শিক্ষণীয় ঘটনা

হায়, মোবাইল ফোন!

ত্বহা নামের একটি ছোট্ট ছেলে। বয়স ১৫ কি ১৬ হবে। দেখতে বেশ সুন্দর। ছাত্র হিসাবে খুবই ভালো। পড়ালেখায় একনিষ্ঠ। আচার-ব্যবহারও তুলনাহীন। তার সুমধুর ব্যবহার ও ঈর্ষণীয় আচার-আচরণ সবাইকে মুগ্ধ করে। আকর্ষণ করে চুম্বুকের মতো। এক কথায় ত্বহার মতো ছেলে বর্তমান সময়ে খুব কমই পাওয়া যায়!

ক্লাস নাইনের ছাত্র ত্বহা। মেধাশক্তি প্রখর ও পড়াশুনায় মনোযোগী হওয়ায় ক্লাসের প্রথম স্থানটি বরাবরই দখল করে আসছে সে। তার হাতের লেখাও বেশ চমৎকার। কণ্ঠও ভালো। তাই স্কুলের শিক্ষকসহ সকলেরই সর্বাধিক প্রিয়পাত্র সে। শিক্ষকগণ তাকে নিজ সন্তানের মতোই আদর করেন। সেই সাথে কিভাবে তার পড়াশুনার অগ্রগতি হবে সে ব্যাপারেও চিন্তা-ফিকির করেন।

একদিন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ত্বহার পিতাকে অফিসকক্ষে ডেকে খুব সমাদর করলেন। আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করলেন। তারপর   বললেন, জনাব! আল্লাহর রহমতে আপনার ছেলের মেধাশক্তি খুবই প্রখর। পড়ালেখার প্রতি তার মনোযোগও প্রশংসনীয়। আমরা আশাবাদী যে, এস,এস,সি পরীক্ষায় ত্বহা বেশ ভালো ফলাফল করতে পারবে। পারবে কাক্সিক্ষখত সাফল্য অর্জন করতে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের এই গ্রামের স্কুলে ওর মেধার বিকাশ পূর্ণরূপে ঘটছে না। কেননা এখানে শহরের নামকরা মানসম্পন্ন স্কুলগুলোর ন্যায় পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও সুযোগ-সুবিধা নেই। নেই আধুনিক প্রযুক্তির উন্নতমানের সরঞ্জমাদিও। সুতরাং ত্বহাকে যদি ঢাকার কোনো মানসম্মত স্কুলে ভর্তি করে দেন তাহলে আমাদের বিশ্বাস, এস,এস, সি পরীক্ষায় নিশ্চয়ই সে গোল্ডেন এ+ পাবে। আর হ্যাঁ, আমাদের স্কুল ছেড়ে ত্বহার চলে যাওয়াটা যদিও আমাদের জন্য বেদনাদায়ক তবুও তার মঙ্গলের জন্য এ বেদনাটুকু আমরা সইব। কারণ, অনেক সময় বৃহৎ স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্রতর স্বার্থকে বিসর্জন দিতে হয়। এবার বলুন, এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?

ত্বহার আব্বা বললেন, এমন একটি ইচ্ছা আমারও ছিল। ভেবেছিলাম, ওকে ঢাকায় ভর্তি করে দেব।  কিন্তু আপনারা কষ্ট পাবেন মনে করে তা আর হয়নি। যাহোক, এখন যেহেতু আপনারাই আমাকে প্রস্তাব দিচ্ছেন, তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ত্বহাকে আমি ঢাকায় ভর্তি করার ব্যবস্থা করব। দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন আমাদের সবার আশা পূর্ণ করেন।

কয়েক দিন পর ঢাকার একটি নামকরা স্কুলে ত্বহাকে ভর্তি করা হলো। ভর্তির ব্যাপারে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফরিদ উদ্দীন সাহেব বেশ সহযোগিতা করলেন। এমনকি তিনি নিজে ত্বহার আব্বাকে সাথে নিয়ে বেশ পরিশ্রম করে একটি ভালো হোস্টেলে তার থাকার ব্যবস্থা করলেন। তারপর নিজের পক্ষ থেকে তাকে ৫০০ টাকা দিয়ে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ত্বহার পিতাকে নিয়ে আপন কর্মস্থলে ফিরে এলেন।

ত্বহা এতদিন বাড়ি থেকে যেয়ে-এসে ক্লাস করেছে। তাই হোস্টেলে তার মন টিকতে চাইল না। বাড়ী আসার জন্য সে ছটফট করতে লাগল। কিন্তু একমাস পূর্ণ না হলে বাড়ী যাওয়ার বিধান নেই বিধায় বাধ্য হয়ে তাকে একমাস শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হলো।

মাস শেষ হতেই ছুটি নিয়ে বাড়িতে চলে এল ত্বহা। মায়ের নিকট খুলে বলল মনের অবস্থা। মা ভাবলেন, ত্বহা আমাদের ছেড়ে দূরে গিয়ে কোথাও দীর্ঘদিন থাকেনি। তাছাড়া হাতে মোবাইল না থাকায় সময়মতো আমাদের সাথে যোগাযোগও করতে পারিনি। এজন্যে তার বেশি খারাপ লেগেছে। যদি তার হাতে একটি মোবাইল ফোন থাকত এবং আমাদের সাথে প্রয়োজনের সময় বা মন খারাপ থাকা অবস্থায় কথা বলতে পারত তাহলে নিশ্চয়ই এতটা খারাপ লাগত না।  নাহ্ যেভাবেই হোক ওর জন্য একটি মোবাইলের ব্যবস্থা করতে হবে।

 ছেলের হাতে মোবাইল তুলে দিতে ত্বহার আব্বা মোটেই রাজী ছিলেন না। তার বক্তব্য হলো, মোবাইল নামক এই যন্ত্রটি যে কোনো সময় ছেলে-মেয়েদেরকে বিপদগামী করতে পারে। পারে তাদের জীবনকে ধ্বংস করে দিতে। হ্যাঁ, পিতা-মাতার সাথে প্রয়োজনীয় কথা বলার জন্য তো ফোনের দোকানই আছে।

 কিন্তু ত্বহার আম্মা নাছোড়বান্দা। তিনি ছেলের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়ার স্বপক্ষে বেশ কয়েকটি যুক্তি দাড় করলেন। তার বড় যুক্তি হলো, ছাত্ররা চাইলেই ফোন-ফ্যাক্সের দোকানে গিয়ে ফোন করতে পারে না। কেননা তাদেরকে স্কুলের রুটিন মোতাবেক চলতে হয়। তাছাড়া ক্লাস চলাকালে তো বাইরে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না!

স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে অবশেষে একটি মোবাইল কিনে আনতে বাধ্য হলেন ত্বহার পিতা।

স্কুলে যাওয়ার সময় ত্বহার আম্মা ত্বহার হাতে মোবাইল সেটটি তুলে দিলেন। বললেন। নাও বাবা!  যখনই মন খারাপ লাগবে তখনই সুযোগ করে আমদের সাথে কথা বলবে।  দেখবে, সাথে সাথে তোমার মন ভালো হয়ে গেছে।

ত্বহা মোবাইল ফোন পেয়ে খুব খুশি হলো। মনে মনে বলল, যাক এবার তাহলে নির্ভাবনায় পড়াশুনা করতে পারব!

ত্বহা চলে এল স্কুলে। কাটতে লাগল সময়।

একদিন বিকাল বেলা। ত্বহা তার সহপাঠিদের সঙ্গে হাঁটতে বের হয়েছে। সবুজ দুর্বা ঘাসের উপর বসে তারা শেষ বিকেলের নির্মল হাওয়া উপভোগ করছে। এমন সময় হঠাৎ ত্বহার মোবাইলে রিং বেজে উঠল। ত্বহা মোবাইল রিসিভ করার জন্য পকেটে হাত দেয় এবং ভাবে, নিশ্চয়ই মা কিংবা বাবা ফোন করেছেস। কারণ, তার নম্বর এ দু’জন ছাড়া আর কেউ জানে না।

ত্বহা পকেট থেকে মোবাইল বের করে। চোখের সামনে মোবাইল এনে দেখে, এটা তার বাড়ীর নম্বর নয়, অপরিচিত নম্বর!

খানিক চিন্তা করে ত্বহা। ভাবে, কার হতে পারে এই নম্বরটি? যে রিং করল সে কীভাবে পেল আমার নম্বর? আমি তো কাউকে আমার নম্বর দেইনি ? রিসিভ করব ? নাকি করব না ?

 অপরিচিত নম্বর দেখে ত্বহা যখন এসব কথা ভাবছিল, ঠিক তখনই পাশের এক সহপাঠি বলে ওঠল, আরে! দেরী করছিস্ কেন? রিসিভ করে দেখ্ না কে ফোন করেছে এবং কী বলতে চায়!

ত্বহা রিসিভ করল।

হ্যলো! কে ? কাকে চান ? ত্বহার প্রশ্ন।

আমি মুনালিসা। আপনাকেই চাই। অপরপ্রান্ত থেকে কোমল কন্ঠে একটি মেয়ে উত্তর দিল।

অপ্রত্যাশিত মেয়ে কণ্ঠ শ্রবণে অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল ত্বহা। অবশেষে অল্পক্ষণ চুপ থাকার পর আস্তে করে লাইন কেটে দিল সে।

কিরে ত্বহা ! কে, কী বলল? কিছু না বলে মোবাইল রেখে দিলি যে? বলল ত্বহার এক সহপাঠি।

আর বলিস্ না। কোত্থেকে যেন এক মেয়ে ফোন করেছে! বলে কি আপনাকেই চাই! আমি তাকে চিনিনা, জানিনা, সে আমাকে চাবে কেন বল্তো?

যা বললি তা যদি সত্যি হয় তাহলে তো লাইনটা কেটে দেওয়া ঠিক হয়নি। কথা বলে দেখ্তি সে কী বলে। হয়তো কোনো প্রয়োজনে ফোন করেছিল। বলল, ত্বহার আরেক সহপাঠি।

ঠিক আছে। যদি আবার ফোন করে তাহলে কথা বলে দেখব কী বলে! এখন চল্ হোস্টেলে যাই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল প্রায়।

মাগরিবের নামাজের পর। ত্বহা ক্লাসের পড়া মুখস্থ করছে। এমন সময় মেয়েটি আবার ফোন দিল।

পড়ার সময় ডিস্টার্ব ত্বহার একেবারে অসহ্য। তাই কে রিং দিয়েছে তা না দেখেই মোবাইলটি বন্ধ করে ড্রয়ারে রেখে দিল ত্বহা। সেই সাথে বিরক্তির সুরে বিড়বিড় করে কি যেন বলল।

পড়া শেষ করে ত্বহা মোবাইল অন করল। অন করার মাত্রই আবার এল মেয়েটির ফোন। ত্বহার বুঝতে বাকি রইল না যে, মেয়েটি এতক্ষণ ধরে কল ঢুকানোর চেষ্টা করছে।

বিরক্ত হলেও ত্বহা রাগ সামলে নিয়ে মোবাইল রিসিভ করল।

ত্বহার শান্ত কন্ঠের কৌতুহলী প্রশ্ন কে?

প্রশ্নের জবাব অপর প্রান্ত থেকে পাওয়া গেল না। যা পাওয়া গেল তা হলো মোবাইল রিসিভ করতে এতো দেরী হলো কেন?

ত্বহা মনে মনে বলল – বাবারে কী দাপট ! রিং দিয়ে আমাকে ডিস্টার্ব করছে, আবার উল্টো আমাকে শাসাচ্ছে!! এ যে, “চুরির উপর সীনাজুরী”।

এদিকে ত্বহার কথা বলতে দেরী দেখে মেয়েটি আবার প্রশ্ন করল, কী ব্যাপার? কথা বলছেন না কেন?

আপনি কে? আপনার পরিচয়টা দিলে ভালো হতো। বলল ত্বহা।

মেয়েটি এবার যাদুমাখা কণ্ঠে তার পরিচয় দিল। সেই সাথে এও বলল, আমি আপনার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই, যদি আপনি রাজী থাকেন।

ত্বহা প্রথমে একটু ইতস্ততঃ করল। কিন্তু ক্ষণিক পরেই শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মেয়েটির সাথে বন্ধুত্ব গড়তে রাজী হয়ে গেল।

‘মুনালিসা’ নামটা যেমন শ্রুতিমধুর, কথাও তেমন যাদুময়। তাই তার ফাঁদে আটকাতে খুব বেশি একটা সময় নিল না ত্বহার!

অল্প কয়েকদিনেই ত্বহা মুনালিসার প্রেমের জালে আবদ্ধ হয়ে গেল। ভুলে গেল তার ঢাকায় আসার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। হারিয়ে ফেলল ভালো মন্দ অনুধাবন করার শক্তি!

হায়রে মোবাইল! হায়রে নারী!! এভাবেই কি তোমরা মানুষকে কর বিপদগামী?! 

যাহোক, এরপর থেকে প্রতিদিন প্রায় ৭/৮ বার ত্বহার সঙ্গে মুনালিসার কথা হতে থাকে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের প্রেমও চলতে থাকে অবিরাম গতিতে। এভাবে কেটে যায় কয়েকটি মাস। এক পর্যায়ে ঘনিয়ে আসে এস,এস,সি পরীক্ষা। কিন্তু এখন আর ত্বহার মাথায় পরীক্ষার কোনো চিন্তা নেই! নেই ভালো ফলাফল করার অদম্য আগ্রহও। এখন তার গোটা হৃদয় আচ্ছন্ন করে আছে শুধু একটি নাম মুনালিসা। তার চিন্তা-চেতনায় এখন মুনালিসা ব্যতীত অন্য কিছুর স্থান নেই!!

প্রথম প্রথম মুনালিসাই ত্বহার কাছে ফোন করত। কিন্তু এখন? এখন মুনালিসার ফোনের অপেক্ষা করে না ত্বহা। নিজেই ফোন করে মুনালিসার কাছে। ফলে বাড়ি থেকে খরচের জন্য যে টাকা দেওয়া হয় তার সিংহভাগই খরচ হয়ে যায় মোবাইলের পিছনে। অনেক সময় এমনও হয় যে, ত্বহা নাস্তা খাওয়ার জন্য হোটেলে গেল। এমন সময় মুনালিসা মিসড্কল দিল। তখন ত্বহা নাস্তা না খেয়ে ঐ টাকা মোবাইলে রিচার্জ করে মুনালিসার সঙ্গে কথা বলে। আর এটাকেই সে নাস্তা খাওয়ার চেয়ে বেশি তৃপ্তিদায়ক মনে করে!!

পরীক্ষার আর মাত্র এক মাস বাকি। সকল ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনায় ব্যস্ত। আর ত্বহা ব্যস্ত মোবাইল প্রেমালাপে! পরীক্ষা উপলক্ষ্যে হোস্টেলে গভীর রাত পর্যন্ত ছাত্ররা জেগে পড়ালেখা করে। ত্বহাও তাদের সঙ্গে জেগে থাকে। তবে পড়ার জন্য নয়। রাত বারটার পর মুনালিসার সঙ্গে কথা বলার জন্য!

রাত জেগে কথা বলতে বলতে ত্বহার স¦াস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়। সেই সাথে সে আক্রান্ত হয় কয়েকটি গোপন রোগে। কিন্তু একথা তার কাছের বন্ধুরা ছাড়া আর কেউ জানল না। আসল রহস্য পিতা-মাতা ও শিক্ষকগণসহ অন্যদের কাছে গোপনই রয়ে গেল! তারা ভাবল, ত্বহা পড়াশুনায় একনিষ্ঠ। অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই পড়াশুনা করে সে! তাই অত্যধিক পড়াশুনার চাপে তার স¦াস্থ্য খারাপ হয়ে গেছে। পরীক্ষার পর আবার ঠিক হয়ে যাবে।

আজ এস, এস, সি পরীক্ষা শুরু। ত্বহা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করল। তবে তার এ অংশগ্রহণ মূলত লোকদেখানো নিয়ম পালন ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কেননা পরীক্ষা দিতে হবে, ভালো রিজাল্ট করতে হবে মুনালিসার সাথে সম্পর্ক গাঢ় হওয়ার পর থেকে এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা নিয়ে একদিনও সে পড়তে বসেনি বা বসতে পারেনি! 

ত্বহার যত চিন্তা, তা কেবল মুনালিসাকে নিয়ে। পরীক্ষার প্রতি তার বিন্দুমাত্রও ভ্রুক্ষেপ নেই! অথচ পিতা-মাতা ও শিক্ষকগণ বুকভারা আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে এই ত্বহার দিকে। তাঁদের চেষ্টা, আশা, স্বপ্ন সবই কি তাহলে বিফলে যাবে? ত্বহা কি পারবে তাদের আশা পূরণ করতে ? পারবে কি তাদের মুখে হাসি ফুটাতে? তাদের সুনাম অক্ষুন্ন রাখতে ? কীভাবে পারবে ? ত্বহা তো এখন হাবুডুবু খাচ্ছে মুনালিসার প্রেম সাগরে!!

পরীক্ষা শেষ হলো। কিছুদিন পর প্রকাশিত হলো পরীক্ষার ফলাফল। ফল যা হওয়ার তাই হলো। দেখা গেল, ত্বহার এ প্লাস পাওয়া তো দূরের কথা, সবগুলো বিষয়ে পাসও করতে পারেনি!! আর যেগুলোতে পাস করেছে তাও কোনো রকম টেনেটুনে!!!

প্রিয় পাঠক! দেখলেন তো! মোবাইল ফোনের কারণে মেধাবী ও বুদ্ধিমান ছাত্র ত্বহার পড়াশুনায় কেমন ধস নেমে এলো! কিরূপ অবনতি হলো তার জীবনের!! কিভাবে নষ্ট হলো তার শরীর-স্বাস্থ্য!!! আচ্ছা এর জন্য দায়ী কে ? মোবাইল ফোন ? ত্বহার অভিভাবক ? নাকি ত্বহার লাগামহীন মোবাইল ব্যবহার ?

হ্যাঁ, মোবাইল ফোন ও অভিভাবকের পাশাপাশি লাগামহীন মোবাইল ব্যবহারের কারণেই ত্বহার আজ এই করুণ পরিণতি। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়ী হলেন ত্বহার মা। কেননা তিনি যদি ত্বহার হাতে মোবাইল না তুলে দিতেন তাহলে হয়তো ত্বহার ঘটনা আজ অন্যভাবে লেখা হতো। হয়তোবা পত্র-পত্রিকায় ত্বহার নাম আসত মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া ছাত্র হিসেবে!

কিন্তু আজ? হ্যাঁ আজ আর ত্বহাকে কেউ ভালোবাসে না। না পিতা-মাতা, না শিক্ষকবৃন্দ, না অন্য কেউ!! সকলেই তাকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে। তার দিকে তাকায় একটু বাঁকা নজরে!

আসলে মোবাইলের খারাবি থেকে বাঁচার জন্য মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের যেমন তার অবৈধ ব্যবহারের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, তেমনি অভিভাবকদেরও উচিত ছেলে-মেয়েদের হাতে মোবাইল না দেওয়া কিংবা একান্ত অপারগতায় দিলেও নিশ্চিন্তে বসে না থাকা। বরং তাদের দায়িত্ব হলো, অতি প্রয়োজনে ছেলে-মেয়েদের হাতে মোবাইল দেওয়ার পর তাদের প্রতি খেয়াল রাখা যে, তারা কী করে, কার সাথে কথা বলে এবং মোবাইল ব্যবহারের পর তার মানসিক ও চারিত্রিক কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর হুকুম মেনে মোবাইলের যাবতীয় অবৈধ ব্যবহার থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।

যে গল্পে প্রেরণা যোগায়- ক্ষমা করা হবে তবে একটি শর্তে

প্রাচীনকালের একটি ঘটনা। এক ব্যক্তি কারো বাগানে প্রবেশ করল। সে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ছিল। ক্ষুধায় তার প্রাণ চলে যাবার উপক্রম। সে ক্ষুধা মিটানোর জন্যে গাছের দিকে তাকালো। বাগানে আপেলের গাছ দেখতে পেল।
সুতরাং সে হাত বাড়িয়ে একটি আপেল নিল এবং তার অর্ধেক খেয়ে নিল। এর পর বাগানের পার্শ্বেই এক নদী ছিল তা থেকে পানি পান করে তৃষ্ণা মিটাল; অল্পক্ষইের মধ্যে সে সচেতন হল। কেননা প্রচণ্ড ক্ষুধার তারনাই সে ফল আহারের আগে ভাবতে পারেনি। এখন যখন তার শরীরে শক্তি ফিরে পেল ভাবতে লাগল এবং নিজেকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলঃ তুমি নিপাত যাও! বিনা অনুমতিতে কারো গাছের ফল খাওয়া কি করে বৈধ হতে পারে?
অতঃপর সে শপথ করল যে, যতক্ষণ বাগানের মালিকের সাথে সাক্ষাত করে ক্ষমা না চাইবে ততক্ষণ সে আর বাড়ি ফিরে যাবেনা। সুতরাং সে বাগানের মালিকের খোঁজে বের হয়ে তার বাড়ি পৌঁছল এবং দরজায় আওয়াজ করল। মালিক ঘর থেকে বের হলে সে তার আগমনের উদ্দেশ্য বিস্তারিত ব্যক্ত করল ঃ মূলতঃ আমি খুব ক্ষুধার্ত ছিলাম। এজন্য নদীর তীরে অবস্থিত আপনার বাগান থেকে একটি আপেলের অর্ধেক আপনার অনুমতি ছাড়া খেয়েছি। এর পর আমার মনে পড়ল যে, এই আপেল আমি অনুমতি ছাড়া খেয়েছি যা আমার জন্যে বৈধ নয়।
এজন্যে আমি আপনার কাছে এসেছি যাতে আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিবেন না হয় এর বিনিময় নিয়ে নিন। বাগানের মালিক তার কথায় বিশ্বাস করছিল না যে, দুনিয়াতে এমন পরহেজগার ব্যক্তিও আছে। এর পর হঠাৎ তার একটি বিষয় খেয়াল হল এবং যুবককে বললঃ আমি তোমার ভুল ক্ষমা করতে পারি। আর ক্ষমা করার একটিই পন্থা তা হল তুমি আমার একটি শর্ত পূর্ণ করবে।
যুবক বললঃ কি সেই শর্ত? বলুন; বাগানের মালিক বললঃ আমার শর্ত হল যে, আমার কন্যাকে তোমার বিয়ে করতে হবে।
যুবক কিছুক্ষণ ভাবল এবং মাথা হেলিয়ে একমত প্রকাশ করল। মালিক বললঃ এত খুশী হওয়ার কারণ নেই। আমার কন্যা অন্ধ, বোবা এবং কানে শুনেনা। আমি অনেক কাল থেকে তার জন্য পাত্র খুঁজছিলাম; কিন্তু কোন উপযুক্ত পাত্র পাচ্ছিলাম না। যুবক তা শুনে চিন্তিত হল যে, এই বিপদ থেকে উদ্ধারের কি পথ আছে এবং এ অবস্থায় আমি কি করতে পারি। এর পর সে ভাবল এমন মেয়ের সাথে বিয়ে করে পরীক্ষায় নিপতিত হওয়া অবৈধ পন্থায় ফল খেয়ে জাহান্নামী হওয়ার চেয়ে উত্তম। আর এই দুনিয়ার জীবনতো স¦ল্পকালীন; কিন্তু আখিরাতের জীবন অনন্তকাল। তাই কেন দুনিয়ার কষ্ট বেছে নিবনা। সুতরাং অনিচ্ছা সত্ত্বেও আল্লাহর রেজামন্দি হাসিলের জন্য এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল।
যখন বিয়ে আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হল তখন বাসর রাতে তার চেহারায় অমানিশার অন্ধকার ছেয়ে গেল। সে বার বার ভাবছিল যে, এমন মেয়ে যে কথা বলতে পারেনা, শুনতে পারেনা, এমন বোবা অন্ধের কাছে কি করে যাবে? এই পরিস্থিতিতে তাকদীরের উপর নির্ভর করে রাযী হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে বললঃ “লা-হাওলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লা, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না-ইলাইহি রাজিউন।”

“বাসর রাতে যখন তার স্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের জন্যে নব বধূর কুঠরিতে প্রবশ করল তখন নব বধূ তার অভ্যর্থনার জন্যে দাঁড়িয়ে গেল এবং বললঃ আসসালামুআলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।”
যখন যুবক দেখল যে, তার সামনে এক অতীব সুন্দরী তার সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সঠিক আছে তখন যুবক কিছুক্ষণ থেমে বললঃ ওয়া আলাইকুমুস সালাম”
আমাকে তো বলা হয়েছিল যে, তুমি অন্ধ, বোবা, কানে শুননা।
মেয়েটি বললঃ আমার শ্রদ্ধেয় পিতা আপনাকে যা কিছু বলেছেন তা সবই সত্য ।

যুবক বলল আমাকে এ বিষয়ের মূল বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত কর যা তোমার পিতা আমাকে বলেছিলেন।
সে উত্তর দিলঃ আমার বাবা আমার ব্যাপারে বোবা বলেছেন এ জন্য যে, আমি কখনো শরীয়ত বিরোধী কথা বলিনি আর না আমি কোন পরপুরুষের সাথে কথা বলেছি।
আর আমার বাবা আমার ব্যাপারে বলেছেন যে আমি কানে শুনিনা তা এ জন্য যে, আমি কখনো এমন বৈঠকে বসিনি যেখানে গীবত, চোগলখোরী এবং অর্থহীন কথা-বার্তায় মজলিশের আলোচনার বিষয় হয়।
আমি অন্ধ এর অর্থ হল যে, আমি এমন ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি দেইনি যে আমার জন্য বৈধ নয়।
পাঠক! আপনারা কি জানেন এই যুবক কে ছিলেন? তিনি ছিলেন সাবেত বিন নোমান। আর এই পরহেজগার ব্যক্তির জীবনে যে স্ত্রী মিলেছিল তার বিষয়ে আপনারা জানতে পারলেন যে, সে কেমন পরহেজগার ও ধার্মিক নারী ছিলেন।
আর এই পবিত্র জোড়া থেকে সেই মহৎ ব্যক্তির জম্ম হয়, যিনি দুনিয়ার আকাশের উজ্জল নক্ষত্র যাকে বিশ্ব মুসলিম ইমাম আযম আবু হানীফা নোমান বিন সাবেত (রা.) বলে জানে।

 

 

 

 

“ইভটিজিং ও তার প্রতিকার”

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে ইভটিজিং শব্দটি সর্বাধিক আলোচিত। টিভির পর্দায়, দৈনিক বার্তার পাতায় ও ইন্টারনেটে, ব্লগ কিংবা ফেসবুকে প্রবেশ করলেই এই মহামারির ভয়াল চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। মিডিয়াতে দৃষ্টি দিলেই দেখা যায় ইভটিজিং এর প্রতিবাদ করায় ইভটিজারের হাতে শিক্ষকের মৃত্যু, (যৌন সন্ত্রাসের প্রথম শিকার ছাত্রীর শিক্ষক নাটোরের কলেজ শিক্ষক মিজানুর রহমান) মায়ের মৃত্যু, (যৌন সন্ত্রাসের দ্বিতীয় শিকার মেয়ের মা  গোপাল গঞ্জের চাঁপা রানী) আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যু (যৌন সন্ত্রাসের তৃতীয় শিকার কুরিগ্রামের ছাত্রীর বয়োবৃদ্ধ নানা) এবার যৌন সন্ত্রাসের শিকার দিনাজপুরের ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী শাবনুর। এ অপমান সইতে না পেরে শাবনুর ঘরে ফিরে রাতে ঘরের বর্গার সাথে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। Continue reading “ইভটিজিং ও তার প্রতিকার”

সত্য অবিনাশী

সত্যকে যারাই ধ্বংস করতে এসেছে তারাই ধ্বংস হয়ে গেছে। ইতিহাসে তার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত আছে। সত্যের পথে বাঁধা সৃষ্টি করে কোন শক্তিই টিকে থাকতে পারেনি। সে শক্তি যত বড় প্রতাপশালীই হোক না কে, ফুৎকারে উড়ে গেছে, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অসম্ভব। সত্যের গতি অপ্রতিহত। দুনিয়াতে আজ পর্যন্ত এমন দৃষ্টান্ত নেই যে সত্য নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ইংরেজীতে একটা কথা আছে “Truth Shall Preveil” সত্যজয়ী হবেই। পরাজিত করা যায় না সত্যকে। সত্যের অভিধানে পরাজয়ে কথাটা নেই। সত্যের এই অপরাজেয় রূপ আমরা ইতিহাসে দেখি। সত্যের বাণী চির অম্লান। সত্যকে লক্ষ্য করে যত কটুক্তিই করা হোক না কেন, তাকে কোন মালিন্যই স্পর্শ করতে পারে না। যত আবর্জনাই তার দিকে নিক্ষেপ করা হোক না কেন সবগুলোর নিক্ষেপকারীর দিকে ফিরে আসে। Continue reading সত্য অবিনাশী