ইন্টারনেটে বাংলা ভাষা


ইন্টারনেটে বাংলা ভাষা
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির নতুন নতুন সংযোজনে ক্রমাগত ছোট হয়ে আসছে আমাদের এ পৃথিবী। অষ্টাদশ শতাব্দীতে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে এসেছিল টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ। তারপর থেকে আমরা আস্তে আস্তে ভোগ করতে শুরু করি উন্নত সুযোগ সুবিধা। বিংশ শতাব্দীতে এসে আমরা পেয়েছি যোগাযোগ ব্যবস্থার আকর্ষণীয় মাধ্যম ইন্টারনেট, ই-মেইলসহ সেলফোন নেটওয়ার্ককে। এ সকল মাধ্যম সহজ করে দিয়েছে বিশ্বের এক প্রান্তকে অন্য প্রান্তের সাথে মুহূর্তে বেঁধে ফেলতে বা সংযোগ ঘটাতে। এই অর্ধশত বছর আগেও যা কল্পনা করা যেতনা।
এইতো বছর পাঁচেক আগেও আমার খুব ইচ্ছে হতো, ইন্টারনেটে মায়ের ভাষা দেখতে। দেখতাম অনেক ওয়েব সাইট তৈরী হয় ইংরেজী ছাড়াও অন্যান্য দেশের নিজস্ব ভাষায়। আশ্চর্য্য হয়ে যেতাম। আমি প্রযুক্তিবিদ নই। তবে প্রচন্ডরকম প্রযুক্তিমনষ্ক একজন মানুষ। প্রতিনিয়ত কেন জানি প্রযুক্তি শুধু আমাকে টানে। মাঝে মাঝে মনে হয় এই প্রযুক্তির উৎকর্ষতা দেখে যাওয়ার জন্যেই আমাকে বাঁচতে হবে। দিন যায় আর আসে একটি একটি নতুন প্রযুক্তি। প্রযুক্তির এই উন্নতর সংস্করণ বা উৎকর্ষতা তৈরীর জন্যে যেন চারিদিকে হিড়িক পড়ে গেছে। এখন খুব ভাল লাগে যখন দেখি কোন একটি ওয়েব সাইট সম্পূর্ণ বাংলায় তৈরি। বাংলা ওয়েব সাইট বানানোর প্রথম দিকের পর্বগুলো ছিলো খুবই জটিল। মূলতঃ তা হতো তিনটি পদ্ধতির যে কোন একটির উপর ভিত্তি করে বা সহযোগেঃ
১) সাইটে বাংলা ফন্ট আপলোড করে রাখতে হতো। ব্যবহারকারীকে তা নিজের কম্পিউটারে ইন্সটল করতে হতো।
২) বাংলা লেখাগুলোকে বই-এর পাতার মত স্ক্যান করে ঔচএ ফরম্যাটে ছবি আকারে আপলোড করা।
৩) পুরো লেখাটিকে চউঋ ফরম্যাটে রূপান্তরিত করে ফাইলটিকে আপলোড করতে হতো। সেক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর কম্পিউটারে অবশ্যই চউঋ রিডার সফটওয়্যার ইন্সটল করা থাকতে হতো তা পড়ার জন্যে।
এসব কিছুই ছিলো দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মত। বর্তমানে তা দূরীভূত হয়েছে কিছু প্রযুক্তিবিদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরী কিছু সফটওয়্যারের মাধ্যমে। অভ্র ও নিকশ হলো তাদের মধ্যে অন্যতম। এসব সফটওয়্যারের মাধ্যমে খুব সহজেই ইউনিকোড ভিত্তিক ফন্ট দিয়ে লেখা যায়। আর লেখার পর তা আপলোড করলেই হলো। ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার, মজিলা ফায়ারফক্স বা অপেরা ব্রাউজারে নির্দিষ্ট ওয়েব ঠিকানায় ক্লিক করলেই পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে বাংলা ভাষায় লেখা ওয়েবসাইটটি ভেসে ওঠে। প্রবাসী একজন কুয়েত থেকে যখন তার মায়ের ভাষায় তৈরী ওয়েব সাইটটি মনিটরের পর্দায় দেখে ও মন্তব্য করে কোন ঝামেলা ছাড়াই, শুধুমাত্র সেই জানে তার মন কি আনন্দে ভরে উঠে! এটা হয়তো এভাবে লিখে বোঝানো সম্ভব হবেনা। তবুও হয়তো আপনাদের হৃদয় কিছুটা হলেও স্পর্শ করবে।
আজকের পৃথিবীতে সেই সমস্ত ভাষাই টিকে আছে, যে সমস্ত ভাষার লিখিতরূপ আছে। শুধুমাত্র যেসব ভাষা কথাবার্তায় চলে কিন্তু লেখা হয়না সে সকল ভাষা একদিন কালের বিবর্তনে হারিয়ে যায়। তাই এক সময় মনে করা হলো ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে দরকার তার ছাপা বা মুদ্রণরূপ। কিন্তু বর্তমানে ভাষাকে শক্তিশালীভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন তার সার্বজনীন ও ডিজিটাল রূপ। এটাই এখন একমাত্র রূপ যা ভবিষ্যতে সবকিছুতেই ব্যবহৃত হবে। তাই আমাদের এখন এমন ফন্টে লেখালেখি করতে হবে যা হবে সার্বজনীন ও আগামীতে যেন পূণরায় পরিবর্তন করতে না হয়। তা যেন পৃথিবীর যে কোন কম্পিউটার থেকে সহজে পড়া যায়। বর্তমানে আমাদের দেশ ও পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গের চিত্র সম্পূর্ন ভিন্ন। যদিও তারা কিছুটা নিয়ম মেনে চলছে। কিন্তু আমাদের দেশে এক কম্পিউটারে লেখা ডকুমেন্ট অন্য কম্পিউটারে নিলে তা অনেক সময়েই পড়া যায় না। একই অবস্থা ভারতীয় লেখা বা খবরের কাগজের ইন্টারনেট সংস্করণ বাংলাদেশ থেকে সহজে পড়া যায় না। এটার একমাত্র কারণ অঝঈওও ‘আসকি’-র যথেচ্ছা ব্যবহার। আসলে এর একটা প্রমিতকরণ প্রয়োজন। তাই এর একমাত্র আন্তর্জাতিক সমাধান হলো ইউনিকোড ফন্ট। আসকিতে সংকেত ছিলো ২৫৬টি। আর ইউনিকোডে আছে ৬৫ হাজারেরও বেশি। এখন পর্যন্ত অনেক খবরের কাগজ ইন্টারনেটে পড়তে হলে তাদের নিজস্ব ফন্ট ইন্সটল না করে উপায় থাকেনা। তাছাড়া সব ব্রাউজার তা সাপোর্টও করেনা। তাই বাংলাদেশের অনেক সংবাদ ভিত্তিক সাইট এখন গড়ে উঠেছে ইউনিকোড ভিত্তিক ফন্ট দিয়ে। এটি একটি দূরদর্শিতা। এখন প্রয়োজন সরকারের পুরোনো দলিল-দস্তাবেজ ইউনিকোডে রূপান্তরের। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে সবার ‘আর্কাইভ’ ব্যবহার করা খুব সহজ হবে। তাছাড়া তাদেরকেও আর্কাইভ ডেটা পরিবর্তন করার মত ঝামেলা পোহাতে হবেনা।
এখন সবাই এটা মেনে নিলেই হলো। এরই মধ্যে দেশে-বিদেশে অসংখ্য বাংলাপ্রেমী মানুষ ইউনিকোডের মাধ্যমে লিখে চলেছে তাদের কথামালা। আর তাতে বাংলা ওয়েব সাইট, ব্লগ সাইটগুলো সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। সম্ভব হচ্ছে মায়ের ভাষায় ই-মেইল করা, তাৎক্ষণিক বার্তা আদান-প্রদান ছাড়াও ফেসবুকে ভাব বিনিময়ের। আর বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজে চলছে বিভিন্ন প্রকারের তাজা খবরের সমাহার। ফলে ধীরে ধীরে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটে বাংলা ভাষা একটি প্রমিতমানের দিকে চলতে শুরু করেছে। আমাদের প্রিয় ভাষা, কৃষ্টি আর ঐতিহ্য বেঁচে থাক আমদের হৃদয়ের মাঝে লাখ লাখ বছর ধরে। গ্লোবাল ভিলেজের দোহাই দিয়ে তাকে যেন বিসর্জন দিতে না হয়।
আসুন এই ভাষা আন্দোলনের মাসে বাংলাকে সর্বত্র ব্যবহারের সচেষ্ট হয়।