কোনটি উত্তম? হজ্ব-উমরার পুনরাবৃত্তি না ‘ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ’?

ড. ইউসুফ আল কারজাবি

ফরজ আদায় করা শরিয়তের মুকাল্লাফ ব্যক্তিমাত্রেরই প্রথম কর্তব্য। বিশেষত তা যদি হয় দ্বীনের রুকন বা স্তম্ভগুলোর অন্যতম। আর নফলের দ্বারা সে আল্লাহর প্রিয় হয় এবং তাঁর নৈকট্য লাভ করে। ইমাম বুখারি বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘আমার বান্দার ওপর আমি যা ফরজ করেছি এর চেয়ে অন্য কিছুর মাধ্যমে সে আমার অধিক নৈকট্য লাভ করে না। আমার বান্দা নফলের দ্বারা আমার কাছে আসতে থাকে এমনকি আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। সুতরাং আমি যখন তাকে ভালোবাসি তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে এবং চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে।’ (বুখারি) তবে পাশাপাশি আমাদের সামনে শরিয়ত নির্ধারিত নিম্নোক্ত মূলনীতিগুলোও বিদ্যমান : প্রথমত. আল্লাহ তাআলা ফরজ সম্পাদন না করা পর্যন্ত কোনো নফল কবুল করেন না। সুতরাং যে ব্যক্তি নফল হজ্ব বা উমরা করে অথচ সে তার ওপর ফরজ জাকাত পুরোপুরি বা আংশিক আদায়ে কার্পণ্য করে তার হজ্ব ও উমরা গ্রহণযোগ্য নয়। হজ্ব বা উমরার পেছনে তার সম্পদ খরচের চেয়ে বরং জাকাত আদায়ের মাধ্যমে সম্পদকে পবিত্র করা অধিক জরুরি। তেমনিভাবে যার কাঁধে ঋণের বোঝা আছে, যেমন সে ব্যবসায়ী; বাকিতে মাল ক্রয় করেছে- যার মূল্য সে সময়মত পরিশোধ করে নি কিংবা তাকে কেউ কর্জে হাসান বা উত্তম ঋণ দিয়েছে তা এখনো আদায় করে নি, তো এই ব্যক্তির জন্য তার ঋণ পরিশোধের আগে নফল হজ্ব বা উমরা করা জায়েজ নেই। দ্বিতীয়ত. হারাম কাজ করার পাশাপাশি যদি কেউ নফল আদায় করে তবে আল্লাহ তাআলা তা কবুল করেন না। কারণ হারামের পাপ বর্জন নফলের পুণ্য অর্জনের চেয়ে বেশি দরকারি। আমরা দেখেছি অতিরিক্ত নফল হজ্বকারীদের উপস্থিতি ফরজ আদায়কারী হাজ্বীদের জন্য দুর্ভোগ বয়ে আনে। যেমন- তারা ভীড় দীর্ঘতর করে। এতে সকল হাজ্বীর কষ্ট বেড়ে যায়, রোগ ছড়ায়, কেউ কেউ আহত হয়, এমনকি অনেকেই পদপিষ্ট হয়। তারা সামনেও অগ্রসর হতে পারে না আবার পেছনেও ফিরে আসতে পারে না। এ মূলনীতির আলোকে যথাসম্ভব ভীড় ঠেকানো ওয়াজিব। আর এর জন্য সবচে কার্যকর ও উত্তম পদক্ষেপ হলো, যারা একাধিকবার হজ্ব করেছেন (অন্তত হজ্ব মৌসুমে) তাদের জন্য হজ্ব-উমরা নিষিদ্ধ করা। যাতে করে যারা এখনো ফরজ হজ্ব আদায় করতে পারেন নি তারা ভালোভাবে হজ্ব আদায় করতে পারেন। ইমাম গাজালি রহ. হাজ্বীদের জন্য যেসব আদব রক্ষা করা ওয়াজিব তার তালিকায় লিখেছেন : ‘হাজ্বীদের জন্য ওয়াজিব তারা যেন মাক্স (এটা এক ধরনের ট্যাক্স যা জোরপূর্বক নেয়া হত) প্রদানের মাধ্যমে আল্লাহর দুশমনদের সাহায্য না করে। মক্কার সেসব প্রশাসক দুশমনরা যারা মসজিদের হারামে প্রবেশের জন্য অন্যায়ভাবে ট্যাক্স আদায় করে এবং যারা রাস্তায় গতি রোধ করে হাজ্বীদের অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নেয়। কারণ তাদেরকে নিজের অর্থ-সম্পদ প্রদান করা জুলুমকে উৎসাহিত করার নামান্তর। সুতরাং এ ক্ষেত্রে কৌশলের আশ্রয় নেবে। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে কোনো কোনো শরিয়তবিদ বলেছেন, নফল হজ্ব বাদ দেয়া এবং রাস্তা থেকে ফিরে আসা জুলমকে উৎসাহিত করার চেয়ে উত্তম। এখানে কারও এ কথা বলা ঠিক হবে না যে, এটাতো আমার থেকে জোরপূর্বক নেয়া হচ্ছে। তাই আমি নিরুপায়। কারণ সে যদি ঘরে বসে থাকে অথবা রাস্তা থেকে ফিরে আসে তাহলে তার থেকে কেউ কিছু নিতে পারবে না। এরপরেও নফল হজ্বের জন্য গেলে তা তো নিজেই নিজেকে নিরুপায় অবস্থায় উপনীত করার শামিল বৈ নয়। (এহইয়াউ উলুমিদ্দিন : ০১/২৩৬, আল-ইবাদাতু ফিল ইসলাম : ৩২৪) এই উদ্ধৃতি থেকে আমরা জানলাম, নফল হজ যদি হারামে পতিত হওয়ার কারণ হয় কিংবা শুধু তাতে পরো সহযোগিতাও হয় তবে তা অবৈধ ও অননুমোদিত। আল্লাহর সন্তুষ্টিই যার কাম্য তার এ নফল হজ্ব পরিহার করাই শ্রেয়। তৃতীয়ত. লাভ করার চেয়ে ক্ষতি রোধই অগ্রগণ্য। বিশেষত যখন ক্ষতি হয় সবার আর লাভ হয় কিছু লোকের। আলোচ্য ক্ষেত্রে কিছু লোকের লাভ এতটুকু যে তারা বারবার হজ্ব-উমরা করছেন আর এর ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে লাখ লাখ লোককে- যারা ফরজ হজ্ব করতে এসেছেন। যেমন- এরা এসব নফল ইবাদতকারীদের কারণে শারীরিক ও মানসিক কষ্ট পাচ্ছেন। এমনকি এরাও সে দুর্ভোগ থেকে নিস্তার পাচ্ছেন না তাই এ কষ্ট দূর করণার্থে বারবার নফল হজ্ব না করা উত্তম। চতুর্থত. নফল নেকি ও পুণ্য আহরণের তো বিস্তর উপায় ও ইবাদত রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার জন্য এর পথ অনেক প্রশস্ত করেছেন। যাতে তারা সবাই আপন স্থান-কাল ও অবস্থা অনুযায়ী পছন্দের উপায়টি বেছে নিতে পারে। তাছাড়া নফল হজ্ব অনেক মুসলমানের কষ্ট ও দুর্ভোগের কারণ হয়। অথচ আল্লাহ তাআলা মুসলমানের জন্য অপর মুসলমান ভাইদের কষ্ট দেয়া ছাড়াই নফল ইবাদতের অনেক ক্ষেত্র রেখেছেন। যেমন- অভাবী ও দরিদ্রকে সদকা করা, বিশেষত নিকাটাত্বীয়দের সাহায্য করা। হাদিসে এসেছে- ‘দরিদ্রকে সদকা করলে শুধু সদকার নেকি আর আত্মীয়কে সাহায্য করলে দুই ধরনের নেকি : একটি সদকা করার দ্বিতীয়টি আত্মীয়তার হক আদায় করার।’ (আহমদ, তিরমিজি) আবার কখনো কখনো সদকা করা ওয়াজিব হয়ে যায়, যখন আত্মীয় হয় অভাবী আর সে হয় বিত্তবান। তেমনি প্রতিবেশিদের দান-সদকা করা। কারণ মুসলমান ভাই হওয়ার সূত্রে তারও অধিকার রয়েছে এর সম্পদে। হাদিসে এসেছে- ‘সে মুমিন নয় যে (খেয়ে) পরিতৃপ্ত হয়ে রাত্রি যাপন আর তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে।’ (তাবরানি, আবু ইআলা) তেমনি নেকি কামাই করা যায় ধর্মীয় নানা সংস্থা-সোসাইটি, ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মক্তব-মাদরাসা এবং ইসলামের জন্য কর্মরত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে দান করার দ্বারা। আজ দাতা ও পৃষ্ঠপোষকের অভাবে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অথচ একই সময়ে দারিদ্রপীড়িত বিভিন্ন মুসলিম দেশে খৃস্টান মিশনারি ও এনজিওগুলো সচ্ছলভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যাদের কাজ ইসলামকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা, মুসলিমদের ঐক্যে ফাটল ধরানো, মুসলিমদের ইসলাম থেকে খারিজ করা এবং খৃস্টান বানাতে না পারলেও কমপে তাদের ইসলামের চেতনা নড়বড়ে করে দেয়া। আবার অনেক ইসলামি প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে পারে না। এর জন্য মুসলমানদের সম্পদ স্বল্পতা দায়ী নয়। বর্তমানে অনেক মুসলিম দেশই বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। আবার দাতা ও ব্যয়কারীরও অভাব নেই; কিন্তু অনেক অর্থ ও দানই অপাত্রে করা হচ্ছে। ব্যয় হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় খাতে। প্রতি বছর যে লাখ লাখ মুসলিম নফল হজ্ব-উমরা করেন তারা যদি তাদের নফল হজের অর্থ ইসলামি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে খরচ করেন অথবা ইসলামি ফান্ডগুলো স্ফীত করতে সাহায্য করেন, আর তা সঠিকভাবে ব্যয় করা হয় তাহলে তা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য আর্থ-সামাজিক কল্যাণ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনতে পারে। ইসলামের পথে একনিষ্ঠভাবে দাওয়াতরত ব্যক্তিগণ এর দ্বারা খ্রিস্টান মিশনারি, সমাজতন্ত্রী, নাস্তিক প্রভৃতি প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের ধর্মহীন ষড়যন্ত্র তথা উম্মার মাঝে অনৈক্য বজায় রাখা, বিশুদ্ধ ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিরোধ ইত্যাদি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। এসব যুক্তির মাধ্যম আমি ইসলামপ্রিয় নেকিভক্ত ভাইদের সুপরামর্শ দিচ্ছি, তারা যেন এ পর্যন্ত যতগুলো হজ্ব-উমরা করেছেন তাতেই ক্ষান্ত হন। এতে দু’টি ভালো কাজ হবে : প্রথম. এ অর্থ ইসলামি কল্যাণমূলক ও দাওয়াতি কাজে ব্যয় করতে পারবেন এবং মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি জায়গায় এমনকি এর বাইরে মুসলিম সংখ্যালঘু এলাকায় প্রেরণ করতে পারবেন। দ্বিতীয়. এতে করে বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে আগত ফরজ আদায়কারী অতিথি মুসলিম ভাইদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেয়া হবে। ফলে তারা আরও ভালোভাবে স্বস্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে তাদের হজ্ব সম্পন্ন করতে পারবেন। অন্যদের জন্য জায়গা করে দিতে নফল হজ্ব ছেড়ে দেয়া এবং হাজ্বীদের ভীড় হ্রাস করা দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান রাখা ব্যক্তি মাত্রই বলবেন, নেকির কাজ। হাদিসে এসেছে- কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেকে তাই পাবে যা সে নিয়ত করবে। (বুখারি) আর যেসব আমল জিহাদের অন্তর্ভুক্ত সেগুলো যে হজ্ব জাতীয় আমলের চেয়ে উত্তম তা তো স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। মুসলমানদের ধর্মান্তরিত হওয়া থেকে বাঁচানো, দ্বীনকে অমুসলিম শত্রুদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা তো জিহাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা কালামে পাকে ইরশাদ করেন- তোমরা কি হাজিদের পানি পান করানো এবং মসজিদে হারাম আবাদ করাকে ওই ব্যক্তির (আমলের) সমতুল্য ভাবছো যে আল্লাহ এবং কিয়ামত দিবসে ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে? এরা আল্লাহর কাছে বরাবর নয়। আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে হেদায়েত দেন না। যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আপন জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে তাদের জন্য আল্লাহর কাছে উচ্চ মর্তবা রয়েছে এবং এরাই কামিয়াব। (তাওবা ১৯-২০)