বদর যুদ্ধ: সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী এক স্মরণীয় ইতিহাস

আরব দেশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধকার যুগ। আল্লাহ পাকের মনোনীত ও প্রেরিত মহাসত্য প্রকাশ পাওয়ার পর মক্কার মুষ্টিমেয় মুসলমানদের উপর নেমে আসলো যুল্ম, নির্যাতন ও লাঞ্ছনার চরম পরীক্ষা। রহমতের নবী অসাধারণ ধৈর্য ও ত্যাগ- তিতিক্ষার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে ইসলামের শাশ্বত নূরের বাণী প্রচারে অগ্রসর হলেন। একদিকে নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকলো। অন্য দিকে সত্যের গতিও হলো অপ্রতিরুদ্ধ। যুল্ম নির্যাতন এতটাই বৃদ্ধি পেল যে, শেষ পর্যন্ত তিনি আল্লাহর হুকুমে মদীনায় হিজরত করতে বাধ্য হলেন। কুরাইশরা এতেও ক্ষান্ত হলো না। তারা ভাবলো ইসলামের শক্তি সঞ্চয় প্রকৃতপক্ষে তাদের জাহেলী ব্যবস্থারই মৃত্যু ঘটার শামিল। অপর দিকে মক্কাবাসীদের জীবিকার একটি বড়ো উপায় ছিল ইয়েমেন ও সিরিয়ায় বাণিজ্য। আর যাতায়াতের পথছিলো মদীনার উপর দিয়ে। সুতরাং মদীনায় মুসলমানদের শক্তি অর্জনের অর্থ ছিলো তাদের চিন্তার কারণ। একদিকে বাণিজ্য পথের নিরাপত্তা অপর দিকে মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে যেভাবেই হোক, চিরতরে মিটিয়ে ফেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো। বাণিজ্য কাফেলা রক্ষার অজুহাত খাড়া করে মুসলমানদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করল। হিজরতের পর দু’বছরও অতিক্রান্ত হয়নি। সহায় সম্বল সব হারিয়ে মুহাজিরগণ রিক্তহস্ত। আনসারগণ যুদ্ধ বিদ্যায় তেমন পারদর্শী নয়। অন্যদিকে ইহুদী গোত্র বিরোধিতার জন্য প্রস্তুত। খোদ মদীনায় মুনাফিক ও মুশরিকদের উপস্থিতি আভ্যন্তরীণ বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনি অবস্থায় কুরাইশরা যদি মদীনা আক্রমণ করে, তাহলে মুসলমানদের এই মুষ্টিমেয় দলটি হয়তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে। আর যদি হামলা না-ও করে বরং আপন শক্তিবলে শুধু কাফেলাকে মুক্ত করে নিয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে শত্রুরা মাথা তুলে দাঁড়াবে। ফলে মুসলমানদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়বে। এই চরম সংকট কালে আল্লাহর পক্ষ থেকে হুকুম আসলো “ যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো তাদেরকে যারা আক্রান্ত হয়েছে; কারণ, তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে; আল্লাহ নিশ্চয় তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম”। ( সূরা হাজ্জ – ৩৯)। এসব কারণেই রাসূল (সাঃ) সিদ্ধান্ত নিলেন যতটুকু শক্তি আছে, তা নিয়েই ময়দানে টিকে থাকার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

[sb]যুদ্ধের সূত্রপাত [/sb]
দ্বিতীয় হিজরীর শা’বান মাস (ঈসায়ী ৬২৩ সালের ফেব্রুয়ারী বা মার্চ মাস) কুরাইশদের এক বিরাট কাফেলা সিরিয়া থেকে মক্কার পথে প্রত্যাবর্তনকালে মুসলিম অধিকৃত এলাকার কাছাকাছি এসে পৌঁছালো। কাফেলাটির সঙ্গে প্রায় ৫০ হাজার আশরাফী মূল্যের সামগ্রী এবং ৩০/৪০ জনের মত রক্ষী ছিলো। তাদের ভয় ছিলো, মদীনার নিকটে পৌঁছলে মুসলমানগণ হয়ত তাদের ওপর হামলা করতে পারে। কাফেলার নেতা ছিলো আবু সুফিয়ান। সে এই বিপদাশংকা উপলব্ধি করেই এক ব্যক্তিকে সাহায্যের জন্যে মক্কায় পাঠিয়ে দিলো। লোকটি মক্কায় পৌঁছেই আরবের প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী উটের কান কেটে ফেললো, তার নাক চিরে দিল, উটের পিঠের আসন উল্টে দিলো, নিজের জামা সামনের দিকে ও পিছনের দিকে ছিঁড়ে এই বলে চিৎকার করতে থাকলো ঃ ‘হে কুরাইশগণ ! তোমাদের বাণিজ্য কাফেলার খবর শুনো। আবু সুফিয়ানের সাথে তোমাদের যে সম্পদ রয়েছে, মুহাম্মাদ তার সঙ্গীসাথীদের নিয়ে তার পিছনে ধাওয়া করেছে। তোমাদের তা পাবার আশা নেই। সাহায্যের জন্য দৌড়ে চলো।’ কাফেলার সঙ্গে যে সম্পদ ছিলো, তার সাথে বহু লোকের স্বার্থ জড়িত ছিলো। ফলে এই সাহায্যের ডাকে সাড়া দিয়ে কুরাইশদের সমস্ত বড় বড় নেতাগণ যুদ্ধের জন্যে তৈরী হলো। এভাবে প্রায় এক হাজার যোদ্ধা রণসাজে সজ্জিত হয়ে পূর্ণ আড়ম্বর ও জাঁক-জমকের সাথে যুদ্ধ ক্ষেত্রে রওনা হলো। এদের হৃদয়ে একমাত্র সংকল্প মুসলমানদের অস্তিত্ব এবার নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হবে, যেনো নিত্যকার এই ঝঞ্ঝাট চিরতরে মিটে যায়। বস্তুতঃ একদিকে তাদের ধন-মাল রক্ষার আগ্রহ অন্যদিকে পুরনো দুশমনী ও বিদ্বেষের তাড়না- এই দ্বিবিধ ক্রোধ ও উম্মাদনার সঙ্গে কুরাইশ বাহিনী মদীনা আক্রমণের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো।

[sb]মুসলমানদের প্রস্তুতি[/sb]
কুরাইশদের এই সিদ্ধান্তের পর রাসূল (সাঃ) মুহাজির ও আনসারগণকে একত্রিত করে তাদের সামনে বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে বললেন, “একদিকে মদীনার উত্তর প্রান্তে রয়েছে ব্যবসায়ী কাফেলা আর দক্ষিণ দিক থেকে আসছে কুরাইশদের সৈন্য-সামন্ত। আল্লাহ্ ওয়াদা করেছেন যে, এর যে কোনো একটি তোমরা লাভ করবে। বলো, এর কোন্টির মুকাবিলা করতে চাও?” জবাবে বহু সাহাবী কাফেলার ওপর আক্রমণ চালানোর আগ্রহ প্রকাশ করলেন। কিন্তু রাসূল (সাঃ)-এর দৃষ্টি ছিল সুদূরপ্রসারী। তাই তিনি তাঁর প্রশ্নটি পূণরাবৃত্তি করলেন। এরপর মুহাজিরদের ভেতর থেকে মিকদাদ বিন আমর (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনাকে যে দিকে আদেশ করেছেন, সেদিকেই চলুন। আমর আপনার সাথে আছি। আমরা বনী ইসরাঈলের মতো বলতে চাই না-যাও, তুমি এবং তোমার আল্লাহ গিয়ে লড়াই করো, আমরা এখানে বসে থাকবো।”
অপর দিকে এ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আনসারদেরও মতামত গ্রহণের প্রয়োজন ছিলো। এজন্যে নবী (সাঃ) উল্লিখিত প্রশ্নটি পূণরাবৃত্তি করলেন। সা’দ বিন মায়াজ (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেনঃ “ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আপনার ওপর ঈমান এনেছি। আপনাকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি এবং আপনি যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা সবই সত্য বলে সাক্ষ্য দিয়েছি। সর্বোপরি আমরা আপনার আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছি। কাজেই হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা কাজে পরিণত করে ফেলুন। সেই সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, আপনি যদি আমাদের নিয়ে সমুদ্রে ঝাঁপ দেন তাহলে আমরা আপনার সাথে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়বো। আমাদের একজনও পিছনে পড়ে থাকবে না। আমরা যুদ্ধে অবিচল ও দৃঢ়পদ থাকবো। কাজেই আল্লাহ খুব শিগ্গীরই আমাদের দ্বারা আপনাকে এমন জিনিস দেখাবেন, যা দেখে আপনার চক্ষু শীতল হয়ে যাবে। অতএব, আল্লাহর রহমত ও বরকতের ওপর ভরসা করে আপনি আমাদের নিয়ে এগিয়ে চলুন।” এই আলোচনা ও বক্তৃতার পর সিদ্ধান্ত হলো, বাণিজ্য কাফেলার পরিবর্তে সৈন্যদলেরই মুকাবিলা করা হবে।

[sb]উভয় বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ও রণ সম্ভার[/sb]
বাণিজ্য কাফেলার পরিবর্তে সৈন্যদলেরই মুকাবিলা করা হবে, এটা কোন মামুলী সিদ্ধান্ত ছিলো না। কারণ কুরাইশদের তুলনায় মুসলমানদের অবস্থা ছিল নেহায়েত দুর্বল। এ সংক্ষিপ্ত সময়ে যারা (মুসলমানরা) যুদ্ধ করতে এগিয়ে এলেন, তাদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন। এদের মধ্যে মাত্র দু’তিন জনের কাছে ঘোড়া ছিল। আর বাকী লোকদের জন্য ৭০ টির বেশী উট ছিলোনা। রণ সম্ভারও ছিল একে বারেই অপ্রতুল। মাত্র ৬০ জনের কাছে ছিল বর্ম।
অপর দিকে কুরাইশরা আবু জাহলের নেতৃত্বে এক হাজার সৈন্য নিয়ে রওনা হলো। এ বাহিনীতে ১০০ টি ঘোড়া, ৬০০ টি বর্ম এবং প্রত্যেকেরই তরবারী ছিল। উট সংখ্যায় এতবেশী ছিল যে, প্রতিদিন তারা ৯ বা ১০ টি করে উট জবেহ করে খেত। সৈন্যরা প্রত্যেকেই যোদ্ধা ও যুদ্ধে পারদর্শী ছিল। সারী গায়িকা বাঁদীদল তাদের বাদ্যযন্ত্রসহ ছিল। তদুপরী সুরাকারূপী ইবলীসকে সঙ্গে নিল। এসব কারণেই কতিপয় মুমিনদের মনে ভীতির সঞ্চার হলো। যা সূরা আনফালের (৫-৮) আয়াতে আল্লাহ পাক উল্লেখ করেছেন।

[sb]উভয় বাহিনী বদর প্রান্তরে [/sb]
যুদ্ধ-সম্ভার ও রসদ-পত্রের এই দৈন্য সত্ত্বেও দ্বিতীয় হিজরীর ১২ই রমযান নবী করীম (সাঃ) আল্লাহর ওপর ভরসা করে মুষ্টিমেয় মুসলিম সৈন্য নিয়ে মদীনা থেকে যাত্রা করেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ) কে মসজিদে নববীর ইমাম এবং আবু লুবাবা (রাঃ) কে মদীনার প্রশাসনিক আমীর নিযুক্ত করলেন। নবী করীম (সাঃ) মুসলিম বাহিনীকে দু’ভাগ করলেনঃ আনসার ও মুহাজির। মুহাজির দলের পতাকা দিলেন আলী (রাঃ) কে। আনসার দলের পতাকা দিলেন সা’দ বিন মু’আয (রাঃ) কে। ডানে, বামে এবং পশ্চাৎ ভাগেও দলপতি নিযুক্ত করলেন। আর তিনি নিজে মুজাহিদ বাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন। ১৬ই রমাযান রাসূল (সাঃ) বদর প্রান্তরে পৌঁছে একটি জায়গায় শিবির স্থাপন করলেন।
অপর দিকে যুদ্ধক্ষেত্রের যে অংশটি কুরাইশরা দখল করল, উপযোগিতার দিক দিয়ে তা ছিলো খুবই উত্তম। তাদের জমিন ছিলো অত্যন্ত মজবুত। আশেপাশে পানির ভাল ব্যবস্থা ছিল। সা’দ বিন মু’আয (রাঃ)-এর পরামর্শ অনুযায়ী রাসূল (সাঃ)-এর জন্য, যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তর-পূর্বে একটি টিলার উপর মঞ্চ (আরীশ) তৈরী করা হলো এবং সা’দ বিন মু’আয (রাঃ)-এর নেতৃত্বেই একটি বাহিনী রাখা হল।
[sb]যুদ্ধ শুরু[/sb]
দ্বিতীয় হিজরীর[sb] ১৭ই রমযান[/sb], শুক্রবার রাত। ঐ রাতে বৃষ্টি হল। মুসলিম বাহিনী রাতে ঘুমে বিভোর। আর রাসূল (সঃ) সারারাত নামাজ পড়লেন। শুক্রবার সকাল বেলা যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহর অভয় বাণী আসলোঃ “তোমরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ো না এবং চিন্তিতও হয়ো না! তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমাদের অন্তরে ঈমানের তেজ থাকে।”(আল-ইমরান ১৩৯)। আল্লাহ পাক আরো বললেনঃ “ আল্লাহর ইচ্ছা এটা যে, তিনি নিজ নির্দেশ দ্বারা সত্যকে সত্যরূপে প্রকাশ করবেন এবং কাফিরদের মূল কেটে ফেলবেন।” (আনফাল ৭ শেষাংশ)। অন্যদিকে আবু জাহল ফয়সালার দু’আ করলঃ ‘হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে দলটি তোমার নিকট প্রিয় ঐ দলটিকে সাহায্য কর।’ উত্তরে আল্লাহ জানালেনঃ “তোমরা যে ফয়সালা চেয়েছিলে তা তো তোমাদের নিকট এসেছে। তোমারা যদি (কুফরী থেকে) বিরত হও তবে সেটা হবে তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। আর যদি তোমারা পূনরায় (সীমা লংঘন) কর, তবে আমিও পূনরায় তোমাদের শাস্তি দিবো। আর তোমাদের দল সংখ্যায় অধিক হলেও তোমাদের কোন কাজে আসবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ মুমিনদের সাথে রয়েছেন।” (আনফাল ১৯)।
প্রাচীন আরব প্রথানুযায়ী প্রথমে মল্লযুদ্ধ শুরু হল। হামযা (রাঃ)-শাইবার বিরুদ্ধে; আলী (রাঃ)- ওয়ালীদ বিন উতবার এবং উবাইদা বিন হারিস- উতবার বিরুদ্ধে। মল্লযুদ্ধে কুরাইশরা পরাজিত হওয়ার পরেই উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ শুরু হল। এ সময় রাসূল (সাঃ) দু’আ করতে থাকলেনঃ “হে আল্লাহ! তোমার এ ক্ষুদ্র দলটি যদি আজ শেষ হয়ে যায়, তবে তোমার ইবাদত করার মত কেউ থাকবে না।” “এ সময় আল্লাহ ফেরেশতাদের বললেনঃ আমি তোমাদের সাথে আছি। সুতরাং তোমারা মুমিনদের অবিচল রাখো, আমি এখনই কাফেরদের মনে আতংক সৃষ্টি করে দিব। কাজেই তোমারা তাদের গর্দানসমূহের উপর আঘাত কর এবং তাদের আঙ্গুল সমূহের প্রত্যেক জোড়ায় আঘাত কর।”(আনফাল ১২)। “এ সময় আল্লাহ পাক আরও বললেনঃ আমি তোমাদেরকে এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা সাহায্য করবো, যারা একের পর এক আসবে।”(আনফাল ৯ শেষাংশ )। তখন নবী (সাঃ) একমুষ্টি পাথুরে মাটি নিয়ে শা-হাতিল উজূহ্ বলে কাফেরদের দিকে নিক্ষেপ করলেন। এরপরই মুসলমান সেনারা এক যোগে কাফিরদের উপর ঝঁপিয়ে পড়লেন। আর অল্পক্ষণের মধ্যেই কাফেরদের বড় বড় নেতারা নিহত হতে লাগল। আবু জাহলের মৃত্যুর সাথে সাথেই কুরাইশ সেনাদল ছত্র-ভঙ্গ হয়ে পালাতে লাগলো। মুজাহিদগণ দ্বিগুণ শক্তিতে বলিয়ান হয়ে কুরাইশ সৈন্যদের ধাওয়া করে, ৭০ জনকে নিহত এবং ৭০ জনকে বন্দী করলেন। মুসলিমগণ ইচ্ছা করলে এ সুযোগে আরো বহু সৈন্যকে নিহত করতে পারতেন। কিন্তু প্রেম ও করূণার মূর্ত প্রতীক মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর অন্তর হতভাগ্য মানুষের বেদনায় কেঁদে ফিরছিলো। তৎক্ষণাৎ তিনি আদেশ দিলেন; ওদেরকে মেরোনা। ওদের অনেকেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে। দুনিয়ার অন্যান্য আন্দোলনের তুলনায় ইসলামী আন্দোলন যে কতখানী উন্নত ও শ্রেষ্ঠ এবং অনুগামীদেরকে সে কি ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে, এ থেকে তা সহজেই অনুমান করা যায়। মুসলমানদের পক্ষে মাত্র ৬ জন মুহাজির এবং ৮ জন আনসার শহীদ হলেন। যুদ্ধে মুসলমানগণ আল্লাহর রহমতে বিজয় লাভ করলেন।
[sb]কঠিন পরীক্ষা ছিলো যাদের[/sb]
ইসলামী আন্দোলনের জিহাদ হচ্ছে চুড়ান্ত পরীক্ষা, যার মাধ্যমে আন্দোলনের অনুবর্তীদের পূর্ণ যাচাই হয়ে যায়। এ যুদ্ধে সবচেয়ে বেশী কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছিল মক্কার মুহাজিরদেরকে। এদের প্রতিপক্ষ ছিলো আপন ভাই-চাচা আত্মীয়-স্বজন ইত্যাদি। কারো বাপ, কারো চাচা, কারো মামা আবার কারো ভাই ছিলো তার তলোয়ারের লক্ষ্যবস্তু এবং নিজ হাতে তাদের হত্যা করতে হয়েছিল এসব কলিজার টুকরাকে। এ ধরনের কঠিন পরীক্ষায় একমাত্র তারাই টিকে থাকতে পারেন যারা পরিপূর্ণ নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা সহকারে হক ও সত্যের সাথে সম্পর্ক জুড়েছে এবং মিথ্যা ও বাতিলের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করতে পুরোপুরী প্রস্তুত হয়েছে। ওদিকে আনসারদের পরীক্ষাও কোন দিক দিয়ে সহজ ছিলনা। এতদিন তারা মুসলমানদেরকে শুধুমাত্র আশ্রয় দিয়ে কুরাইশ ও তাদের সহযোগী গোত্রগুলোর শক্রতার ঝুঁকি নিয়েছিল। কিন্তু এবার তো তারা ইসলামের সমর্থনে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছে। এর মানে ছিল, কয়েক হাজার লোকের একটি জনবসতি সমগ্র আরব দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে গেছে। এ ধরনের দুঃসাহস একমাত্র তারাই করতে পারে যারা সত্য আদর্শের ওপর ঈমান এনে তার জন্য নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থকে সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি দিতে প্রস্তুত হতে পারে। নতুবা আপন ধন-দৌলত এবং স্ত্রী পুত্র-পরিবারকে এভাবে সমগ্র আরব ভূমির শত্র“তার ন্যায় কঠিন বিপদের মুখে কে নিক্ষেপ করতে পারে?
[sb]শেষ কথা [/sb]
হৃদয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখেরাতে সাফল্যের প্রবল বাসনা থাকলেই আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় নিজেকে পুরোপুরী উৎসর্গ করা যায় এবং যে কোন কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া যায়। যার বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে মুহাজির ও আনসারগণ। যুদ্ধে যেভাবে তাঁরা বিজয়ী হলেন, অন্য কোন লোক হলে এ ঘটনাকে নিজের ‘কেরামত ( অলৌকিক) কীর্তি বলে ইচ্ছামত গর্ব করতে পারতো এবং একে ভিত্তি করে তার অনুগামীরাও নানারূপ কিস্সা কাহিনীর সৃষ্টি করতো। কিন্তু কুরআনে স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালা মুসলমানদেরকে বলে দিলনঃ “তাদেরকে তোমরা হত্যা করোনি, বরং তাদের হত্যা করেছেন আল্লাহ” এমন কি, তিনি নবী (সাঃ)কে পর্যন্ত বলে দিলেন যে, “(বালু) তুমি ছুঁড়োনি,বরং ছুড়েছেন আল্লাহ এবং মুমিনদেরকে একটি উত্তম পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ করার জন্যেই এসব কিছু করা হয়েছে।”(আনফাল ১৮)। এভাবে মুসলমানদেরকে বলে দেয়া হলো যে, প্রকৃতপক্ষে সমস্ত কাজের চাবিকাঠি রয়েছে আল্লাহর হাতে এবং যা কিছু ঘটে তাঁর নির্দেশ ও ইচ্ছানুসারেই ঘটে থাকে। মুমিনদের কাজ হচ্ছে আল্লাহ তা’য়ালার ওপর পুরোপুরী নির্ভর করা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহ ও রাসূলের পূর্ণ আনুগত্য করা। এরই ভিতর নিহিত রয়েছে তাদের জন্যে সাফল্য।