আপনি যা জানতে চেয়েছেন

প্রশ্ন: আচ্ছালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ, কেমন আছেন আপনি? আমি মাসিক আল-হুদাকে ভালোবাসি এবং নিয়মিত পড়ার চেষ্টা করি। আপনাদের কাছে আমার একটি প্রশ্ন ছিলো, যা উদয় হয়েছে, আল-হুদার ৩৩তম সংখ্যার প্রশ্নোত্তর পর্ব পাঠ করে। সেখানে পালক সন্তানের বিষয় এক ভাই বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন। আপনারা উত্তরে বলেছেন; পালক মেয়েকে তার পালক বাবা বিয়ে করতে পারবে, এমনকি পালক ছেলেও তার পালক মা-কে বিয়ে করতে পারবে, যদি তার পালক বাবা তাকে তালাক দেয়। এখন আমি আপনাদের কাছে জানতে চাই, এটা কিকরে সম্ভব!? আমি ঠিকমত বুঝে উঠতে পারছি না! যদি আমাকে একটু বুঝিয়ে বলতেন, তাহলে আমি, এই দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝ থেকে সড়ে আসতে পারবো। আপনাদের জন্য শুভ কামনা রইলো। জাযাকাল্লাহু খায়ের। জিল্লুর রহমান, জেলীব আল শুয়োখ, কুয়েত

 উত্তর: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়ারাহমাতুল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। মাসিক আল-হুদা নিজে পড়বেন এবং অন্যদের পড়ার ব্যবস্থা করবেন। আল্লাহ আপনাকে কবুল করুন। আমীন।   বিষয়টি সহজে বুঝার জন্য ৩৩ তম সংখ্যার উত্তরটি পুনরাবৃত্তি করা হলো: সেখানে বলা হয়েছিলো যে, কেউ ইচ্ছা করলে কন্যা সন্তান কিংবা পুত্র সন্তান লালন-পালন করতে পারবে। তবে মনে রাখতে হবে, যে বয়োপ্রাপ্ত হলে, এরা উভয়-ই পরপুরুষ ও পরনারীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তাদের সাথে লালন-পালনকারী মাতা-পিতাকে পর্দা করে চলতে হবে। এমনকি পালিত মেয়েকে বিয়ে করাও ইসলামে জায়েজ। যেমন রাসূল তাঁর জীবদ্দশায় বিষয়টি পরিষ্কার করে গেছেন। (অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম তাঁর পালক ছেলে যায়েদ বিন হারেসার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী যয়নব বিনতে জাহাশকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ে করেছেন।) যেহেতু পালক ছেলে কিংবা মেয়ের সাথে, মাতা-পিতার রক্তের কোন সম্পর্ক স্থাপিত হয় না, তাই বয়োপ্রাপ্ত তাদের সাথে পর্দার বিধান মেনে চলতে হবে। এবং তার উভয় সম্পদেরও হকদার হয় না। আর যাদেরকে বিয়ে করা হারাম, তাদের মধ্যে পালক মা অন্তর্ভুক্ত না বিধায়, পালক ছেলের জন্য পালক বাবার অবর্তমানে (মৃত্যু বা তালাক দেওয়া) বিয়ে করা জায়েয। আশা করি বিষয়টি আপনার নিকট পরিষ্কার হয়েছে।  তেমনিভাবে পালক ছেলে, তার পালক মাকে বিয়ে করতে পারবে। আর পালক সন্তান উত্তরাধিকার সম্পদের মালিক হয় না।

 প্রশ্ন: আচ্ছালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুাহ। আমার একটি প্রশ্ন আছে; আর তাহলো: কোন মুসলমান ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে বিয়ে করে স্বামী তার ধর্ম এবং  স্ত্রীও তার আপন ধর্ম পালন করছে; এবং তাদের গর্ভে সন্তানও জন্মগ্রহণ করেছে। সন্তানরাও যার যার ইচ্ছামত ধর্ম পালন করছে, এটা শরীয়তে কতটুকু বৈধ? আর কোন মুসলমান; হিন্দু, খ্রীষ্টান, ইহুদী এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরকে বিয়ে করতে পারবে কিনা? জানাবেন।

 উত্তর: কোন মুসলমানের জন্য মুশরিক তথা হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীকে বিয়ে করা জায়েয নাই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আর তোমরা মুশরেক নারীদেরকে বিয়ে করোনা, যতক্ষণ না তারা ঈমান গ্রহণ করে। অবশ্য মুসলমান ক্রীতদাসী মুশরেক নারী অপেক্ষা উত্তম, যদিও তাদেরকে তোমাদের কাছে ভালো লাগে। এবং তোমরা (নারীরা) কোন মুশরেকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ো না, যে পর্যন্ত সে ঈমান না আনে। একজন মুসলমান ক্রীতদাসও একজন মুশরেকের তুলনায় অনেক ভাল, যদিও তোমরা তাদের দেখে মোহিত হও। তারা দোযখের দিকে আহ্বান করে, আর আল্লাহ নিজের হুকুমের মাধ্যমে আহ্বান করেন জান্নাত ও ক্ষমার দিকে। আর তিনি মানুষকে নিজের নির্দেশ বাতলে দেন যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। (সূরা বাকার: ২২১)   আলোচ্য আয়াতে মুশরিক বলতে যারা বিভিন্ন প্রকারে পূজা করে থাকে, যেমর মূর্তিপূজা, দেবতা পূজা ইত্যাদি। অর্থাৎ হিন্দু, বৌদ্ধ, সাম্যবাদী বা কমিউনিষ্ট একথায় যাদের কোন আসমানী গ্রন্থ নাই।  ইমাম ইবনে জারীর স্বীয় তাফসীর আত তাবারী ৪/৩৬৩ খণ্ডে কাতাদা হতে হাসান সনদে বর্ণনা করেছেন; আলোচ্য আয়াতে মুশরিকাত বলতে ঐসব মুশরিক যাদের নিকট কোন কিতাব অবতীর্ণ হয়নি। মহান আল্লাহ আহলে কিতাবের মহিলাদেরকে তাদেরকে পৃথক করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলছেন: তোমাদের জন্যে হালাল সতী-সাধ্বী মুসলমান নারী এবং তাদের সতী-সাধ্বী নারী, যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তোমাদের পূর্বে, যখন তোমরা তাদেরকে মোহরানা প্রদান কর তাদেরকে  স্ত্রী করার জন্যে, কামবাসনা চরিতার্থ করার জন্যে কিংবা গুপ্ত প্রেমে লিপ্ত হওয়ার জন্যে নয়। যে ব্যক্তি বিশ্বাসের বিষয় অবিশ্বাস করে, তার শ্রম বিফলে যাবে এবং পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (সূরা মায়েদা: ৫)  তোমরা কাফের নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। (সূরা মুমতাহিনা : ১০) এই আয়াতেও কাফের নারীদের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। হযরত উমর (রা.) এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর দুইজন মুশরিকা স্ত্রীকে তালাক দিয়েদেন।  এই তো গেলে মুশরিক বা পূজারী নারীদের বিয়ে সংক্রান্ত আলোচনা। যে তাদেরকে বিয়ে করা হারাম। পক্ষান্তরে কিতাবধারী খ্রীষ্টান বা ইহুদী নারীদের বিয়ে করা বৈধ এই শর্তে যে, সতী-সাধী হতে হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলছেন: যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের সতী-সাধ্বী  নারীকে বিয়ে করা জায়েজ। সতী-সাধ্বী নারী বলতে এমন নারীকে বুঝায় যে, ব্যভিচারের লিপ্ত হয়নি। উপরের আলোচনা হতে আমরা যা জানতে পারলাম: ১. মুশরিকা নারীকে বিয়ে করা জায়েয নাই। ২. কিতাবধারী ইহুদী ও খ্রীষ্টান নারীকে বিয়ে করা বৈধ। ৩. কিতাবধারী নারীগণ ব্যভিচার হতে পুতপবিত্র হতে হবে।  এবার প্রশ্নকারী আপনি চিন্তা করুন, যে মুসলমান লোকটি কোন শ্রেণীর নারীকে বিয়ে করেছে। আর হ্যাঁ বিয়ের উদ্দেশ্য থাকতে হবে যে, ক্রমশঃ কিতাবধারী মহিলাকে ইসলামের দাওয়াত দিবো। আর সন্তান-সন্তনি বাবার ধর্মের অনুসারী করে গড়ে তুলতে হবে। যদি স্ত্রী এমন শর্ত দেয় যে, সন্তান আমার ধর্মের অনুসরণ করবে, সেই ক্ষেত্রে এমন নারীকে বিয়ে না করাই উত্তম। মনে রাখতে হবে যে, কোন মুসলিম নারীর জন্য খ্রীষ্টান বা ইহুদী পুরুষকে বিয়ে করা জায়েয নাই।  

 প্রশ্ন: হস্তমৈথুন কি যিনার অন্তর্ভুক্ত? পরকালে হস্তমৈথুনকারীকে কোন প্রকারের শান্তি ভোগ করতে হবে? বিষয়টি জানিয়ে উপকৃত করবেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, সালমিয়া, কুয়েত

উত্তর:  ইসলামের দৃষ্টিতে হস্তমৈথুন  (Masturbation)  হস্তমৈথুন (Masturbation)   বা স্বমেহন বর্তমানে একটি বড় সমস্যা। ইসলামের দৃষ্টিতে এটা হারাম এবং কবীরা গুনাহ। শরীয়ত অনুযায়ী যারা হস্তমৈথুন করে তারা সীমালঙ্ঘনকারী। হস্তমৈথুনের কারণে দুই ধরনের সমস্যা হয় (১) মানসিক সমস্যা। (২) শারীরিক সমস্যা। 

পুরুষ হস্তমৈথুন করলে প্রধান যে সব সমস্যায় ভুগতে পারে তার মধ্যে একটি হল নপুংসকতা (Impotence) । অর্থাৎ ব্যক্তি যৌন সংগম স্থাপন করতে অক্ষম হয়ে যায়।   আরেকটি সমস্যা হল অকাল বীর্যপাত (Premat ure Ejaculation)। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ে বীর্যপাত ঘটে। ফলে স্বামী তার  স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করতে অক্ষম হয়। বৈবাহিক সম্পর্ক বেশিদিন স্থায়ী হয় না।   আরো একটি সমস্যা হল, বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যায়। তখন বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা হয় ২০ মিলিয়নের কম। [২ কোটি]। যার ফলে  সন্তান জন্মদানে ব্যর্থতার দেখা দেয়। একজন পুরুষ যখন  স্ত্রী গমন করেন তখন তার থেকে যে বীর্য বের হয় সে বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা হয় ৪২ কোটির মত। স্বাস্থ্যবিজ্ঞান মতে কোন পুরুষের থেকে যদি ২০ কোটির কম শুক্রাণু বের হয় তাহলে সে পুরুষ থেকে কোন সন্তান হয় না।   অতিরিক্ত হস্তমৈথুন পুরুষের যৌনাঙ্গকে দুর্বল করে দেয়।  আর শরীরের অন্যান্য যেসব ক্ষতি হয়।  পুরো শরীর দুর্বল হয়ে যায় এবং শরীর রোগ-বালাইয়ের যাদুঘর হয়ে যায়। * চোখের ক্ষতি হয়। * স্মরণ শক্তি কমে যায়। * মাথা ব্যথা হয় ইত্যাদি আরো অনেক সমস্যা হয় হস্তমৈথুনের কারণে। আরেকটি সমস্যা হল। অর্থাৎ সামান্য উত্তেজনায় যৌনাঙ্গ থেকে তরল পদার্থ বের হয়। ফলে অনেক মুসলিমভাই সালাত পড়তে পারেন না। মহান আল্লাহ  তা‘আলার স্মরণ থেকে মুসলিমদের দূরে রাখে হস্তমৈথুন।  আর কোন নারী যখন স্বমেহন বা হস্তমৈথুন করে তখন তার কুমারীত্ব (Virgi nity) হারানোর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অনেকে স্বমেহন করতে গিয়ে কুমারীত্ব হারিয়ে ফেলে। ফলে তার বিয়ে করতে সমস্যা হয়। বিয়ের পর স্বামী তার এ অবস্থা দেখে তাকে সন্দেহ করে তালাক দেয়। তাই হস্তমৈথুন নারীদের অনেক বড় সমস্যার সৃষ্টি করে। আরো অনেক সমস্যা থাকতে পারে।  ইউরোপীয় দেশেগুলো বয়সন্ধিকালীন ছেলে-মেয়েদর হস্তমৈথুন করার জন্য উৎসাহ প্রদান করে থাকে। হস্তমৈথুন একটি ভাল অভ্যাস বলে তারা প্রচার করছে। কারণ? কারণ হল ব্যবসা। হস্তমৈথুনের সাথে পর্ণোগ্রাফির খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। জুতার সাথে মোজার,চায়ের সাথে বিস্কুটের, কাগজে র সাথে কলমের যেরকম ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হস্তমৈথুনের সাথে পর্ণোগ্রাফিরও সেরকমই সম্পর্ক। পর্ণোগ্রাফির ব্যবসা হল কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। পশ্চিমারা যদি হস্তমৈথুনের অপকারিতা মানুষের কাছে তুলে ধরে তাহলে তাদের কোটি কোটি টাকার ব্যবসার ক্ষতি হবে। কারণ তখন হস্তমৈথুনের হার কমে যাবে। ফলে পর্ণো সিডি, ম্যাগাজিন-এর বিক্রি ব্যাপকভাবে কমবে। এজন্য তারা হস্তমৈথুনের কোন অপকারিতা নেই বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা সমকামিতা  বৈধ করেছে। সমকামিতার মত হস্তমৈথুনের অপকারিতাকেও তারা এড়িয়ে চলছে।

অন্য ধর্ম এ সম্পর্কে কি বলে? হিব্রু এবং খ্রীষ্টান বাইবেল হস্তমৈথুনের ব্যাপারে চুপ। হিন্দু ধর্মে হস্তমৈথুন নিষিদ্ধ নয়। বরং কামসূত্র বইয়ে হস্তমৈথুনের বর্ণনা খুব সুন্দরভাবে দেওয়া হয়েছে।  যাই হোক, আমার মুসলিম ভাই-বোনেরা হস্তমৈথুন নামের এই যৌন বিকৃতি থেকে দূরে থাকতে হবে। মহান আল্লাহ তাআলাকে ভয় করুন। আপনার বন্ধু-বান্ধবীদের এই ব্যাপারে সচেতন করুন। এই ব্যাপারে আলোচনা করুন। এই সামাজিক সমস্যা দূর করুন। সবশেষে একটি হাদীসের উদ্ধৃতি পেশ করছি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন– যে ব্যক্তি আমাকে তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী জিনিস (জিহ্বার) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী জিনিস (যৌনাঙ্গের) নিশ্চয়তা (সঠিক ব্যবহারের) দেবে আমি তার বেহেশতের নিশ্চয়তা দিব। (বুখারী )  হস্তমৈথুনের ব্যাপারে সাধারণ ব্যাকরণ হলো যে, তা হারাম যা পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তবে যদি কেউ ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার তীব্রতা বোধ করে তখন তার জন্য সাময়িকভাবে হস্তমৈথুন বৈধ। যেহেতু এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক, তাই রোযার মাধ্যমে যৌনতাকে দমন করতে হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন  হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহ করার সামর্থ রাখে সে যেন বিবাহ করে। কারণ, এর দ্বারা চোখ নিচে থাকবে এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত হবে। আর যে বিবাহ করার সামর্থ রাখে না, সে যেন সিয়াম বা রোজা রাখে। কারণ, সিয়াম বা রোজা তার কুপ্রবৃত্তিকে দমন করবে। (বুখারী শরীফঃ হাদীস নং ৫০৬৬)  সুতরাং আমাদেরকে প্রবাস জীবনেও এমনতর একটি পাপকাজ থেকে বেঁচে থাকা এবং নিজের যৌন শক্তিকে হেফাজত করার স্বার্থে রাসূলের বাতানো পথে অর্থাৎ সিয়াম সাধনার পথে এগিয়ে আসা কর্তব্য। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তাওফীক দান করুন। আমীন 

বিয়ের পূর্বে দেশাচার

গত সংখ্যায় আমরা দেনমোহর নিয়ে আলোচনা করেছি, এই সংখ্যায় বিয়ের কথা পাকাপাকি হওয়ার যেসব অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড চালু রয়েছে সে বিষয় আলোচনা করবো ইনশা আল্লাহ।

কথা পাকাপাকি হলে বিয়ের দিন ধার্য হবে। তবে কেবল ধার্য করার জন্য ঘটা ও আড়ম্বরপূর্ণ মজলিস করা এবং রাজকীয় পান-ভোজনের বিপুল আয়োজন করা অপব্যয়ের পর্যায়ভুক্ত।  বরপক্ষের উচিত, তা খেয়াল রাখা এবং সর্বোত্তম খাওয়ার ব্যবস্থা না হলে দুর্নাম না করা। কেবল মাত্র একজন লোক গিয়ে অথবা না গিয়ে টেলিফোনের মাধ্যমেও বিয়ের দিন ঠিক করা যায়। নিজেদের সুবিধা মতো যে কোন দিনে যে কোন মাসে দিন স্থির করতে কোন বাধা নেই। আল্লাহর দিন সবই সমান। পঞ্জিকা দেখে শুভাশুভ দিন বিদআত এবং বিজাতির অনুকরণ।

 নিমন্ত্রণ করার সময় নিমন্ত্রণ পত্রের কোণে হলুদ লাগিয়ে দেওয়া বিদআত। এতে কোন শুভলক্ষণ আছে বলে মনে করা শির্ক।

 এরপর পৃথক করে হলুদ মাখার কাপড় পাঠানো এবং বিবাহ-বন্ধনের ৫/৭ দিন পূর্বে কনের বাড়ি ‘লগন’ পাঠানোর প্রথা ইসলামী প্রথা নয়। তারপর এর সঙ্গে যায় বরের ভাই-বন্ধু ও বুনাইরা। সাজ-পোশাক, প্রসাধন সামগ্রীর সাথে পুতুল জরুরি, অনেকে পাঠায় লুডু এবং তাসও! তার সাথে চিনি, পান-সুপারি, মাছ, মুদ্রা , হলুদ মাখার শাড়ি তো থাকবেই। এই ‘লগন-ধরা’ ও মুখ দেখার অনুষ্ঠান এক ব্যয়বহুল ব্যাপার। এতে যা খরচ হয় তা একটা ইসলামী বিবাহ মজলিসের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু হায় রে! কান খোলানকুচি দিয়ে মললেও তাতে নিজের ব্যথা কোথায়?

 দিনের শেষে অনুষ্ঠিত হয় মুখ দর্শনের অনুষ্ঠান। পাত্রীকে সুসজ্জিত করে ‘আলম তালা’র (পাত্র-পাত্রী বসার জন্য বিশেষ সুসজ্জিত বিছানা বা) আসনে বসানো হয়। এরপর অঙ্গরাগে সজ্জিত সেই চেহারা দেখে পাত্রের ঐ ভাই-বন্ধুরা। আঙ্গুলে বা টাকায় চিনি নিয়ে পাত্রীর অধরে স্পষর্শ করে! অঙ্গুরীয়র উপহার সুসজ্জিত আঙ্গুলে পরিয়ে দেয়, ঘড়ি পরিয়ে সুদর্শন হাতখানি টেনে! এর ফাঁকে দু’চারটি ঠাট্টা-উপহাস তো চলেই। কারণ এরা দেবর, নন্দাই, বন্ধু উপহাসের পাত্র তাই!

 অতঃপর সুগোল কব্জিখানিতে সুতো বাঁধে, ললাটে গলায় হলুদ বাঁধা এবং হাতে দেয় জাঁতি বা কাজললতা! অথচ এদেরকে চেহারা দেখানোও হারাম। প্রিয় নবী (সা.) সত্যিই বলেছেন: “লজ্জা না থাকলে মনে যা চায় তাই করতে পারে” (বুখারী ৩৪৮)

 প্রকাশ থাকে যে, এরপর থেকে হাতে বা কপালে সুতো বেঁথে রাখা ও কাজলরতা বা জাঁতি সর্বদা সাথে রাখা বিদআত। বরং এর মাধ্যমে যদি কোন মঙ্গলের আশা করা হয় তবে তা শির্ক।

 

 পাত্র-পাত্রীকে বিয়ের আগের দিনগুলিতে বাড়ির বাইরে যেতে না দেওয়া। এই দিনে মসজিদে বা পীরের খানকায় সিন্নি বিতরণ করা প্রভৃতি বিদআত ও শির্ক।

 এবার রইলো গায়ে হলুদ, তেল চাপানো, সাতুশী ও নাপিতের নখ কাটা প্রভৃতি প্রথা। তেল চাপানো সধবা নারী হতে হবে। বিধবা আসতে পারবে না। নির্দিষ্ট কাপড়ে কাবা মুখে বসিয়ে হলুদ মাখবে। কাপড়ে লিখা থাকবে পাত্র-পাত্রীর নাম। পাত্রকে এমন মহিলারা হলুদ মাখাবে যাদের ঐপাত্রকে দেখা দেওয়া হারাম! পাত্রের এমন অঙ্গে (জাঙ্গে, নাভীর নিচে) হলুদ মাখায় যে অঙ্গ পুরুষকে দেখানোও হারাম! আলোচিত প্রথা কি ইসলামের প্রথা হতে পারে?

 পক্ষান্তরে পুরুষ রং ব্যবহার করতে পারে না। তাই হাতে পায়ে মেহদী লাগাতে পারে না। হলুদ ব্যবহার করাও তার জন্য শোভনীয় নয়। বিশেষ করে হলুদ রঙের পোশাক পুরুষের জন্য নিষিদ্ধ। 

 একদা সাহাবীর গায়ে হলুদ রঙ দেখে রাসূল (সা.) বুঝেছিলেন, তিনি নব বিবাহিত। (বুখারী ও মুসলিম) প্রকৃত পক্ষে সেটা হলুদের রঙ ছিলো না, বরং স্ত্রীর দেহের (মহিলাদের ব্যবহার্যের একপ্রকার সুগন্ধি) ‘খালুক’ এর রঙ, যা তার কাপড়ে লেগেছিলো। (ফাতহুল বারী ৯/১৪৪) সুতরাং এটাকে পাত্র-পাত্রীর হলুদ মাখার বৈধতার দলীল মানা যায় না। হ্যাঁ তবে যদি কেউ দেহের রঙ ‘কাঁচা সোনার মত উজ্জ্বল’ করার উদ্দেশ্যে নিজ হাতে মেখে ধুয়ে ফেলে তবে সে কথা ভিন্ন। তাছাড়া বিয়ের পাত্র-পাত্রীর জন্য এই দিয়ে ‘লগন’ শুরু করা বিদআত। অবশ্য পাত্রী হাতে পায়ে মেহদী ব্যবহার করতে পারে। বরং মহিলাদের হাতে সর্বদা মেহেদী রাখাই বিধি সম্মত। (মি…… ৪৪৬)

 এর রাতে ক্ষীর মুখে দেওয়ার দেশাচার। সাধারণত এ প্রথা পাশ্ববর্তী পরিবেশ থেকে ধার করা বা আমদানী করা প্রথা। রাসূল (সা.) বলেন: ‘যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরণ করে, সে তাদেরই দলভুক্ত ’। (মি….৪৩৪)

 তা ছাড়া এমন মহিলারা পাত্রর ওষ্ঠাধর স্পর্শ করে, তার মুখে ক্ষীর-মিষ্টি দেয়, যাদের জন্য ঐ পাত্রকে দেখা দেওয়াও হারাম। অনেক সময় উপহাসের পাত্রী (?) ভাবী, নানাী, হলে হাতে কামড়ও দেওয়া হয়! বরং পাত্রও ভাবীর মুখে তুলে দেয় প্রতিদানের ক্ষীর! অথচ এই স্পর্শ থেকে তার মাথায় সুচ গেঁথে যাওয়াও উকত্তম ছিলো। (সিলসিলা সহীহা: ২২৬) অনুরূপ করে পাত্রীর সাথেও তার উপহাসের পাত্ররা! বরং যে ক্ষীর খাওয়াতে যায়, তার সাথেও চলে বিভিন্ন মস্করা।

 আর সাথে চলে ‘গীত-পার্টি’ যুবতীদের গীত। শুধু গীতই নয় বরং অশ্লীল গীতও হাত তালিসহ ঢোল-বাদ্য বাজিয়ে গীত। এর সঙ্গে থাকে ‘লেডি ড্যান্স’ বা নাচ। আর শেষে বিভিন্ন অশ্লীল ও অবৈধ অভিনয় বা কাপ। এমন পরিস্থিতি দেখে শুনে প্রত্যেক রুচিবান মুসলিম তা ঘৃণা করতে বাধ্য। কিন্তু বহু রুচিহীন অভিভাবক এসব দেখে-শুনেও শুধু এই বলে ভ্রƒক্ষেপ করে না যে, ‘আম কালে ডোম রাজা, বিয়ে কালে মেয়ে রাজ।’ ফলে ইচ্ছা করে অনুগত প্রজা হয়ে তাদেরকে নিজ অবস্থায় ছেড়ে দেয় অথবা মেয়েদের ধমকে বাধ্য হয়েই চুপ থাকে। তাই নিজ পরিবারকে নির্লজ্জতায় ছেড়ে দিয়ে বাড়ির বাইরে রাত কাটাতেও লজ্জা করে না। অথচ ‘গৃহের সমস্ত দায়িত্ব সম্পর্কে কিয়ামতে গৃহকর্তার নিকট কৈফিয়ত তলব করা হবে।’ (মি…৩৬৮৫)

   এই ধরণের অসার ও অশ্লীল মজলিসে কোন মুসলিম নারীর উপস্থিত হওয়া এবং ক্ষীর খাওয়ানো নিঃসন্দেহে হারাম। যেমন মহিলাদের এই কীর্তিকলাপ দর্শন করা বা নাচে ফেরী দেওয়া পুরুষদের জন্য বিশেষভাবে হারাম। এমন নাচিয়েকে ফেরি দেওয়ার বদলে তার কোমর ভেঙ্গে দেওয়া উচিত তার অভিভাবকের।

 আইবুড়ো বা থুবড়া ভাতের (অবিবাহিত অবস্থায় শেষ অন্নগ্রহণের) অনুষ্ঠানও বিজাতীয় প্রথা। এই দিনে ক্ষীর-সিন্নি বিতরণও বিদআত। বরং পীরতলায় বিতরণ শির্ক। আর এই দিন সাধারণত পাকান বা বাতাসা বিতরণ (বিক্রয়ের) দিন। যাদেরকে এই পাকান বা বাতাসা দেওয়া হবে তাদেরকে পরিমাণ মতো টাকা দিয়ে ‘ভাত’ খাওয়াতেই হবে। না দিলে নয়। এই লৌকিকতায় মান রাখতে গিয়েও অনেকে লজ্জিত হয়। সুতরাং এসব দেশাচার ইসলামের কিছু নয়।

তারপর আসে তেল নামানোর পালা। ঝোমর ডাল হয় পাত্র পাত্রীকে কেন্দ্র করে হাত তালি দিয়ে গেয়েও ও প্রদক্ষিণ করে।

 এ ছাড়া আছে শিরতেল ঢালার অনুষ্ঠান। সধবাদের হাতের উপর, সবার উপর নোড়া, তার উপরে তেল ঢালা হয় এবং পাত্রীর মাথায় গড়িয়ে পড়ে। এই সঙ্গে আরো কি মেয়েলি কীর্তি। তা ছাড়া এ প্রথা সম্ভব শিবলিঙ্গ পূজারীদের। কারণ, অনেকেই এই প্রথাকে ‘শিবতেল ঢালা’ বলে থাকে। তা ছাড়া এর প্রমাণ হলো শিবলিঙ্গের মত ঐ নোড়া।

 সুতরাং যে মুসলিম নারীরা মূর্তিপূজকদের অনুরূপ করে তারা রাসূলের বাণীমতে ওদেরই দলভুক্ত। আর এদের সঙ্গে দায়ী হবে তাদের অভিভাবক ও স্বামীরাও।

 এই দিনগুলিতে ‘আলম তালায়’ বসার আগে পাত্র-পাত্রীর কপাল ঠেকিয়ে আসনে বা বিছানায় সালাম বিদআত। কোন বেগানা (যেমন বুনাই প্রভৃতি) কোলে চেপে আলম তালায় বসা হারাম। নারী-পুরুষর (কুটুম্বদের) অবাধ মেলা-মেশা, কথোপকথন মজাক, ঠাট্টা, পর্দাহীনতা প্রভৃতি ইসলাম বিরোধী আচরণ ও অভ্যাস। যেমন রঙ ছড়াছড়ি করে হোলী ও কাদা খেলা প্রভৃতি বিজাতীয় প্রথা। এমন আড়ম্বর ও অনুষ্ঠান ইসলামে অনুমোদিত নয়।

 সুতরাং মুসলিম সাবধান! তুলে দিন ‘আলম তালা’ নামক ঐ রথতালাকে পরিবেশ হতে। পাত্র-পাত্রীও সচেতন হও! বসবে না ঐ রথতলাতে। ক্ষীর খাবে না এর-ওর হাতে। কে জানে ওদের হাতের অবস্থা কি? ছিঃ!   

শিক্ষণীয় ঘটনা

হায়, মোবাইল ফোন!

ত্বহা নামের একটি ছোট্ট ছেলে। বয়স ১৫ কি ১৬ হবে। দেখতে বেশ সুন্দর। ছাত্র হিসাবে খুবই ভালো। পড়ালেখায় একনিষ্ঠ। আচার-ব্যবহারও তুলনাহীন। তার সুমধুর ব্যবহার ও ঈর্ষণীয় আচার-আচরণ সবাইকে মুগ্ধ করে। আকর্ষণ করে চুম্বুকের মতো। এক কথায় ত্বহার মতো ছেলে বর্তমান সময়ে খুব কমই পাওয়া যায়!

ক্লাস নাইনের ছাত্র ত্বহা। মেধাশক্তি প্রখর ও পড়াশুনায় মনোযোগী হওয়ায় ক্লাসের প্রথম স্থানটি বরাবরই দখল করে আসছে সে। তার হাতের লেখাও বেশ চমৎকার। কণ্ঠও ভালো। তাই স্কুলের শিক্ষকসহ সকলেরই সর্বাধিক প্রিয়পাত্র সে। শিক্ষকগণ তাকে নিজ সন্তানের মতোই আদর করেন। সেই সাথে কিভাবে তার পড়াশুনার অগ্রগতি হবে সে ব্যাপারেও চিন্তা-ফিকির করেন।

একদিন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ত্বহার পিতাকে অফিসকক্ষে ডেকে খুব সমাদর করলেন। আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করলেন। তারপর   বললেন, জনাব! আল্লাহর রহমতে আপনার ছেলের মেধাশক্তি খুবই প্রখর। পড়ালেখার প্রতি তার মনোযোগও প্রশংসনীয়। আমরা আশাবাদী যে, এস,এস,সি পরীক্ষায় ত্বহা বেশ ভালো ফলাফল করতে পারবে। পারবে কাক্সিক্ষখত সাফল্য অর্জন করতে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের এই গ্রামের স্কুলে ওর মেধার বিকাশ পূর্ণরূপে ঘটছে না। কেননা এখানে শহরের নামকরা মানসম্পন্ন স্কুলগুলোর ন্যায় পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও সুযোগ-সুবিধা নেই। নেই আধুনিক প্রযুক্তির উন্নতমানের সরঞ্জমাদিও। সুতরাং ত্বহাকে যদি ঢাকার কোনো মানসম্মত স্কুলে ভর্তি করে দেন তাহলে আমাদের বিশ্বাস, এস,এস, সি পরীক্ষায় নিশ্চয়ই সে গোল্ডেন এ+ পাবে। আর হ্যাঁ, আমাদের স্কুল ছেড়ে ত্বহার চলে যাওয়াটা যদিও আমাদের জন্য বেদনাদায়ক তবুও তার মঙ্গলের জন্য এ বেদনাটুকু আমরা সইব। কারণ, অনেক সময় বৃহৎ স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্রতর স্বার্থকে বিসর্জন দিতে হয়। এবার বলুন, এ ব্যাপারে আপনার মতামত কি?

ত্বহার আব্বা বললেন, এমন একটি ইচ্ছা আমারও ছিল। ভেবেছিলাম, ওকে ঢাকায় ভর্তি করে দেব।  কিন্তু আপনারা কষ্ট পাবেন মনে করে তা আর হয়নি। যাহোক, এখন যেহেতু আপনারাই আমাকে প্রস্তাব দিচ্ছেন, তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ত্বহাকে আমি ঢাকায় ভর্তি করার ব্যবস্থা করব। দোয়া করবেন, আল্লাহ যেন আমাদের সবার আশা পূর্ণ করেন।

কয়েক দিন পর ঢাকার একটি নামকরা স্কুলে ত্বহাকে ভর্তি করা হলো। ভর্তির ব্যাপারে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফরিদ উদ্দীন সাহেব বেশ সহযোগিতা করলেন। এমনকি তিনি নিজে ত্বহার আব্বাকে সাথে নিয়ে বেশ পরিশ্রম করে একটি ভালো হোস্টেলে তার থাকার ব্যবস্থা করলেন। তারপর নিজের পক্ষ থেকে তাকে ৫০০ টাকা দিয়ে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ত্বহার পিতাকে নিয়ে আপন কর্মস্থলে ফিরে এলেন।

ত্বহা এতদিন বাড়ি থেকে যেয়ে-এসে ক্লাস করেছে। তাই হোস্টেলে তার মন টিকতে চাইল না। বাড়ী আসার জন্য সে ছটফট করতে লাগল। কিন্তু একমাস পূর্ণ না হলে বাড়ী যাওয়ার বিধান নেই বিধায় বাধ্য হয়ে তাকে একমাস শেষ হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হলো।

মাস শেষ হতেই ছুটি নিয়ে বাড়িতে চলে এল ত্বহা। মায়ের নিকট খুলে বলল মনের অবস্থা। মা ভাবলেন, ত্বহা আমাদের ছেড়ে দূরে গিয়ে কোথাও দীর্ঘদিন থাকেনি। তাছাড়া হাতে মোবাইল না থাকায় সময়মতো আমাদের সাথে যোগাযোগও করতে পারিনি। এজন্যে তার বেশি খারাপ লেগেছে। যদি তার হাতে একটি মোবাইল ফোন থাকত এবং আমাদের সাথে প্রয়োজনের সময় বা মন খারাপ থাকা অবস্থায় কথা বলতে পারত তাহলে নিশ্চয়ই এতটা খারাপ লাগত না।  নাহ্ যেভাবেই হোক ওর জন্য একটি মোবাইলের ব্যবস্থা করতে হবে।

 ছেলের হাতে মোবাইল তুলে দিতে ত্বহার আব্বা মোটেই রাজী ছিলেন না। তার বক্তব্য হলো, মোবাইল নামক এই যন্ত্রটি যে কোনো সময় ছেলে-মেয়েদেরকে বিপদগামী করতে পারে। পারে তাদের জীবনকে ধ্বংস করে দিতে। হ্যাঁ, পিতা-মাতার সাথে প্রয়োজনীয় কথা বলার জন্য তো ফোনের দোকানই আছে।

 কিন্তু ত্বহার আম্মা নাছোড়বান্দা। তিনি ছেলের হাতে মোবাইল তুলে দেওয়ার স্বপক্ষে বেশ কয়েকটি যুক্তি দাড় করলেন। তার বড় যুক্তি হলো, ছাত্ররা চাইলেই ফোন-ফ্যাক্সের দোকানে গিয়ে ফোন করতে পারে না। কেননা তাদেরকে স্কুলের রুটিন মোতাবেক চলতে হয়। তাছাড়া ক্লাস চলাকালে তো বাইরে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না!

স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে অবশেষে একটি মোবাইল কিনে আনতে বাধ্য হলেন ত্বহার পিতা।

স্কুলে যাওয়ার সময় ত্বহার আম্মা ত্বহার হাতে মোবাইল সেটটি তুলে দিলেন। বললেন। নাও বাবা!  যখনই মন খারাপ লাগবে তখনই সুযোগ করে আমদের সাথে কথা বলবে।  দেখবে, সাথে সাথে তোমার মন ভালো হয়ে গেছে।

ত্বহা মোবাইল ফোন পেয়ে খুব খুশি হলো। মনে মনে বলল, যাক এবার তাহলে নির্ভাবনায় পড়াশুনা করতে পারব!

ত্বহা চলে এল স্কুলে। কাটতে লাগল সময়।

একদিন বিকাল বেলা। ত্বহা তার সহপাঠিদের সঙ্গে হাঁটতে বের হয়েছে। সবুজ দুর্বা ঘাসের উপর বসে তারা শেষ বিকেলের নির্মল হাওয়া উপভোগ করছে। এমন সময় হঠাৎ ত্বহার মোবাইলে রিং বেজে উঠল। ত্বহা মোবাইল রিসিভ করার জন্য পকেটে হাত দেয় এবং ভাবে, নিশ্চয়ই মা কিংবা বাবা ফোন করেছেস। কারণ, তার নম্বর এ দু’জন ছাড়া আর কেউ জানে না।

ত্বহা পকেট থেকে মোবাইল বের করে। চোখের সামনে মোবাইল এনে দেখে, এটা তার বাড়ীর নম্বর নয়, অপরিচিত নম্বর!

খানিক চিন্তা করে ত্বহা। ভাবে, কার হতে পারে এই নম্বরটি? যে রিং করল সে কীভাবে পেল আমার নম্বর? আমি তো কাউকে আমার নম্বর দেইনি ? রিসিভ করব ? নাকি করব না ?

 অপরিচিত নম্বর দেখে ত্বহা যখন এসব কথা ভাবছিল, ঠিক তখনই পাশের এক সহপাঠি বলে ওঠল, আরে! দেরী করছিস্ কেন? রিসিভ করে দেখ্ না কে ফোন করেছে এবং কী বলতে চায়!

ত্বহা রিসিভ করল।

হ্যলো! কে ? কাকে চান ? ত্বহার প্রশ্ন।

আমি মুনালিসা। আপনাকেই চাই। অপরপ্রান্ত থেকে কোমল কন্ঠে একটি মেয়ে উত্তর দিল।

অপ্রত্যাশিত মেয়ে কণ্ঠ শ্রবণে অনেকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল ত্বহা। অবশেষে অল্পক্ষণ চুপ থাকার পর আস্তে করে লাইন কেটে দিল সে।

কিরে ত্বহা ! কে, কী বলল? কিছু না বলে মোবাইল রেখে দিলি যে? বলল ত্বহার এক সহপাঠি।

আর বলিস্ না। কোত্থেকে যেন এক মেয়ে ফোন করেছে! বলে কি আপনাকেই চাই! আমি তাকে চিনিনা, জানিনা, সে আমাকে চাবে কেন বল্তো?

যা বললি তা যদি সত্যি হয় তাহলে তো লাইনটা কেটে দেওয়া ঠিক হয়নি। কথা বলে দেখ্তি সে কী বলে। হয়তো কোনো প্রয়োজনে ফোন করেছিল। বলল, ত্বহার আরেক সহপাঠি।

ঠিক আছে। যদি আবার ফোন করে তাহলে কথা বলে দেখব কী বলে! এখন চল্ হোস্টেলে যাই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল প্রায়।

মাগরিবের নামাজের পর। ত্বহা ক্লাসের পড়া মুখস্থ করছে। এমন সময় মেয়েটি আবার ফোন দিল।

পড়ার সময় ডিস্টার্ব ত্বহার একেবারে অসহ্য। তাই কে রিং দিয়েছে তা না দেখেই মোবাইলটি বন্ধ করে ড্রয়ারে রেখে দিল ত্বহা। সেই সাথে বিরক্তির সুরে বিড়বিড় করে কি যেন বলল।

পড়া শেষ করে ত্বহা মোবাইল অন করল। অন করার মাত্রই আবার এল মেয়েটির ফোন। ত্বহার বুঝতে বাকি রইল না যে, মেয়েটি এতক্ষণ ধরে কল ঢুকানোর চেষ্টা করছে।

বিরক্ত হলেও ত্বহা রাগ সামলে নিয়ে মোবাইল রিসিভ করল।

ত্বহার শান্ত কন্ঠের কৌতুহলী প্রশ্ন কে?

প্রশ্নের জবাব অপর প্রান্ত থেকে পাওয়া গেল না। যা পাওয়া গেল তা হলো মোবাইল রিসিভ করতে এতো দেরী হলো কেন?

ত্বহা মনে মনে বলল – বাবারে কী দাপট ! রিং দিয়ে আমাকে ডিস্টার্ব করছে, আবার উল্টো আমাকে শাসাচ্ছে!! এ যে, “চুরির উপর সীনাজুরী”।

এদিকে ত্বহার কথা বলতে দেরী দেখে মেয়েটি আবার প্রশ্ন করল, কী ব্যাপার? কথা বলছেন না কেন?

আপনি কে? আপনার পরিচয়টা দিলে ভালো হতো। বলল ত্বহা।

মেয়েটি এবার যাদুমাখা কণ্ঠে তার পরিচয় দিল। সেই সাথে এও বলল, আমি আপনার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই, যদি আপনি রাজী থাকেন।

ত্বহা প্রথমে একটু ইতস্ততঃ করল। কিন্তু ক্ষণিক পরেই শয়তানের ধোঁকায় পড়ে মেয়েটির সাথে বন্ধুত্ব গড়তে রাজী হয়ে গেল।

‘মুনালিসা’ নামটা যেমন শ্রুতিমধুর, কথাও তেমন যাদুময়। তাই তার ফাঁদে আটকাতে খুব বেশি একটা সময় নিল না ত্বহার!

অল্প কয়েকদিনেই ত্বহা মুনালিসার প্রেমের জালে আবদ্ধ হয়ে গেল। ভুলে গেল তার ঢাকায় আসার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। হারিয়ে ফেলল ভালো মন্দ অনুধাবন করার শক্তি!

হায়রে মোবাইল! হায়রে নারী!! এভাবেই কি তোমরা মানুষকে কর বিপদগামী?! 

যাহোক, এরপর থেকে প্রতিদিন প্রায় ৭/৮ বার ত্বহার সঙ্গে মুনালিসার কথা হতে থাকে। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের প্রেমও চলতে থাকে অবিরাম গতিতে। এভাবে কেটে যায় কয়েকটি মাস। এক পর্যায়ে ঘনিয়ে আসে এস,এস,সি পরীক্ষা। কিন্তু এখন আর ত্বহার মাথায় পরীক্ষার কোনো চিন্তা নেই! নেই ভালো ফলাফল করার অদম্য আগ্রহও। এখন তার গোটা হৃদয় আচ্ছন্ন করে আছে শুধু একটি নাম মুনালিসা। তার চিন্তা-চেতনায় এখন মুনালিসা ব্যতীত অন্য কিছুর স্থান নেই!!

প্রথম প্রথম মুনালিসাই ত্বহার কাছে ফোন করত। কিন্তু এখন? এখন মুনালিসার ফোনের অপেক্ষা করে না ত্বহা। নিজেই ফোন করে মুনালিসার কাছে। ফলে বাড়ি থেকে খরচের জন্য যে টাকা দেওয়া হয় তার সিংহভাগই খরচ হয়ে যায় মোবাইলের পিছনে। অনেক সময় এমনও হয় যে, ত্বহা নাস্তা খাওয়ার জন্য হোটেলে গেল। এমন সময় মুনালিসা মিসড্কল দিল। তখন ত্বহা নাস্তা না খেয়ে ঐ টাকা মোবাইলে রিচার্জ করে মুনালিসার সঙ্গে কথা বলে। আর এটাকেই সে নাস্তা খাওয়ার চেয়ে বেশি তৃপ্তিদায়ক মনে করে!!

পরীক্ষার আর মাত্র এক মাস বাকি। সকল ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনায় ব্যস্ত। আর ত্বহা ব্যস্ত মোবাইল প্রেমালাপে! পরীক্ষা উপলক্ষ্যে হোস্টেলে গভীর রাত পর্যন্ত ছাত্ররা জেগে পড়ালেখা করে। ত্বহাও তাদের সঙ্গে জেগে থাকে। তবে পড়ার জন্য নয়। রাত বারটার পর মুনালিসার সঙ্গে কথা বলার জন্য!

রাত জেগে কথা বলতে বলতে ত্বহার স¦াস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়। সেই সাথে সে আক্রান্ত হয় কয়েকটি গোপন রোগে। কিন্তু একথা তার কাছের বন্ধুরা ছাড়া আর কেউ জানল না। আসল রহস্য পিতা-মাতা ও শিক্ষকগণসহ অন্যদের কাছে গোপনই রয়ে গেল! তারা ভাবল, ত্বহা পড়াশুনায় একনিষ্ঠ। অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই পড়াশুনা করে সে! তাই অত্যধিক পড়াশুনার চাপে তার স¦াস্থ্য খারাপ হয়ে গেছে। পরীক্ষার পর আবার ঠিক হয়ে যাবে।

আজ এস, এস, সি পরীক্ষা শুরু। ত্বহা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করল। তবে তার এ অংশগ্রহণ মূলত লোকদেখানো নিয়ম পালন ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কেননা পরীক্ষা দিতে হবে, ভালো রিজাল্ট করতে হবে মুনালিসার সাথে সম্পর্ক গাঢ় হওয়ার পর থেকে এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা নিয়ে একদিনও সে পড়তে বসেনি বা বসতে পারেনি! 

ত্বহার যত চিন্তা, তা কেবল মুনালিসাকে নিয়ে। পরীক্ষার প্রতি তার বিন্দুমাত্রও ভ্রুক্ষেপ নেই! অথচ পিতা-মাতা ও শিক্ষকগণ বুকভারা আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে এই ত্বহার দিকে। তাঁদের চেষ্টা, আশা, স্বপ্ন সবই কি তাহলে বিফলে যাবে? ত্বহা কি পারবে তাদের আশা পূরণ করতে ? পারবে কি তাদের মুখে হাসি ফুটাতে? তাদের সুনাম অক্ষুন্ন রাখতে ? কীভাবে পারবে ? ত্বহা তো এখন হাবুডুবু খাচ্ছে মুনালিসার প্রেম সাগরে!!

পরীক্ষা শেষ হলো। কিছুদিন পর প্রকাশিত হলো পরীক্ষার ফলাফল। ফল যা হওয়ার তাই হলো। দেখা গেল, ত্বহার এ প্লাস পাওয়া তো দূরের কথা, সবগুলো বিষয়ে পাসও করতে পারেনি!! আর যেগুলোতে পাস করেছে তাও কোনো রকম টেনেটুনে!!!

প্রিয় পাঠক! দেখলেন তো! মোবাইল ফোনের কারণে মেধাবী ও বুদ্ধিমান ছাত্র ত্বহার পড়াশুনায় কেমন ধস নেমে এলো! কিরূপ অবনতি হলো তার জীবনের!! কিভাবে নষ্ট হলো তার শরীর-স্বাস্থ্য!!! আচ্ছা এর জন্য দায়ী কে ? মোবাইল ফোন ? ত্বহার অভিভাবক ? নাকি ত্বহার লাগামহীন মোবাইল ব্যবহার ?

হ্যাঁ, মোবাইল ফোন ও অভিভাবকের পাশাপাশি লাগামহীন মোবাইল ব্যবহারের কারণেই ত্বহার আজ এই করুণ পরিণতি। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়ী হলেন ত্বহার মা। কেননা তিনি যদি ত্বহার হাতে মোবাইল না তুলে দিতেন তাহলে হয়তো ত্বহার ঘটনা আজ অন্যভাবে লেখা হতো। হয়তোবা পত্র-পত্রিকায় ত্বহার নাম আসত মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া ছাত্র হিসেবে!

কিন্তু আজ? হ্যাঁ আজ আর ত্বহাকে কেউ ভালোবাসে না। না পিতা-মাতা, না শিক্ষকবৃন্দ, না অন্য কেউ!! সকলেই তাকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখে। তার দিকে তাকায় একটু বাঁকা নজরে!

আসলে মোবাইলের খারাবি থেকে বাঁচার জন্য মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের যেমন তার অবৈধ ব্যবহারের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, তেমনি অভিভাবকদেরও উচিত ছেলে-মেয়েদের হাতে মোবাইল না দেওয়া কিংবা একান্ত অপারগতায় দিলেও নিশ্চিন্তে বসে না থাকা। বরং তাদের দায়িত্ব হলো, অতি প্রয়োজনে ছেলে-মেয়েদের হাতে মোবাইল দেওয়ার পর তাদের প্রতি খেয়াল রাখা যে, তারা কী করে, কার সাথে কথা বলে এবং মোবাইল ব্যবহারের পর তার মানসিক ও চারিত্রিক কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর হুকুম মেনে মোবাইলের যাবতীয় অবৈধ ব্যবহার থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।