ঈদুল ফিতর, কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন

সমস্ত প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। আমরা তার প্রশংসা করি, তার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি। তার নিকট ক্ষমা ও মাগফিরাত প্রার্থনা করি। আমরা আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রবৃত্তিজাত অনিষ্ট ও কর্মের কুপ্রভাব হতে আশ্রয় চাই। আল্লাহ তা’আলা যাকে হেদায়েত দান করেন, তার কোন ভ্রষ্টকারী নেই। আর যাকে তিনি ভ্রষ্ট করেন, তার কোন হেদায়েতকারী নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই। তিনি এক, ও একক, তার কোন শরীক নেই। আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ ! সালাত, সালাম ও বরকত অবতীর্ণ করুন তার উপর, তার বংশধর ও সাহাবাদের উপর, এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা তার পথে ধাবিত হবে ও তার আদর্শের অনুসরণ করবে তাদের উপর।

আল্লাহ তা’আলা  ইরশাদ করেন :- সদাচারের প্রতিদান সদাচার ছাড়া আর কি হতে পারে? (সূরা আর-রাহমান-৬০) অর্থাত যেসব মানুষ আল্লাহ তা’আলার জন্য সারা জীবন পৃথিবীতে নিজেদের প্রবৃত্তির ওপর বিধি-নিষেধ ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছিল, হারাম থেকে আত্মরক্ষা করে হালালের ওপর সন্তুষ্ট থেকেছে, ফরযকে ফরয মনে করে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যসমূহ পালন করেছে, ন্যায় ও সত্যকে ন্যায় ও সত্য মনে করে হকদারদের হকসমূহ আদায় করেছে এবং সর্বপ্রকার দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করে অন্যায় ও অকল্যাণের বিরুদ্ধে ন্যায় ও কল্যাণকে সমর্থন করেছে। আল্লাহ তাদের এসব ত্যাগ ও কুরবানীকে ধ্বংস ও ব্যর্থ করে দেবেন এবং কখনো এর কোন প্রতিদান তাদের দেবেন না তা কি করে সম্ভব। আল্লাহ তা’আলার অবশ্যই তাদের প্রতিদান দেবেন। মাহে রমজান ছিল তাওবা ও ক্ষমার মওসুম, মাগফিরাত বা ক্ষমার মাস সেই মাস আমরা অতিবাহিত করেছি।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আল্লাহর দিকে বারবার প্রত্যাগমনকারী, তার ইবাদতকারী, তার প্রশংসা বানী উচ্চারণকারী, তার জন্য যমীনে বিচরণকারী, তার সামনে রুকু ও সিজদাকারী, সৎকাজের আদেশকারী, অসৎকাজ থেকে বিরতকারী, এবং আল্লাহর সীমারেখা সংরক্ষণকারী, (সেই সব মুমিন হয়ে থাকে যারা আল্লাহর সাথে কেনাবেচার সওদা করে) আর হে নবী! এ মুমিনদেরকে সুখবর দাও! (সূরা তাওবা-১১২)

আনন্দ ভরা, ভ্রাতৃত্ব-ভালবাসা ও সহমর্মিতায় অম্লান ঈদুল ফিতর, মুসলিমদের অন্যতম আনন্দ উতসব। হিজরী বছরের দশম-মাস শাওয়াল, শাওয়ালের প্রথম দিন মু’মিনদের অনাবিল খুশির দিন, ক্ষমার বার্তা নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর।

রহমাত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমযানুল মোবারক শেষ হলেই আমাদের মাজে মহাপুরস্কারের পয়গাম নিয়ে আসে ঈদুল ফিতর। আজ ঈদুল ফিতর, মুবারক উপলক্ষ। আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে হাদিয়া হিসেবে-আসা মুবারক ও সম্মানিত উপলক্ষ।

সাহাবী আনাস (রা) বর্ণানা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনায় হিজরত করে এলেন, তিনি মদীনাবসীকে দু’টি দিবসে খেল-তামাশা করতে দেখলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন : এ দিবস দু’টি কী? তারা বললেন, আমরা জাহিলীযুগে এ দিবস দু’টিতে খেলতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে এ দু’টির পরিবর্তে উত্তম দিবস দিয়েছেন। ঈদুল আযহা  ও ঈদুল ফিতর। (আবূ দাউদ)

ঈদুল ফিতরের এ মহান দিবসে, আনন্দের শত আবহ বিজড়িত এ সকালে আমরা যেভাবে নামায আদায়ের মাধ্যমে উতসব পালন করছি, তা আল্লাহ তা‘আলার একটি বিশেষ করুণা ও দান। আমরা দীর্ঘ একটি মাস সিয়াম সাধনা করে, রাতের বেলায় তারাবীহ্-এর নামায পড়ে, কুরআন শুনে ও তিলাওয়াত করে, গরীব-মিসকীনকে দান-সাদকা করে, রোযাদারকে ইফতার করিয়ে, কল্যাণমূলক কাজে সহায়তা করে আমাদের আনন্দকে পরিপূর্ণ করার জন্য আজ উপস্থিত হয়েছি ঈদের নামাযে। এভাবে আনন্দ ও পবিত্রতার অকল্পনীয় সংমিশ্রণে কেবল মুসলিম উম্মাহই ঈদ উদযাপন করে। এটা  নিশ্চয় এক নিয়ামত যা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সম্মানিত করেছে।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- বল, আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে। সুতরাং এ নিয়েই যেন তারা খুশি হয়। এটি যা তারা জমা করে তা থেকে উত্তম। (সূরা ইউনুস-৫৮)

অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- আর বলো, সেই আল্লাহর প্রশংসা, যিনি কোনো পুত্রও গ্রহণ করেননি। তাঁর বাদশাহীতে কেউ শরীকও হয়নি এবং তিনি এমন অক্ষমও নন যে, কেউ তাঁর সাহায্যকারী ও নির্ভর হবে। আর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করো, চূড়ান্ত পর্যায়ের ন্ত্রষ্ঠত্ব। (সূরা ইস্রা-১১১)

ঈদ আরবী শব্দ, অর্থ-আনন্দ, ফিতর-অর্থ, রোজা ভঙ্গ করা। এমন দিনকে ঈদ বলা হয় যে দিন মানুষ একত্র হয় ও দিনটি বার বার ফিরে আসে। যেহেতু এ দিনটি বার বার ফিরে আসে তাই এর নাম ঈদ। এ শব্দ দ্বারা এ দিবসের নাম রাখার তাতপর্য হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ দিবসে তার বান্দাদেরকে নেয়ামত ও অনুগ্রহ দ্বারা বার বার ধন্য করেন ও বার বার তার এহসানের দৃষ্টি দান করেন। যেমন রমজানে পানাহার নিষিদ্ধ করার পর আবার পানাহারের আদেশ প্রদান করেন। সাদকাতুল-ফিতর, হজ্জ-জিয়ারত, কুরবানীর গোশত ইত্যাদি নিয়ামত তিনি বার বার ফিরিয়ে দেন। আর এ সকল নিয়ামত ফিরে পেয়ে ভোগ করার জন্য অভ্যাসগত ভাবেই মানুষ আনন্দ-ফুর্তি করে থাকে।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন :- তোমার প্রভুর ক্ষমা লাভের উদ্দেশ্যে দ্রুত ধাবমান হও। এবং সেই জান্নাতের জন্য (প্রতিযোগিতা কর) যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের সমান, যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহ ভীরুদের জন্যে। (সূরা আলে-ইমরান-১৩৩)

আল্লাহ তা’আলা আরো ইরশাদ করেন :- হে বিশ্বাসীগণ ! আল্লাহ্কে ভয় কর এবং যারা (কথায় ও কাজে) সত্যবাদী তাদের অন্তর্ভুক্ত হও। (সূরা তাওবাহ-১১৯)

ঈদুল ফিতর সমস্ত রমযান মাস সিয়াম পালনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে তাওফীক দানের জন্য আল্লাহ তা’আলা প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। ঈদুল ফিতরের দিন সাদকাতুল-ফিতর আদায় করা তার পর সমবেত ভাবে দু’রাকাত সালাত আদায় করা। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদকাতুল-ফিতর ওয়াজিব করেছেন, অশ্লীল ও অনর্থক কথা-বার্তার কারণে সিয়ামে ঘটে যাওয়া ত্রুটি-বিচ্যুতি গুলো দূর করার জন্য ও মিসকিনদের খাদ্য প্রদানের জন্য। ঈদের নামাজের পূর্বে আদায় করলে তা সাদকাতুল-ফিতর হিসাবে গন্য হবে। আর ঈদের নামাজের পর আদায় করলে তা অন্যান্য সাধারণ সাদকার মত একটি দান হিসাবে গন্য হবে। (আবু দাউদ)

ঈদের দিনের করণীয় : ঈদের দিন গোসল করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা। ঈদের দিন গোসল করার মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা মোস্তাহাব।

ঈদের দিনে খাবার গ্রহণ প্রসঙ্গে : সুন্নত হল ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদের সালাত আদায়ের পূর্বে খাবার গ্রহণ করা। আর ঈদুল আযহার দিন ঈদের সালাতের পূর্বে কিছু না খেয়ে সালাত আদায়ের পর কুরবানির গোশত খাওয়া সুন্নত। ঈদুল ফিতরের দিনে ঈদের সালাতের পূর্বে তিনটি, পাঁচটি অথবা সাতটি এভাবে বে-জোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়া সুন্নত।

সাহাবী আনাস (রাঃ) বর্ণিত তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন কয়েকটি খেজুর না খেয়ে বের হতেন না, আর খেজুর খেতেন বে-জোড় সংখ্যায়। (বুখারী) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া : ঈদগাহে তাড়াতাড়ি যাওয়া উচিত। যাতে ইমাম সাহেবের নিকটবর্তী স্থানে বসা যায় ও ভাল কাজ অতি তাড়াতাড়ি করার সওয়াব অর্জন করা যায়, সাথে সাথে সালাতের অপেক্ষায় থাকার সওয়াব পাওয়া যাবে। ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া হল মোস্তাহাব।

ঈদের তাকবীর আদায় : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন ঘর থেকে বের হয়ে ঈদগাহে পৌঁছা পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতেন। ঈদের সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করতেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : বল, আমি তোমাদের মত একজন মানুষ; (কিন্তু) আমার নিকট ওহী প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের আল্লাহ্ এক ও অদ্বিতীয়। সুতারাং যে তাহার প্রভুর সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎ কাজ করে এবং প্রভুর ইবাদতে কাউকে শরীক না করে। (সূরা কাহ্ফ-১১০) রমজান চলে গেছে, তার অর্থ এই নয় যে আমরা সারা বছর আর কোনো রোযা রাখব না। বরং রমযানের বাইরেও আমরা নফল রোযাসমূহ পালন করার চেষ্টা করব। কেননা, রোযার সাওয়াব অফুরন্ত, যা আল্লাহ তা’আলা নিজ হাতে দিবেন বলে হাদীসে ঘোষণা এসেছে। আর রমযানের পরপরই আমাদের সামনে যে নফল রোযাটি আসে তা হলো শাওয়াল মাসের ছয় রোজা। আবূ আইয়ূব আনসারী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : যে ব্যক্তি রমযানের রোযা রাখার পর শাওয়াল মাসে ৬টি রোযা রাখলো সে যেন সারা বছর রোযা রাখল। (মুসলিম) তাই আজ প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত¦ রমযান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে জীবনকে উদ্ভাসিত করা। আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের তাওফীক দান করুন। আমীন .

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *