ইসলামে আকীকা করার বিধানঃ কোরবানীর গরুর সাথে ভাগে আকীকা দেয়া কি বৈধ?

ভূমিকাঃ المقدمة  সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের জন্য দ্বীন ইসলামকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। দরূদ ও শান্তির অবিরাম ধারা বর্ষিত হোক নবীকুল শিরোমণী মুহাম্মাদ (সাঃ) এবং তাঁর পবিত্র বংশধর ও সম্মানিত সাথীদের উপর। ইসলাম একটি শান্তিময় জীবন বিধান। নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মৃত্যু বরণ করার পূর্বেই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই দ্বীনকে মুসলমানদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। একজন মানুষের জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলাম সুন্দর সুন্দর বিধান প্রদান করেছে। নবজাতক শিশু জন্ম গ্রহণ করার পর সন্তানের পিতা-মাতা বা তার অভিবাবকের উপর আকীকার বিধান ইসলামের সৌন্দর্যময় বিধান সমূহের মধ্য হতে অন্যতম একটি বিধান। আমরা অত্র প্রবন্ধে ইসলামে আকীকার বিধান সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করব, ইনশা-আল্লাহ। আকীকার অর্থঃ تعريف العقيقة ইসলামের পরিভাষায় সন্তান জন্ম গ্রহণ করার পর আল্লাহর শুকরিয়া ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যে পশু জবাই করা হয়, তাকে আকীকা বলা হয়।

আকীকার হুকুমঃ حكم العقيقة অধিকাংশ আলেমের মতে সন্তানের আকীকা করা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। রাসূসুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ

(من أحب منكم أن ينسك عن ولده فليفعل)

“যে ব্যক্তি তার সন্তানের আকীকা করতে চায়, সে যেন উহা পালন করে”। (আহমাদ ও আবু দাউদ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরও বলেনঃ

(كل غلام رهينة بعقيقته)

প্রতিটি সন্তানই আকীকার বিনিময়ে আটক থাকে”। (আহমাদ, তিরমিজী ও অন্যান্য সুনান গ্রন্থ) আকীকার বিনিময়ে সন্তান আটক থাকার ব্যাপারে আলেমগণের কয়েক ধরণের বক্তব্য রয়েছে। এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ বিন হান্বালের কথাটি সবচেয়ে সুন্দর ও বিশুদ্ধ। তিনি বলেন, কথাটি শাফাআতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ আকীকা দেওয়া হয়নি, এমন শিশু সন্তান যদি মৃত্যু বরণ করে, কিয়ামতের দিনে সে শিশুর শাফাআত থেকে পিতা-মাতা বঞ্চিত হবে। আর হাদীসে একথা প্রমাণিত আছে যে, মুসলমানদের যে সমস্ত শিশু বাচ্চা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পূর্বেই মৃত্যু বরণ করবে, তারা তাদের মুসলিম পিতা-মাতার জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করবে। উপরের আলোচনা থেকে প্রমাণিত হলো যে, সন্তানের আকীকা সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। ওয়াজিব বা ফরজ নয়।

আকীকা করার সময়ঃ وقت العقيقة  আকীকার জন্য উত্তম সময় হলো সন্তান ভুমিষ্ঠ হওয়ার সপ্তম দিবস। সপ্তম দিনে আকীকা দিতে না পারলে ১৪ম দিনে, তা করতে না পারলে ২১ম দিনে আকীকা প্রদান করবে। সপ্তম দিনে আকীকা করার সাথে সাথে সন্তানের সুন্দর নাম রাখা, মাথার চুল কামানো এবং চুল এর সমপরিমাণ ওজনের রৌপ্য ছাদকাহ করাও মুস্তাহাব। (তিরমিজী) বিনা কারণে আকীকা দেওয়াতে বিলম্ব করা সুন্নাতের বিরোধীতা করার অন্তর্ভুক্ত। দারিদ্র বা অন্য কোন কারণে যদি উল্লেখিত দিন গুলোতে আকীকা করতে অক্ষম হয়, তবে সন্তান ছোট থাকা অবস্থায় যখনই অভাব দূর হবে, তখনই আকীকা করতে হবে। অভাবের কারণে যদি কোন লোক তার শিশু ছেলে-মেয়েদের আকীকা করতে না পারে, তাহলে সন্তান বড় হওয়ার পর যদি তার আর্থিক অবস্থা ভাল হয়, তখন আকীকা করলেও সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে এবং পিতা- মাতা ছাওয়াব পাবে, ইনশাআল্লাহ। এমন কি কারও পিতা-মাতা যদি আকীকা না করে, সে ব্যক্তি বড় হয়ে নিজের আকীকা নিজে করলেও সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। আনাছ (রাঃ) হতে বর্ণিত,

(أن النبي صلى الله عليه وسلم عق نفسه بعد البعثة)

“ নবী (সাঃ) নবুওয়াত পাওয়ার পর নিজের আকীকা নিজে করেছেন”। (বায়হাকী) এ হাদীস থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর নিজের আকীকা নিজে দেওয়া বৈধ হওয়ার উপর সুস্পষ্ট দলীল পাওয়া যায়।

কোন ধরণের পশু দিয়ে আকীকা করতে হবে? সংখ্যা কয়টি? نوعية المواشي في العقيقة وعددها আকীকার ক্ষেত্রে সুন্নাত হলো, ছেলে সন্তান হলে দু‘টি দুম্বা বা ছাগল আর মেয়ে সন্তান হলে একটি দুম্বা বা ছাগল দিয়ে আকীকা করা। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ

(عن الغلام شاتان مكافئتان وعن الجارية شاة)

“ছেলে সন্তানের পক্ষ থেকে দু‘টি সমবয়সের ছাগল এবং মেয়ে সন্তানের পক্ষ থেকে একটি ছাগল দিয়ে আকীকা দিতে হবে। (আহমাদ ও তিরমিজী) যে ধরণের ও বয়সের ছাগল বা দুম্বা কুরবানীর ক্ষেত্রে বৈধ, তা দিয়ে আকীকা করতে হবে। অর্থাৎ কুরবানীর পশু যেসমস্ত দোষ-ত্রুটি হতে মুক্ত হওয়া শর্ত, আকীকার ছাগল-খাসী বা দুম্বাও সেসমস্ত দোষ-ত্রুটি হতে মুক্ত হতে হবে। আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে যদি ছেলে সন্তানের পক্ষ থেকে দু‘টি ছাগল দিয়ে আকীকা দিতে না পারে, তবে একটি দিয়ে আকীকা দিলেও চলবে। কেননা রাসূল (সাঃ) হতে ছেলে সন্তানের পক্ষ থেকে একটি করে দুম্বা দিয়ে আকীকা করার কথাও প্রমাণিত আছে। ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত,

(أن رسول الله صلى الله عليه وسلم عق عن الحسن والحسين كبشا كبشا)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হাসান এবং হুসাইসের পক্ষ হতে একটি করে দুম্বা আকীকা করেছেন। (আবু দাউদ) তবে সামর্থবান ব্যক্তির পক্ষে একটি ছাগল দিয়ে ছেলে সন্তানের আকীকা করা উচিৎ নয়। মোট কথা, ছেলে সন্তানের আকীকার জন্য দু‘টি ছাগল বা দুম্বা হওয়া জরুরী নয়; বরং মুস্তাহাব।

আকীকার গোশত কি করবে? لحوم العقيقة আকীকার গোশত কুরবানীর গোশতের মতই। তা নিজে খাবে, আত্মীয় স্বজনকে খাওয়াবে এবং গরীব-মিসকীনকে ছাদকা করবে। তবে যেমনভাবে কুরবানীর গোশত তিন ভাগ করে একভাগ নিজে খাওয়া, একভাগ ছাদকা করা এবং এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনকে হাদীয়া হিসাবে দান করা জরুরী নয়, ঠিক তেমনিভাবে আকীকার গোশতও উক্ত নিয়মে তিন ভাগ করা জরুরী নয়। আকীকার গোশত যদি সম্পূর্ণটাই রান্না করে এবং আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব এবং অন্যান্য মুসলমানদেরকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়ায় তাতেও যথেষ্ট হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যে, কোন ক্রমেই যাতে হাদীয়া ও উপহারের আশায় শুধুমাত্র ধনী ও সম্মানী লোকদেরকে দাওয়াত দিয়ে দরিদ্র ও অভাবী ব্যক্তিদেরকে প্রত্যাখ্যান না করা হয়। যা আমাদের দেশে অধিকাংশ সমাজেই বিয়ে বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে হয়ে থাকে। তবে সন্তান জন্ম গ্রহণের দিন কিছু মানুষ যে অনুষ্ঠান করে থাকে বা প্রতি বছর সন্তানের জন্ম দিবস পালন করে থাকে এবং এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান করে থাকে, তা সম্পূর্ণ বিদআত। এ সম্পর্কে ইসলামী শরীয়তে কোন দলীল নাই। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ

(من أحدث فى أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد)

যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মাঝে এমন বিষয় তৈরী করল, যা আমাদের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখাত”। (বুখারী) শুধু বিদআতই নয় বরং তা অমুসলিম ইহুদী-খৃষ্টানদের অনুসরণও বটে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ

(من تشبه بقوم فهو منهم)

“যে ব্যক্তি কোন জাতির অনুস্মরন করবে, সে উক্ত জাতির অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। (আবু দাউদ)

গরু দিয়ে আকীকা করাঃ البقر في العقيقة কোন হাদীসেই গরু দিয়ে আকীকা করার কথা উল্লেখ হয়নি। অথচ রাসূলুল্লাহ(সাঃ) এর যুগে সবধরণের পশুই বিদ্যমান ছিল। সুতরাং উত্তম হচ্ছে ছাগল বা দুম্বা দিয়েই আকীকা করা। গরু দিয়ে আকীকা করা হলে একদল আলেমের মতে তা জায়েয হবে। তবে শর্ত হচ্ছে একজন সন্তানের পক্ষ হতে একটি গরু দিয়ে আকীকা করতে হবে। অপর পক্ষে কতিপয় আলেম সাত সন্তানের পক্ষ হতে একটি গরু দিয়ে আকীকা দিলেও জায়েয হবে বলে মত দিয়েছেন,। তবে সাত সন্তানের পক্ষ হতে একটি গরু আকীকা করার কথা হাদীছে পাওয়া যায় না। আকীকা যেহেতু একটি এবাদত, তাই হাদীছে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে সেভাবেই পালন করা উচিত। আর এটি মোটেই কঠিন কোন বিষয় নয়।

কোরবানীর সাথে ভাগে আকীকা দেয়াঃ الاشتراك في العقيقة مع الأضحية আমাদের দেশে সাতভাগে গরু দিয়ে কুরবানী করার ক্ষেত্রে আকীকার অংশীদার হওয়ার নিয়ম ব্যপকভাবে প্রচলিত আছে। এটি হাদীছ সম্মত নয়। একটি গরু দিয়ে যদি একজন সন্তানের আকীকা করা যদি ঠিক না হয়, তাহলে কুরবানীর গরুর সাথে ভাগে আকীকা করা সঠিক হওয়ার প্রশ্নই আসে না। সর্বোপরি কতিপয় আলেম কোরবানীর গরুর সাথে ভাগে আকীকা দিলে তা বৈধ হবে বলে মত দিয়েছেন। কিন্তু তা হাদীছ সম্মত নয়।

আকীকার ক্ষেত্রে কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাসঃ بعض المعتقدات الخاطئة في العقيقة কিছু লোক বিশ্বাস করে যে, সন্তানের পিতা-মাতা এবং যে সন্তানের আকীকা দেওয়া হলো, সে সন্তান আকীকার গোশত খেতে পারবেনা। এটি একটি ভ্রান্ত বিশ্বাস। এ মর্মে কোন দলীল-প্রমান নাই। পূর্বেই বলা হয়েছে, আকীকার গোশত কুরবানীর গোশতের মতই। পরিবারেই সবাই খেতে পারবে।

আকীকা দিতে অক্ষম হলেঃ إذا عجز عن العقيقة بسبب الفقر وغيره পূর্বেই বলা হয়েছে, দারিদ্রতার কারণে আকীকা দিতে অক্ষম হলে, আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। যখনই সামর্থবান হবে, তখনই আকীকা করবে। আর যদি আর্থিক অবস্থার উন্নতি না হয় এবং আকীকা দিতে না পারে, তাহলে কোন গুনাহ হবেনা। আল্লাহ তা‘য়ালা বলেনঃ

لايكلف الله نفسا إلاوسعها

“আল্লাহ তা‘য়ালা কারও উপর সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেননা। (সূরা বাকারা-২৮৬) আল্লাহ তা‘য়ালা আরও বলেনঃ

(وما جعل عليكم فى الدين من حرج)

“আল্লাহ তা‘য়ালা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোন কঠিন বিষয় চাপিয়ে দেননি। (সূরা হজ্জঃ৭৮) আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ

(فاتقوا الله ما استطعتم)

 ”তোমরা আল্লাহকে ভয় কর তোমাদের সাধ্য অনুযায়ী”। (সূরা তাগাবুন-১৬) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ

إذاأمرتكم بأمر فأتوا منه ما استطعتم وإذا نهيتكم عن شيئ فاجتنبوه

“যখন আমি তোমাদেরকে কোন কাজের আদেশ দেই, তখন সাধ্য অনুযায়ী তোমরা তা পালন কর। আর যখন কোন কাজ হতে নিষেধ করি, তখন তা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাক”। উপরোক্ত দলীল গুলোর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, আকীকাসহ যে কোন আমলই হোক না কেন, অক্ষমতার কারণে পালন করতে না পারলে কোন গুনাহ হবেনা। কিন্তু নিষিদ্ধ বিষয়ের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্নরূপ। সবধরণের নিষেধ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকতে হবে। কারণ নিষেধ থেকে বিরত থাকতে কোন কষ্ট হয়না বা আর্থিক সচ্ছলতার দরকার পড়ে না।

উপসংহারঃ الختام সন্তানের আকীকা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাতে মুহাম্মাদী। তাই এনিয়ে অবহেলা করা ঠিক নয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যেভাবে ইহা পালন করেছেন, পালন করতে বলেছেন, আমাদেরকেও সেভাবে পালন করতে হবে। পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদেরকে এ গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাতটি যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক দেন। আমীন!

এতিমের প্রতি ইসলাম

এতিমের সংজ্ঞা: এতিম শব্দের আভিধানিক অর্থ একক, অদ্বিতীয়, অতুলনীয়, অনুপম, বিস্ময়। মূলত অচেতন থেকে এতিমের উৎপত্তি হয়েছে। কেননা এতিম তার হক থেকে অচেতন থাকে।
পরিভাষায় এতিম বলা হয়; বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বেই পিতার মৃত্যু হওয়া। রাসূল (সাঃ) বলেন; স্বপ্নদোষ তথা বালেগ হয়ে গেলে আর কেউ এতিম থাকে না। বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বে মাতার মৃত্যু হলে আরবদের পরিভাষায় তাকে লতীম বলে, আর মাতা-পিতা উভয় মৃত্যুবরণ করলে তাকে কাতী’ বলে। আর কন্যা সন্তানকে এতিম (এতীমাহ) বলা হবে যতদিন তার বিয়ে না হবে। বিয়ে হয়ে গেলে তাকে আর এতিম বলা যাবে না।

ইসলামে এতিমের তত্ত্বাবধানের ফযীলত: ইসলাম এতিমের হক আদায়ের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছে। বিশেষ করে বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ১০টি হকের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে;

১. এতিমের মাল অন্যদের জন্য স্পর্শ করা নিষিদ্ধ:
আল্লাহ বলেন; যারা অন্যায়ভাবে এতিমের ধন-সম্পত্তি গ্রাস করে, নিশ্চয় তারা স্বীয় উদরে অগ্নি ব্যতীত কিছুই ভক্ষণ করে না এবং সত্বরই তারা অগ্নি শিখায় উপনীত হবে। (সূরা নিসা: ১০)

২. কঠোরতা বা জোরকরা নিষিদ্ধ: পাওনা আদায়ে অধিকার না থাকা সত্ত্বেও জোরপূর্বক নিজের আয়ত্বে রাখাকে আরবী ভাষায় ক্বাহ্র বলে। মহান আল্লাহ এতিমের সাথে এই ক্বাহ্র বাক্যটি ব্যয় করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেন; অতএব, তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না। (সূরা জুহা: ৯)

৩. মর্যাদার অধিকার:করম বলা হয় কোন প্রকার বিনিময় ছাড়া কাউকে কিছু দেয়া। আল্লাহ বলেন; না কখনই নয়। তোমরা এতিমদেরকে করম তথা সম্মান কর না। (সূরা ফাজর: ১৭)

৪. রূঢ়তা ও দুর্ব্যবহার নিষিদ্ধ:আল্লাহ বলেন; সে তো ঐ ব্যক্তি, যে পিতৃহীনকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়। (সূরা মাউন: ২)

৫. খাদ্যের অধিকার:আল্লাহ বলেন; আহার্যের প্রতি আসক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা অভাবগ্রস্ত ও এতিম ও বন্দীকে আহার্য দান করে না। (সূরা দাহ্র: ৮)

৬. আশ্রয়দানের অধিকার:আল্লাহ বলেন; তিনি কি তোমাকে পিতৃহীন অবস্থায় পাননি, অতপর তোমাকে আশ্রয় দান করেন নি? (সূরা জুহা: ৬)

৭. বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত উত্তরাধিকার সংরক্ষণ: আল্লাহ বলেন; আর ঐ প্রাচীরটি- ওটা ছিল নগরবাসী দুই পিতৃহীন কিশোরের, এর নিুদেশে আছে তাদের গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিল সৎ-কর্মপরায়ণ। সুতরাং তোমার প্রতিপালক দয়াপরবশ হয়ে ইচ্ছা করলেন যে, তারা বয়ঃপ্রাপ্ত হোক এবং তারা তাদের ধন ভান্ডার উদ্ধার করুক। (সূরা কাহ্ফ: ৮২)

৮. ইহসানের অধিকার:ইহসান অর্থ ভাল কাজ করাকে বুঝায়, যা ইন’আম তথা পুরস্কার অপেক্ষা ব্যাপক। আর ইহসান, আদল তথা ইনসাফের উপরও অগ্রাধিকার রাখে। বলা হয় ইনসাফ হলো যে পরিমাণ গ্রহণ করা হয়, সে পরিমাণ ফিরেয়ে দেয়া। পক্ষান্তরে ইহসান হচ্ছে বেশী দিয়ে কম গ্রহণ করা। তাই বলা হয় ইনসাফ করা ওয়াজিব। আর ইহসান নফল হলেও এতে সাওয়াব রয়েছে বেশী।

৯. ইনসাফের অধিকার: আল্লাহ বলেন; এবং পিতৃহীনদের প্রতি সুবিচার প্রতিষ্ঠা কর। (সূরা নিসা: ১২৭)

১০. ফাই’র অধিকার: ফাই শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রত্যাবর্তন করা। ফুক্বাহাদের নিকট ফাই হলো কাফেরদের যে মাল যুদ্ধ ছাড়া হস্তগত হয়। যেমন খেরাজ, জেযিয়া। এই মালে সকল মুসলমানের অধিকার থাকে। আর এর থেকে এক পঞ্চমাংশ বের করা হয়। আর যে মাল যুদ্ধের পরে অর্জিত হয় তাকে মালে গনীমত বলে। আবার কেউ কেউ ইমামের (খলীফার) (অংশ) ভাগকে মালে ফাই বলেছেন। মোট কথা হলো মুসলমানদের ঘর হতে সংগৃহীত মালই মালে ফাই। এই মর্মে আল্লাহ বলেন; আল্লাহ এই জনপদবাসীদের নিকট হতে তাঁর রাসূল (সাঃ) কে যা কিছু দিয়েছেন, তা আল্লাহর, তাঁর রাসূল (সাঃ)’র এবং রাসূলের স্বজনগণের এবং এতিমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের, (সূরা হাশর: ৭)

আসুন এবার এতিমের ব্যাপারে যে নবী এতিম হয়েই জন্ম নিলেন, তিনি তাদের সম্পর্কে কি বলেন;
নিশ্চয় রাসূল (সাঃ) এতিমদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। তিনি বলেন; আমি এবং এতিমের জিম্মাদার বা অভিভাবক জান্নাতে এভাবে থাকবো। তখন তিনি তর্জনী এবং মধ্যমা আঙ্গুল সামান্য ফাঁক করে দেখান।
একদা জনৈক ব্যক্তি রাসূল (সাঃ)’র নিকট অভিযোগ করলো হে আল্লাহর রাসূল! আমার হৃদয় অত্যন্ত পাষাণ হয়ে গেছে। আল্লাহর রাসূল বললেন; এতিমের মাথায় হাত রাখ, মিসকীনদের আহার করাও। এতে অনেক পূণ্য রয়েছে। প্রতিটি চুলের বিনিময় নেকী দেয়া হবে। আবু উমামা হতে বর্ণিত; রাসূল (সাঃ) বলেন; যে ব্যক্তি এতিমের মাথায় হাত রাখবে আল্লাহর সন্তুষ্টের উদ্দেশ্যে, তার বিনিময় আল্লাহ প্রতিটি চুলের বদলায় নেকী দান করবেন।

রাসূলের এসব বর্ণনার কারণে দেখা যায় সাহাবাগণ, তাবেঈন, তাবে’ তাবেঈনগণ তাঁরা প্রত্যেকে প্রতিযোগিত করতেন এতিম লালন পালন করার জন্য।
তা ছাড়া আমি আরব রাষ্ট্রগুলো প্রত্যক্ষ করেছি যে, এসব দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে এতিমদের লালন পালনের ব্যবস্থা রয়েছে, এতে দেশের ধনী লোকেরাও অংশগ্রহণ করছে।

এতিমের প্রতি ইসলাম১. ইসলামী সমাজ এমন একটি সমাজ, যে সমাজে পরস্পর সহানুভূতিশীল ও বন্ধুভাবাপন্ন সম্প্রীতি বর্তমান থাকে। আল্লাহ বলেন; মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল; তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; (সূরা ফাত্হ: ২৯) আল্লাহর রাসূল মুমিনদের গুণ বর্ণনা করেন এভাবে যে, সমস্ত মুমিনগণ একটি শরীরের মত। রাসূল (সাঃ) বলেন; মুমিনগণ পরস্পর দয়া ও পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং ভালবাসার দিক হতে একটি শরীরের মত। যদি শরীরের কোন অঙ্গে আঘাত লাগে সমস্ত শরীর ব্যথায় কাতরায়। এই হাদীস স্পষ্ট প্রমাণ করে যে এতিমদেরকে দয়া মায়া মমতা ভালবাসা দিয়ে তাদেরকে আপন করে নিতে হবে।

২. অবশ্য উত্তম কাজের জন্য উত্তম পুরস্কার (জান্নাত) ব্যতীত আর কি হতে পারে?
এই মর্মে আল্লাহ তা’আলা বলেন; উত্তম কাজের জন্য প্রতিদান উত্তম পুরস্কার হবে। (সূরা আর রাহমান: ৬০) অর্থাৎ যদি কোন ব্যক্তি কারো সাথে সদাচরণ করে তাহলে আল্লাহ উত্তম বদলা দিয়ে দিবেন।
এতিমের লালন পালন করা যেন নিজের সন্তানের লালন পালন করার মত। কেননা আল্লাহ না করুন নিজের সন্তান এতিম হলে তখন অন্যরা এই এতিম সন্তানটি লালন পালন করবে। পক্ষান্তরে নিজে অন্য সন্তানের খুঁজ না নিলে, কেউ নিজের সন্তানের খুঁজ-খবর নিবে না, এটাই রীতি। প্রবাদ রয়েছে; যেমন কর্ম তেমন ফল।

৩. ইসলামী সমাজ পরস্পর সহযোগিতার শিক্ষা দেয়।
ইসলাম উৎসাহ প্রদান করেছে, একে অন্যের সুখে-দুঃখে শামিল হওয়ার জন্য। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত; তিনি বলেন রাসূল (সাঃ)’কে কেউ জিজ্ঞাস করলো যে, উত্তম আমল কোনটি? রাসূল (সাঃ) বললেন; তুমি তোমার মুসলিম ভাইয়ের আনন্দে শরীক হও, তার ঋণ পরিশোধ কর, তাকে খানা খাওয়াও। রাসূল (সাঃ) আরো বলেন, যে ব্যক্তি অন্যের প্রয়োজনে এগিয়ে আসবে, আল্লাহ ও তার প্রয়োজনের সময় এগিয়ে আসবেন। রাসূল (সাঃ) আরো বলেন; আল্লাহর নিকট ঐ ব্যক্তি প্রিয়, যে মানুষের উপকার করে। উপরোক্ত হাদীস থেকে স্পষ্ট বুঝা গেল যে, এতিমের লালন-পালন এটি একটি মহত কাজ।
আল্লাহ আমাদের সকল এতিমের লালন-পালন করে চির শান্তি জান্নাতের নীড়ে বসবাস করা সুযোগ করে দিন। আমীন ॥

একজন নও মুসলিমের আত্মকাহিনী

পূর্বে প্রকাশিতের পর-২

 অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার পর, আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়াতা‘আলা দীর্ঘ ৭টি বৎসর আমাকে নানানভাবে পরীক্ষার মাধ্যমে ১৯৯৯ ঈসায়ী সনের ২৮শে অক্টোবর পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ তা‘আলার মনোনীত ধর্ম (জীবন ব্যবস্থা) ইসলামে প্রবেশ করার দ্বার উম্মুক্ত করে দেন। কুয়েতে আসার পর দুই মাস পর এক বন্ধুর মাধ্যমে (কুয়েতী অবসরপ্রাপ্ত এক সামরিক অফিসার) ইসলাম প্রেজেণ্টেশন কমিটি (ওচঈ) -তে রাত ৭-৮ দিকে আসি। ইসলাম বিষয়ক বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করি, সম্মানিত দাঈদের নিকট হতে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় প্রশ্ন করে জেনে নেই। ইসলাম সম্পর্কে আরো বিশদভাবে জানার জন্য আই পি সি কর্তৃপক্ষ আমাকে কিছু বই দেন। যেহেতু আমি পূর্ব থেকেই ইসলাম সম্পর্কে মোটামুটিভাবে জেনেছি, আর ইসলাম গ্রহণ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে  আছি, তাই আর কালবিলম্ব না করে পর দিন সকালে আবার আই. পি. সিতে যাই। সম্মানিত দা‘ঈর মাধ্যমে কালিমায়ে শাহাদাত (আশহাদু আন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াআশহাদু আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ; অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোন প্রকৃত ইলাহ নেই, আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল) পাঠ করে জনসম্মুখে একজন মুসলিম হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ করি। (আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার)

 আশ্চর্যের ব্যাপার যখন কালিমা পড়া শেষ হয়, তখন আমি নিজেকে এতই হালকা অনুভব করলাম, যেন আমার শরীর থেকে হাজার মণ ওজনের পাথর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর এতই সুখ অনুভব করছিলাম যে, মনে হয় পৃথিবীতে আমার চেয়ে সুখী মানুষ দ্বিতীয় আর কেউ আর নেই। তার জন্য মহান আল্লাহর নিকট লক্ষ-কোটি কৃতজ্ঞতা আদায় করছি, সাথে এই প্রার্থনা করছি মহান মনীবের দরবারে তিনি যেন, মৃত্যু পর্যন্ত একজন প্রকৃত মুসলিম হিসেবে জীবন-যাপন করার তাওফীক দান করেন। আমীন।

 জানুয়ারি মাসে আমি ইসলাম গ্রহণ করি, ঐ বৎসরই আই পি সির পক্ষ থেকে ওমরা ও পরে হজ্জ করার তাওফীক মহান আল্লাহ আমাকে দান করেন। দীর্ঘ দিনের মনের আশা ছিল যে পবিত্র ঘর কা‘বা নিজের দৃষ্টিতে দেখবো, মনের আশাটি পূরণ হওয়ায় আল্লাহর লক্ষ-কোটি শুকরিয়া আদায় করছি।

  ইসলাম গ্রহণের এক মাসের মধ্যেই GROUP-4  নামক এক কোম্পানীতে গার্ড হিসেবে কাজে যোগদান করি। ঐ কোম্পানীর অফিসার থেকে শুরু করে যখন যে Place ডিউটি করি, সবাই আমার ইসলাম গ্রহণের কথা শুনে। আমাকে এত সম্মান ও মুহাব্বত করতো, তা ভেবে আবেগে দুই নয়নে অশ্রু এসে যেত। ভাবতাম ইসলাম গ্রহণের আগে আমার কি নোংরা জীবন ছিলো! অথচ যখনই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা তাঁর এই নগন্য বান্দাকে ঈমানের আলো দান করলেন, সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়া ও আখেরাতে কত মান-মর্যাদা, সমাদর বৃদ্ধি পেলো, এ যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অলৌকিক দান তাঁর মনোনীত দ্বীনে প্রবেশ করার জন্য।

  আমি মুসলমান ভাই-বোনদের আহ্বান করবো সামান্য কয় দিনের দুনিয়ার মোহে আবদ্ধ না থেকে আল্লাহর বিধান ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বলা পদ্ধতি বা পবিত্র কুরআন ও হাদীসের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করুন। তবেই এই দুনিয়ার মায়াময় জগৎ থেকে সত্যিকার মুসলমান হিসেবে বিদায় নেওয়া যাবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের তাঁর দ্বীনের উপর চলার তাওফীক দান করুন। আমীন

 যাক GROUP-4 চাকুরীর সুবাদে বিভিন্ন প্লেসে কাজ করার সুযোগ করে দেন। যেমন জামইয়া (সুপার মার্কেট), স্কুল, হাসপাতাল, বড় বড় কোমপ্লেক্স, অফিস ইত্যাদিতে। এভাবে প্রায় তিন বৎসর কাজ করার পর হঠাৎ করে সালমিয়া অঞ্চলে এক আমেরিকান স্কুলে রাতের সিপাটে নিয়োগপ্রাপ্ত হই। প্রতিদিন ফজরের নামাযের সময় পাশের এক মসজিদে ফজরের নামায পড়তে যেতাম। সেখানে নোয়াখালীর বানীপুরের জসিম নামের এক মুসল্লির সাথে পরিচিত হই। কথোপকথোনে বুঝতে পারলাম যে, ছেলেটা প্রচণ্ডভাবে আল্লামা দেলাওয়ার হুসাইন সাঈদী সাহেবের ভক্ত। আমার ইসলাম গ্রহণের কথা শোনে আমাকে তাদের এলাকায় বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়। আমিও তাকে ইসলামের প্রতি অনুরাগী দেখে তার প্রস্তাবে রাজী হই। এবং শর্ত দেই যে, আমি অতি সাধারণ পরিবারে বিয়ে করবো, যে পরিবারের লোকজন ইসলামের প্রতি অনুগত হবে। তার কথায় আস্থা রেখে ২০০৩ সালে এক মুসলিম পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করি। বর্তমানে আমার দুটি কন্যা সন্তান রয়েছে। বড় জনের নাম আয়েশা বিনতে সাইফ, আর ছোট জনের নাম আসমা বিনতে সাইফ।

 নোয়াখালী জেলার চাটখীল উপজেলায় আমি বিয়ে করি। দাম্পত্য জীবনে প্রথম বৎসর ভালোই ছিলো। স্বামী-স্ত্রীর তথা আমাদের মাঝে চমৎকার সম্পর্ক বিরাজ করছিলো। কুয়েতে আমি যে চাকুরি করতাম, বেতন পেতাম ৮০ দিনার, তা দিয়ে স্ত্রীকে ভাড়া বাসায় রাখবো সেই সামর্থ আমার ছিলো না। তাই বাধ্য হয়েই শ্বশুর বাড়িতে রেখে কুয়েত চলে আসি। আমার শ্বশুর বিয়ের পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন, সুতরাং তাদের ফ্যামিলী তেমন সচ্ছল ছিলো না। আমাকে তারা সহযোগিতা করবে এমন সামর্থ তারা রাখতো না। এই কারণে আমার স্ত্রী ছিলো ক্ষুব্ধ। কারণ আমার শ্বশুর বাড়ির আশেপাশে যারা বসবাস করতো, তারা সকলেই ছিলো নামে মুসলিম। তাদের কাজে কামে আচার ব্যবহারে ইসলামের কোন কিছু প্রতিফলিত হতো না। ফলে কারণবশত ঝগড়া কিংবা কথা কাটাকাটি হলে, প্রতিবেশীরা আমার সন্তানদের বলতো, ‘হিন্দুর জন্মা’ স্ত্রীকে অপবাদ দিতো এই বলে যে, হিন্দুর নিকট বিয়ে বসেছে। আমার স্ত্রী এসব সহ্য করতে না পেরে, আমাকে ছেড়ে দেওয়ার উপক্রম হয়ে ছিলো। আল্লাহর রহমতে এতো ঝড়িঝাপটার পরেও আমাদের সংসার টিকে আছে আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের দেশে কিংবা বিদেশে যারা বাংলাদেশী আছি, তারা সহজে একজন নওমুসলিমকে মেনে নিতে কিংবা সাদরে গ্রহণ করতে কুণ্ঠাবোধ করি। তাদের ধারণা তারা জন্মগত মুসলিম বলে, নামায পড়ুক কিংবা না পড়ুক, আল্লাহর হুকুম আহকাম পালন করুক কিংবা না করুক; তারাই মুসলিম। নও মুসলিম হওয়টা যেন অপরাধ! যা মোটেও বঞ্ছনীয় নয়। পিছনের দিকে তাকান, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামানায় একজন নও মুসলিমের মর্যাদা আল্লাহ তা‘আলা কিভাবে প্রকাশ করেছেন। আসলে বর্তমানে বৃহৎ মুসলিম সমাজই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও জ্ঞান থেকে পিছিয়ে আছে, ফলে তারা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, তাহযিব, তামাদ্দুন বুঝা থেকে তারা বঞ্চিত। তাদের ধারণা মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়েছি, সুতরাং শিরক বিদয়াত, জুলুম নির্যাতন যাই করি না কেন, জান্নাতে আমরা যাবই। ইহুদীদের মতো বলে কিছু দিন জাহান্নামে থাকার পর তো আমরা জান্নাতে ঠিকই যাবো। সুতরাং ইসলামের মূল স্তম্ভ যে পাঁচটি তার কোনটাই সঠিকভাবে পালন করছে না। শুধুমাত্র ঐ অমূলক ধারণার কারণে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন বলেছেন; ‘তোমরা মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। এই অমিয় বাণীটা মুসলিম সমাজকে ভালোভাবে উপলব্ধি করার অনুরোধ রইল। 

প্রশ্নোত্তর

আবু আব্দুর রহমান উমারিয়া –  কুয়েতে

 আচ্ছালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ

জনাব, সম্পাদক সাহেব

৩/ চার রাকাত নামাজে দুই রাকাত পড়ার পর বসে কেহ তাসাহুদ (আত্তাহিয়াতু) পড়েন, কেউ কেউ বলেন মাঝে-মধ্যে দরূদ পড়াও সুন্নাত, আবার কেউ বলেন দরূদ পড়লে সেজদা সাহু দিতে হবে বিস্তারিত জানাবেন।

উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম। তিন বা চার রাকাত বিশিষ্ট নামাযের প্রথম তাশাহহুদ তথা প্রথম বৈঠকে শুধুমাত্র পাঠ করবে:

التحياتُ لله ، والصلوات والطيبات ، السلام عليك أيها النبي ورحمة الله وبركاته ، السلام علينا وعلى عباد الله الصالحين ، أشهد أن لا إله إلا الله ، وأشهد ان محمدا عبده ورسوله

এটাই উত্তম। যদি এরপর দরূদ পাঠ করে তবেও কোন অসুবিধা নেই। বিদ্বানদের মধ্যে কেউ কেউ এটাকে মুস্তাহাব বলেছেন। কিন্তু আমার মতে সুন্নাতের নিকটবর্তী কথা হচ্ছে দরূদের পূর্ব পর্যন্ত পাঠ করা-দরূদ না পড়া। তবে ইমাম তাশাহহুদ দীর্ঘ করলে দরূদ পড়তে কোন অসুবিধা নেই। (ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম: ২৫৫)

প্রথম বৈঠকে তাশাহহুদ পাঠ করা সমস্ত ওলামাদের ঐক্যমতে ওয়াজিব। প্রথম বৈঠকে তাশাহহুদের পড়ে দরূদ পড়া যাবে কি-না, এই বিষয়ে ওলামাগণ দ্বিমত পোষণ করেছেন।

প্রথম মত হলো: তাশাহহুদের পড়ে দরূদ পড়া যাবে বরং দরূদ পড়া ওয়াজিব। এটি ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মত। যে ব্যক্তি প্রথম বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরূদ পড়বে না, তার উপর সাজদায়ে সাহু ওয়াজিব। ইমাম ইবনে হেযামও এই মতটি গ্রহণ করেছেন।  দেখুন মুহাল্লা ৩০২/২)

 ইমাম শাফেঈ আল উম্ম (১/২২৮) কিতাবে বলেছেন; তাশাহহুদ এবং দরূদ ফযর প্রত্যেক নামাযেই দোনো  বৈঠকে পড়তে হবে। যদি ভুলক্রমে প্রথম বৈঠকে তাশাহহুদ এবং দরূদ না পড়ে, তবে দ্বিতীয় বার আর পড়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু তাকে সাজদায়ে সাহু করতে হবে। এই মতটি আব্দুল আযীয বিন বায এবং আলবানী (রহ.) গ্রহণ করেছেন। (মাজমু ফতোওয়া বিন বায: ২০১/১১ কিতাবুস সালাহ ১৪৫ পৃষ্ঠা)

দ্বিতীয় মত: প্রথম বৈঠকে শুধু তাশাহহুদ পর্যন্ত পাঠ করবে। দরূদ পাঠ করবে না। এটি জামহুর ওলামায়ে কেরামের মত। এবং এই মতটি ইবনু উসাইমীন গ্রহণ করেছেন। কুয়েত ধর্মমন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত মাওসুয়া ফিকহিয়্যা (ফিকাহ বিশ্বকোষ) ১২/৩৯ বলা হয়েছে; জামহুর ওলামায়ে কেরামের মত হলো, প্রথম বৈঠকে শুধু তাশাহহুদ পাঠ করবে। রাসূলের উপর দরূদ পড়বে না। ইমাম নাখঈ, সাওরী, এবং ইসহাকও এই মত পোষণ করেছেন।  তবে শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরূদ পড়ার ব্যাপারে কারো দ্বিতমত নেই।

এই আলোচনা থেকে বুঝাগেল যে, প্রথম বৈঠকে শুধু তাশাহহুদ পড়তে হবে, মাঝে-মধ্যে দরূদ পড়লেও কোন সমস্যা নেই। সাজদায়ে সাহু দিতে হবে না।

 

 

মোঃ মহাসিন মানগাফ

কুয়েত,

 ১। কোনো বুঝুরগো বা আলেম ঈমানদার ব্যক্তি যদি কবর স্থানে গিয়ে কবর যিয়ারত বা দোয়া করে তাহলে মৃত ব্যক্তির ৪০ দিনের কবর আজাব মাফ হয়।

২। মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর কিছু দূর এসে আবার কবর এস্থানে গিয়ে দাড়িয়ে মৃত ব্যক্তির প্রশ্নর  উত্তর দেওয়া কতটুকু সহীহ, আদৌ কি ফেরেশতা বা মৃত ব্যক্তি জবাব শুনেন? কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক জানাবেন।

উত্তর: আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তরে বলবো, কোন বুঝোরগো কিংবা আলেমকে দিয়ে কবর যিয়ারত করানো হলে ৪০ দিনের জন্য কবর আযাব মাফ হয়ে যাবে এই মর্মে কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে মৃত ব্যক্তিকে তিনভাবে সাওয়াব পৌঁছানোর কথা বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। যখন মানুষ মারা যায়, তখন তার সমস্ত আমল বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু তিন প্রকারের আমল চালু থাকে। ১. সাদক্বায়য়ে জারিয়া ২. উপকারী ইলম অর্থাৎ যে ইলেম দ্বারা সে নিজে উপকৃত হয়েছে এবং মৃত্যুর পর অন্যরা সেই  ইলেম থেকে উপকৃত হয়েছে, ৩. নেক সন্তান যারা তাদের জন্য দোয়া করবে। (মুসলিম: ১৬৩১) এই হাদীসের আলোকে বলা যায়, যে দোয়ার মাধ্যমে কবরে সাওয়াব পৌঁছানো যায়, কিন্তু কোন আলেম বা বুঝুরগো দিয়ে দোয়া করানো হলে কিংবা কবর যিয়ারত করানো হলে ৪০ দিনের জন্য কবর আযাব মওকুফ হয়ে যাবে এই বিষয়ে কোন হাদীস আমরা পাইনি। তবে এই ক্ষেত্রে সঠিক কথা হলো; মৃত ব্যক্তির জন্য নিকটাত্মীয় লোকদের দোয়াই দ্রুত কবুল হয়। তাই প্রত্যেক সন্তানের উচিত, তাদের মাতা পিতার জন্য বেশি বেশি মাগফিরাতের, রহমতের , জান্নাতের এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য দোয়া করা।

 আর কবর যিয়ারতের দ্বারা নিজের ফায়দাও হয়, এতে পরকালের কথা, মৃত্যুর কথা স্বরণ হয়। হযরত আবু হুরায়রা সূত্রে বর্ণিত; তিনি বলেন; একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর আম্মাজান আমেনার কবর যিয়ারত করতে গেলেন।  তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাঁদলেন এবং সাথীরাও কাঁদলেন। অতঃপর তিনি বললেন, আমি আমার মায়ের মাগফিরাতের জন্য আল্লাহর নিকট অনুমতি চাইলাম. কিন্তু আমাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু কবর যিয়ারতের অনুমতি চাইলাম, তা গৃহীত হয়েছে। সুতরাং তোমরাও কবর যিয়ারত কর, কেননা এই কবর যিয়ারত মৃত্যুর কথা স্বরণ করিয়ে দেয়। (মুসলিম) 

আর দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাবে বলবো; লাশ দাফন করার পর কবর থেকে দূরে সরে এসে আবার যাওয়া সুন্নতের খেলাফ কাজ। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে; যখন লাশ দাফন সম্পন্ন হতো, তখন তিনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেন এবং বলতেন; তোমরা তোামদের ভাইয়ের জন্য ইস্তেগফার করো, এবং দৃঢ়তা কামনা করো, কেননা এখনা তাকে প্রশ্ন করা হবে। তবে জীবিত ব্যক্তিদের পক্ষথেকে জবাব দেওয়ার ব্যাপারে কোন হাদীস পাওয়া যায় না। এমনটি করা ঠিক না। ফেরেশতাগণ আমাদের কথা শুনতে পান, কেননা তারা আমাদের মতই জীবিত। আর মৃত ব্যক্তিও দাফন করার সঙ্গে সঙ্গে যখন জীবিত করা হয় তখন আমাদের কথা এমনকি হাঁটার সময় যে জুতার শব্দ হয় তাও শুনতে পান। যেমন বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনা এসেছে;

كَمَا أَخْرَجَ ذَلِكَ الشَّيْخَانِ، فَمِنْهَا مِنْ حَدِيثِ أَنَسٍ أَنَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: إِنَّ الْمَيِّتَ إِذَا وُضِعَ فِي قَبْرِهِ، وَتَوَلَّى عَنْهُ أَصْحَابُهُ، إِنَّهُ لِيَسْمَعُ قَرْعَ نِعَالِهِمْ 

অর্থাৎ যখন লাশ কবরে রেখে তার সাথীরা চলে আসে, তখন মৃত ব্যক্তি জুতার শব্দ পর্যন্ত শুনতে পান।

 কিন্তু আমরা ইচ্ছা করে কোন কথা মৃত ব্যক্তি শুনাতে পারি কিনা, এই ব্যাপারে বিশ্লেষণ হলো; আমরা ইচ্ছা করলে কোন মৃত ব্যক্তি কথা শুনাতে পারি না। বা আমরা কবর যিয়ারত করতে গিয়ে যা বলি, তা মৃত ব্যক্তি শুনেন না। এই মর্মে আল্লাহর বাণী: আপনি মৃত ব্যক্তি শুনাতে পারেন না। (সূরা নামল: ৮০) মহান আল্লাহ অন্যত্র বলেন: যে ব্যক্তি কবরে আছে, তাকে আপনি শুনাতে পারবেন না। (সূরা ফাতির: ২২)

 

 

উমর ফারূক

ইমেইলে পাঠানো প্রশ্ন

 

عباس بن قال ( رضي الله عنهما ) الله لا يقبل صلاة رجل تتغذى على الحرم حتى يتوب 

ইব্নে আব্বাস (রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “কোন লোকের পেটে হারাম খাবার থাকলে আল্লাহ তার নামায কবুল করেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তওবা করে।”

হাদীসটি যে বইতে পেয়েছি তাতে তথ্য সূত্রের উল্লেখ নেই। অর্থাৎ এটি কি বুখারী থেকে না-কি তিরমিযি না-কি মুসলিম না-কি অন্য কোন হাদীস গ্রন্থ থেকে নেয়া। বইয়ের নাম, অধ্যায়ের নাম কিংবা হাদীস নং জানা থাকলে দয়া করে জানাবেন। হাদীসটির বর্ণনাকারীর নামে কি শুধু মাত্র ইব্নে আব্বাস না-কি আবদুল্লাহ ইব্নে আব্বাস কোনটি সহীহ?

উত্তর: জনাব উমর ফারূক সাহেব! আপনি হাদীসের যে আরবী কথাগুলো নোট করেছেন; এই আরবী বাক্যগুলো হাদীসগ্রন্থে পাওয়া যায়নি। আপনি কোন বই থেকে সংগ্রহ করেছেন তাও উল্লেখ করেন নাই। যদিও কোথাও ইবনে আব্বাস উল্লেখ করা হয়, সেখানে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস মনে করতে হবে।

 আপনি বাংলায় যে ভাব প্রকাশ করেছেন, এই ধরণের হাদীস আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: হে লোক সকল! নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া গ্রহণ করেন না। আর তিনি রাসূলদেরকে যেই নির্দেশ দিয়েছেন, সেই নির্দেশ মুমিনদেরকেও করেছেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কুরআনের এই আয়াত তেলওয়াত করলেন; “হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র জিনিস খাও, এবং ভালো কাজ করো, আর তোমরা যা করো সে বিষয়ে আমি অবহিত।” (সূরা মুমিনূন : ৫১) তিনি আরো তেলাওয়াত করলেন; “হে মুমিনগণ তোমরা আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক হতে পবিত্র জিনিস খাও”  (সূরা বাকারা: ১৭২) অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির আলোচনা করলেন; যিনি দীর্ঘ দিন ভ্রমণে কাটিয়েছেন, শরীরে ধুলা মিশ্রিত মাথার চুল এলোমেলো, হাত দুটি আকাশের দিকে লম্বা করে তুলেছে, আর বলছে ইয়া রাব্ব! ইয়া রাব্ব!! অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পরিধানের পোশাক হারাম, আর হারাম বস্তু সে বক্ষণ করে, এই লোকের দোয়া কিভাবে কবুল করা হবে? (মুসলিম: ১৬৮৬)  

 

 

সন্তানের প্রতি জ্ঞানবান পিতার উপদেশ

আল্লাহ তা‘আলার এমন বাণী যা মুহাম্মাদ (সা.)-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে, মাসহাফের মাঝে লিপিবদ্ধ রয়েছে, সন্দেহাতীতভাবে ধারাবাহিক সূত্র পরম্পরায় আমাদের নিকট পৌঁছেছে, তাকেই পবিত্র কুরআন বলা হয়।   আমরা এই কুরআন পেয়েছি তাঁর নির্বাচিত বান্দা মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাধ্যমে। এতে রয়েছে আদেশ, নিষেধ, উপদেশ, কাহিনী, জ্ঞান-বিজ্ঞানের শাখা-প্রশাখা।   প্রিয় ব্লগার! আজ আমি যে, জ্ঞান ও উপদেশের কথা বলবো, তা হচ্ছে; হযরত লুকমান তাঁর সন্তানকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, কিন্তু আমরা অনুসরণ করবো এই জন্য যে, উক্ত কথাগুলো পবিত্র কুরআনুল কারীমের তথা মহান আল্লাহ তা‘আলার কথা।   মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন; আমি অবশ্যই লুকমানকে মহাজ্ঞান দান করেছিলাম, (এবং বলেছিলাম) আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (সূরা লুকামন: ১২) অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম পালন করা, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা জ্ঞানীর পরিচয়। আর বর্তমান সমাজে জ্ঞানী তাদেরকেই বলা হয়, যারা আল্লাহর বেশি না শুকরি করে। যেমন একজন ধনীর সম্পদ আছে, কিন্তু তার জ্ঞান তাকে বলে, যদি এই সম্পদের যাকাত দাও, তোমার সম্পদ কমে যাবে, সুতরাং জ্ঞানীর পরিচয় হলো; ‘জমা কর বেশি হবে’। আর হযরত লুকমান বুঝেছিলেন যে, দুনিয়াতে আমার যত সম্পদ আছে, তার একমাত্র দাতা হচ্ছেন, মহান আল্লাহ তা‘আলা। সুতরাং তাঁরই কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে। আর এটা আল্লাহ তা‘আলা অত্যন্ত পছন্দ করেছিলেন।   মহান আল্লাহ বলেন; আর যে শুকরিয়া আদায় করে, সে তার নিজের কল্যাণের জন্যই কৃতজ্ঞ হয়, আর যে অকৃতজ্ঞ হয়, (জেনে রাখুন) নিশ্চয়ই আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং চির প্রশংসিত। সূরা লুকমান: ১২) অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা কারো প্রশংসার মুখাপেক্ষী না। কেউ আল্লাহর প্রশংসা করে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারে না। আবার দুনিয়ার সমস্ত মানুষও যদি আল্লাহর প্রশংসা না করে, তাহলেও আল্লাহর মর্যাদা একটুও কমবে না। তাইতো জ্ঞানীরা তাদের নিজের স্বার্থেই আল্লাহর প্রশংসা করে। আসুন আমরা জ্ঞানবান লুকমানের উপদেশগুলো শুনি এবং সে মতে আমল করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। ১নং উপদেশ: যখন লোকমান উপদেশচ্ছলে তার পুত্রকে বললেন: হে বৎস! আল্লাহর সাথে শরীক করো না। নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরীক করা মহা অন্যায়। (সূরা লুকমান: ১৩) পবিত্র কুরআনের উক্ত নির্দেশটি যদিও লুকমান, তাঁর ছেলেকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, কিন্তু আমাদেরকেও উক্ত উপদেশটি গ্রহণ করতে হবে, আমাদের পরকালের স্বার্থে। কারণ মাহন আল্লাহ অন্যত্র বলেন; “এটি আল্লাহর হেদায়েত। স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা, এপথে চালান। যদি তারা শেরেকী করত, তবে তাদের কাজ কর্ম তাদের জন্যে ব্যর্থ হয়ে যেত। (সূরা আনআম ৮৮) অর্থাৎ শিরককারীর জন্য জান্নাত হারাম, তাদের ঠিকানা জাহান্নাম, এমনকি তাকে পুনরায় সুপারিশ করেও কেউ জান্নাতে নিতে পারবে না। আর উক্ত শিরকী অপরাধের কারণে পূর্বে ব্যক্তি যদি কোন নেক আমল করেও থাকে, তাও বাতিল হয়ে যাবে। প্রিয় নবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: বিচারের দিনে কোন বান্দা যদি পাহাড় সমান সমান গুনাহও থাকে, আর এর মধ্যে লোকটি শিরক মুক্ত হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ পাহাড় পরিপাণ রহমত নিয়ে আসবেন অর্থাৎ ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দিবেন। তাইতো লুকমান আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞানের কারণে সন্তানকে আগে শিরকের অপকারিতা সম্পর্কে উপদেশ দিলেন। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন; আমি তোমাদের জন্য ছোট শিরকে আশঙ্কা করছি সর্বপেক্ষা বেশি, আর ছোট শিরক হচ্ছে; লোক দেখানো আমল। অতএব আসুন আমরাও লুকমানের উপদেশ গ্রহণ করি, শিরকমুক্ত আমলের প্রতিজ্ঞা করি।

৬নং উপদেশ: সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ: লুকমানের এই উপদেশটি আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জানিয়ে দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে, তোমাকে পিতা মাতার খেদমত, সালাত আদায় করে, শির্কমুক্ত ইবাদত  এ সকল কাজ করেই তোমার দায়িত্ব শেষ নয়, তোমাকে সমাজ সংশোধনের জন্য কাজও করতে হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন; “তোমরাই শ্রেষ্ঠজাতি, তোমাদের উত্থান ঘটানো হয়েছে এই জন্য যে, তোমরা ন্যায়ের আদেশ করবে, এবং অন্যায়ে থেকে নিষেধ করবে, এবং আল্লাহর উপর ঈমান আনবে।” (আলে ইমরান: ১১০) আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: “তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করবে, আর ন্যায়ের আদেশ দিবে, অন্যায় থেকে নিষেধ করবে।” (আলে ইমরান: ১০৪)

 কথা হচ্ছে ন্যায় অন্যায়ের মানদণ্ড কি? ফেরাউন বলে ছিল; “আমি তোমাদের শুধু সৎপথই দেখিয়ে থাকি”। (সূরা মুমিন বা গাফের: ২৯)

 আমাদের নেতারাও ঠিক একই কথা বলে, আমরা যা করি জনগণের কল্যাণের জন্যই করি। তৎকালীন ফেরাউন আর বর্তমানের নেতারা যে, কি কল্যাণ করে তা একজন সাধারণ মানুষই বুঝে। তাই ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড একমাত্র পবিত্র কুরআন ও রাসূলের বিশুদ্ধ হাদীস। রাসূল (সা.) বলেন: তোমাদের কেউ কোন গর্হিত কাজ দেখলে সে যেন তা হাত দিয়ে প্রতিহত করে, যদি তাও না পারে যবান তথা মুখ দিয়ে বাধা প্রদান করে, যদি তাও না পারে তবে অন্তর দিয়ে ঘৃণা করবে, আর ইহা হলো ঈমানের সর্ব নি¤œ স্তর। (সহীহ মুসলিম)

 ৭ নং উপদেশ: ছবর বা ধৈর্য: একজন মানুষ যখন সমাজ সংশোধনের কাজে নামে তখন তার উপর বিপদ আসে। তখন এই বিপদ মুহূর্তে তার করণীয় কি? জ্ঞানীর পরিচয় হলো; উক্ত মুহূর্তে সবর করা ও সাথে সাথে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন; আমি তোমাদের পরীক্ষা করবো, যাতে তোমাদের মধ্যকার মুজাহিদ ও ধৈর্যশীলদের চিনে নিতে পারি। (সূরা মুহাম্মাদ: ৩১) আল্লাহ আরো বলেন: ধৈর্যশীলদেরকে অগণিত পুরস্কার পূর্ণভাব দেওয়া হবে। (সূরা যুমার: ১০)  

 লুকমান তার সন্তানকে এই জন্যই ধৈর্যধারণের উপদেশ দিলেন, কারণ বিপদ ও মুসিবতকে আল্লাহর দেওয়া পরীক্ষা মনে করে সবরের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাইলে আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করবেন ইহকালে অথবা পরকালে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: মুমিনের ব্যাপারটা আশ্চর্যজনক, তার সমস্ত কাজই কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া অন্যের ব্যাপারে এমন নয়। তার জন্য আনন্দের কিছু হলে সে আল্লাহর শোকর আদায় করে। তাতে তার মঙ্গল হয়। আবার ক্ষতির কিছু হলে, সে ধৈর্যধারণ করে, এটা তার জন্য কল্যাণকর।

সবরের আরো কিছু প্রকার আছে, যেমন আনুগত্যের ছবর, অর্থাৎ জীবনের অনেকটা সময় আল্লাহর নাফরমানীতে কেটে গেছে এখন মনে আল্লাহর ভয় ঢুকেছে, সালাতের অভ্যস্ত ছিল না এখন সালাত শুরু করেছে, দাড়ি ছিল না এখন দাড়ি রেখেছে। পিছনের অনেকটা সময়ের দিকে না তাকিয়ে বর্তমানে যে আনুগত্য শুরু হয়েছে তা ছবরের সাথে আশা নিয়ে অব্যাহত রাখাকে আনুগত্যের সবর বুঝায়।

 সবরের আরেকটা দিক হলো; গুনাহ হতে বিরত থাকার সবর। যেমন টেলিভিশনে সুন্দর একটা নাটক, গান, বা সিনেমা হচ্ছে; মন চায় সেগুলো দেখি, কিন্তু গুনাহর কথা চিন্তা করে না দেখে সবর করা। ফন্দি-ফিকির করে টাকা রোজগার করার সুযোগ আছে, কিন্তু গুনাহর কথা স্মরণ করে তা না করাই হলো গুনাহ হতে বিরত থাকার সবর। যুগযুগ  আগে লুকমান তার সন্তানকে এই সবরের শিক্ষা দিয়েছেন।

৮ নং উপদেশ: অহঙ্কার করো না: মানুষ অহঙ্কার করে অনেক কারণে, যেমন: অর্থের অহঙ্কার, ক্ষমতার অহঙ্কার, জ্ঞানের অহঙ্কার, এ জাতিয় সকল অহঙ্কারের পরিণাম জাহান্নাম। অনেক লোক আছে যারা প্রবাসে আসার পর টাকা পয়সার মালিক হয়েছে, আর এই টাকা পয়সা-ই তাকে অহঙ্কারী বানিয়েছে। সম্পদের যাকাত দেয় না, আবার গরীব লোক দেখলে একটু ভাব নিয়ে চলা-ফেরা করে। আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশীর হক যথাযাথ আদায় করে না। এই শ্রেণীর লোক পরকালে, অহঙ্কারের কারণে শাস্তি ভোগ করবে।

 অনেক ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ক্ষমতা পাওয়ার আশায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষুকের মতো হাত তো পাততোই মাথাটাও পেতে দিতো। আর বলতো আমার জন্য একটু দোয়া করবেন। জনগণ ভোট দিয়ে যখন এই লোকটিকে ক্ষমতায় বসায়, অমনি অহঙ্কারী হয়ে যায়। আগে পিছে ক্যাডার নিয়ে চলে। আগে তো ভাই বলে ডাকা যেত, এখন স্যার বললেও শোনেনা। আর গরীব লোকদেরকে পারলে তো পিসে মারে। ক্ষমতা তাকে এমন অহঙ্কারী বানায় যে সে মনে করে তার এই ক্ষমতা চিরকাল থাকবে! আবার কিছু লোক আছে, তারা জ্ঞানের অহঙ্কার করে। এটা মারাত্মক অপরাধ, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে তিন ব্যক্তিকে জাহান্নামের দিবেন, তাদের একজন হবে জ্ঞানী। কারণ সে চাইতো যে দুনিয়ার সবাই তাকে জ্ঞানী বলে ডাকুক। তাইতো আল্লাহ তা‘আলা অহঙ্কারীদেরকে লক্ষ্য করে বলেন: ভূপৃষ্ঠে দম্ভভরে বিচরণ করনা, তুমি কখনো পদভরে ভূপৃষ্ঠ বিদীর্ণ করতে পারবে না। এবং উচ্চতায় তুমি কখনো পর্বত সমানও হতে পারবে না। (সূরা ইসরা: ৩৭)

 লুকমান তাঁর সন্তানকে পরকালে মুক্তির স্বার্থেই অহঙ্কারী হতে নিষেধ করেছেন। আমাদেরও উচিত যে, যতো ধনীই হই না কেন, যত ক্ষমতাধর বা জ্ঞানী হই না কেন, অহঙ্কার ছেড়ে দিয়ে, এসবকে আল্লাহর নিয়ামত ও পরীক্ষা মনে করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং পরীক্ষায় পাস করার চেষ্টা করা। তবেই আমরা সফলতা অর্জন করতে পারবো। ইনশা আল্লাহ।

৯ নং উপদেশ: দুনিয়াতে চলাচলে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করবে: জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থানীতি অবলম্বনে আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে, এমনকি ব্যক্তিরও কল্যাণ রয়েছে। যেমন উদার মন-মানসিকতা কারণে হাত পা ছেড়ে দিয়ে দান করে আহাল পরিবারের হক নষ্ট করে, আল্লাহর আদালতে আসামী হওয়া যাবে না। আবার টাকা পয়সা আছে বলে অতি বিলাসিতার কারণে দামী মোবাইল সেট, দামী ঘড়ি (অহঙ্কার বশত) পরে আল্লাহর আদালতে অপচয়কারী হিসেবে আসামী হওয়া যাবে না। পোশাক আশাক দুই তিন জোড়া হলেই যথেষ্ট, অযথা বেশি রাখা বিলাসিতার শামিল। আর বিলাসিতাকারী আল্লাহর কৃতজ্ঞতা করার সুযোগ পায় না।

ইবাদত বন্দেগীতে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে। অত্যাধিক বাড়াবাড়ি করা নিষেধ। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন; তিনজন ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণের বাড়িতে আসলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইবাদত সম্পর্কে জানার জন্য। যখন তাদেরকে এ সম্পর্কে অবহিত করা হলো; তারা নিজেদের আমলকে সামান্য মনে করলেন। তারা বলতে লাগলেন; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তুলনায় আমরা কোথায়? তাঁর পূর্বের ও পরের সমস্ত গুনাহ মাফ করা হয়েছে। আমাদের তো আর মাফ করা হয়নি। তাদের একজন বললো, আমি সারা রাত নামাযে মগ্ন থাকবো, আরেক জন বললো, আমি অনবরত সিয়াম পালন করবো, আরেক জন বললো, আমি স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকবো, কখনোই বিয়ে-শাদী করবো না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে এসে বললেন, তোমরা কি এমন কথাগুলো বলেছ? আল্লাহর শপথ তোমাদের চাইতে আমি আল্লাহকে বেশি ভয় করি, বেশি তাকওয়া অবলম্বন করি, কিন্তু আমি রোযা রাখি এবং রোযা ভাঙ্গিও, নামায পড়ি এবং ঘুমাই, এবং বিয়ে-শাদীও করেছি। যে ব্যক্তি আমার নিয়ম পালন করবে না, সে আমার দলভুক্ত নয়। (বুখারী ও মুসলিম)

  বুখারীর অন্য এক হাদীসে আছে; তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো ও সামর্থ অনুযায়ী আমল করো এবং সকালে ও রাতে চলো এবং শেষ রাতের কিছু অংশ ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা অবলম্বন করো। মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো, লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে। হাজার হাজার বছর আগে জ্ঞানবান লুকমান তার সন্তানকে লক্ষ্যে পৌঁছার কৌশল বলে দিলেন, একটি মাত্র কথায় যে, তুমি দুনিয়াতে চলাচলে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো। আমরাও যদি লক্ষ্যে পৌঁছতে চাই অতিবিলাসিতা ছাড়তে হবে এবং অতি দরবেশিও ছাড়তে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করুন।

১০ নং উপদেশ: গলার আওয়াজকে নিচু করবে, গাধার মত শব্দ করবে না: সমাজে প্রবাদ বাক্য চালু আছে ‘নরমে যা হয়, গরমে তা হয় না।’ একই কথা উঁচু আওয়াজে বললে এক অর্থ দাড়ায়, আবার নিচু আওয়াজে বললে অন্য অর্থ হয়। আর এই উঁচু আওয়াজ আদবের খেলাপ। তাছাড়া উপরের সবগুলো যে কোন ব্যক্তির জীবনে বাস্তবায়ন করতে হলে গলার আওয়াজ অবশ্যই নরম করতে হবে। যেমন তাওহীদ ভিত্তিক জীবন যাপন, মাতা-পিতার খেদমত, সমাজে নেককার মানুষের সঙ্গে চলতে হলে, এমনি সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ অর্থাৎ দাওয়াতি কাজ করতে হলে সর্ব প্রথম নরম মেজাজের অধিকারী হতে হবে। তাকে বুঝতে হবে তিনি যেন রোগীর সঙ্গে লেনদেন করছেন। আর রোগীরা এমন হৃদয়ের মুখাপেক্ষী যা হয় দয়ালু ও রহমকারী। এ জন্যই মহান আল্লাহ তাঁর নবী মূছা (আঃ) ও হারূন (আঃ)-কে নির্দেশ করেছিলেন, ফিরাউনের কাছে গিয়ে সহজ ও নরম কথা বলার জন্য। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই গুণটিকে আল্লাহ তা‘আলা প্রশংসা স্বরূপ এভাবে বলেছেন; অতএব আল্লাহর অনুগ্রহ এই যে, তুমি তাদের কোমল চিত্ত। এবং তুমি যদি কর্কশ ভাষী হতে, কঠোর হৃদয় হতে, তবে নিশ্চয়ই তারা তোমার সংস্পর্শ হতে দূরে চলে যেত। (সূরা আলে ইমরান: ৫৯)

 প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জিজ্ঞেস করা হলো; হে রাসূল! একজন মহিলা মসজিদ ঝাড়– দেয়, কিন্তু তার মুখের অত্যাচারে মানুষ বিরক্ত। অন্য এক মহিলা যিনি মসজিদ ঝাড়– দেয় না, কিন্তু তার আচরণে মানুষ সন্তুষ্ট, তাদের মধ্যে কে আগে জান্নাতে যাবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যার মুখের আচরণ ভালো সে আগে জান্নাতে যাবে।

 পরিশেষে বলবো মহান আল্লাহ তা‘আলা সূরা লুকমানের ১২ থেকে ১৯ আয়াত পর্যন্ত সন্তানের প্রতি, পিতার কি দায়িত্ব তা একটি কাহিনীর মাধ্যমে জানিয়ে দিলেন। এবং তা অনুসরণ ও বিমুখতায় কি ফলাফল হবে তাও জানিয়ে দিলেন। এক্ষণে প্রতিটি মুমিন ব্যক্তির করণীয় হবে। উপদেশগুলো হৃদয় দিলে অনুধাবন করে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা এবং নিজের সন্তানদেরকেও উপদেশ দেওয়া। তাহলেই আমরা আল্লাহর কাছে জ্ঞানী বলে বিবেচিত হতে পারবো। সমাজে শান্তি আসবে। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা বৃদ্ধি হবে।

 আল্লাহ যেন আমাদের সকল মুসলমান নর-নারীকে উপর্যক্ত উপদেশগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার সুযোগ ও মানসিকতা তৈরি করে দেন। আমীন 

‘ঈমানের হাকীকত

 ভাববার বিষয়

‘কালেমা’ পড়ে আপনি আল্লাহর কাছে এ ওয়াদা-ই করে থাকেন, আর সারা দুনিয়া এ মৌলিক অঙ্গীকারের সাক্ষী হয়ে থাকে। এর বিপরীত কাজ করলে আপনার জিহ্বা, আপনার হাত-পা, আপনার প্রতিটি পশম এবং আকাশ ও পৃথিবীর এক একটি অণু-পরমাণু যাদের সামনে আপনি এ ওয়াদা করেছিলেন আপনার বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে সাক্ষ্য দেবে। আপনি সেখানে একেবারে অসহায় হয়ে পড়বেন। আপনার সাফাই প্রমাণ করার জন্য একটি সাক্ষী কোথাও পাবেন না। কোনো উকিল কিংবা ব্যারিষ্টার আপনার পক্ষ সমর্থন করার জন্য সেখানে থাকবে না। Continue reading ‘ঈমানের হাকীকত

কুরআনের আলো

১৪৩) আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি ‘মধ্যপন্থী’ উম্মাতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা দুনিয়াবাসীদের ওপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল হতে পারেন তোমাদের ওপর সাক্ষী১ এবং তুমি যে কেবলার দিকে ছিলে, তা আমি এ  জন্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম যে, কে রাসূলের অনুসরণ করে আর কে তা হতে স্বীয় পদদ্বয়ে পশ্চাতে ফিরে যায় আমি শুধু তা দেখার জন্য কিব্লাহ নির্দিষ্ট করেছিলাম এটি ছিল অত্যন্ত কঠিন বিষয়, তবে তাদের জন্য মোটেই কঠিন প্রমাণিত হয়নি যারা আল্লাহর হিদায়াত লাভ করেছিল  আল্লাহ তোমাদের এই ঈমানকে কখনো নষ্ট করবেন না নিশ্চিতভাবে জেনে রাখো, তিনি মানুষের জন্য অত্যন্ত স্নেহশীল ও করুণাময়। 

১. এটি হচ্ছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মাতের নেতৃত্বের ঘোষণাবাণী। এভাবেইশব্দটি সাহায্যে দুদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এক: আল্লাহর পথপ্রদর্শনের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যার ফলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুগত্যকারীরা সত্য-সরল পথের সন্ধান পেয়েছে এবং তারা উন্নতি করতে করতে এমন একটি মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে যেখানে তাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মাত গণ্য করা হয়েছে। দুই: এ সাথে কিব্লাহ পরিবর্তনের দিকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্বোধরা একদিক থেকে আর একদিকে মুখ ফিরানো মনে করছে। অথচ বাইতুল মাকদিস থেকে কাবার দিকে মুখ ফিরানোর অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ বনী ইসরাঈলকে বিশ্ববাসীর নেতৃত্ব পদ থেকে যথানিয়মে হটিয়ে উম্মাতে মুহাম্মাদীয়াকে সে পদে বসিয়ে দিলেন।

 মধ্যপন্থী উম্মাত শব্দটি অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক তাৎপর্যের অধিকারী। এর অর্থ হচ্ছে, এমন একটি উৎকৃষ্ট ও উন্নত মর্যাদাসম্পন্ন দল, যারা নিজেরা ইনসাফ, ন্যায়-নিষ্ঠা ও ভারসাম্যের নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, দুনিয়ার জাতিদের মধ্যে যারা কেন্দ্রীয় আসন লাভের যোগ্যতা রাখে, সত্য ও সততার ভিত্তিতে সবার সাথে যাদের সম্পর্ক সমান এবং কারোর সাথে যাদের কোন অবৈধ ও অন্যায় সম্পর্ক নেই।

বলা হয়েছে, তোমাদেরকে মধ্যমপন্থী উম্মাত পরিণত করার কারণ হচ্ছে এই যে, তোমরা লোকদের ওপর সাক্ষী হবে এবং রাসূল তোমাদের ওপর সাক্ষী হবেন। এ বক্তব্যের অর্থ কি এর অর্থ হচ্ছে, আখেরাতে যখন সমগ্র মানবজাতিকে একত্র করে তাদের হিসেব নেয়া হবে তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল প্রতিনিধি হিসেবে রাসূল তোমাদের ব্যাপারে এ মর্মে সাক্ষ্য দেবেন যে, সুস্থ ও সঠিক চিন্তা এবং সৎকাজ ও সুবিচারের যে শিক্ষা দিয়ে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল তা তিনি তোমাদের কাছে হুবহু এবং পুরোপুরি পৌঁছিয়ে দিয়েছেন আর বাস্তবে সেই অনুযায়ী নিজে কাজ করে দেখিয়ে দিয়েছেন। এরপর রাসূলের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে সাধারণ মানুষদের ব্যাপারে তোমাদের এই মর্মে সাক্ষ্য দিতে হবে যে, রাসূল তোমাদের কাছে যা কিছু কার্যকর করে দেখিয়ে ছিলেন তা তাদের কাছে কার্যকর করে দেখিয়ে ছিলেন তা তাদের কাছে কার্যকর করে দেখাবার ব্যাপার তোমরা মোটেই গড়িমসি করোনি।

 এভাবে কোন ব্যক্তি বা দলের এ দুনিয়ায় আল্লাহর পক্ষ থেকে সাক্ষ্য দানের দায়িত্বে নিযুক্ত হওয়াটাই মূলত তাকে নেতৃত্বের মর্যাদায় অভিষিক্ত করার নামান্তর। এর মধ্যে যেমন একদিকে মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধির প্রশ্ন রয়েছে তেমনি অন্যদিকে রয়েছে দায়িত্বের বিরাট বোঝা। এর সোজা অর্থ হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেভাবে এ উম্মাতের জন্য আল্লাহভীতি, সত্য-সঠিক পথ অবলম্বন, সুবিচার, ন্যায়-নিষ্ঠা ও সত্যপ্রীতির জীবন্ত সাক্ষী হয়েছেন তেমনিভাবে এ উম্মাতকেও সারা দুনিয়াবাসীদের জন্য জীবন্ত সাক্ষীতে পরিণত হতে হবে। এমন কি তাদের কথা, কর্ম, আচরণ ইত্যাদি প্রত্যেকটি বিষয় দেখে দুনিয়াবাসী আল্লাহভীতি, সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা ও সত্যপ্রীতির শিক্ষা গ্রহণ করবে। এর আর একটি অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর হিদায়াত আমাদের কাছে পৌঁছাবার ব্যাপারে যেমন রাসূলের দায়িত্ব ছিল বড়ই সুকঠিন, এমনকি এ ব্যাপারে সামান্য ত্রুটি বা গাফলতি হলে আল্লাহর দরবারে তিনি পাকড়াও হতেন, অনুরূপভাবে এ হিদায়াতকে দুনিয়ার সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবার ব্যাপারেও আমাদের ওপর কঠিন দায়িত্ব আরোপিত হয়েছে। যদি আমরা আল্লাহর আদালতে যথার্থই এ মর্মে সাক্ষ্য দিতে ব্যর্থ হই যে, তোমার রাসূলের মাধ্যমে তোমার যে হিদায়াত আমরা পেয়েছিলাম তা তোমার বান্দাদের কাছে পৌঁছাবার ব্যাপারে আমরা কোন প্রকার ত্রুটি করিনি, তাহলে আমরা সেদিন মারাত্মকভাবে পাকড়াও হয়ে যাবো। সেদিন এ নেতৃত্বের অহঙ্কার সেখানে আমাদের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের নেতৃত্বের যুগে আমাদের যথার্থ ত্রুটির কারণে মানুষের চিন্তায় ও কর্মে যে সমস্ত গলদ দেখা দেবে, তার ফলে দুনিয়ায় যেসব গোমরাহী ছড়িয়ে পড়বে এবং যত বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলার রাজত্ব বিস্তৃত হবে — সে সবের জন্য অসৎ নেতৃবর্গ এবং মানুষ ও জিন শয়তানদের সাথে সাথে আমরাও পাকড়াও হবো। আমাদের জিজ্ঞেস করা হবে, পৃথিবীতে যখন জুলুম, নির্যাতন, অন্যায়, অত্যাচার, পাপ ও ভ্রষ্টতার রাজত্ব বিস্তৃত হয়েছিল তখন তোমরা কোথায় ছিলে?  (সূরা বাকারা)

যুগেযুগে ইসলামের শত্রুদের পরিণতি

স্যাম বেসিল নামক একজন আমেরিকান ইহুদী ১০০ জন দাতার সাহায্যে ৫০ লক্ষ ডলার খরচ করে ২ ঘণ্টার একটি ইসলাম বিদ্বেষী মুভি তৈরি করেছে, যার নাম Innocence of Muslims (ইনোসেন্স অব মুসলিমস)। সেখানে ইসলামকে একটি ঘৃণ্য ও ভণ্ড ধর্ম হিসেবে দেখানো হয়েছে যাকে তুলনা করা হয়েছে ক্যান্সার এর সাথে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভণ্ড, মিথ্যাবাদী এবং শিশু যৌনকামি হিসেবে প্রতিপন্ন করে সাহাবীদেরকে সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। (নাউজু বিল্লাহ) কিছু উগ্রবাদী খ্রীষ্টান আর ইহুদী মিলে ইসলাম ধর্মকেক নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে মাত্রা অতিক্রম করে ফেলেছে। এর ফলও আমরা হাতেনাতে পেয়েছি। বিক্ষুব্ধ মুসলিমরা লিবিয়াতে মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ তিন জনকে হত্যা করেছে। মিসরে সাধারণ জনগণ মার্কিন দূতাবাস ঘিরে রেখে সেখানকার মার্কিন পতাকা পুড়ে ফেলে ইসলামি পতাকা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” টাঙিয়েছে। তিউনিসিয়া, ফিলিস্তান, ইয়েমন, আফগানিস্তান বাংলদেশসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশে বিক্ষোভ চলছে। আগুনে ঘি ঢেলে দিলে আগুন ফুসকে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। ইসলামের মহান নেতা প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার মধ্যে বিন্দু পরিমাণ কলঙ্কের ছাপ নেই, তাঁকে যৌনকামী-ভণ্ড হিসেবে নোংরা মুভির মাধ্যমে মুসলমানদের হৃদয়ের গহীনে আঘাত হানবে এবং ইসলামকে এভাবে অপমান করবে, আর আমরা চুপ করে বসে থেকে আঙুল চুষবো, মুসলমানদের এত দুর্বল ঈমান নয়। প্রার্থনার সময় আমরা যেমন শান্ত সন্ন্যাসী হয়ে যাই, যুদ্ধের ময়দানে সেই আমরাই হই সাহসী লড়াকু বীর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- “অন্যায় (শরীয়ত বিরোধী কাজ) হতে দেখলে শক্তি প্রয়োগ করে বাধা দিবে, যদি সে শক্তি না থাকে তবে মুখ দিয়ে নিষেধ করবে। সে শক্তিও যদি না থাকে তাহলে মনে মনে তা ঘৃণা করবে। এটা ঈমানের দুর্বলতম স্তর।” (সহিহ মুসলিম) এখন আমাদের উচিত আমাদের পক্ষে যেভাবে সম্ভব, সেভাবেই এই নিকৃষ্ট কাজের প্রতিবাদ করা। যেহেতু এটা আমাদের ইসলামের উপর সরাসরি আঘাত করেছে, তাই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা নিঃসন্দেহে একটি জিহাদ। এতে আমাদের জঙ্গি বলুক, রাজাকার বলুক, সন্ত্রাসী বলুক- তাতে কিছুই যায় আসেনা। কারণ আমরা জানি আমরা যা করছি আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবেসেই করছি। আর এর প্রতিদান অপেক্ষা করছে জান্নাতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-“গৃহের কোণে বসে ৭০ বছর ইবাদত করা অপেক্ষা আল্লাহর পথে জিহাদ করা বেশি উত্তম। তুমি কি চাওনা আল্লাহ তোমার গুনাহ মাফ করে দিক এবং জান্নাত দান করুক? যে ব্যক্তি অল্পক্ষণের জন্য হলেও আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যায়”। (তিরমিযী শরীফ হাদীস হাসান) বর্তমান পশ্চিমাদের শেখানো ইসলামি জ্ঞান অনুযায়ী অনেকেই জিহাদ এবং Terrorsim (সন্ত্রাসবাদ) কে এক করে ফেলে। কিন্তু জিহাদের সাথে Terrorsim এবং  Terrorsim এর সাথে জিহাদের কোন সম্পর্ক নেই। বরং ঞবৎৎড়ৎংরস কে নির্মূল করাই একটি জিহাদ।

 রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায়ও এমন ঘটনার অবতারণা হয়েছে; যখন কুরআন মজিদের و أنذر عشيرتك الأقربين  ” তোমার নিকটাত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দাও। আয়াত নাজিল হলো তখন একদিন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা বের হয়ে সাফা পাহাড়ে গিয়ে উঠলেন এবং ‘ইয়া সাবাহাহ’ (সকাল বেলার বিপদ, সাবধান!) বলে চিৎকার করে ডাকলেন। সবাই সচকিত হয়ে বলে উঠলো, এভাবে কে ডাকছে? তারপর সবাই তাঁর পাশে গিয়ে সমবেত হলো, তিনি বললেন; আচ্ছা আমি যদি এখন তোমাদেরকে বলি যে, এই পাহাড়ের অপর দিক থেকে একটি অশ্বারোহী সৈন্যবাহিনী আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে, তাহলে কি তোমরা আমাকে বিশ্বাস করবে? সমবেত সবাই বললো, আপনার ব্যাপারে আমাদের মিথ্যার অভিজ্ঞতা নাই। তখন নবীজী বললেন; আমি তোমাদেরকে একটি কঠিন আযাব সম্পর্কে সাবধান করে দিচ্ছি। একথা শুনে আবু লাহাব বললো; “হে মুহাম্মাদ! তোমার সর্বনাশ হোক এজন্যই কি তুমি আমাদেরকে ডেকেছো”? এর পর সে সেখান থেকে দম্ভ ভরে চলে গেল।

তার এই বেয়াদবীপূর্ণ উক্তি আল্লাহর সহ্য হলো না। তার বিরুদ্ধে সূরা লাহাব নাযিল হলো। তার স্ত্রী নবীজীকে গালাগাল দিত এবং নবীজীর যাতায়াত পথে কাঁটা গেড়ে রাখতো। সূরা লাহাবে আল্লাহ তায়ালা উভয়ের বিরুদ্ধে নিম্নোক্ত শাস্তি ঘোষণা করলেন, “আবু লাহাবের উভয় হাত ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক। তার মালদৌলত ও জনবল কোন উপকারে আসবেনা। সে লেলিহান অগ্নিশিখায় অচিরেই পৌছে যাবে এবং তার স্ত্রীও তার সমগামিনী হবে।লাকড়ী বহনকালে তার গলায় রশি পড়বে।”(সূরা লাহাব)

মূলতঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা এর সাথে বেয়াদবী করে কেউ রক্ষা পায়নি। আবু লাহাবের দুই ছেলে ওতবা ও ওতায়বা এর নিকট নবীজীর দু’কন্যা রোকাইয়া ও উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এর বাল্য বিবাহ হয়েছিল ছোটকালে। সূরা লাহাব নাযিল হওয়ার পর তারা পিতার নির্দেশে দু’বোনকে বিবাহ বাসরের পূর্বেই তালাক প্রদান করে। এক পর্যায়ে ওতায়বা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা এর জামা মুবারক ছিড়ে ফেলে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে মনে বড় আঘাত পেলেন এবং বদদোয়া করলেন, “হে আল্লাহ! তুমি ওতায়বার ওপর তোমার পক্ষ থেকে একটি কুকুর লেলিয়ে দাও”। নবীজীর বদদোয়া অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেলো। কোন এক বাণিজ্য সফরে (সিরিয়া) একটি বাঘ এসে বহুলোকের মধ্যখান থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় ওতায়বার ঘাড় মটকে রক্ত চুষে চলে গেলো। নবীজীর সাথে বেয়াদবী করে আপন চাচা-চাচী ও চাচাত ভাইয়েরা বাঁচতে পারেনি। আল্লাহর গযবে পতিত হয়েছে তারা। যারা রাসূলের আত্মীয় নয়-তারা বেয়াদবী করলে আল্লাহ কি তাদের ছেড়ে দেবেন? কখনই নয়। আমার বিশ্বাস যদি আল্লাহর রাসূলের জীবদ্দশায় এই পশু অপেক্ষা অধম, স্পর্ধা দেখাতো, তবে ওর উপর আল্লাহর শাস্তি তখনই নেমে আসতো।

 মানুষরূপী শয়তান সে নিজেকে স্যাম বাসেলি বলে প্রচার করে আসছে। তার প্রকৃত নাম নাকুলা বালেসি নাকুলা (৫৫) ইউ-টিউবে ছবিটি প্রকাশ করার সময় এই নরপশু স্যাম বাসেলি ছদ্মনাম ব্যবহার করে। দীর্ঘদিন যাবৎ সে ব্যাংক একাউন্ট ও সামাজিক যোগাযোগ ফেসবুক ও টুইটারে ছদ্মনাম ব্যবহার করে আসছে। সে এখন পুলিশি প্রহরায়, নিজ এলাকা ছেড়ে স্বপরিবারে কোন এক গোপন স্থানে আত্মগোপন করে আছে। ইন্দোনেশীয় কর্তৃপক্ষ ছবিটি ব্লক করার জন্য ইন্টারনেট সার্ভিস সরবরাহকারীদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদেরও উচিত এই মুভিটি ব্লক করার চেষ্টা করা। 

 বিষয়টি আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিন্টনকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন; মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবারই রয়েছে। আমরা তাকে মত প্রকাশে বাধা দিতে পারি না! আমরা হিলারীকে বলতে চাই; ইসলামেও মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে। আমেরিকাতে যে মত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হলো, তাতে মানুষের মান-সম্মান রক্ষার অধিকার দেওয়া হলো না। এখন যদি কেউ হিলারীকে যা-ইচ্ছে তাই গালী দেয়, সেটা কি কোন সভ্য সমাজ মেনে নিবে। এই ক্ষেত্রে স্বয়ং হিলারীও মানবে বলে মনে হয় না। ইসলাম বাক স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে মান-সম্মান রক্ষারও ব্যবস্থা করেছে; রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; সেই ব্যক্তি প্রকৃত মুসলমান, যার মুখ ও হাত হতে অপর মুসলমান নিরাপদ থাকে। (বুখারী ও মুসলিম) এভাবে একজন ভদ্র লোককে যদি কেউ মৌখিক কিংবা মিডিয়ার মাধ্যমে অপমান করে, তাকে কি আমরা ভালো লোক বলে মেনে নিতে পারি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে হিলারী ক্লিনটনের বক্তব্যে আমরা হতাশ হয়েছি। একজন নবীকে নিয়ে এমন জঘন্য একটা ফিল্মের ব্যাপারে তিনি সামান্য কথাও কি বলতে পারতেন না? একটু নিন্দাও কি করতে পারতেন না? আমাদের ব্যথার সাথে তিনি কি একটু সহানুভূতি প্রকাশ করতে পারতেন না? কোটি কোটি মুসলমানদের অনুভূতির কি কোন মূল্য তাদের কাছে নেই? তিনি কি বলতে চান- মানুষের গালি দেওয়ার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু মানুষের সম্মান রক্ষার অধিকার কি নেই? এটাই কি আমেরিকার সভ্যতা?  যুগে-যুগে ইসলামের মহান ব্যক্তিদের উপর এমন আচরণ আমরা লক্ষ্য করেছি। তাদের এহেন ঘৃণিত কাজকে অবশ্যই প্রতিবাদ করতে হবে। তবে এক পাগলে ফিল্ম বানাবে আমরাও তাদের সাথে পাগল হয়ে নিরপরাধ লোককে হত্যা করবো এটাও মারাত্মক সীমা লঙ্ঘন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের প্রত্যেককে ইসলাম এবং ইসলামী ব্যক্তিদের সম্মান রক্ষা করার পূর্ণ তাওফীক দান করুন। হে আল্লাহর রাসূল! আপনার প্রতি আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ এবং আমি নিজেও উৎসর্গিত।

জিলহজের প্রথম দশদিনের ফযীলত এবং ঈদ ও কুরবানীর বিধান

আব্দুল মালেক আল-কাসেম

 জিলহজ মাসের দশদিনের ফযীলত : আল্লাহ তা’আলার অশেষ মেহেরবানী যে, তিনি নেককার বান্দাদের জন্য এমন কিছু মৌসুম করে দিয়েছেন, যেখানে তারা প্রচুর নেক আমল করার সুযোগ পায়, যা তাদের দীর্ঘ জীবনে বারবার আসে আর যায়। এসব মৌসুমের সব চেয়ে বড় ও মহত্বপূর্ণ হচ্ছে জিলহজ মাসের প্রথম দশদিন। জিলহজ মাসের ফযীলত সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসের কতক দলীল ১. আল্লাহ তা’আলা বলেন : শপথ ভোরবেলার। শপথ দশ রাতের। (সূরা ফাজর : ১-২) ইবনে কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন : এর দ্বারা উদ্দেশ্য জিলহজ মাসের দশ দিন। ২. আল্লাহ তাআলা বলেন : তারা যেন নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। (হজ : ২৮) ইবনে আব্বাস বলেছেন : অর্থাৎ জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন। ৩. ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ দিনগুলোর তুলনায় কোনো আমল-ই অন্য কোন সময় উত্তম নয়। তারা বলল : জিহাদও না ? তিনি বললেন : জিহাদও না, তবে যে ব্যক্তি নিজের জানের শঙ্কা ও সম্পদ নিয়ে বের হয়েছে, অতঃপর কিছু নিয়েই ফিরে আসেনি। (বুখারী) ৪. ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট কোন দিন প্রিয় নয়, আর না তাতে আমল করা, এ দশ দিনের তুলনায়। সুতরাং তাতে তোমরা বেশি করে তাহলীল, তাকবীর ও তাহমীদ পাঠ কর। (তাবারানী ফীল মুজামিল কাবীর) ৫. উলামায়ে কেরামগণ বলেছেন : জিলহজ মাসের দশদিন সর্বোত্তম দিন, আর রমযান মাসের শেষ দশ রাত, সব চেয়ে উত্তম রাত। এ দিনগুলোতে যেসব আমল করা মুস্তাহাব : ১ সালাত : ফরয সালাতগুলো দ্রুত সম্পাদন করা, বেশি বেশি নফল আদায় করা। যেহেতু এগুলোই আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার সর্বোত্তম মাধ্যম। সাওবান রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শোনেছি : তুমি বেশি বেশি সেজদা কর, কারণ তুমি এমন কোন সেজদা কর না, যার কারণে আল্লাহ তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন না এবং তোমরা গুনাহ ক্ষমা করেন না। (মুসলি) এটা সব সময়ের জন্য প্রযোজ্য। ২ সিয়াম : যেহেতু অন্যান্য নেক আমলের মধ্যে সিয়ামও অন্যতম, তাই এ দিনগুলোতে খুব যতেœর সাথে সিয়াম পালন করা। হুনাইদা বিন খালেদ তার স্ত্রী থেকে, সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জনৈক স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিলহজ মাসের নয় তারিখ, আশুরার দিন ও প্রত্যেক মাসের তিন দিন রোজা পালন করতেন। (ইমাম আহমদ আবূ দাউদ ও নাসায়ী) ইমাম নববী জিলহজ মাসের শেষ দশ দিনের ব্যাপারে বলেছেন, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ মুস্তাহাব। ৩ তাকবীর, তাহলীল ও তাহমীদ : পূর্বে ইবনে ওমরের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : তাতে রয়েছে, তোমরা বেশি বেশি তাকবীর, তাহলীল ও তাহমীদ পড়। ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ইবনে ওমর ও আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহুমা এ দশ দিন তাকবীর বলতে বলতে বাজারের জন্য বের হতেন, মানুষরাও তাদের দেখে দেখে তাকবীর বলত। তিনি আরো বলেছেন, ইবনে ওমর মিনায় তার তাবুতে তাকবীর বলতেন, মসজিদের লোকেরা তা শুনত, অতঃপর তারা তাকবীর বলত এবং বাজারের লোকেরাও, এক পর্যায়ে পুরো মিনা তাকবীর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠত। মুসলমান হিসেবে আমাদের উচিত, এ সুন্নতগুলো জীবিত করা, যা বর্তমান যুগে প্রায় পরিত্যক্ত এবং ভুলে যাওয়ার উমক্রম হয়েছে, এমনকি নেককার লোকদের থেকেও, অথচ আমাদের পূর্বপুরুষগণ এমন ছিলেন না। ৪. আরাফার দিন রোজা : হাজী ছাড়া অন্যদের জন্য আরাফার দিনের রোজা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত, তিনি আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে বলেছেন : আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, ইহা পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহর কাফ্ফারা হবে। (মুসলিম) ৫. নহরের দিন তথা দশই জিলহজের ফযীলত : এ দিনগুলোর ব্যাপারে অনেক মুসলমানই গাফেল, অথচ অনেক আলেমদের নিকট নিঃশর্তভাবে এ দিনগুলো উত্তম, এমনকি আরাফার দিন থেকেও। ইবনুল কাইয়ূম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন : আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম দিন, নহরের দিন। আর তাই হজ্জে আকবারের দিন। যেমন সুনানে আবূদাউদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় দিন হলো নহরের দিন, অতঃপর মিনায় অবস্থানের দিন। অর্থাৎ এগারোতম দিন। কেউ কেউ বলেছেন : আরাফার দিন তার থেকে উত্তম। কারণ, সে দিনের সিয়াম দুই বছরের গুনাহর কাফ্ফারা। আল্লাহ আরাফার দিন যে পরিমাণ লোক জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন, তা অন্য কোন দিন করেন না। আরো এ জন্যও যে, আল্লাহ তাআলা সে দিন বান্দার নিকটবর্তী হন এবং আরাফায় অবস্থানকারীদের নিয়ে ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন। তবে প্রথম বক্তব্যই সঠিক : কারণ, হাদীস তারই প্রমাণ বহন করে, এর বিরোধী কিছু নেই। যাই হোক, উত্তম হয় আরাফার দিন নয় মিনার দিন, হাজী বা বাড়িতে অবস্থানকারী সবার উচিত সে দিনের ফযীলত অর্জন করা এবং তার মুর্হূতগুলো থেকে উপকৃত হওয়া। ইবাদাতের মৌসুমগুলো আমরা কিভাবে গ্রহণ করব? প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য ইবাদাতের মৌসুমগুলোতে বেশি বেশি তাওবা করা। গুনাহ ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা। কারণ, গুনাহ মানুষকে আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত রাখে। গুনাহ ব্যক্তির অন্তর ও আল্লাহর মাঝে বাঁধার সৃষ্টি করে। বান্দার আরো উচিত কল্যাণকর ও শুভদিনগুলোতে এমন সব আমল ও কাজে নিয়োজিত থাকা, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ। যে আল্লাহর সাথে সত্যতার প্রমাণ দেবে আল্লাহও তার সাথে তাঁর ওয়াদা বাস্তবায়ন করবেন। তিনি বলেন : আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। (আলে-ইমরান : ১৩৩) ঈদুল আজহার বিধান : ঈদ এ উম্মতের বৈশিষ্ট্য এবং দ্বীনের একটি উজ্জল নিদর্শন। আমাদের দায়িত্ব এটা গুরুত্ব ও সম্মানসহ গ্রহণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন : এটাই হল আল্লাহর বিধান; যে আল্লাহর নিদর্শনসমূহকে সম্মান করে, নিঃসন্দেহে তা অন্তরের তাকওয়া থেকেই। (সূরা হজ : ৩২) ঈদের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত কিছু আদব ও আহকাম : ১ তাকবীর : আরাফার দিনের ফজর থেকে শুরু করে তাশরীকের দিনের শেষ পর্যন্ত, তথা জিলহজ মাসের তের তারিখের আসর পর্যন্ত তাকবীর বলা। আল্লাহ তাআলা বলেন : আর তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর নির্দিষ্ট দিনসমূহে। (সূরা বাকারা : ২০৩) তাকবীর বলার পদ্ধতি : ” الله أكبر، الله أكبر، لا إله إلا الله والله أكبر، الله أكبر ولله الحمد ” আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু ওয়াআল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ। আল্লাহর যিকির বুলন্দ ও সর্বত্র ব্যাপক করার নিয়তে পুরুষদের জন্য মসজিদে, বাজারে, বাড়িতে ও সালাতের পশ্চাতে উচ্চ স্বরে তাকবীর পাঠ করা সুন্নত। ২ কুরবানী করা : ঈদের দিন ঈদের সালাতের পর কুরবানী করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি ঈদের আগে যবেহ করল, তার উচিত তার জায়গায় আরেকটি কুরবানী করা। আর যে এখনো কুরবানী করেনি, তার উচিত এখন কুরবানী করা। (বুখারী ও মুসলিম) কুরবানী করার সময় চার দিন। অর্থাৎ নহরের দিন এবং তার পরবর্তী তাশরীকের তিন দিন। যেহেতু রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : তাশরীকের দিন কুরবানীর দিন। (সহীহ হাদীস সমগ্র : ২৪৬৭) ৩ পুরুষদের জন্য গোসল করা ও সুগন্ধি মাখা : সুন্দর কাপড় পরিধান করা, টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান না করা, কাপড়ের ক্ষেত্রে অপচয় না করা। দাঁড়ি না মুণ্ডানো, এটা হারাম। নারীদের জন্য ঈদগাহে যাওয়া বৈধ, তবে আতর ও সৌন্দর্য প্রদর্শন পরিহার করে। মুসলিম নারীদের জন্য কখনো শোভা পায় না যে, সে আল্লাহর ইবাদাতের জন্য তাঁরই গুনাহতে লিপ্ত হয়ে ধর্মীয় কোন ইবাদাতে অংশ গ্রহণ করবে। যেমন সৌন্দর্য প্রদর্শন, সুসগন্ধি ব্যবহার ইত্যাদি করে ঈদগাহে উপস্থিত হওয়া। ৪ কুরবানীর গোস্ত ভক্ষণ করা : ঈদুল আজহার দিন রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খানা খেতেন না, যতক্ষণ না তিনি ঈদগাহ থেকে ফিরে আসতেন, অতঃপর তিনি কুরবানী গোস্ত থেকে ভক্ষণ করতেন। ৫ সম্ভব হলে হেঁটে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া : ঈদগাহতেই সালাত আদায় করা সুন্নত। তবে বৃষ্টি বা অন্য কোন কারণে মসজিদে পড়া বৈধ, যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা পড়েছেন। ৬ মুসলমানদের সাথে সালাত আদায় করা এবং খুতবায় অংশ গ্রহণ করা : উলামায়ে কেরামদের প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, ঈদের সালাত ওয়াজিব। এটাই ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন : অতএব তোমরা রবের উদ্দেশ্যেই সালাত পড় এবং কুরবানী কর। (সূরা কাউসার : ২) উপযুক্ত কোন কারণ ছাড়া ঈদের সালাতের ওয়াজিব রহিত হবে না। মুসলমানদের সাথে নারীরাও ঈদের সালাতে হাজির হবে। এমনকি ঋতুবতী নারী ও যুবতী মেয়েরা। তবে ঋতুবতী নারীরা ঈদগাহ থেকে দূরে অবস্থান করবে। ৭ রাস্তা পরিবর্তন করা : এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া ও অপর রাস্তা দিয়ে ঈদগাহ থেকে বাড়ি ফেরা মুস্তাহাব। যেহেতু তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম করেছেন। ৮ ঈদের সুভেচ্ছা জানানো : ঈদের দিন একে অপরকে সুভেচ্ছা বিনিময় করা : যেমন বলা : تقبل الله منا ومنكم. أو تقبل الله منا ومنكم صالح الأعمال তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়ামিনকুম, অথবা তাকাব্বাল্লাহু মিন্না ওয়ামিনকুম সালিহাল আ‘মাল। অর্থ : আল্লাহ আমাদের থেকে ও তোমাদের থেকে নেক আমলসমূহ কবুল করুন। বা এ ধরণের অন্য কিছু বলা। ৯ কুরবানীর গোস্ত ভণ্টন করা : কুরবানী পেশকারী ব্যক্তির জন্য সুন্নত হচ্ছে কুরবানীর গোস্ত নিজে খাওয়া, আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের হাদিয়া দেয়া এবং গরীবদের সদকা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন : অতঃপর তোমরা তা থেকে খাও এবং দুস্থ-দরিদ্রকে থেকে দাও। (হজ : ২৮) পূর্বসূরীদের অনেকের পছন্দ হচ্ছে, কুরবানীর গোস্ত তিনভাগে ভাগ করা। এক তৃতীয়াংশ নিজের জন্য রাখা। এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়দের হাদীয়া দেয়া। এক তৃতীয়াংশ ফকীরদের জন্য সদকা করা। পারিশ্রমিক হিসেবে এখান থেকে কসাই বা মজদুরদের কোন অংশ প্রদান করা যাবে না। ১০ কুরবানী পেশকারী যা থেকে বিরত থাকবে : যখন কেউ কুরবানী পেশ করার ইচ্ছা করে আর জিলহজ মাস প্রবেশ করে, তার জন্য চুল, নখ অথবা চামড়ার কোন অংশ কাটা থেকে বিরত থাকবেন, যতক্ষণ না কুরবানী করে। উম্মে সালমার হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন জিলহজ মাসের দশ দিন প্রবেশ করে এবং তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করে, সে তখন থেকে চুল ও নখ কর্তন থেকে বিরত থাকবে। ইতিপূর্বে যা কর্তন করেছে, সে জন্য তার কোন গুনাহ হবে না। কুরবানী দাতার পরিবারের লোক জনের নখ, চুল ইত্যাদি কাঁটাতে কোন সমস্যা নেই। ১১ মুসলিম ভাইদের প্রতি আহব্বান : আপনারা উপরে বর্ণিত নেক আমল ছাড়াও অন্যান্য নেক আমলের প্রতি যতœশীল হোন। যেমন আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা-সাক্ষাত করা, হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করা, একে অপরকে মহব্বত করা এবং গরীব ও ফকীরদের উপর মেহেরবান হওয়া এবং তাদের আনন্দ দেয়া ইত্যাদি। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি আমাদেরকে তাঁর পছন্দনীয় কথা, কাজ ও আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।