হোয়াট ইজ নামাজ?

 পাঁচ বৎসরের শিশু তুহিন। দুরন্তপনায় তার জুড়ি মেলা ভার। আমার এক প্রতিবেশী বাংলাদেশী পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। পরিবারের একমাত্র পুত্র সন্তান। পর পর চারটা কন্যা সন্তানের পর জন্ম নেওয়া এই তুহিন বাবা মা’র নয়নের মণি যেন। সংসারে তার দাপট একচেটিয়া। বড় চারটি বোন, মা এবং বাবা এমন কেউ নেই যার উপরে তুহিনের জোর চলেনা!
 আমার সাথে ছোট তুহিনের দারুণ সম্পর্ক। আমাকে সে অনেক সময় ‘ফানি আঙ্কেল’ বলে ডাকে, এর কারণ মাঝে মধ্যেই ওদের বাসায় ওর বাবার সাথে দু’চারটা গল্প করতে বা কোন কাজে গেলেই তার বায়না অনুযায়ী তাকে দু’একটা মজার মজার গল্প শোনােেত হবে। সেই গল্পগুলো নাকি তার কাছে খুবই ‘ফানি’ মনে হয়। আর তাই তার বায়নাও বেড়ে চলে, আরও বেশি বেশি করে গল্প শোনাতে হবে। ওর বায়না না মিটিয়ে উঠে আসাটা রীতিমত সাধনার ব্যাপারই বলতে হবে।
বাংলাদেশের গল্প শোনাতে চাইলে সে তা শুনতে নারাজ। কারণ, তুহিনের ভাষায় ‘ব্যাংলাডেশ’ হলো ‘পুওর’ ‘মাডি এণ্ড ডাষ্টি’! ওরকম একটা দেশের গল্প সে মোটেও শুনতে প্রস্তুত নয়! তুহিন ভেবেই পায়না তার নানা-নানী, দাদা-দাদি, আঙ্কেল-আণ্টি এরা কি করে সেই দেশে থাকে?
 সে আরও অবাক হয় একথা শুনে যে, তার ড্যাডি-মাম্মী, তার বড় বোনগুলোও সেই ‘পুওর’ ‘মাডি এণ্ড ডাষ্টি’ দেশেই জন্মেছে, সেখানেই বেড়ে উঠেছে। তুহিন অবাক হয়ে তার বাবা, মা, বড় বোনদের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখে সে কথা শুনে।
 সে নিজেও যে ঐ বাংলাদেশেই জন্মেছে, সেকথা তাকে বিশ্বাস করানো কষ্টকর। সে যে মাত্র আট মাসের শিশু অবস্থায় সেই ‘মাডি এণ্ড ডাষ্টি ব্যাংলাডেশ’টা ছেড়ে এসেছে, সে কথা বললে তুহিন ক্ষেপে যায়। ভাবে, তাকে ‘ইনসাল্ট’ করার জন্যই আমরা এরকম একটা আজগুবী কথা বলছি!
বার বার সে কথা স্মরণ করিয়ে দিলে নিশ্চিত হতে সে তার মার কাছে ছুটে যায়, প্রকৃত ব্যাপারাটি কী তা জানার জন্য। মা’ও যখন তাকে এ কথাটাই জানান, তখন তুহিন চুপ করে যায়, কোন কথা বলে না। কী জানি ঐ কচি মন কী ভাবে? তবে সে বিস্ময়ে অবাকই যে হয়, সে বিষয়টা নিশ্চিত। মনে মনে হয়ত ঐ শিশু ‘পুওর, মাডি এন্ড ডাষ্টি ব্যাংলাডেশ’এ জন্ম নিতে হয়েছে বলে হীনমন্যতায় আক্রান্ত হয়! নিজেকে মনে মনে ধিক্কার দেয়! 
 নিষ্পাপ ছোট্ট শিশু তুহিনেরই-বা দোষ দেব কী? তাঁর বাবারই এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু যিনি তুহিনদের বাড়ির অদূরেই স্বপরিবারে বসবাস করছেন, তাঁকে আক্ষেপ করে বলতে শুনেছি, কেন যে তাঁর জন্মটা বাংলাদেশে হয়েছিল?
 পাঁচ বৎসরের ছোট্ট শিশু, স্ট্যামিনা আর উদ্যমে ভরা। তার প্রমাণ সে আমাকে অনেকবার দেখিয়েছে। ফ্লোরে কার্পেটের উপরে শুয়ে পড়ে কী একধরনের দূর্বোধ্য ভঙ্গিমায় চক্রাকারে ঘোরে, একবার পেটের উপরে ভর করে মাথা ঘাড় উঁচু করে দেয়, আবার পরক্ষণেই বিদ্যুতের গতীতে পাশ ফিরে, বৃত্তের ন্যায় আরও দু’একটা পাক খেয়ে উঠে দাঁড়ায়, তড়াক করে লাফিয়ে উঠার মত করে! এর পরে মাজা বেঁকিয়ে হাত, পা, ও সেই সাথে চোখ মুখের কিম্ভূতকিমাকার সঞ্চালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে! প্রথমদিন তো আমি হতবাক তার এই আচরণ দেখে! ভেবেই পাচ্ছিলাম না, ছেলেটা এমন করছে কেন?
অনেকক্ষণ পরে থেমে সে হাঁপাতে হাঁপাতে জানান দিল যে, এটা একটা ড্যান্স, এবং তার বন্ধুরা কেউ তার সাথে এই ড্যান্স এ পালা দিয়ে পারেনা! আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, জীবনেও আমি এরকম ড্যান্স দেখিনি। আর ওটা যে একটা ড্যান্স, তাইতো জানতাম না। আজ ‘মাষ্টার ড্যান্সার’ তুহিনের কাছে সেই ড্যান্সটুকু দেখেও বুঝে উঠতে পারলাম না, কোন শৈল্পিক সুষমার কারণে শরীরের এহেন দুর্বোধ্য এবং কিম্ভূতকীমাকার সঞ্চালনকে ‘ড্যান্স’ বলে আখ্যায়িত করতে হবে?
 বিষয়টি তুহিনকে জানালে সে হেসেই খুন। আমি যে নির্বোধ, সে কথা বুঝতে পেরে ছোট্ট ছেলেটি আমাকে বুঝিয়ে দিল ‘মাইকেল জ্যাকসন’ নামে একজন খুব বড় ড্যান্সার এরকম নাচে! সে তো কেবল সেই মাইকেল জ্যাকসনের অনুকরণই করছিল!!
এবারে আমার মত উজবুক এক ‘ফানি আঙ্কেল’ বুঝল যে, এতক্ষণ তুহিন যা করছিল সেটা সত্যিই একটা ‘ড্যান্স’! অনেক বড় মাপের নাচ! নিছক পাগলামি নয়!! এবং এটাও বুঝলাম যে, আমাদের তুহিন, পাঁচ বৎসরের শিশু হলেও খুব ভালো করেই তা রপ্ত করেছে। মেধা আছে বটে ছেলেটার!
  কখনও কখনও একটি-দুটি সপ্তাহই চলে যায় নিজের ব্যস্ততার কারণে, তাদের বাসায় যাওয়া হয়ে ওঠেনা। তুহিনের সাথেও দেখা হয়না। তার বাবা কিংবা মা মাঝে মধ্যেই বলেন যে তুহিন নাকি তার ‘ফানি আঙ্কেল’ এর খোঁজ করে প্রায়ই। বাবা কিংবা মা’র কাছে জানতে চায় ‘ফানি আঙ্কেল’ কেন আসে না তাদের বাড়িতে?
 গত বড়দিনের দিন দুয়েক আগে ঘটনাক্রমে তার বাবার সাথে দেখা হয়ে গেলে তিনি চা’র আমন্ত্রণ জানালেন। হাতে অবসর     থাকায় আমিও কোন কথা না বাড়িয়ে গিয়ে উঠলাম তাদের বাড়িতে। ড্রয়িংরুমে বসে বসে তুহিনের বাবার সাথে আলাপ করছিলাম আর সেই সাথে চা’র কাপটাও শেষ করা হচ্ছিল।
  এরই মাঝে দোতলা থেকে তুহিন নেমে এল হৈ হৈ করতে করতে। সে তার ‘ফানি আঙ্কেল’কে পেয়েছে অনেকদিন পরে আজ দুটো গল্প না বলে আঙ্কেলের আর মুক্তি নেই! ভাবখানা এমনই আর কি! এমনটাই ভেবেছিলাম। কিন্তু না, আজ সে আর গল্পের বায়না ধরলনা, বরং বড় আগ্রহ ভরে সে তার ‘ফানি আঙ্কেল’কে হাতে ধরা অনেকগুলো গ্রিটিংস কার্ড দেখালো, এক এক করে সে সেই কার্ডগুলো কোনটা কার জন্য, সে কথাও ব্যাখ্যা করে চলল।
সে তার বন্ধু বান্ধবদের গ্রিট করবে বড়দিন উপলক্ষ্যে। কার্ডগুলো বড় আগ্রহভরে আমাকে এক এক করে দেখালো। তার বাবা’কে, মা’কে কার্ড দেবে, তার বোনদেরও দেবে। সে জন্যই কার্ড গুলো আনিয়েছে, সে কথাও জানান দিল। আমাকেও একটা কার্ড দেবে বলে সে নিশ্চিত আশ্বাস দিল, পাছে যেন আমি আবার নিরাশ না হই, সে জন্য!
 নিজের প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যেও চেষ্টা করি শুক্রবার দিনটি সাপ্তাহিক ছুটির দিন হিসেবে নেবার। কখনও কখনও সফল হই, কখনও বা শত চেষ্টা করেও শুক্রবার দিনটিতে ছুটি ম্যানেজ করে উঠতে পারিনা। আর যদি কখনও সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার নিতে পারি, তবে সেদিনটি আমার প্রতিবেশী বন্ধুপ্রবরকে সাথে করেই জুমুআর নামাজটি পড়তে যাই মসজিদে। যাবার সময় প্রায় প্রতিবারই প্রতিবেশী ভদ্রলোক তুহিনের বাবাকে তার বাড়ি থেকে ডেকে নিতে হয়। তিনিও সানন্দে আমার সাথী হন মসজিদ পর্যন্ত। দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে মসজিদ পর্যন্ত নামাজে যাই, নামাজ শেষে আবার দু’জনে একইসাথে গল্প করতে করতে বাসায় ফিরি।
 ভদ্রলোককে বার বার বলেছি তার ছোট্ট ছেলে তুহিনকেও যেন তিনি সাথে নেন মসজিদ পর্যন্ত, কিন্তু তিনি প্রতিবারই সে কথা নাকচ করে দিয়েছেন এই বলে যে, একেবারে ছোট, আরও একটু বড় হোক তখন না হয় সাথে করে নেওয়া যাবে। বোঝানোর চেষ্টা করেছি, এখন এই বয়সে ছেলেটাকে যদি নামাজ, মসজিদ, এসব ইসলামেরমৌলিক বিষয়াদির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া না যায় তবে আর একটু বড় হলে সে পথে তাদের নেওয়া যাবে, তেমনটা আশা করা মোটেও সঙ্গত হবে না।
  কিন্তু তিনি সে কথা খুব একটা কানে নিচ্ছেন বলে মনে হয়নি। তাঁর অনাগ্রহ দেখে শেষ পর্যন্ত নিরাশ হয়েই হাল ছাড়তে হয়েছে, পাছে না আবার তিনি বিরক্তবোধ করেন ভেবে!
 একদিন সুযোগ বুঝে তাঁর স্ত্রী, তুহিনের মাকে বললাম কথাটা। যতটা নরমভাবে বলা সম্ভব, বুঝিয়ে বললাম, আপনারা যে মাইকেল জ্যাকসনের অনুকরণে তুহিনের সেই কিম্ভূতকীমাকার নাচ দেখে যারপরনাই প্রীত হন, ছেলে মানুষের নিরেট ছেলেমানুষি ভেবে উপেক্ষা করেন, আসলেই সেটা কি ছেলেমানুষি?
 ছেলেটা কী নিজের অলক্ষ্যেই একটা ভিন্নধর্মী কালচার, সংস্কৃতিক প্রবনতা নিয়ে বেড়ে উঠছে না? বয়স বাড়ার সাথে সাথে সে যখন ওরকম রক, পপ, ডিসকো নাচে আরও বেশি পারঙ্গমতা অর্জন করবে, ততদিন কী অনেক দেরী হয়ে যাবে না? পারবেন কী তাকে সেই জীবন থেকে ফেরাতে? রক, পপ, ডিসকো নাচের সাথে সাথে এসবের অনিবার্য অনুসঙ্গ হিসেবে যদি একদিন আপনার ছেলের হাতে দেখেন ড্রাগ্স, সাথে দেখেন গার্ল ফ্রেন্ড, তখনও কি ছেলেমানুষি ভেবে চুপ থাকতে পারবেন?
আর যদি তা না পারেন, যদি তার জীবনাচারে বাধার সৃষ্টি করতে যান বাবা বা মা’র দায়িত্বপালন ভেবে, ছেলে কী তখন আপনাদের সেই হস্তক্ষেপকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেবে? যদি তেমনটা মেনে না নেয়, বা নিতে না চায়, তখন যে সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে উঠবে, তার দায়ভার কে নেবে? কিভাবে সেই সঙ্ঘাত সামাল দেবেন?
একজন মুসলমান বাবা-মা হিসেবে ছেলের প্রতি যে মৌলিক দায়িত্বটি আপনাদের রয়েছে সেটি যদি এখনও, এই সময় পালন না করেন, তবে বলুন তো আর কবে সেই দায়িত্বটি পালন করবেন?
 আপনার ছেলে প্রতিদিন স্কুলে যাচ্ছে, ঐ স্কুল কি তাকে ঈমানের মৌলিক পরিচিতি কলেমা শেখাবে বলে আপনি মনে করেন? তারা যদি না শেখায়, তবে তাকে এখন সেই কলেমাটা শেখানোর দায়িত্বটি কার? ভদ্রমহিলা আমার কথা গুলো খুব মনযোগ দিয়ে শুনলেন বলে মনে হলো। কিন্তু কিছুই বললেন না। আমিও আর কথা বাড়ালাম না। তাদের পারিবারিক ব্যাপার, আমার মত আমি চেষ্টা করেছি। এখন তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেবার পালা।
  গত ঈদ উল আজহার দিন। বাসা থেকে জামা কাপড় পরে বের হবার আগে আমার প্রতিবেশী সেই ভদ্রলোককেও ফোন করলাম, একসাথে নামাজে যাবার জন্য। তিনি বললেন, তিনিও রেডি হচ্ছেন, আমি যেন বাসা থেকে বের হলেই তার বাসার দরজায় নক করি।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বের হয়ে উক্ত ভদ্রলোকের দরজায় কড়া নাড়লাম। তিনি দরজা খুলে দিলে আমি দরজাতেই দাঁড়িয়ে রইলাম তাঁরই অপেক্ষায়। ঘরের ড্রইংরুমে তাঁর স্ত্রী শিশু তুহিনকে সুন্দর জামা কাপড় পরিয়ে এনেছেন, বাবার সাথে সাথে ঈদের নামাজে যাবার জন্য। কিন্তু ছেলেটার চোখ মুখই বলে দিচ্ছে, সে তাতে খুশী নয়। এক হাতে দশ পাউন্ডের একটা নোট, নিজের অপর হাতটি দিয়ে চোখ ডলছে ঠাঁই দাঁড়িয়ে! পা বাড়িয়ে বাবার দিকে এগুবে সে লক্ষণ নেই, যদিও পেছন থেকে মা তাকে বার বার ঠেলছেন, বাবা সামনে থেকে ডাকছেন ‘হারি আপ, লেট্স গো, উই আর লেট ’।
তার এ অবস্থা দেখে করূণাই হলো! আমার সাথে শিশু তুহিনের দারুণ একটা সম্পর্ক থাকার কারণে আমিই তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম, বললাম; ‘এসো আমার সাথে, আমরা নামাজ পড়ে দ্রুত চলে আসব, আর এর পরে তোমাকে মজার মজার দুটো গল্প বলব’।
 ছেলেটার মুখে তার পরেও হাসি ফুটল না। তবে মুখে তার ঠিকই কথা ফুটল বটে। আমাদের সকলকে, বিশেষ করে, তার বাবা-মা’কে অবাক করে দিয়ে সে প্রশ্ন করে বসল;
‘হোয়াট ইজ নামাজ’?
তাইতো! পরিবারে নামাজের প্রাথমিক জ্ঞানটুকুও না পাওয়া এক শিশুকে কমিউনিটির একজন আমি কোথায় নিয়ে যাচ্ছি? তাকে যে জানানোই হয়নি ‘হোয়াট ইজ নামাজ ’?

নাথিং উইল গো আনএ্যকাউন্টেড্ ফর!

পিটার বেল, ২৩ বৎসরের মার্কিন যুবক, পদাতিক বাহিনীর এক সৈনিক। আমেরিকার টেক্সাস থেকে ১৯৯০ এর উপসাগরীয় যুদ্ধে কুয়েত ইরাক সীমান্তে এলেন। যুদ্ধের প্রস্তুতি তখন পুরোদমে চলছে। প্রাণচঞ্চল, উচ্ছল, উদ্যাম যুবক পিটার এই প্রথম কোন আরব দেশে এসেছেন। আরব জীবনাচার ও সংস্কৃতির ব্যাপারে তার কোন অভিজ্ঞতাই নেই।

মরুভূমির ধু ধু প্রান্তরে সামরিক তাঁবুর মধ্যেই কাটাতে হয় তাকে সারাটি দিন। সকালে একবার ও বিকেলে আর একবার কুচকাওয়াজ, শারীরিক ফিটনেস ঠিক রাখতে। তাও সেই জিমনেশিয়াম রুপী তাঁবুর মধ্যে! এখানে না আছে নাইট ক্লাব, না পানশালা, না আছে থিয়েটার, আর না বাস্কেট বল বা স্কি খেলার কোন সুযোগ! সময় কাটেনা! হাতের কাছে যে দু চারটি বই ছিল তাও পড়া শেষ। মা ভাইবোন, গার্ল ফ্রেন্ড, বন্ধু বান্ধবদের চিঠি লিখে বা লং ডিসটেন্স কল করে কিছুটা সময় কাটে। সন্ধার পরে জড়ো হয় টিভি’র সামনে। কিন্তু রাজনীতির নামে বড় বড় বক্তৃতা তার কোনদিনই ভালো লাগে না। সে চায় উদ্দাম, উচ্ছল, ধুম ধাড়াক্কা জীবন। মাঝে মাঝে টোসের বড় বড় পাহাড়ঘেরা জনপদ, বার, নাইট ক্লাব ও ডিসকোর স্মৃতী উন্মন করে তোলে তাকে!

 এভাবে চলতে চলতে কয়েক দিনের মধ্যেই তার জীবন বিষিয়ে উঠল। সৈনিক জীবন রোমাঞ্চে ভরা শুনেছিল, কিন্তু বাস্তবে যে পুরো উল্টো! এরই মধ্যে একদিন হঠাৎ করে তিন চার জন আরব এলেন তাদের তাঁবুতে। সবার একই রকম ধবধবে সাদা পোশাক, পা পর্যন্ত লম্বা। মাথায়ও বিশেষ ধরনের রুমাল, কাঁধ পর্যন্ত ঝোলানো, মাথার উপরে কালো রং বৃত্তাকারের দুটো রিং। দুর থেকে দেখতে চমৎকার লাগে!

 এরা কুয়েতি-সউদি নাগরিক। এদের দলনেতা চোস্ত ইংরেজিতে তাদের সাথে কুশল বিনিময় করলেন। খোঁজ খবর জানতে চাইলেন। আলাপের এক পর্যায়ে এসব মার্কিন সৈন্য যখন জানালো যে, সারাদিন অলস বসে বসে কাটাতে তারা বিরক্ত হয়ে উঠেছে! একথা শুনে দলটির নেতা গোছের একজন বললেন;
 ‘আমরা যদি তোমাদের বই পুস্তক, পত্রিকা ইত্যাদি সরবরাহ করি, এবং বলে রাখি, এগুলো আমাদের ধর্ম বিশ্বাস, আমাদের শিক্ষা সংস্কৃতি, আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য এসব বিষয়ে নিয়ে রচিত, তোমরা কি পড়তে প্রস্তুত? তোমরা চাইলে আমরা তোমাদের সেই সব বই পুস্তক দিতে পারি, হতে পারে যে, তোমাদের অলস সময় কিছুটা হলেও কাটানোর একটা উপলক্ষ্য হয়তো পাবে। নেবে কি?’

ভদ্রলোকের কথায় যুক্তি আছে। তাছাড়া বাস্তবিকই সময় কাটানোটা এখানে এখন একটা বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতএব নতুন কিছু জানতে দোষ কি? অন্তত নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি তো সমৃদ্ধ হবে! অতএব একদল মার্কিন সৈন্য সানন্দে রাজী হয়ে গেল। আরবীয় ভদ্রলোকেরা তখনই কিছু বই পুস্তক ধরিয়ে দিলেন এবং নিয়মিত আরও সরবরাহের আশ্বাসও দিলেন।

 এই প্রতিনিধি দলটি ছিল কুয়েতের বিখ্যাত ইসলাম প্রচার সংস্থা, আই পি সি’র, যাঁরা ইরাক কর্তৃক কুয়েত দখল হয়ে যাবার পরে সউদি আরবের বিভিন্ন শহরে বসেই তাদের প্রচার কাজ চালাচ্ছিলেন।
 প্রতিনিধি দলটি সোৎসাহে মার্কিন সৈন্যদের তাঁবুতে এ জাতীয় পুস্তিকা, লিটারেচার সরবরাহ চালু রাখলেন। প্রথম প্রথম খুব বেশি পাঠক পাওয়া না গেলেও অচিরেই দেখা গেল এসব বই পত্রের চাহিদা দ্রুত বেড়ে গেল। এবং উল্লেখযোগ্য সংখক মার্কিন-ফরাসী সৈনিক এসব বই পড়ছে নিয়মিত। তারা যে এগুলো যথেষ্ট মনযোগের সাথেই পড়ছে, তা বোঝা যায় যখন পরবর্তী কোন সাক্ষাতেই প্রতিনিধি দলটিকে তাদের মনে জমে থাকা বিভিন্ন প্রশ্ন করে, আরও বিস্তারিত জানতে চায়। আল্লাহ, তাঁর রাসূল, কেয়ামত নামাজ মৃত্যু ইত্যাদি বিষয়ে হরেক রকেমর প্রশ্ন!

 তাদের আগ্রহ দেখে প্রচারকরা বললেন, তোমরা কি চাও কোন এক্সপার্টের মুখে তোমাদের এসব প্রশ্নের উত্তর শোন? যদি চাও তবে আমরা সে ব্যবস্থাও করতে পারি! সৈনিকরা সমস্বরে আওয়াজ তুলে বলল, যদি পারো তবে তাই করো। ঠিক হলো, মাসে একদিন কোন প্রথিতযশা এক্সপার্ট দিয়ে তাদের এসব প্রশ্নের জবাব দানের ব্যবস্থা করবে আই পি সি কর্তৃপক্ষ।

 এর পরে তাই চলল, মাসের একটি দিন আধা ঘন্টা বিরতিসহ মোট তিন ঘন্টার অনুষ্ঠান। বক্তারা ইসলামের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে এক ঘন্টার বক্তৃতা দেন, তার আলোকে আধাঘন্টার বিস্তারিত ব্যাখ্যা, আধাঘন্টার বিরতি আর এর পরে আবার এক নাগাড়ে দেড় ঘন্টার বিরতিহীন প্রশ্নোত্তর।

কিন্তু দু’মাস না যেতেই সমস্যা দেখা দিল। বর্তমান লেখার নায়ক পিটার বেলসহ সমবয়স্ক একদল সৈন্য দাবী জানিয়ে বসল তাদের জন্য মাসে একবার যে প্রশ্নোত্তর এর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, তা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। তারা অনুষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য জেদ ধরে বসল। বাচ্চাদের মত অনুনয় বিনয় আরম্ভ করল। অবশেষে স্থানীয় সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে আইপিসি প্রতি সপ্তাহেই এধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করলো, তবে সময় কমিয়ে দেড়ঘন্টা করা হলো।

 দেখতে দেখতে অংশগ্রহনকারীর সংখ্যা বেড়ে গেল অস্বাভাবিকভাবে! ধু ধু মরুভূমির বালুকাময় প্রান্তরে সামরিক তাঁবুতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল মাদ্রাসা, শেখানো হয় ইসলাম কিন্তু ছাত্র সকলেই অমুসলিম!
 মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড: জগলুল নাজ্জার এলেন একবার আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে। তিনি পর পর দু সপ্তাহ আলোচনা উপস্থাপন করলেন মার্কিন সৈন্যদের উদ্দেশ্যে। আলোচনার বিষয়, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের পারস্পরিক সম্পর্ক। অত্যন্ত তথ্য ও যুক্তি নির্ভর এ আলোচনায় ড: জগলুল তাঁর বক্তব্য তুলে ধরলেন। জবাব দিলেন প্রতিটি প্রশ্নের। অনেকে অনেক প্রশ্ন করল। পিটার বেল এক কোণায় বসে মন দিয়ে শুনছিল। একটা কথাও বলেনি সে। একটা প্রশ্নও করেনি। তবে এমনভাবে বসে আছে যেন পৃথিবীর আর কোন কিছুর প্রতিই তার কোন খেয়াল নেই!
এবার সে শান্তভাবে উঠে দাঁড়ালো, সরাসরি ড: জগলুলকে প্রশ্নটি করল,
‘ জনাব আপনি কি নিশ্চিত যে, কোন কিছুই মৃত্যুর পরে হিসাবের বাইরে রবে না ?

প্রফেসর জগলুল আলোচনায় বেশ যুক্তি দিয়ে, কুরআন হতে দলিল চয়ন করে বলেছিলেন, আমরা মুসলমান বা খৃস্টান বা ইহুদী বা অন্য যে কোন ধর্মেরই হই না কেন, মৃত্যুর পরে যে জীবন, সে জীবনে আমাদের সকলের এ জগতে করে যাওয়া সকল কাজ ও কথার যুক্তিগ্রাহ্য জবাব দিতে হবে। তিনি তাঁর হাতের শাহাদাত আঙ্গুলি উঁচিয়ে অত্যন্ত জোরের সাথেই বলে ছিলেন Nothing will go unaccounted for !   
 
এই কথাটিই পিটারের মনে আলোড়ন তোলে। সেই দিনই পিটার বেল’সহ ষোলজন মার্কিন সৈন্য তাদের নাম তালিকাভুক্তি করে এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই তারা আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলমান হয়ে যায়। পুরো প্রথম গালফ ওয়ারের প্রায় এগারো মাস সময়কালে কুড়ি হাজারেরও বেশি মার্কিন ও ফরাসী সৈন্য ইসলাম গ্রহন করে! এদের অধিকাংশই মার্কিন সৈন্য।

১৯৯৮ সালে হঠাৎ করে কায়রোতে ড: জগলুলের হাতে একটি চিঠি আসে। টেস্কাস হতে আ: সালাম বেল নিজের পরিচয় তুলে ধরেছেন। ১৯৯০ সালে ধর্মান্তরিত পিটার বেলই আজকের আ: সালাম বেল!
 তাঁর চিঠির সারাংশ হলো, টেস্কাসে ফিরে তিনি এখনও আল্লাহ্ রহমতে মুসলমানই আছেন, অনাকাঙ্খিত সামাজিক ও পারিবারিক চাপ সত্ত্বেও! তাঁর দীর্ঘ প্রচেষ্টায় তাঁর মা, ভাই-ভাবীসহ কিছু পাড়া প্রতিবেশী ইসলাম সম্বন্ধে মনযোগ সহকারে শুনতে প্রস্তুত। ড. জগলুল যদি একবার দয়া করে টেক্সাসে তাঁর অতিথি হন, সেই আট বৎসর আগে মুরুভূমির বুকে দেয়া সেই বক্তব্যটাই আবার তুলে ধরেন, তাহলে হয়ত কোন বিষ্ময়কর ফল ঘটতেও পারে! বেশ কয়েকটি ই-মেইলও এলো! যাবতীয় ব্যয় ভার বহনের প্রতিশ্রুতি’সহ !

বারংবার অনুরোধের ফলে ড. জগলুল ১৯৯৮ সালের ৩রা নভেম্বর সেখানে গেলেন। ভালো করে চেহারাও মনে নেই, আট নয় বৎসর আগে দেখা যুবকের। অনেক চেষ্টা করেও তিনি তার চেহারা মনে করতে পারলেন না। তাই তিনি টেক্সাসে যখন আ: সালামকে দেখলেন, তখন একটু অবাকই হলেন! লাল টুক টুকে চেহারা, থুতনির নিচে কয়েকটা লালচে দাঁড়ি। ধীর স্থীর আ: সালাম খুশীতে আটখানা হয়ে একে একে সবার সাথেই ড. জগলুলকে পরিচয় করিয়ে দিলেন,
‘ইনি সেই প্রফেসর! যাঁর কাছে আমি ইসলাম শিখেছি!’
 
তাঁর মা, ড: জগলুলকে জানালেন ‘আমার দুই ছেলের মধ্যে ঐ সবচেয়ে ছোট, কিন্তু খুব দুষ্ট, দুরন্ত ছিল!  তাঁদের সেই বেয়াড়া, দুরন্ত সদা উচ্ছল পিটার কি ভাবে বদলে গেল ! সব সময় যেন সে এক গভীর ভাবাবেগের মাঝে নিবিষ্ঠ হয়ে থাকে। সবার মাঝে থেকেও সে যেন সবার থেকেই আলাদা! দেখলে মনে হবে যেন ওর মাথায় কোন পাখী বসে আছে, নড়লেই উড়ে যাবে!

ভাই বললেন; ‘কত করে বুঝালাম, কত ভয় দেখালাম, কত প্রলোভন! কিন্তু সে অনড় অটল! জবাব দিল, তোমাদের অসুবিধা হলে বলো আমি অন্যত্র চলে যাই কিন্তু আমাকে ইসলাম ছাড়তে বলো না!’ বাপ মরা আমার বড় আদরের ছোট ভাই, চোখের আড়াল হয়ে দুরে চলে যাক, তা চাইনি, তাই ওকে ওর রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছি! তবে প্রফেসর, স্বীকার করতেই হবে যে, সে চমৎকার একটা মানুষে রূপান্তরিত হয়েছে! আমরা তাকে দেখি, আর অবাক বিষ্ময়ে হয়ে যাই!
 
তাঁর প্রাক্তন এক বান্ধবীর সাথে পরিচিত হলেন ড: জগলুল। সে বললো, জানো প্রফেসর! যুদ্ধ হতে ফিরে এসে সে আমার দিকে আজ পর্যন্ত চোখ তুলে তাকায়নি! আমি তাকে অতিতের মত আবার ডেটিং এ ডাকলে সে খুব ভদ্রভাবে তা এড়িয়ে গেছে। বলেছে,
আমার সে জীবন নয়, আমি সে পথের যাত্রী নই! আমাকে ক্ষমা করো, আর কখনেই আমাকে এ পথে ডেকোনা! ভুলে যাও সে সব কথা, আর যদি ভুলতে না পার বা না চাও, তবে অন্তত পক্ষে আমাকে তা ভুলে যেতে দাও! মনে রেখো, এই জীবন, উদ্দমতার নামে এই উশৃঙ্খলতা এটা পাপ, এটা অন্যায়। এই সব কাজ আর কথার একদিন জবাব দিতে হবে। তোমাকে জবাবদীহিতার মুখোমুখি দঁড়াতেই হবে, পার পাবেনা!– Nothing will go unaccounted for !   
 
কি অদ্ভুত পরিবর্তন!
প্রফেসর জগলুল মোট এগারো দিন থাকলেন। এর মধ্যে টুকি টুকি আলোচনা ছাড়াও আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে মোট তিন দিন ইসলামের উপরে লেকচার ও প্রশ্নের জবাব দিতে হয়েছে। অষ্টম দিনে আ: সালামের মা, ভাই-ভাবীসহ মোট চব্বিশ জন মার্কিন, ইংরেজ খৃষ্টান ইসলাম গ্রহণ করলেন।
প্রফেসর জগলুলের নিজ মুখে এ কাহীনি শুনে বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। আমার এই বিষ্ময়কে তিনি শঙ্কায় পরিণত করলেন, যখন বললেন,
‘তেইশ বৎসরের এক খৃষ্টান যুবক, মৃত্যুর পরে একদিন তার প্রতিটি কর্মের জবাবদীহি করতে হবে জেনে ভীত হলো! শত প্রলোভন, ভয়, ভীতি, চাপ সহ্য করেও তার নতুন ধর্মমতের উপরে টিকে রইল, মুসলমানই রইল, নিষ্ঠাবান মুসলমান! তাঁর পরিবর্তনে প্রভাবিত হয়ে তার নিকটাত্মীয়, তার বন্ধু বান্ধব, একই সমাজের আরও চব্বিশজন জন মুসলমান হলো!

একটাবার চিন্তা করে দেখেছ কী, ইসলাম তার আচার আচরণ জীবন আর জীবনযাত্রায় কি গভীর ছাপ ফেলেছে? যা কেবল তাকেই নয় বরং তার আশে পাশে এতগুলো লোককেও আকৃষ্ট করেছে, তাদেরকে ইসলামের দিকে টেনে এনেছে!
সে নিজেই আমাকে বলেছে; ‘প্রফেসর, সেই মরুভূমিতে তাঁবুর মধ্যে বসে তোমার কাছে জেনেছিলাম যে, প্রত্যেকটি কাজের জবাব দিতে হবে, দিতেই হবে! এর পর হতে আজও আমার ভয়ে বুক কাঁপে! ভাবি, হায়, আমার যদি জন্মই না হতো!’

ড. জগলুল সরাসরি আমার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলেন;
‘বলতে পারো, আমরা মুসলমান হয়ে জীবনে কতবার কুরআনে পড়েছি, আলেমদের কাছে শুনেছি যে, মৃত্যুর পরে আমাদের সকল কাজের জবাব দিতেই হবে, তার পরেও কি আমাদের বুক কেঁপেছে ভয়ে?
কথাটা বলে ড. জগলুল একরাশ প্রশ্ন নিয়ে আমার দিকে চেয়েই রইলেন, একটুখানি থেমে তিনি আবার বলে উঠলেন, মনে রেখো, এর জবাবও আমাদেরকে দিতে হবে! Nothing will go unaccounted for !

দীন প্রচারে ইন্টারনেট : সময়ের দাবি

(ক)

গত বছর ঢাকার মালিবাগ জামিয়ার ৩০ সালা সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এক মার্কিন বাঙালী মুসলিমের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। সাইদ নামের এই সৌম্য-ভদ্র মিষ্টি চেহারার তরুণটি পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। বাবা-মা’র জন্ম বাংলাদেশে হলেও একজন আমেরিকান হিসেবেই তার জন্ম। অন্য দশজন মার্কিন শিশুর মতই তিনি বড় হন ইসলামের নাম-নিশানাহীন সেক্যুলার পরিবেশে। নিজের বাবা-মাকেও দেখেন তিনি অন্য শিশুদের বাবা-মা’র অনুরূপ। ফলে ইসলাম কী বা মুসলিম আর অমুসলিমের মধ্যে তফাৎ কোথায়- সে ব্যাপারে তিনি কোনো ধারণাই পান নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই নিজের সম্পর্কে প্রথম জানতে পারেন তিনি একজন মুসলিম। তারা বাবা বাংলাদেশ থেকে আসা এক তাবলিগ জামাতের সংস্পর্শে কয়েকদিন কাটানোর পর বাসায় ফিরে তাকে প্রথম কালেমার কথা বলেন। বিস্তারিত শেখার জন্য ছেলেকে তাবলিগে পাঠান। তাবলিগ থেকে ফেরার পর প্রকৌশলী সাইদ ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা ও ঘাটাঘাটি শুরু করেন। এরপরের কথাগুলো তার নিজের জবানিতেই শুনুন :

‘আমি তাবলিগ থেকে ফিরে ইসলাম নিয়ে ব্যাপক তথ্য তালাশ শুরু করলাম। যাবতীয় তথ্যের জন্য প্রথমে ইন্টারনেটের শরণাপন্ন হওয়াই আমাদের অভ্যাস। ইন্টারনেটে ইংরেজি ভাষায় প্রচুর বই ও প্রবন্ধ পেলাম। আমার জ্ঞান পিপাসা মেটাবার কোনো বিষয়েরই অভাব নেই সেখানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে এসে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ইঞ্জিয়ারিং শেষ করে ইলমে দীন শেখার জন্য পাকিস্তান বা আরবের কোনো দেশে যাব। কিন্তু স্টুডেন্ট ভিসার আবেদন করে কোনো দেশের পক্ষ থেকেই সাড়া পেলাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সাবজেক্ট নিয়ে পড়েছি তা-ই আমার জন্য অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল। পাছে আমি সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালাই কি-না সে ভয়ে কোনো মুসলিম দেশই আমাকে সেদেশের প্রতিষ্ঠানে এলেম শেখার সুযোগ দিতে চাইছিল না।

অবশেষে আব্বা-আম্মার নাগরিক হওয়ার সূত্রে বাংলাদেশের ভিসা পেলাম। কিন্তু এদেশের খবর নিয়ে আমার ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল। কারণ আমি ইন্টারনেটে বাংলাদেশের আলেম-উলামা ও মসজিদ-মাদরাসা সম্পর্কে অনেক ঘাটাঘাটি করেও তেমন কিছু পেলাম না। বাংলা ভাষায় নেটে (এটা আরও চার-পাঁচ বছর আগের কথা) ইসলাম সম্পর্কে যা পেলাম তার অধিকাংশই নেতিবাচক। নেটের তথ্য সমুদ্রে উপর্যপুরী সাঁতার কেটেও কেবল একজন বাঙালী মাওলানার নামই উদ্ধার করতে পারলাম। তিনি মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী। এ থেকে আমার ধারণা হল, বাংলাদেশে তেমন কোনো মাওলানা নেই। নেই আমার পড়ার মতো কোনো মাদরাসাও। 

তবে উপায়ন্তর আমাকে বাংলাদেশের কথাই ভাবতে হলো। ভাবলাম, আগে তাবলিগ জামাতের সঙ্গে বাংলাদেশটা একবার ঘুরে আসি। অনাবিল সুন্দর এই মুসলিম দেশে গিয়ে কাকরাইলের তাবলিগি মারকাজে পৌঁছেই আমার আক্কেলগুড়ুম। শত শত আলেম-উলামার আনাগোনা! খোদ মারকাজেই দণ্ডায়মান বিশাল মাদরাসা!’ তারপর আমি ঢাকার যেখানেই যাই, সেখানেই দেখি একাধিক মসজিদ-মাদরাসা। আনন্দে হৃদয় দুলে উঠত। গর্বে ফুলে উঠল বুক- এই না আমার পিতৃভূমি মুসলিমের বাংলাদেশ! তবে এত মসজিদ-মাদরাসা ও আলেম-উলামা থাকা সত্ত্বেও আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম ইন্টারনেটে তাদের উপস্থিতির এই শোচনীয় হাল কেন তা কিছুতেই আমার বোধগম্য নয়।’

 (খ)

২০১০ সালের ফেব্রয়ারির ১০ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো’য় একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। সেটি এখানে হুবহু তুলে ধরছি। ‘ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের ধর্মগুরু পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট যেসব ধর্মযাজক তাঁদের বাণী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের জন্য নতুন নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি ধর্মযাজকদের ওয়েবসাইটে নিজস্ব ব্লগ খোলার নির্দেশ দিয়েছেন। পোপ গত শনিবার ধর্মীয় বাণী প্রচারের জন্য এবং অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির লোকজনের সঙ্গে কথা বলার জন্য সম্ভব হলে সব মাল্টিমিডিয়া টুল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। পোপ বেনেডিক্ট এক বার্তায় বলেন, শুধু ই-মেইল ব্যবহার বা ওয়েব সার্ফ করাই যথেষ্ট নয়, নিজেদের প্রকাশ করা এবং নিজ নিজ সম্প্রদায়কে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ধর্মযাজকদের সব ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত। ভ্যাটিকান থেকে প্রকাশিত বার্তায় ৮২ বছর বয়সী পোপ আরও বলেন, তরুণ ধর্মযাজকদের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে বেশি করে পরিচিত হওয়া উচিত। তিনি বিনোদন গণমাধ্যমগুলোর যৌনতা ও সহিংসতাকে উসকে দেওয়ার প্রবণতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির ভূয়সী প্রশংসা করেন পোপ। তিনি বলেন, প্রযুক্তি মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার। উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়েবে পোপের উপস্থিতি ব্যাপকভাবে লক্ষ করা গেছে। ভিডিও ও ছবি আদান-প্রদান করার ওয়েবসাইট ইউটিউবে পোপের একটি নিজস্ব চ্যানেল রয়েছে। এই চ্যানেলের মাধ্যমে পোপ তাঁর ধর্মীয় বাণী প্রচার করেন।’

 (গ)

ইন্টারনেট কীভাবে ইসলাম প্রচারে ভূমিকা রাখছে তার ধারণা দিতে ‘আল-সুন্নাহ’ নামক একটি ইসলামি সাইটের একজন দায়ীর বক্তব্য তুলে ধরছি। সাইটে প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেট চ্যাটে আমাকে নিউজিল্যান্ডের এক বন্ধু জানিয়েছেন, তিনি বছর তিনেক আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তার বাবা-মা এখনো এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আমেরিকান বোন তরুণী জামিলা জানিয়েছেন, তিনিও ইসলাম গ্রহণ করেছেন ইন্টারনেটের মাধ্যমে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তিনি ইন্টারনেট থেকে ইসলামি বই-পুস্তক প্রিন্ট করে রাখেন। তারপর সাপ্তাহিক ছুটির দিন সেগুলো মনযোগ দিয়ে পড়েন। তিনি আমার কাছে অনেক ছাত্র ও গবেষকের পক্ষে মেইল করেন। আমি ইসলাম সম্পর্কে তাদের জিজ্ঞাসার জবাব দেই। আমি সর্বশেষ যে মেইলের জবাব দিয়েছি সেটি পাঠিয়েছেন ১৫ বছর বয়সী এক বৃটিশ তরুণ। তিনি আমার কাছে জানতে চেয়েছেন মৃত্যুদণ্ডকে ইসলাম কোন দৃষ্টিতে দেখে? আমি আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের মেইলও পেয়েছি। তিনি আমার কাছে ইসলাম বিষয়ে অনেক কিছু জানতে চেয়েছেন।’

প্রথম অনুচ্ছেদে আমরা বাংলাদেশের আলেম-উলামার ইন্টারনেটে অনুপস্থিতির করুণ বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা পাই। বর্তমান বিশ্বে এমন সাইদ হাজার হাজার নয়, লাখ লাখ নয়; কোটি কোটি। একটু চিন্তা করে দেখুন, শুধু ইন্টারনেটে আলেম-উলামার আনাগোনা না থাকায় একজন প্রকৌশলী বাংলাদেশকে মসজিদ-মাদরাসা আর আলেম-উলামার দিক থেকে কত না কাঙাল ভেবেছিলেন! পক্ষান্তরে ইসলামপন্থীরা যখন ইন্টারনেট থেকে দূরে তখন তাদের বিপক্ষ শক্তিগুলো একে কতটা কাজে লাগাচ্ছেন তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে ধরিয়ে দিচ্ছে প্রথম আলোয় প্রকাশিত দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের এই প্রতিবেদনটি। অনেকে মনে করেন ইন্টারনেটে শুধু খারাপ ছবি আর সিনেমা দেখার কাজ হয়, তাদের ভুল ভেঙ্গে দিতে ভূমিকা রাখতে পারে তৃতীয় অনুচ্ছেদে তুলে ধরা আরবি একটি প্রবন্ধের এই কিয়দাংশ।

আমরা যারা ইন্টারনেট থেকে দূরে, তারা মনে করি, বাংলাদেশের কয়জনই বা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। আমাদের এ অমূলক ধারণা ভেঙ্গে দিতে একটি তথ্যই যথেষ্ট যে এ দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রিন্ট ভার্সন যতজন পড়েন, তারচেয়েও অনেক অনেক বেশিজন পড়েন ইন্টারনেট ভার্সন। যে পত্রিকার প্রিন্ট ভার্সনের পাঠক দুই লাখ তার নেট ভার্সনের পাঠক অন্তত তিন লাখ। শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলো থেকে নিয়ে পিচ্চি দৈনিক আমাদের সময় পর্যন্ত সবগুলোর নেট ভার্সনের পাঠক প্রিন্ট ভার্সনের দ্বিগুণ বা তারচেয়েও বেশি।

তাছাড়া আমরা জানি, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে দেশে এখন ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে। প্রত্যেক সাংসদকে নেট সংযোগ বিশিষ্ট ল্যাপটপ সরবরাহ করা হয়েছে। দেশের প্রতিটি কলেজ এমনকি স্কুলে পর্যন্ত নেট সংযোগ বিশিষ্ট কম্পিউটার সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগামী এক দেড় বছরের মধ্যে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেয়ারও সক্রিয় উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

শুধু উন্নত বা উন্নয়নশীল বিশ্বেই নয়; অনুন্নত বিশ্বেও আজ ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ছে খুব দ্রুত গতিতে। উন্নত বিশ্বে এখন লেখাপড়া থেকে নিয়ে কেনাকাটা পর্যন্ত সবকিছুই হচ্ছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন বাংলাদেশের, অন্তত শহরের কোটি কোটি মানুষও তাদের সব প্রয়োজন মেটাবার জন্য প্রথমে ধর্ণা দেবে ইন্টারনেটের কাছে।

ইন্টারনেটে ইংরেজি ও আরবি ভাষায় একজন সাধারণ মানুষ থেকে নিয়ে বিদগ্ধ গবেষক পর্যন্ত এমন কোনো শ্রেণী নেই যাদের জ্ঞানের পর্যাপ্ত খোরাক নেই। দুনিয়া বা আখিরাতের প্রতুল তথ্য নেই। এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট ওয়েব সাইটের এড্রেস জানারও দরকার হয় না। প্রয়োজনীয় তথ্যের একটি সম্ভাব্য শব্দ দিয়ে গুগলে সার্চ দিলেই উপস্থিত হয় শত শত প্রবন্ধ বা বইয়ের (লিংক) এড্রেস। তারপর সেই এড্রেসে একটি মাত্র ক্লিকেই পেতে পাওয়া যায় কাক্ষিত তথ্য। উদাহরণ স্বরূপ আমার নিজের অভিজ্ঞতাটাই শেয়ার করি। আমি এই প্রবন্ধটি লেখার আগে ইন্টারনেটে আরবি ভাষায় ‘আদ-দাওয়াতু ইলাল্লাহ আবরাল ইন্টারনেট’ (অর্থাৎ, ইন্টারনেটের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার) লিখে সার্চ দিলাম। বেশ এ সম্পর্কে দশ বারোটি প্রবন্ধ পেয়ে গেলাম। বক্ষমাণ নিবন্ধের তৃতীয় অনুচ্ছেদে উদ্ধৃত ‘আল-সুন্নাহ’ সাইটের সন্ধান আমি এভাবেই পেয়েছি। কিন্তু বাংলায় এভাবে কোনো শব্দ দিয়ে ইসলামি কোনো প্রবন্ধ বা বই পাওয়া সহজ নয়।

আরবি এবং ইংরেজি ভাষাভাষীরা তাদের হক যথাযথভাবে আদায় করছেন বললে অত্যুক্তি হবে না। অথচ এই দুই ভাষার পরই পৃথিবীর অন্যতম বহুল ব্যবহৃত ভাষা বাংলায় এর হক প্রায় পুরোটাই অনাদায় রয়ে গেছে। বাংলায় ইসলামের বাইরের বিষয় ইন্টারনেটে অভাব নেই। কিন্তু ইসলামি বিষয় নেই বললেই চলে। যা-ও আছে তার অধিকাংশই বিভিন্ন বিভ্রান্ত মতাদর্শীদের সরবরাহকৃত।

তাই শ্রদ্ধেয় উলামায়ে কেরামের কাছে অনুরোধ, এই অপ্রতিরোধ্য ইন্টারনেট আগ্রাসনের যুগে আপনারা একে আর এড়িয়ে চলবেন না। মন্দের সর্বপ্লাবী বিস্তারের আগেই আপনারাও এগিয়ে আসুন সুন্দরের বিস্তারে। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।