শোভন কুমার খানের ইসলাম গ্রহণ

 

শোভন কুমার খান তার ইসলামপূর্ব নাম, তিনি ইসলাম গ্রহণের পর মুহাম্মাদ খান নাম নির্বাচন করেন। তিনি ১৮ই আগস্ট ১৯৭০ সালে ভারতে দিনাজপুর জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। ইংলিশ মিডিয়ামে লেখা-পড়া করেন। ১৯৯৯ সালে কুয়েতে আসেন চাকুরির উদ্দেশ্যে। তিনি কুয়েতে এয়ারওয়াইজে আপ্যায়ন বিভাগে কর্মরত আছেন। দীর্ঘ ১৩ বছর কুয়েত এয়ারওয়াইজেই সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। দুর্ভাগ্যবশত কুয়েতে তাকে কারাবরণ করতে হয়। কারণ কুয়েত এয়াপোর্টে তল্লাশিতে কুয়েত এয়াওয়াইজে হেরোইন পাওয়া যায়, যা কুয়েতে রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তাকে জেল হাজতে যেতে হয়। আর এই কারাবরণই তাকে ইসলাম গ্রহণের পথ সুগম করে দেয়। তিনি একজন শিক্ষিত লোক। তিনি শিক্ষা জীবনে বিভিন্ন ধর্ম নিয়েও গবেষণা করেন। যদিও তিনি একজন হিন্দু ধর্মের লোক কিন্তু খ্রীষ্টধর্ম নিয়ে তিনি অধ্যয়ন করেন, বাইবেলের বিভিন্ন অধ্যায় তিনি ব্যাপক গবেষণা করেন। কুয়েতের এই দীর্ঘ সময় কর্মরত থাকার পর ভাগ্যের নির্মম পরিহাস হিসেবে তাকে জেলে যেতে হয়, তিনি সেখানে পবিত্র কুরআনের ইংরেজি অনুবাদ পড়ার সুযোগ পান। পূর্বে বাইবেল পড়া আর বর্তমানে কুরআনের অনুবাদ পড়ে নিজের মধ্যে দু’টি গ্রন্থ নিয়ে তুলনা করতে থাকেন, কোনটি বিজ্ঞান সম্মত ও নির্ভুল। অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর তার মন সায় দেয় যে, পবিত্র কুরআনই নির্ভুল। তিনি পবিত্র কুরআনের অনুবাদ পাঠ করে ইসলাম গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। ৪০ দিন জেল হাজতে থাকার পর, তাকে কোর্টে ওঠানো হয়, প্রথম কোর্টেই তিনি বেকুসুর খালাস পান। তার মন পাগল পারা, কোথায় কিভাবে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হবেন? তারই একজন (কুয়েতি) সহপাটিকে তার মনের কথা খুলে বলেন, কুয়েতি তাকে আই. পি.সির প্রধান কার্যালয় মালিয়াতে নিয়ে আসেন। বিভিন্ন বিষয় প্রশ্ন করা হয়, যখন স্পষ্ট হলো তিনি কারো প্ররোচনায় নয় বরং স্বইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করার নিয়তেই আই. পি. সিতে এসেছেন, তখন আমরা তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে শাহাদাতাইন পাঠ করায়ে ইসলামের ছায়া তলে গ্রহণ করে নেই। আমরা তার জন্য দোয়া করি, তিনি যেন আমরণ ইসলামের উপর অটল থাকতে পারেন।

 

 

 

 

 

 

বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইউসুফ ইসলাম

নও মুসলিমের কাহিনী
লন্ডন ভিত্তিক মুসলিম এইড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সাবেক পপ সঙ্গীত শিল্পী জনাব ইউসুফ ইসলাম বলেছেন, “বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের আজকে বড় সমস্যা ইসলামের বাস্তব শিক্ষার অভাব এবং জীবনাচরণে ইসলামী আদর্শের অনুপস্থিতি। আমাদের ধর্মে যে আমাদের সকল সমস্যার সমাধান দিতে পারে সে সম্পর্কে আমরা অজ্ঞ।”

সম্প্রতি দৈনিক সংগ্রামকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন। গত ২৯শে ডিসেম্বর তিনি ৪ দিনের এক সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলাদেশ আসেন। ২রা জানুয়ারী তিনি স্বদেশ যুক্তরাজ্যে ফিরে যান।

জনাব ইউসুফের সাথে আলোচনার সূচনাতেই প্রশ্ন করলাম আপনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন কেন? তিনি হেসে জবাব দিলেন, দেখুন সঙ্গীত আমাকে ঐশ্বর্য দিয়েছিল অপার। জীবন ভাগের সব আয়োজন ছিল আমার নাগালে। কিন্তু ভোগ বিলাস আমার মনকে শান্ত করতে পারেনি। আমি কিছুতেই তৃপ্তি পাচ্ছিলাম না। এই অশান্তি আমাকে ধর্মের দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়। আমি আমার তদানীন্তন স্বধর্ম খৃষ্টবাদ সম্পর্কে পড়তে শুরু করি। এরপর ইহুদী, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের উপর আমি পড়াশোনা করি। কিন্তু আমি বিফল হই। আমার আকঙ্খিত শান্তি আমি পেলাম না। এ সময় আমার ভাই জেরুজালেম থেকে আবেগ জড়িত কণ্ঠে অনেক কথাই বললো। আমি যে অনুসন্ধানের জন্য তখন ব্যাকুল হয়ে আছি, আমার ভাই সেই খবর জানতো। আমার জন্ম দিনে সে জেরুজালেম থেকে নিয়ে কুরআন আসা একখ- পবিত্র কুরআন শরীফ উপহার দিলো। আমি পবিত্র কুরআন পড়তে শুরু করি। কুরআন সেই মহাগ্রন্থ যা আমার জীবন ও চেতনার জগতকে পালটে দিয়েছে। আমার মনের সকল প্রশ্নের জবাব এই গ্রন্থে পেলাম। আমি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম। আমি মুসলমান হলাম।

প্রশ্নঃ করলাম, এখন আপনি আপনার বিগত জীবনকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন?
জনাব ইউসুফ জবাব দিলেন, দেখুন আজ আমি পরিতৃপ্ত, সুখী। আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমার লক্ষ্য, সে লক্ষ্যেই আমার জীবনকে পরিচালিত করার চেষ্টা করছি। আর আমার পূর্বের জীবন ছিল মোহাচ্ছন্ন, ভোগ বিলাসের, জীবনের কোন লক্ষ্য উদ্দেশ্য ছিল না।

প্রশ্নঃ আপনার পুরানো বন্ধুরা আপনার সম্পর্কে কি বলে?
উত্তরঃ ওদের সাথে যোগাযো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। দেখা সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় হয়। তবে আমাদের জীবেনর মৌল দর্শন পালটে গেছে। আমার লক্ষ্য হচ্ছে অনন্ত জীবন আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ, আর তাদের লক্ষ্য হচ্ছে এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীকে ভোগের জন্য প্রাণপাত করা।

প্রশ্নঃ আপনি ইসলামী সঙ্গীতের বিষয়ে কিছু ভাবছেন?
উত্তরঃ ইসলামের সঙ্গীতের প্রবেশাধিকার কতটুকু তা আমি জানি না। ইসলাম সঙ্গীতকে কতটুকু গ্রহণযোগ্য করেছে সেসম্পর্কে জানতে হবে। এরপরই বিষয়টি নিয়ে ভাববো।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশে আপনার এই সফরের উদ্দেশ্য কি?
উত্তরঃ আমরা বাংলাদেশী মুসলিম ভাই বিশেষ করে এখানে অবস্থানকারী বিহারী মোহাজের মুসলিম ভাইদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখতে এসেছি। এছাড়া আমাদের সংস্থার পক্ষ থেকে সামান্য কিছু আর্থিক সাহায্য তাদের হাতে তুলে দিতে আমি এখানে এসেছি। এখানে আসার আগে পাকিস্তানে আশ্রয়গ্রহণকারী আফগান মুসলমানদের অবস্থা দেখতে আমি সে দেশে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ভারতের বাঙ্গালোরে এক মুসলিম যুব সম্মেলনে অতিথি হিসেবে যোগ দেই। সেখান থেকেই ঢাকায় আমি। আমি চট্টগ্রামও যাব।

প্রশ্নঃ আপনাদের সংস্থার উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম কি? এর তহবিল কিভাবে সংগৃহীত হয়।
উত্তরঃ আমাদের সংগঠন সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবামূলক। ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে দুঃস্থ মানবতাকে সেবা আমাদের উদ্দেশ্য। যুক্তরাজ্যের মুসলিম অমুসলিম ব্যক্তিদের দান আমরা গ্রহণ করি। এছাড়া ২১টি ট্রাষ্ট আমাদের সহায়তা করছে।

প্রশ্নঃ শুধু মুসলমানদেরকেই কি আপনারা সাহায্য করে থাকেন?
উত্তরঃ না । ইসলামী আদর্শে পরিচালিত আমাদের সংস্থা ধর্ম বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে সকল দুঃস্থ মানুষকেই সহায়তা দিচ্ছে। তবে আজকে বিশ্বে মুসলমানরাই তো সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত। সর্বত্রই তো তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।

প্রশ্নঃ মুসলমানদের এই দুর্ভোগের কারণ কি বলে আপনি মনে করেন?
উত্তরঃ আমাদের সমস্যা তো একটি। ইসলাম সম্পর্কে আমাদের স্বচ্ছ ধারণার অভাব। ইসলামকে আমরা মুখে মুখে গ্রহণ করলেও আমাদের জীবনে এর আদর্শকে বাস্তবায়িত করতে পারিনি। ইসলামকে অনুসরণ করলে আমাদের সমস্যা থাকতো না। আমি পশ্চিমের ঐতিহ্য নিয়ে যেভাবে ইসলামের সৌন্দর্য, গুরুত্ব এবং সম্পদকে উপলব্ধি করছি, আমার সন্দেহ হয় অনেকেই হয়ত সেভাবে করছেন না।

প্রশ্নঃ অনেকেই তো বলেন, ইসলাম ১৪শ বছরের পুরাতন আদর্শ, এ যুগের জন্য অচল। এ সম্পর্কে আপনি কি বলেন?
উত্তরঃ আমি বিনয়ের সাথেই বলছি, যারা এসব বলেন, তারা নিজেদের মনে স্থান করে নেয়া ইসলাম সম্পর্কে পূর্ব ধারণার বশবর্তী হয়েই ইসলামকে বিচার করে। যদি সত্যিকারভাবে তারা এ ব্যাপরে জানতে চাইতো তবে তাদের উক্তি হতো ইতিবাচক। এমন দায়িত্বহীন হতো না।

প্রশ্নঃ যুক্তরাজ্যে ইসলামের দাওয়াতী কাজ কেমন চলছে?
উত্তরঃ সেখানকার পরিবেশ ও প্রচার মাধ্যমগুলো ইসলামের জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। কিন্তু এরপরও কাজ হচ্ছে। নতুন নতুন লোক ইসলাম গ্রহণ করছে। আর এসব মুসলিম যেহেতু সেই দেশেরই নাগরিক, তাই সেখানকার সামাজিক জীবনে এর একটা প্রতিক্রিয়া পড়ছে। যুক্তরাজ্যে মুসলিম শিশুদের ইসলামী শিক্ষা দানের জন্য স্কুল খুলেছি।

প্রশ্নঃ আপনার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?
উত্তরঃ ১৯৩৮ সালের রমজান মাসে আমি লন্ডনে জন্মেছি। আমার পিতা ছিলেন গ্রীক সাইপ্রিয়ট, মা সুইডিশ। আমার মা এখনো জীবিত। ১৯৭৭ সালে আমার ইসলাম গ্রহণের পর আমার স্বজনদের অধিকাংশই ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমার স্ত্রী ফাউজিয়া আফগান ও তুর্কী বংশোদ্ভুত মুসলিম। আমাদের তিন কন্যা ও এক পুত্র রয়েছে। আমি ব্যবসায় কিছু পুঁজি বিনিয়োগ করেছি। এতেই আমর চলে যাচ্ছে।

প্রশ্নঃ বাংলাদেশী মুসলিম ভাইদের জন্য আপনার কি কোন বাণী রয়েছে?
উত্তরঃ তাদের প্রতি আমার আবেদন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে ইসলামী উম্মার প্রতি তাদের দায়িত্ব অপরিসীম। ইসলামকে নিজেদের জীবনে সর্বোত্তমভাবে পালনের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রস্তুতি নেয়া। [দৈনিক সংগ্রাম, বুদ্ধবার ২২শে পৌষ ১৩৯৩ বাংলা]

নও মুসলিমের কাহিনী *** ডঃ শিবশক্তি স্বরূপজীর একটি সাক্ষাৎকার

ডঃ স্বরূপজী ইসলামে মুক্তির স্বাদ পেলেন গত ১০ই মে (১৯৮৬) ভারতের সাম্প্রতিক কালের এক মহাত্মা ধর্মগুরু যিনি সেদিন পর্যন্ত সেদেশের সর্বত্র ‘ভগবান’ নামে পরিচিত ও পূজিত ছিলেন সেই ডঃ শিবশক্তি স্বরূপজী মহারাজ উদাসেন নিজ স্ত্রী ও কন্যাসহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাহার নতুন নাম রাখা হয় ইসলামুল হক, পত্নীর নাম খোদেজা হক আর কন্যা নাম রাখা হয় আয়েশা হক। গুজরাটের প্রভাবশালী সাপ্তাহিক ‘শাহীন’ এর তরফ হতে সম্প্রতি ডঃ ইসলামুল হকের এক সাক্ষাৎকর গ্রহণ করা হয়। ১ মার্চ ৮৭ তারিখে সাপ্তাহিক ‘শাহীন] এর প্রকাশিত উক্ত সাক্ষাৎকরটি ইত্তেফাকের পাঠক-পাঠিকা বর্গের নিকট প্রেরণ করেছেন মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, পোষ্ট বক্স নং-২৫, জেদ্দা-২১৪১, সৌদি আরব হতে।
প্রশ্ন : ইসলাম গ্রহণের পর আপনি কি অনুভব করছেন?

উত্তরঃ আল্লাহর হাজার শোকর যে, তিনি আমাকে ঈমানের অমূল্য সম্পদ প্রদান করেছেন। আমি নিজকে পৃথিবীর এক ভাগ্যবান ও বিজয়ী পুরুষ বলে মনে করি। অজ্ঞানতার দুনিয়ায় আমি ‘ভগবান’ হিসেবে পূজিত ছিলাম, আলোকিত বিশ্বে আমি নিজকে মানুষ হিসেবে খুঁজে পেয়েছি।

প্রশ্নঃ আপনাকে ধন্যবাদ। এখন আপনি মেহেরবানী করে আপনার আগের নাম ও পরিচয় সম্বন্ধে কিছু বলুন?

উত্তরঃ আমার নাম মহানত, ডঃ শিবশক্তি স্বরূপজী মহারাজ উদাসেন, ধর্মচারিয়া, আদ্যশক্তিপীঠ। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আমার পেশা মহানতগিরি। বৃন্দাবনে ‘অনাখন্ড আশ্রম’ নামে আমার বড় আশ্রম ছিল। দ্বিতীয় আশ্রম ছিল বোম্বাইয়ের মুলুনডে। আর তৃতীয় দেবালেইনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই আশ্রমটির নির্মাণ কাজ প্রায় ৫০ একর জমির উপর চলছিল। ‘খালাপ পথে’ চলা মানুষের সুপথে আনার উদ্দেশ্যে শিক্ষাদান’ পথ প্রদর্শন ও শিষ্য তৈরী করা ছিল আমার প্রাত্যাহিক কাজ।

প্রশ্ন: আপনার পান্ডিত্যের খ্যাতি সর্বত্র। আপনি আপনার নিজের সম্পর্কে, নিজের শিক্ষা জীবন ও ধর্মজীবন সম্পর্কে কিছু বলুন।

উত্তরঃ আশ্রমেই আমার শিক্ষার সূচনা হয়। পরে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওরিয়েন্টালিজমে এম.এ। গুরুকুল কাংডি থেকে ‘আচারিয়া’ (আচার্য) পদবী লাভ। বৃটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্বের দশটি প্রধানতম ধর্মের উপর ডক্টর অব ডিভাইনিটি এবং সেই সাথে ওরিয়েন্টালিজমে আরেক পি.এইচ.ডি। পোপ পল-৬ এর আহবানে ইতালী যাই। সেখানে সাতটি বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ দান করি। আমাকে এক মহাসম্মান ভাটিকানের নাগরিত্ব দান করা হয়। এবং খ্রীষ্ট ধর্ম গ্রহণের জন্য বিশেষ অনুরোধ জানান হয়। আমি তদের অনুরোধ উপেক্ষা করে ভারতে এসে বিধিমত মুকুট ধারণ করে আশ্রমের গদিতে বসে পড়ি। আমার জন্ম ১৯৩৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারী। জন্মস্থান মথুরা, বৃন্দাবন। আমি প্রায় ১২টি ভাষা জানি, এর মধ্যে ইংরেজী, সংস্কৃত, গ্রীক, হিন্দি, পালি, গোরমুখী, মারাঠী, গুজরাতি, উর্দু ও আরবী আমার ভাল লাগে। … আগেই বলেছি, আমি দুনিয়ার দশটি প্রধানতম ধর্মের উপর তুলনামূলক পড়াশুনা ও গবেষণা করেছি। সে জন্য সত্য স্বীকারে আমার কোন সংকোচ ছিল না। আমার সমকালীনদের মধ্যে হিন্দু জগতের বড় বড় জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্ব ও পন্ডিত রয়েছেন। যেমন জগৎগুরু শংকরাচার্য, রামগোপাল শারওয়ালে, পুরীর শংকরাচার্য, মহামন্ডেলশ্বর স্বামী অখন্ডানন্দজী, গুরু গোলওয়ালকার বাবা সাহেব দেশমুখ, বালঠাকুরে, অটলবিহারী বাজপায়ী, নানা সাহেব, দেশমুখ, বিনোবা ভাবে এবং অন্যান্য। একবার তিনি তার “পরমধাম” আশ্রমে আমাকে বক্তৃতাদানের বিশেষ আমন্ত্রণ জানান। সেখানে উপস্থিত লোকজনের সামনে দাদা ধর্মাধীকারী আমাকে জিজ্ঞাসা করে বসেনঃ “আপনি পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম সম্বন্ধে পড়াশুনা করেছেন, মানুষের জন্য কোন ধর্ম শ্রেষ্ঠ বলে মনে হয়? আমি জবাবে বলেছিলাম,‘ইসলাম’ আমার জওয়াবে দাদা খুশী হন নাই। তিনি বলেন, উঠেন, “ইসলাম নানা বাধা-বন্ধন আরো করে।” আমি জবাব দিলাম, “যে বন্ধন বাঁধে, সেই বন্ধনই মুক্তি দিতে পারে। আর যে প্রথম থেকে স্বাধীন, তার সারা জীবনের জন্য বন্ধন সৃষ্টি প্রবণতা থেকে যাবে। এ ধরনীতে মানুষকে এক সাথে বেঁধ রাখার জন্য বন্ধনকারী ধর্মের প্রয়োজন রয়েছে, যা তাদের পৃথিবীতে ভাল করে বেঁধে রাখবে এবং পরলোকে মুক্ত করে দেবে। আর এ রকম ধর্ম আমার মতে একমাত্র ইসলামেই রয়েছে। ইসলাম ছাড়া এরকম ধর্ম আমি আর দেখি না।”

প্রশ্নঃ নিজের ইসলাম গ্রহণের কারণ সম্পর্কে কিছু বর্ণনা করুন।

উত্তরঃ ১৯৮৪’র জানুয়ারীর কথা। এক রাত্রে আমি স্বপ্ন দেখলাম। একদল লোক আমাকে ধাওয়া করছে। আমি দৌড়াচ্ছি তারাও দৌড়াচ্ছে। আমি দাঁড়াই, তারাও দাঁড়ায়। হঠাৎ আমি ধাক্কা খেলাম এবং মাটিতে পড়ে গেলাম। দু’টি অজানা হাত আমাকে ধরে দাঁড় করালো। দাঁড়িয়ে এক নূরানী চেহারার দিকে অবাক হয়ে থাকিয়ে রইলাম। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোক আমাকে বললেন, ইনি হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)। আমার শরীর কাঁপতে শুরু করল। নবীজী বললেন, ‘‘কলমা পড়।” আমি কলমা পড়লাম। তিনি আমার ডান হাত নিজের পবিত্র হাতের মধ্যে রেখে যা যা পড়াতে লাগলেন, আমি তা পড়তে লাগলাম। এমনি করে পড়া শেষ হলো। তার পর তিনি আমাকে আলিঙ্গন করলেনঃ আর বললেন, “এ দেশকে কলমা পড়াও।” আমি কতক্ষণ ধরে এ স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা আমার মনে নেই। যখন চোখ খুললাম, দেখলাম রাত তিনটা বাজে। একই রাতে, একই সময়ে আমার স্ত্রীও এ ধরনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। … আমরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নিজেদের প্রথম শতাব্দীর মুসলমান বলে ভাবতে লাগলাম। আমি বিধিসম্মতভাবে মুসলমান হবার উপায় খুঁজতে লাগলাম, এখানে সেখানে ঘুরি, আর মুসলমানদের সাথে সম্পক বাড়াই। চুপিসরে নামায পড়ি। এবাদত বন্দেগী করি। পরিশেষে ভাগ্যক্রমে আলেমদের শহর ভুপাল পৌঁছি। ১৯৮৬-এর ১০ই মে, রমজান মাসের চাঁদ দেখার সাথে সাথে আমি আমার স্ত্রী আর আমার যুবতী কন্যা প্রকাশ্যভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করি। আলহামদুলিল্লাহ

প্রশ্নঃ আপনি বহু ধর্ম অধ্যায়ন করেছেন। ইসলামের পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থে আল্লাহ, কুরআন, মোহাম্মদ (সাঃ) অথবা ইসলাম সম্পর্কে কোন বর্ণনা দেখতে পেয়েছেন?

উত্তরঃ বৌদ্ধ ও জৈন মতবাদ ছাড়া বাকী সব ধর্ম গ্রন্থে আল্লাহ, মোহাম্মদ (সাঃ) অথবা আহমদ নাম পাওয়া যায়। বেদে খুবই স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।

প্রশ্নঃ আপনি লাখ লাখ টাকার সম্পদের মোহ ছেড়ে দিয়ে ইসলাম কবুল করেছেন। বর্তমানে আপনি কিভাবে জীবন নির্বাহ করছেন?

উত্তরঃ আমি সমগ্র বিশ্বের রাজত্বও ইসলামের এই মহান উপহারের বদলে ত্যাগ করতে দ্বিধা বা কুন্ঠাবোধ করতাম না। ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে যে তৃপ্তি আমি পেয়েছি সাতরাজ্যের ধন সম্পদ লাভ করেও তা পাওয়া সম্ভব নয়। আমি আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা করি। আল্লাহ তায়ালার কৃপায় প্যারা মাইক্রো পন্থায় দুরারোগ্য ব্যাধির উপশম ঘটাই। এতেই আমার, আমার পরিবারের ডাল রুটির ব্যবস্থা হয়ে যায়।

প্রশ্নঃ সারওয়ারে কায়েনাত হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে আপনার ধারণা কি?

উত্তরঃ আমি আল্লাহ তায়ালাকে চিনতাম না। আমার জানের কসম, তিনি আমাকে রাব্বে জুলজালালকে চিনিয়ে দিয়ছেন…..।

প্রশ্নঃ ইসলামের সিপাহী হিসেবে আপনি দুনিয়ার মুসলমানদের উদ্দেশ্যে কি বাণী রাখতে চান। …. আপনার মতে মুসলমানদের কেমন হওয়া উচিত?

উত্তর : এ ব্যাপারে নবীজি যা বলেছেন তার চেয়ে ভাল কিছু আর কে বলতে পারে? তিনি মুসলামনদেরকে এমন সোনার টুকরার সাথে তুলনা করেছেন কোন অবস্থায়ই যার ঔজ্জ্বল্য কমে না। আরেক জায়গায় তিনি মুসলমানদের তুলনা করেছেন মধুমক্কীকার সাথে, যা ফুলের উপর গিয়ে বসে, নোংরা জায়গায় বসে না। ফুল থেকে রস চুষে মধু বানায়, বিষ তৈরী করে না। আর তা সে নিজের জন্য নয়, অপরের জন্য তৈরী করে। সে ডালে বসে, সে ডালের কোন ক্ষতি করে না। অন্যত্র তিনি বলেছেন, মুসলমান সেই, যার হাত ও কথা থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।

প্রশ্নঃ আপনার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু বলুন।

উত্তর : স্বার্থপরতার জাল হঠাতে হবে। মুসলিম মুজাহিদদের নতুন শপথ নিয়ে মঠে নামতে হবে। সাহস, নিঃস্বার্থ ঈমান, আর মন-প্রাণ ঢেলে কাজে নামতে হবে। আমার নিজের তরফ থেকে আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টায় আছি। সমগ্র মুসলিম সমাজকে এক দেহ আর এক প্রাণে পরিণত করতে হবে। এ বিষয়ে আমার কার্যক্রম নিম্নরূপ ঃ (১) ইসলামের সুরক্ষা (২) মুসলমানদের দ্বীন-দুনিয়ার মূল্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা (৩) সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তারে ভাষায় ইসলামের দাওয়াত পৌছান।
(দৈনিক ইত্তেফাক, বৃহস্পতিবার, ২৩ বৈশাখ ১৩৯৪)

তিনি সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন, উর্দুতে। তার নাম দিয়েছেন “লিজিয়ে আপভি সোঁচে” এর বাংলা অর্থ- নিন আপনিও চিন্তা করুন। আশা করি হিন্দু বাইয়েরা সত্যই চিন্তা করবেন।