একজন নও মুসলিমের আত্মকাহিনী

পূর্বে প্রকাশিতের পর-৩
  পূর্বের ২টি পর্ব প্রকাশিতের পর পাঠক সমাজ থেকে সম্পাদকে নিকট অনেক মোবারকবাদ এসেছে, আমার টেলিফোন সংগ্রহ করে ফোনে আমাকেও মোবারকবাদ দিয়েছে। আবার কেউ কেউ বিরূপ মন্তব্যও করেছে। বলে ২ দিন হলো মুসলমান হয়েছে! এখন সে নসিহত শুরু করেছে। আমি তাদেরকে অতি বিনয়ের সাথে অবগতকরছি যে আমার এখন কোন অভিপ্রায় নেই, কাউকে খাটো করি, কাউকে নসিহতকরি। শুধুমাত্র ঈমানের তাগিদেই লিখছি, এটি যে আমার ঈমানী দায়িত্ব। কোন উদ্দেশ্য বা কাউকে আঘাত দেওয়ার জন্য নয়। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; কোন মুসলমান যদি অন্য মুসলমানের দোষ গোপন রাখে, তবে আল্লাহ তা‘আলাও কিয়ামত দিবসে তার দোষ গোপন রাখবেন।
 আমি ইসলামে প্রবেশ করার পূর্বে দীর্ঘ ৭টি বৎসর আমার কাছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা যেভাবে ইসলামকে উপস্থাপন করেছেন, ইসলাম গ্রহণ করার পর মুসলমানদের সাথে মিশে যা দেখছি, তার মাঝে বিস্তর ফরাক পরিলক্ষিত হয়। মনে হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে যে পথে পরিচালিত করতে চান, আমরা চলছি তার বিপরীত পথে। তাইতো আজ সারা বিশ্বে মুসলমান মানেই জঙ্গী, সন্ত্রাসী ইত্যাদিতে আখ্যায়িত করে ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে বিচ্যুত করার মহাসমারোহে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ কি নেই মসলমানদের কাছ? ঈমানের মত অমূল্য সম্পদ আছে। অর্থে, শক্তিতে-জনবলে বিশ্বের সেরা মুসলমান। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কথা চিন্তা করুন, ১২০ কোটি লোকের দেশ পাকিস্তানের চেয়ে ৮-১০ গুণ বগ, শক্তিতেও পাকিস্তানের চেয়ে অনেকে এগিয়ে, তারপরও পাকিস্তানকে কেমন সমিহ করে চলে। সামরিক শক্তিতেও সমানভাবে লড়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। এটা কিভাবে সম্ভব!? শুধুমাত্র ঈমানদার ও মুসলমান হওয়ার কারণেই। তাহলে বুঝতে হবে আজ আমাদের ঈমানী শক্তি কমে গেছে- তাই আজ সারা বিশ্বে মুসলমান কেবল মার খাচ্ছে। একটা প্রবাদ আছে; কোন ধর্মের উপর যখন অনবরত আঘাত আসতে থাকে, তখন বুঝতে হবে ঐ ধর্মের অনুসারীরা তার ধর্মকে সঠিকভাবে পালন করছে না। আমাদের দেশে এখনও শয়তানের প্ররোচনায় অনেক বেদআতী নিয়ম কানুন, পূর্ব পুরুষদের দোহাই দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। কোন মুসিবত আসলে ২ কেজি মিষ্টি আর ইমামকে ১০০ টাকা দিয়ে মীলাদ বা দোয়া পড়িয়ে সেই মুসিবত থেকে মুক্ত হওয়ায় বিশ্বাসী। অথচ মুসলমানদের বিশ্বাস হওয়া উচিত আল্লাহ তা‘আলা প্রতি। যে মহান আল্লাহই এই বিপদ থেকে মুক্তি দিবেন। প্রচলিত বিদআত অনুসরণ করে নয় বরং সুন্নতি পদ্ধতিতে আল্লাহর নিকট দোয়া চাইতে হবে। দুই রাকাত সালাতুল হাজাত আদায় করে আল্লাহর সমীপে কান্নাকাটি করুন। আল্লাহ অবশ্যই দোয়া কবুল করবেন। এই পদ্ধতি গ্রহণ না করে যদি ইমামের নিকট বা সমাজের নেতৃস্থানীয় লোকের নিকট শরাণপন্ন হোন যে, তারাই আমার বিপদ উদ্ধার করবে, তবে তো শিরক হয়ে যাবে।
 মুসলমান হলো আল্লাহর প্রতিনিধি। যত দিন নবী রাসূলদের প্রয়োজন ছিল, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে, তাই আর নবী রাসূল প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা নেই। তাই ঘোষণা করা হয়; যে মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্য হতে কোন পুরুষের পিতা নন, বরং তিনি সর্বশেষ নবী। তার পরে আর কোন নবী রাসূল আসবেন না। তবে কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াতী কাজ চালানোর জন্য সাহাবায়ে কেরাম আজমাঈন, তাবেঈন, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, আইম্মায়ে মুজতাহেদীন ক্রমান্বয়ে আমাদের উপর দাওয়াতী কাজের দায়িত্ব উপনীত হয়েছে। রাসূলের উাম্মত হিসেবে আমরা সেই মান মর্যাদার অধিকারী হয়েছি। আমাদেরকেই অন্যান্য নবীদের উম্মতের উপর সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করা হবে। মহান আল্লাহ বলেন: আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি ‘মধ্যপন্থী’ উম্মাতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা দুনিয়াবাসীর ওপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল হতে পারেন তোমাদের ওপর সাক্ষী। (সূরা বাকারা: ১৪৩) আমাদেরকের মহান আল্লাহ যে এত বড় মর্যাদা দান করলেন, তা ধরে রাখতে না পারলে প্রকারান্তে রাসূলের মর্যাদার হানী হওয়ার সম্ভাবনার কথা গুরুত্বসহকারে ভাব উচিত। মুসলমান হলো আল্লাহর দুনিয়ার বিবেক, একজন মুসলমানই পারে একটি সভ্য সমাজ গড়তে। ইহুদী খ্রীষ্টানরা যত ভালো কিছুই করুক একটি সভ্য সমাজ বলতে যা বুঝায়, তা তারা উপহার দিতে পারবে না, তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অথচ অনেক নামধারী মুসলমান তাদের গুণোগান গাইতে কেমনজানি আনন্দ বোধ করে। এটা যে একজন মুসলমানের জন্য লজ্জার ব্যাপার তা ভাবে না। 
 তবে আমার দীর্ঘ ১১ বৎসরের কুয়েতের জীবনে অনেক আসল মুসলমানের দেখা পেয়েছি। যারা ইসলামের ইতিহাস নিয়ে পি এইচ পি করেছেন, তারা দেখবেন, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনের পর্যটকরা যখন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনে যেতেন, তখন সেখানকার মুসলমানের আমল, আখলাক, ও তাদের জীবনধারা দেখে এতই মুগ্ধ হয়ে যেতেন, দেখা গেছে অনেক ইহুদী ও খ্রীষ্টান ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তা কুয়েতীদের সাথে মিলে আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি। বিশ্বের সেরা ধনী দেশের মানুষ হয়েও অবসর সময় তারা বাজে কাজে লিপ্ত না হয়ে, সবাই একত্রিত হয়ে ধর্ম চর্চা করে। প্রতি সপ্তায় পর্যায়ক্রমে একেক জনের বাসায় ২-৩ ঘণ্টা ব্যাপী কুরআন ও হাদীসের আলোচনা হয়। আলোচনার পর তা নিয়ে রীতিমত গবেষণাও করে।  তা আমাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করে। তাইতো দীর্ঘ ৭টি বৎসর ধরে আমি স্বেচ্ছায় তাদের সাথে আমার ছুটির অধিকাংশ দিনগুলো পার করে দেই। আমার কাছে প্রচুর অর্থ নেই। আমাদের দেশের প্রত্যেকটি জেলায়, পাড়ায় পাড়ায় এই ব্যবস্থাটা চালু করা মনে করি। সবচেয়ে ভালো লাগে ওয়াজের পর প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাথে কুলাকুলি করে। যা মুসলিম ভ্রাতৃত্বকে জাগিয়ে তুলে। কিছু কিছু কুয়েতি আছে এমন যে, তারা তাদেরকে একেবারে সাধারণ মানুষ ভাবে। চলাফেরা আচার ব্যবহার আমাকে উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনের মুসলমানদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পাশাপাশি আমাদের দেশের কথা মনে হলে হতাশায় মন ছেয়ে যায়! কি বিপদের মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সমাজ হাবুডুবু খাচ্ছে। আমাদেশের বৃহৎ ইসলামী সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ছাত্র জীবনে ছাত্রশিবিরের অনেক নেতা আমার বন্ধ ছিলেন, তাদের সাথে মিশে দেখেছি, আর যাই হোক আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের আদর্শকে তারা এমনভাবে আকড়িয়ে ধরেছে, ফলে তাদের আচার-ব্যবহারে আমি মুগ্ধ হতাম। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেশটাকে সঠিকভাবে পরিচালনা এবং প্রত্যেকেটি মানুষের মধ্যে ইসলামী বোধ জাগিয়ে তুলতে তাদের বিকল্প নেই। অথচ নানান অভিযোগ ও ভুল তথ্য উপস্থাপনা করে সংগঠনটিকে কোণঠাসা করে রেখেছ। জামায়াতে ইসলামী বা ছাত্রশিবির মানেই রাজাকার। আরো বিভিন্ন বিশেষণে তাদেরকে আখ্যায়িত করে। এমে মুসলিম সমাজের কত বড় ক্ষতি হচ্ছে, তা কেউ ভাবছে না। আমার ১২ বছর ইসলামী জীবনে তাবলীগ জামাত ও জামায়াতে ইসলামী এই দু‘টি সংগঠনের কার্যক্রমই প্রকৃত মুসলমান হওয়ার উৎকৃষ্ট স্থান হিসেবে পেয়েছি। তাবলীগ জামাতের মাধ্যমে নবী রাসূল ও সাহাবীদের জীবন ধারা ও আদর্শকে সঠিকভাবে বুঝার সুযোগ পেয়েছি। আর জামায়াতে ইসলামীর মাধ্যমে কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা এত নিখুত ও বিশুদ্ধভাবে শিখতে পেরেছি, ফলে আমি অনুভব করলাম যে, ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াতের কাজ কিয়ামত পর্যন্ত আমাদরেকেই চালু রাখতে হবে। আসছে পর্বে আমি ইসলামের প্রতি কেন আকৃষ্ট হলাম সে বিষয় আলোচনা করবো ইনশা আল্লাহ। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। (চলবে)        

 

 

নও মুসলিমের কাহিনী

রাধারাণীকে তিনবার দেখেছি আমি। তিন রূপে। আর ভুলতে পারিনি, পারবও না কোনদিন মনে হয়। তখন আমি প্রথম বর্ষের ছাত্রী। কল্পনাদের বাসায় প্রায়ই যাই। সেদিন গিয়ে দেখি কল্পনাদের বাসায় মেহমান এসেছে। অপূর্ব সুন্দর একটি ১৪/১৫ বছরের মেয়ে কল্পনার পাশে বসে আছে। আমি এত সুন্দর কালো মেয়ে কোনদিন দেখিনি। আমাকে দেখে বলল, ‘আপনি বুঝি শিরিন আপু?’ কণ্ঠস্বর তো নয় যেন সুরের মূর্ছনা ঝরে পড়ল। কথা বলার ধরন, মুখের হাসি, চোখের চাউনি সব কিছু মিলিয়ে সত্যি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকার মত ছবি।
আমি মুগ্ধ কণ্ঠে বললাম, ‘তুমি কী করে বুঝলে’?
‘এতক্ষণ কল্পনাদি’র সাথে আপনার কথাই হচ্ছিল।’ মেয়েটি কল্পনার ফুফাতো বোন। বেড়াতে এসেছে। একেই বোধ হয় বলে ‘আল্লাহ পাক নিজহাতে তৈরি করেছেন।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কী?
ঃ রাধারাণী।
কল্পনা বলল, ‘জানিস ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, বরটির নাম নবকৃষ্ণ।’
তাই বুঝি? হাসলাম আমি। রাধারাণীও হাসল। রাধারাণীর বিয়ের কথা শুনে আমার ভালো লাগল না। বললাম, এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে দেবে কেন? কোন ক্লাসে পড়ে?
‘ক্লাস নাইনে।’ রাধারাণীই উত্তর দিল।
ঃ এস.এস.সি টা পাস করো, তারপর বিয়ে হোক।
ঃ আমি কী করব বলেন? বাবা-মা কি তা মানবে? বলে হাসল রাধারাণী।
রাধারাণীর মুখখানি আমার মনের ক্যানভাসে আঁকা হয়ে থাকল। এর কিছুদিন পরেই শুনলাম রাধারাণীর বিয়ে হয়ে গেছে। প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার নবকৃষ্ণ দাসের সাথে।
বছরখানেক পর রাধারাণীর সাথে আবার দেখা হল। কল্পনাদের বাসায়ই। স্বামীর সাথে বেড়াতে এসেছে। রাধারাণীকে দেখার জন্য মনটা যেন আমার অস্থির হয়েছিল। আমাকে দেখে রাধারাণী হাসলো। একেই মনে হয় বলে ভুবন মোহিনী হাসি। কাছে এসে বলল, কেমন আছেন শিরীন আপু?
আমি হাত ধরে বললাম, ‘ভালো আছি বোন। তুমি কেমন আছ?’ রাধারাণীর মুখটা ম্লান হয়ে উঠলো। ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, ভালই আছি আপু।
ওর বরটা আমার পছন্দ হলো না। কেমন যেন কাঠখোট্টা ধরনের মনে হল। এত সুন্দর রাধারাণীর পাশে যেন সত্যি বেমানান।
কল্পনার কাছে শুনলাম রাধারাণী শান্তিতে নেই। বিয়ের সময় ৫০ হাজার টাকা যৌতুক দেওয়ার কথা ছিল। রাধারাণীর বাবা ৩০ হাজার টাকা দিয়েছে আর ২০ হাজার এখনো দিতে পারেনি। তাই প্রায়ই রাধারাণীকে কথা শুনতে হয়। আমি রাধারাণীর মুখখানি তুলে ধলে বললাম, এ সুন্দর মুখের দিকে তাকালে তো সব ভুলে যাওয়ার কথা, টাকা কথা বলে কী করে? তোমার কৃষ্ণ কী বলে?
‘শিরীন আপু, আপনি যখন আমাকে সুন্দর বলেন, তখন মনে হয় আমি সত্যি সুন্দর। আমার শাশুড়ি বলে, পেতœীমার্কা মেয়ে। ৫০ হাজার টাকা নগদ দেবে বলেই তো আমরা এ বিয়েতে রাজি হয়েছি, নইলে কেন ঐ পেতœীমার্কা বউ আনবো ছেলের জন্য?
‘তোমার কৃষ্ণ কী বলে?’
ওতো সেই কৃষ্ণ না আপু, ও হলো নবকৃষ্ণ। ওর হাতে বাঁশি নেই, বাঁশ আছে। কোনদিন যে আমার গলায় ফাঁস পরাবে তাই ভাবছি। হাসতে হাসতে বলল রাধারাণী।
আমি রাধারাণীর হাতটি ধরে পাশে বসালাম। বললাম, ছি বোন, ওসব কথা বলতে হয় না। তোমার গলায় কেন ফাঁস পড়বে?
রাধারাণীর বড় বড় চোখ দুটিতে পানিতে ভরে গেল। আঁচলে চোখ মুছে বলল, কল্পনা দি’দের বাসায় বেড়াতে এসেছি শুধু আপনার সাথে দেখা করার জন্য। গতকাল আসার পর থেকে আপনাদের বাসায় যাওয়ার জন্যে যে কতবার চেষ্টা করলাম। আমার নবকৃষ্ণ যখন জানতে পারল আমি একজন মুসলমান মেয়ের সাথে দেখা করতে চাচ্ছি, তখনই রাগে ক্ষেপে উঠল। বলল, একটা মুসলমানের সাথে দেখা করার কী প্রয়োজন তোমার? আমি ভয়ে আর কথা বলিনি। তাই আপনাকে আসতে খবর দিয়েছি। শিরীন আপু আপনার সাথে মনে হয় আমার আর দেখা হবে না!
রাধারাণীর চোখ দুটি আবার পানিতে ভরে উঠল। আমি ব্যথিত কণ্ঠে বললাম, তোমরা কি দূরে কোথাও চলে যাচ্ছ?
রাধারাণী মাথা নেড়ে জানাল, ‘না’। তারপর উঠে দরজায় খিল লাগিয়ে দিল। আমার কাছে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে বলল, আপু আপনার সাথে খুব জরুরি কিছু কথা আছে আমার, বলে কী যেন ভাবল। মনে হচ্ছে, মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। তারপর চোখমুখ উজ্জ্বল করে বলল, ‘আপু! আমি মুসলমান হব।’
আমি চমকে উঠলাম, ‘কী বলছ এসব?’
জানেন আপু আপনাকে যেদিন প্রথম দেখি, সেদিন আমার মনে হয়েছিল পূর্বজন্মে বুঝি আপনি আমার মায়ের পেটের বোন ছিলেন।
আমি বাধা দিয়ে বললাম, পূর্বজন্ম বলে কিছু নেই পাগল মেয়ে। আদর করে তার পিঠে হাত রাখলাম।
‘তা না থাক আপু, ইসলাম ধর্ম আমার ভীষণ ভালো লাগে আপু। কত উদার আর মহৎ ধর্ম। মেয়েদের কত সম্মান করা হয়। আমাদের পাশের বাড়ির শারমিনের বিয়ে হল আপু। বিয়ের গহনা শাড়ি উপরন্তু আরও ১৫ খানা শাড়ি এনেছে বরযাত্রীরা দাদী, নানী, খালা, ফুফুদের জন্য। তারপর ১ লাখ টাকা মোহরানা ৫০ হাজার টাকা নগদ দিয়েছে আর পঞ্চাশ হাজার টাকা পরে দিবে। এখন দিতে পারেনি বলে বাসররাতে ওর স্বামী ওর কাছে মাফ চেয়েছে আপু। বিয়ের পরেই শারমিন ধনী হয়ে গেছে। ওর নাকি এখন যাকাত দিতে হবে। এই তো গত রমজান মাসে ওর একটা গরিব চাচাতো বোন আছে তাকে ৫ হাজার টাকা যাকাত দিল। আর আমার কথা ভাবেন। আমার বাবা শারমিনের বাবার মতই গরিব মানুষ। আমাকে বিয়ে দিয়ে আরও পথে নেমে গেল। আমার বিয়ের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ শারমিনের বিপরীত। গহনা, শাড়ি আরও ১০ খানা শাড়ি, নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা, জামাইর পোশাক, ঘড়ি, আংটি, গলার চেইন আরও যে কত কী সব দিতে হয়েছে। শারমিনকে বললাম, তোর বরকে তোর বাবা কী দিয়েছে? শারমিন বলল, সোনা পরা তো পুরুষদের জন্য হারাম। তাই শুধু একটা ঘড়ি দিয়েছে। তা ওর স্বামী বলেছে আমি কোন যৌতুক নেব না। যৌতুক হারাম। পাশাপাশি বাড়িতে বাস করে তোমাদের জন্য হারাম আর আমাদের জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হয়ে গেল কেন আপু? আমি একটি জিনিস বুঝেছি আপু, যে ধর্ম দুনিয়াতে মানুষকে শান্তি দিতে পারে না সেই ধর্ম কী করে পরকালে শান্তি দেবে?
কণ্ঠস্বর আরও নিচু করে বলল, আমি মুসলমান হয়ে গেছি আপু। শারমিনই আমাকে বলেছিল, কালেমা শাহাদাত পড়লে মুসলমান হওয়া যায়। আমি ওর ইসলাম শিক্ষা বই থেকে কালেমা মুখস্থ করেছি। পাঁচবার যখনই আজান হয় আমি অজু করে পশ্চিম দিকে মুখ করে সেজদা দেই আর কালেমা পড়ি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই হিন্দু পরিবেশে আমি আর থাকবো না। আমি আত্মহত্যা করে আল্লাহর কাছে চলে যাব।
আমি আর্তনাদ করে উঠলাম। ‘নানা আত্মহত্যা করা মহাপাপ। আত্মহত্যা করে আল্লাহর কাছে যাওয়া যায় না রাধারাণী।’
‘ও তাই! আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। তাহলে আত্মহত্যা করবো না। দেখ তোমাকে না জানালে আমি জানতেই পারতাম না, আত্মহত্যা করে বসতাম। জান আপু, আমি আমার নামও পরিবর্তন করেছি। আমার নাম রেখেছি আয়েশা। রাসূল (সা.)-এর প্রিয়তমা স্ত্রীর নাম।
আমার নবকৃষ্ণ যদি জানতে পারে আমার আত্মহত্যা করা লাগবে না, ওরাই আমাকে মেরে ফেলবে। বলে হাসতে লাগলো রাধারাণী। কী সুন্দর পবিত্র সে হাসি! আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম নও-মুসলিম আয়েশার দিকে। বিদায় নেওয়ার সময় হাত ধরে গভীর আবেগে চুপিচুপি বললাম, ‘আস্সালামু আলাইকুম।’
আয়েশা ‘ওয়ালাইকুমুস সালাম’ বলে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি ওর কপালে চুমু খেয়ে চলে এলাম।
প্রায় দু’মাস হয়ে গেছে। সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। খুব ব্যস্ত পড়াশোনা নিয়ে। কলেজেও যাওয়া হয় না, কল্পনার সাথেও দেখা হয় না। রাধারাণীর খোঁজও নিতে পারিনি। হঠাৎ একদিন কল্পনা এল। মুখ খুব ভার ভার লাগছে। আমি কাছে এসে বললাম, কী রে কল্পনা, কী খবর?
কল্পনা আমার হাত ধরে বলল, চল রাধারাণীকে দেখে আসি।
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কোথায় রাধারাণী? কী হয়েছে রাধারাণীর?’
হাসপাতালে, রাধারাণী আত্মহত্যা করেছে।
আমি পাগলের মত চিৎকার করে উঠলাম, না, না রাধারাণী আত্মহত্যা করেনি, করতে পারে না। ওকে খুন করা হয়েছে।
হাসপাতালের বেডে সাদা চাদরে ঢাকা রাধারাণী। মুখের ওপর থেকে চাদরটা সরাতেই দেখলাম কী নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে আছে আয়েশা। অনিন্দসুন্দর। চোখ দুটি এখনই বুঝি খুলে যাবে। তারপর গোলাপ পাপড়ি ঠোঁট দুটিতে হাসি ফুটিয়ে বলবে, ‘আস্সালামু আলাইকুম। শিরীন আপু, তুমি কেমন আছ?
ওর শাশুড়ি শুকনো চোখে হাউমাউ করছিল। নবকৃষ্ণকে কোথাও দেখলাম না। ওর বাবা বসে আছে মেঝেতে। বিধ্বস্ত চেহারা। মূর্তিমান বেদনা যেন। আমি রাধারাণীর মুখের ওপর থেকে কাপড় সরাতেই কাছে এসে দাঁড়ালেন, জোরে কেঁদে উঠলেন, ‘মা রে, আমি তো তোর কথা মেনেছি, তারপর কেন আত্মহত্যা করলিরে মা…’!
রাধারাণীর বাবার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না। পায়ের কাছে বসে ১০/১২ বছরের একটি মেয়ে কাঁদছিল ব্যাকুল হয়ে। মেয়েটিকে চিনি না। বললাম, তুমি কে? কী হও রাধারাণীর?
‘আমি কিছুই হই না, ওদের বাসায় কাজ করি।’
ওর হাত ধরে একপ্রান্তে চলে গেলাম। তারপর বললাম, রাধারাণী কেন আত্মহত্যা করল জান?
বৌদিমণি আত্মহত্যা করেনি, বৌদিমণির পেটে বাচ্চা তো। দাদাবাবু যেই জোরে লাথি মারল, বৌদিমণি তখনই নেতিয়ে পড়ে গেল। আমি দৌড়ে যেয়ে ধরলাম, মাথায় জল দিলাম। আমাকে ওরা সবাই ঘর থেকে বের করে দিল। কিছুক্ষণ পরে সবাই বলতে লাগল, বৌদিমণি আত্মহত্যা করেছে। বৌদিমণি যে কত ভাল মানুষ ছিল গো দিদি! বলে মেয়েটি কাঁদতে লাগলো।
আমি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললাম, ‘কেন নবকৃষ্ণ লাথি মারল তা কি জান?’
‘জানি। বৌদির বাবা যৌতুকের সব টাকা তো দিতে পারেনি, তাই বৌদিকে খুব কথা শুনতে হতো। সবাই বৌদির বাবাকে জোচ্চোর বলত। বৌদি খুব কষ্ট পেত, মাঝে মাঝে রাগ করে খেত না, ওরাও ডাকতো না।
ঐ দিন বৌদির বাবা বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে গেছিল জামাইকে দেবার জন্য। দাদা তখন বাড়িতে ছিল না। বৌদি যখন শুনল বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা এনেছে তখন বৌদি বলল, তুমি বাড়ি বন্ধক রেখে কেন টাকা এনেছ? আমার ছোট ভাই বোনেরা কোথায় থাকবে? এদের কেন টাকা দিতে হবে? এদের তুমি আর এক পয়সাও দিতে পারবে না, যদি তুমি এই টাকা এদের দাও বিশ্বাস কর বাবা, আমি আত্মহত্যা করব।’
ওনার বাবা বললেন, ‘তোর ওপর যে অত্যাচার করে মা তাতো আমি সহ্য করতে পারি না।
করুক, কত আর করবে!
বৌদির বাবা টাকা নিয়ে চলে যেতেই দাদাবাবু বাড়ি এল। দাদাবাবুর মা সত্য মিথ্যা কত কথা যে বানিয়ে বলল। দাদা বাবুও তখন রেগে গেল। তখন বেলা প্রায় ১২টা বেজে গেছে। তখনও পেটে একফোঁটা জল পড়েনি বৌদির। দাদাবাবু বারবার বলতে লাগল, টাকা ফেরত দিয়েছিস কেন? বল, কেন ফেরত দিয়েছিস? বৌদি কথা বলছিল না।
তারপর দাদাবাবু পরপর দুটি লাথি বসিয়ে দিল বৌদির তলপেটে। বলে মেয়েটা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
হঠাৎ মেয়েটা কান্না থামিয়ে আমার কাছে আরও সরে এসে বলল, আপনি তো শিরীন আপু তাই না?
আমি বললাম, হ্যাঁ। মেয়েটি চতুর্দিক সতর্ক দৃষ্টিতে দেখল। তারপর বলল, বৌদিমণি তোমাকে একটা চিঠি দিয়েছে, বলে একটা খাম আমার হাতে দিল। আমি দ্রুতহাতে খাম থেকে চিঠিটা বের করলাম।
ঝকঝকে হাতের লেখা। রাধারাণী লিখেছে, ‘শিরীন আপু, সালাম নিও। নবকৃষ্ণ আমার মুসলমান হওয়ার কথা মনে হচ্ছে জেনে গেছে। কয়েকদিন ধরে ও আমার সাথে খুবই খারাপ ব্যবহার করছে। তারপর আজও বাবা যৌতুকের সব টাকা দিতে পারেনি। ওর মা ওর জন্য মেয়ে পছন্দ করেছে। তারা অনেক যৌতুক দেবে। যা হোক যেজন্য তোমাকে লিখছি। আমার শরীর খুব খারাপ। যদি মরে যাই কিংবা ওরা আমাকে মেরে ফেলে আমার লাশ যেন কেউ আগুনে পোড়াতে না পারে। মুসলমানদের গোরস্থানে আমাকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করো যেভাবে পারো। আমি বাবাকেও একটা চিঠি দিয়েছি। বাবা বাধা দেবে না।
আখিরাতে দেখা হবে নিশ্চয়ই!
তোমার বোন
আয়েশা।
আমাদের পারিবারিক গোরস্থানে আয়েশাকে কবর দেওয়া হয়েছে। আয়েশা যে আমারই বোন!

শোভন কুমার খানের ইসলাম গ্রহণ

 

শোভন কুমার খান তার ইসলামপূর্ব নাম, তিনি ইসলাম গ্রহণের পর মুহাম্মাদ খান নাম নির্বাচন করেন। তিনি ১৮ই আগস্ট ১৯৭০ সালে ভারতে দিনাজপুর জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। ইংলিশ মিডিয়ামে লেখা-পড়া করেন। ১৯৯৯ সালে কুয়েতে আসেন চাকুরির উদ্দেশ্যে। তিনি কুয়েতে এয়ারওয়াইজে আপ্যায়ন বিভাগে কর্মরত আছেন। দীর্ঘ ১৩ বছর কুয়েত এয়ারওয়াইজেই সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। দুর্ভাগ্যবশত কুয়েতে তাকে কারাবরণ করতে হয়। কারণ কুয়েত এয়াপোর্টে তল্লাশিতে কুয়েত এয়াওয়াইজে হেরোইন পাওয়া যায়, যা কুয়েতে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তাকে জেল হাজতে যেতে হয়। আর এই কারাবরণই তাকে ইসলাম গ্রহণের পথ সুগম করে দেয়। তিনি একজন শিক্ষিত লোক। তিনি শিক্ষা জীবনে বিভিন্ন ধর্ম নিয়েও গবেষণা করেন। যদিও তিনি একজন হিন্দু ধর্মের লোক কিন্তু খ্রীষ্টধর্ম নিয়ে তিনি অধ্যয়ন করেন, বাইবেলের বিভিন্ন অধ্যায় তিনি ব্যাপক গবেষণা করেন। কুয়েতের এই দীর্ঘ সময় কর্মরত থাকার পর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হিসেবে তাকে জেলে যেতে হয়, তিনি সেখানে পবিত্র কুরআনের ইংরেজি অনুবাদ পড়ার সুযোগ পান। পূর্বে বাইবেল পড়া আর বর্তমানে কুরআনের অনুবাদ পড়ে নিজের মধ্যে দু’টি গ্রন্থ নিয়ে তুলনা করতে থাকেন, কোনটি বিজ্ঞান সম্মত ও নির্ভুল। অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর তার মন সায় দেয় যে, পবিত্র কুরআনই নির্ভুল। তিনি পবিত্র কুরআনের অনুবাদ পাঠ করে ইসলাম গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। ৪০ দিন জেল হাজতে থাকার পর, তাকে কোর্টে ওঠানো হয়, প্রথম কোর্টেই তিনি বেকুসুর খালাস পান। তার মন পাগল পারা, কোথায় কিভাবে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হবেন? তারই একজন (কুয়েতি) সহপাটিকে তার মনের কথা খুলে বলেন, কুয়েতি তাকে আই. পি.সির প্রধান কার্যালয় মালিয়াতে নিয়ে আসেন। বিভিন্ন বিষয় প্রশ্ন করা হয়, যখন স্পষ্ট হলো তিনি কারো প্ররোচনায় নয় বরং স্বইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করার নিয়তেই আই. পি. সিতে এসেছেন, তখন আমরা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে শাহাদাতাইন পাঠ করায়ে ইসলামের ছায়া তলে গ্রহণ করে নেই। আমরা তার জন্য দোয়া করি, তিনি যেন আমরণ ইসলামের উপর অটল থাকতে পারেন।

 

 

 

 

 

 

বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইউসুফ ইসলাম

নও মুসলিমের কাহিনী
লন্ডন ভিত্তিক মুসলিম এইড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সাবেক পপ সঙ্গীত শিল্পী জনাব ইউসুফ ইসলাম বলেছেন, “বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের আজকে বড় সমস্যা ইসলামের বাস্তব শিক্ষার অভাব এবং জীবনাচরণে ইসলামী আদর্শের অনুপস্থিতি। আমাদের ধর্মে যে আমাদের সকল সমস্যার সমাধান দিতে পারে সে সম্পর্কে আমরা অজ্ঞ।”

সম্প্রতি দৈনিক সংগ্রামকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন। গত ২৯শে ডিসেম্বর তিনি ৪ দিনের এক সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলাদেশ আসেন। ২রা জানুয়ারী তিনি স্বদেশ যুক্তরাজ্যে ফিরে যান।

জনাব ইউসুফের সাথে আলোচনার সূচনাতেই প্রশ্ন করলাম আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন কেন? তিনি হেসে জবাব দিলেন, দেখুন সঙ্গীত আমাকে ঐশ্বর্য দিয়েছিল অপার। জীবন ভাগের সব আয়োজন ছিল আমার নাগালে। কিন্তু ভোগ বিলাস আমার মনকে শান্ত করতে পারেনি। আমি কিছুতেই তৃপ্তি পাচ্ছিলাম না। এই অশান্তি আমাকে ধর্মের দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়। আমি আমার তদানীন্তন স্বধর্ম খৃষ্টবাদ সম্পর্কে পড়তে শুরু করি। এরপর ইহুদী, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের উপর আমি পড়াশোনা করি। কিন্তু আমি বিফল হই। আমার আকঙ্খিত শান্তি আমি পেলাম না। এ সময় আমার ভাই জেরুজালেম থেকে আবেগ জড়িত কণ্ঠে অনেক কথাই বললো। আমি যে অনুসন্ধানের জন্য তখন ব্যাকুল হয়ে আছি, আমার ভাই সেই খবর জানতো। আমার জন্ম দিনে সে জেরুজালেম থেকে নিয়ে কুরআন আসা একখ- পবিত্র কুরআন শরীফ উপহার দিলো। আমি পবিত্র কুরআন পড়তে শুরু করি। কুরআন সেই মহাগ্রন্থ যা আমার জীবন ও চেতনার জগতকে পালটে দিয়েছে। আমার মনের সকল প্রশ্নের জবাব এই গ্রন্থে পেলাম। আমি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। আমি মুসলমান হলাম।

প্রশ্নঃ করলাম, এখন আপনি আপনার বিগত জীবনকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
জনাব ইউসুফ জবাব দিলেন, দেখুন আজ আমি পরিতৃপ্ত, সুখী। আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমার লক্ষ্য, সে লক্ষ্যেই আমার জীবনকে পরিচালিত করার চেষ্টা করছি। আর আমার পূর্বের জীবন ছিল মোহাচ্ছন্ন, ভোগ বিলাসের, জীবনের কোন লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল না।

প্রশ্নঃ আপনার পুরানো বন্ধুরা আপনার সম্পর্কে কি বলে?
উত্তরঃ ওদের সাথে যোগাযো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। দেখা সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় হয়। তবে আমাদের জীবেনর মৌল দর্শন পালটে গেছে। আমার লক্ষ্য হচ্ছে অনন্ত জীবন আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ, আর তাদের লক্ষ্য হচ্ছে এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীকে ভোগের জন্য প্রাণপাত করা।

প্রশ্নঃ আপনি ইসলামী সঙ্গীতের বিষয়ে কিছু ভাবছেন?
উত্তরঃ ইসলামের সঙ্গীতের প্রবেশাধিকার কতটুকু তা আমি জানি না। ইসলাম সঙ্গীতকে কতটুকু গ্রহণযোগ্য করেছে সেসম্পর্কে জানতে হবে। এরপরই বিষয়টি নিয়ে ভাববো।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশে আপনার এই সফরের উদ্দেশ্য কি?
উত্তরঃ আমরা বাংলাদেশী মুসলিম ভাই বিশেষ করে এখানে অবস্থানকারী বিহারী মোহাজের মুসলিম ভাইদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখতে এসেছি। এছাড়া আমাদের সংস্থার পক্ষ থেকে সামান্য কিছু আর্থিক সাহায্য তাদের হাতে তুলে দিতে আমি এখানে এসেছি। এখানে আসার আগে পাকিস্তানে আশ্রয়গ্রহণকারী আফগান মুসলমানদের অবস্থা দেখতে আমি সে দেশে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ভারতের বাঙ্গালোরে এক মুসলিম যুব সম্মেলনে অতিথি হিসেবে যোগ দেই। সেখান থেকেই ঢাকায় আমি। আমি চট্টগ্রামও যাব।

প্রশ্নঃ আপনাদের সংস্থার উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম কি? এর তহবিল কিভাবে সংগৃহীত হয়।
উত্তরঃ আমাদের সংগঠন সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবামূলক। ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে দুঃস্থ মানবতাকে সেবা আমাদের উদ্দেশ্য। যুক্তরাজ্যের মুসলিম অমুসলিম ব্যক্তিদের দান আমরা গ্রহণ করি। এছাড়া ২১টি ট্রাষ্ট আমাদের সহায়তা করছে।

প্রশ্নঃ শুধু মুসলমানদেরকেই কি আপনারা সাহায্য করে থাকেন?
উত্তরঃ না । ইসলামী আদর্শে পরিচালিত আমাদের সংস্থা ধর্ম বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে সকল দুঃস্থ মানুষকেই সহায়তা দিচ্ছে। তবে আজকে বিশ্বে মুসলমানরাই তো সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত। সর্বত্রই তো তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।

প্রশ্নঃ মুসলমানদের এই দুর্ভোগের কারণ কি বলে আপনি মনে করেন?
উত্তরঃ আমাদের সমস্যা তো একটি। ইসলাম সম্পর্কে আমাদের স্বচ্ছ ধারণার অভাব। ইসলামকে আমরা মুখে মুখে গ্রহণ করলেও আমাদের জীবনে এর আদর্শকে বাস্তবায়িত করতে পারিনি। ইসলামকে অনুসরণ করলে আমাদের সমস্যা থাকতো না। আমি পশ্চিমের ঐতিহ্য নিয়ে যেভাবে ইসলামের সৌন্দর্য, গুরুত্ব এবং সম্পদকে উপলব্ধি করছি, আমার সন্দেহ হয় অনেকেই হয়ত সেভাবে করছেন না।

প্রশ্নঃ অনেকেই তো বলেন, ইসলাম ১৪শ বছরের পুরাতন আদর্শ, এ যুগের জন্য অচল। এ সম্পর্কে আপনি কি বলেন?
উত্তরঃ আমি বিনয়ের সাথেই বলছি, যারা এসব বলেন, তারা নিজেদের মনে স্থান করে নেয়া ইসলাম সম্পর্কে পূর্ব ধারণার বশবর্তী হয়েই ইসলামকে বিচার করে। যদি সত্যিকারভাবে তারা এ ব্যাপরে জানতে চাইতো তবে তাদের উক্তি হতো ইতিবাচক। এমন দায়িত্বহীন হতো না।

প্রশ্নঃ যুক্তরাজ্যে ইসলামের দাওয়াতী কাজ কেমন চলছে?
উত্তরঃ সেখানকার পরিবেশ ও প্রচার মাধ্যমগুলো ইসলামের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। কিন্তু এরপরও কাজ হচ্ছে। নতুন নতুন লোক ইসলাম গ্রহণ করছে। আর এসব মুসলিম যেহেতু সেই দেশেরই নাগরিক, তাই সেখানকার সামাজিক জীবনে এর একটা প্রতিক্রিয়া পড়ছে। যুক্তরাজ্যে মুসলিম শিশুদের ইসলামী শিক্ষা দানের জন্য স্কুল খুলেছি।

প্রশ্নঃ আপনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
উত্তরঃ ১৯৩৮ সালের রমজান মাসে আমি লন্ডনে জন্মেছি। আমার পিতা ছিলেন গ্রীক সাইপ্রিয়ট, মা সুইডিশ। আমার মা এখনো জীবিত। ১৯৭৭ সালে আমার ইসলাম গ্রহণের পর আমার স্বজনদের অধিকাংশই ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমার স্ত্রী ফাউজিয়া আফগান ও তুর্কী বংশোদ্ভুত মুসলিম। আমাদের তিন কন্যা ও এক পুত্র রয়েছে। আমি ব্যবসায় কিছু পুঁজি বিনিয়োগ করেছি। এতেই আমর চলে যাচ্ছে।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশী মুসলিম ভাইদের জন্য আপনার কি কোন বাণী রয়েছে?
উত্তরঃ তাদের প্রতি আমার আবেদন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে ইসলামী উম্মার প্রতি তাদের দায়িত্ব অপরিসীম। ইসলামকে নিজেদের জীবনে সর্বোত্তমভাবে পালনের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রস্তুতি নেয়া। [দৈনিক সংগ্রাম, বুদ্ধবার ২২শে পৌষ ১৩৯৩ বাংলা]

এ বৎসর রমযানে আমাদের লক্ষ্য ১১০০ জন অমুসলিমকে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণের চেষ্টা করা

কুয়েতে ১৯৭৮ ইং সাল থেকে ইসলাম প্রেজেন্টেশন কমিটি (আই পি সি) ইসলাম প্রচারের কাজ অব্যাহতভাবে চালিয়ে আসছে। এ যাবত ৩৩ বছরে কুয়েতে বিভিন্ন দেশের ৫৩০০০ (তিপ্পান্ন হাজার) অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে। গত বছর শুধু রমযান মাসে ৮৮১ জন ইসলাম গ্রহণ করেছে।
প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মুহতারম জামাল শাত্তী (কুয়েতী) ঘোষণা করেন এ বৎসর রমযানে আমাদের লক্ষ্য ১১০০ জন অমুসলিমকে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণের চেষ্টা করা। সেই লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ভাষা-ভাষি দাঈগণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। রমযানের ছয় দিনে মোট ২২১ জন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে বারোজন বিভিন্ন ভাষা-ভাষি মহিলা ইসলাম গ্রহণ করেন। প্রকাশ থাকে যে, কুয়েতে এই প্রতিষ্ঠানের ১৫টি শাখা রয়েছে। বিভিন্ন ভাষা-ভাষি ৮০ জন পুরুষ ও মহিলা দাঈ রয়েছেন; তন্মধ্যে আমরা বাংলাদেশী আছি ৮ জন।
আসুন আমরা এই নওমুসলিমদের জন্য দোয়া করি আল্লাহ যেন তাদেরকে ইসলামের উপর অটল রাখেন। আমীন