প্রশ্নোত্তর

জুন 2012

প্রম্ন: বিভিন্ন মুসলিম দেশগুলোতে এবং সমাজের অধিকাংশ মানুষ ধুমপানে অভ্যস্ত। ধুমপায়ীদের অনেকে কুরআন তেলাওয়াত করেন এবং নামাযও পড়েন। তাদের নামায কালাম, ঈমানের ভবিষ্যত কি? কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ধুমপানের বিধি-বিধান জানতে চাই। আবু যুবায়ের

উত্তর: ধুমপান একটি অপরাধ (হারাম): কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে আমরা সকলে জানি ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কথাটা অনেকে সেচ্ছায় বলেন অনেকে বলেন বাধ্য হয়ে। যাই হোক ধুমপানের ক্ষতির তোলনায় শ্লোগানতটা খুবই হালকা। কারণ ধুমপান শুধু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, মস্তিস্কের জন্য ক্ষতিকর, আত্মার জন্য ক্ষতিকর, স্বভাব চরিত্রের জন্য ক্ষতিকর, পরিবার-পরিজন, প্রতিবেশি সমাজ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। আমার কাছে এর চাইতে বড় ক্ষতির দিক হল ধুমপানের মাধ্যমে ইসলামের নীতি ও আদর্শ লঙ্ঘন। 

আমাদের দেশের অনেক ধর্মপ্রান মুসলমানদেরকে দেখা যায় ধুমপান করতে। মাথায় টুপি ও গালে দাড়ি আছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে কিন্তু নামাজ শেষে আবার ধুমপানও করে। তাদের যদি এ অবস্থা হয় তাহলে বেনামাজি ও যুবকদের কি অবস্থা চিন্তা করে বলা মুশকিল। এ সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমান ও ধর্মীয় নেতাদের এবং যুবকদের যখন আপনি বলবেন যে ধুমপান জায়েয নয়, তখন তারা তা মানতে চাননা। তারা তখন অনেক যুক্তি দেখায়। তারা বলেন: আল-কুরআনে তো বলা হয়নি ‘তোমরা ধুমপান করোনা।’ হাদীসেও কোথাও নেই যে ‘ধুমপান করা যাবেনা’, তাহলে ধুমপান ইসলামী শরিয়তে নিষিদ্ধ হল কিভাবে? এ প্রশ্নটির উওর দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ পাক নিজেই। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন- “তিনি তোমাদের জন্য হালাল করে দেন ভাল ও উওম বস্তু আর হারাম করে দেন খারাপ ও ক্ষতিকর বস্তু।”(আল-আরাফ: ১৫৭)

এ আয়াতের ভিত্তিতে এমন অনেক জিনিস আছে যা হারাম হয়েছে অথচ তা কুরআনে ও হাদীসে নাম ধরে বলা হয়নি। যেমন-আমরা সাপ খাইনা, কেন খাইনা? কুরআনে ও হাদীসে কি কোথাও আছে যে তোমরা সাপ খেওনা? নেই ঠিকই, কিন্তু উপরের আয়াতের ভিত্তিতে তা হারাম হয়েগেছে। কেননা তা ক্ষতিকর ও খারাপ। ধুমপান ক্ষতিকর ও খারাপ। এ ব্যাপারে দুনিয়ার সুস্থ বিবেক সম্পন্ন সকল মানুষ একমত। কোন স্বাস্থ্য বিজ্ঞানী দ্বি-মত পোষণ করেননি। তারপরেও যদি কেউ বলেন, ধুমপান শরীয়তের নিষিদ্ধ বস্তুর মধ্যে পরেনা তাহলে তাকে ঐ ডায়াবেটিস রোগীর সঙ্গে তুলনা করা যায় যিনি ডাক্তারের নির্দেষে চিনি ত্যাগ করল ঠিকই কিন্তু রসগোল্লা, চমচম, সন্দেশ সবই খেলেন আর বললেন কই ডাক্তার তো এগুলো নিষেধ করেননি!

কুরআনের আলোকে ধুমপান:

 ১. আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন-

“তিনি তোমাদের জন্য হালাল করে দেন ভাল ও উওম বস্তু আর হারাম করে দেন খারাপ ও ক্ষতিকর নোংরা (খাবাইস) বস্তু।” (আল-আরাফ: ১৫৭) আর ধুমপান নিশ্চই খাবাইস এর অন্তর্ভূক্ত, তাই তা পান করা বৈধ (হালাল) নয়। (একদা আমাদের অফিসে আমার পরিচিত একজন লোক ধুমপান করে এসেছে; তার সঙ্গে এমন বিশ্রি গন্ধ যে, সবাই তার দিকে তাকিয়ে রইলো। অথচ আমাদের অফিস ধুমপান মুক্ত এলাকা, এখানকার লোক লোক ধুমপান করেন না। তাকে বললাম, ভাই ধুপমান করা হারাম, আপনি বিষয়টি মানলে তো ভাল কথা। যদি না মানেন, তবে আমাদের অফিসে ধুমপান করে কখনোই আসবেন না।)

২. আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন- “তোমরা নিজেদের জীবন ধ্বংসের সম্মুখীন করোনা।” (সূরা বাকারা: ১৯৫)

এ আয়াতের দাবিতেও ধুমপান নিষেধ। কেননা ধুমপানের কারণে অনেক জীবন বিধংসী রোগ ব্যাধী হয়ে থাকে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মদ ও জুয়া হারাম করতে গিয়ে ইরশাদ করেন-

৩. “তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন, উভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর তার মধ্যে মানুষের উপকারিতাও আছে। তবে এগুলোর পাপ উপকারের চেয়ে বড়।” (বাকারা: ২১৯)

আল্লাহ তাআলার এ বাণী দ্বারা বুঝে আসে মদ জুয়ার মধ্যে উপকারিতা থাকা সত্ত্বেও তা হারাম করেছেন। তাহলে ধুমপান তো মদ জুয়ার চেয়েও জঘন্য। কারণ তাতে কোন ধরনের উপকার নেই। বরং ১০০ ভাগই ক্ষতি।

৪. আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জাহান্নামিদের খাবারের বর্ণনা করতে গিয়ে ইরশাদ করেন- “এটা তাদের পুষ্টিও যোগাবেনা ও ক্ষুধা নিবারণ করবে না।” (আল-গাশিয়াহ: ০৭)

ধুমপানের মধ্যে এ বৈশিষ্টই রয়েছে যে তা পান কারীর পুষ্টিও যোগায় না, ক্ষুধাও নিবারণ করেনা। ধুমপানের তুলনা জাহান্নামের খাবারের সাথেই তুলনা করা যায়।

৫. আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন- “তোমরা অপচয় কর না। অপচয়কারিরা শয়তানের ভাই।” (আল-ইসরা: ২৭)

ধুমপান একটি অপচয়। অনেক এমন অপচয় আছে যাতে মানুষের লাভ-ক্ষতি কিছুই নেই। এগুলো সকলের কাছে অন্যায় ও সর্বসম্মতভাবে তা অপচয় বলে গণ্য। কিন্তু ধুমপান এমন একটি অপচয় যাতে মানুষের কোন লাভ নেই বরং ক্ষতিই বেশি।

হাদীসের আলোকে ধুমপান:

১.    রাসূলে করীম (সা:) বলেন:- “আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তোমাদের তিনটা বিযয় ঘৃণা করেন। ১) ভিত্তিহীন ও সনদ-সূত্রবিহীন কথা-বার্তা। ২) অধিকহারে প্রশ্ন করা। ৩) সম্পদ নষ্ট করা।” (বুখারী ও মুসলিম) ধুমপানকারী ধুমপান করে সম্পদ নষ্ট করে তাতে কারো কোন দ্বি-মত নেই।

২.    রাসূলে করীম (সা:) বলেন:- “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখে সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।” (বুখারী) ধুমপানকারী তার ধুমপানের দ্বারা পরিবার-পরিজন, সহযাত্রী, বন্ধু-বান্ধব ও আশে পাশের লোকজনকে কষ্ট দিয়ে থাকে। অনেকে নীরবে কষ্ট সহ্য করে মনে মনে ধুমপানকারীকে অভিশাপ দেয়। আবার দু’একজন প্রতিবাদ করে বিব্রতকর অবস্থায় পরে যান। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় এ কথা প্রমাণিত  যে ধুমপানকারীর প্রতিবেশী শারীরিকভাবে সমান ক্ষতিগ্রস্থ হন যতটা ধুমপানকারীর নিজের হয়ে থাকে।

৩.    রাসূলে করীম (সা:) বলেন:- “হালাল স্পষ্ট ও হারাম স্পষ্ট। এ দুইয়ের মাঝে আছে সন্দেহজনক বিষয়াবলী। (তা হালাল না হারাম) অনেক মানুষই জানেনা। যে ব্যক্তি এ সন্দেহজনক বিষয়াবলী পরিহার করল, সে তার উর্ম ও স্বাস্থ্য রক্ষা করল। আর যে ব্যক্তি এ সন্দেহজনক বিষয়াবলীতে লিপ্ত হল সে প্রকারান্তরে হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে গেল। (বুখারী ও মুসলিম)

তাই যারা ইসলামের দৃষ্টিতে ধুমপান নিষিদ্ধ হওয়ার কোন প্রমাণ পাচ্ছেন না তাদের কমপক্ষে এ হাদীসটির দিকে দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

নবী করীম (সা:) এরশাদ করেন:- “যে সকল কথা ও কাজ মানুষের কোন উপকারে আসেনা, তা পরিহার করা তার ইসলামের সৌন্দর্য।” (মুসলিম) আমরা সকলেই স্বীকার করি যে ধুমপান কোন উপকারে আসেনা বরং ক্ষতিই করে।

বাস্তবতার আলোকে ধুমপান:

 কোন পাক ঘরে যদি জানালার কাচ থাকে অথবা বাল্ব থাকে তাহলে দেখা যায় ধোয়ার কারণে তাতে ধীরে ধীরে কালো আবরন পরে। এমনই ভাবে ধুমপানকারীর দাতে, মুখে ও ফুসফুসে কালো আবরণ তৈরি হয়। কাচের আবরণ পরিষ্কার করা গেলেও ফুসফুসের কালিমা পরিষ্কার করা যায়না। ফলে তাকে অনেক রোগ-ব্যাধীর স্বীকার হতে হয়। একজন অধুমপায়ী ব্যক্তির চেয়ে একজন ধুমপয়ী বেশি উগ্র মেজাজের হয়ে থাকেন। সমাজে যারা বিভিন্ন অপরাধ করে বেড়ায় তাদের ৯৮% ধুমপান করে থাকে। যারা মাদক দ্রব্য সেবন করে তাদের ৯৫% প্রথমে ধুমপানে অভ্যস্ত হয়েছে তারপর মাদক সেবন আরম্ভ করেছে। এমনকি ধুমপায়ী মায়ের সন্তান উগ্র স্বভাবের হয়ে থাকে। (সূত্র: দৈনিক ইনকিলাব ১৫-১২-২০০০ ইং)

সম্প্রতি উইনকনসিন বিশ্ব বিদ্যালয়ে ৩৭৫০ জন লোকের উপর এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে আধুমপায়ীএর চেয়ে ধুমপায়ীদের শ্রবণশক্তি কমার সম্ভাবনা শতকরা ৭০ ভাগ বেশি থাকে। গবেষণা করে আরো দেখেছেন যে একজন ধুমপায়ীর ধুমপান করার সময়ে কোন অধুমপায়ী পাশে থাকলে তারো একই সমস্যা হতে পারে। (সূত্র: সাপ্তাহিক আরাফাত বর্ষ ৪৫ সংখ্যা ১, ১৮ই আগষ্ট ২০০৩) তাই আসুন সকলে মিলে আমরা আমাদের সমাজকে ধুমপান মুক্ত করার চেষ্টা করি।

প্রশ্ন: মুহতারাম! আচ্ছালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। কেমন আছেন?  আপনাদের  কাছে  আমার  ১টা প্রশ্ন  আছে। তা  হলো. মেয়েদের  পর্দার  আড়ালে  থাকার  নিয়ম,  কিন্তু  তাদের  যখন  বিয়ে দেওয়া  হয়  তখন সেই  মেয়েকে ছেলের পক্ষের লোকেরা  পা থেকে  মাথা  পর্যন্ত  দেখে  পরখ  করে  নেয়। এটা  হাদীসের  দৃষ্টিতে কি  ঠিক  তা  যদি একটু জানাতেন তাহলে খুশি হতাম।  আর মাসিক আল-হুদা কোথায় পাব জানাবেন। জিল্লুর মালিয়া কুয়েত

উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আমরা ভালো আছি, আলহামদুলিল্লাহ। আপনার প্রশ্নে উত্তর সংক্ষেপে নি¤œরূপ: ইসলামের দৃষ্টিতে পাত্রী দেখার ব্যাপারে রাসূল (সা.) থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে : জাবের ইবন আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, অতঃপর তার পক্ষে যদি ওই নারীর এতটুকু সৌন্দর্য দেখা সম্ভব হয়, যা তাকে মুগ্ধ করে এবং মেয়েটিকে (বিবাহ করতে) উদ্বুদ্ধ করে, সে যেন তা দেখে নেয়।’ 

অপর এক হাদীসে রয়েছে, আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ছিলাম। এমতাবস্থায় তাঁর কাছে এক ব্যক্তি এসে জানাল যে সে একজন আনসারী মেয়েকে বিয়ে করেছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি তাকে দেখেছো?’ সে বললো, না। তিনি বললেন, যাও, তুমি গিয়ে তাকে দেখে নাও। কারণ আনসারীদের চোখে (সমস্যা) কিছু একটা রয়েছে।’ ইমাম নববী রহ. বলেন, ‘এ হাদীস থেকে জানা যায়, যাকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক তাকে দেখে নেয়া মুস্তাহাব।’

 

প্রশ্ন: আপন ভাগনীর মেয়েকে (নাতনী) বিয়ে করা শরীয়ত মতে জায়েয আছে কি-না? জানতে চাই। আমাদের এলাকায় এমন একটি ঘটনা ঘটেছে। এখন আমার প্রশ্ন হলো, যদি বিয়ে হারাম হয় তাহলে, তারা যে ঘর সংসার করছে, এটা কি যেনার অন্তর্ভুক্ত নয়? তাদের ঘরে সন্তান হলে, সেই সন্তানটির কি বৈধ স্বীকৃতি থাকবে? আমার উত্তরটি হ্যাঁ বা না বলে জানাবেন। যদি না হয় তাহলে তাদের করণীয় কি? তাদের ‘সম্পর্ক’ কি বিচ্ছিন্ন করতে হবে? মুহাম্মদ নয়ন মিয়া, হাসাবিয়া :

উত্তর: আপন ভাগনীর মেয়েকে বিয়ে করা জায়েয নাই। আল্লাহ বলেন; ভায়ের মেয়ে এবং বোনের মেয়েকে বিয়েকে করা হারাম করা হয়েছে। এভাবে তাদের ধরাবাহিকতা যত নিচে যাবে তারাও এই হারামের অন্তর্ভুক্ত। আপনার এলাকায় যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা সম্পূর্ণ শরীয়ত পরিপন্থি হয়েছে, এক্ষুণি তাদের বিয়ে ভেঙ্গে দিতে। তাদের ঘর সংসার করা সম্পূর্ণ অবৈধ, যেনার আওতায় পড়বে। তাদের ঘরে কোন সন্তান হলে সে বৈধতার স্বীকৃতি পাবে না। কারণ তাদের বিয়ে সকল ইমামের মতে অবৈধ ছিল। সুতরাং অবৈধ বিয়ের মাধ্যমে সন্তান হলে সেই সন্তানের কোন বৈধ স্বীকৃতি পায় না। সূত্র মারকাজুল ফাতাওয়া: ২৭৫৩৬