স্খানীয় ভাষায় খুতবা প্রসঙ্গে বিভিন্ন অভিমত حكم إلقاء الخطبة باللغة المحلية

 

জুময়ার খুতবা মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত আবশ্যকীয় বিষয় বলে ইসলামি জীবনব্যবস্খায় এটির প্রয়োগের গুরুত্বও অপরিসীম। মহান আল্লাহ জুময়ার খুতবা শোনার জন্য মসজিদে ছুটে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন : ‘জুময়ার দিন যখন নামাজের আজান দেয়া হয় তখন তোমরা আল্লাহর জিকিরের দিকে ছুটে যাও।’ (সুরা জুময়া: …)। কিছু কিছু মুফাসসিরের মতে আয়াতে বর্ণিত জিকির দ্বারা উদ্দেশ্য জুময়ার খুতবা। জুময়ার দিনে প্রথম মসজিদে প্রবেশকারীর সওয়াব সংক্রান্ত আবু হুরায়রা রা: বর্ণিত হাদিসে জিকির শব্দটি খুতবা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; রাসূল সা: বলেন, ‘…তারা মসজিদে প্রবেশ করে ও আল্লাহর জিকির (খুতবা) শুনতে থাকে।’ (বুখারি ও মুসলিম)। জুময়ার খুতবা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ায়, রাসূল সা: মনোযোগসহকারে খুতবা শোনার নির্দেশ দিয়েছেন (বুখারি ও মুসলিম)

রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির উপস্খিতিতে সমসাময়িক বিষয় বিশ্লেষণ, উ?ভূত পরিস্খিতির সমাধানকল্পে ইসলামি নির্দেশনা, দেশ ও জাতির জন্য বিশেষভাবে জরুরি বিষয়গুলোর খোলামেলা আলোচনাই জুময়ার খুতবার মূল দাবি। কিন্তু জুময়ার খুতবার ভাষা কি নামাজের মতো আরবিই হতে হবে, না কি অন্য ভাষায়ও খুতবা প্রদান করা যাবে? ইসলামের প্রথম যুগে অনারবি ভাষায় খুতবা প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত না হওয়ার কারণ স্পষ্ট; কেননা সে সময় ইসলামের বিস্তৃতি মূলত আরব ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল, আরব ছাড়া যেসব অনারব রাষ্ট্রে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে স্খান নিয়েছিল তারা অতি অল্পসময়ে আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু পরে অনারব রাষ্ট্রে ইসলামের বিস্তৃতি ধীরে ধীরে এ প্রয়োজনীয়তার ব্যাপৃতি আরো বাড়িয়ে দেয়। বর্তমান সময়ে আধুনিক জীবনাচারের ধারা পাল্টে যাওয়ার কারণে এ প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্যতায় রূপ নিয়েছে।

সম্প্রতি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইমামদের জাতীয় ইমাম সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ বাংলা ভাষায় জুময়ার খুতবা দেয়ার জন্য বিশেষভাবে জাতির কর্ণধার আলেম সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টার এ আহ্বান বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া সমাজব্যবস্খার জন্য মাতৃভাষায় খুতবা প্রদানের ওপর যে গুরুত্ব বহন করে, বর্তমান সময়ে এ প্রয়োজনীয়তার পেছনে বিভিন্ন যৌক্তিক কারণ রয়েছে:
ক) বিভিন্নমুখী শিক্ষাব্যবস্খা বর্তমান থাকায় জনগোষ্ঠীর মধ্যে মৌলিক ইসলামি শিক্ষার অভাবে সমাজে যে বিশৃঙ্খলা বিরাজমান মাতৃভাষায় খুতবা প্রদানের জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে সহজ বোধগম্যতার কারণে সব কুসংস্কার ও কুপমণ্ডুতা সমাজ থেকে বিতাড়িত করে।
খ) জুময়ার দ্বিতীয় আজানের আগে কোনো কোনো মসজিদে বাংলায় আলোচনা রাখা হলেও সে সময় উপস্খিতি থাকে খুবই নগণ্য; যার কারণে সেখানে বাংলা ভাষায় প্রদত্ত আলোচনা গুরুত্ব পায় না।
গ) যারা ইসলামের প্রতিপক্ষে অবস্খান নিয়ে সবসময় তাদের কিছু মুখোশধারী দোসর যাদের মাধ্যমে ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রপাগান্ডা ছড়ায়, কিন্তু যারা ইসলামপ্রিয় অথচ জ্ঞান-গরিমায় অনেকটা অপরিপক্ব, যার পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধীদের মোকাবেলা করতে বিচলিত হয়ে পড়ে, যার জন্য প্রত্যেক ইসলামপ্রিয় সাধারণের বাংলাভাষায় খুতবা শুনে তার থেকে নির্দেশনা পাওয়া সম্ভব।
ঘ) জুময়ার খুতবার সময় দেখা যায়, মুসল্লিরা ভাষা না বোঝার কারণে মসজিদে বসে বসে তন্দ্রাচ্ছন্ন হন বা অন্যমনস্ক থাকেন, অথচ মনোযোগসহকারে জুময়ার খুতবা শোনা কোনো কোনো ফকিহ ওয়াজিব বলেছেন। অতএব, মাতৃভাষায় খুতবার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
মাতৃভাষায় খুতবার বিষয়ে ইসলামি আইনশাস্ত্র বিশারদদের তিনটি মত রয়েছে:
১) ইমাম আবু হানিফা এবং হাম্বলি ও শাফেয়ি মাজহাবের একদল আলেমের মতে সমর্থন থাক আর না থাক খুতবা শুদ্ধ হওয়ার জন্য আরবি ভাষায় খুতবা প্রদান শর্ত নয়।
২) হানাফি মাজহাবের ইমাম মোহাম্মদ ও আবু ইউসুফ, হাম্বলি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত ও শাফেয়ি মাজহাবের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী সমর্থন থাকলে জুময়ার খুতবা আরবিতে প্রদান শর্ত আর সমর্থন না থাকলে কোনো অসুবিধা নেই।
৩) জুময়ার খুতবা শুদ্ধ হওয়ার জন্য আরবি ভাষায় খুতবা দেয়া শর্ত; তাই সমর্থন থাক বা না থাক। মালেকি মাজহাবের অনুসারীরা এ মত ব্যক্ত করেছেন।
উল্লেখ্য, যেসব আলেম খুতবা আরবিতে প্রদান শর্ত বলেছেন, তাদের মতে শুধু খুতবার রোকনগুলো আরবিতেই হতে হবে।
বর্তমান সময়ের অধিকাংশ ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞের মতে আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা প্রদান বৈধ ও জরুরি। এ সম্পর্কিত কয়েকটি ফতোয়া নিচে উল্লেখ করা হলো :
১) ইসলামি ফিকহ পরিষদ, ১৪০২ হিজরির ৮-১৬ রবিউস সানিতে অনুষ্ঠিত পঞ্চম সম্মেলনের পাঁচ নম্বর সিদ্ধান্ত। অনারব রাষ্ট্রগুলোতে অনারবি বা আঞ্চলিক ভাষায় খুতবা প্রদান ও নামাজে মাইক ব্যবহার সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে (সিদ্ধান্ত নম্বর ৫) পরিষদের পক্ষ থেকে বলা হয়: …. এ বিষয়ে আমরা অধিকতর ন্যায়সঙ্গত যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি তা হলোন্ধ অনারব রাষ্ট্রগুলোয় জুময়া ও দুই ঈদের নামাজের খুতবা শুদ্ধ হওয়ার জন্য আরবি ভাষা শর্ত নয়। তবে এ ক্ষেত্রে উত্তম পদ্ধতি হলো, খতিব খুতবার সূচনা, পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলো অবশ্যই আরবিতে উচ্চারণ করবেন। অবতীর্ণ আয়াত কুরআনের ভাষায় তিলাওয়াত করবে, যাতে অন্যান্য ভাষার মানুষ আরবি শিক্ষা ও কুরআনের ভাষা অনুশীলনে আগ্রহী হয় এবং মানুষের বোধগম্যতার খাতিরে খতিব খুতবার মূল আলোচনা স্খানীয় ভাষায় প্রদান করবেন। (পৃষ্ঠা- ৯৭/৯৮)
২) সৌদি আরবের ফতোয়া বিষয়ক স্খায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত (৮/২৫৪-২৫৫, ফতোয়া নম্বর- ৬৮১২)
৩) সৌদি আরবের গ্রান্ড মুফতি শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বাজ র:-এর দু’টি ফতোয়া (ফতোয়া শেখ বিন বাজ ১২/৩৭০-৩৭৫) যা বর্তমানে তার ওয়েবসাইটে চলমান রেখেছেন।
৪) শেখ মোহাম্মদ বিন উছাইমিন র: বলেন: প্রকৃতপক্ষে উপস্খিত মুসল্লিদের দুর্বোধ্য ভাষায় জুময়ার খুতবা প্রদান বৈধ নয়। উদাহরণস্বরূপ যদি তারা অনারবি কোনো ভাষাভাষী হয় এবং তারা আরবি ভাষা ভালোভাবে অবগত না থাকে তবে খতিব তাদের মাতৃভাষায় খুতবা প্রদান করবেন। কেননা খুতবার মূল উদ্দেশ্য উপস্খিত লোককে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের পদ্ধতি অনুশীলন ও বিভিন্ন বিষয়ে ইসলামি নির্দেশনা প্রদান। তবে, মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের আয়াতগুলো আরবিতেই তিলাওয়াত করবেন এবং আঞ্চলিক ভাষায় এর ব্যাখ্যা করবেন (ফতোয়া আরকানুল ইসলাম: পৃষ্ঠা ৩৯৩)।
উপরোল্লিখিত মতামতের সমর্থনে মহাগ্রন্থ আল কুরআন এবং হাদিসে রাসূল সা:-এর বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া যায় এবং সাধারণ বুদ্ধি-বিবেকও এটিকে সমর্থন করে। ভাষা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য এক উত্তম নেয়ামত এবং তার অস্তিত্বের প্রমাণ। তিনি বলেন: ‘তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে আকাশগুলো ও জমিনের সৃষ্টি আর তোমাদের ভাষাগুলো ও তোমাদের বর্ণের পার্থক্য।’ (সূরা রুম: ২২)

গোত্রীয় ভাষা বা মাতৃভাষাই মানুষের অনুভূতি প্রকাশ করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। মানুষের জ্ঞান অর্জনের প্রধান অবলম্বন। যেকোনো বিষয় মাতৃভাষায় যত সহজে বোধগম্য করা যায় সে ভাষার মানুষের জন্য অন্য কোনো ভাষাতে তা দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে। এ কারণে মহান আল্লাহ সর্ব যুগে তার দীন প্রচারের জন্য স্বগোত্রীয় ভাষাভাষী নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। যারা নিজের গোত্রকে মাতৃভাষাতেই আল্লাহর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, ওয়াজ-নসিহত করেছেন, দীনের প্রচার ও প্রসার করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: ‘আমি প্রত্যেক রাসূলকে নিজ গোত্রীয় ভাষায় প্রেরণ করেছি, যাতে তারা তাদের (গোত্রের লোকদের) জন্য (দীনকে সরলভাবে) উপস্খাপন করতে পারে।’ (সূরা ইব্রাহিম: ৪) ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, সমসাময়িক বিষয় বিশ্লেষণ, উদ্ভূত পরিস্খিতির সমাধানকল্পে ইসলামি নির্দেশনা, দেশ ও জাতির জন্য বিশেষভাবে জরুরি বিষয়গুলোর অবতারণাই জুময়ার খুতবার অন্যতম মূল দাবি। আর মাতৃভাষাই হতে পারে এ দাবি পূরণের উৎকৃষ্ট মাধ্যম। ইসলামি দাওয়াত পেশ করার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম; ইহুদিদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য, তাদের প্রেরিত পত্রের জবাব ও তাদের বিশ্বাস খণ্ডনের জন্য দলিল-প্রমাণ উপস্খাপন করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জায়েদ বিন সাবিতকে ইহুদিদের ভাষা (হিব্রু) শেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই কারণে সাহাবিরা রোম ও পারস্যের কোনো অনারব এলাকায় যুদ্ধ করার আগে অনুবাদক বা দ্বোভাষীর মাধ্যমে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন। কোনো এলাকা জয় করলে তার অধিবাসীদের আরবিতেই আল্লাহর প্রতি আহ্বান করেছেন, আরবি ভাষা শিক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। যারা আরবি শিখতে পারেনি তাদের জন্য নিজ ভাষাতেই ইসলামের বাণী বোঝানোর ব্যবস্খা করেছেন। চলমান পৃথিবীতে ইসলামের বাণী ও শিক্ষা প্রত্যেকের কাছে পৌঁছানোর জন্য নিজ ভাষাভাষী ‘দাঈ’ ইলাল্লাহর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সময়ে নামেমাত্র মুসলমানদের সঠিক ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দেয়ার জন্য জুময়ার খুতবাই মহত্তম এক কৌশলী অবলম্বন। কারণ তারা দীন শিক্ষার মজলিসে বসতে চায় না, দীনি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা নিতে চায় না, জুমার দ্বিতীয় আজানের আগে প্রদেয় বাংলায় ইসলামী আলোচনা শেষ হওয়ার পর উপস্খিত হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।
অনারবি ভাষায় খুতবা প্রদানের নীতিমালা
ইসলামী ফিকহ বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী আরবি ছাড়া অন্য ভাষায় খুতবা প্রদানের ক্ষেত্রে নিুোক্ত নীতিমালা অনুসরণ জরুরী :
ষ খুতবার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা ও তার মাহাত্ম্য সংবলিত বাক্যাবলি আরবিতে হতে হবে।
ষ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তার পরিবার-পরিজনের ওপর দরুদ আরবিতে আদায় করতে হবে।
ষ খুতবার শুরুতে তাকওয়া গ্রহণের অসিয়ত আরবিতে হতে হবে।
ষ মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের আয়াত আরবিতেই তেলাওয়াত করতে হবে।
ষ খুতবার মধ্যকার দোয়া বিশেষত দ্বিতীয় খুতবার দোয়া আরবিতে করতে হবে।
উপরোক্ত পাঁচটি বিষয় খুতবার রোকন বা স্তম্ভ।
ষ অধিকংশ আলিম দ্বিতীয় খুতবার পুরোটাই আরবিতে প্রদান করার পক্ষে মত দিয়েছেন। কেননা দ্বিতীয় খুতবা মূলত দোয়ার সমষ্টি।
ষ এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, খতিবকে ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, চারিত্রিক মাধুর্যের অধিকারী হওয়া অবশ্যই জরুরি এবং তার মধ্যে ইমামতি ও খুতবা প্রদানের যোগ্যতা ও শর্তাবলি বিদ্যমান থাকতে হবে; তাকে একাধারে আরবি ও স্খানীয় ভাষায় খুতবা প্রদানের যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে। তিনি নিজের সুবিধার্থে স্খানীয় ভাষায় খুতবা প্রদান করবেন না, বরং যাতে খুতবার বিষয় সাধারণ জনগণের বোধগম্য হতে পারে সে উদ্দেশ্যেই হতে হবে খুতবার একমাত্র ব্যাখ্যা প্রদান।
অতএব, পরিবর্তিত বিশ্বের চলমান প্রেক্ষাপটে পৃথিবীর প্রত্যেক রাষ্ট্রে মুসলিম জাতি বা অধিবাসীদের জন্য তাদের নিজস্ব ভাষায় খুতবা প্রদান, যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক আন্তর্জাতিক বিদ্যাপীঠে দুনিয়া এবং আখেরাতের জ্ঞান শিক্ষার সহজ ও সরল পন্থা; অত:পর মুসলিম জাতিকে শিক্ষা-দীক্ষায় সমকালীন বিশ্বের উপযোগী করে তোলার জন্য, ইসলামী চিন্তাবিদ, আলিম ও ফকিহরা কুরআন-হাদিসের আলোকে নতুন করে চিন্তা করতে পারেন খুতবার মাধ্যমে যেন মানুষ বিজ্ঞানময় এ পৃথিবীর পার্থিব বিষয়ে জ্ঞানার্জন এবং আল্লাহভীতির মাধ্যমে আখেরাতের সেই মহাজগতে পারাপারের সহজ ও সঠিক পথ খুঁজে পান।

ইসলাম গ্রহণ (বাংলাদেশী) إشهار إسلام بنغالي

ইসলাম প্রেজেণ্টেশণ কমিটি’র (আই পি সি) পরিচালক মুহতারম জামাল শাত্তী, রমযানের পূর্বে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, গত বছর ২০১০ সালে শুধু রমযান মাসে কুয়েতে আই পি সি’র মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের প্রবাসীগণ ৮৮২ জন ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। আর ২০১০ সালে ইসলাম গ্রহণ করেছে মোট ৪০২৯ জন। সেই ধারাবাহিকতায় এ বছর আমাদের টার্গেট ১১০০ জনকে ইসলামের ছায়া তলে আনার চেষ্টা করা।
ইসলাম প্রেজেণ্টেশন কমিটি সেই মিশনকে সামনে রেখে রমযানের প্রথম থেকে দাওয়াতী অভিযান চালিয়ে আসছে। গতকাল পর্যন্ত নওমুসলিমের সংখ্যা ৭৮৮ জনে দাড়িয়েছে।
কিন্তু আমি মনে মনে শুধু আফসোস করতে থাকলাম, প্রায় ১৪টি ভাষা-ভাষী এতগুলো লোক ইসলাম গ্রহণ করলো, কিন্তু এদের মধ্যে একজনও বাংলাদেশী পেলাম না।
আজ আমার মনের আশা পূরণ হলো, আমারই জেলার একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী যুবক ইসলাম গ্রহণ করার নিয়তে আমাকে ফোন করলো। আজ আমার ছুটি থাকার কারণে অফিসে যাইনি। ফোন পেয়ে টেক্সি নিয়ে দৌড়ে ছুটলাম অফিসে।
নও মুসলিমকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করলাম, যেমন আপনার পৈত্রিক ধর্ম কেন ত্যাগ করতে চান? ইসলামের কোন জিনিস আপনার নিকট ভালো লাগলো, যার কারণে আপনি ইলাম গ্রহণ করতে চান? তার জবাবে অফিসের সকলেই সন্তুষ্ট হয়েছেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে কালিমা পড়ায়ে ইসলামে প্রবেশ করিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নও মুসলিমের ইসলাম পূর্ব নাম ছিল দেহান সরকার, ইসলাম পরবর্তী নামা রাখা হয়েছে যুবায়ের।
আমাদের আরো দুইজন বাংলাদেশী ভাইয়ের প্রচেষ্টায় একজন নেপালী ভাষা-ভাষী হিন্দু আজ ইসলাম গ্রহণ করেন। সম্মানিত ব্লগার ভাইগণ, আপনারা এই দুইজন নও মুসলিমের জন্য দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন তাদেরকে ইসলামের উপর অটল রাখেন।

যাকাতুল ফিতর زكاة الفطر

যাকাতুল ফিতর (ফিতরা) সম্পর্কে বিধান

রমযান মাস শেষ হওয়ার পর ঈদুল ফিতরের দিন অর্থাৎ শাওয়াল মাসের ১ তারিখে প্রত্যেক মুসলমান স্বেচ্ছাকৃতভাবে গরীবদের মধ্যে যে খাদ্য বণ্টন করে থাকে, ফিকাহ্‌বিদ ও মুহাদ্দিসগণ তাকে ’যাকাতুল ফিতর’ নামে নামকরণ করেছেন। একে ’সাদকায়ে ফিতর’ ও বলা হয়।

হাদীস এবং অন্যান্য প্রামাণিক ইতিহাস গ্রন’ থেকে জানা যায় যে, দ্বিতীয় হিজরীর রমযান মাসে রোযা ফরয করা হয় এবং একই বছর রাসূলুল্ল্লাহ্‌ (সা.) যাকাতুল ফিতরের আদেশ জারি করেছিলেন। তিনি ফিতরার পরিমাণও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। আবদুল্ল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে, ”রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) সদকায়ে ফিতর হিসাবে এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব প্রতিটি স্বাধীন এবং পরাধীন (গোলাম) মুসলমানের উপর ফরয করে দিয়েছেন” (বূখারী ও মুসলিম) খেজুর এবং যব ছাড়া অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যও সাদাকাতুল ফিতর হিসাবে দেয়া যায়। ”আবু সায়ীদ খুদরী (রা) বলেন, ’আমরা সাদাকাতুল ফিতর হিসাবে এক সা’ খাদ্য অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ পনীর অথবা এক সা’ কিশমিশ দিতাম”(বূখারী ও মুসলিম) ঈমাম মালিক, শাফেঈ, আহমদ ইবনে হান্বল, আবুল আলীয়া, আতা, ইবনে সিরীন ও আল-বূখারীসহ অনেকের মতে ’যাকাতুল ফিতর’ ফরয ইবাদত। আর ঈমাম আবু হানিফা ও তাঁর অনুসারীদের মতে তা ওয়াজিব।

যাকাতুল ফিতরের যৌক্তিকতা

ইবনে আব্বাস(রা.) থেকে বর্ণিত- ”রাসূলে করীম(সা.) ফিতরের যাকাত নির্ধারিত করেছেন রোযাদারদের বেহুদা অশ্লীল কথা ও কাজ থেকে পবিত্র রাখা এবং মিসকিনদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা স্বরূপ”(সুনান আবূ দাউদ)।
রোযাকালীন সময় মানুষ খাদ্যগ্রহণ ও যৌন অঙ্গের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকে। কিন’ মানুষ তার মানবীয় দুর্বলতার কারণে মূখ, কান, চক্ষু কিংবা হাত-পা দ্বারা শরিয়ত নিষিদ্ধ কথা বা কাজ দ্বারা কলুষিত হতে পারে, তাই রমযান মাসে রোযাদার ব্যক্তির বাজে কথাবার্তা ও বাজে কাজ থেকে তার আত্মার পবিত্রকরণের জন্যই রোযা শেষ হওয়ার সাথে সাথে ফিতরা ধার্য করা হয়েছে।
একই সাথে যাকাতুল ফিতরের মাধ্যমে সমাজের গরীব-মিসকিনদের জন্য ঈদের দিনে খাদ্যের ব্যবস্থা করা, যেন অভাবের লাঞ্ছনা নিয়ে তাদেরকে ঈদের দিনে ভিক্ষা করতে না হয়। ঈদের আনন্দ ধনী-গরীব সকলের মাঝে বিস্তার লাভ করা এবং সমাজে ধনী- দরিদ্রের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সমপ্রীতি ও সহানুভূতির গুণাবলী বৃদ্ধির লক্ষ্যে যাকাতুল ফিতর একটি অপরিহার্য ব্যবস্থা। রাসূলুল্লাহ(সা.) বলেছেন, ”তোমরা এ দিনে তাদেরকে স্বচ্ছল করে দাও” (বায়হাকী ও আল-মুআত্তা, আল-মালিক) ।

ফিতরা ধার্য করার লক্ষ্য একদিকে পবিত্রকরণ করা, অন্যদিকে গরীব-মিসকিনদের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা ও তাদের স্বচ্ছল করার একটি উৎকৃষ্ট পদ্ধতি।
রাসূল (সা.) ফিতরের যাকাত বাবদ এক সা’ খাদ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এক সা’তে যে পরিমাণ খাদ্য হয়, তা একজন গরীবের ঘরের সদস্যদের জন্য যথেষ্ট এবং ঈদের দিনে পরিতৃপ্তির সাথে খেতে সমর্থ। অন্যদিকে ফিতরদাতাদের পক্ষেও এ পরিমাণ খাদ্য দান করা কারোর জন্য কষ্টকর হয় না।

যাকাতুল ফিতর ব্যক্তির উপর ধার্য হয়, আর অন্যান্য যাকাত বা সাদাকাহ ধার্য হয় সম্পদের উপর।

যাকাতুল ফিতর এর পরিমাণ 

যাকাতুল ফিতরের পরিমাণের ব্যাপারে দু’টি মত রয়েছে।
১. এক সা’ : অধিকাংশ আলিমের মতে যাকাতুল ফিতরের পরিমাণ এক সা’, আব্দুল্লাহ ইবন উমার ও অন্যান্য সাহাবীদের বর্ণনা থেকে এরূপ জানা যায়। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) লোকদের উপর যাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন, যার পরিমাণ এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব”(সহীহ মুসলিম)। ”আবু সায়ীদ খুদরী (রা) বলেন, ’আমরা সাদাকাতুল ফিতর হিসাবে এক সা’ খাদ্য অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ পনীর অথবা এক সা’ কিশমিশ দিতাম”(বূখারী ও মুসলিম)।

২. অর্ধ সা’ গম : ঈমাম আবু হানীফা রহ. মতে অর্ধ সা‘ পরিমাণ আটা দ্বারা যাকাতুল ফিতর আদায় করা জায়িয। আব্দুল্লাহ ইবন উমারের অপর এক বর্ণনায় অর্ধ সা‘-এর কথা বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, “নবীজী (সা.) সাদাকাতুল ফিতর ফরয করেছেন, যার পরিমাণ এক সা‘ খেজুর অথবা এক সা‘ যব। তারপর লোকেরা সেটার পরিমাণ অর্ধ সা‘ গমে পরিবর্তণ করেন”(সহীহ বুখারী)।

সা’ এর পরিমাণ

‘সা’ হচ্ছে রাসূলুল্ল্লাহ্‌ (সা) সময়ে মদীনায় প্রচলিত খাদ্যশস্য পরিমাপের একক, পাত্র বা ভান্ডের মাপ (Bushel)। ’সা’ এর মাপ আয়তনিক(Volumetric Measure), ওজনের মাপ নহে। সেইযুগে বিশ্বের সব অঞ্চলেই ভান্ডের মাপে খাদ্যশস্য লেনদেন ও ক্রয়-বিক্রয়ের প্রচলন ছিল। এমনকি বর্তমান যুগেও পৃথিবীর কোন কোন অঞ্চলে ভান্ডের মাপে খাদ্যশস্য লেনদেন ও ক্রয়-বিক্রয়ের প্রচলন আছে। আর ভান্ডের আকারও একেক অঞ্চলে একেক ধরণের। তাছাড়া তরলজাতীয় জিনিষের পরিমাপ পৃথিবীর সর্বত্রই পাত্রের (আয়তনিক) মাপে করা হয়ে থাকে। তৎকালীন মদীনাবাসীরা ছিল কৃষিজীবী, তাদের কাছে পাত্রের মাপে লেন-দেনের ব্যবহার অধিক ছিল। আর মক্কাবাসীরা ছিল ব্যবসায়ী, দাঁড়িপাল্লায় ওজনের মাপে তারা অধিক নির্ভরশীল ছিল। তৎকালীন মদীনায় (হিজায অঞ্চলে) প্রচলিত আকারের এক ’সা’ সমপরিমাণ বর্তমান কালের মেট্রিক পদ্ধতির ওজনে ২.৫২০ কিলোগ্রাম চাল অথবা ২.১৭৬ কিলোগ্রাম গম। মনে রাখতে হবে যে, খাদ্য বা শস্যদানার ঘনত্ব ও হালকা বা ভারী ধরনের হওয়ার কারণে একই পাত্রের মাপে বিভিন্ন খাদ্য ও শস্যদানার ওজনে এর কিছুটা কম-বেশী হতে পারে।

তৎকালীন আরব অঞ্চলগুলিতে আরেকটি পদ্ধতিতে সা’ এর পরিমাপ হিসাব করার প্রচলন জানা যায়, তা হ’ল ’মুদ’(Mudd)। মুদের পাত্র (Bushel) আকারে ছোট, ৪(চার) মুদ এর পরিমাণ এক সা’র সমান। মুদ পরিমাপ করার আরেকটি পদ্ধতির প্রচলন ছিল, তা হচ্ছে মধ্যম আকারের একজন ব্যক্তির দুই হাতের ভরা কোষ পরিমাণ খাদ্যশস্য এক মুদ বলে গণ্য করা হত। যাদের কাছে পরিমাপের পাত্র অথবা ওজন করার দাড়িপাল্লা ছিল না, তারা এরূপ চার কোষ(মুদ) এর পরিমাণ এক সা’র সমান হিসাব করতেন।

আরব অঞ্চলের ওজনের মাপে মদীনার এক সা’ সমান পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ রতল(RATL)। এক রতল সমান বর্তমান কালের মেট্রিক পদ্ধতির ওজনে ৪০৮ গ্রাম। সেহিসাবে পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ (৫-১/৩)রতল সমান ২১৭৬ গ্রাম গম(Fiqh Al-Zakah–Qardawi Vol-I page-186, Vol-II page-210)।

রাসুলুল্লাহ্‌(সা.) সাদাকাতুল ফিতরের খাদ্য এক সা’ পরিমাণ সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন যা একটি পাত্রের মাপ। এই মাপটি স্থায়ী, এর কোন পরিবর্তণ নাই। সর্বকালে, বিশ্বের সকল অঞ্চলে এই মাপটি সমান।

আধুনিক ওজনের পরিমাপে এক সা’ শস্যদানার পরিমাণ

খাদ্য বা শস্যদানার ঘনত্ব ও হালকা বা ভারী ধরনের হওয়ার কারণে একই পাত্রের মাপে বিভিন্ন খাদ্য ও শস্যদানার ওজনে এর কিছুটা কম-বেশী হতে পারে।
তৎকালীন মদীনায় (হিজায অঞ্চলে) প্রচলিত আকারের এক ’সা’ সমপরিমাণ বর্তমান কালের মেট্রিক পদ্ধতির ওজনে কয়েকটি শস্যদানার আনুমানিক পরিমাণ:
গম ২১৭৬ গ্রাম
চাল ২৫২০ গ্রাম
ডাল (lentils) ২১৮৫ গ্রাম
শুঁটি (beans) ২২৫০ গ্রাম

এগুলোর গড় পরিমান ৫.৫০ রতলের চেয়ে সামান্য বেশী।(A Guide to Accounting Zakah- Husayn Husayn Shihatah & Abd as-Sattar Abu Ghuddah, page-74 & 81)

সা’ এর ওজনের পরিমাপে হিজাযী ও ইরাকী ফিকাহ্‌বিদদের মতপার্থক্য
রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) কর্তৃক মদীনায় প্রচলিত একটিমাত্র পরিমাপ ব্যবস্থা সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন এবং সেটিকেই অনুসরণ করতে বলেছেন। বিশ্বের সকল মুসলমান মদীনায় প্রচলিত সা’ এর পরিমাপ অনুসরণ করে যাকাতুল ফিতর প্রদান করবেন, এটা নবীজীর নির্দেশ, এতে সকলে সম্পূর্ণ একমত থাকবেন।

ইরাকের অধিবাসী ঈমাম আবু হানিফা(র.) ও তাঁর সমর্থকরা এক সা’কে ওজনের মাপে আট(৮) বাগদাদী রতল সমান হিসাব করেন। অর্থাৎ ইরাকীদের হিসাবে এক সা’ ওজনে মদীনায় প্রচলিত সা’ এর চেয়ে ওজনে প্রায় দেড়গুণ। ইরাকী ফিকাহ্‌বিদরা বলেন, আমাদের পরিমাপটি হযরত উমার (রা.) ব্যবহৃত সা’ এর মত, তা ৮(আট) রতল। তাঁরা আরও বলেন যে রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) আট রতল পানি দিয়ে গোসল করতেন ও দুই রতল পানি দিয়ে ওজু করতেন অথবা রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) এক সা’ পানি দিয়ে গোসল করতেন ও এক মুদ পানি দিয়ে ওজু করতেন। তাদের মতে এক সা’ সমান আট রতল এবং এক মুদ সমান দুই রতল(Fiqh Al-Zakah Vol-I page-184)।

ঈমাম মালিক, শাফেঈ, আহমদ ও অন্যান্য হিজাযবাসীরা মদীনার এক সা’ সমান পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ (৫-১/৩) রতল হিসাব করেন। হিজাযীদের দলিল হল মদীনায় প্রচলিত সা’ই পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ রতল এবং তা রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) এর সময় থেকেই বংশানুক্রমে চালু হয়ে এসেছে। আর সুন্নাহ অনুযায়ী মাদানী সা’ এর পাত্রের পরিমাপ অনুসরণ করতে হবে। ইবনে হাজম বলেন, এ সা’র বিষয়টি মদীনার ছোট-বড় সকলেরই জানা। এ ব্যাপারে সঠিক কথা জানার জন্য বাগদাদের আব্বাসীয় আমলে প্রধান বিচারপতি (Qadi al-Qudat) ঈমাম আবূ ইউসুফ মদীনায় গিয়েছিলেন এবং তিনি সেখানকার আনসার ও মুহাজিরদের অধ:স-ন ৫০ জন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গের সা’ পাত্রগুলি দেখেন। মদীনাবাসী ব্যক্তিবর্গ তাঁকে বলেন, এরূপ সা’ রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) সময় থেকেই বংশানুক্রমে প্রচলিত হয়ে এসেছে। আবূ ইউসুফ সেগুলো ওজনে পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ রতল বলে মনে করেন। ফকীহ মুজতাহিদ ঈমাম আবূ ইউসুফ বলেন ’আমি সা’ এর ব্যাপারে আবু হানিফার কথা ত্যাগ করলাম ও মদীনাবাসীদের কথা গ্রহণ করলাম’। ঈমাম মালিক ইবনে আনাসও বলেছেন, একই ধরণের সা’ রাসূল (সা.) ব্যবহার করেছেন। ঈমাম মালিক নিজেই খলীফা হারুন আল-রশীদের সম্মূখে এক সা’ শস্যদানা ওজন করে দেখিয়েছেন। হিজরী তৃতীয় শতকে ঈমাম আহমদ ইবনে হান্বল বলেছেন ‘আমি এক সা গম ওজন করেছি, তা পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ রতল পরিমাণের হয়’। আল-রয়ীস বলেন, ’সত্যি কথা এই যে, অকাট্য দলীল-প্রমাণ পাওয়ার পর এ পরিমাণটির ব্যাপারে আর কোন সন্দেহ থাকাই উচিত নয়’। আল-রয়ীস আরও বলেন, ঈমাম মালিকের চাইতে মদীনার সমাজ ব্যবস্থা সম্বন্ধে আর কে বেশী জানেন ? ঈমাম আবূ ইউসুফের সাক্ষ্যর চাইতে বড় সাক্ষ্য আর কার হতে পারে ?

মদীনার সমাজে প্রচলিত সা’, বাস-ব পরীক্ষণের মাধ্যমে এর ওজনের পরিমাপ নির্ণয় এবং মুজতাহিদ ফকীহদের সাক্ষ্য ও মতানুযায়ী এটা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে হিজাযী ফিকাহ্‌বিদদের মতটিই সহীহ, মদীনায় প্রচলিত এক সা’ সমান পাঁচ ও এক-তৃতীয়াংশ (৫-১/৩) রতল। যা বর্তমান কালের মেট্রিক পদ্ধতির ওজনে ২.১৭৬ কিলোগ্রাম গমের সমান।

নিসফে সা’ গম এর প্রচলন

’নিসফ’ আরবী শব্দ, এর অর্থ অর্ধেক। দুই মুদ বা অর্ধ সা’ পরিমাণকে ’নিস্‌ফে সা’ বলা হয়।

রাসূলুল্ল্লাহ্‌ (সা.) ফিতরার পরিমাণ এক সা’ খাদ্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। সাধারণ খাদ্য হিসাবে গমের ব্যবহার তখন কম ছিল। সাহাবাদের (রা) শাসন আমলে গমের আমদানী ও ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। গমের মূল্য বেশী ছিল বিধায় দুই মুদ বা অর্ধ সা’ পরিমাণ গম ফিতরাবাবদ প্রদান করার প্রচলন হয়। ”হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার(রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা রাসূলুল্লাহ্‌ (সা.) যুগে মাথাপিছু এক সা‘ পরিমাণ বার্লি অথবা খেজুর বা বার্লি জাতীয় শস্য, অথবা কিশমিশ সদ্‌কায়ে ফিতর প্রদান করত। রাবী (নাফে) বলেন: অত:পর হযরত উমার(রা.) এর সময় যখন গমের ফলন অধিক হতে থাকে, তখন তিনি আধা সা’ গমকে উল্লেখ্য বস’র এক সা’ এর সমপরিমাণ নির্ধারণ করেন। নাফে আরও বলেন আবদুল্লাহ ইবনে উমার(রা.) সদ্‌কায়ে ফিতর হিসাবে শুকনো খেজুর দিতেন। অত:পর কোন এক বছর মদীনায় শুকনো খেজুর দুষ্প্রাপ্য হওয়ায় তাঁরা সদ্‌কায়ে ফিতর হিসাবে বার্লি দেন”(আবূ দাঊদ)।

নিম্নের হাদিসটির বর্ণনা খুবই স্পষ্ট (বূখারী ও মুসলিম সহ অন্যান্য হাদিস গ্রনে’ এই হাদিসটির বর্ণনা আছে):-
”আবু সায়ীদ খুদ্‌রী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমাদের মধ্যে ছিলেন, তখন আমরা ছোট ও বড়, স্বাধীন ও ক্রীতদাস প্রত্যেকের পক্ষ হতে সাদাকাতুল ফিতর বাবদ এক সা’ পরিমাণ খাদ্য অথবা এক সা’ পনীর অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ কিশমিশ প্রদান করতাম। এভাবেই আমরা তা প্রদান করতে থাকি। পরে মুয়াবিয়া ইবনে আবূ সুফিয়ান (রা.) হজ্জ অথবা উমরার উদ্দেশ্যে যখন আমাদের নিকট আসলেন, তখন তিনি মিম্বরে আরোহণ করে উপসি’ত লোকদের সাথে এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করলেন। আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি বললেন, আমার মতে সিরিয়ার দু’ মুদ গম মদীনার এক সা’ খেজুরের সাথে বিণিময় হয়। লোকেরা তা গ্রহন করে নিলেন। আবু সায়ীদ খুদ্‌রী (রা) বলেন আমি তো যতদিন জীবিত থাকব ঐ ভাবেই সাদাকাতুল ফিতর আদায় করব, যে ভাবে আমি পূর্বে (এক সা’) আদায় করে আসছিলাম”(সহীহ মুসলিম)।
এই হাদিসে সিরিয়ার শাসনকর্তা খলিফা মুয়াবিয়ার(রা.) বক্তব্য খূবই স্পষ্ট। তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখানে পরিষ্কার বুঝা যায়-
(১) রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে যে সকল খাদ্য (যব, খেজুর, পনীর ও কিশমিশ ইত্যাদি) দিয়ে ফিতর প্রদান করা হত সেগুলোর মধ্যে গমের উল্লেখ স্পষ্টভাবে ছিল না এবং তিনি কখনও দুই মুদ বা অর্ধ সা’ গম দিতে বলেননি, তাই তার উল্লেখ এখানে নাই। যদি কখনও রাসুলুল্লাহ্‌(সা.) দুই মুদ বা অর্ধ সা’ গম দিতে বলে থাকতেন তবে নিশ্চয়ই এখানে তা উল্লেখ করতেন। কারণ উক্ত মজলিসে খলিফা মুয়াবিয়ার(রা.) সাথে তাঁর সমর্থক অনেক সাহাবী(রা.)ও উপসি’ত ছিলেন যারা রাসুলুল্লাহ্‌(সা.) এর সংস্পর্শ পেয়েছিলেন। উক্ত মজলিসে অনেক লোক উপসি’ত থাকা সত্বেও যদি কোন সাহাবী অথবা কোন তাবীঈন জানতেন যে মুয়াবিয়ার(রা.) সিদ্ধান- রাসুলুল্লাহ্‌(সা.) এর সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ তাহলে তিনি তা উল্লেখ করতেন। যাহোক ইজতিহাদের ভিত্তি ছিল এক সা’ খেজুরের তৎকালীন বিণিময় মূল্যের সমপরিমাণ গম (অর্ধ সা’) ফিতর বাবদ নির্ধারণ করা। ইজতিহাদ ও রায় শরীয়তসম্মত, কিন’ এর পক্ষে অকাট্য দলিল না থাকলে তা অগ্রহণীয়।

(২) মদীনার এক সা’ খেজুরের সহিত সিরিয়ার উন্নত মানের দুই মুদ গম বিণিময় হত, তাই সেই সময়কার বাজার দর অনুযায়ী খেজুরের বিণিময় মূল্যের সমতার শর্তে রাসুলুল্লাহ্‌ (সা.) নির্দেশিত এক সা’র পরিবর্তে দুই মুদ বা অর্ধ সা’ পরিমাণ গম সাদাকাতুল ফিতর বাবদ সিরিয়া অঞ্চলের জন্য নির্ধারণ করেন। এক সা’ খেজুরের বিকল্প হিসাবে দুই মুদ বা অর্ধ সা’ পরিমাণ গমের এই সিদ্ধান- নেয়ার পিছনে এক সা’ খেজুরের বিণিময় মূল্যের সমপরিমাণ গম প্রদান করা যথেষ্ট বলে বিবেচনা করেছিলেন, কারণ সেই সময়ে গমের মূল্য খেজুরের মূল্যের চেয়ে বেশী ছিল। জনসাধারণ এক সা’ গম দিলে বেশী মূল্যের কারণে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে তাই খেজুর ও গমের বাজার দর যাচাই করে নিসফে সা’ গম প্রদানের এই সিদ্ধান- নেন।

(৩) আঞ্চলিক খাদ্যের প্রতি স্পষ্টতই গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। কারণ সিরিয়া অঞ্চলের সাধারণ খাদ্য গম, জনসাধারণ যেন তাদের নিজেদের খাদ্য থেকে সাদাকাতুল ফিতর প্রদান করতে পারে, এই প্রয়োজনে তাদের ফিতরের খাদ্য হিসাবে গম নির্বাচন করেছেন। উপরোক্ত হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত আবু সায়ীদ খুদ্‌রী (রা) ফিতর বাবদ গম নির্বাচনের বিরোধিতা করেননি, তিনি বিরোধিতা করেছেন গমের পরিমাণের, দুই মুদ বা অর্ধ সা’ পরিমাণের বিরোধিতা করেছেন।

এক সা’ খেজুরের সাথে দুই মুদ গমের বিণিময়ের ঘটনা রাসুলুল্লাহ্‌ (সা.) এর পরে সংঘটিত হয়। ইবনে উমর(রা.) এই বর্ণনা থেকেও তা প্রমাণ করে- ”আবদুল্লাহ ইবনে উমর(রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ্‌(সা.) সাদাকাতুল ফিতর হিসাবে এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ যব আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। পরবর্তীকালে লোকেরা দু’মুদ গমকে তার সমপরিমাণ হিসাবে ধরে নিয়েছে” (বুখারী ও মুসলিম)  আবু সায়ীদ খুদ্‌রী (রা) আরও বলেছিলেন ’এটা মুয়াবিয়ার মূল্য নির্ধারণ- আমি গ্রহণও করি না, তদানুযায়ী আমলও করি না’(ফতহুল বারী, আল-মুস্তাদরাক) আবু সায়ীদ খুদ্‌রী (রা) ছাড়াও অনেক সাহাবায়ে কিরাম(রা.) মূল্যের হিসাবের বিরোধিতা করেছেন। হযরত আলীর (রা.) কথা থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়- ”হযরত আলী (রা.) যখন বসরাতে সব জিনিষের সস্থা মূল্য দেখতে পান, তিনি তখন তাদেরকে বললেন, আল্লাহ তোমাদেরকে স্বচ্ছলতা দিয়েছেন, তোমরা গম ও অন্যান্য খাদ্যের এক সা’ পরিমাণই দাও”(আবু দাঊদ) হযরত আলী (রা.) সহ অনেক সাহাবীগণ(রা.) গমের ক্ষেত্রেও এক সা’ প্রদানের জন্য জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতেন। হাসান বসরী, জাবির বিন জায়দ, মালিক, শাফেঈ, আহমদ বিন হান্বল এবং ইসহাকের মতে সাদাকাতুল ফিতর এক সা’ দিতে হবে, সেটা গম বা অন্য যাই কিছু হউক না কেন।

রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে যে সকল খাদ্য (যব, খেজুর, পনীর ও কিশমিশ ইত্যাদি) দিয়ে ফিতর প্রদান করা হত, বর্তমানকালে সেগুলোর মধ্যে মূল্যের পার্থক্য আছে। খেজুর, পনীর ও কিশমিশের মূল্য গম ও যবের চেয়ে অনেকগুণ বেশী। আমাদের দেশেও বিভিন্ন খাদ্যের মধ্যে মূল্যের পার্থক্য বিদ্যমান আছে, যেমন উন্নতমানের চালের মূল্য গমের মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশী। খাদ্যাভাসের কারণে কোন ব্যক্তি বা কোন সমাজে বা অঞ্চলে বা কোন দেশে যেসকল লোক সারা বছর বেশীদামের খাদ্য খেতে অভ্যস- ও আর্থিকভাবে সক্ষম, তারা সেই খাদ্য দিয়ে ফিতরা দিতে স্বাভাবিকভাবেই সক্ষম হবেন।

মূল্যের ব্যাপারটি পরিবর্তণশীল, মূল্য স্থায়ী থাকে না। হয়তবা সাময়িকভাবে কোন সময়ে বা কোন যুগে এর পরিবর্তণ নাও থাকতে পারে, কিন’ বাস-বে স্থায়ী হয় না। কোন দ্রব্যের বাজার মূল্য নির্ধারিত হয় প্রধানত: ঐ দ্রব্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও চাহিদার কারণে। এই কারণগুলির যে কোন একটির কম বা বেশী হলে অন্যটিকে প্রভাবিত করে, যার ফলে বাজার মূল্যও কমে বা বাড়ে। তাছাড়া সকল স্থানে, অঞ্চলে বা দেশে একই দ্রব্যের ভিন্ন ভিন্ন মূল্য হয়ে থাকে, অর্থাৎ কমবেশী হয়ে থাকে। তাই খেজুরের মূল্যের পার্থক্য শর্তে নির্ধারিত নিসফে সা’ গম প্রদানের বিধান ঐ সময়কার জন্য ঠিক ছিল মনে করা হলেও পরবর্তীকালে গমের মূল্য কমে যাওয়ার কারণে তা অকার্যকর হয়ে গেছে। উদাহরণ স্বরূপ ঢাকার বাজারে সাধারণ মানের এক কেজি খেজুরের মূল্য ১০০ টাকা, এ হিসাবে এক সা’ (২.৫০০ কেজি) খেজুরের মূল্য = ২৫০ টাকা। আর যদি এক কেজি গমের মূল্য ২৫ টাকা হয়, তাহলে এক সা’ খেজুরের মূল্যের বিণিময়ে ১০ কেজি গম পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে খেজুরের মূল্য গমের মূল্যের চেয়ে চারগুণ বেশী। মদীনার খেজুরের মূল্যের সাথে যদি গমের তুলনা করা হয়, তাহলে প্রথমে বলতে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নতমানের খেজুর উৎপন্ন হয় মদীনা অঞ্চলে। মদীনার এক কেজি ’আজওয়া’ খেজুরের বর্তমানকালের মূল্য কমপক্ষে ১০০০ টাকা, সে হিসাবে এক সা’ (২.৫০০ কেজি) খেজুরের মূল্য = ২৫০০ টাকা, যার বিণিময়ে ১০০ কেজি (এক কুইন্টাল) গম পাওয়া যাবে। বর্তমানকালে মদীনার খেজুরের মূল্য গমের মূল্যের চেয়ে চল্লিশগুণ বেশী, অথচ মুয়াবিয়া(রা.) এর সময়ে গমের মূল্য মদীনার খেজুরের মূল্যের চেয়ে বেশী ছিল। অতএব, বর্তমানকালে নিসফে সা’ গমের মূল্য এক সা’ খেজুরের মূল্যের বিকল্প নয়। কিশমিশ ও পনীরের মূল্য গমের চেয়ে অনেক বেশী। যবের ব্যবহার আমাদের দেশে নাই। এসব কারণে মুহাক্কিক আলেমগণ মনে করেন নিসফে সা’ গম প্রদানের প্রয়োজনীয়তা, যৌক্তিকতা ও কার্যকারিতা নাই। গমের ক্ষেত্রেও ফিতরার পরিমাণ হবে এক সা’।

যে সকল খাদ্যে ফিতরের যাকাত দিতে হবে

”আবু সায়ীদ খুদরী (রা) বলেন, ’আমরা সাদাকাতুল ফিতর হিসাবে এক সা’ খাদ্য(ta’aam, means food) অথবা এক সা’ যব অথবা এক সা’ খেজুর অথবা এক সা’ পনীর অথবা এক সা’ কিশমিশ দিতাম” হাদিসে উল্লেখিত ’খাদ্য’(ta’aam) বলতে অনেক আলেমের ধারণা আবু সায়ীদ খুদরী প্রথমে এক সা’ খাদ্যের উল্লেখ করেছেন পরবর্তিতে খাদ্যগুলির বর্ণনা দিয়েছেন, অনেকের মতে কেবলমাত্র গমকে বুঝানো হয়েছে, আবার অনেক আলেম মনে করেন দেশের বা সমাজের প্রধান খাদ্য বুঝানো হয়েছে যেমন গম, ভুট্টা, চাল, ময়দা, বাজরা, জোয়ার বা অন্য যে কোন খাদ্য যা ঐ অঞ্চলের বা দেশের প্রচলিত প্রধান খাদ্য। মতামত যাই হউক না কেন, ’খাদ্য‘ বলতে যেটিই বুঝানো হউক, তা সমাজের সাধারণ খাদ্যের অন-র্ভুক্ত বলে বিবেচিত। হাদিস গ্রন’সমূহে যেসকল খাদ্যের উল্লেখ পাওয়া যায় যেমন যব, খেজুর, পনীর ও কিশমিশ সেগুলি রাসুলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ে তৎকালীন মদীনার সমাজে প্রচলিত খাদ্য। সাহাবাদের(রা) শাসন আমলে গমের আমদানী ও ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।

ইসলাম সারা বিশ্বের সকল অঞ্চলে ছড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশের ও অঞ্চলের মানুষের খাদ্য ভিন্ন ভিন্ন। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের মানুষের মোট গড় খাদ্যের অর্ধেকের বেশী খাদ্যের উৎস দানাদার শস্য (Cereals) যেমন চাল, ভূট্টা, যবু(Barley), গম, ওট(Oat), বাজরা(Millet), জোয়ার(Sorghum) ইত্যাদি। আর বাকি অন্যান্য খাদ্য যেমন মূল ও কন্দ(Roots & Tubers) জাতীয় যেমন ইয়াম(Yam), কাসাবা(Kassava), আলু, মিষ্টিআলু, মূখী(Taro) ইত্যাদি, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, তৈল, চর্বি, চিনি, বাদাম, শাঁস(Kernel), ডাল ও শূঁটি(Beans), ফল-মূল, লতা-পাতা ও শাকসব্জি ইত্যাদি।

আলেমগণ সব ধরণের খাদ্য দিয়ে ফিতরা প্রদান যৌক্তিক মনে করেন না। শুকনো খাবার যেগুলো সংরক্ষণ করা সহজ, ফিতরার জন্য সেগুলোর প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। পঁচণশীল এবং যে সকল খাদ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়, এগুলো দিয়ে ফিতরা প্রদান সমর্থন করেন না।
দানাদার খাদ্য যেমন চাল, যব, গম, ভূট্টা, বাজরা, জোয়ার ইত্যাদির প্রচলন পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে আছে এবং এগুলোর যে কোন একটি বা একাধিক দানাদার খাদ্য কোন অঞ্চল বা দেশের সাধারণ খাদ্য হিসাবে বিবেচিত হয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যাকাতুল ফিতর এর পরিমাণ হলো এক ‘সা’ খাদ্য। খেজুর, কিশমিশ, বিভিন্ন দানাদার শস্য যেমন চাল, যব, গম, ভূট্টা, ময়দা, বাজরা, জোয়ার, পনির(পানি নিষ্কাষিত শুষ্ক দুধ যার মাখন বের করা হয়নি), গুড়া দুধ বা মাংস ইত্যাদি দিয়ে যাকাতুল ফিতর প্রদান করা যাবে।

ফিকাহবিদগণ মনে করেন দেশের সাধারণ খাদ্য দিয়ে যাকাতুল ফিতর প্রদান করা উচিত। অভ্যাসগত কিংবা শারীরিক সমস্যা বা হজমশক্তির কারণে কোন ব্যক্তি যদি ভিন্ন খাদ্য গ্রহণ করে তবে ঐ ব্যক্তির নিজের খাদ্য অথবা দেশের সাধারণ খাদ্য, এর যে কোন একটি দিয়ে যাকাতুল ফিতর প্রদান করা উচিত। আরেকটি মত হচ্ছে, যিনি যে মানের খাদ্যদ্রব্য বছরের বেশিরভাগ সময় আহার করেন, সে মানের খাদ্যদ্রব্যের ভিত্তিতেই যাকাতুল ফিতর প্রদান করা উচিত।
দানাদার খাদ্য খোসামূক্ত হতে হবে। বাতিল, ঘুণে ধরা ও দোষযুক্ত খাদ্য দেয়া যাবে না। ফিকাহবিদগণ আরও মনে করেন দেশের সাধারণ খাদ্য অথবা কোন ব্যক্তির নিজের খাদ্য চিহ্নিত করা গেলে, কেউ যদি কার্পণ্য ও অর্থলিপ্সার কারণে তার চেয়ে নিম্নমানের খাদ্যে যাকাতুল ফিতর গ্রদান করে, তাহলে তা জায়েয হবে না। তবে কেউ উচ্চমাণের খাদ্য প্রদান করলে তা জায়েয হবে।

উল্লেখ্য, দানাদার খাদ্যগুলোর মধ্যে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের প্রধান খাদ্য চাল। চাল একটি উৎকৃষ্ট খাদ্য, এবং মূল্যের দিক থেকেও অন্যান্য দানাদার খাদ্যের চেয়ে বেশী। চাল দিয়ে যাকাত, ফিতরা, ফিদিয়া, কাফ্‌ফারা, মান্নত, দান-খয়রাত ইত্যাদি প্রদান করা সম্পূর্ণরূপে জায়েয। সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমীরাত, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া সহ বিশ্বের অনেক দেশে চাল দিয়ে ফিতরা প্রদান করা হয়। সৌদি আরবে সুন্নাহ অনুযায়ী কেবলমাত্র খাদ্য দিয়ে ফিতরা প্রদান করা হয়, নগদ অর্থ প্রদান উৎসাহিত করা হয় না। ফিতরা প্রদানকারী ক্রেতাদের সুবিধার জন্য এক সা’ পরিমাণ নির্ধারিত ওজনের প্যাকেটকৃত চাল রমযানের শেষের দিকে সৌদি আরবের সর্বত্র সকল দোকানপাট এমনকি ফুটপাতেও বিক্রি হয়ে থাকে। পবিত্র কা’বা ও মসজিদে নববীর চারপাশেও প্যাকেটকৃত চাল বিক্রির একই দৃশ্য দেখা যায়। একই সময়ে সমগ্র সৌদি আরবে ’যাকাত আদায় ও বিতরণকারী’ সংস্থাগুলোর অস্থায়ী স্টলসমূহে ফিতরা প্রদানকারীদের কাছ থেকে চালের প্যাকেট সংগ্রহ করা হয় এবং যথাসময়ে ফিতরাগ্রহীতাদের নিকট হস্থান্তর করা হয়।

আমাদের দেশের প্রধান খাদ্য চাল দিয়েই ফিতরা প্রদান করা উচিত। আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি এবং মেহমানদারী, ফকির-মিস্‌কিন খাওয়ানো, দান-খয়রাত ইত্যাদি কাজে চালই ব্যবহার হয়ে থাকে। আমরা ভাত খেয়ে জীবন ধারণ করি এবং নামায-রোযাসহ সকল ইবাদতসমূহ পালন করে থাকি। ফিকাহবিদগণ মনে করেন সমাজের সাধারণ খাদ্য থেকে তাদের ফিতরা প্রদান করা উচিত কারণ সমাজের ধনী-গরীব সকল লোক একই খাদ্যে অভ্যস-, তাহলে যাকাতদাতার জন্য নিজের খাদ্য দিয়ে ফিতরা প্রদান করা সহজ হবে এবং ফিতরাগ্রহীতাও তার চাহিদামত খাদ্যটি পাবে। গরীব-মিসকিন মানুষের দ্বারে দ্বারে চাল ভিক্ষা চায় আর ক্ষুধার্ত হলে দু’মুঠো ভাত চায়। ঘরে ঘরে মুষ্টিচাল ভিক্ষা দেয়া আর ফকির-মিসকিনদেরকে ভাত খাওয়ানো আমাদের সমাজের অতি প্রাচীন ঐতিহ্য। যেহেতু যাকাতুল ফিতর প্রদান করার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য গরীব-মিসকিনদের জন্য ঈদের দিনে খাদ্যের ব্যবস্থা করা, যেন অভাবের লাঞ্ছনা নিয়ে তাদেরকে ঈদের দিনে ভিক্ষা করতে না হয়, সেহেতু কেবলমাত্র চাল দিয়েই তাদের এই চাহিদা পূরণ করে ভিক্ষা করা থেকে নিবৃত্ত করা

সম্ভব।যাকাতুল ফিতর কাদের উপর ওয়াজিব

ঈদুল ফিতরের দিন সূর্যোদয়ের পূর্বে যার নিকট যাকাত ফরয হওয়ার পরিমাণ অর্থ-সম্পদ থাকে তার উপর যাকাতুল ফিতর (ফিতরা) ওয়াজিব। পূর্ণ বৎসর নিসাব পরিমাণ মালের মালিক থাকার দরকার নাই। যাকাতের ক্ষেত্রে ঘরের আসবাবপত্র হিসাব হয় না। কিন’ ফিতরার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় আসবাবপত্র ব্যতিত অন্যান্য সৌখিন দ্রব্যাদি, অতিরিক্ত ঘর (খালি বা ভাড়ায় ব্যবহৃত) ইত্যাদি সম্পদ গণ্য হবে।

অধিকাংশ আলিমের মতে, কোনো ব্যক্তির নিকট ঈদের দিনে তার পরিবারের একদিন একরাত ভরণ-পোষণের খরচ ছাড়া অতিরিক্ত যাকাতুল ফিতর পরিমাণ অর্থাৎ এক সা‘ পরিমাণ খাদ্য থাকলেই যাকাতুল ফিতর প্রদান করতে হবে। যদি কারো নিকট এ পরিমাণ খাদ্য বা টাকা না থাকে তবে তাকে যাকাতুল ফিতর আদায় করতে হবে না। বিভিন্ন হাদীসের ভাষা থেকে বুঝা যায় যে, কারো নিকট একদিন ও একরাতের খাবার থাকলে তার জন্য ভিক্ষা করা বা হাত পাতা ঠিক নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি অমুখাপেক্ষী হওয়া সত্বেও ভিক্ষা করে সে জাহান্নামের দিকে বেশি অগ্রসর হল। সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলূল্লাহ! অমুখাপেক্ষীর মাপকাঠি কি? তিনি বললেন, একদিন একরাতের খাবার থাকা”। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস নম্বর : ১৬৩১, হাদীসটি সহীহ, শায়খ আলবানী)

নর-নারী, যুবা-বৃদ্ধ নির্বিশেষে প্রতিটি মুসলমানের জন্য যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব। ইবনে ওমরের (রা:) বর্ণনা দ্বারা এটা নিশ্চিত করা হয়েছে; “ আল্লাহর প্রেরিত রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঘোষনা করেছেন যে, স্বাধীন কিংবা দাস, যুবা কিংবা বৃদ্ধ, স্ত্রী কিংবা পুরুষ নির্বিশেষে সকল মুসলমানকে এক ‘সা’ পরিমাণ খেজুর বা যব (বার্লি) যাকাতুল ফিতর বাবদ অবশ্যই প্রদান করতে হবে ”(সহীহ বুখারী)  নিজের পক্ষে, স্ত্রী এবং তার উপর নির্ভরশীল সকলের পক্ষে, এমনকি তার উপর নির্ভরশীল পিতামাতার পক্ষে যাকাতুল ফিতর প্রদান করতে হবে। তবে কেউ নিজে ইচ্ছা না করলে এবং তাদের অনুমতি ছাড়া কোন ব্যক্তি তার ভৃত্যদের পক্ষে যাকাতুল ফিতর প্রদান করতে বাধ্য নন।

যাকাতুল ফিতর প্রদানের সময়

রোযাদার ব্যক্তির চিত্তের পরিশোধনের অন্যতম উপায় হিসাবে তার উপর যাকাতুল ফিতর ধার্য করা হয়। এজন্য শেষ রমযানের দিন সূর্যাসে-র পরই যাকাতুল ফিতর প্রদেয় হয়। যেহেতু শেষ রমযানের দিনের সূর্যাসে-র সাথে সাথেই রোযার অবসান ঘটে, সেহেতু যাকাতুল ফিতরও তখন প্রদেয় হয়। সুন্নাহ অনুযায়ী ঈদের নামাযের পূর্বেই যাকাতুল ফিতর প্রদান করা উচিত। এর ফলে গরীব-মিসকীনরা আনন্দচিত্তে অন্যান্য মুসলমান ভাইদের সাথে ঈদগাহে যেতে সক্ষম হয়।
ইবনে ওমর (রা:) এর ব্যাখ্যা থেকে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়। “আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আদেশ দিয়েছেন যে, মানুষ ঈদের জামায়াতে যাওয়ার আগেই যাকাতুল ফিতর প্রদান করা হউক”(সহীহ মুসলিম)।
হাদীসের ভিত্তিতে যাকাতুল ফিতর প্রদানের দু’টি সময় পাওয়া যায়। একটি উত্তম সময় অপরটি বৈধ সময়।
উত্তম সময় : শেষ রোযার সূর্যাসে-র পর থেকে ঈদের সালাতের পূর্ব পর্যন- সময়টি উত্তম সময়। কারণ, এটি ওয়াজিব করার অন্যতম লক্ষ্য হলো, দরিদ্রদেরকে অন্ন প্রদানের মাধ্যমে ঈদের খুশিতে ধনীদের সাথে তাদেরকে শরীক করা। এজন্য ফিতরা যদি ঈদের সালাতের আগে দেয়া না হয় তাহলে এর প্রধান লক্ষ্যই ব্যাহত হবে। আর এটিই রাসূলুল্লাহ (সা.) ও অধিকাংশ সাহাবীর আমল। আব্দুল্লাহ ইবন উমার রা. বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা.) যাকাতুল ফিতর (আদায়)-এর ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন লোকেরা ইদগাহে যাওয়ার পূর্বেই তা আদায় করা হয়”। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নম্বর : ২৩৩৫) অপর হাদীসে এসেছে, “যে ব্যক্তি তা (ঈদের) সালাতের আগে আদায় করবে, তার আদায়টি যাকাতুল ফিতর হিসেবে গৃহীত হবে। আর যে ব্যক্তি সালাতের পরে তা আদায় করবে, তার আদায়টি সাদাকাহ হিসেবে গৃহীত হবে”। (সুনান আবু দাউদ, হাদীস নম্বর : ১৬১১, হাদীসটি হাসান, শায়খ আলবানী)
বৈধ সময় : ঈদের দু-একদিন পূর্বে যাকাতুল ফিতর আদায় করা। কেউ এরূপ করলে তার যাকাতুল ফিতর আদায় হয়ে যাবে। তবে বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াও এরূপ করা ঠিক নয়। কারণ, পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ও অধিকাংশ সাহাবীদের আমল ছিল, শেষ রোযার সূর্যাসে-র পর থেকে ঈদের সালাতের আগে আদায় করা। ঈদের দু-একদিন আগে আদায় করা যে বৈধ সে ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের আমল রয়েছে। নাফি‘ ইবন আব্দুল্লাহ বলেন, “ইবন উমার রা. যাকাতুল ফিতর তাদেরকে দিতেন যারা তা গ্রহণ করতো। আর তারা তা ঈদের দিনের একদিন বা দুইদিন পূর্বে প্রদান করতো”। (সহীহ বুখারী, হাদীস নম্বর : ১৫১১)

যাকাতুল ফিতর কাদেরকে প্রদান করতে হবে

ফিতরা কেবলমাত্র মুসলিম ফকীর মিসকীনদেরকে প্রদান করতে হবে। হাদীসে রয়েছে ‘যাকাতুল ফিতর মিসকীনদের খাবার প্রদানের নিমিত্তে ফরয করেছেন’ (সুনান আবূ দাউদ, হাদীস নম্বর : ১৬১১, হাদীসটি হাসান, শায়খ আলবানী) রাসূলুল্লাহর বাণীটি এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, যাকাতুল ফিতর মিসকীন, ফকীর ও অভাবীদের হক। আল্লামা শাওকানী রহ. এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, “এতে দলীল রয়েছে যে, ফিতরা কেবল যাকাতের খাতসমূহের মধ্য থেকে মিসকীনদের মাঝে প্রদান করা হবে”। (যাকাতুল ফিতর, নাদা আবু আহমাদ, পৃষ্ঠা : ১৪)

যদি কোন মুসলমান ঈদের জামায়াতের আগে যাকাতুল ফিতর প্রদান করতে ভুলে যায়
ঈদের নামাযের পরে যাকাতুল ফিতর প্রদানের অনুমোদন নাই। যাকাতুল ফিতর প্রদানের প্রধান উদ্দেশ্য হল ঈদের দিনে গরিবদের প্রয়োজন মিটানো। কাজেই যাকাতুল ফিতর প্রদানে বিলম্ব ঘটলে এর উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। ইবনে আব্বাসের (রা:) বর্ণিত হাদিস থেকে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়, “রোযাদার ব্যক্তি রোযা রাখা কালে যে সব বাজে কথায় লিপ্ত হয়েছেন তাহা থেকে তাহার আত্মার শুদ্ধির জন্য আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যাকাতুল ফিতর প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন ”(আবু দাঊদ) জুমহুর আলিমের মতে, কোনো প্রকার ওযর ছাড়া ঈদের সালাতের আগে আদায় না করে দেরী করলে তাতে পাপ বা গুনাহ হবে। তবে তা প্রদানের বাধ্যবাধকতা থেকেই যাবে। বিলম্ব হলেও প্রদান করতে হবে।

যাকাতুল ফিতর এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তর

যাকাতুল ফিতর প্রদানকারীর নিজ দেশেই এটা বিতরণ করা উচিত। মহানবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাদিসে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “ এটা (যাকাতুল ফিতর) ধনিদের মধ্য থেকে নিতে হবে এবং গরিবদের মধ্যে বিতরণ করে দিতে হবে” অনেক দেশে এবং অনেক অঞ্চলে মুসলিম জনগোষ্ঠির মধ্যে যাকাতপ্রার্থীর সংখ্যা খূবই কম। আবার অনেক দেশে এবং অনেক অঞ্চলে মুসলিমদের মধ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠির সংখ্যা খূবই বেশী। ক্ষুধা ও বুভূক্ষাজনিত দুর্দশাগ্রস’ এ সব মুসলমান যাকাত পাওয়ার ব্যাপারে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। যেসকল দেশ ও অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যে যাকাতপ্রার্থীর সংখ্যা খূবই কম, তাদের উচিত তাদের উদ্বৃত্তের কথা বিবেচনা করে তাদের যাকাতুল ফিতর এসব দরিদ্র মুসলমানদের জন্য পাঠিয়ে দেয়া। অনেক জ্ঞানী আলেম মনে করেন প্রয়োজনের অগ্রাধিকার অথবা উদ্বৃত্তের কথা বিবেচনা করে যাকাতুল ফিতর প্রদানকারী ব্যক্তির দেশ থেকে অন্য কোন দেশে স্থানান্তর করা যেতে পারে।

বর্তমানকালে অনেক লোক তাদের কর্মস্থানের কারণে বিদেশে অবস্থান করেন। অনেকেই তাদের নিজ দেশের গরীব আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদেরকে তাদের ফিতরা প্রদানে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে যদি তিনি সুন্নাহ অনুযায়ী খাদ্য প্রদান করতে চান তবে তিনি নিজ দেশে তার নিযুক্ত কোন ব্যক্তির দ্বারা এক সা’ খাদ্য ক্রয় করে যাকাতপ্রার্থীকে প্রদান করতে পারেন। আর ফিতরা যদি নগদ অর্থে প্রদান করতে চান, তবে তিনি বর্তমানে যে দেশে অবস্থান করেন সে দেশের স্থানীয় বাজারে এক সা’ খাদ্যের মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ নিজ দেশের যাকাতপ্রার্থীর নিকট পাঠাতে পারেন। তবে নিজ দেশের খাদ্যের মূল্য প্রদান করতে পারবেন না, তিনি বর্তমানে যে দেশে অবস্থান করেন সে দেশের খাদ্যের মূল্য দিতে হবে।
যাকাতুল ফিতর এক দেশ থেকে অন্য কোন দেশে স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, ঈদের জামায়াতে যাওয়ার আগেই যাকাতুল ফিতর প্রাপকদের কাছে পৌঁছাতে হবে।

যাকাতুল ফিতর নগদে প্রদান

খাদ্যদ্রব্য ছাড়া উহার মূল্যবাবদ নগদ অর্থ প্রদান করার ব্যাপারে মত পার্থক্য আছে।
ঈমাম মালিক, শাফেঈ ও আহমাদ মূল্য প্রদান সমর্থন করেন নি। ঈমাম আহমদ বলেন- আমি ভয় করছি যে তাতে আদায় হবে না। তাছাড়া তা রাসূল(সা.)এর সুন্নাতের পরিপনি’ও।
ঈমাম সওরী, আবু হানীফা ও তাঁর সঙ্গীগণ মূল্য প্রদান করা জায়েয বলেছেন।
জ্ঞানী আলেমদের অনেকে মনে করেন যে, খাদ্য-দ্রব্যের গুণগত মানকে বিবেচনায় এনে (বর্তমান বাজার মূল্যে) নগদে যাকাতুল ফিতর প্রদান করা যায়। মানুষের জন্য যাকাত প্রদানের কাজটিকে সহজ করে তোলাই এর লক্ষ্য।
তবে এটা মনে রাখতে হবে যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের মানদন্ডে যাকাতুল ফিতর হিসাব বৈধ নয়। কারণ এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক বছর থেকে অন্য বছরে খাদ্য সামগ্রীর দামের ব্যাপক তারতম্য ঘটে।

নগদ অর্থে ফিতরা হিসাব

যাকাতুল ফিতর প্রদানের সময়, ফিতরা প্রদানকারী ব্যক্তি স্থানীয় বাজারে এক সা’ খাদ্যের মূল্যের সমপরিমাণ নগদ অর্থ হিসাব করবেন।

উদাহরণস্বরূপ :

সাধারণ মানের চাল প্রতি কেজি ৩০.০০ টাকা হলে, এক সা’ বা ২.৫০০ কেজি চালের মূল্যবাবদ জনপ্রতি ফিতরা = ৩০.০০ ঢ ২.৫০০ = ৭৫.০০ টাকা

মাজারী মানের চাল প্রতি কেজি ৪০.০০ টাকা হলে, এক সা’ বা ২.৫০০ কেজি চালের মূল্যবাবদ জনপ্রতি ফিতরা = ৪০.০০ ঢ ২.৫০০ = ১০০.০০ টাকা

উৎকৃষ্ট মানের চাল প্রতি কেজি ৬০.০০ টাকা হলে, এক সা’ বা ২.৫০০ কেজি চালের মূল্যবাবদ জনপ্রতি ফিতরা = ৬০.০০ ঢ ২.৫০০ = ১৫০.০০ টাকা

উপরের এই হিসাবগুলি কেবলমাত্র উদাহরণ, ফিতরা প্রদানকারী ব্যক্তি ফিতরা প্রদানের দিন তিনি যে মানের চাল বছরের বেশীরভাগ সময় গ্রহন করেন, স্থানীয় বাজারে সে মানের চালের মূল্য যাচাই করে এক সা’ বা ২.৫০০ কেজি চালের মূল্য জনপ্রতি ফিতরা নগদ অর্থে নির্ধারণ করবেন।

অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, ঈদের জামায়াতে যাওয়ার আগেই যাকাতুল ফিতর প্রাপকদের কাছে পৌঁছাতে হবে।


ইফতার মাহফিলে অংশ নিয়ে ইসলাম গ্রহণ

অফিসের পক্ষ থেকে প্রায় প্রতি দিনই বিভিন্ন স্থানে ইফতার মাহফিলে গিয়ে ইসলামী আলোচনা করতে হয়। তেমনিভাবে এ বৎসর রমযানে আমাদের অফিসের অদূরে একজন কুয়েতী সাপ্তায় তিন দিন ইফতারের পূর্বে আলোচনার ব্যবস্থা করেছেন। সেখানে আমরা বাংলা, উর্দু, তামিল ভাষায় দাঈগণ আলোচনা করতাম। সেখানে বিভিন্ন দেশের অমুসলিমগণও ইফতারে শরীক হতো। 
আলাপ চারিতায় জানাগেলো যে, সেখানে আট বৎসর যাবত একজন তামিল ভাষা-ভাষী দেওয়া নামী অমুসলিম ইফতার করে আসছে, একত্রে হাজার লোকের ইফতার করা, তার মনে দাগ কেটে যায়। সত্যিই ইসলাম সহমর্মিতার ধর্ম, যা মানুষকে সহানুভূতি শিক্ষা দেয়। এসব দেখে তামিল ভাষা-ভাষী লোকটি ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে মনস্থ করেছে, যখন এই কথা কুয়েতী কর্তৃপক্ষকে জানানো হলো, তাখন তারা এই নওমুসলেমের জন্য ছবি সংযোগ করে কেক বানালো, এবং তার সম্মানে বিশেষ অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করলো, সাংবাদিকগণকে খবর দেওয়া হলো ভিডিও এবং ছবি তোলা হলো। ইসলাম গ্রহণের পর নওমুসলিম দাউদ নাম পছন্দ করেছেন। 
এমন সম্মানের ফলে আরো অন্যান্য অমুসলিমদের হৃদয়ে ইসলামের প্রতি অনেকরে ভুল ধারণা দূর হলো। সম্মানিত ব্লগারগণ এই নওমুসলিম দাউদের জন্য আপনারা দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন তাকে ইসলামের প্র্রতি অটল রাখেন। 

রোজায় পেপটিক আলসারভীতি বিজ্ঞান ও ইসলামের দৃষ্টিতে সমাধান

মাহে রমযানের রোজা প্রত্যেক বালেগ মুসলমান নর-নারীর জন্য অবশ্যকর্তব্য। দুঃখের বিষয়, এ বরকতপূর্ণ ও কল্যাণময় রোজা বিপুল সংখ্যক জনগণ পেপটিক আলসারভীতির কারণে রাখেন না। আমি ডাক্তার হিসেবে এ বিষয়টি যখন বিজ্ঞান ও ইসলামের দৃষ্টিতে দেখি তখন দেখতে পাই যে, রোজা পেপটিক আলসার সৃষ্টি করে না। 

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন: হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (সূরা বাকারা: ১৮৩) 

রমযান শরীফের রোজা পাগল ও নাবালেগ ব্যতীত নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র, অন্ধ-বধির সকলের উপর ফরয। শরীয়তে বর্ণিত ওজর ব্যতীত রমযানের রোজা না রাখা কারো জন্য বৈধ নয়। এ আয়াতে কারীমা থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল মাহে রমযানের গুরুত্ব এবং ঠুকনো ওজর আপত্তিতে রোজা ছাড়া যাবে না। 

বাংলাদেশের কয়েকজন উচ্চপদস্থ গবেষক-ডাক্তার রোজার উপর গবেষণা চালান তার বিবরণ ও গবেষণার ফলাফল বর্ণনা করা হলো। পাকস্থলির এসিড -১৯৫৯ সালের রমযান মাসে ৭ জন রোজাদার ও ৫ জন বেরোজাদার ভলাণ্টিয়ারের পাকস্থলির এসিড (Hcl) পরীক্ষা করা হয় (Gastric Juica Analysis) । রোজার আগে ও পরে বেরোজাদার কণ্ট্রোলদের এসিড প্রায়ই অপরিবর্তিত থাকে, কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। রোজাদারদের সংখ্যা কম বলে দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ১৮ জন ভলাণ্টিয়ারের উপর পরীক্ষা চালানো হয়। উভয় পর্যায়ে মোট ২৫ জন রোজাদারের এসিড ১৭ জনের স্বাভাবিক (Isochlorhydria) , ৭ জনের বেশি (Hypochrlorhydric) এবং ১ জনের কম (Hypochlorhydria) ছিল। রোজার মাসে চতুর্থ সপ্তাহে এদের এসিড দাঁড়ায় ২০ জনের স্বাভাবিক আর ৫ জনের বেশি। ৭ জনের বেশি এসিড। রোজা শেষে ৭ জনের স্বাভাবিক হয়ে যায় ও ২ জনের বেশিই থাকে। তবে ১৭ জনের স্বাভাবিক এসিড রোজা শেষে ১৪ জনের এসিড স্বাভাবিক থাকে আর ৩ জনের এসিড বাড়ে। একজনের কম এসিড রোজা শেষে স্বাভাবিক হয়। সুতরাং রোজায় এসিড বৃদ্ধির তুলনায় হ্রাস পায় অনেক বেশি। 

পাকস্থলির এসিড ঃ কেউ কেউ মনে করেন যে, রোজায় পাকস্থলির এসিড (Gastric Hcl) বৃদ্ধি পায় এবং ফলে পাকস্থলির বা ক্ষুদ্র অন্ত্রের প্রথমাংশে(Doudenum) ঘা (Peptic Ulcer) হতে পারে। বর্তমান গবেষণায় একথা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তা ছাড়া এরূপ ধারণা শারীরবিদ্যারও বিপরীত। রোজায় পেপটিক আলসার হয় বলে কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণও নেই। 
এবার ডাক্তার ক্লীভ সাহেবের গবেষণার দিকে দৃষ্টি দেই। তিনি Peptic Ulcer নামক একটি গবেষণামূলক পুস্তকে যে বিবরণ দিয়েছেন তাতে বিশ্বের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় এ রোগ অনেক কম অথচ দক্ষিণ ভারত, জাপান, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ নাইজেরিয়ায় এ রোগ অত্যন্ত বেশি। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার স্থানীয় মুসলমান ও মালয়েশিয়ার মালয়ী মুসলমানদের তুলনায় ঐসব দেশের চীনাদের মধ্যে এ রোগ বেশ কয়েকগুণ বেশি। এ ছাড়া দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মান ও জাপানী বন্দী শিবরের অনাহারক্লিষ্ট যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে কারো Peptic Ulcer বা Ulcer ছিদ্র হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। ডাক্তার ক্লীভ জোর দিয়ে বলেন, Fasting does not produce organic disease’ (দেখুন Cleave T. L. (1962) Peptic Ulcer, John Wright & Sons ltd. Bristol. p-93.) 

পেপটিক আলসারে চিকিৎসা-বিজ্ঞানীদের কথা: 
পাকস্থলি এবং ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশ ডুয়োডেনাম-এর মিউকোসাতে ‘ঘা’কে পেপটিক আলসার বলে। এ ছাড়াও ওসোফেগাস (Oesophegus) জেজুনাম (Jejunum) এবং মেকেলস ডাইভারটিকুলাম (Meckels Divertocuium) এ ‘ঘা’ হতে দেখা যায়। ডুয়োডেনাম আলসার সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। ডুয়োডেনামের আলসার মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের বেশি হয়। যার অনুপাত ১ : ৪। বৃদ্ধ ব্যক্তিদের পাকস্থলিরও ডুয়োডেনাম আলসার উভয়ই হতে দেখা যায়। 

পেপটিক আলসারের কারণ: 
১. যখন এসিড ও পেপসিন (Acid snd pepsin) মিউকোসার প্রতিরোধের Mucosal defence মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় থাকে না তখন এ রোগের সৃষ্টি হয়। 
২. হেলিকোব্যাকটোর পাইলেরি (H. Pylori) এর রোগের জন্য দায়ী। 
৩. বংশগত যারা ব্লাড গ্রুপ ‘ও’ এন্টিজেন (Blood group ‘O’ antigen) ক্ষরণ গ্যাস্ট্রিক রসে ভরেন না। 
৪. ধূমপায়ী 
৫. ক্ষতিকর ওষুধ সেবন। বিশেষ করে এসপিরিন জাতীয় ওষুধ। 
৬. অন্যান্য কারণ। 

পেপটিক আলসারের লক্ষণসমূহ 
এ রোগে প্রায়ই হয়ে অজীর্ণ থাকে কিন্তু নাভীর উপরে (Epigastric region)- এ ব্যথাই এ রোগের প্রধান লক্ষণ। রোগী এক আঙুল দিয়েও ব্যথার এলাকা দেখাতে পারেন। এটা রোগ নির্ণয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডুয়োডেনাম আলসার রাতে বেশি হয়, অবশ্য দিনেও হয়ে থাকে। যখন রোগী ক্ষুর্ধাত হয় তখন ব্যথা ওঠে। বমি বমি ভাব অথবা বমি হয়। বমি হলে ব্যথা কমে যায়। অনেক সময় পাকস্থলি থেকে এসিড উঠে আসার ফলে জ্বালা-পোড়া অনুভূতি আসে। এটাকে হার্ডবার্ন (Heart burn) বলে। অরুচি এবং ওজন কমে যাওয়া গ্যাস্ট্রিক আলসারের লক্ষণ। 

পরীক্ষা-নিরীক্ষা 
১. এনডোসকপি ঃ (Endoscopy) এ পরীক্ষার সাহায্যে এ রোগ সহজেই নির্ণয় করা যায়। এ যন্ত্রের সাহায্যে বায়োপসি (Biopsy) নেওয়া যায়, যা রোগের কারণ নির্ণয় করতে সহায়ক হয়। 
২. বেরিয়াম মিল X-ray: এ X-ray-এর সাহায্যে পাকস্থলি ও ডুয়োডেনাম ঘা ধরা পড়ে। 

চিকিৎসা: 
এন্টাসিট (antacid) জাতীয় ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। এসিড কমানোর জন্য ওমিপ্রাজল (Omeprazol) এবং রেনিটিডিন (Ranitidin) বহুল ব্যবহৃত হয়। ক্ষত পূরণের জন্য সুক্রালফেট (Sucralfate) একটি ভাল ওষুধ। 
আমরা পূর্বেই পেটের ব্যথার কারণ হিসেবে ধূমপান লক্ষ্য করেছি। বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে জানা যায় যে, ধূমপান ক্ষত শুকাতে দেয় না এবং রোগ বার বার হওয়াকে ত্বরান্বিত করে। ধূমাপন এসিড ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয় এবং অগ্নাশয় (Pancreas)- এর বাইকার্বোনেট ক্ষরণ হতে বাধা দেয়, যার ফলে পেটে ঘা হয়। (Robbin and kumar. Barsic Pathology. 4th Edition. p- 517) 
বাংলাদেশের মানুষসহ পৃথিবীর সবদেশেই ধূমাপান করা যায়। সম্প্রতি দেখা গেছে, ধূমপানের ফলে বিভিন্ন রোগ হওয়ার জন্য উন্নত দেশে এটার হার কমে এসেছে অথচ অনাহারক্লিষ্ট অস্বাস্থ্যবান বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এ হার বেড়ে চলেছে। সুতরাং পেপটিক আলসার থেকে মুক্তি পেতে হলে ধূমপান অবশ্যই ছাড়তে হবে। 
পেপটিক আলসারের আর এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ক্ষতিকারত ওষুধ সেবন। এসপিরিন এবং এ জাতীয় ওষুধ যা মাথা ধরা, বাত রোগে সচরাচর ব্যবহৃত হয়। এসপিরিন, ফিনাইলবুটাজোন (Phenylbutazone), ইনডোমিথাসিন ((Indomefhacin), আইবুপ্রোফেন (Ibuprofen), পাইরোক্সিকাম (Piroxicam)। এছাড়াও স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ (Steroid) সেবনে পেটের আলসার বেশি হয়। রক্তক্ষরণ (Hemorrhage) কালো পায়খানা (Malaene) এবং শেষে নাড়ী ছিদ্র হয়ে (Perforation) যায়। 

পেটব্যথার রোগী ও রোজা ঃ 
যারা পেট ব্যথায় ভোগেন এবং রোজা রাখলে ব্যথা বৃদ্ধি হবে ভাবেন, তাদের জন্য ফয়সালা এই যে, তারা ধূমাপান বন্ধ করবেন। ক্ষতিকারক ওষুধ সেবন করবেন না। ডাক্তার সাহেবের পরামর্শ গ্রহণ করবেন। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলে দেবেন যে, আপনার পেটে ক্ষতিকারক আলসার (Active ulcer) আছে কি না। Endoscopy এর পরীক্ষার জন্য বেশ ভালো। যদি Active ulcer না থাকে তবে অতি সাধারণ ওষুধ খেলে ভালো হয়। তাদের রোজা রাখাতে কোন অসুবিধা নেই, যা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাতে প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং রোজার জন্য গ্যাস্ট্রিক বেড়ে যাবে- এ অহেতুক ভয়ভীতি মন তেকে বের করে দিয়ে রোজা রাখবেন। আর যাদের পেটে Active ulcer আছে তাদের রোজা রাখা না রাখার ব্যাপারে কুরআনিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছি। পবিত্র কুরআনে সূরা বাকারায় আল্লাহ পরিষ্কারভাবে বলছেন: যদি তোমাদের কেউ অসুস্থ হও বা ভ্রমণে থাকো তবে সে (রোজা না রেখে) পরে (সুস্থ হয়ে) সেই রোজাগুলির কাযা আদায় করবে। (সূরা বাকারা; ১৮৪) পরবর্তী আয়াতে আল্লাহপাক বলেন: – আল্লাহ তোমাদের কোনও কঠিন দায়িত্ব দিতে চান না বরং দায়িত্ব সহজ করে দিতে চান। (সূরা বাকার: ১৮৫) 

যাদের পেট Peptic Ulcer তাজা এবং খালি পেটে খুব ব্যথা হয় তাদের রোজা রাখা উচিত নয়, কারণ তারা অসুস্থ। তাদের ঘন ঘন Alkali/Antacid বা অন্যান্য ওষুধ খেতে হয়। ওষুধ না খেলেPeptic Ulcer Perforation হয়ে যেতে পারে এ অবস্থায় রোজা না রেখে এর কাযা পরে আদায় করে নেবেন। যদি রোগ দুরারোগ্য হয় তবে ফিদইয়া দেবেন। 
একজন দিনদার ডাক্তার যদি সার্টিফিকেট দেন যে আপনার পেটে মারাত্মক ‘ঘা’ (Active ulcer) আছে, তাহলে রোজা ছাড়া জায়েয হবে। যদি ডাক্তার কাফির (অমুসলিম) হন অথবা এমন মুসলমান হন যে, তিনি দ্বীন ইসলামের ঈমানের পরওয়া করেন না, তবে তার কথায় রোজা ছাড়া যাবে না। 

এতিমের সজ্ঞা 
এতিম শব্দের আভিধানিক অর্থ একক, অদ্বিতীয়, অতুলনীয়, অনুপম, বিস্ময়। মূলত অচেতন থেকে এতিমের উৎপত্তি হয়েছে। কেননা এতিম তার হক থেকে অচেতন থাকে। এতিম সম্পর্কে আরো বলা হয়; এতিম অর্থ মন্থর , দূর্বল। আর এতিম শব্দটি একক, দূর্বল, মন্থর, প্রয়োজন ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়। 
পরিভাষায় ভাষায় এতিম বলা হয়; বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বেই পিতার মৃত্যু হওয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন; স্বপ্নদোষ তথা বালেগ হয়ে গেলে আর কেউ এতিম থাকে না। বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে মাতার মৃত্যু হলে আরবদের পরিভাষায় তাকে লতীম বলে, আর মাতা-পিতা উভয় মৃত্যুবরণ করলে তাকে কাতী’ বলে। আর কন্যা সন্তানকে এতিম (এতীমাহ) বলা হবে যতদিন তার বিয়ে না হবে। বিয়ে হয়ে গেলে তাকে আর এতিম বলা যাবে না। 

ইসলামে এতিমের তত্ত্বাবধানের ফযীলত: 
ইসলাম এতিমের হক আদায়ের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছে। বিশেষ করে বয়সপূর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ১০টি হকের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে; 

১. এতিমের মাল অন্যদের জন্য স্পর্শ করা নিষিদ্ধ: 
আল্লাহ তা‘আলা বলেন; যারা অন্যায়ভাবে এতিমের ধন-সম্পত্তি গ্রাস করে, নিশ্চয় তারা স্বীয় উদরে অগ্নি ব্যতীত কিছুই ভক্ষণ করে না এবং সত্বরই তারা অগ্নি শিখায় উপনীত হবে। (সূরা নিসা: ১০) 

২. কঠোরতা বা জোরকরা নিষিদ্ধ: 
পাওনা আদায়ে অধিকার না থাকা সত্ত্বেও জোরপূর্বক নিজের আয়ত্বে আনাকে আরবী ভাষায় ক্বাহ্র বলা হয়। মহান আল্লাহ তা‘আলা এতিমের সাথে এই ক্বাহ্র বাক্যটি ব্যয় করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন; অতএব, তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না। (সূরা দুহা: ৯) 

৩. মর্যাদার অধিকার: 
করম বলা হয় কোন প্রকার বিনিময় ছাড়া কাউকে কিছু দেয়া। আল্লাহ তা‘আলা তা‘আলা বলেন; না কখনই নয়। তোমরা এতিমদেরকে করম তথা সম্মান করা না। (সূরা ফাজর: ১৭) 

৪. রূঢ়তা ও দুর্ব্যবহার নিষিদ্ধ: 
আল্লাহ তা‘আলা বলেন; সে তো ঐ ব্যক্তি, যে পিতৃহীনকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়। (সূরা মাউন: ২) 
৫. খাদ্যের অধিকার: 
আল্লাহ তা‘আলা বলেন; আহার্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত ও এতিম ও বন্দীকে আহার্য দান করে না। (সূরা দাহর: ৮) 

৬. আশ্রয়দানের অধিকার: 
আল্লাহ তা‘আলা বলেন; তিনি কি তোমাকে পিতৃহীন অবস্থায় পাননি, অতঃপর তোমাকে আশ্রয় দান করেন নি? ( সূরা জুহা: ৬) 

৭. বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তরাধিকার সংরক্ষণ: 
এই মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন; আর ঐ প্রাচীরটি- ওটা ছিল নগরবাসী দুই পিতৃহীন কিশোরের, এর তলদেশে আছে তাদের গুপ্তধন এবং পিতা ছিল সৎ-কর্মপরায়ণ। সুতরাং তোমার প্রতিপালক দয়াপরবশ হয়ে ইচ্ছা করলেন যে, তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হোক এবং তারা তাদের ধন ভা-ার উদ্ধার করুক। (সূরা কাহ্ফ: ৮২) 

৮. ইহসানের অধিকার: 
ইহসান অর্থ ভাল কাজ করাকে বুঝায়, যা ইন’আম তথা পুরস্কার অপেক্ষা ব্যাপক। আর ইহসান আদল তথা ইনসাফের উপরও অগ্রাধিকার রাখে। বলা হয় ইনসাফ হলো যে পরিমাণ গ্রহণ করা হয়, সে পরিমাণ ফিরেয়ে দেয়া। পক্ষান্তরে ইহসান হচ্ছে বেশি দিয়ে কম গ্রহণ করা। তাই বলা হয় ইনসাফ করা ওয়াজিব। আর ইহসান নফল হলেও এতে সাওয়াব রয়েছে বেশি। 

৯. ইনসাফের অধিকার: 
এই মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন; এবং পিতৃহীনদের প্রতি সুবিচার প্রতিষ্ঠা কর। (সূরা নিসা: ১২৭) 

১০. ফাই’র অধিকার: 
ফাই শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা। ফুক্বাহাদের নিকট ফাই হলো কাফেরদের যে মাল যুদ্ধ ছাড়া হস্তগত হয়। যেমন খেরাজ, জেযিয়া। এই মালে সকল মুসলমানের অধিকার থাকে। আর এর থেকে এক পঞ্চমাংশ বের করা হয়। আর যে মাল যুদ্ধের পরে অর্জিত হয় তাকে মালে গনীমত বলে। আবার কেউ কেউ ইমামের (খলীফার) ভাগকে মালে ফাই বলেছেন। মোট কথা হলো মুসলমানদের ঘর হতে সংগৃহীত মালই মালে ফাই। এই মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন; আল্লাহ এই জনপদবাসীদের নিকট হতে তাঁর রাসূল (সাঃ)-কে যা কিছু দিয়েছেন, তা আল্লাহ তা‘আলার, তাঁর রাসূল (সাঃ)’র এবং রাসূলের স্বজনগণের এবং এতিমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের, (সূরা হাশর: ৭) 
তাছাড়া পবিত্র কুরআনে এতিম নিয়ে ২২ স্থানে আলোচনা করা হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে ইসলামে এতিমের সাথে সৎ ব্যবহার উত্তম প্রশিক্ষণসহ যাবতীয় দিকে খেয়াল রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। যাতে এতিম শিশুটি বড় হয়ে সমাজের একজন কর্ণধার হতে পারে। এতিমের সাথে কোন প্রকারের রূঢ় আচরণ করা যাবে না। 
আসুন এবার এতিমের ব্যাপারে যে নবী এতিম হয়েই জন্ম নিলেন, তিনি তাদের সম্পর্কে কি বলেন; 
১. নিশ্চয় রাসূল (সাঃ) এতিমদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। তিনি বলেন; আমি এবং এতিমের জিম্মাদার বা অভিভাবক জান্নাতে এভাবে থাকবো। তখন তিনি তর্জনী এবং মধ্যমা আঙ্গুল সামান্য ফাঁক করে দেখান। 
২. রাসূল (সাঃ) এতিমের মাল ব্যবসার মাধ্যমে বৃদ্ধি করণে উৎসাহ দিয়েছেন; তিনি বলেন; সাবধান! যদি এতিমের সম্পদ হস্তগত হয় তাহলে ঐ সম্পদ ব্যবসার মাধ্যমে বৃদ্ধি করবে। এমন যেন না হয় যে যাকাত দিতে দিতে তার সম্পত্তি শেষ হয়ে যায়। এই মর্মে হযরত উমার (রাঃ) থেকেও একটি উদ্ধৃতি বর্ণিত রয়েছে; তিনি বলেন: তোমরা এতিমের মাল ব্যবসার মাধ্যমে বৃদ্ধি করবে, যেন যাকাত তার সম্পদ নিঃশেষ করতে না পারে। 

একদা জনৈক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)’র নিকট অভিযোগ করলো হে আল্লাহর রাসূল! আমার হৃদয় অত্যন্ত পাষাণ হয়ে গেছে। তখন রাসূল (সা.) বললেন; এতিমের মাথায় হাত রাখ, মিসকীনদের আহার করাও। এতে অনেক পূণ্য রয়েছে। প্রতিটি চুলের বিনিময় নেকী দেয়া হবে। আবু উমামাহতে বর্ণিত; রাসূল (সাঃ) বলেন; যে ব্যক্তি এতিমের মাথায় হাত রাখবে আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টের উদ্দেশ্যে, তার বিনিময় আল্লাহ তা‘আলা প্রতিটি চুলের বদলায় নেকী দান করবেন।

রাসূলের এসব বর্ণনার কারণে দেখা যায় সাহাবাগণ, তাবেঈন, তাবে’ তাবেঈনগণ তাঁরা প্রত্যেকে প্রতিযোগিতা করতেন, এতিম লালন পালন করার জন্য। 
তা ছাড়া আমি আরব রাষ্ট্রগুলো প্রত্যক্ষ করেছি যে এসব দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে এতিমদের লালন পালনের ব্যবস্থা রয়েছে, এতে দেশের ধনী লোকেরাও অংশগ্রহণ করছে। 
ইসলাম কেন এতিমের প্রতি এতো গুরুত্বারোপ করলো? 

১. মানুষ উৎকৃষ্ট সৃষ্টিজীব, এবং তার অবস্থান ইসলামে আশরাফুল মাখলুকাত দেওয়া হয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ইনসানের মর্যাদার জন্য ফেরেশ্তাকুলকে সেজদাহ করার নির্দেশ দিয়ে ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন; স্মরণ কর, যখন তোমার প্রতিপালক ফেরেশতাদেরকে বলে ছিলেন: আমি মানুষ সৃষ্টি করছি কর্দম হতে। যখন আমি ওকে সুষম করবো এবং ওতে আমার রূহ সঞ্চার করবো, তখন তোমরা ওর প্রতি সিজদাবনত হয়ো। তখন ফেরেশতারা সবাই সিজদাহবনত হলো- শুধু ইবলীস ব্যতীত, সে অহংকার করলো এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হলো। (সূরা সোয়াদ: ৭১-৭৪) 

আর এতিমও একজন মানুষ, সুতরাং তাকেও মর্যাদা ও সম্মান দেয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। 
২. ইসলামী সমাজ এমন একটি সমাজ যে সমাজে পরস্পর সহানুভূতিশীল ও বন্ধুভাবাপন্ন সম্প্রীতি বর্তমান থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন; মুহাম্মদ আল্লাহ তা‘আলার রাসূল; তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; (সূরা ফাত্হ: ২৯) 
আল্লাহ তা‘আলার রাসূল মুমিনদের গুণ বর্ণনা করেন এভাবে যে, সমস্ত মুমিনগণ একটি শরীরের মত। রাসূল (সাঃ) বলেন; মুমিনগণ পরস্পর দয়া ও পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং ভালবাসার দিক হতে একটি শরীরের মত। যদি শরীরের কোন অঙ্গে আঘাত লাগে সমস্ত শরীর ব্যথায় কাতরায়। এই হাদীস স্পষ্ট প্রমাণ করে যে এতিমদেরকে দয়া মায়া মমতা ভালবাসা দিয়ে তাদেরকে আপন করে নিতে হবে। 

৩. অবশ্য উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার (জান্নাত) ব্যতীত আর কি হতে পারে? 
এই মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন; উত্তম কাজের জন্য প্রতিদান উত্তম পুরস্কার হবে। (সূরা আর রাহমান: ৬০) অর্থাৎ যে ব্যক্তি কারো সাথে উত্তম আচরণ করলে এর প্রতিদান আল্লাহ তা‘আলা উত্তম দিয়ে দিবেন। 
সুতরাং এতিমের লালন পালন করা যেন নিজের সন্তানের লালন পালন করার মত। কেননা আল্লাহ তা‘আলা না করুন নিজের সন্তান এতিম হলে তখন অন্যরা এই এতিম সন্তানটি লালন পালন করবে। পক্ষান্তরে নিজে অন্য সন্তানের খুঁজ না নিলে, কেউ নিজের সন্তানের খুঁজ-খবর নিবে না, এটাই রীতি। প্রবাদ রয়েছে; যেমন কর্ম তেমন ফল। 
ইসলামী সমাজ পরস্পর সহযোগিতার শিক্ষা দেয়। 
ইসলাম উৎসাহ প্রদান করেছে, একে অন্যের সুখে-দুঃখে শামিল হওয়ার জন্য। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন রাসূল (সাঃ)’কে কেউ জিজ্ঞাস করলো যে, উত্তম আমল কোনটি? রাসূল (সাঃ) বললেন; তোমার মুসলিম ভাইয়ের আনন্দে শরীক হও, তার ঋণ পরিশোধ কর, তাকে খানা খাওয়াও। রাসূল (সাঃ) আরো বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে আসবে, আল্লাহ তা‘আলা ও তার প্রয়োজনের সময় এগিয়ে আসবেন। রাসূল (সাঃ) আরো বলেন; আল্লাহ তা‘আলার নিকট ঐ ব্যক্তি প্রিয়, যে মানুষের উপকার করে। উপরোক্ত হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা গেল যে, এতিমের লালন-পালন এটি একটি মহত কাজ

প্রথম পাঁচ দিনে ১৯৫ ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণ, গতকাল পর্যন্ত মোট ৪০৭ ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছে

বৃহস্পতিবার, ১১ আগস্ট ২০১১ 
মানবজমিন ডেস্ক: কুয়েতে এবার রমজানের শুরুর প্রথম পাঁচ দিনে ১৯৫ ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কমিটি টু প্রমোট ইসলামের প্রধান জামাল আল শাত্তি কুয়েতের আল ওয়াতান পত্রিকাকে বলেছেন, পবিত্র রমজান মাসের প্রথম পাঁচ দিনে ১৯৫ জন বিদেশী ইসলাম কবুল করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমরা মনে করি রমজান মাসের শেষ নাগাদ আরও অনেক বিদেশী ইসলাম গ্রহণ করার ঘোষণা দেবেন। 

আমি এই প্রতিষ্ঠানের বাংলা বিভাগের একজন দাঈ। গতকাল পর্যন্ত মোট ৪০৭ জন বিদেশী অমুসলিম ইসলাম কবুলের ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা আশা করি রমযান শেষ পর্যন্ত হাজার বিদেশী অমুসলিমের ইসলাম কবুলের ঘোষণা ছাড়িয়ে যাবে, ইনশা আল্লাহ। আপনার এই নওমুসলিমদের জন্য দোয়া করবেন, যেন তারা ইসলামের উপর অটল থাকতে পারে।

এ বৎসর রমযানে আমাদের লক্ষ্য ১১০০ জন অমুসলিমকে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণের চেষ্টা করা

কুয়েতে ১৯৭৮ ইং সাল থেকে ইসলাম প্রেজেন্টেশন কমিটি (আই পি সি) ইসলাম প্রচারের কাজ অব্যাহতভাবে চালিয়ে আসছে। এ যাবত ৩৩ বছরে কুয়েতে বিভিন্ন দেশের ৫৩০০০ (তিপ্পান্ন হাজার) অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করে। গত বছর শুধু রমযান মাসে ৮৮১ জন ইসলাম গ্রহণ করেছে।
প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মুহতারম জামাল শাত্তী (কুয়েতী) ঘোষণা করেন এ বৎসর রমযানে আমাদের লক্ষ্য ১১০০ জন অমুসলিমকে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণের চেষ্টা করা। সেই লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ভাষা-ভাষি দাঈগণ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। রমযানের ছয় দিনে মোট ২২১ জন অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে বারোজন বিভিন্ন ভাষা-ভাষি মহিলা ইসলাম গ্রহণ করেন। প্রকাশ থাকে যে, কুয়েতে এই প্রতিষ্ঠানের ১৫টি শাখা রয়েছে। বিভিন্ন ভাষা-ভাষি ৮০ জন পুরুষ ও মহিলা দাঈ রয়েছেন; তন্মধ্যে আমরা বাংলাদেশী আছি ৮ জন।
আসুন আমরা এই নওমুসলিমদের জন্য দোয়া করি আল্লাহ যেন তাদেরকে ইসলামের উপর অটল রাখেন। আমীন