কোনটি উত্তম? হজ্ব-উমরার পুনরাবৃত্তি না ‘ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ’?

ড. ইউসুফ আল কারজাবি

ফরজ আদায় করা শরিয়তের মুকাল্লাফ ব্যক্তিমাত্রেরই প্রথম কর্তব্য। বিশেষত তা যদি হয় দ্বীনের রুকন বা স্তম্ভগুলোর অন্যতম। আর নফলের দ্বারা সে আল্লাহর প্রিয় হয় এবং তাঁর নৈকট্য লাভ করে। ইমাম বুখারি বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘আমার বান্দার ওপর আমি যা ফরজ করেছি এর চেয়ে অন্য কিছুর মাধ্যমে সে আমার অধিক নৈকট্য লাভ করে না। আমার বান্দা নফলের দ্বারা আমার কাছে আসতে থাকে এমনকি আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। সুতরাং আমি যখন তাকে ভালোবাসি তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে এবং চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে।’ (বুখারি) তবে পাশাপাশি আমাদের সামনে শরিয়ত নির্ধারিত নিম্নোক্ত মূলনীতিগুলোও বিদ্যমান : প্রথমত. আল্লাহ তাআলা ফরজ সম্পাদন না করা পর্যন্ত কোনো নফল কবুল করেন না। সুতরাং যে ব্যক্তি নফল হজ্ব বা উমরা করে অথচ সে তার ওপর ফরজ জাকাত পুরোপুরি বা আংশিক আদায়ে কার্পণ্য করে তার হজ্ব ও উমরা গ্রহণযোগ্য নয়। হজ্ব বা উমরার পেছনে তার সম্পদ খরচের চেয়ে বরং জাকাত আদায়ের মাধ্যমে সম্পদকে পবিত্র করা অধিক জরুরি। তেমনিভাবে যার কাঁধে ঋণের বোঝা আছে, যেমন সে ব্যবসায়ী; বাকিতে মাল ক্রয় করেছে- যার মূল্য সে সময়মত পরিশোধ করে নি কিংবা তাকে কেউ কর্জে হাসান বা উত্তম ঋণ দিয়েছে তা এখনো আদায় করে নি, তো এই ব্যক্তির জন্য তার ঋণ পরিশোধের আগে নফল হজ্ব বা উমরা করা জায়েজ নেই। দ্বিতীয়ত. হারাম কাজ করার পাশাপাশি যদি কেউ নফল আদায় করে তবে আল্লাহ তাআলা তা কবুল করেন না। কারণ হারামের পাপ বর্জন নফলের পুণ্য অর্জনের চেয়ে বেশি দরকারি। আমরা দেখেছি অতিরিক্ত নফল হজ্বকারীদের উপস্থিতি ফরজ আদায়কারী হাজ্বীদের জন্য দুর্ভোগ বয়ে আনে। যেমন- তারা ভীড় দীর্ঘতর করে। এতে সকল হাজ্বীর কষ্ট বেড়ে যায়, রোগ ছড়ায়, কেউ কেউ আহত হয়, এমনকি অনেকেই পদপিষ্ট হয়। তারা সামনেও অগ্রসর হতে পারে না আবার পেছনেও ফিরে আসতে পারে না। এ মূলনীতির আলোকে যথাসম্ভব ভীড় ঠেকানো ওয়াজিব। আর এর জন্য সবচে কার্যকর ও উত্তম পদক্ষেপ হলো, যারা একাধিকবার হজ্ব করেছেন (অন্তত হজ্ব মৌসুমে) তাদের জন্য হজ্ব-উমরা নিষিদ্ধ করা। যাতে করে যারা এখনো ফরজ হজ্ব আদায় করতে পারেন নি তারা ভালোভাবে হজ্ব আদায় করতে পারেন। ইমাম গাজালি রহ. হাজ্বীদের জন্য যেসব আদব রক্ষা করা ওয়াজিব তার তালিকায় লিখেছেন : ‘হাজ্বীদের জন্য ওয়াজিব তারা যেন মাক্স (এটা এক ধরনের ট্যাক্স যা জোরপূর্বক নেয়া হত) প্রদানের মাধ্যমে আল্লাহর দুশমনদের সাহায্য না করে। মক্কার সেসব প্রশাসক দুশমনরা যারা মসজিদের হারামে প্রবেশের জন্য অন্যায়ভাবে ট্যাক্স আদায় করে এবং যারা রাস্তায় গতি রোধ করে হাজ্বীদের অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নেয়। কারণ তাদেরকে নিজের অর্থ-সম্পদ প্রদান করা জুলুমকে উৎসাহিত করার নামান্তর। সুতরাং এ ক্ষেত্রে কৌশলের আশ্রয় নেবে। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে কোনো কোনো শরিয়তবিদ বলেছেন, নফল হজ্ব বাদ দেয়া এবং রাস্তা থেকে ফিরে আসা জুলমকে উৎসাহিত করার চেয়ে উত্তম। এখানে কারও এ কথা বলা ঠিক হবে না যে, এটাতো আমার থেকে জোরপূর্বক নেয়া হচ্ছে। তাই আমি নিরুপায়। কারণ সে যদি ঘরে বসে থাকে অথবা রাস্তা থেকে ফিরে আসে তাহলে তার থেকে কেউ কিছু নিতে পারবে না। এরপরেও নফল হজ্বের জন্য গেলে তা তো নিজেই নিজেকে নিরুপায় অবস্থায় উপনীত করার শামিল বৈ নয়। (এহইয়াউ উলুমিদ্দিন : ০১/২৩৬, আল-ইবাদাতু ফিল ইসলাম : ৩২৪) এই উদ্ধৃতি থেকে আমরা জানলাম, নফল হজ যদি হারামে পতিত হওয়ার কারণ হয় কিংবা শুধু তাতে পরো সহযোগিতাও হয় তবে তা অবৈধ ও অননুমোদিত। আল্লাহর সন্তুষ্টিই যার কাম্য তার এ নফল হজ্ব পরিহার করাই শ্রেয়। তৃতীয়ত. লাভ করার চেয়ে ক্ষতি রোধই অগ্রগণ্য। বিশেষত যখন ক্ষতি হয় সবার আর লাভ হয় কিছু লোকের। আলোচ্য ক্ষেত্রে কিছু লোকের লাভ এতটুকু যে তারা বারবার হজ্ব-উমরা করছেন আর এর ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে লাখ লাখ লোককে- যারা ফরজ হজ্ব করতে এসেছেন। যেমন- এরা এসব নফল ইবাদতকারীদের কারণে শারীরিক ও মানসিক কষ্ট পাচ্ছেন। এমনকি এরাও সে দুর্ভোগ থেকে নিস্তার পাচ্ছেন না তাই এ কষ্ট দূর করণার্থে বারবার নফল হজ্ব না করা উত্তম। চতুর্থত. নফল নেকি ও পুণ্য আহরণের তো বিস্তর উপায় ও ইবাদত রয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার জন্য এর পথ অনেক প্রশস্ত করেছেন। যাতে তারা সবাই আপন স্থান-কাল ও অবস্থা অনুযায়ী পছন্দের উপায়টি বেছে নিতে পারে। তাছাড়া নফল হজ্ব অনেক মুসলমানের কষ্ট ও দুর্ভোগের কারণ হয়। অথচ আল্লাহ তাআলা মুসলমানের জন্য অপর মুসলমান ভাইদের কষ্ট দেয়া ছাড়াই নফল ইবাদতের অনেক ক্ষেত্র রেখেছেন। যেমন- অভাবী ও দরিদ্রকে সদকা করা, বিশেষত নিকাটাত্বীয়দের সাহায্য করা। হাদিসে এসেছে- ‘দরিদ্রকে সদকা করলে শুধু সদকার নেকি আর আত্মীয়কে সাহায্য করলে দুই ধরনের নেকি : একটি সদকা করার দ্বিতীয়টি আত্মীয়তার হক আদায় করার।’ (আহমদ, তিরমিজি) আবার কখনো কখনো সদকা করা ওয়াজিব হয়ে যায়, যখন আত্মীয় হয় অভাবী আর সে হয় বিত্তবান। তেমনি প্রতিবেশিদের দান-সদকা করা। কারণ মুসলমান ভাই হওয়ার সূত্রে তারও অধিকার রয়েছে এর সম্পদে। হাদিসে এসেছে- ‘সে মুমিন নয় যে (খেয়ে) পরিতৃপ্ত হয়ে রাত্রি যাপন আর তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে।’ (তাবরানি, আবু ইআলা) তেমনি নেকি কামাই করা যায় ধর্মীয় নানা সংস্থা-সোসাইটি, ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মক্তব-মাদরাসা এবং ইসলামের জন্য কর্মরত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনকে দান করার দ্বারা। আজ দাতা ও পৃষ্ঠপোষকের অভাবে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অথচ একই সময়ে দারিদ্রপীড়িত বিভিন্ন মুসলিম দেশে খৃস্টান মিশনারি ও এনজিওগুলো সচ্ছলভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যাদের কাজ ইসলামকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা, মুসলিমদের ঐক্যে ফাটল ধরানো, মুসলিমদের ইসলাম থেকে খারিজ করা এবং খৃস্টান বানাতে না পারলেও কমপে তাদের ইসলামের চেতনা নড়বড়ে করে দেয়া। আবার অনেক ইসলামি প্রকল্প বাস্তবায়ন হতে পারে না। এর জন্য মুসলমানদের সম্পদ স্বল্পতা দায়ী নয়। বর্তমানে অনেক মুসলিম দেশই বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। আবার দাতা ও ব্যয়কারীরও অভাব নেই; কিন্তু অনেক অর্থ ও দানই অপাত্রে করা হচ্ছে। ব্যয় হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় খাতে। প্রতি বছর যে লাখ লাখ মুসলিম নফল হজ্ব-উমরা করেন তারা যদি তাদের নফল হজের অর্থ ইসলামি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে খরচ করেন অথবা ইসলামি ফান্ডগুলো স্ফীত করতে সাহায্য করেন, আর তা সঠিকভাবে ব্যয় করা হয় তাহলে তা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য আর্থ-সামাজিক কল্যাণ ও সমৃদ্ধি বয়ে আনতে পারে। ইসলামের পথে একনিষ্ঠভাবে দাওয়াতরত ব্যক্তিগণ এর দ্বারা খ্রিস্টান মিশনারি, সমাজতন্ত্রী, নাস্তিক প্রভৃতি প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের ধর্মহীন ষড়যন্ত্র তথা উম্মার মাঝে অনৈক্য বজায় রাখা, বিশুদ্ধ ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিরোধ ইত্যাদি মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। এসব যুক্তির মাধ্যম আমি ইসলামপ্রিয় নেকিভক্ত ভাইদের সুপরামর্শ দিচ্ছি, তারা যেন এ পর্যন্ত যতগুলো হজ্ব-উমরা করেছেন তাতেই ক্ষান্ত হন। এতে দু’টি ভালো কাজ হবে : প্রথম. এ অর্থ ইসলামি কল্যাণমূলক ও দাওয়াতি কাজে ব্যয় করতে পারবেন এবং মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি জায়গায় এমনকি এর বাইরে মুসলিম সংখ্যালঘু এলাকায় প্রেরণ করতে পারবেন। দ্বিতীয়. এতে করে বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে আগত ফরজ আদায়কারী অতিথি মুসলিম ভাইদের জন্য জায়গা ছেড়ে দেয়া হবে। ফলে তারা আরও ভালোভাবে স্বস্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে তাদের হজ্ব সম্পন্ন করতে পারবেন। অন্যদের জন্য জায়গা করে দিতে নফল হজ্ব ছেড়ে দেয়া এবং হাজ্বীদের ভীড় হ্রাস করা দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান রাখা ব্যক্তি মাত্রই বলবেন, নেকির কাজ। হাদিসে এসেছে- কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রত্যেকে তাই পাবে যা সে নিয়ত করবে। (বুখারি) আর যেসব আমল জিহাদের অন্তর্ভুক্ত সেগুলো যে হজ্ব জাতীয় আমলের চেয়ে উত্তম তা তো স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। মুসলমানদের ধর্মান্তরিত হওয়া থেকে বাঁচানো, দ্বীনকে অমুসলিম শত্রুদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা তো জিহাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা কালামে পাকে ইরশাদ করেন- তোমরা কি হাজিদের পানি পান করানো এবং মসজিদে হারাম আবাদ করাকে ওই ব্যক্তির (আমলের) সমতুল্য ভাবছো যে আল্লাহ এবং কিয়ামত দিবসে ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে? এরা আল্লাহর কাছে বরাবর নয়। আল্লাহ জালিম সম্প্রদায়কে হেদায়েত দেন না। যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আপন জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে তাদের জন্য আল্লাহর কাছে উচ্চ মর্তবা রয়েছে এবং এরাই কামিয়াব। (তাওবা ১৯-২০)

কুয়েতে ঈদ পুনর্মিলনী ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা

 

অর্নিবাণ শিল্পী গোষ্ঠী কুয়েত’র উদ্যোগে এক ঈদ পূর্নমিলনী ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ২/১১/২০১২ ইং তারিখে আব্বাসিয়া টুরেস্টিক পার্কে জনাব শাসছুদ্দোহার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। মনো মুগ্ধকর এই বিনোদন অনুষ্ঠান দেশী বিদেশী হাজার হাজার দর্শক উপভোগ করেন। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ কুরআন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কুয়েত’র সভাপতি হাফেজ মাওলানা নুরুল আলম, কুয়েত জি.সা.স’র সভাপতি আনিসুর রহমান উল্কা, কুয়েত প্রবাসী সাহিত্য পরিষদ’র সভাপতি রফিকুল ইসলাম ভুলু প্রমুখ।

বক্তারা বলেন সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ছাড়া কোন জাতি তার উন্নতির শিখরে পোঁছতে পারবে না। সংস্কৃতি একটি জাতির পরিচয় বহন করে। বর্তমানে যে অপসংস্কৃতির সয়লাব করে শিশু থেকে অবাল, বৃদ্ধা সবাইকে ধ্বংশের মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তা থেকে মুক্তি পেতে হলে অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং পাশাপাশি সুস্থধারার সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচার প্রসার ঘটাতে হবে। তারা আশা প্রকাশ করেন ”অর্নিবাণ শিল্পী গোষ্ঠী কুয়েত” এই ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

অনুষ্ঠানে অর্নিবাণ শিল্পী গোষ্ঠীর শিল্পীরা হামদ, নাত, কৌতুক, নাটক, আঞ্চলিক গান, দেশের গান, কবিতা আবৃতি, টকশো চতুর্থ মাত্রা এবং ”গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য” মনের মত সাজ সহ বিভিন্ন ধরনের ইভেন্ট প্রদর্শন করে। হাফেজ মাওলানা নুরুল আলমের ইমামতিতে দর্শক শ্রোতারা পার্কে মাগরিব ও ঈশার নামাজ আদায় করেন।

একজন নও মুসলিমের আত্মকাহিনী

পূর্বে প্রকাশিতের পর-৩
  পূর্বের ২টি পর্ব প্রকাশিতের পর পাঠক সমাজ থেকে সম্পাদকে নিকট অনেক মোবারকবাদ এসেছে, আমার টেলিফোন সংগ্রহ করে ফোনে আমাকেও মোবারকবাদ দিয়েছে। আবার কেউ কেউ বিরূপ মন্তব্যও করেছে। বলে ২ দিন হলো মুসলমান হয়েছে! এখন সে নসিহত শুরু করেছে। আমি তাদেরকে অতি বিনয়ের সাথে অবগতকরছি যে আমার এখন কোন অভিপ্রায় নেই, কাউকে খাটো করি, কাউকে নসিহতকরি। শুধুমাত্র ঈমানের তাগিদেই লিখছি, এটি যে আমার ঈমানী দায়িত্ব। কোন উদ্দেশ্য বা কাউকে আঘাত দেওয়ার জন্য নয়। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন; কোন মুসলমান যদি অন্য মুসলমানের দোষ গোপন রাখে, তবে আল্লাহ তা‘আলাও কিয়ামত দিবসে তার দোষ গোপন রাখবেন।
 আমি ইসলামে প্রবেশ করার পূর্বে দীর্ঘ ৭টি বৎসর আমার কাছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা যেভাবে ইসলামকে উপস্থাপন করেছেন, ইসলাম গ্রহণ করার পর মুসলমানদের সাথে মিশে যা দেখছি, তার মাঝে বিস্তর ফরাক পরিলক্ষিত হয়। মনে হয় আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আমাদেরকে যে পথে পরিচালিত করতে চান, আমরা চলছি তার বিপরীত পথে। তাইতো আজ সারা বিশ্বে মুসলমান মানেই জঙ্গী, সন্ত্রাসী ইত্যাদিতে আখ্যায়িত করে ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে বিচ্যুত করার মহাসমারোহে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ কি নেই মসলমানদের কাছ? ঈমানের মত অমূল্য সম্পদ আছে। অর্থে, শক্তিতে-জনবলে বিশ্বের সেরা মুসলমান। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কথা চিন্তা করুন, ১২০ কোটি লোকের দেশ পাকিস্তানের চেয়ে ৮-১০ গুণ বগ, শক্তিতেও পাকিস্তানের চেয়ে অনেকে এগিয়ে, তারপরও পাকিস্তানকে কেমন সমিহ করে চলে। সামরিক শক্তিতেও সমানভাবে লড়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। এটা কিভাবে সম্ভব!? শুধুমাত্র ঈমানদার ও মুসলমান হওয়ার কারণেই। তাহলে বুঝতে হবে আজ আমাদের ঈমানী শক্তি কমে গেছে- তাই আজ সারা বিশ্বে মুসলমান কেবল মার খাচ্ছে। একটা প্রবাদ আছে; কোন ধর্মের উপর যখন অনবরত আঘাত আসতে থাকে, তখন বুঝতে হবে ঐ ধর্মের অনুসারীরা তার ধর্মকে সঠিকভাবে পালন করছে না। আমাদের দেশে এখনও শয়তানের প্ররোচনায় অনেক বেদআতী নিয়ম কানুন, পূর্ব পুরুষদের দোহাই দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছে। কোন মুসিবত আসলে ২ কেজি মিষ্টি আর ইমামকে ১০০ টাকা দিয়ে মীলাদ বা দোয়া পড়িয়ে সেই মুসিবত থেকে মুক্ত হওয়ায় বিশ্বাসী। অথচ মুসলমানদের বিশ্বাস হওয়া উচিত আল্লাহ তা‘আলা প্রতি। যে মহান আল্লাহই এই বিপদ থেকে মুক্তি দিবেন। প্রচলিত বিদআত অনুসরণ করে নয় বরং সুন্নতি পদ্ধতিতে আল্লাহর নিকট দোয়া চাইতে হবে। দুই রাকাত সালাতুল হাজাত আদায় করে আল্লাহর সমীপে কান্নাকাটি করুন। আল্লাহ অবশ্যই দোয়া কবুল করবেন। এই পদ্ধতি গ্রহণ না করে যদি ইমামের নিকট বা সমাজের নেতৃস্থানীয় লোকের নিকট শরাণপন্ন হোন যে, তারাই আমার বিপদ উদ্ধার করবে, তবে তো শিরক হয়ে যাবে।
 মুসলমান হলো আল্লাহর প্রতিনিধি। যত দিন নবী রাসূলদের প্রয়োজন ছিল, আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে, তাই আর নবী রাসূল প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা নেই। তাই ঘোষণা করা হয়; যে মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্য হতে কোন পুরুষের পিতা নন, বরং তিনি সর্বশেষ নবী। তার পরে আর কোন নবী রাসূল আসবেন না। তবে কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামের দাওয়াতী কাজ চালানোর জন্য সাহাবায়ে কেরাম আজমাঈন, তাবেঈন, তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, আইম্মায়ে মুজতাহেদীন ক্রমান্বয়ে আমাদের উপর দাওয়াতী কাজের দায়িত্ব উপনীত হয়েছে। রাসূলের উাম্মত হিসেবে আমরা সেই মান মর্যাদার অধিকারী হয়েছি। আমাদেরকেই অন্যান্য নবীদের উম্মতের উপর সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করা হবে। মহান আল্লাহ বলেন: আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে একটি ‘মধ্যপন্থী’ উম্মাতে পরিণত করেছি, যাতে তোমরা দুনিয়াবাসীর ওপর সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূল হতে পারেন তোমাদের ওপর সাক্ষী। (সূরা বাকারা: ১৪৩) আমাদেরকের মহান আল্লাহ যে এত বড় মর্যাদা দান করলেন, তা ধরে রাখতে না পারলে প্রকারান্তে রাসূলের মর্যাদার হানী হওয়ার সম্ভাবনার কথা গুরুত্বসহকারে ভাব উচিত। মুসলমান হলো আল্লাহর দুনিয়ার বিবেক, একজন মুসলমানই পারে একটি সভ্য সমাজ গড়তে। ইহুদী খ্রীষ্টানরা যত ভালো কিছুই করুক একটি সভ্য সমাজ বলতে যা বুঝায়, তা তারা উপহার দিতে পারবে না, তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। অথচ অনেক নামধারী মুসলমান তাদের গুণোগান গাইতে কেমনজানি আনন্দ বোধ করে। এটা যে একজন মুসলমানের জন্য লজ্জার ব্যাপার তা ভাবে না। 
 তবে আমার দীর্ঘ ১১ বৎসরের কুয়েতের জীবনে অনেক আসল মুসলমানের দেখা পেয়েছি। যারা ইসলামের ইতিহাস নিয়ে পি এইচ পি করেছেন, তারা দেখবেন, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনের পর্যটকরা যখন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনে যেতেন, তখন সেখানকার মুসলমানের আমল, আখলাক, ও তাদের জীবনধারা দেখে এতই মুগ্ধ হয়ে যেতেন, দেখা গেছে অনেক ইহুদী ও খ্রীষ্টান ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তা কুয়েতীদের সাথে মিলে আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি। বিশ্বের সেরা ধনী দেশের মানুষ হয়েও অবসর সময় তারা বাজে কাজে লিপ্ত না হয়ে, সবাই একত্রিত হয়ে ধর্ম চর্চা করে। প্রতি সপ্তায় পর্যায়ক্রমে একেক জনের বাসায় ২-৩ ঘণ্টা ব্যাপী কুরআন ও হাদীসের আলোচনা হয়। আলোচনার পর তা নিয়ে রীতিমত গবেষণাও করে।  তা আমাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করে। তাইতো দীর্ঘ ৭টি বৎসর ধরে আমি স্বেচ্ছায় তাদের সাথে আমার ছুটির অধিকাংশ দিনগুলো পার করে দেই। আমার কাছে প্রচুর অর্থ নেই। আমাদের দেশের প্রত্যেকটি জেলায়, পাড়ায় পাড়ায় এই ব্যবস্থাটা চালু করা মনে করি। সবচেয়ে ভালো লাগে ওয়াজের পর প্রত্যেকে প্রত্যেকের সাথে কুলাকুলি করে। যা মুসলিম ভ্রাতৃত্বকে জাগিয়ে তুলে। কিছু কিছু কুয়েতি আছে এমন যে, তারা তাদেরকে একেবারে সাধারণ মানুষ ভাবে। চলাফেরা আচার ব্যবহার আমাকে উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনের মুসলমানদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পাশাপাশি আমাদের দেশের কথা মনে হলে হতাশায় মন ছেয়ে যায়! কি বিপদের মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সমাজ হাবুডুবু খাচ্ছে। আমাদেশের বৃহৎ ইসলামী সংগঠন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ছাত্র জীবনে ছাত্রশিবিরের অনেক নেতা আমার বন্ধ ছিলেন, তাদের সাথে মিশে দেখেছি, আর যাই হোক আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের আদর্শকে তারা এমনভাবে আকড়িয়ে ধরেছে, ফলে তাদের আচার-ব্যবহারে আমি মুগ্ধ হতাম। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেশটাকে সঠিকভাবে পরিচালনা এবং প্রত্যেকেটি মানুষের মধ্যে ইসলামী বোধ জাগিয়ে তুলতে তাদের বিকল্প নেই। অথচ নানান অভিযোগ ও ভুল তথ্য উপস্থাপনা করে সংগঠনটিকে কোণঠাসা করে রেখেছ। জামায়াতে ইসলামী বা ছাত্রশিবির মানেই রাজাকার। আরো বিভিন্ন বিশেষণে তাদেরকে আখ্যায়িত করে। এমে মুসলিম সমাজের কত বড় ক্ষতি হচ্ছে, তা কেউ ভাবছে না। আমার ১২ বছর ইসলামী জীবনে তাবলীগ জামাত ও জামায়াতে ইসলামী এই দু‘টি সংগঠনের কার্যক্রমই প্রকৃত মুসলমান হওয়ার উৎকৃষ্ট স্থান হিসেবে পেয়েছি। তাবলীগ জামাতের মাধ্যমে নবী রাসূল ও সাহাবীদের জীবন ধারা ও আদর্শকে সঠিকভাবে বুঝার সুযোগ পেয়েছি। আর জামায়াতে ইসলামীর মাধ্যমে কুরআন ও হাদীসের শিক্ষা এত নিখুত ও বিশুদ্ধভাবে শিখতে পেরেছি, ফলে আমি অনুভব করলাম যে, ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াতের কাজ কিয়ামত পর্যন্ত আমাদরেকেই চালু রাখতে হবে। আসছে পর্বে আমি ইসলামের প্রতি কেন আকৃষ্ট হলাম সে বিষয় আলোচনা করবো ইনশা আল্লাহ। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন। (চলবে)        

 

 

হিজরী সালের ইতিকথা

রেখে আসা দিনগুলোর গ্লানীকে মুছে ফেলে ও দুঃখ-কষ্ট ভুলে গিয়ে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন বছরের শুরুর সময়টার গুরুত্ব রয়েছে। মুসলিম হিসেবে হিজরী নববর্ষ উদযাপন কিংবা মুসলিমদের গৌরবের দিনটি পালনের ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতিতে ব্যাপকতা লাভ করেনি। আমরা অনেকেই জানি না যে, মুসলিমদের নববর্ষ কোন মাসে হয়? আবার কেউ হয়ত বা হিজরীবর্ষ গণনার সঠিক ইতিহাস জানেন না। হিজরী সনের তারিখের খবরও রাখেন না। এর প্রতি মানুষ আকর্ষণও অনুভব করেন না। তা খুব দুঃখজনক। ১৪৩৩ হিজরীর প্রথম দিনে বাংলাদেশের কোন পত্রিকা সম্পাদকীয় লিখেনি এতেই প্রতীয়মান হয় যে, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশের মুসলমানগণ ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে উদাসীন। এই কলামে আমরা হিজরী সনের ইতিহাস সংক্ষেপে আলোচনার করার চেষ্টা করবো, ইনশা আল্লাহ।  
হিজরী সনের ইতিহাস : হিজরী সন হল মুসলিমদের সন। ৬২২ খ্রীষ্টাব্দের ১২ই সেপ্টেম্বর আল্লাহর নির্দেশে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করেন। মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ৬২২ খ্রীষ্টাব্দের ১৪ বা ১৫ জুলাইয়ের সূর্যাস্তের সময়কে হিজরী সন শুরুর সময় হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। হিজরী সন ১৭ হিজরী সাল (৬৩৮ খ্রীষ্টাব্দ) হতে তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের শাসক হযরত ওমর (রাঃ) – এর শাসন আমলে হিজরী সন গণনা শুরু হয়। হযরত ওমর (রাঃ) এর কাছে ইরাক ও কুফার প্রশাসক আবু মুসা আশআরী (রাঃ) এক চিঠিতে লেখেন, “বিশ্বাসীদের নেতা আপনার পক্ষ হতে আসা শাসন কার্যের সাথে সংশ্লিষ্ট উপদেশ, পরামর্শ এবং নির্দেশ সম্বলিত বিভিন্ন চিঠিপত্র ও দলিলে কোন সন-তারিখ না থাকায় আমরা তার সময় ও কাল নির্ধারণে যথেষ্ট সমস্যার সম্মুখীন হই। অধিকাংশ সময় এসব নির্দেশনার সাথে পার্থক্য করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে বলে আপনার নির্দেশ ও উপদেশ পালন করতে যেয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়তে হচ্ছে।” এ গুরুত্বপূর্ণ পত্র পাওয়ার পর হযরত ওমর (রাঃ) মুসলিম বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে এক পরামর্শ সভার আয়োজন করেন। পরামর্শ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর মদীনায় হিজরত করার ঐতিহাসিক দিন থেকে নতুন একটি সন তৈরী করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। হিজরতের ঘটনাকে স্মরণ করে হিজরী সন শুরু করার কারণ হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর মদীনায় হিজরত করার মাধ্যমে ইসলাম প্রসার লাভ করে, মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তে থাকে, মুসলিমদের শক্তিমত্তা বাড়তে থাকে, ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, ইসলাম বিজয়ী শক্তিতে পরিণত হয় এবং ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হিজরতের কথা গুরুত্বের সাথে কুরআনে উল্লেখ করেছেন। হিজরতের ঘটনাকে স্মরণ করে বানানো হয়েছে বলে এ সনকে হিজরী সন বলা হয়।
বাংলাদেশে হিজরি সনের আবির্ভাব : ইসলাম প্রচারের সাথে সাথেই বাংলাদেশে হিজরী সনের প্রচলন ঘটেছে। বাংলাদেশে ১২০৪ খ্রীষ্টাব্দ হতে সর্বক্ষেত্রে হিজরী সন ব্যবহার শুরু হয় (তবাকাতে নাসিরী)। উপমহাদেশে প্রায় ৫৫০ বৎসর রাষ্ট্রীয়ভাবে এই হিজরী সন স্বীকৃত ছিল। ইংরেজ শাসনকালে আমাদের দেশে কুফরী রাষ্ট্রীয় সনের প্রচলন হয (১৭৯০ সাল হতে) যা আজও আমরা অন্ধের মতো ব্যবহার করছি।
হিজরী সনের তাৎপর্য : ওমর (রাঃ) তার খেলাফতকালের চতুর্থ বছর (৬৩৮ খ্রীষ্টাব্দ) হতে হিজরী বর্ষ পদ্ধতিগত গণনার ভিত্তিতে প্রসার ও প্রচলন শুরু করেন। এ সময থেকেই ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং আদর্শগত ঐতিহ্যের প্রেক্ষিতে মুসলিমরা মুহাররম মাস দ্বারা বর্ষ গণনা শুরু করেন। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ও ধর্মীয় চিন্তা-চেতনায় হিজরী সনের প্রভাব সর্বাধিক। এতদসত্ত্বেও দুঃখজনক সত্য হচ্ছে, আমরা অনেকেই অবগত নই যে, মুহাররম মাস ইসলামী নববর্ষ -আনন্দের দিন। কেননা ইসলামের ঘটনাবহুল ইতিহাসের একটি অতি তাৎপর্যমণ্ডিত ঘটনাকে স্মরণীয রাখার দিনটি হচ্ছে মুহররম মাস। বিশ্বের মুসলিমদের কাছে ইসলামী সন হিসেবে হিজরী সন অতি পবিত্র ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। শুধুমাত্র এই একটি সালেই সমগ্র বিশ্বে সর্বত্র সমানভাবে সমাদৃত। মুসলিমদের কাছে হিজরি সন বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত সন। আল্লাহ তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবুওয়াত দান করলেন। তিনি ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করলেন। তখন থেকেই রাসূল (সাঃ) এর একান্ত আপন জনেরা দূরে সরে যেতে লাগল। সবাই তার বিরোধীতা করতে লাগল। অল্প কিছু লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল। গোপনে গোপনে তিন বছর দাওয়াত দিলেন। এর পর আল্লাহর নির্দেশে সাফা পাহাড়ে প্রাকশ্যে এক আল্লাহর উপর ঈমান আনয়নের ঘোষণা করে ছিলেন। তখন থেকেই আরম্ভ হলো নির্যাতন। পথে প্রান্তে তাকে অপমানিত, লাঞ্ছিত করা হতো। নামাযরত অবস্থায উটের নাড়ী ভুড়ি তাঁর পিঠের উপর চাপিয়ে দেয়া হতো। গমনা-গমনের পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখা হতো। শিয়াবে আবু তালিব নামক স্থানে দীর্ঘদিন বন্দী করে রাখা হলো। এরপর তার সাহাবীদের উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হলো। কাফেররা নবীজীকে শারীরিক নির্যাতন করে দাওয়াত থেকে বিরত করতে পারল না। তখন তারা মানুষিক নির্যাতন করার জন্য নানা রকম ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করতে লাগল। তারা তাকে পাগল, কবি, জাদুকর ইত্যাদি বলে অপপ্রচার করতে থাকলো। কিন্তু কিছুতেই কোন কাজ হলো না। একদিন তারা নদওয়া নামক তাদের মন্ত্রণাগৃহে একটি বৈঠক করলো। সেখানে তারা সিদ্ধান্ত নিল মুহাম্মদ -কে দুনিয়া হতে সরিয়ে দেওয়ার। সবাই এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করলো। মক্কার শক্তিশালী লোকরা একত্রিত হয়ে শপথ নিয়ে বের হল মুহাম্মদ (সাঃ) এর বাড়ি ঘেরাও করে তাকে হত্যা করবে। আল্লাহ ইসলাম প্রচারের সুবিধা ও মুসলিমদের কথা ভেবে মক্কা থেকে মদীনায় দেশান্তরিত হবার আদেশ দেন। এই দেশান্তরিত হওয়াকেই আরবিতে হিজরত বলে। সে দিন ছিল ১২ই সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রীষ্টাব্দ। আল্লাহর এই ঘোষণা পাওয়ার পর রাতের অন্ধকারে নিজ বিছানায় হযরত আলী (রাঃ) কে রেখে মদীনার পথে রওনা দিলেন। এই ঐতিহাসিক দিনটিকে হযরত ওমর (রা.) তারিখ গণনা করার জন্য নির্ধারণ করলেন।
চান্দ্রমাসের প্রভাব মুসলমানদের জীবনে ব্যাপক। জীবনের সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব ও গুরুত্ব রযেেছ। বিশেষত ইবাদতের তারিখ, ক্ষণ ও মৌসুম নির্ধারণের ক্ষেত্রে হিজরী সনের প্রভাব ও গুরুত্ব অপরিসীম। একারণে হিজরী সনের হিসাব স্মরণ রাখা মুসলমানদের জন্য জরুরি। অনেক ক্ষেত্রেই এর প্রভাব রয়েছে। যেমন রমযানের রোযা, দুই ঈদ, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোতে চান্দ্রবর্ষ বা হিজরী সন ধরেই আমল করতে হয়। রোযা রাখতে হয় চাঁদ দেখে, ঈদ করতে হয় চাঁদ দেখে। এভাবে অন্যান্য আমলও। এমনকি স্বামীর মৃত্যুর পর মহিলাদের ইদ্দতের ক্ষেত্রগুলোতেও চান্দ্রবর্ষের হিসাব গণনা করতে হয়। অর্থাৎ মুসলমানদের ধর্মীয় কতগুলো দিন-তারিখের হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্র রয়েছে, সেগুলোতে চাঁদের হিসাবে দিন, তারিখ, মাস ও বছর হিসাব করা আবশ্যকীয়।
রাসূলুল্লাহর সাঃ এর হিজরতের এই প্রেক্ষাপট ও পটভূমি যদি হিজরী নববর্ষে স্মরণ করা হয় তাহলে মুসলিম ভাই-বোনরা ইসলামী সাংস্কৃতির সাথে পরিচিত হতে পারবে। তখনই কেবল ইসলামি সাংস্কৃতি বিমুখ হৃদয় পরিবর্তিত হয়ে ইসলামী হৃদয়ে পরিণত হবে।  তাই আমাদের উচিত রাসূল (সা.)-এর হিজরতের তাৎপর্য স্পষ্টভাবে জনসম্মুখে তুলে ধরা। আল্লাহ আমাদে সকলকে সেই তাওফীক দান করুন।  আমীন।