শিক্ষা হতে হবে কুরআন সুন্নাহ অনুসৃত

বর্তমান বিশ্বে নৈতিকতার বিষয়টি বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। কারণ আধুনিক বিজ্ঞানময় এই যুগে সাধারণ মানুষ ধরে নিয়েছিল উন্নত শিক্ষাদীক্ষায় মানুষের নৈতিকতার মানও উন্নয়ন হবে, কিন্তু না, এসব শিক্ষা মানুষকে মঙ্গলগ্রহে পৌঁছিয়েছে; কিন্তু সাধারণ মানুষে মানুষে যে অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্য, নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন, আদর্শ ও মহানুভব চরিত্র-মাধুর্য দিয়ে বিশ্বকে জয় করার মানসিকতা ক্রমেই লোপ পাচ্ছে। আজ মানুষ অন্যের অধিকার হনন করে যেকোনো নিষ্ঠুরতা অবলম্বন করে হলেও নিজেকে দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, নিজের মতামতকে প্রাধান্য দিতে চায়। ফলে দেশে দেশে ক্রমেই শান্তি স্বস্তি অভিরুচি বিদূরিত হয়ে চলেছে। এখন মানুষ আবার একটি আদর্শিক নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন পরিবেশ ফিরে পেতে পিপাসার্তভাবে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছে। এ ক্ষেত্রে আবার মানুষ ফিরে আসছে ইসলামের শিক্ষায়, ইসলামের মহান নবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ-এর মহানুভব জীবন অনুসরণে। মহানবী আনীত আল-কুরআনই মানবজাতিকে শিক্ষার সাথে নৈতিকতার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠায় যুগে যুগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে। যেমন আল-কুরআনে বলা হয়েছে রব্বানা ওআবায়াস ফিহিম রাসূলাম মিনহুম ইয়াতলু আলাইহিম…। মহান আল্লাহপাক এ আয়াতে হজরত ইবরাহিম নবী আঃ-এর মুখনিসৃত এক ঐতিহাসিক মুনাজাতের মাধ্যমে আখেরি নবী হজরত রাসূলে করিম সাঃ এ দুনিয়ায় আসার কারণ তুলে ধরেছেন। হে আমাদের রব, তুমি শেষ জামানার উম্মতের জন্য তাদের মাঝ থেকে এমন এক নবী প্রেরণ করো যিনি তাদের তোমার পাক কালাম শরিফ বিশুদ্ধ তেলাওয়াত শিখাবেন, কিতাবের অন্তর্নিহিত জ্ঞান, বিজ্ঞান শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করবেন।
এ আয়াতের সর্বশেষ কথা হলো মানুষকে পরিশুদ্ধ করার বিষয়, নৈতিকভাবে বলীয়ান করার বিষয়। অন্যান্য শিক্ষাব্যবস্থায় এ নৈতিক ও আত্মশুদ্ধির বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হয় না বলে মানুষ সুশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও অনেক মানবিক গুণ থেকে বঞ্চিত হয়। আমাদের মহানবী সাঃ হাদিসে বলেছেন, বুইসতু মাকারিমাল আখলাক। আমি চারিত্রিক মাধুর্যের উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রেরিত হয়েছি। মানুষের নৈতিকতা সংশোধনের অন্য মাধ্যম হলো পরকালীন জবাবদিহিতার ভয়। ইসলামী শিক্ষা অনেকটা পরকালমুখী। যার কারণে সত্যিকারের ঈমানদার কখনো নীতি-নৈতিকতাহীন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারে না।
ফামাই ইয়ামাল মিসকালা যাররাতিন খাইরাই ইয়ারাহন্ধ যে ব্যক্তি এ দুনিয়ায় অণু-পরমাণু পরিমাণ ভালো কিছু করবে তা তার সামনে হাজির করা হবে আর যে পরিমাণ খারাপ কিছু করবে তা-ও সে পরকালের বিচারালয়ে প্রত্যক্ষ করবে।
বর্তমানে আমরা দেখি শিক্ষাদীক্ষা ও শৃঙ্খলা বোধে যথেষ্ট দীক্ষিত হওয়া সত্যেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে, উচ্ছৃঙ্খল হয়, অপরিণামদর্শী হয়, ভুলে যায় হিতাহিত জ্ঞান। আধুনিক যুগেও এসব মানব দল থেকে এমন ঘৃণ্য আচরণ সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ করে যা আশরাফুল মাখলুকাতের কাছ থেকে আশা করা যায় না। এসব বর্বরতার কাহিনী শুনেছি আমরা অসভ্য অন্ধকার আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগের মানুষের ইতিহাসে। তাই যেকোনো শিক্ষাদীক্ষার পাশাপাশি ইসলামী নীতি-নৈতিকতা বোধসম্পন্ন পরকালীন জবাবদিহিতামূলক এবং অন্য যেকোনো সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা উদ্‌গিরণকারী ইলমে দীন ও ইলমে তাসাউফ শিক্ষা দেয়া জরুরি।
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের চরিত্র দু’ভাগে বিভক্ত। আখলাকে হামিদা, আখলাকে যামিমাহন্ধ সৎ চরিত্র ও অসৎ চরিত্র। সচ্চরিত্র যেমন সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমা, পরোপকার, শালিনতা ইত্যাদি। অসৎ চরিত্র বলতে মিথ্যা বলা, গালি দেয়া, ঝগড়া করা, চুরি করা ইত্যাদি বোঝায়।
নৈতিকতা, সততা আখলাকে হামিদাহ বা মানুষের সৎ চরিত্রগুলোর মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠ গুণ ও বৈশিষ্ট্য। এর অর্থ সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, সাধুতা; কাজকর্ম, কথাবার্তায়, লেনদেনে এক কথায় জীবনের সব ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি অবলম্বন করা। সত্য কথা বলা, সৎ পথে চলা, সুবিচার করা, অঙ্গীকার পালন করা, আমানত রক্ষা করা, প্রতারণা না করা। এসব মহৎ গুণ আচরণ ব্যক্তিকে করে মহিয়ান আর সমাজকে করে স্থিতিশীল ও ইনসাফপূর্ণ। মানবজীবনের সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলা এসবের ওপর বেশির ভাগ নির্ভরশীল। সৎ লোক ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে সচেতন থাকে। সৎ ব্যবসায়ী দ্রব্যে ভেজাল দেয় না এবং পণ্যের দোষত্রুটি গোপন রাখে না। সৎ কর্মচারী কাজে ফাঁকি দেয় না। সৎ লোক প্রতারণা করে না, প্রবঞ্চনা করতে পারে না। মানুষ সাধারণত অর্থলিপ্সু ও সীমাহীন লোভাতুর হয়ে ব্যবসায়-বাণিজ্যে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং অধিক মুনাফার আশায় ক্রেতাকে প্রতারিত করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে অত্যধিক লাভের কামনায় পণ্যে ভেজাল ও মাপে কম-বেশি করে থাকে। এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। তাই ইসলামে এরূপ কাজকে মারাত্মক অপরাধমূলক কাজ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
সমাজে বিচার-আচার করার ক্ষেত্রেও নীতি-নৈতিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহতায়ালা পাক কালাম শরীফে ইরশাদ করেছেনন্ধ তোমরা ন্যায়ভিত্তিক বিচার সম্পন্ন করো। তা খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আর ন্যায়বিচার করো (স্বজনপ্রীতি করো না) যদিও বা কেউ তোমাদের নিকটাত্মীয় হয়। বলা বাহুল্য, নীতি-নৈতিকতার গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি সবার বিশ্বাস অর্জন করে, শ্রদ্ধা লাভ করে, এমনকি পরম শত্রুও তাকে বিশ্বাস করে।
বিশ্বের দেশে দেশে নৈতিক মানসম্পন্ন লোকের নেতৃত্ব ও সুশাসনের কথাটি বর্তমানে বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। আমাদের দেশে চলছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ। আমরা এ-ও মনে করি নিজে সৎভাবে চলার জন্য সততা লালনের জন্য পরিবেশ পাওয়া একটি বড় বিষয়। নীতি-নৈতিকতা ও সততার সাথে অসততা আর দুর্নীতির একটি চিরন্তন দ্বন্দ্ব রয়েছে। অসৎ লোকের সংখ্যা সমাজে বেশি। আল্লাহর মহান নবী-রাসূলগণ সত্যকে বিজয়ী করতে পেরেছিলেন ঠিক, অসৎদের সাথে তাদের আজীবন দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকতে হয়েছে। আজও সৎ মানুষ বিভিন্ন স্থানে অন্যায় অসুন্দরের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধরত। অসৎদের নেতৃত্বে এ যুগে সব সেক্টরে সৎ মানুষ কোণঠাসা। এমনকি ধর্মীয় উপাসনাগুলোতেও। বর্তমানে বিভিন্ন দুর্নীতি-অনিয়মে ভরা এক শ্রেণীর সামাজিক টাউটদের হাতে মসজিদ ও মাদ্রাসার নেতৃত্ব। আল্লাহপাক আমাদের সত্যিকার অর্থে নীতি-নৈতিকতার জ্ঞানসম্পন্ন সুস্থ মস্তিষ্কের ব্যক্তি ও জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার তওফিক দান করুন।
লেখকঃ জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ইমাম নির্বাচিত ও পুরস্কৃত ২০০৭, স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত ২০০৮

খাদীজা বিনতু খুওয়াইলিদ (রাঃ)

নাম তাঁর খাদীজা। কুনিয়াত (উপনাম) ‘উম্মু হিন্দ’এবং লকব (উপাধি) ‘তাহিরা’। পিতা- খুওয়াইলিদ, মাতা ফাতিমা বিনতু যায়িদ। জন্ম ‘আমুল ফীল’বা হস্তী বর্ষের পনের বছর আগে মক্কা নগরীতে। পিতৃ-বংশের উর্ধ পুরুষ ‘কুসাঈ-এর মাধ্যমে রাসূল (সাঃ) -এর নসবের (বংশের) সাথে তাঁর নসব মিলিত হয়েছে। জাহিলী যুগেই পুতঃপবিত্র চরিত্রের জন্য ‘তাহিরা’উপাধি লাভ করেন (আল-ইসাবা)। রাসূল (সাঃ) ও খাদীজা (রাঃ) মধ্যে ফুফু-ভাতিজার দূর-সম্পর্ক ছিল। এ কারণে, নবুওয়াত লাভের পর খাদীজা (রাঃ) রাসূল (সাঃ) -কে তাঁর চাচাতো ভাই ‘ওয়ারাকা ইবন নওফিলের কাছে নিয়ে গিয়ে বলেন, ‘আপনার ভাতিজার কথা শুনুন।’সম্ভবতঃ বংশগত সম্পর্কের ভিত্তিতেই তিনি একথা বলেছিলেন।
পিতা খুওয়াইলিদ তৎকালীন আরব সমাজের বিশিষ্ট তাওরাত ও ইনজীল বিশেষজ্ঞ ওয়ারাকা ইবন নাওফিলকে খাদীজার বর নির্বাচন করেছিলেন, কিন্তু কেন যে তা বাস্তবে রূপ লাভ করেনি সে সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা নিরব। শেষ পর্যন্ত আবু হালা ইবন যারারাহ আত-তামীমীর সাথে তাঁর বিয়ে হয়। জাহিলী যুগেই তার মৃত্যু হয়। আবু হালার মৃত্যুর পর ‘আতীক বিন আবিদ আল-মাখযুমীর সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয় (শারহুল মাওয়াহিব, আল-ইসতিয়াব)। তবে কাতা’র সূত্রে জানা যায়, তাঁর প্রথম স্বামী ‘আতীক, অতঃপর আবু হালা। ইবন ইসহাকও এ মত সমর্থন করেছেন বলে ইউনুস ইবন বুকাইর বর্ণনা করেছেন (আল-ইসাব ঃ ৪/২৮১)। তবে প্রথমোক্ত মতটি ইবন আবদিল বারসহ অধিকাংশের মত বলে ইবন হাজার উল্লেখ করেছেন। Continue reading খাদীজা বিনতু খুওয়াইলিদ (রাঃ)