সূরা কুরাইশ – سورة قريش

سورة قريش

সূরা কুরাইশ : সূরা নং (১০৬) মাক্কী যুগে নাযিল, মোট আয়াত-৪।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

(১)  যেহেতু কুরাইশরা সুপরিচিত হয়েছে।

(২)  (অর্থাত) শীতকাল ও গরমকালে (বিদেশ) সফরে তাদের পরিচিতি হয়েছে। ১.

(৩)  সেহেতু এ (কাবা) ঘরের ২. মালিকের ইবাদাত করা তাদের উচিত।

(৪)  যিনি তাদেরকে খিদে থেকে বাঁচিয়ে খাবার দিয়েছেন এবং ভয় থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদে রেখেছেন। ৩.

১./ শীত ও গ্রীষ্মের সফর মানে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সফর। কুরাইশ বংশের লোকেরা গ্রীষ্মকালে সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের দিকে এবং শীতকালে দক্ষিণ আরবের দিকে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যাতায়াত করতো। এরই ফলে তারা ধনশালী হতে পেরেছিল।

২./ এর অর্থ হলো কাবাঘর যা মাক্কা শহরে অবস্থিত।

৩./ মাক্কাকে হারাম শরীফ (সবার সম্মানের জায়গা) হিসাবে সবাই মানতো বলে কুরাইশদের বিশ্বাস ছিল যে, কেউ মাক্কা আক্রমণ করবে না। আর কুরাইশরা কাবাঘরের খাদিম ছিল বলে তাদের বণিকদের কাফেলা নিরাপদে আরবের সব এলাকায় যাতায়াত করতে পারতো এবং কেউ তাদের সাথে কোন রকম খারাপ ব্যবহার করতো না। 

নাম করণ ঃ পয়লা আয়াতের কুরাইশ শব্দই এ সূরার নাম।

নাযিলের সময় ঃ কেউ কেউ এ সূরাকে মাদানী যুগের বলেছেন। কিন্ত বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুফাসসিরগণ এ সূরাটিকে মাক্কী যুগের বলেই ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন। তৃতীয় আয়াতের “এই ঘরের রব” কথাটি দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, এ সূরাটি মাক্কী যুগের। এই ঘর বলতে যে কাবাঘরই বুঝায় এ বিষয়ে সবাই একমত। তাই মাদানী যুগে মাক্কার ঘরকে এই ঘর বলা কিছুতেই মানানসই হতে পারে না।

ঐতিহাসিক পটভূমি ঃ কুরাইশ বংশের লোকেরা তাদের পূর্বপুরুষ কুসাই বিন কিলারের পূর্ব পর্যন্ত আরবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। কুসাই-এর চেষ্টায় এরা মাক্কায় কেন্দ্রীভূত হয় এবং আল্লাহর ঘরের খাদিমের দায়িত্ব পায়। তারই নেতৃত্বে মাক্কা শহরভিত্তিক একটা রাষ্ট্র গড়ে উঠে।

হজ্জের সময় সমস্ত আরব থেকে আগত হাজীদের সন্তোষজনক খিদমাতের মাধ্যমে কুরাইশদের মর্যাদা ও প্রভাব বেড়ে যায়।

কুসাই-এর ছেলে আবেদে মুনাফ পিতার জীবিতকালেই আরববাসীদের নিকট সুনাম অর্জন করে। আবদে মুনাফের চার ছেলের মধ্যে হাশিম বড় ছিল। রাসূল (সা)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব হাশিমেরই ছেলে। গোটা আরবে কুরাইশ বংশের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সুনাম-সুখ্যাতির ফলে হাশিমই সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দিকে মনোযোগ দেয়। সূরা ফীলের ঐতিহাসিক পটভূমিতে বলা হয়েছে যে, আরবের পূর্ব ও পশ্চিম দেশগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু ছিল। কিন্তু এ ব্যবসা তখন ইরানীদের হাতে ছিল। ইরানীরা একদিকে পারস্য উপসাগর দিয়ে দক্ষিণ আরবের মাধ্যমে পূর্বদিকের দেশগুলোর সাথে এবং অপরদিকে দক্ষিণ আরব থেকে লোহিত সাগরের উপকূল ধরে মিসর ও সিরিয়ার সাথে এ ব্যবসা চালু করেছিল। যদিও আরবদের সহযোগিতা ছাড়া এ ব্যবসা চলতে পারতো না, তবু এ ব্যবসার আসল লাভ ইরানীরাই ভোগ করতো।

কুরাইশ নেতা হাশিম সারা আরবে তাদের সুনাম ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এ বাণিজ্যে আরবদের প্রাধান্য হাসিলের উদ্যোগ নেয়। হজ্জের সময় কুরাইশদের উদার ব্যবহার ও আশাতীত খিদমাতে আরবের সব গোত্রের লোকই তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকায় কুরাইশদের বাণিজ্যিক কাফিলাকে কেউ লুট করতো না। এমনকি তাদের কাছে কোন গোত্রই কোনরকম ট্যাক্স দাবী করতো না। এ ব্যবসার সুযোগে মাক্কা শহর আরবের আভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হলো।

হাশিম ও তার ভাই আবদে শামস, মুত্তালিব ও নাওফেল মিলে সিরিয়া, ইরাক, ইরান, ইয়ামান ও হাবশার শাসকদের কাছ থেকে সরকারীভাবে এ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনুমতি  হাসিল করে নেয়। এ ব্যবসা এতটা উন্নতি লাভ করে যে, এরা চার ভাই আরবে “ব্যবসায়ী গোষ্ঠী” হিসাবে খ্যাতি লাভ করে। এ বাণিজ্য উপলক্ষে আরবের সমস্ত গোত্রের সাথে কুরাইশদের গভীর সম্পর্ক এবং চারপাশের রাষ্ট্রগুলোর সাথে আরবের ঘনিষ্ঠ পরিচয় হবার কারণে কুরাইশ নেতাগণ “আসহাবুল ঈলাফ” বা “বন্ধুত্ব ও পরিচয়ের ধারক ও বাহক” হিসাবে স্বীকৃত হয়। এই ‘ঈসাফ’ শব্দটি দিয়েই সূরা কুরাইশ শুরু হয়েছে।

কুরাইশদের এ মর্যাদার ফলে সারা আরবে তাদের নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেয়া হতো। ধন-দৌলতের দিক দিয়েও তারা আরবের সেরা গোত্রে পরিণত হয়। মাক্কা শহর আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্রের মর্যাদা পায়। আন্তর্জাতিক পরিচিতির দরুন কুরাইশরা ইরাক থেকে উন্নত মানের আরবী অক্ষর লেখার শিক্ষা পায় এবং সে অক্ষরেই কুরআন মজীদ লিখিত হয়। লেখা-পড়ার চর্চা কুরাইশদের মধ্যে যে পরিমাণে ছিল, এতটা আর কোন গোত্রে ছিল না। এসব কারণেই রাসূল (সা) বলেছিলেন : কুরাইশই জনগণের নেতা।

এ অবস্থায় যদি বাদশাহ আবরাহার হাবশী বাহিনী কাবাঘর ধ্বংস করতে পারতো, তাহলে কুরাইশদের সব কিছুই খতম হয়ে যেতো। আল্লাহর ঘর হিসাবে কাবার মর্যাদা শেষ হয়ে যেতো, কাবার খাদিম হিসাবে কুরাইশদের সম্মানও খতম হতো। মাক্কা আর ব্যবসা কেন্দ্র হিসাবে গণ্য হতো না এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরবদের হাত থেকে হাবশীদের হাতে চলে যেতো।

আল্লাহর কুদরতে হাবশী বাহিনী চরম গযবে পতিত হবার ফলে কাবাঘর “বাইতুল্লাহ” হিসাবে সারা আরবে আগের চেয়েও বেশী সম্মানিত বলে গণ্য হলো এবং সাথে সাথে কুরাইশদের নেতৃত্ব আরও মযবুত হলো। সবার মনেই এ বিশ্বাস দৃঢ় হলো যে, কুরাইশদের উপর আল্লাহর খাস মেহেরবানী আছে।

আলোচনার ধারা ঃ উপরিউক্ত পটভূমিকে সামনে রাখা হলে সূরা কুরাইশের মর্মকথা বুঝতে কোন রকম বেগ পেতে হয় না। শীত, গ্রীষ্ম নির্বিশেষে সারা বছর সর্বত্র ব্যাপক পরিচিতি ও বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে কুরাইশরা যে সৌভাগ্যের অধিকারী হয়েছে, তার বাহাদুরী যে তাদের নয়, একথাই এ সূরায় বুঝানো হয়েছে। তাদের পূর্বপুরুষ কুসাই-এর নেতৃত্বে কুরাইশরা মাক্কায় সমবেত হবার পূর্বে সারা আরবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তারা যে অভাব-অনটনে ছিল এবং নিরাপত্তার দিক দিয়ে অন্যান্য আরব গোত্রের মতোই তারা যে অনিশ্চিত অবস্থায় জীবন যাপন করতো, সে দুরবস্থা থেকে বর্তমান সুদিনের কারণ যে একমাত্র এই কাবাঘর, সে কথা এখানে তাদেরকে মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে, এ ঘরের যিনি মালিক, একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করা তাদের উচিত। আর মুহাম্মদ (সা) তাদেরকে এ কথারই দাওয়াত দিয়েছেন। এ দাওয়াত কবুল করলেই কুরাইশদের মর্যাদা বহাল থাকতে পারে। নেতৃত্বের অহংকারে যদি এ  দাওয়াত তারা কবুল না করে, তাহলে এ ঘরের মালিকই তাদের মর্যাদা কেড়ে নেবেন।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *