Filed under Uncategorized by mamun on April 27, 2013 at 11:25 pm
{no comments}
মৌসুমী মুসল্লীদের আপনি সহজেই চিনতে পারেন, তারা শুধু জানাযা, জুমুয়া ও ঈদের নামাযেই শরীক হয়ে থাকে। তাদেরকে নামাযে সৌভাগ্যের চূড়ায় দেখতে পাবেন। ইমাম সাহেব যদি নামাযে উচ্চ স্বরে ছোট কোন কিরাত পড়েন, অথবা এমন কিরাত যা প্রসিদ্ধ, তখন এই মুসল্লি সূরাটি মুখস্ত করে নিয়ে ইমামের পেছনে স্বরবে পড়া আরম্ভ করে দেয়। যেন তিনি ইমাম সাহেবের পড়ার প্রতিধ্বনি আওড়াচ্ছেন। এমনকি সে যেন বলেই ফেললো যে, আমি মুখস্ত করে ফেলছি। অতঃপর সে ইমাম সাহেব কিরাত শুরু করার ২/১ সেকেণ্ড পূর্বে কিরাত শুরু করে। যেন মুসল্লিগণ মনে করে আমরা মাশারী রাশেদ আল আফাসীর পেছনে নামায পড়ছি। হ্যাঁ আল্লাহ যাদেরকে রহম করেন। আমাদের কোন ভাই খুৎবা আরম্ভ করে দেয়, অথচ তার এক বা দুই বা তিনটি আয়াতই মুখস্ত আছে, অতঃপর খুৎবা বন্ধ করে নামাযের দিকে মনোযোগী হয়।
কিছু মুসল্লি অনুভব করে না, যে নামায বিনয়ী সাথে পড়তে হয়। ইমামকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে, চোখ বাঁকা করে পেছনের দিকে তাকায়, কোন মুসল্লি পাশে দাড়ালে তার দিকে দৃষ্টি দেয়। জামা-কাপড় নিয়ে খেলা করে, অথবা কাপড়ে ধুলা লাগলে তা পরিষ্কার করে। হাতের ঘড়ির দিকে তাকায়, আবার মসজিদের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে হাতের ঘড়ি দেখে যে, সময় বরাবর ঠিক আছে কিনা। এমন আরো অনেক কর্মকাণ্ড করে থাকে, যা নামাযে করা উচিত নয়। এভাবে নামায পড়েই তারা আনন্দিত, তারা ভাবে না যে মহান সৃষ্টিকর্তার সামনে তারা নামায পড়তে দাঁড়িয়েছে।
উউউউহহহহ উউউউহহহহ উউউউহহহহ পবিত্র কুরআনের কিছু কিছু আয়াতে রহমত, জান্নাত ও বিশেষ নিয়ামতের কথা বলা হয়েছে। মুমিনগণ সেগুলোর অপেক্ষায় রয়েছেন। আর কিছু আয়াত রয়েছে যার মধ্যে জাহান্নামের শাস্তি, পরকালের আলোচনা করা হয়েছে। মুসল্লিগণ এসব আয়াত শোনার সময় আল্লাহর ভয়ে, জাহান্নামের ভয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। মাঝে মধ্যে এমন কিছু মুসল্লি লক্ষ্য করা যায়, যে তারা প্রত্যেক নামাযেই এভাবে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন, চাই আয়াতগুলো জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কিত হোক কিংবা মাসিক ঋতু অথবা প্রসূতি সংক্রান্ত হোক। এগুলো মূলত অসচেতনতাই প্রমাণ করে।
দারিদ্রতা কোন দোষনীয় নয় এমনকি হারামও না। নামাযের মধ্যে অনেককেই চূড়ান্ত পর্যায়ের বিনয়ী দেখা যায়। তবুও তারা চেষ্টা করে উত্তম পোশাক পরিধান করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে মসজিদে যেতে। কিন্তু আশ্চার্যের বিষয় হলো অনেক কর্মজীবি লোককে দেখা যায় সাপ্তাহ ভরে কাজ করে মসজিদে আসে অপরিষ্কার অবস্থায়, শরীরের তেলের গন্ধ, ঘামের গন্ধ, সিমেণ্ট লেগে রয়েছে। অযু করার সময় শরীরে সামান্য পানি ছিটা দিয়েই মসজিদে প্রবেশ করে। আর বলে থাকে কাজের ঝামেলায় পরিষ্কার করার সুযোগ পাইনা, আরো বলে দ্বীন তো সহজ।
কিছু মুসল্লি রয়েছেন যারা ইমামের সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গে মসজিদ থেকে বের হওয়ার জন্য উদ্যত হন। তারা এ কথা চিন্তাই করেন না যে, এখনও অনেক মুসল্লি নামায শেষ করেন নাই। অথচ নামাযীর সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করা জায়েয নাই। কিন্তু এই দ্রুতগামী দশ দশ জন মুসল্লির সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করছে, কেউ যদি তাকে বাঁধা দেয়, সে রাগ করে। আর কেউ কেউ মনে করে যে, ধীরগতিতে মুসল্লির সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করলে তা বৈধ হবে (যা মোটেও বৈধ নয়)। আল্লাহ সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায পড়া অবস্থায় দৃষ্টি উপরের দিকে নিক্ষেপ করতে নিষেধ করেছেন। বরং যারা সর্বদা উপরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তাদের দৃষ্টিশক্তি আল্লাহ বিলুপ্ত করে দিবেন, এমন হুঁশিয়ারি বক্তব্য আল্লাহর রাসূল প্রদান করেছেন। তিনি এ কথা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, নামাযী ব্যক্তির দৃষ্টি দাঁড়ানো অবস্থায় সেজদার জায়গায় থাকবে। কিন্তু কিছু মুসল্লি নামাযে রুকু থেকে দাঁড়ানোর সময় ছাদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে থাকে, তারা মনে করে এটাই সঠিক, যেন তারা আল্লাহর দিকে তাকাচ্ছেন, আর আল্লাহ তাদেরকে সম্বোধন করছেন। (আল্লাহ আমাদের সবাইকে এমন দৃষ্টি নিক্ষেপ করা থেকে হেফাযত করুন)
উচ্চ স্বরে কিরাত বিশিষ্ট নামাযে ইমামের পেছনে আমীন বলা এটি উত্তম সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসূলের উম্মতকে আমীন বলার কারণে ভালোবাসেন। আর ফেরেশতাগণও জামাতের মুসল্লিগণের সঙ্গে আমীন বলেন। আর যে মুসল্লির আমীন বলা ফেরেশতার আমীন বলার সঙ্গে এক হয়ে যায়, আল্লাহ চাহে তো তার গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। তবে শর্ত হলো মুসল্লিদের আমীন ও ফেরেশতার আমীন বলা এক সঙ্গে শোনা যেতে হবে। দুঃখজন হলেও সত্য যে, কিছু মুসল্লি এমন রয়েছেন যে তারা ইমামের আমীন বলার সঙ্গে সঙ্গে বলেন না, বরং দেরী করে বলেন। অথবা এমন লম্বা করেন যে সমস্ত মুসল্লিদের আমীন বলা শেষ হয়ে যায় কিন্তু তিনি “আ” বলে টেনেই যাচ্ছেন।
নামাযে দাঁড়ানো অবস্থায় হাত বাঁধার সঠিক নিয়ম হলো সীনার নিচে ও নাভির উপরে, ডান হাত বাম হাতের উপরে রাখবে। কিন্তু অনেক লোককে দেখা যায়, তারা নাভির নিচে হাত বাঁধে, আবার অনেকে সীনার উপরে গলার কাছাকাছি হাত বেঁধে থাকে। অথবা অস্বাভাবিকভাবে হাত বাঁধে, সেইভাবে অন্য কাউকে বাঁধতে দেখা যায় না।
অনেকে একদিনে বার বার অযু করা পছন্দ করেন না। এই অবস্থাটি জামায়াতের সঙ্গে নামায অপেক্ষা একাকী নামায পড়ার মধ্যে বেশি পরিলক্ষিত হয়। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম পেশাব পায়খানা চেপে রেখে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন। সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ অমান্য না করে বরং পেশাব পায়খানার জরুরত থেকে ফারেগ হয়ে নামায পড়লে, নামাযে একাগ্রতা সৃষ্টি হবে।
অনেক সময় লক্ষ্য করা যায়, যে প্রতাপশালী লোকেরা নামাযের মধ্যে দাঁড়ানোর সময় সীসাঢালা প্রচীরের মত কাতার বন্দী হয়ে দাঁড়ায় না। বরং তাড়া দু’জনের মাঝে নিজের মর্যাদাকে বড় মনে করে দূরত্ব বজায়ে দাঁড়ান। আর এভাবে দাঁড়ানো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের নামাযের পরিপন্থি। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহীহ বুঝ দান করুন।

জামাতে নামায তথা সময় মত একই ইমামের পেছনে উপস্থিত মুসল্লিদের নিয়ে এক সঙ্গে নামায পড়া। কিন্তু বারবার একই সমস্যা পরিলক্ষিত হয়, প্রধান জামাতের পর একই সঙ্গে দুই জামাত হতে দেখা যায়। আর এটি হয়ে থাকে মুসল্লি দ্রুততার কারণে, এভাবে যে, একজন মুসল্লি দৌড়ায়ে এসে কিছু মুসল্লি নিয়ে মসজিদের একপাশে জামাত আরম্ভ করে দিল, অথচ একই সময় ওই মসজিদে দ্বিতীয় আরো একটি জামাত চলছে। দ্বিতীয় কারণ হলো: ইমাম সাহেবের স্বর এতই নিস্তেজ যে, অন্যরা শুনতেই পায় না। পরে আগত মুসল্লিগণ বুঝতেই পারেন নাই যে, মসজিদে জামাত চলছে।
অনেক নামাযী রুকু অবস্থায় সঠিকভাবে রুকু করে না, রুকু অবস্থায় হাত দিয়ে অনেকে হাঁটুর অনেক নিচে গুড়ালীর কাছাকাছি ধরে আবার অনেকে হাঁটুর উপরে রানের মধ্যে হাত রাখে, আবার অনেকে একটু মাটি লাগলেই হাত দিয়ে ঝাড়া-ঝাড়ি করে। এমন ঘটনা বারবার পরিলক্ষিত হয়, এবং তারা বলেন যে এমন করা হয় নামাযে একাগ্রতা তৈরী হওয়ার জন্য। রুকু করার মানে এ নয় যে জামার মাপ দেওয়ার জন্য নিচ পর্যন্ত হাত দেওয়া। তবে হ্যাঁ কেউ যদি স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে সঠিকভাবে রুকু করতে না পারে, তাকে আল্লাহ মাফ করবেন।
তেমনিভাবে অনেক নামাযী ছবিতে দেওয়া সঠিক পদ্ধতিতে রুকু করে না। অনেকে সামান্য ঝুকে যা ৯০% ও হয় না। একে বারে পায়ের গুড়ালি পর্যন্ত ঝুকা, এটাও সঠিক না। এভাবে ঝুকাকে অনেকে নামাযের একাগ্রতা মনে করে।
অনেক মুসল্লি সঠিকভাবে সেজদা আদায় করেন না, কনুই মাটির সাথে মিলায়ে সেজদা করেন, যা শুদ্ধ নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে সেজদা করাকে কুকুরের সাথে তুলনা করেছেন। তেমনিভাবে দুনো হাত কম্ফু, কেরাটির মত হাত মুষ্টি করে সেজদা করাও ঠিক নয়। বরং সঠিক নিয়ম হলো দুই হাতের আঙ্গুলগুলো মিলায়ে কিবলার দিকে সোজা রাখা, তেমনিভাবে পায়ের আঙ্গুলগুলোও কিবলার দিকে রাখা। তবে হ্যাঁ কেউ যদি স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে সঠিকভাবে রুকু করতে না পারে, তাকে আল্লাহ মাফ করবেন।
অনেক মুসল্লি এমন আছেন যে, জামাত শেষ করার পর মসজিদেই গল্পগোজব শুরু করে দেন। তারা এ কথা ভুলে যান যে মসজিদে অবস্থান করছেন। অথচ অনেকে সুন্নত পড়ছেন, কিংবা অনেকে পরে এসে ফরজ আদায় করছেন। তারা মসজিদটাকে হোটেল বানিয়ে নেন। যদি তাদের থেকে বয়সে ছোট এমন ব্যক্তি বলেন; “মুরব্বীগণ আসতে কথা বলুন! এখানে অনেকে নামায পড়ছেন।” তখন তারা উত্তরে বলে; ‘আশ্চর্য! ছোট ছেলে আমাদেরকে উপদেশ দেয়, শিষ্টাচার বলতে কিছু নেই?’ তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস শুনান যে; যারা বড়দের সম্মান করেন না তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত না। আরো কত কি যে বলে!!!
জামাতের সঙ্গে নামাযের জন্য কাতার বন্দী হয় দাঁড়ানো যেন সীসা ঢালা প্রাচীরের মত মজবুত ও সোজা হয়। সকল নামাযীকে এভাবে দাঁড়ানো উচিত যে, দুই পা এবং কাঁধ যেন বরাবর হয়। কিন্তু অনেক মুসল্লি বিষয়টি না জানার কারণে সঠিকভাবে দাঁড়ায় না, দূরত্ব বজায় দাঁড়ানোর কারণে মাঝখানে শয়তান প্রবেশ করার সুযোগ পায়।

অনেকে পরে এসে জামাতে শরীক হয়, আর এত স্বরবে তাকবীরে তাহরীমা বাঁধে যেন সে ইমাম। এতে মুসল্লিদের সন্দেহ হয় যে ইমাম সাহেব কী তাকবীর বললেন? অনেকে রুকুতে কিংবা সেজদায় চলে যান। মুক্তাদীর জন্য এভাবে স্বরবে তাকবীর বলা কিংবা কেরাত পড়া সুন্নতের পরিপন্থি, এই মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম অথবা সাহাবা কেরামগণ থেকে কোন বর্ণনা প্রমাণিত নেই। আর নিয়তের স্থান হলো অন্তর, মুখে বলারও কোন প্রয়োজন নেই।

সাধারণত অনেক মুসল্লি এ বিষয়টি জানেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম কাঁচা পেঁয়াজ রশুন খেয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করেছেন। যেন অন্যান্য মুসল্লিদের কষ্ট না হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে অনেক মুসল্লিকে দেখা যায় তারা কাঁচা পেঁয়াজ, রশুন ও সিগারেট খেয়ে মসজিদে নামায পড়তে যান। এবং কাতারে দাঁড়িয়ে আ‘‘‘হ করে হাই তুলেন। বার বার করতেই থাকেন, যেন তিনি এভাবে হাই তুলাকে গর্ব মনে করছেন।
কিছু মুসল্লি জামাতে নামায পড়তে দাঁড়িয়ে কাতার বন্দীকে ভেঙ্গে দেয়। এভাবে যে, ইমামের তাকবীর অপেক্ষা অনেক বিলম্ব করে, সে অন্যান্য মুসল্লি অপেক্ষা রুকু, সেজদায় দেরী করে। আর সে এতেই নিজেকে বেশি মুত্তাকী মনে করে। আর বাকী মুসল্লিগণ যেন ফাও দাঁড়িয়ে আছে। আসলে সঠিক নিয়ম হলো রুকু, সেজদা, এবং দাঁড়ানোসহ সবকিছুই ইমামের সঙ্গে সঙ্গে করা উচিত। যেন প্রকৃতভাবে নামাযটি জামাতের নামায হয়। আর যে ব্যক্তি নামাযে দীর্ঘ সেজদা করতে চায় সে যেন একাকী তথা নফল নামাযে করে।
অনেক মুসল্লিদের দেখা যায়, যারা জুমুয়া কিংবা ফরয নামাযের জন্য বসে অপেক্ষা করা কিংবা খুৎবা চলা অবস্থায় পরস্পর কথা বলে, সালাম ও কোশল বিনিময় করে, অথচ জুমুয়ার খুৎবা নামাযেরই অংশ, খুৎবা চলা অবস্থায় কথা বলা হারাম। এ সময় তারা শিশু কিশোরদের উপদেশ দেয়, আবার অনেকে খতীব সাহেবের খুৎবা ব্যাখ্যা করেন। যেন মনে হচ্ছে তারা কোন মসজিদে না সিনেমা হলে আছে। অথচ সিনেমা হলেও এভাবে কথা বললে বের করে দিবে। আর আল্লাহর ঘর মসজিদে গিয়েও তারা সংযত হয় না। আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। আমীন

সাধারণত হাই তুললে অমনোযোগী ও ক্লান্তি বুঝায়ে থাকে। এগুলো হয়ে থাকে সাধারণত ঘুমের চাপের কারণে। বিষয়টি যে কারণেই হোক, যথা সাধ্য হাই দমাতে চেষ্টা করতে হবে। এ যাবৎ কাউকে এমন পাওয়া যায়নি যে সে পেশা হিসেবে হাই তুলে। কিন্তু এমন অনেক লোককে দেখা যায়, যারা নামাযের মধ্যে দাঁড়িয়ে সিংহের মত হা করে হাই তুলে।
প্রথম কাতার পূর্ণ হওয়ার পর দ্বিতীয় কাতার আরম্ভ নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। কেউ মনে করেন নতুন কাতার ডান দিক থেকে আরম্ভ করা ভালো। কেননা সব কাজই ডান থেকে শুরু করা উত্তম। আবার কেউ বাম দিককে প্রাধান্য দেয়, কারণ প্রথম কাতার শেষ হয়ে বাম দিক দিয়ে। আবার কেউ ফ্যানের নিচে থেকেই কাতার শুরু করে দেন, কারণ তিনি গরম সহ্য করতে পারেন না। তবে উত্তম হলো ইমাম বরাবর পেছন থেকে নতুন কাতার শুরু করা।
অনেক মুসল্লি মনে করেন যে, ইমাম সাহেবের সূরা ফাতেহা ও কিরাত পড়া মুসল্লিদের জন্য যথেষ্ট নয়। তারা মনে করেন কমপক্ষে সূরা ফাতেহা পড়তে হবে যেন নামায শুদ্ধ হয়। আসলে বিষয়টির মধ্যে অবকাশ ও মতভেদ রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো অনেক মুসল্লি ইমামের সঙ্গে সঙ্গে এত দ্রুত ও উচ্চস্বরে সূরা ফাতেহা পাঠ করে যে, সে কি পড়ছে নিজেও বুঝে না। আর পাশের মুসল্লিও ইমামের পড়া শুনতে পান না, তার শব্দের কারণে। ভেবে দেখুন যদি এমন কাণ্ড কয়েক জন মুসল্লি করে, তাহলে নামাযের অবস্থা কি হবে।
এগুলো সংগ্রহের উদ্দেশ্য হলো: আমাদের নামাযে সাধারণত যেসব ভুল হয়ে থাকে, তা থেকে মুসল্লিদের সংশোধন করা। আর যথা সম্ভব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামাযের মত নামায আদায় করার চেষ্টা করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই হাদীস “তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখ সেভাবে নামায পড়” হাদীসটির আমল করা।
Scridb filter
Filed under Uncategorized, যাকাত و ফিতরাو by mamun on August 20, 2011 at 10:57 pm
{no comments}
যাকাতুল ফিতর (ফিতরা) সম্পর্কে বিধান
রমযান মাস শেষ হওয়ার পর ঈদুল ফিতরের দিন অর্থাৎ শাওয়াল মাসের ১ তারিখে প্রত্যেক মুসলমান স্বেচ্ছাকৃতভাবে গরীবদের মধ্যে যে খাদ্য বণ্টন করে থাকে, ফিকাহ্বিদ ও মুহাদ্দিসগণ তাকে ’যাকাতুল ফিতর’ নামে নামকরণ করেছেন। একে ’সাদকায়ে ফিতর’ ও বলা হয়।
হাদীস এবং অন্যান্য প্রামাণিক ইতিহাস গ্রন’ থেকে জানা যায় যে, দ্বিতীয় হিজরীর রমযান মাসে রোযা ফরয করা হয় এবং একই বছর রাসূলুল্ল্লাহ্ (সা.) যাকাতুল ফিতরের আদেশ জারি করেছিলেন। তিনি ফিতরার পরিমাণও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। আবদুল্ল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে, ”রাসূলুল্লাহ্ (সা) সদকায়ে ফিতর হিসাবে এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব প্রতিটি স্বাধীন এবং পরাধীন (গোলাম) মুসলমানের উপর ফরয করে দিয়েছেন” (বূখারী ও মুসলিম) খেজুর এবং যব ছাড়া অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যও সাদাকাতুল ফিতর হিসাবে দেয়া যায়। ”আবু সায়ীদ খুদরী (রা) বলেন, ’আমরা সাদাকাতুল ফিতর হিসাবে এক সা’ খাদ্য অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ পনীর অথবা এক সা’ কিশমিশ দিতাম”(বূখারী ও মুসলিম) ঈমাম মালিক, শাফেঈ, আহমদ ইবনে হান্বল, আবুল আলীয়া, আতা, ইবনে সিরীন ও আল-বূখারীসহ অনেকের মতে ’যাকাতুল ফিতর’ ফরয ইবাদত। আর ঈমাম আবু হানিফা ও তাঁর অনুসারীদের মতে তা ওয়াজিব।
যাকাতুল ফিতরের যৌক্তিকতা
ইবনে আব্বাস(রা.) থেকে বর্ণিত- ”রাসূলে করীম(সা.) ফিতরের যাকাত নির্ধারিত করেছেন রোযাদারদের বেহুদা অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে পবিত্র রাখা এবং মিসকিনদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা স্বরূপ”(সুনান আবূ দাউদ)।
রোযাকালীন সময় মানুষ খাদ্যগ্রহণ ও যৌন অঙ্গের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকে। কিন’ মানুষ তার মানবীয় দুর্বলতার কারণে মূখ, কান, চক্ষু কিংবা হাত-পা দ্বারা শরিয়ত নিষিদ্ধ কথা বা কাজ দ্বারা কলুষিত হতে পারে, তাই রমযান মাসে রোযাদার ব্যক্তির বাজে কথাবার্তা ও বাজে কাজ থেকে তার আত্মার পবিত্রকরণের জন্যই রোযা শেষ হওয়ার সাথে সাথে ফিতরা ধার্য করা হয়েছে।
একই সাথে যাকাতুল ফিতরের মাধ্যমে সমাজের গরীব-মিসকিনদের জন্য ঈদের দিনে খাদ্যের ব্যবস্থা করা, যেন অভাবের লাঞ্ছনা নিয়ে তাদেরকে ঈদের দিনে ভিক্ষা করতে না হয়। ঈদের আনন্দ ধনী-গরীব সকলের মাঝে বিস্তার লাভ করা এবং সমাজে ধনী- দরিদ্রের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সমপ্রীতি ও সহানুভূতির গুণাবলী বৃদ্ধির লক্ষ্যে যাকাতুল ফিতর একটি অপরিহার্য ব্যবস্থা। রাসূলুল্লাহ(সা.) বলেছেন, ”তোমরা এ দিনে তাদেরকে স্বচ্ছল করে দাও” (বায়হাকী ও আল-মুআত্তা, আল-মালিক) ।
ফিতরা ধার্য করার লক্ষ্য একদিকে পবিত্রকরণ করা, অন্যদিকে গরীব-মিসকিনদের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা ও তাদের স্বচ্ছল করার একটি উৎকৃষ্ট পদ্ধতি।
রাসূল (সা.) ফিতরের যাকাত বাবদ এক সা’ খাদ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এক সা’তে যে পরিমাণ খাদ্য হয়, তা একজন গরীবের ঘরের সদস্যদের জন্য যথেষ্ট এবং ঈদের দিনে পরিতৃপ্তির সাথে খেতে সমর্থ। অন্যদিকে ফিতরদাতাদের পক্ষেও এ পরিমাণ খাদ্য দান করা কারোর জন্য কষ্টকর হয় না।
যাকাতুল ফিতর ব্যক্তির উপর ধার্য হয়, আর অন্যান্য যাকাত বা সাদাকাহ ধার্য হয় সম্পদের উপর।
যাকাতুল ফিতর এর পরিমাণ
যাকাতুল ফিতরের পরিমাণের ব্যাপারে দু’টি মত রয়েছে।
১. এক সা’ : অধিকাংশ আলিমের মতে যাকাতুল ফিতরের পরিমাণ এক সা’, আব্দুল্লাহ ইবন উমার ও অন্যান্য সাহাবীদের বর্ণনা থেকে এরূপ জানা যায়। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকদের উপর যাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন, যার পরিমাণ এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব”(সহীহ মুসলিম)। ”আবু সায়ীদ খুদরী (রা) বলেন, ’আমরা সাদাকাতুল ফিতর হিসাবে এক সা’ খাদ্য অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ পনীর অথবা এক সা’ কিশমিশ দিতাম”(বূখারী ও মুসলিম)।
২. অর্ধ সা’ গম : ঈমাম আবু হানীফা রহ. মতে অর্ধ সা‘ পরিমাণ আটা দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করা জায়িয। আব্দুল্লাহ ইবন উমারের অপর এক বর্ণনায় অর্ধ সা‘-এর কথা বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, “নবীজী (সা.) সাদাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন, যার পরিমাণ এক সা‘ খেজুর অথবা এক সা‘ যব। তারপর লোকেরা সেটার পরিমাণ অর্ধ সা‘ গমে পরিবর্তণ করেন”(সহীহ বুখারী)।
সা’ এর পরিমাণ
‘সা’ হচ্ছে রাসূলুল্ল্লাহ্ (সা) সময়ে মদীনায় প্রচলিত খাদ্যশস্য পরিমাপের একক, পাত্র বা ভান্ডের মাপ (Bushel)। ’সা’ এর মাপ আয়তনিক(Volumetric Measure), ওজনের মাপ নহে। সেইযুগে বিশ্বের সব অঞ্চলেই ভান্ডের মাপে খাদ্যশস্য লেনদেন ও ক্রয়-বিক্রয়ের প্রচলন ছিল। এমনকি বর্তমান যুগেও পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চলে ভান্ডের মাপে খাদ্যশস্য লেনদেন ও ক্রয়-বিক্রয়ের প্রচলন আছে। আর ভান্ডের আকারও একেক অঞ্চলে একেক ধরণের। তাছাড়া তরলজাতীয় জিনিষের পরিমাপ পৃথিবীর সর্বত্রই পাত্রের (আয়তনিক) মাপে করা হয়ে থাকে। তৎকালীন মদীনাবাসীরা ছিল কৃষিজীবী, তাদের কাছে পাত্রের মাপে লেন-দেনের ব্যবহার অধিক ছিল। আর মক্কাবাসীরা ছিল ব্যবসায়ী, দাঁড়িপাল্লায় ওজনের মাপে তারা অধিক নির্ভরশীল ছিল। তৎকালীন মদীনায় (হিজায অঞ্চলে) প্রচলিত আকারের এক ’সা’ সমপরিমাণ বর্তমান কালের মেট্রিক পদ্ধতির ওজনে ২.৫২০ কিলোগ্রাম চাল অথবা ২.১৭৬ কিলোগ্রাম গম। মনে রাখতে হবে যে, খাদ্য বা শস্যদানার ঘনত্ব ও হালকা বা ভারী ধরনের হওয়ার কারণে একই পাত্রের মাপে বিভিন্ন খাদ্য ও শস্যদানার ওজনে এর কিছুটা কম-বেশী হতে পারে।
তৎকালীন আরব অঞ্চলগুলিতে আরেকটি পদ্ধতিতে সা’ এর পরিমাপ হিসাব করার প্রচলন জানা যায়, তা হ’ল ’মুদ’(Mudd)। মুদের পাত্র (Bushel) আকারে ছোট, ৪(চার) মুদ এর পরিমাণ এক সা’র সমান। মুদ পরিমাপ করার আরেকটি পদ্ধতির প্রচলন ছিল, তা হচ্ছে মধ্যম আকারের একজন ব্যক্তির দুই হাতের ভরা কোষ পরিমাণ খাদ্যশস্য এক মুদ বলে গণ্য করা হত। যাদের কাছে পরিমাপের পাত্র অথবা ওজন করার দাড়িপাল্লা ছিল না, তারা এরূপ চার কোষ(মুদ) এর পরিমাণ এক সা’র সমান হিসাব করতেন।
আরব অঞ্চলের ওজনের মাপে মদীনার এক সা’ সমান পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ রতল(RATL)। এক রতল সমান বর্তমান কালের মেট্রিক পদ্ধতির ওজনে ৪০৮ গ্রাম। সেহিসাবে পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ (৫-১/৩)রতল সমান ২১৭৬ গ্রাম গম(Fiqh Al-Zakah–Qardawi Vol-I page-186, Vol-II page-210)।
রাসুলুল্লাহ্(সা.) সাদাকাতুল ফিতরের খাদ্য এক সা’ পরিমাণ সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যা একটি পাত্রের মাপ। এই মাপটি স্থায়ী, এর কোন পরিবর্তণ নাই। সর্বকালে, বিশ্বের সকল অঞ্চলে এই মাপটি সমান।
আধুনিক ওজনের পরিমাপে এক সা’ শস্যদানার পরিমাণ
খাদ্য বা শস্যদানার ঘনত্ব ও হালকা বা ভারী ধরনের হওয়ার কারণে একই পাত্রের মাপে বিভিন্ন খাদ্য ও শস্যদানার ওজনে এর কিছুটা কম-বেশী হতে পারে।
তৎকালীন মদীনায় (হিজায অঞ্চলে) প্রচলিত আকারের এক ’সা’ সমপরিমাণ বর্তমান কালের মেট্রিক পদ্ধতির ওজনে কয়েকটি শস্যদানার আনুমানিক পরিমাণ:
গম ২১৭৬ গ্রাম
চাল ২৫২০ গ্রাম
ডাল (lentils) ২১৮৫ গ্রাম
শুঁটি (beans) ২২৫০ গ্রাম
এগুলোর গড় পরিমান ৫.৫০ রতলের চেয়ে সামান্য বেশী।(A Guide to Accounting Zakah- Husayn Husayn Shihatah & Abd as-Sattar Abu Ghuddah, page-74 & 81)
সা’ এর ওজনের পরিমাপে হিজাযী ও ইরাকী ফিকাহ্বিদদের মতপার্থক্য
রাসূলুল্লাহ্ (সা.) কর্তৃক মদীনায় প্রচলিত একটিমাত্র পরিমাপ ব্যবস্থা সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন এবং সেটিকেই অনুসরণ করতে বলেছেন। বিশ্বের সকল মুসলমান মদীনায় প্রচলিত সা’ এর পরিমাপ অনুসরণ করে যাকাতুল ফিতর প্রদান করবেন, এটা নবীজীর নির্দেশ, এতে সকলে সম্পূর্ণ একমত থাকবেন।
ইরাকের অধিবাসী ঈমাম আবু হানিফা(র.) ও তাঁর সমর্থকরা এক সা’কে ওজনের মাপে আট(৮) বাগদাদী রতল সমান হিসাব করেন। অর্থাৎ ইরাকীদের হিসাবে এক সা’ ওজনে মদীনায় প্রচলিত সা’ এর চেয়ে ওজনে প্রায় দেড়গুণ। ইরাকী ফিকাহ্বিদরা বলেন, আমাদের পরিমাপটি হযরত উমার (রা.) ব্যবহৃত সা’ এর মত, তা ৮(আট) রতল। তাঁরা আরও বলেন যে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) আট রতল পানি দিয়ে গোসল করতেন ও দুই রতল পানি দিয়ে ওজু করতেন অথবা রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এক সা’ পানি দিয়ে গোসল করতেন ও এক মুদ পানি দিয়ে ওজু করতেন। তাদের মতে এক সা’ সমান আট রতল এবং এক মুদ সমান দুই রতল(Fiqh Al-Zakah Vol-I page-184)।
ঈমাম মালিক, শাফেঈ, আহমদ ও অন্যান্য হিজাযবাসীরা মদীনার এক সা’ সমান পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ (৫-১/৩) রতল হিসাব করেন। হিজাযীদের দলিল হল মদীনায় প্রচলিত সা’ই পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ রতল এবং তা রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এর সময় থেকেই বংশানুক্রমে চালু হয়ে এসেছে। আর সুন্নাহ অনুযায়ী মাদানী সা’ এর পাত্রের পরিমাপ অনুসরণ করতে হবে। ইবনে হাজম বলেন, এ সা’র বিষয়টি মদীনার ছোট-বড় সকলেরই জানা। এ ব্যাপারে সঠিক কথা জানার জন্য বাগদাদের আব্বাসীয় আমলে প্রধান বিচারপতি (Qadi al-Qudat) ঈমাম আবূ ইউসুফ মদীনায় গিয়েছিলেন এবং তিনি সেখানকার আনসার ও মুহাজিরদের অধ:স-ন ৫০ জন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের সা’ পাত্রগুলি দেখেন। মদীনাবাসী ব্যক্তিবর্গ তাঁকে বলেন, এরূপ সা’ রাসূলুল্লাহ্ (সা.) সময় থেকেই বংশানুক্রমে প্রচলিত হয়ে এসেছে। আবূ ইউসুফ সেগুলো ওজনে পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ রতল বলে মনে করেন। ফকীহ মুজতাহিদ ঈমাম আবূ ইউসুফ বলেন ’আমি সা’ এর ব্যাপারে আবু হানিফার কথা ত্যাগ করলাম ও মদীনাবাসীদের কথা গ্রহণ করলাম’। ঈমাম মালিক ইবনে আনাসও বলেছেন, একই ধরণের সা’ রাসূল (সা.) ব্যবহার করেছেন। ঈমাম মালিক নিজেই খলীফা হারুন আল-রশীদের সম্মূখে এক সা’ শস্যদানা ওজন করে দেখিয়েছেন। হিজরী তৃতীয় শতকে ঈমাম আহমদ ইবনে হান্বল বলেছেন ‘আমি এক সা গম ওজন করেছি, তা পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ রতল পরিমাণের হয়’। আল-রয়ীস বলেন, ’সত্যি কথা এই যে, অকাট্য দলীল-প্রমাণ পাওয়ার পর এ পরিমাণটির ব্যাপারে আর কোন সন্দেহ থাকাই উচিত নয়’। আল-রয়ীস আরও বলেন, ঈমাম মালিকের চাইতে মদীনার সমাজ ব্যবস্থা সম্বন্ধে আর কে বেশী জানেন ? ঈমাম আবূ ইউসুফের সাক্ষ্যর চাইতে বড় সাক্ষ্য আর কার হতে পারে ?
মদীনার সমাজে প্রচলিত সা’, বাস-ব পরীক্ষণের মাধ্যমে এর ওজনের পরিমাপ নির্ণয় এবং মুজতাহিদ ফকীহদের সাক্ষ্য ও মতানুযায়ী এটা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে হিজাযী ফিকাহ্বিদদের মতটিই সহীহ, মদীনায় প্রচলিত এক সা’ সমান পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ (৫-১/৩) রতল। যা বর্তমান কালের মেট্রিক পদ্ধতির ওজনে ২.১৭৬ কিলোগ্রাম গমের সমান।
নিসফে সা’ গম এর প্রচলন
’নিসফ’ আরবী শব্দ, এর অর্থ অর্ধেক। দুই মুদ বা অর্ধ সা’ পরিমাণকে ’নিস্ফে সা’ বলা হয়।
রাসূলুল্ল্লাহ্ (সা.) ফিতরার পরিমাণ এক সা’ খাদ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। সাধারণ খাদ্য হিসাবে গমের ব্যবহার তখন কম ছিল। সাহাবাদের (রা) শাসন আমলে গমের আমদানী ও ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। গমের মূল্য বেশী ছিল বিধায় দুই মুদ বা অর্ধ সা’ পরিমাণ গম ফিতরাবাবদ প্রদান করার প্রচলন হয়। ”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার(রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যুগে মাথাপিছু এক সা‘ পরিমাণ বার্লি অথবা খেজুর বা বার্লি জাতীয় শস্য, অথবা কিশমিশ সদ্কায়ে ফিতর প্রদান করত। রাবী (নাফে) বলেন: অত:পর হযরত উমার(রা.) এর সময় যখন গমের ফলন অধিক হতে থাকে, তখন তিনি আধা সা’ গমকে উল্লেখ্য বস’র এক সা’ এর সমপরিমাণ নির্ধারণ করেন। নাফে আরও বলেন আবদুল্লাহ ইবনে উমার(রা.) সদ্কায়ে ফিতর হিসাবে শুকনো খেজুর দিতেন। অত:পর কোন এক বছর মদীনায় শুকনো খেজুর দুষ্প্রাপ্য হওয়ায় তাঁরা সদ্কায়ে ফিতর হিসাবে বার্লি দেন”(আবূ দাঊদ)।
নিম্নের হাদিসটির বর্ণনা খুবই স্পষ্ট (বূখারী ও মুসলিম সহ অন্যান্য হাদিস গ্রনে’ এই হাদিসটির বর্ণনা আছে):-
”আবু সায়ীদ খুদ্রী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমাদের মধ্যে ছিলেন, তখন আমরা ছোট ও বড়, স্বাধীন ও ক্রীতদাস প্রত্যেকের পক্ষ হতে সাদাকাতুল ফিতর বাবদ এক সা’ পরিমাণ খাদ্য অথবা এক সা’ পনীর অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ কিশমিশ প্রদান করতাম। এভাবেই আমরা তা প্রদান করতে থাকি। পরে মুয়াবিয়া ইবনে আবূ সুফিয়ান (রা.) হজ্জ অথবা উমরার উদ্দেশ্যে যখন আমাদের নিকট আসলেন, তখন তিনি মিম্বরে আরোহণ করে উপসি’ত লোকদের সাথে এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করলেন। আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি বললেন, আমার মতে সিরিয়ার দু’ মুদ গম মদীনার এক সা’ খেজুরের সাথে বিণিময় হয়। লোকেরা তা গ্রহন করে নিলেন। আবু সায়ীদ খুদ্রী (রা) বলেন আমি তো যতদিন জীবিত থাকব ঐ ভাবেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করব, যে ভাবে আমি পূর্বে (এক সা’) আদায় করে আসছিলাম”(সহীহ মুসলিম)।
এই হাদিসে সিরিয়ার শাসনকর্তা খলিফা মুয়াবিয়ার(রা.) বক্তব্য খূবই স্পষ্ট। তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে পরিষ্কার বুঝা যায়-
(১) রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে যে সকল খাদ্য (যব, খেজুর, পনীর ও কিশমিশ ইত্যাদি) দিয়ে ফিতর প্রদান করা হত সেগুলোর মধ্যে গমের উল্লেখ স্পষ্টভাবে ছিল না এবং তিনি কখনও দুই মুদ বা অর্ধ সা’ গম দিতে বলেননি, তাই তার উল্লেখ এখানে নাই। যদি কখনও রাসুলুল্লাহ্(সা.) দুই মুদ বা অর্ধ সা’ গম দিতে বলে থাকতেন তবে নিশ্চয়ই এখানে তা উল্লেখ করতেন। কারণ উক্ত মজলিসে খলিফা মুয়াবিয়ার(রা.) সাথে তাঁর সমর্থক অনেক সাহাবী(রা.)ও উপসি’ত ছিলেন যারা রাসুলুল্লাহ্(সা.) এর সংস্পর্শ পেয়েছিলেন। উক্ত মজলিসে অনেক লোক উপসি’ত থাকা সত্বেও যদি কোন সাহাবী অথবা কোন তাবীঈন জানতেন যে মুয়াবিয়ার(রা.) সিদ্ধান- রাসুলুল্লাহ্(সা.) এর সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ তাহলে তিনি তা উল্লেখ করতেন। যাহোক ইজতিহাদের ভিত্তি ছিল এক সা’ খেজুরের তৎকালীন বিণিময় মূল্যের সমপরিমাণ গম (অর্ধ সা’) ফিতর বাবদ নির্ধারণ করা। ইজতিহাদ ও রায় শরীয়তসম্মত, কিন’ এর পক্ষে অকাট্য দলিল না থাকলে তা অগ্রহণীয়।
(২) মদীনার এক সা’ খেজুরের সহিত সিরিয়ার উন্নত মানের দুই মুদ গম বিণিময় হত, তাই সেই সময়কার বাজার দর অনুযায়ী খেজুরের বিণিময় মূল্যের সমতার শর্তে রাসুলুল্লাহ্ (সা.) নির্দেশিত এক সা’র পরিবর্তে দুই মুদ বা অর্ধ সা’ পরিমাণ গম সাদাকাতুল ফিতর বাবদ সিরিয়া অঞ্চলের জন্য নির্ধারণ করেন। এক সা’ খেজুরের বিকল্প হিসাবে দুই মুদ বা অর্ধ সা’ পরিমাণ গমের এই সিদ্ধান- নেয়ার পিছনে এক সা’ খেজুরের বিণিময় মূল্যের সমপরিমাণ গম প্রদান করা যথেষ্ট বলে বিবেচনা করেছিলেন, কারণ সেই সময়ে গমের মূল্য খেজুরের মূল্যের চেয়ে বেশী ছিল। জনসাধারণ এক সা’ গম দিলে বেশী মূল্যের কারণে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে তাই খেজুর ও গমের বাজার দর যাচাই করে নিসফে সা’ গম প্রদানের এই সিদ্ধান- নেন।
(৩) আঞ্চলিক খাদ্যের প্রতি স্পষ্টতই গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। কারণ সিরিয়া অঞ্চলের সাধারণ খাদ্য গম, জনসাধারণ যেন তাদের নিজেদের খাদ্য থেকে সাদাকাতুল ফিতর প্রদান করতে পারে, এই প্রয়োজনে তাদের ফিতরের খাদ্য হিসাবে গম নির্বাচন করেছেন। উপরোক্ত হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত আবু সায়ীদ খুদ্রী (রা) ফিতর বাবদ গম নির্বাচনের বিরোধিতা করেননি, তিনি বিরোধিতা করেছেন গমের পরিমাণের, দুই মুদ বা অর্ধ সা’ পরিমাণের বিরোধিতা করেছেন।
এক সা’ খেজুরের সাথে দুই মুদ গমের বিণিময়ের ঘটনা রাসুলুল্লাহ্ (সা.) এর পরে সংঘটিত হয়। ইবনে উমর(রা.) এই বর্ণনা থেকেও তা প্রমাণ করে- ”আবদুল্লাহ ইবনে উমর(রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ্(সা.) সাদাকাতুল ফিতর হিসাবে এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। পরবর্তীকালে লোকেরা দু’মুদ গমকে তার সমপরিমাণ হিসাবে ধরে নিয়েছে” (বুখারী ও মুসলিম) আবু সায়ীদ খুদ্রী (রা) আরও বলেছিলেন ’এটা মুয়াবিয়ার মূল্য নির্ধারণ- আমি গ্রহণও করি না, তদানুযায়ী আমলও করি না’(ফতহুল বারী, আল-মুস্তাদরাক) আবু সায়ীদ খুদ্রী (রা) ছাড়াও অনেক সাহাবায়ে কিরাম(রা.) মূল্যের হিসাবের বিরোধিতা করেছেন। হযরত আলীর (রা.) কথা থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়- ”হযরত আলী (রা.) যখন বসরাতে সব জিনিষের সস্থা মূল্য দেখতে পান, তিনি তখন তাদেরকে বললেন, আল্লাহ তোমাদেরকে স্বচ্ছলতা দিয়েছেন, তোমরা গম ও অন্যান্য খাদ্যের এক সা’ পরিমাণই দাও”(আবু দাঊদ) হযরত আলী (রা.) সহ অনেক সাহাবীগণ(রা.) গমের ক্ষেত্রেও এক সা’ প্রদানের জন্য জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতেন। হাসান বসরী, জাবির বিন জায়দ, মালিক, শাফেঈ, আহমদ বিন হান্বল এবং ইসহাকের মতে সাদাকাতুল ফিতর এক সা’ দিতে হবে, সেটা গম বা অন্য যাই কিছু হউক না কেন।
রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে যে সকল খাদ্য (যব, খেজুর, পনীর ও কিশমিশ ইত্যাদি) দিয়ে ফিতর প্রদান করা হত, বর্তমানকালে সেগুলোর মধ্যে মূল্যের পার্থক্য আছে। খেজুর, পনীর ও কিশমিশের মূল্য গম ও যবের চেয়ে অনেকগুণ বেশী। আমাদের দেশেও বিভিন্ন খাদ্যের মধ্যে মূল্যের পার্থক্য বিদ্যমান আছে, যেমন উন্নতমানের চালের মূল্য গমের মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশী। খাদ্যাভাসের কারণে কোন ব্যক্তি বা কোন সমাজে বা অঞ্চলে বা কোন দেশে যেসকল লোক সারা বছর বেশীদামের খাদ্য খেতে অভ্যস- ও আর্থিকভাবে সক্ষম, তারা সেই খাদ্য দিয়ে ফিতরা দিতে স্বাভাবিকভাবেই সক্ষম হবেন।
মূল্যের ব্যাপারটি পরিবর্তণশীল, মূল্য স্থায়ী থাকে না। হয়তবা সাময়িকভাবে কোন সময়ে বা কোন যুগে এর পরিবর্তণ নাও থাকতে পারে, কিন’ বাস-বে স্থায়ী হয় না। কোন দ্রব্যের বাজার মূল্য নির্ধারিত হয় প্রধানত: ঐ দ্রব্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও চাহিদার কারণে। এই কারণগুলির যে কোন একটির কম বা বেশী হলে অন্যটিকে প্রভাবিত করে, যার ফলে বাজার মূল্যও কমে বা বাড়ে। তাছাড়া সকল স্থানে, অঞ্চলে বা দেশে একই দ্রব্যের ভিন্ন ভিন্ন মূল্য হয়ে থাকে, অর্থাৎ কমবেশী হয়ে থাকে। তাই খেজুরের মূল্যের পার্থক্য শর্তে নির্ধারিত নিসফে সা’ গম প্রদানের বিধান ঐ সময়কার জন্য ঠিক ছিল মনে করা হলেও পরবর্তীকালে গমের মূল্য কমে যাওয়ার কারণে তা অকার্যকর হয়ে গেছে। উদাহরণ স্বরূপ ঢাকার বাজারে সাধারণ মানের এক কেজি খেজুরের মূল্য ১০০ টাকা, এ হিসাবে এক সা’ (২.৫০০ কেজি) খেজুরের মূল্য = ২৫০ টাকা। আর যদি এক কেজি গমের মূল্য ২৫ টাকা হয়, তাহলে এক সা’ খেজুরের মূল্যের বিণিময়ে ১০ কেজি গম পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে খেজুরের মূল্য গমের মূল্যের চেয়ে চারগুণ বেশী। মদীনার খেজুরের মূল্যের সাথে যদি গমের তুলনা করা হয়, তাহলে প্রথমে বলতে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নতমানের খেজুর উৎপন্ন হয় মদীনা অঞ্চলে। মদীনার এক কেজি ’আজওয়া’ খেজুরের বর্তমানকালের মূল্য কমপক্ষে ১০০০ টাকা, সে হিসাবে এক সা’ (২.৫০০ কেজি) খেজুরের মূল্য = ২৫০০ টাকা, যার বিণিময়ে ১০০ কেজি (এক কুইন্টাল) গম পাওয়া যাবে। বর্তমানকালে মদীনার খেজুরের মূল্য গমের মূল্যের চেয়ে চল্লিশগুণ বেশী, অথচ মুয়াবিয়া(রা.) এর সময়ে গমের মূল্য মদীনার খেজুরের মূল্যের চেয়ে বেশী ছিল। অতএব, বর্তমানকালে নিসফে সা’ গমের মূল্য এক সা’ খেজুরের মূল্যের বিকল্প নয়। কিশমিশ ও পনীরের মূল্য গমের চেয়ে অনেক বেশী। যবের ব্যবহার আমাদের দেশে নাই। এসব কারণে মুহাক্কিক আলেমগণ মনে করেন নিসফে সা’ গম প্রদানের প্রয়োজনীয়তা, যৌক্তিকতা ও কার্যকারিতা নাই। গমের ক্ষেত্রেও ফিতরার পরিমাণ হবে এক সা’।
যে সকল খাদ্যে ফিতরের যাকাত দিতে হবে
”আবু সায়ীদ খুদরী (রা) বলেন, ’আমরা সাদাকাতুল ফিতর হিসাবে এক সা’ খাদ্য(ta’aam, means food) অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ পনীর অথবা এক সা’ কিশমিশ দিতাম” হাদিসে উল্লেখিত ’খাদ্য’(ta’aam) বলতে অনেক আলেমের ধারণা আবু সায়ীদ খুদরী প্রথমে এক সা’ খাদ্যের উল্লেখ করেছেন পরবর্তিতে খাদ্যগুলির বর্ণনা দিয়েছেন, অনেকের মতে কেবলমাত্র গমকে বুঝানো হয়েছে, আবার অনেক আলেম মনে করেন দেশের বা সমাজের প্রধান খাদ্য বুঝানো হয়েছে যেমন গম, ভুট্টা, চাল, ময়দা, বাজরা, জোয়ার বা অন্য যে কোন খাদ্য যা ঐ অঞ্চলের বা দেশের প্রচলিত প্রধান খাদ্য। মতামত যাই হউক না কেন, ’খাদ্য‘ বলতে যেটিই বুঝানো হউক, তা সমাজের সাধারণ খাদ্যের অন-র্ভুক্ত বলে বিবেচিত। হাদিস গ্রন’সমূহে যেসকল খাদ্যের উল্লেখ পাওয়া যায় যেমন যব, খেজুর, পনীর ও কিশমিশ সেগুলি রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে তৎকালীন মদীনার সমাজে প্রচলিত খাদ্য। সাহাবাদের(রা) শাসন আমলে গমের আমদানী ও ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।
ইসলাম সারা বিশ্বের সকল অঞ্চলে ছড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশের ও অঞ্চলের মানুষের খাদ্য ভিন্ন ভিন্ন। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের মানুষের মোট গড় খাদ্যের অর্ধেকের বেশী খাদ্যের উৎস দানাদার শস্য (Cereals) যেমন চাল, ভূট্টা, যবু(Barley), গম, ওট(Oat), বাজরা(Millet), জোয়ার(Sorghum) ইত্যাদি। আর বাকি অন্যান্য খাদ্য যেমন মূল ও কন্দ(Roots & Tubers) জাতীয় যেমন ইয়াম(Yam), কাসাবা(Kassava), আলু, মিষ্টিআলু, মূখী(Taro) ইত্যাদি, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, তৈল, চর্বি, চিনি, বাদাম, শাঁস(Kernel), ডাল ও শূঁটি(Beans), ফল-মূল, লতা-পাতা ও শাকসব্জি ইত্যাদি।
আলেমগণ সব ধরণের খাদ্য দিয়ে ফিতরা প্রদান যৌক্তিক মনে করেন না। শুকনো খাবার যেগুলো সংরক্ষণ করা সহজ, ফিতরার জন্য সেগুলোর প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। পঁচণশীল এবং যে সকল খাদ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়, এগুলো দিয়ে ফিতরা প্রদান সমর্থন করেন না।
দানাদার খাদ্য যেমন চাল, যব, গম, ভূট্টা, বাজরা, জোয়ার ইত্যাদির প্রচলন পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে আছে এবং এগুলোর যে কোন একটি বা একাধিক দানাদার খাদ্য কোন অঞ্চল বা দেশের সাধারণ খাদ্য হিসাবে বিবেচিত হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যাকাতুল ফিতর এর পরিমাণ হলো এক ‘সা’ খাদ্য। খেজুর, কিশমিশ, বিভিন্ন দানাদার শস্য যেমন চাল, যব, গম, ভূট্টা, ময়দা, বাজরা, জোয়ার, পনির(পানি নিষ্কাষিত শুষ্ক দুধ যার মাখন বের করা হয়নি), গুড়া দুধ বা মাংস ইত্যাদি দিয়ে যাকাতুল ফিতর প্রদান করা যাবে।
ফিকাহবিদগণ মনে করেন দেশের সাধারণ খাদ্য দিয়ে যাকাতুল ফিতর প্রদান করা উচিত। অভ্যাসগত কিংবা শারীরিক সমস্যা বা হজমশক্তির কারণে কোন ব্যক্তি যদি ভিন্ন খাদ্য গ্রহণ করে তবে ঐ ব্যক্তির নিজের খাদ্য অথবা দেশের সাধারণ খাদ্য, এর যে কোন একটি দিয়ে যাকাতুল ফিতর প্রদান করা উচিত। আরেকটি মত হচ্ছে, যিনি যে মানের খাদ্যদ্রব্য বছরের বেশিরভাগ সময় আহার করেন, সে মানের খাদ্যদ্রব্যের ভিত্তিতেই যাকাতুল ফিতর প্রদান করা উচিত।
দানাদার খাদ্য খোসামূক্ত হতে হবে। বাতিল, ঘুণে ধরা ও দোষযুক্ত খাদ্য দেয়া যাবে না। ফিকাহবিদগণ আরও মনে করেন দেশের সাধারণ খাদ্য অথবা কোন ব্যক্তির নিজের খাদ্য চিহ্নিত করা গেলে, কেউ যদি কার্পণ্য ও অর্থলিপ্সার কারণে তার চেয়ে নিম্নমানের খাদ্যে যাকাতুল ফিতর গ্রদান করে, তাহলে তা জায়েয হবে না। তবে কেউ উচ্চমাণের খাদ্য প্রদান করলে তা জায়েয হবে।
উল্লেখ্য, দানাদার খাদ্যগুলোর মধ্যে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য চাল। চাল একটি উৎকৃষ্ট খাদ্য, এবং মূল্যের দিক থেকেও অন্যান্য দানাদার খাদ্যের চেয়ে বেশী। চাল দিয়ে যাকাত, ফিতরা, ফিদিয়া, কাফ্ফারা, মান্নত, দান-খয়রাত ইত্যাদি প্রদান করা সম্পূর্ণরূপে জায়েয। সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমীরাত, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া সহ বিশ্বের অনেক দেশে চাল দিয়ে ফিতরা প্রদান করা হয়। সৌদি আরবে সুন্নাহ অনুযায়ী কেবলমাত্র খাদ্য দিয়ে ফিতরা প্রদান করা হয়, নগদ অর্থ প্রদান উৎসাহিত করা হয় না। ফিতরা প্রদানকারী ক্রেতাদের সুবিধার জন্য এক সা’ পরিমাণ নির্ধারিত ওজনের প্যাকেটকৃত চাল রমযানের শেষের দিকে সৌদি আরবের সর্বত্র সকল দোকানপাট এমনকি ফুটপাতেও বিক্রি হয়ে থাকে। পবিত্র কা’বা ও মসজিদে নববীর চারপাশেও প্যাকেটকৃত চাল বিক্রির একই দৃশ্য দেখা যায়। একই সময়ে সমগ্র সৌদি আরবে ’যাকাত আদায় ও বিতরণকারী’ সংস্থাগুলোর অস্থায়ী স্টলসমূহে ফিতরা প্রদানকারীদের কাছ থেকে চালের প্যাকেট সংগ্রহ করা হয় এবং যথাসময়ে ফিতরাগ্রহীতাদের নিকট হস্থান্তর করা হয়।
আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য চাল দিয়েই ফিতরা প্রদান করা উচিত। আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি এবং মেহমানদারী, ফকির-মিস্কিন খাওয়ানো, দান-খয়রাত ইত্যাদি কাজে চালই ব্যবহার হয়ে থাকে। আমরা ভাত খেয়ে জীবন ধারণ করি এবং নামায-রোযাসহ সকল ইবাদতসমূহ পালন করে থাকি। ফিকাহবিদগণ মনে করেন সমাজের সাধারণ খাদ্য থেকে তাদের ফিতরা প্রদান করা উচিত কারণ সমাজের ধনী-গরীব সকল লোক একই খাদ্যে অভ্যস-, তাহলে যাকাতদাতার জন্য নিজের খাদ্য দিয়ে ফিতরা প্রদান করা সহজ হবে এবং ফিতরাগ্রহীতাও তার চাহিদামত খাদ্যটি পাবে। গরীব-মিসকিন মানুষের দ্বারে দ্বারে চাল ভিক্ষা চায় আর ক্ষুধার্ত হলে দু’মুঠো ভাত চায়। ঘরে ঘরে মুষ্টিচাল ভিক্ষা দেয়া আর ফকির-মিসকিনদেরকে ভাত খাওয়ানো আমাদের সমাজের অতি প্রাচীন ঐতিহ্য। যেহেতু যাকাতুল ফিতর প্রদান করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য গরীব-মিসকিনদের জন্য ঈদের দিনে খাদ্যের ব্যবস্থা করা, যেন অভাবের লাঞ্ছনা নিয়ে তাদেরকে ঈদের দিনে ভিক্ষা করতে না হয়, সেহেতু কেবলমাত্র চাল দিয়েই তাদের এই চাহিদা পূরণ করে ভিক্ষা করা থেকে নিবৃত্ত করা
সম্ভব।যাকাতুল ফিতর কাদের উপর ওয়াজিব
ঈদুল ফিতরের দিন সূর্যোদয়ের পূর্বে যার নিকট যাকাত ফরয হওয়ার পরিমাণ অর্থ-সম্পদ থাকে তার উপর যাকাতুল ফিতর (ফিতরা) ওয়াজিব। পূর্ণ বৎসর নিসাব পরিমাণ মালের মালিক থাকার দরকার নাই। যাকাতের ক্ষেত্রে ঘরের আসবাবপত্র হিসাব হয় না। কিন’ ফিতরার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় আসবাবপত্র ব্যতিত অন্যান্য সৌখিন দ্রব্যাদি, অতিরিক্ত ঘর (খালি বা ভাড়ায় ব্যবহৃত) ইত্যাদি সম্পদ গণ্য হবে।
অধিকাংশ আলিমের মতে, কোনো ব্যক্তির নিকট ঈদের দিনে তার পরিবারের একদিন একরাত ভরণ-পোষণের খরচ ছাড়া অতিরিক্ত যাকাতুল ফিতর পরিমাণ অর্থাৎ এক সা‘ পরিমাণ খাদ্য থাকলেই যাকাতুল ফিতর প্রদান করতে হবে। যদি কারো নিকট এ পরিমাণ খাদ্য বা টাকা না থাকে তবে তাকে যাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে না। বিভিন্ন হাদীসের ভাষা থেকে বুঝা যায় যে, কারো নিকট একদিন ও একরাতের খাবার থাকলে তার জন্য ভিক্ষা করা বা হাত পাতা ঠিক নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি অমুখাপেক্ষী হওয়া সত্বেও ভিক্ষা করে সে জাহান্নামের দিকে বেশি অগ্রসর হল। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলূল্লাহ! অমুখাপেক্ষীর মাপকাঠি কি? তিনি বললেন, একদিন একরাতের খাবার থাকা”। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস নম্বর : ১৬৩১, হাদীসটি সহীহ, শায়খ আলবানী)
নর-নারী, যুবা-বৃদ্ধ নির্বিশেষে প্রতিটি মুসলমানের জন্য যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। ইবনে ওমরের (রা:) বর্ণনা দ্বারা এটা নিশ্চিত করা হয়েছে; “ আল্লাহর প্রেরিত রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঘোষনা করেছেন যে, স্বাধীন কিংবা দাস, যুবা কিংবা বৃদ্ধ, স্ত্রী কিংবা পুরুষ নির্বিশেষে সকল মুসলমানকে এক ‘সা’ পরিমাণ খেজুর বা যব (বার্লি) যাকাতুল ফিতর বাবদ অবশ্যই প্রদান করতে হবে ”(সহীহ বুখারী) নিজের পক্ষে, স্ত্রী এবং তার উপর নির্ভরশীল সকলের পক্ষে, এমনকি তার উপর নির্ভরশীল পিতামাতার পক্ষে যাকাতুল ফিতর প্রদান করতে হবে। তবে কেউ নিজে ইচ্ছা না করলে এবং তাদের অনুমতি ছাড়া কোন ব্যক্তি তার ভৃত্যদের পক্ষে যাকাতুল ফিতর প্রদান করতে বাধ্য নন।
যাকাতুল ফিতর প্রদানের সময়
রোযাদার ব্যক্তির চিত্তের পরিশোধনের অন্যতম উপায় হিসাবে তার উপর যাকাতুল ফিতর ধার্য করা হয়। এজন্য শেষ রমযানের দিন সূর্যাসে-র পরই যাকাতুল ফিতর প্রদেয় হয়। যেহেতু শেষ রমযানের দিনের সূর্যাসে-র সাথে সাথেই রোযার অবসান ঘটে, সেহেতু যাকাতুল ফিতরও তখন প্রদেয় হয়। সুন্নাহ অনুযায়ী ঈদের নামাযের পূর্বেই যাকাতুল ফিতর প্রদান করা উচিত। এর ফলে গরীব-মিসকীনরা আনন্দচিত্তে অন্যান্য মুসলমান ভাইদের সাথে ঈদগাহে যেতে সক্ষম হয়।
ইবনে ওমর (রা:) এর ব্যাখ্যা থেকে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়। “আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আদেশ দিয়েছেন যে, মানুষ ঈদের জামায়াতে যাওয়ার আগেই যাকাতুল ফিতর প্রদান করা হউক”(সহীহ মুসলিম)।
হাদীসের ভিত্তিতে যাকাতুল ফিতর প্রদানের দু’টি সময় পাওয়া যায়। একটি উত্তম সময় অপরটি বৈধ সময়।
উত্তম সময় : শেষ রোযার সূর্যাসে-র পর থেকে ঈদের সালাতের পূর্ব পর্যন- সময়টি উত্তম সময়। কারণ, এটি ওয়াজিব করার অন্যতম লক্ষ্য হলো, দরিদ্রদেরকে অন্ন প্রদানের মাধ্যমে ঈদের খুশিতে ধনীদের সাথে তাদেরকে শরীক করা। এজন্য ফিতরা যদি ঈদের সালাতের আগে দেয়া না হয় তাহলে এর প্রধান লক্ষ্যই ব্যাহত হবে। আর এটিই রাসূলুল্লাহ (সা.) ও অধিকাংশ সাহাবীর আমল। আব্দুল্লাহ ইবন উমার রা. বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) যাকাতুল ফিতর (আদায়)-এর ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন লোকেরা ইদগাহে যাওয়ার পূর্বেই তা আদায় করা হয়”। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নম্বর : ২৩৩৫) অপর হাদীসে এসেছে, “যে ব্যক্তি তা (ঈদের) সালাতের আগে আদায় করবে, তার আদায়টি যাকাতুল ফিতর হিসেবে গৃহীত হবে। আর যে ব্যক্তি সালাতের পরে তা আদায় করবে, তার আদায়টি সাদাকাহ হিসেবে গৃহীত হবে”। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস নম্বর : ১৬১১, হাদীসটি হাসান, শায়খ আলবানী)
বৈধ সময় : ঈদের দু-একদিন পূর্বে যাকাতুল ফিতর আদায় করা। কেউ এরূপ করলে তার যাকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যাবে। তবে বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াও এরূপ করা ঠিক নয়। কারণ, পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ও অধিকাংশ সাহাবীদের আমল ছিল, শেষ রোযার সূর্যাসে-র পর থেকে ঈদের সালাতের আগে আদায় করা। ঈদের দু-একদিন আগে আদায় করা যে বৈধ সে ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের আমল রয়েছে। নাফি‘ ইবন আব্দুল্লাহ বলেন, “ইবন উমার রা. যাকাতুল ফিতর তাদেরকে দিতেন যারা তা গ্রহণ করতো। আর তারা তা ঈদের দিনের একদিন বা দুইদিন পূর্বে প্রদান করতো”। (সহীহ বুখারী, হাদীস নম্বর : ১৫১১)
যাকাতুল ফিতর কাদেরকে প্রদান করতে হবে
ফিতরা কেবলমাত্র মুসলিম ফকীর মিসকীনদেরকে প্রদান করতে হবে। হাদীসে রয়েছে ‘যাকাতুল ফিতর মিসকীনদের খাবার প্রদানের নিমিত্তে ফরয করেছেন’ (সুনান আবূ দাউদ, হাদীস নম্বর : ১৬১১, হাদীসটি হাসান, শায়খ আলবানী) রাসূলুল্লাহর বাণীটি এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, যাকাতুল ফিতর মিসকীন, ফকীর ও অভাবীদের হক। আল্লামা শাওকানী রহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, “এতে দলীল রয়েছে যে, ফিতরা কেবল যাকাতের খাতসমূহের মধ্য থেকে মিসকীনদের মাঝে প্রদান করা হবে”। (যাকাতুল ফিতর, নাদা আবু আহমাদ, পৃষ্ঠা : ১৪)
যদি কোন মুসলমান ঈদের জামায়াতের আগে যাকাতুল ফিতর প্রদান করতে ভুলে যায়
ঈদের নামাযের পরে যাকাতুল ফিতর প্রদানের অনুমোদন নাই। যাকাতুল ফিতর প্রদানের প্রধান উদ্দেশ্য হল ঈদের দিনে গরিবদের প্রয়োজন মিটানো। কাজেই যাকাতুল ফিতর প্রদানে বিলম্ব ঘটলে এর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। ইবনে আব্বাসের (রা:) বর্ণিত হাদিস থেকে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়, “রোযাদার ব্যক্তি রোযা রাখা কালে যে সব বাজে কথায় লিপ্ত হয়েছেন তাহা থেকে তাহার আত্মার শুদ্ধির জন্য আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যাকাতুল ফিতর প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন ”(আবু দাঊদ) জুমহুর আলিমের মতে, কোনো প্রকার ওযর ছাড়া ঈদের সালাতের আগে আদায় না করে দেরী করলে তাতে পাপ বা গুনাহ হবে। তবে তা প্রদানের বাধ্যবাধকতা থেকেই যাবে। বিলম্ব হলেও প্রদান করতে হবে।
যাকাতুল ফিতর এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তর
যাকাতুল ফিতর প্রদানকারীর নিজ দেশেই এটা বিতরণ করা উচিত। মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “ এটা (যাকাতুল ফিতর) ধনিদের মধ্য থেকে নিতে হবে এবং গরিবদের মধ্যে বিতরণ করে দিতে হবে” অনেক দেশে এবং অনেক অঞ্চলে মুসলিম জনগোষ্ঠির মধ্যে যাকাতপ্রার্থীর সংখ্যা খূবই কম। আবার অনেক দেশে এবং অনেক অঞ্চলে মুসলিমদের মধ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠির সংখ্যা খূবই বেশী। ক্ষুধা ও বুভূক্ষাজনিত দুর্দশাগ্রস’ এ সব মুসলমান যাকাত পাওয়ার ব্যাপারে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। যেসকল দেশ ও অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে যাকাতপ্রার্থীর সংখ্যা খূবই কম, তাদের উচিত তাদের উদ্বৃত্তের কথা বিবেচনা করে তাদের যাকাতুল ফিতর এসব দরিদ্র মুসলমানদের জন্য পাঠিয়ে দেয়া। অনেক জ্ঞানী আলেম মনে করেন প্রয়োজনের অগ্রাধিকার অথবা উদ্বৃত্তের কথা বিবেচনা করে যাকাতুল ফিতর প্রদানকারী ব্যক্তির দেশ থেকে অন্য কোন দেশে স্থানান্তর করা যেতে পারে।
বর্তমানকালে অনেক লোক তাদের কর্মস্থানের কারণে বিদেশে অবস্থান করেন। অনেকেই তাদের নিজ দেশের গরীব আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদেরকে তাদের ফিতরা প্রদানে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে যদি তিনি সুন্নাহ অনুযায়ী খাদ্য প্রদান করতে চান তবে তিনি নিজ দেশে তার নিযুক্ত কোন ব্যক্তির দ্বারা এক সা’ খাদ্য ক্রয় করে যাকাতপ্রার্থীকে প্রদান করতে পারেন। আর ফিতরা যদি নগদ অর্থে প্রদান করতে চান, তবে তিনি বর্তমানে যে দেশে অবস্থান করেন সে দেশের স্থানীয় বাজারে এক সা’ খাদ্যের মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ নিজ দেশের যাকাতপ্রার্থীর নিকট পাঠাতে পারেন। তবে নিজ দেশের খাদ্যের মূল্য প্রদান করতে পারবেন না, তিনি বর্তমানে যে দেশে অবস্থান করেন সে দেশের খাদ্যের মূল্য দিতে হবে।
যাকাতুল ফিতর এক দেশ থেকে অন্য কোন দেশে স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, ঈদের জামায়াতে যাওয়ার আগেই যাকাতুল ফিতর প্রাপকদের কাছে পৌঁছাতে হবে।
যাকাতুল ফিতর নগদে প্রদান
খাদ্যদ্রব্য ছাড়া উহার মূল্যবাবদ নগদ অর্থ প্রদান করার ব্যাপারে মত পার্থক্য আছে।
ঈমাম মালিক, শাফেঈ ও আহমাদ মূল্য প্রদান সমর্থন করেন নি। ঈমাম আহমদ বলেন- আমি ভয় করছি যে তাতে আদায় হবে না। তাছাড়া তা রাসূল(সা.)এর সুন্নাতের পরিপনি’ও।
ঈমাম সওরী, আবু হানীফা ও তাঁর সঙ্গীগণ মূল্য প্রদান করা জায়েয বলেছেন।
জ্ঞানী আলেমদের অনেকে মনে করেন যে, খাদ্য-দ্রব্যের গুণগত মানকে বিবেচনায় এনে (বর্তমান বাজার মূল্যে) নগদে যাকাতুল ফিতর প্রদান করা যায়। মানুষের জন্য যাকাত প্রদানের কাজটিকে সহজ করে তোলাই এর লক্ষ্য।
তবে এটা মনে রাখতে হবে যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের মানদন্ডে যাকাতুল ফিতর হিসাব বৈধ নয়। কারণ এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক বছর থেকে অন্য বছরে খাদ্য সামগ্রীর দামের ব্যাপক তারতম্য ঘটে।
নগদ অর্থে ফিতরা হিসাব
যাকাতুল ফিতর প্রদানের সময়, ফিতরা প্রদানকারী ব্যক্তি স্থানীয় বাজারে এক সা’ খাদ্যের মূল্যের সমপরিমাণ নগদ অর্থ হিসাব করবেন।
উদাহরণস্বরূপ :
সাধারণ মানের চাল প্রতি কেজি ৩০.০০ টাকা হলে, এক সা’ বা ২.৫০০ কেজি চালের মূল্যবাবদ জনপ্রতি ফিতরা = ৩০.০০ ঢ ২.৫০০ = ৭৫.০০ টাকা
মাজারী মানের চাল প্রতি কেজি ৪০.০০ টাকা হলে, এক সা’ বা ২.৫০০ কেজি চালের মূল্যবাবদ জনপ্রতি ফিতরা = ৪০.০০ ঢ ২.৫০০ = ১০০.০০ টাকা
উৎকৃষ্ট মানের চাল প্রতি কেজি ৬০.০০ টাকা হলে, এক সা’ বা ২.৫০০ কেজি চালের মূল্যবাবদ জনপ্রতি ফিতরা = ৬০.০০ ঢ ২.৫০০ = ১৫০.০০ টাকা
উপরের এই হিসাবগুলি কেবলমাত্র উদাহরণ, ফিতরা প্রদানকারী ব্যক্তি ফিতরা প্রদানের দিন তিনি যে মানের চাল বছরের বেশীরভাগ সময় গ্রহন করেন, স্থানীয় বাজারে সে মানের চালের মূল্য যাচাই করে এক সা’ বা ২.৫০০ কেজি চালের মূল্য জনপ্রতি ফিতরা নগদ অর্থে নির্ধারণ করবেন।
অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, ঈদের জামায়াতে যাওয়ার আগেই যাকাতুল ফিতর প্রাপকদের কাছে পৌঁছাতে হবে।
Scridb filter