মে দিবসের ভাবনা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

প্রতি বছর মে মাস এলেই ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হয় শ্রমিকের তথা শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের কথা। পয়লা মে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস।’মে দিবস এলেই শ্রমিকশ্রেণীর রক্তঝরা সংগ্রাম আর শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, সভা-সেমিনার, বক্তৃতা-বিবৃতি এবং রাজ পথের মিছিল-শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সারা দুনিয়ার শহর-নগর-বন্দর। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। নিউইয়র্ক-ব্রাসেলসের আধুনিক প্রলেতারিয়েতদের বর্ণাঢ্য র‌্যালির পাশাপাশি বাংলাদেশের আধুনিক শ্রমিক নামের ‘শ্রমদাস’রাও গতানুগতিক শ্লোগানে মুখরিত করে তোলে ঢাকার রাজপথ। পশ্চিমা দুনিয়ার শ্রমজীবী বুর্জোয়া (?), আর বাংলাদেশের শ্রমজীবী নিম্নবিত্তদের মধ্যে মিল যেমন রয়েছে তেমন শ্রেণীগত অবস্থানের বৈপরীত্যও কম নয়।
আজ থেকে ১২৩ বছর আগে ১৮৮৬ সালের পয়লা মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটেরশ্রমিকদের ৮ ঘন্টা কর্মদিবস ও নূন্যতম মজুরির দাবিতে সংগ্রামের ডাক দেওয়া হয়েছিল। শিকাগোর সুতাকলের শ্রমিকরা বুকের রক্ত দিয়ে ৮ ঘন্টা কর্মদিবস আদায় করে নিয়েছিল। তাদের রক্তঝরা সংগ্রামের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে সারাবিশ্বে শ্রমজীবী জনগণ সেদিন শ্লোগানের জন্ম দিয়েছিল দুনিয়ার মজদুর এক হও। কিন্তু দীর্ঘ ১২৩ বছরের ব্যবধানে আমাজান-মিসিসিপি আর পদ্মা-মেঘনার অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। আজকের সাম্রাজ্যবাদ্বী বিশ্বব্যবস্থায় আমেরিকার করাখানা শ্রমিক ‘হ্যারিম্যান’দের জন্য ‘মজদুর’সংজ্ঞাটি সম্ভবত বেমানান। কারণ হ্যারিম্যানরা আজ মাসে মজুরি পান বাংলাদেশী মুদ্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার টাকারও বেশি। শিকাগো সিটির কোনো সুরম্য অট্টালিকায় সম্ভবত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে তার বসবাস।
এদিকে বাংলাদেশের সাধারণ শ্রমিকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রাস্তার ধারে দিনমান সেই যে খোয়া ভাঙছে তো ভেঙেই চলেছে। সারাদিন খোয়া ভেঙে যা মজুরি পেয়েছে, তা দিয়ে এই দূর্মূল্যের বাজারে সারাদিনের চাল-ডাল-নূন জোগাড় করাই দুঃসাধ্য। বাংলাদেশের লাখ লাখ গার্মেণ্টস শ্রমিক, যারা আজো মাসে অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত মজুরির বিনিময়ে ১৪ ঘণ্টা শ্রম দেয় তাদের কাছে ঊনিশ শতকের মে দিবসের বিজয় আজ একুশ শতকে এসেও এক নিদারুণ প্রহসন বলে মনে হয়। হে মার্কেটের শ্রমিক আর বাংলাদেশের শ্রমিক একুশ শতকের এই দুই মেরুর দুই শ্রমিকের আজ দুনিয়ার মজদুর এক হও শ্লোগানও বেমানান, বলতে গেলে প্রহসন।
পশ্চিম ও পূর্বের মাঝে পর্বত প্রমাণ অসম বিকাশের যুগে বাংলাদেশে আরো অনেক প্রহসন লক্ষ্য করা যায়। আমাদের দেশে কথিত ‘শ্রেণীসংগ্রাম’- এর প্রবক্তাদের তত্ত্ব মোতাবেক একদিকে সাম্রাজ্যবাদ্বীদের উচ্ছিষ্টভোগী লুটেরাগোষ্ঠী আজ আধুনিক বুর্জোয়ার আসনে সমাসীন, অন্যদিকে ১৪ ঘণ্টা মজুরি খাটা ‘ক্রীতদাসরা’আধুনিক প্রলেতারিয়েতের আসনে সমাসীন। অতএব তত্ত্ব অনুযায়ী বাংলাদেশের বর্তমান সমাজস্তরে এই ‘বুর্জোয়া’দের বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতের শ্রেণীসংগ্রামই নাকি মুক্তির একমাত্র পথ। কিন্তু আমরা যখন কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হই, তখন দেখতে পাই, বর্তমান সম্রাজ্যবাদ্বী ও সম্প্রসারণবাদ্বী যুগে চিরায়ত শ্রেণীসংগ্রামের আবেদন ফিকে হয়ে গেছে।
১৮৮৬ সালের পয়লা মে আমেরিকায় শিকাগো শহরের আগস্ট স্পাইস, পারসন্স, অ্যাঞ্জেল ও ফিশারের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বব্যাপী ৮ ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারিত রয়েছে। মৃত্যুঞ্জয়ী ওইসব শ্রমিকের আত্মত্যাগের ফল ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলো পেলেও আমাদের দেশ আজো শ্রমিক-কর্মচারী নির্যাতন চলছে নানাভাবে। আমাদের দেশে সরকারি চাকরি বাদে এবং কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করিয়ে নেয়া হয়। মজুরি কমিশন, শ্রম আইন, শ্রমনীতিসহ হাজারো আইন-কানুন, বিধিনিষেধ থাকলেও নেই তার বাস্তবায়ন। আমাদের দেশ গরীব। এখানে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৪০ লাখেরও বেশি। এটাই মালিকপক্ষের নির্যাতনের সবচেয়ে বড় সুযোগ। কারণ পুরনো একজন কর্মচারীকে যে বেতন দিতে হয়, নতুন কর্মচারীকে তার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অনেক বেশি পরিশ্রম করিয়ে অল্প পয়সায় ‘বুঝ’দেয়া যায়। ১২, ১৪ আর ১৫ ঘণ্টা বলে কথা নেই, যতক্ষণ কাজ থাকবে ততক্ষণ নাকি করতে হবে। কিন্তু এ জন্য অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দেয়া হয় খুব কম ক্ষেত্রেই। অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে জীবন দেয়া যেসব শ্রমিকের স্মরণে প্রতি বছর দুনিয়াজুড়ে পালন করা হয় ‘মে দিবস’তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন আজো হয় নি। দীর্ঘ ১২৩ বছরে শ্রমিকের অধিকার কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে প্রশ্ন থেকেই গেছে। নানা শোষণ-বঞ্চনার মধ্য দিয়ে এখনো তাদের দিন কাটে। শিল্পকারখানা, গার্মেণ্টস, নির্মাণকাজ, স্বর্ণশিল্পসহ অসংখ্য উৎপাদনমুখী কাজে জড়িত রয়েছে লাখো-কোটি শ্রমিক। তাদের কষ্টসাধ্য শ্রমের বিনিময়েই সচল রয়েছে বিশ্বের অর্থনীতির চাকা।
কিন্তু সারা বিশ্বেই শ্রমিকরা নানামুখী বঞ্চনা ও শোষণের শিকার। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বে অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে শ্রমিকদের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা খুবই কম। উন্নয়শীল দেশগুলোতে তাই শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। আমাদের শ্রমিকদের অবস্থা খুব ভালো নয়। অশিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, শোষণ, চাকরির অনিশ্চয়তা এমন অসংখ্য কারণে শ্রমিকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পরও পরিবারের মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দিতে পারেন না। আধুনিক, উন্নত জীবনযাত্রার কোনো ছোঁয়া নেই তাদের জীবনে। অর্থের অভাবে সন্তানরা বঞ্চিত হয় শিক্ষা থেকে। কেউ কেউ নিয়োজিত হয় শিশুশ্রমে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই শ্রমিকরা হচ্ছেন বঞ্চনা ও শোষণের শিকার।
বাংলাদেশের শ্রমিক : একটি পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ লেবার ফোর্স সার্ভে অনুযায়ী দেশের মোট শ্রমিক সংখ্যা ৪ কোটি ৪৪ লাখ প্রায়। এর মধ্যে পুরুষ শ্রমিক ৩ কোটি ৪৫ লাখ আর মহিলা শ্রমিক ৯৯ হাজার প্রায়। কৃষি, বন ও এ সম্পর্কিত কাজে জড়িত শ্রমিকের সংখ্যা ২ কোটি ১৯ লাখ প্রায়। মৎস্য শিল্পে ১০ লাখ ৫০ হাজার। খনিজ দ্রব্যের কাজে নিয়োজিত ৮২ হাজার। উৎপাদনসামগ্রী প্রস্তুত কাজে নিয়োজিত ৪ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শ্রমিক, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির কাজে নিয়োজিত ১ লাখ শ্রমিক। নির্মাণসামগ্রীর সাথে জড়িত শ্রমিকরে সংখ্যা ১৫ লাখ ৫০ হাজার। পাইকারী ও খুচরা ব্যবসায় ৬১ লাখ ২০ হাজার, হাসপাতাল ও রেস্তোঁরায় ৫৬ লাখ ১৫ হাজার, যোগোযাগ ব্যবস্থার সাথে জড়িত ৩০ লাখ ২৫ হাজার, ব্যাংক, বীমা সংক্রান্ত কাজে ২ লাখ ৩০ হাজার, রিয়েল এস্টেট, গাড়ি ও ব্যবসায় নিয়োজিত শ্রমিকরে সংখ্যা ২ লাখ ১০ হাজার, গণপ্রশাসনে ১০ লাখ, শিক্ষা সার্ভিসে ১২ লাখ স্বাস্থ্য ও সামাজিক কর্মকান্ডে ৫০ লাখ ১৫ হাজার, এবং স্বউদ্যোগে নির্মিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ২৫ লাখ ৭৫ হাজার। শ্রম মন্ত্রণালয়ের ২০০২-২০০৩ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৫-১৭ বছরের মোট শিশু ৪ কোটি ২৩ লাখ ৬৭ হাজার। এর মধ্যে শিশুশ্রমে নিয়োজিত ৭৪ লাখ ২৩ হাজার। অর্থাৎ মোট শিশুর ১৭.৫ শতাংশ শিশুশ্রমে জড়িত। এর মধ্যে ছেলেশিশু ৫৪ লাখ ৭১ হাজার আর মেয়েশিশু ১৯ লাখ ৫২ হাজার। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে ৫৭ শতাংশ শিশু কাজ করছে শুধু খাবারের বিনিময়ে। তাদের কোন বেতন ভাতা দেয়া হচ্ছে না।
দেশের সমাজ আজ লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি ও উদ্বীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নূন্যতম মজুরি নীতির অভাবে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। একদিকে ১৯৬১ সালের নূন্যতম মজুরি আইন, ১৯৬৯ সালের নূন্যতম মজুরি অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ সালের স্কপ-সরকার চুক্তি ১৯৯২ সালে গঠিত জাতীয় শ্রম আইন কমিশনের প্রয়োগহীনতা, অপর দিকে নতুন মুক্তবাজারের বিশ্বঅর্থনীতি একতরফা দাপটে দেশের শ্রমিক সাধারণের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বছর বছর মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছে, দ্রব্যমূল্য বেড়েছে কিন্তু শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি কমিশন আশানোরূপ বাড়েনি। দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরায় যে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করায় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ইসলামের শ্রম ও শ্রমিকের অধিকার
ইসলাম শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রসঙ্গে সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠ বক্তব্য রয়েছে। হাদীসে আছে, শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে তার মজুরি দিয়ে দাও। হাদীসে আরো আছে শ্রমজীবীর উপার্জনই শ্রেষ্ঠতর যদি সে সৎ উপার্জনশীল হয়। যে ব্যক্তি নিজের শ্রমের ওপর জীবিকা নির্বাহ করে তারচেয়ে উত্তম আহার আর কেউ করে না। কেবল উপর্যুক্ত হাদীসদ্বয় নয়, এ রকম অসংখ্য হাদীসের বাণী রয়েছে, যেখানে শ্রমকে সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমরা মুসলমানমাত্রই এ বিষয়ে সবিশেষ অবগত যে, ইসলামের দৃষ্টিতে ধনী-গরিব, উঁচু-নীচু সবাই সমান। এই যখন অবস্থা তখন তো অধীনস্থ লোকদের খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। এমনো হতে পারে যে, খাদেম তার মুনিব অপেক্ষা উত্তম এবং এও বিচিত্র নয় যে, আল্লাহর দরবারে খাদেমের কর্মই অধিক পছন্দনীয়। অনেক নবীই শ্রম বিনিয়োগ করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করেছেন।
নবী করীম (সাঃ) এ প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন: ‘দুনিয়াতে আল্লাহ এমন কোনো নবী প্রেরণ করেননি যিনি বকরি চরাননি। হযরত দাউদ (আঃ) কর্মকার ছিলেন, হযরত আদম (আঃ) কৃষক ছিলেন, হযরত নূহ (আঃ) ছুতার (কাঠের কর্মসম্পাদনকারী) হযরত ইদ্রিস (আঃ) দর্জি, হযরত মূসা (আঃ) বকরি চরিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় এমন ভূরি ভূরি নজির রয়েছে যে, একজন সৎ এবং যোগ্য ব্যক্তি মজদুর হয়েও রাষ্ট্রের কর্তধার পর্যন্ত হতে পারেন এবং হয়েছেনও। হযরত বেলাল, আম্মার, খাব্বাব, শুয়াইব, যায়েদ (রাঃ) প্রমুখ আরো অনেকেই মাওয়ালী বা আদায়কৃত দাস শ্রমিক ছিলেন। আজকাল শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক এক জটিল সমস্যায় আবর্তিত হচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই শ্রমিক-মালিক আজ যেন দু’টি মারমুখী প্রতিদ্বন্দ্বী। ইসলাম বলে, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক যেন কৃত্রিমতায় আচ্ছন্ন হয়ে না পড়ে। কারণ শ্রমিক আর মালিকের পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছাড়া জাতীয় উৎপাদনে সন্তোষজনক হার আশা করা যায় না।
মহানবী (সাঃ) মানবতার মুক্তির জন্যই কাজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন অসহায়, দুর্বল ও নির্যাতিতদের অতি আপনজন। সুখে-দুঃখে তিনি তাদের পাশে থাকতেন। এদের দুঃখ-বেদনায় তিনি এতটাই ব্যথিত হয়েছিলেন, জীবনসায়া‎ে‎হ্নও এদের কথাই বলে বলে পৃথিবীর মানবতাকে সাবধান করে গেছেন। ইন্তেকালের আগ মুহূর্তে তিনি বলে গেছেন, নামায ও অধিনস্থদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। (আবু দাউদ-ইবনে মাযাহ) তিনি আরো বলেছেন; তোমাদের গোলাম! তোমাদের ভৃত্য! তোমরা যা খাবে তা-ই তাদের খাওয়াবে, নিজেরা যা পরবে তা-ই পরতে দেবে। রাসূল (সাঃ) বলেছেন: অধিনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহার সৌভগ্যের উৎস আর তাদের সাথে দুর্ব্যবহার দুর্ভাগ্যের উৎস। (আবু দাউদ)
শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা না দিয়ে বাহুল্য ব্যয় করা ধনীদের স্বভাব। এ ধরনের আচরণ ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই মজুরি পরিশোধের তাগিদ দিয়েছে ইসলাম। মহানবী (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের চাকর-ভৃত্যরা তোমাদের ভাই। তাদের আল্লাহ তা’আলা তোমাদের অধিনস্থ করেছেন। সুতরাং আল্লাহ যার ভাইকে তার অধীন করে দিয়েছেন সে তার ভাইকে যেন তা-ই খাওয়ায় যা সে নিজে খায়, তাকে তা-ই পরিধান করায় যা সে পরিধান করে। আর তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ যেন তার ওপর না চাপায়। একান্ত যদি চাপানো হয়, তবে তা সমাধানের ব্যাপারে তাকে সাহায্য করা উচিত। (বুখারী ও মুসলিম)
ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রম হলো আল্লাহ তা’আলার এক পবিত্র আমানত। যে রাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের শ্রম বিনিয়োগস্থলের ব্যবস্থা করতে না পারে সে রাষ্ট্র কখনো জনকল্যাণমুখী হতে পারে না। ইসলাম বলছে: কারো অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তার বিপর্যস্ততার ছত্রছায়ায় যে চুক্তি করা হয় সেই চুক্তির কোনো মূল্য নেই। এরূপ জুলুমের চুক্তিকে ইসলাম কখনো অনুমোদন করে না। ইসলামের মূল কথা হলো নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ো না এবং অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করো না। এ ক্ষেত্রে শ্রমিকের মজুরি নিয়ে ইসলামের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট। মহানবী (সাঃ) বলেন: মালিক, শ্রমিকের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নেবে অথবা এমন মজুরি দেবে যাতে তার প্রয়োজন মিটে যায়। নবী করীম (সাঃ) পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা ছাড়া মজুর থেকে কাজ নেয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। শিকাগোর শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্বে শ্রমিকের ৮ ঘণ্টা দাবি প্রায় সব দেশে মেনে নেয়। ইসলাম এই মৌলিক সমস্যার অনেক যুক্তিযুক্ত সমাধান দিয়েছে ১৪২০ বছর আগেই। ইসলাম বলছে, জীবনযাত্রার মান, পরিবেশ ও আবহাওয়ার তারতম্যে সব দেশের সব মানুষের কর্মক্ষমতা সমান হয় না। ইসলামের দৃষ্টিতে তখনই একজন শ্রমিকের কাছ থেকে কাজ নেয়া যেতে পারে যতক্ষণ সে তা স্বাভাবিকভাবে কুলিয়ে উঠতে পারে। এছাড়া শ্রমিককে দিয়ে মালিক কী ধরনের কাজ করিয়ে নিতে চায় তাও নির্ধারণ করে নিতে হবে। মজুর পুঁজিপতির হাতের খেলনা নয়। ইসলামের মূলনীতি হলো মজুরকে দিয়ে এমন কাজ করিয়ে নেয়া যাবে না যা তার জন্য কষ্টকর।
অন্যদিকে রাসূল (সাঃ) বলেন; ‘সব দেশ ও জমিন আল্লাহর, আর সব মানুষ আল্লাহর বান্দা। তাই যেখানেই তুমি মঙ্গলজনক মনে করো সেখানেই বাস করো।’লাভের ব্যাপারে রাসূল (সাঃ) বলেন, শ্রমিকদের তাদের শ্রমার্জিত সম্পদ (লাভ) হতেও অংশ দিয়ো। এমনিভাবে দেখা যায়, ‘শ্রমিকের সব ধরনের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের চেয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা আর কেউ রাখতে পারেনি।
‘মহান মে দিবস’শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে চেতনা সঞ্চারিত করেছে দেখা যাচ্ছে ইসলাম এসব বিষয় যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে শ্রমিকদের এই অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেই মে দিবসের চেতনা সার্থক হবে।

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)

(পর্ব: ১)

নাম ‘উমর, লকব ফারুক এবং কুনিয়াত আবু হাফ্স। পিতা খাত্তাব ও মাতা হান্তামা। কুরাইশ বংশের আ’দী গোত্রের লোক। ‘উমরের অষ্টম উর্দ্ধ পুরুষ কা’ব নামক ব্যক্তির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র নসবের সাথে তাঁর নসব মিলিত হয়েছে। পিতা খাত্তাব কুরাইশ বংশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। মাতা ‘হানতামা’ কুরাইশ বংশের বিখ্যাত সেনাপতি হিশাম ইবন মুগিরার কন্যা। ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ এই মুগীরার পৌত্র। মক্কার ‘জাবালে আকিব’-এর পাদদেশে ছিল জাহিলী যুগে বনী ‘আ’দী ইবন কা’বের বসতি। এখানেই ছিল হযরত উমরের বাসস্থান। ইসলামী যুগে ‘উমরের নাম অনুসারে পাহাড়টির নাম হয় ‘জাবালে উমর’-উমরের পাহাড়। (তাবাকাতে ইবন সা’দ ৩/৬৬) ‘উমরের চাচাত ভাই. যায়িদ বিন নুফাইল। হযরত রাসূলে কারীমের আবির্ভারের পূর্বে নিজেদের বিচার বুদ্ধির সাহায্যে মূর্তিপুজা ত্যাগ করে জাহিলী আরবে যাঁরা তাওহীদবাদী হয়েছিলেন, যায়িদ তাঁদেরই একজন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র জন্মের তের বছর পর তাঁর জন্ম। মুত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র বয়সের সমান ৬৩ বছর। তবে তাঁর জন্ম ও ইসলাম গ্রহণের সন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
গাঁয়ের রং উজ্জ্বল গৌর বর্ণ, টাক মাথা, গন্ডদেশ মাংসহীন, ঘন দাড়ি, মোঁচের দু’পাশ লম্বা ও পুরু এবং শরীর দীর্ঘাকৃতির। হাজার মানুষের মধ্যেও তাঁকেই সবার থেকে লম্বা দেখা যেত।
তাঁর জন্ম ও বাল্যকাল সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না। ইবন আসাকির তাঁর তারীখে ‘আমর ইবন ‘আস (রাঃ) বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। তাতে জানা যায়, একদিন ‘আমর ইবন ‘আস কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবসহ বসে আছেন, এমন সময় হৈ চৈ শুনতে পেলেন। সংবাদ নিয়ে জানতে পেলেন, খাত্তাবের একটি ছেলে হয়েছে। এ বর্ণনার ভিত্তিতে মনে হয়, হযরত ‘উমরের জন্মের সময় বেশ একটা আনন্দোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
তাঁর যৌবনের অবস্থাও প্রায় অনেকটা অজ্ঞাত। কে জানতো যে এই সাধারণ এক রোখা ধরনের যুবকটি একদিন ‘ফারুকে আযমে’ পরিণত হবেন। কৈশরের উমরের পিতা তাঁকে উটের রাখালী কাজে লাগিয়ে দেন। তিনি মক্কার নিকটবর্তী ‘দাজনান’ নামক স্থানে উট চরাতেন। তিনি তাঁর খিলাফত কালে একবার এই মাঠ অতিক্রমকালে সঙ্গীদের কাছে বাল্যকালের স্মৃতিচারণ করেছিলেন এভাবে ঃ ‘এমন এক সময় ছিল যখন আমি পশমী জামা পরে এই মাঠে প্রখর রোধে খাত্তাবের উট চরাতাম। খাত্তাব ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও নীরস ব্যক্তি। ক্লান্ত হয়ে একটু বিশ্রাম নিলে পিতার হাতে নির্মম প্রহৃত হতাম। কিন্তু আজ আমার এমন দিন এসেছে যে, এক আল্লাহ ছাড়া আমার উপর কর্তৃত্ব করার আর কেউ নেই।’- (তাবাকাত ৩/২৬৬-৬৭)
যৌবনের প্রারম্ভেই তিনি তৎকালীন অভিজাত আরবদের অবশ্য শিক্ষণীয় বিষয়গুলি যথাঃ যুদ্ধ বিদ্যা, কুস্তি, বক্তৃতা ও বংশ তালিকা শিক্ষা প্রভৃতি আয়ত্ব করেন। বংশ তালিকা বা নসবনামা বিদ্যা তিনি লাভ করেন উত্তরাধিকার সূত্রে। তাঁর পিতা ও পিতামহ উভয়ে ছিলেন এ বিদ্যায় বিশেষ পারদর্শী। তিনি ছিলেন তাঁর যুগের একজন শ্রেষ্ঠ কুস্তিগীর। আরবের ‘উকায’ মেলায় তিনি কুস্তি লড়তেন। আল্লামা যুবায়ানী বলেছেন ঃ ‘উমর ছিলেন একজন মস্ত-বড় পাহলোয়ান।’ তিনি ছিলেন জাহিলী আরবের এক বিখ্যাত ঘোর সওয়ার। আল্লামা জাহিয বলেছেনঃ ‘উমর ঘোড়ায় চড়লে মনে হত, ঘোড়ার চামড়ার সাথে তাঁর শরীর মিশে গেছে’ (আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন)। তার মধ্যে কাব্য প্রতিভাও ছিল। তৎকালীন খ্যাতনামা কবিদের প্রায় সব কবিতাই তাঁর মুখস্ত ছিল। আরবী কাব্য সমালোচনার বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রতিষ্ঠাতা প্রকৃতপক্ষে তিনিই। ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর মতামতগুলি পাঠ করলে এ বিষয়ে তাঁর যে কতখানি দখল ছিল তা উপলব্ধী করা যায়। বাগ্মিতায় ছিল তাঁর সহজাত গুণ। যৌবনে তিনি কিছু লেখাপড়া শিখেছিলেন। বালাজুরী লিখেছেন ঃ ‘ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় গোটা বংশে মাত্র সতেরজন লেখা-পড়া জানতেন। তাদের মধ্যে উমর একজন।
ব্যবসা বাণিজ্য ছিল জাহিলী যুগের আরব জাতির সম্মানজনক পেশা। উমরও ব্যবসা শুরু করেন এবং তাতে যথেষ্ট উন্নতিও করেন। ব্যবসা উপলক্ষে অনেক দূরদেশে গমন এবং বহু জ্ঞানী-গুণী সমাজের সাথে মেলামেশার সুযোগ লাভ করেন। মাসউদী বলেনঃ ‘উমর জাহিলী যুগে সিরিয়া ও ইরাকে ব্যবসা উপলক্ষ্যে ভ্রমণে যেতেন। ফলে আরব ও আজমের অনেক রাজা-বাদশার সাথে মেলামেশার সুযোগ লাভ করেন।’ শিবলী নু’মানী বলেনঃ ‘জাহেলী যুগেই উমরের সুনাম সমগ্র আরবে ছড়িয়ে পড়েছিল। এ কারণে কুরাইশরা সর্বদা তাঁকেই দৌত্যগিরিতে নিয়োগ করতো। অন্যান্য গোত্রের সাথে কোন বিরোধ সৃষ্টি হলে নিষ্পত্তির জন্য তাঁকেই দূত হিসেবে পাঠানো হত। (আল-ফারুক-১৪)।
উমরের ইসলাম গ্রহণ এক চিত্তাকর্ষক ঘটনা। তাঁর চাচাত ভাই যায়িদের কল্যাণে তাঁর বংশে তাওহীদের বাণী একেবারে নতুন ছিল না। তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম যায়িদের পুত্র সাঈদ ইসলাম গ্রহণ করেন। সাঈদ আবার উমরের বোন ফাতিমাকে বিয়ে করেন। স্বামীর সাথে ফাতিমাও ইসলাম গ্রহণ করেন। উমরের বংশের আর এক বিশিষ্ট ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহও ইসলাম গ্রহণ করেন। কিন্তু তখনও পর্যন্ত উমর ইসলাম সম্পর্কে কোন খবরই রাখতেন না। সর্বপ্রথম যখন ইসলামের কথা শুনলেন, ক্রোধে জ্বলতে লাগলেন। তাঁর বংশে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের তিনি পরম শত্র“ হয়ে দাড়ালেন। এর মধ্যে জানতে পেলেন, ‘লাবীনা’ নামে এক দাসীও ইসলাম গ্রহণ করেছেন। যাঁদের উপর তাঁর ক্ষমতা চলতো, নির্মম উৎপীড়ন চালালেন। এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, ইসলামের মূল প্রচারক মুহাম্মদ সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। যে কথা সেই কাজ….
(চলবে)

বর্তমান বিশ্ব

বর্তমান বিশ্বে নৈতিকতার বিষয়টি বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। কারণ আধুনিক বিজ্ঞানময় এই যুগে সাধারণ মানুষ ধরে নিয়েছিল উন্নত শিক্ষাদীক্ষায় মানুষের নৈতিকতার মানও উন্নয়ন হবে, কিন্তু না, এসব শিক্ষা মানুষকে মঙ্গলগ্রহে পৌঁছিয়েছে; কিন্তু সাধারণ মানুষে মানুষে যে অধিকার ও দায়িত্ব-কর্তব্য, নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন, আদর্শ ও মহানুভব চরিত্র-মাধুর্য দিয়ে বিশ্বকে জয় করার মানসিকতা ক্রমেই লোপ পাচ্ছে। আজ মানুষ অন্যের অধিকার হনন করে যেকোনো নিষ্ঠুরতা অবলম্বন করে হলেও নিজেকে দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, নিজের মতামতকে প্রাধান্য দিতে চায়। ফলে দেশে দেশে ক্রমেই শান্তি স্বস্তি অভিরুচি বিদূরিত হয়ে চলেছে। এখন মানুষ আবার একটি আদর্শিক নীতি-নৈতিকতাসম্পন্ন পরিবেশ ফিরে পেতে পিপাসার্তভাবে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছে। এ ক্ষেত্রে আবার মানুষ ফিরে আসছে ইসলামের শিক্ষায়, ইসলামের মহান নবী হজরত মুহাম্মদ সাঃ-এর মহানুভব জীবন অনুসরণে। মহানবী আনীত আল-কুরআনই মানবজাতিকে শিক্ষার সাথে নৈতিকতার সমন্বয় ঘটিয়ে একটি আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠায় যুগে যুগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে। যেমন আল-কুরআনে বলা হয়েছে রব্বানা ওআবায়াস ফিহিম রাসূলাম মিনহুম ইয়াতলু আলাইহিম…। মহান আল্লাহপাক এ আয়াতে হজরত ইবরাহিম নবী আঃ-এর মুখনিসৃত এক ঐতিহাসিক মুনাজাতের মাধ্যমে আখেরি নবী হজরত রাসূলে করিম সাঃ এ দুনিয়ায় আসার কারণ তুলে ধরেছেন। হে আমাদের রব, তুমি শেষ জামানার উম্মতের জন্য তাদের মাঝ থেকে এমন এক নবী প্রেরণ করো যিনি তাদের তোমার পাক কালাম শরিফ বিশুদ্ধ তেলাওয়াত শিখাবেন, কিতাবের অন্তর্নিহিত জ্ঞান, বিজ্ঞান শিক্ষা দেবেন এবং তাদের পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করবেন।
এ আয়াতের সর্বশেষ কথা হলো মানুষকে পরিশুদ্ধ করার বিষয়, নৈতিকভাবে বলীয়ান করার বিষয়। অন্যান্য শিক্ষাব্যবস্থায় এ নৈতিক ও আত্মশুদ্ধির বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হয় না বলে মানুষ সুশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও অনেক মানবিক গুণ থেকে বঞ্চিত হয়। আমাদের মহানবী সাঃ হাদিসে বলেছেন, বুইসতু মাকারিমাল আখলাক। আমি চারিত্রিক মাধুর্যের উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রেরিত হয়েছি। মানুষের নৈতিকতা সংশোধনের অন্য মাধ্যম হলো পরকালীন জবাবদিহিতার ভয়। ইসলামী শিক্ষা অনেকটা পরকালমুখী। যার কারণে সত্যিকারের ঈমানদার কখনো নীতি-নৈতিকতাহীন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়াতে পারে না।
ফামাই ইয়ামাল মিসকালা যাররাতিন খাইরাই ইয়ারাহন্ধ যে ব্যক্তি এ দুনিয়ায় অণু-পরমাণু পরিমাণ ভালো কিছু করবে তা তার সামনে হাজির করা হবে আর যে পরিমাণ খারাপ কিছু করবে তা-ও সে পরকালের বিচারালয়ে প্রত্যক্ষ করবে।
বর্তমানে আমরা দেখি শিক্ষাদীক্ষা ও শৃঙ্খলা বোধে যথেষ্ট দীক্ষিত হওয়া সত্যেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে, উচ্ছৃঙ্খল হয়, অপরিণামদর্শী হয়, ভুলে যায় হিতাহিত জ্ঞান। আধুনিক যুগেও এসব মানব দল থেকে এমন ঘৃণ্য আচরণ সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ করে যা আশরাফুল মাখলুকাতের কাছ থেকে আশা করা যায় না। এসব বর্বরতার কাহিনী শুনেছি আমরা অসভ্য অন্ধকার আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগের মানুষের ইতিহাসে। তাই যেকোনো শিক্ষাদীক্ষার পাশাপাশি ইসলামী নীতি-নৈতিকতা বোধসম্পন্ন পরকালীন জবাবদিহিতামূলক এবং অন্য যেকোনো সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা উদ্‌গিরণকারী ইলমে দীন ও ইলমে তাসাউফ শিক্ষা দেয়া জরুরি।
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের চরিত্র দু’ভাগে বিভক্ত। আখলাকে হামিদা, আখলাকে যামিমাহন্ধ সৎ চরিত্র ও অসৎ চরিত্র। সচ্চরিত্র যেমন সততা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমা, পরোপকার, শালিনতা ইত্যাদি। অসৎ চরিত্র বলতে মিথ্যা বলা, গালি দেয়া, ঝগড়া করা, চুরি করা ইত্যাদি বোঝায়।
নৈতিকতা, সততা আখলাকে হামিদাহ বা মানুষের সৎ চরিত্রগুলোর মধ্যে একটি শ্রেষ্ঠ গুণ ও বৈশিষ্ট্য। এর অর্থ সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, সাধুতা; কাজকর্ম, কথাবার্তায়, লেনদেনে এক কথায় জীবনের সব ক্ষেত্রে ন্যায়নীতি অবলম্বন করা। সত্য কথা বলা, সৎ পথে চলা, সুবিচার করা, অঙ্গীকার পালন করা, আমানত রক্ষা করা, প্রতারণা না করা। এসব মহৎ গুণ আচরণ ব্যক্তিকে করে মহিয়ান আর সমাজকে করে স্থিতিশীল ও ইনসাফপূর্ণ। মানবজীবনের সুখ-শান্তি, নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলা এসবের ওপর বেশির ভাগ নির্ভরশীল। সৎ লোক ন্যায়-অন্যায় সম্পর্কে সচেতন থাকে। সৎ ব্যবসায়ী দ্রব্যে ভেজাল দেয় না এবং পণ্যের দোষত্রুটি গোপন রাখে না। সৎ কর্মচারী কাজে ফাঁকি দেয় না। সৎ লোক প্রতারণা করে না, প্রবঞ্চনা করতে পারে না। মানুষ সাধারণত অর্থলিপ্সু ও সীমাহীন লোভাতুর হয়ে ব্যবসায়-বাণিজ্যে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং অধিক মুনাফার আশায় ক্রেতাকে প্রতারিত করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে অত্যধিক লাভের কামনায় পণ্যে ভেজাল ও মাপে কম-বেশি করে থাকে। এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। তাই ইসলামে এরূপ কাজকে মারাত্মক অপরাধমূলক কাজ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
সমাজে বিচার-আচার করার ক্ষেত্রেও নীতি-নৈতিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহতায়ালা পাক কালাম শরীফে ইরশাদ করেছেনন্ধ তোমরা ন্যায়ভিত্তিক বিচার সম্পন্ন করো। তা খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আর ন্যায়বিচার করো (স্বজনপ্রীতি করো না) যদিও বা কেউ তোমাদের নিকটাত্মীয় হয়। বলা বাহুল্য, নীতি-নৈতিকতার গুণে গুণান্বিত ব্যক্তি সবার বিশ্বাস অর্জন করে, শ্রদ্ধা লাভ করে, এমনকি পরম শত্রুও তাকে বিশ্বাস করে।
বিশ্বের দেশে দেশে নৈতিক মানসম্পন্ন লোকের নেতৃত্ব ও সুশাসনের কথাটি বর্তমানে বেশ জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। আমাদের দেশে চলছে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ। আমরা এ-ও মনে করি নিজে সৎভাবে চলার জন্য সততা লালনের জন্য পরিবেশ পাওয়া একটি বড় বিষয়। নীতি-নৈতিকতা ও সততার সাথে অসততা আর দুর্নীতির একটি চিরন্তন দ্বন্দ্ব রয়েছে। অসৎ লোকের সংখ্যা সমাজে বেশি। আল্লাহর মহান নবী-রাসূলগণ সত্যকে বিজয়ী করতে পেরেছিলেন ঠিক, অসৎদের সাথে তাদের আজীবন দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকতে হয়েছে। আজও সৎ মানুষ বিভিন্ন স্থানে অন্যায় অসুন্দরের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধরত। অসৎদের নেতৃত্বে এ যুগে সব সেক্টরে সৎ মানুষ কোণঠাসা। এমনকি ধর্মীয় উপাসনাগুলোতেও। বর্তমানে বিভিন্ন দুর্নীতি-অনিয়মে ভরা এক শ্রেণীর সামাজিক টাউটদের হাতে মসজিদ ও মাদ্রাসার নেতৃত্ব। আল্লাহপাক আমাদের সত্যিকার অর্থে নীতি-নৈতিকতার জ্ঞানসম্পন্ন সুস্থ মস্তিষ্কের ব্যক্তি ও জাতি হিসেবে গড়ে ওঠার তওফিক দান করুন।
লেখকঃ জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ইমাম নির্বাচিত ও পুরস্কৃত ২০০৭, স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত ২০০৮


মামুনুর রশীদ
মোবাইল: ০০৯৬৫-৯৭৩৫২১৩২
ফোন: ০০৯৬৫-২২৪৪৪১১৭-২১৫
কুয়েত

এপ্রিলের মিথ্যাচার

كذبة إبريل

মিথ্যা একটি চারিত্রিক ব্যাধি। যার মধ্যে মনুষ্য রুচিবোধ কিংবা সুস্থ প্রকৃতি বিদ্যমান সে কোনক্রমেই এর প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করতে পারে না। আর না করাই হচ্ছে স্বাভাবিক মনুষ্য ধর্ম। সকল ধর্মেই এর প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়েছে।
‘পক্ষান্তরে সত্য পৃথিবীর স্থায়ীত্বের একটি মূল ভিত্তি। প্রশংসাযোগ্য বস্তু, নবুওয়তের অংশ ও তাকওয়ার ফল। এ সত্য না থাকলে শরিয়তের বিধানসমূহ অকেজো হয়ে যেত। মূলত মিথ্যা বলার দোষে দুষ্ট হওয়ার অর্থ হচ্ছে মানবতা থেকে বেরিয়ে যাওয়া। কারণ, কথা বলা মানুষের একটি বৈশিষ্ট্য আর কথা সত্য না হলে তার কোন অর্থই থাকে না।’ (মুহাম্মদ আল-খাদেমি রচিত, বারিককা মাহমুদিয়া : ৩/১৮৩)
আমাদের পবিত্র দীনে ইসলামে এর সামান্যতম আশ্রয়-প্রশ্রয় নেই। কুরআন, হাদিস এবং উম্মতের ঐক্যমত দ্বারা প্রমাণিত যে এটা হারাম, এটা নিষিদ্ধ ও গর্হিত। যে মিথ্যা বলে তার পরিণাম দুনিয়া ও আখেরাতে খুবই নিন্দনীয়।
নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্র ব্যতীত মিথ্যা বলার কোন অবকাশ নেই। এ মিথ্যার মাধ্যমে কারো অধিকার হরণ করা যাবে না, কাউকে হত্যা করা যাবে না এবং কারো ইজ্জম সম্মানে আঘাত হানা যাবে না। বরং কাউকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কিংবা দু’জনের মধ্যে ছিন্ন সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করার জন্য অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মিল-মহব্বত তৈরি করার জন্য এ মিথ্যার আশ্রয় নেয়া যাবে, অন্যথায় নয়।
ইসলাম ধর্মে এমন একটি মুহূর্ত কিংবা দিন-ক্ষণ নেই যার মধ্যে মিথ্যা বলা বৈধ বা মানুষ যা চায় তা বলার জন্য সে স্বাধীন। পক্ষান্তরে কতক সমাজে প্রচলিত রেওয়াজ যেমন পহেলা এপ্রিল বা এপ্রিল ফুল নামে যে কুসংস্কার চলে আসছে যে, তাতে মিথ্যা বলা বা কাউকে ধোঁকা দেয়া সম্পূর্ণ বৈধ, তার কোন ভিত্তি ইসলাম ধর্মেই নেই। বরং মিথ্যা সবসময়ই মিথ্যা এবং সবসময় তা হারাম।
মিথ্যার ক্ষতিসমূহ :
মিথ্যা বলা হারাম :
১. আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মিথ্যা তো তারাই বানায় যারা আল্লাহর নিদর্শন সমূহের ওপর ঈমান রাখে না। বস্তুত তারাই মিথ্যুক।’ (সূরা নাহাল : ১০৫)
ইবনে কাসির রহ. বলেন, ‘অতঃপর আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিয়েছেন যে, রাসূল সা. মিথ্যা তৈরি করেন না এবং মিথ্যা বলেনও না। কারণ, আল্লাহ এবং তার রাসূলের নামে যারা মিথ্যা রটায় তারা নিকৃষ্ট মাখলুক। তারা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের ওপর বিশ্বাস রাখে না, তারা কাফের, তারা বদ্দীন, তারা মানুষের নিকট মিথ্যুক হিসেবে পরিচিত। পক্ষান্তরে রাসূল সা. মানুষের মাঝে সব চেয়ে সত্যবাদী হিসেবে, সব চেয়ে সৎকর্মশীল হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। কওমের সবাই তাকে বিশ্বস্ত মু‏হাম্মদ বা আলআমীন মুহাম্মদ বলে ডাকত।’ (ইবনে কাসির : ২/৫৮৮)
২. আবুহুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘মুনাফেকদের নিদর্শন তিনটি : কথা বলার সময় মিথ্যা বলা, ওয়াদা করে ভঙ্গ করা এবং আমানতের মধ্যে খেয়ানত করা।’ (বুখারি : ৩৩, মুসলিম : ৫৯)
ইমাম নববি রহ. বলেন, অধিকাংশ আলেমে রায় হচ্ছে এগুলো মুনাফিকির আলামত ও স্বভাব। যার মধ্যে এগুলো থাকবে সে এসব স্বভাবে মুনাফেকদের ন্যায় ও তাদের আচরণ গ্রহণকারী।
সব চেয়ে বড় মিথ্যা :
সব চেয়ে বড় মিথ্যা হচ্ছে আল্লাহ ও তার রাসূল সা. এর ওপর আরোপ করা। এর শাস্তি ভয়াবহ, কেউ কেউ এ জাতীয় মিথ্যুককে কাফের পর্যন্ত বলেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমাদের জিহ্বা দ্বারা বানানো মিথ্যার ওপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম, আল্লাহর ওপর মিথ্যা রটানোর জন্য। নিশ্চয় যারা আল্লাহর নামে মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না।’ (নাহাল : ১১৬)
আলী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘তোমরা আমার ওপর মিথ্যা বলবে না, যে আমার ওপর মিথ্যা বলবে, সে যেন আগুনে প্রবেশ করে।’ (বুখারি : ১০৬)
আবুহুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘যে আমার ওপর মিথ্যা বলল, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়।’ (বুখারি : ১১০, মুসলিম : ৩)
ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন, ‘এর অর্থ হচ্ছে যে রাসূল সা. এর ওপর মিথ্যা বলবে সে যেন নিজ স্থায়ী ঠিকানা জাহান্নাম বানিয়ে নেয়।’ (তারিকুল হিজরাতাইন : ১৬৯)
বেচাকেনায় মিথ্যা বলা :
সাহাবি আবুজর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘কেয়ামতের দিন তিন জন ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ কথা বলবেন না এবং তাদের দিকে তাকাবেন না এবং সংশোধন করবেন না, আরো তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। আবুজর বলেন, রাসূল সা. একথাগুলো তিনবার বললেন। আবুজর বলেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত, তারা ধ্বংস প্রাপ্ত, তাদের পরিচয় কি হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী, উপকার করে খোটা প্রদানকারী ব্যক্তি ও মিথ্যা কসমের মাধ্যমে বিক্রয়কারী ব্যক্তি।’ (মুসলিম : ১০৬)
হাকিম বিন হিজাম থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘ক্রেতা ও বিক্রেতা ইচ্ছাধীন যতক্ষণ না তারা পৃথক হয়। যদি তারা সত্য বলে ও দোষ-গুণ বর্ণনা করে দেয়, তবে তাদের মধ্যে বরকত প্রদান করা হয়। আর যদি তারা গোপন রাখে ও মিথ্যা বলে তবে তাদের বরকত নষ্ট করে দেয়া হয়।’ (বুখারি : ১৯৭৩, মুসলিম : ৫৩২)
শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, ‘আল্লাহ সত্য ও স্পষ্ট করে বলার জন্য আদেশ দিয়েছেন এবং মিথ্যা ও গোপন করার জন্য নিষেধ করেছেন, যেসব ব্যাপারে স্পষ্ট করে বলার প্রয়োজন হয়, সেসব ব্যাপারে। যেমন রাসূল সা. বলেছেন, ‘ক্রেতা ও বিক্রেতা ইচ্ছাধীন যতক্ষণ না তারা পৃথক হয়। যদি তারা সত্য বলে ও দোষ-গুণ বর্ণনা করে দেয়, তবে তাদের মধ্যে বরকত প্রদান করা হয়। আর যদি তারা গোপন রাখে ও মিথ্যা বলে তবে তাদের বরকত নষ্ট করে দেয়া হয়।’ আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও। কোন কওমের প্রতি শত্র“তা যেন তোমাদেরকে কোনভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ কর, তা তাকওয়ার নিকটতর।’ মায়েদা : ৮, (মিহাজুজ সুন্নাহ : ১/৬১)
স্বপ্নের ব্যাপারে মিথ্যা বলা হারাম :
কেউ কেউ স্বপ্নে কিছু না দেখেও বলে যে, আমি স্বপ্নে এমন এমন দেখেছি, অতঃপর মানুষের কাছে তা বলে বেড়ায়। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি স্বপ্ন না দেখেও স্বপ্ন দেখার ভান করবে, তাকে দু’টি গমের মাঝে গিরা দিতে বলা হবে, অথচ তা সে করতে সক্ষম হবে না। আর যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের কথা কান পেতে শোনল, অথচ তারা তাকে তা শোনাতে চায়নি, তার কানে কেয়ামতের দিন শিশা ঢালা হবে, যে ব্যক্তি ছবি অঙ্কন করবে কেয়ামতের দিন তাকে শাস্তি দেয়া হবে এবং তাকে বলা হবে তাতে রুহ সঞ্চার করতে, অথচ তা করতে সে সক্ষম হবে না।’ (বুখারি : ৬৬৩৫)
মুনাবি রহ. বলেন, ‘দু’টি গমের মাঝে তাকে গিরা দিতে বলা হবে’ এর অর্থ হচ্ছে তাকে সর্বদা শাস্তি দেয়া হবে। জাগ্রত অবস্থার চেয়ে ঘুমন্ত অবস্থার মিথ্যা ব্যাপারে কেন এ কঠিন শাস্তি ? অথচ জাগ্রত অবস্থায় মিথ্যা বলে কাউকে তো হত্যা পর্যন্ত করা যায়। এর উত্তর হচ্ছে, ঘুমন্ত অবস্থায় মিথ্যা বলার অর্থ হল আল্লাহর ওপর মিথ্যা বলা। কারণ, স্বপ্ন নবওয়তের একটি অংশ, তাই নবুওয়তের অংশও আল্লাহর পক্ষ থেকেই। সবার নিকট বিদিত যে, মানুষের ওপর মিথ্যা বলার চেয়ে আল্লাহর ওপর মিথ্যা বলার শাস্তি ভয়াবহ ও কঠিন।’ (ফায়জুল কাদির : ৬/৯৯)
সব শোনা কথা বলাও হারাম :
হাফস বিন আসেম থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেনে, ‘ব্যক্তির মিথ্যুক হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনবে তাই বলবে।’ (মুসলিম : ৫)
ইমাম নববি রহ. বলেন, ‘এ সব হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যা যা শোনা যায় তার সব কিছু বলা নিষেধ। কারণ, প্রতিনিয়ত সত্য-মিথ্যা অনেক কিছুই শোনা যায়, অতএব যে ব্যক্তি সব কিছু বলে বেড়াবে তার দ্বারা মিথ্যা প্রচারিত হওয়াই স্বাবাভিক, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোন সম্পর্ক বিদ্যমান থাকবে না। আর এটাই হচ্ছে মিথ্যা, মিথ্যার জন্য ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন দখল নেই। হ্যা, গোনাগার হওয়ার ইচ্ছা শর্ত।আল্লাই ভাল জানেন।’ (মুসলিমের ব্যাখ্যা গ্রন্থ : ১/৭৫)
সব চেয়ে ঘৃণিত হচ্ছে হাসি-মসকরাচ্ছলে মিথ্যা বলা :
অনেকে ধারণা করে যে হাসি-রসিকতায় মিথ্যা বলা বৈধ। আর এ থেকেই বিশ্ব ধোঁকা দিবস বা এপ্রিল ফুলের জন্ম। এটা ভুল ধারণা, এর কোন ভিত্তি নেই ইসলাম ধর্মে। রসিকতা কিংবা স্বাভাবিক অবস্থায় মিথ্যা সর্বাবস্থায় হারাম।
ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, ‘আমি রসিকতা করি ঠিক, তবে সত্য ব্যতীত কখনো মিথ্যা বলি না।’ (তাবরানি ফিল মুজামুল কাবির : ১২/৩৯১, সহিহ আল-জামে : হাদিস নং ২৪৯৪)
আবুহুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, সাহাবায়ে কেরাম একদা বলল, হে আল্লাহ রাসূল, আপনি তো আমাদের সঙ্গে রসিকতা করেন। তিনি বললেন, ‘আমি সত্য ভিন্ন কিছু বলি না।’ (তিরমিজি : ১৯৯০)
আব্দুর রহমান ইবনে আবি লায়লা রহ. বলেন, রাসূল সা. এর সাহাবাগণ বলেছেন যে, তারা রাসূল সা. সঙ্গে কোন সফরে ছিল, তাদের একজন ঘুমিয়ে পড়লে অপর কেউ তার তীর নিয়ে নেয়, লোকটি ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে ভীত হয়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে সবাই হেসে দিল। রাসূল সা. বললেন, তোমরা হাসলে কেন? তারা বলল, কিছু হয়নি। তবে আমি তার তীরটি নিয়েছিলাম আর এতেই সে ঘাবড়ে গেছে। রাসূল সা. বললেন, ‘কোন মুসলমানের জন্য অন্য কোন মুসলমানকে ভয় দেখানো বৈধ নয়।’ (আবুদাউ : ৫০০৪, আহমদ : ২২৫৫৫, অনুবাদ আহমদ থেকে, জহিহ আল-জামে : ৭৬৫৮)
অপর এক হাদিসে রাসূল সা. বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ কারো আসবাব পত্র ইচ্ছায় বা রসিকতায় ধরবে না, কেউ কারোটা ধরে থাকলে তার উচিত তাকে তা ফেরৎ দেয়া।’ (আবুদাউদ : ৫০০৩, তিরমিজি : ২১৬০, সহিহ আল-জামে : ৭৫৭৮, হাদিসটি হাসান)
বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলাচ্ছলে মিথ্যা বলা :
বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলাতেও মিথ্যা থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ, এটা বাচ্চাদের অন্তরে গেঁথে যায়। রাসূল সা. এর থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আমের থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাকে আমার আম্মা একদিন ডাকলেন, তখন রাসুল সা. আামাদের ঘরে বসা ছিলেন, আম্মা বললেন, তুমি আস, আমি তোমাকে দেব। রাসূল সা. বললেন, তুমি তাকে কি দেয়ার ইচ্ছা করেছ? তিনি বললেন, আমি তাকে খেজুর দেব। রাসূল সা. তাকে বললেন, হ্যা, যদি তুমি তাকে কিছু না দিতে তবে তার সঙ্গে তোমার এটা মিথ্যা বলা হত।’ আবুহুরায়রা রা. বলেন, যে ব্যক্তি কোন বাচ্চাকে বলল, আস আমি তোমাকে দেব, অতঃপর সে যদি না দেয়, তবে তার এটা মিথ্যা কথা হবে। (আবুদাউদ : ৪৯৯১, হাদিসটি সহিহ আল-জামেতে হাসান বলা হয়েছে, হাদিস নং ১৩১৯)
লোক হাসানোর জন্য মিথ্যা বলা :
মুয়াবিয়া বিন হাইদা বলেন, আমি রাসূল সা. কে বলতে শোনেছি, ‘ধ্বংস তার জন্য যে, লোক হাসানোর জন্য কথা বলে এবং তাতে সে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। ধ্বংস তার জন্য, ধ্বংস তার জন্য।’ (তিরমিজি : ২৩৫, তিনি বলেছেন, হাদিসটি হাসান, আবুদাউদ : ৪৯৯০)
মিথ্যার পরিণাম :
মিথ্যা বলার পরিণাম খুবই ধ্বংসাত্মক। এর জন্য দুনিয়াতে রয়েছে ধ্বংস আর আখেরাত রয়েছে অপমান ও লাঞ্ছনা। নিম্নে কয়েকটি তুলে ধরা হল :
ক. মিথ্যার কারণে অন্তরে কপটতার সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সুতরাং পরিণামে তিনি তাদের অন্তরে নিফাক রেখে দিলেন সেদিন পর্যন্ত, যেদিন তারা তার সাথে সাক্ষাৎ করবে, তারা আল্লাহকে যে ওয়াদা দিয়েছে তা ভঙ্গ করার কারণে এবং তারা যে মিথ্যা বলেছিল তার কারণে।’ (তওবা : ৭৭) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ বলেন, ‘মুনাফিকদের পরিচয় তিনটি : যখন কথা বলবে মিথ্যা বলবে, আর ওয়াদা করে ভঙ্গ করবে ও আমানত রাখলে খেয়ানত করবে। অতঃপর তিনি দলিল স্বরূপ সুরা তওবার ৭৫-৭৭ পর্যন্ত আয়াতগুলো তেলাওয়াত করেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা : ৬/১২৫)
খ. মিথ্যা পাপাচার ও জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, ‘সত্যাবাদিতা হচ্ছে শুভ কাজ। আর শুভ কাজ জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। আর বান্দা যখন সত্য বলতে থাকে, একসময় আল্লাহর নিকট সে সিদ্দিক হিসেবে পরিগণিত হয়। আর মিথ্যা হচ্ছে পাপাচার, পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়, বান্দা যখন মিথ্যা বলতে থাকে, আল্লাহর নিকট একসময় সে মিথ্যুক হিসেবে গণ্য হয়। (বুখারি : ৫৭৪৩, মুসলিম : ২৬০৭)
সানআনি বলেন, ‘হাদিসে এর প্রতি ঈঙ্গিত রয়েছে যে, বান্দা সত্য বললে সত্যবাদিতা তার একটি আলামত হয়ে যায়। পক্ষান্তরে বান্দা মিথ্যা বললে মিথ্যা বলা তার অভ্যাস ও আলামতে পরিণত হয়। সত্যবাদিতা ব্যক্তিকে জান্নাতে নিয়ে যায় আর মিথ্যা ব্যক্তিকে জাহান্নামে নিয়ে যায়। অধিকন্তু সত্যবাদির কথার প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকে ও তা মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্যতা পায় আর মিথ্যুকদের কথার প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকে না এবং মানুষের নিকট তা গ্রহণযোগ্যতাও পায় না।’ (সুবুলুস্সালাম : ২/৬৮৭)
গ. মিথ্যুকদের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় না। ইবনুল কাইয়ূম রহ. বলেন, যেসব কারণে ফতোয়া, সাক্ষ্য ও বর্ণনা পরিত্যাগ করা হয় তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে মিথ্যা। মিথ্যা মানুষের মুখের কার্যকারিতাই নষ্ট করে দেয়। যেমনিভাবে অন্ধ ব্যক্তির চাঁদ দেখার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় এবং বধির ব্যক্তির শোনার সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, মুখ একটি অঙ্গের ন্যায় যখন তা মিথ্যা বলা আরম্ভ করবে তখন তার কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যাবে। বরং মানুষের ক্ষতির মূল কারণই হচ্ছে মিথ্যা জবান।’ (আলামুল মুয়াক্কিঈন : ১/৯৫)
ঘ. মিথ্যার কারণে দুনিয়া আখেরাত উভয় জাগতেই চেহারা বিবর্ণ ও মলিন হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে কিয়ামতের দিন তুমি তাদের চেহারাগুলো কালো দেখতে পাবে।’ (জুমার : ৬০) আল্লাহ এবং তার রাসূলের ওপর মিথ্যা বলার শাস্তি হচ্ছে চেহারা কালো হয়ে যাওয়া।
ঙ. হাদিস দ্বারা প্রমাণিত মিথ্যুকের চোয়াল চিরে গর্দান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে। (বুখারি : ৫৭৪৫)
যেসব কারণে মিথ্যা বলা যায় :
তিন জায়গায় মিথ্যা বলা বৈধ। ১. যুদ্ধে মিথ্যা বলা বৈধ। ২. দু’গ্র“পের মাঝে সমঝোতা করার জন্য মিথ্যা বলা বৈধ। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মিল-মহব্বত সৃষ্টি করার জন্যও মিথ্যা বলা বৈধ।
উম্মেকুলসুম রা. বলেন, আমি রাসূল সা. কে বলতে শোনেছি : ‘যে ব্যক্তি দু’জনে মাঝে সমঝোতা করার জন্য ভালো কথার আদান-প্রদানকালে মিথ্যা বলে সে মিথ্যুক নয়।’ (বুখারি : ২৫৪৬, মুসলিম : ২৬০৫)
আসমা বিনতে ইয়াজিদ বলেন, রাসূল সা. বলেছেন, ‘তিন জায়গা ব্যতীত মিথ্যা বলা বৈধ নয়। স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্য মিথ্যা বলা, যুদ্ধে মিথ্যা বলা এবং দু’জনের মাঝে সমঝোতা করার জন্য মিথ্যা বলা বৈধ। তিরমিজি : ১৯৩৯, সহিহ আল-জামে : ৭৭২৩)

এপ্রিল ফুল বা এপ্রিলের বোকা :
এপ্রিল ফুল সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি, তবে এ সম্পর্কে অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়। তার মধ্যে বহুল প্রচলিত হচ্ছে নিম্নের ঘটনাটি :
এপ্রিল ফুল :
এপ্রিল ফুল সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায়নি, তবে এ সম্পর্কে কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন, কেউ কেউ বলেছেন, ২১ মার্চ যখন রাত-দিন সমান হয়ে যায় …….
এপ্রিল ফুল নিয়ে আবার কারো কারো বক্তব্য হচ্ছে :
আমরা অনেকেই এপ্রিল ফুল বা বিশ্ব বোকা দিবস উদযাপন করে থাকি। অথচ এ দিবসের জন্ম রহস্য বা এর প্রেক্ষাপট সম্পর্কে স¤পূর্ণ অজ্ঞ। প্রায় হাজার বছর পূর্বে মুসলমানগণ যখন স্পেন শাসন করছিল, মুসলমানদের শক্তি অপ্রতিরোধ্য ছিল এবং খৃস্টজগৎ বিশ্ব থেকে মুসলামনদের নিশ্চি‎হ্ন করার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছিল, যে ব্যাপারে তারা এক ধরণের সফলতাও পায়, সেসময়েরর ঘটনা এটি। স্পেন থেকে মুসলমানদের উৎখাত করার জন্য খৃস্টজগৎ অনেকবারই চেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু তারা সফল হতে পারেনি। তাই তারা মুসলমানদের এ অপ্রতিরোধ্য শক্তি রহস্য জানার জন্য গোয়েন্দা নিয়োগ করল। গোয়েন্দা বাহিনীর রিপোর্ট দিল যে, মুসলমানদের আত্মির শক্তির মূল রহস্য হচ্ছে তাকওয়া। তারা একমাত্র আল্লাহকে ভয় করে বলেই অন্য কাউকে ভয় পায় না।
যখন তাদের নিকট মুসলমানদের শক্তির রহস্য উদ্ঘাটন হয়ে গেল, তখন তারা এর মূলে আঘাত হানার জন্য মদ এবং নেশাজাতীয় সামগ্রী স্পেনে রফতানি আরম্ভ করল। তাদের এ কৌশল কার্যকর প্রমাণ হলো। ধীরে ধীরে মুসলমানদের ঈমান দুর্বল হতে লাগল। এক সময় পাশ্চাত্যের ক্যাথলিক খৃস্টানরা স্পেনের সকল যুবকদের কাবু করে ফেলল। প্রায় আটশ বছর যাবৎ মুসলমানদের যে রাজত্ব চলে আসছিল তার সর্ব শেষ ঘাঁটি গ্রানাটার পতন ঘটে পহেলা এপ্রিল। আর এজন্য একে এপ্রিলের বোকা বা ধোঁকা বলা হয়। (APRIL FOOL)
তখন থেকেই তারা এর দিবসটি পালন করে আসছে। মুসলমানদের বোকা বানানোর সে দিনটিকেই তারা এভাবে উদযাপন করে এপ্রিল ফুল নামে।
তারা এ বোকামী ও ধোঁকাবাজি শুধু গ্রানাডার বাহিনীর জন্য মনে করছে না বরং এ ধোঁকা তারা সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য মনে করছে এবং সবার ওপরই একে চাপিয়ে দিচ্ছে। আমরা যদি এ সব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি বা অন্ধদের ন্যায় এর অনুকরণ করি তবে এটা আমাদের জ্ঞানের দৈন্যতা ভিন্ন বলার কিছু নেই। আমরা যদি এর মূল ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হই তবে আমাদের পরাজয়ের দিনে আমাদের উৎসব পালন করা কখনই সম্ভব হত না। বরং স্পেন থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের কর্তব হচ্ছে এসব অনুষ্ঠান প্রত্যাক্ষান করা এবং সত্যিকারার্থের ইসলামকে আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করা। আর কোনভাবেই আমাদের ঈমানে দুর্বলতা আসে এমনসব জীবন গ্রহণ না করা।
এদিন মানুষ বিভিন্ন ধরণের মিথ্যা বলে থাকে। যেমন : কারো সন্তান, স্ত্রী বা ঘনিষ্ট কারও মৃত্যুর সংবাদ দেয়, ফলে সংবাদ গ্রহীতা এর দুঃখ সইতে না পেরে অনেক সময় মৃত্যু বরণ করে। আবার কারো চাকুরী চলে যাওয়া, কারো স্ত্রীর ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ দেয়া, কারো আগুনে পুড়ে যাওয়া বা অসুখ ইত্যাদির ব্যাপারে মিথ্যা সংবাদ পরিবেশন করে। কারণে হত্যা, তালাক ও অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে থাকেÑ যা কখনোই কাম্য নয়।
তাই আমাদের ইসলাম ধর্ম এ ধরনের মিথ্যা, ধোঁকাবাজি ও প্রতারণাকে হারাম ঘোষণা করেছে।

গন্তব্য হোক, অনন্ত-জান্নাত

১ম পর্ব
যেহেতু আমার লেখার শিরোনামে রয়েছে গন্তব্য হোক অনন্ত জান্নাত। তাই শিরোনামের সাথে সংগতি রেখেই শুরু করতে চাই ঐ গন্তব্য স্থল অনন্ত-জান্নাতের মালিক শেষ বিচার ও দিবসের মালিক, মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের, বিশ্ব মানবতার কল্যাণে তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মদ  এর উপর নাযিলকৃত মহা পবিত্র আল কুরআনের বাণী দিয়ে। যা তাঁর বান্দার কল্যাণে প্রেরণ করেছেন এবং শিখিয়েছেন বান্দা কিভাবে তার প্রভুর নিকট, মালিক ও স্রষ্টার নিকট প্রার্থনা করবে।
মহান আল্লাহর বাণী : আমাদেরকে সরল পথ দেখাও, সে সমস্ত লোকের পথ যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছো। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং তাদের পথেও নয় যারা পথ ভ্রষ্ট হয়েছে। (সূরা ফাতেহা ৬-৭)
নিশ্চয়ই আমরা দয়াময় আল্লাহর নিকট সহজ সরল পথের সন্ধান চাই। তাদের পথের সন্ধান চাই যাদেরকে মহান আল্লাহ তাঁর পথের যাত্রী হিসেবে কবুল করেছেন। তাদের পথ চাই, যাদেরকে মুমিন হিসেবে কবুল করেছেন। তাদের পথ চাই যাদেরকে তাঁর প্রিয় বান্দা বলে গ্রহণ করেছেন। তাদের পথ চাই যারা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতে সফল হয়েছে। আর নিশ্চয়ই তাদের পথ চাই না, যারা আল্লাহর গহজবে পতিত হয়েছে এবং অভিশপ্ত, ঘৃণিত ও বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। কঠিন আযাব ও দুঃসহ যন্ত্রণায় নিমজ্জিত হয়েছে। তাদের পথও চাই না, যারা দ্বীন ইসলাম অস্বীকার করে কাফের হয়েছে। আবার তাদের পথও চাই না যারা মুসলিম হয়েও গাফেল ও মুনাফিক হয়েছে। তাদের পথও নয় যারা নফসের খেয়াল খুশী মতে চলেছে এবং যাদের দুনিয়া আখেরাত উভয় জগত বরবাদ ও ধ্বংস হয়েছে। মহান আল্লাহর বাণীতে দুটি পথের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। পথ দুটি হলো: অনন্ত অসীম প্রশান্তিময় জান্নাতের পথ এবং অপরটি হলো: কঠিন আযাব ও যন্ত্রণাময় জাহান্নাম যা ইন্ধন হবে মানুষ আর পাথর। ধারাবাহিকভাবে যখন জান্নাত, জাহান্নাম প্রসঙ্গ আসবে তখন ইনশা আল্লাহ সাধ্যানুযায়ী বর্ণনা সহকারে আলোচনা করার চেষ্টা করব।
প্রিয় পাঠক বন্ধুগণ, আমাদের কি ভেবে দেখা উচিৎ নয়, কেন মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে সৃষ্টি করলেন? আর সৃষ্টির সেরা মানব বানিয়ে ও দুনিয়ায় প্রেরণ করলেন। আমাদের জন্য এত অসীম নিয়ামত দিলেন। সৃষ্টি করলেন বিশাল আসমান ও জমি। গ্রহ, তারা নক্ষত্র রাজী, বৃক্ষ তরুলতা। আমাদের চোখের সামনে যা কিছু আছে সবইতো মহান আল্লাহর দেয়া নেয়ামত। তা তো কোনক্রমে অস্বীকার করার মত নয়। আমাদেরকে সৃষ্টির বিপরীতে কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে মহান রাব্বুল আলামীনের, অবশ্যই আমাদেরকে ভেবে দেখা উচিত, জানা প্রয়োজন এ জন্য যে উদ্দেশ্য বিহীন যেমনি জীবন চলতে পারে না। উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য সম্বন্ধে সম্যক ধারনা ছাড়া জীবনে সফলতা বয়ে আনতে পারে না। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্বন্ধে জানা থাকলে সফলতা ও লক্ষ্যার্জনের সহজ হয়। আমরা যখন পথ চলি, তখন গন্তব্যের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য জানা থাকলে পথ চলতে সহজ হয়। গন্তব্যে পৌঁছার আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। কোন কাজ করার পূর্বে যদি জানা থাকে এ কাজটি কেন করছি? এর উদ্দেশ্য কি বা ইহা থেকে কোন লাভবান হওয়া যাবে কিনা? কতটুকু লাভবান হওয়ার যাবে? এ কাজে কেমন সময় ব্যয় হতে পারে? এমন আগাম ধারণা, অবশ্যই কাজে গতির সঞ্চার জাগাবে। কাজটি দ্রুত ও অল্প সময়ে সহজে সফল হতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এমনি বাস্তবতার আলোকে যদি আমরা জানতে পারি যে, মহান সৃষ্টি কর্তা আল্লাহ কেন আমাদেরকে সৃষ্টি করলেন? বা কি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করলেন? তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের করণীয় ও বর্জীয় সম্বন্ধে জানার বুঝার জ্ঞান অর্জন করার আগ্রহ জাগবে। মহান সৃষ্টিকর্তা প্রভূর প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রেম ভালবাসা জন্মাবে। আনুগত্যের শির অবনত করতে দ্বিধা থাকবে না। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর গুণাগুণ সম্বন্ধে জানার আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। মহান আল্লাহর গুণাগুণ সম্বন্ধে জানতে পারলে তাঁর সৃষ্টি সম্বন্ধে জানার এবং বুঝার অনুভূতি জাগবে।
যার ফলে মহান আল্লাহর মনোনীত দ্বীন, ধর্ম ও ইসলাম সম্বন্ধে জানার, বুঝার শিক্ষার্জন ও জ্ঞানার্জন করার অনুপ্রেরণার দ্বার উম্মুক্ত হবে। আর দ্বীন, ধর্ম ইসলাম সম্বন্ধে জানা থাকলে জ্ঞান-অর্জন শিক্ষার্জন করতে পারলে ঈমান হবে মজবুত, বিশ্বাস হবে দৃঢ় তাই আসুন আমরা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নিকট থেকে জেনে নেই। কেন কি উদ্দেশ্যে তিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করলেন।
মহান সৃষ্টিকর্তা প্রভূ বলেন, আমি মানব ও জ্বীন জাতিক শুধুমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছি। (সুরা যারিয়াত-৫৬)
উপরোক্ত পবিত্র কুরআনে আয়াতের যদি আমরা অনুধাবন করি। হৃদয়াঙ্গম করি, তাহলে নিশ্চয়ই আমরা বুঝতে সক্ষম হবো যে, মহান সৃষ্টিকর্তা প্রভূ আমাদেরকে কেন সৃষ্টি করলেন। কি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করলেন। অর্থাৎ তাঁহার ইবাদত করার জন্য। এখন আমাদের জানা প্রয়োজন ইবাদত কি? ইবাদত কাকে বলে?
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,
“তোমরা কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য করতে চাও? অথচ আকাশ ও পৃথিবীর প্রত্যেকটি জিনিস ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক তাঁরই আনুগত্য করে যাচ্ছে। আর সকলেই তাঁর কাছে ফিরে যাবে।” (সুরা আল-ইমরান-৮৩)
ইবাদত: ইবাদত শব্দের মূল অর্থ হলো দাসত্ব করা। আর দিন-রাত সর্বক্ষণ একমাত্র আল্লাহর তা’আলার হুকুম পালন করে চলাকেই ইবাদত বলে। যে কাজ করতে তিনি নিষেধ করেছেন, তা হতে ফিরে থাকা এবং তিনি যা করতে আদেশ করেছেন তা পূর্ণরূপে পালন করাই হচ্ছে ইবাদত। যখন জানা প্রয়োজন আল্লাহ তা’আলা আমাদের জন্য কি হুকুম করলেন। আর কি নিষেধ করলেন। কি করতে বললেন আর কি পরিহার করতে বললেন। মোট কথা আমাদের জীবন বিধান কি হবে কোন পথে জীবন পরিচালনা করলে, দুনিয়া আখেরাত উভয় জগত সফল হবে। কোন পথে জীবন পরিচালনা করলে মহান আল্লাহ রাজি খুশী হবেন। এমন কি কোন পথ চলতে পারলে আমাদের গন্তব্য ও অনন্ত অসীম জানাতে সহজে পৌঁছতে পারব। এ জন্য সর্ব প্রথম যা জানা প্রয়োজন। তাহলো একজন মুসলমান হওয়ার জন্য জ্ঞান অর্জন করা এবং জ্ঞানের আবশ্যকতা। প্রত্যেক মুসলমানই একথা বিশ্বাস করে এবং ভাল করে জানে যে, দুনিয়ায় ইসলাম আল্লাহ তা’আলার একটি সবচেয়ে বড় নিয়ামত। আল্লাহ তা’আলা তাকে মুহাম্মদ  -এর উম্মত করে সৃষ্টি করেছেন এবং ইসলামের ন্যায় এত বড় একটা নিয়ামত তাকে দান করেছেন বলে প্রত্যেক মুসলমান আল্লাহর শুকর আদায় করে থাকে। এমন কি, স্বয়ং আল্লাহ তা’আলাও ইসলামকে মানুষের প্রতি সবচেয়ে বড় ও উৎকৃষ্ট নিয়ামত বলে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ “আজ আমি তোমাদের আনুগত্যের বিধান (জীবন বিধান) পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পুর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জীবন বিধান হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা: আল-মায়েদা-৩)
মহান আল্লাহ তা’আলার বান্দার জন্য দেয়া নিয়ামত অবশ্যই আমাদের এবং সকল মুসলমানের গ্রহণ করা উচিত। যারা এ নিয়ামত গ্রহণ করে পূর্ণরূপে মহান সৃষ্টিকর্তা প্রভূর আনগত্য করবে, তারাই দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতে সফল হতে পারবে। তাই আমাদের সকলকে আল্লাহ তা’আলার মনোনীত ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করতে হবে। তাঁর দেয়া বিধি-বিধান এবং ইসলামের জ্ঞান আহরণ করে, ধর্ম ও ইসলামক ভাল করে সুন্দর ও সুচারুরূপে বুঝতে হবেএ বং জানতে হবে। আর এ জন্য আবশ্যক কুরআন পড়া। শুধুমাত্র কুরআন পড়লেই চলবে না, কুরআন জেনে-বুঝে পড়তে হবে। হাদীস চর্চা করতে হবে, সে অনুযায়ী জীবন পরিচালিত করতে হবে। আমদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্তে কুরআন ও সুন্নাহ এর বাস্তব রূপ দিয়ে এর মাধ্যমে ইসলামের আদর্শ বাস্তবায়ন করতে হবে। কেবল মাত্র তা হলেই মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব এবং আমাদের কাংখিত গন্তব্য জান্নাতে প্রবেশ করা যেতে পারে।
এখন আমাদের জানা প্রয়োজন, মুসলমান কাকে বলে: মুসলমান হওয়ার অর্থ কি এবং মুসলমান আর অমুসলমানের মধ্যে পার্থক্য কেমন করে করা যায়, এসব বিষয় জানা না থাকলে, তবে সে তো অমুসলমানের মত কাজ কর্ম শুরু করবে এবং তার মুসলমানীর কোন সম্মানই সে রক্ষা করতে পারবে না। অতএব প্রত্যেক মুসলমানকে এবং মুসলমানের প্রত্যেকটি সন্তানকেই ভাল করে জেনে নিতে হবে যে, সে যে নিজেকে নিজে মুসলমান মনে করে এ মুসলমান হওয়ার অর্থ কি? মুসলমান হওয়ার সাথে সাথে মানুষের মধ্যে কি পরিবর্তন ও পার্থক্য হয়ে যায় ও তার উপর কি কর্তব্য ও দায়িত্ব এসে পড়ে? ইসলামের কোন সীমার মধ্যে থাকলে মানুষ মুসলমান থাকতে পারে এবং কোন সীমা অতিক্রম করলেই সে মুসলমানী হতে খারিজ হয়ে যায়? এসব বিষয় না জানলে মুখ দিয়ে সে মুসলমানীর যতই দাবী করুক না কেন, তার মুসলমান থাকা সম্ভব নয়?
ইসলাম :
ইসলাম অর্থ আল্লাহর আনুগত্য করা ও হুকুম পালন করে দেয়ার নাম হচ্ছে ইসলাম। আল্লাহর সম্মুখে নিজ নিজ কামনা বাসনা ও স্বাধীনতাকে স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করার নাম ইসলাম। আল্লাহর বাদশাহী এবং আনুগত্যকে মাথানত করে স্বীকার করে নেয়ার নাম ইসলাম। যে ব্যক্তি নিজের সমস্ত কাজ-কারবার ব্যবসা-বাণিজ্য আল্লাহর হাতে সঁপে দেয় সেই ব্যক্তি মুসলমান। আর যে ব্যক্তি নিজের সব ব্যাপারে নিজের ইচ্ছামত সম্পন্ন করে কিংবা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোও হাতে তা সেপার্দ করে সে মুসলমান নয়। আল্লাহর হাতে সঁপে দেয়ার তাৎপর্য এই যে, তিনি তার কিতাব এবং তাঁর নবীর মারফত যে হেদায়াত ও সৎ পথের বিধান পাঠিয়েছেন, মানুষ তা পূর্ণরূপে পালন করবে এবং তাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি করতে পারবে না। জীবনের প্রত্যেকটি ব্যাপারে এবং কাজে শুধুমাত্র পবিত্র কুরআন ও হাদীসের নিয়ম নীতি অনুসরণ করে চলবে। যে ব্যক্তি দুনিয়ার নিয়ম-নীতি প্রথা আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছু পশ্চাতে ফেলে রেখে প্রত্যেক ব্যাপারেই কেবল আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের হাদীসের কাছে পথের সন্ধান চায় এবং জানতে চায় আমার কি করা উচিৎ আর কি করা উচিৎ নয়, আর সেখান হতে যে নিয়মই পাওয়া যায় তা বিনা আপত্তিতে মেনে নেয় তার বিপরীতে যা তা সবই অস্বীকার করে শুধু সেই ব্যক্তি মুসলমান। কারণ সে তো নিজেকে আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়েছেন। আর এভাবে আল্লাহর হাতে নিজেকে সঁপে দিলেই মানুষ মুসলমান হতে পারে। এর বিপরীত যে ব্যক্তি কুরআন ও হাদীসের উপর নির্ভর করে না বরং নিজের মন যা বলেই তাই করে কিংবা বাপ দাদা হতে চলে আসা নিয়ম-কানুনের অনুসরণ করে চলে, কিংবা দুনিয়ায় যা কিছু হচ্ছে সেও তাই করে নিজের কোন ব্যাপারেই কুরআন ও হাদীসের কাছে জিজ্ঞেস করে না যে, তার কি করা উচিত, পবিত্র কুরআন ও হাদীসের বিধান জেনে সে বলে ওঠে যে, আমার বুদ্ধি তা গ্রহণ করতে চায় না, তাই আমি তা মানি না, অথবা বাপ দাদার কাল হতে তার উল্টা নিয়ম চলে আসছে। কাজেই তার অনুসরণ করতে পারব না। বা দুনিয়ার নিয়ম তার বিপরীত, তাই আমি সে নিয়ম অনুসারেই চলবো তবে সেই ব্যক্তি কিছুতেই মুসলমান নয়। যদি সে নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দেয়। তবে সে মিথ্যাবাদী এতে কোন সন্দেহ নেই।
আমরা যখন কালেমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ পড়ি এবং মুসলমান হওয়ার কথা স্বীকার করি তখন আমরা এই বাক্যের মধ্যে দিয়ে একথাও স্বীকার করে থাকি যে, আল্লাহর আইন আমাদের জন্য একমাত্র আইন: আল্লাহ তা’আলাই আমাদের প্রভু ও আদেশকর্তা। তখন আমাদের শুধু আল্লাহরই আনুগত্য করতে হবে। আমাদের কাছে শুধু সেই বিধানই সত্য বিধানরূপে স্বীকৃতি পাবে যা আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসূলগণের মাধ্যমে পাওয়া যায়। এর অর্থ এই যে, আমরা মুসলমান হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহর সামনে নিজের ইচ্ছা ও স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিয়েছি। অতপর আমাদের নিজের স্বাধীনতা বা ইচ্ছাশক্তি বলতে কিছু আর থাকে না। থাকতে পারে না। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রথা বা পারিবারিক নিয়ম-নীতির ও কোন গুরুত্ব থাকতে পারে না অথবা অমুক হযরত বা পীর বুজুর্গ, ওস্তাদ মাশায়েখ কি বলেছেন, আল্লাহর কালাম এবং তাঁর রাসূলের সুন্নাতের মোকাবিলায় এ ধরনের কোন কথাই আমরা তখন উপস্থাপন করতে পারি না। আমাদের প্রত্যেকটি বিষয়ই পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে উপস্থাপন করাই এখন আমাদের একমাত্র কাজ। যা তাহার অনুরূপ হবে না তা দূরে নিক্ষেপ করতে হবে। নিজেকে মুসলমান বলা এবং তারপর পবিত্র কুরআন ও হাদীসকে বাদ দিয়ে নিজের মত দুনিয়ার প্রথা কিংবা মানুষের তৈরী করা কোন মতবাদ ও কাজের অনুসরণ করা সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী। কোন অন্ধ ব্যক্তি যেমন নিজেকে চোখ ওয়ালা বলতে পারে না, কোন নাকহীন ব্যক্তি যেমন নিজেকে নাক ওয়ালা বলতে পারে না, ঠিক তেমনি যে ব্যক্তি নিজের সমস্ত কাজকর্ম কুরআন হাদীস অনুসারে সমাধা করে না বরং তা পরিত্যাগ করে নিজের বুদ্ধি বা দুনিয়ার প্রথা অথবা মানুষের তৈরী মতবাদ এবং কোন ব্যক্তি বিশেষের কথা বা কাজের অনুসরণ অনুকরণ করে চলে সে কিছুতেই নিজেকে মুসলমান বলতে পারে না।

এপ্রিল ফুল ডে : গল্পের আড়ালে বেদনার পাহাড়

প্রথম বোকা ছিলো কারা? ফ্রান্স, বৃটেন, মেক্সিকো, সুইডেন নাকি ভারতীয়রা? এ প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসের অনেক ঘটনার মতো রহস্যাবৃতই রয়ে গেছে। কারো কারো মতে, ১৫৬৪ সালে ফ্রান্সে পরিবর্তিত নতুন ক্যালেন্ডারকে সামনে রেখে এপ্রিল ফুল ডে’র সুচনা হয়। নবম চার্লসের অধীনে প্রবর্তিত ক্যালেন্ডারে ১লা এপ্রিলের পরিবর্তে ১লা জানুয়ারীকে নতুন বছরের প্রথম দিন হিসেবে গণনার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে কিছু লোক তার বিরোধিতা করে। যারা ১লা এপ্রিলকেই নববর্ষের ১ম দিন ধরে দিন গণনা করে আসছিল, তাদেরকে প্রতি বছর ১লা এপ্রিলে বোকা উপাধি দেয়া হতো। ফ্রান্স ছাড়া মেক্সিকো ,স্কটল্যান্ড, বৃটেন, সুইডেন প্রভৃতি দেশে ভিন্ন ভিন্ন কারণে এপ্রিল ফুল ডে পালন করা হতো।
ইতিহাসের বিভিন্ন বইয়ে ১লা এপ্রিল বা এপ্রিল ফুলস ডে-র ঘটনাসমূহে রস, কৌতুক আর আমোদপ্রমোদের পাশাপাশি রয়েছে বেদনার এক কালো পাহাড়। জানা যায়, অষ্টম শতাব্দীর প্রথম দিকে বিখ্যাত মুসলিম সেনাপতি তারিখ বিন রিয়াদের নেতৃত্বে মুসলমানরা স্পেন দখল করে। এরপর ৭শ বছর চলে মুসলমান রাজত্ব। এ সময় ইউরোপের এ ভূখন্ডে গড়ে উঠেছিল এক অনন্য মুসলিম সভ্যতা। কালক্রমে এ সভ্যতায় ভাটা পড়ে। ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে মুসলমানদের শাসন ক্ষমতায় অবয় দেখা দেয়। আর এ অবয়ের সুযোগটি নেন স্পেনের রাজা ফার্ডিনান্ড।
সে দিন ছিল পয়লা এপ্রিল, ১৪৯২ সাল। ১৪৯২ সালের প্রথম দিকে পাশ্ববর্তী রাজ্যের রাজা ফার্ডিনান্ড ও রানী ইসাবেলার সেনাবাহিনী সম্মিলিতভাবে স্পেন আক্রমণ করেন। তাদের আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য মুসলমানরা নগরের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়। সুচতুর রাজা ফার্ডিনান্ড খবর পাঠায় যে, মুসলমানরা যদি মসজিদে আশ্রয় নেয় এবং নগরীর সদর দরজা খুলে দেয় তাহলে তাদের ওপর হামলা করা হবে না।
রাজার এ ঘোষণা শুনে মুসলমানরা সরল বিশ্বাসে শহরের দরজা খুলে দিয়ে মসজিদে আশ্রয় নেয়। কিন্তু রাজা তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে সবগুলো মসজিদে একযোগে আগুন লাগিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়। সেদিন ফার্ডিনান্ডের চক্রান্তে কয়েক লক্ষ মুসলমান মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান।
লেলিহান শিখার মাঝে অসহায় মুসলমানদের আত্মচিৎকারে যখন আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠেছিল তখন ফার্ডিনান্ড উল্লসিত হয়ে বলেছিলেন, ” হে মুসলমান, তোমরা হলে এপ্রিলের বোকা”। সেই থেকে মুসলমানদের বোকা বানানোর এই দিনটিকে স্মরণীয় করতে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় নিয়মিত এপ্রিল ফুল পালন করে আসছে।
মুসলমানদের বোকা বানানোর এ দিনটিকে স্মরণীয় করতে আসল ঘটনা বেমালুম চাপা দিয়ে ১৫০০ সালের ১লা এপ্রিল থেকে সমগ্র খ্রিষ্টান জগতে এ দিনটিকে হাসি, ঠাট্টা এবং মিথ্যা প্রেম দেয়া-নেয়ার দিন হিসাবে আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করে আসছে। আজ অবধি ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ সমগ্র বিশ্বে বোকা বানানোর এই দিবস পালিত হয়ে আসছে। এ দিবস উপলক্ষ্যে বিভিন্ন রকমের ‘এপ্রিল ফুলস ডে’ সম্বন্ধীয় বিশেষ কার্ড ও নিমন্ত্রণপত্র বের হয় পশ্চিমা দেশগুলোতে। খরচ করা হয় হাজার হাজার ডলার। পশ্চিমা দেশের মতো আমাদের দেশেও এপ্রিল ফুলের প্রচলন আছে। শহর কিংবা গ্রামে সব জায়গাতেই এ দিনে প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যে, আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে অনেক ঠাট্টা-মসকরা এবং হৃদয়গ্রাহী রসিকতা চলে।
আমাদের দেশে শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সব স্তরের লোকেরা এ দিনটি কমবেশি পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু যারা এ দিনটি ধুমধামের সাথে পালন করছেন তাদের অনেকেই জানেন না এপ্রিল ফুলের আড়ালের সেই মর্মভেদী ইতিহাস, যা মুসলমানদের জন্য রীতিমতো শোকের দিন।
তাই এ ইতিহাস জানার পর কারোই উচিত হবে না, এদিনে আনন্দ ফূর্তি করা কিংবা কাউকে বোকা বানানো। পাশাপাশি আমাদেরকে আরো সচেতন হতে হবে। কারণ রাসূল (সাঃ) বলেছেন, প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি যে কাউকে প্রতারিত করে না কিংবা নিজেও প্রতারিত হয় না।