নামের মাঝেই লুকিয়ে আছে আমার পরিচয়

( শেষ পর্ব:)
এইভাবে ঠিকানা লেখায় আমার সহকর্মী বোনেরা আপত্তি জানালেন। বললেন “আপনার হাসব্যান্টের ঠিকানাই তো স্থায়ী ঠিকানা। বললাম “ বুঝি কি করে?” “তার মানে?” অবাক কণ্ঠ বোনদের। বললাম “ অপ্রিয় হলেও এটাই বাস্তব যে হাসব্যান্টের ঠিকানা স্থায়ী ঠিকানা না।
যে কোনো সময় সে ঠিকানা বদলে যেতে পারে। আমাদের মা দাদীরা একই ঠিকানায় জীবন পার করে দিয়ে গেছেন। আমাদের জীবনের ও অর্ধেকের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। বাকী দিন কয়টি ও হয়ত যাবে। কিন্তু সবার জন্য না। অথচ বাপের নাম কোনোদিন বদল হবে না। বাপ বেঁচে থাকতেও না মরে গেলেও না” আমার কথা কারো মনঃপুত হলো কেউ মুখ টিপে হাসল। আশ্চর্যের বিষয় কি জানেন? মাত্র মাস ছয়েকের মধ্যে আমাদের এক বোন বরের সাথে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলো। তিনটি সন্তান, মজবুত সংসার। যে কারণেই হোক ভেঙ্গে গেল। আমার সেই বোনটি এখন স্থায়ী ঠিকানায় থাকে। হ্যা বাপের বাড়িতে। যদিও বাপ জীবিত নেই।
ইবনে অথবা বিনতেঃ- নামের পরে ইবনে অথবা বিনতে দিয়ে পিতার নাম দেওয়া খুবই বিজ্ঞান সম্মত এবং সুষ্ঠু একটা বিধান। যেমন- আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারাক, অর্থাৎ মুবারাকের পূত্র আবদুল্লাহ, সন্তান যদি মেয়ে হয় তাহলে ফাতিমা বিনতে মুবারক-মানে মুবারকের মেয়ে ফাতিমা। এইভাবে নাম রাখা হলে এক নামের যত ব্যক্তিই হোক না কেন চিনতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না। এতে আর একটা সুবিধা এই যে নাম শুনেই পরস্পর ভাই বোন কিংবা ভাই ভাই অথবা বোন বোন ইত্যাদি বোঝা যায়। যেমন উম্মে হারাম বিনতে মিলহান এবং উম্মে সুলাইম বিনতে মিলহান এরা যে দুই বোন তা কারো বলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। যদিও নামের এই ধারাটা ব্যাপকভাবে আমাদের সমাজে চালু নেই। তবে কিছু কিছু আছে।
যে সব নাম রাখা নিষেধঃ- শাহানশাহ, রাজাধিরাজ, শাহ জাহান এই সব নাম রাখতে রাসূল (সঃ) নিষেধ করেছেন কারণ এইনাম গুলো আল্লাহর জন্যই প্রযোজ্য। তেমনি আল্লাহর নাম বাদে অন্য কারো সাথে আব্দুহ যোগ করে নাম রাখাও অন্ত্যন্ত আপত্তিকর। যেমন- গোলাম নবী, গোলাম মুহাম্মাদ, গোলাম হোসেন, গোলাম রাসূল, আব্দুনবী, আব্দুনূর ইত্যাদি। মানুষ গোলাম বা আব্দু (দাস) হবে তো একমাত্র আল্লাহর। কারো নাম দিদার বখশ, পীর বখশ। বখশ শব্দের অর্থ দান বা উপহার। উপর্যুক্ত নাম গুলো শীর্ক যুক্ত। এধরনের কোনো নাম যেন আমরা সন্তানদের না রাখি। এ ধরনের নাম যাদের আছে তাদের সঠিক কাজ হবে এই সব নাম বদলে অন্য কোনো ভালো নাম রাখা।
আমাদের সমাজে ডাকনাম হিসাবে ছোট ছোট কিছু নাম আছে যার অর্থ মোটেও ভালো না- যেমন রিয়া ইত্যাদি। ডাকতে এবং শুনতে শব্দটি ভালো লাগলেও অর্থ মোটেও ভালো না। রিয়া অর্থ লোক দেখানো কাজ বা প্রদর্শোনিচ্ছ।
আবার এমন কিছু নাম আছে যা কোনো অর্থ বোধক শব্দই না। যেমন- নান্নু,টুন্নু, মন্নু, রুনু, মিনু, রানু, মিন্টু,সেন্টু, পিন্টু, পল্টু, বল্টু, টুলটুল, টুটুল, মিঠুন, কালা, ধলা, রাঙ্গু, – জানিনা প্রিয়তম সন্তানের জন্য এইসব নিরর্থক নাম কেন রাখে মা বাবারা?
আগে গ্রামের মেয়েদের নাম রাখা হতো বড়–, মাঝু, সাজু , ছুটু, সোনা, ইত্যাদি। ছেলেদের নাম কেদু, গেদু ইত্যাদি। ইদানিং মেয়েদের নাম রাখছে- সাবানা, ববিতা, কবরি, শাবনূর, পূর্ণিমা ইত্যাদি নায়িকা ও মডেল কন্যাদের নাম। ছেলেদের নামের বেলায় ও বিভিন্ন চিত্রতারকা, খেলোয়ার, মডেল তারকাদের নাম পছন্দ করছে।
প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত স্যাটালাইট টি.ভির বদৌলতে গ্রামের লোক আর যাই শিখুক না কেন নায়ক নায়িকাদের, খেলোয়ার মডেল তারকাদের নাম শিখছে। টি.ভিতে বিভিন্ন চ্যানেলে প্রায় সর্বক্ষণ নাটক সিনেমা, মডেলিং, নাচ গান আর নায়ক নায়িকা, গায়ক গায়িকাদের জীবনি চর্চাই করা হয়। আর সবাই বিশেষ করে মহিলারা নিবিষ্ট মনে চিত্ত বিনোদনের নামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঐ সবই দেখে। আর ভালোবেসে, শখ করে মহব্বত করে ঐসব নাম রাখে সন্তানদের।
ঘর সংসার আর স্যাটালাইট টি.ভি দেখার পর এই সব গৃহিনীরা আর কোনো সময় ই পায়না যে কুরআন হাদীস কিংবা সাহাবা তাবেঈনদের জীবনী পড়বে কিংবা জানবে। ইসলামী টি.ভি নামে একটা চ্যানেল থাকলেও তা খুব কম মহিলাই দেখে। গ্রামের মহিলারা বোধ হয় জানেও না যে ইসলামিক টি.ভি নামে কোনো চ্যালেন আছে। কি করে ইসলামী নামের সন্ধান তারা পাবে?
এইসব মহিলা কিংবা এদের ঘরের কিশোর কিশোরীদের একটা পরীক্ষা করে দেখেন- তাদের কাছে-দশজন নায়িকা-দশজন গায়িকার নাম কিংবা দশজন খেলোয়ার বা মডেল তারকাদের নাম জানতে চান দেখেন তারা ঝটপট দেশী বিদেশী বিশজন করে নায়ক নায়িকা, গায়ক গায়িকা, খেলোয়ার, মডেল তারকার নাম বলে দেবে।
কিন্তু দশজন নবীর নাম বলতে বলেন, দশজন সাহাবী এবং মহিলা সাহাবীর নাম বলতে বলেন কিংবা দশজন তাবেঈন অথবা ইসলামী চিন্তাবিদের নাম বলতে বলেন দেখবেন পারবে না।
অশিক্ষিত মেয়েরা বোধ হয় একদম পারবে না কিন্তু নায়ক নায়িকাদের নাম বলতে পারবে। শিক্ষিত মেয়েরা নবী রাসূলদের চার/পাঁচ জনের নাম হয়ত বলতে পারবে। সাহাবীদের হয়ত চার খলিফা পর্যন্ত, মহিলা সাহাবীদের নাম কমই আশা করা যায়। সাহাবী যে মহিলা হয় এই ধারনাই অনেকের নাই। আর তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন? জিজ্ঞেস করে দেখেন অবাক হয়ে বলবে ‘সে আবার কি জিনিস?’ আর ইসলামী চিন্তাবিদ বললেও- কিছু বলতে পারবে বলে মনে হয় না।
অবশ্য ইদানিং বিভিন্ন বৈঠকাদিতে যারা যায় তাদের ধ্যান ধারনা চিন্তা চেতনা বেশ পরিবর্তন হয়েছে। নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্যের ব্যাপারে বেশ সচেতন হয়েছেন। জাতির জন্য এটা ভালো লক্ষণ। আমাদের পূর্বসুরীদের নাম জানা একান্ত জরুরী।
আমরা হযরত খাদিজা, ফাতিমা, আয়েশা, উম্মে সুলাইম, উম্মে আম্মারা, খাওলা দের উত্তরসুরী যারা ছিলেন-ঈমানে দৃঢ়, ইবাদাতে অবনত, বিপদ মুসিবতে ধৈর্যশীল। যাবতীয় ভালো কাজে অগ্রগামী। তাদের ছিল খারাপ কাজের প্রতি চরম ঘৃনা, আল্লাহর নাফরমানীর পর্যায় পড়তে পারে এমন কোন কাজ জীবন গেলেও তারা করতে রাজী হতেন না। আল্লাহ এবং তার রাসূলের নির্দেশ পালনে তারা ছিলেন তৎপর। তারা একদিকে ছিলেন বীর সাহসী অন্য দিকে ছিলেন বিদূসী, তাপসী, গুণবতী, প্রেমময়ী। আমরা তাদের উত্তরসূরী।
আমরা শীলাদেবী কিংবা প্রীতিলতাদের উত্তরসুরী না বিপদে পড়লে যারা আত্মহত্যা করে। “নামের বড়াই করো না, নাম দিয়ে কি হয়?” আসলে কথাটি ঠিক না, নামে অনেক কিছু হয়। আমি যে মুসলমান, তার প্রথম চিহ্নই হলো নাম। মার্গারেট মারকিউস নাম শুনলেই বুঝবো ভদ্র মহিলা পাশ্চাত্যবাসী কোনো ইহুদি কিংবা খৃষ্টান। কিন্তু যখন শুনবো ভদ্র মহিলার নাম মরিয়ম জামিলা। তখন তাকে মুসলমান ছাড়া অন্য কিছু ভাববো কি?
যখন সুদর্শন ভট্রাচার্য, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, ক্যাট ষ্টিফেন্ট নাম শুনি তখন কি তাদের মুসলিম মনে হয়? আর যখন এই মানুষদের নাম হয় আবুল হোসেন ভট্টাচার্য, ইসমাইল হোসেন দিনাজী, ইউসুফ ইসলাম, তখন আর কারো বুঝতে সমস্যা হয় কি এরা মুসলমান না অন্য কিছু? আসলে নামটাই প্রথম। তাই আমাদের ছেলে মেয়েদের এমন নাম রাখতে হবে যা শুনেই অপরিচিত কেউ বুঝতে পারে যে মুসলমানের সন্তান।
কিছু নামে বোধ হয় এলার্জি আছেঃ- নওগাঁ থেকে যশোর যাচ্ছিলাম ট্রেনে। যশোর বাপের বাড়ি বিধায় প্রায়ই যাই। প্রায় ছয়/সাত ঘণ্টার জার্নি। পাশাপাশি সহযাত্রীদের সাথে মোটামুটি খাতির হয়ে যায়। বিভিন্ন প্রকারের টুকটাক খাবার, পত্র পত্রিকা বই ইত্যাদি কেনা যায়। জার্নিটা একঘেয়ে মনে হয় না। ভালোই লাগে। আমার সামনের সিটে বসা এক ভদ্রলোক। লেখা পড়া শেষ করে নতুন চাকরিতে ঢুকছেন। অফিসের কাজে খুলনা যাচ্ছেন।
আমি জানালার ধারে বসে বই পড়ছিলাম। আমার প্রিয় লেখক অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের আদম সৃষ্টির হাকিকত। ভদ্রলোক আমাকে বললেন “ কি বই?”
আমি মুখে কিছু না বলে বইটি উল্টে দেখালাম। ভদ্র লোক চমকে উঠলেন যেন “ ও রে বাব্বা গোলাম আযমের বই?”
বললাম “ কেন, এলার্জি আছে নাকি?”
ঃ“তার মানে?”
ঃ “যে ভাবে কেঁপে উঠলেন মনে হলো এই নামে বুঝি আপনার এলার্জি আছে।”
ঃ “ আর কি বই আছে আপনার কাছে?”
আমি একটু আগেই ফেরিওয়ালার কাছ থেকে দু’টো বই কিনেছি। একটা সমরেশ মজুমদারের উপন্যাস অন্যটি জীবনানন্দ দাসের কবিতার বই। আমি ঐ বই দুটি ভদ্রলোককে দেখালাম। ভদ্রলোক বললেন “বাঃ সব ধরনের বই ই তো আছে।”
বললাম “ হ্যা সব ধরনের বই ই পড়ি। কোনো নামেই আমার এলার্জি নেই।”
ঃ “ কি যে বলেন, নামে আবার এলার্জি থাকে নাকি? আমি ও সব লেখকের বই পড়ি।”
আমার হাতের বইখানা দেখিয়ে বললাম, “ এই লেখকের বই কোনোদিন পড়েছেন?”
ভদ্র লোক মাথা নেরে বললেন “ না”। বললাম কেন পড়েন নি?
ঃ “ আসলে লেখক মানুষটিতো বিতর্কিত।
তাছাড়া উনি যে কি ধরনের বই লেখেন তাও জানি না। নামটাই জানি এই মাত্র। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিল এই টুকু ছাড়া তার সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না।”
আমি বইখানি ভদ্র লোকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম “ পড়ে দেখেন। জীবনের যতো বই পড়েছেন সব বই এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ বই হবে এটি। যদি সত্যিকারের পাঠক হয়ে থাকেন।”
ভদ্রলোক ইতস্তত করে বললো “ আপনি পড়ছিলেন।”
বললাম “ তাতে কি? এ বইটি আগে আমি আরও দুইবার পড়েছি। এইবার দিয়ে তিনবার হচ্ছিল।”
ভদ্রলোক বইটি নিলেন এবং খুব আগ্রহের সাথেই পড়তে লাগলেন।
দেখতে দেখতে যশোর ষ্টেশনে চলে এলাম। আমি নামার জন্য উঠে দাড়াতেই ভদ্রলোক ব্যস্ত হয়ে বললেন “ আপা আপনি তো এখানেই নামবেন কিন্তু আপনার বইটা যে——-।”
বললাম“ ভাই বইটি আপনাকে গিফট করলাম। ভদ্রলোকের পড়ার আগ্রহ দেখেই বইটি তাকে গিফট করতে ইচ্ছে হলো।
অনেককে দেখেছি কোনো কোনো লেখকের নাম দেখেই তার বই পড়ে না। কি অন্ধকারাচ্ছন্ন মন!
কুরআনী জ্ঞানের সল্পতাঃ- কুরআন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান যে কতো কম, তা কুরআনের শব্দচয়ন করে সন্তানদের নাম রাখার ধরন দেখে বোঝা যায়। আমার ঘনিষ্ট কয়েক জনের নাম বলি, আম্বিয়া, জাহিমা। আম্বিয়া শব্দের অর্থ নবীগণ, জাহিম অর্থ জাহান্নাম।
অন্যদের কথা থাক নিজেকে নিজেই একটু পরীক্ষা করে দেখেন। জ্ঞানের বহর দেখে লজ্জা পেয়ে যাবেন।
আল কুরআনে একশত চৌদ্দটি সূরা আছে। এইবার এই একশত চৌদ্দটি সূরার নাম বলেন তো? হাতে গোনা কয়েক জনে হয়ত পারতেও পারেন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই পারবে না। নামই যেখানে জানা নাই তাহলে সূরার মধ্যে কি বলা হয়েছে তা কি করে জানবে?
আমাদের সবার উচিত আল কুরআনের সূরা কয়টির নাম মুখস্ত করা। সূরা কয়টির নাম জানা খুবই জরুরী।
আমাদের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা, যারা প্রাইমারী কিংবা হাইস্কুলে পড়ে- তাদের পাঠ্য পুস্তকে বাংলা ইংরেজিতে কয়টি গল্প, প্রবন্ধ, আর কবিতা আছে তা জানে, সে সবের নাম জানে, তার লেখক বা কবিদের নাম জানে, সেই লেখক কবিদের পরিচয়ও জানে। আর আমাদের পাঠ্য পুস্তকে একশ চৌদ্দটি সূরা তার নাম জানি না। তাছাড়া ছেলেমেয়েদের সিলেবাস এক বছরের আর আমাদের সিলেবাস সারা জীবনের। দুইদিনে একটা সূরার নাম মুখস্ত করলে এক বছর লাগে না। দশ মাসে সব সূরার নাম মুখস্ত হয়ে যায়।
কোনো কিছুর নামের মাধ্যমে মানুষ তার সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে থাকে। এটিই জ্ঞান লাভের পদ্ধতি। ফেরেশতাদের চেয়ে আদম (আঃ) কে বেশি জ্ঞান দেওয়া হয়েছে এই বিষয়টি ফেরেশতাদের জানানোর জন্য আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা আদম (আঃ) কে সব কিছুর নাম শিখান। তারপর আদম (আঃ) বলেন,“ তুমি ওদেরকে (ফেরেশতাদের কে) এই জিনিস গুলোর নাম বলে দাও।” সূরা বাকারা-৩৩
ইতোপূর্বে তিনি ফেরেশতাদের কাছে জিনিস গুলোর নাম জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফেরেশতারা তা বলতে পারে নি। ফেরেশতারা যা বলতে পারে নি তা আদম (আঃ) কে দিয়ে বলায়ে আল্লাহ প্রমাণ করলেন যে মানুষ ফেরেশতাদের চেয়ে বেশি জানে। জাননেওয়ালা হওয়াই মানুষের ফিতরাত (স্বভাব)। মানুষতো সবই জানতে চায়। যা প্রয়োজন না তাও জানতে চায়। তাহলে যা প্রয়োজন তা জানার চেষ্টা কেন করব না?
আসলে নাম অতি প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। নাম শুধু চিহ্নমাত্র নয়। নাম জ্ঞানের পরিচয় বাহক, সৌন্দর্যের পরিচয় বাহক, সুসংস্কৃতির পরিচয় বাহক, সু-সভ্যতার পরিচয় বাহক, সুস্থ্য সুন্দর মনের, সুষ্ঠু রুচি বোধের পরিচয় বাহক।
রাসূল (সাঃ) শুধু মানুষের নামই রাখতেন না তিনি ব্যবহার্য প্রত্যেকটি জিনিসের নাম রাখতেন। তার ঘোড়ার নাম ছিল দুলদুল। যা তিনি ইমাম হুসাইন (রাঃ) কে দিয়েছিলেন। হযরত আলীর (রাঃ) তরবারীর নাম রেখেছিলেন জুলফিকার। তিনি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কৌতুক করেও কিছু নাম রেখেছেন। যেমন প্রখ্যাত সাহাবা আব্দুর রহমান যার পূর্ব নাম ছিল আব্দুস শামস। তিনি একটি বিড়ালের বাচ্চা পুশতেন। বাচ্চাটিকে সব সময় সাথে সাথে রাখতেন। রাসূল (সাঃ) এই জন্য তাকে একদিন আবু হুরাইরা বলে ডাকলেন। আবু হুরাইরা মানে বিড়ালের বাবা (বিড়াল ওয়ালা)। সেই সাহাবীর আব্দুর রহমান নামটা সবাই যেন ভুলেই গেল। সবাই তাকে আবু হুরাইরা বলেই ডাকতে লাগল। আমরা তো অনেকে বোধ হয় জানিই না তার আসল নাম আব্দুর রহমান।
একদিন হযরত আলী (রাঃ) মসজিদে নববীর মেঝের উপর ঘুমিয়ে ছিলেন। শরীরে ধুলোমাটি লেগেছিল। রাসূল (সাঃ) তাকে আদর করে ডাকলেন,“ ওঠ আবু তোরাব। তারপর গায়ের ধুলোবালি মুছে দিলেন। আবু তোরাব অর্থ মাটির বাবা। হযরত আয়েশা কে (রাঃ) প্রায়ই হুমায়রা বলে ডাকতেন। হুমায়রা অর্থ লাল বর্ণের। আয়েশা (রাঃ) ছিলেন লাল বর্ণের ফর্সা।
এমনি ভাবে নাম কখনও কখনও হয় আদর স্নেহ ভালোবাসার প্রকাশ। তাই আমরা যখন প্রিয়জনদের নাম রাখব তখন এই সব দিকে লক্ষ্য রেখেই যেন নাম রাখি। শির্ক, বিদ’য়াত বর্জন করে, অর্থহীন শ্র“তি কটু শব্দ বাদ দিয়ে অর্থযুক্ত, শ্র“তি মধুর, সহজে উচ্চারণ যোগ্য নাম গুলোই হোক আমাদের প্রিয়তম সন্তানদের নাম। আমি যে মুসলিম তা যেন আমার নামের মধ্যেই ফুটে ওঠে। আমি মুসলিম না অন্য কোনো বিশ্বাসাবলম্বি, আমার নাম শুনে এই দ্বিধায় যেন কেউ না পড়ে। আমার নামই হোক আমার পরিচয় পত্র, আমার প্রশংসা পত্র। আমার গৌরব। অথচ এক শ্রেণীর মুসলমান আছে যারা মুসলিম নাম রাখাই অপছন্দ করে।
বলেনতো ……….
মুসলিম নাম রাখাই যদি অপছন্দ করি তাহলে আমরা – কেমন মুসলমান?

নামের মাঝেই লুকিয়ে আছে আমার পরিচয়

(১ম পর্ব:)
“ নামের বড়াই করো না কেউ,
নাম দিয়ে কী হয়?
নামের মাঝে পাবে না তো
সবার পরিচয়।”
ছোটবেলা এই গানটি শুনতে খুব ভালো লাগতো। মনে হতো সত্যিই তো নাম দিয়ে কী হয়? রাজা বাদশা নবাব নামে অনেক ফকির মিসকিন দেখেছি। আবার ফকির আহমেদ, গরীবউল্লাহ, খয়রাত হোসেন নামে অনেক ধনী লোকও দেখেছি।
জামিলা (সুন্দরী) হাসিনা (অপরূপা) নামে অনেক কুৎসিত মেয়ে দেখেছি, আবার লাইলি, (রাত্রি)-কালী নামে অনেক সুন্দরী মেয়ে দেখেছি। বোবা মেয়ের নাম সুভাষিণী আর কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন আমাদের সমাজে কম নেই।
নামের গুরুত্ব:- কিন্তু তারপরও নামের বিরাট একটা গুরুত্ব আছে। রাসূল (সা.) বলেছেন ‘তোমরা সন্তানদের ভালো নাম রাখো।’ রাসূল (সা.) অনেক সাহাবীর খারাপ নাম বদলে ভালো নাম রেখেছেন। যেমন বিখ্যাত সাহাবী আবু হুরায়রার নাম ছিল আব্দুস শামস, যার অর্থ অরুণ (সূর্য) দাস। কারো মতে আব্দুল ওজ্জা বা ওজ্জার দাস। রাসূল (সা.) তার নাম রাখেন আব্দুর রহমান। হযরত আবু বকর (রা.)-এর পূর্বে একটি মুশরিকি নাম ছিল, তা বদলে দিয়ে রাসূল (সা.) তার নাম আব্দুল্লাহ রাখেন যদিও আবু বকর নামেই তিনি অধিক পরিচিত।
আর এক ব্যক্তির নাম ছিল হাজন, মানে দুঃখ, কষ্ট, অভাব, দুর্ভাগা ইত্যাদি। রাসূল (সা.) বললেন ‘তোমার নাম বদলে রাখো সাহল। সাহল মানে সহজ, সুখ, সচ্ছলতা, সৌভাগ্যবান। নামের একটা তাছির বা প্রভাব আছে। আল্লাহর নামের সাথে আব্দুন যোগ করে নাম রাখা রাসূল (সা.) পছন্দ করতেন। আর যে কোনো সুন্দর অর্থবোধক নাম তিনি পছন্দ করতেন।
আমরা বাংলাদেশী। বাংলা আমাদের ভাষা। আমরা বাচ্চাদের ডাকনাম বাংলায় রাখতে পারি তবে অবশ্যই একটি ইসলামী নাম থাকা উচিত যা শুনলে মুসলিম বলে চেনা যায়। আর বাংলা ভাষায় যে নামটি রাখবো তা যেন অবশ্যই অর্থবোধক এবং শির্কমুক্ত হয়। কোনো দেবদেবীর নাম, না হয়। ফুলের নাম, নদীর নাম, পাখির নাম কিংবা অন্য কোনো সুন্দর অর্থবোধক বাক্য হতে পারে।
আসলে নাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। রাসূল (সা.) হাজন নামে এক ব্যক্তির নাম বদলে সাহল রেখেছিলেন কিন্তু সেই দুর্ভাগা ব্যক্তি (হাজন শব্দের অর্থও দুর্ভাগা) বলেছিল,“ থাক, আমার বাবা মা যখন রেখেছে এই নামই থাক।” রাসূল (সা.) তাকে আর কিছু বলেননি। পরবর্তীতে তার নাতী বর্ণনা করেছে “ আমাদের জীবন থেকে দুঃখ দুর্দশা কখনও দূর হয়নি।
আমাদের জাতীয় কবীর নাম ছিল দুখু মিয়া। সারাটি জীবন তার দুঃখে-দুঃখেই পার হলো। কী দরকার এ সব বাজে নাম রাখার?
মানুষ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ট। অন্যান্য প্রাণীও মানুষের মতো খায়, ঘুমায়, পরিশ্রম করে, বিশ্রাম নেয়, বংশ বৃদ্ধি করে, সন্তান বাৎসল্যও তাদের আছে। তারপরও মানুষের জীবন পদ্ধতির সাথে তাদের জীবন পদ্ধতি আকাশ পাতাল পার্থক্য। এই পার্থক্যের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো, মানুষ তার সন্তানের জন্য সুন্দর একটা নাম রাখে। নাম শুধু পরিচিতি চি‎হ্ন নয়। নামকরণের বেলায় অর্থপূর্ণ এবং শ্র“তি মধুর নাম রাখা প্রত্যেক মুসলিম মা বাবার কর্তব্য। একটি সুন্দর নাম বাবা মায়ের নিকট সন্তানের প্রাপ্য অধিকার। বাবা মা যদি এ অধিকার থেকে সন্তানকে বঞ্চিত করে তাহলে তাদেরকে আল্লাহর দরবারে জবাবদিহি করতে হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন, “হাশরের মাঠে প্রত্যেককে নাম ধরেই ডাকা হবে। তাই কারো নাম যদি ইসলামী রীতি বহির্ভূত, নিরর্থক, অথবা দাম্ভিকতাপূর্ণ হয় সে জন্য পিতা-মাতাকেই জবাবদিহি করতে হবে।
নামের বিকৃতি:- নাম মানুষের অত্যন্ত প্রিয় একটি জিনিস। আমার মনে হয় প্রত্যেকটি মানুষ তার নামকে ভালোবাসে তাই কারো নামের বিকৃতি করা উচিত না। অন্তর্যামী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা তিনি বান্দার ভালো লাগা মন্দ লাগা জানেন তাই বলছেনÑ “তোমরা কাউকে খারাপ নামে ডেকো না।” (সূরাহ হুজুরাত: ১১)
আল্লাহ যে কাজ করার আদেশ দেন তা পালন করা, ফরজ। আর যা তিনি নিষেধ করেন তা করা, হারাম। তা করলে কবীরা গুনাহ হবে। কবীরা গুনাহের গুরুত্ব বুঝতে হবে। বিভিন্ন ভালো কাজের মাধ্যমে সাগীরা (ছোট) গুনাহ মাফ হয় কিন্তু কবীরা গুনাহ মাফ হয় না। কবীরা গুনাহ থেকে মাফ পেতে হলে সেই গুনাহ থেকে বিশেষভাবে আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে, তওবা করে, আর কখোনো করবো না বলে কান্নাকাটি করতে হবে। অতএব কাউকে বিকৃতি নামে ডাকাকে আমরা যতোই তুচ্ছ মনে করি না কেন আসলে বিষয়টি কিন্তু তুচ্ছ না।
নাম বিকৃতিকারীগণ নামকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, সেই বিকৃত শব্দ থেকে আসল নাম খুঁজে পাওয়াই মুসকিল। আমাদের বাসার পাশে বাস করত ঘ্যাণা শেখের মেয়ে কুনু। শুনলে অবাক হবেন কুনুর সঠিক নাম কুলসুম, আর ঘ্যানা শেখের নাম আনোয়ার শেখ। কী করে যে আনোয়ার শেখ ঘ্যাণা শেখ হলো তা আবিস্কার করতে বোধহয় প্রতœতত্ত্ববীদ লাগবে। নাম বিকৃতি করা যেন একটা স্বভাবে পরিণত হয়েছে এক শ্রেণী মানুষের। মতী কে মইত্যা, খলীল কে খইল্যা, জলিলকে জইল্যা ইত্যাদি বলে ।
যা হোক আমাদের অনেকের মধ্যেই কম-বেশি করে নাম বিকৃতি করার অপতৎপরতা আছে। আমরা যেন এই অপতৎপরতা থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারি। আল্লাহ আমাদের সাইকে সেই তাওফীক দান করুন। আমীন \
না বুঝে নাম রাখা:- বৈঠকে নতুন মুখ দেখে জিজ্ঞেস করলাম। “আপা আপনার নাম কী?” সেই আপা খুব গম্ভির স্বরে উত্তর দিলেন। “আমার নাম কা’য়াস ফিম্ মা’কুল” সূরাহ ফীলের শেষ আয়াত”। আর একবার এক ভদ্র মহিলা গর্বের সাথে বলে ছিলেন তার নাম ‘আল ক্বারিয়া’। আর একজন তার ছেলের নাম রেখেছে খিঞ্জির আহমেদ, কেউ রাখে ‘নার’ জাহেলা। আবার অহংকারের সাথে বলে এইসব শব্দ আল কুরআন থেকে নেওয়া।

কায়াস্ ফিম্ মা’কুল অর্থ- পশুর চিবানো ভূসি। আল ক্বারিয়া অর্থ- চরম দুর্ঘটনা। খিঞ্জির মানে শুকর। নার-আগুন। জাহান্নাম বুঝাতে ‘নার’ ব্যবহার করা হয়েছে আল কুরআনে। জাহেলা মানে চরম মূর্খ। এমনি আরও অনেক শব্দ আল কুরআনে আছে যার কোনো মানে না বুঝেই বাচ্চাদের নাম রাখে আর মনে মনে খুশি হয় এই ভেবে, যে নামটি কুরআন থেকে রেখেছি।
বাবার নামের সাথে মিলিয়ে নাম:-আব্দুল আলীম মানে আলীমের বান্দা- গোলাম বা দাস। আলীম আল্লাহ পাকের একটি নাম। তাহলে আসগর আলীমের অর্থ কী হতে পারে? আসগর অর্থ ছোট। আবার বাবার নাম আব্দুর রহমান, ছেলের নাম দুলাল রহমান। কি হলো এইবার?
আব্দুর রহমান মানে রহমানের দাস, আর দুলাল রহমান মানে রহমানের পূত্র। আসতাগফিরুল্লাহ। (আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন)
আসল কথা হচ্ছে আমরা যে নাম-ই রাখি না কেন, যেন অর্থ জেনে-বুঝে রাখি।

নাম নিয়ে কতো কথাঃ- মুহাম্মাদ আব্দুল মান্নান নামের অতি পণ্ডিত এক লোক বিজ্ঞের মতো মাথা দুলিয়ে বললো “বাংলাদেশের যতো ইসলামী আন্দোলনের নেতা আছেন, তাদের কারো নামই তো ইসলামী না!!
বুঝতে না পেরে বললাম “তার মানে?”
ভদ্রলোক বলতে লাগলো “অধ্যাপক গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, দেলোয়ার হোসেন সাইদী, মহিউদ্দিন খান আহমদ শফি প্রমুখ এদের একজনের নামের আগেও কী মুহাম্মাদ শব্দটি আছে?”
বললাম “তাহলে রাসূল (সা.) এর সাহাবীরাও তো ইসলামী নাম রাখেন নাই, কী বলেন? আবু বকর (রা.) ওমর (রা.) আলী (রা.) এঁদের কারো নামের আগেও তো মুহাম্মাদ নেই।” ভদ্রলোক এইবার চুপ হয়ে গেলেন।
মুহাম্মাদ যদি কারো নাম রাখা হয় তবে মুহাম্মাদই রাখতে হবে। নামের অংশ হিসাবে প্রথম কিংবা শেষে রাখার কোনো যুক্তি নেই।
আবার মেয়েদের নামের আগে মোসাম্মাত লাগায়। মোসাম্মাত শব্দের অর্থ নামীয় বা নাম বিশিষ্ট। যেমন- মোসাম্মাত আমেনা বেগম। এর অর্থ হলো আমেনা বেগম নাম বিশিষ্ট। এর কোনো দরকার আছে? অনেকের ধারণা নামের আগে ছেলেদের জন্য মুহাম্মাদ এবং মেয়েদের জন্য মোসাম্মাত লাগানো বোধ হয় জরুরী। মোটেও না।
হিন্দুরা তাদের নামের আগে শ্রীমাণ শ্রীমতী। ইংরেজরা মিষ্টার, মিস্ , মিসেস লেখে। দীর্ঘদিন হিন্দু এবং ইংরেজদের অধীনে থেকে আমাদেরও সখ হয়েছে নামের আগে-পিছে কিছু লাগানো। এছাড়া আর কিছু নয়।
এক বয়স্ক ভদ্র মহিলাকে সীরাত মাহফিলের দাওয়াত দিতে যেয়ে কার্ড হাতে নিয়ে বিনয়ের সাথে বললাম “ খালাম্মা আপনার নামটা যদি বলেন—–।”
ভদ্র মহিলা বললেন “ লেখো মিসেস্ চৌধুরী।” হায় আল্লাহ বাবা-মা কী কোনো নাম রাখেননি? কী আর করা মিসেস্ চৌধুরী লিখেই কার্ডটা তার হাতে দিয়ে এলাম।
কী আশ্চর্য নারী স্বাধীনতা নিয়ে এত হৈ চৈ। পুরুষের সমান অধিকার আদায়ের জন্য কত আন্দোলন, অথচ পরিচয় দেওয়ার সময় পুরুষের লেজুর হওয়া। এটা কেমন মানষিকতা?
বিয়ের পর বরের নামের অর্ধেক নিজের নামের সাথে যোগ করা ফ্যাশন না সভ্যতা বুঝি না। গুটি কয়েক বাদে সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন পর্যন্ত প্রায় একই রকম।
ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, হাসিনা ওয়াজেদ, আইভি রহমান, খালেদা জিয়া, রওশন এরশাদ- উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত প্রায় সবাই নিজেদের নামের মাথায় বরের নাম জুড়ে নামের শ্রীবৃদ্ধি করেন।
অনেকে অবশ্য বলেন একই নামের একাধিক ব্যক্তি হওয়ার কারণে তারা বরের নাম ব্যবহার করেন চেনার জন্য। কথা হলো একই নামের একাধিক ব্যক্তি কী শুধু মহিলাদের মধ্যেই হয় পুরুষের মধ্যে হয় না? তারা তো কেউ স্ত্রীর নাম ব্যবহার করেন না। পরিচিতির জন্য যদি বরের নাম লিখতে হয় কিংবা বলতে হয়, তা না হয় বললাম- কিন্তু নামের মাথায় টুপি পড়াতে হবে কেন?
একবার কোনো এক ফরমে স্থায়ী আর অস্থায়ী ঠিকানা লিখতে বলায়, আমি লিখেছিলাম-
অস্থায়ী ঠিকানা-
মাসুদা সুলতানা রুমী
w/o জনাব নূর মুহাম্মাদ (ইঞ্জিনিয়ার)
কলেজপাড়া। বদলগাছী। নওগাঁ
স্থায়ী ঠিকানা
মাসুদা সুলতানা রুমী
পিতা- মুহাম্মাদ ফখরুল ইসলাম মোল্লা
বারান্দি মোল্লাপাড়া। যশোর। (চলবে…)

সর্বযুগের সর্বাধুনিক জীবনপদ্ধতির নাম : ইসলাম


বিরুদ্ধবাদী শক্তি সর্বদাই এগিয়ে চলার প্রেরণা যোগায়। সকল পথেই বিদ্যমান তার বিপরীত ধারা। পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ, ব্যাপক, পরিপূর্ণ ও সুসামঞ্জস্যশীল জীবন ব্যবস্থা ইসলামের ক্ষেত্রেও এর কোন ব্যতিক্রম নেই। অর্থাৎ, ইসলামের চলার পথ সরল কিন্তু কুসুমাস্তীর্ণ নয়; বরং পদে-পদেই পিচ্ছিল ও কণ্টকাকীর্ণ। হবেই বা না কেন? এ পথেই তো আমাদের পরীক্ষা চলছে জাগতিক জীবনের অনির্দিষ্ট দিন-রাতে। আর পরীক্ষাক্ষেত্রেই ফলাফল আশা করা কখনোই কোন সুস্থ ও জ্ঞানসম্পন্ন পরীক্ষার্থীর কাজ হতে পারে না। অতএব, আল্লাহর পথের পরীক্ষার্থী মুমিনেরা সে আশা করেও না; বরং দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যা পায় অথবা হারায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকে। কিন্তু লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয় না কখনো।
বিরুদ্ধবাদীদের যাবতীয় যন্ত্রণা এখানেই যে, মুমিনেরা কেন তাদের আসল লক্ষ্যের পানে ধাবমান? কেন তারা তাছবীহ আর জায়নামায নিয়ে মোরাকাবায় বসে-বসে ধ্যান করে না! (?) কেন তারা কবরে কবরে গম্বুজ উঁচিয়ে গাঁজার নেশায় মারফতী (?) গানে বুঁদ হয়ে থাকে না। কেন তারা ইসলামকে দেখতে চায় রাষ্ট্রব্যবস্থায়? কারণ, ইসলাম তো এ যুগে একেবারেই অচল, সেকেলে, পুরাতন, এর সংরক্ষণে হেন ত্রুটি, তেন ঘাটতি রয়েছে। অতএব যত্ত পার মসজিদে, খানকায়, ঘরের কোণায় ইসলাম মান বাধা নেই, খামাখা কেন তারে রাজনীতিতে টেনে আনছো? (আড়ালী দৃষ্টিতে-কেন আমাদের স্বার্থের গুদামে আগুন দিচ্ছো?)
বিভ্রান্তি ঘুরপাক খাচ্ছে অশান্ত বাতাসে- ‘ইসলাম আধুনিক নয় সেকেলে, একালের জন্য যোগ্যতা রাখে না’। জানা দরকার যে, আধুনিকতার সংজ্ঞা কি? ‘সংসদ’ বলে- বর্তমানকালীন, সাম্প্রতিক, হালের, অধুনাতন, নব্য ইত্যাদি। সমার্থ শব্দকোষ তার অনেক অনেক প্রতিশব্দাবলীর সমাবেশ ঘটিয়েছে। সাথে সাথে ‘চিরনতুন’, ‘চিরনবীন’ ইত্যাদি শব্দেরও অবতারণ হয়েছে।
এখন আসুন ইসলাম কীভাবে আধুনিক? গতবিকেলে তোলা টমেটো, কাঁচামরিচ, ধনেপাতা থেকে শুরু করে- খবর, খবরের কাগজ, আসবাব পত্র, ঘটনাবলী নিয়ে বইপুস্তক পর্যন্ত পুরোনো হয়ে যাচ্ছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম শেষ হয়ে যাচ্ছে; তারা সকলেই আধুনিক থেকে পুরাতন হয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই ধারার কোন এক পর্যায়ে ফেললে ইসলাম পুরাতন। কিন্তু ইসলাম নামক পূর্ণাঙ্গ একটি জীবন ব্যবস্থাকে এতটা নগন্যরূপে যারা চেনে, এতটা স্বল্পতায় যারা জানে ও তার সাথে এতটাই হীনসম্পর্ক যারা রাখে; কেবলমাত্র তাদের পক্ষেই সম্ভব একথা বলা যে, ইসলাম তথা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা পুরোনো, সেকেলে কিংবা আরো একধাপ এগিয়ে- যে, ইসলাম এ যুগের জন্য অচল! মূলতঃ ইসলামের জন্য আধুনিক অর্থে ‘চিরনবীন’, ‘চিরনতুন’ শব্দাবলীই সর্বাধিক প্রযোজ্য। কেননা, প্রতিটি মানব শিশুকেই জন্মের পর থেকে কোন না কোন জীবন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয়; যারা ইসলামের সাথে পরিচিত হবার সৌভাগ্য অর্জন করে, ইসলাম তাদের নিকট সম্পূর্ণ নতুন; যেন আল্লাহ তা’আলা তার বা তাদের জন্যই ঠিক এই মুহূর্তে এই বিধান নাযিল করেছেন, যে মুহূর্তে তারা তা শ্রবণ ও অনুধাবন করে। আজকের আধুনিক পৃথিবীতে জন্মগ্রহণকারী একটি শিশু বৃদ্ধি পেয়ে কিশোর হয়ে যৌবন-বার্ধক্য নিয়ে পর্যায়ক্রমে পরিপূর্ণ জীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগে কী হবে তার করণীয় সে দিকনির্দেশনা একমাত্র ইসলামই তাকে দিতে পারে প্রতিদিনের টাটকা খবরের মত করেই এবং কেয়ামত পর্যন্ত ইসলামই এই ক্ষমতা রাখে। অতএব, ইসলাম সর্বকালেই জীবন পদ্ধতিতে যুগের চাহিদা মেটাতে পারে বলে ইসলাম ‘চিরনবীন’, ‘চিরনতুন’ তথা আধুনিক।
আসুন আমরা এই চিরনবীন, চিরনতুন ইসলামকে আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে পালনে ব্রতী হই। আল্লাহ আমাদের সে তাওফীক ও শক্তি দান করুন। আমীন \