দুনিয়া সুন্দর আসমান সুন্দর

ফুল সুন্দর দুনিয়া সুন্দর, আসমান সুন্দর জমিন সুন্দর,
সুন্দরে সুন্দরে পাল্লা, জানি না কত সুন্দর তুমি আল্লাহ !

httpv://youtu.be/Ou8cVop3OV4

যেভাবে বাংলা ভাষার উৎপত্তি

আরবী বারো মাসের মধ্যে রবিউল আউয়াল মাসটি মুসলমানগণ বিশেষভাবে আলোচনা করে থাকেন। কারণ এ মাসেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম ও মৃত্যু সংগঠিত হয়েছে। পৃথিবীর আদি থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত অগণন মানুষ বিগত হয়েছে, তাদের মধ্যে বহুলাংশ অতি সাধারণ হলেও কিছু সংখ্যক ছিলেন অনন্য। আমরা চেষ্টা করি সেই অনন্যদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে। একথা সর্বজন বিদিত যে, সেসব মহামানবদের জীবনেও সকল কিছুর সমাবেশ ঘটা প্রায় অসম্ভব ছিল এবং বাস্তবেও তাই দেখতে পাই আমরা; কেবলমাত্র আল্লাহর নির্বাচিত নবীগণ ব্যতীত। নবীগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হলেন, নবী মুহাম্মাদ সাল্ল­াল্ল­াহু আলাইহি ওয়াসাল্ল­াম। এ মহামানবের জীবনকে কেউ অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারলে তার জন্য আর কারো কাছে জীবনের জন্য কোন বিধি পদ্ধতি পেতে হাত পাতার প্রয়োজন হবে না। তাই আসুন এই মাসসহ সারা বছরই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ অনুসরণ করাসহ সারা বিশ্বে তাঁর আদর্শ প্রচার করি।
মুসলিম আমলের পূর্বে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কোন নযীর পাওয়া যায় না। অবশ্য বৌদ্ধ যাজকরা বাংলার মৌলিক ও কথ্য ভাষায় বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করতো ও ধর্ম গ্রন্থ রচনা করেছিলো। খ্রিস্টীয় সপ্তম ও দশম শতাব্দীতে ব্রাহ্মণ্যবাদের সঙ্গে সংঘর্ষে সেই বৌদ্ধ-সাহিত্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। সাধারণ লোকের মুখের ভাষাকে ব্রাহ্মণেরা ইতর বা নীচুদের ভাষা বলতো। মুসলিম সম্পর্কের ফলেও ইসলামের তাওহীদ ও সাম্যনীতির সংস্পর্শে বৌদ্ধ দোঁহার এই বাংলা ভাষা ও তুর্কী মুসলিমের সংযোগে এক নতুন ভাষার উৎপত্তি হলো, যা বাংলা ভাষার প্রথম স্পষ্ট ও ঐতিহাসিক সাহিত্যিক রূপ। এই ভাষা হিন্দু-মুসলমানের ভেতর সমানে প্রচলিত ছিল। দলিল-পত্রাদিতে এর স্পষ্ট নযীর রয়েছে। গৌড়ের সিংহাসন নিয়ে মুজাফফর শাহ ও শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এই সুযোগে হাবশী দাসগণ বিদ্রোহ করে। তখন বাংলার হিন্দু-মুসলমান এক হয়ে বিচক্ষণ ও মানব প্রেমের চরিত্রবান হোসেন শাহকে (১৪৯৩-১৫১৯) গৌড়ের আধিপতি নির্বাচিত করলো। তিনি মগদেরকে পরাস্ত করেন ও তাঁর আমলেই কামরূপ গৌড়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা তাঁর করতলগত ছিল।
হোসেন শাহের হৃদয় ছিল উদার, সরল ও একাত্মবোধদীপ্ত। তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নব যুগের প্রবর্তন করলেন। তাঁর পূর্বে সংস্কৃতি শাস্ত্রগ্রন্থ বাংলায় তরজমা হয়নি। তাঁর সভাতেই বাংলা কাব্যের গোড়াপত্তন হলো। তিনি প্রথম বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের প্রবর্তন করলেন। ফারসী ভাষার পারদর্শী হিন্দু-মুসলমান মিলিতভাবে সাহিত্য সৃষ্টি করে চললেন। এইভাবে এক মহানুভব মুসলমান শাসনকর্তার মহানুভবতায় ও ইসলামের তাওহীদে, সামাজিক সাম্য ও মানবিক ঐক্যের প্রত্যক্ষ প্রভাবে ঐতিহাসিক বাংলা ভাষার জন্ম হলো। উত্তর ভারতের মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ দান যেমন উর্দু ভাষা, তেমনি বাংলাদেশে মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ দান হলো বাংলা ভাষা। এইভাবে বাংলা ভাষার প্রতিষ্ঠা ও পূর্ণবিকাশে মুসলমানগণ প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ করলেন। শাহ মুহাম্মাদ সগীর ও আলাওল বাঙালী সাহিত্যের দুই উজ্জ্বল নক্ষত্র। হোসেন শাহের জীবন বাংলা সাহিত্যের স্ফুরণ অমর হয়ে রয়েছে। অবশ্য এই আমলের পূর্বেও মুসলমানদের লেখা বাংলা পুস্তক পাওয়া যায়। চতুর্দশ শতাব্দীতে মুসলমানের হাতে যে বিরাট পুঁথিসাহিত্য গড়ে উঠলো, তা বহুলাংশে আত্মরক্ষামূলক। বৈষ্ণবাবাদের প্রভাবে ইসলামী সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টা তার মধ্যে স্বতস্ফূর্ত।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিবর্তন এবং পলাশীর যুদ্ধ কেবল বাঙালী মুসলমানের রাজনৈতিক পতন আনেনি, তাদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরাজয়ও এরই সঙ্গে এসে পড়লো। মুসলমানদের এ পরাজয়, হিন্দুরা সাদরে বরণ করে নিয়েছে ও সন্তুষ্টচিত্তে বৃটিশের শাসন মেনে নিয়েছে। নিজেদের সুযোগ-সুবিধা তারা খুঁজে পেলো বৃটিশের শাসনে। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর অনুসৃত নীতির ফলে চাকরীর ক্ষেত্রে তাদের একচ্ছত্র অধিকার কায়েম হয়ে গেল। এইভাবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মুসলমানের অস্তিত্ব মুছে গেল। রাষ্ট্রীয় ভাষা ফরাসী ও মুসলিম আইনের স্থানে ইংরেজি ভাষা হওয়ায় মুসলমানগণ লজ্জায়, ক্ষোভে, দুঃখে সরে দাঁড়ালেন। পলাশী পরবর্তী যুগের মুসলিম অসহযোগের সুযোগ হিন্দুরা খুব ভালভাবেই গ্রহণ করলো, আর মুসলিমেরা ডুবে গেল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক  নৈরাশ্যের অন্ধকারে।
অতঃপর বাংলা ভাষার বিকাশও মুসলমানদের হাত থেকে সরে গেল। এর স্থান দখল করলো হিন্দুঘেষা খ্রিস্টান মিশনারী ও হিন্দু সাহিত্যিকগণ। ১৮০০ সালে শ্রীরামপুরে মিশনারী কেরী মার্শম্যান ওয়ার্ড খ্রিস্টান ধর্ম প্রচারের তাগিদে যে বাংলা ভাষা প্রবর্তন করলো, তাতে হিন্দুদের প্রভাব সুস্পষ্ট। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একচ্ছত্র হিন্দুযুগ শুরু হলো। এলো হেমচন্দ্র, মধুসূদন, নবীনচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রের যুগ। হিন্দুত্ব ও বাঙালিত্ব এক জিনিস হয়ে দাঁড়ালো। হিন্দু বাংলা সাহিত্যকে বাংলা সাহিত্য বলে চালানো হলো বহুদিন। ফলে আদি থেকে বাংলা সাহিত্যের যে একটা মুসলিম ধারা ছিল, তা বিস্মৃতির তলে তলিয়ে গেল। বাঙালীর জীবন বলতে হিন্দু বাঙালীর জীবনই বোঝাতে হতো। বাংলাদেশের মুসলমানও যে ভাষার দিক থেকে বাঙালী, একথা সবাই এক রকম ভুলেই গেল। মুসলমান কথাটি বাঙালী হিন্দুর কাছে অবাঙালী বলে ঠেকাতো। কলকাতায় এক হিন্দু ভদ্রলোক এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি মুসলমান না বাঙালী? লোকটি জওয়াবে বলেছিলেন, আমি বাঙালী মুসলমান।
আজ এই বাংলা ভাষা, শুধু বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গে ও কলকাতায় সীমিত নয়, বাংলা সাহিত্য ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। ব্যবহৃত হচ্ছে সর্বত্র। বাংলা ভাষা জাতীয় মর্যাদা লাভ করেছে। ইসলাম আজ আরবী ভাষা, উর্দু ভাষা ও ফারসী ভাষা থেকে রূপান্তর হয়ে বাংলা ভাষায় প্রচার হচ্ছে। আসুন আমারা আল্লাহ প্রদত্ত দান এই মাতৃভাষাকে, মর্যাদা দিয়ে সর্বত্র ব্যবহারের চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন…