লাইলাতুল কদরের মর্যাদা, বৈশিষ্ট্য ও ফযীলাত

(১) এ রাতে আল্লাহ তা‘আলা পুরা কুরআন কারীমকে লাউহে মাহফুয থেকে প্রথম আসমানে নাযিল করেন। তাছাড়া অন্য আরেকটি মত আছে যে, এ রাতেই কুরআন নাযিল শুরু হয়। পরবর্তী ২৩ বছরে বিভিন্ন সূরা বা সূরার অংশবিশেষ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ঘটনা ও অবস্থার প্রেক্ষিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র উপর অবতীর্ণ হয়।
(২) এ এক রজনীর ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম।
(৩) এ রাতে পৃথিবীতে অসংখ্য ফেরেশতা নেমে আসে এবং তারা তখন দুনিয়ার কল্যাণ, বরকত ও রহমাত বর্ষণ করতে থাকে।
(৪) এটা শান্তি বর্ষণের রাত। এ রাতে ইবাদত গুজার বান্দাদেরকে ফেরেশতারা জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তির বাণী শুনায়।
(৫) এ রাতের ফাযীলত বর্ণনা করে এ রাতেই একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল হয়। যার নাম সূরা কদর।
(৬) এ রাতে নফল সালাত আদায় করলে মুমিনদের অতীতের সগীরা গুনাহগুলো মাফ করে দেয়া হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি ঈমান ও সাওয়াব লাভের আশায় কদরের রাতে নফল সালাত আদায় ও রাত জেগে ইবাদত করবে আল্লাহ তার ইতোপূর্বের সকল সগীরা (ছোট) গুনাহ ক্ষমা করেদেন। (বুখারী)
কোন রাতটি লাইলাতুল কদর? [১] এ রাতটি রমযান মাসে। আর এ রাতের ফযীলত কিয়ামত পর্যন্ত জারী থাকবে।
[২] এ রাতটি রমাযানের শেষ দশকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “রমাযানের শেষ দশদিনে তোমরা কদরের রাত তালাশ কর।” (বুখারী)
[৩] আর এটি রমযানের বেজোড় রাতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “তোমরা রমাযানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত খোঁজ কর।” (বুখারী)
[৪] এ রাত রমযানের শেষ সাত দিনে হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদর (কদরের রাত) অন্বেষণ করতে চায়, সে যেন রমাযানের শেষ সাত রাতের মধ্য তা অন্বেষণ করে।”
[৫] রমাযানের ২৭ শে রজনী লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী।
ক. হাদীসে আছে : উবাই ইবনে কাব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন যে, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি যতদূর জানি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যে রজনীকে কদরের রাত হিসেবে কিয়ামুল্লাইল করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা হল রমাযানের ২৭ তম রাত। (মুসলিম)
(খ) আব্দুল্লাহ বিন ‘উমার থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “যে ব্যক্তি কদরের রাত অর্জন করতে ইচ্ছুক, সে যেন তা রমাযানের ২৭শে রজনীতে অনুসন্ধান করে। (আহমাদ)
[৬] কদরের রাত হওয়ার ব্যাপারে সম্ভাবনার দিক থেকে পরবর্তী দ্বিতীয় সম্ভাবনা হল ২৫ তারিখ, তৃতীয় হল ২৯ তারিখে। চতুর্থ হল ২১ তারিখ। পঞ্চম হল ২৩ তারিখের রজনী।
[৭] সর্বশেষ আরেকটি মত হল- মহিমান্বিত এ রজনীটি স্থানান্তরশীল। অর্থাৎ প্রতি বতসর একই তারিখে বা একই রজনীতে তা হয় না এবং শুধুমাত্র ২৭ তারিখেই এ রাতটি আসবে তা নির্ধারিত নয়। আল্লাহর হিকমত ও তাঁর ইচ্ছায় কোন বছর তা ২৫ তারিখে, কোন বছর ২৩ তারিখে, কোন বছর ২১ তারিখে, আবার কোন বছর ২৯ তারিখেও হয়ে থাকে।
কেন এ রাতকে অস্পষ্ট করে গোপন রাখা হয়েছে। এটা স্পষ্ট করে নির্দিষ্ট করে বলা হয় নি কেন? এ রাতের পুরস্কার লাভের আশায় কে কত বেশী সক্রিয় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এবং কত বেশী সচেষ্ট হয়, আর কে নাফরমান ও আলসে ঘুমিয়ে রাত কাটায় সম্ভবতঃ এটা পরখ করার জন্যই আল্লাহ তা‘আলা এ রাতকে গোপন ও অস্পষ্ট করে রেখেছেন।
যে রাতটি লাইলাতুল কদর হবে সেটি বুঝার কি কোন আলামত আছে? হাঁ, সে রাতের কিছু আলামত হাদীসে বর্ণিত আছে। সেগুলো হল : (১) রাতটি গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না।
(২) নাতিশীতোষ্ণ হবে। অর্থাত গরম বা শীতের তীব্রতা থাকবে না।
(৩) মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে।
(৪) সে রাতে ইবাদত করে মানুষ অপেক্ষাকৃত অধিক তৃপ্তিবোধ করবে।
(৫) কোন ঈমানদার ব্যক্তিকে আল্লাহ স্বপ্নে হয়তো তা জানিয়েও দিতে পারেন।
(৬) ঐ রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে।
(৭) সকালে হালকা আলোকরশ্মিসহ সূর্যোদয় হবে। যা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মত।
(সহীহ ইবনু খুযাইমাহ- ২১৯০, বুখারী০ ২০২১, মুসলিম- ৭৬২ নং হাদীস)
রমাযানের শেষ দশ রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী ধরণের ইবাদত করতেন? তাঁর ইবাদতের অবস্থা ছিল নিম্নরূপ :
১. প্রথম ২০ রাত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্ণ রাত জাগরণ করতেন না। কিছু সময় ইবাদত করতেন, আর কিছু অংশ ঘুমিয়ে কাটাতেন। কিন্তু রমাযানের শেষ দশ রাতে তিনি বিছানায় একেবারেই যেতেন না। রাতের পুরো অংশটাই ইবাদত করে কাটাতেন।
সে সময় তিনি কুরআন তিলাওয়াত, সলাত আদায় সদাকা প্রদান, যিকর, দু‘আ, আত্মসমালোচনা ও তাওবাহ করে কাটাতেন। আল্লাহর রহমাতের আশা ও তার গজবের ভয়ভীতি নিয়ে সম্পূর্ণ খুশুখুজু ও বিনম্রচিত্তে ইবাদতে মশগুল থাকতেন।
২. হাদীসে এসেছে সে সময় তিনি শক্ত করে তার লুঙ্গি দ্বারা কোমর বেধে নিতেন। এর অর্থ হল, রাতগুলোতে। তাঁর সমস্ত শ্রম শুধু ইবাদতের মধ্যেই নিমগ্ন ছিল। নিজে যেমন অনিদ্রায় কাটাতেন তাঁর স্ত্রীদেরকেও তখন জাগিয়ে দিতেন ইবাদত করার জন্য।
৩. কদরের রাতের ইবাদতের সুযোগ যাতে হাতছাড়া হয়ে না যায় সেজন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশদিনের পুরো সময়টাতে ইতেকাফরত থাকতেন। (মুসলিম- ১১৬৭)
মহিমান্বিত লাইলাতুল কদরে আমরা কী কী ইবাদত করতে পারি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে এ রাত কাটাতেন এর পূর্ণ অনুসরণ করাই হবে আমাদের প্রধান টার্গেট। এ লক্ষ্যে আমাদের নিুবর্ণিত কাজগুলো করা আবশ্যক :
(ক) নিজে রাত জেগে ইবাদত করা এবং নিজের অধীনস্ত ও অন্যান্যদেরকেও জাগিয়ে ইবাদতে উদ্বুদ্ধ করা।
(খ) লম্বা সময় নিয়ে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ পড়া। এসব সালাতে কিরাআত ও রুকু-সিজদা লম্বা করা। রুকু থেকে উঠে এবং দুই সিজদায় মধ্যে আরো একটু বেশী সময় অতিবাহিত করা, এসময় কিছু দু‘আ আছে সেগুলে পড়া।
(গ) সিজদার মধ্যে তাসবীহ পাঠ শেষে দু‘আ করা। কেননা সিজদাবনত অবস্থায় মানুষ তার রবের সবচেয়ে নিকটে চলে যায়। ফলে তখন দু‘আ কবুল হয়।
(ঘ) বেশী বেশী তাওবা করবে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়বে। ছগীরা কবীরা গোনাহ থেকে মাফ চাইবে। বেশী করে শির্কী গোনাহ থেকে খালেছ ভাবে তাওবা করবে। কারণ ইতিপূর্বে কোন শির্ক করে থাকলে নেক আমল তো কবুল হবেই না, বরং অর্জিত অন্য ভাল আমলও বরবাদ হয়ে যাবে। ফলে হয়ে যাবে চিরস্থায়ী জাহান্নামী।
(ঙ) কুরআন তিলাওয়াত করবে। অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ কুরআন অধ্যয়নও করতে পারেন। তাসবীহ তাহলীল ও যিক্র-আযকার করবেন। তবে যিকর করবেন চুপিসারে, নিরবে ও একাকী এবং কোন প্রকার জোরে আওয়ায করা ছাড়া। এভাবে যিকর করার জন্যই আল্লাহ কুরআনে বলেছেন :“সকাল ও সন্ধ্যায় তোমার রবের যিকর কর মনে মনে বিনয়ের সঙ্গে ভয়ভীতি সহকারে এবং জোরে আওয়াজ না করে। এবং কখনো তোমরা আল্লাহর যিকর ও স্মরণ থেকে উদাসীন হয়োনা।” (আরাফ : ২০৫) অতএব, দলবেধে সমস্বরে জোরে জোরে উচ্চ স্বরে যিক্র করা বৈধ নয়। এভাবে সম্মিলিত কোন যিকর করা কুরআনেও নিষেধ আছে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তা করেন নি। যিকরের শব্দগুলো হল: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ইত্যাদি।
(চ) একাগ্রচিত্তে দু‘আ করা। বেশী বেশী ও বার বার দু‘আ করা। আর এসব দু‘আ হবে একাকী ও বিনম্র চিত্তে কবুল হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে। দু‘আ করবেন নিজের ও আপনজনদের জন্য. জীবিত ও মৃতদের জন্য, পাপমোচন ও রহমত লাভের জন্য, দুনিয়ার শান্তি ও আখিরাতের মুক্তির জন্য। তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাতে নিম্নের এ দু‘আটি বেশী বেশী করার জন্য উতসাহিত করেছেন : “ হে আল্লাহ! তুমি তো ক্ষমার আধার, আর ক্ষমা করাকে তুমি ভালবাস। কাজেই তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। (তিরমিযী)

মুত্তাকীরা রাতের বেলা কমই ঘুমাতো – كَانُوا قَلِيلاً مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُون

সমস্ত প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। আমরা তার প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, ও একক, তার কোন শরীক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ! সালাত, সালাম ও বরকত অবতীর্ণ করুন তার উপর, তার বংশধর ও সাহাবাদের উপর, এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার পথে ধাবিত হবে ও তার আদর্শের অনুসরণ করবে তাদের উপর।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার শ্রেষ্ঠ নবীর শ্রেষ্ঠ উম্মাতদেরকে উপহার দিয়েছেন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মাস রমযানুল মোবারক। এ মাসেই আল্লাহ তা’আলার পক্ষথেকে রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। রমযান মাসে সিয়াম সাধনায় মহান আল্লাহর অনন্ত অসীম রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। তাই তো রমযানের আগমনে আল্লাহ প্রেমিক বান্দার অন্তরে এক অনাবিল আনন্দধারা প্রবাহিত হয়। সকল ঈমানদারেরা শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে এই পবিত্র মাসটি অতিবাহিত করে। মুসলিম উম্মাহর জন্য রমযান অত্যন্ত কাংক্ষিত ও প্রাপ্তির মাস। রমজান এমন একটি মাস যে মাসে ইবাদতের সওয়াব অনেক বেশি। সুতরাং আল্লাহর দরবারে বিনয়াবনত হয়ে কাতর কণ্ঠে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে যেন শারীরিক সুস্থতা ও মনের শুদ্ধতা নিয়ে দিনের বেলায় সিয়াম সাধনা ও রাতে সালাত, কুরআন তিলাওয়াত ও নফল ইবাদতের মাধ্যমে এই মোবারক মাসের সদ্ব্যবহার করা যায়। রমজান মাস সতকর্ম ও আখিরাতের নেকি লাভের উত্তম মৌসুম। কিয়ামুল-লাইল বা রাতের সালাতের ফজীলত আল্লাহর নিকট বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ কোন সন্দেহ নেই। ফরয সালাতের পর এ সালাতের স্থান। এ সালাতের বৈশিষ্ট্য শুধু ব্যক্তির পাপ মোচন করা নয়, বরং পাপে লিপ্ত হওয়া থেকে হিফাযত করা। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : তোমরা রাতের সালাত জরুরী করে নাও, কারণ তা নেককার লোকদের অভ্যাস, তোমাদের রবের নৈকট্য, গুনাহের কাফফারা ও পাপ থেকে সুরক্ষা। (তিরমিযী) অর্থাত, আমাদের পূর্বপুরুষগণ কিয়ামুল লাইল বা রাতের সালাতের ব্যাপারে শিথিলতা করতেন না, কিন্তু বর্তমান যুগে অবস্থা পাল্টে অনেকের রাত পরিণত হয়েছে দিনে। তাদের থেকে বিদায় নিয়েছে রাতে আল্লাহর সাথে মোনাজাতের স্বাদ। অনেকের শিথিলতা ফজর সালাতের সীমা অতিক্রম করে গেছে।

قال الله تعالى : وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا (سورة الفرقان-৬৪)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : (রহমানের আসল বান্দা) তারাই যারা নিজেদের রবের সামনে সিজদায় অবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে রাত কাটিয়ে দেয়। (সূরা ফুরকান-৬৪)

قال الله تعالى : كَانُوا قَلِيلاً مِّنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ (الذريات-১৭)

আল্লাহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন :- (মুত্তাকীরা) রাতের বেলা তারা কমই ঘুমাতো। (সূরা যারিয়াত-১৭) অর্থাত, তারা রাতের বেশীর ভাগ সময়ই মহান আল্লাহর ইবাদতে কাটাতেন এবং অল্প সময় ঘুমাতেন।

قال الله تعالى : تَتَجَافَىٰ جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ ، فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ. (سورة السجدة-১৬/১৭)

অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- তাদের পিঠ থাকে বিছানা থেকে আলাদা, নিজেদের রবকে ডাকে আশংকা ও আকাংকা সহকারে এবং যা কিছু রিযিক আমি তাদেরকে দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। তারপর কেউ জানে না তাদের কাজের পুরস্কার হিসেবে তাদের চোখের শীতলতার কি সরঞ্জাম লুকিয়ে রাখা হয়েছে। (সূরা সিজদাহ-১৬/১৭) হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, হাদীসে কুদসীটি উদ্ধৃত হয়েছে যে, নবী করীম (সা) বলেছেন : আল্লাহ তা’আলা বলেন; আমার সতকর্মশীল বান্দাদের জন্য আমি এমনসব জিনিস সংগ্রহ করে রেখেছি যা কখনো কোন চোখ দেখেনি, কোন কান শোনেনি এবং কোন মানুষ কোনদিন তা কল্পনাও করতে পারে না। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী ও মুসনাদে আহমাদ)

জান্নাতে যাওয়ার অন্যতম উপায় রাতের সালাত :

عن عبد الله بن سلام رضي الله عنه قال :  سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : يا أيها الناس أفشوا السلام ، و أطعموا الطعام ، و صلوا الأرحام ، و صلوا بالليل و الناس نيام ، تدخلوا الجنة بسلام (رواه الترمذي)

আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন করেন, তখন লোকেরা তার দিকে ছুটে গেল। আর চারদিকে ধ্বনিত হল : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমন করেছেন (তিনবার)।

আমি মানুষের সাথে তাকে দেখতে আসলাম। আমি যখন তার চেহারা ভালভাবে দেখলাম, পরিষ্কার বুঝলাম তার চেহারা কোন মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। আমি সর্বপ্রথম তাকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন : হে লোকেরা, তোমরা সালামের প্রসার কর, খাদ্য দান কর, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখ ও রাতে সালাত আদায় কর যখন মানুষেরা ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিযী, ইবনে মাজা)

এ মোবারক মাসের শেষ দশকে রাব্বুল আলামীন লাইলাতুল কদর নামে এমন এক মহামূল্যবান ও মহিমান্বিত রজনী আমাদের দান করেছেন, যা ইতিপূর্বে কোন উম্মাতকে দেয়া হয়নি। লাইলাতুল কদর এমন একটি রজনী যা হাজার মাস (ইবাদাত) অপেক্ষা উত্তম।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাতে ইবাদত-বন্দেগীতে বেশি সময় ও শ্রম দিতেন, যা অন্য কোন রাতে দেখা যেত না। যেমন মুসলিম শরীফে আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে, তিনি এ রাতে কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে জাগ্রত থাকতেন এরপর সেহরী গ্রহণ করতেন। রমযানের শেষ দশক আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরনের লুঙ্গি শক্ত করে নিতেন। রাত্রি জাগরণ করতেন এবং পরিবারের সকলকে জাগিয়ে দিতেন। যেমন বোখারী ও মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে এসেছে। তিনি এ দশদিনের রাতে মোটেই নিদ্রা যেতেন না। পরিবারের সকলকে তিনি এ রাতে ইবাদত-বন্দেগী করার জন্য জাগিয়ে দিতেন। এ দশদিনের একটি বৈশিষ্ট্য হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ শেষ দশদিনে মসজিদে এ’তেকাফ করতেন। প্রয়োজন ব্যতীত তিনি মসজিদ থেকে বের হতেন না।

লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব : আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন এ রাতকে সকল রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি তার কালামে পাকে এ রাতকে প্রশংসার সাথে উল্লেখ করেছেন।

قال الله تعالى : حم ، وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ ، إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ ۚ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ ، فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ ، أَمْرًا مِّنْ عِندِنَا ۚ إِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ (سورة الدخان)

আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন : (১) হা-মীম, (২) শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, (৩) আমি তো এটা (কুরআনুল কারীমকে) অবতীর্ণ করেছি এক মুবারক রজনীতে; আমি তো সতর্ককারী। (৪) এ রজনীতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়; (৫) আমার আদেশক্রমে, আমি তো রাসূল প্রেরণ করে থাকি। (সূরা দুখান) ব্যাখ্যা : মুবারক রজনী দ্বারা মুফাস্সিরগণ লাইলাতুল কদরকে বুঝিয়েছেন। বরকতময় রজনী হল লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তা’আলা একে বরকতময় বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এ রাতে রয়েছে যেমন বরকত তেমনি কল্যাণ ও তাতপর্য। বরকতের প্রধান কারণ হল এ রাতে আল-কোরআন নাযিল হয়েছে। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-সিদ্ধান্ত লওহে মাহফুজ থেকে ফেরেশতাদের হাতে অর্পণ করা হয় বাস্তবায়নের জন্য। এ রাতের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হল আল্লাহ তা’আলা এ রাত সম্পর্কে একটি পূর্ণ সূরা অবতীর্ণ করেছেন।

قال الله تعالى : إنا أنزلناه في ليلة القدر ، وما أدراك ما ليلة القدر ، ليلة القدر خير من ألف شهر ، تنزل الملائكة والروح فيها بإذن ربهم من كل أمر ، سلام هي حتى مطلع الفجر  (سورة القدر)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : (১) নিশ্চয় আমি একে (কুরআনুল কারীমকে) নাযিল করেছি কদরের রাতে। (২) কদরের রাত সম্পর্কে আপনি কী জানেন ? (৩) কদরের রাত হচ্ছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (৪) এই রাতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতারা ও রূহ জিবরাঈল (আঃ) অবতীর্ণ হন তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। (৫) এ রাত সালাম তথা নিরাপত্তার রাত, যা ফজর হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সূরা,কদর)

লাইলাতুল কদরের ফযীলত ও মর্যাদা : মহান রাব্বুল আলামীন বিশ্ব মানবের হিদায়াত ও পথ নির্দেশিকা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এ রজনীতেই লাওহে মাহ্ফুজ থেকে প্রথম আসমানে সম্পূর্ণ রূপে অবতীর্ণ করেছেন। অতঃপর সুদীর্ঘ তেইশ বছর যাবত প্রয়োজন অনুসারে বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। (ইবনে কাসীর) দুনিয়ার বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ মূল্যবান ও মর্যাদাপূর্ণ রজনী হলো কদরের রজনী। এ রজনীর গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে উম্মতে মুহাম্মদীকে অবহিত করানোর জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ”সূরা কদর” নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা অবতীর্ণ করেছেন। এ সূরায় উম্মাতে মুহাম্মদীকে সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। এই একটি রাতের ইবাদাত হাজার মাস ইবাদাতের চেয়েও উত্তম বলে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি কদরের রাতে পূর্ণ বিশ্বাস ও সওয়াবের নিয়্যাতে ইবাদাত করবে তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (বুখারী)

হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রমযান মাসের আগমনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : দেখ এ মাসটি তোমাদের কাছে এসে উপস্থিত হয়েছে। এতে এমন একটি রাত আছে যা হাজার মাস থেকে অধিক উত্তম। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে যাবতীয় কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। আর চিরবঞ্চিত ব্যক্তিই কেবল এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। (ইবনে মাযাহ)

আল-কোরআনে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি লাইলাতুল কদর কোন রাত। তবে কুরআনের ভাষ্য হল লাইলাতুল কদর রমযান মাসে। কিয়ামত পর্যন্ত রমযান মাসে লাইলাতুল কদর অব্যাহত থাকবে। এবং এ রাত রমযানের শেষ দশকে হবে বলে সহী হাদীসে এসেছে। এবং তা রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে হাদীসে এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর। (বুখারী) 

নিঃসন্দেহে ঐ বরকতপূর্ণ রাতটি যে ব্যক্তি অবহেলায় বা অলসতায় অবমূল্যায়ন করল, এর যথার্থ গুরুত্বারোপ করল না সে সমূহ কল্যাণ থেকে নিজকে বিরত রাখল। প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির উচিত যে, ঐ রাতের যথাযথ ভাবে হক আদায় করে মহান আল্লাহর পক্ষথেকে কল্যাণ, ফযীলত, বরকত ও আশাতীত সওয়াব লাভে ধন্য হওয়া।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে বেশী-বেশী করে ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে শেষ দশকের ফযীলত অর্জন করে তার নৈকট্য লাভের তাওফীক দান করুন। আমীন .

রমজানের ঐতিহাসিক তিনটি প্রেক্ষাপট

তিনটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে রমজান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং তাতে আমাদের জন্য রয়েছে শিক্ষা।

১. রমজান কুরআন নাজিলের মাস। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এ মাসেই নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন : ‘রমজান এমন একটি মাস যে মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে।’ (সূরা বাকারা-১৮৫) এ কুরআনের কারণেই মূলত রমজান মাস তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কুরআন নাজিল মানবতার প্রতি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সবচেয়ে বড় করুণা। এ করুণার ফলে উম্মাতে মুহাম্মদি সবচেয়ে মর্যাদাবান জাতিতে অভিহিত। কুরআনের বদৌলতে মুসলমানরা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হয়েছিলেন। আজ মুসলমনরা কুরআন থেকে দূরে-বহুদূরে। তাই তো আমরা পৃথিবীতে অপমানিত-নিপীড়িত। আজ আমাদের অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গেছে। অথচ মানবতার মুক্তির সনদ মহাগ্রন্থ আল কুরআনকে আমরা মুসলমানরা আমাদের জীবনের মূলমন্ত্রে পরিণত করলে আমাদের গৌরব আবারো ফিরে আসবে। তাই কুরআন নাজিলের এ পবিত্র রমজান মাসে আমরা বেশি করে কুরআন তেলাওয়াতের পাশাপাশি কুরআনের আলোকে আমরা আমাদের নিজেদের জীবন গড়ে তুলব। আর সেটাই হবে পবিত্র মাহে রমজানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
২. রমজান মাসেই সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক বদরের যুদ্ধ। সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়কারী এ যুদ্ধ এ মাসে সংঘটিত হওয়ার ফলে মাসটির গুরুত্ব আরো অনেক বেড়ে গেছে। তাই তো মাহে রমজানের আরেকটি শিক্ষা হচ্ছে : বদরের যুদ্ধে মুসলমানরা বাতিলের বিরুদ্ধে যেমনি ছিল আপসহীন, তেমনি আমাদেরও আজ অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে থাকতে হবে বজ্রকঠোর। রমজান ধৈর্যধারণের মাস একথা সত্য। তবে ধৈর্যের দোহাই দিয়ে বসে থাকব আর অন্যায় মাথাচাড়া উঠবে, সেটা ঠিক নয় তথা মাহে রমজানের শিক্ষাও নয়। অন্যায় আর অসত্যকে যাতে আমরা সমূলে ধ্বংস করে দিতে পারি, রমজান মাসে সংঘটিত বদরের যুদ্ধ আমাদের সে শিক্ষাই দিয়ে গেছে। বদরের যুদ্ধ ইসলামের প্রথম জেহাদ ও হক বাতিলের পার্থক্য নির্ণয়ের জেহাদ। বদরের যুদ্ধ প্রমাণ করেছে ইসলাম সত্য ধর্ম। বদরের যুদ্ধ থেকে মুসলমানদেরকে শিক্ষা নিতে হবে যে, তারা সত্যের পক্ষে। ন্যায়ের পক্ষে থেকে জেহাদ বা প্রতিরোধ গড়লে মুসলমানরা দুর্বল হলেও আল্লাহ তায়ালা এখনও তাদেরকে গায়েবী সাহায্যের জন্য প্রয়োজন আধ্যাত্মিকতা। মুসলমানদের এ আধ্যাত্মিক শক্তি ধ্বংস করতে সর্বদা চক্রান্ত করে যাচ্ছে। বদরের চেতনায় এদের প্রতিহত করা হক পথের মুসলমানদের ইমানী দায়িত্ব। পৃথিবীর ইতিহাসে বদরের যুদ্ধ ও মক্কা বিজয় মুসলিম উম্মার অগ্রগতির এবং জয়যাত্রার এক নবতর অধ্যায়ের সূচনা করেছে। বদরের যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে কোন অস্ত্র এবং শক্তির বিরুদ্ধে ঈমানী শক্তি অপ্রতিরোধ্য।

৩. ঐতিহাসিক মক্কা বিজয়ের মাস এ রমজান। রমজানের ঐতিহাসিক স্মৃতি জাগ্রত রাখতে মক্কা বিজয় অনেকখানি ভূমিকা পালন করেছে। সেদিন সিয়াম সাধনায় মশগুল মুসলমানরা ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে মক্কা অভিযানে বের হয়েছিলেন আল্লাহর রাসুলের সফরসঙ্গী হয়ে। মুসলমান ঘরে বসে থাকার জাতি নয়। আল্লাহর দ্বীনকে তাঁর দেয়া ভূখণ্ডে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে কায়েম করার দৃঢ়প্রত্যয় গ্রহণের অন্যতম শিক্ষা হচ্ছে মাহে রমজানের শিক্ষা। সুতরাং মুসলিম হিসেবে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার প্রত্যয় আমাদের গ্রহণ করতে হবে এ রমজান মাসে। মনে রাখতে হবে, বাতিলের ওপর আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে কায়েম করার জন্য আল্লাহর রাসুলের এ ধরাপৃষ্ঠে আগমন।

মুসলিম চরিত্রে রমযানের কাঙ্খিত প্রভাব

মুসলিম চরিত্রে রমযানের কাঙ্খিত প্রভাব

রমযানের গুরুত্ব : রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “রমযানের আগমনে জান্নাতের দরজাগুলোকে খুলে দেয়া হয়”। রমযানে অধিক পরিমাণে ভাল কাজ করে জান্নাতের নিকটবর্তী হওয়া যায়। রমযানে সিয়াম পালনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করিয়ে নেয়ার চমৎকার সুযোগ আসে। আবু হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে উদ্ধৃত করেছেন : যে রমযানে বিশুদ্ধ বিশ্বাসের সাথে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিদান লাভের আশায় সিয়াম পালন করবে, আল্লাহ তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন।

তেমনি তিনি (সা:) বলেছেন: ঈমান সহকারে রমযানে রাতে যে কিয়াম করবে (রাতে সালাত আদায় করবে), তার অতীতের সমস্ত গুনাহ আল্লাহ মাফ করে দেবেন। একবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মিম্বরে ওঠার সময় তিনবার আমিন বলেন। পরবর্তীতে তিনি ব্যাখ্যা করেন, জিবরীল (আঃ) এঁর তিনটি প্রার্থনার উত্তরে তিনি আমিন বলেন। তার মধ্যে একটি দুআ ছিল, যার ওপর রমযান আসে এবং চলে যায় অথচ তার গুনাহ মাফ হয় না, সে ক্ষতিগ্রস্ত/লাঞ্চিত হোক। বিশুদ্ধ নিয়তে সিয়াম পালন করলে মন্দের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার আত্মিক শক্তি অর্জিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: রোযা ঢাল স্বরুপ. একান্তভাবে আলল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য রোযা পালনকারীর জন্য বিশেষ পুরস্কার রয়েছে। একটি হাদীসে কুদসীতে এসেছে আল্লাহ বলেন : আদম সন্তানের সকল কাজই তার নিজের জন্য, সিয়াম ব্যতীত। এটা শুধুই আমার জন্য, এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।

রমযানের এইরূপ মর্যাদার প্রধান কারণ হচ্ছে এই মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে, যা স্রষ্টার পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ এবং পৃথিবীতে বিদ্যমান একমাত্র অপরিবর্তিত কিতাব। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন : রমযান মাস সেই মাস, যে মাসে মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ স্বরুপ কুরআন নাযিল করা হয়েছে। এতে রয়েছে সত্য পথ প্রদর্শনের জন্য বিশুদ্ধ শিক্ষা এবং (সত্য থেকে মিথ্যাকে পার্থক্য করার) মানদন্ড।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২:১৮৫)

কুরআন নাযিল মানবজাতির প্রতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সর্ববৃহৎ অনুগ্রহ, যে মানবজাতি এর পূর্ববর্তী ওহী নাযিল হওয়ার পরবর্তী সময় থেকে নিয়ে অজ্ঞানতার অন্ধকারে ডুবে গিয়েছিল। তাঁর দয়া নিঃসৃত এই অনুপম অনুগ্রহ ছাড়া হেদায়েতের স্তিমিত-প্রায় আলোটুকুও হারিয়ে যেত এবং গোটা মানবসমাজে প্রতিষ্ঠা হত অন্যায়ের রাজত্ব।

সিয়ামের উদ্দেশ্য : রোযার মূল লক্ষ্য তাকওয়া (আল্লহ-ভীতি এবং তাঁর সম্পর্কে সচেতনতা) অর্জন। যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনুল কারীমে উল্লেখ করেছেন : “…যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২ : ১৮৩)

তাকওয়া সর্বোচ্চ নৈতিক গুণগুলোর একটি, তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে একজন মুসলিম আল্লাহর ক্রোধ এবং নিজের মাঝে একটি ঢাল তৈরী করতে পারে। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহর সমস্ত আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে সর্বদা সচেতন থাকা, অর্থাৎ হারাম পরিহার করা, মাকরূহ পরিহার করা এবং এমনকি সন্দেহের অবস্থায় হালালও পরিত্যাগ করা। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারেরা এটাও পরীক্ষা করে দেখেছেন যে রোযা বহুভাবে স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। যেমন এ সময় শরীরে সঞ্চিত অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ব্যবহৃত হয়। এভাবে রোযা শরীরকে সবল রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

বর্তমান মুসলিম সংস্কৃতিতে রোযা : বর্তমান মুসলিম সংস্কৃতিতে রোযা ধর্মীয় চিন্তা-ভাবনা এবং সংযমের পরিবর্তে পরিণত হয়েছে উৎসবের মাসে! রমযানের রাতগুলি পরিণত হয় পার্টি এবং ভোজের রাত্রিতে যা কিনা কোন কোন দেশে ভোর পর্যন্ত চলে। সেখানে রাত পরিবর্তিত হয় দিনে, দিন পরিবর্তিত হয় রাতে (বহু মানুষই রোযার সময়টুকু ঘুমিয়ে কাটায়)। সাধারণতঃ সেহেরীতে মানুষ হালকা খাবারের বদলে পেট ভরে খায়। ফলে রোযা অবস্থায় খুব কম মানুষই প্রকৃত ক্ষুধার তাড়না বোধ করে। আবার ইফতারীতে আরেক দফা ভরপেট খাওয়া চলে, সেই সাথে রয়েছে রকমারী খাবারের আয়োজন। ফলে অনেকেই রমযান শেষে ওজন বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করে!

মুসলিম চরিত্রে সাওমের কাঙ্খিত প্রভাব : রমযানের শিক্ষাসমূহ , রমযানের সময়কাল অনেকটা বিদ্যালয়ের মত, যে সময়টিতে শেখার মত কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কোন কারণে নামায ছুটে গেলে আমরা তা পরবর্তীতে আদায় করে নিতে পারি, কিংবা রোযাও পরবর্তীতে রাখতে পারি, কিন্তু রমযানের সময়টি সেরকম নয়, এ সময় যদি পার হয়ে যায় এমন অবস্থায় যে আমরা রমযানের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা গুলো নিতে পারলাম না, তবে তা বিরাট ক্ষতি।

প্রথম শিক্ষা : আল্লাহ সম্পর্কে সচেতনতা বা তাকওয়া সৃষ্টি, কুরআনের যে আয়াতে সিয়ামের আদেশ দেয়া হয়েছে, সে আয়াতেই এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে : হে বিশ্বাসীগণ। তোমাদের জন্য সিয়াম পালনকে নির্ধারণ করা হল যেমনটি তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর করা হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২ : ১৮৩)

এই তাকওয়া আল্লাহ সম্পর্কে সচেতনতা, তাঁর উপস্থিতির উপলব্ধি, এবং এটা জানা যে তিনি আমাদের দেখছেন – যা আমাদেরকে ব্যক্তিগত জীবনে উন্নততর মানুষ হতে সাহায্য করবে। এই তাকওয়াকে আলী (রাঃ) বর্ণনা করেছেন আল্লাহর প্রতি ভয়, অল্পে সন্তুষ্টি এবং (পরবর্তী জীবনের পানে) যাত্রার প্রস্তুতি হিসেবে। তাই ভয় তাকওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। একদল লোক কেবল আল্লাহকে ভালবাসার কথা বলে থাকে এবং দাবী করে যে আল্লাহকে ভয় করে তাঁর ইবাদত করা ঠিক নয়, বরং তাঁকে শুধুমাত্র ভালবেসে ইবাদত করাটাই ঈমানের উন্নততর শর্ত । কিন্তু এ কথা ঠিক নয়। কুরআনের পাতায় পাতায় আল্লাহকে ভয় করার কথা বলা হয়েছে। এই ভয়ের অর্থ তাঁর অবাধ্যতার কারণে যে শাস্তি রয়েছে, সেই শাস্তিকে ভয় করা। মানুষ আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য সাধনা করার মাধ্যমে তাকে ভালবাসবে, একই সাথে তাঁর শাস্তির ভয়ও অন্তের পোষণ করতে হবে। এ দুটো অবিচ্ছেদ্য এবং প্রকৃত ঈমানের মৌলিক দুটি উপাদান। আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, যে রোযাদার লাইলাতুল ক্বদর লাভ করবে, তার পূর্ববর্তী পাপসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। এবং যে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ঈমান সহকারে রমযানে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ সমূহকেও ক্ষমা করে দেয়া হবে“। এজন্য সিয়াম হতে হবে সঠিক পদ্ধতিতে এবং সঠিক প্রেরণার ভিত্তিতে। যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : যে রোযা অবস্থায় মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার ওপর আচরণ করা থেকে বিরত হল না, তার ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।

রোযা অবস্থায় আমাদের দিনগুলো রোযা না রাখা অবস্থায় আমাদের দিনগুলোর মত হওয়া উচিৎ নয় – এর মাঝে পার্থক্য থাকা উচিৎ। এই তাকওয়াই মানুষকে সর্বাবস্থায় অন্যায় থেকে বিরত রাখে, যদিও বা কেউ তাকে দেখতে না পায়। তাকওয়ার অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে। কুরআনের আলোকে তাকওয়ার কয়েকটি উপকারিতা হচ্ছে:

দ্বিতীয় শিক্ষা : আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করা

বিভিন্ন ধরনের ইবাদত প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সাথে আমাদের বন্ধন প্রতিষ্ঠার উপায়। রমযানে এই ইবাদতগুলো পরিমাণে বৃদ্ধি পায়, যেন আমরা এই মাস শেষে আল্লাহর সাথে সম্পর্কের উচ্চতর স্তরে অবস্থান করতে পারি। খাদ্য ও পানীয় দেহের পুষ্টির উৎস, মনের খাদ্য হচ্ছে জ্ঞান, আর অন্তেরর প্রয়োজন হচ্ছে ঈমান এবং আল্লাহ সম্পর্কে সচেতনতা। রমযানে অধিক ইবাদতের দ্বারা আমরা ইবাদতকে আমাদের জীবনের মৌলিক কাঠামো হিসেবে গ্রহণের শিক্ষা পাই। কুরআনে যেমনটি বলা হচ্ছে : “…নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার ত্যাগ, আমার জীবন-মরণ, জগসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।”(সূরা আল আনআম, ৬:১৬২)

এরকমই হচ্ছে একজন প্রকৃত মুসলিমের জীবন। রমযানে বেশী বেশী কুরআন তিলাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য এক মাসে কুরআন খতম করা নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর বাণীর সাথে আমাদের সম্পর্ক গভীরতর করা, যদি কুরআনের বাণী আমাদের অন্তেরে স্থান করে নিতে পারে, তবে তা আমাদের জীবনকে আমূল পরিবর্তন করতে সাহায্য করবে। অধিক পরিমান কুরআন তিলাওয়াৎ শোনার আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে শয়তানের কুরআন থেকে দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া। শয়তানের কুরআন [আরবী পরিভাষায় কুরান অর্থ হচ্ছে তিলাওয়াৎ, এখানে ভাষাগত অর্থটিকে ইংগিত করা হয়েছে] হচ্ছে গান-বাজনা, গল্প-উপন্যাস, সিনেমা-নাটক ইত্যাদি যেগুলো আমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে না, এগুলো আমাদেরকে আনন্দ দান করলেও আল্লাহ থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে নেয়। তাই রমযানে আল্লাহর কুরআনের নিকটবর্তী হওয়া এবং শয়তানের কুরআন থেকে দূরবর্তী হওয়ার দ্বিমুখী সাধনা চালাতে হবে। রমযানে বেশী বেশী করে আমরা রাতের নফল সালাত আদায় করি, যেন রমযানের পরও তা আমাদের অভ্যাস হিসেবে থেকে যায়, কেননা সমস্ত সালাতের ভিতর রাতের সালাতই সবচেয়ে একনিষ্ঠভাবে আদায় করা সম্ভব, যখন কেউ আমাদের দেখতে পায় না, এই একনিষ্ঠতা অন্যান্য সালাতে অর্জন করা খুবই কষ্টসাধ্য। তেমনি এ মাসে ধার্মিক লোকদের সাহচর্য বৃদ্ধি পায়, আমরা রোযাদারদের সাথে বসে একত্রে ইফতার করি, এবং রোযাদারেরা একে অপরকে ইফতারের দাওয়াত দিয়ে থাকে। আমাদের উচিৎ এ মাসে বেশী বেশী করে আল্লাহভীরু, ধার্মিক লোকদের সাহচর্য লাভে সচেষ্ট হওয়া, বেশী বেশী করে সে সব স্থানে যাওয়া, যেখানে জ্ঞানের কথা আলোচিত হয়।

তৃতীয় শিক্ষা : সবর এবং ইচ্ছাশক্তি, যদিও মুসলিম সমাজে বর্তমানে প্রচলিত পদ্ধতির রোযায় সবর ও ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন নেই। কেননা ইফতার এবং সেহরীতে পেটভরে খেয়ে এবং সারাদিন ঘুমিয়ে কাটালে তাতে বিশেষ কষ্টের কিছু নেই। এতে কেবল দৈনন্দিন রুটিন পরিবর্তিত হয়ে রাত পরিণত হয় দিনে আর দিন রাতে। পারিভাষিক অর্থে একে রোযা বলে সংজ্ঞায়িত করা গেলেও এটা প্রকৃত সিয়াম নয়। এধরনের সিয়াম সবর করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে না। এতে সেই সবর অর্জিত হবে না, যেই সবর এই জীবনের পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেমনটি আল্লাহ সূরা আল আসরে বর্ণনা করেছেন : সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই সকল মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তারা ব্যতীত, যারা ঈমান এনেছে এবং সকর্ম করেছে, এবং পরস্পরকে সত্যের প্রতি আহবান জানায় এবং পরস্পরকে ধৈর্যধারণের উপদেশ দেয়।” (সূরা আল আসর, ১০৩:১-৩) এখানে বলা হচ্ছে সবর সাফল্যের চাবিকাঠি। এবং প্রকৃত সবরকারীর প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত।

চতুর্থ শিক্ষা : রিয়া থেকে বাঁচা, রিয়া অত্যন্ত ভয়ানক ব্যাপার। যদি আমরা অন্যদের দেখানোর জন্য আমল করি, তবে বাহ্যত একে উত্তম আমল বলে গণ্য করা হলেও আমাদের সমস্ত আমল নষ্ট হয়ে যেতে পারে এই রিয়ার কারণে। রাসূল (সা) বলেছেন, তোমাদের জন্য আমি যা সবচেয়ে বেশী ভয় করি, তা হল ছোট শিরক বা শিরক আল আসগার। সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, ছোট শিরক কি?” তিনি উত্তর দিলেন, “রিয়া (লোক দেখানোর জন্য কাজ করা), নিশ্চয়ই আল্লাহ পুনরুত্থান দিবসে প্রতিদান দেওয়ার সময় লোকদের বলবেন, ‘পার্থিব জীবনে যাদেরকে দেখানোর জন্য তোমরা কাজ করেছিলে, তাদের কাছে যাও এবং দেখ তাদের কাছ থেকে কিছু আদায় করতে পার কিনা।’” (আহমাদ, বায়হাকী)। ইবন আব্বাস (রা) এ সম্পর্কে বলেন, “কোন চন্দ্রবিহীন মধ্যরাতের অন্ধকারে কালো পাথরের উপর কালো পিঁপড়ার চুপিসারে চলার চেয়েও গোপন হচ্ছে  রিয়া।” (ইবন আবী হাতিম)। রোযার মাধ্যমে প্রতিটি কাজ বিশুদ্ধভাবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করার শিক্ষা হয়, কেননা প্রকৃত সিয়াম অন্যকে দেখানোর জন্য হওয়া সম্ভব নয়। কারণ সিয়ামের বিষয়টি বাহ্যিকভাবে দেখা যায় না। একটি হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ বলেন: আদম সন্তানের সকল কাজই তার নিজের জন্য, সিয়াম ব্যতীত। এটা শুধুই আমার জন্য, এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।

পঞ্চম শিক্ষা : নৈতিক চরিত্র গঠন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যে রোযা অবস্থায় মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার ওপর আচরণ করা থেকে বিরত হল না, তার ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। এ মাসে আমরা অধিক ভাল কাজ করার এবং খারাপ কাজ থেকে অধিক পরিমাণে বিরত থাকার চেষ্টা করি। আমরা খারাপ কথা ও কাজ পরিহার করি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরও বলেছেন: তোমাদের কেউ রোযা অবস্থায় যেন অশ্লীল কাজ ও অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকে, এবং যদি কেউ কোন অশ্লীল কথা শুরু করে কিংবা তর্ক করতে আসে, তবে সে যেন তাকে বলে: আমি রোযাদার।’” তেমনি আমাদের দৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণে আনার শিক্ষা হয় এই রমযান মাসে। তাই সিয়াম আমাদের চোখ, কান, হাত ও জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার মাধ্যমে আমাদের নৈতিক চরিত্রে উন্নতি ঘটায়। আমরা যদি রোযা রেখেও হারাম কথা, কাজ কিংবা হারাম দৃশ্যের প্রতি দৃষ্টিপাত বন্ধ না করি, তবে এই সিয়াম আমাদের নেক কাজের পাল্লায় যোগ না হয়ে যোগ হবে অন্যায়ের পাল্লায়, যার জন্য কিয়ামতের দিন আমাদের শাস্তি পেতে হবে।

ষষ্ঠ শিক্ষা : এটা উপলব্ধি করা যে পরিবর্তন সম্ভব, আমরা যখন বর্তমান মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকাই, আমরা সর্বত্র দেখতে পাই নৈতিক অবক্ষয়, ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিদাত, শিরক প্রভৃতির প্রাচুর্য, মুসলিমরা ইসলাম থেকে এতই দূরে, যে কারও পক্ষে ‘কোন আশা নেই’ এ কথা বলে বসা অসম্ভব নয়। এ অবস্থার যেন ক্রমাবনতি ঘটছে। এর সমাধান হচ্ছে মুসলিমদেরকে পরিবর্তন হতে হবে, কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব? রমযান আমাদের বলছে যে এটা সম্ভব। আমরা রমযানের ফজরে দেখতে পাই মসজিদ পরিপূর্ণ, অথচ অন্যান্য মাসে তা ফাঁকা থাকে। যদিও এদের মাঝে কিছু লোক কেবল রমযান মুসলিম, কিন্তু অনেকেই প্রকৃত ঈমানদার, যারা রমযানে সচেতন হয়ে ওঠে। তেমনি কুরআনের ওপর জমে থাকা ধূলো সরে যায়, এবং কুরআন বেশী বেশী করে তিলাওয়াৎ করা হয়। তেমনি মানুষের চরিত্রেও পরিবর্তন দেখা যায়। হয়ত ঝগড়াটে কোন ব্যক্তি এ মাসে নিজেকে সংযত করতে শেখে। তেমনি অনেক খারাপ কাজ যা অন্য মাসে ত্যাগ করা সম্ভব হয় না, তা এই মাসে সম্ভব হয়, যেমন অনেকে ধূমপান ত্যাগ করে থাকে। তাই রমযান আমাদের শেখায় যে মুসলিমরা নিজেদেরকে পরিবর্তন করতে সক্ষম। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এজন্য জিহাদকে রমযানের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আমাদের নফসের বিরুদ্ধে, পরিবারে, সমাজে ও বিশ্বে অবস্থিত সকল কু-শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে। একমাত্র এভাবেই পরিবর্তন আসা সম্ভব।

সপ্তম শিক্ষা : নিয়ন্ত্রণ, ক্ষুধা এবং যৌন বাসনা মানুষের চরিত্রে সবচেয়ে প্রবল দুটি বাসনা। এগুলোর ফলে মানুষ বহু বড় বড় পাপকাজে জড়িয়ে পড়ে। রোযা যেহেতু খাদ্য, পানীয় এবং যৌনাচার থেকে সংযম, তাই এর মাধ্যমে রোযাদারের আত্মনিয়ন্ত্রণের অনুশীলন হয়। প্রকৃতপক্ষে রোযার শিক্ষা অর্জিত হয়েছে কিনা, তা বোঝার মুহূর্তটি হচ্ছে রোযা ভাঙ্গার মুহূর্ত। কেননা এসময় টেবিলে যাবতীয় মজাদার খাবার সাজানো থাকে, তাই রোযা ভেঙ্গেই মুখে প্রচুর পরিমাণে খাবার পোরার ইচ্ছে হয়, কিন্তু একজন মুমিনকে এসময় সংযত থাকতে হবে এবং নামাযের আগে হালকা কিছু মুখে দিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) তিনটি খেজুর এবং পানি দিয়ে রোযা ভাঙতেন, এবং মাগরিবের নামাযের পর, মাঝারি খাবার খেতেন। আত্মিক সংযমও রোযার লক্ষ্য। কেবল খাদ্য, পানীয় ইত্যাদিই নয়, রোযাদারকে মিথ্যা বলা, গীবত করা, দুর্নাম করা ইত্যাদি থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “যে রোযা অবস্থায় মিথ্যা বলা এবং মিথ্যার ওপর আচরণ করা থেকে বিরত হল না, তার ক্ষুধা এবং তৃষ্ণায় আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” তিনি (সা) আরও বলেছেন: “তোমাদের কেউ রোযা অবস্থায় যেন অশ্লীল কাজ ও অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকে, এবং যদি কেউ কোন অশ্লীল কথা শুরু করে কিংবা তর্ক করতে আসে, তবে সে যেন তাকে বলে: ‘আমি রোযাদার।’” তাই উপরোক্ত দিক নির্দেশনা মেনে যে রোযা রাখবে, তার নৈতিক চরিত্রে উন্নতি ঘটবে, সে অধিকতর সত্যবাদী এবং কথা ও কাজে আরও সতর্ক হবে।

অষ্টম শিক্ষা : মধ্যপন্থা, যেহেতু রোযা ভাঙার সময় একজন রোযাদার নিজেকে সংযত রাখে, ফলে তার খাদ্যাভাসে মধ্যপন্থা গড়ে ওঠে, যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) খাদ্য গ্রহণ সম্পর্কে বলেছেন: “মুমিন এক পেটে, কাফির (যেন) সাত পেটে খায়।” জাবির (রা) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, “একজনের খাদ্য দুইজনের জন্য যথেষ্ট, দুইজনের খাদ্য চারজনের জন্য যথেষ্ট।” ইবন উমার (রা) বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কাউকে সঙ্গীর অনুমতি ব্যতীত খাওয়ার সময় একেকবারে দুটো করে খেজুর নিতে নিষেধ করেছেন।

নবম শিক্ষা : সহমর্মিতা, রোযা একজন মানুষকে ক্ষুধা এবং তৃষ্ণার প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করায়, ফলে সে দরিদ্রের অবস্থা বুঝতে পারে। এর ফলে তার মাঝে দরিদ্রকে সহায়তা করার এবং তাদেরকে নিজ সম্পদের ভাগ দেয়ার প্রেরণা সৃষ্টি হয়। আর এই চেতনার নমুনা হিসেবেই ঈদুল ফিতরের দিনে অভাবীকে নির্দিষ্ট পরিমাণে দান করাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর যখন আমরা উপলব্ধি করব যে আমাদের এই কষ্ট ইচ্ছাকৃত, কিন্তু দরিদ্রদের কষ্ট অনিচ্ছাকৃত, তারা চাইলেও খেতে পায় না, তখন আমরা অধিকতর সহমর্মিতা অর্জন করতে পারব।

রমযান তো চলে গেল, আমাদের অবস্থা কি?… مضى رمضان كيف حالنا ؟

রমযানের মাস সাধারণতঃ মুসলমানদের দ্বীনের প্রতি আগ্রহ-উদ্দীপনা বেশী দেখা যায়। এই অবস্থা দেখে অন্তরে খুশির বন্যা বয়ে যায়। কারণ যে দিকে চোখ ফিরাই সেদিকেই দেখি নেক আমলের ঢল। মনে হয় ইসলামের জয় জয়কার।

কিন্তু…?  ঈদ ও তার পরবর্তী দিনগুলো উক্ত সুধারণার সত্যায়ন করেনা, অথবা সব ধারণা গুণাহমিশ্রিত আনন্দে ভেস্তে যায়। যে ব্যক্তি মাহে রমযান ও রমযান পরবর্তী মানুষের অবস্থা নিয়ে গবেষণা করবে তখন সে আশ্চর্য না হয়ে পারবে না। কেননা রমযানের পর লোকজন ইবাদতে অলসতা বরং ইবাদত থেকে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে। মনে হয় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ইবাদত, তাওবা ও সকল নেক আমল শুধুমাত্র মাহে রমযানের সাথেই সম্পৃক্ত। তারা এ কথা জানেনা যে, আল্লাহ তাআলা রমযান সহ সবকয়টি মাসের রব। অন্যান্য মাসের তুলনায় রমযান হলো আনুগত্য ও ধৈর্যের অনুশীলন মাত্র। এ মাসে ঈমানী শক্তি সঞ্চয় করে বাকী এগার মাস চলতে হবে।

হ্যাঁ, তবে রমযান মাসে ইবাদতের বিশেষ গুরুত্ব আছে এবং রমযান অন্যান্য মাসের চেয়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ। কিন্তু রমযান মাসই কেবল ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট নয়। আর এ কারণেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব সময়ই দান-সদকা করতেন, তবে রমযানে তার দানের পরিমাণ অন্যান্য মাসের তুলনায় বেড়ে যেত। পবিত্র কালামে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :

﴿ وَلاَ تَكُونُواْ كَالَّتِي نَقَضَتْ غَزْلَهَا مِن بَعْدِ قُوَّةٍ أَنكَاثًا ﴾ )النحل (92-

তোমরা ঐ নারীর মত হয়োনা, যে সুতা দিয়ে মজবুতভাবে কাপড় তৈরি করার পর সুতাগুলো কাটতে শুরু করল। (সূরা নহল-৯২) অতএব, কল্যাণমূলক কাজগুলো কেবল রমযানের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং সব সময়ই আমাদের রবের ডাকে সাড়া দিতে হবে। ইরশাদ হচ্ছে –

 ﴿ وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ ﴾) الحجر (99-

মৃত্যু আসার পূর্ব পর্যন্ত তুমি তোমার রবের ইবাদতে নিয়োজিত থাক। (সূরা হিজর-৯৯) অতএব, মৃত্যু পর্যন্ত আল্লাহ ইবাদত ও নৈকট্য অর্জনের সমাপ্তি নেই।

ঈদে মানুষের বৈধ-অবৈধ পন্থায় আনন্দ-উল্লাস ও শরীয়তের সীমালঙ্ঘনের প্রতি দৃষ্টি দিলে মনে হবে না যে, তারা তাদের রমযানের নেক আমলগুলো প্রত্যাখ্যান করার ব্যাপারে ভয় করছে, অথবা যে ঈদের মাধ্যমে আল্লাহ তাদের সম্মান দান করেছেন তার ব্যাপারে তারা শুকরিয়া আদায় করছে। আর এ কারণেই তাদের অবস্থা ঐ নারীর সাথে তুলনা করা হয়েছে যে সুতা বুনার পর তা কেটে ফেলে। মানব প্রকৃতি হলো যদি সে স্বীয় সৃষ্টিকর্তার সাথে ব্যাস্ত থাকে তাহলে কখনো সে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এমন কোন কাজে লিপ্ত হবে না। পবিত্র কালামে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :

﴿ إِنَّ الَّذِينَ ارْتَدُّوا عَلَى أَدْبَارِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدَى الشَّيْطَانُ سَوَّلَ لَهُمْ وَأَمْلَى لَهُم ﴾ )محمد (25-

নিশ্চয় যারা হেদায়েত স্পষ্ট হওয়ার পর পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে শয়তান তাদের প্ররোচিত করে এবং আশা দেয়। (সূরা মুহাম্মদ-২৫) আসলে যদি তারা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্যকে ভালোবাসত তাহলে চোখের এক পলকের জন্যও তা থেকে দূরে থাকত না। পূর্ব যুগে বলা হত : 

من عشق طريق اليمن لم يلتفت إلى الشام.

যে ব্যক্তি ইয়ামানের রাস্তার আশেক, সে কখনো সিরিয়ার দিকে তাকাবে না। শুনে রাখুন, কেউ অলস ও দুর্বল হয়ে গেলে কিন্তু সাধনা করতে পারবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নিজেকে ইবাদাত ও দৃঢ়তার উপর সংযত রাখা, কঠিনভাবে নিজেকে ইবাদতে আটকে রাখা। হে মুসলমান, খবরদার! রমযানে কুপ্রবৃত্তি দমন করে ধোকায় পড়োনা, তাতে তুমি রমযানের পর আবার ফিতনায় জড়িয়ে পড়বে। কেননা কুপ্রবৃত্তি মানুষকে চক্রান্তে ফেলে দেয়। যুদ্ধের ময়দানে এমন অনেক বীর পুরুষ ধোকায় পড়ে, ফলে সে এমন এক পরিস্থিতির শিকার হয়, যা সে কখনো কল্পনাও করেনি। এখানে হামযা (রাঃ)-এর সাথে ওয়াহশির ঘটনা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হতে পারে। যে ব্যক্তি আমল করে কিছদূর গিয়ে আবার অলস হয়ে স্থির হয়ে যায়  সে ব্যক্তি কখনো শান্তি পায় না।  কেননা প্রবাদ বাক্যে বলা হয়-

إن أردت ألا تتعب فاتعب لئلا تتعب

যদি তুমি ক্লান্ত হতে না চাও তাহলে তুমি করতে থাক, যাতে তুমি ক্লান্ত না হও। এক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার বাণী সবচেয়ে অর্থবহ, পবিত্র কালামে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন : এরশাদ হচ্ছে-

(فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ) (الشرح 9-)

অত:পর তুমি যখন ফারেগ হবে, তখন তুমি নামাজে দাড়িয়ে যাও। (সূরা ইনশিরাহ-৭)

কেননা অলসতা কখনো কারো হক আদায় করতে পারে না। যে ব্যক্তি হায় হুতাশ করে সে কখনো হকের উপর অটল থাকতে পারে না। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

الكيس من دان نفسه وعمل لما بعد الموت والعاجز من أتبع نفسه هواها وتمنى على الله الأماني.

যে ব্যক্তি নফসকে কন্ট্রোল করে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করে সে-ই প্রকৃত বুদ্ধিমান। আর যে ব্যক্তি নিজের নফসের অনুসরণ করে ও আল্লাহর উপর ভরসা কের সে-ইঅক্ষম। নফসকে শাসন করার মূলমন্ত্র হলো আমলের প্রতি দৃঢ় সংকল্প করা। কেননা সংশয়ের কারণেই কোন কাজ ধ্বংস হয়ে যায়।

মুজাহাদা একটি আশ্চর্যজনক পদক্ষেপ। তাইতো দেখা যায় যারা নফসকে যা ইচ্ছা তা-ই করার জন্য ছেড়ে দেয়, নফস তাদেরকে অপছন্দনীয় কর্মকান্ডে ফেলে দেয়। আর যারা সর্বদা নফসের বিরোধিতা করে তাদের নফস কষ্ট পেলেও তারা সফল হয়ে যায়। আরবী কবি যথার্থই বলেছেন।

والنفس كالطفل إن تهمله شب على-  حب الرضاع وإن تفطمه ينفطم

নফস হলো ছোট্ট শিশুর মত, তাকে ছেড়ে দিলে সে দুধ পান করার জন্য উদগ্রীব থাকে, আর তাকে দুধ পান ছাড়িয়ে ফেললে ছেড়ে দেয়।

একথা সত্য যে দুনিয়ার জীবন কষ্ট-ক্লেশ থেকে কখনো পৃথক হয় না। জীবন চলার পথে অনেক মুসীবতের সম্মুখীন হতে হয়। মানব জীবনে সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো পরিণতি সম্পর্কে অনুভূতি না থাকা। বরং এর চেয়েও নিকৃষ্ট হলো পূর্ণমাত্রায় ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত হওয়ার পর ইবাদত কমিয়ে দিয়ে তার উপর সন্তুষ্ট থাকা, অথবা গুণাহ থেকে তাওবা করে আবার গুণাহে ফিরে আসা। যার অবস্থা এমন সে কখনো ইবাদত করে কামিয়াব হতে পারে না। যদি কেউ মৌসুমী ইবাদতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে তাহলে সে কঠিন শাস্তিতে নিমজ্জিত হবে, আর তা হলো ইবাদতের মজা ও আল্লাহর সাথে নিবির মুনাজাতের মিষ্টতা আস্বাদন করার সুযোগ না পাওয়া। মুমিন নারী ও পুরুষ যারা প্রতিটি মাসের রবের ইবাদত করে প্রত্যেক মাসে, তাদের বাহির ও ভিতর সমান। তাদের শাওয়াল মাস রমজানের মতই। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাঃ) বলেন : নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে উপদেশ দিয়ে বলেন :

(يا عبدالله لا تكن مثل فلان كان يقوم الليل فترك قيام الليل)

হে আব্দুল্লাহ তুমি অমুক ব্যক্তির মত হয়োনা, যে রাত জেগে ইবাদতের অভ্যাস করে আবার তা ছেড়ে দিল। আল্লাহ তাআলা মৃত্যু আসার পূর্ব পর্যন্ত নেক আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর নবীকে। তাই আসুন আমরা সবাই আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন হই। এবং মৃত্যু পর্যন্ত তাতে অটল থাকার চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমীন।

গরীবের প্রতি সহানুভূতির মাস রমযান – شهر رمضان شهر المواساة

একটি বছর পর আমাদের মাঝে ফিরে আসে পবিত্র রমজান মাস। এ মাস অন্য সব মাসের মত নয়। একে আমরা কুরআনের মাস হিসেবে জানি। মহান আল্লাহর রাশি রাশি করুণার ধারা বর্ষিত হয় এ মাসে। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সাড়া পড়ে যায় ইবাদাতের। পুরো মাসটিই মুমিন ও ইসলামপ্রিয়দের নিকট আনন্দের মাস ও অর্জনের মাস। এ মাসে সারা বিশ্বের মুসলিমগণ ইসলামের পাঁচটি রুকনের একটি রুকন সাওম বা রোজা পালন করে থাকেন। সাওম এর শাব্দিক অর্থ হলো বিরত থাকা। পারিভাষিক অর্থে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিয়ত সহকারে পানাহার, পাপাচার  ও কামাচার থেকে বিরত থাকার নাম সাওম। শুধু অনাহারে দিনযাপনের নাম সাওম নয়। এখানেই অনেকে ভুল করে থাকি। আমরা অনেকেই মনে করি সারাদিন উপোষ থাকার নামই সাওম। একদিকে যেমন আমরা সাওমের উদ্দেশ্যে উপোষ থাকি অপরদিকে সালাত অনাদায়, গীবত, মিথ্যা, কামাচার, পাপাচার ইত্যাদির মত জঘন্যতম অপরাধেও কেউ কেউ লিপ্ত হই। রমজানের যে শিক্ষা তা আমরা শুধু উপোষ থাকার মাধ্যমে পালন করি। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : কত সাওম পালনকারী রয়েছে যারা অনাহার ছাড়া আর কিছুই পায় না। (মুসনাদ আহমাদ) অন্যত্র তিনি বলেছেন : যে মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মূর্খতা পরিত্যাগ করতে পারল না তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। (অর্থাৎ তার এ রোজার দিকে আল্লাহ ভ্রুপে করেন না এবং তার রোজা কবুল করেন না)। (সহীহ বুখারী) তাই সাওম পালনের সাথে সাথে অন্যান্য পাপ থেকে যেন মুক্ত থাকা যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। রোজার অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হলো : গরীব দুঃখিদের প্রতি মিল ও সহানুভূতি। সারাদিন অভুক্ত থাকার মাধ্যমে মানুষ যেন তার গরীব ভাই যে প্রায়ই বা মাঝে মাঝে উপোষ থাকে তার দুঃখ, দুর্দশা ও কষ্ট অনুভব করতে পারে। বুঝতে পারে যে, সমাজের অনেক লোকদের তুলনায় সে খুব ভালো অবস্থানে আছে। তাদের সাথে দুঃখ-কষ্ট ভাগাভাগি করতে পারে। কিন্তু আমরা যারা মধ্যবিত্ত বা ধনী আমরা কখনো রোজা থেকে এ শিক্ষাটি গ্রহণ করতে পেরেছি কি? বরং দেখা যায় রমজান মাসের বাজেট অন্যান্য মাসের তুলনায় অনেক বেশি থাকে। সারা দিন উপোষ থাকার পর ৬/৭ আইটেম বা তারও বেশী আইটেম দিয়ে ইফতার করলে কি গরীবদের প্রতি সহানুভুতি প্রকাশ করা হয়? অনুরূপ সেহরীতে মুরগী, গরু, দামী -দামী খাবার খেয়ে রোজা রাখার মাধ্যমে কি গরীব দুঃখীদের সাথে মিল হচ্ছে? প্রশ্ন দু’টির উত্তরে হ্যাঁ বললে একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না। উদরপুর্তি করে খাওয়া যেমনি গরীব দুঃখীদের প্রতি সহানুভুতি প্রকাশের পরিপন্থী তেমনি এর দ্বারা রোজার আরো একটি মহভ উদ্দেশ্য ব্যহত হয়। তা হলো, রোজাদার নিজের কামভাব ও পশু প্রবৃত্তিকে দমন করা এবং নূরানী শক্তিকে বর্ধিত করা। এগার মাস প্রচুর খাওয়ার পর এক মাস কিছুটা কম খেলে কেউ প্রাণ হারায় না। ইমাম গাজ্জালী রাহ. বলেন, “রোজার উদ্দেশ্য হল শয়তান ও নফসকে দমন করা। কিন্তু ইফতারের সময় যদি বেশি খায় তবে তার উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। এতে আমরা শুধু আহারের সময় পরিবর্তন করলাম। আমরা রমজানে অন্য মাসের তুলনায় অধিক পরিমাণ খাদ্য সামগ্রীর আয়োজন করি এবং দিনভর উপবাস থেকে মজার খানায় ঝাপিয়ে পড়ি। এটা নিঃসন্দেহে কামভাবকে দমন না করে তাকে আরও উত্তেজিত করে দেয়।” হাদীসে এসেছে যে, রাসূলুল্লাহর সা. খেজুর পেলে খেজুর দিয়ে অন্যথায় পানি দিয়ে ইফতার ও সাহরী করতেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : প্রত্যেক জিনিসের যাকাত রয়েছে, আর শরীরের যাকাত হল রোজা (ইবনে মাজাহ) রমজান বরকত ও ত্যাগের মাস। কিন্তু এখন যেন এ মাসটি উন্নত খাবার খাওয়ার মাস। কে কত উন্নত মানের খাবার এ মাসে খেতে পারি সেটিই যেন বড় একটি লক্ষ। আমরা যদি এ মাসটিতে গরীবদের প্রতি সহানুভুতি দেখিয়ে কম খাবার খাই এবং ইবাদাতের প্রতি গুরুত্ব বেশী দেই। সুতরাং স্বচ্ছতা ও জবাদিহিতা সম্পন্ন এবং দুর্নীতিমুক্ত সৎ মানুষ গড়ার জন্য রোজার প্রশিক্ষণ একটি কার্যকর ব্যবস্থা। রোজার এ শিক্ষাকে কাজে লাগাতে পারলে দুর্নীতিমুক্ত সুন্দর সমাজ গঠন করা সম্ভব।

ইসলাম আর্তমানবতার কল্যাণে নিবেদিত একটি পূর্ণাঙ্গ ইনসাফপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। অসহায় ও হতদরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে ইসলাম কঠোর তাগীদ দিয়েছে। রমজান মাসকে হাদীস শরীফে ‘শাহরুল মুওয়াসাত’ বা সহানুভূতির মাস বলা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমগ্র মানবজাতির মধ্যে সবচেয়ে উদার ও দানশীল ছিলেন। রমযান মাসে হযরত জিবরীল (আঃ) যখন নিয়মিত আসতে শুরু করতেন, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দানশীলতা বহু গুণ বেড়ে যেত। (বুখারী ও মুসলিম)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতদের বাস্তব শিক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে রমযান মাসে সাদকা খায়রাত ও বদান্যতার হাত বেশি করে প্রসারিত করতেন এবং এ মাসটিকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দানশীলতার ব্যাপারে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ধনীদের বিশাল ও বিলাসবহুল সম্পত্তিতে গরীবের অধিকার রয়েছে। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে : তোমাদের অর্থ সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে। (সূরা যারিয়াত-১৯)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি পেট পুরে আহার করে অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকে সে প্রকৃত ঈমানদার নয়। (বায়হাকী) যে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষের অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি হলো না, দানশীলতা ও সহানুভূতির গুণ তৈরি হলো না, তার রোজা নিছক উপবাস ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই যে ব্যক্তি মাহে রমযানে শুধু রোজা পালন করল, কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় দান-খয়রাত আত্মত্যাগের মাধ্যমে এগিয়ে এলো না সমাজের গরীব-দুঃখীদের পাশে যে ব্যক্তি রমযান মাসের দাবী পূরণে ব্যর্থ হলো। প্রতিটি রোজাদার মুমিন বান্দা রমযান মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে খাদ্য-পানীয়ের অভাবে গরীব-দুঃখী লোকরা যে কত অনুভব করে তার বাস্তব অভিজ্ঞতা লাভ করে। এজন্য তাদের মধ্যে দানের অনুভূতি সৃষ্টি হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি রমযান মাসে তার অধীনস্থ দাসের কাজের চাপ কমিয়ে দেবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন। (সহীহ ইবনে খুযাইমাহ) সমাজের ধনী সামর্থ্যবান রোজাদার ব্যক্তি সিয়াম পালনের সাথে গরীব-দুঃখী, দুস্থ, অভাবী, অনাথ, এতিম, মিসকিন এবং পথচারীকে প্রয়োজনে অর্থ বন্টন করে দেবে। তারা ক্ষুধার্ত হলে প্রয়োজনে সেহরী ইফতারের ব্যবস্থা করবে, এটা মাহে রমজানের সহানুভূতি প্রদর্শনের সুবর্ণ সুযোগ।

নবী করম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি একজন রোজাদারকে ইফতার করাবে সে তার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে এবং ওই রোজাদারের সওয়াব থেকে বিন্দুমাত্রও কমানো হবে না, আর যে ব্যক্তি রোজাদারকে পেট ভরে খাওয়াবে আল্লাহ তাকে আমার হাউস (হাউসে কাওসার) থেকে এমনভাবে পান করাবেন যাতে সে জান্নাতে প্রবেশের আগ পর্যন্ত আর কষ্ট পাবে না। (সহীহ ইবনে খুযাইমাহ) সুতরাং প্রত্যেক রোজাদার মুমিনের একান্ত কর্তব্য মাহে রমজানে রোজা পালনের সাথে সাথে স্বীয় অর্থসম্পদ দুস্থ মানবতার সেবায় ব্যয় করা, গরীব-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সহানুভূতি প্রদর্শন করা, তা হলেই রমজানের সিয়াম সাধনা সার্থক হবে।

ফিতরা রোজাকে পরিশুদ্ধ করে – زكاة الفطر طهرة للصائم

আমাদের প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের একটি অনুগ্রহ এই যে তিনি আমাদের ইবাদত-বন্দেগীতে কোন ত্রুটি হলে তার ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন। যেমন নফল নামাজ দ্বারা ফরজ নামাজের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন। এমনিভাবে সিয়াম পালনে যে সকল ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে থাকে তার ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার জন্য যাকাতুল ফিতর আদায়ের বিধান দিয়েছেন। সাথে সাথে দরিদ্র ও অনাহার ক্লিষ্ট মানুষেরা যেন ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে সে ব্যবস্থাও দিয়েছেন। কেউ যেন অর্থাভাবে ঈদের খুশী থেকে বঞ্চিত না থাকে সে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ইসলামী সমাজকে এ বিধান দিয়েছেন। এ ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করে থাকে। তিনিই তো সিয়াম পূর্ণ করা ও রমজানের রাতে কিয়ামসহ অন্যান্য নেক আমল এবং কল্যাণকর কাজ করার তওফীক দিয়েছেন।

ফিতরের বিধান : ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সিয়াম পালনকারীর জন্য সদকাতুল ফিতর আদায় অপরিহার্য করে দিয়েছেন। যা সিয়াম পালনকারীর অনর্থক কথা ও কাজ পরিশুদ্ধকারী ও অভাবী মানুষের জন্য আহারের ব্যবস্থা হিসেবে প্রচলিত। যে ব্যক্তি ঈদের সালাতের পূর্বে তা আদায় করবে তা সদকাতুল ফিতর হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। আর যে ব্যক্তি  ঈদের সালাতের পর আদায় করবে তা সাধারণ  সদকা বলে গণ্য হবে। (আবু দাউদ) অতএব সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু ওয়াজিব করেছেন তা পালন করা উম্মতের জন্য অপরিহার্য। আল্লাহর রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : যে রাসূলের আনুগত্য করল সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল। এবং যে মুখ ফিরিয়ে নিল আমি তোমাকে তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক পাঠাইনি। (সূরা নিসা-৮০) অতএব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা নির্দেশ দিয়েছেন তা মূলত আল্লাহরই নির্দেশ। আল্লাহর রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর রাসূলের। (সূরা নিসা-৫৯)

সাদাকাহ অর্থ দান করা, প্রদান করা। আর ফিতরা অর্থ ভঙ্গ করা। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম পালন করার পর ঈদের দিন সকালে খাবার গ্রহণের মাধ্যমে এক মাসে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যকে ভেঙে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসার যে প্রয়াস তা-ই ফিতরা। আর এ সিয়াম পালন করতে ছোটখাটো অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি হয়ে যাওয়া একেবারেই স্বাভাবিক। এ ত্রুটি-বিচ্যুতিকে যেন রোজার শেষের প্রথম দিনেই ঝেড়ে মুছে ফেলা যায়, তার জন্য যে দান নির্ধারিত করা হয়েছে তা-ই সাদাকাতুল ফিতর। এ দানের মাধ্যমে দীর্ঘ সিয়াম পালনের কোনো ঘাটতি থাকলে তাকে পরিশুদ্ধ করে সব রোজা আল্লাহ পরিপূর্ণ করে দেবেন। অন্য হাদীসে বলা হয়েছে : রোজার মাসের শেষ দিকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা অবশ্য কর্তব্য।

সাদাকাতুল ফিতর কার উপর ওয়াজিব ? যার কাছে ঈদের দিন স্বীয় পরিবারের একদিন ও একরাতের ভরন-পোষণের খরচ বাদে এক সা’পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী থাকবে তার উপরই সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে। যার উপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব তিনি নিজের পক্ষ থেকে যেমন আদায় করবেন তেমনি নিজের পোষ্যদের পক্ষ থেকেও আদায় করবেন। এ বিষয়ে ইমামদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত পরিলক্ষিত হয়। ইমাম শাফেয়ী, আহমদ ও মালেক রহঃ-এর মতে, যে ব্যক্তি নিজ ও নিজ পরিবারের লোকজনের জন্য এক দিনের অন্নবস্ত্রের খরচাদি ছাড়াও সাদাকাতুল ফিতরের সমতুল্য সম্পদের মালিক তার ওপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে। এ জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা শর্ত নয়। তাদের যুক্তি হলো, সাদাকাতুল ফিতর সংক্রান্ত যত হাদীস এসেছে তা সবই আম বা ব্যাপক। এসব হাদীসে নেসাব পরিমাণ মালের মালিক হতে হবে এমন শর্ত উল্লেখ নেই। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানিফা রহঃ-এর মতে যে ব্যক্তি ঈদের দিন পারিবারিক খরচাদি ছাড়াও নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকেন, তার ওপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। তাদের দলীল হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস : ধনী ছাড়া অন্যের ওপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব নয় । ধনীদের পক্ষ থেকে দান করা সাদাকাতুল ফিতরই উত্তম দান। তাদের মতে ধনী বলা হয়, যিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন। সুতরাং সাদাকাতুল ফিতরের ক্ষেত্রে এক বছর নেসাব পরিমাণ মাল অব্যাহতভাবে থাকা শর্ত নয়। বরং যে পরিমাণ মালের ওপর জাকাত ওয়াজিব হয় ঈদের দিন সকালে সে পরিমাণ মাল থাকলেই সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে।

আমাদের দেশে সাদাকাতুল ফিতরসংক্রান্ত অনেক কুসংস্কার রয়েছে। মূলত সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। ইমাম আবু হানিফা ও সাহেবাইনের মতে, প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। তাদের যুক্তি হলো, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : সাদাকাতুল ফিতর হলো গরীবের হক এবং তা আদায়কারী নারী ও পুরুষ সবার ওপর ওয়াজিব । ইমাম শাফেয়ীও আহমদ রাঃ-এর মতে, সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ফরজ। তাদের দলীল হলো আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাকাতুল ফিতর বা সাদাকাতুল ফিতরকে ফরজ করেছেন। ইমাম মালেক রাঃ ইবনে ওমর রাঃ-এর হাদীসের ভিত্তিতেই বলেছেন, হাদীসে ফারজা অর্থ কাদ্দারা। সুতরাং ফরজ সাব্যস্ত না হয়ে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ সাব্যস্ত হবে।

হাদীসে এক সা বা অর্ধ সা পরিমাণ খেজুর, আঙ্গুর, যব, কিশমিশ, গম ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে। মূলত সে সময়ের প্রেক্ষাপটে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এগুলোর কথা বলেছিলেন। বর্তমানে প্রত্যেক দেশের আলেম ওলামারা রমজানের মাঝামাঝিতেই জনপ্রতি সাদাকাতুল ফিতরের পরিমাণ কত হবে তা বলে দেন।

যাকাতুল ফিতর কাকে দেবেন ? নিজ শহরের অভাবী ও দরিদ্র মানুষদের মাঝে সদকাতুল ফিতর আদায় করবেন। যারা জাকাত গ্রহণের অধিকার রাখে এমন অভাবী লোকদেরকে সদকাতুল ফিতর প্রদান করতে হবে। একজন দরিদ্র মানুষকে একাধিক ফিতরা দেয়া যেমন জায়েজ আছে তেমনি একটি ফিতরা বণ্টন করে একাধিক মানুষকে দেয়াও জায়েজ। সাদাকাতুল ফিতরের মাল বা অর্থ তাদের দেয়া যাবে যারা জাকাতের অর্থ পাওয়ার হকদার। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের সূরা তাওবার ৬০ নাম্বার আয়াতের আলোকে এসব লোক হলো : ১. ফকির অর্থাৎ যার সামান্য সম্পদ আছে (মাল্লাহু শাইয়ুন) ২. মিসকিন অর্থাৎ যার কিছুই নেই (মান লাইছা লাহু শাইয়ুন) ৩. মুসাফির (ইবনুস সাবিল) ৪. আদায়কারী কর্মচারী ৫. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, ঋণ পরিশোধের কোনো উপায় নেই, ঋণের বোঝায় ভারাক্রান্ত ব্যক্তি, ৬. আল্লাহর পথে (ফি সাবিলিল্লাহ) দীন কায়েমের পথে, ৭. যেসব দাসদাসী মুক্তির ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ এবং ৮. ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য অমুসলিমকে। তবে সাদাকাতুল ফিতর বা ফিতরার টাকার পরিমাণ যেহেতু অল্প তাই নিজ আত্মীয় স্বজনের মধ্যে যারা গরীব রয়েছে তাদের মধ্যে বন্টন করাই বেশি কল্যাণের কাজ হবে। অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে ঈদের দিন সকালের মধ্যে ঈদের নামাজের আগেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করে দিতে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদগাহে যাওয়ার আগে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা প্রয়োজন। গোলাম ও শিশুদের ওপরও সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব, অথচ গোলাম তো কোনো কিছুরই মালিক নয়। আর শিশু তো শরীয়ত পালনে আদিষ্ট নয়, সুতরাং তারা কিভাবে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করবে? এ প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে, গোলামের সাদাকাতুল ফিতর মনিবের পক্ষ থেকে আর শিশুর সাদাকাতুল ফিতরা অভিভাবকদের পক্ষ থেকে আদায় করবে। যে শিশু ঈদের দিনে সুবহে সাদিকের আগে জন্মগ্রহণ করেছে তার পক্ষ থেকে অভিভাবকদের ওপর সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। আর ঈদের দিন সুবহে সাদিকের পর যে শিশু জন্মগ্রহণ করেছে তার ওপর সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হবে না। মোদ্দাকথা, পরিবারের সবার পক্ষ থেকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে।

রমযানের শেষ দশকের ফযীলত – فضل العشر الأواخر من رمضان

সমস্ত প্রশংসা মহান রাব্বুল আলামীনের জন্য, যিনি তার শ্রেষ্ঠ নবীর শ্রেষ্ঠ উম্মাতকে উপহার দিয়েছেন অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মাস রমযানুল মোবারক। এ মাসেই আল্লাহ তা’আলার পক্ষথেকে রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। রমযান মাসে সিয়াম সাধনায় মহান আল্লাহর অনন্ত অসীম রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। তাই তো রমযানের আগমনে আল্লাহ প্রেমিক বান্দার অন্তরে এক অনাবিল আনন্দধারা প্রবাহিত হয়। সকল ঈমানদারেরা শৃঙ্খলার মধ্যে থেকে এই পবিত্র মাসটি অতিবাহিত করে। মুসলিম উম্মাহর জন্য রমযান অত্যন্ত কাংক্ষিত ও প্রাপ্তির মাস। এ মোবারক মাসের শেষ দশকে রাব্বুল আলামীন লাইলাতুল কদর নামে এমন এক মহামূল্যবান ও মহিমান্বিত রজনী আমাদের দান করেছেন, যা ইতিপূর্বে কোন উম্মাতকে দেয়া হয়নি। লাইলাতুল কদর এমন একটি রজনী যা হাজার মাস (ইবাদাত) অপেক্ষা উত্তম। যে এ রাতে ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে ইবাদত-বন্দেগী করবে তার অতীতের পাপগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ রাতে ইবাদত-বন্দেগীতে বেশি সময় ও শ্রম দিতেন, যা অন্য কোন রাতে দেখা যেত না। যেমন মুসলিম শরীফে আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে এসেছে যে, তিনি এ রাতে কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে জাগ্রত থাকতেন এরপর সেহরী গ্রহণ করতেন। রমযানের শেষ দশক আসলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরনের লুঙ্গি শক্ত করে নিতেন। রাত্রি জাগরণ করতেন এবং পরিবারের সকলকে জাগিয়ে দিতেন। যেমন বোখারী ও মুসলিমে আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে এসেছে। তিনি এ দশদিনের রাতে মোটেই নিদ্রা যেতেন না। পরিবারের সকলকে তিনি এ রাতে ইবাদত-বন্দেগী করার জন্য জাগিয়ে দিতেন। এ দশদিনের একটি বৈশিষ্ট্য হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ শেষ দশদিনে মসজিদে এ’তেকাফ করতেন। প্রয়োজন ব্যতীত তিনি মসজিদ থেকে বের হতেন না।

লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব : আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন এ রাতকে সকল রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি তার কালামে পাকে এ রাতকে প্রশংসার সাথে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইরশাদ করেন : (১) হা-মীম, (২) শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, (৩) আমি তো এটা (কুরআনুল কারীমকে) অবতীর্ণ করেছি এক মুবারক রজনীতে; আমি তো সতর্ককারী। (৪) এ রজনীতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়; (৫) আমার আদেশক্রমে, আমি তো রাসূল প্রেরণ করে থাকি।  (সূরা,দুখান) ব্যাখ্যা : মুবারক রজনী দ্বারা মুফাস্সিরগণ লাইলাতুল কদরকে বুঝিয়েছেন। বরকতময় রজনী হল লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তা’আলা একে বরকতময় বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এ রাতে রয়েছে যেমন বরকত তেমনি কল্যাণ ও তাৎপর্য। বরকতের প্রধান কারণ হল এ রাতে আল-কোরআন নাযিল হয়েছে। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-সিদ্ধান্ত লওহে মাহফুজ থেকে ফেরেশতাদের হাতে অর্পণ করা হয় বাস্তবায়নের জন্য। এ রাতের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হল আল্লাহ তা’আলা এ রাত সম্পর্কে একটি পূর্ণ সূরা অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : (১) নিশ্চয় আমি একে (কুরআনুল কারীমকে) নাযিল করেছি কদরের রাতে। (২) কদরের রাত সম্পর্কে আপনি কী জানেন ? (৩) কদরের রাত হচ্ছে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (৪) এই রাতে প্রত্যেক কাজের জন্য ফেরেশতারা ও রূহ জিবরাঈল (আঃ) অবতীর্ণ হন তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। (৫) এ রাত সালাম তথা নিরাপত্তার রাত, যা ফজর হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সূরা,কদর)

লাইলাতুল কদরের ফযীলত ও মর্যাদা : মহান রাব্বুল আলামীন বিশ্ব মানবের হিদায়াত ও পথ নির্দেশিকা মহাগ্রন্থ আল-কুরআন এ রজনীতেই লাওহে মাহ্ফুজ থেকে প্রথম আসমানে সম্পূর্ণ রূপে অবতীর্ণ করেছেন। অতঃপর সুদীর্ঘ তেইশ বছর যাবৎ প্রয়োজন অনুসারে বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। (ইবনে কাসীর) দুনিয়ার বুকে সর্বশ্রেষ্ঠ মূল্যবান ও মর্যাদাপূর্ণ রজনী হলো কদরের রজনী। এ রজনীর গুরুত্ব ও ফযীলত সম্পর্কে উম্মতে মুহাম্মদীকে অবহিত করানোর জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ”সূরা কদর” নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা অবতীর্ণ করেছেন। এ সূরায় উম্মাতে মুহাম্মদীকে সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। এই একটি রাতের ইবাদাত হাজার মাস ইবাদাতের চেয়েও উত্তম বলে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে।

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি কদরের রাতে পূর্ণ বিশ্বাস ও সওয়াবের নিয়্যাতে ইবাদাত করবে তার অতীতের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে। (বুখারী) হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রমযান মাসের আগমনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন : দেখ এ মাসটি তোমাদের কাছে এসে উপস্থিত হয়েছে। এতে এমন একটি রাত আছে যা হাজার মাস থেকে অধিক উত্তম। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে যাবতীয় কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। আর চিরবঞ্চিত ব্যক্তিই কেবল এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়। (ইবনে মাযাহ)

আ’ইশা সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন : রমযানের শেষ ১০ দিন শুরু হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল কদর লাভ করার জন্য পরিপূর্ণ প্রস্তুতি নিতেন। নিজে রাত জাগতেন এবং নিজের পরিবারের লোকজনকেও জাগাতেন। (বুখারী ও মুসলিম)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : শবে কদরে হযরত জিব্রীল (আঃ) ফেরেশতাদের বিরাট বাহিনী নিয়ে অবতীর্ণ হন এবং যারা এই রাতে ইবাদাত করে তাদের জন্য রহমাতের দু’আ করতে থাকেন। (বায়হাকী)

মুসলিম ভাইয়েরা! আল-কোরআনে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি লাইলাতুল কদর কোন রাত। তবে কুরআনের ভাষ্য হল লাইলাতুল কদর রমযান মাসে। কিয়ামত পর্যন্ত রমযান মাসে লাইলাতুল কদর অব্যাহত থাকবে। এবং এ রাত রমযানের শেষ দশকে হবে বলে সহী হাদীসে এসেছে। এবং তা রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে হাদীসে এসেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর। (বুখারী)  এবং রমযানের শেষ সাত দিনে লাইলাতুল কদর থাকার সম্ভাবনা অধিকতর। যেমন হাদীসে এসেছে, যে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করতে চায় সে যেন শেষ সাত দিনে অন্বেষণ করে। (বুখারী ও মুসলিম) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ রাতকে গোপন রেখেছেন আমাদের উপর রহম করে। তিনি দেখতে চান এর বরকত ও ফজীলত লাভের জন্য কে কত প্রচেষ্টা চালাতে পারে। লাইলাতুল কদরে আমাদের করণীয় হল বেশি করে দোয়া করা। আয়েশা (রাঃ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, লাইলাতুল কদরে আমি কি দোয়া করতে পারি? তিনি বললেন, বলবে—

اَللّهُم إِنَّكَ عَفُوٌّ  تٌحِبُّ العَفْوَ فَاعْفُ عَنِّيْ . رواه الترمذي

হে আল্লাহ ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। (তিরমিযী)

নিঃসন্দেহে ঐ বরকতপূর্ণ রাতটি যে ব্যক্তি অবহেলায় বা অলসতায় অবমূল্যায়ন করল, এর যথার্থ গুরুত্বারোপ করল না সে সমূহ কল্যাণ থেকে নিজকে বিরত রাখল। প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির উচিত যে, ঐ রাতের যথাযথ ভাবে হক আদায় করে মহান আল্ল¬াহর পক্ষথেকে কল্যাণ, ফযীলত, বরকত ও আশাতীত সওয়াব লাভে ধন্য হওয়া। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে বেশী-বেশী করে ইবাদাত-বন্দেগীর মাধ্যমে শেষ দশকের ফযীলত অর্জন করে তার নৈকট্য লাভের তাওফীক দান করুন। আমীন .

ইতিকাফের গুরুত্ব ও ফজীলত – فضل الإعتكاف

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সুসংবাদবাহী মাস রমজান। চন্দ্র মাসের মধ্যে রমজান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এ মাস বিশেষ সম্মানিত ও মর্যাদামণ্ডিত হওয়ার পেছনে যে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। সেগুলো হচ্ছে : সিয়াম, মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাজিল, লাইলাতুল কদর ও ইতিকাফ। এ বৈশিষ্ট্যগুলো শুধু এ মাসের সাথেই সম্পৃক্ত। তাই পুরো মাসই বরকত ও সৌভাগ্যের সওগাত নিয়ে আসে। বিশ্ব মুসলিম এ মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, সংযম অবলম্বন, তাকওয়া অর্জন ও অপরের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শনের কঠোর অনুশীলনে আত্মনিয়োগ করেন। ফলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে পুণ্যময় পরিবেশ বিরাজ করে।

ইতিকাফের পরিচয় : ইতিকাফ আরবী শব্দ, অর্থ হলো : অবস্থান করা, কোনো জিনিসকে বাধ্যতামূলক ধরে রাখা, কোনো জিনিসের ওপর নিজেকে শক্তভাবে আটকিয়ে রাখা। যে লোক মসজিদে অবস্থান গ্রহণ করেছে তাকে আকিফ্ বা মুতাকিফ বলা হয়। যেমন-আল্লাহর বাণী : আর তোমরা মসজিদের নির্দিষ্ট স্থানসমূহে অবস্থানরত। (সূরা বাকারা-১৮৭) শরীয়তের পরিভাষায় যে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামায়াত সহকারে নিয়মিত আদায় করা হয় এমন মসজিদে আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে নিয়ত সহকারে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। ইতিকাফের প্রকারভেদ : ইতিকাফ তিন প্রকার,

১. সুন্নাতে মুআক্কাবাদ : মাহে রমজানের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ।

২. ওয়াজিব ইতিকাফ : যে ব্যক্তি ইতিকাফ করার মানত করবে তার ওপর ইতিকাফ আদায় করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। মানত ইতিকাফের জন্য সাওম পালন করা শর্ত। যদি নির্ধারিত কোনো সময় বা স্থানের মানত করে তাহলে ওই সময় ও স্থানেই ইতিকাফ করতে হবে।

৩. মুস্তাহাব : রমজান মাস ছাড়া অন্য যেকোনো সময় মসজিদে ইতিকাফের নিয়তে অবস্থান করা মুস্তাহাব। তবে সুন্নাত ও মুস্তাহাব ইতিকাফের জন্য সাওম পালন করা শর্ত নয়। (বাদায়েউস সানায়ে)

ইতিকাফের উদ্দেশ্য : ইতিকাফের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রাহঃ) বলেন, ইতিকাফের উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তায়ালার পাক জাতের সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন যেন সব দিক থেকে ফিরে একমাত্র তাঁরাই সাথে একত্র হওয়া যায় এবং তিনি ব্যতীত সব কিছু থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে তারই মধ্যে ডুবে যাওয়া যায় এবং যাবতীয় ব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে তারই পবিত্র সত্তায় মগ্ন হওয়া। ধারণাসহ সব ক্ষেত্রে তার পবিত্র জিকর ও মুহব্বতকে স্থান দেয়া, এমনকি তামাম সৃষ্টিকুলের ভালোবাসার পরিবর্তে যেন আল্লাহ পাকের সাথে ভালোবাসা সৃষ্টি হয়ে যায়।

হযরত আবু সাঈদ কুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, রমজানের প্রথম দশকে ইতিকাফ করতেন, তারপর তিনি দ্বিতীয় দশকেও ইতিকাফ করলেন। তারপর তিনি যে তুর্কি তাঁবুর ভেতরে অবস্থান করছিলেন তা থেকে মাথা বের করে বললেন, আমি এ রাতটি অর্থাৎ শবে কদরের সন্ধানে প্রথম দশক ইতিকাফ করলাম। তারপর মধ্যম দশকেও ইতিকাফ করলাম, তারপর জনৈক আগন্তুক (ফেরেশতা) মারফত আমাকে বলা হলো রাতটি শেষ দশকে নিহিত রয়েছে। সুতরাং আমার সাথে যারা ইতিকাফ করেছে, তাদের শেষ দশকে ইতিকাফ করা উচিত। (মিশকাত) এ হাদীস থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, কদরের রাতটি পাওয়াই ইতিকাফের উদ্দেশ্য।

ইতিকাফের শর্তাবলী : ইতিকাফের চারটি শর্ত রয়েছে যা ব্যতিরেকে ইতিকাফ শুদ্ধ হবে না।

১. মসজিদে অবস্থান : তবে মহিলারা নিজ নিজ বাড়িতে ইতিকাফ করবে।

২. হাদাসে আকবর থেকে পাক হওয়া : অর্থাৎ নারী-পুরুষের গোসল ফরজ হলে তা করে শরীর পাক করে নেবে এবং নারী হায়েজ নেফাস থেকে পাক হবে।

৩. রোজা : ইতিকাফের জন্য রোজাও শর্ত। অবশ্য তা শুধু ওয়াজিব ইতিকাফের জন্য। মুস্তাহাব ও সুন্নত ইতিকাফের জন্য রোজা শর্ত নয়। (আসান ফেকাহ)

ইতিকাফের আদাব : নিন্মোক্ত বিষয়গুলো ইতিকাফে মুস্তাহাব।

১. কল্যাণকর কথা ছাড়া বাজে কথা না বলা। তবে নীরবে সময় কাটা মাকরুহ।

২. ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম মসজিদ গ্রহণ করা। অর্থাৎ যে মক্কাতে থাকে তার জন্য মসজিদে হারাম। মদিনাতে অবস্থানকারীর জন্য মসজিদে নব্বী। যে ব্যক্তি বাইতুল মুক্কাদাসে থাকে তার জন্য মসজিদে আকসা। অন্যদের জন্য জামে মসজিদে ইতিকাফ করা।

৩. কুরআন তিলাওয়াত, মাসনুন জিকির, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর দরুদ পড়া, ওয়াজ নসিহত করা এবং ধর্মীয় বই পুস্তক অধ্যয়ন ও রচনায় লিপ্ত থাকা (আল ফিকহুর মুইয়াসসাল)

ইতিকাফের ফজিলত ও গুরুত্ব : ইসলাম যেহেতু বৈরাগ্যের ধর্ম নয়, সামাজিকতার ধর্ম, তাই আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্য অন্যান্য জাতির সাধক, সন্ন্যাসীদের মতো লোকালয় পরিত্যাগ করতে বলা হয়নি, বরং লোকালয়ে ইবাদত কেন্দ্র মসজিদে অবস্থানের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভে তৎপর হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে। ইতিকাফের এই পুণ্য সময়টুকুতে আল্লাহপ্রেমে নিবেদিত সাচ্চা মুমিন ব্যক্তিদের সৎ সাহচর্য লাভেরও এক অপূর্ব সুযোগ উপস্থিত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির মানসে এক দিন ইতিকাফ পালন করে, আল্লাহ তার এবং জাহান্নামের মধ্যে তিনটি গহ্বর সৃষ্টি করবেন যার দূরত্ব আসমান জমিনের দূরত্বের চেয়ে অধিক।  (তিবরানী) ইতিকাফ জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাধ্যম। ইতিকাফ সুন্নতে মুআক্কাদায়ে কিফায়া। এটি মসজিদে যদি কিছুসংখ্যক সাওম পালনকারী ইতিকাফ করেন তাতে গোটা মহল্লা বা মসজিদের মুসল্লিদের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। আর যদি কেউ ইতিকাফ না করেন গোটা মহল্লাবাসী গুনাহগার হবে।

ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইতিকাফকারী সম্পর্কে বলেন, সে ব্যক্তি গুনাহর আবিলতা থেকে মুক্ত থাকে এবং তার জন্য সেসব নেকি লিপিবদ্ধ করা হয় যেমনটি সেসব পুণ্য কাজ যারা করে তাদের জন্য লিখিত থাকে  (মিশকাত)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি কোনো একদিন ইতিকাফ অবস্থায় মসজিদে অতিবাহিত করে জাহান্নাম তার থেকে আসমান-জমীনের দূরত্বের তিন গুণ দূরে সরে যায়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন : যে ব্যক্তি এক দিনও ইতিকাফে বসবে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তার মধ্যে এবং জাহান্নামের মধ্যে তিন খন্দকের ব্যবধান করবেন। এক খন্দক পাঁচশত বছরের পথ।

হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশকে ইবাদত-বন্দেগীর কাজে এতই কষ্ট স্বীকার করতেন যা অন্য সময় করতেন না। (তিরমিজী) হযরত জয়নব বিনতে সালমার বর্ণনায় আরো বলিষ্ঠভাবে বিবৃত হয়েছে,  রমজানের শেষ দশকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ঘরের লোকদের মধ্যে জেগে ইবাদত করতে সক্ষম এমন কাউকে ঘুমাতে দিতেন না এবং প্রত্যেককেই জাগ্রত থেকে ইবাদত করার জন্য প্রস্তুত করতেন।  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন : যে ব্যক্তি খালেস নিয়তে এবং খাঁটি ঈমানের সাথে সওয়াবের উদ্দেশ্যে ইতিকাফ করবে, তার পূর্ববর্তী সব সগীরাহ গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। সুতরাং উপরিউক্ত হাদীসের মাধ্যমে ইতিকাফের মহত্ত ও ফজীলত সবার কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট ।

যেসব কারণে ইতিকাফ ফাসেদ হয় : নিন্মোক্ত কারণে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যায়, আবার তা কাজা পালন করতে হয়।

প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার মতো মানবিক প্রয়োজন তথা প্রস্রাব, পায়খানা অথবা শরয়ী প্রয়োজন যথা জুমার জামাতে শরীক হওয়া ব্যতীত ইতিকাফরত ব্যক্তি মসজিদ থেকে অল্প সময়ের জন্য বের হলে হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ইতিকাফরত থাকতেন তখন মসজিদ থেকে হুজরার দিকে মাথা বাড়িয়ে দিতেন। আমি তাঁর চুল আঁচড়িয়ে দিতাম এবং তিনি মানবিক প্রয়োজন ছাড়া ঘরে প্রবেশ করতেন না। (অথচ তাঁর ঘর ছিল মসজিদসংলগ্ন) মানবিক প্রয়োজনে বাইরে গেলে এ দিক সে দিক না গিয়েও না দাঁড়িয়ে রোগীর অবস্থা জিজ্ঞাসা করা অথবা জানাজার নামাজ আরম্ভ হয়ে গেছে দেখলে তাতে শামিল হওয়া জায়েজ। কেননা হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত আবু দাউদের হাদীসে আছে : নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইতিকাফ অবস্থায় হাঁটতে হাঁটতে পথের এ দিক সে দিক না গিয়েও দাঁড়িয়ে রোগীর অবস্থা জিজ্ঞাসা করতেন।  (মিশকাত)

মহিলাদের হায়েজ অথবা নেফাসরত হলে : স্ত্রী সম্ভোগ অথবা সম্ভোগের প্রতি আকর্ষণীয় বিষয় যেমন চুমো দেয়া অথবা যৌন উত্তেজনার সাথে সম্পর্ক করা। ইতিকাফ অবস্থায় বিনা প্রয়োজনে পার্থিব কাজে লিপ্ত হওয়া মাকরূহের তহরিমী। কেউ ইতিকাফরত মসজিদ থেকে ভুলে ও সামান্য সময়ের জন্য বের হয়ে পড়লে ইতিকাফ ফাসেদ হয়ে যাবে। (শরহে বেকায়া আরবী) ফরজ গোসল ব্যতীত অন্য কোনো গোসলের জন্য ইতিকাফকৃত ব্যক্তি মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ ভেঙে যাবে। তবে মসজিদসংলগ্ন বাথরুম ও গোসলখানা থাকলে, অতি মাত্রা গরমের কারণে শরীর অতিষ্ঠ হয়ে পড়লে কিছু পানি শরীরের ওপর ঢেলে দেয়া যাবে, কিন্তু সাবান দিয়ে ঘষামাজা করা যাবে না।

অতএব আমাদের উচিত রোজা, ইবাদত ও ইতিকাফের মধ্য দিয়ে রমজান মাস অতিবাহিত করা, যাতে রমজান মাস যে সওগাত নিয়ে আমাদের মাঝে উপস্থিত হয় তা যেন আমরা আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারি। তাহলে রমজানের পরবর্তী মাসগুলোতে সঠিকভাবে দ্বীনের ওপর অটল থাকতে পারব। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের রোজা পালনের সাথে ইতিকাফ করার সুযোগ দান করুক।

রোযার মূল শিক্ষা তাকওয়া অর্জন – مدرسة رمضان لتعليم التقوى

পবিত্র মাহে রমযানের রহমতের প্রথম দশ দিন আমরা অতিক্রমকরে, মাগফিরাতের দশ দিনও অতিক্রম করছি। ইতিমধ্যে পাঁচটি রোযা অতিবাহিত হয়ে গেছে। রমযানের প্রভাবে সর্বত্র একটা ধর্মীয় আমেজ বিরাজ করছে। তাই ব্যক্তিগত আচার আচরণে কারো চোখে কোন অমিল ধরা পড়লে বলা হচ্ছে রমযান মাস রোযা রেখেছেন তাই সংযত হওয়া প্রয়োজন। এটা অবশ্য ভাল দিক। কারণ মুসলমান রমযানে সংযমী হয়ে চলবেন তা সবাই আশা করে। রোযার উদ্দেশ্যও মানুষকে আদর্শ নাগরিকে উন্নীত করা। আর একজন মানুষ আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি জাগ্রত হওয়ার মাধ্যমেই আদর্শ মানুষে পরিণত হতে পারে। রোযার মাধ্যমে যে তাকওয়া অর্জনের কথা বলা হয়েছে একমাত্র সে তাকওয়াই মানুষের মধ্যে এ অনুভূতি জাগ্রত করতে পারে।

রোযার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহভীতি অর্জন। আল্লাহ মহাগ্রন্থ আলকোরআনে বলেছেন : হে ঈমানদার লোকেরা তোমাদের উপর রোযাকে ফরয করা হয়েছে যেমনি ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহভীতি অর্জন করতে পার। (সূরা বাকারাহ-১৮২) যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদেরকে মুত্তাকী বলা হয় এবং মুত্তাকীরা হচ্ছে আদর্শ মানুষ।

মুসলমানরা রমযানে যে আল্লাহভীতি অর্জন করবে রমযানের পর বাকী ১১ মাস সে আল্লাহভীতি বজায় রাখবে। আল্লাহভীতি মূল তাৎপর্য হল একজন মুসলমান হিসেবে তা সাধারণ থেকে সর্বোচ্চ যে পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করুন না কেন প্রতিটি দায়িত্ব পালনকালে সকল চিন্তা, কর্মনীতি ও কর্মসূচী প্রণয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজ বাস্তবায়নে আল্লাহর কাছে জবাবাদিহিতার দায়িত্বানুভূতি থাকতে হবে। মুসলিমদেশের রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি, বিচারপতি থেকে শুরু করে নেতৃস্থানীয় রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিক, শিল্পপতি, সরকারী কর্মকর্তাসহ সব পর্যায়ের নেতৃবৃন্দরা অধিকাংশই মুসলমান এবং রমযানে রোযা পালন করেন। কিন্তু তারা কি রাষ্ট্র, সরকার ও জাতীয় পর্যায়ের দায়িত্ব পালনকালে সকল চিন্তা, কর্মনীতি প্রণয়ন ও সিদ্বান্ত গ্রহণ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আল্লাহ কি করলে খুশী এবং কি কাজ করলে বা সিদ্ধান্ত নিলে অসন্তুষ্ট হন তা কি গভীরভাবে চিন্তা করেন? এক কথায় তারা কি এসব ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার এ বিষয়টি চিন্তা করেন?

অপরদিকে সরকারী বেসরকারী অফিস আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী, হাট-বাজারে বিক্রেতাসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ যারাই কোন না কোন দায়িত্বপূর্ণ কাজ করছেন তারাও কি যথাযথ দায়িত্বানুভূতি অর্থাৎ আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতি নিয়ে কাজ করছেন?

সর্বোপরি বাংলাদেশেও কি রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রী, এমপি, বিচারপতি, সচিব, জেলা উপজেলা পর্যায়ের সকল কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিক্ষক, শিল্পপতি, ব্যবসায়ীসহ সর্বস্তরের মুসলমানকে প্রতিটি চিন্তা, কর্মসূচী, কর্মনীতি প্রণয়ন, সিদ্বান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার কোন প্রতিফলন কি আমরা দেখতে পাই? তার উত্তর পুরো ইতিবাচক নয়।

বাংলাদেশে অন্য ১১ মাস সরকারী অফিস আদালতে যেমন ঘুষ-দুর্নীতি চলে রমজান মাসে কি কম হয়? অবশ্য এ পর্যন্ত তার কোন নজীর নেই অর্থাৎ রমযান মাস ও অন্য ১১মাসের মধ্যে কোন তফাৎ দেখা যায় না। ব্যবসায়ীদের একটা অংশ সারা বছর যেভাবে শুধু লাভের আশায় ব্যবসা করে তেমনি রমযানে সুযোগ বুঝে আরো মুনাফা করার জন্য আরো ফন্দি ফিকির করে। যার কারণে রমযানে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আরো বেড়ে যায়। কেন এমনটা হচ্ছে?

আসলে যে উদ্দেশ্যে আল্লাহ আমাদের জন্য রোযা ফরয করেছেন সেই শিক্ষা ও চেতনা আমাদের এখনও জাগ্রত হয় নাই। আমরা শুধু রোযা পালনই করছি কিন্তু রোযার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করছি না। রোযা সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা কোরআনে কি বলছেন তা জানছি না, হাদীসে কি আছে তা পড়ছি না। তাই মুসলমানদের রোযা পালনের সাথে সাথে কুরআনকে বুঝতে হবে, কুরআনকে জানতে হবে। তাই মুসলমানরা রোযা পালন করছে ঠিকই কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রে তার প্রভাব পড়ছে না। এর জন্য প্রয়োজন মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে রাষ্ট্রের সকল পর্যায় থেকে রমযান ও রোযার শিক্ষা ও তাৎপর্য প্রচার করা। এক কথায় প্রতিটি মুসলমান কি করে এ রমযানে রোযার মূল শিক্ষা তাকওয়া অর্জন করে মুত্তাকী মুসলমান হতে পারে তার দিক নির্দেশনা প্রদান করা। আর তাহলেই রোযার যে মূল শিক্ষা তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহভীতি অর্জন তা সর্বস্তরের মানুষের চরিত্রে প্রতিফলন হবে। আর তখনই রমযানের প্রভাবে একটি আদর্শ ও সুন্দর সমাজ,সরকার ও রাষ্ট্র গঠিত হবে। যেখানে মানবতার কল্যাণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। সকল মুসলমাদের এটাই প্রত্যাশা। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে রোযার যে মূল শিক্ষা তাকওয়া অর্থাৎ আল্লাহভীতি অর্জন করা, সেই তাকওয়া অর্জন করার তাওফীক দান করুন। আমীন