ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ মুসলমানদের ঈমান,আকীদা ধ্বংসকারী একটি ভ্রান্ত মতবাদ

১ম পর্ব

 ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের পরিচয়  

আল্লাহ প্রদত্ত ধর্মীয় বিধানকে মানুষের ব্যক্তি জীবনে সীমাবদ্ধ রেখে সমাজ জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে আল্লাহ ও রাসূলের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার নামই ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism)। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ধর্মকে পরিত্যাগ করাই এর লক্ষ্য। ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism) মানব রচিত একটি জীবন দর্শন বা বিধান। এ জীবন দর্শনে বিশ্ব স্রষ্টার বিধান ও আদেশ-নিষেধ প্রত্যাখান করে মানব রচিত জীবনাচার পালন করাই এর উদ্দেশ্য। তবে ব্যক্তি জীবনে কেউ যদি আস্তিক বা আল্লাহতে বিশ্বাসী হয় তাহলে সে তার ব্যক্তি জীবনে ধর্মের কিছু আচার অনুষ্ঠান পালন করতে পারবে। কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্র তৎসম্পর্কিত যাবতীয় বিষয়ে স্রষ্টার আইন বা  ধর্মের কোন সম্পর্ক থাকবে না। এ ক্ষেত্রে সমাজ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে শিক্ষা ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন, রাজনীতি, অর্থনীতি ইত্যাদি যাবতীয় ব্যবস্থাপনা আল্লাহ ও ধর্মের কতৃত্ব মুক্ত বা স্বাধীন রাখার নামই ধর্মনিরপেক্ষতা। অর্থাৎ ব্যক্তি জীবনে কেউ ধর্মের মূলনীতি মানলে মানতেও পারে কিংবা না মানলেও রাষ্ট্রের কিছু করার নেই। তাদের মতে আল্লাহ এ বিশ্বটা শুধু সৃষ্টি করেছেন, বড়জোর তিনি এ জগতের নিয়ম-কানুন রচয়িতা। কিন্তু দুনিয়ার জীবনে উন্নতি, শান্তি ও প্রগতির জন্য আল্লাহ বা রাসূলের কোন প্রয়োজন নেই। সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা গোটা সমাজ জীবনকেই আল্লাহ এবং ধর্মের অনাবশ্যক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখাকে আদর্শ বলে মনে করে। তাদের মতে ধর্ম নিতান্তই একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার। দু’ বা ততোধিক মানুষের সকল প্রকার পারস্পারিক সম্পর্ক নির্ধারণে ধর্মকে অনধিকার প্রবেশ করতে দেয়া চলে না। কেননা সমাজ জীবনে ধর্মের প্রভাব সম্পূর্ণ প্রগতি বিরোধী এবং প্রতিক্রিয়াশীলতার পরিচায়ক। আর রাষ্ট্রের মূলনীতির ক্ষেত্রে স্রষ্টার নির্দেশ থাকলেও অবস্থা ও পরিবেশ পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তা মানা সম্ভব নয়। ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের এ ধারনার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। এখানে প্রশ্ন হলো, কোন দলিলের ভিত্তিতে তারা আল্লাহর ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত এলাকায় সীমাবদ্ধ করেন ?   আল্লাহ কি কোথাও এ বিষয় কোন ইংগিত দিয়েছেন? কোন নবীর কাছে এ বিষয় কোন ওহী নাযিল হয়েছে কি? বরং আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, তবে কি তারা আল্লাহর দীন ব্যতীত অন্য কিছু কামনা করে? অথচ আকাশ ও পৃথিবীর সবকিছু ইচ্ছা বা অনিচ্ছাক্রমে সবাই তাঁর হুকুমের আনুগত্য করছে এবং তাঁরই দিকে ফিরে যেতে হবে। (সূরা: ইমরান-৮৩)। অর্থাৎ সমগ্র বিশ্ব-জাহান ও  বিশ্ব-জাহানের মধ্যে যা কিছু আছে সবার দীন ও জীবন বিধানই হচ্ছে এ ইসলাম। এখন এ বিশ্ব-জাহানের মধ্যে অবস্থান করে তোমরা ইসলাম ছাড়া আর কোন জীবন বিধানের অনুসন্ধান করছো? এর পরেও যদি কেউ অন্য কিছু গ্রহণ করে তাহলে সে পথ ভ্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহ পাক বলেন, অতএব সত্যের পর ভ্রষ্টতা ছাড়া আর কি রইলো? (সত্যকে ছেড়ে) কোথায় ফিরে যাচ্ছ? (সূরা: ইউনুছ-৩২)। এ আয়াত থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, এমন কিছু বিভ্রান্তকারী ব্যক্তি বা দল আছে যারা লোকদেরকে সঠিক ইসলামের পথ থেকে টেনে নিয়ে ভুল পথের দিকে ফিরিযে দেয়। আল্লাহ যদি নিজে তাঁর আনুগত্যের দাবীকে মানুষের ব্যক্তি জীবনে সীমাবদ্ধ করে না থাকেন তাহলে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের নির্দেশেই যদি আল্লাহর হুকুমকে মানুষের  পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে উচ্ছেদ করা হয় তাহলে এটা কি কুফরী নয়? কোন মুসলমানের পক্ষে এধরনের নীতিমালা গ্রহণ করা কি বৈধ হতে পারে? কুরআনের ঘোষণা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) কোন বিষয় নির্দেশ দিলে কোন মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর সে বিষয়ে (ভিন্ন) কোন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)-কে অমান্য করলে সে তো স্পষ্টই পথভ্রষ্ট হবে।(সূরা: আহযাব-৩৬)। আর যে কেউ আল্লা

রমযান মাস কুরআনের মাস

বিশ্বমানবতার মুক্তির জন্য রাব্বুল আলামীনের অফুরন্ত নিয়ামতের অন্যতম নিয়ামত হলো পবিত্র মাহে রমযান। জাহিলিয়াতের পর্দা উন্মোচন করে পথহারা মানুষের পথের সন্ধান দিতে মুক্তির দিশারী আল-কুরআন অবতীর্ণের মাস এ রমযান। এটা এমন একটি মহিমান্বিত মাস, যে মাসে জান্নাতের সব দরজা বান্দার জন্য খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের সব দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। শয়তানকে শিকল দ্বারা আবদ্ধ করা হয়, আল্লাহর পক্ষ থেকে সৎপথে চলমানদের অগ্রসর হতে ও অসৎ পথে চলমানদেরকে থেমে যেতে বলা হয়, রহমতের ফেরেশতাতের অবতরণ, রহমত-মাগফিরাত ও নাযাতের বাণী নিয়ে যার আগমন, যার প্রতিদান আল্লাহ কর্তৃক নিজ হাতে প্রদান, রাইয়ান নামক জান্নাতের নির্দিষ্ট দরজা রোযাদারের জন্য নির্ধারণ, রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকে আম্বরের চেয়েও সুঘ্রাণ হওয়া, ১৭রমযানে বদর প্রান্তরে বাতিলের বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রথম সামরিক বিজয়, মক্কা বিজয়, লাইলাতুল ক্বদরের মতো বরকতময় রজনীসহ অসংখ্য ফযীলত যে মাসে অন্তর্ভূক্ত তার অন্যতম কারণ হলো মহাগ্রন্থ আল কুরআনুল কারীম।
আল-কুরআনের পরিচয় : কুরআন শব্দের শাব্দিক অর্থ: পাঠ, পঠন, আবৃত্তি, সংযুক্ত হওয়া বা অধিক পঠিত বিষয়, কুরআনের প্রত্যেকটি আয়াত একটির সাথে অন্যটি সংযুক্ত হওয়া ও কুরআন অধিক পরিমাণে পঠিত হওয়ায় একে কুরআনরূপে নামকরণ করা হয়েছে। পরিভাষায় কুরআন এমন একটি কিতাব যা আল্লাহর কাছ থেকে জিবরাঈল (আঃ)-এর মাধ্যমে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে, যা সহিফাসমূহে লিপিবদ্ধ, ধারাবাহিকভাবে আমাদের কাছে বর্ণিত হওয়ায় যার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই এবং যা বর্তমান প্রসিদ্ধ মুসহাফের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। এটা এমন একটি কিতাব যার নির্ভুলতার ব্যাপারে রাব্বুল আলামীন গ্যারান্টি দিয়েছেন, মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন : উহা এমন কিতাব যার মধ্যে কোনরূপ সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ নেই। (সূরা বাকারা: ২)
রমযানের পরিচয় : রমযান শব্দের শাব্দিক অর্থ : দগ্ধ হওয়া, পুড়ে যাওয়া, উত্তপ্ত হওয়া, ছারখার করা, সুতরাং কোন কিছুকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করাকে রমযান বলে। আরবী মাসসমূহের সরদার ও অধিকতর মর্যাদাপূর্ণ মাস হলো রমযান, অতীব মহিমান্বিত ও তাৎপর্যমণ্ডিত একটি মাস। পরিভাষায় : আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য ফরয রোযা পালনের মাধ্যমে নফসে আম্মারাকে (কুমন্ত্রণাদাতা প্রবৃত্তি) দমন ও গোনাহসমূহকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেয়াকে রমযান বলে।
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন নাযিলের কারণ : রাব্বুল আলামীন মানুষকে সৃষ্টি করে দুনিয়ায় পাঠানোর সময় তাদেরকে হিদায়াত দানের ওয়াদা দিয়েছিলেন তার বাস্তব প্রয়োগ নবী-রাসূলদের  প্রেরণ ও তাঁদের ওপর আসমানী কিতাব অবর্তীণকরণ। কুরআনুল কারীম সব আসমানী কিতাবের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ট আসমানী কিতাব। কুরআন অবর্তীণের অনেক কারণ আছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো : এ কুরআন বিশ্বমানবের জন্য পথ প্রদর্শক এবং সু-পথের উজ্জ্বল নিদর্শন এবং হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেয়ার জন্য। (সূরা বাকারা: ১৮৫) এ কুরআন মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত স্বরূপ, সুতরাং তাদেরকে হিদায়াতের পথে পরিচালনা করার জন্য কুরআনের অবতরণ। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন : উহা এমন কিতাব যার মধ্যে কোনরূপ সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত স্বরূপ। (সূরা বাকারা: ২) এ কুরআন অবর্তীণ হয়েছে মানুষকে উপদেশ, অন্তরের ব্যাধি দূর করা ও মুমিনদের হিদায়াত ও রহমত স্বরূপ। শাশ্বত আল-কুরআনের বাণী : হে মানুষ! তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে এসেছে উপদেশ ও তোমাদের অন্তরে যা আছে তার আরোগ্য এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত। (সূরা ইউনুস: ৫৭) কুরআন অবতীর্ণের অন্যতম কারণ বিশ্ববাসীকে সতর্ক করা। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন : কত মহান তিনি যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরকান (কুরআন) অবতীর্ণ করেছেন যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে। (সূরা ফুরকান: ১)
রমযান আগমনের কারণ : মানুষের সব গোনাহ মাফ করে তাদের নিষ্পাপ করার জন্য রমযানের আগমন। যেমন: আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি ঈমান ও সতর্কতার সাথে সওয়াবের নিয়তে রমযানের রোযা রাখবে আল্লাহ তায়ালা তার জীবনের সব গোনাহ মাফ করে দেবেন। (বুখারী) অন্যত্র আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি ঈমান ও সতর্কতার সাথে সওয়াবের নিয়তে রমযানের রাতে দাঁড়িয়ে ইবাদাত করবে, আল্লাহ তায়ালা তার জীবনের সব গোনাহ মাফ করে দেবেন। (মুসলিম)
কুরআনের সাথে রমযানের সম্পর্ক : কুরআনের আলোচ্য বিষয় হলো মানুষ, সুতরাং মানুষের জীবনের সার্বিক দিকনির্দেশনাও কুরআনের মধ্যে অবস্থিত। আর এ সবের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আল্লাহমুখী করা, মানুষের মাঝে আল্লাহভীতি তৈরী করা। আর রমযানেরও উদ্দেশ্য মানুষকে মুত্তাকী হিসেবে তৈরী করা। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের বাণী : হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোযাকে ফরয করা হয়েছে যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপরও ফরয করা হয়েছিল, যাতে করে তোমরা আল্লাহভীতি অর্জন করতে পার। (সূরা বাকারা: ১৮৩) বস্তুত রমযান এমন একটি মাস যে মাসে অবতীর্ণ হয়েছে মহাগ্রন্থ আল কুরআন। এ সম্পর্কে রাব্বুল আলামীনের বাণী : রমযান মাস এমন মাস যে মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত ও সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী স্বরূপ। (সূরা বাকারা: ১৮৫) এ মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিবরাঈল (আঃ)-এর সাথে সমগ্র কুরআন অধ্যয়ন করতেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সবচাইতে দানবীর, তাঁর এ দান রমযান মাসে আরো বেশী বেড়ে যেত তখন জিবরাঈল (আঃ) তার সাথে সাক্ষাৎ করতেন, আর তিনি রমযানের প্রতি রাতে তার সাথে সাক্ষাৎ করে তারা উভয়ে কুরআন অধ্যয়ন করতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন প্রবাহমান ঝঙার চাইতেও বেশী কল্যাণময়। (বুখারী) অন্যত্র আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : রোযা ও কুরআন উভয়েই বান্দার জন্য সুপারিশ করবে, রোযা বলবে: হে আমার রব! আমি তাকে পানাহার ও কামনা-বাসনা থেকে দিনের বেলা বিরত রেখেছি, সুতরাং তার ক্ষেত্রে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আর কুরআন বলবে: হে আমার রব! আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, সুতরাং তার ক্ষেত্রে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। এরপর তাদের উভয়েরই সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। (মুসতাদরাক হাকেম) রমযানের সাথে কুরআনের এ মধুর সম্পর্কের কারণে মাসজিদুল হারাম ও মাসজিদে নববীসহ সব স্থানে কুরআনের চর্চা লক্ষ্য করা যায়। অসংখ্য নিরক্ষর ব্যক্তিও এ মাসে কুরআনের তা’লীম গ্রহণ করে সৌভাগ্যশালীদের কাতারে শামিল হয়।
সলফে সালেহীনদের জীবনে রমযান ও কুরআন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবা, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ীগণসহ সব সলফে সালেহীনদের জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা জানতে পারি যে, তাঁরা সবাই পবিত্র রমযানকে নেয়ামতের মাস হিসেবে গ্রহণ করে তা থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য সদা তৎপর থাকতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাগণ রমযান মাস আগমনের আগে থেকেই তা পাওয়ার জন্য পেরেশান হতেন, এজন্য হাদীসে তাঁদের দোআ উল্লেখিত হয়েছে : হযরত আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রজব মাস এলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন : হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে রজব, শাবান ও রমযান মাসে বরকত দান করুন। অন্য রেওয়ায়াতে আছে : হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং রমযানকে আমাদের মাঝে পৌছে দিন।
কুরআন কেন্দ্রিক রমযানে আমাদের বর্তমান অবস্থা : আল্লাহর অফুরন্ত নেয়ামতের মাস রমযানে কুরআন কেন্দ্রিক আমাদের বাস্তব অবস্থা সলফে সালেহীনদের বাস্তব অবস্থার চাইতে ভিন্ন ধরনের। অনেকেই রমযানকে একটি উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, অনেকে আবার রাত-দিন তিলায়াতের মাধ্যমে এ সময় কয়েকবার কুরআন খতম করেন। মসজিদে মসজিদে চলে খতমে কুরআনের প্রতিযোগিতা ও খতমে তারাবীর আয়োজন। কিন্তু অধিকাংশ মুসলমান কুরআনের মর্ম জানা এমনকি তার তরজমা উপলদ্ধি করতেও কার্পণ্য করেন বা প্রয়োজনই অনুভব করেন না। রমযান উপলক্ষে চলে যত কুরআনের ওপর ঘষা-মাজার কাজ, রমযান শেষে কুরআনকে করা হয় সযত্নে গিলাফবন্দী। আমাদের অনেকের বাস্তব জীবনে পড়ে না কুরআনের মহান শিক্ষার কোন আলামত, যার কারণে রমযানের প্রথমদিকে আমাদের মসজিদগুলোতে তিলধারণের ঠাই না থাকলেও পরবর্তী দিনগুলোতে তাতে ভাটা পড়তে শুরু করে।
রমযানে কুরআন কেন্দ্রিক আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য : রমযানের এ পবিত্র মাসে মুসলমান হিসেবে আমাদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো আল কুরআন পড়া, কুরআন বোঝা এবং কুরআন অনুযায়ী জীবন গড়া। বিশেষ করে যারা কুরআন পড়তে জানেন না তাদেরকে এ মাসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কুরআন পড়া শিখে তা বাস্তবায়নে তৎপর হওয়ার। এ মাসে তুলনামূলকভাবে কম ব্যস্ততা ও অন্তর কোমল থাকায় স্মরণশক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় কুরআন মুখস্থ করার উপযুক্ত সময়, রাত্রিকালীন সালাতের মধ্যে কুরআন বেশী করে তিলাওয়াত করা প্রয়োজন। রমযান মাস কুরআনের তাফসীর জানার উপযুক্ত সময়, অধিকাংশ মুসলমান এমন আছেন যারা সমগ্র কুরআনের তাফসীর এমনকি তরজমাও একবার পড়েননি। সুতরাং এসব মুসলমান ভাইবোনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, এ মাসে কুরআনের তাফসীর অথবা কমপক্ষে তরজমা একবার পড়বো, কেননা রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : তবে কি তারা কুরআন অনুধাবন করে না ? এটা যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছ থেকে আসত তবে তারা অনেক অসংগতি পেত। (সূরা নিসা: ৮২) অন্যত্র তিনি বলেন : তবে কি তারা কুরআন সম্বন্ধে অভিনিবেশ সহকারে চিন্তা করে না ? না তাদের অন্তর তালাবদ্ধ ? (সূরা মুহাম্মদ: ২৪) বাস্তবেই রমযান আমাদের আত্মশুদ্ধি ও উৎকর্ষ সাধনের এক বাস্তব হাতিয়ার। এ মাসে যদি আমরা সঠিকভাবে ট্রেনিং নিতে পারি তাহলে সে পুঁজিই আমাদের সারাটি বছর সত্যের পথে পরিচালিত করবে। রমযানের সঠিক শিক্ষা বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন আমাদের আচরণ মার্জিত হবে অন্যদিকে বিশ্ববাসীও তা থেকে উপকৃত হতে পারবে। আর এজন্য আমাদের সর্বদা বিশেষ করে এ মাসে কুরআনের সাথে কাঙিক্ষত সুসম্পর্ক রাখতে হবে, তা হলে কুরআনের হক্ব আদায় করা কিছুটা হলেও সম্ভব হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন

হাজার মাইলের ঝটিকা সফর

শায়খুল হাদীস মাওলানা নূরউদ্দীন গহরপুরী রহ. এর স্মারকগ্রন্থের কাজে সিলেটের পথে-প্রান্তরে প্রায় হাজার মাইলের সফর করে এলাম। সফরটা দারুণ উপভোগ্য হয়েছে। জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার থানার সীমান্তঘেরা পাহাড়ী অঞ্চল ঘুরতে দারুণ লেগেছে। গহরপুরী হুজুরের সাহেবজাদা মাওলানা মুসলেহউদ্দীন রাজু ভাইয়ের সুন্দর প্রাইভেট কারটি আমাদের জন্য বরাদ্দ ছিল। এজন্য সফরের কোনো ক্লান্তি অনুভূত হয়নি। চারদিনের সফরের প্রায় পুরোটাতেই রাজু ভাই আমাদের সাথে ছিলেন।
সিলেটের মাটি ও মানুষের সাথে ইসলামের একটা গভীর ও নিবিড় সম্পক বিদ্যমান। দীনের প্রতি তাদের দরদ ও আবেগ দেখে আমরা অভিভূত হয়েছি। তবে একটি জিনিস আমাদের কাছে খুবই খারাপ লেগেছে। সেখানে আলেম-ওলামা এবং মাদরাসার কোনো কমতি নেই। কিন্তু তাদের পারস্পরিক বিভেদ ও হিংসাত্মক মনোভাবটা একটু বেশি। অনেকগুলো দল-উপদল ও গ্রুপ রয়েছে সিলেটে। প্রতেক্যেই নিজেদের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মরিয়া। পারস্পরিক এই বিদ্বেষমূলক আচরণের কারণে তাদের শক্তিটা সুসংহত ও কাযকর হচ্ছে না। এটা একটা দুরভাগ্যজনক ট্রাজেডী। মুসলমানদের পতনের মূল কারণ এটাই।
সিলেট বাংলাদেশের ইসলামের জন্য সম্ভাবনাময় একটি অঞ্চল। এ অঞ্চলের মানুষের ইসলামের প্রতি যে আবেগ ও দরদ রয়েছে এবং তাদের সামথ্যের পরিধি যত বিস্তৃত তা অন্য কোথাও দেখা যায় না। সিলেটের মাটিতে ইসলামের বাম্পার ফলন না হওয়ার পেছনে দায়ী সেখানকার আলেমসমাজ। তাই এ ব্যাপারে আলেমদেরকে সচেতন ও সজাগ হতে হবে।