এতিমের সজ্ঞা 
এতিম শব্দের আভিধানিক অর্থ একক, অদ্বিতীয়, অতুলনীয়, অনুপম, বিস্ময়। মূলত অচেতন থেকে এতিমের উৎপত্তি হয়েছে। কেননা এতিম তার হক থেকে অচেতন থাকে। এতিম সম্পর্কে আরো বলা হয়; এতিম অর্থ মন্থর , দূর্বল। আর এতিম শব্দটি একক, দূর্বল, মন্থর, প্রয়োজন ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। 
পরিভাষায় ভাষায় এতিম বলা হয়; বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বেই পিতার মৃত্যু হওয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন; স্বপ্নদোষ তথা বালেগ হয়ে গেলে আর কেউ এতিম থাকে না। বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে মাতার মৃত্যু হলে আরবদের পরিভাষায় তাকে লতীম বলে, আর মাতা-পিতা উভয় মৃত্যুবরণ করলে তাকে কাতী’ বলে। আর কন্যা সন্তানকে এতিম (এতীমাহ) বলা হবে যতদিন তার বিয়ে না হবে। বিয়ে হয়ে গেলে তাকে আর এতিম বলা যাবে না। 

ইসলামে এতিমের তত্ত্বাবধানের ফযীলত: 
ইসলাম এতিমের হক আদায়ের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছে। বিশেষ করে বয়সপূর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ১০টি হকের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে; 

১. এতিমের মাল অন্যদের জন্য স্পর্শ করা নিষিদ্ধ: 
আল্লাহ তা‘আলা বলেন; যারা অন্যায়ভাবে এতিমের ধন-সম্পত্তি গ্রাস করে, নিশ্চয় তারা স্বীয় উদরে অগ্নি ব্যতীত কিছুই ভক্ষণ করে না এবং সত্বরই তারা অগ্নি শিখায় উপনীত হবে। (সূরা নিসা: ১০) 

২. কঠোরতা বা জোরকরা নিষিদ্ধ: 
পাওনা আদায়ে অধিকার না থাকা সত্ত্বেও জোরপূর্বক নিজের আয়ত্বে আনাকে আরবী ভাষায় ক্বাহ্র বলা হয়। মহান আল্লাহ তা‘আলা এতিমের সাথে এই ক্বাহ্র বাক্যটি ব্যয় করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন; অতএব, তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না। (সূরা দুহা: ৯) 

৩. মর্যাদার অধিকার: 
করম বলা হয় কোন প্রকার বিনিময় ছাড়া কাউকে কিছু দেয়া। আল্লাহ তা‘আলা তা‘আলা বলেন; না কখনই নয়। তোমরা এতিমদেরকে করম তথা সম্মান করা না। (সূরা ফাজর: ১৭) 

৪. রূঢ়তা ও দুর্ব্যবহার নিষিদ্ধ: 
আল্লাহ তা‘আলা বলেন; সে তো ঐ ব্যক্তি, যে পিতৃহীনকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়। (সূরা মাউন: ২) 
৫. খাদ্যের অধিকার: 
আল্লাহ তা‘আলা বলেন; আহার্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত ও এতিম ও বন্দীকে আহার্য দান করে না। (সূরা দাহর: ৮) 

৬. আশ্রয়দানের অধিকার: 
আল্লাহ তা‘আলা বলেন; তিনি কি তোমাকে পিতৃহীন অবস্থায় পাননি, অতঃপর তোমাকে আশ্রয় দান করেন নি? ( সূরা জুহা: ৬) 

৭. বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তরাধিকার সংরক্ষণ: 
এই মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন; আর ঐ প্রাচীরটি- ওটা ছিল নগরবাসী দুই পিতৃহীন কিশোরের, এর তলদেশে আছে তাদের গুপ্তধন এবং পিতা ছিল সৎ-কর্মপরায়ণ। সুতরাং তোমার প্রতিপালক দয়াপরবশ হয়ে ইচ্ছা করলেন যে, তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হোক এবং তারা তাদের ধন ভা-ার উদ্ধার করুক। (সূরা কাহ্ফ: ৮২) 

৮. ইহসানের অধিকার: 
ইহসান অর্থ ভাল কাজ করাকে বুঝায়, যা ইন’আম তথা পুরস্কার অপেক্ষা ব্যাপক। আর ইহসান আদল তথা ইনসাফের উপরও অগ্রাধিকার রাখে। বলা হয় ইনসাফ হলো যে পরিমাণ গ্রহণ করা হয়, সে পরিমাণ ফিরেয়ে দেয়া। পক্ষান্তরে ইহসান হচ্ছে বেশি দিয়ে কম গ্রহণ করা। তাই বলা হয় ইনসাফ করা ওয়াজিব। আর ইহসান নফল হলেও এতে সাওয়াব রয়েছে বেশি। 

৯. ইনসাফের অধিকার: 
এই মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন; এবং পিতৃহীনদের প্রতি সুবিচার প্রতিষ্ঠা কর। (সূরা নিসা: ১২৭) 

১০. ফাই’র অধিকার: 
ফাই শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা। ফুক্বাহাদের নিকট ফাই হলো কাফেরদের যে মাল যুদ্ধ ছাড়া হস্তগত হয়। যেমন খেরাজ, জেযিয়া। এই মালে সকল মুসলমানের অধিকার থাকে। আর এর থেকে এক পঞ্চমাংশ বের করা হয়। আর যে মাল যুদ্ধের পরে অর্জিত হয় তাকে মালে গনীমত বলে। আবার কেউ কেউ ইমামের (খলীফার) ভাগকে মালে ফাই বলেছেন। মোট কথা হলো মুসলমানদের ঘর হতে সংগৃহীত মালই মালে ফাই। এই মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন; আল্লাহ এই জনপদবাসীদের নিকট হতে তাঁর রাসূল (সাঃ)-কে যা কিছু দিয়েছেন, তা আল্লাহ তা‘আলার, তাঁর রাসূল (সাঃ)’র এবং রাসূলের স্বজনগণের এবং এতিমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের, (সূরা হাশর: ৭) 
তাছাড়া পবিত্র কুরআনে এতিম নিয়ে ২২ স্থানে আলোচনা করা হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে ইসলামে এতিমের সাথে সৎ ব্যবহার উত্তম প্রশিক্ষণসহ যাবতীয় দিকে খেয়াল রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। যাতে এতিম শিশুটি বড় হয়ে সমাজের একজন কর্ণধার হতে পারে। এতিমের সাথে কোন প্রকারের রূঢ় আচরণ করা যাবে না। 
আসুন এবার এতিমের ব্যাপারে যে নবী এতিম হয়েই জন্ম নিলেন, তিনি তাদের সম্পর্কে কি বলেন; 
১. নিশ্চয় রাসূল (সাঃ) এতিমদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। তিনি বলেন; আমি এবং এতিমের জিম্মাদার বা অভিভাবক জান্নাতে এভাবে থাকবো। তখন তিনি তর্জনী এবং মধ্যমা আঙ্গুল সামান্য ফাঁক করে দেখান। 
২. রাসূল (সাঃ) এতিমের মাল ব্যবসার মাধ্যমে বৃদ্ধি করণে উৎসাহ দিয়েছেন; তিনি বলেন; সাবধান! যদি এতিমের সম্পদ হস্তগত হয় তাহলে ঐ সম্পদ ব্যবসার মাধ্যমে বৃদ্ধি করবে। এমন যেন না হয় যে যাকাত দিতে দিতে তার সম্পত্তি শেষ হয়ে যায়। এই মর্মে হযরত উমার (রাঃ) থেকেও একটি উদ্ধৃতি বর্ণিত রয়েছে; তিনি বলেন: তোমরা এতিমের মাল ব্যবসার মাধ্যমে বৃদ্ধি করবে, যেন যাকাত তার সম্পদ নিঃশেষ করতে না পারে। 

একদা জনৈক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)’র নিকট অভিযোগ করলো হে আল্লাহর রাসূল! আমার হৃদয় অত্যন্ত পাষাণ হয়ে গেছে। তখন রাসূল (সা.) বললেন; এতিমের মাথায় হাত রাখ, মিসকীনদের আহার করাও। এতে অনেক পূণ্য রয়েছে। প্রতিটি চুলের বিনিময় নেকী দেয়া হবে। আবু উমামাহতে বর্ণিত; রাসূল (সাঃ) বলেন; যে ব্যক্তি এতিমের মাথায় হাত রাখবে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টের উদ্দেশ্যে, তার বিনিময় আল্লাহ তা‘আলা প্রতিটি চুলের বদলায় নেকী দান করবেন।

রাসূলের এসব বর্ণনার কারণে দেখা যায় সাহাবাগণ, তাবেঈন, তাবে’ তাবেঈনগণ তাঁরা প্রত্যেকে প্রতিযোগিতা করতেন, এতিম লালন পালন করার জন্য। 
তা ছাড়া আমি আরব রাষ্ট্রগুলো প্রত্যক্ষ করেছি যে এসব দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে এতিমদের লালন পালনের ব্যবস্থা রয়েছে, এতে দেশের ধনী লোকেরাও অংশগ্রহণ করছে। 
ইসলাম কেন এতিমের প্রতি এতো গুরুত্বারোপ করলো? 

১. মানুষ উৎকৃষ্ট সৃষ্টিজীব, এবং তার অবস্থান ইসলামে আশরাফুল মাখলুকাত দেওয়া হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ইনসানের মর্যাদার জন্য ফেরেশ্তাকুলকে সেজদাহ করার নির্দেশ দিয়ে ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন; স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বলে ছিলেন: আমি মানুষ সৃষ্টি করছি কর্দম হতে। যখন আমি ওকে সুষম করবো এবং ওতে আমার রূহ সঞ্চার করবো, তখন তোমরা ওর প্রতি সিজদাবনত হয়ো। তখন ফেরেশতারা সবাই সিজদাহবনত হলো- শুধু ইবলীস ব্যতীত, সে অহংকার করলো এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হলো। (সূরা সোয়াদ: ৭১-৭৪) 

আর এতিমও একজন মানুষ, সুতরাং তাকেও মর্যাদা ও সম্মান দেয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। 
২. ইসলামী সমাজ এমন একটি সমাজ যে সমাজে পরস্পর সহানুভূতিশীল ও বন্ধুভাবাপন্ন সম্প্রীতি বর্তমান থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন; মুহাম্মদ আল্লাহ তা‘আলার রাসূল; তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; (সূরা ফাত্হ: ২৯) 
আল্লাহ তা‘আলার রাসূল মুমিনদের গুণ বর্ণনা করেন এভাবে যে, সমস্ত মুমিনগণ একটি শরীরের মত। রাসূল (সাঃ) বলেন; মুমিনগণ পরস্পর দয়া ও পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং ভালবাসার দিক হতে একটি শরীরের মত। যদি শরীরের কোন অঙ্গে আঘাত লাগে সমস্ত শরীর ব্যথায় কাতরায়। এই হাদীস স্পষ্ট প্রমাণ করে যে এতিমদেরকে দয়া মায়া মমতা ভালবাসা দিয়ে তাদেরকে আপন করে নিতে হবে। 

৩. অবশ্য উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার (জান্নাত) ব্যতীত আর কি হতে পারে? 
এই মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন; উত্তম কাজের জন্য প্রতিদান উত্তম পুরস্কার হবে। (সূরা আর রাহমান: ৬০) অর্থাৎ যে ব্যক্তি কারো সাথে উত্তম আচরণ করলে এর প্রতিদান আল্লাহ তা‘আলা উত্তম দিয়ে দিবেন। 
সুতরাং এতিমের লালন পালন করা যেন নিজের সন্তানের লালন পালন করার মত। কেননা আল্লাহ তা‘আলা না করুন নিজের সন্তান এতিম হলে তখন অন্যরা এই এতিম সন্তানটি লালন পালন করবে। পক্ষান্তরে নিজে অন্য সন্তানের খুঁজ না নিলে, কেউ নিজের সন্তানের খুঁজ-খবর নিবে না, এটাই রীতি। প্রবাদ রয়েছে; যেমন কর্ম তেমন ফল। 
ইসলামী সমাজ পরস্পর সহযোগিতার শিক্ষা দেয়। 
ইসলাম উৎসাহ প্রদান করেছে, একে অন্যের সুখে-দুঃখে শামিল হওয়ার জন্য। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন রাসূল (সাঃ)’কে কেউ জিজ্ঞাস করলো যে, উত্তম আমল কোনটি? রাসূল (সাঃ) বললেন; তোমার মুসলিম ভাইয়ের আনন্দে শরীক হও, তার ঋণ পরিশোধ কর, তাকে খানা খাওয়াও। রাসূল (সাঃ) আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে আসবে, আল্লাহ তা‘আলা ও তার প্রয়োজনের সময় এগিয়ে আসবেন। রাসূল (সাঃ) আরো বলেন; আল্লাহ তা‘আলার নিকট ঐ ব্যক্তি প্রিয়, যে মানুষের উপকার করে। উপরোক্ত হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা গেল যে, এতিমের লালন-পালন এটি একটি মহত কাজ