অপরের প্রতি সহানুভূতি

untitledএকে অপরের প্রতি সহানুভূতি, সেবা-সহযোগিতার মতো এই মহত্ গুণটি যদি আমরা ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করি, তাহলে সমাজের উঁচু-নিচু ভেদাভেদ তথা শান্তি-শৃঙ্খলায় আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে। পরোপকারে রয়েছে আত্মিক তৃপ্তি, পরিবার, সমাজ এবং দেশের মঙ্গল। আমাদের মহানবী হজরত রাসুলুল্লাহ (সা) একটি কথা বিশেষভাবে হাদীসে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, মানুষ তাঁর প্রতিবেশীকে কষ্ট না দিয়ে, জ্বালাতন না করে এবং উপোস না রেখে বিপদে-আপদে, দুঃখে-কষ্টে, শোকে-দুঃখে একে অপরের প্রতি সমবেদনা-সহানুভূতিতে এগিয়ে আসা মানবিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। অতএব আমরা যেন পরিবার, সমাজ, দেশের শত কোটি মানুষের সঙ্গে আচার-আচরণে, সাহায্য-সহযোগিতা ও সহানুভূতিতে এবং পরোপকারী মন-মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসি।

মানবিক সহজাত গুণাবলীর মধ্যে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতা বা পরোপকার অন্যতম গুণ। এই মহত ও সুন্দর গুণটি যার মধ্যে বিদ্যমান, তিনি সমাজ তথা রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে উত্তম কাজের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। তাই ইসলামে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতাকে সর্বোত্তম কাজ বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং মানবতার মঙ্গল সাধনে এই গুণটির গুরুত্ব অত্যধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমরা বিভিন্নভাবে মানব ও মানব সমাজের উপকার সাধন করতে পারি। এই উপকার বা সেবাদান, পরিশ্রম বা আর্থিক সাহায্য কিংবা সত্ পরামর্শ দ্বারাও হতে পারে। একথা স্মরণীয়, মহত্ লোকেরা বরাবরই পরের কল্যাণ সাধনে নিজেদের উতসর্গ করেন। যাঁরা নিজেদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে পারেন-তাঁরাই শুধু এই মহত কাজটি পুরোপুরি সমাধা করতে পারেন। পক্ষান্তরে মহত্ত্বের এই গুণটি যাঁর মধ্যে নেই তিনি কস্মিনকালেও একে অপরের প্রতি সহানুভূতির কাজটি করতে পারেন না। ইসলামে পরোপকারের কথা বারবার গুরুত্বসহকারে বলা হয়েছে। দান-সাহায্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সুরা আল বাকারায় ইরশাদ হয়েছে : তোমাদের দান-সদকা, সাহায্যগুলো প্রকাশ্যে করো-তাও ভালো। তবে যদি গোপনে অভাবীদের দাও তাহলে তোমাদের জন্য এটিই বেশি ভালো। এ ছাড়া আল কোরআনে আরো বলা হয়েছে : কোনো গরীব-দুঃখীজন কিছু চাইলে তাকে ধমক দিয়ে ফিরিয়ে দিও না। পূর্ণাঙ্গ মানুষের মূর্ত প্রতীক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনে আমরা পরোপকারের দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। তাঁর অন্তঃকরণ ছিল সমবেদনা ও পরোপকারের আকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ। অকথ্য নির্যাতন ও অসহনীয় দুঃখকষ্টেও তাঁর ধৈর্য ছিল সীমাহীন। তাঁকে যারা কষ্ট দিত, তাদেরও তিনি ধর্যের মাধ্যমে শিক্ষা দিতেন। যারা তাঁকে বঞ্চিত করত তাদের তিনি অকাতরে দান-সাহায্য করতেন। তিনি রোগব্যাধি ও দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের সেবা-যত্ন করে শান্তি পেতেন। রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের তিনি সেবা, সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো পীড়িত ব্যক্তিকে দেখতে পথচলা শুরু করে, সে যেন আল্লাহর রহমতের দরিয়ায় সাঁতরাতে থাকে। যখন রোগীর কাছে উপস্থিত হয় তখন রহমতের দরিয়ায় ডুবে যায়। তিনি আরো একটি হাদীসে বলেছেন, বিধবা ও দারিদ্র্যের সেবক আল্লাহর পথে যোদ্ধার সমতুল্য। ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও, পীড়িতদের সেবা করো এবং বন্দিদের মুক্তি দাও, এটাই ছিল তাঁর আহ্বান।

মক্কার এক বুড়ি প্রতিদিন হজরত রাসুলে করীম (সা)-এর যাতায়াতের পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন। হঠাত একদিন রাসুলে করীম (সা) দেখলেন পথে কাঁটা নেই, খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন সেই বুড়ি রোগাক্রান্ত হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী। আল্লাহর রাসুল (সা) এই খবর শোনামাত্র ছুটে গেলেন বুড়ির বাড়িতে এবং মহানবী (সা) সেবা-শুশ্রূষা করে ওষুধপত্র খাইয়ে বুড়িকে সুস্থ করে তুললেন। আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা)-এর এই উদার ব্যবহার ও কর্মকাণ্ডে বুড়ি অনুশোচনায় নিজেকে ধিক্কার দিলেন। আল্লাহর রাসুল (সা)-এর এমন মহত ও উন্নত মনমানসিকতার বিরল দৃষ্টান্ত।

ইসলামে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি অর্থাত, পরোপকারের বহু উল্লেখযোগ্য নজির রয়েছে। আমরা হজরত ওমর (রা)-এর কথা অনেকেই জানি। তিনি ছিলেন বিশাল সাম্রাজ্যের খলিফা। তিনিও অতি সহজ-সরলভাবে জীবন নির্বাহ করতেন। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অতি মহানুভব-পরোপকারী হৃদয়। এক রাতে তিনি নগরীর শহরতলির আশপাশে ঘুরে যখন একটি ক্ষুধার্ত পরিবারের শূন্য হাঁড়িতে পানি জ্বাল দেওয়ার দৃশ্য অবলোকন করলেন তখনই হজরত ওমর (রা) ছুটে যান সরকারি গুদামে, সেখান থেকে তিনি বয়ে নিয়ে এলেন আটার বস্তা। গৃহকর্ত্রী খলিফার এমন দয়া ও সহানুভূতি দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন। পরোপকারের এই অপূর্ব ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। অতএব, পরোপকারের মতো একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতার গুণটি যদি আমরা অনুশীলন করি তবে আমাদের সমাজের উঁচু-নিচু ভেদাভেদ থাকবে না, সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধিতে আমূল শান্তিময় পরিবেশ ফিরে আসবে সন্দেহ নেই। শুধু তাই নয়, এতে রয়েছে আত্মিক তৃপ্তি। আবার লক্ষ করুন, আমাদের মহানবী (সা) বলেছেন, যে প্রতিবেশীকে উপোস রেখে পেটপুরে খায় সে মুমিন নয়। আসুন, আমরা যেন মানবিক কল্যাণে-মঙ্গলে একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল, সহমর্মিতা এবং সমবেদনায় একাত্ম হয়ে সমাজ সংসারে স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারি। দেশের সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধিকরণে যেন ধর্মীয় মূল্যবোধকে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে পার।

সবর বা ধৈর্য ধারন

সবর তেজদীপ্ত অশ্ব যা কখনো হোঁচট খায় না। এমন ক্ষুরধার তরবারী, যা কখনো  তেজ হারায় না; এমন বিজয়ী সৈনিক যা কখনো পরাজিত হয় না; এমন সুরক্ষিত দূর্গ যা কখনো ধ্বংস হয় না। সবর আর বিজয় দুই সহোদর ভাই। এমন কেউ  নেই, যে সবরের অস্ত্রে সজ্জিত হয়েছে অথচ তার নাসফ অথবা শয়তান তাকে পরাহত করেছে। যার সবর নেই সে শক্তিহীন, পঙ্গু।  যে ব্যক্তি তার জিহাদ-সংগ্রামে সবরকে সঙ্গী বানাবে না, সে পরাজিত হতে বাধ্য। তাইতো আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُون
হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধর ও ধৈর্যে অটল থাক এবং পাহারায় নিয়োজিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও। (সূরা আলে-ইমরান-২০০)
সবর মুমিনের জন্য গৃহাপালিত জন্তু, খুঁটির মধ্যে বেঁধে রাখার মতো। ইচ্ছামত এদিক সেদিক ঘোরে; কিন্তু পরিশেষে তাকে সেই খুঁটির কাছেই ফিরে আসতে হয়। সবর ঈমানের শেকড়রে মতো। বৃক্ষ যেভাবে শেকড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে  ঈমানও তদ্রুপ সবরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তাই যার সবর নেই  তার পূর্ণ ঈমান নেই। সবরবিহীন ঈমানদার দ্বিধাগ্রস্ত ঈমানদার। এ ধরনের ঈমানদার সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةٌ انْقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآَخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
মানুষের মধ্যে কতক এমন রয়েছে, যারা দ্বিধার সাথে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি তার কোন কল্যাণ হয় তবে সে তাতে প্রশান্ত হয়। আর যদি তার কোন বিপর্যয় ঘটে, তাহলে সে তার আসল চেহারায় ফিরে যায়। সে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি হল সুস্পষ্ট ক্ষতি। (সূরা হজ-১১)
যে সবর করে, বিপদে ধৈর্য ধারণ করে সেই ভাগ্যবান : পৃথিবীতে যারা সুন্দর জীবন গড়তে পেরেছে, তারা সবরের গুণেই তা গড়েছে। তারা সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করেছে এই সবরের বদৌলতেই। তারা দুঃসময় এলে ধৈর্য ধারণ করে আর সু-সময় এলে আল্লাহ তা’আলার শুকরিয়া আদায় করে। আর এভাবে তারা সবর ও শোকরের ডানায় চড়ে জান্নাতের অধিকারী হয়।
সবর কী? সবরের আভিধানিক অর্থ : ধৈর্য ধারণ করা, বাধা দেয়া বা বিরত রাখা, সহনশীলতা। শরীআ’তের পরিভাষায় সবর বলা হয় : অন্তরকে অস্থির হওয়া থেকে, জিহ্বাকে অভিযোগ করা থেকে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গাল চাপড়ানো ও বুকের কাপড় ছেঁড়া ইত্যাদি থেকে বিরত রাখা। কারো কারো মতে, এটি হলো মানুষের অন্তরগত একটি উত্তম স্বভাব, যার মাধ্যমে সে অসুন্দর ও অনুত্তম কাজ থেকে বিরত থাকে। এটি মানুষের একটি অন্তরগত শক্তি, যা দিয়ে সে নিজকে সুস্থ ও সুরক্ষিত রাখতে পারে। সবর হলো সুন্দরভাবে বিপদ মোকাবিলা করা। বিপদকালে অভিযোগ-অনুযোগ না করে অমুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করাই সবর।
জুনায়েদ বাগদাদী (র) কে সবর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন : হাসি মুখে তিক্ততার ঢোক গেলা। যুন্নূন মিসরী (র) বলেন : আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ থেকে দূরে থাকা; বিপদের সময় শান্ত থাকা এবং জীবনের কুরুক্ষেত্রে দারিদ্রের কষাঘাত সত্ত্বেও অমুখাপেক্ষিতা প্রকাশ করা।
এক বুযুর্গ এক ব্যক্তিকে অন্যের কাছে তার সমস্যা নিয়ে অনুযোগ করতে শুনে বললেন : যিনি দয়া করেন না তার কাছে দয়াকারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছ। এ সম্পর্কে আরও বলা হয় : তুমি যখন মানুষের কাছে অভিযোগ কর, তখন মূলত দয়াময়ের বিরুদ্ধে নির্দয়ের কাছেই অভিযোগ কর।
অভিযোগ দু’টি পন্থায় করা হয়: একটি হলো, আল্লাহ তা’আলার কাছে অনুযোগ করা। এটি সবর পরিপন্থী নয়। যেমন ইয়াকূব (আ) প্রিয় পুত্র ইউসুফকে হারিয়ে বলেছেন : আমি আল্লাহর কাছেই আমার দুঃখ বেদনার অভিযোগ জানাচ্ছি। অপরটি হলো, নিজের মুখ বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ভাষার মাধ্যমে মানুষের কাছে অভিযোগ করা। এটি সবর পরিপন্থী।
আমরা যে সবরের কথা আলোচনা করছি তা তিন প্রকারের। যথা : ১. আল্লাহ তা’আলার আদেশ-নির্দেশ পালন ও ইবাদত-বন্দেগী আদায় করতে গিয়ে ধৈর্যধারণ করা।  ২. আল্লাহ তা’আলার নিষেধ ও তাঁর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করা এবং ৩. তাকদীর ও ভাগ্যের ভালো-মন্দে অসন্তুষ্ট না হয়ে তার ওপর ধৈর্যধারণ করা। এই তিন প্রকার সম্পর্কেই শায়খ আবদুল কাদীর জিলানী (র) বলেন : একজন বান্দাকে অবশ্যই তিনটি বিষয়ে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে : কিছু আদেশ পালনে, কিছু নিষেধ থেকে বিরত থাকায় এবং ফয়সালাকৃত তাকদীরের ওপর।
আল-কুরআনে বর্ণিত লুকমান (আ)-এর বিখ্যাত উপদেশেও এ তিনটি বিষয়ের কথা বলা হয়েছে।
يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
হে আমার প্রিয় বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ কর এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধর। নিশ্চয় এগুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ। (সূরা লুকমান-১৭)
লুকমান (আ) যে ‘সৎকাজের আদেশ দাও’ বলেছেন, তার মধ্যে নিজে সৎ কাজ করা এবং অপরকে সৎ কাজের উপদেশ দেয়াÑ উভয়টি অন্তর্ভুক্ত। তেমনি অসৎকাজে নিষেধ করার মধ্যেও উভয়টি রয়েছে। এখানে ‘সৎকাজের আদেশ’ ও ‘অসৎকাজে নিষেধ’ শব্দ থেকেই এমনটি বুঝা যায়। তাছাড়া শরীয়তের  দৃষ্টিতেও ‘সৎকাজের আদেশ’ ও ‘অসৎকাজে নিষেধ’ বাস্তবায়িত হয় না, যতক্ষণ না আগে সে নিজে তা পালন করে।
وَالَّذِينَ صَبَرُوا ابْتِغَاءَ وَجْهِ رَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَأَنْفَقُوا مِمَّا رَزَقْنَاهُمْ سِرًّا وَعَلَانِيَةً وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ أُولَئِكَ لَهُمْ عُقْبَى الدَّارِ
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে সবর করে, সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদের যে রিযক প্রদান করেছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে এবং ভাল কাজের মাধ্যমে মন্দকে দূর করে, তাদের জন্যই রয়েছে আখিরাতের শুভ পরিণাম। (সূরা রা‘দ-১৯-২২)
সবর বা ধৈর্য আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ মুমিন বান্দাদের বৈশিষ্ট্য : নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ তা’আলা এই বিরল গুণে ভূষিত করেছিলেন। তাই নবী-রাসূলগণই হলেন সবরের সকল আকার-প্রকৃতির উজ্জ্বলতম উদাহরণ। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র) বলেন, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা নব্বই জায়গায় সবরের কথা বলেছেন। অতএব ভেবে দেখুন সবর কত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়!
আল্লাহ তা’আলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে সবরকারী তথা ধৈর্যশীলদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদেরকে হিসাব ছাড়া প্রতিদান দেবেন বলে উল্লেখ করেছেন।
قُلْ يَا عِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
বল, হে আমার বান্দারা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়ায় ভাল কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। আর আল্লাহর যমীন প্রশস্ত, কেবল ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেয়া হবে কোন হিসাব ছাড়াই। (সূরা যুমার-১০) আল্লাহ তা’আলা বলেন, তিনি ধৈর্যশীলদের জন্য হিদায়েত ও সুস্পষ্ট বিজয় নিয়ে তাদের সাথেই আছেন।
وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। (সূরা আনফাল-৪৬) আল্লাহ তা’আলা সবর ও ইয়াকীনের কারণে মানুষকে নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করেন।
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ
আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা করেছিলাম, তারা আমার আদেশানুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত, যখন তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত। (সূরা সাজদাহ-২৪) আল্লাহ তা’আলা দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, সবরই মানুষের জন্য কল্যাণকর।
وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِلصَّابِرِينَ
আর যদি তোমরা সবর কর, তবে তাই সবরকারীদের জন্য উত্তম। (সূরা নাহল-১২৬) আল্লাহ তা’আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, কারও যদি সবর থাকে, তাহলে যত বড় শত্রুই হোক তাকে হারাতে পারবে না।
 وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ
আর যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের  কোন ক্ষতি করবে না। তারা যা করে, নিশ্চয় আল্লাহ তা পরিবেষ্টনকারী। (সূরা আলে-ইমরান-১২০) আল্লাহ তা’আলা বিজয় ও সফলতার জন্য সবর ও তাকওয়া অবলম্বনের শর্ত জুড়ে দিয়েছেন।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধর ও ধৈর্যে অটল থাক এবং পাহারায় নিয়োজিত থাক। আর আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও। (সূরা আলে-ইমরান-২০০) আল্লাহ তা’আলা ধৈর্যশীলকে ভালোবাসেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আর একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে?
وَكَأَيِّنْ مِنْ نَبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا وَاللهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ
আর কত নবী ছিল, যার সাথে থেকে অনেক আল্লাহ ওয়ালা লড়াই করেছে। তবে আল্লাহর পথে তাদের ওপর যা আপতিত হয়েছে তার জন্য তারা হতোদ্যম হয়নি। আর তারা দুর্বল হয়নি এবং তারা নত হয়নি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদেরকে ভালবাসেন। (সূরা আলে-ইমরান-১৪৬) আল্লাহ তা’আলা ধৈর্যশীলদের তিনটি বিষয়ে সুসংবাদ দিয়েছেন যার প্রতিটি বিষয় পাবার জন্য দুনিয়াবাসী একে অপরের সঙ্গে ইর্ষা করেন।
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ.  الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ. أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা, তাদেরকে যখন বিপদ আক্রামণ করে তখন বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। (সূরা বাকারাহ-১৫৫-১৫৭) ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহ তা’আলা রেখেছেন জান্নাত লাভের কামিয়াবী আর জাহান্নাম থেকে মুক্তির সাফল্য।
 إِنِّي جَزَيْتُهُمُ الْيَوْمَ بِمَا صَبَرُوا أَنَّهُمْ هُمُ الْفَائِزُونَ
নিশ্চয় আমি তাদের ধৈর্যের কারণে আজ তাদেরকে পুরস্কৃত করলাম; নিশ্চয় তারাই হল সফলকাম। (সূরা মুমিনূন-১১১) আল্লাহ তা’আলা আল-কুরআনের চারটি স্থানে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর নিদর্শনাবলী থেকে ধৈর্যশীল ও শোকরগুযার বান্দারাই উপকৃত হয় এবং তারাই সৌভাগ্যবান।
أَلَمْ تَرَ أَنَّ الْفُلْكَ تَجْرِي فِي الْبَحْرِ بِنِعْمَةِ اللهِ لِيُرِيَكُمْ مِنْ آيَاتِهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
তুমি কি দেখনি যে, নৌযানগুলো আল্লাহর অনুগ্রহে সমুদ্রে চলাচল করে, যাতে তিনি তাঁর কিছু নিদর্শন তোমাদের দেখাতে পারেন। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য অনেক নিদর্শন রয়েছে। (সূরা লুকমান-৩১)
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا مُوسَى بِآيَاتِنَا أَنْ أَخْرِجْ قَوْمَكَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَذَكِّرْهُمْ بِأَيَّامِ اللَّهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
আর আমি মূসাকে আমার আয়াতসমূহ দিয়ে পাঠিয়েছি যে, তুমি তোমার কওমকে অন্ধকার হতে আলোর দিকে বের করে আন এবং আল্লাহর দিবসসমূহ তাদের স্মরণ করিয়ে দাও। নিশ্চয় এতে প্রতিটি ধৈর্যশীল, কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য রয়েছে অসংখ্য নিদর্শন। (সূরা ইবরাহীম-৫)
فَقَالُوا رَبَّنَا بَاعِدْ بَيْنَ أَسْفَارِنَا وَظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ فَجَعَلْنَاهُمْ أَحَادِيثَ وَمَزَّقْنَاهُمْ  كُلَّ مُمَزَّقٍ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِكُلِّ صَبَّارٍ شَكُورٍ
কিন্তু তারা বলল, ‘হে আমাদের রব, আমাদের সফরের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিন। আর তারা নিজদের প্রতি যুলম করল। ফলে আমি তাদেরকে কাহিনী বানালাম এবং তাদেরকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে দিলাম। নিশ্চয় এতে প্রত্যেক ধৈর্যশীল কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য নিদর্শন রয়েছে। (সূরা সাবা-১৯)
বিপদে ধৈর্য ধারণ করার ফযীলত অনেক : তাই বলে শরীয়তে বিপদ কামনা করার অনুমতি দেয়া হয়নি। কারণ মুমিন সচেতন ও বুদ্ধিমান। সে কখনো বিপদ প্রত্যাশা করতে পারে না। হ্যাঁ, বিপদ এসে পড়লে তাতে বিচলিতও হয় না; বরং তাতে ধৈর্য ধারণ করে। বিপদের সময় সে সহনশীলতার পরিচয় দেয়। যেমন সহীহ বুখারীতে আবদুল্লাহ বিন আবূ আওফা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, যুদ্ধের দিনগুলোতে একদা রাসূলুল্লাহ (সা) অপেক্ষায় থাকলেন। যখন সূর্য ডুবে গেল তখন তিনি তাঁদের মাঝে  দাঁড়িয়ে বললেন, ‘হে লোকসকল, তোমরা শত্রুদের সঙ্গে মুখোমুখী হবার প্রত্যাশা করো না। আল্লাহ তা’আলার কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা কামনা করো। তবে যখন তোমরা তাদের মুখোমুখী হও, তখন ধৈর্য ধারণ করো এবং সবর করো। আর জেনে রেখো, জান্নাত তরবারির ছায়ার নিচে। (বুখারী) আপনারা কি সেই সাহাবীর কথা শুনেননি যিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়ে আহত অবস্থায় যন্ত্রণা সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলেন? এ জন্যই কিন্তু আবু বকর সিদ্দীক (রা) বলতেন : আমার কাছে বিপদে পড়ে সবর করার চেয়ে সুখে থেকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাই অধিক পছন্দনীয়।
একজন প্রকৃত মুমিন কিন্তু সর্বাবস্থায় দৃঢ়ভাবে এ কথা বিশ্বাস করে যে, সে যে অবস্থায় আছে, তাতে কোনো কল্যাণ নিহিত রয়েছে। যেমন মুসলিম শরীফে সুহাইব ইবন সিনান (রা) থেকে মারফূ‘ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে : মুমিনের অবস্থা কতইনা চমৎকার! তার সব অবস্থাতেই কল্যাণ থাকে। এটি শুধু মুমিনেরই বৈশিষ্ট্য যে, যখন সে আনন্দে থাকে, তখন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এবং যখন সে কষ্টে থাকে, তখন সবর করে। আর এ উভয় অবস্থাই তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মুমিনের পুরো জীবনই কিন্তু পরীক্ষা। যেমন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন : كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَنَبْلُوكُمْ بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ ‘আর ভাল ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে। (সূরা আম্বিয়া-৩৫)
আল্লাহ তা’আলা তাঁর বান্দাকে প্রতি মুহূর্তে পরীক্ষা করেন। তিনি দেখতে চান কে ধৈর্যশীল, কে মুজাহিদ আর কে সত্যবাদী। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمِ اللَّهُ الَّذِينَ جَاهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّابِرِينَ ‘তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ আল্লাহ এখনো জানেননি তাদেরকে, যারা তোমাদের মধ্য থেকে জিহাদ করেছে এবং জানেননি ধৈর্যশীলদেরকে। (সূরা আলে-ইমরান-১৪২)
আল্লাহ তাআলা মুমিনকে সম্পদ-সন্তান সব কিছু দিয়েই পরীক্ষা করেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :  إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَاللهُ عِنْدَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ ‘তোমাদের ধনÑসম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা বিশেষ। আর আল্লাহর নিকটই মহান প্রতিদান। (সূরা তাগাবুন-১৫)
রাসূলুল্লাহ (সা) স্বয়ং তাঁর সাহাবীদের সবর শিক্ষা দিয়েছেন। এ সবরের পরীক্ষা বেশি দেয়া হয়েছে মক্কী জীবনে। যেমন খুবাইব ইবন আরাত রা.-এর হাদীসে আমরা তার চিত্র দেখতে পাই। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন কা’বার ছায়ায় তাঁর একটি চাদরে মাথা রেখে শায়িত অবস্থায় ছিলেন। আমরা তাঁর কাছে অভিযোগ করলাম, কেন তিনি আমাদের জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য চান না, আমাদের জন্য তাঁর কাছে দু‘আ করেন না। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে (এমন বিপদও এসেছে যে) কাউকে পাকড়াও করা হতো। তারপর গর্ত খনন করে তাকে সেই গর্তে ফেলা হতো। এরপর করাত এনে তার মাথার ওপর রাখা হতো। অতপর তাকে দুই টুকরো করে লোহার চিরুনী দিয়ে তার শিরা-অস্থিসহ আচড়ানো হতো। তদুপরি তারা তাকে দ্বীন থেকে ফেরাতে পারতো না। আল্লাহর শপথ! এখন আমাদের পরীক্ষা চলছে। একদিন এমন আসবে যখন আরোহীরা সান‘আ থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত যাবে। বাঘ আর ছাগল একে অন্যের থেকে নিরাপদে থাকবে। এক আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করতে হবে না। কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়া করছো। অর্থাৎ মক্কার মুশরিকদের দেয়া আযাব অচিরেই দূর হয়ে যাবে। সুতরাং অতীতের উম্মতের মতো তোমরাও দ্বীনের বিপদে একটু ধৈর্য ধারণ করো।
সবরের ফযীলত : সবরের কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহর বান্দা মাত্রই সবর করতে হবে। কেননা কখনো আল্লাহর আদেশ মানতে হবে, তাঁর নির্দেশিত কাজ করতে হবে। আবার কখনো তাঁর নিষেধ মেনে চলতে হবে, বিরত থাকতে হবে তা করা থেকে। আবার কখনো অকস্মাৎ তাকদীরের কোনো ফয়সালা এসে পড়বে। নিয়ামত দেয়া হবে, তখন শুকরিয়া আদায় করতে হবে। এভাবে নানা অবস্থার মধ্য দিয়ে মুমিনের জীবন অতিবাহিত হয়। সুতরাং মৃত্যু পর্যন্ত এই সবরকে সাথে নিয়েই চলতে হবে। এজন্যই সবরের অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে।
ক. উম্মে সালামা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলতে শুনেছি : যে ব্যক্তি কোনো বিপদে পড়ে আল্লাহ যা নির্দেশ দিয়েছেন অর্থাৎ  إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ   পড়বে এবং বলবে :  اَللَّهُمَّ آَجِرْنِيْ فِيْ مُصِيْبَتِيْ وَاخْلُفْ لِي خَيْراً مِنْهَا  হে আল্লাহ, আমাকে আমার বিপদের প্রতিদান দিন এবং আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন। আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন। উম্মে সালামা (রা) বলেন, আবূ সালামা মারা গেলেন। আবূ সালামার চেয়ে উত্তম মুসলমান আর কে হতে পারে? তাঁর ঘরেই রাসূলুল্লাহ (সা) সর্বপ্রথম হিজরত করেছেন। (তবে আমি দু’আটি পড়লাম আর আল্লাহ তা’আলা আমাকে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা)-কেই স্বামী হিসেবে দান করলেন!)
খ. আয়েশা (রা) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : মুমিনকে যেকোনো বিপদই স্পর্শ করুক না কেন আল্লাহ তার বিনিময়ে তার গুনাহ মাফ করে দেন। এমনকি (চলতি পথে) পায়ে যে কাঁটা বিদ্ধ হয় (তার বিনিময়েও গুনাহ মাফ করা হয়। (বুখারী ও মুসলিম )
গ. আবূ মূসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : যখন কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয় অথবা সফর করে, তার জন্য সে সুস্থাবস্থায় এবং ঘরে থাকতে যেরূপ নেকী কামাই করতো অনুরূপ নেকী লেখা হয়। ( আশ্শারহুল মুমতি)।
ঘ. সুফিয়ান ইবন উয়াইনা (র) নিচের আয়াত : وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآَيَاتِنَا يُوقِنُونَ ”আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা করেছিলাম, তারা আমার আদেশানুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত, যখন তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত। (সূরা সাজদাহ-২৪)-এর ব্যাখ্যায় বলেন, যেহেতু তারা সকল কৌশলের মূল তথা ধৈর্য অবলম্বন করেছে তাই আমি তাদেরকে নেতা বানিয়ে দিলাম।
ঙ. উমর ইবন আবদুল আযীয (রহ) বলেন, যাকে আল্লাহ তা’আলা কোনো নেয়ামত দিয়ে তা ছিনিয়ে নিয়েছেন এবং তার স্থলে তাকে সবর দান করেছেন, এমতাবস্থায় সে ব্যক্তি থেকে যা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তার চেয়ে সেটাই উত্তম যা তাকে দান করা হয়েছে।
জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে আমাদেরকে সবর ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে প্রতিবেশীর ওপর। তার দেয়া কষ্ট অম্লান বদনে সহ্য করতে হবে এবং তা সত্ত্বেও সচেষ্ট থাকতে হবে তার কল্যাণ সাধনে। ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে আত্মীয়দের ব্যাপারে। তাদের কাছ থেকে অনাকাংক্ষিত যেসব আচরণ হবে তার ওপর। তাতে ধৈর্য ধারণ করতে হবে আর নেকির প্রত্যাশায় থাকতে হবে। শুধু তাই নয় ধৈর্য ধরতে হবে আপনার অধীনস্তদের ব্যাপারেও। তারা ভুল করবে, ঝামেলা বাধাবে। তাতেও ধৈর্য ধরতে হবে। মনে রাখতে হবে দুনিয়ার সবাই তো আর নিয়মের মধ্যে চলে না। আরও ধৈর্য ধরতে হবে স্ত্রীর ভুলত্রুটির ব্যাপারে। তদ্রুপ স্ত্রীকেও স্বামীর আচরণে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিতে হবে। তার আচরণে ধৈর্য ধরতে হবে। সব সময় অভিযোগ করলে চলবে না। তার উৎপাত বা অসদাচরণে ধৈর্য ধরেই সংসার জীবন চালিয়ে নিতে হবে। এভাবেই কিন্তু ভালোবাসা দীর্ঘস্থায়ী হবে। এভাবে আশপাশের অসহায়দের প্রতি ধৈর্য নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। কর্মস্থলে অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেক আচরণেও বিরক্তি আসবে। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যেতে চাইবে। কিন্তু এই ধৈর্য দিয়েই সেসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। কারণ পৃথিবীর সবাই একরকম মন-মানসিকতা সম্পন্ন হয় না। সবার স্বভাবও একরকম হয় না। ভালো-মন্দ মিলেই সমাজ। সুতরাং সবাইকে ধৈর্যের অনুশীলন করতে হবে। যার ধৈর্য নেই সে কিছুতেই সুখী হতে পারে না।

ঈদুল ফিতর, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন

সমস্ত প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। আমরা তার প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করি। আমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রবৃত্তিজাত অনিষ্ট ও কর্মের কুপ্রভাব হতে আশ্রয় চাই। আল্লাহ তা’আলা যাকে হেদায়েত দান করেন, তার কোন ভ্রষ্টকারী নেই। আর যাকে তিনি ভ্রষ্ট করেন, তার কোন হেদায়েতকারী নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, ও একক, তার কোন শরীক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ ! সালাত, সালাম ও বরকত অবতীর্ণ করুন তার উপর, তার বংশধর ও সাহাবাদের উপর, এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার পথে ধাবিত হবে ও তার আদর্শের অনুসরণ করবে তাদের উপর।

আল্লাহ তা’আলা  ইরশাদ করেন :- সদাচারের প্রতিদান সদাচার ছাড়া আর কি হতে পারে? (সূরা আর-রাহমান-৬০) অর্থাত যেসব মানুষ আল্লাহ তা’আলার জন্য সারা জীবন পৃথিবীতে নিজেদের প্রবৃত্তির ওপর বিধি-নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছিল, হারাম থেকে আত্মরক্ষা করে হালালের ওপর সন্তুষ্ট থেকেছে, ফরযকে ফরয মনে করে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালন করেছে, ন্যায় ও সত্যকে ন্যায় ও সত্য মনে করে হকদারদের হকসমূহ আদায় করেছে এবং সর্বপ্রকার দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করে অন্যায় ও অকল্যাণের বিরুদ্ধে ন্যায় ও কল্যাণকে সমর্থন করেছে। আল্লাহ তাদের এসব ত্যাগ ও কুরবানীকে ধ্বংস ও ব্যর্থ করে দেবেন এবং কখনো এর কোন প্রতিদান তাদের দেবেন না তা কি করে সম্ভব। আল্লাহ তা’আলার অবশ্যই তাদের প্রতিদান দেবেন। মাহে রমজান ছিল তাওবা ও ক্ষমার মওসুম, মাগফিরাত বা ক্ষমার মাস সেই মাস আমরা অতিবাহিত করেছি।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আল্লাহর দিকে বারবার প্রত্যাগমনকারী, তার ইবাদতকারী, তার প্রশংসা বানী উচ্চারণকারী, তার জন্য যমীনে বিচরণকারী, তার সামনে রুকু ও সিজদাকারী, সৎকাজের আদেশকারী, অসৎকাজ থেকে বিরতকারী, এবং আল্লাহর সীমারেখা সংরক্ষণকারী, (সেই সব মুমিন হয়ে থাকে যারা আল্লাহর সাথে কেনাবেচার সওদা করে) আর হে নবী! এ মুমিনদেরকে সুখবর দাও! (সূরা তাওবা-১১২)

আনন্দ ভরা, ভ্রাতৃত্ব-ভালবাসা ও সহমর্মিতায় অম্লান ঈদুল ফিতর, মুসলিমদের অন্যতম আনন্দ উতসব। হিজরী বছরের দশম-মাস শাওয়াল, শাওয়ালের প্রথম দিন মু’মিনদের অনাবিল খুশির দিন, ক্ষমার বার্তা নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর।

রহমাত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমযানুল মোবারক শেষ হলেই আমাদের মাজে মহাপুরস্কারের পয়গাম নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর। আজ ঈদুল ফিতর, মুবারক উপলক্ষ। আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে হাদিয়া হিসেবে-আসা মুবারক ও সম্মানিত উপলক্ষ।

সাহাবী আনাস (রা) বর্ণানা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনায় হিজরত করে এলেন, তিনি মদীনাবসীকে দু’টি দিবসে খেল-তামাশা করতে দেখলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন : এ দিবস দু’টি কী? তারা বললেন, আমরা জাহিলীযুগে এ দিবস দু’টিতে খেলতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে এ দু’টির পরিবর্তে উত্তম দিবস দিয়েছেন। ঈদুল আযহা  ও ঈদুল ফিতর। (আবূ দাউদ)

ঈদুল ফিতরের এ মহান দিবসে, আনন্দের শত আবহ বিজড়িত এ সকালে আমরা যেভাবে নামায আদায়ের মাধ্যমে উতসব পালন করছি, তা আল্লাহ তা‘আলার একটি বিশেষ করুণা ও দান। আমরা দীর্ঘ একটি মাস সিয়াম সাধনা করে, রাতের বেলায় তারাবীহ্-এর নামায পড়ে, কুরআন শুনে ও তিলাওয়াত করে, গরীব-মিসকীনকে দান-সাদকা করে, রোযাদারকে ইফতার করিয়ে, কল্যাণমূলক কাজে সহায়তা করে আমাদের আনন্দকে পরিপূর্ণ করার জন্য আজ উপস্থিত হয়েছি ঈদের নামাযে। এভাবে আনন্দ ও পবিত্রতার অকল্পনীয় সংমিশ্রণে কেবল মুসলিম উম্মাহই ঈদ উদযাপন করে। এটা  নিশ্চয় এক নিয়ামত যা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সম্মানিত করেছে।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- বল, আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে। সুতরাং এ নিয়েই যেন তারা খুশি হয়। এটি যা তারা জমা করে তা থেকে উত্তম। (সূরা ইউনুস-৫৮)

অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আর বলো, সেই আল্লাহর প্রশংসা, যিনি কোনো পুত্রও গ্রহণ করেননি। তাঁর বাদশাহীতে কেউ শরীকও হয়নি এবং তিনি এমন অক্ষমও নন যে, কেউ তাঁর সাহায্যকারী ও নির্ভর হবে। আর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করো, চূড়ান্ত পর্যায়ের ন্ত্রষ্ঠত্ব। (সূরা ইস্রা-১১১)

ঈদ আরবী শব্দ, অর্থ-আনন্দ, ফিতর-অর্থ, রোজা ভঙ্গ করা। এমন দিনকে ঈদ বলা হয় যে দিন মানুষ একত্র হয় ও দিনটি বার বার ফিরে আসে। যেহেতু এ দিনটি বার বার ফিরে আসে তাই এর নাম ঈদ। এ শব্দ দ্বারা এ দিবসের নাম রাখার তাতপর্য হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ দিবসে তার বান্দাদেরকে নেয়ামত ও অনুগ্রহ দ্বারা বার বার ধন্য করেন ও বার বার তার এহসানের দৃষ্টি দান করেন। যেমন রমজানে পানাহার নিষিদ্ধ করার পর আবার পানাহারের আদেশ প্রদান করেন। সাদকাতুল-ফিতর, হজ্জ-জিয়ারত, কুরবানীর গোশত ইত্যাদি নিয়ামত তিনি বার বার ফিরিয়ে দেন। আর এ সকল নিয়ামত ফিরে পেয়ে ভোগ করার জন্য অভ্যাসগত ভাবেই মানুষ আনন্দ-ফুর্তি করে থাকে।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- তোমার প্রভুর ক্ষমা লাভের উদ্দেশ্যে দ্রুত ধাবমান হও। এবং সেই জান্নাতের জন্য (প্রতিযোগিতা কর) যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের সমান, যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ভীরুদের জন্যে। (সূরা আলে-ইমরান-১৩৩)

আল্লাহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন :- হে বিশ্বাসীগণ ! আল্লাহ্কে ভয় কর এবং যারা (কথায় ও কাজে) সত্যবাদী তাদের অন্তর্ভুক্ত হও। (সূরা তাওবাহ-১১৯)

ঈদুল ফিতর সমস্ত রমযান মাস সিয়াম পালনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে তাওফীক দানের জন্য আল্লাহ তা’আলা প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। ঈদুল ফিতরের দিন সাদকাতুল-ফিতর আদায় করা তার পর সমবেত ভাবে দু’রাকাত সালাত আদায় করা। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদকাতুল-ফিতর ওয়াজিব করেছেন, অশ্লীল ও অনর্থক কথা-বার্তার কারণে সিয়ামে ঘটে যাওয়া ত্রুটি-বিচ্যুতি গুলো দূর করার জন্য ও মিসকিনদের খাদ্য প্রদানের জন্য। ঈদের নামাজের পূর্বে আদায় করলে তা সাদকাতুল-ফিতর হিসাবে গন্য হবে। আর ঈদের নামাজের পর আদায় করলে তা অন্যান্য সাধারণ সাদকার মত একটি দান হিসাবে গন্য হবে। (আবু দাউদ)

ঈদের দিনের করণীয় : ঈদের দিন গোসল করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা। ঈদের দিন গোসল করার মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা মোস্তাহাব।

ঈদের দিনে খাবার গ্রহণ প্রসঙ্গে : সুন্নত হল ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদের সালাত আদায়ের পূর্বে খাবার গ্রহণ করা। আর ঈদুল আযহার দিন ঈদের সালাতের পূর্বে কিছু না খেয়ে সালাত আদায়ের পর কুরবানির গোশত খাওয়া সুন্নত। ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদের সালাতের পূর্বে তিনটি, পাঁচটি অথবা সাতটি এভাবে বে-জোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়া সুন্নত।

সাহাবী আনাস (রাঃ) বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন কয়েকটি খেজুর না খেয়ে বের হতেন না, আর খেজুর খেতেন বে-জোড় সংখ্যায়। (বুখারী) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া : ঈদগাহে তাড়াতাড়ি যাওয়া উচিত। যাতে ইমাম সাহেবের নিকটবর্তী স্থানে বসা যায় ও ভাল কাজ অতি তাড়াতাড়ি করার সওয়াব অর্জন করা যায়, সাথে সাথে সালাতের অপেক্ষায় থাকার সওয়াব পাওয়া যাবে। ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া হল মোস্তাহাব।

ঈদের তাকবীর আদায় : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতেন। ঈদের সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : বল, আমি তোমাদের মত একজন মানুষ; (কিন্তু) আমার নিকট ওহী প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের আল্লাহ্ এক ও অদ্বিতীয়। সুতারাং যে তাহার প্রভুর সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎ কাজ করে এবং প্রভুর ইবাদতে কাউকে শরীক না করে। (সূরা কাহ্ফ-১১০) রমজান চলে গেছে, তার অর্থ এই নয় যে আমরা সারা বছর আর কোনো রোযা রাখব না। বরং রমযানের বাইরেও আমরা নফল রোযাসমূহ পালন করার চেষ্টা করব। কেননা, রোযার সাওয়াব অফুরন্ত, যা আল্লাহ তা’আলা নিজ হাতে দিবেন বলে হাদীসে ঘোষণা এসেছে। আর রমযানের পরপরই আমাদের সামনে যে নফল রোযাটি আসে তা হলো শাওয়াল মাসের ছয় রোজা। আবূ আইয়ূব আনসারী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি রমযানের রোযা রাখার পর শাওয়াল মাসে ৬টি রোযা রাখলো সে যেন সারা বছর রোযা রাখল। (মুসলিম) তাই আজ প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত¦ রমযান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে জীবনকে উদ্ভাসিত করা। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের তাওফীক দান করুন। আমীন .

অপরের প্রতি সহানুভূতি

একে অপরের প্রতি সহানুভূতি, সেবা-সহযোগিতার মতো এই মহত্ গুণটি যদি আমরা ব্যক্তি, পরিবার, সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অনুসরণ করি, তাহলে সমাজের উঁচু-নিচু ভেদাভেদ তথা শান্তি-শৃঙ্খলায় আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে। পরোপকারে রয়েছে আত্মিক তৃপ্তি, পরিবার, সমাজ এবং দেশের মঙ্গল। আমাদের মহানবী হজরত রাসুলে মকবুল (সা.) একটি কথা বিশেষভাবে হাদিসে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, প্রতি মানুষকে তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দিয়ে, জ্বালাতন না করে এবং উপোস না রেখে বিপদে-আপদে, দুঃখে-কষ্টে, শোকে-দুঃখে একে অপরের প্রতি সমবেদনা-সহানুভূতিতে এগিয়ে আসা মানবিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। অতএব আমরা যেন পরিবার, সমাজ, দেশের শত কোটি মানুষের সঙ্গে আচার-আচরণে, সাহায্য-সহযোগিতা ও সহানুভূতিতে এবং পরোপকারী মন-মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসি।

মানবিক সহজাত গুণাবলির মধ্যে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতা বা পরোপকার অন্যতম গুণ। এই মহৎ ও সুন্দর গুণটি যার মধ্যে বিদ্যমান, তিনি সমাজ তথা রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে উত্তম কাজের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। তাই ইসলামে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতাকে সর্বোত্তম কাজ বলে অভিহিত করা হয়েছে এবং মানবতার মঙ্গল সাধনে এই গুণটির গুরুত্ব অত্যধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমরা বিভিন্নভাবে মানব ও মানব সমাজের উপকার সাধন করতে পারি। এই উপকার বা সেবাদান কায়িক পরিশ্রম বা আর্থিক সাহায্য কিংবা সৎ পরামর্শ দ্বারাও হতে পারে। একথা স্মরণীয়, মহৎ লোকেরা বরাবরই পরের কল্যাণ সাধনে নিজেদের উৎসর্গ করেন। যাঁরা নিজেদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে পারেন_তাঁরাই শুধু এই মহৎ কাজটি পুরোপুরি সমাধা করতে পারেন। পক্ষান্তরে মহত্ত্বের এই গুণটি যাঁর মধ্যে নেই তিনি কস্মিনকালেও একে অপরের প্রতি সহানুভূতির কাজটি করতে পারেন না।
ইসলামে পরোপকারের কথা বারবার গুরুত্বসহকারে বলা হয়েছে। দান-সাহায্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সুরা আল বাকারায় এরশাদ করা হয়েছে_’তোমাদের দান-সদকা, সাহায্যগুলো প্রকাশ্যে করো_তাও ভালো। তবে যদি গোপনে অভাবীদের দাও তাহলে তোমাদের জন্য এটিই বেশি ভালো।’ এ ছাড়া আল কোরআনে আরো বলা হয়েছে_’ওয়া আম্মাস সায়িলা ফালা তানহার’ অর্থাৎ ‘কোনো গরিব-দুঃখীজন কিছু চাইলে তাকে ধমক দিয়ে ফিরিয়ে দিও না।’
পূর্ণাঙ্গ মানুষের মূর্ত প্রতীক আমাদের প্রিয় নবী করিম (সা.)-এর জীবনে আমরা পরোপকারের দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। তাঁর অন্তঃকরণ ছিল সমবেদনা ও পরোপকারের আকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ। অকথ্য নির্যাতন ও অসহনীয় দুঃখকষ্টেও তাঁর ধৈর্য ছিল সীমাহীন। তাঁকে যারা কষ্ট দিত, তাদেরও তিনি ঔদার্যের মাধ্যমে শিক্ষা দিতেন। যারা তাঁকে বঞ্চিত করত তাদের তিনি অকাতরে দান-সাহায্য করতেন।
তিনি রোগব্যাধি ও দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের সেবা, যত্ন-আত্তি করে শান্তি পেতেন। রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের তিনি সেবা, সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো পীড়িত ব্যক্তিকে দেখতে পথচলা শুরু করে, সে যেন আল্লাহর রহমতের দরিয়ায় সাঁতরাতে থাকে। যখন রোগীর কাছে উপস্থিত হয় তখন রহমতের দরিয়ায় ডুবে যায়। তিনি আরো একটি হাদিসে বলেছেন, বিধবা ও দারিদ্র্যের সেবক আল্লাহর পথে যোদ্ধার তুল্য। ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও, পীড়িতদের সেবা করো এবং বন্দিদের মুক্তি দাও, এটাই ছিল তাঁর আহ্বান।
মক্কার এক বুড়ি প্রতিদিন হজরত রাসুলে করিম (সা.)-এর যাতায়াতের পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন। হঠাৎ একদিন রাসুলে করিম (সা.) দেখলেন পথে কাঁটা নেই, খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন সেই বুড়ি রোগাক্রান্ত হয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী।
আল্লাহর রাসুল (সা.) এই খবর শোনামাত্র ছুটে গেলেন বুড়ির বাড়িতে এবং মহানবী (সা.) সেবা-শুশ্রূষা, যত্ন-আত্তি করে ওষুধপত্র খাইয়ে বুড়িকে সুস্থ করে তুললেন। আল্লাহর নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর এই উদার ব্যবহার ও কর্মকাণ্ডে বুড়ি অনুশোচনায় নিজেকে ধিক্কার দিলেন। আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর এমন মহৎ ও উন্নত মনমানসিকতার বিরল দৃষ্টান্ত।
ইসলামে একে অপরের প্রতি সহানুভূতি অর্থাৎ পরোপকারের বহু উল্লেখযোগ্য নজির রয়েছে। আমরা হজরত ওমর (রা.)-এর কথা অনেকেই জানি। তিনি ছিলেন বিশাল সাম্রাজ্যের খলিফা। তিনিও অতি সহজ-সরলভাবে জীবন নির্বাহ করতেন। সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর ছিল অতি মহানুভব-পরোপকারী হৃদয়। এক রাতে তিনি নগরীর শহরতলির আশপাশে ঘুরে যখন একটি ক্ষুধার্ত পরিবারের শূন্য হাঁড়িতে পানি জ্বাল দেওয়ার দৃশ্য অবলোকন করলেন তখনই হজরত ওমর (রা.) ছুটে যান সরকারি গুদামে_সেখান থেকে তিনি বয়ে নিয়ে এলেন আটার বস্তা। গৃহকর্ত্রী খলিফার এমন দয়া ও সহানুভূতি দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন।
পরোপকারের এই অপূর্ব ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
অতএব, পরোপকারের মতো একে অপরের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতার গুণটি যদি আমরা অনুশীলন করি তবে আমাদের সমাজের উঁচু-নিচু ভেদাভেদ থাকবে না, সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধিতে আমূল শান্তিময় পরিবেশ ফিরে আসবে সন্দেহ নেই। শুধু তাই নয়, এতে রয়েছে আত্দিক তৃপ্তি। আবার লক্ষ করুন, আমাদের মহানবী (সা.) বলেছেন, যে প্রতিবেশীকে উপোস রেখে পেটপুরে খায় সে মুমিন নয়।
আসুন, আমরা যেন মানবিক কল্যাণে-মঙ্গলে একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল, সহমর্মিতা এবং সমবেদনায় একাত্দ হয়ে সমাজ সংসারে স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারি। দেশের সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধিকরণে যেন ধর্মীয় মূল্যবোধকে নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে পার।

হৃদয়ের কোমলতা

কোমল হৃদয় মানুষের গুণ-বৈশিষ্ট্যের এক অন্যতম অলংকার। বিশ্বমানবতার শ্রেষ্ঠতম মহামানব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। তিনি মানুষের সাথে খুবই নম্র ব্যবহার করতেন। তাঁর সহচর কেউ এমন কোনো ঘটনার কথা মনে করতে পারেন না যেখানে তিনি তাঁদের সাথে কর্কশ ভাষায় কথা বলেছেন বা তাঁদেরকে আঘাত দিয়েছেন। তিনি তাঁর নম্রতার জন্য সুপরিচিত ছিলেন।

মহান আল্লাহ এই গুণটিকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছেন:
আল্লাহর দয়ার কারণেই তুমি তাদের প্রতি নম্র। যদি তুমি রূঢ় ও কঠিন-হৃদয় হতে, তাহলে তারা তোমার কাছে থেকে দূরে সরে যেতো। সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৫৯

নবীদের বৈশিষ্ট্য ছিল এটাই এবং এই বৈশিষ্ট্য তাদেরও অবশ্যই অর্জন করতে হবে যারা মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকে। এটি আল্লাহর দিকে মানুষকে আহবানকারীদের জন্য অত্যাবশ্যকীয়। যারা জ্ঞানের সন্ধানী তাদের জন্যও এটি খুবই দরকারি, প্রয়োজন সব মানুষের জন্যই।

নবী করীম সা: বলেছেন, যে অন্যকে দয়া করে না সে দয়া পাবে না যে পরিবারের লোকেরা পরস্পরের প্রতি দয়ালু ও ক্ষমাশীল, সে ঘর সুখ ও আনন্দে ভরা থাকে।

দয়া এমন একটি জিনিস – যা ছাড়া আমরা বাঁচতে পারি না। যারা জ্ঞানের সন্ধানী তারা যদি কোমল হৃদয়ের অধিকারী না হন, তবে জ্ঞানের সৌন্দর্য উপভোগ করা তাদের সম্ভব হয় না। যেমন হাসান আল-বসরী বলেছেন, যদি কেউ জ্ঞান অনুসন্ধান করে, তা তার চেহারা, হাত ও জিহবায় এবং আল্লাহর প্রতি তার বিনয়ে প্রকাশ পাবে

এর বিপরীত কথাটিও সত্য যে, কোনো কিছুই জ্ঞানকে এবং ইসলামের প্রতি আহবানের কাজকে ততটা নষ্ট করে না যতটা করে হৃদয়ের কাঠিন্য। যেখানে হৃদয় কঠিন হয়ে যায়, সেখানে জ্ঞান ব্যক্তির নিজেরও কোনো কাজে লাগে না, আর সে তা দিয়ে অন্যেরও উপকার করতে পারে না।

হৃদয়ের কোমলতা সত্যিকার মুসলিমের বৈশিষ্ট্য। এর অনুপস্থিতিতে জীবন দুর্ভোগ ও অশান্তিতে ভরে যায়। এটা আল্লাহর ওয়াদা। যাদের হৃদয় কোমল নয় তারা এক অস্বস্তিকর জীবন লাভ করবে। মহান আল্লাহ বলেন:

যাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণের ব্যাপারে কঠোর, তাদের জন্য দুর্ভোগ। সূরা আয-যুমার, ৩৯:২২

তারা সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতার মধ্যে রয়েছে। তাদের জন্য দুর্ভোগ যারা কুরআন শুনে, কিন্তু তারপরও তারা ভীত ও বিনীত হয় না। দুর্ভোগ তাদের জন্য যাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিলেও আল্লাহর ভয়ে তাদের অন্তর এতটুকু কেঁপে ওঠে না। দুর্ভোগ তাদের জন্য যাদের কাছে আল্লাহর সতর্কবাণী পৌঁছানোর পরও তারা তাঁর বাণীর প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয় না।

কঠিন-হৃদয় বিশিষ্ট হওয়া একটি অভিশাপ। আর হৃদয়ের নম্রতা সৌভাগ্যের কারণ। জীবনের সকল কাম্য বস্তুর অধিকারী হলেও কঠিন হৃদয়-সম্পন্ন ব্যক্তি কষ্ট ভোগ করে। আপাত দৃষ্টিতে সুখময় মনে হলেও তা এক শূন্য জীবন – একাকীত্বে পরিপূর্ণ। তারা অন্তরে শান্তি পায় না, কারণ তাদের অন্তর আল্লাহর প্রতি কঠিন – আল্লাহকে বিশ্বাসের ব্যাপারে ও তার আনুগত্যের ব্যাপারে। সেজন্যই মহান আল্লাহ বলেছেন:

যারা বিশ্বাস করে, এবং যাদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে তৃপ্তি লাভ করে; নিঃসন্দেহে আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়সমূহ শান্তি লাভ করে। সূরা রা’দ, ১৩:২৮

শারীরিকভাবে সুস্থ ও পরিতৃপ্ত জীবন যাপনের এক অন্যতম উপাদান হচ্ছে একটি কোমল হৃদয়। চলুন আমরা এই অমূল্য সম্পদটি অর্জন ও লালনে সচেষ্ট হই।
হে আমাদের মহান প্রতিপালক! তুমি আমাদেরকে জ্ঞান দান করো!
আমাদের হৃদয়গুলোকে তুমি কোমল করে দাও!

মৃত্যুর মুখে অপূর্ব ভ্রাতৃত্ব

ইসলাম মানবতার মুক্তি ও কল্যাণের জন্য আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত একমাত্র জীবনাদর্শ। ইসলাম প্রদর্শন করেছে তার অনুসারীদের জন্য সঠিক পথ। ইসলামে রয়েছে অধিকার ও কর্তব্যের সুন্দর সমন্বয়। সবাইকে দেয়া হয়েছে তার প্রাপ্য অধিকার। ইসলাম যেসব হক বা অধিকার দিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো, এক মুসলমান ভাইয়ের ওপর অন্য মুসলমান ভাইয়ের হক।

মুসলিম জাতি আজ স্রোতে ভাসা খড়কুটার মতো মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। মুসলমানদের কাতার আজ হয়ে গেছে খণ্ড-বিখণ্ড। তারা হয়ে পড়েছে শতধা বিভক্ত। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে আজ ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক (তাআ‘উন তথা) সহযোগিতার পবিত্র বন্ধন। ফলে ঠিক দলচ্যুত মেষের মতোই তারা আজ শিকারে পরিণত হচ্ছে নানা জাতি ও গোত্র-সম্প্রদায়ের। 

বর্তমানে মুসলিম উম্মাহ লাঞ্ছনাকর ও অপমানজনক অবস্থায় কালাতিপাত করছে। এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে ঈমান ও তাকওয়ার উত্তাপ হ্রাস পাওয়া এবং আল-উখুওয়াহ ফিল্লাহ তথা ইসলামী ভ্রাতৃত্বের অভাবে। ‘আল-উখুওয়াহ ফিল্লাহ’ হচ্ছে, তাওহীদের নিখাঁদ বাঁধন এবং পূর্ণাঙ্গ এক ঐক্য চেতনা। এই নিখাঁদ, পূর্ণাঙ্গ ও পরিব্যাপ্ত চেতনা ছাড়া বাস্তবে এই ভ্রাতৃত্বের বাঁধনকে পুনর্জীবন দান করা কিছুতেই সম্ভব নয়। যেমন এই ভ্রাতৃত্বচেতনা মুসলমানদের প্রথম জামাতকে মেষের রাখাল থেকে বিভিন্ন দেশ ও জাতির নেতা ও পরিচালক বানিয়ে দিয়েছিল। এ রূপান্তর ও পরিবর্তন তখনই সূচিত হয়েছিল যখন তাঁরা পূর্ণাঙ্গ ও পরিব্যপ্ত আকীদার বুনিয়াদে গড়া এই ভ্রাতৃত্বকে তাঁদের কর্ম ও জীবন পদ্ধতিতে বাস্তবে রূপায়িত করেছিলেন। এই উজ্জ্বল ও দ্যুতিময় চিত্র সেদিন ভাস্বর হয়ে উঠেছিল, রাসূলুল্লাহু সা. প্রথম যেদিন মক্কায় তাওহীদের অনুসারীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের উদ্বোধন করেছিলেন। বর্ণ ও গোত্র এবং ভাষা ও ভূমির ভিন্নতা সত্ত্বেও তাঁদের মধ্যে বপণ করেছিলেন এক অভূতপূর্ব ভ্রাতৃত্ব ও একতার বীজ। ভ্রাতৃত্বের এক সুতোয় বেঁধেছিলেন তিনি কুরাইশ বংশের হামযা, গিফারী বংশের আবূ যর আর পারস্যের সালমান, হাবশার বিলাল ও রোমের সুহাইব রা. প্রমুখকে। একতা ও ভালোবাসার বাঁধনে জড়িয়ে তাঁরা সবাই যেন অভিন্ন কণ্ঠে আবৃত্তি করছিলেন পবিত্র কুরআনের এ আয়াত :

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপোষ-মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে। (সূরা হুজুরাত-১০)

রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ মুমিন হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজের জন্য যা ভালবাসে তার ভাইয়ের জন্য তা ভালবাসবে। (বুখারী, কিতাবুল ঈমান)

ইয়ারমুক যুদ্ধের বিশাল ময়দান। এক প্রান্তে ক্ষুদ্র মুসলিম সেনাদল আর অপর প্রান্তে রোমক দলের বিশাল সৈন্য বাহিনী। উভয় দলই ভয়াবহ এক যুদ্ধের মুখোমুখি দন্ডায়মান। যুদ্ধ শুরুর পূর্ব মুহূর্তে আবূ ওবাইদাহ, মু‘আয বিন জাবাল আমর ইবনুল আছ, আবূ সুফিয়ান, আবু হুরায়রাহ প্রমুখ সাহাবী সৈন্যদের উদ্দেশ্যে হৃদয়গ্রাহী উপদেশ দেন। আবূ ওবাইদাহ উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো, আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন এবং পদযুগলকে স্থির করবেন। হে মুসলিম সেনাবাহিনী! তোমরা ধৈর্যধারণ করো। কেননা ধৈর্য কুফরী থেকে বাঁচার, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের এবং লজ্জা নিবারণের উপায়। তোমরা তোমাদের যুদ্ধের সারি থেকে সরে দাঁড়াবে না। কাফেরদের দিকে এক ধাপও অগ্রসর হবে না এবং আগ বেড়ে তাদের সাথে যুদ্ধের সূচনা করবে না। শত্রুদের দিকে বর্শা তাক করে থাকবে এবং বর্ম দিয়ে আত্মরক্ষা করবে। তোমাদেরকে যুদ্ধের নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তোমরা মনে মনে আল্লাহর যিকির করতে থাকবে।

যুদ্ধ শুরু হ’ল এবং প্রচন্ড আকার ধারণ করল। যুদ্ধের সময় হুযায়ফা রা.  আহতদের মধ্যে তার চাচাতো ভাইকে খুঁজতে শুরু করলেন। তার সাথে ছিল সামান্য পানি। হুযায়ফার চাচাতো ভাইয়ের শরীর দিয়ে রক্ত ঝরছিল। তার অবস্থা ছিল আশংকাজনক। হুযায়ফা রা. তাকে বললেন, তুমি কি পানি পান করবে? সে তার কথার কোন উত্তর দিতে সক্ষম না হয়ে হ্যা সূচক ইঙ্গিত করল। আহত ব্যক্তি হুযায়ফার কাছ থেকে পানি পান করার জন্য হাতে নিতেই তার পাশে এক সৈন্যকে পানি পানি বলে চিৎকার করতে শুনল। পিপাসার্ত ঐ সৈনিকের বুকফাটা আর্তনাদ শুনে তার পূর্বে তাকে পানি পান করানোর জন্য হুযায়ফাকে ইঙ্গিত দিলেন। হুযায়ফা তার নিকট গিয়ে বললেন, আপনি কি পানি পান করতে চান? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি পান করার জন্য পাত্র উপরে তুলে ধরতেই পানির জন্য অন্য একজন সৈন্যের চিৎকার শুনতে পেলেন। তিনি পানি পান না করে হুযায়ফা রা.-কে বললেন, তার দিকে দ্রুত ছুটে যাও এবং সে পানি পান করার পর কিছু অবশিষ্ট থাকলে আমাকে দিয়ো। হুযায়ফা আহত সৈন্যটির কাছে গিয়ে দেখলেন, সে মারা গেছে। অতঃপর দ্বিতীয় জনের কাছে এসে দেখলেন সেও মারা গেছে। অতঃপর চাচাতো ভাইয়ের কাছে ফিরে আসলে দেখেন তিনিও শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করে জান্নাতবাসী হয়েছেন। পানির পাত্রটি তখনও হুযায়ফার হাতে। এতটুকু পানি। অথচ তা পান করার মত এখন আর কেউ বেঁচে নেই। যাদের পানির প্রয়োজন ছিল তারা আরেক জনের পানির পিপাসা মেটাবার জন্য এতই পাগলপরা ছিলেন যে, অবশেষে কেউ সে পানি পান করতে পারেননি। সবারই প্রাণ ছিল ওষ্ঠাগত। অসামান্য ভ্রাতৃত্ব ও মমত্ববোধের কারণে সবাই একে অপরের জন্য পানি ফিরিয়ে দিয়েছেন। কি অপূর্ব এ ভ্রাতৃত্ব!

সূত্র : আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ

ইসলামে সমাজসেবার গুরুত্ব

 

মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে সমাজের প্রতি তার কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। নিজের অর্থ-সম্পদ সমাজের লোকদের জন্য অকাতরে খরচ করেন এমন সমাজ সেবক, শিক্ষানুরাগী, দানশীল ব্যক্তির সংখ্যা কিন্তু কম নয়। অর্থ-সামর্থ্য না থাকলেও মানুষকে উপদেশ বিলিয়ে থাকেন এমন মহৎ ব্যক্তিও আমাদের সমাজে আছেন। নিজের যোগ্যতা, অর্থ-সামর্থ্য ও বিচার-বুদ্ধি দিয়ে আমাদের যেমনি অন্যের উপকারে এগিয়ে আসতে হবে, তেমনি ধর্মীয় ব্যাপারেও নিজেরসহ অন্যের হিত কামনায় কাজ করতে হবে। আমরা যারা বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করছি এবং এ ক্ষেত্রে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাকে প্রাধান্য দিচ্ছি তারা এর সাথে আরো একটি মহৎ ও স্থায়ী কাজকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। কী সেই মহৎ ও স্থায়ী কাজ? আল্লাহও আখীরাত বিশ্বাসীদের জন্য সে কাজটি হচ্ছে ধর্মীয় কাজ। অর্থাৎ আগের সব সেবাগুলো ঠিকই থাকবে শুধু এ সাথে যোগ হবে ধর্মীয় কিছু সেবা। একজন নিঃস্ব-নিরীহ লোককে ক্ষুধা-তৃষ্ণার যন্ত্রণা আর রোদ্র-বৃষ্টি ও শীতের কষ্ট থেকে এতে যেমনি বাঁচানো যাবে, তেমনি তাকে রক্ষা করা যাবে চিরস্থায়ী জাহান্নামের কঠিন আজাব থেকে। অন্যভাবে বলা যায় অসহায় মানুষটির সাময়িক অস্থায়ী উপকারের পাশাপাশি স্থায়ী উপকারের ব্যাপারেও আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে, তাকে ধর্ম পালনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, বুঝাতে হবে। একাজগুলো আমাদের ওপর আরোপিত দায়িত্ব ও বটে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা ভালো ও আল্লাভীতিমূলক কাজে, আল্লাভীতির পথে একে অপরকে সহযোগিতা কর।(সূরা মায়িদা-২)
ধর্ম আর ধর্মীয় সেবা কী? রাসূল সাঃ বলেন, ধর্ম হচ্ছে শুভ কামনা/উপদেশ/পরামর্শ (তিন বার তিনি কথাটি বলেছেন)। আমরা (সাহাবীগণ রাঃ) বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্য, তাঁর কিতাবের জন্য, তাঁর রাসূলের জন্য, মুসলমান নেতৃবৃন্দের জন্য এবং সব মুসলমানের জন্য (মুসলিম) সমাজ সেবার পাশাপাশি ধর্মীয় সেবায় আমাদের প্রতি রাসূল সাঃ সুস্পষ্ট নির্দেশ হচ্ছে, আমার পক্ষ থেকে একটি বাক্য হলেও পৌঁছে দাও। জাগতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের পাশাপাশি সময়-সুযোগ করে আমাদের ধর্মীয় পড়া পড়তে হবে, জানতে হবে, বলতে হবে, জানাতে হবে, লিখতে হবে ও প্রচার করতে হবে। তা না হলে বিবেকের কাঠগড়ায় যেমনি আসামি হতে হবে, একইভাবে আসামি হতে হবে ধর্মের কাঠগড়ায়ও। কারণ রাসূল সাঃ বলছেন, যেসব লোক এমন কোনো বৈঠকে অংশ গ্রহণের জন্য ওঠে আসে যেখানে আল্লাহর নাম স্বরণ করা হয় না (ধর্মের কথা মোটেই বলা হয় না) তারা যেন মৃত গাধার লাশের স্তূপ থেকে ওঠে আসে। এরূপ মজলিস তাদের জন্য আফসসের কারণ (মুসলিম) যদি কোনো দল কোনো বৈঠকে বসে আল্লাহর জিকির না করে এবং তাদের নবীর ওপর দরূদ ও পাঠ না করে (কুরআন ও হাদীসের কথা না বলে, ধর্মের কথা স্বরণ না রাখে) তাহলে তাদের সে বৈঠক তাদের পক্ষে হতাশার কারণ হবে। আল্লাহ ইচ্ছে করলে তাদের শাস্তি দিবে অথবা তাদের ক্ষমা করবেন। (আবু দাউদ, আহমদ)

মিথ্যা সব পাপ-গুনাহের জননী – حكم الكذب في الإسلام

মিথ্যা একটি চারিত্রিক ব্যাধি, মিথ্যা বলা, মিথ্যাচার জঘন্যতম ঘৃণিত অভ্যাস। মিথ্যা বলার চেয়ে অপরাধ আর নেই। তাই মিথ্যাবাদীকে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল আদৌ পছন্দ করেন না। পবিত্র কোরআনে মিথ্যুক এবং মিথ্যাবাদীর ভয়ানক পরিণতির কথা বলা হয়েছে। মিথ্যা বলার পাপ অতিমারাত্মক। মিথ্যা ভাষণ, মিথ্যাচারের ঘৃণ্যতা ও দুরবস্থার কথা হযরত রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্ণনা করেছেন। মিথ্যা ভাষণে, মিথ্যাচারে যে বা যারা অভ্যস্ত থাকে, কোনো মানুষ কোনো দিন তার সামান্য কথা, উক্তি বিশ্বাস করে না, কেননা এসব লোকের খপ্পরে পড়লে প্রতারিত হতে হয়। মিথ্যা বিষয়টি এমনই একে সত্য বলে প্রমাণ করতে গিয়ে হাজারও ছলচাতুরি এবং আরও বহু মিথ্যা কথা বলার প্রয়োজন হয়। মিথ্যা এমনই এক বদঅভ্যাস যার মধ্যে মিথ্যা বলার প্রবণতা ঢুকেছে আর উপায় নেই। পরিত্যাগ করা বড়ই কঠিন। মিথ্যুক, মিথ্যা ভাষণ, মিথ্যাচার করে যারা বেড়ায় তারা সংসারে, পরিবারে, সমাজে এবং দেশে মহাদুর্যোগ সৃষ্টি করতে পারে। মিথ্যুকের মিথ্যা বলার খপ্পরে পড়ে অনেক নিরীহ মনুষ প্রতারিত হয়েছে, ঠকেছে এবং মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছে। মিথ্যাবাদীর ওপর মহান আল্লাহ পাকের অভিশাপ বর্ষিত হয়।

যে বা যারা মিথ্যা বলার অভ্যাস করেই ক্রমে তার মানসিক শক্তি এবং সত্ সাহস লোপ পেতে আরম্ভ করে, সত্য কথাকে যেমন আল্লাহ তা’আলা অসম শক্তি দান করেছেন, আবার মিথ্যাকে অত্যন্ত দুর্বল ও মানুষের কাছে ঘৃণিত পরিত্যাজ্য করে দিয়েছেন। এ জন্যই সত্য কথা, ভাষণ সদা সবল, ডর-ভয় নেই। আপন সত্যবাদিতায় বলীয়ান এবং আল্লাহর প্রাপ্ত ব্যক্তি। মিথ্যা বলা সব পাপাচারের মূল। যে মিথ্যাকে বর্জন করে সে কোনোরূপ পাপই করতে পারে না। একবার এক নামকরা পাপিষ্ঠ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে আরজ করল ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি এমন এক ব্যক্তি, আমার মধ্যে এমন কোনো অন্যায়-অপরাধের কাজ নেই যা আমার দ্বারা সাধিত হয়নি। এখন বলুন, হে আল্লাহর রাসুল! (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমি কীভাবে কী উপায়ে এ চরম পাপাসক্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি। এ থেকে মুক্তি বা নাজাত পেতে পারি। রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকটির কথা শুনে বুঝলেন, সত্যি সত্যি লোকটি সত্যের পথে আসার উপায় খুঁজছে। রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও ভাবলেন, লোকটির মধ্যে যত রকমের অন্যায় কাজ রয়েছে, যদি ওইগুলোকে একই সঙ্গে বর্জন করতে নির্দেশ দেয়া হয় তবে তার পক্ষে তা এক সঙ্গে বর্জন করা সম্ভব হবে না। অতএব এর মধ্য থেকে তাকে প্রথমত একটি অসত্য কথা, মিথ্যাচার একটি পাপই বর্জন করতে বলি। এরূপ স্থির করে রাসুলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার চিন্তার কোনো কারণ নেই। এখন আপাতত তুমি তোমার মধ্যে থেকে একটি কাজই বর্জন করো। আশা করি এতেই তোমার সত্ উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে। অতএব তুমি আজ থেকে মিথ্যা কথা পরিহার কর। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। লোকটি রাসুলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই সংক্ষিপ্ত নিষেধ বাক্য খুশি হয়ে এবং বিষয়টি অতি সহজসাধ্য মনে করে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করল যে, হ্যাঁ আজ থেকে আর মিথ্যা কথা বলব না। অতঃপর সে রাসুলের কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দরবার থেকে বিদায় গ্রহণকালে বললেন, আপনি আগামীকাল জানতে পারবেন রাত-দিনের সব কথা ও কাজের হিসাব জানিয়ে দেবেন। এতটুকু মিথ্যা আছে কিনা? অতঃপর লোকটি নিজের বাড়ি যাওয়ার পর যখন নামাজের ওয়াক্ত হলো, তখন তার মনে চিন্তার উদয় হলো যে, এতদিন তো আমি নামাজের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই রাখিনি। এখন যদি আল্লাহর নবী মোহাম্মদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে যাই আর যদি মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করে বসেন যে তুমি কাল নামাজ পড়েছিলে কিনা? লোকটি আল্লাহর নবী, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট জবাবদিহিতার ভয়ে আতঙ্কে ওয়াক্ত মতো নামাজ আদায় করল। লোকটির আর একটি বদঅভ্যাস ছিল, রাতের একটি নির্দিষ্ট সময় শরাব (মদ) পান করত। হঠাত্ করে রাতে তার শরাব পানের নির্দিষ্ট সময় এলে তখনই মনে পড়ে গেল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে ওয়াদা-প্রতিজ্ঞা করার কথা। এসব কথা চিন্তা করে শরাবের গ্লাস ছুড়ে ফেলল। আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) জানতেন যে, মিথ্যা বলা এমনই এক অভ্যাস, তা পরিত্যাগ করতে পারলে সঙ্গে সঙ্গে অন্য সব পাপ থেকে দূরে থাকা যায়। এ জন্যই মিথ্যাকে সব পাপ-গুনাহের জননী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মোট কথা, মিথ্যাই সব ধরনের অপরাধে উত্সাহ-প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। মিথ্যাচার না থাকলে অন্য কোনো ধরনের অসত্ কর্ম বা পাপের কাজ করতে পারে না। অতএব আসুন, আমরা সদাসর্বদা কথা ও কাজে সততা বজায় রেখে আল্লাহ তা’আলার প্রিয় বান্দা হই।

মিথ্যার ক্ষতিসমূহ : (মিথ্যা বলা হারাম) আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন : মিথ্যা তো তারাই বানায় যারা আল্লাহর নিদর্শন সমূহের ওপর ঈমান রাখে না। বস্তুত তারাই মিথ্যুক। (সূরা নাহাল-১০৫)

২. আবুহুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : মুনাফেকদের নিদর্শন তিনটি : কথা বলার সময় মিথ্যা বলা, ওয়াদা করে ভঙ্গ করা এবং আমানতের মধ্যে খেয়ানত করা। (বুখারী, মুসলিম)

বেচাকেনায় মিথ্যা বলা : সাহাবী আবুযর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : কেয়ামতের দিন তিন জন ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ কথা বলবেন না এবং তাদের দিকে তাকাবেন না এবং সংশোধন করবেন না, আরো তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। আবুযর বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথাগুলো তিনবার বললেন। আবুযর বলেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত, তারা ধ্বংস প্রাপ্ত, তাদের পরিচয় কি হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী, উপকার করে খোটা প্রদানকারী ব্যক্তি ও মিথ্যা কসমের মাধ্যমে বিক্রয়কারী ব্যক্তি। (মুসলিম)

স্বপ্নের ব্যাপারে মিথ্যা বলা হারাম : কেউ কেউ স্বপ্নে কিছু না দেখেও বলে যে, আমি স্বপ্নে এমন এমন দেখেছি, অতঃপর মানুষের কাছে তা বলে বেড়ায়। ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি স্বপ্ন না দেখেও স্বপ্ন দেখার ভান করবে, তাকে দু’টি গমের মাঝে গিরা দিতে বলা হবে, অথচ তা সে করতে সক্ষম হবে না। আর যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের কথা কান পেতে শোনল, অথচ তারা তাকে তা শোনাতে চায়নি, তার কানে কেয়ামতের দিন শিশা ঢালা হবে, যে ব্যক্তি ছবি অঙ্কন করবে কেয়ামতের দিন তাকে শাস্তি দেয়া হবে এবং তাকে বলা হবে তাতে রুহ সঞ্চার করতে, অথচ তা করতে সে সক্ষম হবে না। (বুখারী)

সব শোনা কথা বলাও হারাম : হাফস বিন আসেম থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনে : ব্যক্তির মিথ্যুক হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনবে তাই বলবে। (মুসলিম)

সব চেয়ে ঘৃণিত হচ্ছে হাসি-মসকরাচ্ছলে মিথ্যা বলা : অনেকে ধারণা করে যে হাসি-রসিকতায় মিথ্যা বলা বৈধ। এটা ভুল ধারণা, এর কোন ভিত্তি নেই ইসলাম ধর্মে। রসিকতা কিংবা স্বাভাবিক অবস্থায়, মিথ্যা সর্বাবস্থায় হারাম।

ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : আমি রসিকতা করি ঠিক, তবে সত্য ব্যতীত কখনো মিথ্যা বলি না। (তাবরানি, সহীহ আল-জামে)

বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলাচ্ছলে মিথ্যা বলা : বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলাতেও মিথ্যা থেকে বিরত থাকা জরুরী। কারণ, এটা বাচ্চাদের অন্তরে গেঁথে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।

লোক হাসানোর জন্য মিথ্যা বলা : মুয়াবিয়া বিন হাইদা বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শোনেছি : ধ্বংস তার জন্য যে, লোক হাসানোর জন্য কথা বলে এবং তাতে সে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। ধ্বংস তার জন্য, ধ্বংস তার জন্য। (তিরমিজী, আবুদাউদ)

মিথ্যার পরিণাম : মিথ্যা বলার পরিণাম খুবই ধ্বংসাত্মক। এর জন্য দুনিয়াতে রয়েছে ধ্বংস আর আখেরাতে রয়েছে অপমান ও লাঞ্ছনা। নিম্নে কয়েকটি তুলে ধরা হল :

ক. মিথ্যার কারণে অন্তরে কপটতার সৃষ্টি হয়।

খ. মিথ্যা পাপাচার ও জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।

গ. মিথ্যুকদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না।

ঘ. মিথ্যার কারণে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জাগতেই চেহারা বিবর্ণ ও মলিন হয়ে যায়।

ঙ. হাদীস দ্বারা প্রমাণিত মিথ্যুকের চোয়াল চিরে গর্দান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে। (বুখারী)

যেসব কারণে মিথ্যা বলা যায : তিন জায়গায় মিথ্যা বলা বৈধ। ১. যুদ্ধে মিথ্যা বলা বৈধ। ২. দু’গ্রুপের মাঝে সমঝোতা করার জন্য মিথ্যা বলা বৈধ। ৩. স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মিল-মহব্বত সৃষ্টি করার জন্যও মিথ্যা বলা বৈধ। (বুখারী, মুসলিম)

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সাদিকীনদের দলভুক্ত করুন। কথায়-কাজে-আচরণে আমাদের সবাইকে সততার পরিচয় দেয়ার তাওফীক দান করুন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপে সত্যাশ্রয়ী হয়ে জীবনযাপনের তাওফীক দান করুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে মিথ্যা থেকে হিফাযত করুন। কপটতা ও মুনাফিকী থেকে হিফাযত করুন। আমীন…

ঘরে প্রবেশের ইসলামী বিধান – الاستئذان لدخول البيوت

ইসলাম অসতবৃত্তির উতপত্তি ও অসত প্রবণতা রোধে অশ্লীলতা দমন এবং সতীত্ব সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন বিধান জারি করেছে, তন্মধ্যে অন্যতম বিধান হলো ঘরে প্রবেশ করার বিধান। জাহেলী যুগে আরববাসীদের নিয়ম ছিল, তারা (সুপ্রভাত, শুভসন্ধা) বলতে বলতে নিঃসঙ্কোচে সরাসরি একজন অন্যজনের গৃহে প্রবেশ করে যেত, অনেক সময় বহিরাগত ব্যক্তি গৃহমালিক ও তার বাড়ির মহিলাদের বেসামাল অবস্থায় দেখে ফেলত, আল্লাহ তা’আলা-এর সংশোধনের জন্য এ নীতিনির্ধারণ করেন, প্রত্যেক ব্যক্তির, যেখানে সে অবস্থান করে, সেখানে তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করার অধিকার আছে এবং তার সম্মতি ও অনুমতি ছাড়া গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করার অন্য কারো অধিকার নেই। তাই কারো গৃহে প্রবেশ করার আগে অনুমতি নেয়া ও সালাম দেয়ার বিধান জারি করে আল্লাহ তা’আলা আয়াত নাযিল করেছেন। ইরশাদ হচ্ছে : হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্যের গৃহে প্রবেশ কোরো না যতক্ষণ না গৃহবাসীদের সম্মতি লাভ করো এবং তাদের সালাম করো। এটিই তোমাদের জন্য ভালো পদ্ধতি, আশা করা যায় তোমরা এটাকে স্মরণ রাখবে। (সূরা আন-নূর-২৭)

অনুমতি চাওয়ার রহস্য ও উপকারিতা : আল্লাহ তা’আলা প্রত্যেক মানুষকে বসবাসের জায়গা দিয়েছেন। তা মালিকানাধীন হোক কিংবা ভাড়া করা হোক, সর্বাবস্থায় তার গৃহই তার আবাসস্থল। আবাসস্থলের আসল উদ্দেশ্য শান্তি ও আরাম। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে অমূল্য নেয়ামতরাজির উল্লেখ প্রসঙ্গে এ দিকে ইঙ্গিত করে বলেছে, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের গৃহে তোমাদের জন্য শান্তি ও আরামের ব্যবস্থা করেছেন। (সূরা নাহাল-৮০) এই শান্তি ও আরাম তখনই অক্ষুণ্ন থাকতে পারে, যখন মানুষ অন্য কারো হস্তক্ষেপ ছাড়া নিজ গৃহে নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ ও বিশ্রাম করতে পারে। তার স্বাধীনতায় বিঘ্ন সৃষ্টি করা গৃহের আসল উদ্দেশ্যকে পণ্ড করে দেয়ার নামান্তর। এটা খুবই কষ্টের কথা।

ইসলাম কাউকে অহেতুক কষ্ট দেয়াকে হারাম করেছে। অনুমতি চাওয়া সম্পর্কিত বিধানাবলীর বড় উপকারিতা হচ্ছে, প্রথম: মানুষের স্বাধীনতায় বিঘ্ন সৃষ্টি করা ও কষ্টদান করা থেকে আত্মরক্ষা করা, যা প্রত্যেকটি সম্ভ্রান্ত মানুষের যুক্তিসঙ্গত কর্তব্যও। দ্বিতীয়: স্বয়ং সাক্ষাতপ্রার্থীর। সে যখন অনুমতি নিয়ে ভদ্রজনোচিতভাবে সাক্ষাত করবে, তখন প্রতিপক্ষও তার বক্তব্য যত্নসহকারে শুনবে। তার কোনো অভাব থাকলে তা পূরণ করার প্রেরণা তার অন্তরে সৃষ্টি হবে। এর বিপরীতে অভদ্রজনোচিত পন্থায় কোনো ব্যক্তির ওপর বিনানুমতিতে চড়াও হয়ে গেলে সে তাকে অকস্মাৎ বিপদ মনে করে যত শিগগির সম্ভব বিদায় করে দিতে চেষ্টা করবে এবং হিতাকাড়ক্ষার প্রেরণা থাকলেও তা নিস্তেজ হয়ে যাবে। অপর দিকে আগন্তুক ব্যক্তি মুসলমানকে কষ্ট দেয়ার পাপে পাপী হবে। তৃতীয় : নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতা দমন। কারণ বিনানুমতিতে কারো গৃহে প্রবেশ করলে মাহরাম নয়, এমন নারীর ওপর দৃষ্টি পড়া এবং অন্তরে কোনো রোগ সৃষ্টি হওয়া আশ্চর্য নয়। এ দিকে লক্ষ করেই অনুমতি গ্রহণের বিধানাবলিকে আল-কুরআন ব্যভিচার, অপবাদ ইত্যাদি শাস্তির বিধিবিধান সংলগ্ন বর্ণনা করেছেন। চতুর্থ: এই যে, মানুষ মাঝে মাঝে নিজ গৃহের নির্জনতায় এমন কাজ করে, যে সম্পর্কে অপরকে অবহিত করা সমীচীন মনে করে না। যদি কেউ অনুমতি ব্যতিরেকে গৃহে ঢুকে পড়ে, তবে ভিন্ন লোক তার গোপন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে যায়। কারো গোপন কথা জবরদস্তি জানার চেষ্টা করাও গোনাহ এবং অপরের জন্য কষ্টের কারণ।

অনুমতি নেয়ার ইসলামী নীতি : দুটি কাজ না করা পর্যন্ত কারো গৃহে প্রবেশ করা যাবে না। প্রথমত, সম্মতি নেয়া। প্রবেশের পূর্বানুমতি লাভ দ্বারা প্রতিপক্ষ পরিচিত ও আপন হয়, সে আতঙ্কিত না হয়। দ্বিতীয়ত, গৃহের লোকদের সালাম করা, কোন কোন তফসিরকারক এর অর্থ এরূপ দিয়েছেন, প্রথমে অনুমতি নেবে, পরে গৃহে প্রবেশ করার সময় সালাম দিয়ে প্রবেশ করবে। প্রখ্যাত মুফাসসির কুরতুবী এ মতকে পছন্দ করেছেন। মাওয়ারিদ বলেন, যদি অনুমতি নেয়ার আগে গৃহের কোনো ব্যক্তির ওপর দৃষ্টি পড়ে, তবে প্রথমে সালাম করবে, এরপর অনুমতি নিয়ে গৃহে প্রবেশ করবে। নতুবা প্রথমে অনুমতি নেবে, পরে সালাম দিয়ে প্রবেশ করবে। অতএব সুন্নত নিয়ম হলো প্রথমে সালাম করবে অনুমতি নেয়ার জন্য, এ সালামের মাধ্যমে ঘরের লোকদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে। এরপর অনুমতি নিয়ে সালাম দিয়ে প্রবেশ করবে।

প্রথম প্রথম যখন অনুমতি নেয়ার বিধান জারি হয়, তখন লোকরা তার নিয়মকানুন জানত না, একবার এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে দরজা থেকে চিৎকার করে বলতে থাকে (আমি কি ভেতরে ঢুকে যাবো?) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাতাকে বললেন, এ ব্যক্তি অনুমতি চাওয়ার নিয়ম জানে না, বাইরে গিয়ে তাকে ঘরে প্রবেশ করার নিয়ম শিখিয়ে দাও, তাকে বলো সে যেন বলে আসসালামু আলাইকুম (আমি কি প্রবেশ করব?) খাদেম বের হওয়ার আগেই লোকটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা শুনে আসসালামু আলাইকুম (আমি কি প্রবেশ করব?) বলল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাতাকে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি দিলেন, লোকটি প্রবেশ করল। (আবু দাউদ)

অনুমতি চাওয়ার সঠিক পদ্ধতি হলো : নিজের নাম উল্লেখ করে অনুমতি চাইবে। হযরত ওমর (রাঃ)-এর ব্যাপারে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খিদমতে হাজির হয়ে তিনি বলতেন, আস্সালামু আলাইকুম। সালামের পর বলতেন, ওমর প্রবেশ করতে পারে কি? (আবু দাউদ) সহিহ মুসলিমে আছে হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রাঃ)-এর কাছে এলেন এবং অনুমতি চাওয়ার জন্য বললেন, আস্সালামু আলাইকুম। সালাম দিয়ে প্রথমে নিজের নাম আবু মূসা বলেছেন এরপর আরো নির্দিষ্টভাবে প্রকাশ করার জন্য আশআরী বলেছেন। এর কারণ এই যে, অনুমতি প্রার্থীকে না চেনা পর্যন্ত জবাব দেয়া যায় না।

অনুমতি চাওয়ার পর যখন ভেতর থেকে জিজ্ঞাসা করে কে? উত্তরে শুধু আমি বলা যাবে না, বরং এমন নাম বলতে হবে, যে নাম পরিচিত। শুধু আমি জিজ্ঞাসার জবাব নয়। খতীব বাগদাদী বর্ণনা করেন, আলী ইবনে আসেম বসরায় হযরত মুগীরা ইবনে শুবার সাক্ষাতপ্রার্থী হন। দরজার কড়া নাড়লেন। হযরত মুগীরাহ ভেতর থেকে প্রশ্ন করলেন কে? উত্তর হলো, আনা অর্থাত আমি। হযরত মুগীরা বললেন, আমার বন্ধুদের মধ্যে তো কারো নাম আনা নেই। এরপর তিনি বাইরে এসে তাকে হাদীস শুনালেন, একদিন জাবের ইবনে আবদুল্লাহ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপস্থিত হয়ে অনুমতির জন্য দরজার কড়া নাড়লেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাভেতর থেকে প্রশ্ন করলেন কে? উত্তরে জাবের বললেন, আনা অর্থাত আমি, এতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাতাকে শাসিয়ে বললেন, আনা আনা (আমি, আমি) বললে কাউকে চেনা যায় কি? (বোখারী, মুসলিম) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লা যখন মিরাজে গেলেন, প্রতি আকাশেই জিবরাঈল আলাইহিস্সালাম দরওয়াজা খুলে দেয়ার অনুমতি চাইলে ভেতর থেকে জিজ্ঞসা করা হলো, কে? উত্তরে জিবরাঈল নিজের নাম বলে দিলেন জিবরাঈল। (বুখারী, মুসলিম)

অনুমতি নেয়ার জন্য তিনবার ডাক দেয়ার বিধান রয়েছে। আবার তিনবার ডাকা একের পর এক হওয়া উচিত নয় বরং একটু থেমে থেমে হতে হবে। এর ফলে ঘরের লোকরা যদি কাজে ব্যস্ত থাকে এবং সে জন্য তারা যদি জবাব দিতে না পারে তাহলে সে কাজ শেষ করে জবাব দেয়ার সুযোগ পাবে। আবু মূসা আশআরী (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বলেছেন, অনুমতি চাইতে হবে তিনবার, যদি অনুমতি দেয় প্রবেশ করবে নতুবা ফিরে যাবে। (বোখারী, মুসলিম)। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হযরত সাদ বিন উবাদার বাড়িতে গেলেন এবং আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ বলে দুবার অনুমতি চাইলেন। কিন্তু ভেতর থেকে জবাব এলো না। তৃতীয়বার জবাব না পেয়ে তিনি ফিরে যেতে লাগলেন। হযরত সাদ ভেতর থেকে দৌড়ে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমি আপনার আওয়াজ শুনছিলাম, কিন্তু আমার মন চাচ্ছিল আপনার মুবারক কণ্ঠ থেকে আমার জন্য যতবার সালাম ও রহমতের দু’আ বের হয় ততই ভালো, তাই আমি খুব নিচুস্বরে জবাব দিচ্ছিলাম। (আবু দাউদ, আহমাদ) এমনি হযরত আবু মূসা আশআরী (রাঃ) হযরত ওমর (রাঃ)-এর কাছে প্রবেশ করার জন্য তিনবার অনুমতি চেয়ে অনুমতি না পেয়ে ফিরে গেলেন।

দ্বীন হচ্ছে উপদেশ দান ও অপরের কল্যাণ কামনা করা – الدين النصيحة

আন-নাসীহা বা নসীহত শব্দের অর্থ হল : উপদেশ দেয়া, কল্যাণ কামনা করা। যার কল্যাণ কামনা করা হয় তাকেই উপদেশ দেয়া হয়। নসীহতের বিপরীত হল : ধোঁকাবাজী, প্রতারণা, খেয়ানত, ষড়যন্ত্র, হিংসা-বিদ্বেষ ইত্যাদি। মানুষের বিবাদ মীমাংসা করাও একটি নসীহত।

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ۚ وَاتَّقُوا اللَّـهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ  ﴿الحجرات-١٠﴾

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন : মু’মিনগণ পরস্পর ভাই ভাই, অতএব তোমাদের ভাইদের মধ্যে সংশোধন-মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা অনুগ্রহ প্রাপ্ত হও। (সূরা হুজুরাত-১০)

أُبَلِّغُكُمْ رِسَالَاتِ رَبِّي وَأَنصَحُ لَكُمْ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّـهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ  ﴿الاعراف-٦٢﴾

আল্লাহ তা’আলা কুরআন মজীদে নূহ আলাইহিস সালামের বক্তব্য উল্লেখ করেছেন, নূহ আলাইহিস সালাম বলেছিলেন : আমি আমার প্রতিপালকের পয়গাম তোমাদের কাছে পৌছিয়ে দিচ্ছি, আর আমি তোমাদের উপদেশ দেই ও কল্যাণ কামনা করি। আর তোমরা যা জান না আমি তা আল্লাহর নিকট থেকে জেনে থাকি। (সূরা আ’রাফ-৬২)

أُبَلِّغُكُمْ رِسَالَاتِ رَبِّي وَأَنَا لَكُمْ نَاصِحٌ أَمِينٌ ﴿٦٨﴾

আল্লাহ তা’আলা আল-কুরআনে নবী হূদ আলাইহিস সালাম-এর বক্তব্য উল্লেখ করেছেন, হূদ আলাইহিস সালাম বলেছিলেন : আমি আমার প্রতিপালকের পয়গাম তোমাদের নিকট পৌছিয়ে দিচ্ছি, আমি তোমাদের জন্য বিশ্বস্ত কল্যাণকামী-উপদেশ দাতা। (সূরা আ’রাফ-৬৮)

উল্লেখিত আয়াতসমূহ থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল : (এক) ঈমানদারগণ একে অপরের ভাই, তাই তারা অবশ্যই পরস্পরের কল্যাণ কামনা করবে। এক ভাই তার অপর ভাইয়ের জন্য অকল্যাণ কামনা কখনো করে না বা করতে পারে না।

(দুই) সত্যিকার ভ্রাতৃত্ব হবে দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব। এটি রক্ত সম্পর্কীয় ভ্রাতৃত্বের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রক্ত সম্পর্কীয় ভ্রাতৃত্বের মধ্যে যদি দ্বীন না থাকে তবে সেটা আল্লাহর কাছে কোন ভ্রাতৃত্ব বলে স্বীকৃতি পায় না।

(তিন) মুসলিমরা যখন একে অপরের ভাই, তখন তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তা’আলা। এটা কল্যাণকামিতার একটি দিক।

(চার) সকল নবীই মানবতার কল্যাণ কামনা করেছেন। এ জন্য কল্যাণকামিতাই হল আসল ধর্ম।

عن أَبِي رُقيَّةَ تَميمِ بنِ أَوْس الدَّارِيِّ رضي اللَّه عنه ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وسَلَّم قَالَ : الدِّينُ النَّصِيحَةُ ، قُلْنَا : لِمَنْ ؟ قَالَ :  للَّه وَلِكِتَابِهِ ولِرسُولِهِ وَلأَئمَّةِ المُسْلِمِينَ وَعَامَّتِهِمْ  (رواه مُسْلم)

১.  হাদীস : আবু রুকাইয়া তামীম ইবনে আউস আদ-দারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : ধর্ম হল নসীহত বা কল্যাণকামিতা। আমরা বললাম, কার জন্য কল্যাণ কামনা?  তিনি বললেন : আল্লাহ তা’আলা, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূল এবং মুসলমানদের নেতৃবর্গ ও সাধারণ মুসলমানদের জন্য। (মুসলিম)

হাদীস থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল : (এক) ইসলাম ধর্মের মূল কথা হল অপরের কল্যাণ কামনা। তাই তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ধর্ম হল কল্যাণ কামনা করা। (দুই) পাঁচ প্রকার সত্ত্বার জন্য কল্যাণ কামনা করতে হবে।

প্রথমত : আল্লাহ তা’আলার জন্য কল্যাণ কামনা। প্রশ্ন হতে পারে আমরা মানুষ হয়ে মহান আল্লাহ যিনি সকল কল্যাণের স্রষ্টা ও মালিক, তাঁর জন্য কিভাবে কল্যাণ কামনা করব?  আল্লাহর জন্য কল্যাণ কামনা হল : তাকে সর্ব বিষয়ে প্রভু-পালনকর্তা বলে স্বীকার করা। তাকে ছাড়া আর কারো ইবাদত না করা। তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা। তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক-সমকক্ষ জ্ঞান না করা। তাঁর গুণাবলীগুলো অবিকৃতভাবে বিশ্বাস করা। তাঁর আদেশগুলো মেনে চলা। নিষেধগুলো বর্জন করা। তাঁর জন্য বন্ধুত্ব, তাঁর জন্য শত্রুতা পোষণ করা। তাঁর নি’আমাত সমূহের শুকরিয়া আদায় করা।

দ্বিতীয়ত : আল্লাহর কিতাবের জন্য জন্য কল্যাণ কামনা হল। আল কুরআন আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ বলে বিশ্বাস করা। তা অবিকৃত বলে বিশ্বাস রাখা। তিলাওয়াত বা অধ্যায়ন করা। এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন করা।

তৃতীয়ত : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য কল্যাণ কামনা হল। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তা’আলার রাসূল বলে বিশ্বাস করা, তাঁর আদেশ, নির্দেশ ও আদর্শ অনুসরণ করা, তাঁকে ভালবাসা।

চতুর্থত : মুসলমানদের নেতা ও ইমামদের জন্য কল্যাণ কামনা হল। তাদের আনুগত্য করা, সত্য প্রতিষ্ঠায় তাদের সাহায্য করা, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করা, তাদের সংশোধনের জন্য চেষ্টা করা ও উপদেশ দেয়া, তাদের জন্য দু’আ করা।

পঞ্চমত : সাধারণ মুসলিমদের জন্য কল্যাণ কামনা হল। জাগতিক ও ধর্মীয় ব্যাপারে তাদের উপদেশ ও নির্দেশনা দেয়া, তাদের পারস্পারিক বিবাদ মীমাংসা করে দেয়া, তাদের সকল ভাল কাজে সহযোগিতা করা, তাদের দোষত্রুটি গোপন রাখা, নিজের জন্য যা পছন্দ তা তাদের জন্যেও পছন্দ করা, সহমর্মিতার সাথে তাদের ভাল কাজের আদেশ করা আর অন্যায় থেকে বিরত রাখা, তাদের জন্য দু’আ করা।

عَنْ جرير بْنِ عبدِ اللَّه رضي اللَّه عنه قال : بَايَعْتُ رَسولَ اللَّه صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وسَلَّم عَلى : إِقَامِ الصَّلاَةِ ، وإِيتَاءِ الزَّكَاةِ ، وَالنُّصْحِ لِكلِّ مُسْلِمٍ (متفقٌ عليه)

২.  হাদীস : জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে শপথ (বাইআত) গ্রহণ করেছি নামাজ কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, সকল মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা ও উপদেশ দেয়ার। (বুখারী ও মুসলিম)

হাদীসটি থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল : (এক) বাইয়াত হল, হাতে হাত রেখে শপথ করা। জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) তিনটি বিষয়ে রাসূলের হাতে হাত রেখে শপথ করেছেন। বিষয় তিনটি হল : নামাজ, যাকাত ও প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা।

(দুই) ইসলামের প্রতি একনিষ্ঠ মুসলিম সর্বদা অপর মুসলিমের জন্য কল্যাণ কামনা করে থাকে কিন্তু মুনাফিক অপর মুসলিমের জন্য কল্যাণ কামনা করে না।

عَنْ أَنَس رضي اللَّه عنه عن النبيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وسَلَّم قال : لاَ يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى يُحِبَّ لأَخِيهِ مَا يُحِبُّ لِنَفْسِهِ (متفقٌ عليه(

৩.  হাদীস : আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করবে যা নিজের জন্য পছন্দ করে। (বুখারী ও মুসলিম)

হাদীস থেকে শিক্ষা ও মাসায়েল : (এক) কল্যাণ কামনার একটি দিক হল, নিজের জন্য যা পছন্দ করবে তা অপরের জন্যও পছন্দ করা। যদি কারো মধ্যে এ গুণটি অর্জন না হয় তাহলে সে অপরের জন্য কল্যাণকামী বলে বিবেচিত হবে না। কল্যাণ কামনার নামই তো দ্বীন। এ গুণটি না থাকলে এমনকি সত্যিকার ঈমানদার বলেও গণ্য হবে না। তাই হিংসুক ব্যক্তি কখনো কল্যাণকামী হতে পারে না। কারণ, সে অন্যের কল্যাণ হোক তা চায় না। সে সর্বদা নিজের কল্যাণ চায়।

(দুই) যে ব্যক্তি সর্বদা নিজের স্বার্থের জন্য কাজ করে সে কল্যাণকামী হতে পারে না। তাই স্বার্থপরতা কল্যাণ কামনার পথে একটি বড় বাধা। যে ব্যক্তি নিজের জন্য যা পছন্দ করে অপরের জন্য তা পছন্দ না করলে সে-ই স্বার্থপর। এ গুণটি অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। মুসলিম জীবনে এ গুণটির অভাব সবচেয়ে বেশী। এ গুণটি না থাকার কারণে আমরা সর্বক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হই। অথচ এ গুণটিকে ঈমানের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এটি ঈমানের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ শাখা।

কল্যাণকামীদের মর্যাদা : আল্লাহর বান্দাদেরকে দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণের নসীহত করাই ছিল নবী-রাসূলদের কাজ। অতএব কোন ব্যক্তির মর্যাদাবান হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে সৃষ্টি সেরা ব্যক্তিত্ব তথা নবী-রাসূলদেও কাজ আঞ্জাম দিচ্ছে। কেননা নবীদের উচ্চ মর্যাদার মাধ্যমই ছিল এই নসীহত। সুতরাং মহান আল্লাহর দরবারে হিসাবের পাল্লাকে মর্যাদাবান করতে চাইলে গুরুত্বপূর্ণ এই মহান কাজে অবশ্যই শরীক হতে হবে। আল্লাহ তা’আলা সকল মুসলিমকে এ গুণটি অর্জন করার তাওফীক দান করুন।