বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

উপক্রমণিকা: ঈসায়ী ৭ম শতকের পৃথিবী। সর্বত্র যুদ্ধ রক্তপাত আর হানাহানি। ব্যক্তি পরিবার সমাজ রাষ্ট্র সর্ব ক্ষেত্রেই ছিল নৈরাজ্য আর অশান্তি। শান্তির দূরতম লক্ষণ কোথাও দৃষ্টিগোচর ছিলোনা। মানবতার ও সভ্যতার এহেন অশান্তিময় দুরবস্থায় এলেন মহানবী (সা.)।পেশ করলেন শান্তির বাণী। মাত্র ২৩ বছরের মধ্যে তিনি তদানীন্তন আরবে এক শান্তিময় রাষ্ট্র স্থাপন করলেন। প্রশস্ত করে দিলেন মানবতার শান্তির স্বর্গীয় অনুপম পথ। সমগ্র মানবজাতি খুঁজে পেয়েছিলো শান্তির দিকনির্দেশনা। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে যুগ যুগ ধরে চলে আসা যুদ্ধের অবসান ঘটে ছিলো আরবে। চরম অশান্তির বদলে স্থাপিত হয়েছিলো সুখের আবাস। নিষ্পেষিত শোষিত মানবতা খুঁজে পেয়েছিলো শান্তির অমিয়ধারা। আর প্রত্যক্ষ করেছিলো শান্তিময় সুশীল সমাজরাষ্ট্র। বিশ্ববাসী লাভ করেছিলো শান্তির পরশ। স্বর্গীয় শান্তির ফল্গুধারা নেমে এসেছিলো ধূলির এধরায়। শান্তিময় হয়ে ওঠেছিলো সবকিছু। শান্তির সুবাতাস বয়ে চলছিলো বিশ্বজুড়ে। এভাবে মহানবীর শিক্ষা সংস্কার ও সমাজ বিনির্মাণে মূর্ত হয়ে ওঠেছিলো সে দিন।

একি শুধু অতীতের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের এক দ্যুতিময় অধ্যায় ? নাকি আজকের সংকট সমস্যা জর্জরিত পৃথিবীতে এর কোন উপযোগিতা আছে ? আদর্শিক শূন্যতা হতাশা ও নিশ্চয়তার অতল গহবরে নিক্ষিপ্ত মানবতার মুক্তির সাধনে মহানবীর (সা.) জীবনাদর্শ কী অতীতের মতোই দিক নির্দেশনা দিতে সক্ষম ? যুদ্ধে জর্জরিত পৃথিবীতে শান্তি ও ন্যায়ের নিশ্চয়তা দানে সে আদর্শ আজোকী সমক্ষ ?
এজন্যে আজ মহানবীর (সা.) আদর্শকে বিশেষভাবে অনুশীলন ও চর্চা একান্ত প্রয়োজন। প্রয়োজন আজকের সংকটাপন্ন পৃথিবীতে তাঁর আদর্শের সক্ষমতাদানের বিচার-বিশ্লেষণ। কারণ তিনি বিশ্ব মানবের জন্য ছিলেন শান্তির অগ্রদূত। বিরাজমান সংকট দূরীকরণে তাঁর আর্দশের বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তা সামনে রেখে আলোচনার প্রয়াস মাত্র।
আল্লাহ বলেন; আমার সৃষ্টিকুলের সবার জন্য আপনাকে শান্তির অগ্রদূত হিসাবে প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)
হাদীস অধ্যয়ন করলে জানা যায়, যে মহানবী (সা.) সকলের জন্যই শান্তির অগ্রদূত ছিলেন।
জনৈক সাহাবী রাসূলকে (সাঃ) মুশরিকদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করার জন্য বললে নবীজী উত্তরে বলেন ; আমাকে এ জন্য প্রেরণ করা হয়নি যে আমি কাউকে অভিশাপ দেবো, বরং আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে রহমত (শান্তির অগ্রদূত) স্বরূপ। মুসলিম আবু হুরায়রাহ থেকে।
নবীজী ছিলেন দয়ার সাগর এবং উম্মতকেও দয়া ও কোমলতা শিক্ষা দিয়েছেন, স্বয়ং আল্লাহই নবীজীকে তাঁর সাহাবাদের সাথে কোমলতার কথা তোলে ধরেছেন এ ভাবে; মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল, আর যেসব লোক তাঁর সঙ্গে রয়েছে তাঁরা কাফেরদের প্রতি শক্ত কঠোর, এবং পরস্পর পূর্ণদয়াশীল। (সূরা ফাতহ: ২৯)
মূলত নবীজীর এই কোমলতাই মুশরিকদের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হয়েছে। যদি তিনি কঠোরমনা হতেন তাহলে লোকেরা তাঁর কাছেই ঘেঁষতো না। আল্লাহ বলেন; হে নবী এটা আল্লাহর বড়ই অনুগ্রহের বিষয়, যে তুমি লোকদের জন্য খুবই নম্র স্বভাবে হয়েছো। অন্যথায় যদি তুমি উগ্র-স্বভাব ও পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী হতে , তাহলে এসব লোক তোমার কাছেই ঘেঁষতো না। ( সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)
আর এই মর্মে নবীজী বলেন; যেব্যক্তি কোমল স্বভাব থেকে বঞ্চিত সে কল্যাণ থেকেও বঞ্চিত। রাসূলে (সা.) সাহাবাদের শান্তির দিকে উৎসাহ দিতে গিয়ে বলেন; মহান দয়ালু আল্লাহ দয়াকারীদের প্রতি দয়া করে থাকেন, সুতরাং তোমরা দুনিয়াবাসীদের প্রতি দয়া কর , তাহলে যিনি আকাশে আছেন তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।
সুতরাং আমাদের উচিত নবীজীর আদর্শকে আঁকড়ে ধরা আর দয়া ও স্নেহ মায়া-মমতা দিয়ে সকলকে আপন করে নেওয়া। এই কাজটি আমরা দুভাবে আমাদের জীবনে প্রকাশ করতে পারি। ১. ছোটদের প্রতি স্নেহ প্রদর্শন , আর ২. বড়দেরকে সম্মান দিয়ে।
মহানবী ছিলেন পরমসহিষ্ণু। সামাজিক যে কোন কাজে তিনি সাহাবায়ে কেরামদের পরামর্শ চাইতেন। নিজের মতের সঙ্গে তাদের মতপার্থক্য দেখা দিলেও তিনি অধিকাংশের মতের প্রধান্য দিতেন। আল্লাহর বাণী প্রচার করতে গিয়ে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ অকথ্য জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁরা সেজন্য নিজ নিজ স¤প্রদায়ের বিরুদ্ধে আল্লাহর নিকট বদদোয়া করেছেন। নবীগণের বদদোয়ায় আল্লাহ সেসব স¤প্রদায়কে ধ্বংস করে দিয়েছেন। মহানবী (সা.) তায়েফের প্রান্তরে প্রস্তরাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন। মালায়েকা তাঁর নিকট পাহাড় চাপা দিয়ে তায়েফবাসীদের ধ্বংস করে দেওয়ার অনুমতি চয়েছেন। অহুদের যুদ্ধে নবীজী মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। তাঁর পবিত্র দাঁত ভাংগা গেছে। লৌহ শিরস্ত্রাণ ভেঙ্গে মাথায় ঢুকে গেছে। নবীজীর দুঃখে অহুদ পাহাড় আরজ করলো আপনি অনুমতি দিন আমি কাফিরকুলকে গ্রাস করে ফেলি। মহানবী (সা.) এ অনুমতি দেননি। তিনি আল্লাহর কাছে বিনয়াবনত মস্তকে আরজ করলেন; হে আল্লাহ আমার স¤প্রদায়ের লোকেরা অবুঝ! ওদের হেদায়েত দিন।
তিনি ছিলেন ধৈর্যের প্রতীক। শান্তির পতাকাবাহী, ও মহানায়ক। এক কথায় তিনি ছিলেন আদর্শ বালক , আদর্শ যুবক, আদর্শ সেবক, আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক, আদর্শ মহাবিজ্ঞানী, পৃথিবীর যে কোন মানুষের জন্য তিনি ছিলেন আদর্শ শিক্ষক, তিনি ছিলেন সকল বিষয়েরই আদর্শ নমুনা বা মডেল। তাঁকে নিয়ে পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরে আলোচনা গবেষণা হয়েছে , হচ্ছে এবং হতে থাকবে। তিনি বহুল আলোচিত ব্যক্তি। সর্বকালে সকল বিষয়ে তিনি শীর্ষে স্থান পেয়েছেন এবং পেতে থাকবেন। তিনি সর্বজন বরেণ্য। এজন্যই তাঁর পদাংক অনুসরণ সকলের জন্য ফরজ। আল্লাহ বলেন; আর রাসূল তোমাদের যে বিষয়ে আদেশ করেন, তা পালন করবে, এবং যে সব বিষয়ে বারণ করবেন অবশ্যই তা থেকে বিরত থাকবে। (সূরা হাশর: ৭)
নবীজী তাঁর গোটা জিন্দেগীতে যে সব কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করেন তা সংক্ষেপে নিম্মে পেশ করছি।
* কর্মধারাঃ তাঁর আচরণে মুগ্ধ সবাই। সচ্চরিত্রের অধিকারী “আল-আমীন” বলে ডাকতে বাধ্য সবাই। প্রায় যৌবনে পদার্পণ। সুশীল সমাজ বিনির্মাণে দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে মক্কায় বর্ণ-গোত্রের সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে গড়ে তুলেন সামাজিক সংগঠন “হিলফুল ফুযুল”।
* সমাজ গঠনঃ হিযরতের পর মহানবী (সা.) প্রথমে মক্কা থেকে আগত মুহাজির এবং মদীনার আনসারদের মধ্যে স্থাপন করলেন ভালোবাসার ভরপুর ভ্রাতৃত্ব যা ইতি পূর্বে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রত্যক্ষ করা যায়নি। কিছু দিনের মধ্যে মদীনার সমাজকে রাষ্ট্রে পরিণত করার উদ্যোগ নিলেন মহানবী (সা.)।
* সংখ্যালঘুর অধিকার : তদানীন্তন মদীনাতে তথা সমগ্র পৃথিবীতে সংখ্যালঘুদের কোন অধিকার কার্যত ছিলো না। কিন্তু মহানবী (সা.) এমন আদর্শ স্থাপন করেছিলেন যা আজো মনবতা পুরোপুরি আত্মস্থ করতে পারেনি। এ ব্যাপারে তিনি কয়েকটি মূলনীতি পেশ করেছিলেন। তা হচ্ছে;
১. নিজ নিজ ধর্ম বিশ্বাস।
২. বিবেকের স্বাধীনতার অধিকার দেওয়া।
৩. ধর্মীয় ব্যাপারে কারো মনে কষ্ট দেওয়া যাবে না।
৪. ব্যক্তি অপরাধে সমাজের অপরাধ নয়।
৫. আইনের চোখে সবাই সমান।
প্রেক্ষিতে আজকের বিশ্ব : হাজারো সমস্যা আবর্তে আজকের বিশ্ব মানবতা আজ নিষ্পেষিত। জাতিতে জাতিতে সংঘর্শ আজ সর্বত্র। সাম্রাজ্যবাদের ছোবলে পড়ে ছোট ও গরীব রাষ্ট্রগুলো আজ দিশেহারা। সর্বত্র চলছে আজ ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত, জাতিগত প্রধান্যের তীব্র প্রতিযোগিতা। ফলশ্র“তিতে সংঘাত , অসাম্য, ঘৃণা, প্রতিশোধ, আজ প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুসলিম দুনিয়ার অবস্থা আরো ভয়াবহ। অব্যবস্থা, দারিদ্র, স্বৈরাচারী শাসন মুসলিম বিশ্বের আজ বৈশিষ্ট। মুসলমানরা আজ সাম্রাজ্যবাদ ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্রের কবলে নিপতিত। সর্বত্র মুসলমানেরা নির্যাতিত, বঞ্চিত, নিগৃহিত। কসোভা, ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, আরাকান, বসনিয়া, সর্বত্রই মুসলমানের রক্তের হোলিখেলা চলছে। অনৈক্য, বিভেদ মুসলিম বিশ্বের শক্তিকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। আবার এই অনৈক্য বিভেদে ইন্ধন যোগাচ্ছে পাশ্চাত্য।
উপসংহার
তাই এহেন দূরবস্থা থেকে গোটা বিশ্ব আজ মুক্তি পেতে চায়। কিন্ত সে বাঁচার পথ কোনটি ? আজ বিশ্বমানবতার সামনে মুক্তির পথ উম্মুক্ত নয়। তাই আজকের প্রেক্ষিতে মহানবীর জীবনাদর্শের চর্চা ও অনুশীলন যত বেশী হবে ততই মানবতার মুক্তির পথ উম্মুক্ত ও সুগম হবে। আমাদের ব্যষ্টিক সামাজিক জীবনকে করবে শোষণ মুক্ত সমৃদ্ধিশালী। রাষ্ট্রকে করবে শক্তিশালী, পরিবারকে করবে প্রেমময়। গোটা মানবতাকে দেখাবে মহা ঐক্যের মহাভ্রাতৃত্বের সন্ধান। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব পতনের পথ থেকে মুক্তি পাবে। অতীতের সোনালী যুগ আবার তারা উদ্ধার করবে,বিশ্ব মুসলিম জাগরণের পথ হবে প্রশস্ত।
بلغ العلى بكماله * كشف الدجى بجماله
حسنت جميع خصاله * صلوا عليه و آله
اللهم صل و سلم دائماً أبداَ

সর্বশেষ যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে

সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী
সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারী

পুলসিরাত সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ হাদীসের শেষাংশে এসেছে : হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত এক ব্যক্তি জাহান্নামের দিকে মুখ করা অবস্থায় থাকবে। তখন সে বলবে, হে আমার প্রভূ! জাহান্নামের গরম বায়ু আমাকে শেষ করে দিল। আমার চেহারাটা আপনি জাহান্নাম থেকে অন্য দিকে ফিরিয়ে দিন। সে এভাবে আল্লাহ তাআলার কাছে বার বার প্রার্থনা করতে থাকবে। আল্লাহ তাকে বলবেন, তোমার এ প্রার্থনা কবুল হলে এরপর তুমি যেন আর কিছু না চাও। সে বলবে, আপনার মর্যাদার কসম করে বলছি, এরপর আপনার কাছে আর কিছু চাইবো না। তখন জাহান্নামের দিক থেকে তার চেহারা ফিরিয়ে দেয়া হবে। তারপর সে আবার বলতে শুরু করবে, হে আমার প্রভূ! আমাকে একটু জান্নাতের দরজার নিকটবর্তী করে দেন। আল্লাহ বলবেন, তুমি কি বলোনি এরপর আর কিছু চাইবে না? ধিক হে মানব সন্তান। তুমি কোন কথা রাখো না। কিন্তু এ ব্যক্তি প্রার্থনা করতেই থাকবে। আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমার তো মনে হয় তোমার এ দাবী পুরণ করা হলে আবার অন্য কিছু চাইবে। সে বলবে, আপনার মর্যাদার কসম করে বলছি, এরপর আপনার কাছে আর কিছু চাইবো না। সে আর কিছু চাইবে না এ শর্তে আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের গেটের নিকটবর্তী করে দিবেন। যখন সে জান্নাতে গেটের দিকে তাকিয়ে জান্নাতের সূখ শান্তি দেখবে তখন কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার প্রার্থনা করতে শুরু করবে, হে আমার প্রভূ আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিন। আল্লাহ বলবেন, তুমি কি বলোনি এরপর আর কিছু চাইবে না? ধিক হে মানব সন্তান! তুমি কোন কথা রাখো না। সে বলবে, হে আমার প্রভূ! আমাকে আপনার সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে দুর্ভাগা করে রাখবেন না। এভাবে সে প্রার্থনা করতে থাকবে। অবশেষে আল্লাহ হাসি দিবেন। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর পর আল্লাহ বলবেন; ঠিক আছে তুমি আরো কিছু চাও, সুতরাং সে আল্লাহর নিকট চাইবে, আল্লাহও তাকে বিভিন্ন বিষয় চাওয়ার জন্য স্মরণ করিয়ে দিবেন। অতঃপর তার চাওয়া শেষ হয়ে যাবে। আল্লাহ বলবেন এই সবই তোমার জন্য। এবং সাথে আরো সেই পরিমাণ দেওয়া হলো। (বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম)