) অপেক্ষায় থাকলেন। যখন সূর্য ডুবে গেল তখন তিনি তাঁদের মাঝে  দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে লোকসকল, তোমরা শত্রুদের সঙ্গে মুখোমুখী হবার প্রত্যাশা করো না। আল্লাহ তা’আলার কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করো। তবে যখন তোমরা তাদের মুখোমুখী হও, তখন ধৈর্য ধারণ করো এবং সবর করো। আর জেনে রেখো, জান্নাত তরবারির ছায়ার নিচে। (বুখারী) আপনারা কি সেই সাহাবীর কথা শুনেননি যিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়ে আহত অবস্থায় যন্ত্রণা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলেন? এ জন্যই কিন্তু আবু বকর সিদ্দীক (রা) বলতেন : আমার কাছে বিপদে পড়ে সবর করার চেয়ে সুখে থেকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাই অধিক পছন্দনীয়।
একজন প্রকৃত মুমিন কিন্তু সর্বাবস্থায় দৃঢ়ভাবে এ কথা বিশ্বাস করে যে, সে যে অবস্থায় আছে, তাতে কোনো কল্যাণ নিহিত রয়েছে। যেমন মুসলিম শরীফে সুহাইব ইবন সিনান (রা) থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে : মুমিনের অবস্থা কতইনা চমৎকার! তার সব অবস্থাতেই কল্যাণ থাকে। এটি শুধু মুমিনেরই বৈশিষ্ট্য যে, যখন সে আনন্দে থাকে, তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এবং যখন সে কষ্টে থাকে, তখন সবর করে। আর এ উভয় অবস্থাই তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মুমিনের পুরো জীবনই কিন্তু পরীক্ষা। যেমন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন : كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَنَبْلُوكُمْ بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ ‘আর ভাল ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। (সূরা আম্বিয়া-৩৫)
আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাকে প্রতি মুহূর্তে পরীক্ষা করেন। তিনি দেখতে চান কে ধৈর্যশীল, কে মুজাহিদ আর কে সত্যবাদী। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ ‘তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো জানেননি তাদেরকে, যারা তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদ করেছে এবং জানেননি ধৈর্যশীলদেরকে। (সূরা আলে-ইমরান-১৪২)
আল্লাহ তাআলা মুমিনকে সম্পদ-সন্তান সব কিছু দিয়েই পরীক্ষা করেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :  إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَاللهُ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ ‘তোমাদের ধনÑসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা বিশেষ। আর আল্লাহর নিকটই মহান প্রতিদান। (সূরা তাগাবুন-১৫)
রাসূলুল্লাহ (সা) স্বয়ং তাঁর সাহাবীদের সবর শিক্ষা দিয়েছেন। এ সবরের পরীক্ষা বেশি দেয়া হয়েছে মক্কী জীবনে। যেমন খুবাইব ইবন আরাত রা.-এর হাদীসে আমরা তার চিত্র দেখতে পাই। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন কা’বার ছায়ায় তাঁর একটি চাদরে মাথা রেখে শায়িত অবস্থায় ছিলেন। আমরা তাঁর কাছে অভিযোগ করলাম, কেন তিনি আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চান না, আমাদের জন্য তাঁর কাছে দু‘আ করেন না। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে (এমন বিপদও এসেছে যে) কাউকে পাকড়াও করা হতো। তারপর গর্ত খনন করে তাকে সেই গর্তে ফেলা হতো। এরপর করাত এনে তার মাথার ওপর রাখা হতো। অতপর তাকে দুই টুকরো করে লোহার চিরুনী দিয়ে তার শিরা-অস্থিসহ আচড়ানো হতো। তদুপরি তারা তাকে দ্বীন থেকে ফেরাতে পারতো না। আল্লাহর শপথ! এখন আমাদের পরীক্ষা চলছে। একদিন এমন আসবে যখন আরোহীরা সান‘আ থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত যাবে। বাঘ আর ছাগল একে অন্যের থেকে নিরাপদে থাকবে। এক আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করতে হবে না। কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়া করছো। অর্থাৎ মক্কার মুশরিকদের দেয়া আযাব অচিরেই দূর হয়ে যাবে। সুতরাং অতীতের উম্মতের মতো তোমরাও দ্বীনের বিপদে একটু ধৈর্য ধারণ করো।
সবরের ফযীলত : সবরের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহর বান্দা মাত্রই সবর করতে হবে। কেননা কখনো আল্লাহর আদেশ মানতে হবে, তাঁর নির্দেশিত কাজ করতে হবে। আবার কখনো তাঁর নিষেধ মেনে চলতে হবে, বিরত থাকতে হবে তা করা থেকে। আবার কখনো অকস্মাৎ তাকদীরের কোনো ফয়সালা এসে পড়বে। নিয়ামত দেয়া হবে, তখন শুকরিয়া আদায় করতে হবে। এভাবে নানা অবস্থার মধ্য দিয়ে মুমিনের জীবন অতিবাহিত হয়। সুতরাং মৃত্যু পর্যন্ত এই সবরকে সাথে নিয়েই চলতে হবে। এজন্যই সবরের অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে।
ক. উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি : যে ব্যক্তি কোনো বিপদে পড়ে আল্লাহ যা নির্দেশ দিয়েছেন অর্থাৎ  إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ   পড়বে এবং বলবে :  اَللَّهُمَّ آَجِرْنِيْ فِيْ مُصِيْبَتِيْ وَاخْلُفْ لِي خَيْراً مِنْهَا  হে আল্লাহ, আমাকে আমার বিপদের প্রতিদান দিন এবং আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন। আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন। উম্মে সালামা (রা) বলেন, আবূ সালামা মারা গেলেন। আবূ সালামার চেয়ে উত্তম মুসলমান আর কে হতে পারে? তাঁর ঘরেই রাসূলুল্লাহ (সা) সর্বপ্রথম হিজরত করেছেন। (তবে আমি দু’আটি পড়লাম আর আল্লাহ তা’আলা আমাকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা)-কেই স্বামী হিসেবে দান করলেন!)
খ. আয়েশা (রা) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : মুমিনকে যেকোনো বিপদই স্পর্শ করুক না কেন আল্লাহ তার বিনিময়ে তার গুনাহ মাফ করে দেন। এমনকি (চলতি পথে) পায়ে যে কাঁটা বিদ্ধ হয় (তার বিনিময়েও গুনাহ মাফ করা হয়। (বুখারী ও মুসলিম )
গ. আবূ মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : যখন কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয় অথবা সফর করে, তার জন্য সে সুস্থাবস্থায় এবং ঘরে থাকতে যেরূপ নেকী কামাই করতো অনুরূপ নেকী লেখা হয়। ( আশ্শারহুল মুমতি)।
ঘ. সুফিয়ান ইবন উয়াইনা (র) নিচের আয়াত : وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآَيَاتِنَا يُوقِنُونَ ”আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা করেছিলাম, তারা আমার আদেশানুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত, যখন তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত। (সূরা সাজদাহ-২৪)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, যেহেতু তারা সকল কৌশলের মূল তথা ধৈর্য অবলম্বন করেছে তাই আমি তাদেরকে নেতা বানিয়ে দিলাম।
ঙ. উমর ইবন আবদুল আযীয (রহ) বলেন, যাকে আল্লাহ তা’আলা কোনো নেয়ামত দিয়ে তা ছিনিয়ে নিয়েছেন এবং তার স্থলে তাকে সবর দান করেছেন, এমতাবস্থায় সে ব্যক্তি থেকে যা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তার চেয়ে সেটাই উত্তম যা তাকে দান করা হয়েছে।
জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে আমাদেরকে সবর ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে প্রতিবেশীর ওপর। তার দেয়া কষ্ট অম্লান বদনে সহ্য করতে হবে এবং তা সত্ত্বেও সচেষ্ট থাকতে হবে তার কল্যাণ সাধনে। ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে আত্মীয়দের ব্যাপারে। তাদের কাছ থেকে অনাকাংক্ষিত যেসব আচরণ হবে তার ওপর। তাতে ধৈর্য ধারণ করতে হবে আর নেকির প্রত্যাশায় থাকতে হবে। শুধু তাই নয় ধৈর্য ধরতে হবে আপনার অধীনস্তদের ব্যাপারেও। তারা ভুল করবে, ঝামেলা বাধাবে। তাতেও ধৈর্য ধরতে হবে। মনে রাখতে হবে দুনিয়ার সবাই তো আর নিয়মের মধ্যে চলে না। আরও ধৈর্য ধরতে হবে স্ত্রীর ভুলত্রুটির ব্যাপারে। তদ্রুপ স্ত্রীকেও স্বামীর আচরণে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে। তার আচরণে ধৈর্য ধরতে হবে। সব সময় অভিযোগ করলে চলবে না। তার উৎপাত বা অসদাচরণে ধৈর্য ধরেই সংসার জীবন চালিয়ে নিতে হবে। এভাবেই কিন্তু ভালোবাসা দীর্ঘস্থায়ী হবে। এভাবে আশপাশের অসহায়দের প্রতি ধৈর্য নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। কর্মস্থলে অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেক আচরণেও বিরক্তি আসবে। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যেতে চাইবে। কিন্তু এই ধৈর্য দিয়েই সেসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। কারণ পৃথিবীর সবাই একরকম মন-মানসিকতা সম্পন্ন হয় না। সবার স্বভাবও একরকম হয় না। ভালো-মন্দ মিলেই সমাজ। সুতরাং সবাইকে ধৈর্যের অনুশীলন করতে হবে। যার ধৈর্য নেই সে কিছুতেই সুখী হতে পারে না।

যৌতুক প্রতিরোধে আলেম সমাজের ভূমিকা

মাওলানা শাহ আবদুস সাত্তার

অতি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলতে হয়—অভিশপ্ত যৌতুকবিরোধী আইন থাকা সত্ত্বেও দেশের শহর, নগর, গ্রাম, গঞ্জসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের এখানে-সেখানে প্রকাশ্যে-চুপিসারে যৌতুকের কারণে হত্যাকাণ্ড, অত্যাচার-নির্যাতন, আত্মহত্যা এবং কথা নেই বার্তা নেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে নিজ স্ত্রীকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে বলে দেয়—টাকা এনে দাও, নয়তো তোমাকে কঠোর অত্যাচারের শিকার হতে হবে। পরিণামে মা-বোন হচ্ছে লাঞ্ছিত ও নারীকুল হচ্ছে অপমানিত। ফলে অনেকেই অত্যাচারে-অপমানে করছে আত্মহত্যা এবং শিকার হচ্ছে নির্মম পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের।
এ অবস্থায় আলেম-ওলামা ও মুফতি সমাজ বিরাট ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা হচ্ছেন নায়েবে রাসুল। ইসলামী দিকদর্শন ও নীতিমালায় যৌতুক লেনদেন শরিয়তের ঘোর পরিপন্থী, সেদিক দিয়ে আলেম, ইমাম ও কাজী সাহেবদের যৌতুক প্রতিরোধে অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। তাই আমি যৌতুক প্রতিরোধে আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ, মুফতি-ইমাম, কাজী ও সরকারের কাছে কয়েকটি সুপারিশ বা প্রস্তাব করছি।
১. যৌতুক লেনদেন একটি অভিশপ্ত বিজাতীয় প্রচলন এবং নারী নির্যাতনমূলক মর্মান্তিক ও দুঃখজনক জঘন্যতম প্রথা। এর বিরুদ্ধে পরিবারে ও সমাজে গণসচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ, সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আলোচনা অনুষ্ঠান করে যৌতুকের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি ও এর প্রতিরোধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা আবশ্যক এবং যৌতুকলোভীদের চিহ্নিত করে সরকারের হাতে তুলে দিতে পারেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে যৌতুকবিরোধী আইন থাকা সত্ত্বেও তার সঠিক কার্যকরী বাস্তবায়ন নেই। বলতে গেলে কিতাবে আছে, গোয়ালে নেই। আইন আছে, কঠোর বাস্তবায়ন বা পদক্ষেপ নেই। অতএব এই মুহূর্তে যৌতুকবিরোধী আইন আরও কঠোরতর করার লক্ষ্যে ঘরে ঘরে গিয়ে যৌতুকলোভী, অত্যাচারীদের পাকড়াও করে জনসমক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করে দেশের অগণিত নিরীহ, অবলা, অসহায় নারীকে যৌতুকের নির্যাতন থেকে রক্ষা করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
২. যৌতুকী বিয়েশাদিতে কলেমা বা খুত্বা পাঠ না করিয়ে সামাজিকভাবে যৌতুকঘটিত বিয়ে বয়কট করতে হবে।
৩. দেশের সব মসজিদে জুমার খুতবার আগে অভিশপ্ত যৌতুক যে শরিয়ত পরিপন্থী প্রথা, এতে যে আল্লাহপাক দারুণ অসন্তুষ্ট হন—এ বিষয়ে সাধারণ মুসল্লিদের মধ্যে সম্যক জ্ঞান দান করে এর মারাত্মক কুফল-পরিণতি সম্পর্কে অবহিত করতে এবং যৌতুক লেনদেনের প্রতি চরম ঘৃণা সৃষ্টিতে স্ব-স্ব মসজিদের খতিব ও ইমামদের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
৪. সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত বয়সের ক্লাসগুলোতে যৌতুক যে অত্যন্ত গর্হিত, জঘন্য ও অভিশপ্ত প্রথা—এ বিষয়ে কিছুটা হলেও শিক্ষাদান করতে হবে।
৫. গ্রাম, গঞ্জ, পাড়া, মহল্লায় সর্বস্তরের সমাজকর্মীদের নিয়ে যৌতুক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে হবে। শুধু তাই নয়, এর বাস্তবায়নের জন্য মুরব্বিদের সচেতন ও শক্ত কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। যৌতুকী বিয়েশাদিতে যারা জড়িত তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।
৬. যৌতুক আদায়ে যেসব পাষণ্ড স্বামী স্ত্রীকে মারধর করে বা বাপের বাড়ি টাকা বা অর্থ আনতে পাঠিয়ে দেয় তাদের তাত্ক্ষণিকভাবে পাকড়াও করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করতে হবে এবং কঠিন শাস্তি প্রদান করতে হবে।
৭. বিশেষ করে কাবিননামা ফরমে ‘যৌতুকের কোনো দাবি নেই’, এই মর্মে আদালত গ্রাহ্য হলফনামায় স্বাক্ষরদানের ধারা প্রবর্তনের দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরতে হবে।
৮. দেশে অসংখ্য অতি গরিব, দুঃখী, অসহায় পিতা-মাতার বিয়েযোগ্য কন্যাদায়গ্রস্ত পরিবার আছে, যারা অর্থের অভাবে বিয়ে সুসম্পন্ন করতে পারছে না। ফলে এসব কন্যাদায়গ্রস্ত মা-বাবার অসহনীয় মনোকষ্ট, ব্যথা-আহাজারিতে চোখ থেকে পানি ঝরছে। শুধু তাই নয়, মনের দুঃখে অনেক মা-বাবার মানসিক কষ্টে ঘুম নষ্ট হচ্ছে, অসুস্থ হয়ে পড়ে, যা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।
৯. কন্যাদায়গ্রস্ত নিঃস্ব-দুস্থ অসহায় বা-মার সাহায্য-সহযোগিতায় বিবাহযোগ্য কন্যাদের দ্রুত বিয়ে সম্পন্নকরণে বাস্তবভিত্তিক সংস্থা করতে দেশের ধনাঢ্য, বিত্তবান ও সরকারের যৌথ উদ্যোগে এগিয়ে আসার দাবি জানাচ্ছি।
১০. দেশের সব জাতীয় সংবাদপত্র ও বেতার-টিভি এবং দেশি চ্যানেল-মিডিয়াগুলোয় বাধ্যতামূলকভাবে যৌতুক প্রতিরোধে বিভিন্ন যৌতুকবিরোধী টকশো, আলেম, ওলামা, ইমাম, পীর-মাশায়েখদের যৌতুক যে ইসলাম ও শরীয়তপন্থী প্রথা এবং এর কুফল, ভয়াবহ পরিণতির কথা জনসমক্ষে তুলে ধরে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।
১১. যৌতুকবিহীন বিয়ে সুসম্পন্ন করতে দেশের সর্বত্র নিজ নিজ এলাকার গণ্যমান্য মুরব্বি, অভিভাবক মহল, ধনাঢ্য-বিত্তবান, আলেম-ওলামা, ইমাম ও কাজীদের যৌতুক লেনদেন বন্ধ করার মন-মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
বিয়েশাদি মানব জীবনের একটি শুভ পবিত্র কাজ। অতএব আসুন, আর যৌতুক লেনদেন নয়—ধর্মীয় নীতিমলায় ঘৃণিত, অভিশপ্ত, পরিত্যাজ্য প্রথাটি চিরতরে বিলুপ্ত করে নারী নির্যাতনমূলক প্রথাটি প্রতিরোধে আমার-আপনার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং স্ব-স্ব ক্ষেত্রে মানবিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যৌতুক প্রতিরোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।
লেখক : সভাপতি, সীরাত মিশন, বাংলাদেশ

ইসলামে সমাজসেবার গুরুত্ব

 

মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে সমাজের প্রতি তার কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। নিজের অর্থ-সম্পদ সমাজের লোকদের জন্য অকাতরে খরচ করেন এমন সমাজ সেবক, শিক্ষানুরাগী, দানশীল ব্যক্তির সংখ্যা কিন্তু কম নয়। অর্থ-সামর্থ্য না থাকলেও মানুষকে উপদেশ বিলিয়ে থাকেন এমন মহৎ ব্যক্তিও আমাদের সমাজে আছেন। নিজের যোগ্যতা, অর্থ-সামর্থ্য ও বিচার-বুদ্ধি দিয়ে আমাদের যেমনি অন্যের উপকারে এগিয়ে আসতে হবে, তেমনি ধর্মীয় ব্যাপারেও নিজেরসহ অন্যের হিত কামনায় কাজ করতে হবে। আমরা যারা বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করছি এবং এ ক্ষেত্রে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে প্রাধান্য দিচ্ছি তারা এর সাথে আরো একটি মহৎ ও স্থায়ী কাজকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। কী সেই মহৎ ও স্থায়ী কাজ? আল্লাহও আখীরাত বিশ্বাসীদের জন্য সে কাজটি হচ্ছে ধর্মীয় কাজ। অর্থাৎ আগের সব সেবাগুলো ঠিকই থাকবে শুধু এ সাথে যোগ হবে ধর্মীয় কিছু সেবা। একজন নিঃস্ব-নিরীহ লোককে ক্ষুধা-তৃষ্ণার যন্ত্রণা আর রোদ্র-বৃষ্টি ও শীতের কষ্ট থেকে এতে যেমনি বাঁচানো যাবে, তেমনি তাকে রক্ষা করা যাবে চিরস্থায়ী জাহান্নামের কঠিন আজাব থেকে। অন্যভাবে বলা যায় অসহায় মানুষটির সাময়িক অস্থায়ী উপকারের পাশাপাশি স্থায়ী উপকারের ব্যাপারেও আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে, তাকে ধর্ম পালনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, বুঝাতে হবে। একাজগুলো আমাদের ওপর আরোপিত দায়িত্ব ও বটে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা ভালো ও আল্লাভীতিমূলক কাজে, আল্লাভীতির পথে একে অপরকে সহযোগিতা কর।(সূরা মায়িদা-২)
ধর্ম আর ধর্মীয় সেবা কী? রাসূল সাঃ বলেন, ধর্ম হচ্ছে শুভ কামনা/উপদেশ/পরামর্শ (তিন বার তিনি কথাটি বলেছেন)। আমরা (সাহাবীগণ রাঃ) বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলমান নেতৃবৃন্দের জন্য এবং সব মুসলমানের জন্য (মুসলিম) সমাজ সেবার পাশাপাশি ধর্মীয় সেবায় আমাদের প্রতি রাসূল সাঃ সুস্পষ্ট নির্দেশ হচ্ছে, আমার পক্ষ থেকে একটি বাক্য হলেও পৌঁছে দাও। জাগতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের পাশাপাশি সময়-সুযোগ করে আমাদের ধর্মীয় পড়া পড়তে হবে, জানতে হবে, বলতে হবে, জানাতে হবে, লিখতে হবে ও প্রচার করতে হবে। তা না হলে বিবেকের কাঠগড়ায় যেমনি আসামি হতে হবে, একইভাবে আসামি হতে হবে ধর্মের কাঠগড়ায়ও। কারণ রাসূল সাঃ বলছেন, যেসব লোক এমন কোনো বৈঠকে অংশ গ্রহণের জন্য ওঠে আসে যেখানে আল্লাহর নাম স্বরণ করা হয় না (ধর্মের কথা মোটেই বলা হয় না) তারা যেন মৃত গাধার লাশের স্তূপ থেকে ওঠে আসে। এরূপ মজলিস তাদের জন্য আফসসের কারণ (মুসলিম) যদি কোনো দল কোনো বৈঠকে বসে আল্লাহর জিকির না করে এবং তাদের নবীর ওপর দরূদ ও পাঠ না করে (কুরআন ও হাদীসের কথা না বলে, ধর্মের কথা স্বরণ না রাখে) তাহলে তাদের সে বৈঠক তাদের পক্ষে হতাশার কারণ হবে। আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদের শাস্তি দিবে অথবা তাদের ক্ষমা করবেন। (আবু দাউদ, আহমদ)