উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)

(পর্ব: ১)

নাম ‘উমর, লকব ফারুক এবং কুনিয়াত আবু হাফ্স। পিতা খাত্তাব ও মাতা হান্তামা। কুরাইশ বংশের আ’দী গোত্রের লোক। ‘উমরের অষ্টম উর্দ্ধ পুরুষ কা’ব নামক ব্যক্তির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র নসবের সাথে তাঁর নসব মিলিত হয়েছে। পিতা খাত্তাব কুরাইশ বংশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। মাতা ‘হানতামা’ কুরাইশ বংশের বিখ্যাত সেনাপতি হিশাম ইবন মুগিরার কন্যা। ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ এই মুগীরার পৌত্র। মক্কার ‘জাবালে আকিব’-এর পাদদেশে ছিল জাহিলী যুগে বনী ‘আ’দী ইবন কা’বের বসতি। এখানেই ছিল হযরত উমরের বাসস্থান। ইসলামী যুগে ‘উমরের নাম অনুসারে পাহাড়টির নাম হয় ‘জাবালে উমর’-উমরের পাহাড়। (তাবাকাতে ইবন সা’দ ৩/৬৬) ‘উমরের চাচাত ভাই. যায়িদ বিন নুফাইল। হযরত রাসূলে কারীমের আবির্ভারের পূর্বে নিজেদের বিচার বুদ্ধির সাহায্যে মূর্তিপুজা ত্যাগ করে জাহিলী আরবে যাঁরা তাওহীদবাদী হয়েছিলেন, যায়িদ তাঁদেরই একজন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র জন্মের তের বছর পর তাঁর জন্ম। মুত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র বয়সের সমান ৬৩ বছর। তবে তাঁর জন্ম ও ইসলাম গ্রহণের সন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
গাঁয়ের রং উজ্জ্বল গৌর বর্ণ, টাক মাথা, গন্ডদেশ মাংসহীন, ঘন দাড়ি, মোঁচের দু’পাশ লম্বা ও পুরু এবং শরীর দীর্ঘাকৃতির। হাজার মানুষের মধ্যেও তাঁকেই সবার থেকে লম্বা দেখা যেত।
তাঁর জন্ম ও বাল্যকাল সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না। ইবন আসাকির তাঁর তারীখে ‘আমর ইবন ‘আস (রাঃ) বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তাতে জানা যায়, একদিন ‘আমর ইবন ‘আস কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবসহ বসে আছেন, এমন সময় হৈ চৈ শুনতে পেলেন। সংবাদ নিয়ে জানতে পেলেন, খাত্তাবের একটি ছেলে হয়েছে। এ বর্ণনার ভিত্তিতে মনে হয়, হযরত ‘উমরের জন্মের সময় বেশ একটা আনন্দোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
তাঁর যৌবনের অবস্থাও প্রায় অনেকটা অজ্ঞাত। কে জানতো যে এই সাধারণ এক রোখা ধরনের যুবকটি একদিন ‘ফারুকে আযমে’ পরিণত হবেন। কৈশরের উমরের পিতা তাঁকে উটের রাখালী কাজে লাগিয়ে দেন। তিনি মক্কার নিকটবর্তী ‘দাজনান’ নামক স্থানে উট চরাতেন। তিনি তাঁর খিলাফত কালে একবার এই মাঠ অতিক্রমকালে সঙ্গীদের কাছে বাল্যকালের স্মৃতিচারণ করেছিলেন এভাবে ঃ ‘এমন এক সময় ছিল যখন আমি পশমী জামা পরে এই মাঠে প্রখর রোধে খাত্তাবের উট চরাতাম। খাত্তাব ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও নীরস ব্যক্তি। ক্লান্ত হয়ে একটু বিশ্রাম নিলে পিতার হাতে নির্মম প্রহৃত হতাম। কিন্তু আজ আমার এমন দিন এসেছে যে, এক আল্লাহ ছাড়া আমার উপর কর্তৃত্ব করার আর কেউ নেই।’- (তাবাকাত ৩/২৬৬-৬৭)
যৌবনের প্রারম্ভেই তিনি তৎকালীন অভিজাত আরবদের অবশ্য শিক্ষণীয় বিষয়গুলি যথাঃ যুদ্ধ বিদ্যা, কুস্তি, বক্তৃতা ও বংশ তালিকা শিক্ষা প্রভৃতি আয়ত্ব করেন। বংশ তালিকা বা নসবনামা বিদ্যা তিনি লাভ করেন উত্তরাধিকার সূত্রে। তাঁর পিতা ও পিতামহ উভয়ে ছিলেন এ বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী। তিনি ছিলেন তাঁর যুগের একজন শ্রেষ্ঠ কুস্তিগীর। আরবের ‘উকায’ মেলায় তিনি কুস্তি লড়তেন। আল্লামা যুবায়ানী বলেছেন ঃ ‘উমর ছিলেন একজন মস্ত-বড় পাহলোয়ান।’ তিনি ছিলেন জাহিলী আরবের এক বিখ্যাত ঘোর সওয়ার। আল্লামা জাহিয বলেছেনঃ ‘উমর ঘোড়ায় চড়লে মনে হত, ঘোড়ার চামড়ার সাথে তাঁর শরীর মিশে গেছে’ (আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন)। তার মধ্যে কাব্য প্রতিভাও ছিল। তৎকালীন খ্যাতনামা কবিদের প্রায় সব কবিতাই তাঁর মুখস্ত ছিল। আরবী কাব্য সমালোচনার বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রতিষ্ঠাতা প্রকৃতপক্ষে তিনিই। ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর মতামতগুলি পাঠ করলে এ বিষয়ে তাঁর যে কতখানি দখল ছিল তা উপলব্ধী করা যায়। বাগ্মিতায় ছিল তাঁর সহজাত গুণ। যৌবনে তিনি কিছু লেখাপড়া শিখেছিলেন। বালাজুরী লিখেছেন ঃ ‘ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় গোটা বংশে মাত্র সতেরজন লেখা-পড়া জানতেন। তাদের মধ্যে উমর একজন।
ব্যবসা বাণিজ্য ছিল জাহিলী যুগের আরব জাতির সম্মানজনক পেশা। উমরও ব্যবসা শুরু করেন এবং তাতে যথেষ্ট উন্নতিও করেন। ব্যবসা উপলক্ষে অনেক দূরদেশে গমন এবং বহু জ্ঞানী-গুণী সমাজের সাথে মেলামেশার সুযোগ লাভ করেন। মাসউদী বলেনঃ ‘উমর জাহিলী যুগে সিরিয়া ও ইরাকে ব্যবসা উপলক্ষ্যে ভ্রমণে যেতেন। ফলে আরব ও আজমের অনেক রাজা-বাদশার সাথে মেলামেশার সুযোগ লাভ করেন।’ শিবলী নু’মানী বলেনঃ ‘জাহেলী যুগেই উমরের সুনাম সমগ্র আরবে ছড়িয়ে পড়েছিল। এ কারণে কুরাইশরা সর্বদা তাঁকেই দৌত্যগিরিতে নিয়োগ করতো। অন্যান্য গোত্রের সাথে কোন বিরোধ সৃষ্টি হলে নিষ্পত্তির জন্য তাঁকেই দূত হিসেবে পাঠানো হত। (আল-ফারুক-১৪)।
উমরের ইসলাম গ্রহণ এক চিত্তাকর্ষক ঘটনা। তাঁর চাচাত ভাই যায়িদের কল্যাণে তাঁর বংশে তাওহীদের বাণী একেবারে নতুন ছিল না। তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম যায়িদের পুত্র সাঈদ ইসলাম গ্রহণ করেন। সাঈদ আবার উমরের বোন ফাতিমাকে বিয়ে করেন। স্বামীর সাথে ফাতিমাও ইসলাম গ্রহণ করেন। উমরের বংশের আর এক বিশিষ্ট ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহও ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু তখনও পর্যন্ত উমর ইসলাম সম্পর্কে কোন খবরই রাখতেন না। সর্বপ্রথম যখন ইসলামের কথা শুনলেন, ক্রোধে জ্বলতে লাগলেন। তাঁর বংশে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের তিনি পরম শত্র“ হয়ে দাড়ালেন। এর মধ্যে জানতে পেলেন, ‘লাবীনা’ নামে এক দাসীও ইসলাম গ্রহণ করেছেন। যাঁদের উপর তাঁর ক্ষমতা চলতো, নির্মম উৎপীড়ন চালালেন। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, ইসলামের মূল প্রচারক মুহাম্মদ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। যে কথা সেই কাজ….
(চলবে)