আল আকসা মসজিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের নয়া ষড়যন্ত্র

আল আকসা মসজিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের নয়া ষড়যন্ত্র

ইহুদীবাদী ইসরাইল মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলা মসজিদুল আকসার পশ্চিম দিকের প্রবেশ দ্বারে খননকাজ চালাতে গিয়ে দ্বারটি ভাঙ্গার কাজ শুরু করেছে ৷ সারাবিশ্বের মুসলমানরা ইসরাইলের এ ন্যাক্কারজনক কাজের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ৷ আল আকসা মসজিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের নয়া ষড়যন্ত্র সম্পর্কে দিগন্তের আজকের আসরে রয়েছে একটি আলোচনা ৷ মসজিদুল আকসা সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত ধর্মীয় স্থান ৷ বিভিন্ন ধর্মের কাছে ঐতিহাসিক এ মসজিদের গুরুত্ব রয়েছে এবং ১৯৬৭ সালে ইহুদীবাদী ইসরাইল এ মসজিদ দখল করার পর থেকে এটিকে ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা চালিয়েছে ৷ ইসরাইলী সেনারা কিছুদিন পরপর নতুন নতুন অজুহাতে আল-আকসা মসজিদে হামলা চালিয়ে এর ক্ষতি করছে ৷ ইহুদীবাদীরা গত ৬ই ফেব্রুয়ারি এ মসজিদের উপর সর্বশেষ আগ্রাসন চালায় ৷ এবার তারা মসজিদেরর পশ্চিম দিকের প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে ৷ ইসরাইলীরা এরই মধ্যে ঐ প্রাচীরের নীচে ভূগর্ভস্থ দুটি বৃহত্‍ হলরুম ধবংস করে ফেলেছে ৷ ইসরাইল সরকার বলছে, জেরুযালেম শহরের ইহুদী অধ্যুষিত এলাকার সাথে মসজিদুল আকসার একটি সংযোগ সেতু নির্মানের লক্ষ্যে তারা ঐ ধবংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ৷ অর্থাৎ ইসরাইল মসজিদুল আকসায় ইহুদীবাদীদের যাতায়াতের সুবিধা করে দেয়ার অজুহাতে মসজিদটির একাংশ ধ্বংসের কাজে হাত দিয়েছে ৷ ইসরাইলীরা আল আকসা মসজিদ ধ্বংসের ষড়যন্ত্র শুরু করে ১৯৬৯ সালে এটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ৷ তখন থেকে এ পর্যন্ত তেলআবিব এ মসজিদ ধবংস করার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ৷ ইহুদীবাদীরা দাবি করছে, মসজিদুল আকসার নীচে হযতর সোলায়মান (আঃ) এর উপাসনালয় অবিস্থত এবং সেটিকে খুঁজে বের করার জন্য তারা এ ধরনের ধবংসাত্মক কাজে হাত দিয়েছে ৷ তারা বিশ্বাস করে, ইহুদী জাতির মুক্তিদাতার আবির্ভাবের সময় এসে গেছে এবং তার আবির্ভাবের ক্ষেত্র সৃষ্টি করার জন্য আল আকসা মসজিদ ধবংস করে সেখানে সোলায়মানের উপাসনালয় নির্মাণ করতে হবে ৷ হযরত সোলায়মান (আঃ) প্রায় তিন হাজার বছর আগে সোলায়মানের উপাসনালয় খ্যাত স্থাপনাটি নির্মান করেছিলেন ৷ কিন্তু তার প্রায় চার শতাব্দি পর বাবোলের অধিবাসীরা এটিকে ধবংস করে ৷ তবে ঐ উপাসনালয় পুনরায় তৈরি করা হলেও হযরত ঈসা (আঃ) এর জন্মের ৭০ বছর পর রোম সম্রাট এটিকে ধবংস করে দেয় ৷ তবে আল আকসা মসজিদের নীচে ঐ উপাসনালয়ের অবস্থান নিয়ে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদরা ব্যাপক সংশয় প্রকাশ করেছেন৷ বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ মাইর বিন দোউফ ব্যাপক গবেষণা ও বহুবার মসজিদুল আকসা পরিদর্শনের পর ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গবেষণার ফলাফল লিখতে গিয়ে বলেন, হযরত ঈসা (আঃ) এর উপাসনালয় কোন অবস্থায়ই আল আকসা মসজিদের নীচে অবস্থিত নয় ৷ ইহুদীবাদীরা তাদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলকে বৈধতা দেয়ার জন্য হোলোকাস্টের মত যেসব কল্পকাহিনী তৈরি করেছে, সোলায়মানের উপাসনালয় সে রকমেরই একটি কল্পকাহিনী ৷ আরো অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষক মাইর বিন দোউফের এ দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করেছেন ৷ এদিকে ইহুদীবাদীরাও এতদিন ধরে খননকাজ চালানোর পরও মসজিদুল আকসার নীচে কোন ধরনের উপাসনালয় খুঁজে পায় নি ৷ কিন্তু তারপরও হযরত সোলায়মান (আঃ) এর উপাসনালয়ের সন্ধানের অজুহাতে ইহুদীবাদীরা মসজিদুল আকসা ধ্বংসের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ৷ বলা হচ্ছে, ইসরাইলের ১২৫টি উগ্র ইহুদীবাদী গোষ্ঠি আল আকসা মসজিদকে ধবংস করার দাবি জানাচ্ছে এবং এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন কর্মসূচী দিচ্ছে ৷ এ পর্যন্ত ইহুদীবাদী সরকার মসজিদুল আকসার ভিত্তি দুর্বল করার জন্য এর নীচ দিয়ে ট্যানেল তৈরি করেছে এবং এর বেশ কিছু অংশ ধবংস করেছে ৷ ১৯৮২ সালে আল আকসা মসজিদে এ ধরনের এক আগ্রাসন প্রতিহত করতে গিয়ে বহু ফিলিস্তিনী ইসরাইলী সেনাদের গুলিতে শাহাদাতবরণ করেন ৷ ১৯৯০ এর দশকে এ ঐতিহাসিক মসজিদের নীচে বহু খননকাজ চালানো হয় ৷ ১৯৯৬

মৃত্যু ভাবনা ও করণীয়

অর্থ-বিত্ত, ভোগ-বিলাস, শক্তি সামর্থ ও ক্ষমতার মদমত্ততা রূপ জটিল রোগ থেকে মুক্তির এবং ভারসাম্য পূর্ণ ভদ্র ও শালীন জীবন যাপন করার জন্য মৃত্যু চিন্তার চাইতে উত্তম ও উপকার আর কিছু হতে পারে না।
হযরত ওমর (রাঃ) রাসূল (সাঃ) কে প্রশ্ন করেছিলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান ব্যক্তি কে? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, যে ব্যক্তি মৃত্যুর কথা বেশি স্মরণ করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের পাথেয় সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে। (ইবনে মাজা)
শাদ্দাদ ইবনে আওস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি স্বীয় প্রবৃত্তির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করেছে সেই সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান লোক। অপরদিকে যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে অনেক কিছু আশা করে কিন্তু প্রবৃত্তিকে মোটেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না তার সকল প্রয়াসই পশু শ্রম হবে। (ইবনে মাযাহ, তিরমিযী)
হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, মৃত্যুর কথা বেশি স্মরণ কর, মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ কমিয়ে দেয়। ধন সম্পদের মধ্যে যদি মৃত্যুকে স্মরণ কর তবে তোমার অন্তর ধন লিপ্সার বিপদ থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। যদি দুঃখ-দরিদ্রের সময় মৃত্যুকে স্মরণ কর তবে দুঃখবোধ থেকে মুক্ত থাকেত পারবে। (ইবনে আবিদ দুনিয়া)
একদা আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এমন একটি মজলিসে উপস্থিত হলেন, যেখানে লোকেরা অট্টহাসিতে নিমগ্ন ছিল। এদের অবস্থা দেখে বললেন, লোক সকল! তোমরা এই মজলিসে শুধুমাত্র মজা লুটতে ব্যস্ত থেকো না। সকল মজা যে বস্তুকে বিনষ্ট করে দেয় সে বিষয়টির কথার স্মরণ রেখো। সাহাবীগণ আরজ করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঐ বস্তটি কি? বললেন, “মৃত্যু ভাবনা-মৃত্যুচিন্তা।” যে মৃত্যুর কথা বেশি স্মরণে রাখবে। দেখবে, মৃত্যুর স্মরণ তোমাকে দুনিয়ার সকল দুঃশ্চিন্তা ভুলিয়ে দেবে। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কোন সময় কারো মধ্যে দ্বীনের প্রতি অন্যমনস্ক লক্ষ্য করলে ডেকে বলতেন দেখ, মৃত্যু অবশ্যই আসবে। সেটা সৌভাগ্যের মধ্যেই আসুক বা দুর্ভাগ্যের মধ্যে (ইবনে আবিদ দুনিয়া) অর্থাৎ সৎকর্মরত অবস্থায় মৃত্যু আসলে সেটা অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়। আর মন্দকাজে লিপ্ত অবস্থায় মৃত্যু আসলে সেটা হবে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের ব্যাপার।
হযরত আম্মার (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, উপদেশ গ্রহণ করার জন্য মৃত্যু চিন্তাই যথেষ্ট (তিবরানী) কেউ যদি মৃত্যুর কথা স্মরণ করে তবে তার জন্য অন্য কারো উপদেশ গ্রহণ করার প্রয়োজন পড়ে না। মৃত্যু চিন্তাই তাকে যাবতীয় অসৎকর্ম থেকে বিরত রাখে এবং সৎ কর্মের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
হযরত রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, হাশরে শহীদানের সাথে কি কাউকে উঠানো হবে? জবাব দিয়েছিলেন, হ্যাঁ যে ব্যক্তি দিন রাতের মধ্যে অন্ততঃ ২০ বার মৃত্যুর কথা স্মরণ করে। (তিবরানী)
তাইমী (রহ) বর্ণনা করেন দু’টি বিষয় আমাকে দুনিয়ার যাবতীয় ভোগ বিলাস স্পৃহা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। এক, মৃত্যুচিন্তা। দুই, হাশরের ময়দানে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভীতি। (ইবনে আবিদ দুনিয়া)
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ) এর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করলো, মৃত্যুর কথা শুনতে আমার মোটেও ভাল লাগেনা। হযরত (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি মাল দৌলত আছে? লোকটি স্বীকার করলো, তার অধিকারে বেশ মাল দৌলত আছে। তখন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাকে বললেন, ধন-সম্পদ অগ্রে পাঠিয়ে দাও, দেখবে তোমার মনও আগের দিকে ধাবিত হতে থাকবে। কেননা, মানুষের মন তার ধন সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট থাকবে, এটাইতো স্বাভাবিক। (আবু নাঈম)
রেজা ইবনে হায়াত (রাহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি মৃত্যুর কথা বেশি স্মরণ করতে পারে, তার মন থেকে হিংসা এবং ভোগবিলাস ধীরে ধীরে দূর হয়ে যায়। (ইবনে আবিদ দুনিয়া)
রবী ইবনে আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেন, দুনিয়ার প্রতি বিতৃষ্ণা এবং আখেরাতের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টির জন্য, মৃত্যুর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসই যথেষ্ট। (ইবনে আবি শাইবা, আহমদ) তারেক মাহরেবী (রাঃ) বর্ণনা করেন, একবার আমাকে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এ মর্মে উপদেশ দিয়ে ছিলেন যে, হে তারেক! মৃত্যু আসার আগেই তুমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকবে। (তিবরানী)
হযরত আবু হাসেম (রাহ) বলেন, যে সব কর্মের কারণে মৃত্যুর প্রতি তোমাদের মনে ভীতির সৃষ্টি হয়, সে আমলগুলি সযতেœ পরিহার করে চল। দেখবে, মৃত্যুর সময় কোন ভয়ত্রাসের সম্মুখীন হতে হবে না। (ইবনে আবি শাইবা)
হযরত হাসান (রাঃ) বলেন; যে ব্যক্তি মৃত্যু ভাবনা মনে মনে অব্যাহত রাখে, তার দৃষ্টিতে দুনিয়া এবং দুনিয়ার বিত্ত-সম্পদের কোন মূল্য থাকেনা। (ইবনে আবিদ দুনিয়া)
হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, সর্বাপেক্ষা বড় সাধনা হচ্ছে মৃত্যুর কথা বেশি করে স্মরণ করা। চিন্তা ভাবনা করা সর্বাপেক্ষা বড় এবাদত। যে ব্যক্তি মৃত্যুর কথা ভাবতে ভাবতে অন্য সব কিছু ভুলে যায় সে তার কবরকে জান্নাতের একটি বাগানরূপে দেখতে পাবে। (দাইলামী)
হযরত আলী (রাঃ) বলেন, কবর হচ্ছে সব দরনের আমলের সিন্দুক। মৃত্যুর সাথে সাথেই তা অনুভব করা যাবে। (ইবনে আসাকের)
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) বলেন, মৃত্যুর সাথে সকল শ্রেণীর মানুষই এক অন্তহীন আক্ষেপে পতিত হবে, নেক আমল সে কেন করল না!? আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করেছে, সে এই বলে আক্ষেপ করবে যে সময় থাকতে কেন পাপ কাজ থেকে বিরত হল না? (তিরমিযী)
যে সব বিষয় মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় :
(১) রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, লোক সকল, কবর জিয়ারত কর। এর দ্বারা মৃত্যুর কথা স্মরণ হবে। (মুসলিম)
হযরত আবদুুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, ইতিপূর্বে আমি তোমাদিগকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করতাম। এখন অনুমতি দিচ্ছি, করব জিয়ারত কর। কেননা এতে আখেরাতের কথা স্মরণ হবে এবং দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ কমে আসবে। (ইবনে মাজাহ)
আল্লাহর ভয় এবং আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করা ঃ
হযরত জাবের (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রাসূল (সাঃ) -এর ওফাতের তিন দিন আগে তাকে বলতে শুনেছি, আল্লাহর প্রতি সুধারণা ছাড়া যেন তোমাদের কারো মৃত্যু না হয়। (বুখারী ও মুসলিম)
হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেন, আমার নিকট রাসূল (সাঃ) -এর বাণী পৌঁছেছে যে, আল্লাহ পাক বলেন, আমি বান্দাদের দু’টি ভয় বা দু’টি নিরাপত্তা একত্রিত করবো না অর্থাৎ যে ব্যক্তি পার্থিব জীবনে আমাকে ভয় করে চলেছে, তাকে আখেরাতে ভয়-ভীতির সম্মুখীন করবো না। আর যে ব্যক্তির দুনিয়ার জীবনে ভয় লেশহীন বেপরোয়া জীবন যাপন করেছে, তাকে আখেরাতের জীবনে পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হবে না। (তিরমিযী)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, কারো মৃত্যু নিকটবর্তী হতে দেখলে তাকে সুসংবাদের কথা শুনাও যেন সে বান্দা আল্লাহর প্রতি উচ্চ ধারণা নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় হয়। আর যদি কাউকে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ বেপরোয়া জীবন যাপন করতে দেখ তবে তাকে সতর্ক কর, যেন সে তওবা করার সুযোগ পায়। (ইবনুল মোবারক)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, সেই আল্লাহর কসম, যিনি ব্যতীত আর কোন মাবুদ নাই, যে বান্দা আল্লাহর নিকট মনে প্রাণে উচ্চ ধারণা রাখে এবং কল্যাণ কামনা করে, আল্লাহ পাক সে ধারণা অবশ্যই পূর্ণ করেন। (ইবনে আবি শাইবা)
আসুন আমরা দুনিয়ার জীবনে আখেরাতকে প্রাধান্য দিই, মৃত্যুর কথা চিন্তা, পরকালের জবাবদিহিতা আল্লাহভীতি মনে পোষণ করে সকল অপকর্ম অসৎকর্ম ছেড়ে আল্লাহ এবং তার রাসূলকে অনুসরণ ও অনুকরণ করে জিন্দেগী অতিবাহিত করি। হে আল্লাহ তুমি আমাদের সে তাওফীক ও শক্তি দান কর। আমীন ॥

শিক্ষা হতে হবে কুরআন সুন্নাহ অনুসৃত

বর্তমান বিশ্বে নৈতিকতার বিষয়টি বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। কারণ আধুনিক বিজ্ঞানময় এই যুগে সাধারণ মানুষ ধরে নিয়েছিল উন্নত শিক্ষাদীক্ষায় মানুষের নৈতিকতার মানও উন্নয়ন হবে, কিন্তু না, এসব শিক্ষা মানুষকে মঙ্গলগ্রহে পৌঁছিয়েছে; কিন্তু সাধারণ মানুষে মানুষে যে অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্য, নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন, আদর্শ ও মহানুভব চরিত্র-মাধুর্য দিয়ে বিশ্বকে জয় করার মানসিকতা ক্রমেই লোপ পাচ্ছে। আজ মানুষ অন্যের অধিকার হনন করে যেকোনো নিষ্ঠুরতা অবলম্বন করে হলেও নিজেকে দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, নিজের মতামতকে প্রাধান্য দিতে চায়। ফলে দেশে দেশে ক্রমেই শান্তি স্বস্তি অভিরুচি বিদূরিত হয়ে চলেছে। এখন মানুষ আবার একটি আদর্শিক নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন পরিবেশ ফিরে পেতে পিপাসার্তভাবে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছে। এ ক্ষেত্রে আবার মানুষ ফিরে আসছে ইসলামের শিক্ষায়, ইসলামের মহান নবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ-এর মহানুভব জীবন অনুসরণে। মহানবী আনীত আল-কুরআনই মানবজাতিকে শিক্ষার সাথে নৈতিকতার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠায় যুগে যুগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে। যেমন আল-কুরআনে বলা হয়েছে রব্বানা ওআবায়াস ফিহিম রাসূলাম মিনহুম ইয়াতলু আলাইহিম…। মহান আল্লাহপাক এ আয়াতে হজরত ইবরাহিম নবী আঃ-এর মুখনিসৃত এক ঐতিহাসিক মুনাজাতের মাধ্যমে আখেরি নবী হজরত রাসূলে করিম সাঃ এ দুনিয়ায় আসার কারণ তুলে ধরেছেন। হে আমাদের রব, তুমি শেষ জামানার উম্মতের জন্য তাদের মাঝ থেকে এমন এক নবী প্রেরণ করো যিনি তাদের তোমার পাক কালাম শরিফ বিশুদ্ধ তেলাওয়াত শিখাবেন, কিতাবের অন্তর্নিহিত জ্ঞান, বিজ্ঞান শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করবেন।
এ আয়াতের সর্বশেষ কথা হলো মানুষকে পরিশুদ্ধ করার বিষয়, নৈতিকভাবে বলীয়ান করার বিষয়। অন্যান্য শিক্ষাব্যবস্থায় এ নৈতিক ও আত্মশুদ্ধির বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হয় না বলে মানুষ সুশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও অনেক মানবিক গুণ থেকে বঞ্চিত হয়। আমাদের মহানবী সাঃ হাদিসে বলেছেন, বুইসতু মাকারিমাল আখলাক। আমি চারিত্রিক মাধুর্যের উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রেরিত হয়েছি। মানুষের নৈতিকতা সংশোধনের অন্য মাধ্যম হলো পরকালীন জবাবদিহিতার ভয়। ইসলামী শিক্ষা অনেকটা পরকালমুখী। যার কারণে সত্যিকারের ঈমানদার কখনো নীতি-নৈতিকতাহীন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারে না।
ফামাই ইয়ামাল মিসকালা যাররাতিন খাইরাই ইয়ারাহন্ধ যে ব্যক্তি এ দুনিয়ায় অণু-পরমাণু পরিমাণ ভালো কিছু করবে তা তার সামনে হাজির করা হবে আর যে পরিমাণ খারাপ কিছু করবে তা-ও সে পরকালের বিচারালয়ে প্রত্যক্ষ করবে।
বর্তমানে আমরা দেখি শিক্ষাদীক্ষা ও শৃঙ্খলা বোধে যথেষ্ট দীক্ষিত হওয়া সত্যেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে, উচ্ছৃঙ্খল হয়, অপরিণামদর্শী হয়, ভুলে যায় হিতাহিত জ্ঞান। আধুনিক যুগেও এসব মানব দল থেকে এমন ঘৃণ্য আচরণ সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ করে যা আশরাফুল মাখলুকাতের কাছ থেকে আশা করা যায় না। এসব বর্বরতার কাহিনী শুনেছি আমরা অসভ্য অন্ধকার আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগের মানুষের ইতিহাসে। তাই যেকোনো শিক্ষাদীক্ষার পাশাপাশি ইসলামী নীতি-নৈতিকতা বোধসম্পন্ন পরকালীন জবাবদিহিতামূলক এবং অন্য যেকোনো সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা উদ্‌গিরণকারী ইলমে দীন ও ইলমে তাসাউফ শিক্ষা দেয়া জরুরি।
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের চরিত্র দু’ভাগে বিভক্ত। আখলাকে হামিদা, আখলাকে যামিমাহন্ধ সৎ চরিত্র ও অসৎ চরিত্র। সচ্চরিত্র যেমন সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমা, পরোপকার, শালিনতা ইত্যাদি। অসৎ চরিত্র বলতে মিথ্যা বলা, গালি দেয়া, ঝগড়া করা, চুরি করা ইত্যাদি বোঝায়।
নৈতিকতা, সততা আখলাকে হামিদাহ বা মানুষের সৎ চরিত্রগুলোর মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠ গুণ ও বৈশিষ্ট্য। এর অর্থ সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, সাধুতা; কাজকর্ম, কথাবার্তায়, লেনদেনে এক কথায় জীবনের সব ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি অবলম্বন করা। সত্য কথা বলা, সৎ পথে চলা, সুবিচার করা, অঙ্গীকার পালন করা, আমানত রক্ষা করা, প্রতারণা না করা। এসব মহৎ গুণ আচরণ ব্যক্তিকে করে মহিয়ান আর সমাজকে করে স্থিতিশীল ও ইনসাফপূর্ণ। মানবজীবনের সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলা এসবের ওপর বেশির ভাগ নির্ভরশীল। সৎ লোক ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে সচেতন থাকে। সৎ ব্যবসায়ী দ্রব্যে ভেজাল দেয় না এবং পণ্যের দোষত্রুটি গোপন রাখে না। সৎ কর্মচারী কাজে ফাঁকি দেয় না। সৎ লোক প্রতারণা করে না, প্রবঞ্চনা করতে পারে না। মানুষ সাধারণত অর্থলিপ্সু ও সীমাহীন লোভাতুর হয়ে ব্যবসায়-বাণিজ্যে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং অধিক মুনাফার আশায় ক্রেতাকে প্রতারিত করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে অত্যধিক লাভের কামনায় পণ্যে ভেজাল ও মাপে কম-বেশি করে থাকে। এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। তাই ইসলামে এরূপ কাজকে মারাত্মক অপরাধমূলক কাজ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
সমাজে বিচার-আচার করার ক্ষেত্রেও নীতি-নৈতিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহতায়ালা পাক কালাম শরীফে ইরশাদ করেছেনন্ধ তোমরা ন্যায়ভিত্তিক বিচার সম্পন্ন করো। তা খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আর ন্যায়বিচার করো (স্বজনপ্রীতি করো না) যদিও বা কেউ তোমাদের নিকটাত্মীয় হয়। বলা বাহুল্য, নীতি-নৈতিকতার গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি সবার বিশ্বাস অর্জন করে, শ্রদ্ধা লাভ করে, এমনকি পরম শত্রুও তাকে বিশ্বাস করে।
বিশ্বের দেশে দেশে নৈতিক মানসম্পন্ন লোকের নেতৃত্ব ও সুশাসনের কথাটি বর্তমানে বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। আমাদের দেশে চলছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ। আমরা এ-ও মনে করি নিজে সৎভাবে চলার জন্য সততা লালনের জন্য পরিবেশ পাওয়া একটি বড় বিষয়। নীতি-নৈতিকতা ও সততার সাথে অসততা আর দুর্নীতির একটি চিরন্তন দ্বন্দ্ব রয়েছে। অসৎ লোকের সংখ্যা সমাজে বেশি। আল্লাহর মহান নবী-রাসূলগণ সত্যকে বিজয়ী করতে পেরেছিলেন ঠিক, অসৎদের সাথে তাদের আজীবন দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকতে হয়েছে। আজও সৎ মানুষ বিভিন্ন স্থানে অন্যায় অসুন্দরের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধরত। অসৎদের নেতৃত্বে এ যুগে সব সেক্টরে সৎ মানুষ কোণঠাসা। এমনকি ধর্মীয় উপাসনাগুলোতেও। বর্তমানে বিভিন্ন দুর্নীতি-অনিয়মে ভরা এক শ্রেণীর সামাজিক টাউটদের হাতে মসজিদ ও মাদ্রাসার নেতৃত্ব। আল্লাহপাক আমাদের সত্যিকার অর্থে নীতি-নৈতিকতার জ্ঞানসম্পন্ন সুস্থ মস্তিষ্কের ব্যক্তি ও জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার তওফিক দান করুন।
লেখকঃ জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ইমাম নির্বাচিত ও পুরস্কৃত ২০০৭, স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত ২০০৮