একজন নও মুসলিমের আত্মকাহিনী

পূর্বে প্রকাশিতের পর-৩
  পূর্বের ২টি পর্ব প্রকাশিতের পর পাঠক সমাজ থেকে সম্পাদকে নিকট অনেক মোবারকবাদ এসেছে, আমার টেলিফোন সংগ্রহ করে ফোনে আমাকেও মোবারকবাদ দিয়েছে। আবার কেউ কেউ বিরূপ মন্তব্যও করেছে। বলে ২ দিন হলো মুসলমান হয়েছে! এখন সে নসিহত শুরু করেছে। আমি তাদেরকে অতি বিনয়ের সাথে অবগতকরছি যে আমার এখন কোন অভিপ্রায় নেই, কাউকে খাটো করি, কাউকে নসিহতকরি। শুধুমাত্র ঈমানের তাগিদেই লিখছি, এটি যে আমার ঈমানী দায়িত্ব। কোন উদ্দেশ্য বা কাউকে আঘাত দেওয়ার জন্য নয়। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; কোন মুসলমান যদি অন্য মুসলমানের দোষ গোপন রাখে, তবে আল্লাহ তা‘আলাও কিয়ামত দিবসে তার দোষ গোপন রাখবেন।
 আমি ইসলামে প্রবেশ করার পূর্বে দীর্ঘ ৭টি বৎসর আমার কাছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা যেভাবে ইসলামকে উপস্থাপন করেছেন, ইসলাম গ্রহণ করার পর মুসলমানদের সাথে মিশে যা দেখছি, তার মাঝে বিস্তর ফরাক পরিলক্ষিত হয়। মনে হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে যে পথে পরিচালিত করতে চান, আমরা চলছি তার বিপরীত পথে। তাইতো আজ সারা বিশ্বে মুসলমান মানেই জঙ্গী, সন্ত্রাসী ইত্যাদিতে আখ্যায়িত করে ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে বিচ্যুত করার মহাসমারোহে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ কি নেই মসলমানদের কাছ? ঈমানের মত অমূল্য সম্পদ আছে। অর্থে, শক্তিতে-জনবলে বিশ্বের সেরা মুসলমান। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কথা চিন্তা করুন, ১২০ কোটি লোকের দেশ পাকিস্তানের চেয়ে ৮-১০ গুণ বগ, শক্তিতেও পাকিস্তানের চেয়ে অনেকে এগিয়ে, তারপরও পাকিস্তানকে কেমন সমিহ করে চলে। সামরিক শক্তিতেও সমানভাবে লড়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। এটা কিভাবে সম্ভব!? শুধুমাত্র ঈমানদার ও মুসলমান হওয়ার কারণেই। তাহলে বুঝতে হবে আজ আমাদের ঈমানী শক্তি কমে গেছে- তাই আজ সারা বিশ্বে মুসলমান কেবল মার খাচ্ছে। একটা প্রবাদ আছে; কোন ধর্মের উপর যখন অনবরত আঘাত আসতে থাকে, তখন বুঝতে হবে ঐ ধর্মের অনুসারীরা তার ধর্মকে সঠিকভাবে পালন করছে না। আমাদের দেশে এখনও শয়তানের প্ররোচনায় অনেক বেদআতী নিয়ম কানুন, পূর্ব পুরুষদের দোহাই দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। কোন মুসিবত আসলে ২ কেজি মিষ্টি আর ইমামকে ১০০ টাকা দিয়ে মীলাদ বা দোয়া পড়িয়ে সেই মুসিবত থেকে মুক্ত হওয়ায় বিশ্বাসী। অথচ মুসলমানদের বিশ্বাস হওয়া উচিত আল্লাহ তা‘আলা প্রতি। যে মহান আল্লাহই এই বিপদ থেকে মুক্তি দিবেন। প্রচলিত বিদআত অনুসরণ করে নয় বরং সুন্নতি পদ্ধতিতে আল্লাহর নিকট দোয়া চাইতে হবে। দুই রাকাত সালাতুল হাজাত আদায় করে আল্লাহর সমীপে কান্নাকাটি করুন। আল্লাহ অবশ্যই দোয়া কবুল করবেন। এই পদ্ধতি গ্রহণ না করে যদি ইমামের নিকট বা সমাজের নেতৃস্থানীয় লোকের নিকট শরাণপন্ন হোন যে, তারাই আমার বিপদ উদ্ধার করবে, তবে তো শিরক হয়ে যাবে।
 মুসলমান হলো আল্লাহর প্রতিনিধি। যত দিন নবী রাসূলদের প্রয়োজন ছিল, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে, তাই আর নবী রাসূল প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা নেই। তাই ঘোষণা করা হয়; যে মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্য হতে কোন পুরুষের পিতা নন, বরং তিনি সর্বশেষ নবী। তার পরে আর কোন নবী রাসূল আসবেন না। তবে কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াতী কাজ চালানোর জন্য সাহাবায়ে কেরাম আজমাঈন, তাবেঈন, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, আইম্মায়ে মুজতাহেদীন ক্রমান্বয়ে আমাদের উপর দাওয়াতী কাজের দায়িত্ব উপনীত হয়েছে। রাসূলের উাম্মত হিসেবে আমরা সেই মান মর্যাদার অধিকারী হয়েছি। আমাদেরকেই অন্যান্য নবীদের উম্মতের উপর সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করা হবে। মহান আল্লাহ বলেন: আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি ‘মধ্যপন্থী’ উম্মাতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা দুনিয়াবাসীর ওপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল হতে পারেন তোমাদের ওপর সাক্ষী। (সূরা বাকারা: ১৪৩) আমাদেরকের মহান আল্লাহ যে এত বড় মর্যাদা দান করলেন, তা ধরে রাখতে না পারলে প্রকারান্তে রাসূলের মর্যাদার হানী হওয়ার সম্ভাবনার কথা গুরুত্বসহকারে ভাব উচিত। মুসলমান হলো আল্লাহর দুনিয়ার বিবেক, একজন মুসলমানই পারে একটি সভ্য সমাজ গড়তে। ইহুদী খ্রীষ্টানরা যত ভালো কিছুই করুক একটি সভ্য সমাজ বলতে যা বুঝায়, তা তারা উপহার দিতে পারবে না, তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অথচ অনেক নামধারী মুসলমান তাদের গুণোগান গাইতে কেমনজানি আনন্দ বোধ করে। এটা যে একজন মুসলমানের জন্য লজ্জার ব্যাপার তা ভাবে না। 
 তবে আমার দীর্ঘ ১১ বৎসরের কুয়েতের জীবনে অনেক আসল মুসলমানের দেখা পেয়েছি। যারা ইসলামের ইতিহাস নিয়ে পি এইচ পি করেছেন, তারা দেখবেন, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনের পর্যটকরা যখন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনে যেতেন, তখন সেখানকার মুসলমানের আমল, আখলাক, ও তাদের জীবনধারা দেখে এতই মুগ্ধ হয়ে যেতেন, দেখা গেছে অনেক ইহুদী ও খ্রীষ্টান ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তা কুয়েতীদের সাথে মিলে আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি। বিশ্বের সেরা ধনী দেশের মানুষ হয়েও অবসর সময় তারা বাজে কাজে লিপ্ত না হয়ে, সবাই একত্রিত হয়ে ধর্ম চর্চা করে। প্রতি সপ্তায় পর্যায়ক্রমে একেক জনের বাসায় ২-৩ ঘণ্টা ব্যাপী কুরআন ও হাদীসের আলোচনা হয়। আলোচনার পর তা নিয়ে রীতিমত গবেষণাও করে।  তা আমাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করে। তাইতো দীর্ঘ ৭টি বৎসর ধরে আমি স্বেচ্ছায় তাদের সাথে আমার ছুটির অধিকাংশ দিনগুলো পার করে দেই। আমার কাছে প্রচুর অর্থ নেই। আমাদের দেশের প্রত্যেকটি জেলায়, পাড়ায় পাড়ায় এই ব্যবস্থাটা চালু করা মনে করি। সবচেয়ে ভালো লাগে ওয়াজের পর প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাথে কুলাকুলি করে। যা মুসলিম ভ্রাতৃত্বকে জাগিয়ে তুলে। কিছু কিছু কুয়েতি আছে এমন যে, তারা তাদেরকে একেবারে সাধারণ মানুষ ভাবে। চলাফেরা আচার ব্যবহার আমাকে উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনের মুসলমানদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পাশাপাশি আমাদের দেশের কথা মনে হলে হতাশায় মন ছেয়ে যায়! কি বিপদের মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সমাজ হাবুডুবু খাচ্ছে। আমাদেশের বৃহৎ ইসলামী সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ছাত্র জীবনে ছাত্রশিবিরের অনেক নেতা আমার বন্ধ ছিলেন, তাদের সাথে মিশে দেখেছি, আর যাই হোক আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের আদর্শকে তারা এমনভাবে আকড়িয়ে ধরেছে, ফলে তাদের আচার-ব্যবহারে আমি মুগ্ধ হতাম। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেশটাকে সঠিকভাবে পরিচালনা এবং প্রত্যেকেটি মানুষের মধ্যে ইসলামী বোধ জাগিয়ে তুলতে তাদের বিকল্প নেই। অথচ নানান অভিযোগ ও ভুল তথ্য উপস্থাপনা করে সংগঠনটিকে কোণঠাসা করে রেখেছ। জামায়াতে ইসলামী বা ছাত্রশিবির মানেই রাজাকার। আরো বিভিন্ন বিশেষণে তাদেরকে আখ্যায়িত করে। এমে মুসলিম সমাজের কত বড় ক্ষতি হচ্ছে, তা কেউ ভাবছে না। আমার ১২ বছর ইসলামী জীবনে তাবলীগ জামাত ও জামায়াতে ইসলামী এই দু‘টি সংগঠনের কার্যক্রমই প্রকৃত মুসলমান হওয়ার উৎকৃষ্ট স্থান হিসেবে পেয়েছি। তাবলীগ জামাতের মাধ্যমে নবী রাসূল ও সাহাবীদের জীবন ধারা ও আদর্শকে সঠিকভাবে বুঝার সুযোগ পেয়েছি। আর জামায়াতে ইসলামীর মাধ্যমে কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা এত নিখুত ও বিশুদ্ধভাবে শিখতে পেরেছি, ফলে আমি অনুভব করলাম যে, ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াতের কাজ কিয়ামত পর্যন্ত আমাদরেকেই চালু রাখতে হবে। আসছে পর্বে আমি ইসলামের প্রতি কেন আকৃষ্ট হলাম সে বিষয় আলোচনা করবো ইনশা আল্লাহ। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। (চলবে)        

 

 

একজন নও মুসলিমের আত্মকাহিনী

পূর্বে প্রকাশিতের পর-২

 অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার পর, আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়াতা‘আলা দীর্ঘ ৭টি বৎসর আমাকে নানানভাবে পরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৯৯ ঈসায়ী সনের ২৮শে অক্টোবর পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ তা‘আলার মনোনীত ধর্ম (জীবন ব্যবস্থা) ইসলামে প্রবেশ করার দ্বার উম্মুক্ত করে দেন। কুয়েতে আসার পর দুই মাস পর এক বন্ধুর মাধ্যমে (কুয়েতী অবসরপ্রাপ্ত এক সামরিক অফিসার) ইসলাম প্রেজেণ্টেশন কমিটি (ওচঈ) -তে রাত ৭-৮ দিকে আসি। ইসলাম বিষয়ক বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করি, সম্মানিত দাঈদের নিকট হতে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় প্রশ্ন করে জেনে নেই। ইসলাম সম্পর্কে আরো বিশদভাবে জানার জন্য আই পি সি কর্তৃপক্ষ আমাকে কিছু বই দেন। যেহেতু আমি পূর্ব থেকেই ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটিভাবে জেনেছি, আর ইসলাম গ্রহণ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে  আছি, তাই আর কালবিলম্ব না করে পর দিন সকালে আবার আই. পি. সিতে যাই। সম্মানিত দা‘ঈর মাধ্যমে কালিমায়ে শাহাদাত (আশহাদু আন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াআশহাদু আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ; অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোন প্রকৃত ইলাহ নেই, আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল) পাঠ করে জনসম্মুখে একজন মুসলিম হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করি। (আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার)

 আশ্চর্যের ব্যাপার যখন কালিমা পড়া শেষ হয়, তখন আমি নিজেকে এতই হালকা অনুভব করলাম, যেন আমার শরীর থেকে হাজার মণ ওজনের পাথর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর এতই সুখ অনুভব করছিলাম যে, মনে হয় পৃথিবীতে আমার চেয়ে সুখী মানুষ দ্বিতীয় আর কেউ আর নেই। তার জন্য মহান আল্লাহর নিকট লক্ষ-কোটি কৃতজ্ঞতা আদায় করছি, সাথে এই প্রার্থনা করছি মহান মনীবের দরবারে তিনি যেন, মৃত্যু পর্যন্ত একজন প্রকৃত মুসলিম হিসেবে জীবন-যাপন করার তাওফীক দান করেন। আমীন।

 জানুয়ারি মাসে আমি ইসলাম গ্রহণ করি, ঐ বৎসরই আই পি সির পক্ষ থেকে ওমরা ও পরে হজ্জ করার তাওফীক মহান আল্লাহ আমাকে দান করেন। দীর্ঘ দিনের মনের আশা ছিল যে পবিত্র ঘর কা‘বা নিজের দৃষ্টিতে দেখবো, মনের আশাটি পূরণ হওয়ায় আল্লাহর লক্ষ-কোটি শুকরিয়া আদায় করছি।

  ইসলাম গ্রহণের এক মাসের মধ্যেই GROUP-4  নামক এক কোম্পানীতে গার্ড হিসেবে কাজে যোগদান করি। ঐ কোম্পানীর অফিসার থেকে শুরু করে যখন যে Place ডিউটি করি, সবাই আমার ইসলাম গ্রহণের কথা শুনে। আমাকে এত সম্মান ও মুহাব্বত করতো, তা ভেবে আবেগে দুই নয়নে অশ্রু এসে যেত। ভাবতাম ইসলাম গ্রহণের আগে আমার কি নোংরা জীবন ছিলো! অথচ যখনই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা তাঁর এই নগন্য বান্দাকে ঈমানের আলো দান করলেন, সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়া ও আখেরাতে কত মান-মর্যাদা, সমাদর বৃদ্ধি পেলো, এ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অলৌকিক দান তাঁর মনোনীত দ্বীনে প্রবেশ করার জন্য।

  আমি মুসলমান ভাই-বোনদের আহ্বান করবো সামান্য কয় দিনের দুনিয়ার মোহে আবদ্ধ না থেকে আল্লাহর বিধান ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বলা পদ্ধতি বা পবিত্র কুরআন ও হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করুন। তবেই এই দুনিয়ার মায়াময় জগৎ থেকে সত্যিকার মুসলমান হিসেবে বিদায় নেওয়া যাবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের তাঁর দ্বীনের উপর চলার তাওফীক দান করুন। আমীন

 যাক GROUP-4 চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন প্লেসে কাজ করার সুযোগ করে দেন। যেমন জামইয়া (সুপার মার্কেট), স্কুল, হাসপাতাল, বড় বড় কোমপ্লেক্স, অফিস ইত্যাদিতে। এভাবে প্রায় তিন বৎসর কাজ করার পর হঠাৎ করে সালমিয়া অঞ্চলে এক আমেরিকান স্কুলে রাতের সিপাটে নিয়োগপ্রাপ্ত হই। প্রতিদিন ফজরের নামাযের সময় পাশের এক মসজিদে ফজরের নামায পড়তে যেতাম। সেখানে নোয়াখালীর বানীপুরের জসিম নামের এক মুসল্লির সাথে পরিচিত হই। কথোপকথোনে বুঝতে পারলাম যে, ছেলেটা প্রচণ্ডভাবে আল্লামা দেলাওয়ার হুসাইন সাঈদী সাহেবের ভক্ত। আমার ইসলাম গ্রহণের কথা শোনে আমাকে তাদের এলাকায় বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। আমিও তাকে ইসলামের প্রতি অনুরাগী দেখে তার প্রস্তাবে রাজী হই। এবং শর্ত দেই যে, আমি অতি সাধারণ পরিবারে বিয়ে করবো, যে পরিবারের লোকজন ইসলামের প্রতি অনুগত হবে। তার কথায় আস্থা রেখে ২০০৩ সালে এক মুসলিম পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করি। বর্তমানে আমার দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে। বড় জনের নাম আয়েশা বিনতে সাইফ, আর ছোট জনের নাম আসমা বিনতে সাইফ।

 নোয়াখালী জেলার চাটখীল উপজেলায় আমি বিয়ে করি। দাম্পত্য জীবনে প্রথম বৎসর ভালোই ছিলো। স্বামী-স্ত্রীর তথা আমাদের মাঝে চমৎকার সম্পর্ক বিরাজ করছিলো। কুয়েতে আমি যে চাকুরি করতাম, বেতন পেতাম ৮০ দিনার, তা দিয়ে স্ত্রীকে ভাড়া বাসায় রাখবো সেই সামর্থ আমার ছিলো না। তাই বাধ্য হয়েই শ্বশুর বাড়িতে রেখে কুয়েত চলে আসি। আমার শ্বশুর বিয়ের পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন, সুতরাং তাদের ফ্যামিলী তেমন সচ্ছল ছিলো না। আমাকে তারা সহযোগিতা করবে এমন সামর্থ তারা রাখতো না। এই কারণে আমার স্ত্রী ছিলো ক্ষুব্ধ। কারণ আমার শ্বশুর বাড়ির আশেপাশে যারা বসবাস করতো, তারা সকলেই ছিলো নামে মুসলিম। তাদের কাজে কামে আচার ব্যবহারে ইসলামের কোন কিছু প্রতিফলিত হতো না। ফলে কারণবশত ঝগড়া কিংবা কথা কাটাকাটি হলে, প্রতিবেশীরা আমার সন্তানদের বলতো, ‘হিন্দুর জন্মা’ স্ত্রীকে অপবাদ দিতো এই বলে যে, হিন্দুর নিকট বিয়ে বসেছে। আমার স্ত্রী এসব সহ্য করতে না পেরে, আমাকে ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম হয়ে ছিলো। আল্লাহর রহমতে এতো ঝড়িঝাপটার পরেও আমাদের সংসার টিকে আছে আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের দেশে কিংবা বিদেশে যারা বাংলাদেশী আছি, তারা সহজে একজন নওমুসলিমকে মেনে নিতে কিংবা সাদরে গ্রহণ করতে কুণ্ঠাবোধ করি। তাদের ধারণা তারা জন্মগত মুসলিম বলে, নামায পড়ুক কিংবা না পড়ুক, আল্লাহর হুকুম আহকাম পালন করুক কিংবা না করুক; তারাই মুসলিম। নও মুসলিম হওয়টা যেন অপরাধ! যা মোটেও বঞ্ছনীয় নয়। পিছনের দিকে তাকান, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানায় একজন নও মুসলিমের মর্যাদা আল্লাহ তা‘আলা কিভাবে প্রকাশ করেছেন। আসলে বর্তমানে বৃহৎ মুসলিম সমাজই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও জ্ঞান থেকে পিছিয়ে আছে, ফলে তারা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, তাহযিব, তামাদ্দুন বুঝা থেকে তারা বঞ্চিত। তাদের ধারণা মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়েছি, সুতরাং শিরক বিদয়াত, জুলুম নির্যাতন যাই করি না কেন, জান্নাতে আমরা যাবই। ইহুদীদের মতো বলে কিছু দিন জাহান্নামে থাকার পর তো আমরা জান্নাতে ঠিকই যাবো। সুতরাং ইসলামের মূল স্তম্ভ যে পাঁচটি তার কোনটাই সঠিকভাবে পালন করছে না। শুধুমাত্র ঐ অমূলক ধারণার কারণে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন বলেছেন; ‘তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। এই অমিয় বাণীটা মুসলিম সমাজকে ভালোভাবে উপলব্ধি করার অনুরোধ রইল। 

নও মুসলিমের কাহিনী

রাধারাণীকে তিনবার দেখেছি আমি। তিন রূপে। আর ভুলতে পারিনি, পারবও না কোনদিন মনে হয়। তখন আমি প্রথম বর্ষের ছাত্রী। কল্পনাদের বাসায় প্রায়ই যাই। সেদিন গিয়ে দেখি কল্পনাদের বাসায় মেহমান এসেছে। অপূর্ব সুন্দর একটি ১৪/১৫ বছরের মেয়ে কল্পনার পাশে বসে আছে। আমি এত সুন্দর কালো মেয়ে কোনদিন দেখিনি। আমাকে দেখে বলল, ‘আপনি বুঝি শিরিন আপু?’ কণ্ঠস্বর তো নয় যেন সুরের মূর্ছনা ঝরে পড়ল। কথা বলার ধরন, মুখের হাসি, চোখের চাউনি সব কিছু মিলিয়ে সত্যি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকার মত ছবি।
আমি মুগ্ধ কণ্ঠে বললাম, ‘তুমি কী করে বুঝলে’?
‘এতক্ষণ কল্পনাদি’র সাথে আপনার কথাই হচ্ছিল।’ মেয়েটি কল্পনার ফুফাতো বোন। বেড়াতে এসেছে। একেই বোধ হয় বলে ‘আল্লাহ পাক নিজহাতে তৈরি করেছেন।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কী?
ঃ রাধারাণী।
কল্পনা বলল, ‘জানিস ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, বরটির নাম নবকৃষ্ণ।’
তাই বুঝি? হাসলাম আমি। রাধারাণীও হাসল। রাধারাণীর বিয়ের কথা শুনে আমার ভালো লাগল না। বললাম, এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে দেবে কেন? কোন ক্লাসে পড়ে?
‘ক্লাস নাইনে।’ রাধারাণীই উত্তর দিল।
ঃ এস.এস.সি টা পাস করো, তারপর বিয়ে হোক।
ঃ আমি কী করব বলেন? বাবা-মা কি তা মানবে? বলে হাসল রাধারাণী।
রাধারাণীর মুখখানি আমার মনের ক্যানভাসে আঁকা হয়ে থাকল। এর কিছুদিন পরেই শুনলাম রাধারাণীর বিয়ে হয়ে গেছে। প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার নবকৃষ্ণ দাসের সাথে।
বছরখানেক পর রাধারাণীর সাথে আবার দেখা হল। কল্পনাদের বাসায়ই। স্বামীর সাথে বেড়াতে এসেছে। রাধারাণীকে দেখার জন্য মনটা যেন আমার অস্থির হয়েছিল। আমাকে দেখে রাধারাণী হাসলো। একেই মনে হয় বলে ভুবন মোহিনী হাসি। কাছে এসে বলল, কেমন আছেন শিরীন আপু?
আমি হাত ধরে বললাম, ‘ভালো আছি বোন। তুমি কেমন আছ?’ রাধারাণীর মুখটা ম্লান হয়ে উঠলো। ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, ভালই আছি আপু।
ওর বরটা আমার পছন্দ হলো না। কেমন যেন কাঠখোট্টা ধরনের মনে হল। এত সুন্দর রাধারাণীর পাশে যেন সত্যি বেমানান।
কল্পনার কাছে শুনলাম রাধারাণী শান্তিতে নেই। বিয়ের সময় ৫০ হাজার টাকা যৌতুক দেওয়ার কথা ছিল। রাধারাণীর বাবা ৩০ হাজার টাকা দিয়েছে আর ২০ হাজার এখনো দিতে পারেনি। তাই প্রায়ই রাধারাণীকে কথা শুনতে হয়। আমি রাধারাণীর মুখখানি তুলে ধলে বললাম, এ সুন্দর মুখের দিকে তাকালে তো সব ভুলে যাওয়ার কথা, টাকা কথা বলে কী করে? তোমার কৃষ্ণ কী বলে?
‘শিরীন আপু, আপনি যখন আমাকে সুন্দর বলেন, তখন মনে হয় আমি সত্যি সুন্দর। আমার শাশুড়ি বলে, পেতœীমার্কা মেয়ে। ৫০ হাজার টাকা নগদ দেবে বলেই তো আমরা এ বিয়েতে রাজি হয়েছি, নইলে কেন ঐ পেতœীমার্কা বউ আনবো ছেলের জন্য?
‘তোমার কৃষ্ণ কী বলে?’
ওতো সেই কৃষ্ণ না আপু, ও হলো নবকৃষ্ণ। ওর হাতে বাঁশি নেই, বাঁশ আছে। কোনদিন যে আমার গলায় ফাঁস পরাবে তাই ভাবছি। হাসতে হাসতে বলল রাধারাণী।
আমি রাধারাণীর হাতটি ধরে পাশে বসালাম। বললাম, ছি বোন, ওসব কথা বলতে হয় না। তোমার গলায় কেন ফাঁস পড়বে?
রাধারাণীর বড় বড় চোখ দুটিতে পানিতে ভরে গেল। আঁচলে চোখ মুছে বলল, কল্পনা দি’দের বাসায় বেড়াতে এসেছি শুধু আপনার সাথে দেখা করার জন্য। গতকাল আসার পর থেকে আপনাদের বাসায় যাওয়ার জন্যে যে কতবার চেষ্টা করলাম। আমার নবকৃষ্ণ যখন জানতে পারল আমি একজন মুসলমান মেয়ের সাথে দেখা করতে চাচ্ছি, তখনই রাগে ক্ষেপে উঠল। বলল, একটা মুসলমানের সাথে দেখা করার কী প্রয়োজন তোমার? আমি ভয়ে আর কথা বলিনি। তাই আপনাকে আসতে খবর দিয়েছি। শিরীন আপু আপনার সাথে মনে হয় আমার আর দেখা হবে না!
রাধারাণীর চোখ দুটি আবার পানিতে ভরে উঠল। আমি ব্যথিত কণ্ঠে বললাম, তোমরা কি দূরে কোথাও চলে যাচ্ছ?
রাধারাণী মাথা নেড়ে জানাল, ‘না’। তারপর উঠে দরজায় খিল লাগিয়ে দিল। আমার কাছে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে বলল, আপু আপনার সাথে খুব জরুরি কিছু কথা আছে আমার, বলে কী যেন ভাবল। মনে হচ্ছে, মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। তারপর চোখমুখ উজ্জ্বল করে বলল, ‘আপু! আমি মুসলমান হব।’
আমি চমকে উঠলাম, ‘কী বলছ এসব?’
জানেন আপু আপনাকে যেদিন প্রথম দেখি, সেদিন আমার মনে হয়েছিল পূর্বজন্মে বুঝি আপনি আমার মায়ের পেটের বোন ছিলেন।
আমি বাধা দিয়ে বললাম, পূর্বজন্ম বলে কিছু নেই পাগল মেয়ে। আদর করে তার পিঠে হাত রাখলাম।
‘তা না থাক আপু, ইসলাম ধর্ম আমার ভীষণ ভালো লাগে আপু। কত উদার আর মহৎ ধর্ম। মেয়েদের কত সম্মান করা হয়। আমাদের পাশের বাড়ির শারমিনের বিয়ে হল আপু। বিয়ের গহনা শাড়ি উপরন্তু আরও ১৫ খানা শাড়ি এনেছে বরযাত্রীরা দাদী, নানী, খালা, ফুফুদের জন্য। তারপর ১ লাখ টাকা মোহরানা ৫০ হাজার টাকা নগদ দিয়েছে আর পঞ্চাশ হাজার টাকা পরে দিবে। এখন দিতে পারেনি বলে বাসররাতে ওর স্বামী ওর কাছে মাফ চেয়েছে আপু। বিয়ের পরেই শারমিন ধনী হয়ে গেছে। ওর নাকি এখন যাকাত দিতে হবে। এই তো গত রমজান মাসে ওর একটা গরিব চাচাতো বোন আছে তাকে ৫ হাজার টাকা যাকাত দিল। আর আমার কথা ভাবেন। আমার বাবা শারমিনের বাবার মতই গরিব মানুষ। আমাকে বিয়ে দিয়ে আরও পথে নেমে গেল। আমার বিয়ের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ শারমিনের বিপরীত। গহনা, শাড়ি আরও ১০ খানা শাড়ি, নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা, জামাইর পোশাক, ঘড়ি, আংটি, গলার চেইন আরও যে কত কী সব দিতে হয়েছে। শারমিনকে বললাম, তোর বরকে তোর বাবা কী দিয়েছে? শারমিন বলল, সোনা পরা তো পুরুষদের জন্য হারাম। তাই শুধু একটা ঘড়ি দিয়েছে। তা ওর স্বামী বলেছে আমি কোন যৌতুক নেব না। যৌতুক হারাম। পাশাপাশি বাড়িতে বাস করে তোমাদের জন্য হারাম আর আমাদের জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হয়ে গেল কেন আপু? আমি একটি জিনিস বুঝেছি আপু, যে ধর্ম দুনিয়াতে মানুষকে শান্তি দিতে পারে না সেই ধর্ম কী করে পরকালে শান্তি দেবে?
কণ্ঠস্বর আরও নিচু করে বলল, আমি মুসলমান হয়ে গেছি আপু। শারমিনই আমাকে বলেছিল, কালেমা শাহাদাত পড়লে মুসলমান হওয়া যায়। আমি ওর ইসলাম শিক্ষা বই থেকে কালেমা মুখস্থ করেছি। পাঁচবার যখনই আজান হয় আমি অজু করে পশ্চিম দিকে মুখ করে সেজদা দেই আর কালেমা পড়ি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই হিন্দু পরিবেশে আমি আর থাকবো না। আমি আত্মহত্যা করে আল্লাহর কাছে চলে যাব।
আমি আর্তনাদ করে উঠলাম। ‘নানা আত্মহত্যা করা মহাপাপ। আত্মহত্যা করে আল্লাহর কাছে যাওয়া যায় না রাধারাণী।’
‘ও তাই! আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। তাহলে আত্মহত্যা করবো না। দেখ তোমাকে না জানালে আমি জানতেই পারতাম না, আত্মহত্যা করে বসতাম। জান আপু, আমি আমার নামও পরিবর্তন করেছি। আমার নাম রেখেছি আয়েশা। রাসূল (সা.)-এর প্রিয়তমা স্ত্রীর নাম।
আমার নবকৃষ্ণ যদি জানতে পারে আমার আত্মহত্যা করা লাগবে না, ওরাই আমাকে মেরে ফেলবে। বলে হাসতে লাগলো রাধারাণী। কী সুন্দর পবিত্র সে হাসি! আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম নও-মুসলিম আয়েশার দিকে। বিদায় নেওয়ার সময় হাত ধরে গভীর আবেগে চুপিচুপি বললাম, ‘আস্সালামু আলাইকুম।’
আয়েশা ‘ওয়ালাইকুমুস সালাম’ বলে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি ওর কপালে চুমু খেয়ে চলে এলাম।
প্রায় দু’মাস হয়ে গেছে। সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। খুব ব্যস্ত পড়াশোনা নিয়ে। কলেজেও যাওয়া হয় না, কল্পনার সাথেও দেখা হয় না। রাধারাণীর খোঁজও নিতে পারিনি। হঠাৎ একদিন কল্পনা এল। মুখ খুব ভার ভার লাগছে। আমি কাছে এসে বললাম, কী রে কল্পনা, কী খবর?
কল্পনা আমার হাত ধরে বলল, চল রাধারাণীকে দেখে আসি।
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কোথায় রাধারাণী? কী হয়েছে রাধারাণীর?’
হাসপাতালে, রাধারাণী আত্মহত্যা করেছে।
আমি পাগলের মত চিৎকার করে উঠলাম, না, না রাধারাণী আত্মহত্যা করেনি, করতে পারে না। ওকে খুন করা হয়েছে।
হাসপাতালের বেডে সাদা চাদরে ঢাকা রাধারাণী। মুখের ওপর থেকে চাদরটা সরাতেই দেখলাম কী নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে আছে আয়েশা। অনিন্দসুন্দর। চোখ দুটি এখনই বুঝি খুলে যাবে। তারপর গোলাপ পাপড়ি ঠোঁট দুটিতে হাসি ফুটিয়ে বলবে, ‘আস্সালামু আলাইকুম। শিরীন আপু, তুমি কেমন আছ?
ওর শাশুড়ি শুকনো চোখে হাউমাউ করছিল। নবকৃষ্ণকে কোথাও দেখলাম না। ওর বাবা বসে আছে মেঝেতে। বিধ্বস্ত চেহারা। মূর্তিমান বেদনা যেন। আমি রাধারাণীর মুখের ওপর থেকে কাপড় সরাতেই কাছে এসে দাঁড়ালেন, জোরে কেঁদে উঠলেন, ‘মা রে, আমি তো তোর কথা মেনেছি, তারপর কেন আত্মহত্যা করলিরে মা…’!
রাধারাণীর বাবার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না। পায়ের কাছে বসে ১০/১২ বছরের একটি মেয়ে কাঁদছিল ব্যাকুল হয়ে। মেয়েটিকে চিনি না। বললাম, তুমি কে? কী হও রাধারাণীর?
‘আমি কিছুই হই না, ওদের বাসায় কাজ করি।’
ওর হাত ধরে একপ্রান্তে চলে গেলাম। তারপর বললাম, রাধারাণী কেন আত্মহত্যা করল জান?
বৌদিমণি আত্মহত্যা করেনি, বৌদিমণির পেটে বাচ্চা তো। দাদাবাবু যেই জোরে লাথি মারল, বৌদিমণি তখনই নেতিয়ে পড়ে গেল। আমি দৌড়ে যেয়ে ধরলাম, মাথায় জল দিলাম। আমাকে ওরা সবাই ঘর থেকে বের করে দিল। কিছুক্ষণ পরে সবাই বলতে লাগল, বৌদিমণি আত্মহত্যা করেছে। বৌদিমণি যে কত ভাল মানুষ ছিল গো দিদি! বলে মেয়েটি কাঁদতে লাগলো।
আমি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললাম, ‘কেন নবকৃষ্ণ লাথি মারল তা কি জান?’
‘জানি। বৌদির বাবা যৌতুকের সব টাকা তো দিতে পারেনি, তাই বৌদিকে খুব কথা শুনতে হতো। সবাই বৌদির বাবাকে জোচ্চোর বলত। বৌদি খুব কষ্ট পেত, মাঝে মাঝে রাগ করে খেত না, ওরাও ডাকতো না।
ঐ দিন বৌদির বাবা বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে গেছিল জামাইকে দেবার জন্য। দাদা তখন বাড়িতে ছিল না। বৌদি যখন শুনল বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা এনেছে তখন বৌদি বলল, তুমি বাড়ি বন্ধক রেখে কেন টাকা এনেছ? আমার ছোট ভাই বোনেরা কোথায় থাকবে? এদের কেন টাকা দিতে হবে? এদের তুমি আর এক পয়সাও দিতে পারবে না, যদি তুমি এই টাকা এদের দাও বিশ্বাস কর বাবা, আমি আত্মহত্যা করব।’
ওনার বাবা বললেন, ‘তোর ওপর যে অত্যাচার করে মা তাতো আমি সহ্য করতে পারি না।
করুক, কত আর করবে!
বৌদির বাবা টাকা নিয়ে চলে যেতেই দাদাবাবু বাড়ি এল। দাদাবাবুর মা সত্য মিথ্যা কত কথা যে বানিয়ে বলল। দাদা বাবুও তখন রেগে গেল। তখন বেলা প্রায় ১২টা বেজে গেছে। তখনও পেটে একফোঁটা জল পড়েনি বৌদির। দাদাবাবু বারবার বলতে লাগল, টাকা ফেরত দিয়েছিস কেন? বল, কেন ফেরত দিয়েছিস? বৌদি কথা বলছিল না।
তারপর দাদাবাবু পরপর দুটি লাথি বসিয়ে দিল বৌদির তলপেটে। বলে মেয়েটা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
হঠাৎ মেয়েটা কান্না থামিয়ে আমার কাছে আরও সরে এসে বলল, আপনি তো শিরীন আপু তাই না?
আমি বললাম, হ্যাঁ। মেয়েটি চতুর্দিক সতর্ক দৃষ্টিতে দেখল। তারপর বলল, বৌদিমণি তোমাকে একটা চিঠি দিয়েছে, বলে একটা খাম আমার হাতে দিল। আমি দ্রুতহাতে খাম থেকে চিঠিটা বের করলাম।
ঝকঝকে হাতের লেখা। রাধারাণী লিখেছে, ‘শিরীন আপু, সালাম নিও। নবকৃষ্ণ আমার মুসলমান হওয়ার কথা মনে হচ্ছে জেনে গেছে। কয়েকদিন ধরে ও আমার সাথে খুবই খারাপ ব্যবহার করছে। তারপর আজও বাবা যৌতুকের সব টাকা দিতে পারেনি। ওর মা ওর জন্য মেয়ে পছন্দ করেছে। তারা অনেক যৌতুক দেবে। যা হোক যেজন্য তোমাকে লিখছি। আমার শরীর খুব খারাপ। যদি মরে যাই কিংবা ওরা আমাকে মেরে ফেলে আমার লাশ যেন কেউ আগুনে পোড়াতে না পারে। মুসলমানদের গোরস্থানে আমাকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করো যেভাবে পারো। আমি বাবাকেও একটা চিঠি দিয়েছি। বাবা বাধা দেবে না।
আখিরাতে দেখা হবে নিশ্চয়ই!
তোমার বোন
আয়েশা।
আমাদের পারিবারিক গোরস্থানে আয়েশাকে কবর দেওয়া হয়েছে। আয়েশা যে আমারই বোন!

শোভন কুমার খানের ইসলাম গ্রহণ

 

শোভন কুমার খান তার ইসলামপূর্ব নাম, তিনি ইসলাম গ্রহণের পর মুহাম্মাদ খান নাম নির্বাচন করেন। তিনি ১৮ই আগস্ট ১৯৭০ সালে ভারতে দিনাজপুর জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। ইংলিশ মিডিয়ামে লেখা-পড়া করেন। ১৯৯৯ সালে কুয়েতে আসেন চাকুরির উদ্দেশ্যে। তিনি কুয়েতে এয়ারওয়াইজে আপ্যায়ন বিভাগে কর্মরত আছেন। দীর্ঘ ১৩ বছর কুয়েত এয়ারওয়াইজেই সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। দুর্ভাগ্যবশত কুয়েতে তাকে কারাবরণ করতে হয়। কারণ কুয়েত এয়াপোর্টে তল্লাশিতে কুয়েত এয়াওয়াইজে হেরোইন পাওয়া যায়, যা কুয়েতে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তাকে জেল হাজতে যেতে হয়। আর এই কারাবরণই তাকে ইসলাম গ্রহণের পথ সুগম করে দেয়। তিনি একজন শিক্ষিত লোক। তিনি শিক্ষা জীবনে বিভিন্ন ধর্ম নিয়েও গবেষণা করেন। যদিও তিনি একজন হিন্দু ধর্মের লোক কিন্তু খ্রীষ্টধর্ম নিয়ে তিনি অধ্যয়ন করেন, বাইবেলের বিভিন্ন অধ্যায় তিনি ব্যাপক গবেষণা করেন। কুয়েতের এই দীর্ঘ সময় কর্মরত থাকার পর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হিসেবে তাকে জেলে যেতে হয়, তিনি সেখানে পবিত্র কুরআনের ইংরেজি অনুবাদ পড়ার সুযোগ পান। পূর্বে বাইবেল পড়া আর বর্তমানে কুরআনের অনুবাদ পড়ে নিজের মধ্যে দু’টি গ্রন্থ নিয়ে তুলনা করতে থাকেন, কোনটি বিজ্ঞান সম্মত ও নির্ভুল। অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর তার মন সায় দেয় যে, পবিত্র কুরআনই নির্ভুল। তিনি পবিত্র কুরআনের অনুবাদ পাঠ করে ইসলাম গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। ৪০ দিন জেল হাজতে থাকার পর, তাকে কোর্টে ওঠানো হয়, প্রথম কোর্টেই তিনি বেকুসুর খালাস পান। তার মন পাগল পারা, কোথায় কিভাবে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হবেন? তারই একজন (কুয়েতি) সহপাটিকে তার মনের কথা খুলে বলেন, কুয়েতি তাকে আই. পি.সির প্রধান কার্যালয় মালিয়াতে নিয়ে আসেন। বিভিন্ন বিষয় প্রশ্ন করা হয়, যখন স্পষ্ট হলো তিনি কারো প্ররোচনায় নয় বরং স্বইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করার নিয়তেই আই. পি. সিতে এসেছেন, তখন আমরা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে শাহাদাতাইন পাঠ করায়ে ইসলামের ছায়া তলে গ্রহণ করে নেই। আমরা তার জন্য দোয়া করি, তিনি যেন আমরণ ইসলামের উপর অটল থাকতে পারেন।

 

 

 

 

 

 

বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইউসুফ ইসলাম

নও মুসলিমের কাহিনী
লন্ডন ভিত্তিক মুসলিম এইড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সাবেক পপ সঙ্গীত শিল্পী জনাব ইউসুফ ইসলাম বলেছেন, “বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের আজকে বড় সমস্যা ইসলামের বাস্তব শিক্ষার অভাব এবং জীবনাচরণে ইসলামী আদর্শের অনুপস্থিতি। আমাদের ধর্মে যে আমাদের সকল সমস্যার সমাধান দিতে পারে সে সম্পর্কে আমরা অজ্ঞ।”

সম্প্রতি দৈনিক সংগ্রামকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন। গত ২৯শে ডিসেম্বর তিনি ৪ দিনের এক সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলাদেশ আসেন। ২রা জানুয়ারী তিনি স্বদেশ যুক্তরাজ্যে ফিরে যান।

জনাব ইউসুফের সাথে আলোচনার সূচনাতেই প্রশ্ন করলাম আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন কেন? তিনি হেসে জবাব দিলেন, দেখুন সঙ্গীত আমাকে ঐশ্বর্য দিয়েছিল অপার। জীবন ভাগের সব আয়োজন ছিল আমার নাগালে। কিন্তু ভোগ বিলাস আমার মনকে শান্ত করতে পারেনি। আমি কিছুতেই তৃপ্তি পাচ্ছিলাম না। এই অশান্তি আমাকে ধর্মের দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়। আমি আমার তদানীন্তন স্বধর্ম খৃষ্টবাদ সম্পর্কে পড়তে শুরু করি। এরপর ইহুদী, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের উপর আমি পড়াশোনা করি। কিন্তু আমি বিফল হই। আমার আকঙ্খিত শান্তি আমি পেলাম না। এ সময় আমার ভাই জেরুজালেম থেকে আবেগ জড়িত কণ্ঠে অনেক কথাই বললো। আমি যে অনুসন্ধানের জন্য তখন ব্যাকুল হয়ে আছি, আমার ভাই সেই খবর জানতো। আমার জন্ম দিনে সে জেরুজালেম থেকে নিয়ে কুরআন আসা একখ- পবিত্র কুরআন শরীফ উপহার দিলো। আমি পবিত্র কুরআন পড়তে শুরু করি। কুরআন সেই মহাগ্রন্থ যা আমার জীবন ও চেতনার জগতকে পালটে দিয়েছে। আমার মনের সকল প্রশ্নের জবাব এই গ্রন্থে পেলাম। আমি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। আমি মুসলমান হলাম।

প্রশ্নঃ করলাম, এখন আপনি আপনার বিগত জীবনকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
জনাব ইউসুফ জবাব দিলেন, দেখুন আজ আমি পরিতৃপ্ত, সুখী। আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমার লক্ষ্য, সে লক্ষ্যেই আমার জীবনকে পরিচালিত করার চেষ্টা করছি। আর আমার পূর্বের জীবন ছিল মোহাচ্ছন্ন, ভোগ বিলাসের, জীবনের কোন লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল না।

প্রশ্নঃ আপনার পুরানো বন্ধুরা আপনার সম্পর্কে কি বলে?
উত্তরঃ ওদের সাথে যোগাযো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। দেখা সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় হয়। তবে আমাদের জীবেনর মৌল দর্শন পালটে গেছে। আমার লক্ষ্য হচ্ছে অনন্ত জীবন আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ, আর তাদের লক্ষ্য হচ্ছে এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীকে ভোগের জন্য প্রাণপাত করা।

প্রশ্নঃ আপনি ইসলামী সঙ্গীতের বিষয়ে কিছু ভাবছেন?
উত্তরঃ ইসলামের সঙ্গীতের প্রবেশাধিকার কতটুকু তা আমি জানি না। ইসলাম সঙ্গীতকে কতটুকু গ্রহণযোগ্য করেছে সেসম্পর্কে জানতে হবে। এরপরই বিষয়টি নিয়ে ভাববো।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশে আপনার এই সফরের উদ্দেশ্য কি?
উত্তরঃ আমরা বাংলাদেশী মুসলিম ভাই বিশেষ করে এখানে অবস্থানকারী বিহারী মোহাজের মুসলিম ভাইদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখতে এসেছি। এছাড়া আমাদের সংস্থার পক্ষ থেকে সামান্য কিছু আর্থিক সাহায্য তাদের হাতে তুলে দিতে আমি এখানে এসেছি। এখানে আসার আগে পাকিস্তানে আশ্রয়গ্রহণকারী আফগান মুসলমানদের অবস্থা দেখতে আমি সে দেশে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ভারতের বাঙ্গালোরে এক মুসলিম যুব সম্মেলনে অতিথি হিসেবে যোগ দেই। সেখান থেকেই ঢাকায় আমি। আমি চট্টগ্রামও যাব।

প্রশ্নঃ আপনাদের সংস্থার উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম কি? এর তহবিল কিভাবে সংগৃহীত হয়।
উত্তরঃ আমাদের সংগঠন সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবামূলক। ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে দুঃস্থ মানবতাকে সেবা আমাদের উদ্দেশ্য। যুক্তরাজ্যের মুসলিম অমুসলিম ব্যক্তিদের দান আমরা গ্রহণ করি। এছাড়া ২১টি ট্রাষ্ট আমাদের সহায়তা করছে।

প্রশ্নঃ শুধু মুসলমানদেরকেই কি আপনারা সাহায্য করে থাকেন?
উত্তরঃ না । ইসলামী আদর্শে পরিচালিত আমাদের সংস্থা ধর্ম বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে সকল দুঃস্থ মানুষকেই সহায়তা দিচ্ছে। তবে আজকে বিশ্বে মুসলমানরাই তো সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত। সর্বত্রই তো তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।

প্রশ্নঃ মুসলমানদের এই দুর্ভোগের কারণ কি বলে আপনি মনে করেন?
উত্তরঃ আমাদের সমস্যা তো একটি। ইসলাম সম্পর্কে আমাদের স্বচ্ছ ধারণার অভাব। ইসলামকে আমরা মুখে মুখে গ্রহণ করলেও আমাদের জীবনে এর আদর্শকে বাস্তবায়িত করতে পারিনি। ইসলামকে অনুসরণ করলে আমাদের সমস্যা থাকতো না। আমি পশ্চিমের ঐতিহ্য নিয়ে যেভাবে ইসলামের সৌন্দর্য, গুরুত্ব এবং সম্পদকে উপলব্ধি করছি, আমার সন্দেহ হয় অনেকেই হয়ত সেভাবে করছেন না।

প্রশ্নঃ অনেকেই তো বলেন, ইসলাম ১৪শ বছরের পুরাতন আদর্শ, এ যুগের জন্য অচল। এ সম্পর্কে আপনি কি বলেন?
উত্তরঃ আমি বিনয়ের সাথেই বলছি, যারা এসব বলেন, তারা নিজেদের মনে স্থান করে নেয়া ইসলাম সম্পর্কে পূর্ব ধারণার বশবর্তী হয়েই ইসলামকে বিচার করে। যদি সত্যিকারভাবে তারা এ ব্যাপরে জানতে চাইতো তবে তাদের উক্তি হতো ইতিবাচক। এমন দায়িত্বহীন হতো না।

প্রশ্নঃ যুক্তরাজ্যে ইসলামের দাওয়াতী কাজ কেমন চলছে?
উত্তরঃ সেখানকার পরিবেশ ও প্রচার মাধ্যমগুলো ইসলামের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। কিন্তু এরপরও কাজ হচ্ছে। নতুন নতুন লোক ইসলাম গ্রহণ করছে। আর এসব মুসলিম যেহেতু সেই দেশেরই নাগরিক, তাই সেখানকার সামাজিক জীবনে এর একটা প্রতিক্রিয়া পড়ছে। যুক্তরাজ্যে মুসলিম শিশুদের ইসলামী শিক্ষা দানের জন্য স্কুল খুলেছি।

প্রশ্নঃ আপনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
উত্তরঃ ১৯৩৮ সালের রমজান মাসে আমি লন্ডনে জন্মেছি। আমার পিতা ছিলেন গ্রীক সাইপ্রিয়ট, মা সুইডিশ। আমার মা এখনো জীবিত। ১৯৭৭ সালে আমার ইসলাম গ্রহণের পর আমার স্বজনদের অধিকাংশই ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমার স্ত্রী ফাউজিয়া আফগান ও তুর্কী বংশোদ্ভুত মুসলিম। আমাদের তিন কন্যা ও এক পুত্র রয়েছে। আমি ব্যবসায় কিছু পুঁজি বিনিয়োগ করেছি। এতেই আমর চলে যাচ্ছে।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশী মুসলিম ভাইদের জন্য আপনার কি কোন বাণী রয়েছে?
উত্তরঃ তাদের প্রতি আমার আবেদন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে ইসলামী উম্মার প্রতি তাদের দায়িত্ব অপরিসীম। ইসলামকে নিজেদের জীবনে সর্বোত্তমভাবে পালনের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রস্তুতি নেয়া। [দৈনিক সংগ্রাম, বুদ্ধবার ২২শে পৌষ ১৩৯৩ বাংলা]

নও মুসলিমের কাহিনী *** ডঃ শিবশক্তি স্বরূপজীর একটি সাক্ষাৎকার

ডঃ স্বরূপজী ইসলামে মুক্তির স্বাদ পেলেন গত ১০ই মে (১৯৮৬) ভারতের সাম্প্রতিক কালের এক মহাত্মা ধর্মগুরু যিনি সেদিন পর্যন্ত সেদেশের সর্বত্র ‘ভগবান’ নামে পরিচিত ও পূজিত ছিলেন সেই ডঃ শিবশক্তি স্বরূপজী মহারাজ উদাসেন নিজ স্ত্রী ও কন্যাসহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাহার নতুন নাম রাখা হয় ইসলামুল হক, পত্নীর নাম খোদেজা হক আর কন্যা নাম রাখা হয় আয়েশা হক। গুজরাটের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক ‘শাহীন’ এর তরফ হতে সম্প্রতি ডঃ ইসলামুল হকের এক সাক্ষাৎকর গ্রহণ করা হয়। ১ মার্চ ৮৭ তারিখে সাপ্তাহিক ‘শাহীন] এর প্রকাশিত উক্ত সাক্ষাৎকরটি ইত্তেফাকের পাঠক-পাঠিকা বর্গের নিকট প্রেরণ করেছেন মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, পোষ্ট বক্স নং-২৫, জেদ্দা-২১৪১, সৌদি আরব হতে।
প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণের পর আপনি কি অনুভব করছেন?

উত্তরঃ আল্লাহর হাজার শোকর যে, তিনি আমাকে ঈমানের অমূল্য সম্পদ প্রদান করেছেন। আমি নিজকে পৃথিবীর এক ভাগ্যবান ও বিজয়ী পুরুষ বলে মনে করি। অজ্ঞানতার দুনিয়ায় আমি ‘ভগবান’ হিসেবে পূজিত ছিলাম, আলোকিত বিশ্বে আমি নিজকে মানুষ হিসেবে খুঁজে পেয়েছি।

প্রশ্নঃ আপনাকে ধন্যবাদ। এখন আপনি মেহেরবানী করে আপনার আগের নাম ও পরিচয় সম্বন্ধে কিছু বলুন?

উত্তরঃ আমার নাম মহানত, ডঃ শিবশক্তি স্বরূপজী মহারাজ উদাসেন, ধর্মচারিয়া, আদ্যশক্তিপীঠ। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আমার পেশা মহানতগিরি। বৃন্দাবনে ‘অনাখন্ড আশ্রম’ নামে আমার বড় আশ্রম ছিল। দ্বিতীয় আশ্রম ছিল বোম্বাইয়ের মুলুনডে। আর তৃতীয় দেবালেইনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই আশ্রমটির নির্মাণ কাজ প্রায় ৫০ একর জমির উপর চলছিল। ‘খালাপ পথে’ চলা মানুষের সুপথে আনার উদ্দেশ্যে শিক্ষাদান’ পথ প্রদর্শন ও শিষ্য তৈরী করা ছিল আমার প্রাত্যাহিক কাজ।

প্রশ্ন: আপনার পান্ডিত্যের খ্যাতি সর্বত্র। আপনি আপনার নিজের সম্পর্কে, নিজের শিক্ষা জীবন ও ধর্মজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।

উত্তরঃ আশ্রমেই আমার শিক্ষার সূচনা হয়। পরে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওরিয়েন্টালিজমে এম.এ। গুরুকুল কাংডি থেকে ‘আচারিয়া’ (আচার্য) পদবী লাভ। বৃটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্বের দশটি প্রধানতম ধর্মের উপর ডক্টর অব ডিভাইনিটি এবং সেই সাথে ওরিয়েন্টালিজমে আরেক পি.এইচ.ডি। পোপ পল-৬ এর আহবানে ইতালী যাই। সেখানে সাতটি বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ দান করি। আমাকে এক মহাসম্মান ভাটিকানের নাগরিত্ব দান করা হয়। এবং খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণের জন্য বিশেষ অনুরোধ জানান হয়। আমি তদের অনুরোধ উপেক্ষা করে ভারতে এসে বিধিমত মুকুট ধারণ করে আশ্রমের গদিতে বসে পড়ি। আমার জন্ম ১৯৩৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারী। জন্মস্থান মথুরা, বৃন্দাবন। আমি প্রায় ১২টি ভাষা জানি, এর মধ্যে ইংরেজী, সংস্কৃত, গ্রীক, হিন্দি, পালি, গোরমুখী, মারাঠী, গুজরাতি, উর্দু ও আরবী আমার ভাল লাগে। … আগেই বলেছি, আমি দুনিয়ার দশটি প্রধানতম ধর্মের উপর তুলনামূলক পড়াশুনা ও গবেষণা করেছি। সে জন্য সত্য স্বীকারে আমার কোন সংকোচ ছিল না। আমার সমকালীনদের মধ্যে হিন্দু জগতের বড় বড় জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্ব ও পন্ডিত রয়েছেন। যেমন জগৎগুরু শংকরাচার্য, রামগোপাল শারওয়ালে, পুরীর শংকরাচার্য, মহামন্ডেলশ্বর স্বামী অখন্ডানন্দজী, গুরু গোলওয়ালকার বাবা সাহেব দেশমুখ, বালঠাকুরে, অটলবিহারী বাজপায়ী, নানা সাহেব, দেশমুখ, বিনোবা ভাবে এবং অন্যান্য। একবার তিনি তার “পরমধাম” আশ্রমে আমাকে বক্তৃতাদানের বিশেষ আমন্ত্রণ জানান। সেখানে উপস্থিত লোকজনের সামনে দাদা ধর্মাধীকারী আমাকে জিজ্ঞাসা করে বসেনঃ “আপনি পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম সম্বন্ধে পড়াশুনা করেছেন, মানুষের জন্য কোন ধর্ম শ্রেষ্ঠ বলে মনে হয়? আমি জবাবে বলেছিলাম,‘ইসলাম’ আমার জওয়াবে দাদা খুশী হন নাই। তিনি বলেন, উঠেন, “ইসলাম নানা বাধা-বন্ধন আরো করে।” আমি জবাব দিলাম, “যে বন্ধন বাঁধে, সেই বন্ধনই মুক্তি দিতে পারে। আর যে প্রথম থেকে স্বাধীন, তার সারা জীবনের জন্য বন্ধন সৃষ্টি প্রবণতা থেকে যাবে। এ ধরনীতে মানুষকে এক সাথে বেঁধ রাখার জন্য বন্ধনকারী ধর্মের প্রয়োজন রয়েছে, যা তাদের পৃথিবীতে ভাল করে বেঁধে রাখবে এবং পরলোকে মুক্ত করে দেবে। আর এ রকম ধর্ম আমার মতে একমাত্র ইসলামেই রয়েছে। ইসলাম ছাড়া এরকম ধর্ম আমি আর দেখি না।”

প্রশ্নঃ নিজের ইসলাম গ্রহণের কারণ সম্পর্কে কিছু বর্ণনা করুন।

উত্তরঃ ১৯৮৪’র জানুয়ারীর কথা। এক রাত্রে আমি স্বপ্ন দেখলাম। একদল লোক আমাকে ধাওয়া করছে। আমি দৌড়াচ্ছি তারাও দৌড়াচ্ছে। আমি দাঁড়াই, তারাও দাঁড়ায়। হঠাৎ আমি ধাক্কা খেলাম এবং মাটিতে পড়ে গেলাম। দু’টি অজানা হাত আমাকে ধরে দাঁড় করালো। দাঁড়িয়ে এক নূরানী চেহারার দিকে অবাক হয়ে থাকিয়ে রইলাম। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোক আমাকে বললেন, ইনি হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)। আমার শরীর কাঁপতে শুরু করল। নবীজী বললেন, ‘‘কলমা পড়।” আমি কলমা পড়লাম। তিনি আমার ডান হাত নিজের পবিত্র হাতের মধ্যে রেখে যা যা পড়াতে লাগলেন, আমি তা পড়তে লাগলাম। এমনি করে পড়া শেষ হলো। তার পর তিনি আমাকে আলিঙ্গন করলেনঃ আর বললেন, “এ দেশকে কলমা পড়াও।” আমি কতক্ষণ ধরে এ স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা আমার মনে নেই। যখন চোখ খুললাম, দেখলাম রাত তিনটা বাজে। একই রাতে, একই সময়ে আমার স্ত্রীও এ ধরনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। … আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নিজেদের প্রথম শতাব্দীর মুসলমান বলে ভাবতে লাগলাম। আমি বিধিসম্মতভাবে মুসলমান হবার উপায় খুঁজতে লাগলাম, এখানে সেখানে ঘুরি, আর মুসলমানদের সাথে সম্পক বাড়াই। চুপিসরে নামায পড়ি। এবাদত বন্দেগী করি। পরিশেষে ভাগ্যক্রমে আলেমদের শহর ভুপাল পৌঁছি। ১৯৮৬-এর ১০ই মে, রমজান মাসের চাঁদ দেখার সাথে সাথে আমি আমার স্ত্রী আর আমার যুবতী কন্যা প্রকাশ্যভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করি। আলহামদুলিল্লাহ

প্রশ্নঃ আপনি বহু ধর্ম অধ্যায়ন করেছেন। ইসলামের পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে আল্লাহ, কুরআন, মোহাম্মদ (সাঃ) অথবা ইসলাম সম্পর্কে কোন বর্ণনা দেখতে পেয়েছেন?

উত্তরঃ বৌদ্ধ ও জৈন মতবাদ ছাড়া বাকী সব ধর্ম গ্রন্থে আল্লাহ, মোহাম্মদ (সাঃ) অথবা আহমদ নাম পাওয়া যায়। বেদে খুবই স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।

প্রশ্নঃ আপনি লাখ লাখ টাকার সম্পদের মোহ ছেড়ে দিয়ে ইসলাম কবুল করেছেন। বর্তমানে আপনি কিভাবে জীবন নির্বাহ করছেন?

উত্তরঃ আমি সমগ্র বিশ্বের রাজত্বও ইসলামের এই মহান উপহারের বদলে ত্যাগ করতে দ্বিধা বা কুন্ঠাবোধ করতাম না। ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে যে তৃপ্তি আমি পেয়েছি সাতরাজ্যের ধন সম্পদ লাভ করেও তা পাওয়া সম্ভব নয়। আমি আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা করি। আল্লাহ তায়ালার কৃপায় প্যারা মাইক্রো পন্থায় দুরারোগ্য ব্যাধির উপশম ঘটাই। এতেই আমার, আমার পরিবারের ডাল রুটির ব্যবস্থা হয়ে যায়।

প্রশ্নঃ সারওয়ারে কায়েনাত হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?

উত্তরঃ আমি আল্লাহ তায়ালাকে চিনতাম না। আমার জানের কসম, তিনি আমাকে রাব্বে জুলজালালকে চিনিয়ে দিয়ছেন…..।

প্রশ্নঃ ইসলামের সিপাহী হিসেবে আপনি দুনিয়ার মুসলমানদের উদ্দেশ্যে কি বাণী রাখতে চান। …. আপনার মতে মুসলমানদের কেমন হওয়া উচিত?

উত্তর : এ ব্যাপারে নবীজি যা বলেছেন তার চেয়ে ভাল কিছু আর কে বলতে পারে? তিনি মুসলামনদেরকে এমন সোনার টুকরার সাথে তুলনা করেছেন কোন অবস্থায়ই যার ঔজ্জ্বল্য কমে না। আরেক জায়গায় তিনি মুসলমানদের তুলনা করেছেন মধুমক্কীকার সাথে, যা ফুলের উপর গিয়ে বসে, নোংরা জায়গায় বসে না। ফুল থেকে রস চুষে মধু বানায়, বিষ তৈরী করে না। আর তা সে নিজের জন্য নয়, অপরের জন্য তৈরী করে। সে ডালে বসে, সে ডালের কোন ক্ষতি করে না। অন্যত্র তিনি বলেছেন, মুসলমান সেই, যার হাত ও কথা থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।

প্রশ্নঃ আপনার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু বলুন।

উত্তর : স্বার্থপরতার জাল হঠাতে হবে। মুসলিম মুজাহিদদের নতুন শপথ নিয়ে মঠে নামতে হবে। সাহস, নিঃস্বার্থ ঈমান, আর মন-প্রাণ ঢেলে কাজে নামতে হবে। আমার নিজের তরফ থেকে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টায় আছি। সমগ্র মুসলিম সমাজকে এক দেহ আর এক প্রাণে পরিণত করতে হবে। এ বিষয়ে আমার কার্যক্রম নিম্নরূপ ঃ (১) ইসলামের সুরক্ষা (২) মুসলমানদের দ্বীন-দুনিয়ার মূল্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা (৩) সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তারে ভাষায় ইসলামের দাওয়াত পৌছান।
(দৈনিক ইত্তেফাক, বৃহস্পতিবার, ২৩ বৈশাখ ১৩৯৪)

তিনি সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন, উর্দুতে। তার নাম দিয়েছেন “লিজিয়ে আপভি সোঁচে” এর বাংলা অর্থ- নিন আপনিও চিন্তা করুন। আশা করি হিন্দু বাইয়েরা সত্যই চিন্তা করবেন।

নাথিং উইল গো আনএ্যকাউন্টেড্ ফর!

পিটার বেল, ২৩ বৎসরের মার্কিন যুবক, পদাতিক বাহিনীর এক সৈনিক। আমেরিকার টেক্সাস থেকে ১৯৯০ এর উপসাগরীয় যুদ্ধে কুয়েত ইরাক সীমান্তে এলেন। যুদ্ধের প্রস্তুতি তখন পুরোদমে চলছে। প্রাণচঞ্চল, উচ্ছল, উদ্যাম যুবক পিটার এই প্রথম কোন আরব দেশে এসেছেন। আরব জীবনাচার ও সংস্কৃতির ব্যাপারে তার কোন অভিজ্ঞতাই নেই।

মরুভূমির ধু ধু প্রান্তরে সামরিক তাঁবুর মধ্যেই কাটাতে হয় তাকে সারাটি দিন। সকালে একবার ও বিকেলে আর একবার কুচকাওয়াজ, শারীরিক ফিটনেস ঠিক রাখতে। তাও সেই জিমনেশিয়াম রুপী তাঁবুর মধ্যে! এখানে না আছে নাইট ক্লাব, না পানশালা, না আছে থিয়েটার, আর না বাস্কেট বল বা স্কি খেলার কোন সুযোগ! সময় কাটেনা! হাতের কাছে যে দু চারটি বই ছিল তাও পড়া শেষ। মা ভাইবোন, গার্ল ফ্রেন্ড, বন্ধু বান্ধবদের চিঠি লিখে বা লং ডিসটেন্স কল করে কিছুটা সময় কাটে। সন্ধার পরে জড়ো হয় টিভি’র সামনে। কিন্তু রাজনীতির নামে বড় বড় বক্তৃতা তার কোনদিনই ভালো লাগে না। সে চায় উদ্দাম, উচ্ছল, ধুম ধাড়াক্কা জীবন। মাঝে মাঝে টোসের বড় বড় পাহাড়ঘেরা জনপদ, বার, নাইট ক্লাব ও ডিসকোর স্মৃতী উন্মন করে তোলে তাকে!

 এভাবে চলতে চলতে কয়েক দিনের মধ্যেই তার জীবন বিষিয়ে উঠল। সৈনিক জীবন রোমাঞ্চে ভরা শুনেছিল, কিন্তু বাস্তবে যে পুরো উল্টো! এরই মধ্যে একদিন হঠাৎ করে তিন চার জন আরব এলেন তাদের তাঁবুতে। সবার একই রকম ধবধবে সাদা পোশাক, পা পর্যন্ত লম্বা। মাথায়ও বিশেষ ধরনের রুমাল, কাঁধ পর্যন্ত ঝোলানো, মাথার উপরে কালো রং বৃত্তাকারের দুটো রিং। দুর থেকে দেখতে চমৎকার লাগে!

 এরা কুয়েতি-সউদি নাগরিক। এদের দলনেতা চোস্ত ইংরেজিতে তাদের সাথে কুশল বিনিময় করলেন। খোঁজ খবর জানতে চাইলেন। আলাপের এক পর্যায়ে এসব মার্কিন সৈন্য যখন জানালো যে, সারাদিন অলস বসে বসে কাটাতে তারা বিরক্ত হয়ে উঠেছে! একথা শুনে দলটির নেতা গোছের একজন বললেন;
 ‘আমরা যদি তোমাদের বই পুস্তক, পত্রিকা ইত্যাদি সরবরাহ করি, এবং বলে রাখি, এগুলো আমাদের ধর্ম বিশ্বাস, আমাদের শিক্ষা সংস্কৃতি, আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য এসব বিষয়ে নিয়ে রচিত, তোমরা কি পড়তে প্রস্তুত? তোমরা চাইলে আমরা তোমাদের সেই সব বই পুস্তক দিতে পারি, হতে পারে যে, তোমাদের অলস সময় কিছুটা হলেও কাটানোর একটা উপলক্ষ্য হয়তো পাবে। নেবে কি?’

ভদ্রলোকের কথায় যুক্তি আছে। তাছাড়া বাস্তবিকই সময় কাটানোটা এখানে এখন একটা বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতএব নতুন কিছু জানতে দোষ কি? অন্তত নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি তো সমৃদ্ধ হবে! অতএব একদল মার্কিন সৈন্য সানন্দে রাজী হয়ে গেল। আরবীয় ভদ্রলোকেরা তখনই কিছু বই পুস্তক ধরিয়ে দিলেন এবং নিয়মিত আরও সরবরাহের আশ্বাসও দিলেন।

 এই প্রতিনিধি দলটি ছিল কুয়েতের বিখ্যাত ইসলাম প্রচার সংস্থা, আই পি সি’র, যাঁরা ইরাক কর্তৃক কুয়েত দখল হয়ে যাবার পরে সউদি আরবের বিভিন্ন শহরে বসেই তাদের প্রচার কাজ চালাচ্ছিলেন।
 প্রতিনিধি দলটি সোৎসাহে মার্কিন সৈন্যদের তাঁবুতে এ জাতীয় পুস্তিকা, লিটারেচার সরবরাহ চালু রাখলেন। প্রথম প্রথম খুব বেশি পাঠক পাওয়া না গেলেও অচিরেই দেখা গেল এসব বই পত্রের চাহিদা দ্রুত বেড়ে গেল। এবং উল্লেখযোগ্য সংখক মার্কিন-ফরাসী সৈনিক এসব বই পড়ছে নিয়মিত। তারা যে এগুলো যথেষ্ট মনযোগের সাথেই পড়ছে, তা বোঝা যায় যখন পরবর্তী কোন সাক্ষাতেই প্রতিনিধি দলটিকে তাদের মনে জমে থাকা বিভিন্ন প্রশ্ন করে, আরও বিস্তারিত জানতে চায়। আল্লাহ, তাঁর রাসূল, কেয়ামত নামাজ মৃত্যু ইত্যাদি বিষয়ে হরেক রকেমর প্রশ্ন!

 তাদের আগ্রহ দেখে প্রচারকরা বললেন, তোমরা কি চাও কোন এক্সপার্টের মুখে তোমাদের এসব প্রশ্নের উত্তর শোন? যদি চাও তবে আমরা সে ব্যবস্থাও করতে পারি! সৈনিকরা সমস্বরে আওয়াজ তুলে বলল, যদি পারো তবে তাই করো। ঠিক হলো, মাসে একদিন কোন প্রথিতযশা এক্সপার্ট দিয়ে তাদের এসব প্রশ্নের জবাব দানের ব্যবস্থা করবে আই পি সি কর্তৃপক্ষ।

 এর পরে তাই চলল, মাসের একটি দিন আধা ঘন্টা বিরতিসহ মোট তিন ঘন্টার অনুষ্ঠান। বক্তারা ইসলামের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে এক ঘন্টার বক্তৃতা দেন, তার আলোকে আধাঘন্টার বিস্তারিত ব্যাখ্যা, আধাঘন্টার বিরতি আর এর পরে আবার এক নাগাড়ে দেড় ঘন্টার বিরতিহীন প্রশ্নোত্তর।

কিন্তু দু’মাস না যেতেই সমস্যা দেখা দিল। বর্তমান লেখার নায়ক পিটার বেলসহ সমবয়স্ক একদল সৈন্য দাবী জানিয়ে বসল তাদের জন্য মাসে একবার যে প্রশ্নোত্তর এর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, তা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। তারা অনুষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য জেদ ধরে বসল। বাচ্চাদের মত অনুনয় বিনয় আরম্ভ করল। অবশেষে স্থানীয় সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে আইপিসি প্রতি সপ্তাহেই এধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করলো, তবে সময় কমিয়ে দেড়ঘন্টা করা হলো।

 দেখতে দেখতে অংশগ্রহনকারীর সংখ্যা বেড়ে গেল অস্বাভাবিকভাবে! ধু ধু মরুভূমির বালুকাময় প্রান্তরে সামরিক তাঁবুতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল মাদ্রাসা, শেখানো হয় ইসলাম কিন্তু ছাত্র সকলেই অমুসলিম!
 মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড: জগলুল নাজ্জার এলেন একবার আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে। তিনি পর পর দু সপ্তাহ আলোচনা উপস্থাপন করলেন মার্কিন সৈন্যদের উদ্দেশ্যে। আলোচনার বিষয়, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের পারস্পরিক সম্পর্ক। অত্যন্ত তথ্য ও যুক্তি নির্ভর এ আলোচনায় ড: জগলুল তাঁর বক্তব্য তুলে ধরলেন। জবাব দিলেন প্রতিটি প্রশ্নের। অনেকে অনেক প্রশ্ন করল। পিটার বেল এক কোণায় বসে মন দিয়ে শুনছিল। একটা কথাও বলেনি সে। একটা প্রশ্নও করেনি। তবে এমনভাবে বসে আছে যেন পৃথিবীর আর কোন কিছুর প্রতিই তার কোন খেয়াল নেই!
এবার সে শান্তভাবে উঠে দাঁড়ালো, সরাসরি ড: জগলুলকে প্রশ্নটি করল,
‘ জনাব আপনি কি নিশ্চিত যে, কোন কিছুই মৃত্যুর পরে হিসাবের বাইরে রবে না ?

প্রফেসর জগলুল আলোচনায় বেশ যুক্তি দিয়ে, কুরআন হতে দলিল চয়ন করে বলেছিলেন, আমরা মুসলমান বা খৃস্টান বা ইহুদী বা অন্য যে কোন ধর্মেরই হই না কেন, মৃত্যুর পরে যে জীবন, সে জীবনে আমাদের সকলের এ জগতে করে যাওয়া সকল কাজ ও কথার যুক্তিগ্রাহ্য জবাব দিতে হবে। তিনি তাঁর হাতের শাহাদাত আঙ্গুলি উঁচিয়ে অত্যন্ত জোরের সাথেই বলে ছিলেন Nothing will go unaccounted for !   
 
এই কথাটিই পিটারের মনে আলোড়ন তোলে। সেই দিনই পিটার বেল’সহ ষোলজন মার্কিন সৈন্য তাদের নাম তালিকাভুক্তি করে এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলমান হয়ে যায়। পুরো প্রথম গালফ ওয়ারের প্রায় এগারো মাস সময়কালে কুড়ি হাজারেরও বেশি মার্কিন ও ফরাসী সৈন্য ইসলাম গ্রহন করে! এদের অধিকাংশই মার্কিন সৈন্য।

১৯৯৮ সালে হঠাৎ করে কায়রোতে ড: জগলুলের হাতে একটি চিঠি আসে। টেস্কাস হতে আ: সালাম বেল নিজের পরিচয় তুলে ধরেছেন। ১৯৯০ সালে ধর্মান্তরিত পিটার বেলই আজকের আ: সালাম বেল!
 তাঁর চিঠির সারাংশ হলো, টেস্কাসে ফিরে তিনি এখনও আল্লাহ্ রহমতে মুসলমানই আছেন, অনাকাঙ্খিত সামাজিক ও পারিবারিক চাপ সত্ত্বেও! তাঁর দীর্ঘ প্রচেষ্টায় তাঁর মা, ভাই-ভাবীসহ কিছু পাড়া প্রতিবেশী ইসলাম সম্বন্ধে মনযোগ সহকারে শুনতে প্রস্তুত। ড. জগলুল যদি একবার দয়া করে টেক্সাসে তাঁর অতিথি হন, সেই আট বৎসর আগে মুরুভূমির বুকে দেয়া সেই বক্তব্যটাই আবার তুলে ধরেন, তাহলে হয়ত কোন বিষ্ময়কর ফল ঘটতেও পারে! বেশ কয়েকটি ই-মেইলও এলো! যাবতীয় ব্যয় ভার বহনের প্রতিশ্রুতি’সহ !

বারংবার অনুরোধের ফলে ড. জগলুল ১৯৯৮ সালের ৩রা নভেম্বর সেখানে গেলেন। ভালো করে চেহারাও মনে নেই, আট নয় বৎসর আগে দেখা যুবকের। অনেক চেষ্টা করেও তিনি তার চেহারা মনে করতে পারলেন না। তাই তিনি টেক্সাসে যখন আ: সালামকে দেখলেন, তখন একটু অবাকই হলেন! লাল টুক টুকে চেহারা, থুতনির নিচে কয়েকটা লালচে দাঁড়ি। ধীর স্থীর আ: সালাম খুশীতে আটখানা হয়ে একে একে সবার সাথেই ড. জগলুলকে পরিচয় করিয়ে দিলেন,
‘ইনি সেই প্রফেসর! যাঁর কাছে আমি ইসলাম শিখেছি!’
 
তাঁর মা, ড: জগলুলকে জানালেন ‘আমার দুই ছেলের মধ্যে ঐ সবচেয়ে ছোট, কিন্তু খুব দুষ্ট, দুরন্ত ছিল!  তাঁদের সেই বেয়াড়া, দুরন্ত সদা উচ্ছল পিটার কি ভাবে বদলে গেল ! সব সময় যেন সে এক গভীর ভাবাবেগের মাঝে নিবিষ্ঠ হয়ে থাকে। সবার মাঝে থেকেও সে যেন সবার থেকেই আলাদা! দেখলে মনে হবে যেন ওর মাথায় কোন পাখী বসে আছে, নড়লেই উড়ে যাবে!

ভাই বললেন; ‘কত করে বুঝালাম, কত ভয় দেখালাম, কত প্রলোভন! কিন্তু সে অনড় অটল! জবাব দিল, তোমাদের অসুবিধা হলে বলো আমি অন্যত্র চলে যাই কিন্তু আমাকে ইসলাম ছাড়তে বলো না!’ বাপ মরা আমার বড় আদরের ছোট ভাই, চোখের আড়াল হয়ে দুরে চলে যাক, তা চাইনি, তাই ওকে ওর রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছি! তবে প্রফেসর, স্বীকার করতেই হবে যে, সে চমৎকার একটা মানুষে রূপান্তরিত হয়েছে! আমরা তাকে দেখি, আর অবাক বিষ্ময়ে হয়ে যাই!
 
তাঁর প্রাক্তন এক বান্ধবীর সাথে পরিচিত হলেন ড: জগলুল। সে বললো, জানো প্রফেসর! যুদ্ধ হতে ফিরে এসে সে আমার দিকে আজ পর্যন্ত চোখ তুলে তাকায়নি! আমি তাকে অতিতের মত আবার ডেটিং এ ডাকলে সে খুব ভদ্রভাবে তা এড়িয়ে গেছে। বলেছে,
আমার সে জীবন নয়, আমি সে পথের যাত্রী নই! আমাকে ক্ষমা করো, আর কখনেই আমাকে এ পথে ডেকোনা! ভুলে যাও সে সব কথা, আর যদি ভুলতে না পার বা না চাও, তবে অন্তত পক্ষে আমাকে তা ভুলে যেতে দাও! মনে রেখো, এই জীবন, উদ্দমতার নামে এই উশৃঙ্খলতা এটা পাপ, এটা অন্যায়। এই সব কাজ আর কথার একদিন জবাব দিতে হবে। তোমাকে জবাবদীহিতার মুখোমুখি দঁড়াতেই হবে, পার পাবেনা!– Nothing will go unaccounted for !   
 
কি অদ্ভুত পরিবর্তন!
প্রফেসর জগলুল মোট এগারো দিন থাকলেন। এর মধ্যে টুকি টুকি আলোচনা ছাড়াও আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে মোট তিন দিন ইসলামের উপরে লেকচার ও প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে। অষ্টম দিনে আ: সালামের মা, ভাই-ভাবীসহ মোট চব্বিশ জন মার্কিন, ইংরেজ খৃষ্টান ইসলাম গ্রহণ করলেন।
প্রফেসর জগলুলের নিজ মুখে এ কাহীনি শুনে বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। আমার এই বিষ্ময়কে তিনি শঙ্কায় পরিণত করলেন, যখন বললেন,
‘তেইশ বৎসরের এক খৃষ্টান যুবক, মৃত্যুর পরে একদিন তার প্রতিটি কর্মের জবাবদীহি করতে হবে জেনে ভীত হলো! শত প্রলোভন, ভয়, ভীতি, চাপ সহ্য করেও তার নতুন ধর্মমতের উপরে টিকে রইল, মুসলমানই রইল, নিষ্ঠাবান মুসলমান! তাঁর পরিবর্তনে প্রভাবিত হয়ে তার নিকটাত্মীয়, তার বন্ধু বান্ধব, একই সমাজের আরও চব্বিশজন জন মুসলমান হলো!

একটাবার চিন্তা করে দেখেছ কী, ইসলাম তার আচার আচরণ জীবন আর জীবনযাত্রায় কি গভীর ছাপ ফেলেছে? যা কেবল তাকেই নয় বরং তার আশে পাশে এতগুলো লোককেও আকৃষ্ট করেছে, তাদেরকে ইসলামের দিকে টেনে এনেছে!
সে নিজেই আমাকে বলেছে; ‘প্রফেসর, সেই মরুভূমিতে তাঁবুর মধ্যে বসে তোমার কাছে জেনেছিলাম যে, প্রত্যেকটি কাজের জবাব দিতে হবে, দিতেই হবে! এর পর হতে আজও আমার ভয়ে বুক কাঁপে! ভাবি, হায়, আমার যদি জন্মই না হতো!’

ড. জগলুল সরাসরি আমার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলেন;
‘বলতে পারো, আমরা মুসলমান হয়ে জীবনে কতবার কুরআনে পড়েছি, আলেমদের কাছে শুনেছি যে, মৃত্যুর পরে আমাদের সকল কাজের জবাব দিতেই হবে, তার পরেও কি আমাদের বুক কেঁপেছে ভয়ে?
কথাটা বলে ড. জগলুল একরাশ প্রশ্ন নিয়ে আমার দিকে চেয়েই রইলেন, একটুখানি থেমে তিনি আবার বলে উঠলেন, মনে রেখো, এর জবাবও আমাদেরকে দিতে হবে! Nothing will go unaccounted for !