আল আকসা মসজিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের নয়া ষড়যন্ত্র

আল আকসা মসজিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের নয়া ষড়যন্ত্র

ইহুদীবাদী ইসরাইল মুসলমানদের প্রথম ক্বেবলা মসজিদুল আকসার পশ্চিম দিকের প্রবেশ দ্বারে খননকাজ চালাতে গিয়ে দ্বারটি ভাঙ্গার কাজ শুরু করেছে ৷ সারাবিশ্বের মুসলমানরা ইসরাইলের এ ন্যাক্কারজনক কাজের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ৷ আল আকসা মসজিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলের নয়া ষড়যন্ত্র সম্পর্কে দিগন্তের আজকের আসরে রয়েছে একটি আলোচনা ৷ মসজিদুল আকসা সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত ধর্মীয় স্থান ৷ বিভিন্ন ধর্মের কাছে ঐতিহাসিক এ মসজিদের গুরুত্ব রয়েছে এবং ১৯৬৭ সালে ইহুদীবাদী ইসরাইল এ মসজিদ দখল করার পর থেকে এটিকে ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা চালিয়েছে ৷ ইসরাইলী সেনারা কিছুদিন পরপর নতুন নতুন অজুহাতে আল-আকসা মসজিদে হামলা চালিয়ে এর ক্ষতি করছে ৷ ইহুদীবাদীরা গত ৬ই ফেব্রুয়ারি এ মসজিদের উপর সর্বশেষ আগ্রাসন চালায় ৷ এবার তারা মসজিদেরর পশ্চিম দিকের প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে ৷ ইসরাইলীরা এরই মধ্যে ঐ প্রাচীরের নীচে ভূগর্ভস্থ দুটি বৃহত্‍ হলরুম ধবংস করে ফেলেছে ৷ ইসরাইল সরকার বলছে, জেরুযালেম শহরের ইহুদী অধ্যুষিত এলাকার সাথে মসজিদুল আকসার একটি সংযোগ সেতু নির্মানের লক্ষ্যে তারা ঐ ধবংসযজ্ঞ চালাচ্ছে ৷ অর্থাৎ ইসরাইল মসজিদুল আকসায় ইহুদীবাদীদের যাতায়াতের সুবিধা করে দেয়ার অজুহাতে মসজিদটির একাংশ ধ্বংসের কাজে হাত দিয়েছে ৷ ইসরাইলীরা আল আকসা মসজিদ ধ্বংসের ষড়যন্ত্র শুরু করে ১৯৬৯ সালে এটিতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ৷ তখন থেকে এ পর্যন্ত তেলআবিব এ মসজিদ ধবংস করার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে ৷ ইহুদীবাদীরা দাবি করছে, মসজিদুল আকসার নীচে হযতর সোলায়মান (আঃ) এর উপাসনালয় অবিস্থত এবং সেটিকে খুঁজে বের করার জন্য তারা এ ধরনের ধবংসাত্মক কাজে হাত দিয়েছে ৷ তারা বিশ্বাস করে, ইহুদী জাতির মুক্তিদাতার আবির্ভাবের সময় এসে গেছে এবং তার আবির্ভাবের ক্ষেত্র সৃষ্টি করার জন্য আল আকসা মসজিদ ধবংস করে সেখানে সোলায়মানের উপাসনালয় নির্মাণ করতে হবে ৷ হযরত সোলায়মান (আঃ) প্রায় তিন হাজার বছর আগে সোলায়মানের উপাসনালয় খ্যাত স্থাপনাটি নির্মান করেছিলেন ৷ কিন্তু তার প্রায় চার শতাব্দি পর বাবোলের অধিবাসীরা এটিকে ধবংস করে ৷ তবে ঐ উপাসনালয় পুনরায় তৈরি করা হলেও হযরত ঈসা (আঃ) এর জন্মের ৭০ বছর পর রোম সম্রাট এটিকে ধবংস করে দেয় ৷ তবে আল আকসা মসজিদের নীচে ঐ উপাসনালয়ের অবস্থান নিয়ে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদরা ব্যাপক সংশয় প্রকাশ করেছেন৷ বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ মাইর বিন দোউফ ব্যাপক গবেষণা ও বহুবার মসজিদুল আকসা পরিদর্শনের পর ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গবেষণার ফলাফল লিখতে গিয়ে বলেন, হযরত ঈসা (আঃ) এর উপাসনালয় কোন অবস্থায়ই আল আকসা মসজিদের নীচে অবস্থিত নয় ৷ ইহুদীবাদীরা তাদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলকে বৈধতা দেয়ার জন্য হোলোকাস্টের মত যেসব কল্পকাহিনী তৈরি করেছে, সোলায়মানের উপাসনালয় সে রকমেরই একটি কল্পকাহিনী ৷ আরো অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষক মাইর বিন দোউফের এ দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করেছেন ৷ এদিকে ইহুদীবাদীরাও এতদিন ধরে খননকাজ চালানোর পরও মসজিদুল আকসার নীচে কোন ধরনের উপাসনালয় খুঁজে পায় নি ৷ কিন্তু তারপরও হযরত সোলায়মান (আঃ) এর উপাসনালয়ের সন্ধানের অজুহাতে ইহুদীবাদীরা মসজিদুল আকসা ধ্বংসের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ৷ বলা হচ্ছে, ইসরাইলের ১২৫টি উগ্র ইহুদীবাদী গোষ্ঠি আল আকসা মসজিদকে ধবংস করার দাবি জানাচ্ছে এবং এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন কর্মসূচী দিচ্ছে ৷ এ পর্যন্ত ইহুদীবাদী সরকার মসজিদুল আকসার ভিত্তি দুর্বল করার জন্য এর নীচ দিয়ে ট্যানেল তৈরি করেছে এবং এর বেশ কিছু অংশ ধবংস করেছে ৷ ১৯৮২ সালে আল আকসা মসজিদে এ ধরনের এক আগ্রাসন প্রতিহত করতে গিয়ে বহু ফিলিস্তিনী ইসরাইলী সেনাদের গুলিতে শাহাদাতবরণ করেন ৷ ১৯৯০ এর দশকে এ ঐতিহাসিক মসজিদের নীচে বহু খননকাজ চালানো হয় ৷ ১৯৯৬

ইসলামি সভ্যতা

ইসলাম জীবনর্শনের সার্বজনীন মূলনীতির উপরে ইসলামী তমদ্দুন প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের মূল্যবোধ এই তমদ্দুনের প্রাণ। সাহিত্য, শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের সহস্র প্রেরণা রয়েছে এই সংস্কৃতির মধ্যে। ইসলামী জীবনর্শনকে আল-কুরআনে বিশালাকার বৃক্ষের সংগে তুলনা করা হয়ছে। ধর্মের বাণী একটা বৃক্ষের মত, যার শিকড় থাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত আর শাখা প্রশাখা আসমানে মাথা উঁচু করে থাকে। (সূরা ইবারাহীম : ১৪,২৪) তৌহীদ (আল্লাহর একত্ব), মালিকিয়াত (আল্লাহর সার্বভৌমত্ব) ও খিলাফত (মানুষের প্রতিনিধিত্ব) এই তমদ্দুনের অপরিহার্য অংশ। আল্লাহ এক ও তিনিই একমাত্র উপাস্য ও তাঁর উপরে আর কেউ নেই, কোন শক্তি নেই।
তিনি শুধু মুসলিমের প্রভু নন, সমগ্র নিখিল বিশ্বেরই তিনি প্রভু। জাতি হিসেব কেবলমাত্র মুসলমানেরাই তাঁর অনুগ্রহ-প্রাপ্ত নন। সব জাতি এবং ব্যক্তিই তাঁর অনুগ্রহ ও রহমত পেয়ে থাকেন। তবে কোন জাতি বা ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব তাঁর ঈমান, আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ, সততা, সাধুতা ও মানবকল্যাণের উপরই নির্ভর করে। প্রত্যেকটি মানুষ আল্লাহর খলীফা বা প্রতিনিধি এ সেই হিসেবে সমান অধিকারের দাবীদার। সব মানুষ পরস্পর ভাই-ভাই ও একই আইনের অধীন। এ বিষয়ে শাসক বা শাসিতের মধ্যে কোন তফাত নেই। আল্লাহ ও মানুষের মধ্যে কোন মধ্যস্থতার বালাই নেই। এই জীবনদর্শনের বস্তু আত্মার কোন বিরোধ ও স্বীকৃত হয়নি; উভয় দিকেই দেয়া হয়েছে সমান মনোযোগ। মানুষে মানুষে সম্পর্কে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায় বিচারের ভিত্তিতে। ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভর করে জ্ঞান, কার্যক্ষমতা ও নৈতিক উৎকর্ষের উপর ও জাতির শ্রেষ্ঠত্ব নিহিত রয়েছে সুষ্ঠু ও সুবিচারমূলক সমাজ গঠনে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রথাই ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করে, রিবা বা সুদ এবং সর্ব প্রকারের অর্থনৈতিক শোষণ ঘোর পাপ ও মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি হিসেবে গণ্য হয়। সামাজিক কল্যাণের (অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি) সীমার মধ্যে থেকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ভোগ করা চলে। সুষ্ঠু সমাজ গঠনের জন্য ইসলাম বাধ্যতামূলক সামাজিক নিরাপত্তা বা যাকাতের বিধান দিয়েছে। ইসলাম বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করে যেতে জানিয়েছে উদাত্ত আহব্বান। ব্যক্তির নিজস্ব সত্তা, অধিকার ও নিরাপত্তা ইসলাম স্বীকার করে। এই অধিকার কারো ছিনিয়ে নেবার অধিকার নেই।
সালাতের নীতি দ্বারা ইসলাম প্রচার করেছে যে, দুনিয়ার সব জাতির ভেতরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছেন ও হযরত মুহম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর শেষ রাসূল। এই নীতির দ্বারা মানব জাতির ঐক্য ও বুদ্ধিমত্তার উপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। ইসলামের মতে সত্য ও জ্ঞানের উপলদ্ধিতে কোন জাতির একচ্ছত্র অধিকার নেই। মানব সংস্কৃতির ঐক্য পরস্পর নির্ভরশীল ও মানব মহিমার স্বীকৃতি রয়েছে। সংস্কৃতি সম্পর্কে এখানে উদার দৃষ্টিকোণ ও মানসিকতা, তার ভেতরে দেখি মানবতার জয়জয়কার। যদিও এই সাংস্কৃতিক বিচার বৃদ্ধি ও মূল্যায়ন মুসলিম সমাজের সামাজিক দুর্গতি, অর্থনৈতিক অরাজকতা গোষ্ঠীগত অন্ধকার মাঝে আটকে গেছে, তবু মুসলমানগণ দু:খের নির্মম তৌহীদে ও রিসালাতের আশ্রয় নিয়ে শক্তি সঞ্চয় করতে পারেন, শত বাধা-বিপত্তি জয় করতে পারেন। তৌহীদ ও রিসালতের নীতিকে বুঝতে পারলে মুসলিম মানুষের নিছক নেতিবাচক ভাবধারা ও অন্তর্মুখিতা দূর হয়ে যাবে ও ইসলামী জীবনদর্শনের মূল উদ্দেশ্য সুষ্ঠু সমাজ সংগঠনের দিকে আমরা দৃষ্টি ফেলতে পারব। এ উপমহাদেশের মুসলিম বিজয়ের ইতাহাস থেকে জানতে পারা যায় যে, বিজয়ীরা সবাই এক জাতির লোক নয়- কিন্তু তারা একই সূত্রে গ্রথিত; তারা সবাই মুসলিম, এই ছিল তাদের পরিচয়। তুর্কী, আফগান ও মুগল নিজেদের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেও ইসলামী জীবনদর্শন ও সংস্কৃতির এক একটা বিশিষ্ট অংশরূপে নিজেদের মনে করতেন। তৌহীদ ও সাম্যনীতি এই সব জাতিকে কম-বেশী ইসলামী সংস্কৃতির আওতায় এনেছিল। ইসলামী সংস্কৃতির একথা দাবী করে না যে, কেবলমাত্র এর মধ্যেই মানুষের মানুসিক ও সামাজিক জীবনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। দুনিয়ার সব ভাষা ও সংস্কৃতিকে ইসলামী তমদ্দুনে সম্মানের চক্ষে দেখা হয়।
বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাবধারার সার্থক অনুপ্রবেশ ইসলামের কাম্যও। এইজন্যই ইসলামে মৌলিক নীতি অক্ষুন্ন রেখে সামাজিক চাহিদা ও পরিবেশমাফিক নীতিকে (প্রিন্সিপালন্স) বাস্তবে রূপায়িত করতে বলা হয়েছে। এর নাম ইজতিহাদ। ইসলামী জীবনদর্শনকে আধুনিক যুগে রূপায়ণের উপযোগী করে তুলতে হলেও আধুনিক মানুষকে ইসলামের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে হলে যেমন একদিকে জ্ঞানের মারফত ইসলামের সামাজিক রূপায়ন প্রয়োজন,তেমনি শিক্ষা ব্যবস্থাও আমাদের মূল্যবোধ-অনুগ করে ঢেলে সাজাতে হবে। অধ্যাপক ইলিয়ট স্মিথ বলেন যে, ভাগ্যগুণে খৃষ্টজন্মের চার হাজার বৎসর পূর্বে মিসরে মানব সভ্যতার পত্তন হয় ও সেখানে থেকে তা তাইগ্রীস নদের তীরে, বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশে, চীনে ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। একে বলা হয় সংস্কৃতি বিবর্তনের প্রত্যয় (ইভল্যুশনিষ্ট থিয়োরী) অপরদিকে অধ্যাপক টয়েনবি বলেন, অন্যান্য সংস্কৃতির সংগে সংযোগের ফলেই কোন একটা সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধিত হয়। একে বলা হয় সংস্কৃতির সঞ্চারশীল প্রত্যয় (ডিফিউশনিস্ট থিয়োরী)। রিসালাতের মারফত ইসলাম গৌণভাবে এই সঞ্চারী প্রত্যয়কেই সমর্থন করেছে।
আধুনিক দুনিয়ার সমগ্র মুসলিম জাতির একজন শাসক বা খলীফা ঘোষণা করলে বা সাধারণ মুসলিমের রোমান্টিক ঐক্যের (যার আংশিক প্রয়োজন কোন দিন ফুরিয়ে যাবে না) কথা প্রচার করলে কোন ফায়দা হবে না। দেশে-দেশে বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামের সমাজনীতির দ্বিধানীন রূপায়ণের মারফত ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অতঃপর মুসলিমের সামাজিক (সমাজ ব্যবস্থাগত) ও আধ্যাত্মিক এই উভয় মিলনের সেতু রচনা করা সহজ হয়ে যাবে। ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা ভিন্ন তথাকথিত রাজতন্ত্রগত মুসলিম রাষ্ট্রের সংগে খিলাফতভিত্তিক গণতন্ত্রী অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের সমঝোতা ও সত্যিকার মিলন অনেক দিক দিয়েই অসম্ভব ব্যাপার।
ইসলামী সংস্কৃতির মূল্যবোধ থেকে আমরা এই সত্যেরই ইঙ্গিত পাই। এখানে ঘটেছে বস্তু ও আত্মা, সমাজব্যবস্থা ও ব্যক্তিসত্তার সমন্বয়। দুনিয়ার সব কাজেই মুসলিমের ইবাদত, যদি তার ভেতরে জীবন সম্পর্কে সর্বাংগীন দৃষ্টিভঙ্গী ও মানবকল্যাণ নিহিত থাকে। দুনিয়ার কাজ করা দুনিয়াদার হওয়া নয়- আল্লাহকে ভুলে থাকার নামই দুনিয়াদার হওয়া। সমগ্র প্রকৃতিতে রয়েছে সত্যের নিদর্শন। সেই শক্তিকে উপলব্ধি করতে হবে, আহরণ করতে হবে। কারণ এই বাস্তব জগতই পরকালের শস্য ক্ষেত্র। আকল বুদ্ধি, মুহব্বত (প্রেম) ও মারেফাতের (সাধনা) মাধ্যমে ফালাহ (সাফল্য) লাভ করাই ব্যাপক অর্থে ইবাদত ও ইসলামী তমদ্দুনের বাস্তব পন্থা।
এমার্সনের মতে সংস্কৃতির যে বিশেষ গুণ সামাজিক সংযোগ ও আত্মগত নির্জনবাসের মধ্যে এক মাঝামাঝি পথ, তা ইসলামী সংস্কৃতিতে পুরোপুরি মেলে। সমগ্র জীবন নিয়ে ইসলামী সংস্কৃতির কারবার। স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ক ছাড়াও মানুষের সমাজ জীবন, খাদ্য আহরণ ও অর্জনের পন্থা, যৌন-জীবন, রাষ্ট্রনীতি, শিল্প বাণিজ্য সম্পর্ক এবং এক মানবোচিত পরিকল্পনা এতে রয়েছে। অন্যান্য দার্শনিক আর্দশের (গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র) চাইতে মৌলিক বিষয়ে মতবিরোধ ইসলামের নেই বললেই চলে (পাশ্চত্য দেশগুলোর রাজনৈতিক গণতন্ত্র, সোভিয়েট রাশিয়ার অর্থনৈতিক গণতন্ত্র ও কমিউনিস্ট চীনের স্বৈরবাদী গণতন্ত্র)। ইসলামে শিয়া-সুন্নী মতবিরোধ রাজনৈতিক বিবর্তন সম্পর্কে মতবিরোধ। ইসলামী জীবনদর্শনের কোন মৌলিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এই দুটো দল গড়ে ওঠেনি। আর এই জীবনদর্শনের মৌলিক নীতি ও সমাজদর্শনের কোন অস্পষ্টতা নেই। সুদূর প্রসারী এক একটি দিককে আদি সত্তার প্রকাশের সমগ্র রূপ বলে মুসলমান মনে করেন না, তাই তাকে পূজা না করে করেন অনুশীলন। ইসলামী সংস্কৃতির এই সর্বমুখিনতার ফলে আরবদের মধ্যে ইসলামের প্রেরণায় শিল্পকলা ও বিজ্ঞানচর্চার পরিপূর্ণতা ও স্মরণ একই যুগে সম্ভব হয়েছিল। কুরআন একখানা বিজ্ঞানের কিতাব নয়, বিজ্ঞানে সত্য প্রচার করা ও কুরআনের কাজ নয়। ইসলাম দিয়েছে বিজ্ঞানের প্রেরণা। সেই প্রেরণা সার্থক হয়েছে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভবে। মানুষের মত আদিসত্তা আল্লাহ কোন ব্যক্তি নন, তিনি সেই মহান শক্তি, যিনি একই সঙ্গে একদিকে সুদূরপ্রসারী (ট্রানসেনডেন্টাল) অপর দিকে অনুপ্রসারী (ইমানেন্ট)। তাই তাঁর থেকে ইসলামী জীবনদর্শনের দার্শনিক ভিত্তি ও সর্বাংগীন (নিছক বস্তুগত নয়) বৈজ্ঞানিক পদ্ধিতর
জন্ম হয়।
সমাপ্ত

রিসালাতে মুহাম্মাদী ও বর্তমান পশ্চিমা বিশ্ব

আমাদের সামনে যখন আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগের নাম আসে তখন চোখের সামনে ভেসে উঠে খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের সেই তমসাচ্ছন্ন যুগ। যখন আবির্ভুত হয়েছিলেন বিশ্বনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম । বিকশিত হয়েছিল তাঁর হিদায়েত ও প্রশিক্ষণ। বিশ্ববাসী দেখেছিল তাঁর মুজিযা। জাহেলিয়্যাত শব্দটি কানে আসলেই ভেসে উঠে চোখের সামনে আরব জাতি, তাদের বর্বরতা, লাগামহীন চলাফেরার দৃশ্য। ঐতিহাসিকগণ যার চিত্র তুলে ধরেছেন তাদের গ্রন্থে।
তবে জাহিলিয়্যাত বা মূর্খতা শুধু সে কালের সাথে বিশেষিত নয়, ইসলামের পরিভাষায় যে যুগ অহী ও নবুয়াতি দিক-নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত বা নবুওয়তের শিক্ষা ও দাওয়াত পৌছেছে কিন্তু লোকেরা তা থেকে বিমুখ থেকেছে, তাকেও বলা হয় আইয়ামে জাহিলিয়্যাত। সেটা ষষ্ঠ শতকের দিগন্ত- বিস্তৃত বর্বর যুগ হোক বা ইউরোপীয় ইতিহাসের মধ্য যুগীয় বর্বরতা হোক -সাধারণত অন্ধকার যুগ হিসাবে যাকে স্মরণ করা হয়। অথবা বিংশ শতাব্দীর দীপ্তিময় সভ্য ও অগ্রগতির যুগ হোক; আমরা যা অতিক্রম করছি।
আল কুরআনুল কারীমের ভাষায়, বিশ্বে আলোকরশ্মি একটিই এবং তার উৎস একটি। আল্লাহ তাআলা বলেন:
اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ
আল্লাহ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর আলোকরশ্মি। (সূরা আন নূর, আয়াত ৩৫)
তবে অন্ধকার অসংখ্য আর অগণিত।
যদি আল্লাহ তাআলার আলোকরশ্মিতে দীপ্তি না থাকতো, তাহলে বিশ্বে আধারের কোন সুনির্দিষ্ট ঠিকানা থাকতো না। দেখা যেত মানব জীবনের বাঁকে বাঁকে আধার আর আধার।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَوْ كَظُلُمَاتٍ فِي بَحْرٍ لُجِّيٍّ يَغْشَاهُ مَوْجٌ مِنْ فَوْقِهِ مَوْجٌ مِنْ فَوْقِهِ سَحَابٌ ظُلُمَاتٌ بَعْضُهَا فَوْقَ بَعْضٍ إِذَا أَخْرَجَ يَدَهُ لَمْ يَكَدْ يَرَاهَا وَمَنْ لَمْ يَجْعَلِ اللَّهُ لَهُ نُورًا فَمَا لَهُ مِنْ نُورٍ
“অথবা (তাদের কর্মসমূহ) গভীর সাগরে ঘনিভূত অন্ধকারের মত, যাকে আচ্ছন্ন করে ঢেউয়ের উপরে ঢেউ, তার উপরে মেঘমালা। অনেক অন্ধকার; এক স্তরের উপর অপর স্তর। কেউ হাত বের করলে আদৌ তা দেখতে পায় না। আর আল্লাহ যাকে জ্যোতি দেন না তার জন্য কোন জ্যোতি নেই।” (সূরা আন নূর, আয়াত ৪০)
আল কুরআনুল কারীমে যেখানেই আলো-আধার এর আলোচনা এসেছে, সেখানেই আলো-কে এক বচন আর আধার-কে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। বলা হয়েছে : নূর (আলো) আর জুলুমাত (অন্ধকারসমূহ)। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আলো বা জ্যোতি একটাই আর অন্ধকারের সংখ্যা অনেক এবং অনেক। ঐ প্রাকৃতিক মেঘাচ্ছন্ন আধারে প্রভাতের উদয় হতো না। যেখানে আলোর স্থান ছিল না, সেখানে প্রদীপ জ্বালালেও তা দীপ্তিময় ও জাগ্রত হত না। বিশ্ব হত তিমিরাচ্ছন্ন একটি ঘুট ঘুটে কালো সমাধি। যেখানে প্রদীপ জ্বালালেও তা প্রজ্বলিত হবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا يَمْشِي بِهِ فِي النَّاسِ كَمَنْ مَثَلُهُ فِي الظُّلُمَاتِ لَيْسَ بِخَارِجٍ مِنْهَا كَذَلِكَ زُيِّنَ لِلْكَافِرِينَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
“যে ছিল মৃত, অতঃপর আমি তাকে জীবন দিয়েছি এবং তার জন্য নির্ধারণ করেছি আলো, যার মাধ্যমে সে মানুষের মধ্যে চলে, সে কি তার মত যে ঘোর অন্ধকারে রয়েছে, যেখান থেকে সে বের থেকে পারে না? এভাবেই কাফিরদের জন্য তাদের কৃতকর্ম সুশোভিত করা হয়। (সূরা আল আনআম, আয়াত ১২২)
এ কথা দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, পাশ্চাত্য জগতে – যেখানে সূর্য উদিত হয় না শুধু অস- যায়, নবুওয়তের আলোক বিন্দুর ছোঁয়া লেগেছে খুবই কম। ওখানে আসমানী আলোকরশ্মির চিত্রায়নের চেষ্টা করা হয়েছে প্রতিনিয়ত মানবমস্তিষ্ক প্রসুত আলোকরশ্মি দিয়ে। মানবিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে গ্রীস ও রোমানদের সোনালী যুগ ইতিহাসের এক দীপ্ত অধ্যায়- সন্দেহ নেই। কিন্তু নবীওয়ালা প্রশিক্ষণ ও দিক-নির্দেশনার তুলনায় তা যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এক বর্বর যুগ।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সত্ত্বা ও গুণাবলির ব্যাপারে ওখানে কোন আলোকরশ্মি বা দিক-নির্দেশনা ছাড়াই যুক্তির ঘোড়া দাবরানো হয়েছে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ সুন্দর বলেছেন :
مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتِّبَاعَ الظَّنِّ
“এ বিষয়ে তাদের কোন জ্ঞান নেই। তারা শুধু মাত্র আন্দাজের অনুসরণ করে।”
বিজ্ঞান ও দর্শনের যে ম্যাজিক ওখানের দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরা সুবিস্তৃত করেছেন তা কল্পনাপ্রসুত ও বিস্ময়ের দিক দিয়ে প্রাচ্যের বিরল কল্প-কাহিনী মনোহরী ভোজভাজীকেও ছাড়িয়ে গেছে। গ্রীসের বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস ও প্লেটোর কথা, দর্শন, দার্শনিকদের চারিত্রিক প্রশিক্ষণ কোথাও কোথাও ঝলক দিত। তবে তা নবীদের প্রশিক্ষণের তুলনায় বর্ষার ঘন অন্ধকার রাতে জোনাকী পোকার আলোর মতই বিচ্ছুরিত হত। নবীদের কোন কোন শিক্ষা ও বাণী তাদের শ্রুতিগোচর হয়েছিল অনেক ক্ষেত্রে। কিন্তু তার সাহায্যে পথ চলার মত সেটা যথেষ্ট ছিল না। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সেই কথাই প্রযোজ্য:
كُلَّمَا أَضَاءَ لَهُمْ مَشَوْا فِيهِ وَإِذَا أَظْلَمَ عَلَيْهِمْ قَامُوا
“বিদ্যুৎচমক যখনই তাদের আলো দেয়, তারা তাতে চলতে থাকে। আর যখন তা তাদের উপর ছেয়ে যেত আধার, তখন ঠায় দাড়িয়ে থাকত।” (সূরা আল বাকারা, আয়াত ২০)
কি আশ্চর্য! নবী ঈসা আলাইহিস সালামের হেদায়াতের প্রদীপ প্রাচ্যে দু শত শতাব্দী পর্যন- প্রতিকুল পরিবেশের মুকাবেলা করে টিকে থেকেছে কিন্তু পাশ্চাত্যে তা নিসপ্রভ হয়ে গেছে তাঁরই গুণগ্রাহীদের আঁচল ছায়ায়। ঈসা আলাইহিস সালামের শিক্ষা সংস্কার পাশ্চাত্যে তার গতি হারিয়ে ফেলেছে। যেখানে খৃষ্টবাদের উত্থান হয়েছিল, সেখানেই শিরক ও প্রতিমা পূজার স্রোতধারা বইতে লাগল। কনষ্টাটিনোপলের সম্রাট ও সেন্ট পলের হাতে তাওহীদবাদী এ ধর্মটি পৌত্তলিক ধর্মে পরিণত হল। খৃষ্টবাদের সেই স্বর্গীয় আলোক বর্তিকা নিষপ্রভ হয়ে যাওয়ার পর পাদ্রীরা ধর্মীয় সমাবেশে প্রজ্বলিত করত কর্পূরের উজ্জল প্রদীপ। আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত আলোকবর্তিকার স্থান দখল করে নিল যান্ত্রিক প্রদীপ। আর তারা মনে করতে থাকল, ঈসা আলাইহিস সালাম কর্তৃক আনীত আলোকবর্তিকা তাদের কাছে যত্নের সাথে আছে বিদ্যমান। মুলত: কত শতাব্দী পূর্বে যে তা হারিয়ে গেছে সে খবর নেই তাদের কাছে।
এতদাসত্বেও এ বাস-বতা স্বীকার করতেই হয় যে, পাশ্চাত্যে আল্লাহ তাআলার প্রতি বিশ্বাস, পরকালের চিন্তা-চেতনা খৃষ্টবাদেরই ফসল। আসলে আসমানী ধর্ম যতই বিকৃত হোক, আল্লাহ ও আখেরাতের ধারনা শিরা উপশিরায় প্রবাহমান থাকে। খৃষ্টীয় পনের ও ষোড়শ শতকে ইউরোপে যৌক্তিকতা, বস’বাদ তথা ইন্দ্রিয়পূজার যে বিপ্লব সৃষ্টি হল, পাশ্চাত্য জগতকে তা জড়পূজায় লিপ্ত করে দিল। ধীরে ধীরে পাশ্চাত্য হয়ে উঠল জড়পূজারী। তাদের জীবনধারার রীতি-নীতি আচর-আচারণে আল্লাহ ও পরকাল আর বাকী থাকল না। আজ এ কথা জোড় দিয়ে বললে বলা ভুল হবে না যে, ইউরোপের ধর্ম খৃষ্টবাদ নয়, বস্তুবাদ। যুগ যুগ ধরে ইউরোপ মূর্তিপূজায় লিপ্ত আর দাবী করছে তারা খৃষ্টধর্মের অনুসারী। তারা অত্যন- আবেগের সাথে খৃষ্টবাদের প্রতি তাদের নিখাদ ভালোবাসা ও প্রেম প্রকাশ করে যাচ্ছে। তাদের এ নতুন মতাদর্শের গির্জা হল, ফ্যাক্টরী, শিল্প, ব্যবসা, প্রমোদভবন, শরাবখানা। এ গির্জাগুলো সর্বদা থাকে লোকের ভীড়ে আবাদ। আর এ গির্জাগুলোর পাদ্রী-পুরোহিত হল, শিল্পপতি, পুজিপতি, কারিগর, শিল্পী। এরাই সেখানে মর্যাদার পাত্র। তারাই সেখানে পূজিত হয় প্রতি নিয়ত। আর খৃষ্টবাদ থেকে গেল গায়েবী মূর্তির মতই।
পাশ্চাত্যের এ আত্নভোলা জাতির যে সকল পরিণাম বিকশিত হয়েছে, আর হচ্ছে তা তাদের বস’বাদী জীবন দর্শনেরই ফল। পাশ্চাত্য এক আল্লাহকে বাদ দিয়ে ধারন করেছে অনেক প্রভূ।
এক উপযুক্ত দরবার থেকে মাথা উঠিয়ে – যেখানে মাথা নত করলে সমস- দরবার থেকে স্বাধীন হতে পারত- মাথা ঝুকাতে লাগল সকল দরজায়। এক আল্লাহকে ত্যাগ করার শাসি- হিসাবে তারা লাভ করেছে অসংখ্য প্রভূর দাসত্ব। ফলে গোটা পাশ্চাত্য জগত তাদের হিংস্র থাবার কাছে জিম্মি হয়ে গেছে। কোথাও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভংগিতে, আবার কোথাও অর্থনীতির দেবতার সুরতে কিংবা কোথাও মনগড়া জীব-বোধের আকারে তাদের উপর চেপে বসেছে এ প্রভূত্ব। যারা তিক্ত করে রেখেছে তাদের আজ্ঞা বহদের জীবনযাত্রা। উপাসনা করছে অহর্নিশ। যার তুলনায় আল্লাহ তাআলার উপাসনা করা উচিত ছিল সহস্র গুণ। এমন কঠোর পরিশ্রম নিচ্ছে তাদের জীবন থেকে যা সাধারণত বোবা প্রাণী বা নিষপ্রাণ মেশীন থেকেও নেয়া যায় না। এমন কঠোর সাধনায় নিয়োজিত রেখেছে তাদের অদ্যাবধি যা কোন দেবতার জন্য নিবেদন করা হয়নি। আল্লাহ ব্যতীত ঐ অসংখ্য প্রভূর অভিসন্ধি ও অভিলাষে রয়েছে প্রচন্ড সংঘাত, আকর্ষণ- বিকর্ষণ। তাদের অসঙ্গত উদ্দেশ্য সাধনে উত্থান ও পতন হতে লাগল গোটা বিশ্বে। সামপ্রাতিককালের দেশাত্নবোধও একটি বড় দেবতা। সর্বদা যা শোণিত ধারা মানুষের জীবন ভক্ষনের অভিলাষী। এমনিভাবে পেট তাদের আরেক দেবতা। বিংশ শতাব্দীর মানবগোষ্ঠী দিবা-নিশি যার বন্দেগীতে লিপ্ত। তদুপরি সে তার ভক্তদের প্রতি অসন্তুষ্ট। এই তো মাত্র কিছুদিন আগে স্যার এ্যালউরলাজ তার এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘অনারম্ভর জীবন-যাপন এখন পরিগ্রহ করেছে সপ্নপুরীতে। এখন না জীবনের কোন লক্ষ্য সামনে আছে, না আছে জীবনের বড় কোন পরিকল্পনা। সকলেই রাত-দিন গাধার ন্যায় স্বীয় ফ্যাক্টরী বা অফিসে দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ। দ্রুত থেকে দ্রুততর যান নির্মিত হয়ে প্রতিটি মুহুর্তে প্রত্যেক ব্যক্তির হাত-পা যেন চক্কর ও ঘুর্ণনে ব্যতিব্যস্ত।’
আল্লাহ-কে ভুলে যাওয়ার দ্বিতীয় পরিণাম হল আত্নবিস্মৃতি। আল কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা এ বাস-ব সত্যটির বিবরণ দিয়েছেন –
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ
“তোমরা তাদের মত হইও না, যারা আল্ল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল ফলে আল্লাহও তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছিলেন।” (সূরা আল হাশর, আয়াত ১৯)
বিংশ শতাব্দীর মানুষ হল আত্নবিস্মৃতির পরিপূর্ণ মডেল। সে একেবারেই ভুলে গেছে তার মূলসত্তা, ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট, পশু ও মানবের পার্থক্য, জীবন ও জন্মলাভের মূল উদ্দেশ্য। সে অবলম্বন করেছে পশুসুলভ, জড়বাদী জীবন পদ্ধতি। রূপান্তরিত হয়েছে টাকা-ডলার তৈরীর একটি মেশীনে। যে নিজে তা থেকে কোন উপকার লাভ করতে পারে না। অন্তত শারিরিক আমোদ-প্রমোদ আন্তরিক প্রশান্তিই তো তার চেষ্টা-প্রচেষ্টার দাবী। কিন্তু তার জীবনে এর জন্যও কোন সুযোগ হয়ে উঠে না। এমনকি এ অনুভূতিটুকুও অনুভব করার যোগ্যতা সে হারিয়ে ফেলেছে।
প্রফেসর জোড যথার্থই বলেছেন- ‘সম্প্রতিকালের মানব সমাজের সম্পর্ক হল অগ্রগতির সাথে। অগ্রগতিই ইদানীং কালের যুবকদের উপাস্য। এর আস্তানায় তারা পেতে চায় স্বস্তি, শান্তি ও নিরাপত্তা। অন্যের প্রতি দয়াপরবশ হওয়াকে তারা প্রত্যাখ্যান করে নির্দয়ভাবে।’
বর্তমান বিশ্ব আত্নভোলা পাগলামীতে মানুষের মৌলিক অবকাঠামো বদলে দিয়েছে। সে স্বীয় উন্নতি নির্দিষ্ট পথ ছেড়ে ভিন্ন লাইনে অগ্রগতির উচ্চ শিখরে আরোহন করেছে। আসলে সত্যিকার মানুষ হিসাবে সে কোন উন্নতি করেনি। বরং তার মানুষত্বের বৈশিষ্টে ধস নেমেছে। সামপ্রতিক অগ্রগতিগুলো বিশ্লেষণ করলে বের হয়ে আসবে এগুলো হল হিংস প্রাণীর চরিত্র আর বিহঙ্গকুল ও মৎসরাজীর কলাকৌশল।
একজন পশ্চিমা লেখক এ বাস-বতাকে স্বীকার করেছেন এভাবে: ‘আমাদের বিষ্ময়কর শৈল্পিক বিজয় এবং লজ্জাকর ছেলে মানুষী চরিত্রের যে ব্যবধান, এর কারণে আমাদের জীবনের বাঁকে বাঁকে জন্ম নিয়েছে প্রচুর সমস্যা। আমাদের এ অগ্রগতির রূপরেখাটা হল ; আমরা সমুদ্র পারে বসে এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশের মানুষের সাথে কথা বলতে পারছি সহজে। সমুদ্রের উপরে ছুটাছুটি করি আর তার তলদেশে সাতার কাটি। সেলুনে বসে রেডিও মারফত লন্ডনের বড় ঘন্টার ধ্বনি শুনি। আমাদের ফোনগুলোতে কথার সাথে সাথে আসতে থাকে ছবি। বিদ্যুতযোগে পাকানো হচ্ছে ফসলাদি। তৈরী হচ্ছে রাবারের সড়ক। আধুনিক যন্ত্রপাতির বরকতে আমরা অনায়াসে দেখতে পাচ্ছি শরীরের ভিতরের বিভিন্ন অংশ। বৈদ্যুতিক হিটে চুলে সিঁথি কাটতে শিখেছি আমরা। সামুদ্রিক জাহাজ উত্তর মেরু আর বায়ু জাহাজ দক্ষিণ মেরু পর্যন- উড়ে যায়। এত কিছু সত্বেও আমরা পারি না আমাদের শহরগুলোতে কোন বিস্তৃত ময়দান বানাতে যেখানে অসহায় শিশুরা আরাম আয়েশে খেলাধুলা করবে, মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াবে।’
ভারতীয় এক দার্শনিকের সাথে নিজেদের সভ্যতার গুণ-কীর্তন করছিলাম এক মোটর চালক সম্পর্কে। সে এক ঘন্টায় তিনশত চার মাইলের দূরত্ব অতিক্রম করে রেকর্ড করেছিল। আমার কথা শুনে ভারতীয় দার্শনিক বললেন, ‘হ্যাঁ, কথা সত্য। চড়ুই পাখীর মত তোমরা আকাশে উড়তে পার। মাছের মত পানিতে সাতরাতে জান, কিন্তু মানুষের মত পৃথিবীতে চলতে জান না।’
তাই বলতে হয়, আত্নবিস্মৃতিতে অগ্রসর পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার অভিযোগ করে কোন লাভ নেই।
পাশ্চাত্যের আল্লাহ ও পরকাল ভুলে যাওয়ার চিত্র হল – পার্থিব জীব ও জাগতিক বস্তুর স্বাদ আস্বাদন, ভোগ বিলাস এক চরম উম্মাদনা আর অবিচ্ছেদ্য পীড়ায় রূপান-রিত হয়েছে। ভোগ-বিলাসই হল তাদের জীবনের প্রধান টার্গেট। আজ পাশ্চাত্যের পরতে পরতে ধ্বনিত হচ্ছে ভোজন উৎসব ও পানাহারের কলরব। ভেসে আসছে আমোদ-প্রমোদের সুউচ্চ আওয়ায। তারা এ ভোগ বিলাস ও তার উপকরণ অর্জনের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। এ প্রতিযোগিতা মানুষকে এক সীমাহীন প্রান-র বানিয়ে দিয়েছে যেখানে তার আত্না বিভ্রান- হয়ে ঘুরে বেড়ায় আপন গৃহের সন্ধানে। এ যেন জীবনের এক তীব্র তৃষ্ণা যা কখনো নির্বাপিত হবার নয়। এক প্রচন্ড ক্ষুধা যা নিবারণ হবার নয়। প্রতিটি মানুষের জানবাজ শ্লোগান একটি: আরো চাই! আরো চাই!! দিন দিন বাড়তে লাগল জীবনের প্রয়োজন। সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগল প্রবৃত্তির দাবী পুরনের রকমারি উপকরণ। যা সামাজিক জীবনকে করে তুলল জটিল থেকে জটিলতর। তীব্র হতে লাগল ব্যসায়িক প্রতিযোগিতা। নিজেদের জীবনের মানদন্ড দিন দিন উন্নততর হতে লাগল। অন্যকে পরাস- করে নিজেদের চাহিদার উপকরণ যোগার তাদের নেশায় পরিণত হয়ে গেল। নিজেদেরে লোভ-লালসা, ভোগ-বিলাস, কু-প্রবৃত্তির তাড়না পুরনের এক আজীবন সংগ্রামে হারিয়ে গেল মনজিলে মকসুদের আসল ঠিকানা।
পরকাল অস্বীকৃতি বা পরকাল ভুলে যাওয়ার পর আমোদ-প্রমোদ ও জীবন উপভোগের এ আবেগ – আমরা মুসলিমরা যাকে ছেলেমী মনে করি- সম্পূর্ণভাবে পরকাল অস্বীকার করার ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি। এ জীবনের পর আকেটি জীবন আছে বলে যারা ভাবতে পারে না, তারা এ জীবনের স্বাদ উপভোগে, আত্নার দাহ নেভাতে কেন ত্রুটি করবে? তারা ভোগ-বিলাস রেখে দেব কোন সুদিনের জন্য? এ জন্যই মহান আল্লাহ বলেন:
وَالَّذِينَ كَفَرُوا يَتَمَتَّعُونَ وَيَأْكُلُونَ كَمَا تَأْكُلُ الْأَنْعَامُ وَالنَّارُ مَثْوًى لَهُمْ
“আর যারা কাফের তারা ভোগ বিলাসে মত্ত থাকে এবং চতুষ্পদ জন’র মত আহার করে। তাদের বাসস্থান জাহান্নাম।” (সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত ১২)
তিনি আরো বলেন:
ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ
“ছেড়ে দিন তাদেরকে খেয়ে নিক তারা এবং আশায় ব্যাপৃত থাকুক। অতিসত্বর তারা জানতে পারবে।” (সূরা আল হিজর, আয়াত ৩)
পরকাল অস্বীকার করার দ্বিতীয় পরিণাম হল – দুনিয়া ও তার উপকরণ, দুনিয়ার কর্ম সুসজ্জিত, যৌক্তিক ও বিবেক সম্মত মনে হয়। জন্ম নেয় বস-বাদী মানসিকতা।
আল্লাহ তাদের সম্পর্কে বলেছেন :
إِنَّ الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآَخِرَةِ زَيَّنَّا لَهُمْ أَعْمَالَهُمْ فَهُمْ يَعْمَهُونَ
“যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, আমি তাদের দৃষ্টিতে তাদের কাজ-কর্মকে সুশোভিত করে দিয়েছি।” (সূরা আন নমল, আয়াত ৪)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেনঃ
قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا ﴿১০৩﴾ الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا ﴿১০৪﴾ أُولَئِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآَيَاتِ رَبِّهِمْ وَلِقَائِهِ فَحَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَلَا نُقِيمُ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَزْنًا ﴿১০৫﴾
বল, ‘আমি কি তোমাদেরকে এমন লোকদের কথা জানাব, যারা কর্মের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস-?’ দুনিয়ার জীবনে যাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেছে, অথচ তারা মনে করছে যে, তারা ভাল কাজই করছে! ‘তারাই সেসব লোক, যারা তাদের রবের আয়াতসমূহ এবং তাঁর সাথে সাক্ষাত (পরকাল) কে অস্বীকার করেছে। ফলে তাদের সকল আমল নিষ্ফল হয়ে গেছে। সুতরাং আমি তাদের জন্য কিয়ামতের দিন কোন ওজনের ব্যবস্থা রাখব না।’ (সূরা আল কাহাফ, আয়াত ১০৩-১০৫)
পরকাল অস্বীকারের আরেকটি পরিণতি হল – জীবনে বাস-বতা আর গাম্ভীর্যতার অংশ খুবই কম। ক্রীড়া কৌতুক, আমোদ-প্রমোদ আর বিনোদন ক্রিয়ায় কেটেছে জীবনের সিংহ ভাগ। চিত্ত বিনোদনের গ্রাসে চলে যাচ্ছে জীবনের একটি বড় অংশ। এমনকি বড় বড় সঙ্কটপূর্ণ মুহুর্তেও তাদের আনন্দ বিনোদনে কোন ভাটা পড়ে না।
ইরশাদ হচ্ছে –
وَذَرِ الَّذِينَ اتَّخَذُوا دِينَهُمْ لَعِبًا وَلَهْوًا وَغَرَّتْهُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا
“তাদেরকে পরিত্যাগ করুন, যারা নিজেদের ধর্মকে ক্রীড়া কৌতুক রূপে গ্রহণ করেছে এবং পার্থিব জীবন তাদের-কে ধোকায় ফেলেছে।” (সূরা আল আনআম, আয়াত ৭০)
পরকাল অস্বীকারের আরেকটি পরিণাম হল- আকষ্মিক ঘটনাবলিতে বাস-ব কারণের প্রতি তাদের দৃষ্টি যায় না। তাদের দৃষ্টি তখন আটকে যায় বাহ্যিক কিছু বস্তুর উপর। তারা পৌছতে পারে না ঘটনার অন-রে। ফলে অত্যন- সংকটময় মুহুর্তেও তাদের আমোদ প্রমোদে মত্ত থাকতে দেখা যায়। উদাসীনতায় ঘাটতি আসে না তখনো। ঐ আকষ্মিক ঘটনার কোন একটি কাল্পনিক ব্যাখ্যা বের করে শান- হয়ে যায়। কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে না তাদের রীতি নীতি ও জীবন ধারায়।
আল কুরআনুল কারীমে তাদের স্বভাবের কথা আলোচিত হয়েছে এভাবে –
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا إِلَى أُمَمٍ مِنْ قَبْلِكَ فَأَخَذْنَاهُمْ بِالْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ لَعَلَّهُمْ يَتَضَرَّعُونَ فَلَوْلَا إِذْ جَاءَهُمْ بَأْسُنَا تَضَرَّعُوا وَلَكِنْ قَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ
“আর অবশ্যই আমি তোমার পূর্বে বিভিন্ন কওমের কাছে রাসূল প্রেরণ করেছি। অতঃপর আমি তাদেরকে দারিদ্র্য ও দুঃখ দ্বারা পাকড়াও করেছি, যাতে তারা অনুনয় বিনয় করে। সুতরাং তারা কেন বিনীত হয়নি, যখন আমার আযাব তাদের কাছে আসল? কিন্তু তাদের হৃদয় নিষ্ঠুর হয়ে গিয়েছে। আর তারা যা করত, শয়তান তাদের জন্য তা শোভিত করেছে।” (সূরা আল আনআম, আয়াত ৪২- ৪৩)
পরকাল অস্বীকার করার আরেকটি পরিণাম হল, অহংকার। যাদের অহংকার আর দম্ভ আছে তারা আখেরাতে বিশ্বাস করে না। তারা নিজেদের অনেক বড় কিছু মনে করার কারণে মহা শক্তিশালী সত্তার বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। তাহলে তাকে এক লাগামহীন পাগলা ঘোড়ার মত উদ্ধত হওয়া থেকে রুখতে পারে কিসে? এ জন্য আল কুরআনুল কারীমে আখেরাত অস্বীকারের সাথে সাথে অহংকারের প্রসঙ্গ আলোচ না করা হয়েছে।
ইরশাদ হচ্ছে :
إِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَالَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِالْآَخِرَةِ قُلُوبُهُمْ مُنْكِرَةٌ وَهُمْ مُسْتَكْبِرُونَ
“তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ। অতঃপর যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না, তাদের অন-র অস্বীকারকারী এবং তারা অহঙ্কারী।” (সূরা আন নাহল: আয়াত ২২)
এমননি ভাবে পরকাল অস্বীকারকারী, বস’বাদী সমপ্রদায়ের হিংস থাবা, তাদের জুলুম অত্যাচার, আর তাদের বিজয়ী ঔদ্ধত্য সারা বিশ্বে এক ভয়াবহ টর্ণেডো সৃষ্টি করছে।
ইরশাদ হচ্ছে :
وَإِذَا بَطَشْتُمْ بَطَشْتُمْ جَبَّارِينَ
“যখন তোমরা আঘাত হান, তখন জালিম ও নিষ্ঠুরের মত আঘাত হান।” (সূরা আশ শুআরা, আয়াত ১৩০)
এমনিভাবে পাশ্চাত্যবাসীরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি ঈমান আনার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত। যদিও তারা ঈসা আলাইহিস সালাম- কে আল্লাহ তাআলার পুত্র হিসাবে মেনে নিয়েছে কিন্তু তারা তাকে জীবনাদর্শ ও অনুসরণীয় রাসূল হিসাবে মেনে নেয়নি। জীবনাদর্শ হিসাবে মেনে নেয়াটা ছিল একটি বিশ্বাসগত বিষয়। একে মেনে নেয়ার দ্বারা তাদের জীবন, চরিত্র ও কর্মকান্ডে বিস-র প্রভাব পড়ত। তাদের কাছে মসীহ আলাইহিস সালামের জীবনের মাত্র তিনটি বছরের কর্ম বিবরণ ছিল। তা আবার এমন, যা বাস-বায়ন করা সাধ্যের বাহিরে। পাশ্চাত্য জগত যদি ঈসা মসীহ আ. এর জীবন-চরিত, কথা-বার্তা, পথ-নির্দেশনাকে আদর্শ বানাতে চাইত তাহলে তা তাদের জন্য জটিল হত। কারণ খৃষ্টান পাদ্রীদের কাছে এরূপ কোন বিশুদ্ধ জ্ঞান ভান্ডার ছিল না। যা থেকে একটি জাতির জন্য সুষ্ঠু পথ নির্দেশনা দেয়া যেতে পারত। আবার তারা ধর্মীয় প্রজ্ঞা ও অন-র্দৃষ্টি সম্পন্ন ছিল না। যা দিয়ে তারা জাগতিক অগ্রগতির পাশাপাশি তাদেরকে ধর্মীয় পরিমন্ডলে রাখতে পারে। ফলে খৃষ্টান জাতি ঈসা মসীহ ও গির্জার তত্তাবধান থেকে নিজেদের মুক্ত করে বাধা-বন্ধনহীন এমনভাবে জীবন যাপন করতে লাগল, যেন তারা কোন নবীর উম্মত নয়। তারা বঞ্চিত হল চারিত্রিক শিক্ষা ও আত্নশুদ্ধি থেকে যা নবীদের অনুসারীরাই লাভ করে থাকে। তারা জাগতিক উপকরণ সঞ্চয় করেছে প্রচুর কিন্তু আদর্শের কোন পরিবর্তন হয়নি। বস’বাদী জ্ঞান বিজ্ঞান দ্বারা তা হতেও পারে না।
পরিণামে এ সকল উপকরণ ও শক্তি যা কল্যাণ প্রবনতার সাথে সাথে যা মানুষের অগ্রগতির কারণ হতে পারত, তা পরিণত হল, নেতৃত্ব, দখলদারি ও সাম্রাজ্যবাদী হাতিয়ারে।
এ আল্লাহ ভোলা পরকাল বিস্মৃতি এবং নবীদের শিক্ষা-প্রশিক্ষণ বিমুখতার পরিণাম হল, পাশ্চাত্য আজ এত আলোকিত যে রাত দিনের মত উজ্জল। আর দিন রাতের চেয়েও কালো।
বিগত বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পর লয়েড জর্জ বলেছিলেন : ‘যদি আজ ঈসা মসীহ (যীশু) পৃথিবীতে আগমন করতেন, তাহলে বেশীদিন বাঁচবেন না।’ চিন্তার বিষয় হল, দু হাজার বছর পরও মানুষ ফেতনা-ফাসাদ, রক্তপাত, হত্যা, লুন্ঠনে নিয়মিত জড়িত বরং তার ভয়াবহতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তিনি যদি আসেন তাহলে দেখবেন, দেশে দেশে যুদ্ধের প্রস’তি, একে অন্যের জীবন হরণে তৎপরতা, নিপীড়ণ নির্যাতনের রকমারি হাতিয়ার আবিস্কার ও মানুষকে কষ্ট দেয়ার নিত্য নতুন প্রণালী নিয়ে তার অনুসারীরা ব্যস্ত।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের প্রারম্ভে মি. ইডেন বলেছিলেন : ‘বিশ্ববাসী, যতদিন কিছু করা যায়, জানা যায়, করে নাও ও জেনে নাও। কেননা এ শতাব্দীর শেষ দিকে এসে গুহায় জীবন যাপনকারীরা পৃথিবীর প্রাচীন বর্বর যুগের জীবন পদ্ধতি অবলম্বন করবে। সুচনা হবে ঐ বর্বর যুগের, হাজার বছর পূর্বে যা প্রতিষ্ঠিত ছিল।’
কী বিষ্ময়কর ব্যাপারঃ সমস- দেশ একটি অস্ত্র থেকে বাঁচার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে, যার ব্যাপারে সকলেই ভীত-সন্ত্রস- কিন্তু তাকে আয়ত্তে রাখতে কেউ রাজী নয়। কোন সময় বিস্মিত হয়ে ভাবি অন্য কোন গ্রহ থেকে যদি কোন পর্যটক, তীর্থ যাত্রী এ পৃথিবীতে আসে, এ পৃথিবীকে দেখে তখন কি বলবে? সে দেখবে আমরা সকলে নিজেদের ধ্বংসের উপকরণ তৈরীতে ব্যস-। আরো মজার ব্যাপার হল, একে অপরকে তার ব্যবহার পদ্ধতিও জানিয়ে দিচ্ছি। আজ থেকে চৌদ্দ শত বছর পূর্বের সভ্য জগতের কথা চিন্তা করুন। রোম ও পারস্য সম্রাটদের হাতে ছিল যে সভ্যতার দিক-নির্দেশনা। তা আজকের জগতের সাথে প্রায় মিলে যায়। তখনও মানুষ আল্লাহকে ভুলে গিয়ে আত্নবিস্মৃতিতে নিমজ্জিত হয়েছিল। আল্লাহ তাআলার প্রতি বিশ্বাস এক ঐতিহাসিক থিওরীর চেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। মানুষ ঐতিহাসিকভাবে অবশ্য এ স্বীকৃতি দিয়ে আসছিল যে, এ বিশ্ব-ভূবনকে কোন কালে আল্লাহ তাআলাই সৃষ্টি করেছেন।
এদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন :
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ لَيَقُولُنَّ اللَّهُ
“আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে কে সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ।”
কিন্তু তাদের বাস-ব জীবন ছিল এ স্বীকৃতির বাস-বায়ন থেকে ভিন্নতর। তাদের কর্মজীবন ছিল এ রূপ যেন আল্লাহ বলতে কেউ নেই। অথবা আছেন, কিন্তু নির্জনতা অবলম্বন করেছেন। বা অন্যদের স্বার্থে সাম্রাজ্য থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। জগত জুড়ে এক আল্লাহ তাআলার পরিবর্তে বহু খোদার পূজা ও উপাসনার মায়াজাল বিস্তৃত ছিল। কোথাও ভূত-প্রেতের অর্চনা ছিল আবার কোথাও সমপ্রদায় বা বংশের। কোথাও বন্দেগী করা হত লালসা ও কামনার। কোথাও বা শক্তি ও ক্ষমতার। কোথাও বাদশা সম্রাটদের বা পাদ্রী সন্নাসীদের। মানুষ ভুলে গিয়েছিল তার জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। জীবনের সঠিক কর্ম ভুলে গিয়ে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল অনর্থক ব্যস-তায়। শাষকগোষ্ঠী লিপ্ত ছিল নির্যাতন, নিপীড়ণ, বলাৎকার, অন্যায়ভাবে শক্তি প্রয়োগ করে রাজত্ব পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগত করতে। ভোগ বিলাসে মত্ত ছিল আমীর ওমরাগণ। তখন জীবন যাপনের মডেল ছিল বহু উন্নত এবং জীবনোপকরণের প্রাচুর্যে ছিল না কোন ঘাটতি। ফলে শাষকগোষ্ঠী নতুন নতুন ট্যাক্স, জরিমানা ও অত্যাচার করেও জীবনের দাবী পূরণে ব্যর্থ হচ্ছিল।
মধ্য স-রের লোকেরা সর্বদা ব্যতিব্যস- থাকত উঁচু স্তরের মানুষদের তোষামোদ ও অনুকরণে। অসহায় লোকেরা মাথা তোলার সুযোগ পেতনা কোথাও। নির্দেশ পালন, দাসত্ব ও নিত্য নতুন ট্যাক্সের বোঝায় জীবন ভারী হয়ে উঠত। স্বীয় মনিবের ভোগ-বিলাস, তাদের বৈধ-অবৈধ দাবী পূরনের জন্য ভাষাহীন প্রাণীর ন্যায় বন্দি থাকত। যখন তা থেকে কিছুটা ছুটি মিলত, তখন নোংড়া আমোদ-প্রমোদে ডুবে যেত। এভাবেই তারা আত্ন প্রশানি- লাভ করত। ধর্ম, সৃষ্টিকর্তা ও পরকালের চিন্তায় কাটত না তাদের এক শ্বাস পরিমাণ সময়ও। পঙ্কিল শহরের হুকুমতের লালসা ও রাজ্য দখলের উচ্চাকাংখা ছিল তাদের নিত্য দিনের সঙ্গী। পারস্য সম্রাট কোন কারণ ছাড়াই খৃষ্টরাজ্য সিরিয়ায় আক্রমণ করেছে। নব্বই হাজার নিরাপরাধ মানুষের তপ্তলহুতে রক্তাক্ত করেছে আল্লাহর এ জমিন। এর প্রতিশোধ নিল রোম সাম্রাজ্য। একটি নিরাপদ শহরের প্রতিশোধ নিল আরেকটি নিরাপদ শহর দিয়ে। এ রক্তাক্ত যুদ্ধ ধারা বছরের পর বছর চলতে থাকল কোন যুক্তি ছাড়াই। পৃথিবীর দুটো বৃহৎ সাম্রাজ্যের সুসভ্য মানুষগুলো হায়েনার মত লড়ছে একে অপরের বিরুদ্ধে। আঁধার ছেয়ে গিয়েছিল তখন গোটা পৃথিবীতে। আর এর জন্য দায়ী ছিল কোন অসভ্য সমাজ? ইরশাদ হচ্ছে :
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُمْ بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ
মানুষের কৃতকর্মের দরুন স’লে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদেরকে আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে। (সূরা আর রূম, আয়াত ৪১)
তৎকালীন ঘুনে ধরা সভ্য জগতে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নিকটবর্তী স্থানে আল্লাহ পাঠালেন এক উম্মী নবী-কে। যার অবস্থান ছিল সভ্যতার গর্বে গর্বিত দু সাম্রাজ্যের মধ্যখানে অথচ খুব কাছে। তিনি যেন শতাব্দীভর নিপতিত শাসি- থেকে উদ্ধার করেন জগত-কে। আসন্ন পরকাল জীবনের শাসি- সম্পর্কে সতর্ক করেন। সকল প্রকার দাসত্ব থেকে বের হয়ে মহান আল্লাহর দাসত্ব করতে আদেশ করেন। ছিন্ন করে দেন সকল শিকল, যাতে তারা আবদ্ধ ছিল। তিনি তাদের নির্দেশ দেন সৎকর্মের আর নিষেধ করেন সকল অসৎকর্ম থেকে। যা কিছু পবিত্র ও কল্যাণকর তা হালাল ঘোষণা করেন। যা অপবিত্র ও ক্ষতিকর তা হারাম করে দেন।
সপ্তম হিজরী সনে এই নবী মদীনা থেকে রোম সম্রাট বরাবরে একটি পত্র লিখেন। যাতে আহবান ছিল :
يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَى كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ
হে আহলে কিতাবগণ (ইহুদী ও খৃষ্টান সমপ্রদায়) তোমরা এমন কথার দিকে আস, যেটি আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান যে, আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত না করি। আর তার সাথে কোন কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ কাউকে আল্লাহ ছাড়া রব হিসাবে গ্রহণ না করি।’
রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস এ আহবানের সত্যতা বুঝেছে, কিন্তু নিজস্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক দুর্বলতার কারণে এ আহবানে সাড়া দিতে পারেনি। তাদের অনেক শক্তি ও ক্ষমতা থাকলে কোথাও যেন একটি অসহায়ত্ব তাড়া করে ফিরেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, এ বার্তাকে সাদরে গ্রহণ করেছে আরবের নিরুপায়, দুর্দশাগ্রস- সমপ্রদায়। পরিণামে লাভ করেছে তারা দুনিয়ার রাজত্ব। আর ছিন্ন ভিন্ন করে দিয়েছিল দাসত্বের সকল শৃংখল। এক আল্লাহর কাছে মাথা ঝুকিয়ে স্বাধীন হয়ে গেছে সকল রাজদরবার থেকে। না বাকী ছিল প্রবৃত্তির দাসত্ব, না সম্রাট ও সাম্রাজ্যের। না কুসংস্কার, না ভ্রান- প্রথার, না সোসাইটির নিপীড়ণমুলক বন্ধনের।
আল্লাহ তাআলার পরিচয়, তাঁর মহত্ব, বড়ত্ব ভন্ডুল করে দিল পৃথিবীর কৃত্রিম প্রভূদের মহত্বের সব যাদু। ফল হল এই, আরবের ক্ষুধার তারনায় কাতর, ছিন্ন বস্ত্র, পশমী কম্বল পরিহিত মরুচারী, যারা নির্জন মরুভূমি থেকে বেরিয়ে আসত না কখনো, যারা জাঁকজমকের বিকাশ ঘটাতে জানত না, তাদের দেখা গেল অনরাবী সম্রাটের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে। তাদের দরবারে গিয়ে তাদের রানের সাথে রান লাগিয়ে বসতে। শান শওকতের কৃত্রিম প্রকাশ তাদের উপর কোন প্রভাবই রাখেনি।
সাহাবী সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. ইরানের প্রতাপশালী সেনাপতি রুস-মের আহবানে রিবয়ী ইবনে আমেরকে দূত হিসাবে পাঠালেন তারই কাছে। ইরানীরা বেশ জাঁকজমকের সাথে সংসদ সাজিয়েছে। সোনালী তারের কারুকার্য খচিত কার্পেটে রেশমের তুলতুলে নরম বিছানা বিছিয়েছে। ইয়াকুত ও মনি-মুক্তার আলোকছটায় দৃষ্টি প্রায় কেড়ে নিচ্ছিল। স্বর্ণখচিত মুকুট রুস-মের মাথায়। শরীরে স্বর্ণের পরিচ্ছদ আর সোনালী সিংহাসনে সমাসীন।
অপরদিকে ইসলামী বাহিনীর দূত রিবয়ী রা. রাজ দরবারে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন, শরীরে মোটা সুতি কাপড়, হাতে নাঙ্গা তলোয়ার, ঢাল, রানের নীচে হাল্কা ঘোড়াসহ অত্যন- সংকোচহীন ভঙ্গিতে রাজ দরবারে প্রবেশ করলেন। ঘোড়া থেকে নেমে একজন দরবারী আমীরের চেয়ারের সাথে ঘোড়া বেধে সভায় উপসি’ত হতে যাচ্ছেন। এরই মধ্যে একজন গার্ড তার পথ আগলে ধরল। বলল, হাতিয়ার রেখে দিন। বলিষ্ঠ উত্তর দিলেন রিবয়ী। বললেন, “আমি স্বেচ্ছায় আসিনি এখানে। তোমাদের আমন্ত্রণে এসেছি। যদি এ অবস’ায় আমার আগমন তোমাদের পছন্দ না হয়, তাহলে আমি এক্ষুনি চলে যাব।”
সেনাপতি রুস-ম গার্ডকে বলল, আসতে দাও তাকে। রিবয়ী নিজের বর্শা কার্পেটে বিদ্ধ করতে করতে দৃঢ় পদক্ষেপে আগে বাড়তে লাগলেন। কার্পেট বার বার ফুটো হতে লাগল। তিনি রুস-মের পাশে গিয়ে বসলেন। রুস-ম জিজ্ঞেস করল, এ দেশে কি উদ্দেশ্যে আপনাদের আগমন? তিনি জবাব দিলেন স্পষ্টভাবে, “আল্লাহ তাআলা এক মহান কাজের জন্য আমাদের নিয়োজিত করেছেন। তা হল, আমরা তাঁর নির্দেশে তাঁর বান্দাদেরকে মানুষের গোলামী থেকে মুক্ত করে আল্লাহর দাসত্বের দিকে নিয়ে যাই। পার্থিব সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে আখেরাতের প্রশস-তার দিকে আহবান করি। ধর্মের নামে রকমারি নির্যাতন নিপীড়ণ থেকে উদ্ধার করে ইসলামের সাম্য ও ন্যায়নীতির তাবুতে প্রবেশ করাই। তিনি আমাদের স্বীয় ধর্মসহ সকল সৃষ্টিজীবের কাছে পাঠিয়েছেন। আমরা যেন তার ধর্মের দিকে মানুষকে আহবান করি। যদি তারা তা মেনে নেয় তবে আমরা চলে যাব। আর যদি তা অস্বীকার করে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা লড়ে যাব। আমরা লাভ করব আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুত পুরস্কার।
রুস-ম জিজ্ঞেস করল, কী সেই পুরস্কার?
বললেন, এ পথে যারা শহীদ হবে তাদের জন্য আছে জান্নাত। আর যারা গাযী হবে তাদের জন্য আছে নুসরত ও সম্মান।
রুস-ম বলল, আমি আপনাদের কথা শুনলাম। আপনি আমাদের কিছু সময় দেবেন কি, যাতে আমরা রাজন্যবর্গের সাথে পরামর্শ করতে পারি?
রিবয়ী রা. বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। কতদিন প্রয়োজন আপনার? এক দিন, দু দিন?
রুস-ম বলল, এতো তাড়াতাড়ি কী করে হবে? রাজধানীতে আমাদের চিঠি-পত্র পাঠাতে হবে, সিদ্ধান- জানতে হবে।
রিবয়ী বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিন দিনের বেশী সময় দেয়ার নজীর রেখে যাননি। তাই এ বিষয় তাড়াতাড়ি সিদ্ধান- করে ফেলুন আর তিনটি পথের মধ্যে যে কোন একটি বেছে নিন। ইসলাম গ্রহণ করুন নয়তো জিযিয়া কর প্রদান করুন অথবা যুদ্ধের জন্য তৈরী হোন।
রুস-ম বলল, আপনি কি মুসলিমদের নেতা?
রিবয়ী বললেন, না, সমস্ত মুসলমান একটি শরীরের মত। এখানে সকলে সমান অধিকার রাখে।
আরেকবার দূতের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিলেন সাহাবী মুগীরা ইবনে শোবা রা. । সেদিন পারস্যের রাজদরবার ছিল অভিনব জাকজমকপূর্ণ। ইরানীরা তাদের শান শওকত, দওলত, মহরতের চুরান্ত সমাবেশ ঘটিয়েছিল সেদিন। মুগীরা রা. প্রচলিত রীতিনীতি উপেক্ষা করে সম্রাটের প্রতি অগ্রসর হলেন এবং তার রানের সাথে রান মিশিয়ে বসে গেলেন। ইরানী দরবারীরা এ দৃশ্য সহ্য করতে পারল না। তারা তার বাহু ধরে সিংহাসন থেকে নামিয়ে দিল। মুগীরা রা. দীপ্ত কন্ঠে বললেন : অতিথির সাথে এ আচরণ ঠিক হয়নি। আমাদের মাঝে এ রীতি নেই যে একজন খোদা সেজে বসবে আর সকল মানুষ তার সামনে দাসের মত দাড়িয়ে থাকবে।
তার এই বীরত্বপূর্ণ কথা যখন অনুবাদ করা হল, তখন দরবার পিন-পতন নীরবতায় ছেয়ে গেল। এবং তারা তাদের ভুল স্বীকার করল।
সাহাবী মুআজ বিন জাবাল রা. দুত হিসাবে গেলেন এক রোমীয় রাজ দরবারে। সেখানে ছিল স্বর্ণখচিত বিছানা। মুআজ রা. জমিনে বসে গেলেন এবং বললেন, আমি এমন বিছানায় বসতে চাই না যা দরিদ্র, অসহায়দের অধিকার হরণ করে তৈরী করা হয়েছে।
খৃষ্টানগণ বলল, আমরা আপনাকে সম্মান দেখাতে চেয়েছিলাম কিন্তু কি করার, নিজেদের সম্মানের প্রতি আপনাদের কোন খেয়াল নেই।
মুআজ রা. দাড়িয়ে গেলেন, আর বললেন, তোমরা যাকে সম্মান মনে কর তার প্রতি আমার কোন আগ্রহ নেই। যদি জমিনে বসা দাসদের অভ্যাস হয়ে থাকে তাহলে আমার চেয়ে আল্লাহ তাআলার বড় দাস আর কে?
তাদের একজন জিজ্ঞেস করল: মুসলিমদের মধ্যে তোমার চেয়ে বড় কেহ আছে?
মুআজ বললেন, আমি সর্বনিকৃষ্ট নই। এটাই তো বড়।
রোমানরা তাদের সম্রাটকে নিয়ে গর্ববোধ করতে লাগল। মুআজ রা. বললেন, তার উপর তোমাদের গর্ব এ কারণে যে, তোমরা এম সম্রাটের প্রজা। তোমাদের জান মালের ব্যাপারে তার ক্ষমতা আছে। কিন্তু আমরা যাকে শাসক বানিয়েছি, তিনি কোন বিষয় নিজেকে আমাদের উপর প্রাধান্য দেন না। যদি তিনি ব্যভিচার করেন, তাকে দোররা মারা হবে। তিনি যদি চুরি করেন, তার হাত কেটে দেয়া হবে। তিনি পর্দার আড়ালে বসেন না। তিনি নিজেকে আমাদের চেয়ে বড় মনে করেন না। তার সম্পদ আমাদের চেয়ে বেশী নেই।
এ হচ্ছে মানুষের আমূল পরিবর্তন- যারা এক আল্লাহকে প্রকৃত প্রভূ ও উপাস্য মেনে নিয়েছে। বদলে গেছে তাদের জীব আদ্যোপান-। যারা ছিল পশুর দোষে দুষ্ট তারা বনে গেল ফেরেশ্‌তার গুণে গুণান্বিত। যারা ছিল লুণ্ঠনকারী ও ডাকাত, তারাই অন্যের সম্পদে রক্ষাকারী হয়ে গেল। যারা পশুকে আগে পানি পান করার অধিকার নিয়ে বছরের পর রক্তপাতে লিপ্ত ছিল, তারাই নিজের জীবন দিয়ে অন্যকে পানি পান করাল। যারা নিজেদের কন্যা সন-ানদের জীবন- কবর দিত তারাই অন্যের শিশু প্রতিপালনের জন্য নিজেদের কোল খালি করতে লাগল। যারা অন্যের সম্পদকে মনে করত নিজের সম্পদ। তারাই নিজের সম্পদে অন্যের অধিকার আগ্রহ ভরে মেনে নিল।
আল্লাহ তাআলার সন’ষ্টি অন্বেষণ, তাদের দুনিয়া ও রিযক অন্বেষনের উদ্যম ও আবেগকে শেষ করে দিয়েছে। যা পুরো বিশ্বটাকে পরিণত করেছে হাট-বাজারে।
সেই দীনের প্রতি সকল মানুষের আগ্রহ জাগিয়ে তুলল। পবিত্র বানাল মানুষের ভিতর ও বাহির। সুন্দর করে দিল চরিত্র ও আচার-আচরণ।
মানুষের বিভিন্ন স-রে একে অপর থেকে অগ্রণী হওয়ার প্রতিযোগিতা চলত কিন্তু তা ছিল নেক আমল ও সৎকর্মে।
দরিদ্র সাহাবায়ে কেরাম রাসূলের দরবারে এসে বললেন : আমাদের মধ্যকার ধনী ভাইয়েরা আমাদের চেয়ে যে আগে বেড়ে যাচ্ছে। নামাজ, রোযা তারা আমাদের মতই করে কিন্তু দান ছদকা করতে পারি না আমরা তাদের মত। দয়াময় রাসূল তাদের একটি জিকির শিখিয়ে দিলেন। এটা আমল করলে তারা ধনীদের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে। ধনীরা তা শুনে ফেলল। তারাও আমল শুরু করে দিল। গরীব সাহাবায়ে কেরাম আবার এসে বললেন, আমরা তো আবার পিছনে পড়ে যাচ্ছি। আমাদের ধনী ভাইয়েরা তো সে আমল করতে শুরু করেছে যা আপনি আমাদের শিখিয়েছিলেন। তিনি তাদের সান-না দিয়ে বললেন, এটা আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা তিনি অনুগ্রহ করেন।
পার্থিব জীবনোপকরণের প্রতি অনাসক্তি, অল্পে তুষ্টি পার্থিব জীবনকে জান্নাতের মডেল বানিয়েছিল।
ঘরের মালিক প্রাণ-প্রিয় শিশু বাচ্চাদের ভুলিয়ে বালিয়ে ঘুম পাড়িয়ে নিভিয়ে দিয়েছে ঘরে চেরাগ। মেহমানকে এ বিশ্বাস দেয়ার জন্য যে, তার সাথে তারাও খাচ্ছে। মেহমান উদার ভরে খেলেন আর মেজবান, তার স্ত্রী, সন্তানাদিরা রাতভর ক্ষুধার্ত থাকলেন। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ এ দৃশ্য দেখে চুপ থাকলেন না। বললেন :
وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“এবং নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ওপর তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যাদের মনের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়েছে, তারাই সফলকাম।” (সূরা আল হাশর, আয়াত ৯)
এ সব সংশোধন, আদর্শিক অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল আল্লাহ তাআলাকে এক ও অদ্বিতীয় উপাস্য হিসাবে মেনে নেয়ার পরিণামে।
খৃষ্ট জগত এ বার্তার মুল্যায়ন করেনি। প্রাচ্য দেশগুলো এ বার্তা তরিৎগতিতে ধারণ করেছে। কিন্তু পাশ্চাত্য ইসলামের আহবানে সাড়া দেয়নি। তারা পূর্ণ নয় শতাব্দী মূর্খতা ও অন্ধকারে কাটিয়েছে। নিজেরাই যাকে অন্ধকার যুগ বলে স্বীকার করত। মানব জীবনের এ সুদীর্ঘ কাল উপহার দিয়েছে কেবল বর্বরতা, মূর্খতা, জ্ঞান-শত্রুতা, প্রবৃত্তি পূজা, পাদ্রী কর্তৃক মানুষকে শোষণ ও শাষকদের নিপীড়ণমূলক খতিয়ান। তাদের এ অধপতনের কারণ ছিল, আল কুরআনের ভাষায় :
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ
“তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পণ্ডিতগণ ও সংসার-বিরাগীদের প্রভূ হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র।” (সূরা তাওবা : ৩১)
ষোড়শ শতাব্দীতে যখন তাদের চোখ খুলল, বুঝতে পারল, তাদের সকল বিপর্যয়ের চিকিৎসা হল গীর্জার দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করা। কিন্তু ‘লা-ইলাহা’ এর পুরো মনযিল তারা অতিক্রম করেনি তখনও। কেবল ‘লা কালেমা’ কে ‘লা-ইলাহার প্রতিশব্দ মনে করেছে। এভাবে ঈশ্বরকে অস্বীকার করে সমস- উপাস্যকে স্থান দিয়েছে হৃদয়ে। আর ‘ইল্লাল্লাহ’ তারা শুরুই করেনি। তাদের উপাস্যগুলোর কোনটির নাম গণতন্ত্র, কোনটির নাম এক নায়কতন্ত্র, কোনটির নাম পুঁজিবাদ, কোনটির নাম সমাজতন্ত্র আবার কোনটির নাম জাতীয়তাবাদ। কিন্তু তাদের কোন মডেল নেই, যার মত করে তারা জীবন সাজাবে।
তারা জীবনের হাজার নকশা প্রণয়ন করেছে এবং হাজার বার পরীক্ষা নিরীক্ষা ও সংশোধন করেছে আর নতুন নতুন নাম দিয়েছে।
বিংশ শতাব্দীর বিশ্বের প্রতি -যার নেতৃত্ব আজ পাশ্চাত্যের হাতে- রিসালাতে মুহাম্মাদীর মৌলিক বার্তা হল, “হে আল্লাহ থেকে পলায়নকারী, আল্লাহর দিকে ফিরে এসো। তাকে ছাড়া আর কাউকে উপাস্য রূপে গ্রহণ করো না।”
ইরশাদ হচ্ছে :
فَفِرُّوا إِلَى اللَّهِ إِنِّي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌ مُبِينٌ ﴿৫০﴾ وَلَا تَجْعَلُوا مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ إِنِّي لَكُمْ مِنْهُ نَذِيرٌ مُبِينٌ ﴿৫১﴾
“অতএব তোমরা আল্লাহর দিকে দৌড়ে এসো। তাকে ব্যতীত কাউকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করো না। আমি তাঁর পক্ষ থেকে তোমাদের সুস্পষ্ট সতর্ককারী।” (সূরা জারিয়াত, আয়াত ৫০-৫১)
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এ বার্তা পৌছে দেয়া হচ্ছে পৃথিবীর এক প্রান- থেকে অপর প্রান্তে।
নবীগণ মানবিক জাহাজের ক্যাপ্টেন। যুগে যুগে মানুষের নৌকা তাদেরই দক্ষ পরিচালনায় তীরে পৌছেছে।

সমাপ্ত

হাদীসের আলোকে রোগ দর্শন


আমাদের সমাজে রোগ সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা প্রচলিত রয়েছে। কেউ এটাকে আল্লাহর গজব বলে উল্লেখ করে, কেউ মনে করে জ্বীন-ভূতের আছর, কেউ আবার এর সাথে চন্দ্র-সূর্যের কক্ষপথ পরিবর্তনের সাথে যোগসূত্র স্থাপন করে। একইভাবে চিকিৎসা সম্পর্কেও আমাদের মধ্যে বিভিন্ন দর্শন বিদ্যমান, যা কখনো ভিত্তিহীন, কখনো অযৌক্তিক, কখনো কাল্পনিক আবার কখনো সত্যের কাছাকাছি। কিন্তু তীব্বে রাসূল বা রাসূল (সঃ) -এর চিকিৎসা পদ্ধতিতে রোগ সম্পর্কীত স্পষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য দর্শন প্রদান করা হয়েছে। নিম্মে কুরআন ও হাদীসের আলোকে রোগ দর্শন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল:রোগ মুমিনের পরীক্ষা:
রোগ মুমিনের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিভিন্ন প্রকার রোগের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। আল্লাহ বলেন: “আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব ভয়-ভীতি, ক্ষুধা, জান-মাল ও ফসলের স্বল্পতা দ্বারা, (হে রাসূল!) তুমি ধৈর্য্যশীলদের সুসংবাদ দাও।” (সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৬) আয়াতে বর্ণিত জানের স্বল্পতা দ্বারা দুটি জিনিস উদ্দেশ্য মৃত্যু ও রোগ। মহান আল্লাহ আইযূব (আঃ) কে রোগ দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন। পবিত্র আল-কুরআনের সূরা আম্বিয়ায় এ সম্পর্কিত আলোচনা বিদ্যমান। (দ্র: সূরা আম্বিয়া, আয়াত নং – ৮৩- ৮৪ )
রোগ ঈমানের পূর্ণতা দেয়:
যে মুমিনের কখনো রোগ হয়নি তার ঈমানের পূর্ণতার ব্যাপরে সন্দেহ থেকে যায়। আমের (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল (সঃ) একদিন সাহাবাগণের উদ্দেশ্যে বললেন: যদি কোন মুমিনের রোগ হয় অত:পর আল্লাহ তাকে আরোগ্য দান করেন, তবে এটি তার জন্য পূর্ববর্তী গুনাহের কাফ্ফারা হয়। তখন একজন বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! রোগ কি? আমি তো কখনো অসুস্থ হইনি। তখন রাসূল (সঃ) বললেন: উঠে দাড়াও তুমি আমাদের পর্যায়ভূক্ত নও। (আবু দাউদ) এ হাদীস থেকে স্পষ্টত: প্রমাণিত হয়, রোগ শোক মুমিনের জিন্দেগীতে আবশম্ভ্যবী এক বিষয়।
অন্য হাদীসে রাসূল (সঃ) বলেন: “ঐ মুমিনের উপর আমি আশ্চর্য হই যে রোগের উপর বিরক্ত ও বিতৃষ্ণ হয়। সে যদি জানত রোগের মধ্যে কি রয়েছে তবে সে আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরো জীবনটাই রোগাক্রান্ত থাকাটা নিজের জন্য আবশ্যক করে নিত (পছন্দ করত)। (বায্যার))
রোগ কল্যাণের বাহক:
রাসূল (সঃ) এর চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোগ-শোক কল্যাণের বাহক। তিনি বলেন: “আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে কষ্টে ফেলেন।” (মুয়াত্তা মালেক) এ কল্যাণ বিভিন্নভাবে হতে পারে। আতা ইবনে ইয়াসার (রা) হাদীস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূল (সঃ) বলেছেন: “যখন কোন মানুষ রোগে পতিত হয় তখন আল্লাহ তার কাছে এ নির্দেশ সহকারে দুজন ফেরেশতা পাঠান যে, দেখ সে তার সেবাকারীর সাথে কি বলছে, যদি ঐ ব্যক্তি অসুস্থ হওয়ার পরেও আল্লাহর শোকর গুজার করতে থাকে তবে সে খবর ফিরিশতাদ্বয় আল্লাহর কাছে নিয়ে যায়। তখন আল্লাহ বলেন: আমি যদি তাকে মৃত্যু দেই তবে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবো আর যদি তাকে রোগ থেকে মুক্তি দেই তবে তার খারাপ গোশতকে ভাল গোশত দ্বারা এবং দূষিত রক্তকে উত্তম রক্ত দ্বারা বদলে দেব এবং তার গুনাহ ক্ষমা করে দেব।” (মুয়াত্তা মালেক) অতএব বুঝা গেল, রোগ মানুষের জন্য কল্যাণ নিয়ে আসে চাই তা ইহলৌকিক, পরলৌকিক দৌহিক বা অন্য কোন কল্যাণ হোক। এ সম্পর্কে আল্লাহর চিরন্তন নীতি হল: “নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে, নিশ্চয় কষ্টের সাথে স্বস্তি আছে।” (আল-ইনশিরাহ: ৫-৬)
মুমিনের রোগ তার গুনাহের কাফ্ফারা:
মুমিন ব্যক্তি কোন রোগে আক্রান্ত হলে রোগাক্রান্ত হওয়ার কষ্টটা তার পূর্বেকৃত অপরাধের জন্য কাফ্ফারা হয়ে যায়। অর্থাৎ রোগে পতিত হওয়ার মাধ্যমে মুমিনের পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ হয়। এ সম্পর্কে অসংখ্য হাদীস রয়েছে। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল (সঃ) বলেছেন: “কোন মুসলিম ব্যক্তি এমন কোন দুঃখ-কষ্ট, ক্লান্তি, রোগ, চিন্তা বা ক্ষুদ্রতর ব্যথা অনুভব করে না যার মাধ্যমে তার পাপ দূর হয় না।” (বুখারী-মুসলিম) আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সঃ) বলেছেন: “মুমিন এমন কোন কষ্ট পায় না এমন কি তার গায়ে কাটা বিধে না যার অসিলায় তার গুনাহ মাফ করা হয় না।” (মুয়াত্তা মালেক) ইয়াহইয়া বিন সাঈদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (সঃ) -এর আমলে এক ব্যক্তির ইন্তেকাল হয়, একজন ব্যক্তি উক্ত মাইয়্যেতকে লক্ষ্য করে বলল: কতই না উত্তম মৃত্যু, কোন রোগে-শোকে ভূগল না।” তখন রাসূল (সঃ) বললেন: হায়রে পোড়া কপালী! তুমি কি বোঝ আল্লাহ কাউকে কোন রোগে ফেললে এর মাধ্যমে তার পূর্বের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। (মুয়াত্তা মালেক)
রোগে ধৈর্যধারণ জান্নাত প্রাপ্তির মাধ্যম:
রোগের যন্ত্রণায় অতিষ্ট না হয়ে যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে ধৈর্যধারণ করে আল্লাহ তাকে উত্তম পুরস্কার দান করেন। বিভিন্ন হাদীসে রাসূল (সঃ) রোগকে জান্নাত লাভের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আতা ইবনে আবী রোবাহ (রাঃ) বলেন: একবার আমাকে আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) বললেন, আমি কি আপনাকে এক জান্নাতি মহিলাকে দেখাবো? আমি বললাম অবশ্যই; তিনি বললেন: ঐ কালো মহিলাকে দেখুন। ঐ মহিলা একদিন রাসূল (সঃ)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মৃগী রোগের চাপ শুরু হলে কোন কোন সময় আমার ছতর খুলে যায়, তাই আমার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করুন। তখন রাসূল (সঃ) বললেন: “তুমি ইচ্ছা করলে ধৈর্যধারণ করতে পার তাহলে জান্নাত লাভ করতে পারবে। আর যদি চাও তবে আমি তোমার রোগ মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করি।” তখন মহিলাটি বললেন- হে আল্লাহর রাসূল! আমি ধৈর্যধারণ করব তবে আমার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করুন যেন আমার ছতর খুলে না যায়। তখন রাসূল (সঃ) তার জন্য সেই দোয়া করলেন। (বুখারী ও মুসলিম) এ ছাড়া অন্ধ ব্যক্তির ধৈর্যধারণ সম্পর্কে রাসূল (সঃ) বলেন: “আল্লাহ যার প্রিয় দুটি জিনিস (চোখ) নিয়ে গেছে এবং সে ধৈর্যধারণ করেছে তার জন্য রয়েছে জান্নাত।” (বুখারী ও মুসলিম)
রোগকে গালি দেয়া নিষিদ্ধ
:আমাদের সমাজে অনেকেই রোগে পতিত হলে রোগকে গালি-গালাজ করে। রাসূল (সঃ) নির্দেশিত চিকিৎসা বিধানে রোগকে গালি দেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সঃ) একদিন উম্মে মাসাইয়্যেব (রাঃ) এর নিকট যেয়ে শুনলেন তোমার কি হয়েছে যে তুমি কাঁপছ? তিনি বললেন, জ্বরে আক্রান্ত হয়েছি। আল্লাহ এই জ্বরের কল্যাণ না করুক। তখন রাসূল (সঃ) বললেন: জ্বরকে গালি দিও না, কেননা এটা আদম সন্তানের গুনাহগুলো এমনভাবে দূর করে দেয় যেভাবে কামারের ভাট্রি লোহার মরিচা দূর করে দেয়। (মুসলিম)
সব রোগের চিকিৎসা আছে:
রাসূল (সঃ) নির্দেশিত চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কোন ব্যাধিই দূরারোগ্য নয়; প্রত্যেক রোগেরই চিকিৎসা রয়েছে। রোগ শোক আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে আর তিনিই এ রোগ মুক্তির ঔষধ প্রদান করেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সঃ) বলেছেন: “আল্লাহ এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি যার শেফা বা প্রতিষেধক পাঠাননি।” (বুখারী মুসলিম) অন্য হাদীসে জাবির বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে রাসূল (সঃ) বলেছেন: “প্রত্যেক রোগের ঔষধ রয়েছে। যখন রোগ অনুযায়ী যথাযথ ঔষধ প্রয়োগ হয় তখন আল্লাহর হুকুমে রোগ মুক্ত হয়।” (মুসলিম) উমামা বিন শারীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সঃ)-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম, তখন কিছু বেদুঈন এসে প্রশ্ন করল হে আল্লাহর রাসূল! আমরা চিকিৎসা গ্রহণ না করলে কি আমাদের গুনাহ হবে? তিনি উত্তরে বললেন: “হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ কর। মহান আল্লাহ একটি মাত্র ব্যাধি ছাড়া এমন কোন ব্যাধি সৃষ্টি করেননি যার প্রতিষেধকও সৃষ্টি করেননি এবং যা দূরারোগ্য। তারা জিজ্ঞেস করল হে আল্লাহর রাসূল! দূরারোগ্য সে ব্যাধিটি কি? রাসূল (সঃ) উত্তরে বললেন: সেটি হলো বার্ধক্য। (সুনানে আরবাআ)
ঔষধ রোগ মুক্তির অসীলা মাত্র:
মানুষের তাকদীর যেহেতু নির্ধারিত তাই তাকদীরের মোকাবেলায় ঔষধ কি কাজে আসে? ঔষধ কি খোদায়ী বিধান পরিবর্তন করতে পারে? আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সঃ)-এর মজলিসে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলেন: তাকদীরের মোকাবেলায় ঔষধ কি কোন কাজে আসে? উত্তরে রাসূল (সঃ) বললেন: “ঔষধ তাকদীরেরই (আল্লাহর হুকুমের) একটি বিষয়। তিনি যাকে যেভাবে উপকার করতে চান করেন।” (জামে সগীর) অতএব ঔষধের নিজস্ব কোন রোগ নিরাময়ের শক্তি নেই। বরং তা আল্লাহর হুকুমেই ফল প্রদান করে কারো জন্য ইতিবাচক, কারো জন্য নেতিবাচক। তাই ঔষধ রোগ নিরাময়ের একটি মাধ্যম মাত্র। সব কিছুই আল্লাহর হুকুমে হয়। কুরআনের বাণী: “আমি যখন অসুস্থ হই তখন তিনিই আমাকে রোগমুক্ত করেন।” (সূরা শুয়ারা: ৮০ )
হারাম বস্তু দ্বারা চিকিৎসা গ্রহণ নিষিদ্ধ:
ইসলামী শরীয়তে যেসব জিনিস, খাদ্য বা পানীয় হারাম তার মাধ্যমে ঔষধ গ্রহণও হারাম। আবু দারদা (রাঃ) বলেন, রাসূল (সঃ) বলেছেন: “নিশ্চয় রোগ ও ঔষধ আল্লাহ প্রদত্ত দুটি জিনিস। তিনি প্রত্যেক রোগের নিরাময় ব্যবস্থা করেছেন; সূতরাং তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো তবে হারাম কোন কিছু দ্বারা চিকিৎসা নিও না। (সুনানে আবু দাউদ) আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “ রাসূল (সঃ) নাপাক ঔষধ থেকে নিষেধ করেছেন।” (আবু দাউদ, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ) হারাম তথা নিষিদ্ধ জিনিসের মধ্যে আরোগ্য দানের ক্ষমতা নেই। এ জন্য আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) বলতেন, “নিশ্চয় আল্লাহ ঐ জিনিসের মধ্যে তোমাদের আরোগ্য রাখেননি যা তোমাদের জন্য হারাম করেছেন।” (মুসতাদরেক) মদ ইসলামী শরীয়তে হারাম একটি পানীয়, স্বাভাবিকভাবে তাই মদ দিয়ে ঔষধ গ্রহণও হারাম। এ সম্পর্কে তারেক বিন সুয়াইদ (রাঃ) বলেন: রাসূল (সঃ) কে মদ ব্যবহার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি তা ব্যবহার করতে নিষেধ করেন। তখন প্রশ্নকারী বলল, আমিতো এটা ঔষধ হিসেবে তৈরী করেছি। তখন রাসূল (সঃ) বললেন, মদ কখনো ঔষধ হতে পারে না, বরং সে নিজেই রোগের উপাদান।” (মুসলিম)
অভিজ্ঞতা ছাড়া চিকিৎসা নিষিদ্ধ:
যে সব চিকিৎসকের পূর্ব অভিজ্ঞতা বা ঔষধ সংক্রান্ত কোন জ্ঞান নেই বরং মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করে সে সব হাতুড়ে ডাক্তারদের ব্যাপারে রাসূল (সঃ) বলেন: “পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা বা জানাশুনা ছাড়া যদি কোন ব্যক্তি কাউকে চিকিৎসা করে এমতাবস্থায় (রোগীর কোন ক্ষতি হলে) রোগীর সব দায়-দায়িত্ব উক্ত ডাক্তারের উপর পড়বে। (আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, মুসতাদরেক)

ইসলামে রসিকতার বিধান

সৃষ্টির শুরু থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মানুষের জীবনাচারের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে তাদের জীবনের সাথে অঙ্গা-অঙ্গিভাবে মিশে আছে হাসি-তামাশা ও আনন্দ-রসিকতা। এ ক্রিড়া-কৌতুক ও আনন্দ- রসিকতা মানুষের জীবনে বয়ে আনে এক অনাবিল প্রাণ চাঞ্চল্য ও উদ্যমতা। মানুষকে করে ঘনিষ্ঠ। তাদের আবদ্ধ করে এক অকৃত্রিম ভালবাসার মায়াডোরে।
আনন্দ-রসিকতার এ মহোময় ক্রিয়াটি সম্পাদিত হয় সমবয়সী বন্ধু-বান্ধব, সাথী-সঙ্গী, নিজ সন্তানাদি ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মাঝে। বরং কোন মানুষই এ আনন্দঘন কর্ম থেকে মুক্ত নয়। তবে কেউ কম আর কেউ বেশি।
মুসলমান আল্লাহ তা’আলার বান্দা হিসাবে তার জীবনের প্রতিটি পর্বকে সাজাতে হবে মহান আল্লাহ তা’আলার নির্দিষ্ট রীতি অনুযায়ী। যাতে তার মধ্যে আল্লাহ তা’আলার উবূদিয়্যত (দাসত্ব) পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হয়। বর্তমানে মানুষের মাঝে হাসি-তামাশার প্রচলন একটু বেশি। তাই তার ধরণ-প্রকৃতি, হুকুম ও প্রকার এবং এ বিষয়ে শরয়ী দৃষ্টিকোণ কি ? সে সম্পর্কে জানা আবশ্যক হয়ে দাড়িয়েছে। যাতে মুসলমানরা সেগুলো মেনে চলতে পারে ও একঘেয়েমি দূরকারী এ সুন্দর পদ্ধতি পরিত্যাগ করতে না হয়। এবং এর শরয়ী দিকনির্দেশনা অবলম্বন করে যেন পূণ্য অর্জন করতে পারে, পাশাপাশি নিজেকে গুনাহ থেকে বিরত রাখতে পারে।
রসিকতা তিন প্রকার:
(১) অনুমোদিত বরং প্রশংসাযোগ্য রসিকতা: আর সেটি হচ্ছে, যা ভাল উদ্দেশ্যে, সৎ নিয়তে এবং শরয়ী নিয়ম-নীতি অবলম্বন করে সম্পাদন করা হয়। যেমন মাতা-পিতার সাথে আদবের সহিত রসিকতা করা অথবা স্ত্রী, সন্তানদের সাথে অনুরূপ বন্ধু-বান্ধবদের সাথে তাদের অন্তরে আনন্দ-খুশির উপস্থিতির জন্য। এগুলির দ্বারা রসিকতাকারীর পূণ্য লাভ হয়।
এই প্রকার রসিকতার অনুমোদনে প্রমাণাদি :
ক) হানযালাহ রা. সূত্রে বর্ণিত: তিনি বলেন : হে আল্লাহর রাসূল! হানযালাহ মুনাফেক হয়ে গেছে। রাসূল (সাঃ) বললেন: কীভাবে? আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যখন আপনার কাছে থাকি আর আপনি আমাদেরকে বেহশত-দোযখের কথা স্মরণ করান, মনে হয় যেন চাক্ষুষ দেখতে পাচ্ছি। যখন আপনার নিকট থেকে চলে যাই আর আমাদের স্ত্রী সন্তান-সন্ততি এবং বিভিন্ন সাংসারিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তখন এর অনেক কিছুই ভুলে যাই। তখন রাসূল (সাঃ) বললেন; যার হাতে আমার প্রাণ তার শপথ: আমার নিকট থাকা কালীন সময়ে তোমাদের অবস্থা যেমন হয় যদি তোমরা সর্বদা ঐ অবস্থায় থাকতে এবং জিকিরের সাথে পূর্ণসময় অতিবাহিত করতে, তাহলে অবশ্যই ফেরেশতারা তোমাদের বিছানায় ও চলার রাস্তায় তোমাদের সাথে করমর্দন করত। কিন্তু হে হানযালাহ কিছু সময় এভাবে কিছু সময় ঐ ভাবে। কথাটি তিনবার বললেন।
খ) যাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রা. এর হাদীসে এসেছে: যখন তিনি বিবাহ করলেন নবীজী (সাঃ) তাকে প্রশ্ন করলেন: হে যাবের তুমি কি বিবাহ করেছ? আমি বললাম: হ্যাঁ। রাসূল (সাঃ) বললেন: কুমারী না বিবাহিতা? তিনি বলেন: আমি বললাম: বিবাহিতা। রাসূল (সাঃ) বললেন: তুমি কুমারী মেয়ে বিবাহ করলে না কেন? তাহলে তুমি তার সাথে খেলা করতে এবং সেও তোমার সাথে খেলা করতো। অথবা রাসূল (সাঃ) বলেছেন: তুমি তার সাথে হাসতে এবং সে তোমার সাথে হাসতো।
গ) আয়েশা রা. এর হাদীসে এসেছে: কোন এক সফরে তিনি নবী (সাঃ) এর সাথে ছিলেন। আয়েশা রা. বলেন: আমি রাসূলের সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রবৃত্ব হলাম এবং রাসূল (সাঃ) কে পিছনে ফেলে দিলাম। অত:পর যখন আমার শরীর মোটা হয়ে গেল আবার প্রতিযোগিতা করলাম রাসূল বিজয়ী হলেন। তখন বললেন: এই বিজয় ঐ বিজয়ের পরিবর্তে।
ঘ) আনাস রা. থেকে বর্ণিত: নবী (সাঃ) একবার তাকে এ বলে সম্বোধন করেছিলেন: ( হে দুই কান বিশিষ্ট ব্যক্তি) হাদীসের একজন বর্ণনাকারী আবু উসামা বলেন: অর্থাৎ রাসূল তার সাথে রসিকতা করছিলেন।
ঙ) আনাস রা. থেকে বর্ণিত কোন এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ) এর নিকট একটি (ভারবাহী জন্তু) বাহন চাইলেন, রাসূল (সাঃ) বললেন আমি তোমাকে একটি উটের বাচ্চার উপর চড়িয়েদেব। সে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমি উটের বাচ্চা দিয়ে কি করব? রাসূল (সাঃ) বললেন: উটতো উটের বাচ্চা ছাড়া আর কিছু জন্ম দেয় না।
(২) নিন্দাযোগ্য রসিকতা :
অর্থাৎ যে রসিকতা মন্দ উদ্দেশ্যে এবং অসৎ নিয়তে অথবা শরীয়তের নির্ধারিত রীতি ভঙ্গ করে সম্পাদন করা হয়। এর উদাহরণ: যেমন মিথ্যা মিশ্রিত রসিকতা, অথবা অন্যকে কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে কৃত রসিকতা।
(৩) মুবাহ রসিকতা :
ঐ রসিকতা যার কোন সঠিক উদ্দেশ্য নেই, ভাল নিয়তও নেই, কিন্তু শরীয়তের নির্ধারিত গণ্ডি থেকে বের হতে হয় না এবং নিয়মও ভঙ্গ করা হয়না। পাশাপাশি অতিরিক্ত পরিমাণেও করে না যে অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে। এমন রসিকতা প্রশংসাযোগ্যও নয় আবার নিন্দাযোগ্যও নয়। সুতরাং এর ভিতর কোন পূণ্য নেই। কারণ পূণ্য পাওয়ার যে নীতিমালা অর্থাৎ সঠিক উদ্দেশ্য এবং সৎ নিয়ত তা এখানে পাওয়া যায়নি অনুরূপভাবে কোন গুনাহও হবেনা কারণ শরীয়তের বিরুদ্ধাচারণ করা হয়নি বা কোন নীতি ভাঙ্গা হয়নি।
রসিকতার কতিপয় নীতিমালা ও আদব :
প্রথমত : রসিকতা করার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোর প্রতি গুরত্ব দিতে হবে :
১। ভাল নিয়ত অর্থাৎ রসিকতা করার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মনে মনে এমন ধারণা পোষণ করবে যে সে আল্লাহ তা’আলা পছন্দ করেন এমন একটি ভাল কাজ করছে। যেমন রসিকতার মাধ্যমে নিজ ভাই, স্ত্রী, পিতা বা এমন কারো অন্তরে খুশি-আনন্দ প্রবেশ করিয়ে তাদের কর্ম চঞ্চল করে তোলা। অথবা উক্ত তামাশা করার মাধ্যমে কাউকে একটি ভাল কাজের নিকটবর্তী করে দেয়া। অথবা নিজ আত্মাকে ভালকাজের জন্য শক্তি সঞ্চয়ের লক্ষ্যে প্রফুল্ল করা। বা এরূপ যে কোন ভাল নিয়ত পোষণ করা। আর এ মহান মূলনীতির প্রমাণ হল রাসূল (সাঃ) এর বাণী সমস্ত কাজের ফলাফল নিয়তে উপর ভিত্তি করে নিরোপিত হয়।
২। রসিকতা করার ক্ষেত্রে সত্যকে অত্যাবশ্যকীয় করে নেয়া অর্থাৎ শুধুমাত্র সত্য ও বাস্তবমূখী রসিকতা করবে এবং মিথ্যা পরিহার করবে। আবু হুরাইরা রা. বলেন: লোকেরা বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আমাদের সাথে রসিকতা করছেন? নবীজী (সাঃ) বললেন: আমি সত্য ছাড়া বলি না।
৩। রসিকতা করার ক্ষেত্রে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্মান বোধ থাকতে হবে, মানুষকে তার যোগ্য মর্যাদা দিতে হবে এবং প্রতিপক্ষের মন-মানুষিকতা বুঝতে হবে। সকল মানুষ ঠাট্টা-রসিকতা পছন্দ করে না।
বলা হয়: ছোটদের সাথে ঠাট্টা-মশকরা করো না তোমার মাথায় চড়বে এবং বয়স্কদের সাথে করো না সে তোমার প্রতি হিংসা করবে। যে ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দেরকে সম্মান করে না সে আমার দলভুক্ত নয়।
দ্বিতীয়ত: রসিকতার সময় যে সমস্ত বিষয় থেকে বেঁচে থাকতে হবে।
১। মিথ্যা, ঠাট্টার ছলে হোক আর উদ্দেশ্য মূলকভাবেই হোক মিথ্যা সর্বাবস্থায়ই হারাম এবং শরীয়তের দৃষ্টিকোন থেকে খুবই নিকৃষ্ট কাজ। মানুষকে হাসানোর জন্য যে মিথ্যা বলে তার প্রতি বিশেষ শাস্তির কথা এসেছে। আর এটা এই জন্য যে এটি খুবই বিপদজনক, সাথীদেরকে উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি এর ভিতর খুব সহজেই জড়িয়ে পড়া যায় , এবং এর মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করা যায়।
রাসূল (সাঃ) বলেন: ধ্বংস ঐ ব্যক্তির জন্য যে মানুষকে হাসানোর জন্য কথা বলে অতঃপর মিথ্যা বলে, তার ধ্বংস অনিবার্য, তার ধ্বংস অনিবার্য।
শরীয়ত এ কু-অভ্যাসকে শুধু এখানে নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং রাসূল (সাঃ) ঠাট্টা-রসিকতার মত বিষয়েও এটি পরিত্যাগ করতে সকলকে দারুন ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
রাসূল (সাঃ) বলেছেন: আমি জান্নাতের মধ্যবর্তী স্থানে একটি বিশেষ ঘরের জিম্মাদারী গ্রহণ করছি ঐ ব্যক্তির জন্যে যে সর্বোতভাবে মিথ্যা পরিহার করেছে এমনকি রসিকতার মাঝেও।
২। হাসি-রসিকতার ক্ষেত্রে বাড়া-বাড়ি এবং পরিমাণে এত অধিক করা যে মজলিসটিই হাসি-তামাশার মজলিসে রূপান্তরিত হয়ে যায় এবং মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয় বিষয়াদি চাপা পড়ে যায়। আর এটি ব্যক্তির পরিচয় ও বৈশিষ্টে পরিণত হয়। এরূপ পর্যায়ের মজা-রসিকতা নিন্দনীয়। কেননা এতে সময় নষ্ট হয়। ব্যক্তিত্বের প্রভাব নষ্ট হয়ে যায়, বৈশিষ্ট্য পূর্ণ ইসলামী ব্যক্তিত্ব শেষ হয়ে যায়, অবশ্যই ইহা মিথ্যায় পতিত করে। অন্যকে ছোট করা হয়, ছোটরা বড়দের উপর সাহসী হয়ে উঠে। অন্তর মরে যায় এবং মুসলমান যে ধরনের বাস্তব ও উপকারী গুণাগুণ দ্বারা অলংকৃত থাকার কথা তা তার থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
৩। বেগানা নারীদের সাথে ঠাট্টা করা। কেননা এটা ফিতনা ও অশ−ীলতায় পড়ার কারণ এবং অন্তর হারামের দিকে ধাবিত করে।
৪। অন্যের ক্ষতি সাধন করা, কষ্ট দেওয়া বা অধিকার হরণ করা, অথবা এমন আঘাত করা যা সীমা লঙ্ঘন করে অথবা এমন জিনিস দ্বারা ঠাট্টা করা যার দ্বারা ক্ষতি হতে পারে যেমন পাথর বা অস্ত্র। এ ধরনের ঠাট্টা হিংসা বিদ্বেষ তৈরি করে বরং কখনও ঝগড়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ঠাট্টাকে তখন আর ঠাট্টা মনে করা হয়না বাস্তব মনে করা হয় আর ভালোবাসা পরিবর্তিত হয়ে যায় হিংসায়। পছন্দ মোড় নেয় অপছন্দের দিকে। মহান আল্লাহ বলেন; আমার বান্দাদেরকে বলে দিন, তারা যেন যা উত্তম এমন কথাই বলে। শয়তান তাদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধায়। নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। (আল-ইসরা : ৫৩)
হাফেজ ইবনে কাসীর র. বলেন : আল্লাহ তাআলা তার মুমিন বান্দাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন পরস্পরে কথা বলার সময় নরম এবং ভাল কথা বলবে। তারা যদি এমন না করে তাহলে শয়তান তাদের মাঝে ঝগড়া বাঁধিয়ে দেবে।
আব্দুল্লাহ ইবনে সায়েব তার পিতা থেকে তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন। তিনি রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছেন: তোমরা তোমাদের ভায়ের জিনিস-পত্র, মাল-সামানা খেলার ছলে হোক বা প্রকৃত অর্থে কোন ভাবেই ধরবে না। যে ব্যক্তি নিজ মুসলমান ভাইয়ের লাঠি (এর মত নগন্য জিনিসও) নিয়েছে তার উচিত ফেরত দেওয়া। তাহলে যে ব্যক্তি টাকা পয়সা বা মূল্যবান ধন-সম্পদ না বলে নিয়ে নেয় তার অবস্থা কি হবে? ভাববার বিষয়!
৫। শরীয়তের বিষয়াদি নিয়ে রসিকতা করা, এসব বিষয়ে রসিকতা করা কে উপহাস ও বিদ্রুপ হিসাবে ধরা হয় যা মূলত: কুফরী এবং এগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রক্ষা করুন।
আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর তবে তারা বলবে আমরাতো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন : তোমরা কি আল্লাহর সাথে তার হুকুম আহকামের সাথে এবং তার রাসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে, ছলনা করো না, তোমরা যে কাফের হয়ে গেছ, ঈমান প্রকাশ করার পর।
অনুরূপভাবে দ্বীনের ধারক বাহক তথা সাহাবা , উলামা, সালেহীন প্রমুখদের হুকুমও তাই। অর্থাৎ তাদের চাল চলন কথা-বার্তা আচার-আচরণ ফতোয়া ইত্যাদি নিয়ে কেউ ঠাট্টা বিদ্রুপ করলে তারও ঈমান থাকবে না।
আল্লাহ আমাদের সকলকে ইসলামী পদ্ধতিতে রসিকতা ও কৌতুক বিনিময় করার তাওফীক দান করুন। আমীন ॥

মৃত্যু ভাবনা ও করণীয়

অর্থ-বিত্ত, ভোগ-বিলাস, শক্তি সামর্থ ও ক্ষমতার মদমত্ততা রূপ জটিল রোগ থেকে মুক্তির এবং ভারসাম্য পূর্ণ ভদ্র ও শালীন জীবন যাপন করার জন্য মৃত্যু চিন্তার চাইতে উত্তম ও উপকার আর কিছু হতে পারে না।
হযরত ওমর (রাঃ) রাসূল (সাঃ) কে প্রশ্ন করেছিলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান ব্যক্তি কে? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, যে ব্যক্তি মৃত্যুর কথা বেশি স্মরণ করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের পাথেয় সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে। (ইবনে মাজা)
শাদ্দাদ ইবনে আওস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি স্বীয় প্রবৃত্তির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করেছে সেই সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান লোক। অপরদিকে যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে অনেক কিছু আশা করে কিন্তু প্রবৃত্তিকে মোটেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না তার সকল প্রয়াসই পশু শ্রম হবে। (ইবনে মাযাহ, তিরমিযী)
হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, মৃত্যুর কথা বেশি স্মরণ কর, মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে পাপ থেকে দূরে রাখে এবং দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ কমিয়ে দেয়। ধন সম্পদের মধ্যে যদি মৃত্যুকে স্মরণ কর তবে তোমার অন্তর ধন লিপ্সার বিপদ থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। যদি দুঃখ-দরিদ্রের সময় মৃত্যুকে স্মরণ কর তবে দুঃখবোধ থেকে মুক্ত থাকেত পারবে। (ইবনে আবিদ দুনিয়া)
একদা আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এমন একটি মজলিসে উপস্থিত হলেন, যেখানে লোকেরা অট্টহাসিতে নিমগ্ন ছিল। এদের অবস্থা দেখে বললেন, লোক সকল! তোমরা এই মজলিসে শুধুমাত্র মজা লুটতে ব্যস্ত থেকো না। সকল মজা যে বস্তুকে বিনষ্ট করে দেয় সে বিষয়টির কথার স্মরণ রেখো। সাহাবীগণ আরজ করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! ঐ বস্তটি কি? বললেন, “মৃত্যু ভাবনা-মৃত্যুচিন্তা।” যে মৃত্যুর কথা বেশি স্মরণে রাখবে। দেখবে, মৃত্যুর স্মরণ তোমাকে দুনিয়ার সকল দুঃশ্চিন্তা ভুলিয়ে দেবে। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) কোন সময় কারো মধ্যে দ্বীনের প্রতি অন্যমনস্ক লক্ষ্য করলে ডেকে বলতেন দেখ, মৃত্যু অবশ্যই আসবে। সেটা সৌভাগ্যের মধ্যেই আসুক বা দুর্ভাগ্যের মধ্যে (ইবনে আবিদ দুনিয়া) অর্থাৎ সৎকর্মরত অবস্থায় মৃত্যু আসলে সেটা অত্যন্ত সৌভাগ্যের বিষয়। আর মন্দকাজে লিপ্ত অবস্থায় মৃত্যু আসলে সেটা হবে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের ব্যাপার।
হযরত আম্মার (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, উপদেশ গ্রহণ করার জন্য মৃত্যু চিন্তাই যথেষ্ট (তিবরানী) কেউ যদি মৃত্যুর কথা স্মরণ করে তবে তার জন্য অন্য কারো উপদেশ গ্রহণ করার প্রয়োজন পড়ে না। মৃত্যু চিন্তাই তাকে যাবতীয় অসৎকর্ম থেকে বিরত রাখে এবং সৎ কর্মের প্রতি আগ্রহী করে তোলে।
হযরত রাসূল (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, হাশরে শহীদানের সাথে কি কাউকে উঠানো হবে? জবাব দিয়েছিলেন, হ্যাঁ যে ব্যক্তি দিন রাতের মধ্যে অন্ততঃ ২০ বার মৃত্যুর কথা স্মরণ করে। (তিবরানী)
তাইমী (রহ) বর্ণনা করেন দু’টি বিষয় আমাকে দুনিয়ার যাবতীয় ভোগ বিলাস স্পৃহা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। এক, মৃত্যুচিন্তা। দুই, হাশরের ময়দানে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভীতি। (ইবনে আবিদ দুনিয়া)
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, একদা এক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ) এর খেদমতে হাজির হয়ে আরজ করলো, মৃত্যুর কথা শুনতে আমার মোটেও ভাল লাগেনা। হযরত (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি মাল দৌলত আছে? লোকটি স্বীকার করলো, তার অধিকারে বেশ মাল দৌলত আছে। তখন আল্লাহর রাসূল (সাঃ) তাকে বললেন, ধন-সম্পদ অগ্রে পাঠিয়ে দাও, দেখবে তোমার মনও আগের দিকে ধাবিত হতে থাকবে। কেননা, মানুষের মন তার ধন সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট থাকবে, এটাইতো স্বাভাবিক। (আবু নাঈম)
রেজা ইবনে হায়াত (রাহঃ) বলেন, যে ব্যক্তি মৃত্যুর কথা বেশি স্মরণ করতে পারে, তার মন থেকে হিংসা এবং ভোগবিলাস ধীরে ধীরে দূর হয়ে যায়। (ইবনে আবিদ দুনিয়া)
রবী ইবনে আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেন, দুনিয়ার প্রতি বিতৃষ্ণা এবং আখেরাতের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টির জন্য, মৃত্যুর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসই যথেষ্ট। (ইবনে আবি শাইবা, আহমদ) তারেক মাহরেবী (রাঃ) বর্ণনা করেন, একবার আমাকে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এ মর্মে উপদেশ দিয়ে ছিলেন যে, হে তারেক! মৃত্যু আসার আগেই তুমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকবে। (তিবরানী)
হযরত আবু হাসেম (রাহ) বলেন, যে সব কর্মের কারণে মৃত্যুর প্রতি তোমাদের মনে ভীতির সৃষ্টি হয়, সে আমলগুলি সযতেœ পরিহার করে চল। দেখবে, মৃত্যুর সময় কোন ভয়ত্রাসের সম্মুখীন হতে হবে না। (ইবনে আবি শাইবা)
হযরত হাসান (রাঃ) বলেন; যে ব্যক্তি মৃত্যু ভাবনা মনে মনে অব্যাহত রাখে, তার দৃষ্টিতে দুনিয়া এবং দুনিয়ার বিত্ত-সম্পদের কোন মূল্য থাকেনা। (ইবনে আবিদ দুনিয়া)
হযরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, সর্বাপেক্ষা বড় সাধনা হচ্ছে মৃত্যুর কথা বেশি করে স্মরণ করা। চিন্তা ভাবনা করা সর্বাপেক্ষা বড় এবাদত। যে ব্যক্তি মৃত্যুর কথা ভাবতে ভাবতে অন্য সব কিছু ভুলে যায় সে তার কবরকে জান্নাতের একটি বাগানরূপে দেখতে পাবে। (দাইলামী)
হযরত আলী (রাঃ) বলেন, কবর হচ্ছে সব দরনের আমলের সিন্দুক। মৃত্যুর সাথে সাথেই তা অনুভব করা যাবে। (ইবনে আসাকের)
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) বলেন, মৃত্যুর সাথে সকল শ্রেণীর মানুষই এক অন্তহীন আক্ষেপে পতিত হবে, নেক আমল সে কেন করল না!? আর যে ব্যক্তি মন্দ কাজ করেছে, সে এই বলে আক্ষেপ করবে যে সময় থাকতে কেন পাপ কাজ থেকে বিরত হল না? (তিরমিযী)
যে সব বিষয় মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় :
(১) রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, লোক সকল, কবর জিয়ারত কর। এর দ্বারা মৃত্যুর কথা স্মরণ হবে। (মুসলিম)
হযরত আবদুুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন, ইতিপূর্বে আমি তোমাদিগকে কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করতাম। এখন অনুমতি দিচ্ছি, করব জিয়ারত কর। কেননা এতে আখেরাতের কথা স্মরণ হবে এবং দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ কমে আসবে। (ইবনে মাজাহ)
আল্লাহর ভয় এবং আল্লাহর প্রতি সুধারণা পোষণ করা ঃ
হযরত জাবের (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রাসূল (সাঃ) -এর ওফাতের তিন দিন আগে তাকে বলতে শুনেছি, আল্লাহর প্রতি সুধারণা ছাড়া যেন তোমাদের কারো মৃত্যু না হয়। (বুখারী ও মুসলিম)
হযরত হাসান বসরী (রহঃ) বলেন, আমার নিকট রাসূল (সাঃ) -এর বাণী পৌঁছেছে যে, আল্লাহ পাক বলেন, আমি বান্দাদের দু’টি ভয় বা দু’টি নিরাপত্তা একত্রিত করবো না অর্থাৎ যে ব্যক্তি পার্থিব জীবনে আমাকে ভয় করে চলেছে, তাকে আখেরাতে ভয়-ভীতির সম্মুখীন করবো না। আর যে ব্যক্তির দুনিয়ার জীবনে ভয় লেশহীন বেপরোয়া জীবন যাপন করেছে, তাকে আখেরাতের জীবনে পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়া হবে না। (তিরমিযী)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন, কারো মৃত্যু নিকটবর্তী হতে দেখলে তাকে সুসংবাদের কথা শুনাও যেন সে বান্দা আল্লাহর প্রতি উচ্চ ধারণা নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় হয়। আর যদি কাউকে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ বেপরোয়া জীবন যাপন করতে দেখ তবে তাকে সতর্ক কর, যেন সে তওবা করার সুযোগ পায়। (ইবনুল মোবারক)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, সেই আল্লাহর কসম, যিনি ব্যতীত আর কোন মাবুদ নাই, যে বান্দা আল্লাহর নিকট মনে প্রাণে উচ্চ ধারণা রাখে এবং কল্যাণ কামনা করে, আল্লাহ পাক সে ধারণা অবশ্যই পূর্ণ করেন। (ইবনে আবি শাইবা)
আসুন আমরা দুনিয়ার জীবনে আখেরাতকে প্রাধান্য দিই, মৃত্যুর কথা চিন্তা, পরকালের জবাবদিহিতা আল্লাহভীতি মনে পোষণ করে সকল অপকর্ম অসৎকর্ম ছেড়ে আল্লাহ এবং তার রাসূলকে অনুসরণ ও অনুকরণ করে জিন্দেগী অতিবাহিত করি। হে আল্লাহ তুমি আমাদের সে তাওফীক ও শক্তি দান কর। আমীন ॥