“ইভটিজিং ও তার প্রতিকার”

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে ইভটিজিং শব্দটি সর্বাধিক আলোচিত। টিভির পর্দায়, দৈনিক বার্তার পাতায় ও ইন্টারনেটে, ব্লগ কিংবা ফেসবুকে প্রবেশ করলেই এই মহামারির ভয়াল চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। মিডিয়াতে দৃষ্টি দিলেই দেখা যায় ইভটিজিং এর প্রতিবাদ করায় ইভটিজারের হাতে শিক্ষকের মৃত্যু, (যৌন সন্ত্রাসের প্রথম শিকার ছাত্রীর শিক্ষক নাটোরের কলেজ শিক্ষক মিজানুর রহমান) মায়ের মৃত্যু, (যৌন সন্ত্রাসের দ্বিতীয় শিকার মেয়ের মা  গোপাল গঞ্জের চাঁপা রানী) আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যু (যৌন সন্ত্রাসের তৃতীয় শিকার কুরিগ্রামের ছাত্রীর বয়োবৃদ্ধ নানা) এবার যৌন সন্ত্রাসের শিকার দিনাজপুরের ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী শাবনুর। এ অপমান সইতে না পেরে শাবনুর ঘরে ফিরে রাতে ঘরের বর্গার সাথে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। Continue reading “ইভটিজিং ও তার প্রতিকার”

সত্য অবিনাশী

সত্যকে যারাই ধ্বংস করতে এসেছে তারাই ধ্বংস হয়ে গেছে। ইতিহাসে তার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত আছে। সত্যের পথে বাঁধা সৃষ্টি করে কোন শক্তিই টিকে থাকতে পারেনি। সে শক্তি যত বড় প্রতাপশালীই হোক না কে, ফুৎকারে উড়ে গেছে, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অসম্ভব। সত্যের গতি অপ্রতিহত। দুনিয়াতে আজ পর্যন্ত এমন দৃষ্টান্ত নেই যে সত্য নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ইংরেজীতে একটা কথা আছে “Truth Shall Preveil” সত্যজয়ী হবেই। পরাজিত করা যায় না সত্যকে। সত্যের অভিধানে পরাজয়ে কথাটা নেই। সত্যের এই অপরাজেয় রূপ আমরা ইতিহাসে দেখি। সত্যের বাণী চির অম্লান। সত্যকে লক্ষ্য করে যত কটুক্তিই করা হোক না কেন, তাকে কোন মালিন্যই স্পর্শ করতে পারে না। যত আবর্জনাই তার দিকে নিক্ষেপ করা হোক না কেন সবগুলোর নিক্ষেপকারীর দিকে ফিরে আসে। Continue reading সত্য অবিনাশী

আসুন, পরিচয়টা সেরে নেই!

জিয়াউল হক
প্রিয় রাসূলুল্লাহ (সা:) একবার তাঁর এক হাদীসে বলেছেন, ‘ ইসলাম সূচিত হয়েছিল অপরিচিত ও অনাত্মীয় পরিবেশে, এবং সে (ইসলাম) আবারও সেরকম প্রাথমিক সূচনাকালের অবস্থায় ফিরে আসবে’।
যতটুকু মনে করতে পারি তা হলো, মুসলিম শরীফে এই হাদীসটি বর্নিত হয়েছে আবু হুরায়রা থেকে। হাদীসটি নিয়ে বেশিদূর যাবার চেষ্টা করবনা কারণ, সে বিষয়ে আমি কোন বিশেষজ্ঞ নই বরং কুরআন হাদীসের ব্যাপারে আমার জ্ঞান মাত্রারিক্ত কম। অতএব নিজের ওজন বুঝেই কথা বলব ইনশা আল্লাহ। Continue reading আসুন, পরিচয়টা সেরে নেই!

আল আকসা মসজিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের নয়া ষড়যন্ত্র

আল আকসা মসজিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের নয়া ষড়যন্ত্র

ইহুদীবাদী ইসরাইল মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলা মসজিদুল আকসার পশ্চিম দিকের প্রবেশ দ্বারে খননকাজ চালাতে গিয়ে দ্বারটি ভাঙ্গার কাজ শুরু করেছে ৷ সারাবিশ্বের মুসলমানরা ইসরাইলের এ ন্যাক্কারজনক কাজের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ৷ আল আকসা মসজিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের নয়া ষড়যন্ত্র সম্পর্কে দিগন্তের আজকের আসরে রয়েছে একটি আলোচনা ৷ মসজিদুল আকসা সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত ধর্মীয় স্থান ৷ বিভিন্ন ধর্মের কাছে ঐতিহাসিক এ মসজিদের গুরুত্ব রয়েছে এবং ১৯৬৭ সালে ইহুদীবাদী ইসরাইল এ মসজিদ দখল করার পর থেকে এটিকে ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা চালিয়েছে ৷ ইসরাইলী সেনারা কিছুদিন পরপর নতুন নতুন অজুহাতে আল-আকসা মসজিদে হামলা চালিয়ে এর ক্ষতি করছে ৷ ইহুদীবাদীরা গত ৬ই ফেব্রুয়ারি এ মসজিদের উপর সর্বশেষ আগ্রাসন চালায় ৷ এবার তারা মসজিদেরর পশ্চিম দিকের প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে ৷ ইসরাইলীরা এরই মধ্যে ঐ প্রাচীরের নীচে ভূগর্ভস্থ দুটি বৃহত্‍ হলরুম ধবংস করে ফেলেছে ৷ ইসরাইল সরকার বলছে, জেরুযালেম শহরের ইহুদী অধ্যুষিত এলাকার সাথে মসজিদুল আকসার একটি সংযোগ সেতু নির্মানের লক্ষ্যে তারা ঐ ধবংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ৷ অর্থাৎ ইসরাইল মসজিদুল আকসায় ইহুদীবাদীদের যাতায়াতের সুবিধা করে দেয়ার অজুহাতে মসজিদটির একাংশ ধ্বংসের কাজে হাত দিয়েছে ৷ ইসরাইলীরা আল আকসা মসজিদ ধ্বংসের ষড়যন্ত্র শুরু করে ১৯৬৯ সালে এটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ৷ তখন থেকে এ পর্যন্ত তেলআবিব এ মসজিদ ধবংস করার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ৷ ইহুদীবাদীরা দাবি করছে, মসজিদুল আকসার নীচে হযতর সোলায়মান (আঃ) এর উপাসনালয় অবিস্থত এবং সেটিকে খুঁজে বের করার জন্য তারা এ ধরনের ধবংসাত্মক কাজে হাত দিয়েছে ৷ তারা বিশ্বাস করে, ইহুদী জাতির মুক্তিদাতার আবির্ভাবের সময় এসে গেছে এবং তার আবির্ভাবের ক্ষেত্র সৃষ্টি করার জন্য আল আকসা মসজিদ ধবংস করে সেখানে সোলায়মানের উপাসনালয় নির্মাণ করতে হবে ৷ হযরত সোলায়মান (আঃ) প্রায় তিন হাজার বছর আগে সোলায়মানের উপাসনালয় খ্যাত স্থাপনাটি নির্মান করেছিলেন ৷ কিন্তু তার প্রায় চার শতাব্দি পর বাবোলের অধিবাসীরা এটিকে ধবংস করে ৷ তবে ঐ উপাসনালয় পুনরায় তৈরি করা হলেও হযরত ঈসা (আঃ) এর জন্মের ৭০ বছর পর রোম সম্রাট এটিকে ধবংস করে দেয় ৷ তবে আল আকসা মসজিদের নীচে ঐ উপাসনালয়ের অবস্থান নিয়ে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদরা ব্যাপক সংশয় প্রকাশ করেছেন৷ বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ মাইর বিন দোউফ ব্যাপক গবেষণা ও বহুবার মসজিদুল আকসা পরিদর্শনের পর ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গবেষণার ফলাফল লিখতে গিয়ে বলেন, হযরত ঈসা (আঃ) এর উপাসনালয় কোন অবস্থায়ই আল আকসা মসজিদের নীচে অবস্থিত নয় ৷ ইহুদীবাদীরা তাদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলকে বৈধতা দেয়ার জন্য হোলোকাস্টের মত যেসব কল্পকাহিনী তৈরি করেছে, সোলায়মানের উপাসনালয় সে রকমেরই একটি কল্পকাহিনী ৷ আরো অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষক মাইর বিন দোউফের এ দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করেছেন ৷ এদিকে ইহুদীবাদীরাও এতদিন ধরে খননকাজ চালানোর পরও মসজিদুল আকসার নীচে কোন ধরনের উপাসনালয় খুঁজে পায় নি ৷ কিন্তু তারপরও হযরত সোলায়মান (আঃ) এর উপাসনালয়ের সন্ধানের অজুহাতে ইহুদীবাদীরা মসজিদুল আকসা ধ্বংসের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ৷ বলা হচ্ছে, ইসরাইলের ১২৫টি উগ্র ইহুদীবাদী গোষ্ঠি আল আকসা মসজিদকে ধবংস করার দাবি জানাচ্ছে এবং এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন কর্মসূচী দিচ্ছে ৷ এ পর্যন্ত ইহুদীবাদী সরকার মসজিদুল আকসার ভিত্তি দুর্বল করার জন্য এর নীচ দিয়ে ট্যানেল তৈরি করেছে এবং এর বেশ কিছু অংশ ধবংস করেছে ৷ ১৯৮২ সালে আল আকসা মসজিদে এ ধরনের এক আগ্রাসন প্রতিহত করতে গিয়ে বহু ফিলিস্তিনী ইসরাইলী সেনাদের গুলিতে শাহাদাতবরণ করেন ৷ ১৯৯০ এর দশকে এ ঐতিহাসিক মসজিদের নীচে বহু খননকাজ চালানো হয় ৷ ১৯৯৬

ইসলামি সভ্যতা

ইসলাম জীবনর্শনের সার্বজনীন মূলনীতির উপরে ইসলামী তমদ্দুন প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের মূল্যবোধ এই তমদ্দুনের প্রাণ। সাহিত্য, শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের সহস্র প্রেরণা রয়েছে এই সংস্কৃতির মধ্যে। ইসলামী জীবনর্শনকে আল-কুরআনে বিশালাকার বৃক্ষের সংগে তুলনা করা হয়ছে। ধর্মের বাণী একটা বৃক্ষের মত, যার শিকড় থাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত আর শাখা প্রশাখা আসমানে মাথা উঁচু করে থাকে। (সূরা ইবারাহীম : ১৪,২৪) তৌহীদ (আল্লাহর একত্ব), মালিকিয়াত (আল্লাহর সার্বভৌমত্ব) ও খিলাফত (মানুষের প্রতিনিধিত্ব) এই তমদ্দুনের অপরিহার্য অংশ। আল্লাহ এক ও তিনিই একমাত্র উপাস্য ও তাঁর উপরে আর কেউ নেই, কোন শক্তি নেই।
তিনি শুধু মুসলিমের প্রভু নন, সমগ্র নিখিল বিশ্বেরই তিনি প্রভু। জাতি হিসেব কেবলমাত্র মুসলমানেরাই তাঁর অনুগ্রহ-প্রাপ্ত নন। সব জাতি এবং ব্যক্তিই তাঁর অনুগ্রহ ও রহমত পেয়ে থাকেন। তবে কোন জাতি বা ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর ঈমান, আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ, সততা, সাধুতা ও মানবকল্যাণের উপরই নির্ভর করে। প্রত্যেকটি মানুষ আল্লাহর খলীফা বা প্রতিনিধি এ সেই হিসেবে সমান অধিকারের দাবীদার। সব মানুষ পরস্পর ভাই-ভাই ও একই আইনের অধীন। এ বিষয়ে শাসক বা শাসিতের মধ্যে কোন তফাত নেই। আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে কোন মধ্যস্থতার বালাই নেই। এই জীবনদর্শনের বস্তু আত্মার কোন বিরোধ ও স্বীকৃত হয়নি; উভয় দিকেই দেয়া হয়েছে সমান মনোযোগ। মানুষে মানুষে সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে। ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে জ্ঞান, কার্যক্ষমতা ও নৈতিক উৎকর্ষের উপর ও জাতির শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত রয়েছে সুষ্ঠু ও সুবিচারমূলক সমাজ গঠনে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রথাই ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, রিবা বা সুদ এবং সর্ব প্রকারের অর্থনৈতিক শোষণ ঘোর পাপ ও মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি হিসেবে গণ্য হয়। সামাজিক কল্যাণের (অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি) সীমার মধ্যে থেকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভোগ করা চলে। সুষ্ঠু সমাজ গঠনের জন্য ইসলাম বাধ্যতামূলক সামাজিক নিরাপত্তা বা যাকাতের বিধান দিয়েছে। ইসলাম বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করে যেতে জানিয়েছে উদাত্ত আহব্বান। ব্যক্তির নিজস্ব সত্তা, অধিকার ও নিরাপত্তা ইসলাম স্বীকার করে। এই অধিকার কারো ছিনিয়ে নেবার অধিকার নেই।
সালাতের নীতি দ্বারা ইসলাম প্রচার করেছে যে, দুনিয়ার সব জাতির ভেতরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছেন ও হযরত মুহম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর শেষ রাসূল। এই নীতির দ্বারা মানব জাতির ঐক্য ও বুদ্ধিমত্তার উপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। ইসলামের মতে সত্য ও জ্ঞানের উপলদ্ধিতে কোন জাতির একচ্ছত্র অধিকার নেই। মানব সংস্কৃতির ঐক্য পরস্পর নির্ভরশীল ও মানব মহিমার স্বীকৃতি রয়েছে। সংস্কৃতি সম্পর্কে এখানে উদার দৃষ্টিকোণ ও মানসিকতা, তার ভেতরে দেখি মানবতার জয়জয়কার। যদিও এই সাংস্কৃতিক বিচার বৃদ্ধি ও মূল্যায়ন মুসলিম সমাজের সামাজিক দুর্গতি, অর্থনৈতিক অরাজকতা গোষ্ঠীগত অন্ধকার মাঝে আটকে গেছে, তবু মুসলমানগণ দু:খের নির্মম তৌহীদে ও রিসালাতের আশ্রয় নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে পারেন, শত বাধা-বিপত্তি জয় করতে পারেন। তৌহীদ ও রিসালতের নীতিকে বুঝতে পারলে মুসলিম মানুষের নিছক নেতিবাচক ভাবধারা ও অন্তর্মুখিতা দূর হয়ে যাবে ও ইসলামী জীবনদর্শনের মূল উদ্দেশ্য সুষ্ঠু সমাজ সংগঠনের দিকে আমরা দৃষ্টি ফেলতে পারব। এ উপমহাদেশের মুসলিম বিজয়ের ইতাহাস থেকে জানতে পারা যায় যে, বিজয়ীরা সবাই এক জাতির লোক নয়- কিন্তু তারা একই সূত্রে গ্রথিত; তারা সবাই মুসলিম, এই ছিল তাদের পরিচয়। তুর্কী, আফগান ও মুগল নিজেদের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেও ইসলামী জীবনদর্শন ও সংস্কৃতির এক একটা বিশিষ্ট অংশরূপে নিজেদের মনে করতেন। তৌহীদ ও সাম্যনীতি এই সব জাতিকে কম-বেশী ইসলামী সংস্কৃতির আওতায় এনেছিল। ইসলামী সংস্কৃতির একথা দাবী করে না যে, কেবলমাত্র এর মধ্যেই মানুষের মানুসিক ও সামাজিক জীবনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। দুনিয়ার সব ভাষা ও সংস্কৃতিকে ইসলামী তমদ্দুনে সম্মানের চক্ষে দেখা হয়।
বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাবধারার সার্থক অনুপ্রবেশ ইসলামের কাম্যও। এইজন্যই ইসলামে মৌলিক নীতি অক্ষুন্ন রেখে সামাজিক চাহিদা ও পরিবেশমাফিক নীতিকে (প্রিন্সিপালন্স) বাস্তবে রূপায়িত করতে বলা হয়েছে। এর নাম ইজতিহাদ। ইসলামী জীবনদর্শনকে আধুনিক যুগে রূপায়ণের উপযোগী করে তুলতে হলেও আধুনিক মানুষকে ইসলামের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হলে যেমন একদিকে জ্ঞানের মারফত ইসলামের সামাজিক রূপায়ন প্রয়োজন,তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থাও আমাদের মূল্যবোধ-অনুগ করে ঢেলে সাজাতে হবে। অধ্যাপক ইলিয়ট স্মিথ বলেন যে, ভাগ্যগুণে খৃষ্টজন্মের চার হাজার বৎসর পূর্বে মিসরে মানব সভ্যতার পত্তন হয় ও সেখানে থেকে তা তাইগ্রীস নদের তীরে, বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে, চীনে ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। একে বলা হয় সংস্কৃতি বিবর্তনের প্রত্যয় (ইভল্যুশনিষ্ট থিয়োরী) অপরদিকে অধ্যাপক টয়েনবি বলেন, অন্যান্য সংস্কৃতির সংগে সংযোগের ফলেই কোন একটা সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধিত হয়। একে বলা হয় সংস্কৃতির সঞ্চারশীল প্রত্যয় (ডিফিউশনিস্ট থিয়োরী)। রিসালাতের মারফত ইসলাম গৌণভাবে এই সঞ্চারী প্রত্যয়কেই সমর্থন করেছে।
আধুনিক দুনিয়ার সমগ্র মুসলিম জাতির একজন শাসক বা খলীফা ঘোষণা করলে বা সাধারণ মুসলিমের রোমান্টিক ঐক্যের (যার আংশিক প্রয়োজন কোন দিন ফুরিয়ে যাবে না) কথা প্রচার করলে কোন ফায়দা হবে না। দেশে-দেশে বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামের সমাজনীতির দ্বিধানীন রূপায়ণের মারফত ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অতঃপর মুসলিমের সামাজিক (সমাজ ব্যবস্থাগত) ও আধ্যাত্মিক এই উভয় মিলনের সেতু রচনা করা সহজ হয়ে যাবে। ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা ভিন্ন তথাকথিত রাজতন্ত্রগত মুসলিম রাষ্ট্রের সংগে খিলাফতভিত্তিক গণতন্ত্রী অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের সমঝোতা ও সত্যিকার মিলন অনেক দিক দিয়েই অসম্ভব ব্যাপার।
ইসলামী সংস্কৃতির মূল্যবোধ থেকে আমরা এই সত্যেরই ইঙ্গিত পাই। এখানে ঘটেছে বস্তু ও আত্মা, সমাজব্যবস্থা ও ব্যক্তিসত্তার সমন্বয়। দুনিয়ার সব কাজেই মুসলিমের ইবাদত, যদি তার ভেতরে জীবন সম্পর্কে সর্বাংগীন দৃষ্টিভঙ্গী ও মানবকল্যাণ নিহিত থাকে। দুনিয়ার কাজ করা দুনিয়াদার হওয়া নয়- আল্লাহকে ভুলে থাকার নামই দুনিয়াদার হওয়া। সমগ্র প্রকৃতিতে রয়েছে সত্যের নিদর্শন। সেই শক্তিকে উপলব্ধি করতে হবে, আহরণ করতে হবে। কারণ এই বাস্তব জগতই পরকালের শস্য ক্ষেত্র। আকল বুদ্ধি, মুহব্বত (প্রেম) ও মারেফাতের (সাধনা) মাধ্যমে ফালাহ (সাফল্য) লাভ করাই ব্যাপক অর্থে ইবাদত ও ইসলামী তমদ্দুনের বাস্তব পন্থা।
এমার্সনের মতে সংস্কৃতির যে বিশেষ গুণ সামাজিক সংযোগ ও আত্মগত নির্জনবাসের মধ্যে এক মাঝামাঝি পথ, তা ইসলামী সংস্কৃতিতে পুরোপুরি মেলে। সমগ্র জীবন নিয়ে ইসলামী সংস্কৃতির কারবার। স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ক ছাড়াও মানুষের সমাজ জীবন, খাদ্য আহরণ ও অর্জনের পন্থা, যৌন-জীবন, রাষ্ট্রনীতি, শিল্প বাণিজ্য সম্পর্ক এবং এক মানবোচিত পরিকল্পনা এতে রয়েছে। অন্যান্য দার্শনিক আর্দশের (গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র) চাইতে মৌলিক বিষয়ে মতবিরোধ ইসলামের নেই বললেই চলে (পাশ্চত্য দেশগুলোর রাজনৈতিক গণতন্ত্র, সোভিয়েট রাশিয়ার অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ও কমিউনিস্ট চীনের স্বৈরবাদী গণতন্ত্র)। ইসলামে শিয়া-সুন্নী মতবিরোধ রাজনৈতিক বিবর্তন সম্পর্কে মতবিরোধ। ইসলামী জীবনদর্শনের কোন মৌলিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এই দুটো দল গড়ে ওঠেনি। আর এই জীবনদর্শনের মৌলিক নীতি ও সমাজদর্শনের কোন অস্পষ্টতা নেই। সুদূর প্রসারী এক একটি দিককে আদি সত্তার প্রকাশের সমগ্র রূপ বলে মুসলমান মনে করেন না, তাই তাকে পূজা না করে করেন অনুশীলন। ইসলামী সংস্কৃতির এই সর্বমুখিনতার ফলে আরবদের মধ্যে ইসলামের প্রেরণায় শিল্পকলা ও বিজ্ঞানচর্চার পরিপূর্ণতা ও স্মরণ একই যুগে সম্ভব হয়েছিল। কুরআন একখানা বিজ্ঞানের কিতাব নয়, বিজ্ঞানে সত্য প্রচার করা ও কুরআনের কাজ নয়। ইসলাম দিয়েছে বিজ্ঞানের প্রেরণা। সেই প্রেরণা সার্থক হয়েছে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভবে। মানুষের মত আদিসত্তা আল্লাহ কোন ব্যক্তি নন, তিনি সেই মহান শক্তি, যিনি একই সঙ্গে একদিকে সুদূরপ্রসারী (ট্রানসেনডেন্টাল) অপর দিকে অনুপ্রসারী (ইমানেন্ট)। তাই তাঁর থেকে ইসলামী জীবনদর্শনের দার্শনিক ভিত্তি ও সর্বাংগীন (নিছক বস্তুগত নয়) বৈজ্ঞানিক পদ্ধিতর
জন্ম হয়।
সমাপ্ত