নও মুসলিমের কাহিনী

রাধারাণীকে তিনবার দেখেছি আমি। তিন রূপে। আর ভুলতে পারিনি, পারবও না কোনদিন মনে হয়। তখন আমি প্রথম বর্ষের ছাত্রী। কল্পনাদের বাসায় প্রায়ই যাই। সেদিন গিয়ে দেখি কল্পনাদের বাসায় মেহমান এসেছে। অপূর্ব সুন্দর একটি ১৪/১৫ বছরের মেয়ে কল্পনার পাশে বসে আছে। আমি এত সুন্দর কালো মেয়ে কোনদিন দেখিনি। আমাকে দেখে বলল, ‘আপনি বুঝি শিরিন আপু?’ কণ্ঠস্বর তো নয় যেন সুরের মূর্ছনা ঝরে পড়ল। কথা বলার ধরন, মুখের হাসি, চোখের চাউনি সব কিছু মিলিয়ে সত্যি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকার মত ছবি।
আমি মুগ্ধ কণ্ঠে বললাম, ‘তুমি কী করে বুঝলে’?
‘এতক্ষণ কল্পনাদি’র সাথে আপনার কথাই হচ্ছিল।’ মেয়েটি কল্পনার ফুফাতো বোন। বেড়াতে এসেছে। একেই বোধ হয় বলে ‘আল্লাহ পাক নিজহাতে তৈরি করেছেন।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কী?
ঃ রাধারাণী।
কল্পনা বলল, ‘জানিস ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে, বরটির নাম নবকৃষ্ণ।’
তাই বুঝি? হাসলাম আমি। রাধারাণীও হাসল। রাধারাণীর বিয়ের কথা শুনে আমার ভালো লাগল না। বললাম, এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে দেবে কেন? কোন ক্লাসে পড়ে?
‘ক্লাস নাইনে।’ রাধারাণীই উত্তর দিল।
ঃ এস.এস.সি টা পাস করো, তারপর বিয়ে হোক।
ঃ আমি কী করব বলেন? বাবা-মা কি তা মানবে? বলে হাসল রাধারাণী।
রাধারাণীর মুখখানি আমার মনের ক্যানভাসে আঁকা হয়ে থাকল। এর কিছুদিন পরেই শুনলাম রাধারাণীর বিয়ে হয়ে গেছে। প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার নবকৃষ্ণ দাসের সাথে।
বছরখানেক পর রাধারাণীর সাথে আবার দেখা হল। কল্পনাদের বাসায়ই। স্বামীর সাথে বেড়াতে এসেছে। রাধারাণীকে দেখার জন্য মনটা যেন আমার অস্থির হয়েছিল। আমাকে দেখে রাধারাণী হাসলো। একেই মনে হয় বলে ভুবন মোহিনী হাসি। কাছে এসে বলল, কেমন আছেন শিরীন আপু?
আমি হাত ধরে বললাম, ‘ভালো আছি বোন। তুমি কেমন আছ?’ রাধারাণীর মুখটা ম্লান হয়ে উঠলো। ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, ভালই আছি আপু।
ওর বরটা আমার পছন্দ হলো না। কেমন যেন কাঠখোট্টা ধরনের মনে হল। এত সুন্দর রাধারাণীর পাশে যেন সত্যি বেমানান।
কল্পনার কাছে শুনলাম রাধারাণী শান্তিতে নেই। বিয়ের সময় ৫০ হাজার টাকা যৌতুক দেওয়ার কথা ছিল। রাধারাণীর বাবা ৩০ হাজার টাকা দিয়েছে আর ২০ হাজার এখনো দিতে পারেনি। তাই প্রায়ই রাধারাণীকে কথা শুনতে হয়। আমি রাধারাণীর মুখখানি তুলে ধলে বললাম, এ সুন্দর মুখের দিকে তাকালে তো সব ভুলে যাওয়ার কথা, টাকা কথা বলে কী করে? তোমার কৃষ্ণ কী বলে?
‘শিরীন আপু, আপনি যখন আমাকে সুন্দর বলেন, তখন মনে হয় আমি সত্যি সুন্দর। আমার শাশুড়ি বলে, পেতœীমার্কা মেয়ে। ৫০ হাজার টাকা নগদ দেবে বলেই তো আমরা এ বিয়েতে রাজি হয়েছি, নইলে কেন ঐ পেতœীমার্কা বউ আনবো ছেলের জন্য?
‘তোমার কৃষ্ণ কী বলে?’
ওতো সেই কৃষ্ণ না আপু, ও হলো নবকৃষ্ণ। ওর হাতে বাঁশি নেই, বাঁশ আছে। কোনদিন যে আমার গলায় ফাঁস পরাবে তাই ভাবছি। হাসতে হাসতে বলল রাধারাণী।
আমি রাধারাণীর হাতটি ধরে পাশে বসালাম। বললাম, ছি বোন, ওসব কথা বলতে হয় না। তোমার গলায় কেন ফাঁস পড়বে?
রাধারাণীর বড় বড় চোখ দুটিতে পানিতে ভরে গেল। আঁচলে চোখ মুছে বলল, কল্পনা দি’দের বাসায় বেড়াতে এসেছি শুধু আপনার সাথে দেখা করার জন্য। গতকাল আসার পর থেকে আপনাদের বাসায় যাওয়ার জন্যে যে কতবার চেষ্টা করলাম। আমার নবকৃষ্ণ যখন জানতে পারল আমি একজন মুসলমান মেয়ের সাথে দেখা করতে চাচ্ছি, তখনই রাগে ক্ষেপে উঠল। বলল, একটা মুসলমানের সাথে দেখা করার কী প্রয়োজন তোমার? আমি ভয়ে আর কথা বলিনি। তাই আপনাকে আসতে খবর দিয়েছি। শিরীন আপু আপনার সাথে মনে হয় আমার আর দেখা হবে না!
রাধারাণীর চোখ দুটি আবার পানিতে ভরে উঠল। আমি ব্যথিত কণ্ঠে বললাম, তোমরা কি দূরে কোথাও চলে যাচ্ছ?
রাধারাণী মাথা নেড়ে জানাল, ‘না’। তারপর উঠে দরজায় খিল লাগিয়ে দিল। আমার কাছে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে বলল, আপু আপনার সাথে খুব জরুরি কিছু কথা আছে আমার, বলে কী যেন ভাবল। মনে হচ্ছে, মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। তারপর চোখমুখ উজ্জ্বল করে বলল, ‘আপু! আমি মুসলমান হব।’
আমি চমকে উঠলাম, ‘কী বলছ এসব?’
জানেন আপু আপনাকে যেদিন প্রথম দেখি, সেদিন আমার মনে হয়েছিল পূর্বজন্মে বুঝি আপনি আমার মায়ের পেটের বোন ছিলেন।
আমি বাধা দিয়ে বললাম, পূর্বজন্ম বলে কিছু নেই পাগল মেয়ে। আদর করে তার পিঠে হাত রাখলাম।
‘তা না থাক আপু, ইসলাম ধর্ম আমার ভীষণ ভালো লাগে আপু। কত উদার আর মহৎ ধর্ম। মেয়েদের কত সম্মান করা হয়। আমাদের পাশের বাড়ির শারমিনের বিয়ে হল আপু। বিয়ের গহনা শাড়ি উপরন্তু আরও ১৫ খানা শাড়ি এনেছে বরযাত্রীরা দাদী, নানী, খালা, ফুফুদের জন্য। তারপর ১ লাখ টাকা মোহরানা ৫০ হাজার টাকা নগদ দিয়েছে আর পঞ্চাশ হাজার টাকা পরে দিবে। এখন দিতে পারেনি বলে বাসররাতে ওর স্বামী ওর কাছে মাফ চেয়েছে আপু। বিয়ের পরেই শারমিন ধনী হয়ে গেছে। ওর নাকি এখন যাকাত দিতে হবে। এই তো গত রমজান মাসে ওর একটা গরিব চাচাতো বোন আছে তাকে ৫ হাজার টাকা যাকাত দিল। আর আমার কথা ভাবেন। আমার বাবা শারমিনের বাবার মতই গরিব মানুষ। আমাকে বিয়ে দিয়ে আরও পথে নেমে গেল। আমার বিয়ের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ শারমিনের বিপরীত। গহনা, শাড়ি আরও ১০ খানা শাড়ি, নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকা, জামাইর পোশাক, ঘড়ি, আংটি, গলার চেইন আরও যে কত কী সব দিতে হয়েছে। শারমিনকে বললাম, তোর বরকে তোর বাবা কী দিয়েছে? শারমিন বলল, সোনা পরা তো পুরুষদের জন্য হারাম। তাই শুধু একটা ঘড়ি দিয়েছে। তা ওর স্বামী বলেছে আমি কোন যৌতুক নেব না। যৌতুক হারাম। পাশাপাশি বাড়িতে বাস করে তোমাদের জন্য হারাম আর আমাদের জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হয়ে গেল কেন আপু? আমি একটি জিনিস বুঝেছি আপু, যে ধর্ম দুনিয়াতে মানুষকে শান্তি দিতে পারে না সেই ধর্ম কী করে পরকালে শান্তি দেবে?
কণ্ঠস্বর আরও নিচু করে বলল, আমি মুসলমান হয়ে গেছি আপু। শারমিনই আমাকে বলেছিল, কালেমা শাহাদাত পড়লে মুসলমান হওয়া যায়। আমি ওর ইসলাম শিক্ষা বই থেকে কালেমা মুখস্থ করেছি। পাঁচবার যখনই আজান হয় আমি অজু করে পশ্চিম দিকে মুখ করে সেজদা দেই আর কালেমা পড়ি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই হিন্দু পরিবেশে আমি আর থাকবো না। আমি আত্মহত্যা করে আল্লাহর কাছে চলে যাব।
আমি আর্তনাদ করে উঠলাম। ‘নানা আত্মহত্যা করা মহাপাপ। আত্মহত্যা করে আল্লাহর কাছে যাওয়া যায় না রাধারাণী।’
‘ও তাই! আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। তাহলে আত্মহত্যা করবো না। দেখ তোমাকে না জানালে আমি জানতেই পারতাম না, আত্মহত্যা করে বসতাম। জান আপু, আমি আমার নামও পরিবর্তন করেছি। আমার নাম রেখেছি আয়েশা। রাসূল (সা.)-এর প্রিয়তমা স্ত্রীর নাম।
আমার নবকৃষ্ণ যদি জানতে পারে আমার আত্মহত্যা করা লাগবে না, ওরাই আমাকে মেরে ফেলবে। বলে হাসতে লাগলো রাধারাণী। কী সুন্দর পবিত্র সে হাসি! আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম নও-মুসলিম আয়েশার দিকে। বিদায় নেওয়ার সময় হাত ধরে গভীর আবেগে চুপিচুপি বললাম, ‘আস্সালামু আলাইকুম।’
আয়েশা ‘ওয়ালাইকুমুস সালাম’ বলে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি ওর কপালে চুমু খেয়ে চলে এলাম।
প্রায় দু’মাস হয়ে গেছে। সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। খুব ব্যস্ত পড়াশোনা নিয়ে। কলেজেও যাওয়া হয় না, কল্পনার সাথেও দেখা হয় না। রাধারাণীর খোঁজও নিতে পারিনি। হঠাৎ একদিন কল্পনা এল। মুখ খুব ভার ভার লাগছে। আমি কাছে এসে বললাম, কী রে কল্পনা, কী খবর?
কল্পনা আমার হাত ধরে বলল, চল রাধারাণীকে দেখে আসি।
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কোথায় রাধারাণী? কী হয়েছে রাধারাণীর?’
হাসপাতালে, রাধারাণী আত্মহত্যা করেছে।
আমি পাগলের মত চিৎকার করে উঠলাম, না, না রাধারাণী আত্মহত্যা করেনি, করতে পারে না। ওকে খুন করা হয়েছে।
হাসপাতালের বেডে সাদা চাদরে ঢাকা রাধারাণী। মুখের ওপর থেকে চাদরটা সরাতেই দেখলাম কী নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে আছে আয়েশা। অনিন্দসুন্দর। চোখ দুটি এখনই বুঝি খুলে যাবে। তারপর গোলাপ পাপড়ি ঠোঁট দুটিতে হাসি ফুটিয়ে বলবে, ‘আস্সালামু আলাইকুম। শিরীন আপু, তুমি কেমন আছ?
ওর শাশুড়ি শুকনো চোখে হাউমাউ করছিল। নবকৃষ্ণকে কোথাও দেখলাম না। ওর বাবা বসে আছে মেঝেতে। বিধ্বস্ত চেহারা। মূর্তিমান বেদনা যেন। আমি রাধারাণীর মুখের ওপর থেকে কাপড় সরাতেই কাছে এসে দাঁড়ালেন, জোরে কেঁদে উঠলেন, ‘মা রে, আমি তো তোর কথা মেনেছি, তারপর কেন আত্মহত্যা করলিরে মা…’!
রাধারাণীর বাবার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না। পায়ের কাছে বসে ১০/১২ বছরের একটি মেয়ে কাঁদছিল ব্যাকুল হয়ে। মেয়েটিকে চিনি না। বললাম, তুমি কে? কী হও রাধারাণীর?
‘আমি কিছুই হই না, ওদের বাসায় কাজ করি।’
ওর হাত ধরে একপ্রান্তে চলে গেলাম। তারপর বললাম, রাধারাণী কেন আত্মহত্যা করল জান?
বৌদিমণি আত্মহত্যা করেনি, বৌদিমণির পেটে বাচ্চা তো। দাদাবাবু যেই জোরে লাথি মারল, বৌদিমণি তখনই নেতিয়ে পড়ে গেল। আমি দৌড়ে যেয়ে ধরলাম, মাথায় জল দিলাম। আমাকে ওরা সবাই ঘর থেকে বের করে দিল। কিছুক্ষণ পরে সবাই বলতে লাগল, বৌদিমণি আত্মহত্যা করেছে। বৌদিমণি যে কত ভাল মানুষ ছিল গো দিদি! বলে মেয়েটি কাঁদতে লাগলো।
আমি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললাম, ‘কেন নবকৃষ্ণ লাথি মারল তা কি জান?’
‘জানি। বৌদির বাবা যৌতুকের সব টাকা তো দিতে পারেনি, তাই বৌদিকে খুব কথা শুনতে হতো। সবাই বৌদির বাবাকে জোচ্চোর বলত। বৌদি খুব কষ্ট পেত, মাঝে মাঝে রাগ করে খেত না, ওরাও ডাকতো না।
ঐ দিন বৌদির বাবা বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে গেছিল জামাইকে দেবার জন্য। দাদা তখন বাড়িতে ছিল না। বৌদি যখন শুনল বাড়ি বন্ধক রেখে টাকা এনেছে তখন বৌদি বলল, তুমি বাড়ি বন্ধক রেখে কেন টাকা এনেছ? আমার ছোট ভাই বোনেরা কোথায় থাকবে? এদের কেন টাকা দিতে হবে? এদের তুমি আর এক পয়সাও দিতে পারবে না, যদি তুমি এই টাকা এদের দাও বিশ্বাস কর বাবা, আমি আত্মহত্যা করব।’
ওনার বাবা বললেন, ‘তোর ওপর যে অত্যাচার করে মা তাতো আমি সহ্য করতে পারি না।
করুক, কত আর করবে!
বৌদির বাবা টাকা নিয়ে চলে যেতেই দাদাবাবু বাড়ি এল। দাদাবাবুর মা সত্য মিথ্যা কত কথা যে বানিয়ে বলল। দাদা বাবুও তখন রেগে গেল। তখন বেলা প্রায় ১২টা বেজে গেছে। তখনও পেটে একফোঁটা জল পড়েনি বৌদির। দাদাবাবু বারবার বলতে লাগল, টাকা ফেরত দিয়েছিস কেন? বল, কেন ফেরত দিয়েছিস? বৌদি কথা বলছিল না।
তারপর দাদাবাবু পরপর দুটি লাথি বসিয়ে দিল বৌদির তলপেটে। বলে মেয়েটা কান্নায় ভেঙে পড়ল।
হঠাৎ মেয়েটা কান্না থামিয়ে আমার কাছে আরও সরে এসে বলল, আপনি তো শিরীন আপু তাই না?
আমি বললাম, হ্যাঁ। মেয়েটি চতুর্দিক সতর্ক দৃষ্টিতে দেখল। তারপর বলল, বৌদিমণি তোমাকে একটা চিঠি দিয়েছে, বলে একটা খাম আমার হাতে দিল। আমি দ্রুতহাতে খাম থেকে চিঠিটা বের করলাম।
ঝকঝকে হাতের লেখা। রাধারাণী লিখেছে, ‘শিরীন আপু, সালাম নিও। নবকৃষ্ণ আমার মুসলমান হওয়ার কথা মনে হচ্ছে জেনে গেছে। কয়েকদিন ধরে ও আমার সাথে খুবই খারাপ ব্যবহার করছে। তারপর আজও বাবা যৌতুকের সব টাকা দিতে পারেনি। ওর মা ওর জন্য মেয়ে পছন্দ করেছে। তারা অনেক যৌতুক দেবে। যা হোক যেজন্য তোমাকে লিখছি। আমার শরীর খুব খারাপ। যদি মরে যাই কিংবা ওরা আমাকে মেরে ফেলে আমার লাশ যেন কেউ আগুনে পোড়াতে না পারে। মুসলমানদের গোরস্থানে আমাকে কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করো যেভাবে পারো। আমি বাবাকেও একটা চিঠি দিয়েছি। বাবা বাধা দেবে না।
আখিরাতে দেখা হবে নিশ্চয়ই!
তোমার বোন
আয়েশা।
আমাদের পারিবারিক গোরস্থানে আয়েশাকে কবর দেওয়া হয়েছে। আয়েশা যে আমারই বোন!

যে গল্পে প্রেরণা যোগায়- ক্ষমা করা হবে তবে একটি শর্তে

প্রাচীনকালের একটি ঘটনা। এক ব্যক্তি কারো বাগানে প্রবেশ করল। সে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ছিল। ক্ষুধায় তার প্রাণ চলে যাবার উপক্রম। সে ক্ষুধা মিটানোর জন্যে গাছের দিকে তাকালো। বাগানে আপেলের গাছ দেখতে পেল।
সুতরাং সে হাত বাড়িয়ে একটি আপেল নিল এবং তার অর্ধেক খেয়ে নিল। এর পর বাগানের পার্শ্বেই এক নদী ছিল তা থেকে পানি পান করে তৃষ্ণা মিটাল; অল্পক্ষইের মধ্যে সে সচেতন হল। কেননা প্রচণ্ড ক্ষুধার তারনাই সে ফল আহারের আগে ভাবতে পারেনি। এখন যখন তার শরীরে শক্তি ফিরে পেল ভাবতে লাগল এবং নিজেকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলঃ তুমি নিপাত যাও! বিনা অনুমতিতে কারো গাছের ফল খাওয়া কি করে বৈধ হতে পারে?
অতঃপর সে শপথ করল যে, যতক্ষণ বাগানের মালিকের সাথে সাক্ষাত করে ক্ষমা না চাইবে ততক্ষণ সে আর বাড়ি ফিরে যাবেনা। সুতরাং সে বাগানের মালিকের খোঁজে বের হয়ে তার বাড়ি পৌঁছল এবং দরজায় আওয়াজ করল। মালিক ঘর থেকে বের হলে সে তার আগমনের উদ্দেশ্য বিস্তারিত ব্যক্ত করল ঃ মূলতঃ আমি খুব ক্ষুধার্ত ছিলাম। এজন্য নদীর তীরে অবস্থিত আপনার বাগান থেকে একটি আপেলের অর্ধেক আপনার অনুমতি ছাড়া খেয়েছি। এর পর আমার মনে পড়ল যে, এই আপেল আমি অনুমতি ছাড়া খেয়েছি যা আমার জন্যে বৈধ নয়।
এজন্যে আমি আপনার কাছে এসেছি যাতে আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিবেন না হয় এর বিনিময় নিয়ে নিন। বাগানের মালিক তার কথায় বিশ্বাস করছিল না যে, দুনিয়াতে এমন পরহেজগার ব্যক্তিও আছে। এর পর হঠাৎ তার একটি বিষয় খেয়াল হল এবং যুবককে বললঃ আমি তোমার ভুল ক্ষমা করতে পারি। আর ক্ষমা করার একটিই পন্থা তা হল তুমি আমার একটি শর্ত পূর্ণ করবে।
যুবক বললঃ কি সেই শর্ত? বলুন; বাগানের মালিক বললঃ আমার শর্ত হল যে, আমার কন্যাকে তোমার বিয়ে করতে হবে।
যুবক কিছুক্ষণ ভাবল এবং মাথা হেলিয়ে একমত প্রকাশ করল। মালিক বললঃ এত খুশী হওয়ার কারণ নেই। আমার কন্যা অন্ধ, বোবা এবং কানে শুনেনা। আমি অনেক কাল থেকে তার জন্য পাত্র খুঁজছিলাম; কিন্তু কোন উপযুক্ত পাত্র পাচ্ছিলাম না। যুবক তা শুনে চিন্তিত হল যে, এই বিপদ থেকে উদ্ধারের কি পথ আছে এবং এ অবস্থায় আমি কি করতে পারি। এর পর সে ভাবল এমন মেয়ের সাথে বিয়ে করে পরীক্ষায় নিপতিত হওয়া অবৈধ পন্থায় ফল খেয়ে জাহান্নামী হওয়ার চেয়ে উত্তম। আর এই দুনিয়ার জীবনতো স¦ল্পকালীন; কিন্তু আখিরাতের জীবন অনন্তকাল। তাই কেন দুনিয়ার কষ্ট বেছে নিবনা। সুতরাং অনিচ্ছা সত্ত্বেও আল্লাহর রেজামন্দি হাসিলের জন্য এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল।
যখন বিয়ে আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হল তখন বাসর রাতে তার চেহারায় অমানিশার অন্ধকার ছেয়ে গেল। সে বার বার ভাবছিল যে, এমন মেয়ে যে কথা বলতে পারেনা, শুনতে পারেনা, এমন বোবা অন্ধের কাছে কি করে যাবে? এই পরিস্থিতিতে তাকদীরের উপর নির্ভর করে রাযী হয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করে বললঃ “লা-হাওলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লা, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না-ইলাইহি রাজিউন।”

“বাসর রাতে যখন তার স্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের জন্যে নব বধূর কুঠরিতে প্রবশ করল তখন নব বধূ তার অভ্যর্থনার জন্যে দাঁড়িয়ে গেল এবং বললঃ আসসালামুআলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।”
যখন যুবক দেখল যে, তার সামনে এক অতীব সুন্দরী তার সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সঠিক আছে তখন যুবক কিছুক্ষণ থেমে বললঃ ওয়া আলাইকুমুস সালাম”
আমাকে তো বলা হয়েছিল যে, তুমি অন্ধ, বোবা, কানে শুননা।
মেয়েটি বললঃ আমার শ্রদ্ধেয় পিতা আপনাকে যা কিছু বলেছেন তা সবই সত্য ।

যুবক বলল আমাকে এ বিষয়ের মূল বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত কর যা তোমার পিতা আমাকে বলেছিলেন।
সে উত্তর দিলঃ আমার বাবা আমার ব্যাপারে বোবা বলেছেন এ জন্য যে, আমি কখনো শরীয়ত বিরোধী কথা বলিনি আর না আমি কোন পরপুরুষের সাথে কথা বলেছি।
আর আমার বাবা আমার ব্যাপারে বলেছেন যে আমি কানে শুনিনা তা এ জন্য যে, আমি কখনো এমন বৈঠকে বসিনি যেখানে গীবত, চোগলখোরী এবং অর্থহীন কথা-বার্তায় মজলিশের আলোচনার বিষয় হয়।
আমি অন্ধ এর অর্থ হল যে, আমি এমন ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি দেইনি যে আমার জন্য বৈধ নয়।
পাঠক! আপনারা কি জানেন এই যুবক কে ছিলেন? তিনি ছিলেন সাবেত বিন নোমান। আর এই পরহেজগার ব্যক্তির জীবনে যে স্ত্রী মিলেছিল তার বিষয়ে আপনারা জানতে পারলেন যে, সে কেমন পরহেজগার ও ধার্মিক নারী ছিলেন।
আর এই পবিত্র জোড়া থেকে সেই মহৎ ব্যক্তির জম্ম হয়, যিনি দুনিয়ার আকাশের উজ্জল নক্ষত্র যাকে বিশ্ব মুসলিম ইমাম আযম আবু হানীফা নোমান বিন সাবেত (রা.) বলে জানে।