হোয়াট ইজ নামাজ?

 পাঁচ বৎসরের শিশু তুহিন। দুরন্তপনায় তার জুড়ি মেলা ভার। আমার এক প্রতিবেশী বাংলাদেশী পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। পরিবারের একমাত্র পুত্র সন্তান। পর পর চারটা কন্যা সন্তানের পর জন্ম নেওয়া এই তুহিন বাবা মা’র নয়নের মণি যেন। সংসারে তার দাপট একচেটিয়া। বড় চারটি বোন, মা এবং বাবা এমন কেউ নেই যার উপরে তুহিনের জোর চলেনা!
 আমার সাথে ছোট তুহিনের দারুণ সম্পর্ক। আমাকে সে অনেক সময় ‘ফানি আঙ্কেল’ বলে ডাকে, এর কারণ মাঝে মধ্যেই ওদের বাসায় ওর বাবার সাথে দু’চারটা গল্প করতে বা কোন কাজে গেলেই তার বায়না অনুযায়ী তাকে দু’একটা মজার মজার গল্প শোনােেত হবে। সেই গল্পগুলো নাকি তার কাছে খুবই ‘ফানি’ মনে হয়। আর তাই তার বায়নাও বেড়ে চলে, আরও বেশি বেশি করে গল্প শোনাতে হবে। ওর বায়না না মিটিয়ে উঠে আসাটা রীতিমত সাধনার ব্যাপারই বলতে হবে।
বাংলাদেশের গল্প শোনাতে চাইলে সে তা শুনতে নারাজ। কারণ, তুহিনের ভাষায় ‘ব্যাংলাডেশ’ হলো ‘পুওর’ ‘মাডি এণ্ড ডাষ্টি’! ওরকম একটা দেশের গল্প সে মোটেও শুনতে প্রস্তুত নয়! তুহিন ভেবেই পায়না তার নানা-নানী, দাদা-দাদি, আঙ্কেল-আণ্টি এরা কি করে সেই দেশে থাকে?
 সে আরও অবাক হয় একথা শুনে যে, তার ড্যাডি-মাম্মী, তার বড় বোনগুলোও সেই ‘পুওর’ ‘মাডি এণ্ড ডাষ্টি’ দেশেই জন্মেছে, সেখানেই বেড়ে উঠেছে। তুহিন অবাক হয়ে তার বাবা, মা, বড় বোনদের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে সে কথা শুনে।
 সে নিজেও যে ঐ বাংলাদেশেই জন্মেছে, সেকথা তাকে বিশ্বাস করানো কষ্টকর। সে যে মাত্র আট মাসের শিশু অবস্থায় সেই ‘মাডি এণ্ড ডাষ্টি ব্যাংলাডেশ’টা ছেড়ে এসেছে, সে কথা বললে তুহিন ক্ষেপে যায়। ভাবে, তাকে ‘ইনসাল্ট’ করার জন্যই আমরা এরকম একটা আজগুবী কথা বলছি!
বার বার সে কথা স্মরণ করিয়ে দিলে নিশ্চিত হতে সে তার মার কাছে ছুটে যায়, প্রকৃত ব্যাপারাটি কী তা জানার জন্য। মা’ও যখন তাকে এ কথাটাই জানান, তখন তুহিন চুপ করে যায়, কোন কথা বলে না। কী জানি ঐ কচি মন কী ভাবে? তবে সে বিস্ময়ে অবাকই যে হয়, সে বিষয়টা নিশ্চিত। মনে মনে হয়ত ঐ শিশু ‘পুওর, মাডি এন্ড ডাষ্টি ব্যাংলাডেশ’এ জন্ম নিতে হয়েছে বলে হীনমন্যতায় আক্রান্ত হয়! নিজেকে মনে মনে ধিক্কার দেয়! 
 নিষ্পাপ ছোট্ট শিশু তুহিনেরই-বা দোষ দেব কী? তাঁর বাবারই এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু যিনি তুহিনদের বাড়ির অদূরেই স্বপরিবারে বসবাস করছেন, তাঁকে আক্ষেপ করে বলতে শুনেছি, কেন যে তাঁর জন্মটা বাংলাদেশে হয়েছিল?
 পাঁচ বৎসরের ছোট্ট শিশু, স্ট্যামিনা আর উদ্যমে ভরা। তার প্রমাণ সে আমাকে অনেকবার দেখিয়েছে। ফ্লোরে কার্পেটের উপরে শুয়ে পড়ে কী একধরনের দূর্বোধ্য ভঙ্গিমায় চক্রাকারে ঘোরে, একবার পেটের উপরে ভর করে মাথা ঘাড় উঁচু করে দেয়, আবার পরক্ষণেই বিদ্যুতের গতীতে পাশ ফিরে, বৃত্তের ন্যায় আরও দু’একটা পাক খেয়ে উঠে দাঁড়ায়, তড়াক করে লাফিয়ে উঠার মত করে! এর পরে মাজা বেঁকিয়ে হাত, পা, ও সেই সাথে চোখ মুখের কিম্ভূতকিমাকার সঞ্চালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে! প্রথমদিন তো আমি হতবাক তার এই আচরণ দেখে! ভেবেই পাচ্ছিলাম না, ছেলেটা এমন করছে কেন?
অনেকক্ষণ পরে থেমে সে হাঁপাতে হাঁপাতে জানান দিল যে, এটা একটা ড্যান্স, এবং তার বন্ধুরা কেউ তার সাথে এই ড্যান্স এ পালা দিয়ে পারেনা! আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, জীবনেও আমি এরকম ড্যান্স দেখিনি। আর ওটা যে একটা ড্যান্স, তাইতো জানতাম না। আজ ‘মাষ্টার ড্যান্সার’ তুহিনের কাছে সেই ড্যান্সটুকু দেখেও বুঝে উঠতে পারলাম না, কোন শৈল্পিক সুষমার কারণে শরীরের এহেন দুর্বোধ্য এবং কিম্ভূতকীমাকার সঞ্চালনকে ‘ড্যান্স’ বলে আখ্যায়িত করতে হবে?
 বিষয়টি তুহিনকে জানালে সে হেসেই খুন। আমি যে নির্বোধ, সে কথা বুঝতে পেরে ছোট্ট ছেলেটি আমাকে বুঝিয়ে দিল ‘মাইকেল জ্যাকসন’ নামে একজন খুব বড় ড্যান্সার এরকম নাচে! সে তো কেবল সেই মাইকেল জ্যাকসনের অনুকরণই করছিল!!
এবারে আমার মত উজবুক এক ‘ফানি আঙ্কেল’ বুঝল যে, এতক্ষণ তুহিন যা করছিল সেটা সত্যিই একটা ‘ড্যান্স’! অনেক বড় মাপের নাচ! নিছক পাগলামি নয়!! এবং এটাও বুঝলাম যে, আমাদের তুহিন, পাঁচ বৎসরের শিশু হলেও খুব ভালো করেই তা রপ্ত করেছে। মেধা আছে বটে ছেলেটার!
  কখনও কখনও একটি-দুটি সপ্তাহই চলে যায় নিজের ব্যস্ততার কারণে, তাদের বাসায় যাওয়া হয়ে ওঠেনা। তুহিনের সাথেও দেখা হয়না। তার বাবা কিংবা মা মাঝে মধ্যেই বলেন যে তুহিন নাকি তার ‘ফানি আঙ্কেল’ এর খোঁজ করে প্রায়ই। বাবা কিংবা মা’র কাছে জানতে চায় ‘ফানি আঙ্কেল’ কেন আসে না তাদের বাড়িতে?
 গত বড়দিনের দিন দুয়েক আগে ঘটনাক্রমে তার বাবার সাথে দেখা হয়ে গেলে তিনি চা’র আমন্ত্রণ জানালেন। হাতে অবসর     থাকায় আমিও কোন কথা না বাড়িয়ে গিয়ে উঠলাম তাদের বাড়িতে। ড্রয়িংরুমে বসে বসে তুহিনের বাবার সাথে আলাপ করছিলাম আর সেই সাথে চা’র কাপটাও শেষ করা হচ্ছিল।
  এরই মাঝে দোতলা থেকে তুহিন নেমে এল হৈ হৈ করতে করতে। সে তার ‘ফানি আঙ্কেল’কে পেয়েছে অনেকদিন পরে আজ দুটো গল্প না বলে আঙ্কেলের আর মুক্তি নেই! ভাবখানা এমনই আর কি! এমনটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু না, আজ সে আর গল্পের বায়না ধরলনা, বরং বড় আগ্রহ ভরে সে তার ‘ফানি আঙ্কেল’কে হাতে ধরা অনেকগুলো গ্রিটিংস কার্ড দেখালো, এক এক করে সে সেই কার্ডগুলো কোনটা কার জন্য, সে কথাও ব্যাখ্যা করে চলল।
সে তার বন্ধু বান্ধবদের গ্রিট করবে বড়দিন উপলক্ষ্যে। কার্ডগুলো বড় আগ্রহভরে আমাকে এক এক করে দেখালো। তার বাবা’কে, মা’কে কার্ড দেবে, তার বোনদেরও দেবে। সে জন্যই কার্ড গুলো আনিয়েছে, সে কথাও জানান দিল। আমাকেও একটা কার্ড দেবে বলে সে নিশ্চিত আশ্বাস দিল, পাছে যেন আমি আবার নিরাশ না হই, সে জন্য!
 নিজের প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যেও চেষ্টা করি শুক্রবার দিনটি সাপ্তাহিক ছুটির দিন হিসেবে নেবার। কখনও কখনও সফল হই, কখনও বা শত চেষ্টা করেও শুক্রবার দিনটিতে ছুটি ম্যানেজ করে উঠতে পারিনা। আর যদি কখনও সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার নিতে পারি, তবে সেদিনটি আমার প্রতিবেশী বন্ধুপ্রবরকে সাথে করেই জুমুআর নামাজটি পড়তে যাই মসজিদে। যাবার সময় প্রায় প্রতিবারই প্রতিবেশী ভদ্রলোক তুহিনের বাবাকে তার বাড়ি থেকে ডেকে নিতে হয়। তিনিও সানন্দে আমার সাথী হন মসজিদ পর্যন্ত। দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে মসজিদ পর্যন্ত নামাজে যাই, নামাজ শেষে আবার দু’জনে একইসাথে গল্প করতে করতে বাসায় ফিরি।
 ভদ্রলোককে বার বার বলেছি তার ছোট্ট ছেলে তুহিনকেও যেন তিনি সাথে নেন মসজিদ পর্যন্ত, কিন্তু তিনি প্রতিবারই সে কথা নাকচ করে দিয়েছেন এই বলে যে, একেবারে ছোট, আরও একটু বড় হোক তখন না হয় সাথে করে নেওয়া যাবে। বোঝানোর চেষ্টা করেছি, এখন এই বয়সে ছেলেটাকে যদি নামাজ, মসজিদ, এসব ইসলামেরমৌলিক বিষয়াদির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া না যায় তবে আর একটু বড় হলে সে পথে তাদের নেওয়া যাবে, তেমনটা আশা করা মোটেও সঙ্গত হবে না।
  কিন্তু তিনি সে কথা খুব একটা কানে নিচ্ছেন বলে মনে হয়নি। তাঁর অনাগ্রহ দেখে শেষ পর্যন্ত নিরাশ হয়েই হাল ছাড়তে হয়েছে, পাছে না আবার তিনি বিরক্তবোধ করেন ভেবে!
 একদিন সুযোগ বুঝে তাঁর স্ত্রী, তুহিনের মাকে বললাম কথাটা। যতটা নরমভাবে বলা সম্ভব, বুঝিয়ে বললাম, আপনারা যে মাইকেল জ্যাকসনের অনুকরণে তুহিনের সেই কিম্ভূতকীমাকার নাচ দেখে যারপরনাই প্রীত হন, ছেলে মানুষের নিরেট ছেলেমানুষি ভেবে উপেক্ষা করেন, আসলেই সেটা কি ছেলেমানুষি?
 ছেলেটা কী নিজের অলক্ষ্যেই একটা ভিন্নধর্মী কালচার, সংস্কৃতিক প্রবনতা নিয়ে বেড়ে উঠছে না? বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে যখন ওরকম রক, পপ, ডিসকো নাচে আরও বেশি পারঙ্গমতা অর্জন করবে, ততদিন কী অনেক দেরী হয়ে যাবে না? পারবেন কী তাকে সেই জীবন থেকে ফেরাতে? রক, পপ, ডিসকো নাচের সাথে সাথে এসবের অনিবার্য অনুসঙ্গ হিসেবে যদি একদিন আপনার ছেলের হাতে দেখেন ড্রাগ্স, সাথে দেখেন গার্ল ফ্রেন্ড, তখনও কি ছেলেমানুষি ভেবে চুপ থাকতে পারবেন?
আর যদি তা না পারেন, যদি তার জীবনাচারে বাধার সৃষ্টি করতে যান বাবা বা মা’র দায়িত্বপালন ভেবে, ছেলে কী তখন আপনাদের সেই হস্তক্ষেপকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেবে? যদি তেমনটা মেনে না নেয়, বা নিতে না চায়, তখন যে সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে উঠবে, তার দায়ভার কে নেবে? কিভাবে সেই সঙ্ঘাত সামাল দেবেন?
একজন মুসলমান বাবা-মা হিসেবে ছেলের প্রতি যে মৌলিক দায়িত্বটি আপনাদের রয়েছে সেটি যদি এখনও, এই সময় পালন না করেন, তবে বলুন তো আর কবে সেই দায়িত্বটি পালন করবেন?
 আপনার ছেলে প্রতিদিন স্কুলে যাচ্ছে, ঐ স্কুল কি তাকে ঈমানের মৌলিক পরিচিতি কলেমা শেখাবে বলে আপনি মনে করেন? তারা যদি না শেখায়, তবে তাকে এখন সেই কলেমাটা শেখানোর দায়িত্বটি কার? ভদ্রমহিলা আমার কথা গুলো খুব মনযোগ দিয়ে শুনলেন বলে মনে হলো। কিন্তু কিছুই বললেন না। আমিও আর কথা বাড়ালাম না। তাদের পারিবারিক ব্যাপার, আমার মত আমি চেষ্টা করেছি। এখন তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবার পালা।
  গত ঈদ উল আজহার দিন। বাসা থেকে জামা কাপড় পরে বের হবার আগে আমার প্রতিবেশী সেই ভদ্রলোককেও ফোন করলাম, একসাথে নামাজে যাবার জন্য। তিনি বললেন, তিনিও রেডি হচ্ছেন, আমি যেন বাসা থেকে বের হলেই তার বাসার দরজায় নক করি।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বের হয়ে উক্ত ভদ্রলোকের দরজায় কড়া নাড়লাম। তিনি দরজা খুলে দিলে আমি দরজাতেই দাঁড়িয়ে রইলাম তাঁরই অপেক্ষায়। ঘরের ড্রইংরুমে তাঁর স্ত্রী শিশু তুহিনকে সুন্দর জামা কাপড় পরিয়ে এনেছেন, বাবার সাথে সাথে ঈদের নামাজে যাবার জন্য। কিন্তু ছেলেটার চোখ মুখই বলে দিচ্ছে, সে তাতে খুশী নয়। এক হাতে দশ পাউন্ডের একটা নোট, নিজের অপর হাতটি দিয়ে চোখ ডলছে ঠাঁই দাঁড়িয়ে! পা বাড়িয়ে বাবার দিকে এগুবে সে লক্ষণ নেই, যদিও পেছন থেকে মা তাকে বার বার ঠেলছেন, বাবা সামনে থেকে ডাকছেন ‘হারি আপ, লেট্স গো, উই আর লেট ’।
তার এ অবস্থা দেখে করূণাই হলো! আমার সাথে শিশু তুহিনের দারুণ একটা সম্পর্ক থাকার কারণে আমিই তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম, বললাম; ‘এসো আমার সাথে, আমরা নামাজ পড়ে দ্রুত চলে আসব, আর এর পরে তোমাকে মজার মজার দুটো গল্প বলব’।
 ছেলেটার মুখে তার পরেও হাসি ফুটল না। তবে মুখে তার ঠিকই কথা ফুটল বটে। আমাদের সকলকে, বিশেষ করে, তার বাবা-মা’কে অবাক করে দিয়ে সে প্রশ্ন করে বসল;
‘হোয়াট ইজ নামাজ’?
তাইতো! পরিবারে নামাজের প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও না পাওয়া এক শিশুকে কমিউনিটির একজন আমি কোথায় নিয়ে যাচ্ছি? তাকে যে জানানোই হয়নি ‘হোয়াট ইজ নামাজ ’?