মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হবে?

মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হবে?
মুসলিম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হবে?

 রহিম সাহেব বেসরকারী একটি অফিসের কর্মকর্তা। নয়টা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত অফিস করে অভ্যস্ত। পাঁচটার পর যথারীতি অফিসের কাজ গুটিয়ে হটপটটি কাঁধে ঝুলিয়ে বাসা অভিমুখে রওনা হলেন। দোতলা ভলভো সার্ভিসের অপেক্ষায় আছেন কাউন্টারের সামনের সারিতে। আচমকা পেছন থেকে একটা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলেন। জামা-প্যান্ট ধূলি-ধূসর হয়ে গেল। পেছন ফিরে যেসব শব্দ বা বাক্য তিনি সজোরে উচ্চারণ করলেন, তা সাধারণত কেউই শুনতে চায় না। আর শোনার পর নিস্ক্রিয় থাকে না। ভলভোয় একটু ভদ্রগোছের মধ্যবিত্তরাই চড়ে। তাই কেউই তার অভদ্র শব্দগুলোর জবাব দিল না। ঝগড়াটে মানুষ ঝগড়া করতে না পারলে স্বস্তি পায় না। মনের পোটে প্রাণীটি ভেতরেই রয়ে গেল। অবশেষে বাসায় ফেরার পর বৌয়ের হাতে হটপটটি দেয়ার সময় প্রাণীটি বেরিয়ে এলোঃ
কী ছাইপাঁশ রান্না করো আজকাল, এসব কি খাওয়া যায়? সারাদিনে সামান্য একটু রান্না করবে-তারও এই হাল যত্তোসব। বারেক, বাসু ওরা কোথায়?
বৌঃ নিরুত্তরই থাকলো। কোন কথাই বললো না।
রহিম সাহেব বললো : কথা কানে যায় না?   কোথায় ওরা এদিকে বৌ কাঁদতে কাঁদতে অন্দরে চলে গেল। তার ছেলে দুটি মায়ের রুমে আজ্রাইলের ভয়ে চুপটি মেরে পড়ে আছে। এদিকে বাসায় রহিম সাহেবের বন্ধু এলেন হঠাৎ করেই। তিনি রহিম সাহেবকে তার কূশলাদি জিজ্ঞেস করার সাথে সাথেই জবাব দিলেন, ভালো আর থাকলাম কই, ঘরে-বাইরে সব খানেই অশান্তি আর অশান্তি। তোর ভাবীকে কয়েকবার জিজ্ঞেস করলাম ছেলেপুলেগুলো কোথায়, সে তার মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। দুই বন্ধুর এরকম কথাবার্তার মাঝে রহিম সাহেবের স্ত্রী মেহমানকে সালাম দিয়ে ড্রইংরুমে এলেন। পারস্পরিক কূশল বিনিময়ের পর ভদ্র মহিলা চা আনার কথা বলে ভেতরে যাচ্ছিলেন, এমন সময় রহিম সাহেব টিপ্পনি কেটে বললেন, তোমার যেই চা, ও আর খাওয়া লাগবে না। বরং ফল-টল কিছু দাও। রহিম সাহেবের স্ত্রী লজ্জিত হয়ে অন্দর মহলে চলে গেলেন। এবারে আসুন ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। প্রতিটি মানুষেরই আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব রয়েছে, আত্মমর্যাদা রয়েছে। মর্যাদা এমন একটি ব্যাপার, যা অনেকের কাছেই সম্পদের চেয়েও মূল্যবান। নিকৃষ্ট চরিত্রের অধিকারীরাই কেবল ধন-সম্পদের লোভে মর্যাদা বা ব্যক্তিত্বকেও বিসর্জন দিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। কিন্তু যারা সৎ তারা মর্যাদাকে সব কিছুর উপরে স্থান দেয়। নারীরা স্বভাবতই লজ্জাবতী। সৎ নারীদের কাছে অর্থাৎ লজ্জাশীলা নারীদের কাছে মর্যাদার গুরুত্ব বেশি। স্ত্রীরাও স্বামীদের কাছে একইভাবে মর্যাদা পেতে আশা করে। স্বামীরা যদি তাদেরকে অমর্যাদা কিংবা অপমানিত করে, তাহলে তারা ভীষণ আহত হয়। আর স্ত্রীদের অর্থাৎ নারীদের অনেকেরই স্বভাব হলো, আহত হলেও তা প্রকাশ না করা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তুষের আগুনের মতো ধিকি ধিকি সে আহত হবার বেদনা লালন করতে থাকে। ধীরে ধীরে স্বামীর ব্যাপারে নিস্পৃহ মনোভাব দেখা দেয় এবং ঘৃণা করতে শুরু করে। অথচ স্ত্রী হলো আপনার জীবনসঙ্গিনী, আপনার সেরা বন্ধু, আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষ। ফলে সে-ই আপনার কাছ থেকে বন্ধুত্বের শ্রেষ্ঠ মর্যাদা পাবার অধিকার রাখে। স্ত্রীকে সম্মান করলে তা প্রেম-ভালোবাসায় পরিণত হয়। ফলে স্ত্রীও আপনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুরক্ত হয়ে পড়বে। এই সম্মান বা মর্যাদা প্রদর্শনের ব্যাপারটি কিন্তু আলাদা কোন আনুষ্ঠানিকতার মতো ঘটনা নয়। বরং উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে সকল কাজে কর্মেই সম্মান প্রদর্শন করা যেতে পারে। যখন বাসা থেকে অফিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন, স্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিন। অফিসে এসে কাজের ফাঁকে খোঁজ নিন। বাসায় ফেরার পর দরজা খুলতেই তার আগে আপনিই সালাম দিন। সারাদিন কেমন কাটলো, খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো হলো কিনা, সন্তানেরা জ্বালাতন করলো কিনা, এসব খোঁজ-খবর নিন। তারপর যতোক্ষণ একত্রে বাসায় থাকেন, সন্তানদের দেখাশোনার দায়-দায়িত্ব পালনে নিজেও অংশ নিন। স্ত্রী আপনাকে নিষেধ করলে আপনি বলুন সারাদিন তো তুমিই জ্বালাতন সহ্য কর। তার খানিকটা আমাকেও নিতে দাও। আপনার স্ত্রী এতে কৃতজ্ঞতায় বিনয়ী হয়ে উঠবে। খাওয়া-দাওয়া করতে বসলেন-তার রান্নাবান্নার প্রশংসা করুন। ঠাট্টা-মশকরা করেও স্ত্রীকে বিদ্রুপ করা বা অসম্মানিত করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করুন। কারণ আপনি ভালোবেসেই যে ঠাট্টা করেছেন এটা সে বুঝবে। সেজন্যে হয়তো কিছু মনে করবে না। তবে মনে মনে হয়তো ঠাট্টাটিকে সে অপছন্দই করতে পারে। কী প্রয়োজন ঠাট্টার পরিবর্তে বরং প্রশংসার কাব্যিক পথ বেছে নিন। মজা যদি করতেই হয়, তাহলে এমন ধরনের রসিকতা করুন, যাতে মজাও পাওয়া যায় আবার সম্মান-মর্যাদায়ও আঘাত না লাগে। কোন মজলিসে কিংবা বন্ধু-বান্ধবদের সমাবেশে কখনই স্ত্রীকে খাটো করে বা অমর্যাদা করে কথা বলবেন না। বরং তাকে সম্মান দিয়ে তাকে প্রশংসা করুন। এতে আপনার বন্ধু মহলেও আপনার স্ত্রীর সম্মান-মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। যার ফলে আপনারা দুজনেই সম্মানিত হবেন। আর পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক দৃঢ় হয়। সেইসাথে দাম্পত্য জীবন ও পরিবারে সুখ-শান্তি ও সৌরভময় এক পরিবেশ বিরাজ করে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, যারা মহৎ হৃদয় সম্পন্ন একমাত্র তারাই নারীদের সম্মান প্রদর্শন করে। তিনি আরো বলেছেন,  যে পরিবার অর্থাৎ স্ত্রীকে অসম্মান করে, সে নিজের জীবনের সুখ নষ্ট করে ফেলে। রাসূল (সাঃ)-এর এই মহান বাণীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তাঁর সকল উম্মতের উচিত নিজ নিজ স্ত্রীকে সম্মান করা। ইমাম সাদিক (আঃ)ও তাঁর পিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, যে বিয়ে করেছে তার অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হলো স্ত্রীকে সম্মান করা। পারিবারিক সুখ-শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থেই তারা স্ত্রীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। কিন্তু এই সম্মান দেখানোর বিষয়টি অন্তর থেকে উত্থিত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। সম্মান ভালোবাসারই প্রকাশ। ফলে ভালোবাসা যেমন অকৃত্রিম হওয়া দরকার, সম্মান প্রদর্শনও ঠিক তাই হওয়া উচিত। দৈনন্দিন জীবনে মানুষ বিচিত্র ঘটনাবলীর সম্মুখীন হয়। এসব ঘটনা সবসময় সুখকর নাও হতে পারে। অফিসে বিচিত্র মানসিকতার সহকর্মী থাকে। সবাই যে বন্ধু সুলভ হবে তা নাও হতে পারে। ফলে আপনি যদি কারো কাছ থেকে কখনো অবন্ধুসুলভ আচরণ পান, তাহলে আপনার মনটা খারাপ হয়ে থাকতে পারে। তার উপর হয়তো বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেলেন, কিংবা দুর্ভাগ্যবশত: কোন ছিনতাইকারী আপনার সর্বস্ব লুট করে নিল-এরকম অবস্থায় আপনি বিক্ষুদ্ধ মনে বাসায় ফিরলেন। বাসায় ফেরার পর আপনি আর কাউকে না পেয়ে বেচারী স্ত্রীর ওপর মনের ঝাল ঝাড়লেন। আপনার ছেলে মেয়েরা আপনার আচরণ দেখে ভাবলো, বাবা তো নয় যেন এক আজরাইল বাসায় ফিরেছে। তারা আপনার কাছে না ঘেঁষে ভয়ে পালিয়ে বাঁচলো। এদিকে আপনার স্ত্রী আপনার জন্যে সারাদিন খেটে যে রান্নাবান্না করলো, সেই রান্নাবান্নার ছোট-খাটো স্বাভাবিক ত্রুটিতে আপনি অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করলেন, কিংবা ঘরদোর হয়তো বাচ্চারা অগোছালো করে রেখেছে, কিংবা তারা চেঁচামেচি করছে-যাই হোক না কেন আপনি যদি এসব অজুহাতে আপনার স্ত্রীর সাথে দুর্ব্যবহার করেন, তাহলে এরচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা আর কী থাকতে পারে আপনি নিজেই আপনার সংসারকে দোজখে পরিণত করলেন। আপনার এই আচরণ মোটেই অভিভাবক সুলভ নয়, বরং একজন অত্যাচারী স্বৈরাচারের মতো। আপনার মতো স্বৈরাচারের শোষণে আপনার পুরো পরিবার অসহ্য যন্ত্রণার শিকার হচ্ছে। আর আপনার স্ত্রী যে তার স্বামীকে দেখামাত্রই খুশী হয়ে ওঠার কথা ছিল, সে আপনার চেহারা দেখা মাত্রই বিরক্ত হয়ে উঠবে। আপনার সঙ্গই তার কাছে বিষময় মনে হবে। ধীরে ধীরে আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গ ত্যাগ করতে চাইবে। বাচ্চাদের কারণে তা অসম্ভব হলে ঘৃণা করতে শুরু করবে। এর ফলে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটি আপনার হবে, তাহলো আপনার এই আচরণের প্রভাব ছেলেমেয়েদের মনে ব্যাপকভাবে পড়বে। ছেলেমেয়েরা ধীরে ধীরে মানসিকভাবে এতটাই জটিল বা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়তে পারে যে, তারা আপনার চেয়েও ভয়ঙ্কর কাজ শুরু করতে পারে। অপরাধ জগতে যারা প্রবেশ করে, তাদের পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধান করে দেখলে এই জটিল মানসিকতার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে। যার মূল কারণ আপনারই রূঢ় ও ভারসাম্যহীন আচরণ। আপনার সাময়িক অসহিষ্ণুতা কতো মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তা একবার ভেবে দেখুন।
সর্বোপরি একটা বিষয় আপনার সুষ্ঠুভাবে চিন্তা করা উচিত, তাহলো যেই দুর্ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার কারণে আপনি রূঢ় আচরণ শুরু করলেন, সেই ঘটনার জন্য আপনি, আপনার স্ত্রী কিংবা ছেলেমেয়েরা কী দায়ী? মোটেই না। ফলে আপনার নিরপরাধ পরিবারের সদস্যদের সাথে নির্দয় আচরণ করা কি অন্যায় নয়? বুদ্ধিমানের কাজ হলো সবকিছুকে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা করা। ধৈর্যহারা না হয়ে নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কাজকর্ম সেরে ধীরে সুস্থে দুর্ঘটনার কথাটি আপনার স্ত্রীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সামনে তুলে ধরলে তারা বরং কষ্টটিকে আপনার সাথে ভাগ করে নেবে। এতে সবাই কষ্টের অংশীদার হলো। অন্যদিকে আপনাকে কতোভাবে যে প্রবোধ দেয়ার চেষ্টা করবে, তাতে আপনার কষ্টকে আর কষ্টই মনে হবে না। আর আপনার সন্তানরা আপনার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবে। প্রতিদিন তারা অপেক্ষায় থাকবে কখন আপনি বাসায় ফিরবেন। ঠিকমতো আপনি পৌঁছলেন কিনা এ ব্যাপারে তারা সদা উদ্বিগ্ন থাকবে। যার ফলে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় হবে। তাই কোন সমস্যার মোকাবেলায় উগ্রতা পরিহার করে ঠাণ্ডা মাথায় সামাধান করার চেষ্টা করুন। পরিবারের সবার সাথে বিশেষ করে স্ত্রীর সাথে হাসিখুশী থাকার চেষ্টা করুন। সুন্দর আচরণ করার চেষ্টা করুন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এটাকে ঈমানের নিদর্শন বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি সুন্দর আচরণ করে, তার ঈমান অধিকতর পূর্ণ। তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ যে তার নিজ পরিবারের সাথে সুন্দর আচরণ করে। রাসূল (সা.) আরো বলেছেন, সুন্দর আচরণের চেয়ে শ্রেয়তর কোন কর্ম নেই। (তিরমিযী)

কুরআনের আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব

কুরআনের আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব
কুরআনের আলোকে মাতৃভাষার গুরুত্ব

মাতৃভাষার সাথে মানুষের জন্মগত ও স্বভাবগত চাহিদা রয়েছে। আর এ চাহিদার অমূল্যায়ন ইসলাম কস্মিনকালেও করেনি। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা এবং রাষ্ট্রীয় ভাষাও বাংলা। সুতরাং বাংলা ভাষাকে অমূল্যায়ন করা বা অবহেলা করা কখনো সমীচীন হবে না।
ইসলাম মাতৃভাষাকে মর্যাদার উচ্চাসনে সমাসীন করেছে। তাইতো দেখা যায় যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যুগেযুগে পথভ্রষ্ট মানব জাতিকে সুপথে পরিচালনা করার নিমিত্ত অসংখ্য নবী -রাসূলকে আসমানী কিবাতসহ তাঁদের স্ব-জাতির ভাষায় প্রেরণ করেছেন।
যেমন হযরত দাউদ (আ.) এর ‘যবূর’ ছিল, তাঁর সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা ‘ইউনানীতে’। হযরত মূসা (আ.) এর ‘তাওরাত’ ছিল, তাঁর সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা ‘ইবরানীতে’। হযরত ঈসা (আ.) এর ইনজীল ছিল, তাঁর স্ব-জাতির মাতৃভাষা সুরইয়ানীতে’ এবং আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর প্রতি অবতীর্ণ ‘কুরআন’ ছিল তাঁর স্ব-জাতির মাতৃভাষা ‘আরবীতে’। এভাবেই আল্লাহর বিধি-বিধান মানব জাতির কাছে পৌঁছানোর সহজতম পথটি অনুসৃত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: وَمَا أَرْسَلْنَا مِنْ رَسُولٍ إِلَّا بِلِسَانِ قَوْمِهِ لِيُبَيِّنَ لَهُمْ   ‘আমি সব রাসূলকেই তাঁদের স্ব-জাতির ভাষাভাষি করে প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে (আমার বাণী ) সু স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারেন।’ (সূরা ইবরাহীম:৪)
এখানে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) যেহেতু সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে রাসূল রূপে প্রেরিত হয়েছিলেন, সেহেতু বিশ্বের প্রতিটি জাতির নিকট আল্লাহর বিধি-বিধান সঠিকরূপে পৌঁছানোর জন্য প্রত্যেক জাতির ভাষায় পৃথক পৃথক কুরআন অবতীর্ণ করা হলো না কেন? তার প্রতি উত্তরে উলামায়ে কেরাম বিভিন্ন ধরনের অভিমত পেশ করেছেন। তন্মধ্যে বাংলা পাক ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত তাফসীর বিশারদ মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী (রহ.) এর অভিমত পরিধাণযোগ্য। তিনি বলেন:
“বিশ্বের জাতিসমূহের মধ্যে শতশত ভাষা প্রচলিত রয়েছে। এমতাবস্থায় সবাইকে হেদায়াত করার দু‘টি উপায় সম্ভবপর ছিল। প্রথমতঃ প্রত্যেক জাতির ভাষায় পৃথক-পৃথক কুরআন অবতীর্ণ হওয়া এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর শিক্ষাও তদ্রƒপ প্রত্যেক জাতির ভাষায় ভিন্ন-ভিন্ন হওয়া। আল্লাহর শক্তির সামনে এরূপ ব্যবস্থাপনা মোটেই কঠিন ছিলনা; কিন্তু সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য এক রাসূল এক গ্রন্থ এবং এক শরীয়ত প্রেরণ করার মাধ্যমে তাদের মধ্যে হাজারো মতবিরোধ সত্ত্বেও ধর্মীয় চারিত্রিক ও সামাজিক ঐক্য  ও সংহতি স্থাপনের যে মহান লক্ষ্য অর্জন করার উদ্দেশ্য ছিল, এমতাবস্থায় তা অর্জিত হত না। এছাড়া প্রত্যেক জাতির ও প্রত্যেক দেশের কুরআন ও হাদীস ভিন্ন-ভিন্ন ভাষায় থাকলে কুরআন পরিবর্তনের অসংখ্য পথ খুলে যেত এবং কুরআন একটি সংরক্ষিত কালাম, যা বিজাতি এবং কুরআন অবিশ্বাসীরাও মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করে। এ অলৌকিক বৈশিষ্ট্য খতম হয়ে যেত।
এছাড়া একই ধর্ম এবং একই গ্রন্থ সত্ত্বেও এর অনুসারীরা শতধাবিভক্ত হয়ে যেত এবং তাদের মধ্যে ঐক্যের কোন কেন্দ্রবিন্দুই অবশিষ্ট থাকতো না। এক আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল হওয়া সত্ত্বেও এর ব্যাখ্যা তাফসীরের বৈধ সীমার মধ্যে মত-পার্থক্য দেখা দিয়েছে। অবৈধ পন্থায় যেসব মত বিরোধ হয়েছে, সেগুলোর তো ইয়ত্তা নেই।
এ থেকেই উপরিউক্ত বক্তব্যের সত্যতা সম্যক অনুমান করা যায়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও যারা কোন না কোন স্তরে কুরআনের বিধি-বিধান পালন করে, তাদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য বিদ্যমান রয়েছে।
মোট কথা রাসূল (সা.) এর নবুওয়াত সমগ্র বিশ্বের জন্য ব্যাপক হওয়ার প্রেক্ষিতে প্রত্যেক জাতির ভাষায় ভিন্ন-ভিন্ন কুরআনের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ববাসীর শিক্ষা ও হেদায়াতের পন্থাকে কোন স্থূলবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিও সঠিক ও নির্ভুল মনে করতে পারে না। তাই দ্বিতীয় পন্থাটিই অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অর্থাৎ রাসূলের ভাষাই কুরআনের ভাষা হবে।
নায়েবে রাসূল আলেমগণ প্রত্যেক জাতি ও প্রত্যেক দেশে রাসূল (সা.) এর নির্দেশাবলী তাদের ভাষায় বোঝাবেন এবং প্রচার করবেন। আল্লাহ তা‘আলা এর জন্যে বিশ্বের ভাষাসমূহের মধ্য থেকে আরবী ভাষাকে নির্বাচন করেছেন। (মা‘আরেফুল কুরআন, প্রকাশনায় মদীনা মুনাওয়ারা ৭১২ পৃষ্ঠা)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মাতৃভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে কুরআনের বিভিন্ন স্থানে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) কে উদ্দেশ্য করে বলেন: আমি কুরআনকে আপনার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে আপনি এর  আল্লাহভীরুদেরকে সুসংবাদ দেন এবং কলহ প্রিয় সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন। (সূরা মারইয়াম: ৯৭)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন: আমি আপনার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে তারা স্মরণ করে। (সূরা দুখান: ৫)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন: আমি এ কুরআনকে আরবী ভাষায় (অবতীর্ণ) করেছি, যাতে তোমরা বুঝ। (সূরা যুখরুফ:৩)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন: এ কুরআন বিশ্বজাহানের পালনকর্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। বিশ্বস্ত ফেরেশতা একে নিয়ে অবতরণ করেছে আপনার অন্তরে, যাতে আপনি ভীতি প্রদর্শনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হন সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়। (সূরা শু‘আরা: ১৯২-১৯৫)
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন: আমি এ কুরআনকে কোন ভিন্ন ভাষা-ভাষীর প্রতি অবতীর্ণ করতাম অতঃপর তিনি তা তাদের কাছে পাঠ করতেন, তাহলে তাদের তারা বিশ্বাস স্থাপন করতো না। (সূরা শু‘আরা: ১৯৮-১৯৯)
আর জাতিকে সুপথে পরিচালনা করতে হলে পরিচালক মণ্ডলীকে জাতির বোধগম্য ভাষায় কুরআন ও হাদীসের পূর্ণ জ্ঞানের অধিকারী অবশ্যই হতে হবে, নচেৎ জাতির সামনে মনের ভাব ও মূল বক্তব্য ব্যক্ত করা কখনো সম্ভব হবে না। যদি নবীদের ভাষা উম্মতের ভাষা থেকে ভিন্ন হত, তাহলে নবীদেরকে উম্মতের নিকট আল্লাহর বিধ-বিধান পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অনুবাদের ঝুঁকি গ্রহণ করতে হতো। এরপরও উম্মতের কাছে আল্লাহর বিধি-বিধান সঠিকরূপে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে থেকে যেত অসংখ্য সন্দেহ। তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ দেশে কোন নবী প্রেরণ করতেন, তাহলে তাঁকেও এদেশের মাতৃভাষার মাধ্যমেই প্রেরণ করতেন।
দ্বিতীয়তঃ বিশ্বের বুকে যতগুলো শিশু জন্মগ্রহণ করে, তারা বুঝ, জ্ঞান ও অনুভূতির ভাষা শিক্ষা করে, মাতা-পিতা, ভাই-বোন এবং পাড়া প্রতিবেশীদের কাছ থেকে এ ভাষা শিশুদের মনের দুয়ার খুলে দেয় এবং বুঝতে, শিখতে ও জানতে সাহায্য করে।
এমনিভাবে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বাতেল যে যুগে যে-রূপ নিয়ে মানব সমাজে এসেছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, যে যুগের নবীকেও তার মুকাবেলা করার জন্য সে ধরণের মু‘জিযা দিয়ে পাঠিয়েছেন।
হযরত নূহ (আ.)-এর যুগ ছিল জাহাজ শিল্পের উন্নতির যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে জাহাজ শিল্পের জ্ঞান দান করে ছিলেন।
হযরত দাউদ (আ.)-এর যুগ ছিল গান-বাজনা চর্চার যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এমন সুমধুর কণ্ঠ দান করে ছিলেন যে, তাঁর কণ্ঠে আল্লাহর কালাম শ্রবণের জন্য মানুষ ছাড়াও, আকাশের উড়ন্ত পাখি পর্যন্ত নেমে আসতো।
হযরত সুলাইমান (আ.)Ñএর যুগ ছিল রাজ ক্ষমতা এবং অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্যের যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে মানব ইতিহাসের সর্বাধিক রাজক্ষমতা এবং অর্থ-সম্পদ দান করেছিলেন। তিনি এমন রাজ-ক্ষমতা সম্পন্ন ছিলেন যে, কেবলমাত্র জিন-পরী এবং পশু-পাখি কেন? বায়ূ পর্যন্ত তাঁর আজ্ঞাধীন থাকতে বাধ্য ছিল।
হযরত মূছা (আ.)-এর যুগ ছিল যাদু বিদ্যার উৎকর্ষের যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে ‘লাঠি’ দিয়ে সাপ বানানোর ক্ষমতা দান করেছিলেন।
হযরত ঈসা (আ.)-এর যুগ চিকিৎসা বিদ্যার সোনালীর যুগ। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এমন রোগ নিরাময় ক্ষমতা দান করেছিলেন যে, তার হাতের স্পর্শের জন্মান্ধ ব্যক্তি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেত এবং কুষ্ঠরোগী রোগ থেকে মুক্তি পেত। এমনকি মৃত ব্যক্তিও আল্লাহর হুকুমে জীবিত হয়ে যেত।
এমনিভাবে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর যুগ ছিল সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ্যেত্বের যুগ। তাই তাঁকে দেওয়া হয়েছিল গোটা বিশ্বের অদ্বিতীয় উজ্জ্বলতম সাহিত্যগ্রন্থ আল-কুরআন। যাকে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর সর্বাপেক্ষা বড় এবং স্থায়ী মু‘জিযা বলে উল্লেখ করে, গোটা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। যেমন কুরআনুল কারীমে সমগ্র মানব গোষ্ঠীকে সম্বোধন করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেন যে, যদি তোমরা কুরআনকে আল্লাহর কালাম বলে স্বীকার না কর; বরং মানব রচিত  মনে কর, তাহলে তোমরাও তো মানুষ; এর মত একটি গ্রন্থ রচনা করে নিয়ে এসো। প্রয়োজনে তোমাদের সাথে জিনদেরকেও মিলিয়ে নাও।
যখন তারা কুরআনের ন্যায় গ্রন্থ রচনা করতে অপারগ হলো, তখন তাদের অপারগতাকে আরো প্রকটভাবে প্রমাণ করার জন্য পর্যায়ক্রমে বলা হয়েছে, যে তোমরা কুরআনের সূরার ন্যায় দশটি সূরা তৈরী কর। সর্বশেষে বলা হয়েছে যে, তোমরা কুরআনের সূরার ন্যায় একটি সূরা তৈরী কর। নি¤েœ এ সম্পর্কে আয়াতসমূহ উল্লেখ করা হলো।
“বল, যদি মানুষ ও জিন এ কুরআনের অনুরূপ হাজির করার জন্য একত্র হয়, তবুও তারা এর অনুরূপ হাজির করতে পারবে না। যদিও তারা একে অপরের সাহায্যকারী হয়।” (সূরা আল-ইসরা : ৮৮)
নাকি তারা বলে, ‘সে এটা রটনা করেছে’? বল, ‘তাহলে তোমরা এর অনুরূপ দশটি সূরা বানিয়ে নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পার ডেকে আন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’। (সূরা হূদ: ১৩)
নাকি তারা বলে, ‘সে তা বানিয়েছে’? বল, ‘তবে তোমরা তার মত একটি সূরা (বানিয়ে) নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া যাকে পারো ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও’।  (সূরা ইউনুস: ৩৮)
আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাক, তবে তোমরা তার মত একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাক; যদি তোমরা সত্যবাদী হও। (সূরা বাকারা: ২৩)
অনুরূপভাবে তাদের অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করার জন্য আমাদের প্রিয়নবী (সা.) একটি অভিনব পন্থা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কুরআনের সবচেয়ে ছোট সূরা ‘সূরায়ে কাউছারের’ একটি আয়াত إنا أعطيناك الكوثر লিখে কাবা ঘরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখার জন্য সাহাবায়ে কেরামকে পরামর্শ দিলেন এবং তৎকালীন প্রথিত যশা কবি-সাহিত্যিক এবং জ্ঞানী-গুনীদেরকে ঐ আয়াতের বর্ণনা ভঙ্গি, ভাষাশৈলী, অনন্য রচননীতি এবং সমিল ছন্দের ন্যায় আরেকটি আয়াত রচনা করার জন্য আহ্বান জানালেন। আরবের সেরা কবি সাহিত্যিকগণ তাঁর এ ডাকে সাড়া দিয়ে শত চেষ্টা করেও ঐ আয়াতের ন্যায় একটি আয়াত রচনা করতে সমর্থ হয়নি, ফলে তারা জোটবদ্ধভাবে পরাজয় বরণের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়।
অবশেষে তখনকার যুগের শ্রেষ্ঠ কবি ‘লবিদ ইবনে রাবিয়াহ’ উক্ত আয়াতটি লিখে দিলেন: ليس هذا كلام البشر অর্থাৎ এটা কোন মানব রচিত গ্রন্থ নয়। সাথে সাথে ঐ ছন্দের মাধ্যমেই তাদের পরাজয় বরণের ঘোষণাটি আরো প্রস্ফুটিত হয়ে উঠে।
মোটকথা, কুরআনের অসাধারণ বর্ণনা ভঙ্গি, ভাষাশৈলী, অনন্য রচনানীতি এবং বিষয়বস্তুর মৌলিকত্ব ও গভীরতার কারণেই কুরআন ও কুরআনের বাহক নবী (সা.) এর বিরুদ্ধে জান-মাল এবং ইজ্জত-আবরু সবকিছু ব্যয় করার জন্য তারা প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও কুরআনের এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে একটি আয়াত রচনা করতে কেউ সাহসী হয় নি।
কুরআনের এ দাবী বা চ্যালেঞ্জে সারা আরববাসী  শুধু পরাজয়বরণ করেই ক্ষান্ত হয়েছে, তা নয়; বরং একে অনন্য বা অদ্বিতীয় বলেও প্রকাশ্যভাবে স্বীকার করেছে। যেমন কথিত আছে, আরবের একজন সরদার ‘আসআদ ইবনে যেরার’ রাসূল (সা.)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা.) এর নিকট স্বীকার করেছেন যে, তোমরা অনর্থক মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিরুদ্ধাচরণ করে নিজেদের ক্ষতি করছো এবং পারস্পরিক সম্পর্কচ্ছেদ করছো। আমি দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে, নিশ্চয় তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি যে কালাম পেশ করেছেন তা আল্লাহর, এতে বিন্দু মাত্রও সন্দেহ নেই। (মা‘আরেফুল কুরআন বাদশা ফাহাদ কর্তৃক প্রকাশিত ২৪ পৃষ্ঠা)
আরবের জাহেলী যুগের সাতজন শ্রেষ্ঠ কবির অন্যতম সাহাবী লবীদ (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর নি¤œলিখিত দু‘টি ছন্দ ব্যতীত অন্য কোন কবিতা আবৃত্তি করেননি। কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দেন যে, ‘কুরআনের (অনন্য ভাষাশৈলীর) সামনে কবিতা আবৃত্তি করতে আমি লজ্জাবোধ করি।’ কবি লাবীদের ছন্দ দু‘টি নিম্নে দেওয়া হলো:
< ألا كل شيئ ماخلا الله باطل
< و كل نعيم لا محالة زائل
< نعيمك في الدنيا غرور و حسرة
< و عيشك في الدنيا محال  و باطل
“জেনে রেখ! আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া সবই অকার্যকর। সমস্ত নিয়ামত অবশ্যই ধ্বংস হবে। তোমার পার্থিব নেয়ামত ধোঁকা এবং আফসোসের সামগ্রী। আর তোমার সুখের জীবন এ পৃথিবীতে নিশ্চয় অসম্ভব ও অকার্যকর।
হযরত মূছা (আ.) যখন আল্লাহর দিদার লাভের উদ্দেশ্যে ‘তূর পাহাড়ে’ গিয়েছিলেন, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর সাথে তাঁর ভাষাতেই কথোপকথোন করেছিলেন। এমনিভাবে আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ (সা.) যখন ‘হেরা গুহায়’ আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, তখন হযরত জিবরাঈল (আ.) তাঁর ভাষাতেই তাঁর নিকট আল্লাহর বাণী নিয়ে এসেছিলেন।
দ্বিতীয়তঃ ইসলাম মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিয়েছে বলেই ইসলাম যেখানেই পৌঁছেছে, সেখানকার মাতৃভাষা পরিচর্যায় প্রেরণা যুগিয়েছে। এ সত্যটিকে মর্মেমর্মে উপলদ্ধি করে আমাদেরকেও স্ব-স্ব মাতৃভাষায় দক্ষতা ও পারদর্শিতা অর্জন করে ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রচার ও প্রসারের কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
আমাদের মাতৃভাষা ‘বাংলা’। বাংলাদেশসহ পশ্চিম বঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার এক বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে প্রায় ত্রিশ কোটি বাংলা ভাষা-ভাষী। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর নিকট নবীদের অনুসারী হিসেবে যুগ চাহিদার ভিত্তিতে আল্লাহর বিধি-বিধান এবং ইসলামের সুমহান আদর্শের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে উলামায়ে কেরামগণসহ বক্তাগণের মাতৃভাষায় দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজনীয় নয় কি?